সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –৯)

ভগবান শ্রীরাম শুনে খুবুই বিষণ্ণ হয়ে রইলেন । কাহার সাথে কথা নেই। দ্বিপ্রহরে আহার করলেন না। বারংবার সীতার নিস্পাপ মুখ আর তাঁর গর্ভে রঘুকুলের বংশজের কথা ভেবে তিঁনি অন্তরে অন্তরে খুবুই রোদন করলেন। এই ব্যাথা কেউ জানলো না । বারবার দেখলেন অযোধ্যার সেই গৌরবান্বিত রাজসিংহাসণকে । যার চারটি পায়া সর্বদা রাজ কর্তব্য পালনের কথা বলে। নিজেকে খুব ভার বলে মনে হতে লাগলো। মনে হতে লাগলো অযোধ্যার সেই রাজমুকুট শিরে কণ্টকমুকুটের ন্যায় বেদনা দিচ্ছে। সেই দায়িত্ব পালনে কোন এক নিস্পাপ স্ত্রী আর গর্ভস্থ সন্তান কে দণ্ড প্রদান করা হচ্ছে । তিন মাতা জিজ্ঞেস করলেন- “পুত্র রাম! তোমার কি কোন প্রকার অসুখ হয়েছে। এত বিষ্ণন্ন তোমাকে এর পূর্বে দেখা যায় নাই।” তিন ভ্রাতা জিজ্ঞেস করলেন- “অগ্রজ! আপনি এত বিষণ্ণ কেন?” শ্রীরাম কি উত্তর দেবেন । বলার কিছুই নাই । দেবী জানকী এসে প্রভু শ্রীরামের পদসেবা করতে করতে বললেন- “প্রভু! আপনি এত বিষণ্ণ কেন ? আপনার কি কোন প্রকার অসুখ হইয়াছে?” শ্রীরাম বললেন- “না জানকী! এই রাজকাজ আমাকে দিয়ে এত কিছু করাচ্ছে যে এখন দশের দাবী, ইচ্ছা মেটানোর জন্য কোন নিস্পাপ কে দণ্ড দিতে হচ্ছে। রাজ্য চালানো এত সহজ নয়। নিজের আবেগ, অনুভুতি , সুখ কে বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু যখন সাধারণ মানব রূপে নিজেকে বিবেচোনা করি তখন এই রাজ ধর্ম বড়ই নিষ্ঠুর বলে মনে হয়।” সীতা দেবী বললেন- “প্রভু! আপনিই ত স্বয়ং নিজেই বলেন যে দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। তবে কেন এরূপ রাজ ধর্মের প্রতি আপনার বিতৃষ্ণা দেখা দিচ্ছে? আপনি এই সীতার স্বামী। সীতার ইহকাল, পরকাল । আপনার নামের সাথেই আমার পরিচয়। কিন্তু সর্বোপরি আপনি অযোধ্যার রাজা। সমস্ত রাজ্যের প্রজা আপনার সন্তানসম । আপনি নিজ দায়িত্ব কিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন ?”

শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “সীতা! তুমি ছাড়া এই শ্রীরামের ভরসা, শক্তি, প্রেরণা কোথায়? স্ত্রীর ভূমিকা স্বামীর জীবনে অনেক। স্ত্রীই স্বামীর প্রেরণা, স্বামীর শক্তি, স্বামীর অন্ধকারে প্রদীপ । যদি কখনো এমন হয় এই রাজধর্ম তোমার আর আমার মধ্যে বিশাল এক পরিখা রচনা করলো? এমন যদি হয়, তবে এই শ্রীরাম নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না, এক স্ত্রী রূপে সীতাও তার স্বামীকে ক্ষমা করতে পারবে না।” সীতা দেবী বললেন- “প্রভু! আপনি কি আর্য্যা নারীকে এতই ক্ষুদ্র বুদ্ধি সম্পন্না বিবেচনা করেন ? স্ত্রীর কাছে তার স্বামীই পরমগুরু , দেবতা। ইহাই নারীজাতির ধর্ম । এক নারী তার সর্বস্ব ছেড়ে পিত্রালয় থেকে স্বামীর গৃহে যাত্রা করে- সারা জীবনে সেই স্বামী তাহার পরিচয়। স্বামী গৃহে অবস্থান করে স্বামীর কুলকে সেবা করাই স্ত্রীধর্ম । এক স্ত্রী কদাপি তাঁর স্বামীর দায়িত্ব, কর্তব্যে বিঘ্ন উৎপন্ন করে না। কোন স্ত্রীই তার স্বামীকে দায়িত্ব কর্তব্য ত্যাগ করতে উৎসাহ দেয় না। নারীর এই ত্যাগ- তার মহান ভাবমূর্তিকে সংসার মাঝে প্রকাশ করে। সেই নারী সংসারে মহাসতী নামে খ্যাতা হন। সেইরূপ আমি আপনার কর্তব্যে দায়িত্বের মাঝে আসবো না। যদি তাহার জন্য কখনো আমার আপনার মাঝে গণ্ডী এসে পড়ে, তবে তাহা আমি মেনে নেবো।” শ্রীরামের চোখে দিয়ে জল ঝরতে লাগলো। বিধাতা কেবল নারীদের মধ্যেই কেন ত্যাগের ভাবনা সৃষ্টি করেন, এত মহান চিন্তা সৃষ্টি করেন, এত ধৈর্য সৃষ্টি করেন- এসব ভাবতে লাগলেন শ্রীরাম। সীতাদেবী তখন শ্রীরামের অশ্রুবিন্দু করতলে ধারণ করে মস্তকে ধারণ করলেন। তারপর স্বীয় আঁচল দ্বারা প্রভু শ্রীরামের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন- “প্রভু! বহুদিন যাবত আমার বন দর্শনের ইচ্ছা হয়েছে। বনের সেই সৌন্দর্য আমি ভুলিনি। অপরূপ সবুজে ঢাকা, সুগন্ধি পুস্পের দ্বারা শোভিত সেই অরন্য আমি দেখতে ইচ্ছুক। কৃপা করে আমাকে কাল অরণ্য পরিভ্রমণে নিয়ে যাবেন।” ভগবান শ্রীরাম কিছু ভেবে বললেন- “সীতা! অবশ্যই কাল প্রভাতে যাবে। তবে রাজকর্মের জন্য আমি তোমাকে ভ্রমণে নিয়ে যেতে পারবো না। তুমি বরং লক্ষ্মণের সাথে অরণ্য ভ্রমণ করবে। আমি তাহাকে সব বলে দেবো।” রাত্রিকালে শ্রীরাম লক্ষ্মণ কে ডেকে বললেন- “ভ্রাতা! তুমি সর্বদা আমার পাশে থেকেছো। লঙ্কার সাথে যুদ্ধের সময় তুমি অনেক শক্তিমান রাক্ষস দের বধ করে লঙ্কার শক্তি হ্রাস করেছো। তোমার ন্যায় ভ্রাতা কপাল গুণেই প্রাপ্তি হয়। ভ্রাতা এবার তোমাকে একটি কাজ করতে হবে। এই কাজ করার শক্তি আমার নেই।”

লক্ষ্মণ জানতে চাইলে শ্রীরাম সব বলে দিলেন যে রাজ্যের লোক সীতাকে অসতী মনে করছে। তারা চাইছে সীতাকে বিদায় করা হোক এই রাজ্য থেকে । এই অবস্থায় সীতাকে ত্যাগ করে প্রজাদের দাবী মেনে নেওয়া উচিৎ । শুনে লক্ষ্মণের যেনো পায়ের তলা থেকে মাটি সড়ে গেলো। বিনা মেঘে বজ্রপাত হল। লক্ষ্মণের শরীরে যেনো ক্রোধে জুয়ালামুখী ফুটতে লাগলো। লক্ষ্মণ বলল- “ছিঃ দাদা! তুমিই কি সেই আমার আদর্শবান দাদা ? অযোধ্যার মহারানী সম্বন্ধে অপবাদ দেয় এমন সাহস কাদের হয় ? আপনি তাদের নাম বলুন। আমি গিয়ে তাদের মুণ্ডটাই কেটে আনবো। যে মুখে সতী শিরোমণি দেবী সীতার সম্বন্ধে এমন কুবাক্য বের হয়, সেই মুখ আমি আস্ত রাখবো না। আর দাদা, তোমারই বা বুদ্ধি কি? এইসব অসভ্য প্রজাদের শাসন না করে আপনি নির্দোষী গর্ভবতী বৌঠান কেই ত্যাগ করার কথা বলছেন ? তাও আমার হস্ত দিয়ে এইরূপ পাপ করাতে চাইছেন। এই আদেশ আমি মানতে পারলাম না।” শুনে শ্রীরাম বললেন- “প্রজাদের দণ্ড দিয়ে লাভ কি? রঘুকুলের নিয়ম যে প্রজাদের সেবা করা। প্রজাদের দাবীদাওয়া মেনে নেওয়া। হে লক্ষ্মণ তুমি নিজে রঘুবংশী। মহারাজা হরিশ্চন্দ্র, রাজা সগর, রাজা দীলিপ, রাজা ভগীরথ, রাজা রঘুর মহান দানের কথা স্মরণ করো। এনারা সকলে রঘুবংশীয়। এঁনারা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে প্রতিজ্ঞা পালন করেছেন। আমিও প্রতিজ্ঞা করেছি যে প্রজাদের সকল মতামত মান্য করবো। জানি এতে আমার সংসার ভেসে যাবে, আমার পত্নী নিস্পাপ হওয়া সর্তেও তাকে ত্যাগ করতে হবে। আমার সন্তান আমার স্নেহছায়া থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু ইহা আমার ভাবলে চলবে না। তাহলে রঘুবংশে কালিমা লেপন হবে। পূর্বপুরুষ দের মহান কীর্তিতে কলঙ্ক লেপন হবে । যা এই রঘুবংশীয় রাম কদাপি হতে দেবে না।” লক্ষ্মণ বলল- “বাঃ দাদা! এরজন্য এক সরল মনের নারীকে বলি হতে হবে ? এ কোথাকার নিয়ম ? আপনি কি সত্যই সীতাদেবীকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসেন ? আপনি নির্দয় হয়ে বৌঠানের অগ্নিপরীক্ষা নিয়েছিলেন, আবার এখন কিছু গর্দভের কথা শুনে সেই সতী নারীকে ত্যাগ করার কথা ভাবছেন ? এ কেমন রাজধর্ম দাদা - যে নিস্পাপ গর্ভবতী নারীকেও ত্যাগ করতে শিক্ষা দেয়? কখনো ভেবেছেন, বৌঠানের কর্ণে এই সকল কথা প্রবেশ করলে তাঁহার কি অবস্থা হবে? আরে তিঁনি ত আপনাকে পরমেশ্বর জ্ঞানে ভক্তি শ্রদ্ধা করেন। এই তাহার প্রতিদান দিচ্ছেন?”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger