সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –৩)

মহর্ষি অগস্ত্য উঠে তখন ভগবান শ্রীরামকে অনেক ধন্যবাদ দিলেন। বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনি তাড়কা বধ করে অধর্মের নাশ আরম্ভ করেছিলেন। দশাননকে বধ করে সেই কর্ম যথাবিহিত সুসম্পন্ন করলেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “গুরুদেব! কৃপা করে আমাকে রাক্ষস বংশ, রাবণের পরিচয় দান করুন। আমি সেইটুকুই জানি যেটুকু আমার পরম সখা বিভীষণ আমাকে বলেছেন।” মহর্ষি অগ্যস্ত বললেন- “হে শ্রীরাম আপনি শুনবেন সেই ইতিহাস? এই ইতিহাস অনেক পুরানো। মহর্ষি বাল্মিকী নিশ্চয়ই আপনার জীবন চরিতে সেই সকল ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। আপনি শুনুন । বহু পূর্বে লঙ্কা নগরী রাক্ষসদের ছিলো । মালী, সুমালী, মাল্যবাণ নামক রাক্ষস বহু পূর্বে স্বর্গ রাজ্য আক্রমণ করেছিলো। দেবতাদের সুরক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এই যুদ্ধে ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র চালাবেন না বলে শর্ত হয়েছিলো- কিন্তু দেবতাদের প্রার্থনায় ভগবান মধুসূদন চক্র দ্বারা মালীকে বধ করলে রাক্ষসেরা পরাজিত হয়ে পাতালে পলায়ন করলেন। অপরদিকে ব্রহ্মার পুত্র পুলস্ত্যের বংশজ মহর্ষি বিশ্রবার বিবাহ হয়েছিলো ভরদ্বাজ মুনির কন্যা লতার সাথে। মুনির ঔরসে লতার গর্ভে কুবেরের জন্ম হয়। কুবের এরপর লঙ্কা শাসন করেন। অপরদিকে মাল্যবান পূর্ব রাজ্য ফিরে পেতে ও দেবতাদের পরাস্ত করতে সঙ্কল্প গ্রহণ করে। সেই উদ্দ্যেশে কন্যা কেকসীকে প্রেরণ করে বিশ্রবা মুনির আশ্রমে। কেকসীর সাথে মহর্ষি বিশ্রবার বিবাহ হয়। শাস্ত্রাচার ভুলে মুনি সন্ধ্যাকালে পত্নীর অনুরোধে সঙ্গম করেন। যার ফলে তাহাদের প্রথম সন্তান রাবণ রাক্ষস হয়, জন্ম মাত্রই সেই দশানন দারুন ‘রব’ করলে তার নাম হয় রাবণ । এরপর কেকসী কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ ও শূর্পনাখার জন্ম প্রদান করেন। কঠোর তপস্যা করে তিন ভ্রাতা ব্রহ্মাকে প্রসন্ন করে বর পান। ব্রহ্মার বরে রাবণের দশ আনন, উদরে অমৃত কুম্ভ ও নর বানর ছাড়া অপরের হস্তে না মরবার বর পায়। কুম্ভকর্ণ ছয়মাস ঘুম ও একদিন মাত্র জেগে থাকার বর পায়- কিন্তু অকালে নিদ্রভঙ্গ করলে মৃত হবার বর পায়। আর বিভীষণ ধর্মে মতি থাকার বর পায় ।”

সকলে অগ্যস্ত মুনির কথা শুনতে লাগলেন। মুনি বললেন- “রাবণ ময়দানবের রূপসী কন্যা মন্দোদরীর পাণিগ্রহণ করেন , কুম্ভকর্ণের সাথে পাতাল নিবাসী রাক্ষসী বজ্রজ্বালার বিবাহ হয় আর বিভীষণের সাথে গন্ধর্ব রাজ শৈলুষের কন্যা সরমার বিবাহ হয় । রাবণ নিজ বলে কুবেরের মহল, বিমান ও লঙ্কা দখল করলে কুবের কৈলাসে পলায়ন করেন। এরপর রাবণের ঔরসে মন্দোদরীর গর্ভে মেঘনাদের জন্ম হয় । রাবণ ধীরে ধীরে দাম্ভিক ও অধার্মিকে পরিণত হয়। পৃথিবীর বহু রাজা তাহার নিকট পরাজিত হয় । এরপর রাবণ কৈলাসে গিয়ে নন্দীকে উপহাস করলে ক্রুদ্ধ হয়ে নন্দী শাপ প্রদান করেন যে নর আর বানরের হাতেই রাবণ ধ্বংস হবে। রাবণের নারীলোলুপ স্বভাব বৃদ্ধি পায়। রাবণের হস্তে লাঞ্ছিতা কন্যারা অভিশাপ দেয়- কোন এক নারীতে মজেই রাবণ নিজের সর্বনাশ আহ্বান করবে। মহর্ষি কুশধব্জের কন্যা বেদবতী রূপে দেবী লক্ষ্মী অবতরণ করেছিলেন। রাবণ তাঁকে অপহরণ করতে গেলে তিনি যজ্ঞে ঝাঁপ দেন। ঝাঁপ দেবার পূর্বে প্রতিজ্ঞা করেন যে পরজন্মে তিনি রাবণের কাল হয়ে জন্মাবেন । মরুত্ত নামক এক রাজা দেবতাদের আমন্ত্রণ করে যজ্ঞ করছিলেন, রাবণ সেখানে উপস্থিত হলে দেবতারা পক্ষী রূপে পলায়ন করেন, রাজা তখন যজ্ঞ বন্ধ রেখে রাবণের বশ্যতা স্বীকার করে। এরপর রাবণ আপনার বংশীয় অর্থাৎ সূর্য বংশীয় নৃপতি রাজা অনরণ্যকে যুদ্ধে পরাজিত করে নিহত করেন। মরবার পূর্বে রাজা অনরণ্য শাপ প্রদান করেন যে সূর্য বংশের কোন একজনের হাতে রাবণের মরণ হবে। দম্ভে মত্ত রাবণ সহস্র হস্তীর শক্তিতুল্য রাজা কার্তবীর্যার্জুনকে আক্রমণ করেন । এখানে রাবণ পরাস্ত হয়। রাজা কার্তবীর্যার্জুন রাবণকে কারাগারে বন্দী করেন। মহর্ষি পুলস্ত্য এসে রাজা কার্তবীর্যার্জুনকে অনুরোধ করে রাবণকে উদ্ধার করেন । বালীর সাথেও রাবণের যুদ্ধ হয়। বালী রাবণকে লেজে পেঁচিয়ে সাতবার সমুদ্রের জলে নিমজ্জিত করে সন্ধ্যা আহ্নিক সমাপন করেছিলেন। শেষে বালীর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রাবণ মুক্ত হয় । রাবণ এরপর পাতালে বলি রাজার রাজ্য আক্রমণ করে। বিষ্ণু ভক্ত বলির হস্তে রাবণ পরাজিত ও বন্দী হয়- অন্তিমে এক বৈষ্ণবীর উচ্ছিষ্ট ভোজন করে রাবণ মুক্ত হয়। পরাজিত হয়েও রাবণ একটুকুও পরিবর্তন হয় নি। এরপর রাবণ নাগরাজ বাসুকীকে পরাজিত করে পাতালরাজ নিপাতকের সাথে যুদ্ধ করেন । পরাজিত হয়ে ব্রহ্মার নির্দেশে রাবণ নিপাতকের সাথে সন্ধি করে মুক্ত হন।”

মুনির বাক্য সকলে মোহিত হয়ে শুনছিলেন । অগ্যস্ত মুনি বললেন- “এরপর রাবণ বরুণলোক আক্রমণ করেন। বরুণ দেবতার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বরুণের পুত্রকে পরাজিত করে সকল অস্ত্র লুট করেছিলেন । রাবণ একবার যমালয় আক্রমণ করেছিলেন। যমরাজের সাথে দশাননের ঘোর যুদ্ধ চলছিলো, সেসময় ব্রহ্মা এসে মিটমাট করে দেন। তারপর রাবণ রাজা মান্ধাতার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পরাজিত হয় ও বন্দী হয়। ব্রহ্মার ইচ্ছায় মহর্ষি ভার্গব এসে রাবণকে মুক্ত করেন। বারবার পরাজিত হয়ে রাবণের মোটেও শিক্ষা হয় নি। কুশ দ্বীপ আক্রমণ করে নারী অপহরণ করতে গেলে মায়াবী পুরুষের হস্তে পরাজিত হয় । দশানন এরপর চন্দ্রলোক আক্রমণ করে সর্বস্ব হরণ করেন। এরপর রাবণ মধু দৈত্যের সাথে মিলিত হয়ে একজোট হয়ে স্বর্গ আক্রমণ করলে পরাজিত ও বন্দী হন। রাবণ পুত্র মেঘনাদ তখন দেবতাদের পরাজিত বন্দী করেন, ও পিতাকে মুক্ত করেন। ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় ব্রহ্মাস্ত্রের বিনিময়ে মেঘনাদ দেবতাদের মুক্ত করে। এরপর রাবণ স্বর্গের বহু দেবকন্যাদের লঙ্কায় নিয়ে এসে দাসীবৃত্তিতে নিযুক্ত করেন। রাবণের নিকৃষ্ট কর্ম হল রম্ভাকে ধর্ষণ করা। ক্রুদ্ধ রম্ভা রাবণকে শাপ দেন কোনো নারীকে বল পূর্বক ভোগ করতে গেলে রাবণের মস্তক সাত টুকরো হয়ে যাবে। এই হল রাবণের কাহানী ।” এই ভাবে অগ্যস্ত সেই সকল পুরাণো অতীতের কথা বর্ণনা করলেন। অগ্যস্ত বললেন- “হে শ্রীরাম! এই সকল এখন অতীত। কারণ আপনি রাবণকে বধ করেছেন। লঙ্কায় এখন ধর্ম রাজ্য স্থাপন হয়েছে । এই সকল ঘটনা বহু পূর্বের । রাবণ নেই। কিন্তু তার সকল অত্যাচারের কাহানী থেকেই যাবে। যুগে যুগে যখন ‘রামকথা’ পাঠ হবে, সাথে সাথে রাবণের এই সকল দৌরাত্মের ঘটনা মানুষ জানবে । এই হল সেই ইতিহাস।” এই বলে অগ্যস্ত মুনি পুরানো ঘটনা সমাপ্ত করলেন । সকলে নানা অনুষ্ঠানে সামিল হলেন। রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠান শেষে যা যার গৃহে গমন করলো। ‘রামরাজ্যে’ অযোধ্যায় যেনো স্বর্গ রাজ্য স্থাপিত হল ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger