সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-২১)

কুম্ভ নিকুম্ভ প্রবল আড়ম্বর সহকারে লঙ্কার রাজপ্রসাদে প্রবেশ করলেন । রাজা দশানন তাহাদিগের আদর যত্ন করে যুদ্ধে যেতে আদেশ দিলেন । কপালে তিলক, পুস্পাদি, মুখে তাম্বুল দিয়ে যুদ্ধে পাঠালেন । আট অক্ষৌহিণী সেনা সাথে দিলেন। লক্ষ লক্ষ গজ, অশ্ব, রথ, ধনুর্ধারী রাক্ষস, পদাতিক সেনা গেলো। লঙ্কার মেদিনী কাঁপিয়ে কুম্ভ ও নিকুম্ভ যুদ্ধে বের হলেন । সকলে জয় জয় শব্দে আকাশবাতাস প্রতিধ্বনিত করলো । লঙ্কার রাক্ষসেরা দেখতে লাগলো । কুম্ভ নিকুম্ভ হস্তী পৃষ্ঠে বসেছিলেন । উভয়ে কুম্ভকর্ণের বীরপুত্র। পিতার ন্যায় অতি বলশালী । বানর সেনারা প্রস্তুত হয়ে ছিলো। অপেক্ষা করছিলো কখন লঙ্কার দ্বার উন্মোচিত হবে। লঙ্কার দ্বার খুলতেই লক্ষ লক্ষ রাক্ষসেরা ঝাঁপিয়ে পড়লো । বানরেরা বর্শা, বৃহৎ প্রস্তর, গদা, বৃক্ষ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো । রক্তে রক্তময় হল। রাক্ষসেরা তীক্ষ্ণ শর বর্ষণ আরম্ভ করলো । শরে বানরদের মুণ্ড হস্ত পদ কেটে কেটে আলাদা হয়ে গেলো । অপরদিকে বৃহৎ গদার আঘাতে রাক্ষসেরা সব মুখ থুবরে থুবরে ভূমিতে পড়ে ইহলোক ত্যাগ করলো । যুদ্ধ যেনো আজ সব নাশ করে দেবে এমন মনে হল । হনুমান একাই লাঙ্গুলে পেঁচিয়ে শত শত রাক্ষসকে ভূমিতে আছার দিয়ে খুলি চূর্ণ করলো । গদার আঘাতে লক্ষ লক্ষ হস্তীগুলোকে বধ করলো। ভল্লুকেরা লম্ফ দিয়ে রাক্ষসদের ওপর পড়ে রাক্ষসদের মুণ্ড ছিড়ে উদর ছিড়ে ভক্ষণ করতে লাগলো ।নল , নীল, গবাক্ষ, অঙ্গদ এই সব বীরেরা গদা দিয়ে আঘাত করে শত শত রাক্ষস বধ করলো । যুদ্ধে শরে আচ্ছন্ন হল। বজ্রকন্ঠ নামক রাক্ষস শর দিয়ে ভল্লুক বাহিনীকে আঘাত হানলো । সেই রাক্ষসের শরে ভল্লুকেরা ছিন্নভিন্ন হতে লাগলো অত্যন্ত অট্টহাস্য করে বজ্রকন্ঠ সমগ্র যুদ্ধে রথে দাঁপিয়ে বেড়াতে লাগলো । হস্তীগুলি পায়ে পিষে বানরদের বধ করতে লাগলো । বজ্রকন্ঠের সামনে যতগুলি সুগ্রীবের সেনা পড়লো সকলে ধ্বংস হল। বজ্রকন্ঠ এইভাবে যুদ্ধ করার পর গদা নিয়ে ভূমিতে লাফ দিয়ে নামলো। রাক্ষসের পায়ের তলাতেই কতক বানর পিষ্ট হয়ে ছটফট করে মরল । তাহার পর গদা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে বানরদের খেদিয়ে দিতে লাগলো । রাক্ষসের গদার প্রহারে বানরেরা রক্তবমি করতে করতে প্রান ত্যাগ করলো ।

অট্টহাস্য করে এই ভাবে বজ্রকন্ঠ বহু বীর কপিকে হত্যা করলো । দেহের স্তূপ জমল । এমন সময় তার সামনে আসলো অঙ্গদ । বালির নন্দন অঙ্গদকে দেখেই বজ্রকন্ঠ বলল- “ওরে বালক! এই যুদ্ধে কেন জড়িয়েছিস? আমার খুঁড়া দশাননের সাথে মিত্রতা স্থাপিত করে সুখ ভোগ কর। কেন অকালে প্রান হারাবি?” অঙ্গদ বলল- “ওরে দুর্মতি! একবার আমার সহিত যুদ্ধ কর। দেখবি কে বালক আর কেই বা নাবালক । তুই বরং প্রভু শ্রীরামের শরণাগত হ। এতে প্রাণে বেঁচে যাবি।” বজ্রকন্ঠ মুখে বিকট শব্দ করে গদা উচিয়ে অঙ্গদের মস্তকে আঘাত করবার জন্য দৌড়ে গেলো। অঙ্গদ স্বীয় গদা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো । দুই বীরের মধ্যে রণ চলল। তাহাদিগের রণ চলাকালীন তাদের পায়ের তলায় বহু রাক্ষস বানর পিষ্ঠ হল । দুজনের গদার সংঘর্ষে প্রচণ্ড শব্দ হতে লাগলো । কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারে না এমন ছিলো। উভয়ে উভয়ের ওপর অনেক গদার আঘাত করলো। গদার আঘাতে দুজনেই দুর্বল হল । তখন বজ্রকন্ঠ অতি বেগে গদার আঘাত করলো অঙ্গদের ওপর। বুকে আঘাত পেয়ে অঙ্গদ রক্তবমি করতে করতে ভূমিতে হাটু মুড়ে বসে পড়লো । প্রচণ্ড সূর্যের তাপে তাহার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো। নাক ও মুখ দিয়ে নির্গত শোনিত ধারা তার বস্ত্র, বুক সকল লাল করে দিলো। এই অবস্থা দেখে সুগ্রীব, জাম্বুবান এগিয়ে আসতে গেলে হনুমান বাধা দিয়ে বলল- “অঙ্গদ একাই এই রাক্ষসের বধ করতে সমর্থ।” হনুমান অঙ্গদকে বলল- “অঙ্গদ। তুমি বীর। এই রাক্ষস তোমার কাছে তৃনসম । তুমি একে বধ করতে পারবে। মনে প্রভু শ্রীরামের ধ্যান করে উঠে দাঁড়াও বতস্য।” অঙ্গদের মনে হল সে মূর্ছা যাচ্ছে। এই অবস্থায় হনুমানের বাক্য ভারীভারী হয়ে কর্ণে প্রবেশ করলো। মুখের বোল আটকে যাচ্ছে। হৃদয়ে প্রভু শ্রীরামের ধ্যান করলো । ভগবান রাম, করকমল তার মস্তকে বুলিয়ে দিচ্ছেন এমন মনে হল । অপরদিকে বজ্রকন্ঠ প্রবল এক আঘাত হানবার জন্য গদা তুলে নিলো। অঙ্গদ তখন ‘জয় শ্রী রাম’ বলে লম্ফ দিয়ে গদা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে বজ্রকন্ঠের মস্তকে আঘাত হানলো। বজ্রকন্ঠের মস্তক থেঁতলে গেলো।

বজ্রকন্ঠ মারা যাবার পর সকম্পন নামক আরোও এক বীর রাক্ষস শরে শরে আচ্ছন্ন করলো অঙ্গদকে । অঙ্গের সমস্ত শরীর দিয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত বইছিল । সকম্পন সমানে হাস্য করতে করতে অঙ্গদের দিকে তীক্ষ্ণ বাণ সন্ধান করতে লাগলেন । অঙ্গদ সেইদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সকম্পনের রথের চক্র গদার আঘাতে চূর্ণ করলেন । দুটি চক্র চূর্ণ হতেই রথ পড়ে গেলো । এরপর অঙ্গদ সেই রথ তুলে রাক্ষসদের পালে নিক্ষেপ করলেন। বেশ কিছু রাক্ষস রথের তলে মরল । এরপর সকম্পন ঢাল আর খড়্গ নিয়ে যুদ্ধ করতে আসলে অঙ্গদ খড়্গ আর ঢাল কেড়ে নিলো। এরপর খড়্গের আঘাতে সকম্পনের শিরোচ্ছেদ করে ফেলল। কুম্ভ এবার যুদ্ধে আসলো। কুম্ভ যেই মদমত্ত হস্তীর পৃষ্ঠে বসে ছিলো তার তলায় বহু বানর, ভল্লুক পিষ্ট হল । যূপাখ, শোনিতাক্ষ , শ্রীমৈন্দ, দ্বিবিদ নামক বানর বীরেরা কুম্ভের কাছে পরাজিত হয়ে পালালো । কুম্ভের পেছনে হস্তীগুলো থেকে রাক্ষসেরা সমানে বানরদের শর বিদ্ধ করে বধ করতে লাগলো। সুগ্রীব তার কটক নিয়ে এগিয়ে গেলো। সুগ্রীবের সেনারা বৃহৎ প্রস্তর নিক্ষেপ করে হস্তীগুলিকে ধরাশায়ী করলো। যে সব রাক্ষসেরা হস্তীর পীঠে ছিলো তারাও মরল । সে সময় বিদ্যুমালী নামক এক রাক্ষসের সাথে নলের যুদ্ধ আরম্ভ হল । নল ও বিদ্যুমালী বাহুযুদ্ধ আরম্ভ করলো । একে অপরকে কামড়, আঁচর বসালো। উভয়ের শরীর থেকেই রক্তপাত হতে লাগলো কেউ যেনো কাউকে পরাজিত করতে পারে না। এমনই ছিলো উভয়ের বীক্রম । বিদ্যুমালী ও নল একে অপরের বুকে, মস্তকে কিল, চর দিতে লাগলো। উভয়ের ঠোঁট কেটে শোনিত ধারা বের হল। উভয়ে রক্তাক্ত। এই সময় বিদ্যুমালী একটি রথে উঠে নলের ওপর অস্ত্র নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলে নল একটি বিশালাকার প্রস্তর রথে নিক্ষেপ করলো। সেই প্রস্তরে রথ গুড়িয়ে গেলো। সারথি, অশ্ব সহ বিদ্যুমালী নিহত হল। কুম্ভ এরপর মহাবিক্রমে যুদ্ধ আরম্ভ করলো ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger