সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৫)



এরপর শ্রীরামচন্দ্র রাজ্য ভাগ করলেন । লবকে অয্যোধ্যার রাজা বানালেন। কুশকে নন্দিগ্রামের রাজা করলেন । ভরতের পুত্র তক্ষকে তক্ষশীলা আর ভরতের অপর পুত্র পুষ্কর কে পুষ্করাবতীর রাজা বানালেন । লক্ষ্মণের পুত্র চন্দ্রকেতুকে অশ্বদেশ আর লক্ষ্মণের আর এক পুত্র অঙ্গদকে মল্লদেশের রাজা করলেন । শত্রুঘ্নের দুই পুত্র শত্রুঘাতী ও সুবাহুকে মথুরা রাজ্য দুভাগ করে দুভাগের রাজা বানালেন । এভাবে সকলকে রাজা বানালেন ভগবান শ্রীরাম । ধীরে ধীরে সময় বয়ে গেলো। ত্রেতা যুগ সমাপনের পথে । দ্বাপর যুগ প্রতীক্ষারত । একদিন ব্রহ্মলোকে দেবতারা সকলে একত্র হয়েছেন। দেবতারা বললেন- “প্রজাপতি! প্রভু শ্রীবিষ্ণু কবে রাম রূপ ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠে আসবেন? ত্রেতা যুগ ত সমাপনের পথে।” ব্রহ্মা বললেন- হে দেবতাগণ তোমরা ঠিক বলেছ। আমার বিধানে রাম অবতারের সময় সীমা সমাপ্ত । কিন্তু যদি প্রভু শ্রীরাম আরোও মর্ত্যলীলা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে থাকবেন। তবুও বিধান রক্ষার জন্য আমি সেখানে কালদেবকে প্রেরণ করবো।” এই বলে ব্রহ্মা, কালদেবকে আহ্বান করলেন। ব্রহ্মা বললেন- “হে কালদেব! রাম অবতারের সময় সমাপ্ত। তুমি এখন সেই লীলা তরান্বিত করো।” এই বলে প্রজাপতি ব্রহ্মা বুদ্ধি দিলেন কালদেবকে। অপরদিকে প্রজাপতি ব্রহ্মা দুর্বাসা কে দেখা দিয়ে বললেন- “মহর্ষি দুর্বাসা। তোমার ক্রোধের কথা জগত বিদিত। মর্তলোকে শ্রীরাম অবতারের সময়সীমা সমাপন হয়েছে। শ্রীহরি যাহাতে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসতে পারেন, তাহার জন্য তোমাকে অগ্রনী ভূমিকা নিতে হবে ।” এই বলে প্রজাপতি ব্রহ্মা, মহর্ষি দুর্বাসাকে বুদ্ধি দিলেন। ব্রহ্মার ইচ্ছায় কালদেব একজন সাধু রূপ ধরে অযোধ্যায় আসলেন। সাধু এসেছেন শুনে লক্ষ্মণ গিয়ে ভগবান শ্রীরামকে সংবাদ দিলেন । ভগবান শ্রীরাম সাদরে আপ্যায়ন করে মুনির স্বাগত জানালেন। মুনির চরণ পূজা করে বসতে আসন দিলেন। বলিলেন- “হে মহর্ষি! আমি আপনার কিরূপে সেবা করতে পারি?” এই বলে ভগবান শ্রীরাম মুনিকে স্বাগত জানিয়ে গৃহে নিয়ে গেলেন। কালদেব বললেন- “হে শ্রীরাম! আমার আপনার সহিত অতি গোপনীয় কথা আছে। সেই কথা সবার সামনে প্রকাশ নিষেধ। সে কথা অন্যজনের শোনা নিষেধ। একটি শর্তেই আমি সেই কথা বলিব।” অবাক হলেন শ্রীরাম ।

সে কালপুরুষ কহে শুনহ বচন ।
যে কথা কহিব পাছে শুনে অন্য জন ।।
এ সময়ে যে করিবে হেথা আগমন ।
ব্রহ্মার বচনে তারে করিবে বর্জন ।।
( কৃত্তিবাস রামায়ণ )

কালদেব বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনার সাথে বার্তা চলাকালীন যদি কেহ আমাদের বার্তাকক্ষে প্রবেশ করে কিংবা বার্তা শ্রবণ করে, তবে আপনি তাহাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন। ইহাই শর্ত।” ইহা শুনে আশ্চর্য হলেন। এমন কি কথা থাকতে পারে। পাছে মুনিবাক্য না মানলে মুনি শাপ দেন। তাই ভগবান শ্রীরাম বললেন- “অবশ্যই মহর্ষি। আমি দাশরথি রাম এই প্রতিজ্ঞা করছি যে আমাদের কথা চলাকালীন যদি কেহ কক্ষে আসে, বা সেই কথা শ্রবণ করে- তবে তাহাকে বধ করবো।” কালদেব তখন লক্ষ্মণকে বললেন- “হে লক্ষ্মণ। তুমি সর্বদা তোমার বড় ভ্রাতার আজ্ঞা মেনে চলেছো। এমনকি বনে গিয়ে সেবা করেছো। যুদ্ধে রাক্ষস বধ করেছো। এমনকি তাঁর আজ্ঞাতেই সীতাদেবীকে বনে রেখে এসেছো। তুমি কক্ষের দ্বার প্রহরা দেবে। ভুলেও সেই কক্ষে যেনো কেউ প্রবেশ না করে। কেউ যেনো আমাদের কথা শ্রবণ না করে।” লক্ষ্মণ দ্বার প্রহরায় থাকলো। সেই সময় কক্ষে কেবল শ্রীরাম ও কালদেব। কালদেব নিমিষে ছদ্দবেশ ত্যাগ করে আসল রূপে এসে বললেন- “ভগবান! আপনি কি আপনার স্বরূপ ভুলে গেছেন ? আপনিই ত ক্ষীরোদ সাগড়ে নাগশয্যায় শায়িত ভগবান বিষ্ণু। আপনি মধু কৈটভ বধ করে মেদিনী সৃষ্টি করেছেন। আপনার নাভি থেকেই পদ্মযোনি ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছেন। হে নারায়ণ । সেই চতুর্মুখ ব্রহ্মা আমাকে এখানে প্রেরণ করেছেন । আপনার রাম অবতারের সময় সীমা সমাপ্ত হয়েছে। আপনি রাম অবতার ধারণ করার পূর্বে যেটুকু সময় নির্ধারিত করেছিলেন, তাহা সমাপ্ত। যদি আপনি আরোও মর্তে থাকতে চান তাহলে আপনি থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে তবে প্রজাপতির বিধান পরিবর্তন হবে। দেবতাদের প্রার্থনা আপনি এখন বৈকুণ্ঠে আগমন করুন।” ভগবান শ্রীরাম ভাবতে লাগলেন। সত্যি ত। রাম অবতারের সময় সীমা সমাপন হয়েছে। এই অবতারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তিঁনি কালদেবের সাথে এই নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন ।

এই সময় মহর্ষি দুর্বাসা আসলেন। ব্রহ্মার বুদ্ধিমতো কর্ম করছেন। মহর্ষি দুর্বাসাকে শ্রদ্ধা সহকারে ভেতরে আনা হল। লক্ষ্মণ কে ডেকে বললেন- “লক্ষ্মণ! এই মুহূর্তেই আমি শ্রীরামের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। তাহাকে জানাও যে আমি এসেছি।” কিন্তু শ্রীরামকে কিভাবে ডাকা সম্ভব! সেই ঘরে প্রবেশে মানা আছে। লক্ষ্মণ বিনম্র ভাবে বলল- “মহর্ষি! আপনি কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করে আমাদের সেবার সুযোগ প্রদান করুন। মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র খানিক ক্ষণ পরেই আসবেন।” শুনে দুর্বাসা মুনি ক্ষেপে গেলেন। বললেন- “তোমার সাহস ত মন্দ নয়। মহর্ষি দুর্বাসাকে প্রতীক্ষা করতে বল কোন সাহসে? অযোধ্যায় কি এইভাবে মুনি ঋষিদের বসিয়ে রেখে স্বাগত জানানো হয়?” লক্ষ্মণ অনেক বুঝালো। দুর্বাসা মুনি নারাজ। সেই মুহূর্তেই সাক্ষাৎ চাই। দুর্বাসা মুনি ক্ষেপে গেলেন। রেগে বলতে লাগলেন- “দেখো আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গো না। তুমি কি জানো না আমার শাপে দেবতারা শ্রীভ্রষ্ট হয়েছিলেন। আমার ক্রোধে প্রলয় হতে পারে। এইভাবে আমার অপমান করলে আমি মেনে নেবো না। অবিলম্বে শ্রীরামকে ডেকে আনো। নচেৎ আমি শাপ দিয়ে এই অযোধ্যা, অয্যোধ্যার সকল অধিবাসী, তোমাদের চার ভ্রাতা, তোমাদের এই রাজপুরী ভস্ম করবো।” লক্ষ্মণ দেখলেন দুর্বাসা মুনির চোখ দিয়ে যেনো আগুন ঝড়ছে। রাঙা ক্রোধী চোখ। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্র সেই কক্ষ প্রবেশে মানা করেছেন। যে যাবে , তাকেই মৃত্যু দন্ড দেবেন। সেই ঋষি এমনই শর্ত দিয়েছেন। আজকেই বা দুই দুই জন ঋষি আসলেন কেন ? দুর্বাসা মুনি বললেন- “তুমি কি এখুনি রামচন্দ্রকে ডেকে আনবে, নাকি আমি শাপ দিয়ে ভস্ম করবো?” লক্ষ্মণ দেখলেন এই মুহূর্তে দুর্বাসা মুনির দাবী না মানলে গোটা অযোধ্যা ভস্ম হবে। অপরদিকে শ্রীরামচন্দ্রের কক্ষে যে যাবে সে মৃত্যুর শাস্তি পাবে। লক্ষ্মণ ভাবল তার মৃত্যুতে ত অযোধ্যা বাঁচবে। দশের বদলে একের মরণই শ্রেয়। এই ভেবে লক্ষ্মণ সেই মন্ত্রণা কক্ষে ঢুকে পড়লেন। লক্ষ্মণকে দেখেই কালদেব অদৃশ্য হল। কক্ষে ঋষির বদলে দেবতাকে দেখে লক্ষ্মণ অবাক হলেন। শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “হাঁ লক্ষ্মণ! তুমি এ কি করলে?”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger