সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –৩১)


লব ও কুশের সঙ্গীত শুনে সকলে চোখের জল মুছলেন। কি মিষ্টি কণ্ঠ! কি সুন্দর সুর তোলে বীনায় ঐ দুই বালক। তাহাদের দেখে মনে হয় স্বর্গের গায়ক এসেছেন মানব রূপে । সমবেত মুনি ঋষি ও সকলে মহর্ষি বাল্মিকীর ভূয়ষী প্রশংসা করলেন ওই দুই বালক কে এত সুন্দর সঙ্গীত শিক্ষা প্রদানের জন্য । মাণ্ডবী, ঊর্মিলা, শ্রুতকীর্তি প্রভৃতি এসে লব ও কুশকে আদর করলেন। অনেক স্নেহ প্রদান করলেন । ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হে বালক! তোমরা আমার পুত্রসম । তোমাদিগকে আমি পুরস্কৃত করতে চাই। বল বালক তোমরা কি চাও ? ভূমি- ধন- সোনা- গোধন - আহার যাহা ইচ্ছা প্রার্থনা করতে পারো।” লব ও কুশ তখন শ্রীরামচন্দ্রকে প্রণাম করে বললেন- “হে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র। আপনি সাধারণ মনুষ্য নন। আপনি মনুষ্য রূপে পরমেশ্বর । সকলে আপনাকেই ভজনা করে থাকেন। আপনি স্বয়ং যজ্ঞাগ্নি, আপনি মুক্তিদাতা, আপনিই উদ্ধারকর্তা। আপনার নাম জপ মাত্রই সকল সাধনার ফল লাভ হয় । হে প্রভু! সাক্ষাৎ আপনার দর্শন লাভের পর আর কিছুই কামনা থাকে না। কারন সর্বশ্রেষ্ঠ ত আপনি। যদি কৃপা করে আমাদের একটি ইচ্ছা পূর্ণ করেন, তাহলে আমরা উপকৃত হই । আপনি একবার পতিতপাবনী , সতী শিরোমণি সীতাদেবীর দর্শনের আদেশ দিন। সেই সতীশ্রেষ্ঠা কেন এই যজ্ঞে উপস্থিত নেই? কৃপা পূর্বক আমরা তাহার দর্শন চাই।” শুনে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র মস্তক নীচু করে থাকলেন । এর উত্তর কি দেবেন আর। দুই বালক ইহাও জানে না সীতাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে । লক্ষ্মণ ও ভরত যেনো চুপ থেকে দুই বালক কেই সমর্থন করছিলেন । লক্ষ্মণ ও ভরত বললেন- “হে মহারাজ! এই দুই বালকের প্রশ্নের উত্তর দিন। কোথায় সেই সতী শিরোমণি- যাহার দিন আরম্ভ হত আপনার চরণামৃত গ্রহণ করে, আর দিন শেষ হত আপনার চরণ সেবা করে। তিঁনি কোথায়?” মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র চুপ করে থাকলেন।

লব ও কুশ বললেন- “হে মহারাজ! তবে কি দেবী সীতামাতা এইস্থানে উপস্থিত নন? এ কিভাবে সম্ভব? তবে আপনি অশ্বমেধ যজ্ঞ কিভাবে করছেন ? কোথায় সেই ‘রামায়ণ’ এর শক্তিরূপিনী সেই সতী নারী ? কোথায় সেই জগতমাতা যাঁহার অন্তর করুণায় ভরা ? কোথায় সেই মহাসতী নারী যিঁনি স্বামীকে পরমেশ্বর জ্ঞানে ভজনা করেন ? কোথায় সেই দেবী- যিঁনি কৃপা করলে অসাধ্য সাধন হয় ? আমরা সেই দেবীর দর্শন কামনা করি।” মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “বালক! দেবী সীতা এইস্থানে নেই। তাঁহার স্বর্ণ মূর্তি এইস্থানে আছে। তোমরা চাইলে তাহাকে দর্শন করতে পারো।” এই বলে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র সকল ঘটনা বর্ণনা করলেন, যে কেনো দেবী সীতাকে গর্ভবতী অবস্থায় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। শুনে লব ও কুশ বললেন- “ছিঃ মহারাজ! আপনি সেই সতী নারীকে ত্যাগ করলেন- যাঁহার তীর্থ ছিলো আপনার শ্রীচরণ ? যিঁনি আপনার বাক্যকে ঈশ্বরের বাণী জ্ঞান করে তাহাই অভ্রান্ত ভাবে পালন করতেন। যিঁনি আপনার ছায়া ছিলেন, আপনি তাঁহাকেই দূর করে দিলেন ? এ কেমন বিচার মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র ? এই জন্য কি উনি লঙ্কায় আপনার নাম জপ করেই নিদারুন অত্যাচার সহ্য করেছিলেন, যে আপনি তাঁহাকে উদ্ধার করে আবার ত্যাগ করবেন ? আপনার মায়া দয়া হয় নি যে তিঁনি গর্ভস্থ নারী। সাক্ষাৎ পতিতপাবনী দেবী সীতার ওপরেই আপনি এইরূপ অবিচার করলেন ? এ কেমন বিচার ? কখনো ভেবেছেন কি দেবীর মনের অবস্থা কিরূপ হয়েছিলো ইহা শুনে, যে আপনি তাঁহাকে ত্যাগ করেছেন। এখন তাঁহার মর্মর মূর্তি বসিয়ে যজ্ঞ করে কি লাভ হবে ? আপনাকে সকলে ঈশ্বর বলে, আপনি সেই ঈশ্বরের প্রতিমার ন্যায় পাষাণ। আপনি কঠোর ও অন্যায়কারী। ‘সীতা’ ভিন্ন রামনাম জপ নিস্ফল। সীতা ছাড়া রামায়ন অসম্পূর্ণ । তাহা শ্রবনে কোন ফল নেই। আমরা এমন নির্দয় মানবের চরিত কদাপি আর পাঠ করবো না।” এই বলে লব ও কুশ বীনার সূত্র গুলি ছিন্ন করে ফেললেন। দুভ্রাতা বলল- “সময় ও সুযোগ হলে দেবী সীতার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ অবশ্যই নেবো।”

এই বলে লব ও কুশ ক্রুদ্ধ হয়ে রাজসভা থেকে বিদায় নিলেন। সাথে মহর্ষি বাল্মিকীও বিদায় নিলেন। ভরত , লক্ষ্মণ বলল- “অগ্রজ। দুই বালক একবর্ণও মিথ্যা বলেন নি। আপনি অন্যায় করেছেন। কর্তব্য পালনের জন্য সেই দুঃখিনী নারীর সাথে অন্যায় করেছেন।” অপরদিকে অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব গিয়ে প্রবেশ করলো মধুপুরীর রাজা চন্দ্রকেতুর রাজ্যে। চন্দ্রকেতু শিব উপাসক ছিলেন। ভগবান শিব বর দিয়েছিলেন যে যুদ্ধে চন্দ্রকেতু যদি কখনো পরাজিত হয়, তবে তিঁনি নিজে আবির্ভূত হয়ে ভক্তের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করবেন । মধুপুরীর রাজা চন্দ্রকেতু সেই অশ্ব বন্দী করলেন । শত্রুঘ্ন গিয়ে প্রথমে দূত পাঠিয়ে রাজা চন্দ্রকেতুকে অনুরোধ জানালেন মহারাজ শ্রীরামচন্দ্রের মিত্রতা গ্রহণ করে অশ্ব মুক্ত করে দিতে । চন্দ্রকেতু ত নারাজ। তখন শত্রুঘ্ন যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ চলল। একে অপরের সেনা সকল নাশ করতে লাগলো। হনুমান একাই রাজা চন্দ্রকেতুর অনেক হানি করে দিলেন। পরাজয় নিশ্চিত জেনে চন্দ্রকেতু তখন ভগবান শিবকে স্মরণ করলেন। কৈলাসে হর আর গৌরী দেবী সকল কিছু দেখছিলেন। দেবী বললেন- “প্রভু! আপনি কি রাজা চন্দ্রকেতুর পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করবেন ? তখন আপনাকে আপনারই অংশ হনুমানের সাথে যুদ্ধ করতে হতে পারে। রুদ্র আর রুদ্রাংশের মধ্যে যুদ্ধ হলে সৃষ্টি নাশ হতে পারে।” ভগবান শিব বললেন- “দেবী! ভক্ত যেমন ভগবানকেই একমাত্র গতি মনে করেন, তেমনি ভগবান তাহার ভক্তের বশে থাকেন । চন্দ্রকেতু আমার ভক্ত। আমি আমার ভক্তের সাথেই আছি। সে আমাকে স্মরণ করেছে। এই মুহূর্তে আমি তাহাকে উদ্ধার করতে যাবো। জানি আমি বিষ্ণুর বিরোধী হতে যাচ্ছি। কিন্তু ভগবানের কাছে তাহার ভক্তই সব।” এই বলে ভগবান শিব বৃষে আরোহিত হয়ে রুদ্রধনুক ও পাশুপাতাদি অস্ত্র নিয়ে ত্রিশূল ধারণ করে যুদ্ধে চললেন। ভগবান শিবের সাথে যতেক ভূত- প্রেত- বেতাল- কুস্মাণ্ড নানা অস্ত্র নিয়ে গেলেন । হনুমান যখন চন্দ্রকেতুকে বন্দী করতে যাবে, সেই সময় ভগবান শিব অনুচর সহিত আবির্ভূত হলেন । অযোধ্যার সেনাবাহিনীর সাথে শিবের অনুচরদের ধুন্ধুমার মারপিট আরম্ভ হল ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger