সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৫৯)

পুস্পক বিমান উড়ে চলল নানা পর্বত, নদী, জনপদ অরন্যের ওপর দিয়ে। মেঘে ঢাকা মেঘের রাজ্য ভেদ করে পুস্পক বিমান উড়তে লাগলো। সকলে প্রসন্ন হয়ে ধরিত্রী তে সকল কিছুই দেখতে লাগলেন । মাতা সীতা দেখলেন সেই স্থান- যেখানে প্রভু শ্রীরাম খড় দূষণ রাক্ষস বধ করেছেন । আরোও দেখলেন সেই স্থান- যেখানে প্রভু রামচন্দ্র বিরাধ রাক্ষসকে বধ করে মুনি ঋষি দিগকে রক্ষা করেছিলেন । বনবাস কালে বিভিন্ন স্মৃতি মনে ফুটে উঠলো। প্রভু শ্রীরামকে নানা সুগন্ধি পুস্পের মাল্য, বনজ চন্দন দ্বারা সুশোভিত করেছিলেন। জ্যোতস্নালোকে প্লাবিত গোদাবরীর বালুকা তট, বৃক্ষে বৃক্ষে অপূর্ব সুগন্ধি বনজ পুস্পের সমাহার- তাহার মধ্যে যুগলের যুগল মিলন- সব কিছুই মনে পড়তে লাগলো। জটায়ু পক্ষীর কথা মনে পড়লো। তিঁনি সীতাকে পুত্রী জ্ঞান করতেন। আহা! জটায়ু বৃদ্ধা হয়েও দশাননের সাথে বীর বীক্রমে লড়াই করে বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছেন। জটায়ুর কথা ভাবতেই সীতাদেবীর চোখ জলে ভাসল। পিতার কর্তব্য পালন করেছেন তিঁনি । আরোও ভাবলেন লক্ষ্মণকে কতই না কুকথা বলে বনে প্রেরণ করেছিলাম। এমন কি তাঁর অঙ্কিত রেখা অতিক্রম করেই সর্বনাশের পাল্লায় পড়তে হয়েছিলো । সীতাদেবী নিজেকে অপরাধী মনে করে বললেন- “লক্ষ্মণ! তোমাকে অনেক কুকথা বলে সেদিন বনে প্রেরণ করেছিলাম। আমার যে সেদিন কি হয়েছিলো। মনে হয় এইভাবেই মানব নিজেই নিজের বিপদকে আহ্বান করে। তুমি সেদিনের কথা মনে রেখো না। আমাকে ক্ষমা করো।” লক্ষ্মণ বলল- “বৌঠান! আপনি এভাবে ক্ষমা চাইবেন না। অতীতের কথা ভুলে যাওয়াই ভালো। সকল দুঃখের স্মৃতি ভুলে যাওয়াই উচিৎ। দুঃখের পর সুখের আগমন হয়। সেদিন অপরাধ হয়েছিলো আমার। আমার উচিৎ ছিলো নিজেই গিয়ে মারীচকে বধ করবার । কিন্তু সেটা রাবণের চক্রান্ত ছিলো- ইহা কে জানতো ?”

ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হে সীতা! অতীতের কথা স্মরণ না করাই ভালো। ইহা ভাবো যে আমরা চতুর্দশ বৎসর সমাপন করে স্বদেশে গমন করছি। মাতৃভূমি ও স্ববাটি ভিন্ন অপর কোন সুখের স্থান হতেই পারে না । ভাবো সেখানে আমাদের আত্মীয় স্বজনেরা অপেক্ষা করে আছেন । কিন্তু দুঃখের বিষয় ফিরে গিয়ে আর পিতার স্নেহ ভালোবাসা প্রাপ্ত করবো না। পিতার সেবা করার অধিকার হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাতারা সব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন । তাহাদের স্নেহ ভালোবাসা প্রাপ্ত করবো।” সীতা দেবী এই সকল ভাবতে লাগলেন । তারপর তাই নিয়ে অনেক আনন্দজনক কল্পনা ভাবলেন । ভগবান শ্রীরাম তখন সীতাকে বললেন- “হে সীতে! দেখো ঐ আমার ভক্ত শরভঙ্গ মুনির নিবাস । দেখো অত্রি মুনির আশ্রম। মনে আছে মাতা অনুসূয়া তোমাকে নানা অলঙ্কারে সুসজ্জিতা করেছিলেন ?” সীতা বলিলেন- “হে রঘুনাথ! সেই সকল সুন্দর মুহূর্ত কিভাবে বিস্মৃত হতে পারি ? আপনার সাথে এই অরণ্যের যে নিদারুন সৌন্দর্য দেখেছিলাম- তাই ছিলো আমার কাছে অমরাবতী । সব যেমন ছিলো, তেমন আছে। শুধু মাঝখান থেকে দশমাস আমার অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। প্রভু এই সেই স্থান, যেখানে আমি পিতা দশরথ কে বালুকা পিণ্ড দিয়েছিলাম । আপনি বিশ্বাস না করে প্রমাণ চেয়েছিলেন । তুলসী, ব্রাহ্মণ, ফল্গু নদী মিথ্যা ভাষণ করেছিলো। কিন্তু বট, দূর্বা এনারা সত্য বচন বলেছিল। কত সুন্দর ছিল সে সকল দিন । এখনও যেনো চোখের সামনে সব ভেসে ওঠে।” এইভাবে ভগবান শ্রীরামের সাথে সীতাদেবী নানা ঘটনা আলাপ করতে লাগলেন । নানা পুরানো ঘটনা স্মৃতিচারণা করতে লাগলেন । পুস্পক বিমান তখন প্রয়োগ রাজ্যে উপস্থিত । শ্রীরাম সেখানে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে নামলেন । মাতা সীতা দেবী বললেন- “প্রভু! এইস্থানে আমি মা গঙ্গার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে বনবাস সমাপন করে সকলে সুস্থ ভাবে এখানে ফিরলে আমি মাতা গঙ্গার পূজা করবো।” ভগবান শ্রীরাম সম্মত হলেন। সকলে গঙ্গা তীরে গমন করলো। মাতা সীতা দেবী তখন বনজ পুস্প, বনজ ফল দ্বারা গঙ্গার পূজা করলেন। প্রভুকে দেখে মাতা গঙ্গা যেনো শত হস্তকে শত লহরী তে পরিণত করে বারংবার প্রভু শ্রীরামের চরণ স্পর্শ করে গেলেন ।

মাতা সীতা বললেন- “হে পতিতপাবনী ! হে ত্রিপথগামিণী দেবী। আপনার পুণ্য সলিল মহাপাপ বিনষ্ট করে। আপনার পবিত্র এক বিন্দু সলিল গ্রহণ করলে যমভয় বিদূরিত হয় । আপনার নাম শ্রবণ- কীর্তন করা মাত্রই নরক ভয় দূর হয় । আপনার পবিত্র ধারায় যাহারা নিত্য অবগাহন করেন- তাহাদিগের সুমেরু তুল্য পুণ্য জমা হয় । হে মোক্ষদায়িনী মাতা, আমি আমার বচন পালন করে বনবাস সমাপন করে আপনার পূজা করেছি । এবার কৃপা করে আমাদিগের আশীর্বাদ করুন।” এরপর ভরদ্বাজ মুনি আসলেন। রাম- লক্ষ্মণ- সীতাদেবী- হনুমান- বিভীষণ- সুগ্রীব সকলে প্রনাম করে মুনিকে পূজা করলেন। ভরদ্বাজ মুনি প্রণাম করে অভিবাদন জানিয়ে বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনি রাক্ষস ধ্বংস করে পৃথিবী থেকে অধর্মের নাশ করেছেন। আপনাকে অনেক প্রণাম জানাই। কৃপা করে আজ নিশি আমার আশ্রমে নিবাস করে কাল প্রভাতেই যাত্রা করবেন। এখান থেকে অযোধ্যা খুব দূর নয় ।” অনেক আপত্তি সর্তেও সকলে রাজী হলেন । ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে গিয়ে আশ্রম কন্যাদের সাথে সীতাদেবী মন খুলে নানা গল্প করতে লাগলেন । রন্ধন কাজে অংশ নিলেন । নানা রকমের ব্যাঞ্জন – স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী রান্না করলেন। এরপর পরিবেশন করলেন। সকলে একসাথে আহারে বসলেন।

কি মনোরঞ্জন সে ব্যঞ্জন নানাবিধ ।
চর্ব চুষ্য লেহ্য পেয় ভক্ষ্য চতুর্বিধ ।।
যথেষ্ট মিষ্টান্ন সে প্রচুর মতিচুর ।
যাহা নিরখিবামাত্র হয় মতি চুর ।।
নিখুঁত নিখুঁত মণ্ডা আর রসকরা ।
দৃষ্টিমাত্র মনোহরা দিব্য মনোহরা ।।
সরুচাকুলির রাশি লবণ ঠিকরি ।
গুড়পিঠে রুটি লুচি খুরমা কচুরি ।।
ক্ষীর ক্ষীরসা ক্ষীরের লাড়ু মুগের সাউলি ।
অমৃতা চিতুই- পুলি নারিকেল পুলি ।
কলাবড়া তালবরা আর ছানাবড়া ।
ছানাভাজা খাজা গজা জিলেপি পাঁপড়া ।।
সুগন্ধি কোমল অন্ন পায়স পিষ্টক ।
ভোজন করিল সুখে রামের কটক ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

সীতাদেবীর রন্ধন খেয়ে সকলে ধন্য ধন্য করতে লাগলো । সকলে তাম্বুল সেবা নিয়ে খড়িকা দ্বারা দন্ত পরিষ্কার করতে লাগলো। আকণ্ঠ, উদর খেয়ে ঢেঁকুর তুলে সবে শয়ন দিলো। কি মধুর রাত্রি । চতুর্দশীর আকাশ । সকলে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হল। কাল প্রভাতে উঠেই আবার যাত্রা আরম্ভ হবে। পুস্পক বিমান সেই বণে উজ্জ্বল আলোকের ন্যায় অবস্থান করছিলো। মনে হল যেনো চন্দ্রমা ধরিত্রীতে নেমে এসেছেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger