সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ৭ )

লঙ্কার নরখাদক বড় বীরেরা মারা যাচ্ছে দেখে রাবণ খানিকক্ষণ কপালে হাত দিয়ে বসে থাকলো । তারপর হঠাত প্রফুল্ল হয়ে বলল- “ অকম্পন কে সংবাদ প্রেরণ করো। সেই আজ যুদ্ধে সেনাপতি ও সেনানায়ক হবে।অকম্পন বড় বীর। তাহাকে দেখে অমরাবতীর দেবকূল অবধি ভয়ে থাকে। রণক্ষেত্রে সে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শত্রু বধ করে।” অকম্পন কে ডেকে আনা হল। অতি দর্পে সে বুক ফুলিয়ে সভামাঝে প্রবেশ করলো । বানর কুলকে নিমিষে সে সংহার করবে জানিয়ে দশাননকে আশ্বস্ত করলো । দশানন তাহাকে যুদ্ধ যাত্রার অনুমতি দিলো । লঙ্কায় রাক্ষসেরা বিবিধ রন দামামা, তুরী, ভেরী, ন্যাকড়া বাজাতে লাগলো । অতি উচ্চ রবে “রামকে মারো” বলে রাক্ষসেরা ধাবমান হল। লঙ্কার দ্বার খুলতেই হৈ চৈ করে রাক্ষসেরা বের হল। তারপর বর্শা উঁচিয়ে অশ্বারোহী সেনারা বের হল। পেছনে ১০ হাজার রথে রাক্ষসেরা শর নিক্ষেপ করতে করতে বের হল। তার পেছনে ২০ হাজার হস্তী মাটি কাঁপিয়ে প্রচণ্ড রবে গর্জন করে বের হল। বানর সেনারা প্রস্তুত ছিলো। রাক্ষসদের ওপরে শর, বর্শা, বৃহৎ প্রস্তর, বৃক্ষ, প্রাস, তোমর ছুড়তে লাগলো । আবার যুদ্ধ আরম্ভ হল । একে অপরকে কেটে দু টুকরো করলো। কেউ একে অপরকে বর্শা দিয়ে এমন ভাবে বিদ্ধ করলো যে দেহের ছিদ্রাংশ দিয়ে অপরদিকের দৃশ্য দেখা হল। রক্ত একেবারে বৃষ্টির ন্যায় প্রবাহিত হতে লাগলো। হস্তী গুলি বানর দের পিষে মাটিটে মিশিয়ে দিলো। ভল্লুকেরা লম্ফ দিয়ে হস্তীগুলির উপরে উঠে নখ দিয়ে রাক্ষসদের মুণ্ডু ছিড়ে দিলো । অঙ্গদ, মৈন্দ, কুমুদ নামক কপিরা গদা দিয়ে পিটিয়ে রাক্ষসদের মৃতদেহের পাহার জমা করলো । রথ গুলির তলায় যখন বানরেরা চাপা পড়লো, তখন অপর বৃহৎ মর্কটেরা প্রস্তর নিক্ষেপ করে স্বর্ণ রথ গুলি খণ্ডখণ্ড করলো। প্রস্তরের তলায় পড়ে সারথি, অশ্ব সহ রাক্ষস যোদ্ধাগুলো হত হল । রক্ত মাংসে চতুর্দিকে ভরে গেলো । কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, ধ্বজে লঙ্কার বালুকারাশি ঢেকে গেলো । ভল্লুকেরা আঁচর, কাঁমড় দিয়ে রাক্ষসদের বধ করলো। কোন রাক্ষসের পেট ছিন্ন করে মাংস বের করে ফেলল । আবার রাক্ষসেরা যখন বর্শা দিয়ে ভল্লুক দের নিহত করে আসলো ভল্লুকেরা বর্শা কেড়ে টুকরো করে ভেঙ্গে দিলো। আবার কাউকে সেই বর্শা দিয়েই উদর ছিন্ন করে অশ্ব সমেত ভূমিতে ফেলে বধ করলো ।

এভাবে কপিরা প্রচুর পরিমাণে রাক্ষস বধ করলে, রাক্ষসেরা উন্মত্ত হয়ে কপিদের দিকে তীক্ষ্ণ শর বৃষ্টির ন্যায় নিক্ষেপ করতে লাগলো। কপি, ভল্লুক, মর্কটেরা সেই শরে প্রান হারাতে থাকলো । বৃষ্টির ন্যায় বাণে চারপাশে এমন আচ্ছাদিত হল যে সূর্য ঢাকা পড়লো । মনে হল রাত্রি সমাগত । বানরেরা প্রচুর বৃহৎ প্রস্তর নিক্ষেপ করলো। সেই প্রস্তরে গজ, অশ্ব, রথ গুলি চাপা পড়লো । আকাশ থেকে বৃষ্টির ন্যায় যেনো প্রস্তর বর্ষণ হয়েই চলেছে। রাক্ষসেরা শর যোজনা করার আগেই সেই সব নিক্ষেপিত প্রস্তরে চাপা পড়লো । কুমুদ, নল ও মৈন্দ বানর অকম্পনের সাথে যুদ্ধ করতে লাগলো । অকম্পনের ধনুক কেড়ে মাটিটে ফেলে ভেঙ্গে ফেলল, তখন অকম্পন আরোও একটি ধনুক নিয়ে দিব্যাস্ত্র সকল চালনা করে কপিদের বধ করতে আরম্ভ করলো । কুমুদ, নল, মৈন্দের প্রতি এত শর চালনা করলো, যে গাত্র দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো । কুমুদ, নল, মৈন্দ পলায়ন করলো। এরপর হনুমান আসলো । হনুমান সেই রাক্ষসের দিকে একটি শিলা নিক্ষেপ করবার জন্য শিলা উঠালো।অকম্পন দেখতে পেয়েই সেই দিকে অর্ধচন্দ্র বাণ নিক্ষেপ করলো। শিলা নিক্ষেপের আগেই শত টুকরো হল। তারপর পাঁচশো রথ হনুমানের চারপাশে হনুমানকে ঘীরে ধরে শর চালনা করতে লাগলো । হনুমান একটি বৃহৎ অশ্বকর্ণ বৃক্ষ উপরে আনলো। তারপর তা চতুর্দিকে ঘোরাতে লাগলো । সেই বৃক্ষের আঘাতে সকল রথ সকল চূর্ণ বিচূর্ণ হল। অশ্ব, সারথি, রথী সকল নানাদিকে ছিটকে পড়ে তাদের মস্তক চূর্ণ হল । এরপর যে গজ গুলি ছিলো তারাও ছিটকে বহু উপরে উঠে ভূমিতে পতিত হল। অকম্পন ক্রোধে চতুর্দশ দিব্যাস্ত্র হনুমানের দিকে ছুড়লো । হনুমান সেসকল শর গদা দিয়ে চারপাশে ফেলে দিলো । এরপর হনুমান অপর একটি বৃক্ষ এনে অকম্পনের রথে নিক্ষেপ করলো। রথের সাথে অশ্ব, সারথি সহ অকম্পনের মস্তক থেঁতলে গেলো । এই ভাবে অকম্পন রাক্ষস নিহত হল। বীর রাক্ষসদের মৃত্যু হয়েছে দেখে দূত গিয়ে রাবণকে জানালো । কিছুক্ষণ রাবণ বিষণ্ণ থেকে পুনঃ রাক্ষস বীর প্রহস্তকে ডেকে আনলো । প্রহস্তকে পর দিন যুদ্ধে যেতে আদেশ দিলো । প্রহস্ত খুব বড় বীর ছিলো । রাবণ তাকে যুদ্ধে গমনের আদেশ দিয়ে অন্তক, কুম্ভহণু , মহানাদ ও সমুন্নত নামক চার বীর রাক্ষস কে সাথে দিয়ে প্রচুর রাক্ষস সেনা দিলেন ।

সূর্যের আলো উঠতেই প্রভাত নেমে এলো । চারপাশে দিনের আলো ফুটতেই রাক্ষসেরা আবার গর্জন করে বের হল। অপরদিকে বানরেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো । সেই তীব্র সংগ্রাম আরম্ভ হল । অন্তক, কুম্ভহণু , মহানাদ ও সমুন্নত রথ থেকে ভল্লুক বাহিনীর দিকে শর সন্ধান আরম্ভ করলো। ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ ছুটে এসে ভল্লুক দের ছিন্নভিন্ন করলো । মর্কটেরা তখন প্রস্তর নিক্ষেপ আরম্ভ হল। রাক্ষসদের রথ রথী অশ্ব সারথি সহিত চূর্ণ হলে অন্তক, কুম্ভহণু , মহানাদ ও সমুন্নত অশ্বে আরোহিত হলেন। তরবারি দিয়ে কপিদের সাথে যুদ্ধ করে কপিদের বধ করতে থাকলেন । এতে অনান্য অশ্বারোহী রাক্ষসেরা কপি নিধন আরম্ভ করলো । ভল্লুক, মর্কট রা ছত্রভঙ্গ হলে হনুমান ও অঙ্গদ এসে রাক্ষসদের বধ আরম্ভ করে দিলো। অশ্ব সহিত উলটে দিলো রাক্ষসদের। কোন কোন অশ্বকে তুলে অশ্বারোহী সমেত সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে তিমি, মকড়েরা ভক্ষণ করলো । অপরদিকে হনুমান অঙ্গদের বীরত্ব দেখে বাকী মর্কটেরা ভীষণ উজ্জীবিত হয়ে বৃহৎ শিলা নিক্ষেপ করে অশ্ব, হস্তী গুলিকে নিধন আরম্ভ করলো । রাক্ষসেরা সব ছিটকে মাটিটে পড়ে প্রান হারাতে থাকলো । হনুমান ও অঙ্গদের পদপিষ্ট হয়ে কয়েক হাজার ভয়ানক রাক্ষস নিহত হল। এইভাবে হনুমান ও অঙ্গদ মিলে চার অতীব শক্তিমান রাক্ষস অন্তক, কুম্ভহণু , মহানাদ ও সমুন্নত কে নিহত করলো । রাক্ষসেরা সব একে একে নিহত হলে বাকী রাক্ষসেরা পলায়ন করলো । অপরদিকে নীল নামক বানরেরা সাথে প্রহস্তের যুদ্ধ আরম্ভ হল। নীল এক লম্ফ দিয়ে প্রহস্তের ধনুক কেড়ে ভেঙ্গে ফেলল। প্রহস্ত আর একটি ধনুক নিয়ে যুদ্ধ আরম্ভ করলো। নীল একটি প্রস্তর ছুড়লে প্রহস্ত বাণ দিয়ে সেই শিলা চূর্ণ করলো। এরপর প্রহস্ত মুষল নিয়ে লম্ফ দিয়ে রথ থেকে নেমে নীলের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করলো । নীল গদা নিয়ে এগিয়ে এলো। দুজনেড় অস্ত্রের টক্করে যেনো প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হতে লাগলো। পরে বাহুযুদ্ধ আরম্ভ হল। একে অপরকে দন্ত, নখ দিয়ে কামড় আঁচর দিয়ে দফারফা শেষ করতে লাগলো। দুজনের শরীর রক্তাক্ত হল। তখন প্রহস্ত তার মুষল নিয়ে নীলের দিকে আঘাত হানার জন্য এগিয়ে গেলে নীল একটি বৃহৎ প্রস্তর দিয়ে প্রহস্তের মস্তক চূর্ণ করলো। প্রহস্ত নিহত হল।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger