সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –৪)

রাজ্যাভিষেক সমাপন হল। তিন মাতা অপার আনন্দে খুশী। অযোধ্যায় সুখ ও সমৃদ্ধি উপচে পড়ছিলো। যথাসময়ে প্রয়োজন অনুসারে বৃষ্টিপাত হল। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি বা খরা হল না। মাঠে মাঠে সোনার ফসল উপচে পড়লো। রাজ্যে যখন মাতা লক্ষ্মী অবস্থান করছেন, তখন ধন সম্পদের শ্রীবৃদ্ধি হল । প্রজারা সুখে দিন যাপন করতে লাগলো। সর্বত্র কেবল আনন্দ। বৃক্ষ গুলি বারোমাস ফুলে ফলে শোভিত হল। কোন অশান্তি নেই, মারামারি নেই। সর্বত্র পূজা পাঠ হতে লাগলো আর শান্তিতে ছেয়ে গেলো। একদিন মাতা সীতা হনুমানকে বললেন- “পুত্র হনুমান! তুমি ত কিছুই নিলে না। তোমাকে কিছু প্রদান করতে পারলে আমি খুশী হবো। বল পুত্র কি চাও?” হনুমান অযোধ্যাতেই নিবাস করছিলেন । হনুমান বলল- “মাতা! আপনি আর প্রভু একত্রে যুগল রূপে আমার চোখের মণিতে অবস্থিত আছেন- এই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হয়েছে আমার- এর উপর আর কিছু চাওয়া ত মূর্খতা। কারণ ইহাই সবথেকে বড় সম্পদ। তবুও মাতা একটি জিনিষ চাইবো। আপনার রন্ধন খেতে বড়ই সাধ হয়েছে। একদিন আপনি স্বহস্তে রন্ধন করে আমাকে আহার প্রদান করুন।” মাতা সীতা হাস্যমুখে বললেন- “তাই হবে পুত্র!” একদিনের কথা। মাতা সীতা নিজেই রন্ধনশালায় গমন করলেন। দাসীদের সহিত রন্ধন করতে বসলেন। পলান্ন , হালুয়া , রসা, পুরি, খাজা, নিমকি, মোদক, মিষ্টান্ন, ক্ষীর ও বিবিধ মিষ্টি প্রস্তুত করতে লাগলেন । হনুমানকে পূর্বে বলে দেওয়া বলেছিল আজ দ্বিপ্রহরে অন্ন গ্রহণ করতে । হনুমান ত সেই খুশী । মাতা সীতাদেবী নিজেই রন্ধন আরম্ভ করলেন। রন্ধনের সুগন্ধে চতুর্দিক আমোদিত করে তুলল। একে একে রান্না করে সব তুলে রাখলেন । এরপর স্নানাদি সেড়ে পরিবেশন করতে আসলেন। হনুমান মহা আনন্দে আসনে উপবেশন করলেন। দাসীরা এসে স্বর্ণ থালা, স্বর্ণ পাত্র দিয়ে গেলো। জল পাত্রে কর্পূর মিশানো শীতল জল রেখে গেলো। মাতা সীতা দেবী সকল ব্যাঞ্জন দিয়ে স্বর্ণ থালা পরিপূর্ণ করলেন ।

হনুমান দেখলেন সারি সারি বাটিতে নানা ব্যাঞ্জন। একপাশে ঝুড়িতে নানান ফলমূল , কন্দ রাখা হল । ধূমায়িত গরম গরম নানা ব্যাঞ্জন দেখে হনুমান বড়ই খুশী হলেন । দাসীরা কেহ কেহ পাখা দুলাতে লাগলেন । হনুমান বলল- “অহ! রন্ধনের কি অপূর্ব গন্ধ। স্বয়ং মায়ের হস্তের রন্ধনে যেনো মাতৃত্ব স্নেহ জড়ানো। মাতা আমি আজ অধিক পরিমাণে ভোজন করবো।” মাতা সীতাদেবী হাস্য করে বললেন- “ অবশ্যই পুত্র! তোমার যত মন চায় আহার করো। সংকোচ করো না। মায়ের কাছে সঙ্কোচ করতে নেই।” হনুমান হাত থেকে গদা রেখে আচমন, রাম স্মরণ না করেই গ্রেগ্রাসে খাওয়া আরম্ভ করলো। তালের আঁটির ন্যায় হস্তে পলান্ন ধারণ করে গপগপ করে নিমিষে সাবার করলো। তারপর পুরি মিষ্টান্ন, ক্ষীর, রসা সহিত গপগপ করে মুখে ফেলে চিবিয়ে খেতে লাগলো। হনুমানের আহার দেখে সকলে হাসতে থাকলো। মাতা সীতা বাৎসল্য বশত বললেন- “ধীরে ভোজন করো পুত্র! যত ইচ্ছে ভোজন করো।” একে একে পুরি শেষ হলে খাজা, নিমকি মুড়মুড় শব্দ করে চিবিয়ে ভোজন করলো। তার পর মোদক গুলি গ্রহণ করলেন। এরপর এক চুমুকে মিষ্টান্ন, ক্ষীরের বাটি সমাপ্ত করলো। মাতা সীতা পুনঃ সেই সকল আহার এনে দিলেন। হনুমান গ্রেগ্রাসে আহার করলেন । বললেন- “মাতা! থালায় অবশিষ্ট কিছুই নেই। ভোজোন প্রদান করো মাতা।” দাসীরা গিয়ে রন্ধনশালা থেকে খাবার এনে দিলেন। মাতা সীতাদেবী হাসতে হাসতে পরিবেশন করলেন। নিমিষে পলান্ন সমাপ্ত করলেন হনুমান। একটা দানাও পরে নেই। পুরী সকল যেনো চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলো হনুমানের মুখে । দেখতে দেখে নিমকি, খাজা সমাপন হল। পায়েস আর ক্ষীরের বাটি নিঃশেষে সমাপ্ত করে হনুমান বলল- “মাতঃ! উদর ভরে নি। আরোও দিন।” মাতা সীতাদেবীর আদেশে রন্ধনশালায় অবশিষ্ট যা ছিলো, তাই আনা হল। দেখতে দেখতে হনুমান সেগুলি খেয়ে বলল- “মাতা! পরিবেশন করুন। পাত্র শূন্য। মাতা আপনার রন্ধন মধুর। যত গ্রহণ করি- ততই যেনো ক্ষুধা বৃদ্ধি পাচ্ছে।” দাসীরা এসে জানালো- “দেবী! রন্ধনশালায় আর রন্ধন নেই। পুনঃ রন্ধন করতে হবে।” মাতা সীতাদেবী বললেন- “বাছা হনুমান! একটু অপেক্ষা করো। আমি পুনঃ আহার্য রন্ধন করে এনে দিচ্ছি।”

হনুমান বলল- “তাই হোক মাতা। আমি ততক্ষণ ফলমূল আহার করছি। শীঘ্র রন্ধন করুন মাতা। ক্ষুধায় আর অপেক্ষা করতে পারছি না।” সীতাদেবী পুনঃ রন্ধনশালায় প্রবেশ করে রান্না চাপালেন । হনুমান চোখের নিমিষে ফলের ঝুঁড়ি খালি করলেন। সব ফল উদরে গেলো। কেবল ছিলকা পড়ে থাকলো। হনুমান বলল- “মাতা! ক্ষুধায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখছি। শীঘ্র আহার আনুন।” সীতাদেবী তখন যা রান্না করেছিলেন অর্ধেক এনে দিলেন। চোখের নিমিষে হনুমান তাহা সাবার করে বলল- “মাতা পরিবেশন করুন।” সীতাদেবী তখন সব এনে দিলেন। হনুমান নিমিষে খেয়ে বললেন- “মাতা! আমার আরোও ক্ষুধা পাচ্ছে। কিছু এনে দিন।” সীতাদেবী আবার রান্না করলেন । রান্না করে সব কিছু দিয়ে দিলেন। হনুমান সব খেয়ে আরোও খাবার চাইলো। সীতাদেবী অবাক হলেন। ভাবলেন সামান্য ফলমূলেই যাহার উদর ভরে যায়- সে এত খাদ্য কিভাবে খাচ্ছে ? আবার রান্না করে নিয়ে আসতেই সব খেয়ে আরোও খাবার চাইলেন হনুমান । কয়েকবার এমন হল। দাসীরা বলল- “দেবী! এবার আটা, চাউল বাড়ন্ত! রান্নার কাষ্ঠ সমাপ্ত।” সীতাদেবী তখন কাঁচা গোদুগ্ধ দিলেন। হনুমান নিমিষে পান করে বললেন- “মা! আমার উদর তৃপ্ত হয় নি। আরোও দিন।” আরোও খাবার! সীতাদেবী ভয় পেয়ে শ্রীরামকে স্মরণ করলেন । ভগবান শ্রীরাম সব শুনে বললেন- “হে সীতা! আমার প্রসাদ না পেলে হনুমানের ক্ষুধা কদাপি নিবৃত্ত হবে না। আমার প্রসাদের এক কণা পেলেই তাঁর ক্ষুধা দূর হবে, তা না হলে গোটা ত্রিলোকের আহার গ্রহণেও তার উদর শান্ত হবে না । আজ সে আমাকে নিবেদন না করেই গ্রহণ আরম্ভ করেছে। তাই এই পরিস্থিতি । হে দেবী! আহারে তুলসী পত্র স্পর্শ হলে, তাহা আমার উদ্দেশেই নিবেদিত হয়। সেজন্য আমার ভক্তেরা সর্বদা আমার নৈবদ্যে তুলসী প্রদান করেন। তার পর সেই প্রসাদ হনুমান প্রাপ্তি করে। তুমি তুলসী সমেত পরিবেশন করো।” মাতা সীতা তখন একটি তুলসী পত্র আনলেন। দেখলেন রন্ধনশালায় একটি পুরি অবশিষ্ঠ আছে। তুলসী সমেত সেই পুরি হনুমানকে দিলেন । সেই পুরি আহার করতেই হনুমান ঢেঁকুড় তুললেন। বললেন- “মাতা! এবার আমার ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়েছে। মনে হয়েছে এত খেয়েছি যে চলতে ফিরতে পারবো না।” হস্তপদ ধৌত করে হনুমান তাম্বুল সেবা নিলেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger