সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪১)



মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব নিয়ে শাস্ত্র অনুমোদিত সকল শুভ কর্ম করলেন। অতঃ অশ্বকে উৎসর্গ করে যজ্ঞে আহুতি প্রদান পূর্বক যজ্ঞ সমাপন করলেন। অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপন হয়েছে। তিঁনি আর্যভূমিতে শক্তিশালী রাজা রূপে কীর্তিত হলেন । অযোধ্যায় সকলে শ্রীরামের পুত্র লব আর কুশের বীরত্বের কথা শুনে গর্বিত হল। কৌশল্যা, কৈকয়ী, সুমিত্রা দেবী- সীতাদেবীর তিন ভগিনী লব , কুশ ও সীতাকে দেখবার জন্য ব্যাকুল হলেন। বাল্মিকী মুনি জানতেন কি হতে চলেছে। তবুও ব্রহ্মার ইচ্ছায় তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। আশ্রমে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে সীতাদেবী কাবেরীমাতার কাছে গেলেন। প্রণাম করে বিদায় দিলেন। আশ্রমের সকলের চোখে জল। লব ও কুশ ছিলো আশ্রমের প্রাণ, সীতা যেনো সেই আশ্রমের কন্যা ছিলেন। এই তিনের বিহনে আশ্রম শূন্য। পশু, পক্ষী এমনকি মৃগ, ব্যাঘ্র, সিংহ, হস্তী, বরাহ আদি এসে লব কুশের বিদায় যাত্রার সময় অশ্রু মোচন করতে লাগলো। লব ও কুশ বন্য পশুদের সহিত ক্রীড়া করতো। সখা দের বিদায় জানালেন। সকলে বিদায় জানালো। মহর্ষি বাল্মিকী সীতাদেবী, লব ও কুশ কে নিয়ে অয্যোধ্যার দিকে চললেন। অযোধ্যায় উপস্থিত আত্মীয় কুটুম্ব ও প্রজা সকলে অপেক্ষা করতে লাগলেন । এমনকি যে সকল প্রজা মাতা সীতা সম্বন্ধে অপবাদ দিয়েছিলো, তাহারাও অপেক্ষা করতে লাগলেন । সকলের নজর কেবল নগরে প্রবেশের তোড়ন দ্বারের দিকে। কৌশল্যা, কৈকয়ী, সুমিত্রা দেবী অপেক্ষা করে রইলেন। ভরত মাণ্ডবী, লক্ষ্মণ- ঊর্মিলা, শত্রুঘ্ন – শ্রুতকীর্তি সকলে আপন পুত্রদের নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাত মহর্ষি বাল্মিকী সীতাদেবী ও লব কুশকে নিয়ে পদার্পণ করলেন। ভীর যেনো উপচে পড়লো। সকলেই লব ও কুশকে ক্রোড়ে লইতে চায়। এমনই সবার ছিলো। হুজুগ। সীতাদেবী করজোড়ে সকল কে অভিবাদন জানালেন। মনে পড়লো কত পুরাণো স্মৃতি। কতকাল আগে বন দর্শনের জন্য প্রস্থান- বনবাস স্বীকার- আর এত কাল পড় অযোধ্যায় ফেরা। রাজা জনক, মাতা সুনয়না দেবী পুত্রীকে দেখবার জন্য সেই দিকেই গেলেন ।

এত মানুষের ভীর যে সেনারাও সামাল দিতে পারছে না । লোকে যেনো বাঁধভাঙ্গা প্লাবনের ন্যায় ছুটে আসছে। কি অন্ধ , কি প্রতিবন্ধী সকলেই আসছে। সকলের চোখেই অশ্রু আর মুখে হাসি। রাশি রাশি পুস্প বর্ষণ করছে। অযোধ্যার পথ পুস্পে ঢেকে গেলো। সেই পুস্প পথে মহর্ষি বাল্মিকী, দেবী সীতা ও লব কুশ আসতে লাগলেন । প্রথমে রাজা জনক, মাতা সুনয়না আপন পুত্রীকে দেখে অনেক স্নেহ করলেন। লব , কুশকে অনেক ভালোবাসা দিলেন। তিন ভগিনী এসে বড় ভগিনীকে আলিঙ্গন করে অনেক রোদন করলেন । অবশেষে তিন ভ্রাতা এসে বৌঠানকে নমস্কার করে স্বাগত জানালেন। তিন মাতা এসে বরণ করলেন। লব, কুশকে ক্রোড়ে নিয়ে তিন রাজমাতা অনেক আদর স্নেহ প্রদান করলেন । অবশেষে এলেন শ্রীরাম । কি আর বলবেন । উভয়ের চোখে কেবল অশ্রু । রাজসভাতে উপস্থিত হলেন মাতা সীতা ।সন্দেহবাদীরা বলাবলি করতে লাগলো আর একবার অগ্নিপরীক্ষা দেবার জন্য। একথা মহারাজ শ্রীরামচন্দ্রের কানেও গেলো। তিঁনি কি বলবেন- একদিকে রাজধর্ম, প্রজাদের দাবী মান্য করার শপথ- অপরদিকে পতিধর্ম, পিতাধর্ম – শ্রীরামের মনে যেনো টানা হ্যাঁচড়া চলল। ভাবলেন বারবার সীতাকে অগ্নিপরীক্ষার কথা বলা নারী জাতির চূড়ান্ত অপমান। অপরদিকে যদি অগ্নিপরীক্ষা না হয়, তবে প্রজারা সীতার বর্জন দাবী তুললে আবার সীতাকে বনে যেতে হবে। মাতা সীতাদেবী বললেন- “আমি অগ্নিপরীক্ষা দেবো। সকলের সামনেই দেবো। এমন পরীক্ষা দেবো, যাহাতে কোনো যুগে আর কোন নারীকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।” আবার অগ্নিপরীক্ষা! শুনে সকলে বিস্মিত হল। মুনি ঋষিরা বললেন- “সীতা দেবী সাক্ষাৎ সতী রমণী। অগ্নি ও গঙ্গার ন্যায় শুদ্ধা তিঁনি। তাহার সতী ধর্মের পরীক্ষা চাওয়া মানে নারীর সতীত্ব ধর্মকে অপমান করা।” সন্দেহবাদী প্রজারা তবুও চাক্ষুষ অগ্নিপরীক্ষার দাবী তুলেছিলেন থেকে থেকে। মাতা সীতাদেবী কেবল শুনছিলেন সে সকল কথা । তারপর সকলকে থামিয়ে বললেন- “আমি অগ্নিপরীক্ষা দেবো। যে যাহাই বলুক। সতী ধর্মের জয় সকল যুগেই হয়ে থাকে। আজও হবে। তবে তাহার আগে আমি মহারাজকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাই।”

সীতাদেবী এরপর মহারাজ শ্রীরামকে বললেন- “প্রভু! সীতা কদাপি শ্রীরাম ভিন্ন অপরের ভজনা করেনি, অপরের চিন্তাও করেনি। আপনার চরণ আমার তীর্থ। আপনার চরণধূলি আমার কাছে তীর্থের ধূলি। আপনার পাদোদক আমার কাছে চরণামৃত। এই ধরিত্রী তে সকল পতিব্রতা নারীর এই ধর্ম। নারীর কাছে তার স্বামীই পরমেশ্বর। নারীর ত্যাগ, নারীর সেবা, নারীর পতিব্রতা ধর্মই নারীর কাছে অগ্নিপরীক্ষা। প্রতি মুহূর্তে সকল সতী নারীই এই পরীক্ষা দিয়ে চলছেন। তবুও এই সতী নারীদের কাছে পৃথক অগ্নিপরীক্ষা চাওয়া কি অধর্ম নয়?” ইহা শুনে সকলে চুপ থাকলেন। এমনকি শাস্ত্রজ্ঞ মুনি ঋষিরাও চুপ হয়ে থাকলেন। সীতাদেবী বললেন- “রাবণের রাজ্যে ঈশ্বর জানেন কি নিদারুন অত্যাচার সয়ে আমি সতীত্ব ধর্ম পালন করেছি। তবুও এই সমাজে আমাকে সেই কারণে অসতী অপবাদ শুনতে হয়েছে। যাহার ফল আমার সন্তানেরা প্রাপ্তি করেছে। অয্যোধ্যার রাজকুমার হয়েও তাহারা সেই ভাবে লালিত হয় নি। কোন নারী স্বেচ্ছায় নিপীড়িত হতে চায় এই জগতে ? আর সেই নিপীড়িতা নারীর কাছে কেন অগ্নিপরীক্ষা চাওয়া হয়? ইহা কি অধর্ম নয় ?” ইহা শুনে সকলের মুখের বোল হারিয়ে গেলো। কাহার মুখে শব্দ নেই। সীতাদেবী বললেন- “স্ত্রী যদি এক দিবস স্বামী গৃহে না থাকে তবে সেই স্ত্রীকে অসতী জ্ঞান করে ত্যাগ করা কোন ধর্মের বিচার? যদি কোন পুরুষ তাহার স্ত্রী থেকে, গৃহ থেকে দূরে থাকে, তবে সেই পুরুষের কেন অগ্নিপরীক্ষা চাওয়া হয় না। ইহা কি অধর্ম নয়?” ইহা শুনেও সকলে চুপ হয়ে গেলেন। মাতা সীতাদেবী বললেন- “হে মহারাজ! আপনি রাজা। রাজা রূপে আপনার কাছেই বিচার চাইলাম । কিন্তু আপনি আমার স্বামী। স্ত্রীরূপে নারী রূপে বলছি- আমি কি একবর্ণও অযৌক্তিক প্রস্তাব করেছি।” এরপর মাতা সীতাদেবী সকলকে বললেন- ‘আপনারা কেন বোঝেন না- এক নারীর ধৈর্য, ত্যাগ, পতিসেবাই তাহার সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। তাহার কাছে অন্য অগ্নিপরীক্ষা চাওয়া অধর্ম। দুঃখ লাগে যখন আপনারা একজন সতী নারীর কাছে এইরূপ পরীক্ষা চান। আর তার চেয়েও বড় দুঃখ হয় যখন রাজা এই অগ্নিপরীক্ষাকে সমর্থন করেন। কারণ রাজা যা করেন, প্রজা তাই শেখে। আর তার ফলে এই অগ্নিপরীক্ষার নামে যুগে যুগে নারীদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে।” এই বলে মাতা সীতাদেবী আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে রোদন করতে লাগলেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger