সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব- ৪৭)



বিভীষন আসলেন। সুগ্রীব, জাম্বুবান, নল, নীল, অঙ্গদ, গবাক্ষ, মৈন্দ , দ্বিবিদ আদি সব বানরেরা আসলেন। হনুমান শ্রীরামের লীলাত্যাগ শুনে খুবুই রোদন করতে লাগলেন । প্রভু শ্রীরামের চরণে পড়ে বললেন- “প্রভু! আপনার বিহনে আমি বা কিরূপে থাকবো? এ কেমন সিদ্ধান্ত? অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত ত্যাগ করুন। কিছুতেই আপনাকে দেহ রাখতে অনুমতি দিতে পারি না।” শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “বতস্য হনুমান! আমি নিত্য। আমি জন্ম মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। হনুমান ! আমি আমার ভক্তদের ছেড়ে কোথায় থাকি ? যেখানে আমার ভক্তেরা আমাকে আহ্বান করেন, আমি সেইখানেই অবস্থান করি। আমার ভক্তের মধ্যেই আমি বিরাজ করি। তুমি নিজে বক্ষ বিদীর্ণ করে জগতকে এই শিক্ষাই ত দিয়েছো? তুমি এখন রোদন করছ? হনুমান। মানব কদাপি অমর হয় না। যে জন্মে সে একদিন দেহ রাখে। ইহাই সত্য। ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে শিশু ত ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যায়। প্রতি শ্বাস, প্রতি ক্ষণ তাহাকে ক্রমশ মৃত্যুর দিকেই নিয়ে যায়। সুতরাং এই শরীর আমাকে ত্যাগ করতে হবে।” এই বলে শ্রীরামচন্দ্র , হনুমান সহ বিভীষণ, সুগ্রীব, জাম্বুবান, নল, নীল, অঙ্গদ সকলকে এই অমৃত বার্তা প্রদান করলেন । সুগ্রীব বললেন- “প্রভু! আমি অঙ্গদকে কিস্কিন্ধ্যার রাজা করে এসেছি। আপনার সহিত আমিও গমন করবো। ইহাতে নিষেধ করতে পারবেন না। ইহাই আমার দৃঢ় সঙ্কল্প ।” ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সেই ইচ্ছা মেনে নিলেন । এরপর ভগবান শ্রীরাম বিভীষণকে বললেন- “বিভীষণ তুমি ইক্ষাকু কুলের দেবতা সূর্যনারায়ন জগন্নাথের আরাধনা করো। ইহাতে তোমার পরম মঙ্গল হবে।” সকলে রোদন করতে লাগলেন। শ্রীরাম সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “ জাম্বুবান, অঙ্গদ , দ্বিবিদ, মৈন্দ, বিভীষণ তোমরা যতদিন কলিকাল না আসে ততদিন ধরণী তে থাকো। জাম্বুবানের সাথেই তোমরা থাকো।”

এরপর এলো সেই লীলা সংবরণের দিন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বললেন- “হনুমান। তুমি চার যুগে অমর। এই কথা বিস্মৃত হয়ো না। লব ও কুশ সহ অয্যোধ্যার রাজকুমারদের দেখো। আগামী যুগে তোমার পূজা প্রচলন হবে। তোমার অনেক মন্দির স্থাপনা হবে।” হনুমান রোদন করতে করতে বলল- “না প্রভু! সেবকের কেন পূজা হবে? আমি আমার পূজা চাই না। আপনার চরণ ভিন্ন আমার অন্য কিছু অভিলাষ নেই।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হনুমান! মানুষের বিশ্বাস এর রূপ হচ্ছে মন্দির । মন্দিরের বিগ্রহ মানুষের বিশ্বাসেই নির্মাণ হয়। ঈশ্বর সর্বব্যাপী। তবুও মানুষ তাহাকে সেই রূপেই পূজা করেন, যেই রূপে শাস্ত্রে ব্যাখা হয়। তুমি ত্রানকর্তা, তুমি সংকটমোচন , তুমি মহাবীর। যারা তোমাকে পূজা করবে, আমি স্বহস্তে তাঁহাদিগের ভববন্ধন মোচন করে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যাবো। তোমার ভক্তদের ওপর সর্বদা আমার কৃপা বর্ষণ হবে। তোমাকে ভগবান রূপে প্রকাশ হতেই হবে। তুমিই ধর্মের রক্ষা করবে। অধর্মের থেকে ধর্মকে ত্রান করবে। বিপদে পড়ে যে তোমার স্মরণ করবে তুমি তাহাকে রক্ষা করবে। তুমিই মুক্তি প্রদান করবে।” হনুমান অশ্রু মোচন করতে লাগলেন । রোদন করতে করতে বললেন- “প্রভু! আপনার দর্শন কবে পাবো? কবে আপনার সেবার সুযোগ পাবো?” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হনুমান! দ্বাপরে আমি আবার অবতার গ্রহণ করে আসবো। তখন তোমার সাথে আমার আবার সাক্ষাৎ হবে। কথা দিলাম। তোমাকে আমি দ্বাপর যুগেও ‘রাম’ রূপে দর্শন দান দেবো। তোমাকে সেবার সুযোগ দেবো। হনুমান, বৈকুণ্ঠের দ্বার তোমার জন্য অবাধ। তোমার যখন ইচ্ছা বৈকুণ্ঠে এসে আমার দর্শন করতে পারবে।” হনুমান বললেন- “প্রভু! আমি জানি, আপনিই স্বয়ং নারায়ন। আপনার এই ‘রাম’ রূপ আমার হৃদয়ে অবস্থিত। কৃপা করে সদা সর্বদা আপনি এই ‘রাম’ রূপেই মাতা সীতা সহিত বিরাজ করবেন। এই প্রার্থনাই জানাই। যেখানে যেখানে আপনার লীলা, আপনার কীর্তন , রামায়ন পাঠ হবে – সেখানে আমি অবস্থান করবো। এই আপনাকে কথা দিলাম। ” শ্রীরাম সম্মতি প্রদান করলেন । নারায়ন, কৃষ্ণ, রাম সকলেই এক। যে তাঁহাকে যেই রূপে হৃদয়ে স্থান দেন, তিঁনি সেই রূপেই আসেন। রামভক্তের নিকট তিঁনি সর্বদা ধনুর্বাণ ধারী শ্রীরামচন্দ্র।

এই বলে শ্রীরামচন্দ্র রাজপুরী ছেড়ে বের হলেন। পেছনে ফেলে রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি । মনে পড়লো কত পুরানো ঘটনা। বাল্যকাল থেকে এক এক করে সব মনে পড়লো। সকলেই ত স্বর্গ চলে গেছেন। ধরিত্রীর এই নিয়ম। যে আসে, তার গমন নির্ধারিত হয়েই যায়। এক এক করে সবাই চলে গেলো। অযোধ্যার অনেক বৃদ্ধ, কাণা , খোঁড়া ছুটে এলো। অনেক পুরুষ নারী এলো। সকলে শ্রীরামের সাথে যেতে চাইলেন। কিন্তু শ্রীরাম প্রথমে রাজী না হলেও, পরে ভক্তের কাছে রাজী হলেন । ভরত, শত্রুঘ্ন চললেন। সুগ্রীব চললেন। সকলের চোখে জল । হনুমান কাঁদছেন। শ্রীরামচন্দ্র বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, অগ্যস্ত ও অনান্য মুনিদিগকে একে একে সকলের কাছে প্রণাম জানালেন। মুনি- ঋষি- ব্রাহ্মণ দের ভূমি, গো, ধন সম্পদ দান করে আশীর্বাদ নিলেন। এরপর হনুমানকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “হনুমান। তুমি আমার ভক্তদের সর্বদা রক্ষা করবে।সকলের কাছে আমার ভক্তি বিতরণ করবে। যখন যখন ধর্মের অবক্ষয় হবে, অধর্মের প্রাদুর্ভাব হবে তখন তখন আমি এই ধরণীতে আসবো।” তারপর সরয়ূর ঘাটে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ধীরে ধীরে জলে নামলেন শ্রীরাম, ভরত, শত্রুঘ্ন । চলে গেলেন সোজা মাঝ নদীতে । আকাশে দেবতাবৃন্দ উপস্থিত হয়ে বিবিধ বাদ্য বাজনা বাজাতে লাগলেন। মাঝ নদীতে গেলে যোগ সমাধি দ্বারা ভরত ও শত্রুঘ্নের তেজ , শ্রীরামের বৈষ্ণবতেজে মিলিত হইল। দেবতারা পুস্পাদি বর্ষণ করতে লাগলেন । প্রজারা একে একে এসে সরয়ূর জলে প্রবেশ করলেন। দেহ ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠ গমন করলেন। অবশেষে যোগ সাধনা দ্বারা শ্রীরামচন্দ্র দেহ রাখলেন । হনুমান দেখলেন অপূর্ব দিব্য তেজ সরয়ূর গর্ভ থেকে উঠে চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি ধারণ করে মহাকাশে বীলিন হলেন । সুগ্রীবও দেহ রাখলেন । ভগবানের লীলা কদাপি সমাপ্ত হয় না। ভগবানের জন্ম মৃত্যু বলেও কিছু হয় না। তিঁনি আবির্ভূত হন। আমাদের সুশিক্ষা প্রদান করেন। তাই আমাদের মাঝেই আসেন। আবার লীলান্তে লীলা সংবরণ করেন। কিন্তু ভক্তের শ্রদ্ধা বিশ্বাসে তিঁনি নিত্য বিরাজিত। নিত্য লীলা করেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger