সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ১৭ )


বানরেরা ছুটে গিয়ে অশ্রসজল চোখে ভগবান শ্রীরামের সম্মুখে দাঁড়ালো । সকলে কেবল মস্তক নীচু করে রোদন করছিলো। অপরদিকে লঙ্কায় বিজয় , উল্লাস, আতসবাজি পোড়ানো হচ্ছিল্ল। এই সময় লক্ষ্মণ অনুপস্থিত । শ্রীরামের শঙ্কা হচ্ছিল্ল। লঙ্কায় কেন আজ বিজয়
উৎসব ? এত বাদ্য কেন লঙ্কায় বাজানো হচ্ছে? শ্রীরাম বললেন- “আমার প্রাণের অধিক প্রিয় আমার ভ্রাতা কোথায়?” বানরেরা সব বলল। শ্রীরাম যেন চোখে নিশীথ অপেক্ষাও অধিক তমসা দেখলেন । বুক ভার হয়ে আসলো। হস্তপদ অসার ও শুন্য মনে করলেন । এক ছুটে সমুদ্র তটে এসে দেখলেন লক্ষ্মণ মাটিটে চোখ বন্ধ করে শায়িত। সকলে তাহাকে ঘীরে রোদন করছে। ভগবান রাম ভূমিতে বসে লক্ষ্মণের মস্তক ক্রোড়ে নিয়ে বিলাপ করে প্রলাপ বকতে আরম্ভ করলেন শোকে। পরে বললেন- “হে লক্ষ্মণ! তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে গেলে ? এই যুদ্ধ কত আর বলি নেবে? আমি কি মুখ দেখাবো রাজ্যে ফিরে ? মাতা কৌশল্যা , মাতা কৈকয়ীকে , মাতা সুমিত্রাকে কি উত্তর দেবো? ঊর্মিলাকে কি উত্তর দেবো ? হে ভ্রাতা! তুমি ভিন্ন এই যুদ্ধে জয়ী বা পরাজিত হই- তার আর অর্থ থাকে না। ভ্রাতা ! অরণ্যে তুমি আমাকে এক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার ন্যয় সর্বদা দেখাশোনা করে এসেছো। নিজের সুখ না দেখে কেবল আমার আর সীতার সেবা করেছো । আমি কিছুই করতে পারি নি। হায় ঈশ্বর! কেন আজ আমি ভ্রাতাকে যুদ্ধে প্রেরণ করলাম।”পদ্মলোচন শ্রীরামের নয়ন থেকে অশ্রু পতিত হতে লাগলো । জাম্বুবান দেখে বলল – “প্রভু লক্ষ্মণ কেবল মূর্ছা গেছেন। প্রাণ আছে। এই অস্ত্র ধীরে ধীরে প্রভাব বৃদ্ধি করছে। সুচিকিৎসা দ্বারা এই অস্ত্রের প্রভাব বিনষ্ট করে লক্ষ্মণকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব।” বিভীষণ বলল- “প্রভু! এর চিকিৎসা লঙ্কার শ্রেষ্ঠ বৈদ্য সুষেণ করতে পারেন। তাহাকে আনা হোক।” হনুমান যেতে রাজী হল। এক লম্ফ দিয়ে লঙ্কায় ঢুকে সুষেণ বৈদ্যের ঘর সমেত উড়িয়ে নিয়ে আসলো । সুষেণ সমস্ত দেখে বলল- “আমি লঙ্কার চিকিৎসক । শত্রু পক্ষের চিকিৎসা করলে আমার প্রাণ যাবে। মরে গেলেও এ আমি করতে পারবো না।” হনুমান অনেক ভয় দেখালেও সুষেণ চিকিৎসা করলো না।

তখন ভগবান রাম করজোড়ে বললেন- “হে বৈদ্যশ্রেষ্ঠ! ভগবান ধন্বন্তরি কি শত্রু মিত্র জ্ঞান করে চিকিৎসা শাস্ত্র প্রদান করেছেন ? হে বৈদ্যরাজ! বৈদ্যের কর্তব্য শত্রু মিত্র ভেদ না দেখে চিকিৎসা করা। কোন ব্যক্তিই বৈদ্যের শত্রু হয় না। বৈদ্যের শত্রু কেবল রোগজীবানু হয়- রোগী নন। আমি আমার ভ্রাতার জীবন ভিক্ষা চাইছি। আপনি নিজের মনকে প্রশ্ন করুন। যদি আপনি চিকিৎসা না করেন, তবুও আপনাকে অক্ষত লঙ্কায় পৌছে দেওয়া হবে। কিন্তু তাহার পর আপনি বিবেকের কাছে কি উত্তর দেবেন?” সুষেণ এইভাবে ভগবান রামের কথায় অনুপ্রাণিত হল। ভাবল ইনি তো যথার্থ বলেছেন । আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের উৎপত্তি রোগীকে আরোগ্য প্রদানের জন্য। স্বার্থ , লোভ এর স্থান আয়ুর্বেদে নেই। যদি চিকিৎসা না করা হয় এতে ভগবান ধন্বন্তরি কোনদিনই ক্ষমা করবেন না। ভাবলেন কপালে যা আছে হোক। ধন্বন্তরিকে প্রণাম করে সুষেণ লক্ষ্মণের নাড়ি টিপে দেখে বলল- “এ বেঁচে আছে। তবে ক্ষত ধীরে ধীরে একে মৃত্যুমুখে নিয়ে যাচ্ছে । এর ঔষধ হল বিশল্যকরণী । কাল সূর্য উদয়ের আগে একে সেই ঔষধি সেবন করালে সম্পূর্ণ সুস্থ হবে। নচেৎ মৃত্যু অবধারিত । জগতের কোন বৈদ্য বাঁচাতে পারবে না।” সকলে জিজ্ঞেস করলো এই ঔষধি কোথায় পাওয়া যায় ? সুষেণ বলল- “সেই স্থান বহুদূরে । উত্তরে হিমালয়ের ঋষভ ও কৈলাস শিখরের মাঝে গন্ধমাদন পর্বত অবস্থিত। সেই পর্বতে এই দিব্য ঔষধি পাওয়া যায় । সেখানে মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী , সন্ধানকরণী নামক চার দিব্য ঔষধি দেখা যায়। সেই ঔষধি থেকে দিব্য জ্যোতি নির্গত হয়। এই ঔষধি আনয়ন করা সামান্য ব্যাপার নয়। সমুদ্র মন্থনের সময় এই ঔষধি সকল প্রকটিত হয়েছিলো। দেবতারা এই ঔষধি প্রহরা দেন। সেই ঔষধি সূর্য উদয়ের আগে বেটে খাওয়ালে শ্রীমান লক্ষ্মণ সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করবেন।” কিন্তু একরাতের মধ্যে কে হিমালয়ে যাবে? আর নিয়ে আসবেই বা কে? জাম্বুবান বলল- “আমার মনে হয় হনুমান ব্যতীত এই কাজ কেউ সম্পাদন করতে পারে না। যেমন সেই প্রথম মাতা সীতার অন্বেষণ করে এনেছিলো । সে বায়ুরপুত্র। প্রবল গতিতে আকাশ ভ্রমণের বিদ্যা তার করায়ত্ত । হে পবন পুত্র! তুমি সত্বর গিয়ে সেই ঔষধি আনো।” ভগবান শ্রীরাম তখন হনুমানের কাছে অনেক অনুনয়- বিনয় করলেন। হনুমান রাজী হলেন । রাম নাম নিয়ে লম্ফ দিয়ে আকাশে উঠে উড়ে চললেন হিমালয়ের দিকে। রাবণ গুপ্তচর মারফৎ সব খবর পেয়ে প্রথমে বিভীষণ, তারপর সুষেণ কে অনেক গালমন্দ করলেন। এরপর রাক্ষস বীর কালনেমিকে আদেশ দিলেন হিমালয়ে ঐ হনুমানকে হত্যা করবার । কালনেমি হিমালয়ে চলল।

সীতা সব শুনেছিলেন । তিনি রোদন করে বিলাপ করতে লাগলেন। সীতার কাতর অবস্থা দেখে শূর্পনাখা, রাবণ আদি এরা হাস্য করতে লাগলো। লঙ্কায় যেনো বিজয় উৎসব আরম্ভ হয়েছে । কারণ তারা আনন্দে ছিলো যে লক্ষ্মণ এবার মরবে । সূর্য উদয়ের আগে এতদূর থেকে হনুমান সেই পর্বত আনতে পারবে না। সে ভেষজ উদ্ভিদ চিনবে না। পৌছালেই কালনেমির হস্তে মরবে । সীতাদেবী করজোড়ে দেবতাদের কাছে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন। ভগবান ধন্বন্তরি , যম দেবতা, সূর্য দেবতা এঁনাদের কাছে লক্ষ্মণের আয়ু ভিক্ষা প্রার্থনা করতে লাগলেন। রোদন করে করে বারংবার এই সকল দেবতাদের কাছে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন । অপরদিকে ভগবান রাম সমুদ্র তীরে লক্ষ্মণের মস্তক ক্রোড়ে রেখে কেবল রোদন করতে লাগলেন । হনুমান উড়ে চললেন। আকাশের নক্ষত্র গুলি আগুনের ফুলকির ন্যায় তীব্র বেগে পেছনে সড়ে যাচ্ছিল্ল। প্রবল গতিবেগে হনুমান উড়ে যাচ্ছেন । চন্দ্রালোকে ঘুমন্ত নগরী, গ্রাম, পর্বত কন্দর , জনপদ দেখতে পেলেন। কত পাহার, অরণ্য পার করে গেলেন । প্রবল গতিবেগে উড়ে যাচ্ছেন । একসময় পৌছে গেলেন হিমালয় পর্বতে । বরফে ঢাকা হিমালয়। এখানে পূর্বে শিবলিঙ্গ নিতে এসেছিলেন , মনে পড়লো । দেখলেন সেই যোগীরা ঠাণ্ডায় এখনও ভগবানের তপে মগ্ন । হনুমান সব দেখে গন্ধমাদন পর্বতের খোঁজ করতে লাগলেন । সেখানে কালনেমি পৌছে ভেক ধরেছিল । মায়াবলে যোগী রূপ ধরে, মায়া দ্বারা একটি আশ্রম কুটির নির্মাণ করেছিলো । সেই দুরাচারী রাক্ষস এক কলসি জলে ভয়ানক বিষ মিশিয়ে রেখেছিলো। পরিকল্পনা করেছিলো যে হনুমান আসলেই তাকে এই বিষাক্ত জল পান করতে দেবে। সেই খানে একটি পুকুরে গন্ধকালি নামে এক অপ্সরা শাপিত হয়ে কুমীর হয়ে নিবাস করেছিলো। সেই প্রকাণ্ড কুমীর অতীব শক্তিমান ছিলো। কেউ এই পুকুরে আসতো না। সেই গন্ধকালি সকল কিছুই দেখছিলো। বিশাল কুমীর যে এই পুকুরে থাকে সেই কথাও জানতো কালনেমি। ভাবল সেই হনুমান যদি বিষাক্ত জলে না মরে তবে এই পুকুরে প্রেরণ করবে। আর হনুমান তখন কুমীরের ভোজন হবে। এই ভেবে কালনেমি অতি আনন্দিত হচ্ছিল্ল। ভেক ধরে কপালে তিলক কেটে, তুলসীমাল্য হাতে, বাহু, কণ্ঠে ধারণ করে ‘রাম’ নাম কীর্তন করছিলো । আর খেয়াল রাখছিলো কখন হনুমান আসে। হনুমান সেই দিক হতে রাম নাম শুনতে পেয়ে সেই আশ্রমে উপস্থিত হল।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger