সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৫৭)

এরপর ব্রহ্মা ও দেবতারা প্রকট হলেন । বললেন- “হে শ্রীরাম! দেবী সীতা সতী নারী। তাঁহাকে গ্রহণ করুন। দেবী চির নিত্য শুদ্ধা। তিঁনি পবিত্রা। আমরা দেবতারা ইহার সাক্ষী । অতএব নিশ্চিন্তে দেবী জানকীকে গ্রহণ করে রাজ্যে গমন করুন। আপনার বনবাস কাল সমাপন হতে মাত্র কিছু সময় বাকী।” কেহ কেহ বলেন আসল সীতা বহু পূর্বে অগ্নিদেবের সুরক্ষায় ছিলেন। তার বদলে একটি মায়া সীতা ছিলেন রামের সাথে। রাবণ সেটিকেই হরণ করেছিলো। অগ্নিপরীক্ষার সময় অগ্নিদেব আসল সীতাকে এনে দিলে, নকল সীতা- আসল সীতার মধ্যে বিলীন হয়ে যান । দেবতারা বিদায় নিলে মাতা সীতা বলেন- “হে রঘুনাথ! আপনারা কেন বোঝেন না যে এক নারীর ধৈর্য , সহনশীলতাই তার অগ্নিপরীক্ষা । রাবণ কি আমার ইচ্ছায় আমাকে হরণ করেছিলো ? আমি কি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম লঙ্কাপুরীতে ? আপনাদের যুদ্ধে বলি হয়েছি আমি। এক নারী। তবুও কেন আমার অগ্নিপরীক্ষা ? কোন নারী স্বেচ্ছায় নিপীড়িত হতে চায় না , তবে নারীজাতিকে কেনই বা সতীত্বের প্রমান দিতে হয় ? পাপরাজ্যে পাপীদের মাঝে থাকলেই যদি নারীকে অসতী হতে হয়- তবে মাতা গঙ্গার জলে নিত্য না জানি কত মহাপাপী স্নানাদি করে, তাহলে কি গঙ্গা দেবীও অশুদ্ধা হন? এই বিধান সমস্ত নারীজাতির অপমান। আর আমি অগ্নিপরীক্ষার বিধান মেনে সমস্ত নারীজাতির পক্ষ হতে আপনার কাছে পতিব্রতা স্ত্রীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। আজ আপনি যে অন্যায়ের সূচনা করলেন তার ফলে যুগে যুগে নারীদের ওপর দুর্ভাগ্য নেমে আসবে।” এই বলে সীতাদেবী ক্রন্দন করতে লাগলেন। ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হে প্রিয়ে! অশ্রু মোচন করো। তুমি কিভাবে ধারণা করলে সীতাগত প্রাণ শ্রীরাম তাঁহার সীতাকেই সন্দেহ করবে? হে জানকী! আমি জানি সমস্ত নারীজাতির কাছে তুমি উদাহরণ প্রস্তুত করেছো, আর তোমাকে সন্দেহ করে এই শ্রীরাম নারীজাতির ওপর কিভাবে দুর্ভাগ্য আনয়ন করবে ? হে সীতে! এই সমাজে সুবুদ্ধি ও মন্দবুদ্ধি উভয় প্রকার মানব একত্রে সমাবেশ করে। কেন আমি তোমাকে পরীক্ষা নিলাম এর উত্তর একদিন নিশ্চয়ই তুমি পাবে।”

এই বলে শ্রীরাম বললেন- “জানকী! তুমি কি জানো না অসৎ বুদ্ধি সম্পন্ন মানব কত কিছুই কুচিন্তা করে। নারীদের চরিত্রে বৃথা সন্দেহ করা ইহাদিগের অভ্যাস । তাহারা পর নারীতে মজে, কিন্তু তবুও নারীদের সন্দেহ করে। যাহাতে ইহারা তোমার চরিত্রে সন্দেহ না করে, তাহার জন্যই এই পরীক্ষা । আগামীতে বহু নারীকে এমন সন্দেহ করা হবে। কিন্তু সেই সকল নারী তোমার ন্যায় তেজস্বী সম্পন্না হয়ে নিজ সতী ধর্মের পরিচয় দেবে। সতী নারীর সতীত্ব প্রমানের জন্য দেবতাদের আগমনের দরকার নেই। সতী নারীর ধৈর্য, সহনশীলতা , পতিব্রতা ধর্মই তাঁর সতীত্বের পরিচয় । কোন নারীকে যেনো এভাবে অগ্নিপরীক্ষা দিতে না হয়- ইহাই কামনা করি।” ভগবান শ্রীরাম ও মাতা সীতার যুগল স্বরূপ দেখে বানরেরা সব সষ্টাঙ্গে ভূমিতে পড়ে প্রণাম করতে লাগলো। রাশি রাশি পুস্প অর্পণ করতে লাগলেন। রাম সীতার শ্রীচরণ পুস্পে ঢেকে গেলো। মনের আনন্দে বানরেরা “সিয়ারাম” কীর্তন করতে করতে রাম সীতাকে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন । এই যুগল রূপ মনোহর । আহা! কি অপূর্ব শোভা। এতদিন রাম সীতা অসম্পূর্ণ ছিলেন। আজ দুজনের মিলনে তাহা সম্পূর্ণ হল। নয়নে সেই মধুর মূর্তি যেনো চির বিরাজ করে। চোখের পলক পড়লেও বিরক্ত বোধ হয়। একদৃষ্টে নয়ন মেলে সেই নয়নাভিরাম অপূর্ব যুগল দর্শন করতেই মন চায় । এক ‘রাম’ নামে কি বা মাহাত্ম্য। ‘সীতারাম’ এই নাম জপেই মুক্তি। পতিতপাবন সীতারাম। সাধু, সন্ন্যাসী এই নামই দিবারাত্র জপ করে চলছেন । সীতামাতা তখন বানরদের আশীর্বাদ করে বললেন- “আমার পুত্রেরা! তোমরা সকলে এই যুদ্ধে বহু ক্লেশ সহ্য করেছো। তোমরা সুখে থাকো এই আশীর্বাদ করি। তোমাদিগের পুরস্কার দেওয়া হবে।” বিভীষণ তখন লঙ্কায় গমন করে বানরদের বহু বহু ধন রত্ন প্রদান করলেন । বিভীষণ সকলকে লঙ্কায় নিমন্ত্রণ করলেন । সকল বানরেরা লঙ্কায় প্রবেশ করলো। লঙ্কার আকাশচুম্বী স্বর্ণ মহল দেখে অবাক হল। তাতে হীরক, মুক্তা, মাণিক্য নক্ষত্রের ন্যায় আলোক বিকিরণ করছে । স্বর্ণ দ্যুতিতে উজ্জ্বল আলো চতুর্দিকে প্রকাশিত হয়েছে । এমনই ছিলো লঙ্কার প্রাসাদ গুলি । বিভীষণের নির্দেশে বানরদের সুগন্ধি তৈলে গাত্র লেপণ করা হল । সরোবরের মিষ্ট শীতল জলে লম্ফ ঝম্ফ করে স্নান করলো। সাড়ি সাড়ি বানর, মর্কট, লাঙুর , ভল্লুক স্নান করতে লাগলো । এইভাবে তাহাদের আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর দেখে কে? রাক্ষসেরাও যেনো পরিবর্তন হয়েছিলো । রাক্ষসেরা আর বানরেরা যেনো একে অপরের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো । যে সকল রাক্ষসেরা অধর্ম ত্যাগ করেনি তারা বিভিন্ন বনে জঙ্গলে পলায়ন করলো। কেউ কেউ আবার মথুরায় রাবণের মিত্র লবণ অসুরের রাজ্যে চলে গেলো ।

স্নান করি পরে সবে বিচিত্র বসন ।
গলায় পুস্পের মালা নানা আভরণ ।।
লঙ্কার সামগ্রী যত ভুবনের সার ।
রাজার আজ্ঞায় দ্রব্য আনে ভারে ভার ।।
অপূর্ব সে ভক্ষ্য দ্রব্য দিব্যনারী তায় ।
স্বর্ণথালে পরিবেষে বানরেরা খায় ।।
পাকা কাঁঠালের কোষ সবে খায় চুষি ।
ক্ষীর- লাড়ু পাঁপড় মোদক রাশি রাশি ।।
মধু পিয়ে কপিগণ ভরি স্বর্ণ – গাড়ু ।
গাল ভরি কপিগণ খায় ঝাললাড়ু ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

বানরেরা সব ভোজন করলেন । তাই শুনে ভগবান শ্রীরাম খুবুই প্রীত হলেন । বিভীষণকে অনেক ধন্য ধন্য করলেন । এবার বাসায়, আত্মীয় পরিজনদের কাছে ফিরবার পালা। ঠিক হল, ভগবান শ্রীরাম যেদিন অযোধ্যা যাত্রা করবেন, তার পূর্বেই সকলে লঙ্কা থেকে চলে যাবেন । খাওয়া দাওয়া করে উদর ফুলিয়ে বানরেরা সব শয়ন করলো। সুখেতে নিদ্রা দিয়ে নিশি যাপন করলো। ভগবান শ্রীরাম, সীতা , লক্ষ্মণ কেবল বনজ ফলমূল গ্রহণ করলেন পদ্মপাতায় । প্রভাত হতে বিভীষণ, ভগবান শ্রীরামকে নিয়ে লঙ্কার বিভিন্ন মন্দির দেখালেন । বিভীষণ বললেন- “প্রভু! এবার আমরা আপনার সহিত অযোধ্যায় গমন করবো। প্রভু একটি অনুরোধ আছে। বানরেরা প্রস্থান করবার পর আপনি সেই সেঁতু ভঙ্গ করবেন। নচেৎ লঙ্কায় যে কেহ সহজে চলে আসবে। হতে পারে লবণ অসুর লঙ্কা আক্রমণ করে। কারণ কিছু রাক্ষসেরা এখন মথুরায় লবণ অসুরের কাছে চলে গেছে। তারা নিশ্চয়ই লবণ অসুরকে লঙ্কা আক্রমণের জন্য উৎসাহিত করছে।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “আগামী কার্ত্তিকের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে আমার চতুর্দশ বৎসর বনবাস সমাপন হচ্ছে। আমাকে যেভাবেই হোক, কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথির মধ্যেই অযোধ্যা পৌছাতে হবে । আমার ভ্রাতা ভরত প্রতীক্ষা করছে । না জানি বিলম্ব হলে সে কোন অনর্থ না করে ফেলে।” সুগ্রীব, অঙ্গদ, নল, নীল, হনুমান, জাম্বুবান এঁনারা প্রভু শ্রীরামের সাথে অযোধ্যা যেতে চাইলেন। ভগবান রাজী হলেন । ভগবান শ্রীরাম বললেন- “আমাকে আরোও একটি কাজ করতে হবে। রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ পুত্র। তাঁহাকে বধ করে আমার ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়েছে। আমি পুনঃ রামেশ্বরে শিব পূজো করে এই ব্রহ্মহত্যার পাপ নিবারণ করবো।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger