সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –১৭)

লক্ষ্মণ পরাজিত হয়ে ফিরে গেলো। শ্রীরাম দেখলেন লক্ষ্মণ ফিরে আসছে। শ্রীরামচন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন সকল কিছু। লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! আপনার নাম নিয়ে হনুমান এমন অভেদ্য পাঁচির নির্মাণ করেছে, যে কোন অস্ত্রই তাহা ভেদ করতে পারছে না । আপনার নাম কে কি আর ধ্বংস করা যায় ? ‘রাম’ নামের সেই পাঁচির যাহা কোন কিছুতেই ভেদ হবে না। এ এক সুরক্ষিত বর্ম ।” মহর্ষি বিশ্বামিত্র তখন রেগে হন্তদন্ত হয়ে ছুট এলেন। বললেন- “বন্ধ করো রাম তোমার এই দ্বিচারিতা। একদিকে তুমি গুরুকে কথা দিলে যে রাজা শকুন্তের মস্তক এনে দেবে, অপরদিকে আবার নিজের নামে ডঙ্কা বাজিয়ে চলছ? তোমার নাম নিয়ে হনুমান সেই শকুন্তের জীবন রক্ষা করছে।” বিশ্বামিত্র মুনি খুবুই ক্ষুব্ধ ছিলেন । ক্রোধে মুখমণ্ডল আরক্তিম হয়েছিলো। ভগবান শ্রীরাম করজোড়ে বললেন- “গুরুদেব আপনি শান্ত হোন। আমি ইহা অনুমান করতে পারিনি। আজ সূর্যাস্তের আগে রাজা শকুন্তের মস্তক আপনার চরণে থাকবে, নচেৎ আমি অগ্নিপ্রবেশ করবো- ইহা দাশরথি রামের প্রতিজ্ঞা। এক গুরুর কাছে শিষ্যের প্রতিজ্ঞা।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম নিজেই যুদ্ধে গেলেন । হস্তে ধনুর্বাণ, তূনে নানা দিব্যাস্ত্র নিলেন। বর্ম- কবচ পড়ে রথে উঠলেন । সারথি রথ চালনা করলেন । সাথে দশ অক্ষৌহিণী সেনা চলল । গজ, অশ্ব, রথ, পদাতিক সেনারা গেলো। হনুমান দূর থেকে দেখলেন ভগবান শ্রীরাম আসছেন । গজের পদচালনায় ভূমি থরথর কাঁপতে লাগলো। অশ্বের আওয়াজে চতুর্দিকে আচ্ছাদিত হল, পদাতিক সেনার কোলাহল শোনা গেলো । হনুমান জানালো যে এবার স্বয়ং প্রভু শ্রীরাম আসছেন । শ্রীরামের আগমনের সংবাদ শুনে রাজা শকুন্তের ভয়ে হাত পা শুকিয়ে গেলো। চোখে অন্ধকার দেখলেন। এবার বুঝি আর নিস্তার নেই । ঠিক মস্তক কাটা যাবে ।

হনুমান বলল- “রাজা শকুন্ত এবার ‘জয় সীতারাম- রাম রাম রাম – জয় সীতারাম’ এই নাম উচ্চ কণ্ঠে জপ করো। ভুলেও কিন্তু জপ ছেড়ো না। খর- দূষণ- বিরাধ- কুম্ভকর্ণ- রাবণের অন্তিম অবস্থা শুনেছোই ত, তোমারও কিন্তু সেই দশা হবে। একমাত্র ‘রাম’ নাম জপেই মৃত্যুভয় দূর হয়। যে ‘রাম’ নাম জপে যম তাহার শত ক্রোশ দূর দিয়ে যেতেও সাহস পান না। তাই অবিরত নাম কীর্তন করো।” রাজা শকুন্ত জোরে জোরে ‘জয় সীতারাম- রাম রাম রাম – জয় সীতারাম’ নাম জপ আরম্ভ করলো। ভগবান শ্রীরাম এসে বললেন- “হনুমান! তুমি আমার বিরুদ্ধাচরণ করছ? জানো না আমি রাজা শকুন্তের মস্তক নিয়ে গুরুদেব বিশ্বামিত্রর চরণে রাখবার প্রতিজ্ঞা করেছি! তুমি সড়ে যাও।” হনুমান বলল- “প্রভু! রাজা শকুন্তকে আমার মাতা অঞ্জনাদেবী সুরক্ষা করবার শপথ দিয়েছেন। আমি মায়ের আজ্ঞা পালন করছি। প্রভু আপনি নিজেই মায়ের আদেশ মেনে বনে গমন করেছিলেন। আপনার সেবক হয়ে আমি কিভাবে মায়ের আদেশ অমান্য করি?” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “তুমি যেমন তোমার মায়ের আদেশ মান্য করছ, আমিও আমার গুরুর আদেশ পালন করছি। তোমাকে বন্দী করে আমি শকুন্তের মস্তক নিয়ে যাবো।” এই বলে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র সেনাদের আদেশ দিলেন। হৈ হৈ করে দশ অক্ষৌহিণী সেনা ছুটলো। কিন্তু নানা অস্ত্র দিয়েও রাম নামের প্রাঁচীর অতিক্রম করতে পারলো না। কত শত অস্ত্র বর্ষণ করলেও সেই প্রাচীর ভাঙ্গলো না । হস্তীগুলি গিয়েও ভাঙ্গতে পারলো না। সকল অস্ত্র গুলি চূর্ণ হল। ভগবান শ্রীরাম সব দেখতে লাগলেন । ব্রহ্মা তখন নারদ মুনিকে বললেন- “রাম হতে ‘রামনাম’ শ্রেষ্ঠ পুত্র। অবিরত এই নাম জপে কোন আঘাতই স্পর্শ করতে পারে না।” ভগবান শ্রীরাম তখন দিব্যাস্ত্র চালনা করতে লাগলেন । দিব্যাস্ত্র ঝঙ্কারে ত্রিলোক কম্প হল।

উল্কাবাণ , কালপাশ, মণিবাণ, অগ্নিবান, মরুত বাণ, যম বাণ, গন্ধর্ব বাণ, যক্ষ বাণ, সূর্য বান, অর্ধচন্দ্র বাণ, পর্বত বান, নাগ বাণ, গরুর বান ছুড়লেন । এই সকল ঘাতক অস্ত্র গিয়ে রাম নামের প্রাচীরে ঠেকতেই ফিরে চলে গেলো। কোন বাণ সেই প্রাচীর ভঙ্গ করতে পারলো না। রাজা শকুন্ত তখন কেবল সেই নাম জপ করে যাচ্ছেন । ভগবান শ্রীরাম এরপর চক্রবাণ নিক্ষেপ করলেন, বজ্র বাণ নিক্ষেপ করলেন। প্রবল শক্তিমান ঐন্দ্রাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন – সব বাণের এক পরিণতি হল। বিফল হয়ে শ্রীরামের তূনে ফিরে গেলো। বায়ব্য বাণ দ্বারা কুম্ভকর্ণকে ধরাশায়ী করেছিলেন, সেই বাণ নিক্ষেপ করলেন। সেই বাণ ফিরে এলো। যেই বাণে বালি বধ করেছিলেন সেই ঐষিক বাণ নিক্ষেপ করলেন, কিন্তু তাও ফিরে এলো। শ্রীরাম তখন ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন । ব্রহ্মাস্ত্রের প্রভাবে প্রলয় ঝড় উঠলো, যেনো সৃষ্টি নাশ হবে। ব্রহ্মাস্ত্র ফিরে এসে পুস্প হয়ে শ্রীরামের চরণে ঝরে পড়লো। তখন শ্রীরাম ভয়ানক পাশুপাত নিক্ষেপ করলেন। সেই ধ্বংসকারী অস্ত্র বিফল হয়ে এসে পুস্পমাল্য হয়ে ভগবান শ্রীরামের গলে শোভা পেলো। অন্তিমে রামবাণ নিক্ষেপ করলেন, তাহাও বিফল হল। তখন সূর্য প্রায় অস্তগামী। ভগবান শ্রীরাম ভাবলেন সফল হলেন না, সুতরাং অগ্নিপ্রবেশ করবেন। হনুমান রাজা শকুন্তকে বললেন- “শীঘ্র গিয়ে মহর্ষি বিশ্বামিত্রর চরণে মস্তক রেখে ক্ষমা চাও।” রাজা শকুন্ত তখন মহর্ষি বিশ্বামিত্রর চরণে মস্তক রেখে বললেন- “মহর্ষি সূর্যাস্তের আগে এই আমার মস্তক আপনার চরণে আছে। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। অজান্তে কৃত অপরাধ ক্ষমা করুন। এমন ভুল কদাপি করবো না।” মহর্ষি বিশ্বামিত্র দেখলেন যে সূর্যাস্তের কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে। রাজা শকুন্ত চরণে মস্তক রেখেছেন। বিশ্বামিত্র তখন ভগবান শ্রীরামকে বললেন- “হে রাম! আমি সমস্ত আদেশ তুলে নিলাম। তোমার অগ্নিপ্রবেশের দরকার নেই, কারণ রাজা শকুন্তের মস্তক আমার চরণেই আছে। আমি রাজা শকুন্তকে ক্ষমা করে দিলাম।” মহর্ষি বিশ্বামিত্র তখন রাজা শকুন্তকে বললেন- “আর যেনো সাধু সন্তদের দেখে অবহেলা করো না। তাহাদিগকে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করবে।”

( ক্রমশঃ ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger