সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –২৮)


শ্রীরামচন্দ্র এই ভাবে অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা শুনলেন । ভাবলেন তিঁনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন । উপযুক্ত ব্রাহ্মণের সন্ধান করতে হবে । শ্রীরামচন্দ্র ভরত ও লক্ষ্মণ কে বললেন- “ভ্রাতা! আমি রাজসূয় যজ্ঞ করবো না। তাহার পরিবর্তে অশ্বমেধ যজ্ঞ করবো। তোমরা সত্বর বামদেব, জাবালি, কাশ্যপ আদি ব্রাহ্মণ দিগকে আহ্বান করো। আমি তাঁহাদিগের সাথে শলা পরামর্শ করে যজ্ঞ করবো। তাহার পর অশ্ব ছাড়িয়া দেবো। যে সকল রাজ্যের ওপর দিয়ে আমার অশ্ব যাইবে, সেই সকল রাজ্যের রাজার কাছে দুটি পথ খোলা থাকবে। হয় তাহারা আমার মিত্রতা গ্রহণ করে এই যজ্ঞে উপস্থিত হবেন, নচেৎ তাহাদিগকে অযোধ্যার সহিত যুদ্ধ করতে হবে । তোমরা যুদ্ধে সেই সকল মিত্রতা স্থাপনে অনিচ্ছুক রাজাদের পরাজিত করে সম্মান সহিত যজ্ঞসভায় উপস্থিত করবে। পবিত্র আর্যভূমিতে একটি শক্তিশালী , ধর্মরাজ্য স্থাপনের জন্য এই যজ্ঞের প্রয়োজন। সমগ্র দেশকে নেতৃত্ব দেবে সূর্যবংশীয় গন।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম সেই সকল মুনি দিগকে আহ্বান করতে পাঠালেন দুভ্রাতাকে । সেই সকল ব্রহ্মবংশে জন্মগত ব্রাহ্মণ শাস্ত্রজ্ঞ মুনি গণ এলেন । বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে পারবেন না। কারণ এই যজ্ঞে সস্ত্রীক যজমানের আসনে উপস্থিত হয়ে, যজ্ঞাহুতি প্রদান করতে হয়। আপনি আপনার স্ত্রীকে নির্বাসনে দিয়েছেন। হয় আপনি সীতাদেবীকে ফিরিয়ে আনুন, নচেৎ দ্বিতীয় বিবাহ করে সস্ত্রীক যজ্ঞে বসুন।” এই শুনে শ্রীরামচন্দ্র খুবুই চিন্তিত হলেন। মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। কিন্তুরা বাকীরা খুশী হল। কারণ শ্রীরাম সীতা ভিন্ন অপর কোন নারীকে স্ত্রীর আসন দিতে পারবেন না। এই মুহূর্তে তাঁহাকে সীতা দেবীকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। অভাগিনী সীতাদেবী এবার নিশ্চয়ই সুখের মুখ দেখবেন।

ভরত, লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! চিন্তা কিসের। আদেশ দিন। এখুনি বৌঠানকে রাজ্যে ফিরিয়ে আনি। এই যজ্ঞ বৌঠানের সকল দুঃখের অবসান করুক ।” শ্রীরাম বললেন- “এ হতে পারে না। কারণ রাজ্যের লোকেরা এখনও সীতা বিদায়ে প্রসন্ন হয়ে ইহা ভাবেন যে অসতী রানী বিদায় নিয়েছেন। সুতরাং সীতাকে ফিরিয়ে আনলে প্রজাদের মনে অসন্তোষ জন্ম নেবে। অশ্বমেধ যজ্ঞ হবেই। যে কোন পরিস্থিতিতে।” এবার সকলে ভয় পেলো। তবে কি শ্রীরামচন্দ্র দ্বিতীয় বিবাহ করবেন ? সকলের মুখ শুকিয়ে গেলো। শ্রীরামচন্দ্র ব্রাহ্মণ দিগকে করজোড়ে বললেন- “হে বিপ্রগণ! আমি সীতাকে ফিরিয়ে আনতে অসমর্থ। আর আমি দ্বিতীয় বিবাহে ইচ্ছুক নই । আপনারাই বিধান দিন এই পরিস্থিতিতে কিরূপে যজ্ঞ সম্ভব হবে?” ব্রাহ্মণ গণ শাস্ত্র ঘেটে অনেক বিচার বিশ্লেষণ করলেন। তখন বললেন- “একটি উপায় আছে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র। যদি আপনি সীতাদেবীর স্বর্ণ মূর্তি নির্মাণ করে আপনার বামে রেখে যজ্ঞ সমাপন করেন, তবে এই যজ্ঞ শাস্ত্র মতে সফল হবে। রাজন ক্ষত্রিয়ের স্বর্ণ মূর্তি, বৈশ্যের রৌপ্য মূর্তি আর শূদ্রের লৌহ মূর্তি উপযুক্ত। আপনি ক্ষত্রিয়। দয়া করে সোনার সীতা নির্মাণ করে যজ্ঞে প্রবৃত্ত হন।” এই বলে ব্রাহ্মণেরা বিদায় লইলেন । শ্রীরামচন্দ্র তখন লক্ষ্মণ কে এক মূর্তিকারের খোঁজ করতে বললেন। যে এসে সুন্দর স্বর্ণ সীতা মূর্তি নির্মাণ করে দেবে । তখন লক্ষ্মণ বললেন- “অগ্রজ! এ আপনার কেমন সিদ্ধান্ত? যখন আপনি বৌঠানের জড় মূর্তি পাশে রেখে যজ্ঞ করতে পারবেন, তাহলে জলজ্যান্ত বৌঠানকে কেন খুঁজে আনবেন না? তখন প্রজারা অপবাদ দেবেন না যে আপনি অসতী রানীর মূর্তি রেখেছেন। কেন বৌঠানকে ফিরিয়ে আনছেন না?”

ভগবান শ্রীরাম বললেন- “লক্ষ্মণ! এই উত্তর বহুবার প্রদান করেছি। এর যোগ্য উত্তর আমার কাছেও নেই। এখন এই সকল পুনঃ আলোচনা নিস্ফল। বরং যজ্ঞ সংক্রান্ত আলোচনা হোক। তুমি উপযুক্ত ধন রত্ন সহিত বিভিন্ন মিত্র রাজ্যে নিমন্ত্রণ প্রেরণ করো। যেনো মিত্র বিভীষণ তাহার রাক্ষস বাহিনী নিয়ে যজ্ঞে উপ্সথিত থাকেন। মিত্র সুগ্রীব যেনো বানর সেনা সহিত আসেন। যেনো কেশরী রাজা তাঁহার মর্কট বাহিনী সহ উপস্থিত থাকেন । আর আমন্ত্রণ জানাবে আমার পরম বন্ধু গুহক কে। জাম্বুবান যেনো ভল্লুক বাহিনী নিয়ে এখানে উপস্থিত থাকেন। শত্রুঘ্ন কে আজই রাজপুরী নিয়ে আসো। রাজা জনক সস্ত্রীক ও রাজা জনকের ভ্রাতা যেনো এখানে সস্ত্রীক উপস্থিত থাকেন । কেকয়, কৌশল, সিংহলে আমন্ত্রণ জানাবে। সকলকে মর্যাদা সহকারে অযোধ্যায় অশ্বমেধ যজ্ঞে উপস্থিত হতে অনুরোধ জানাবে। যেথায় যত ঋষি , মুনি ও ব্রাহ্মণ আছেন, সকলকে শিষ্য সমেত অযোধ্যায় পদার্পণ করতে বিনীত অনুরোধ জানাবে। আমার গুরু বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র ও অগ্যস্ত মুনিকে শিষ্য সহ এই স্থানে উপস্থিত হতে অনুরোধ জানাবেন । মহর্ষি বাল্মিকী যেনো শিষ্য সহ এখানে আসেন। দেখবে কোন মিত্র রাজ্য যেনো বাদ না যায়। শত্রুভাব পোষোনকারী রাজ্যগুলিতেও নিমন্ত্রণ জানাবে। সমস্ত নর্তক, নর্তকী, রাজা সকলকেই আহ্বান জানাবে। নিমিষারণ্যে গোমতী নদী তীর অতি পবিত্র স্থান। আমি সেই স্থানেই এই পবিত্র যজ্ঞ করবো।” এইভাবে যজ্ঞের আয়োজন চলল। যজ্ঞের খবর মহর্ষি বাল্মিকীর আশ্রমে পৌছালো। সীতাদেবী ভয় পেয়ে বাল্মিকীকে বললেন- “পিতা! এই যজ্ঞ কিরূপে সম্ভব ? তবে কি উনি দ্বিতীয় বিবাহ করবেন?” বাল্মিকী বললেন- “পুত্রী! উনি দ্বিতীয় বিবাহ করবেন না। উনি তোমার স্বর্ণ মূর্তি নির্মাণ করে যজ্ঞে উপস্থিত রাখবেন।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger