সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৩৮)


দেবতাবৃন্দ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞেস করছিলেন , “হে প্রজাপতি! দয়া করে মহীরাবণের সম্বন্ধে বলুন। কেনই সে এত শক্তিশালী?” ব্রহ্মা বললেন- “সুরবৃন্দ! বহু পূর্বে শত্রুধনু নামক এক গন্ধর্ব ছিলো। সে ছিলো ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত । সে ভক্তিতে তন্ময় হয়ে বৈকুণ্ঠে ভগবানের সামনে নৃত্যগীত করতো। তাহার প্রতি ভগবান হরিও তুষ্ট ছিলেন । একদা অষ্টবক্র মুনি ভগবানকে দর্শন করতে এসেছিলেন । প্রতিবন্ধী অষ্টবক্র মুনিকে দেখে শত্রুধনু হাস্য উপহাস করে। এতে অষ্টবক্র কুপিত হয়ে সেই গন্ধর্বকে অভিশাপ প্রদান করে যে সে রাক্ষস হয়ে জন্মাবে। শারীরিক প্রতিবন্ধক নিয়ে হাস্য উপহাস করা আসুরিক লক্ষণ । গন্ধর্ব শত্রুধনু ক্ষমা প্রার্থনা চাইলে মুনি বলেন যে রাক্ষস কুলে জন্মালেও মহামায়া তার ওপর সদয় থাকবেন । অবশেষে ভগবান বিষ্ণু রাক্ষস ধ্বংস করতে নর রূপে আবির্ভূত হবেন। তাঁরই কোন ভক্ত শিরোচ্ছেদ করে তাহাকে মুক্তি দেবেন।” এই ছিলো মহীরাবণের পূর্ব পরিচয় । গভীর নিশি উপস্থিত । মহীরাবণ পূজা শেষ করে রাম লক্ষ্মণ কে এনে হাঁড়িকাঠের সামনে উপস্থিত করলেন । রক্তবস্ত্র, রক্ততিলক ও রুদ্রাক্ষে ভূষিত আলো অন্ধকারময় পাতালভৈরবীর মন্দিরে মহীরাবণের চেহারা অতি ভয়ঙ্কর রূপ বোধ হচ্ছিল্ল। দেবীর মূর্তির পেছনে বসে হনুমান অপেক্ষা করছিলেন । মহীরাবণ বলল- “রাম লক্ষ্মণ! তোমাদের অসীম সৌভাগ্য যে মহামায়ার সেবায় নিয়োজিত হচ্ছ। সষ্টাঙ্গে হাঁড়িকাঠে মাথা রেখে মহামায়াকে প্রণাম করো।” ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ বললেন- “অবশ্যই! কিন্তু একটি সমস্যা আছে। আমরা অযোধ্যার রাজপুত্র। আমাদের পিতা শক্তিশালী নৃপতি ছিলেন। সকলে আমাদিগকে প্রণাম করতো। বনবাসে আসলেও বানরেরা আমাদের প্রণাম করতো। কদাপি আমরা কাহাকেও প্রণাম করিনি । কিভাবে প্রণাম করতে হয়- জানিও না। যদি দেখিয়ে দিবেন, তাহলে বুঝবো।” মহীরাবণ হাস্য করে বলল- “এই ব্যাপার ! বেশ আমি দেখিয়ে দিচ্ছি প্রণাম করার বিঁধি!” এই বলে মহীরাবণ হাস্য করে ‘জয় মা’ বলে হাঁড়িকাঠে মাথা রেখে প্রণাম করতে নিলেন। তখুনি দেবীর মূর্তির পেছন থেকে হনুমান লম্ফ দিয়ে বের হলেন ।



হনুমান এসেই প্রথমে হাঁড়িকাঠের শিক আটকে দিলেন। চোখের পলকে দেবীর হস্ত থেকে খড়্গ নিয়ে এককোপে মহীরাবনের শিরোচ্ছেদ করলেন । মহীরাবণের মুণ্ড গড়িয়ে দেবীর চরণে চলে গেলো। দেবীর মূর্তি দেখে মনে হল, তিঁনি খুবুই প্রীতা হয়ে প্রসন্ন হয়ে হাসছেন । দেবী যেনো মহীরাবণের বলি গ্রহণ করলেন । মহীরাবনের রক্তে ভেসে গেলো মন্দির । মহীরাবণের অন্ত হল । হনুমান তখন শ্রীরাম ও লক্ষ্মণের হস্তের বাঁধন খুলে দিলেন । রাক্ষসেরা রে রে করে তেরে আসলো। হনুমানের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ হল। লণ্ডভণ্ড হল পূজাগৃহ। প্রদীপদানি উলটে আগুন ধরল। গদা দিয়ে রাক্ষসদের পিটিয়ে মারলো মারুতি। কাউকে ল্যাজে পেঁচিয়ে ভূমিতে আছরে মারলো । ্কাউকে তুলে আছার দিলো । কাউকে পদতলে পিষ্ট করলো। এই সময় সেই বানর সেনাপতি মকরধ্বজ ছুঁটে আসলো গদা নিয়ে মকরধ্বজের সাথে হনুমানের যুদ্ধ বাঁধলো। কেউ যেনো কাউকে হারাতে পারে না। উভয়ে উভয়কে কিল চর লাথি ঘুষি দিতে লাগলো। উভয়ের গাত্র থেকে রক্ত বের হল। গদার সংঘর্ষে যেনো পাতাল পুরী কেঁপে উঠলো। স্তম্ভাদি সকল ভেঙ্গে পড়তে থাকলো। কে এই বীর! হনুমান ভাবতে লাগলো। এমন সময় এক মতস্যকন্যা এসে বলল- “পুত্র রোষো! পিতার সাথে কেন যুদ্ধ করছ ?” এই শুনে হনুমান চমকে উঠলো। সে বলল- “আপনি মিথ্যা বলছেন! আমি ব্রহ্মচারী। আমি বিবাহ করিনি। কেন এ আমার পুত্র হবে?” মতস্যকন্যা বলল- “পবনপুত্র! এ আপনারই পুত্র। মনে আছে মাতা সীতার আদেশে আপনি পুচ্ছের অগ্নি নির্বাপিত করবার জন্য সমুদ্রে লাঙুল নিমজ্জিত করেছিলেন ? সে সময় আপনার লাঙুলের বারি ধারা আমার উদরে প্রবেশ করে। আমি গর্ভবতী হই । এ আপনার পুত্র! রাক্ষস দের সাথে নিবাস করতে করতে আমিও রাক্ষসের গুণ পেয়েছি। রাক্ষস, অসুরদের মধ্যে ভূমিষ্ঠ শিশু মানবশিশুর থেকেও অনেক শীঘ্র বয়োঃবৃদ্ধি ঘটে। রাক্ষস গুণের ফলে এই মকরধ্বজ রাক্ষসদের সেবা করছে।” এই বলে মতস্যকন্যা বললেন- “পুত্র মকরধ্বজ! তুমি ধর্মের পক্ষ অবলম্বন করো। অধার্মিক দের কেহই রক্ষা করেন না। নিজেই ত প্রমান পেলে। দেবী অম্বিকা কি মহীরাবণকে বাঁচিয়েছেন ? পুত্র! রাক্ষসেরা কদাপি তোমার আপন জন নয়। লঙ্কায় যুদ্ধে রাক্ষসেরা বহু বানরকে হত্যা করেছে। অতএব পুত্র তুমি স্বজাতির পক্ষ অবলম্বন করে ধর্মের মার্গ অবলম্বন করো।”


হনুমান কপালে হাত দিয়ে বসলো। বসে রোদন করে বলতে লাগলো- “এই পৃথিবী আমাকে ব্রহ্মচারী রূপে জানে। আজ আমি কলঙ্কের ভাগী হলাম । আমি এই মুখ কিভাবে দেখাবো? আমার সমস্ত সম্মান ধূলিসাৎ হয়েছে। এ আমি কি পাপ করলাম।” ভগবান শ্রীরাম তখন হনুমানের মস্তকে হস্ত বুলিয়ে বললেন- “হনুমান! রোদন করো না। যাহা হয় তাহার পেছনে কোন শুভ উদ্দেশ্য থাকে। তুমি স্বেচ্ছায় নারীসঙ্গ করো নি। সুতরাং তোমার বিন্দুমাত্র দোষ নেই। নিজেকে অপরাধী ভেবো না। তাহলে তোমার পুত্র মকরধ্বজ অত্যন্ত দুঃখী হবে। তুমি বরং পুত্রকে আলিঙ্গন করে স্নেহ আশীর্বাদ প্রদান করো।” মকরধ্বজ এসে তখন হনুমানের চরণে প্রণাম করতে নিলে হনুমান বলল- “আমাকে নয়। বরং প্রভুকে অগ্রে প্রণাম করো।” মকরধ্বজ গিয়ে ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে প্রণাম করলে তাঁহারা আশীর্বাদ দিলেন- “বীর প্রতাপী হয়ে পাতাল পুরী শাসন করো। সদা ধর্ম পথে থেকো।” এরপর হনুমানকে প্রনাম করলেন মকরধ্বজ । হনুমান , পুত্রকে বুকে জড়িয়ে স্নেহ আশীর্বাদ প্রদান করলেন । এই সময় অহীরাবণ সেনা সমেত এলো। গর্জন করে বলতে লাগলো- “কোথায় সেই আমার পিতৃঘাতী মর্কট?” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “অহীরাবণ! দেখো পাপের পথ অবলম্বন করলে কি পরিণাম হয়। তুমি আর পাপ করো না। তোমার পিতাকেই দেখো, তাঁর কি পরিণাম হয়েছে। তোমার সাথে আমার শত্রুতা নেই। এসো আমাদের সহিত সখ্যতা স্থাপন করো।” অহীরাবণ ত মানলো না। হৈহৈ করে তেরে এলো। রাক্ষসেরা সব আসলো। হনুমান গদা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিমিষে অসংখ্য রাক্ষস বধ করলো। রাক্ষসদের দেহের স্তূপ জমল । এরপর অহীরাবণ যুদ্ধে এলো। হনুমানের সাথে প্রবল যুদ্ধ হল। এমন হাতাহাতি লড়াই হল, মনে হল গোটা পাতালপুরী বুঝি ভেঙ্গে পড়বে। অন্তিমে হনুমান , অহীরাবণকে তুলে আছার দিলো ভূমিতে। সেই আছারে অহীরাবণের মস্তক চূর্ণ হল। এইভাবে রাক্ষস পিতাপুত্রের অন্ত হল। ভগবান রামচন্দ্র বললেন- “পাতালপুরী এখন শূন্য। এখানে এখন শাসকের প্রয়োজন । মকরধ্বজ আজ থেকে পাতালপুরীর রাজা হবে।” এরপর বলা হয় পাতালভৈরবী দেবীর আদেশে হনুমান সেই দেবীর বিগ্রহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার যুগ্যাদা শক্তিপীঠে স্থাপন করেছিলেন । এই স্থানে দেবী সতীর দক্ষিণ চরণের অঙ্গুষ্ঠ পতিত হয়েছিলো । তবে মহীরাবণ পূজিত পাতালভৈরবী মূর্তি এখন আর এখানে নেই। এখানে এখন উগ্রচণ্ডী মূর্তিতে দেবীর পূজা হয়। বর্ধমান আসলে আপানার এই পীঠ দেখে যেতে পারেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger