সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪০)



মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “লব ও কুশ, তোমরা ইহা কি করছ ? তোমরা জানো না উনি কে হন। সত্বর ওঁনার অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব সসম্মানে ওঁনাকে ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অজ্ঞান বশত তোমরা নিজের জনকের সাথেই যুদ্ধ করছ। মহাপাপ হয়েছে তোমাদের।” ‘জনক’ শব্দ শুনে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র চমকে উঠলেন। হস্ত থেকে ধনুক খসে পড়লো । মহর্ষির বাক্য যেনো সংশয় হয়ে কর্ণে প্রবেশ করেছে । পুনঃ তিঁনি জিজ্ঞাসা করলেন- “হে মহর্ষি! আমি ইহাদের জনক। তবে কি এরা আমার পুত্র?” মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “হে পুরুষত্তম রঘুনাথ! সময় এসেছে সেই রহস্য উন্মোচনের। বিধাতার বিধানে সেই সময় আগত, যখন পিতা পুত্রদের মধ্যে পরিচয় হবে। ইহারা আপনারই যমজ সন্তান । ইহাদের মাতা সীতাদেবী আমার আশ্রমেই আপনার দুই পুত্রকে জন্ম দিয়েছিলেন ।” লব ও কুশ সব শুনে তাজ্জব হয়ে গেলেন । এ কি কথা বলছেন গুরুদেব? যেই মাতাকে তারা চির দুখিনী বলে জানতেন তিনিই তাহলে রামায়নের সুধা, শক্তিরূপিনী সীতাদেবী? আর সীতাদেবীর দর্শনের জন্যই তারা এত উদগ্রীব হয়েছিলেন । মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “লব ও কুশ তোমরা মহারাজ শ্রীরামের সন্তান। উনিই তোমাদের পিতা। আর সীতাদেবী তোমাদের মাতা। যাহাকে তোমরা সাধারণ রমণী ভেবেছিলে, তিঁনি সীতাদেবী। এবার গিয়ে পিতার আশীর্বাদ গ্রহণ করো।” তারপর মহর্ষি বাল্মিকী শ্রীরামচন্দ্রকে বললেন- “হে শ্রীরাম! এই যুদ্ধে আপনার বহু হানি হয়েছে। প্রজাপতি ব্রহ্মার কৃপায় আমি অমৃত বারি সেচন করে সকল আহত দিগকে সুস্থ করবো। সকল মৃতদের জীবিত করবো।” এই বলে মহর্ষি বাল্মিকী মন্ত্র পুতঃ বারিধারা সেচন করে সকল আহত দের সুস্থ করে মৃত অশ্ব, হস্তী, ভল্লুক, রাক্ষস, বানর, মর্কট, অযোধ্যার সেনারা যাহারা হতাহত হয়েছিলেন, সকলকে বাঁচিয়ে সুস্থ করলেন। শত্রুঘ্ন, ভরত, লক্ষ্মণ কে সুস্থ করলে তাহারা সেইস্থানে আসলেন । লব ও কুশ মহারাজ শ্রীরামচন্দ্রকে অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব ফিরিয়ে দিলেন । চরণে পতিত হয়ে ক্ষমা চাইলে শ্রীরামচন্দ্র দুই পুত্রকে ক্রোড়ে নিয়ে অনেক আদর, স্নেহ প্রদান করলেন । অতঃ ভরত, শত্রুঘ্ন, লক্ষ্মণ দুই বালক কে ক্রোড়ে নিয়ে অনেক স্নেহ প্রদান করলেন। যোগ্য সূর্যবংশের উত্তরাধিকারী হয়েছে তাহারা। বংশের নাম উজ্জ্বল করবে ।

মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “হে শ্রীরাম। এই দুই বালক এর নামকরণ সংস্কার আপনার কুলের দ্বারাই হয়েছে। যখন মথুরা নরেশ শ্রীশত্রুঘ্ন লবণ অসুর বধের জন্য যাত্রা করে এই তপোবনে এসেছিলেন, তখন তাহার দ্বারাই আপনার পুত্রদ্বয়ের নামকরণ অনুষ্ঠান হয়।” শ্রীরাম বললেন- “কিন্তু ইহাদের মাতা, তথা আমার পত্নী কোথায়?” সেই সময় হনুমান ,মাতা সীতাদেবীকে নিয়ে আসছিলেন । হনুমান এসে বললেন- “প্রভু! এই মাতাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। দয়া করে আর মাতার ওপর কোন অবিচার করবেন না। তিঁনি মুখ বুজে পালন করেন ঠিকই- কিন্তু অন্তরে অন্তরে অনেক দুঃখ পান। দয়া করে এবার মাতাকে ও আপনার দুই পুত্রকে অযোধ্যায় নিয়ে চলুন।” শ্রীরামচন্দ্র রথ থেকে নেমে সীতার কাছে গেলেন। ঘোমটার আড়ালে থাকা সীতার মুখমণ্ডল দর্শন হল না। শ্রীরামচন্দ্র খানিক ক্ষণ স্তব্ধ থাকার পর বললেন- “সীতা! আমার সহিত কথা বলবে না? তুমি কি জানো না তোমাকে ত্যাগ করে আমি বা কেমন আছি। চন্দ্র যদি তার জ্যোতি হারিয়ে ফেলে, তখন চন্দ্রের মূল্য থাকে কি? সীতা বিনা রামচন্দ্রেরই কি বা গুরুত্ব?” ইহা শুনে সীতাদেবীর নয়ন জলে ভেসে গেলো। কতদিন পর স্বামীর সঙ্গে কথা হচ্ছে। কত বছর, কত রাত্রি, কত অমাবস্যা, কত পূর্ণিমা, কত দিন কেটে গেছে এই কণ্ঠস্বর কর্ণে প্রবেশ করেনি । সীতাদেবী বললেন- “কিভাবে আবরণ উন্মোচন করি? পাছে প্রজারা অভিযোগ না করেন- যে আপনি অসতী রানীর মুখ দেখেছেন। আপনার চরণ কিভাবে স্পর্শ করি- পাছে অভিযোগ করেন যে এক চরিত্রহীনা রমণী আপনার চরণ স্পর্শ করেছে। আপনাকে দূর হতে প্রণাম করি। এক স্ত্রীর কাছে স্বামী মান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সব। যদি আপনাকে কেহ অপবাদ দেয়- তবে সর্বপ্রথম আঘাত আমার ওপরে আসে।” ভগবান শ্রীরামের চোখে জল এলো। শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “আমার বড় ভুল তোমাকে সাগর পারে অগ্নিপরীক্ষা গ্রহণ করা। এক সতী স্ত্রীর কাছে সতীধর্মের প্রমান চাওয়া সবচেয়ে বড় অধর্ম। যদি এই অধর্ম আমি অযোধ্যায় সমস্ত প্রজাদের কাছে করতাম, তবে তার থেকেও বড় অধর্ম যা তোমাকে গর্ভস্থ অবস্থায় সহ্য করতে হয়েছে, সেটা করতে হতো না।”

ভগবান শ্রীরাম আরো বললেন- “ সীতা! এই অন্যায় কাজ আমার দ্বারাই কেন বা হল ? রাজধর্ম পালন করতে করতে আমি নিজ পতিধর্ম , পিতাধর্মকে জলাঞ্জলি দিয়ে দিলাম । এবার আমি তোমাকে গ্রহণ করে অযোধ্যায় নিয়ে যেতে চাই। আর তার জন্য অয্যোধ্যার সেই ভ্রান্ত মানবের মন থেকে সংশয় দূর করা দরকার।” ইহা বলে ভগবান শ্রীরাম চুপ হয়ে রইলেন। মাতা সীতাদেবী বললেন- “বুঝেছি প্রভু! এবার আমি এমন অগ্নিপরীক্ষা দেবো, যে কোন মানব আর সতী স্ত্রীর ওপরে কলঙ্ক লেপন করতে পারবে না। আমি সেই পরীক্ষাই দেবো, যাহাতে লোকে নারীজাতিকে সম্মান করতে শেখে। আমি সেই পরীক্ষাই দেবো যাহাতে যুগে যুগে নারীধর্ম আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আপনি চিন্তিত হবেন না।” এই বলে সীতাদেবী পুত্রদের নিয়ে বিদায় হলেন । ভগবান শ্রীরাম মহর্ষি বাল্মিকীকে শিষ্য সহিত, দেবী সীতা ও দুই পুত্রকে নিয়ে যজ্ঞ সমাপনের দিন অযোধ্যায় থাকতে অনুরোধ জানালেন । ইহা বলে ভগবান শ্রীরাম অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব নিয়ে অযোধ্যায় গেলেন। অযোধ্যায় সকলে লব ও কুশের সংবাদ পেয়ে আনন্দিত হল। অপরদিকে আশ্রমের লোকেরা এসে সীতাদেবীর কাছে ক্ষমা চাইলো, কারন যাঁহাকে সাধারণ নারী জ্ঞানে তুচ্ছ করেছিলেন, তিঁনিই স্বয়ং সীতাদেবী। সাক্ষাৎ ভগবতী লক্ষ্মী। সীতাদেবী বললেন- “আপনারা সকলে আমার নমস্য । আপনাদিগের কারণে আজ লব ও কুশ এত শক্তির অধিকারী হয়েছে। আপনাদের স্নেহ ভালোবাসাতেই তারা লালিত পালিত হয়েছে। আপনারা সকলেই আমার আপনজন ।” লব ও কুশকে মাতা সীতাদেবী বললেন- “পুত্র! অযোধ্যা নরেশ শ্রীরামচন্দ্র তোমাদের পিতা। তোমরা এখন থেকে সেখানেই থাকবে ওঁনার কাছে।” লব ও কুশ রোদন করে উঠলো। তাহার বাল্যকাল হতে কেবল মাতাকেই দেখেছেন। পিতাকে ত এই প্রথম দেখলেন। মাতাই সব । সীতাদেবী বললেন- “উনি তোমাদের অধিক স্নেহ করবেন। তোমরা এখন বালক। শিশু নও । তোমরা ক্ষত্রিয় পুত্র। রাজধর্ম পালন করতে চেষ্টা করো। যেমন তোমাদের পিতা পালন করেন। ওঁনার কাছে থেকে এই সকল বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করবে।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger