সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –১৩)

সীতা দেবী এই বলে মুনিকে ফিরে যেতে অনুরোধ জানালেন । মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “পুত্রী! তোমার গর্ভে শ্রীরামের সন্তান আছে। তাহাদের মঙ্গলের চিন্তা করো। মাতা হয়ে সন্তান দের সুরক্ষা চিন্তা করো। এই হেন অরণ্যে একাকী থাকা তোমার পক্ষে উপযুক্ত নয়। সীতা! এটা হবারই ছিল। এটাই বিধিলিপি । সুতরাং এখন আমার সহিত আমার আশ্রমে গমন করো। সেখানে অবস্থিত আশ্রম কন্যারা তোমার দেখাশোনা করবেন। সেখানে এক বৃদ্ধা নারী কাবেরীদেবী অবস্থান করছেন । তিঁনি তোমার মাতৃতুল্যা। এই অবস্থায় তিঁনি তোমাকে পুত্রীর ন্যায় সেবাযত্ন করবেন।” সীতাদেবী বললেন- “হে মহর্ষি! আমি কোন মুখে সেখানে যাই ? যাঁর জীবন কথা আপনি রচনা করছেন, তিঁনি তাঁর স্ত্রীকে ত্যাগ করেছেন- এমন শুনলে ভক্তির হানি ঘটবে। কারণ সাধারন মানুষ চোখে দেখা আর কানে শ্রবন করাকেই সর্বোপরি স্থান দেয়। আমি স্বামী পরিত্যক্তা । আমার ভব্যিষত কি ? আমি কি বলবো আশ্রমে গিয়ে যে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম দায়িত্ব পালনের জন্য স্ত্রীকে ত্যাগ করেছেন?” মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “হে দেবী! তুমি সেখানে ছদ্দবেশে থাকবে। সেখানে কেহ তোমার পরিচয় জানবে না । আর রঘুকুলের বংশজ আমার আশ্রমেই পালিত হবে। তাহাদের আমি শাস্ত্র, অস্ত্র শস্ত্র শিক্ষা দেবো। রামকথার সঙ্গীত শেখাবো। নাই বা থাকলো তাহাদের ওপর পিতার ভালোবাসা- স্নেহ। মাতার ভালোবাসা স্নেহই বা কম কিসের ? তাহারা তোমার স্নেহ বাৎসল্যে লালিত পালিত হইবে। একদিন তারা এত বড় বীর যোদ্ধা হবে যে তাহাদের শৌর্য বীর্য স্বয়ং মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামকে এখানে আসতে বাধ্য করবে। মায়ের প্রতি অবিচারের প্রতিকার করবে তারা। অযোধ্যাবাসীদের সেই ভুলচিন্তাকে খণ্ডন করবে তারা।” শুনে সীতাদেবী চোখের জল মুছলেন ।

তারপর সীতাদেবী, মহর্ষি বাল্মিকীর সহিত আশ্রমে পদার্পণ করলেন । নানা অলঙ্কারে সুসজ্জিতা অপূর্ব সুন্দরী কান্তিময়ীকে আসতে দেখে আশ্রমের লোকেরা অবাক হলেন। যেনো মনে হচ্ছিল্ল বৈকুণ্ঠ থেকে স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী নেমে এসেছেন। তারা এর আগে অযোধ্যা গেলেও সীতাদেবীকে দেখেন নি। তাই চিনতে পারলেন না। সীতাদেবী যখন আশ্রমে প্রবেশ করলেন তখন প্রকৃতি যেনো সাড়া দিলো। বৃক্ষ থেকে পুস্পগুলি আপন ইচ্ছাতেই সীতাদেবীর চরণে ঝড়ে পড়লো। এক দিব্য জ্যোতি বলয় যেনো সীতাদেবীর অঙ্গ থেকে নির্গত হচ্ছিল্ল। দীঘির পদ্মগুলি আপন ইচ্ছাতেই প্রস্ফুটিত হল। আশ্রমে যে সকল মুনি ঋষি যজ্ঞাদি পূজা করছিলেন তাহারাও যজ্ঞ, পূজা ছেড়ে করজোড়ে প্রণাম জানালেন । ভাবলেন স্বয়ং হরিপ্রিয়া এসেছেন । মহর্ষি বাল্মিকী তখন বললেন- “ইনি সূর্যবংশীয় কূলবধূ। স্বামী এনাকে বনে রেখে গেছে। ইনি গর্ভবতী। আজ হতে এই কন্যা এই আশ্রমেই নিবাস করবেন। ইহার সেবা সুরক্ষার ভার আমাদের সকলের ওপর। এনার সেবায় যেনো কোন ত্রুটি না হয় ।” বৃদ্ধা কাবেরী দেবী বললেন- “মহর্ষি! ইনি কি মানবী না দেবী। এক ঝলক দেখে ভেবেছি সাক্ষাৎ প্রকৃতিদেবী এই নারীর রূপে আবির্ভূতা হয়েছেন। এঁনার নাম কি?” বাল্মিকী বললেন- “হ্যা! ইনি সাক্ষাৎ প্রকৃতিদেবীর রূপ। ইনি হলেন বনদেবী । আজ হতে ইনি এখানে আপনার কাছেই থাকবেন। আপনি মাতার ন্যায় এঁনার খেয়াল রাখবেন। ইনি তুষ্টা হলে সকল জগত তুষ্ট হয়, ইনি রুষ্টা হলে সকল শ্রী সম্পদ বিনষ্ট হয়। অতএব কন্যার ন্যায় সর্বদা এঁর খেয়াল রাখিবেন।” কাবেরী দেবী সীতাদেবীকে কুটিরে নিয়ে গেলেন। সীতাদেবী সকল অলঙ্কার, রাজবেশ খুলে আবার সেই গেরুয়া শুদ্ধ বস্ত্র ও রুদ্রাক্ষ মাল্য ধারণ করলেন। মনে পড়ে গেলো বন গমনের প্রাক মুহূর্তের কথা। সেই সময় স্বামী ছিলো সাথে। আজ কেউ নেই। ভাবতেই সীতাদেবীর চোখ জলে ভরে গেলো।

অপরদিকে লক্ষ্মণ একাকী রথ নিয়ে ফিরে এলো । তিন মাতা এসে বললেন- “পুত্র! তুমি একাকী কেন ? আমাদের সীতা কোথায় ? সে কি তবে মিথিলায় প্রস্থান করেছে?” দুভ্রাতা এসে জিজ্ঞেস করলো বৌঠান কোথায় ? তিন ভগিনী এসে জিজ্ঞেস করল আমাদের অগ্রজা ভগিনী কোথায় ? লক্ষ্মণ সেই সময় অশ্রু সংবরণ করতে না পেরে বলল- “এই কথা আপনারা অযোধ্যার রাজা শ্রীরামচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করুন। এর উত্তর আমার কাছে নেই। আমি রাজার ভৃত্য। বড় ভ্রাতা নয় আমি রাজাজ্ঞা মেনে বৌঠানকে অরণ্যে রেখে এসেছি।” শুনে সকলে আশ্চর্য হল। একি বিচার। এই সকল কেন হল! ভাবতে লাগলেন । ঊর্মিলা বলল- “কেন আপনি আমাদের বড় ভগিনীকে শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে রেখে আসলেন ? কি সব বলছেন? একি করেছেন?” তখন ভগবান শ্রীরাম এসে বললেন- “লক্ষ্মণের কোন দোষ নেই। সে আমার আদেশে এই সকল কর্ম করেছে।” সকলে অবাক হল। ভগবান শ্রীরাম বললেন- “সিংহাসনে বসবার আগে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে নিজের স্বার্থ সুখ নয়, রাজ্যের স্বার্থে আমি কর্ম করবো। প্রজার দাবীদাওয়া মান্য করবো। এই রাজ্যের কিছু প্রজা ইহা সন্দেহ করছেন যে দশমাস লঙ্কায় বন্দিনী থাকার পর সীতার সতীত্ব নাশ হয়েছে। তাই সীতাকে বহিষ্কার করা উত্তম। আমি তাহাই করেছি। তাহাকে ত্যাগ করেছি।” শুনে সকলের মাথায় যেনো বজ্রপাত হল । সীতার তিন ভগিনী মূর্ছা গেলেন । তিন মাতা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন খুবুই বিস্মিত হলেন । ভরত বলল- “অগ্রজ! এ আপনি কি করলেন ? সাক্ষাৎ সতীলক্ষ্মী বৌঠানকে প্রজাদের দাবী মানতে ত্যাগ করলেন ? অগ্রজ আপনার বন গমনকে যেমন আমি সমর্থন করিনি, এই সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করছি না।” কৌশল্যা , সুমিত্রা বললেন- “পুত্র! একি অধর্ম করলে তুমি ? আমাদের গৃহের লক্ষ্মীকে ত্যাগ করলে ? তুমি জানোনা যে সীতা এখন গর্ভবতী। এই অবস্থায় এত নিষ্ঠুর কিভাবে হলে পুত্র ? ধিক্কার জানাই তোমার এমন সিদ্ধান্তকে । ছিঃ পুত্র! এই রকম পাপ কর্ম করার চিন্তা কিভাবে তোমার জন্মালো ? শত্রুঘ্ন বলল- “অগ্রজ! আপনি এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলেন? আমাকে একবার বলতেন আমি সেই দুর্বুদ্ধি প্রজাদের কারাগারে বন্দী করে রাখতাম। আপনি পাপীদের দণ্ড না দিয়ে নিস্পাপ বৌঠানকেই দণ্ড প্রদান করলেন ? এ কেমন ধর্ম দাদা?”

( ক্রমশঃ ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger