সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –২৫)

শ্রীরাম ন্যায় বিচার করতেন । ব্রাহ্মণ কে ভূমি- অন্ন- বস্ত্র নানান দানে সন্তুষ্ট রাখতেন । প্রতিদিন সহস্র ব্রাহ্মণ এসে রাজা রামকে আশীর্বাদ করতেন । যাই হোক ভগবান শ্রীরামের কাছে অনেকে বিচার চাইতে আসতেন । অয্যোধ্যার সন্নিকটে একটি সুন্দর নিবির ছায়াশীতল বাগিচা ছিলো। সেই বাগানে অনেক পক্ষী ছিলো। একটি পেঁচক সেথায় বহুকাল যাবত অবস্থান করতো। একদিন এক গৃধ এসে পেঁচকের বাসা দখল করলো। গৃধের দাবী এই বাসা আগে থেকেই নাকি তার ছিলো । পেঁচক আর গৃধের মধ্যে তুমুল ঝগড়া লাগলো। পেঁচক বলল- “দিবাকালে আমি চোখে দেখি না বলে আমার সাথে তুমি ছলনা করছ গৃধ ? ইহা আমার নিবাস। বহুকাল যাবত আমি এই খানেই অবস্থান করি। তুমি অন্যায় করছ। রাম রাজত্বে এমন জোর দখলদার দের কঠোর শাস্তি পেতে হয়। তুমি অন্যত্র অবস্থান করো।” গৃধ ত দখল করে বসে আছে পেঁচকের বাসা। সে ছাড়বে না । দুজনের কিছুক্ষণ হাতাহাতি হল। বেঁচারা পেঁচক দিবাকালে অন্ধ। সে আহত হল। বলল- “আসো আমরা শ্রীরামের রাজসভায় বিচার চাইতে চাই। উনি ন্যায্য বিচার করবেন।” দুজনে মিলে শ্রীরামের রাজসভায় গেলো। দুজনে প্রথমে অগ্রে ভগবান শ্রীরামকে প্রণাম করলো। গৃধ বলল- “হে শ্রীরাম! আপনি দেবতা এমনকি দেবগুরু বৃহস্পতি অথবা অসুর গুরু শুক্র থেকেও প্রধান । আপনি সৌন্দর্যে চন্দ্রমা, আপনি সর্বজ্ঞ, আপনি গম্ভীর ও প্রভাযুক্ত। আপনি অস্ত্রবিদ্যায় নিপুণ, দুর্জয়। আপনি সর্ব গুন সম্পন্ন । এই পেঁচক আমার বাসা দখল করতে চাইছে। দয়া করে ন্যায় বিচার করুন । আপনার রাজত্বে এই অনাচার কিভাবে শোভা পায় ? দয়া করে আমার নিবাস আমাকে ফিরিয়ে দিন । ”

পেঁচক বলল- “ হে রাজন! চন্দ্র- সূর্য- ইন্দ্র- কুবের- যম ইহাদের তেজে রাজার জন্ম হয় । আপনিই দেব নারায়ণ। আপনি সবার প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ করেন । আপনি দান ধ্যান করে প্রজা পালন করেন, আবার দুস্কৃতিকে শাস্তি প্রদান করেন । স্বয়ং ঐশ্বর্যের দেবী মাতা লক্ষ্মী আপনার সন্নিকটে থাকেন । আপনি শত্রু- মিত্রে ভেদাভেদ জ্ঞান করেন না। আপনি যার প্রতি ক্রুদ্ধ হন- মৃত্যু তার দিকে ধাবমান হয়। রাজাই হন রাজ্যের অনাথ ও দুর্বলের বল। যাহাদের নয়ন নাই, রাজাই তাহাদের নয়ন হন। আপনি আমাদিগের নাথ। হে প্রভু, এই গৃধ মিথ্যা ভাষণ করছে। সেই নীর আমার। আমিই তাহাতে বাস করি। এই গৃধ বল পূর্বক দখল করে রেখেছে। আপনি বিচার করুন।” শ্রীরাম এই শুনে সচিব দিগকে আহ্বান করলেন। ধৃষ্টি, জয়ন্ত, বিজয়, সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রবর্ধন , অশোক, ধর্মপাল, সুমন্ত্র আদি বুদ্ধিমান ও পণ্ডিত আসলেন । তাহারা এসে ভগবান শ্রীরামকে বুদ্ধি দিলেন। ভগবান শ্রীরাম গৃধকে বললেন- “বল গৃধ! তুমি কবে থেকে সেই নীরে বাস করছ?” গৃধ বলল- “হে শ্রীরাম! মনুষ্য গণ যবে থেকে বসুমতীর চারিদিক আবৃত্ত করেছে , ততদিন হইতে আমি সেই নীরে অবস্থান করছি।” শ্রীরাম তখন পেঁচক কে বললেন- “পেঁচক, তুমি কবে থেকে সেই নীরে আছো?” পেঁচক বলল- “মহারাজ । যবে থেকে এই পৃথিবী তরুরাজি দ্বারা শোভিত হয়েছে, তবে থেকে আমি সেই নীরে আছি।” মহারাজ শ্রীরাম বললেন- “আমি এই বিষয়ে বৃদ্ধ বয়স্ক ব্যাক্তিদিগের সহায়তা নিবো। যে সভায় অভিজ্ঞতায় পূর্ণ বৃদ্ধেরা অবস্থান না করেন, সে সভা সভাই নয়।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম বৃদ্ধ বয়স্ক পণ্ডিতদের আহ্বান করলেন। বৃদ্ধেরা সব শুনে বলল- “মহারাজ পেঁচক সত্য বলছে। গৃধ মিথ্যা ভাষণ করেছে। পুরাণে যাহা আছে তাহা শ্রবণ করো। কল্পান্তে অগাধ জলরাশিতে ভগবান বিষ্ণু শয়ন করছিলেন। তাঁর কর্ণ হতে মধু ও কৈটভ নামক দুই দানবের উৎপত্তি হল। তারা প্রজাপতি ব্রহ্মাকে ভক্ষণ করতে গেলে ভগবান বিষ্ণু জাগ্রত হয়ে মধু ও কৈটভের বধ করলেন।”

সকলে শুনতে লাগলো। বৃদ্ধেরা বলতে লাগলো- “ এর পর মধু , কৈটভের মেদে পরিপ্লুতা হলে ভগবান হরি ধরণী গঠন করে ধরণীকে প্রথম বৃক্ষ দ্বারা সুসজ্জিত করলেন । মেদোগন্ধযুক্ত বলে ধরণী ‘মেদিনী’ নামে খ্যাতা হল । মানুষ ত অনেক পরে সৃষ্ট। ঐ পেঁচক বলেছে যে যবে থেকে ধরণী বৃক্ষ দ্বারা সজ্জিত হয়েছে তবে থেকে সে ঐ নীরে আছে। সুতরাং ঐ বাসা পেঁচকের। গৃধের নয়।” ভগবান শ্রীরাম তখন গৃধ কে বললেন- “তস্কর গৃধ! তুই অন্যের বাসস্থান দখল করেছিস ? তোকে আজ মৃত্যু প্রদান করবো। রাজসভায় মিথ্যা ভাষণ ক্ষমাহীন অপরাধ। যে ক্রুর, মিথ্যাচারী, অন্যের গৃহ দখল করে পীড়া দেয়- তাহাকে বধ করাই উচিৎ।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম গৃধকে বধ করতে গেলে আকাশ হতে দৈববাণী হল- “হে রাম! এই গৃধ পূর্ব হতে গৌতম ঋষির শাপে পক্ষী হয়ে শাস্তি পাচ্ছে। আর একে শাস্তি দেবেন না। এই গৃধ গত জন্মে রাজা ব্রহ্মদত্ত ছিলেন। সে যুগে কিছু মুনি ঋষি মাংস ভোজন করতেন, কিছু করতেন না। একবার মহর্ষি গৌতম ইহার অতিথি হইলে ইনি গৌতমকে মাংস আহার প্রদান করেন। মুনি গৌতম মাংসাহারী ছিলেন না। তিঁনি শাপ দ্বারা রাজা ব্রহ্মদত্তকে গৃধে পরিণত করলেন। আপনার চরণ স্পর্শেই এর মুক্তি হবে। কারণ মুনি গৌতম এমন বানী করেছিলেন যে ইক্ষাকু বংশের যশস্বী রাজা শ্রীরামচন্দ্রের চরণ স্পর্শে মুক্তি হবে।” তখন ভগবান শ্রীরাম চরণ দ্বারা গৃধকে স্পর্শ করলেন। গৃধ তখন শাপমুক্ত হয়ে রাজা ব্রহ্মদত্ত হলেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত করজোড়ে প্রভু শ্রীরামের বন্দনা করে বললেন-“ হে ধর্মজ্ঞ জ্ঞাতা শ্রীরাম! আপনার কৃপায় আমার এই নারকীয় জীবনের অবসান হইল। তুমিই আমার শাপের অন্ত করিলে। তোমাকে প্রণাম।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger