সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( সুন্দরাকাণ্ড পর্ব- ১৯ )


এইভাবে বানর সেনারা লঙ্কায় পৌছালো শত যোজন পার করে। লঙ্কার চরে তাঁবুতে সকলে মশাল প্রজ্বলিত করলো।
কালো আকাশে একটি দুটি করে নক্ষত্রমালার সাড়ি দেখা গেলো। তার মধ্যে শশী শোভা পেলো। সমগ্র সমুদ্র তটের বালি জ্যোৎস্নাতে চিকচিক করছিলো । সমুদ্রের নীল জলরাশিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব খেলা করছিলো । দূর হরে রাক্ষসেরা এই সকল তাবুতে প্রজ্বলিত অগ্নি মশাল প্রত্যক্ষ করছিলো । যেনো অসংখ্য আগুনের ফুলকি । গুনে শেষ করা যাবে না মশালের সংখ্যা । শ্রীরাম, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব, অঙ্গদ, বিভীষণ সুবেল পর্বতে উঠল । পর্বতের মধ্যে একটি সমতল জায়গা দেখে সেখানে প্রভুর জন্য উত্তম কুটির নির্মাণ করা হল। লক্ষ্মণ উত্তম শুকনো তৃন তে মৃগ চর্ম বিছিয়ে শয্যা রচনা করলেন । ভগবান শ্রীরাম সেই শয্যাতে শয়ন করলেন । তিনি চন্দ্রের নিদারুন আলোকে লঙ্কাকে দেখতে লাগলেন। এই পর্বত থেকে লঙ্কার নগর দেখা যায় । সেখানে কুটির গুলো আলোকমালাতে ঝলমল করছে । রাক্ষস রাক্ষসীরা সকলে নানা স্থানে বেড়িয়েছে। এদের যুদ্ধ সম্বন্ধে ভয় নেই। রাবণের মতো তাদের ধারনা যে এই বনের পশুদের অনায়েসে নিধন করা সম্ভব । কিন্তু ভগবান শ্রীরাম ভাবলেন অন্য কথা। নির্মল, চাঁদের জ্যোৎস্না আর শ্বেত বালুকায় চিকিমিকি দেখতে দেখতে ভগবান শ্রীরাম নানা কথা ভাবতে লাগলেন। ভাবলেন এই যুদ্ধে যেই বিজয়ী হোক, মাঝখান থেকে অনেক নীরিহ প্রান মারা যাবে। এই মর্কট, কপি, ভল্লুক, লেঙুরেরা নিজেদের পরিবার, নিজেদের আত্মীয় স্বজন ফেলে সুগ্রীবের একডাকে যুদ্ধ করতে এসেছে। না জানি যুদ্ধান্তে কজন বা দেশে ফিরতে পারবে । বিভীষণের মতো হয়তো লঙ্কাতে আরোও কিছু ধার্মিক রাক্ষস থাকতে পারে। যারা কেবল রাবণের দর্পের জন্য হত হবে। কিংবা রাক্ষসদের ছেলে মেয়েরা অনাথ হবে। রাক্ষসীরা অকালে বিধবা হবে। এই যুদ্ধ কি রোধ করা যায় না ।

তিনি তো এই কারণেই হনুমানকে দিয়ে শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। যদি রাবণ সীতাকে ফিরিয়ে দিতো, তাহলে এত নীরিহ প্রান বলি হত না। কিন্তু রাবণ উগ্র মেজাজী আর জেদী। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সম্বন্ধে তাঁর ধারনাই নেই । দর্প আর অহংকার নিয়ে বসে আছে । এই সময় লক্ষ্মণ বলল- “দাদা! আপনি কি চিন্তন করছেন ? কেনই বা এইহেন চিন্তা করছেন । সেনা সমেত আমরা এখন এখানে। আপনি আদেশ দিলে এখুনি আমরা লঙ্কা আক্রমণ করি।” ভগবান রাম বললেন- “সৌমিত্র! যুদ্ধ হয় দুই রাজার মধ্যে। কিন্তু প্রাণ যায় অনেক নিরীহ মানবের। যাদের সাথে এই যুদ্ধের দূর দূর অবধি কোন সম্বন্ধ নেই, তারাও বলি হয়। যুগে যুগে এইরকমই হয়ে আসছে। সেই জন্য আমি শান্তি প্রস্তাব দিয়ে দূত করে হনুমানকে পাঠিয়েছিলাম । কিন্তু রাবণ সেই সকল কথা কর্ণে নেয় নি। সে যদি হনুমানের প্রস্তাব শুনে সীতাকে ফিরিয়ে দিতো, তবে অনেক নিরীহ প্রান রক্ষা পেতো।” লক্ষ্মণ বলল- “ভ্রাতা! এই পৃথিবীর সকল মানব যদি আপনার মতো চিন্তন করতো তবে এই ধরাধামেই স্বর্গরাজ্য স্থাপিত হত। কিন্তু অহং বোধ ও মিথ্যা দর্পে অধিকাংশ মানবের নয়ন আবদ্ধ- তাই এই পৃথিবীতে কেবল এত হানাহানি। রাবণ তাদেরই একজন । সে কেবল যুদ্ধ আর ধ্বংস ঘটিয়ে নিজ আস্ফালন প্রকাশ করতে চায়। সে নিজেকে সর্বেসর্বা জ্ঞান করে। তাঁর অন্তরে দ্বেষ ভিন্ন অপর কিছুই নেই। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের যতজন নিহত হবে, তার সব পাপ রাবণের ওপর আসবে। কারণ বিধাতা সব দেখছেন। তিনি জানেন আপনি নিরুপায় হয়েই এই সংহারক যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন। রাবণকে তো আপনি সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু সেই মূঢ়মতি তা গ্রহণ করেনি । সুতরাং আপনার দোষ কোনভাবেই হয় না।” এই সময় কোথার থেকে যেনো নৃত্যগীতের আওয়াজ আসতে লাগলো। তাঁর সাথে ভেসে আসতে লাগলো ঘুঙুরের আওয়াজ । এই সময় এইখানে কে এমন নৃত্যগীত করে নাচ গান করছে, তা জানতে শ্রীরাম উৎসুক হলেন । বিভীষণ বললেন- “প্রভু! এই নৃত্যগীত রাবণের নাচমহল থেকে আসছে। তিনি নিশ্চয়ই দেবকন্যাদের নৃত্য প্রদর্শন করছেন।”

এই বলে বিভীষণ, রাম, লক্ষণ সকলে মিলে সুবেল পর্বতের একটি উচ্চ চূড়ায় উঠলেন । এখান থেকে রাবণের মহল দেখা যায় । রাবণের মস্তকের কিরীট, স্বর্ণ ছত্র ও রানী মন্দোদরীর কর্ণ কুণ্ডল থেকে এত দ্যুতি নির্গত হচ্ছিল্ল, যেনো মনে হল লঙ্কার ঐ রাজসভায় আরোও একটি চন্দ্র অবস্থিত হয়েছে । ভগবান শ্রীরাম আক্ষেপ করে বললেন- “হায় অবস্থা! শত্রুপক্ষ দোরগোড়ায়, অথচ দেশের রাজা এমন নৃত্যগীতে মগ্ন। তিনি যুদ্ধ মহড়া বাতিল করে নৃত্যসুখ উপভোগ করছেন। এমন রাজা যেই দেশে, সেই দেশের অধঃপতন নিশ্চিত।” এই কথা শুনে বিভীষণ অতি লজ্জিত হলেন। কারণ রাবণ তার ভ্রাতা- সে পদাঘাত করলেও সম্পর্ক ত মিথ্যা হয় না । ভগবান রাম বললেন- “আমি রাবণকে এর পূর্বে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এবার আবার একবার সতর্ক করবো, দেখি রাবণ সীতাকে ফিরিয়ে দেয় নাকি।” এই বলে ভগবান রাম তূণ থেকে শর এনে ধনুকে জুড়ে নিক্ষেপ করলেন। উল্কার মতো সেই বাণ তীব্র বেগে চোখের নিমিষে ছুটে গিয়ে রাবণের কিরীট, স্বর্ণ ছত্র, মন্দোদরীর কুণ্ডল ছিন্ন করে দিলো। অকস্মাৎ এমন ঘটনায় দেবকণ্যারা ভয় পেয়ে নৃত্য থামালো। ভূমিকম্প , ঝড় ছাড়া কিভাবে এটা হল এই ভেবে রাবণ অবাক হল। মন্দোদরী নিজেও অবাক হল। পরে রামচন্দ্রের শর দেখে রাবণ কটমট করে বলল- “সেই ভিক্ষুকের এত সাহস।” মন্দোদরী রোদন করে বলল- “দেখুন নাথ! প্রিয়তম আপনি দেখুন! এ কার সাথে আপনি শত্রুতা করছেন । তিনি চাইলে এখুনি আমাকে বৈধব্য প্রদান করতে পারতেন । আপনার সাথে সাথে আমার শাঁখা, পলা, সিঁদুর আমাকে ছেড়ে এখুনি চিরতরে বিদায় নিতে পারতো। কিন্তু বোধ হয় তিঁনি কেবল সাবধান করবার জন্যই এমন করেছেন। হে নাথ! আপনি কি এখনো যুদ্ধে জয়ী হবার আশা দেখেন? আমি তো কেবল আমার দুর্ভাগ্য দেখতে পাচ্ছি। হে নাথ! সীতার স্বামী রামচন্দ্র নরদেহে সাক্ষাৎ ঈশ্বর। তাঁর মধ্যেই সব দেবতা বিরাজিত। আপনিই বলুন কেউ কি ঈশ্বরকে পরাজিত করতে পারে ? যা হতে পারে না, তা কোনযুগেই হয় না। আপনিও পারবেন না। সীতাকে ফিরিয়ে দিয়ে ওঁনার শরণ নিন।” রাবণ ধমক দিয়ে বলল- “মন্দোদরী! সেই রামের মধ্যে যে দেবতারা থাকে তারা আমার ভয়ে থরথর কাঁপে। তাঁদের আমি পরাজিত করেছি । মনে সাহস রাখো। আর জানবে ত্রিলোকবিজয়ী রাবণকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। খুব শীঘ্রই ঐ ভিখারী ভ্রাতা দ্বয়ের মুণ্ড কেটে আমি এইভাবেই ভূমিতে ফেলবো ।” এইভাবে রাবণ বৃথা হাস্য পরিহাস করে রাত্রি জাগরণ করলো ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger