সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-২৪)


যুদ্ধের সংবাদ শুনে রাবণ বিমর্ষ হয়ে পড়লো। একের পর এক বীর মারা যাচ্ছে। চতুরতার দ্বারাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। এখন উপায় কি? কুলঘাতী বিভীষণের নাম স্মরণ মাত্রেই বিভীষণের পুত্র তরণীসেনের কথা মনে পড়লো। ভাবল এবার তাকেই যুদ্ধে পাঠানো হবে। দেখি বিভীষণ কার পক্ষ নেয়। রামের না নিজ পুত্রের। ইষ্ট বড়- না পুত্র। ভক্তি আর বাৎসল্যের মধ্যে দেখা যাক কার জয় হয়। সঙ্গে সঙ্গে তরণীসেনকে সংবাদ দেওয়া হল। তরণী এলে রাবণ বলল- “পুত্র! তোমার আর মেঘনাদের মধ্যে আমি কোন ভেদ দেখি না। তুমিও আমার পুত্রসম । আমার ভ্রাতা আমার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করলেও আমার বিশ্বাস তুমি এরূপ করবে না। অক্ষয়কুমার , নরান্তক, দেবান্তক, ত্রিশিরা, মকরাক্ষ এরা তো তোমারই সহোদর ছিলো । জাতিতে তুমিও রাক্ষস। আমি তোমার পিতাকে বিদায় করলেও তোমাদের ত আদর যত্ন করি না- এমন ত নয়। এই দুর্দিনে তুমি লঙ্কার সম্মান রক্ষা করো। যদি আমি সীতাকে এখন রামের হাতে তুলে দেই তাহলে লঙ্কার রাজার অপমান হবে, লঙ্কার অপমান হবে। ত্রিলোক বলবে লঙ্কা ঐ দুই ভিখারীর চরণে নতমস্তক হয়েছে। তুমি কি চাও তোমার জন্মভূমির এই বদনাম হোক?” তরণী বুঝতে পারলো যে খুঁড়ামহাশয় এইসব বলে তাহাকে অধর্মের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করতে বলছে। তবুও সে বলল- “খুঁড়ামহাশয়। আমি এই যুদ্ধে যাবো। শ্রীরামের সাথে যুদ্ধের পরিণাম কি, তা আমি জানি। যুদ্ধে আমি নিহত হই কি বেঁচে থাকি। কিন্তু লঙ্কার সম্মান বজায় রাখবো।” তরণীসেন নিজ মাতা সরমার কাছে বিদায় নিতে গেলো । সরমা বলল- “পুত্র তুমি কি যেচে মৃত্যুকে বরণ করতে যাচ্ছো? শ্রীরামের সাথে যুদ্ধ করার ফল কি জানো না? এই রকম প্রস্তাবে কেন সায় দিলে? চলো আমি আর তুমি গোপোনে তোমার পিতার নিকট যাই। শ্রীরামকে কেহই পরাজিত করতে পারেন না। তোমার পিতা বলতেন যে রাক্ষস জাতির নাশ করেই উনি লঙ্কা থেকে প্রস্থান করবেন। অতএব যুদ্ধের বিচার ত্যাগ করো।” তরণীসেন বলল- “মাতা! এই যুদ্ধের পরিণতি আমি জানি। লঙ্কার পরাজয় হবে। কিন্তু দেশে আক্রমণ হলে দেশবাসীর কর্তব্য শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা। আমি সেই নিয়ম পালন করতে করতে বীরগতি ও মুক্তি পেতে চাই। মাতঃ সকলে আমাকে বিশ্বাসঘাতকের পুত্র বলে লঙ্কায় উপহাস করে। তোমাকে বিশ্বাসঘাতকের পত্নী বলে ব্যঙ্গ করে। আমি এমন কিছু করে যেতে চাই, যাতে লঙ্কার লোকেরা আমাদের উপহাস না করে। তুমি আমাকে ত্যাগ করে সেই মিথ্যা দোষকে খণ্ডন করো।”

তরণীসেন আরোও বলল- “মাতঃ! আমি জানি শ্রীরাম পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ। তিনি রাক্ষসদিগের বধ করে তাহাদের মুক্তি প্রদান করছেন। এই সুযোগ কিভাবে হাতছাড়া করি? আমার ইষ্ট আমাদের সামনে। একবার তাঁহার দর্শন লাভ অবশ্যই করবো। তুমি আমাকে বিদায় দাও।” এই বলে তরণীসেন মাতাকে বুঝালে চোখের জলে সরমা বিদায় দিলেন। কারণ সরমা জানেন এই তার শেষ সাক্ষাৎ পুত্রের সাথে। লঙ্কার অনান্য মাতাদের ন্যায় এবার তার গর্ভ খালি হবে। প্রভাতে চতুর অক্ষৌহিণী সেনা দিলেন রাবণ। ত্রিজটার ভ্রাতা মায়াবী ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত বক্রজটাকে সেনাপতি করে দিলেন । তরণীকে আলিঙ্গন করে রথে বসালেন । মেঘনাদ , ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করে বিদায় দিলেন । সাড়ি সাড়ি রথে যার মস্তকে নানা পতাকা উড়ছিলো, রাক্ষসেরা ধনুর্বাণ , মুষল, খাণ্ডা, শেল, শূল, গদা, তরোয়াল নিয়ে উঠলো । সরমা কপাট রোধ করে ভূমিতে আছরে কাঁদতে লাগলো। কারণ জানে তার সন্তান আর ফিরবে না। তরণীসেনের নেতৃত্বে রাক্ষসেরা সব বের হল। হৈহৈ করে বের হল। বানরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। বানেরার বৃক্ষ, প্রস্তর নিক্ষেপ করে রাক্ষস ধ্বংস আরম্ভ করলো । ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মিত্র বিভীষণ! ঐ রথে আসীন তেজস্বী প্রতাপী বালক কে? সে যুদ্ধ বিদ্যায় এত পারঙ্গদ। সে বোধ হয় আমার ভক্ত। কারণ তাঁর অঙ্গে তিলক, মাল্য শোভা দেখা যাচ্ছে। কে সেই বীর?” বিভীষণ আর কি বলে? পুত্রকে দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো । আজ তার কোল খালি হবে। অশ্রু চেপে হৃদয়ে পাথর চাপা দিয়ে বলল- “প্রভু ! এ এক লঙ্কার অতি বীর। একে রোধ না করলে আজ এ সমস্ত বানর সেনার নাশ করেই ছাড়বে।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “ভক্তের দেহে সূচাগ্র বিদ্ধ হলে আমার দেহে শেল বিদ্ধ হয়। আমি আমার ভক্তের ওপর কিভাবে অস্ত্র নিক্ষেপ করবো? এই যুদ্ধ না জানি আর কি কি দেখাবে?” তরণী সত্যই বীর ছিলো। বিভীষণ বলল না যে এ তার ছেলে, পাছে প্রভু আর যুদ্ধ না করেন । তরণীর প্রবল বিক্রম আরম্ভ করে চোখের পলকে লক্ষ লক্ষ বানর, ভল্লুক, লাঙ্গুর, মর্কট বধ করলো। অঙ্গদ, গবাক্ষ, নল, নীল, সুগ্রীব, মৈন্দ, দিবিদ, কেশরী আদি বানরেরা পলায়ন করলো পরাজয় মেনে। হনুমানের দেহ রক্তাক্ত হল। অপরদিকে বক্রজটার সাথে লক্ষ্মণের ঘোরতর যুদ্ধ হল ।

লক্ষ্মণ যত বাণ মারে বক্রজটার কিছুই হয় না। তখন বিভীষণ বলল- “লক্ষ্মণ ঠাকুর! বক্রজটা ব্রহ্মার বর পেয়েছে যে সে ব্রহ্মার প্রদত্ত কোন অস্ত্রেই মরবে না। আপনি এমন কোন বাণ নিক্ষেপ করুন যাহা ব্রহ্মার অস্ত্রভাণ্ডারে নেই।” তখন লক্ষ্মণ ব্রহ্মার সকল অস্ত্রের চেয়েও বহুগুণ ক্ষমতা শালী ‘ব্রহ্মজিৎ’ অস্ত্র নিক্ষেপ করলো। সেই অস্ত্রে বক্রজটার মুণ্ড কেটে মাটিটে পড়লো। বক্রজটা নিহত হতেই লক্ষ্মণ তরণীর সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করলো। তরণীর হস্তে পরাজিত হল । তখন শ্রীরাম সামনে এসে বললেন- “রোস বালক! তোর ধৃষ্টতা এতক্ষণ আমি বালকজ্ঞান করে ক্ষমা করেছি। যা ফিরে যা। নচেৎ তোর বধ করবো।” তরণী নিজেও বলল না যে সে বিভীষণের সন্তান, পাছে প্রভু তাঁকে বধ না করেন । তরণী ধনুক রেখে করজোড়ে স্তবস্তুতি করে বলল- “হে মর্যাদা পুরুষোত্তম। আপনিই সেই নারায়ণ! আপনি ত্রিলোক স্বামী । আপনি জগতের রক্ষক । হে ভগবন আপনি মৎস্য, কূর্ম , বরাহ, নৃসিংহ , বামন , পরশুরাম অবতার গ্রহণ করেছেন। আপনিই এখন রাম রূপে আমার সামনে । হে রঘুনাথ। আমি আপনার স্তব কিভাবে করবো ? বেদবেদান্তে আপনাকে পরব্রহ্ম বলে স্তবস্তুতি করেও মুনি ঋষিরা আপনার সম্পূর্ণ মহিমা কীর্তন করতে অসমর্থ হয়েছেন। হে ভগবান। আপনাকে প্রণাম জানাই।” এইভাবে স্তবস্তুতি জানালে ভগবান শ্রীরাম প্রসন্ন হয়ে বললেন- “তবে বালক! ফিরে যাও! ভক্তের ওপর আমি অস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারি না।” তরণী বলল- “তবে আপনি আমার সাথে যুদ্ধ না করলে আমি সম্পূর্ণ বানর সেনা নষ্ট করবো।” এই বলে তরণী বানর কটক নষ্ট করতে থাকলে ভগবান শ্রীরাম যুদ্ধ আরম্ভ করলেন। ভক্ত আর ভগবানের যুদ্ধ দেখছিলেন হর গৌরী, ব্রহ্মা- সরস্বতী , ইন্দ্রাদি দেবতারা। এই দৃশ্য বড়ই দুর্লভ । তরণী যত অস্ত্র নিক্ষেপ করে সব অস্ত্রই নিবারণ করেন প্রভু শ্রীরাম । অন্তে প্রভু শ্রীরাম “ব্রহ্মশক্তি” বাণ নিক্ষেপ করলেন । সেই বাণে তরণীর বুক বিদীর্ণ হল। মাটিটে পড়ে ‘রাম’ নাম জপতে লাগলো। রাক্ষসেরা পলায়ন করলো। বিভীষণ ‘হা!পুত্র’ বলে তরণীর নিকট গেলেন। শ্রীরাম সব দেখে অবাক ! বললেন- “মিত্র! তুমি আগে কেন বল নি এ তোমার পুত্র! হায় ঈশ্বর! এই যুদ্ধ আর কি কি পরিস্থিতি সামনে আনবে! আমি কিনা আমার মিত্রের সন্তানের হত্যা করলাম।” তরণী সেই অবস্থায় ভগবান শ্রীরামের চরণ ছুয়ে বলতে লাগলেন- “প্রভু এ হত্যা নয়। মুক্তি। আপনার শ্রী চরণ স্পর্শ করে দেহ ত্যাগের ভাগ্য কজন লাভ করে?” এই শুনে প্রভু শ্রীরাম রোদন করতে লাগলেন। তরণীর মস্তক ক্রোড় নিয়ে মস্তকে হস্ত বুলাতে লাগলেন। বানরেরা এই দেখে রোদন করতে লাগলো। ধীরে ধীরে তরণীর শেষ নিঃশ্বাস বের হয়ে গেলো।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger