সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –৩২)


শিবের অনুচর বাহিনীর কাছে অয্যোধ্যার সেনারা পরাস্ত হয়ে নাশ হতে লাগলো। শত্রুঘ্ন নিজেও ভগবান শিবের অনুচর দের সাথে পেরে উঠলো না । তখন হনুমান যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। গদা দিয়ে রে রে করে তেড়ে গিয়ে ভগবান শিবের অনুচরদের মেরে তাড়াতে লাগলেন। হনুমান স্বয়ং রুদ্রাবতার । তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে জেতা অসম্ভব । তাই ভগবান শিবের অনুচরেরা পরাস্ত হয়ে পলায়ন করতে লাগলো। রাজা চন্দ্রকেতু এই সকল দেখে ভগবান শিবকে স্তব করতে লাগলেন । যুদ্ধভূমিতে রুদ্রদেব আর রুদ্রাবতার মুখোমুখি আসলেন। গগনে দেবতারা ইহা দেখে পিতামহ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞেস করলেন- “হে প্রজাপতি! এই যুদ্ধ এখন ভয়ানক পরিস্থিতিতে এসেছে। স্বয়ং শিব আর শিবাংশের মধ্যে যুদ্ধ হবে। ইহার ফল কি হইবে ? কে জয়ী হবেন ? যদি ভগবান শিব জয়ী হয়ে রাজা চন্দ্রকেতুকে রক্ষা করেন, তবে ভগবান শ্রীরামের যজ্ঞ বিফল হবে। অপরদিকে মহাদেব স্বয়ং অপরাজিত । তাঁহাকে কে পরাস্ত করতে পারে?” পিতামহ ব্রহ্মা বললেন- “এই পরিস্থিতি কেবল চিন্তার নয়, মহাবিনাশের সূচক। যদি শিবাবতার আর ভগবান শিবের মধ্যে যুদ্ধ হয়, তবে উভয়ের অস্ত্র সংঘর্ষে এই বিশ্বে মহাপ্রলয় আসন্ন হবে। অকালে সব বিনাশ হবে।” দেবতারা একে অপরের মুখ ভয়ে চাওয়চাওয়ি করলেন। এর উপায় কি? পিতামহ ব্রহ্মা বললেন- “এই সমস্যার সমাধান নারদ মুনি ও রাজা চন্দ্রকেতু করতে পারবেন । রাজা চন্দ্রকেতু পরম শিবভক্ত। তাহার প্রার্থনাতেই ভগবান শিব এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। যদি নারদ মুনির পরামর্শে রাজা চন্দ্রকেতু ভগবান শ্রীরামের শরণাগত হয়ে যুদ্ধ বন্ধ করে, তবে মহাপ্রলয় স্তব্ধ হবে।” এরপর প্রজাপতি ব্রহ্মা নারদ মুনিকে বললেন- “পুত্র নারদ! শীঘ্র তুমি মর্তে গমন করে রাজা চন্দ্রকেতুকে ভগবান শ্রীরামের অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দাও। রাজা চন্দ্রকেতু কোন অসুর নয়। তিনি শিভবক্ত দয়ালু, উদারচেতা রাজা। তিঁনি তোমার এই শুভ প্রস্তাব মেনে নেবেন।”

নারদ মুনি চললেন। রাজা চন্দ্রকেতুকে সব বলে বললেন- “হে রাজন! আপনি দয়ালু, উদার। আপনি ন্যায়- নীতি দ্বারা রাজ্য শাসন করেন । আপনার ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে স্বয়ং ভগবান শিব আপনার পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্রের সেবক হনুমানজী নিজেও শিবাবতার। এখন স্বয়ং ভগবান শিব ও শিবাবতারের যুদ্ধ হলে সমগ্র বিশ্ব নাশ হবে। হে রাজন! আপনি কি সকলের বিনাশ কামনা করেন, না সকলের মঙ্গল প্রার্থনা করেন ? আমি জানি আপনি সকলের মঙ্গল কামনা করেন। সুতরাং শ্রীরামের শরণ নিয়ে এই যুদ্ধ বন্ধ করুন। শ্রীরামের সাথে মিত্রতা হওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিঁনি আপনার রাজ্য দখল করবার মানসে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন নি । তাহার এই যজ্ঞের উদ্দেশ্য সমগ্র আর্য্যভূমিতে শক্তিশালী একটি শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন। তিঁনি দখলের নীতিতে বিশ্বাসী নন। রাবণ বধ করে তিঁনি লঙ্কা দখল করেন নি- বরং রাবণের ভ্রাতা বিভীষণের হস্তেই লঙ্কার শাসন ভার ন্যস্ত করেছেন। দেবতাদের ইচ্ছা আপনিও এই মহান যজ্ঞে ভগবান শ্রীরামের প্রস্তাবে সায় দিন। ” রাজা চন্দ্রকেতু বললেন- “হে দেবর্ষি! আপনি যথার্থ বলেছেন। এই যুদ্ধ এখনই বন্ধ করা উচিৎ। নচেৎ বিশ্ব ধ্বংস হলে সব কিছুই নাশ হবে। আমি শ্রীরামের শরণ নিলাম। এই অশ্ব মুক্ত করে আমি তাঁহার যজ্ঞে সামিল হতে চাই।” অপরদিকে ভগবান শিব ও হনুমান মুখোমুখি যুদ্ধে। হনুমান বললেন- “প্রভু! জানি আমি আপনারই অংশ। কিন্তু এই রূপে আমি ভগবান শ্রীরামের সেবক। তাঁহার আদেশ পালণ করাই আমার ধর্ম। তাই আপনার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছি।” ভগবান শিব বললেন- “বতস্য! ভগবান স্বয়ং ভক্তের বশে থাকেন। রাজা চন্দ্রকেতু আমার ভক্ত। আমার ভক্তের সাথে আমি সর্বদাই বিরাজ করি। সুতরাং তুমি তোমার ধর্ম পালন করো। আমি ভক্তের পাশে থেকে আমার ধর্ম পালন করি।” হনুমান গদা তুলে লম্ফ দিয়ে এগিয়ে গেলেন। ভগবান শিব ত্রিশূল নিয়ে বৃষ থেকে নেমে এলেন। সে সময় রাজা চন্দ্রকেতু এসে বললেন- “হে শম্ভু ! হে ভোলেনাথ! আপনি কৃপা করে এই যুদ্ধ করবেন না। আমি আপনার ভজনা করেছি। কিন্তু অজ্ঞান বশত আপনারই অবতারের সাথে যুদ্ধে নিমগ্ন হয়ে পাপ করেছি।”

এই বলে রাজা চন্দ্রকেতু অশ্ব ফিরিয়ে দিলেন। রাজা বললেন- “প্রভু! আপনাদের দুজনের যুদ্ধে সৃষ্টি নাশ হতে চলেছিলো। যার দায়ী হতাম আমি। স্বয়ং ভগবান শ্রীরামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষোনা করে আমি অন্যায় করেছি। আমি ওঁনার শরণাপন্ন হয়ে ওঁনার বৃহৎ যজ্ঞে নিজেকে সামিল করতে চাই।” ভগবান শিব বললেন- “রাজা চন্দ্রকেতু! আমি এই কথাই তোমার মুখ হতে শ্রবন করতে চেয়েছিলাম। যে আমার শুদ্ধ ভক্ত- তার ন্যায়, অন্যায়, ধর্ম, অধর্ম বোধ থাকে । তোমার মধ্যে আমি সেই উন্নত চিন্তা লক্ষ্য করছি। শ্রীরাম হলেন স্বয়ং ভগবান শ্রীহরি। হরি আর হর অভেদ জানবে। শ্রীরাম সাক্ষাৎ ধর্মের জীবন্ত বিগ্রহ। তুমি সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছো। তোমার কল্যাণ হোক। তুমি বর প্রার্থনা করো।” রাজা চন্দ্রকেতু বললেন- “হে শঙ্কর। হে আশুতোষ! আমার কিছু চাওয়ার নেই। কিছু যদি দিতে হয়, তবে এই যুদ্ধে উভয় পক্ষে যত প্রান হানি হয়েছে সকলকে জীবন প্রদান করুন। আপনি সাক্ষাৎ মৃত্যুঞ্জয়। আপনি যার ওপর সদয় থাকেন, যম তাহার শত ক্রোশের ধার দিয়েও যান না। মার্কণ্ড মুনিকে আপনিই ত পরম আয়ু দিয়েছিলেন।” ভগবান শিব বললেন- “তথাস্তু রাজা চন্দ্রকেতু! তোমার ন্যায় নির্লোভী, উদারচেতা, পরোপকারী ভক্তকেই ত ভগবান খুঁজে বেড়ান। তোমার কল্যাণ হোক। তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে।” এই বলে ভগবান শিব নিহতদের পুনর্জীবিত করলেন । এরপর রাজা চন্দ্রকেতু নানা উপঢৌকন নিয়ে যজ্ঞে সামিল হতে গেলেন। ভগবান শ্রীরাম সকল কিছু ভুলে রাজা চন্দ্রকেতুকে স্বাগত জানালেন। কুশল মঙ্গলাদি জিজ্ঞাসা করে রাজার ন্যায় যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করলেন । এরপর অশ্ব এগিয়ে চলল। পেছন পেছন শত্রুঘ্ন ও হনুমান চলল। আর চলল অয্যোধ্যার বিশাল বাহিনী ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger