সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ১ )


ভয়হর মঙ্গল দশরথ রাম ।
জয় জয় মঙ্গল সীতা রাম ।।

মঙ্গলকর জয় মঙ্গল রাম ।
সঙ্গতশুভবিভবোদয় রাম ।।
আনন্দামৃতবর্ষক রাম ।
আশ্রিতবৎসল জয় জয় রাম ।।
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম ।
পতিতপাবন সীতা রাম ।।

লঙ্কারাজ রাবণ যে শান্তিপ্রস্তাব মানে নি, তা এসে অঙ্গদ জানালো। তখন শ্রীরাম বললেন- “তবে এই যুদ্ধ আর রোধ করা গেলো না। অতএব আমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।” এরপর রাবণ একদিন শুক আর শারণ কে গুপ্তচর করে প্রেরন করলো । লঙ্কার বাইরে যে শত্রু অবস্থান করছে দেখা যাক, তাঁর শক্তি কত। শত্রুকে একবার দেখাই যাক । যদিও বনের পশুগণ ঐ দুই মানুষের সাথে যেসব অস্ত্রই নিয়ে আসুক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। লঙ্কার বিজয় নিশ্চিত। রাবণ এসব ভেবে আনন্দ প্রকাশ করলো। শুক আর শারণ গুপ্তচর হয়ে গেলো। মায়াবিদ্যা দ্বারা কপি রূপ ধরে কপি দলের মাঝে মিশে সকল কিছু ছানবিন করতে থাকলো। কোন তাঁবুতে কতজন বানর আছে, কেমন অস্ত্র আছে তাদের, খাবার- রসদ কোথায় আছে। তারা কি পরামর্শ করছে, লঙ্কার কোন দিক থেকে তারা আক্রমণ করবে, কে কে যুদ্ধ করবে এই সকল আলাপ আলোচনা শুনবার জন্য এদিক সেদিক ভ্রমণ করতে থাকলো । কিন্তু বিভীষণের হাতে ধরা পড়লো । ধরা পড়তেই কপি রূপ ছেড়ে আসল রাক্ষস স্বরূপে আসলো । শুক আর শারণ খুবুই ভয় পেলো । দূত রূপে যখন হনুমান লঙ্কায় গিয়েছিলো, তখন তারা তার সাথে কিরকম নিষ্ঠুর আচরণ টাই না করেছে । এখন এরা নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেবে। না জানি কি শাস্তিই যে অপেক্ষা করে আছে। দুজনের ভয়ে গলা শুকিয়ে গেলো। চোখে মুখে অন্ধকার ছেয়ে গেলো, ভয়ে মুখের বোল আটকে গেলো। হনুমানের আদেশে সকলে শুক আর শারণ কে ভগবান শ্রীরামের কাছে নিয়ে গেলো। নবদূর্বাদল কান্তি শ্রীরামকে দেখে শুক আর শারণ অনেক অভয় পেলো। তাদের মনে হল এই রামচন্দ্র সাক্ষাৎ ক্ষমার মূর্তি । এঁনার শরণ নিলেই সকল ভয় নাশ হয় । ইনি দয়া- করুণাময় । সকলে বলল- “প্রভু । এই দুই রাক্ষস রাবণের গুপ্তচর ! এদের কি শাস্তি দেওয়া যায়?”

ভগবান শ্রীরাম দুই রাক্ষস চরকে তাদের পরিচয় দিতে বললেন। দুই রাক্ষস নিজ পরিচয় দিয়ে বলল- “হে শ্রীরাম! আমরা রাক্ষসরাজ রাবণের গুপ্তচর। তাহার নির্দেশেই আমরা এখানে পর্যবেক্ষণ করতে এসেছি, যে আপনাদের সেনা সংখ্যা ও অস্ত্রাদি। এই আমাদের অপরাধ ।” শুনে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র শৃঙ্খল উন্মোচন করতে আদেশ দিলেন কপিদের । অতঃ বললেন- “এনারা চর। এনাদের উন্মুক্ত করে যথাবিধ সম্মান প্রদর্শন করা হোক। আপনারা প্রকাশ্যেই এই সকল তাঁবু ঘুরে গিয়ে রাবণকে সংবাদ দিতে পারেন।” কপিরা দুই চরের জন্য ফলমূলাদি আনয়ন করে তাঁবুতে বসিয়ে পাখার বাতাস প্রদান করতে লাগলো । লজ্জায় শুক আর শারণ যেনো পারলে মাটিতে মিশে যায়। কারণ যখন দূত রূপে হনুমান লঙ্কায় গিয়েছিলো, তখন তাকে কতই না অপমান করা হয়েছে। একটি আসন অবধি বসতে দেওয়া হয় নি। অঙ্গদকেও কত অপমান করা হয়েছে। আর এঁনারা দেবতুল্য । চর জেনেও এত আদর যত্ন করছে। সত্যই শ্রীরাম মর্যাদা পুরুষোত্তম । এই সকল শুভ গুনের জীবন্ত মূর্তি তিনি । ভগবান রাম বললেন- “শুক, শারণ! আমি এই যুদ্ধে লোকক্ষয়ের কথা চিন্তা করে রাবণকে এর পূর্বে তিনবার সংবাদ দিয়েছি , যে সীতাকে ফিরিয়ে দিতে। তাহলে যুদ্ধ হবে না। অনেক নিরীহ প্রান রক্ষা পাবে। কিন্তু দাম্ভিক রাবণ নিজ সিদ্ধান্তে অটল , তাই যুদ্ধ করার ব্যতীত আমার কাছে আর দ্বিতীয় পথ নেই। তোমরা গিয়ে তোমাদের রাজাকে জানাবে যে এখনো সময় আছে। সীতাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে। অন্যত্থায় আমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।” শুক শারণ সকল কিছু দেখে লঙ্কায় গেলো। রাবণকে সকল সংবাদ দিলো। তাদের মনে ভগবান শ্রীরামের সেই দিব্যরূপ স্থাপিত হয়েছিলো, তাই তাদের অন্তর হতে সকল শঙ্কা নষ্ট হল । শুক শারণ অসংখ্য বানরের শক্তির কথা বলে বলল- “মহারাজ! আমরা এখনো ভগবান শ্রীরামের শত্রুনাশক রূপের কথা শুনেছি। কিন্তু আজ তেঁনার যে কোমল ও উদার স্বরূপ দেখলাম তা দেখে আমি অবাক। সত্যই তিঁনি ভগবান। নাহলে এত দয়ামায়া। আমাদের দূতের ন্যায় সম্মান প্রদান করেছে। হে লঙ্কেশ্বর শ্রীরামের সেনারা খুব শক্তিশালী। যারা সেঁতু বেঁধে শত যোজন আসতে পারে, তাদের পক্ষে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব কিছু না।”

শুনে রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলল- “ওরে মূর্খ! তোদের চর রূপে প্রেরন করলাম আর তোরা রামভক্ত হয়ে ফিরে এলি? তোদের লঙ্কা থেকে নিষ্কাশন করবো।” শুক , শারণ বলল- “মহারাজ! তিনি মর্যাদা পুরুষোত্তম! তিঁনি আমাদের ক্ষমা করেছেন। উনি চাইলেই আমাদের আজ বধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি দয়া ক্ষমার জীবন্ত প্রতীক। উনি জানিয়েছেন সীতাদেবীকে যদি আপনি ফিরিয়ে দেন, তবে উনি যুদ্ধ করবেন না। আর তা না হলে যুদ্ধ করবেন । হে লঙ্কারাজ! আমাদিগের কথা শুনুন। আমরা যা দেখে এলাম তাতে মনে হয় লঙ্কার পরাজয় এই যুদ্ধে নিশ্চিত । শ্রীরাম অবশ্যই বিজয়ী হয়ে সীতা উদ্ধার করবেন । সুতরাং আমাদের অনুরোধ আপনি এই ধ্বংস মূলক যুদ্ধে জড়াবেন না। শ্রীরামের শান্তি প্রস্তাব মেনে সীতাদেবীকে ফিরিয়ে দিন। ভগবান শ্রীরাম এই ঘোষোনা করেছেন যে আপনাকে বধ করে আপনার ভ্রাতা বিভীষণকে লঙ্কার রাজা করবেন। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর রাজতিলক অনুষ্ঠান সেড়ে ফেলেছেন।” রাবণ ক্রোধে বললেন- “দূর হ! তোরা কি রামের শক্তি সম্বন্ধে আমাকে অবগত করছিস নাকি তার প্রশংসা করছিস? ঐ ভিখারীর নামের আগে ‘শ্রী’ বলবি না। নচেৎ এখানেই তোদের মুণ্ডচ্ছেদ করবো।” এই বলে রাবণ , শুক শারণের শিরোচ্ছেদ করতে উদ্যত হলে মেঘনাদ থামালো। শুক, শারণ কে বকাঝকা করে বিদায় করলো। মেঘনাদ অনেক ভাবে বুঝিয়ে বলল- “পিতা! সব সময় শক্তি দ্বারা কাজ সিদ্ধ হয় না। কিছু সময় বুদ্ধি প্রয়োগে অনেক কিছু কাজ সফল হয় । কেন না আমরা এমন করি- রাম, লক্ষ্মণের কাটা মুণ্ড গিয়ে সীতাকে দেখাই, আর একটি মায়া সীতার কাটা মুণ্ড রাম লক্ষ্মণের সামনে নিয়ে দেখাই । এতে সীতা শোক পেয়ে রামের চিন্তন ভুলে যাবে, অপরদিকে সীতা নিহত ভেবে রাম ফিরে যাবে।” খুশীতে ডগমগ হয়ে রাবণ বলল- “তবে রাক্ষস বিদ্যুৎজিহ্ব কে সংবাদ প্রেরন করো। সে এইরূপ নকল মূর্তি মায়া দ্বারা নির্মাণে সিদ্ধহস্ত ।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger