সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৬২)

ভগবান শ্রীরাম ভীর ঠেলে মাতা কৌশল্যা ও সুমিত্রামায়ের কাছে গেলেন । সেখানে শত্রুঘ্ন কে আলিঙ্গন করলেন। শত্রুঘ্ন শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ ও সীতাদেবীকে প্রনাম করলেন । ভগবান শ্রীরাম মাতা কৈকয়ীকে খুঁজতে লাগলেন । কিন্তু মাতা কৈকয়ীকে দেখতে পেলেন না। বললেন- “আমার মাতা কৈকয়ীদেবী কোথায়?” শুনে সকলে স্তম্ভিত হলেন। যাঁর জন্য বনবাস- তাঁকেই খুঁজছেন শ্রীরাম । ভরত বলল- “অগ্রজ! কৈকয়ী নামক আমাদের কোন জননী ছিল ইহা ভুলে যান। আমি নিজেকে মাতা কৌশল্যা ও মাতা সুমিত্রার পুত্র মনে করি। আসুন অগ্রজ, দুই মায়ের আশীর্বাদ আমরা চার ভ্রাতা মিলে গ্রহণ করি।” শ্রীরাম বললেন- “একি ভ্রাতা! পুত্র হয়ে মাতাকে ভুলে যাবো ? সেই মাতাই আমাকে ছোটোকাল হতে লালন পালন করেছেন, খাওয়াতেন, নাওয়াতেন, ঘুম পাড়াতেন । মাতাকে ভুলে যাওয়া সবচেয়ে বড় অধর্ম। কোথায় আমার মাতা? তিনি আমাকে বরণ না করলে আমি রাজমহলে প্রবেশ করবো না। পুনঃ অরণ্যে চলে যাবো।” রানী কৈকয়ীকে তখন ডেকে আনা হল। রানী কৈকয়ী এসে বললেন- “পুত্র! আমি তোমার জীবন কষ্টে ভরে দিয়েছি। আমার মতোন অশুভ নারীকে এই শুভ সময়ে ডেকে আনা কেন?” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মাতা! এ আপনি কিরূপ বাক্য বলছেন ? মা কি কখনো পুত্রের কাছে অশুভ হতে পারে ? মা পুত্রের কাছে মমতাময়ী , করুণাময়ী। মায়ের ক্রোড়েই সর্বোত্তম শান্তি । মা তুমি কি এখনও তোমার এই পুত্রকে দূরে নিক্ষেপ করবে? চতুর্দশ বৎসর তোমার আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলাম । এখনও কি বঞ্চিত থাকবো ? মায়ের আদেশ পালন করা পুত্রের ধর্ম । আমি ত তাই করেছি।” এই বলে শ্রীরাম ও সীতাদেবী প্রথমে কৈকয়ীকে প্রণাম করলেন। কৈকয়ীর চোখ ফেটে যেনো জল ঝরে পড়তে লাগলো। শ্রীরামের কপালে চুম্বন করে অনেক আদর করলেন, বরণ করলেন। অতঃ মাতা কৌশল্যা ও মাতা সুমিত্রাদেবী বরণ করলেন ।

ভগবান শ্রীরাম তখন ভরতকে বললেন- “ভ্রাতা ! মাতা কৈকয়ীর আশীর্বাদেই আজ রাবণ বধের যশ প্রাপ্তি করেছি। মায়ের সাথে আমার বহু পূর্বে এই চুক্তি হয়েছিলো। যখন আমি বনে যেতে ওনার কাছে আদেশ চাই, শেষ সময়ে উনি সেই আদেশ তুলে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি দেই নি। কারণ অযোধ্যায় বসে সুদূর দক্ষিণে রাক্ষস বধ করা সম্ভব ছিলো না। রাক্ষস বধ করতে হলে তাদের মাঝে যাওয়া উচিৎ ছিলো। মাতা কৈকয়ী আমাকে সেই যশ লাভের পথ দেখিয়েছিলেন । এই রহস্য কেউ জানে না। মাতা কৈকয়ী কি দুঃখ মনে চেপে চতুর্দশ বৎসর কাটিয়েছেন- ইহা অনুভব করো। মাতাকে সম্মান করো। আজ সমস্ত দক্ষিণ রাক্ষস আতঙ্ক মুক্ত হয়েছে। লঙ্কায় ধর্মরাজ্য স্থাপন হয়েছে। এই সব শুভ কর্মের পথ মাতা কৈকয়ী উন্মোচন করেছেন।” এই শুনে দুঃখে ভরতের চোখে জল আসলো। না জানি এই চতুর্দশ বৎসর মাতাকে কত না অপমান করেছে, কত কটু কথা বলেছে। কৈকয়ীর চরণে পড়ে ভরত অনেক ক্ষমা প্রার্থনা চাইলো। কৈকয়ী ভরতকে অনেক আদর, স্নেহ করলেন। তারপর কৈকয়ী বললেন- “পুত্র রাম! এবার তুমি অযোধ্যার রাজা হও- ইহা আমার ইচ্ছা। আমার পুত্র রাম অযোধ্যার রাজা হয়ে অযোধ্যার সেবা করুক- ইহাই আমার ইচ্ছা।” এরপর সকলের সাথে মিলিত হলেন শ্রীরাম, জানকী দেবী ও লক্ষ্মণ । বশিষ্ঠ বললেন- “তোমরা এখন আর বনবাসী নও । হে শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ, ভরত ! তোমরা সরয়ূ নদীতে স্নান করে জটা, বাকল ত্যাগ করে রাজবেশ ধারণ করো।” শ্রীরাম, ভরত ও লক্ষ্মণ ও সীতাদেবী সেই আদেশ পালন করে সরয়ূ নদীতে উত্তম তৈল, সুগন্ধি দ্বারা স্নান করে জটা, বাকল, রুদ্রাক্ষ , গেরুয়া বস্ত্র ত্যাগ করে উত্তম রাজ বেশ, মণি মুক্তা স্বর্ণ খচিত বিবিধ অলঙ্কার, চূড়া ধারণ করলেন । সীতাদেবী বামে করে রামচন্দ্র অবস্থান করলেন। ভগবান শ্রীরামের ডানে লক্ষ্মণ অধিষ্ঠান করলেন। আর হনুমান ভূমিতে নতজানু হয়ে রামসীতার বন্দনা করতে লাগলেন । এই দিব্য মূর্তি দেখে সকলে ধন্য ধন্য করে পূজা করলেন । অযোধ্যা যেনো সাজানো হল । ভরত বললেন- “আজ কার্ত্তিকের অমাবস্যা তিথি। আজ সমগ্র অযোধ্যা প্রদীপ দিয়ে সাজানো হবে। অগ্রজ শ্রীরামের আগমনে অযোধ্যা থেকে সকল অন্ধকার দূর হয়েছে। আজ প্রদীপের আলোয় অযোধ্যার সর্বত্র ঝলমল করবে। কোন স্থান যেনো আঁধার না থাকে।”

শ্রীরাম, ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন চারভ্রাতা একসাথে আহারে বসলেন। মাতা কৈকয়ীদেবী পুত্র রামকে স্নেহ করে অনেক সুস্বাদু বাঞ্জন পরিবেশন করলেন । তিন মাতার সেই বাল্যকালের স্মৃতি মনে হতে লাগলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই উৎসব আরম্ভ হল অযোধ্যায় । সব বাড়ীতে কদলী বৃক্ষ, মঙ্গল কলস, নেতের পতাকা শোভিত । প্রদীপ দিয়ে সাজানো হল বাড়ী- উঠান- প্রাঙ্গন , মূল প্রবেশ দ্বার। ঝোপ ঝাড়- বাগান প্রদীপের আলোক মালায় সেজে উঠলো। বিবিধ বাহারী প্রদীপে সাজানো হল। ঝলমল করে উঠলো সমগ্র অযোধ্যা। রঙ্গলী বানিয়ে প্রদীপ দিয়ে সাজানো হল। লোকেরা নব বস্ত্র পরিধান করে রাজপথে নেমে এলো। একে অপরকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল। নানা স্থানে গীত- সঙ্গীত- নৃত্য হল। শ্রীরাম সকলের নয়নের মণি। আজ যেনো অন্ধজন চোখ পেয়েছে- এমন মনে হল। বিবিধ পটকা ফাটানো হল। হাউই বাজি, ফুলঝুড়ি সব রঙ্গীন হয়ে আলোয় ভরিয়ে দিলো। এই দিনকেই আমরা “দীপাবলি” বলি। এই দিন শ্রীরামের অযোধ্যা গমনের আনন্দ কে স্মরণ করা হয় । এই দিন হল অন্ধকারের উপর আলোর বিজয়ের দিন। আমরা বাঙ্গালীরা দীপাবলিতে মা কালীর পূজা করি। কিন্তু সমগ্র ভারতে দীপাবলির দিন লক্ষ্মী পূজা করা হয়। বাঙ্গালীরা কোজাগোরী পূর্ণিমাতে লক্ষ্মী পূজো করেন যদিও। কিন্তু অবাঙ্গালী হিন্দুরা দীপাবলির দিন মাতা লক্ষ্মী, সিদ্ধিদাতা গণেশ ও মা সরস্বতী দেবীর পূজা করেন । মাতা লক্ষ্মী ধন ঐশ্বর্য প্রদান করেন, শ্রী গণেশ ধন সম্পদ রক্ষার বুদ্ধি সহ শক্তি প্রদান করে বিঘ্ননাশ করেন, মা সরস্বতী দেবী সেই ধন ও শক্তিকে শুভ কর্মে নিয়োগ করবার জন্য বিদ্যা প্রদান করেন । এইজন্যই দীপাবলিতে এঁনাদের একত্র পূজা করা হয় । ভগবান শ্রীরাম ও মাতা সীতাদেবী উভয়ে বহুতল মহল থেকে সমগ্র প্রজাদের আনন্দ, নৃত্য, গীত দেখে অতি প্রসন্ন হলেন । প্রজারা নাচছে , গাইছে- বিবিধ আতসবাজি পোড়াচ্ছে। সমগ্র অযোধ্যায় যেনো আনন্দের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে । শ্রীরামের সাথে আগত অতিথি বন্ধুরা এই আনন্দ উল্লাসে সামিল হলেন।

( লঙ্কাকাণ্ড সমাপ্ত )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger