সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ৪৬ )

ভগবান শ্রীরাম পূজায় বসলেন। হনুমান গুনে গুনে একশত আটটি নীল পদ্ম আনয়ন করেছেন । ভগবান শ্রীরাম একে একে অষ্ট শক্তি রূপিনী মহামায়ার পূজা করলেন- যথা উগ্রচণ্ডা, প্রচণ্ডা, চণ্ডোগ্রা, চণ্ডনায়িকা, চন্ডা, চন্ডবতী, চন্ডরূপা, অতিচণ্ডিকা, রুদ্রচণ্ডি পূজা করলেন। তারপর চৌষট্টি যোগিনীর পূজা করলেন । এরপর একশত আটটি নীল পদ্ম দেবীর চরণে অর্পণ করতে লাগলেন । এখনও এই নিয়ম দেখা যায়। যদিও নীলপদ্ম আর দেওয়া হয় না । সাধারন জলজ পদ্মেই পূজা শুরু হয়। ভগবতী সব দেখছিলেন । তিনি ভাবলেন একবার শ্রীরামের পরীক্ষা নেওয়াই যাক। রাবণের পূজায় কেবল আছে দম্ভ । ভক্তি শ্রদ্ধার লেশ মাত্র নাই। কিন্তু শ্রীরামের পূজো ভক্তি পূর্ণ । এই সময়ে একটি পরীক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন । ভগবতী অম্বিকা তখন একটি নীলপদ্ম হরণ করলেন । এই ঘটনা কেউ টের পেলো না। ওদিকে ভগবান শ্রীরাম এক এক করে সমস্ত পদ্ম দেবীর চরণে নিবেদন করছেন । দুন্দুভি, ঢাক, ঢোল, দামামা, কাঁসর বাজতে লাগলো। রাবণ চর মারফৎ সব শুনে হাস্য করতে লাগলেন। ভিখারির পূজা কি আর রাজরাজেশ্বরী গ্রহণ করবেন- এই ভেবে রাবণ অট্টহাস্য করতে লাগলেন । অপরদিকে অশোক বাটিকায় সীতাদেবী স্বামীর বিজয়ের জন্য গৌরীদেবীর ধ্যানে মগ্ন হলেন । কেবল পূজাস্থলে শিঙা বা বাঁশি বাজলো না- কারণ দুর্গা পূজায় বাশী বাজানো নিষেধ। এইভাবে রামচন্দ্র তন্ময় হয়ে পূজা করছেন। একশত সাতটি নীল পদ্ম অর্পণ করলেন । পুষ্পপত্রে হাত দিয়ে দেখলেন একটি পদ্ম নেই। ওমনি খোঁজবিন আরম্ভ হল। একটি পদ্ম গেলো কোথায় ? ভগবান রাম খুঁজে খুঁজে না পেয়ে বললেন- “হনুমান তুমি গুনে গুনে একশত আটটি পদ্ম এনেছিলে কি? একটি পদ্ম কোথায় গেলো?” হনুমান লজ্জিত হয়ে বলল- “ আমি গুনে গুনে বস্ত্রে বেঁধে এনেছি। পথে কোথাও পতিত হয় নি । প্রভু জাতিতে আমি পশু। বিদ্যা শিক্ষা নেই। হয়তো গুনতে ভুল হয়েছে। আমি সত্বর গিয়ে আর একটি নীল পদ্ম আনয়ন করছি।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “শীঘ্র গমন কর বতস্য। যেনো শুভ সময় অতিক্রান্ত না হয়।”

ভগবতী দুর্গা দেবী তখন বিশ্ব থেকে সমস্ত নীল পদ্ম, এমনকি অন্য সকল পদ্ম, কলি সমস্ত হরণ করলেন । কেবল পত্র ভিন্ন কিছুই থাকলো না। হনুমান সমস্ত সরোবরে গিয়ে খুঁজতে লাগলো। যেখান থেকে নীলপদ্ম এনেছিলো, সব জায়গাতে দেখলো। কোথাও নীল পদ্ম ত দূর, কোন পদ্মই নেই, কলি পর্যন্ত নেই। হনুমান ভাবল রাবণ কোন মায়া করেছে কিনা প্রভুর পূজা বন্ধ করবার জন্য। একটি পদ্ম কোথাও নেই। অথচ একটু আগেই এখানে পদ্মের বন ছিলো। কত শত পদ্ম ছিলো। কাশফুলে ভরা মাঠ, শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, শিউলির গন্ধে আমোদিত গগন সকল জায়গায় হনুমান খুঁজলো। মুনি ঋষি দিগকে জিজ্ঞেস করেও একটিও পদ্ম পেলো না। রিক্ত হস্তে ফিরে এলো। ভগবান রাম সকল কিছু শুনে মাথায় হাত দিলেন। বললেন- অসমাপ্ত পূজায় অকল্যাণ হয়। তবে কি ভগবতী আমার পূজায় সন্তুষ্ট নন । আমার পূজায় কি ত্রুটি হয়েছে? আমি এখন কি দিয়ে দেবীর পূজা করবো।” বিভীষণ বললেন- “প্রভু! পিতার নিকট শুনেছি শাস্ত্রে লেখা আছে যে, কোন বস্তুর অভাব হলে তার বিকল্প কিছু দিয়ে পূজা সুসম্পন্ন করা যায়। আপনি পদ্মের বিকল্প কিছু প্রদান করুন।” ভগবান শ্রীরাম ভাবতে লাগলেন বিকল্প কি দেওয়া যায়। হঠাত মনে পড়লো তাঁর নয়ন পদ্মলোচনের মতো। সকলে তাঁহাকে “কমলনয়ন” বলে ডাকেন। ভাবলেন একটি চোখ উপরে দেবীর চরণে দেবেন, কারণ তা কমল সাদৃশ্য। শ্রীরাম বললেন- “আমার এক নাম কমল নয়ন। আমার চোখ কমল সাদৃশ্য। একটি চোখ আমি দেবীকে অর্পণ করে পূজা করবো।” সকলে মানা করতে লাগলো। রোদন করতে লাগলো। লক্ষ্মণ বলল- “দাদা! তুমি কি শেষ কালে অন্ধ হবে? এ হয় না।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “লক্ষ্মণ! আমার একটি চোখ থাকবে। তুমি , ভরত, শত্রুঘ্ন আমার তিন চোখ। তখন চার চোখ দিয়ে দেখবো। তোমরা তিন ভ্রাতাই আমার নয়নের মণি।” এই বলে ভগবান রাম তূণ থেকে শর নিয়ে চোখ উৎপাটন করতে গেলে কে যেনো রামচন্দ্রের হস্ত টেনে রোধ করলো। ভগবান রাম সহ সম্মুখে দেখলেন সামনে স্বয়ং ভগবতী দুর্গা দেবী অবস্থান করছেন । তিঁনি মৃদু মৃদু হাসছেন ।

ভগবতী দশভুজা রূপে প্রকটিতা । তেজস্বী এক সিংহের স্কন্ধে আসীনা। দশ হস্তে- খড়্গ, ঢাল, চক্র, শঙ্খ, ঘণ্টা, বজ্র, গদা, ধনুর্বাণ , সর্প , ত্রিশূল ধারন করে আছেন । দেবীর শরীর থেকে দিব্য জ্যোতি উৎপন্ন হয়ে চতুর্দিকে আচ্ছাদিত হয়েছে । প্রসন্ন বদনা ত্রিনয়নীর রূপে ত্রিভুবন আলোকিত হয়েছে। মঙ্গলময়ী যেনো তারকামালায় অলঙ্কারে সুশোভিতা হয়েছেন । ভগবতী দুর্গা দেবী বললেন- “হে রাম! আপনার পূজায় আমি প্রসন্না হয়েছি । একটি নীলপদ্ম আমি হরণ করেছিলাম । আপনাকে পরীক্ষা গ্রহণ করেছিলাম। আপনি সফল হয়েছেন। আপনার জয় হবেই।” ভগবান শ্রীরাম সেই নীলপদ্ম গ্রহণ করলেন, তৎপর ভগবতীর চরণে নিবেদন করে স্তবস্তুতি করলেন । সকল বানর সেনা, বিভীষণ- অঙ্গদ- লক্ষ্মণ- হনুমান – সুগ্রীব- জাম্বুবান সকলে নতজানু হয়ে ভগবতীকে প্রণাম করতে লাগলেন । ভগবতীর দর্শন অত্যন্ত দুর্লভ । সকলে স্তবস্তুতি করে ভরিয়ে দিলো । গগন থেকে দেবতারা পুস্প বর্ষণ করলেন । প্রথম অকাল বোধন – যা এখন বাংলায় শারদীয়া দুর্গা পূজা- অগ্রে হয়েছিলো শ্রীলঙ্কায়। কত দূরে! ভগবতী বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনিই স্বয়ং বৈকুণ্ঠের শ্রী বিষ্ণু। দেবী সীতা সাক্ষাৎ লক্ষ্মী । রাবণ সেই সতী নারীকে অপহরণ করে পাপের কলস পূর্ণ করেছে। তার বিনাশ এবার আপনার হস্তেই হবে। এ পূর্ব নির্ধারিত । আসছে সপ্তমী তিথিতে আমি আপনার শরে শক্তি পরিবৃতা হয়ে আবির্ভূতা হবো, অষ্টমী তিথিতে আপনার সাথে মহাপাপী রাবণের প্রবল যুদ্ধ হবে- যেই যুদ্ধ দেখে ত্রিলোক অবাক হবে, নবমী তিথিতে আপনার বাণে রাবণের দশমুণ্ড ধূলিসাৎ হবে- সেই দিনই রাবণের অন্ত হবে আপনার হস্তে। দশমী তে এখানে বানর সেনারা আনন্দ করবে। আপনার বিজয় উৎসব করবে। মহাদেবী সীতার সকল দুঃখের অবসান হবে। শেষে ধর্মের জয় হয়, অধর্মের নাশ হয়। যুগে যুগে তাই হয়েছে আর হবে।” সকলে শুনে ভগবতীর জয়গান করলো। ভগবতী বললেন- “আজ থেকে আমার এই শরত ঋতুর পূজো ‘অকাল বোধন’ নামে মর্তলোকে প্রচারিত হবে। বসন্ত ঋতুর সাথে সাথে শরতে আমার পূজা হবে। এই পূজার সাথে আপনার নাম জড়িয়ে থাকবে।”

( ক্রমশঃ ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger