সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৬)



শ্রীরামচন্দ্র হা হুতাশ করে বলতে লাগলেন- “ভ্রাতা! কেন তুমি মন্ত্রণা চলাকালীন এই কক্ষে প্রবেশ করলে? আমি কিরূপে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবো। কেনই বা আমি এই প্রতিজ্ঞা করলাম। আমি কিভাবে আমার প্রাণাধিক প্রিয় ভ্রাতাকে এইহেন শাস্তি দেবো। ভ্রাতৃহন্তা হয়ে আমি নরকেও ঠাঁই পাবো না। হে বিধাতা! কেনই বা আপনি আমার থেকে এই সকল কঠোর পরীক্ষা গ্রহণ করেন ? আপন স্ত্রীকে গর্ভস্থ অবস্থায় ত্যাগ করতে হল। স্ত্রীকে বসুমতী গর্ভে প্রবেশ করাও আমাকে সহ্য করতে হল। এখন নিজের ভ্রাতাকে মৃত্যু দিতে হবে? এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। এই জীবন আমি আর রাখবো না।” লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! আমি কি করবো? মহর্ষি দুর্বাসা পদার্পণ করেছেন। তিঁনি আদেশ করেছেন এই মুহূর্তে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে। তিলেক বিলম্ব হলেই উনি অভিশাপ দিয়ে এই রাজপুরী, এই অযোধ্যা ভস্ম করবেন বলে জানিয়েছেন। অগ্রজ! অযোধ্যা আমাদের মাতৃভূমি। মাতৃভূমির জন্য এই একজনের বলিদান উপযুক্ত। কিন্তু একজনের জীবন রক্ষার নিমিত্ত গোটা অযোধ্যাকে আমি কিভাবে ভস্ম হতে দিতে পারি? আমি ত তোমার ভ্রাতা। বড় ভ্রাতা গুরুতুল্য। আপনি ত নিজেই ত্যাগী। আপনাকে দেখেই এই ত্যাগ আমি মাথা পেতে স্বীকার করলাম । এবার সত্ত্বর গিয়ে মহর্ষি দুর্বাসার সহিত সাক্ষাৎ করুন। পাছে বিলম্ব হলে মহর্ষি আবার ক্রোধে কাণ্ডজ্ঞান বিস্মৃত না হন।” ভগবান শ্রীরাম যথাউপযুক্ত ভাবে মহর্ষি দুর্বাসাকে প্রণাম জানিয়ে বললেন- “মহর্ষি আপনি ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনার আগমন বার্তা পেয়েই আমি ছুটে এসেছি। এ আমার পরম সৌভাগ্য যে আপনার চরণ যুগল দর্শনের সৌভাগ্য হয়েছে । দয়া করে আপনি শাপ প্রদান করবেন না। কৃপা করে আপনার সেবা করার সুযোগ প্রদান করুন।” এই বলে মহারাজ শ্রীরাম সুগন্ধি বারি দ্বারা দুর্বাসা মুনির পদ ধৌত করে চরণ পূজা করে বসতে আসন দিলেন । মহর্ষি দুর্বাসা শান্ত হলেন ।

বিনয়ে বলেন রাম কোন্ প্রয়োজন ।
দুর্বাসা বলেন চাহি উচিৎ ভোজন ।।
এক বর্ষ করিয়াছি আমি অনাহার ।
দেহ অন্ন ব্যঞ্জন যে অমৃত সুসার ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

দুর্বাসা মুনি বললেন- “হে শ্রীরাম! এক বৎসর অনাহারে তপস্যা করে আমি এখন বড়ই ক্ষুধার্ত । আমাকে অন্ন ভোজন প্রদান করো।” শ্রীরামচন্দ্র বুঝতে পারলেন এও বিধাতার খেলা। যাহাতে লক্ষ্মণ আগে গমন করতে পারে । কারণ দুর্বাসা মুনি উগ্রতপা মুনি। সহস্র বৎসর অনাহারে তপস্যা করার ক্ষমতা রাখেন তিঁনি । কিন্তু এখন আর কি করবেন । সুগন্ধি উত্তম অন্ন বিবিধ ব্যঞ্জনাদি দ্বারা মহর্ষি কে সেবা করালেন। উৎকৃষ্ট তাম্বুল বিবিধ মশলা সহকারে মহর্ষিকে প্রদান করলেন। মহর্ষি দুর্বাসা গোপোনে বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনি সাক্ষাৎ নারায়ণ। প্রভু মর্ত্যলোকে আপনার লীলা সমাপন হয়েছে। এবার বৈকুণ্ঠে গমনের সময় এসেছে। আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন। প্রজাপতি ব্রহ্মার আদেশে আমি এমন করেছি। যাহাতে আপনি বৈকুণ্ঠ গমন করতে পারেন । ” মহর্ষি বিদায় নিলেন । লক্ষ্মণ গিয়ে বললেন- “অগ্রজ! কাল্য আমি প্রভাতে দেহ রাখবো।” শুনে শ্রীরামচন্দ্র ক্রন্দন করলেন। বললেন- “ভ্রাতা! এ কি রূপে হয় ? আমি কিভাবে মৃত্যু পথে যেতে তোমাকে আদেশ দেবো?” লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ! আপনি শপথ করেছিলেন যে মন্ত্রণা গৃহে যে আসবে তাকে মৃত্যু দেবেন । রঘুকুলের নিয়ম এটাই যে প্রাণ দিয়ে হলেও শপথ রক্ষা করতে হবে। এই কারণেই ত আপনি বনে গমন করেছিলেন। এই কারণেই ত প্রজার দাবী মেনে বৌঠাণ কে ত্যাগ করেছিলেন। আজ কেন এত দুর্বল আপনি? আমি আপনার ভ্রাতা। আমি কিভাবে আপনার শপথ ভঙ্গ হতে দিতে পারি?” লক্ষ্মণ এরপর শ্রীরামের চরণে পড়ে বললেন- “ভ্রাতা! আমি আমার যথাসাধ্য আপনার সেবা করার চেষ্টা করেছি। জানি অনেক ভুল ভ্রান্তি হয়েছে। আপনি তাহা স্নেহবশে ক্ষমা করেছেন। আশীর্বাদ করুন- পরজন্মে যেনো আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হয়ে জন্মাতে পারি। কারণ এই রূপে আপনাকে বনে চতুর্দশ বৎসর কণ্টক, প্রস্তরের ওপর হাটতে দেখে বুক ফেটে গেলেও, আপনাকে আদেশ করার ধৃষ্টতা করতে পারিনি। যদি আমি আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হতাম তবে আপনাকে কদাপি বনবাসে যেতে দিতাম না, বৌঠানকেও ত্যাগ করতে দিতে দিতাম না। যুগে যুগে যেনো আমি আপনার ভ্রাতা হতে পারি।”

শ্রীরাম ক্রন্দন করতে করতে বললেন- “ভ্রাতা! মন না চাইলেও অনুমতি দিতে হবে। সাধুগণের কাছে ত্যাগ করা আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উভয় সমান। আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম ভ্রাতা। তোমার ন্যায় ভ্রাতা শত কোটি জন্মের পুণ্যের ফলেই প্রাপ্তি করা যায়। পরজন্মে তুমি আমার জ্যেষ্ঠ হয়ে আবির্ভূত হবে।” এই বলে শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষ্মণকে আলিঙ্গন করে অনেক অশ্রু বিসর্জন করলেন । পর দিন প্রাতঃকালে লক্ষ্মণ সবার অলক্ষ্যে উঠে পড়ছেন। পাছে মায়া বশত পুনঃ শ্রীরামচন্দ্র তাহাকে যেতে না দেন। পুত্র চন্দ্রকেতু আর অঙ্গদ কে দেখে অযোধ্যাকে প্রণাম করে চললেন সরয়ূ নদীর দিকে। সেখানে প্রণাম, পূজাদি করে যোগসাধনায় বসলেন। মনে পড়লো কত পুরাণো স্মৃতি ঘটনা। এই অযোধ্যাকে ঘীরে, সমগ্র বনবাস স্মৃতি, লঙ্কার যুদ্ধ আদি সকল ঘটনা। ব্রাহ্ম মুহূর্তে চতুর্দিকে পাখীর কলরবে পরিপূর্ণ। মুনি, ঋষি, ব্রাহ্মণেরা উঠে স্নানে আসছেন। চতুর্দিক হতে মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি ও পবিত্র মন্ত্র সকল ভেসে আসছে। আর একধারে সরয়ূর জল বয়ে যাওয়ার আওয়াজ। চোখ মুদ্রিত করে লক্ষ্মণ ধ্যানে বসলেন। আত্মা লক্ষ্মণের দেহ থেকে বের হয়ে গেলো। স্বর্গের অপ্সরা, দেবতা সকলে লক্ষ্মণের সেই পবিত্র দেহে পুস্প বর্ষণ করলেন । যোগসাধনা দ্বারা মৃত্যু বরন আর আত্মহত্যা কিন্তু এক জিনিষ না। যোগ দ্বারা দেহ রাখতে পারেন যোগী। কঠোর যোগসাধনায় সিদ্ধ যোগীরা এমন ভাবে দেখ রাখেন। হরিদ্বার, কাশী, প্রয়োগে এখনও এমন যোগসিদ্ধ যোগী দেখা যায়। আর আত্মহত্যা করে কাপুরুষেরা, যাদের বুদ্ধি বিবেক নষ্ট হয়, তাহারাই। যোগ সাধনা দ্বারা দেহ রাখলে আত্মা সেই পরমাত্মায় লীন হয়। আর আত্মহত্যা করলে ভূত, প্রেত হয়ে ঘুরে ঘুরে অশেষ দুঃখ যাতনা পেতে হয় । লক্ষ্মণের দেহ রাখার সংবাদে শ্রীরাম খুবুই দুঃখ পেলেন । হা হুতাশ করলেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন কে ডেকে বললেন, তিঁনিও প্রান ত্যাগ করবেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন অনুগমন করতে চাইলে শ্রীরাম বাধা দিলেন। কিন্তু তাঁহারা বলল যে- “অগ্রজ! আমরা সকলে আপনার অংশ। আপনিই বিষ্ণু। আপনার অংশ হতে আমরা আবির্ভূত। আপনি চলে গেলে অংশ রূপ কিভাবে থাকবে? আপনাকে চতুর্দশ বৎসর বনে নিবাসে আপত্তি জানালেও, আপনি রাখেন নি। বৌঠানকে ফিরিয়ে আনতে বললেও , আপনি শোনেন নি। জানি আপনার আদেশ না মান্য করার কারণে আমাদের অপরাধ হবে। কিন্তু এই মহাপাপ করতে রাজী, তবুও আপনাকে ভিন্ন একবিন্দু মর্ত্যে থাকতে ইচ্ছা করিনা ।” তখন শ্রীরামচন্দ্র রাজী হলেন। লঙ্কা, কিস্কিন্ধ্যায় দূত প্রেরণ করে জানানো হল যে শ্রীরাম দেখ রাখবেন সরয়ূর জলে ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger