সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

বর্তমানের অনেক বিষয়ের প্রতিকারে প্র্রাচীন ভারতের চাণক্যনীতি-র বক্তব্য আজও কার্যকর

চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) ছিলেন একজন প্রাচীন ভারতীয় গুরু (শিক্ষক), দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা। তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনিই তরুণ চন্দ্রগুপ্তকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টার কাজ করেছিলেন। চাণক্যকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও অভিহিত করা হয়। তিনি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞান গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এর রচয়িতা। তাঁকেই ভারতের প্রথম অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করা হয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে তাঁর অর্থনীতি তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। চাণক্যকে "ভারতের মেকিয়াভেলি" বলা হয়। যদিও তিনি নিকোলো মেকিয়াভেলির ১৮০০ বছর আগের মানুষ ছিলেন। গুপ্ত রাজবংশের শাসনের শেষ দিকে তাঁর বইটি হারিয়ে যায়। এটি আবার আবিষ্কৃত হয় ১৯১৫ সালে।


অফিস-রাজনীতির শিকার? পড়ুন, কী বলছে চাণক্যনীতি :

প্রাচীন ভারতে ‘অফিস রাজনীতি’ ছিল না, এমনটা ভাবলে ভুল করবেন। মৌর্য যুগেই এক কঠোর কেন্দ্রীয় প্রশাসন ভারতে চালু হয়। পরর্তী সময়ে গুপ্ত সম্রাটরা আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলেন। সেই সঙ্গে বিস্তৃতি
অব্যাহত থাকে ব্যবসা-বাণিজ্যের। ফলে এই দেশে ‘অফিস জব’ যাকে বলে, তা সেই আমলেই ভাল পরিমাণেই ছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর এ কথা কে না জানে, অফিস থাকলেই অফিস পলিটিক্স-ও থাকে। সেই নোংরা রাজনীতি থেকে মুক্তির সন্ধান রয়েছে ‘চাণক্যনীতি’-তে। ‘চাণক্যনীতি’-র ঐতিহাসিকতা নির্ণয় করার চেষ্টা করে লাভ নেই। এই নীতিবাক্য সমূহ যদি মহামতি কৌটিল্য বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্যের লেখা না-ও হয়, ক্ষতি নেই। এই বাণীসমূহকে প্রাচীন ভারতীয় গণ-প্রজ্ঞার প্রতিফলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে না।

দেখা যাক অফিস-রাজনীতির প্রতিকারের বিষয়ে চাণক্যনীতি-র বক্তব্য কী।

• সততা বিষয়ে সাবধান। খুব বেশি সৎ হতে গেলে গেলে খেসারত দিতে হবে। সৎ ব্যক্তিরাই সবার আগে রাজনীতির শিকার হন।
• সততার সঙ্গে ধূর্ততার মিশেল ঘটানো একান্ত কাম্য। চোখ-কান খোলা রাখাটা তো আর অন্যায় নয়! অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। যখন সততার প্রয়োজন তখন সততা, আবার যেখানে ধূর্ততাই একমাত্র অনুসরণীয়, সেখানে সেটাই
অনুসরণ করা যুক্তিযুক্ত।
• কোনও কাজ শুরু করার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন—
১. কেন এই কাজটি আপনি করছেন?
২. এর ফল কী হতে পারে?
৩. এটা কী ধরনের সাফল্য আনতে সক্ষম?

• কোন কাজটি আগে করবেন, সেটা সবার আগে ঠিক করুন। সেই সঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করুন, কোন কাজে কতটা সময় আপনি দেবেন এবং কেন দেবেন।
• কোনও কাজ শুরু করলে ব্যর্থতার ভয় পেলে চলবে না। পিছিয়ে এলে আপনারই ক্ষতি।
• দফতরের গোপনীতা রক্ষা করুন। সব কথ সবাইকে বলার নয়। এমনকী, নিজের স্ত্রীকেও নয়।
• দফতরের গুজব থকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন।
• দফতরের বন্ধুত্ব স্বার্থশূন্য হয় না, এটা মনে রাখবেন। সহকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেকে মিশুন।
• কোনও ভয় রেখে কাজ করবেন না। ভয় বা আশঙ্কা জাগ্রত হলেই তাকে আক্রমণ করে ধ্বংস করুন।
• দেখা এবং শেখার চোখ সব সময়ে খোলা রাখুন।
• মনে রাখবেন, যে সাপ বিষধর নয়, সে-ও বিষধরের ভান করে।
• নিজের কাজের জায়গায় নিজেকে নমনীয় রাখুন।
• কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে বোকা বানাতে যাবেন না। তাঁর সঙ্গে সহজ সম্পর্কই তৈরি করুন।
• নিজের ভুল নিজে স্বীকার করুন। ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নিন।
• পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতাকে বাড়ান। ব্যক্তি এবং ঘটনা— দুটোকেই তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখুন।


কোন নারীকে বিবাহ করা অনুচিত? কী বলেছেন চাণক্য?
প্রতিটি সমাজেরই নিজস্ব কিছু কহন রয়েছে বিবাহ বিষয়ে। বাংলার এক প্রচীন প্রবাদই হল— লাখ কথার বিয়ে। এই লক্ষ কথা তো খরচ হয় পরিচয়ে। কিন্তু তার পরেও তো দেখা দেয় অশান্তি। সংসার বিষময় হয়ে ওঠে কেবলমাত্র ভুল বিবাহ-সিদ্ধান্তে। সমাজ সেই সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে খানিক ভাবনা-চিন্তার অবকাশ রাখতে বলেছে বিশ্বের সর্বত্র। আমাদের দেশেও ‘চাণক্য নীতি’ নামে পরিচিত কহন খোলাখুলি জানায় বিবাহ-সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে করণীয় বিষয়ে ভাবার বিষয়ে। কোন নারীর সঙ্গে বিবাহ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া উচিত হবে না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায় চাণক্য নীতি।

দেখা যেতে পারে হাজার বছর ধরে চলে আসা সেই বিধির কয়েক ঝলক।

• সুন্দরী কি সুন্দরী নন, এ নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই চাণক্যর। তাঁর মতে কোনও নারীকে বিবাহ করার আগে তার অন্তরের হদিশ নেওয়াটা জরুরি। অন্তরের সৌন্দর্যই চানক্যের মতে শেষ কথা।
• বিবাহ করার আগে জেনে নিতে হবে সাত্রীর পরিবারের খুঁটনাটি। পরিবারের পরিচয়ই মেয়েটির প্রকৃত পরিচয়।
• রূঢ়ভাষী নারী থেকে বিবাহ-বিষয়ে দূরে থাকাই ভাল।
• সুন্দরী নারী, কিন্তু স্বভাব ছায়াচ্ছন্ন, এমন পাত্রীকে বিয়ে না করাই সাব্যস্ত।
• কোনও পরিস্থিতিতেই মিথ্যাবাদী স্ত্রীলোককে বিবাহ করা উচিত নয়।
• হবু স্ত্রী কতটা বিশ্বাসযোগ্যা, তা জেনে নেওয়াটা প্রাথমিক কর্তব্য।
• যে নারী গৃহকর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ, তার বিবাহ না করাই উচিত। আজকের দিনে উপদেশটা গায়ে লাগার মতো। তবে চাণক্যের যুগে ব্যাপারটা অপরিহার্য ছিল।
• নাস্তিক স্ত্রীলোককে কিছুতেই বিবাহ করা যাবে না।

সঠিক বন্ধু আর মেকি বন্ধুর ফারাক কোথায়? কী বলছে চাণক্য-নীতি?

ভারতীয় গণমানসের প্রতিচ্ছবি হিসেবে যদি চাণক্য-নীতিকে ধরা হয়, তবে নিঃসন্দেহে তা এক সামূহিক স্মৃতির কথা বলে। এই স্মৃতি এই উপমহাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই স্মৃতিই আমাদের কর্তব্য-অকর্তব্যের দিশারী হয়ে দাঁড়ায় কখনও কখনও। তাকে চাণক্য-নীতির মতো আপ্তবাক্যের স্তরে নিয়ে যায় গণচৈতন্যই। চাণক্য যদি এই কথাগুলি না-ও বলে থাকেন, তা হলেও কিছু যায়-আসে না। এই ‘চাণক্য’ আসলে ইতিহাসের নিজস্ব কণ্ঠস্বর।

চাণক্য বন্ধু ও শত্রুর ভেদকে চিহ্নিত করার উপায় বাৎলেছিলেন। সেই সঙ্গে এ-ও বলেছিলেন, কীভাবে চিনতে হয় প্রকৃত বন্ধুকে। এই পদ্ধতির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল, কে প্রকৃত বন্ধু আর কে মেকি মিত্র, সেটা নির্ণয় করা। চাণক্য-নীতি সেই বিষয়ে বিশদ আলোকপাত করে। জেনে নেওয়া যাক, কী বক্তব্য এই প্রাচীন শাস্ত্রের।

• প্রকৃত বন্ধুর সবথেকে বড় লক্ষণ হল, তার স্বার্থহীনতা। লক্ষ রাখতে হবে, বন্ধু হিসেবে সে কতটা আত্মত্যাগপ্রবণ। লক্ষ্য রাখতে হবে, সে সকলের প্রতিই সমান যত্নশীল কি না। এমন মানুষকে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করা চলে।
• লক্ষ রাখুন, আপনার বন্ধু কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে কোনও কিছু না জেনেই মতামত তৈরি করে ফেলেন কি না। লক্ষ করতে হবে, তিনি তাঁর মতামত দ্রুত বদলে ফেলেন কি না। এবং এই মতামত কতটা সঠিক সেটা বিচার করে দেখতে হবে। সহজে মত বদলান, এমন বন্ধু থেকে সাবধান থাকাটাই শ্রেয়।
• জানার চেষ্টা করুন, আপনার বন্ধু কাদের সঙ্গে সময় কাটান। একজন মানুষের সঙ্গই তাঁর চরিত্রের আয়না। এ-ও লক্ষ করতে হবে, যাঁদের সঙ্গে সেই ব্যক্তি সময় কাটান, তাঁদের অনুপস্থিতিতে তিনি তাঁদের সম্পর্কে কী মন্তব্য করেন। যদি তা সদর্থক হয়, তাহলে বুঝতে হবে তিনি বিশ্বাসযোগ্য।
• লক্ষ রাখতে হবে, বন্ধুটি বাক-সংযমী কি না। আত্মবিজ্ঞাপনকারী ব্যক্তি থেকে দূরে থাকাটাই কর্তব্য।    

শত্রুর দাপটে দিশেহারা? জেনে নিন কী বলছে চাণক্য-নীতি

চাণক্য-নীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও প্রশ্নাতীত। কৌটিল্য বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য স্বয়ং এই নীতি রচনা করেছিলেন কি না, সে কথা অবান্তর। এই নীতিমালায় আসলে প্রতিফলিত হয়েছে শত শত বছরের ভারতীয় প্রজ্ঞা। যে কোনও সংকটে, যেকোনও সমস্যায় চাণক্যনীতির সরামর্শ রয়েছে। কোনও বিশেষ কালের প্রেক্ষিতে এই নীতীমালাকে দেখা যাবে না। আজ, এই কর্পোরেট-বিশ্বেও চাণক্য-নীতি সমান কার্যকর বলেই মনে করেন ম্যনেজমেন্ট গুরুরা।

শত্রুতা সভ্যতায় এক অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। কোথা থেকে এবং কী করে শত্রুর উদয় ঘটে জীবনে, তা সব সময়ে বোঝা সম্ভব নয়। জীবনের কোনও বিশেষ পর্বে এসে দেখা যায়, তীব্র সব শত্রুতার শিকার হতে হচ্ছে। কখনও প্রতিদ্বন্দিতা, কখনও যৌন ঈর্ষা, কখনও বা বিনা কারণেই শত্রুতা মাথা চাড়া দেয়। শত্রু এবং শত্রুতা বিষয়ে চাণক্য-নীতি কী বলছে দেখা যাক।

• প্রতিটি সম্পর্কের পিছনে কোনও না কোনও উদ্দেশ্য কাজ করে। উদ্দেশ্যশূন্য সম্পর্ক হতে পারে না। বন্ধুত্ব এবং শত্রুতাও কোনও না কোনও উদ্দেশ্য দ্বারা প্রণোদিত। শত্রুতার ক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্যটিকে বোঝার চেষ্টা করুন।
• শত্রুর ক্ষমতার সীমা রয়েছে। তারও দুর্বলতা রয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত শত্রুর দুর্বল দিকগুলি জানতে পারছেন, ততক্ষণ শত্রুর সঙ্গে সংঘাতে না-যাওয়াই ভাল। দুর্বলতা জানা গেলে তার সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া যেতে পারে।
• শত্রুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়তেই পারেন। হারের সম্ভাবনা দেখা দিলেই সন্ধির চেষ্টা করতে হবে বলে জানাচ্ছে চাণক্য-নীতি। নিজের দুর্বলতাকে ঢাকা দিতে সন্ধি সব থেকে সম্মানজনক ব্যবস্থা।
• শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করা কর্তব্য। রাষ্ট্রের জন্য এমন ক্ষেত্রে কড়া গুপ্তচর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে চাণক্য-নীতিতে। আর ব্যক্তিগত স্তরে প্রয়োজন সতর্কতার, একথাও বলছে চাণক্য-নীতি।


যে ৬টি প্রাণীর ঘুম কখনও ভাঙাতে নেই, কী বলছে চাণক্যনীতি ?



ভারতে প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত নৈতিক উপদেশাবলি ‘চাণক্য নীতি’ সত্যিই ‘অর্থশাস্ত্রট প্রণেতা কৌটিল্য বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্যের লেখা কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পার। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, ‘চাণক্য নীতি’ নামে পরিচিত নৈতিক উপদেশগুলি যথার্থই প্রাচীন। এই উপদেশগুলি আজ, এই কর্পোরেট-শাসিত বিশ্বেও দারুণভাবে সচল, একথা অনেকেই বলে থাকেন। আসলে ‘চাণক্য নীতি’ দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা গণস্মৃতির একটি দলিল। এতে যা রয়েছে, তা মানব সভ্যতারই অভিজ্ঞতার ফসল।

‘চাণক্য নীতি’-তে বহু সাবধানবাণীই উল্লিখিত রয়েছে। তার মধ্যে একটি ঘুমন্ত প্রাণী সংক্রান্ত। এখানে চাণক্য কয়েকটি ঘুমন্ত প্রাণীকে না-জাগাতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই ‘প্রাণী’-রা হয়তো প্রতীক। কিন্তু চাণক্য প্রণিধানযোগ্য। দেখা যাক কী রয়েছে এই সংক্রান্ত উপদেশে।

১. সাপকে কখনও জাগাতে নেই। কারণ, ঘুম ভাঙলেই সে ছোবল মারতে পারে।
২. ঘুমন্ত রাজার ঘুম কখনও ভাঙাতে নেই। তা হলে রাজরোষে পড়তে হয়।
৩. সিংহের ঘুম ভাঙালে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিপুল।
৪. সরিসৃপের ঘুম ভাঙালে সমস্যা অনেক। তিতবিরক্ত হতে পারেন তার দ্বারা।
৫. শিশুদের ঘুম ভাঙাতে নেই। কারণ, ঘুমের ভিতরেই তারা বেড়ে ওঠে।
৬. বোকাদের ঘুমোতে দেওয়াই কাম্য। তারা জেগে থাকলে অনর্থের সম্ভাবনা।



চাণক্য নীতি দর্পণ সারাংশ:
১) যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।
২) সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের ওপর। সেজন্যে সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বা’র ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজ কর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। জলের নিচে মাছের গতিবিধি যেমন জল পান করে বা পান না করেও বোঝা সম্ভব নয়, অনুরূপ রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুপও দেখা অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজ কর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সমভাবে অসম্ভব।”
৩) বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারো থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী – এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।
৪) মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এই বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।
৫) যারা পরিশ্রমী, তাদের জন্যে কোনকিছুই জয় করা অসাধ্য কিছু নয়। শিক্ষিত কোন ব্যক্তির জন্যে কোন দেশই বিদেশ নয়। মিষ্টভাষীদের কোন শত্রু নেই।
৬) বিরাট পশুপালের মাঝেও শাবক তার মাকে খুঁজে পায়। অনুরূপ যে কাজ করে অর্থ সবসময় তাকেই অনুসরণ করে।
৭) মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন।

কী বুঝলেন? সেই তেইশ শত বছর আগের উপদেশ এগুলো! একটাও আজ ভুল প্রমাণিত হয়েছে? নাকি আরও বেশী প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনে?

এবার আসা যাক তার রচিত বিভিন্ন শ্লোক বা উপদেশ প্রসঙ্গে-

চাণক্য শ্লোক:
১) অতি পরিচয়ে দোষ আর ঢাকা থাকে না।
২) অধমেরা ধন চায়, মধ্যমেরা ধন ও মান চায়। উত্তমেরা শুধু মান চায়। মানই মহতের ধন।
৩) অনেকে চারটি বেদ এবং ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেও আত্মাকে জানে না, হাতা যেমন রন্ধন-রস জানে না।
৪) অন্তঃসার শূন্যদের উপদেশ দিয়ে কিছু ফল হয় না, মলয়-পর্বতের সংসর্গে বাঁশ চন্দনে পরিণত হয় না।
৫) অবহেলায় কর্মনাশ হয়, যথেচ্ছ ভোজনে কুলনাশ হয়, যাচ্ঞায় সম্মান-নাশ হয়, দারিদ্র্যে বুদ্ধিনাশ হয়।
৬) অভ্যাসহীন বিদ্যা, অজীর্ণে ভোজন, দরিদ্রের সভায় কালক্ষেপ এবং বৃদ্ধের তরুণী ভার্যা বিষতুল্য।
৭) অহংকারের মত শত্রু নেই।
৮) আকাশে উড়ন্ত পাখির গতিও জানা যায়, কিন্তু প্রচ্ছন্নপ্রকৃতি-কর্মীর গতিবিধি জানা সম্ভব নয়।
৯) আদর দেওয়ার অনেক দোষ, শাসন করার অনেক গুণ, তাই পুত্র ও শিষ্যকে শাসন করাই দরকার, আদর দেওয়া নয়।
১০) আপদের নিশ্চিত পথ হল ইন্দ্রিয়গুলির অসংযম, তাদের জয় করা হল সম্পদের পথ, যার যেটি ঈপ্সিত সে সেই পথেই যায়।
১১) আড়ালে কাজের বিঘ্ন ঘটায়, কিন্তু সামনে ভাল কথা বলে, যার উপরে মধু কিন্তু অন্তরে বিষ, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত।
১২) ইন্দ্রিয়ের যে অধীন তার চতুরঙ্গ সেনা থাকলেও সে বিনষ্ট হয়।
১৩) উপায়জ্ঞ মানুষের কাছে দুঃসাধ্য কাজও সহজসাধ্য।
১৪) উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে সঙ্গে থাকে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু।
১৫) ঋণ, অগ্নি ও ব্যাধির শেষ রাখতে নেই, কারণ তারা আবার বেড়ে যেতে পারে।
১৬) একটি দোষ বহু গুণকেও গ্রাস করে।
১৭) একটি কুবৃক্ষের কোটরের আগুন থেকে যেমন সমস্ত বন ভস্মীভূত হয়, তেমনি একটি কুপুত্রের দ্বারাও বংশ দগ্ধ হয়।
১৮) একটিমাত্র পুষ্পিত সুগন্ধ বৃক্ষে যেমন সমস্ত বন সুবাসিত হয়, তেমনি একটি সুপুত্রের দ্বারা সমস্ত কুল ধন্য হয়।
১৯) একশত মূর্খ পুত্রের চেয়ে একটি গুণী পুত্র বরং ভাল। একটি চন্দ্রই অন্ধকার দূর করে, সকল তারা মিলেও তা পারে না।
২০) কর্কশ কথা অগ্নিদাহের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
২১) খেয়ে যার হজম হয়, ব্যাধি তার দূরে রয়।
২২) গুণবানকে আশ্রয় দিলে নির্গুণও গুণী হয়।
২৩) গুণহীন মানুষ যদি উচ্চ বংশেও জন্মায় তাতে কিছু আসে যায় না। নীচকুলে জন্মেও যদি কেউ শাস্ত্রজ্ঞ হয়, তবে দেবতারাও তাঁকে সম্মান করেন।
২৪) গুরু শিষ্যকে যদি একটি অক্ষরও শিক্ষা দেন, তবে পৃথিবীতে এমন কোনও জিনিস নেই, যা দিয়ে সেই শিষ্য গুরুর ঋণ শোধ করতে পারে।
২৫) গৃহে যার মা নেই, স্ত্রী যার দুর্মুখ তার বনে যাওয়াই ভাল, কারণ তার কাছে বন আর গৃহে কোনও তফাৎ নেই।
২৬) চন্দন তরুকে ছেদন করলেও সে সুগন্ধ ত্যাগ করে না, যন্ত্রে ইক্ষু নিপিষ্ট হলেও মধুরতা ত্যাগ করে না, যে সদ্বংশজাত অবস্থা বিপর্যয়েও সে চরিত্রগুণ ত্যাগ করে না।
২৭) তিনটি বিষয়ে সন্তোষ বিধেয়: নিজের পত্নীতে, ভোজনে এবং ধনে। কিন্তু অধ্যয়ন, জপ, আর দান এই তিন বিষয়ে যেন কোনও সন্তোষ না থাকে।
২৮) দারিদ্র্য, রোগ, দুঃখ, বন্ধন এবং বিপদ- সব কিছুই মানুষের নিজেরই অপরাধরূপ বৃক্ষের ফল।
২৯) দুর্জনের সংসর্গ ত্যাগ করে সজ্জনের সঙ্গ করবে। অহোরাত্র পুণ্য করবে, সর্বদা নশ্বরতার কথা মনে রাখবে।
৩০) দুর্বলের বল রাজা, শিশুর বল কান্না, মূর্খের বল নীরবতা, চোরের মিথ্যাই বল।
৩১) দুষ্টা স্ত্রী, প্রবঞ্চক বন্ধু, দুর্মুখ ভৃত্য এবং সর্প-গৃহে বাস মৃত্যুর দ্বার, এ-বিষয়ে সংশয় নেই।
৩২) ধর্মের চেয়ে ব্যবহারই বড়।
৩৩) নানাভাবে শিক্ষা পেলেও দুর্জন সাধু হয় না, নিমগাছ যেমন আমূল জলসিক্ত করে কিংবা দুধে ভিজিয়ে রাখলেও কখনও মধুর হয় না।
৩৪) পরস্ত্রীকে যে মায়ের মত দেখে, অন্যের জিনিসকে যে মূল্যহীন মনে করে এবং সকল জীবকে যে নিজের মত মনে করে, সে-ই যথার্থ জ্ঞানী।
৩৫) পাপীরা বিক্ষোভের ভয় করে না।
৩৬) পাঁচ বছর বয়স অবধি পুত্রদের লালন করবে, দশ বছর অবধি তাদের চালনা করবে, ষোল বছরে পড়লে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত আচরণ করবে।
৩৭) পুত্র যদি হয় গুণবান, পিতামাতার কাছে তা স্বর্গ সমান।
৩৮) পুত্রকে যারা পড়ান না, সেই পিতামাতা তার শত্রু। হাঁসদের মধ্যে বক যেমন শোভা পায় না, সভার মধ্যে সেই মূর্খও তেমনি শোভা পায় না।
৩৯) বইয়ে থাকা বিদ্যা, পরের হাতে থাকা ধন একইরকম। প্রয়োজন কালে তা বিদ্যাই নয়, ধনই নয়।
৪০) বিদ্বান সকল গুণের আধার, অজ্ঞ সকল দোষের আকর। তাই হাজার মূর্খের চেয়ে একজন বিদ্বান অনেক কাম্য।
৪১) বিদ্যাবত্তা ও রাজপদ এ-দুটি কখনও সমান হয় না। রাজা কেবল নিজদেশেই সমাদৃত, বিদ্বান সর্বত্র সমাদৃত।
৪২) বিদ্যা ব্যতীত জীবন ব্যর্থ, কুকুরের লেজ যেমন ব্যর্থ, তা দিয়ে সে গুহ্য-অঙ্গও গোপন করতে পারে না, মশাও তাড়াতে পারে না।
৪৩) বিদ্যাভূষিত হলেও দুর্জনকে ত্যাগ করবে, মণিভূষিত হলেও সাপ কি ভয়ঙ্কর নয়?
৪৪) বিদ্যার চেয়ে বন্ধু নাই, ব্যাধির চেয়ে শত্রু নাই। সন্তানের চেয়ে স্নেহপাত্র নাই, দৈবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বল নাই।
৪৫) বিনয়ই সকলের ভূষণ।
৪৬) বিষ থেকেও অমৃত আহরণ করা চলে, মলাদি থেকেও স্বর্ণ আহরণ করা যায়, নীচজাতি থেকেও বিদ্যা আহরণ করা যায়, নীচকুল থেকেও স্ত্রীরত্ন গ্রহণ করা যায়।
৪৭) ভোগবাসনায় বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়।
৪৮) মিত ভোজনেই স্বাস্থ্যলাভ হয়।
৪৯) যশবানের বিনাশ নেই।
৫০) যারা রূপযৌবনসম্পন্ন এবং উচ্চকুলজাত হয়েও বিদ্যাহীন, তাঁরা সুবাসহীন পলাশ ফুলের মত বেমানান।
৫১) যে অলস, অলব্ধ-লাভ তার হয় না।
৫২) যে গাভী দুধ দেয় না, গর্ভ ধারণও করে না, সে গাভী দিয়ে কী হবে! যে বিদ্বান ও ভক্তিমান নয়, সে পুত্র দিয়ে কী হবে!
৫৩) রাতের ভূষণ চাঁদ, নারীর ভূষণ পতি, পৃথিবীর ভূষণ রাজা, কিন্তু বিদ্যা সবার ভূষণ।
৫৪) শাস্ত্র অনন্ত, বিদ্যাও প্রচুর। সময় অল্প অথচ বিঘ্ন অনেক। তাই যা সারভূত তারই চর্চা করা উচিত। হাঁস যেমন জল-মিশ্রিত দুধ থেকে শুধু দুধটুকুই তুলে নেয়, তেমনি।
৫৫) সত্যনিষ্ঠ লোকের অপ্রাপ্য কিছুই নাই।
৫৬) সত্যবাক্য দুর্লভ, হিতকারী-পুত্র দুর্লভ, সমমনস্কা-পত্নী দুর্লভ, প্রিয়স্বজনও তেমনি দুর্লভ।
৫৭) সাপ নিষ্ঠুর খলও নিষ্ঠুর, কিন্তু সাপের চেয়ে খল বেশি নিষ্ঠুর। সাপকে মন্ত্র বা ওষধি দিয়ে বশ করা যায়, কিন্তু খলকে কে বশ করতে পারে?
৫৮) সুবেশভূষিত মূর্খকে দূর থেকেই দেখতে ভাল, যতক্ষণ সে কথা না বলে ততক্ষণই তার শোভা, কথা বললেই মূর্খতা প্রকাশ পায়।
৫৯) হাতি থেকে একহাজার হাত দূরে, ঘোড়া থেকে একশ হাত দূরে, শৃঙ্গধারী প্রাণী থেকে দশহাত দূরে থাকবে। অনুরূপ দুর্জনের কাছ থেকেও যথাসম্ভব দূরে থাকবে।

সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, “দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।” অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।

কি বুঝলেন?
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger