সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –২৯)


মহর্ষি বাল্মিকী বললেন- “পুত্রী! আমি সর্ব ভাবে চেষ্টা করবো, যাহাতে অযোধ্যাবাসীরা নিজের ভ্রম সংশোধন করে তোমার নিকট ক্ষমা চায়। ইহা হইলে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র তোমাকে অযোধ্যা নিয়ে যাবেন। লব ও কুশ পিতার স্নেহ প্রাপ্তি করবে। আমি লব ও কুশকে নিয়ে সে অশ্বমেধ যজ্ঞে গমন করবো। সেখানে লব ও কুশ রামায়ণ সঙ্গীত বিশেষ করে তোমার কথা সঙ্গীতাকারে সকলকে শ্রবণ করাবেন। অজ্ঞাতে হইলেও পিতা ও পুত্রের সাক্ষাৎ হবে।” এই বলে সীতাদেবীকে সান্ত্বনা দিলেন মহর্ষি বাল্মিকী। মহর্ষি বাল্মিকী জানতেন এর অন্তিম পরিণতি কি হবে। তবে তিনি সামান্য চেষ্টা করছিলেন যাহাতে সীতাদেবীর সকল দুর্ভাগ্যের অবসান হয় । অপরদিকে নিমিষারণ্যে যজ্ঞ মন্দির নির্মাণ হল ।

আশী যোজনের পথ করে আয়তন ।
তাহাতে বিচিত্র কুণ্ড করিল গঠন ।।
একমাসে পুরীখান করিল নির্মাণ ।
বিশ্বকর্মা চলিয়া গেলেন নিজ স্থান ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

এই ভাবে যজ্ঞকুণ্ড নির্মাণ হল। এমন কথিত আছে সীতাদেবীর স্বর্ণ মূর্তি এক অন্ধ শিল্পী গঠন করেছিলেন । সেই অন্ধশিল্পী কেবল সীতাদেবীর বর্ণনা শুনেছিলেন । সীতাদেবীর স্বর্ণ মূর্তি দেখে সকলে তাজ্জব হয়ে গেলো। সেই মূর্তিকে যদি মানবীর ন্যায় অঙ্গ বর্ণ প্রদান করা হত, মনে হত যেনো সাক্ষাৎ সীতাদেবী সেখানে বসে আছেন। কথা কইবেন – এমন । সেই মূর্তি অলঙ্কারাদি আভূষণ দ্বারা সজ্জিতা করা হল । সেই অন্ধ শিল্পী তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলো এর পর। ভাবতে অবাক লাগে- এক রাজা তাঁর পত্নীর সৌধ নির্মাণকারী কারিগরদের হাত কেটে নিয়েছিলেন- অপরদিকে অয্যোধ্যার রাজা মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র শিল্পীকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়ে পুরস্কৃত করলেন । এই ভাবে যজ্ঞের সমস্ত কিছু আয়োজন করা হল। রাজ্য রাজ্য থেকে মিত্র রাজারা উপঢৌকন সহ অযোধ্যায় আসতে লাগলেন। দলে দলে চতুর্বর্ণের লোকেরা অযোধ্যায় আসলো।

ভিক্ষুক আসলো। যত নর নারী আসলো। সকলকে শাস্ত্র মতে দান করা হতে লাগলো। সকলের মুখে আনন্দ। যে যাহা খাদ্য চাইলো, তাহাই পাইলো। বস্ত্র- আভূষণ- ভূমি- গো- গৃহ যার যা ইচ্ছা তাহাই দান পাইতে লাগলেন । অযোধ্যা নগরী থেকে নিমিষারণ্য পর্যন্ত সেজে উঠলো। পবিত্র কলস ও কদলী বৃক্ষ, নানা রঙের নেতের পতাকা, ঘণ্টা দ্বারা গৃহ গুলি সজ্জিত হল। পথে পথে নান রঙের রঙ্গলী বানানো হল । স্থানে স্থানে আনন্দ- নৃত্য- গীত চলতে লাগলো। মুনি, ব্রাহ্মণেরা বৃহৎ শিষ্য নিয়ে আসলেন। সকলের আনন্দ। সকলে এমন সুন্দর ব্যবস্থা দেখে ধন্য ধন্য করতে লাগলো। হনুমান সকল দায়িত্ব সামলাচ্ছেন । পূর্বে শ্রীরামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ রাজা সগর এর অশ্বমেধ যজ্ঞ পণ্ড করেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। হনুমান স্থির করলো এবার ইন্দ্র চালাকী করলে গদা দিয়ে তাহার মস্তক চূর্ণ করে দেবেন । আসতে আসতে কেশরী, জাম্বুবান, নল- নীল, হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ পুরো কটক সহ আসলেন। সকলকে স্বাগত জানালেন ভগবান শ্রীরাম। নিষাদ রাজ গুহককে সাদরে সম্মান জানালো হল। জনক রাজা আসলেন। কৌশল, কেকয়, সিংহল থেকে রাজা আসলেন । সকলে আনন্দে উৎসবে সামিল হলেন । অগণিত অতিথি আসলেন । বিভীষণ তাহার পত্নী সরমা সহ আসলেন। আসলেন তার সাথে রাক্ষস । রাক্ষস দেখে সকলের ভয়ে প্রাণ উড়লো। ভাবল এই বুঝি পুনঃ নর মাংস আহার করে। মুনি- ঋষিরা রাবণের তাণ্ডবের কথা স্মরণ করে ভীত হলেন। কিন্তু রাক্ষসেরা মুনি ঋষিদের চরণ ধুয়ে পূজা করলো। অসুর গুরু শুক্রের সাথে অসুরেরা আসলো- তাহাদিগকেও সসম্মানে আসন দেওয়া হল। এক সাথে রাক্ষস- মানব- অসুর- বানরেরা বসলো। কোন হিংসা অথবা মারপিট অথবা কোলাহল অথবা ভয় নেই। একে যেনো অপরের সখা। এই অসাধ্য সাধন হয়েছিলো ভগবান শ্রীরামের কৃপায়।

বড় বড় যত মুনি আছেন ভুবনে ।
একে একে সব মুনি আইল সেস্থানে ।।
জমদাগ্নি আইল ভার্গব পরাশর ।
সাবর্ণ কশ্যপ আদি আইল মুনিবর ।।
ভরদ্বাজ হস্তদীর্ঘ আইল শীঘ্রগতি ।
আইল দুর্বাসা মুনি বড় ক্রোধমতি ।।
আইল আস্তিক মুনি গৌতম ব্রাহ্মণ ।
মৎস্যকর্ণ আইলেন ঋষি সঙ্গোপন ।।
পর্বত হইতে এল দক্ষ- মহামুনি ।
আইল ঐ ষিল কুশধ্বজ মহাজ্ঞানী ।।
বিষ্ণুপদ – মুনি আইল ঔর্ব্য ও চ্যবন ।
সনাতন সনক আইল দুই জন ।।
করিল শাণ্ডিল্য গর্গ্য মুনি আগুসার ।
আইল কপিল মুনি বিষ্ণু অবতার ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

এছাড়াও বশিষ্ঠ সহ সপ্তর্ষি, বিশ্বামিত্র , অগ্যস্ত, মার্কণ্ড, যাজ্ঞবল্ক্য , বিশ্রবা, কাত্যায়ন, কণ্ব আদি সকল মুনি ঋষিরা বৃহৎ শিষ্যমণ্ডলী সহ আসলেন। সকলে নানা বিষয়ে একত্রিত হয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। শ্রীরাম সকল মুনি ঋষি ও ব্রাহ্মণ দিগকে পূজা করলেন। লক্ষ্মণ কে বললেন- “ভ্রাতা! মহর্ষি বাল্মিকী অনুপস্থিত কেন? তুমি ওনাকে যথাবিধি অনুসারে আমন্ত্রণ করেছিলে ত?” লক্ষ্মণ জানালো আমন্ত্রণ করা হয়েছে । যজ্ঞের আয়োজন দেখে মুনি ঋষিরা ধন্য ধন্য করে জানালেন সকল কিছুই শাস্ত্র সম্মত হয়েছে । কৃষ্ণ বর্ণের এক অশ্বকে যজ্ঞের অশ্ব রূপে নির্বাচিত করা হয়েছিলো। সমস্ত রাজ্য ঘুরে এলে সেই অশ্বকে উৎসর্গ করে তাহার মাংস যজ্ঞ দেবতাকে উৎসর্গ করা হবে । অশ্বমেধ যজ্ঞের ইহাই নিয়ম । সকলে সোনার সীতা মূর্তি দর্শন করালেন । ঘোমটা দ্বারা তাহার মুখ আচ্ছাদিত করে রথে চড়িয়ে যজ্ঞস্থানে নিয়ে যাওয়া হল। ভগবান শ্রীরাম প্রথমে বশিষ্ঠ – ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র ও অগ্যস্ত মুনিকে পূজা করলেন । গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে যজ্ঞ আরম্ভ করতে চাইলেন । বশিষ্ঠ মুনি আদেশ দিলেন।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger