সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ৪২ )

রাবণের হাতে অজস্র বানর সেনা আজ মারা গেছে । বানরেরা রাবণের এমন মূর্তি আগে কোন যুদ্ধে দেখেনি। মনে হয় আজ রাবণ একাই সমস্ত বানর দলের নাশ করে দেবে । বালুকা রাশিতে বালুকাতে মাখামাখি রক্ত- মাংস সকল পক্ষী, শৃগালেরা ভক্ষণ করছিলো। ভগবান রাম কিঞ্চিৎ বিশ্রাম গ্রহণ করছেন। ভক্ত হনুমান তখন প্রভু শ্রীরামের পদসেবা করছিলেন । বানরেরা প্রভু শ্রীরামের আঘাত স্থানে ঔষধি দিয়ে বস্ত্র দ্বারা বেঁধে দিছিল্ল । বিভীষণ এসে রোদন করে বলল- “প্রভু! আমার মতোন তুচ্ছ একজনের জন্য আপনি সেই অস্ত্র নিজে গ্রহণ করলেন? কেন এত কষ্টকে বরণ করলেন প্রভু? আমি না হয় মরে যেতাম।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মিত্র! কে বলে তুমি তুচ্ছ ? আজ লঙ্কাকে বীরশূন্য করতে পেরেছি কেবল তোমারই মিত্রতার কারণে। মিত্র , তুমি আমার আশ্রয় নিয়েছো। শরণাগতকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করাই ধর্ম । তোমার কিছু হলে আমি কলঙ্কের ভাগী হতাম।” রাত কাটলো। প্রভাতের সূর্য উঠতেই পুনঃ রাবণ যুদ্ধে আসলো। আবার তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হল । মারমার- কাটকাট শব্দে ভরে গেলো চতুর্দিকে। রাবণের জয়ধ্বনি অপরদিকে ভগবান রামচন্দ্রের জয়ধ্বনিতে ভুবন ঢেকে গেলো। বানর আর রাক্ষসদের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হল । রাবণ একে একে পুনঃ দিব্যাস্ত্র সকল চালনা করলো। কালপাশ নিক্ষেপ করলো। দেখা গেলো বানরেরা তৃণবৎ সব মারা যাচ্ছে। ধূম্রবাণ নিক্ষেপ করলো। দেখা গেলো বানরেরা বিষাক্ত ধূমে দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে। পুনঃ সূর্য বাণ নিক্ষেপ করলেন দশানন। প্রবল তাপে বানর, মর্কট, ভল্লুকেরা ভস্ম হতে লাগলো। রাবণের দশমুণ্ডের কিরীটের মণি থেকে অতি দ্যুতি নির্গত হচ্ছিল্ল। যেনো মনে হচ্ছিল্ল দশাননের চারপাশে নবগ্রহ তারকামালায় সজ্জিত হয়ে অবস্থান করছে । বীর প্রতাপী রাবণের অলঙ্কারাদি থেকে সূর্যের ন্যায় প্রভা দেখা দিছিল্ল । আর রাবণের রথ থেকে উলকার ন্যায় জলন্ত আগুনের গোলার মতো শর ছুটে এসে বানর দলে পতিত হচ্ছিল্ল। সারি সারি বাঁদর মুখ থুবরে পড়লো। ভগবান রাম তখন যুদ্ধে আসলেন। লক্ষ্মণ এসে রাক্ষস সেনাদের পানে জ্বালাবাণ ও অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করলেন। রাবণের রথ সকল, হস্তী সকল পুড়ে ভস্ম হতে লাগলো। স্বর্ণ রথ গুলি আগুনে গোলার তেজে স্বর্ণ নদীর ন্যায় প্রবাহিত হল । হস্তীগুলি ভস্ম হয়ে ছাই হয়ে বাতাসে মিশে গেলো। রাক্ষসেরা পুড়ে মরল ।

যেনো স্বয়ং ভগবান শিব ত্রিনয়ন দ্বারা ভস্ম করছেন এমন মনে হল । নিমিষে লক্ষ লক্ষ রাক্ষস সেনা লক্ষ্মণের শরে মুক্তি পেলো। ভগবান শ্রীরাম বর্ষার মেঘের ন্যায় রাবণের দিকে বাণ বর্ষণ করতে লাগলেন । শ্রাবণের মেঘের ন্যায় তীব্র বেগে বাণাদি ছুটে গিয়ে রাবণের আশে পাশে সকল রথ, রথী, সারথি, অশ্ব গুলিকে শত টুকরো করে দিলো। রাবণ নিজেও টিকতে পারলো না। কি সেই বাণের প্রভাব । ভগবান রাম তখন মরুত বাণ রাবণের দিকে নিক্ষেপ করলো। সেই বাণে রাবণের কবচ ছিন্ন হল । রাবণ বুঝলেন এবার বুঝি আর রক্ষা নেই। মনে মনে রাবণ তখন ভগবতী অম্বিকা কে শরণ করলো । বলিল – “হে তারিণী তুমি সদয় হও। দেখা দিয়ে আমাকে রক্ষা করো। হে পাপহারিণী কালিকে, তুমি দীনহীনকে দয়া করো, আমাকে করুণা করো। শ্রীরামের সাথে যুদ্ধে আমার শোচনীয় অবস্থা হয়েছে। তুমি ছাড়া আর ভরসা কি – কারণ শঙ্কর আমাকে ত্যাগ করেছে । শাস্ত্রে তোমাকে দয়াময়ী বলে কীর্তন করে । তুমি শক্তি- মুক্তি – তৃপ্তি নামে বিচরণ করো। যে তোমার শরণ নেয়- তার কোন বিপদ হতেই পারে না।” এই বলে রাবণ ভদ্রকালীকে ডাকতে লাগলো। ভগবান শ্রীরাম বললেন- “ওরে দুরাচারী! পাপের সময় তখন ঈশ্বরের কথা স্মরণ থাকে না? বিপদে পড়েই তাঁহাকে মনে পড়ে?” এই বলে ভগবান শ্রীরাম ঐষিক বাণ ছুঁড়লেন । কিন্তু ভগবতী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন । হঠাত সেখানে ভগবতী আবির্ভূতা হলেন । কালিকা রূপ ধরে রাবণকে ক্রোড়ে নিলেন । ভগবতীর কোন ইচ্ছা ছিলো না এই দুর্মতিকে রক্ষা করবার। কিন্তু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ।

স্তবে তুষ্টা হয়ে মাতা দিলা দরশন ।
বসিলেন রথে, কোলে করিয়া রাবণ ।।
আশ্বাস করিয়া কন না কর রোদন ।
ভয় নাই ভয় নাই রাজা দশানন ।।
আসিয়াছি আমি আর কারে কর ডর ।
আপনি যুঝিব যদি আসে শঙ্কর ।।
অসিত বরণী কালী কোলে দশানন ।
রূপের ছটায় ঘন তিমির নাশন ।।
অলকা ঝলকা উচ্চ কাদম্বিনী কেশ ।
তাহে শ্যামারূপে নীল সৌদামিনী বেশ ।।
কর পদ নখে শশী অলকা প্রকাশে ।
বিম্বফল স্ফলিত অধরে মন্দ হাসে ।।
শোক গেল রাবণের দুঃখ বিনাশনে ।
হইল আহ্লাদ চিত্ত দেবী দরশনে ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

ঐষিক বাণ গিয়ে ভগবতীকে সামনে দেখে বিফল হল। ভগবান রাম নিজেও বুঝতে পারছিলেন না। এরপর খড়্গ বাণ, বৈজয়ন্তী শক্তি, বায়ব্যবাণ নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু ভগবতী তার করাল লোলজিহ্বা দ্বারা সব বাণ গ্রাস করলেন। রাবণ অট্টহাস্য করতে লাগলেন । ভগবতী ভাবতে লাগলেন কতদিনে রাবণ তাঁহাকে ত্যাগ করে। এই পাপীর বিনাশ হলেই ত্রিলোকে মঙ্গল নেমে আসবে । ভগবান রাম বুঝলেন ভগবতী যতদিন সদয় আছেন, এই রাবণকে বধ করা অসম্ভব । মাতা দুর্গা দেবী ভগবান বিষ্ণুর মানব রূপকে প্রণাম জানালেন । শিবের ঈষ্ট স্বয়ং শ্রীরাম । ভগবান শিব চোখ মুদ্রিত করে ত এঁনাকেই দর্শন করেন ।

আগুসারি যুদ্ধে এল রাম রঘুপতি ।
দেখিলেন রাবণের রথে হৈমবতী ।।
বিস্ময় হইয়া রাম ফেলে ধনুর্বাণ ।
প্রণাম করিলা তাঁরে করি মাতৃজ্ঞান ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

ভগবান রাম বললেন- “মাতঃ ! হে কালিকে! হে ভবানী আপনাকে প্রণাম জানাই। হে জগদম্বা ! আপনিই দানব শক্তির নাশিকা মহাশক্তি। আপনিই সেই আদ্যাশক্তি । সৃষ্টির আদিতে আপনিই ছিলেন, সৃষ্টি নাশের পর আপনিই থাকবেন । এই জগত আপনার ইচ্ছাতেই সৃষ্ট- পালিত হইতেছে। অন্তিমে আপনার ইচ্ছাতেই নাশ হইবে । আপনি বিশ্ব ধারণ করেন। হে চণ্ডী আপনিই সাধুদিগের ইস্পিত ফল প্রদান করেন, আপনিই অসাধুদের বিনাশ করেন । হে রুদ্রানী আপনিই সেই শক্তি, যাঁর সন্ধান দেবতারাও পান না। হে দুর্গে দেবী। আপনি অসুর বিনাশ করেও কেন রাবণকে রক্ষা করছেন ?” ভগবতী বললেন- “ হে রামচন্দ্র! আমি রাবণের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যতদিন এ আমাকে ত্যাগ না করে, আমি তাহাকে রক্ষা করবোই।” ভগবানকে নিরস্ত্র দেখে বিভীষণ বললেন- “হে রঘুনাথ! আপনি অস্ত্র ত্যাগ কেন করলেন?” ভগবান রাম বললেন- “মিত্র বিভীষণ! ভগবতী নিজে আবির্ভূতা হয়ে রাবণকে রক্ষা করছেন। এই সময় কোন অস্ত্রেই রাবণের বিনাশ সম্ভব না। সুতরাং এই অবস্থায় ধনুর্বাণ আমি ত্যাগ করেছি।” কিন্তু রাবণ ও রাক্ষসেরা নির্ভয়ে সমানে বানর বধ করেই চলল। রাতের আঁধার নামলো । রাবণ অট্টহাস্য করে ফিরে গেলো ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger