সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –১৮)

রাক্ষস নাশ হয়েছিলো কিন্তু দানব জাতির অত্যাচার বজায় ছিলো। মথুরার শাসক ছিলেন লবণ অসুর । তার তাণ্ডবে মুনি ঋষিরা ছিলেন শঙ্কিত। একের পর এক মুনি ঋষি দের তপোবন ছারখার করে লবণ অসুর এক ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করলো। ঋষি দিগের পবিত্র যজ্ঞে রক্ত মাংস ঢেলে যজ্ঞ পণ্ড করে দিতো অসুরেরা। মেরে কেটে আশ্রম গুলিতে রক্তবন্যা করে দিতো। কয়েদে নিয়ে অকথ্য অত্যাচার চালাতো এই লবণ অসুর । একদিন সকল মুনি ঋষি এসে যমুনা তীরে অবস্থিত হয়ে মহর্ষি ভার্গব ও চ্যবন মুনিকে সব কিছু জানালেন । বললেন- “ হে মুনিবর ! লঙ্কার রাজা রাবণের বিনাশের পর আমরা বেশ শান্তিতে যজ্ঞাদি করে দেবতাদিগকে হব্য প্রদান করছিলাম । কিন্তু পুনঃ এই অসুরদের অত্যাচার আরম্ভ হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কি করবো ? তবে কি রাক্ষসদের পর এবার অসুরদের তাণ্ডব সইতে হবে?” মহর্ষি ভার্গব ও চ্যবন মুনি বললেন- “হে সন্তগণ ! লবণ অসুর মাত্রা অতিক্রম করেছে। এবার তাহাকে স্তব্ধ করা প্রয়োজন ।

যিঁনি দশাননকে বিনাশ করে ধর্ম সংস্থাপন করেছেন, সেই অনাথের নাথ শ্রীরামচন্দ্রই পারেন দৈত্যদিগকে বিনাশ করতে। আসুন আমরা সকলে অযোধ্যা প্রস্থান করি ।” মহর্ষি ভার্গব ও চ্যবন মুনি ও বহু মুনি ঋষি অযোধ্যায় অভিযোগ জানাতে গেলেন। এক সাথে বহু ব্রাহ্মণ আগমন করেছেন দেখে ভগবান শ্রীরাম পাদ্য- অর্ঘ - পুস্প দ্বারা পূজা করে বসতে আসন দিলেন। ফলমূল আদি আহারের ব্যবস্থা করলেন । মুনি ঋষিরা লবণ অসুরের সব দৌরাত্ম্য সকল ঘটনা বললেন। মহর্ষি ভার্গব , চবন মুনি বললেন- “হে শ্রীরাম। ধরিত্রী তে এমন রাজা নেই যে কিনা এই সময় লবণকে নাশ করে আমাদের উপকার করতে পারে। একমাত্র আপনি এই কর্মে উপযুক্ত । দয়া করে আমাদের লবণ অসুরের কবল থেকে মুক্ত করুন।” শ্রীরামচন্দ্র ক্রোধিত হয়ে বললেন- “হে মহর্ষি বৃন্দ। আমি দাশরথি রাম আপনাদের সামনে শপথ গ্রহণ করলাম যে লবণ অসুরের আতঙ্ক আমি দূর করবো।”

মহর্ষি চবন বলল- “ হে রঘুনন্দন ! লবণ অসুর খুবুই বলশালী। তার পিতা ছিলেন রাবণের সখা মধু দৈত্য। তার মাতার নাম কুম্ভিনসী । লবণ অসুরের পিতা মধু দৈত্য ছিলেন একজন পরম শিবভক্ত। ভগবান শিব প্রসন্ন হয়ে মধু দৈত্যকে একটি দিব্য ত্রিশূল প্রদান করেছেন। সেই ত্রিশূল এখন লবণ অসুরের হস্তে। লবণ নিত্য সেই ত্রিশূলের পূজা করে। সেই ত্রিশূল ত্রিলোক ধ্বংস করতে পারে। এই অপাত্রের হাতে এমন ত্রিশূল থাকা সৃষ্টির পক্ষে বিপদজনক । সেই দুর্মতি কখন সৃষ্টি নাশ করে দেয়। আপনি সত্বর লবণ বধের ব্যবস্থা করুন। সে এই ত্রিশূল দ্বারা মান্ধাতার বধ করেছে। ” তখন মহর্ষি ভার্গব বললেন- “শুধু কি আমরাই কষ্টে আছি ? মথুরা বাসীর কষ্ট বর্ণনা করা যায় না। সেই রাজ্য থেকে লবণ ধর্মনাশ করে অধর্মের বিস্তার করে রেখেছে। মথুরার নাগরিকেরা দিবারাত্র অসহ্য নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে। সেখানে কেহ শান্তিতে নেই। ঘরে ঘরে সেখানে কেবল বিভীষিকা । সেই মাংসাশী লবণ মনুষ্য মাংস এমন কি অরণ্য থেকে মৃগ, সিংহ, ব্যাঘ্র, পক্ষী সকল হত্যা করে ভক্ষণ করে। নাতো বনের জীব, না সাধু সন্ন্যাসী নাতো মথুরার লোক- কেহ শান্তিতে নেই।

সকলের চোকে মুখে কেবল আতঙ্ক। আপনি লবণ বধ করে মথুরায় ধর্মরাজ্য প্রবর্তন করুন।” এই বলে নানান উপদেশ দিয়ে মুনি ঋষিরা বিদায় নিলেন । ভগবান শ্রীরাম ভাবলেন এবার লবণ বধের জন্য গমন করতে হবে । সেই অসুর এর রাজ্য দখল করে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু পূর্বে একবার লবণ কে সাবধান করে শুধরানোর জন্য সুযোগ দেওয়া উচিৎ । এই মনে করে শ্রীরাম , হনুমানকে দূত করে পাঠালেন । হনুমান বুক ফুলিয়ে লবণ দৈত্যের রাজ সভায় প্রবেশ করে লবণ কে সাবধান করে বলল- “ওরে দুরাচারী। তোর দৌরাত্ম্য এবার প্রভু শ্রীরামের কর্ণগোচর হয়েছে । তিঁনি তোর এই অধার্মিক কর্ম শুনে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়েছেন । শ্রীরামের ক্রোধের ফল ত জানিস। রাবণের বংশনাশ হয়েছে, রাবণ নিজেও গত হয়েছে। সুতরাং তোরও ঐ একই অবস্থা হবে। অতএব এখুনি সকল পাপ কর্ম ছেড়ে শাস্ত্র অনুসরণ করে রাজ্য চালনা কর। অন্যত্থায় তোর বিনাশ হবে। প্রভু শ্রীরাম তোকে শুধরানোর সুযোগ দিয়ে আমাকে দূত করে প্রেরণ করেছেন।”

লবণ বলল- “ ওরে মর্কট! তুই আমাকে উপদেশ দিস ? এই লবণ কে দেখে দেবতারা ভয় পায়। আর তুই আমার সভায় এসে আমাকে ভীত করছিস ? হে মর্কট আমি চাইলে এখুনি তোকে বন্দী করতে পারি। কে তোকে বাঁচাবে?” হনুমান হাস্য করে বলল- “ লবণ! তুই বোধ হয় লঙ্কা দহনের সংবাদ শুনিস নি । তোর মতো রাবণ আমাকেও বন্দী করে পুচ্ছ দগ্ধ করতে চেয়েছিলো। সেই অগ্নিতে আমি লঙ্কা ভস্ম করি। এমন কোন শক্তি জন্মায় নি যে কিনা ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের ভক্তদের বন্দী করতে পারে। তাই অন্তিম বার অনুরোধ করে বলছি ভগবান শ্রীরামের আদেশ মেনে নিয়ে ধর্ম পথে এসে রাজত্ব পরিচালনা করো। মুনি ঋষিদের ওপর অত্যাচার করো না। নচেৎ তোমার অবস্থাও রাবণের ন্যায় হবে। প্রভু শ্রীরাম অবিলম্বে তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষোনা করবেন ।” লবণ হাস্য করে বলল- “গিয়ে বল তোর ঐ প্রভুকে যে লবণ ভীত হয় নি। আমি যুদ্ধের জন্য তৈরী।

কোন মতেই এই প্রস্তাব আমি মান্য করবো না।” হনুমান চলে এলো। অযোধ্যায় ফিরে ভগবান শ্রীরামকে সব বললেন। শ্রীরাম বললেন- “তবে লবণ দানব এবার বধ হবে। আমি লবণ অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষোনা করলাম ।” ভরত এসে বলল- “অগ্রজ। লঙ্কায় আপনি অনেক রাক্ষস বধ করেছেন। আর আপনাকে কষ্ট করতে দেবো না। এই যুদ্ধ আমি করবো। আমি লবণ বধ করবো।” লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! আমি আপনার ভৃত্য। আমি থাকতে আপনি কেন যুদ্ধ করবেন। আমি মথুরা গিয়ে লবণ বধ করে ধর্মরাজ্য স্থাপন করবো।” তখন শত্রুঘ্ন এসে বলল- “আমার অগ্রজগণ ! আপনারা কেউ যুদ্ধ করবেন না। এই যুদ্ধ আমি করবো। আমার দুই অগ্রজ লঙ্কায় যুদ্ধে বহু রাক্ষস বধ করেছেন, আমার আর এক অগ্রজ চতুর্দশ বৎসর নন্দিগ্রামে সন্ন্যাস জীবন পালন করে অনেক ক্লেশ সহ্য করেছেন। আমি কি করলাম? আমি গুরুকূলে যে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছি- তার প্রয়োগ কিভাবে করবো ? সেই সুযোগ আমাকে কেহ প্রদান করেনি। অতএব এই যুদ্ধ আমি করবো। লবণ আমার হস্তেই বধ হবে।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger