সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৩৯)

মকরধ্বজকে পাতালের রাজা বানালো হল। ব্রাহ্মণেরা বৈদিক স্তুতি পাঠ করলেন। পবিত্র বারি দ্বারা মকরধ্বজের অভিষেক করানো হল। পাতালের রাক্ষসেরা সকলে হনুমানের ভয়ে মকরধ্বজের অনুগত হল। এছারা তারা মকরধ্বজের শক্তি জানতো। তারাও আর পাপ করবে না বলে ভগবান শ্রীরামের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। মকরধ্বজের মাতা বলল- “প্রভু! আপনি স্বয়ং মর্যাদা পুরুষোত্তম । আমার পুত্র সদ্য কিশোর। সে সকল রাজধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত নয়। কৃপা করে তাহাকে উপদেশ প্রদান করুন।” ভগবান শ্রীরাম তখন মকরধ্বজকে বললেন- “বতস্য! সদা ধর্মপথে থেকো। ধর্মই সব। ধর্ম হীন হলে সে সব কিছুই হারিয়ে ফেলে। নিজেও অধর্ম করবে না, কদাপি অধার্মিকদের সঙ্গ দেবে না। যে অধার্মিক দিগের সঙ্গ করে, সে নিজেও অধার্মিক হয়। অধার্মিক দিগকে সর্বদা ধর্ম কথা শ্রবন করাবে । কদাপি ব্রাহ্মণ দ্বেষী হবে না। ব্রাহ্মণ দিগকে সর্বদা ধেনু, ভূমি, অর্থ , বস্ত্র দান করিবে। শাস্ত্র বিধান মান্য করবে চলবে। মাতার সেবা করবে। প্রজাদিগকে সন্তান ন্যায় পালন করবে। কদাপি প্রজার ওপর অত্যাচার করিবে না। বরং প্রজাদের স্বার্থে ব্যক্তিগত সুখ ত্যাগ করবে। রাজার কর্তব্য সুখ ভোগ করা নয়। রাজার কর্তব্য গো- ব্রাহ্মণ- শাস্ত্র- নারী ও প্রজাদের রক্ষা করা। যে রাজা ইহা করে না সে নরকে গমন করে। প্রত্যহ সাধ্যানুসারে দান- ধ্যান করবে। প্রজাদের মতামত মান্য করবে।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম , মকরধ্বজকে অনেক উপদেশ প্রদান করলেন । হনুমান তখন দুই স্কন্ধে প্রভু শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে উঠালেন। তারপর হাস্যমুখে ফিরে চললেন । পাতালের পথ বেয়ে চললেন। পথে আসবার সময় কপিল মুনিকে দেখতে পেলেন। কপিল মুনির আশ্রমে নেমে এলেন। ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ কপিল মুনিকে প্রণাম করলেন । কপিল মুনি অন্তরে অন্তরে প্রভু শ্রীরামকে প্রনাম করলেন । কপিল মুনির কাছে আধ্যাত্মিক বানী শ্রবন করলেন। তারপর সেখানে কিঞ্চিৎ সেবা গ্রহণ করে পুনঃ হনুমানের স্কন্ধে চাপলেন ।

একে একে লাভার নদী সকল পার করলেন । দেবী বসুমতীকে দেখলেন । তারপর ধীরে ধীরে বলি রাজার ওখানে আসলেন । বলি রাজা ভগবানের দিব্যরূপ দেখে ভূমিতে সষ্টাঙ্গে প্রণাম জানিয়ে বললেন- “প্রভু! আপনি সেই বামনদেব। আপনার চরণ স্পর্শে আমি ধন্য হয়েছি। আপনি এই ভক্তের আলয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করুন।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মহারাজ বলি। আমি ত সর্বদা ভক্তের সঙ্গেই থাকি। ভক্তের হৃদয় আমার প্রিয় বাসস্থান । আমি সর্বদা তোমার সাথেই আছি। তোমার ভক্তি শ্রদ্ধাতেই আমি আছি। কিন্তু আমি এই অবতারে চতুর্দশ বৎসর কোন রাজকীয় সেবা গ্রহণে অপারগ। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। চতুর্দশ বৎসর সমাপন হতে আর মাত্র কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে।” বলি মহারাজকে কৃপা করে পুনঃ হনুমানের স্কন্ধে চড়লেন । তারপর আবার চললেন। পাতালপুরী সকল দেখতে লাগলেন । অনেক মুনি ঋষি ও পুন্যাত্মা দিগকে দেখতে পেলেন । একসময় সুরঙ্গের পথ ধরে রাম লক্ষ্মণ কে স্কন্ধে নিয়ে হনুমান উঠে আসলেন । ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে এভাবে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে দেখে বানর সেনাদলে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেলো । সকলে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনিতে চতুর্দিক ভরিয়ে দিলেন। ভগবান রাম তখন বিভীষণ ও সুগ্রীবকে আলিঙ্গন প্রদান করলেন । সকল ঘটনা ব্যক্ত করলেন। হনুমানের পুত্র মকরধ্বজের কথা শ্রবণ করে সকলে আশ্চর্য হলেন। খুশী হলেন এই শুনে যে মকরধ্বজ এখন পাতালের রাজা। মহীরাবণ ও অহীরাবণ দুই বধ হয়েছে । ভগবান শ্রীরাম তখন বললেন- “এই সকল অঘটনকে দূর করেছে হনুমান। সেই ছিলো বলে মহীরাবণ আমাদের বলি দিতে অসমর্থ হয়েছে। হনুমানের উপকার আমি কিরূপে শোধ করবো?” হনুমান লজ্জিত হয়ে বললেন- “ছি! ছি! প্রভু! আমাকে লজ্জা দেবেন না। আপনার কৃপাতেই এই সকল সম্ভব । আপনি স্বয়ং মায়াধীশ। মহীরাবণের সাধ্য কি যে সে আপনাকে মায়াজালে নিক্ষেপ করে? এই সকল হয়েছে কেবল আমার দ্বারা মহীরাবণের অন্ত হওয়ার জন্য। এই সকল আপনারই লীলা।”

বানর দলের জয়ধ্বনি লঙ্কায় পৌছে গিয়েছিলো । ত্রিজটা গিয়ে সীতাদেবীকে সব সংবাদ দিলেন। মহীরাবণের ঘটনা শুনে সীতাদেবী শোকে উন্মাদিনী হয়েছিলেন । কিন্তু প্রভু শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ কে অক্ষত অবস্থায় হনুমান ফিরিয়ে এনেছে, হনুমান নিজে মহীরাবণ আর অহীরাবণের বধ করেছে শুনে আনন্দে দেবতাদের ধন্যবাদ প্রদান করতে লাগলেন । হনুমানকে অনেক আশীর্বাদ দিলেন । বললেন- “দাম্ভিক রাবণের এই পরিণতি হওয়ার ছিলো। অহঙ্কারী ব্যক্তি অহঙ্কারে এত শীর্ষে উঠতে চায় যে সে সেখান থেকে পতিত হয়ে নিদারুন ভাবে চূর্ণ হয়। রাবণ সেই রকম।” পুত্র ও নাতির মৃত্যু সংবাদ ও রাম লক্ষ্মণের জীবিত অবস্থায় ফেরা শুনে রাবণ শোকে অস্থির হল। শোকে সে ভূমিতে পতিত হয়ে রোদন করতে লাগলো । “হা পুত্র!” বলে রোদন করতে লাগলো। রাবণ শোকে বলতে লাগলো – “আমার সকল সন্তান, নাতিপুতি সকলেই নিহত হয়েছে। এই শোক আমি কোথায় রাখবো? হে মহেশ্বর! আমি কেনই বা এত শোক পাচ্ছি। আমার বংশে প্রদীপ দেবার কেউ থাকলো না!” এই বলে রাবণ রোদন করতে লাগলো। মন্দোদরী এসে বলল- “স্বামী! আমি এইদিনেরই ভয় পেয়েছিলাম । আমি , আপনার ভ্রাতা বিভীষণ, আপনার পিতামাতা আপনাকে কত বুঝিয়েছিলাম , মনে আছে? যেদিন আপনি সীতাকে হরণ করতে গিয়েছিলেন, সেইদিনই আপনাকে কত বুঝিয়েছি! বারবার বুঝিয়েছি আর বারবার আপনি শক্তির দম্ভ দেখিয়েছেন। শ্রীরাম অজেয়, কেউ তাঁহাকে পরাজিত করতে পারে না। আপনি কারোর কথাই মানেন নি। এই সব হতোই। এখন শোক করে আর কি পুত্রদের ফিরে পাবেন? তাই বলছি সীতাকে ফিরিয়ে দিন। আপনি নতুন করে রাজ্যকে সাজিয়ে পরিচালনা করুন।” রাবণ ক্রোধে বলল- “যে আমার বংশকে নির্বংশ করলো, আমি তার দাবী মেনে নেবো? কদাপি নয়। আমার শ্বাস যতদিন আছে, সীতাকে ফিরিয়ে দেবো না। নাই বা থাকলো কেও। আমি যুদ্ধে গিয়ে জয়ী হয়ে ফিরবো। পুত্রঘাতী সেই শত্রুদের কাহাকেও জীবিত রাখবো না।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger