সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ৪৭ )

এরপর ভগবান শ্রীরাম বহুভাবে দেবীর স্তুতি করলেন । দেবী প্রসন্ন হলেন । দেবী বললেন- “হে শ্রীরাম! আপনার স্তবে আমি প্রসন্না হয়েছি। আপনি বর প্রার্থনা করুন!” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “হে মহামায়া! তোমার কৃপায় যেনো আমি রাবণ বধ করতে পারি। আর সেঁতুবন্ধে আমার ইষ্ট ‘রামেশ্বর’ জ্যোতিরলিঙ্গের ধামে আপনি ‘রামেশ্বরী’ নামে বিরাজিতা হোন।” দেবী বললেন- “তথাস্তু! তাই হবে। আমি রামেশ্বরী নামে সেঁতুবন্ধে আজ থেকে বিরাজিতা হইলাম । আর রাবণের আয়ু আর স্বল্প দিন আছে। তার নাশ আপনার হস্তেই হবে। আমি মায়া দ্বারা রাবণের বুদ্ধি ভ্রষ্ট করবো। সে নিজেই আমাকে ত্যাগ করবে।” তাহার পর মহামায়া হনুমানকে বললেন- “হনুমান! তুমি রাবণের চণ্ডীপাঠে ভ্রম উৎপন্ন করবে। অশুদ্ধ চণ্ডীপাঠের জন্য রাবণ আমার কৃপা হতে বঞ্চিত হবে।” এই ভাবে নানান কথা বলে মহামায়া প্রস্থান করলেন । অপরদিকে রাবণ গুপ্তচর শুক আর শারণের কাছে সংবাদ প্রাপ্ত করলো যে রামচন্দ্র দেবীর কৃপা প্রাপ্তি করেছে। সে ভাবল পাছে মহামায়া , রামের পক্ষে যান- তাই সে নিশাকালে দেবগুরু বৃহস্পতি কে ডেকে চণ্ডীপাঠের আয়োজন করলো । এমন প্রবাদ আছে নিশাকালে চণ্ডীপাঠ নিষেধ। মতান্তরে বলা হয়- চণ্ডীর দেবীসুক্ত ও রাত্রিসুক্ত পড়ে নিশাকালে চণ্ডী পড়লে দোষ খণ্ডন হয় । দেবগুরু বললেন- “রাবণ! নিশাকালে চণ্ডী পাঠ নিষিদ্ধ। এই অশাস্ত্রীয় কাজ আমি করবো না।” ক্রোধে রাবণ বলল- “স্তব্ধ হও দেবগুরু! যদি চণ্ডী পাঠ না করো, তাহলে তোমার এমন অবস্থা করবো যে জীবনে আর কোন মন্ত্র পাঠ করতে পারবে না। তোমার জিহ্বাই ছেদন করে দেবো।” ভয়ে ভয়ে দেবগুরু বৃহস্পতি চণ্ডীপাঠ আরম্ভ করলেন । হনুমান করলেন কি – মক্ষী আকৃতি হয়ে চণ্ডীর পৃষ্ঠায় বসে চেটে দিয়ে কালি মুছে দিলেন –

যথা বৃহস্পতি আছে , উপনীত তাঁর কাছে ,
একমনে করে চণ্ডীপাঠ ।।
মক্ষিকার রূপ ধরে, চাটিলেন দ্বি অক্ষরে ,
দেখিতে না পান বৃহস্পতি ।
অভ্যাস আছিল তায়, পড়িল অবহেলায় ,
হনুমান সচিন্তিত অতি ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

অক্ষর গুলো মাঝখান থেকে চেটে কালি তুলে দিলেন হনুমান । মাত্রা, ইকার, দীর্ঘিকার – ইত্যাদি সকল ভুলভাল পড়ে গেলেন বৃহস্পতি । চণ্ডী পাঠে অক্ষর ভুল হলে অপরাধ হয়। সেজন্য চণ্ডীপাঠের শেষে ক্ষমা প্রার্থনা অধ্যায় পড়তে হয়। শুধু চণ্ডী নয়- যে কোন শাস্ত্রই কি গীতা কি উপনিষদ কি স্ত্রোত্র – ভুলভাল ভাবে পড়লে অপরাধ হয়। সেজন্য স্তব পাঠের পর ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। সেজন্য পূর্ব কালে জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ ভিন্ন অপর কারোর শাস্ত্র পাঠে অধিকার ছিলো না। কারণ সেই যুগে ব্রাহ্মণ, টোলে যেতে পারতো- শূদ্রে পারতো না । যাই হোক ভগবতী তখন রাবণের ওপর ক্ষিপ্ত হলেন। আর বৃহস্পতি চণ্ডীপাঠ অসমাপ্ত করেই প্রস্থান করলেন । রাবণ ক্ষিপ্ত হয়ে দেবী ভদ্রকালীকে নানান কুকথা বলে বললেন- “হে দেবী! তুমি শেষে রামের পক্ষ নিয়ে তাকেই বিজয় হবার বর দিলে ? আমার পূজায় কি কম ছিলো ? তবে কেন আমার শত্রুকে বর দিলে? যাও আর তোমার কৃপার দরকার নেই আমার। যখন আমার শত্রুর পক্ষ নিয়েছো- তখন তার সাথেই থাকো। আজ তোমাকে মুক্ত করলাম । আমাকে কৃপা করার তোমার আর দরকার নেই।” মন্দোদরী বললেন- “একি করছেন নাথ! ভগবতীকে ত্যাগ করছেন ? এই সেই ভগবতী- যিঁনি আপনাকে রক্ষা করেছেন । না হলে শ্রীরামের বাণে আপনার সর্বনাশ হতো। ভুলেও এই ভুল করবেন না। ”

রাবণ বলল- “যেই দেবী আমার শত্রুর পক্ষ নেয়- সে আমার শত্রু। কারণ শত্রুর মিত্র শত্রুই হয়। আর আমি সেই শত্রুর সহায়তা চাই না। আমি ত্যাগ করে দিলাম ভগবতীকে।” ভগবতী এমন চাইছিলেন। তিনি প্রসন্না হয়ে বললেন- “তথাস্তু রাবণ! আমি আর তোমাকে রক্ষা করতে আসবো না। সকল বন্ধন থেকে আমাকে মুক্ত করে দিলে তুমি।” এই বলে ভগবতী প্রস্থান করলেন কৈলাসে। দেবাদিদেব প্রসন্ন চিত্তে বললেন- “দেবী! তোমার এই মুক্তিতে আমি আনন্দিত। ত্রিলোকে এবার রাবণের পাপীছায়া দূর হবে। আর কেহ রক্ষা করবে না।” সপ্তমীর প্রভাত আসলো । দেবরাজ ইন্দ্র তখন মাতলিকে বললেন- “মাতলি। তুমি শীঘ্র দিব্য রথ নিয়ে রঘুনাথের সম্মুখে অবস্থিত হও।” মাতলি সেই দিব্য রথ নিয়ে লঙ্কায় উপস্থিত হল। ভগবান শ্রীরামকে স্তবস্তুতি করে বললেন- “হে রঘুনাথ! এই রথ , ধনু , কবচ, দিব্যাস্ত্র সকল দেবতারা আপনাকে প্রদান করেছেন।” ভগবান শ্রীরাম অসম্মত হলেন কারণ চতুর্দশ বৎসর তিনি রাজকীয় রথে উঠবেন না। তখন মাতলি বলল- “হে ভগবন! দেবতাদের প্রদত্ত দ্রব্য পার্থিব দ্রব্যে গণ্য হয় না। পিতামহ ব্রহ্মা এমন বলেছেন। অতএব আপনি শীঘ্র এই রথে আসীন হোন। আমার সারথ্য কৌশলে রণক্ষেত্রে দেবেন্দ্র যেভাবে অসুর নিধন করেন, সেই রূপ আপনি লঙ্কারাজ রাবণকে বিনাশ করবেন। হে রঘুবর ! এই রথের দুটি চক্র চন্দ্র আর সূর্য, রজ্জু স্বয়ং শেষনাগ, এ এক দিব্যরথ। আপনি এতে আসীন হন ।” ভগবান শ্রীরাম সেই রথে আসীন হলেন। তারপর উপস্থিত হলেন অগ্যস্ত মুনি। অগস্তের নির্দেশে ভগবান শ্রীরাম আদিত্যহ্রদয় স্তব পাঠ করলেন । তারপর ভগবান শ্রীরাম বানর সেনাদের বললেন- “বানর সেনারা ! আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার নিমিত্ত আপনারা স্বজন, রাজ্য ছেড়ে এখানে এসে লড়ছেন। যুদ্ধে আপনাদের অনেক সঙ্গসাথী হতাহত হয়েছে। অঙ্গহানি হয়েছে। তবুও আপনাদের সকলের সহায়তায় আজ রাবণের সমস্ত বীর যোদ্ধাকে বধ করা সম্ভব হয়েছে। আজ সেই রাবণের সাথে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আপনাদের সহায়তা একান্ত ভাবে কামনা করি। ইতিহাস বলবে যে বানর বাহিনীর সহায়তা নিয়েই এই দাশরথি রাম লঙ্কাকে পরাজিত করতে পেরেছেন। এই শ্রীরাম আপনাদের কাছে সদা কৃতজ্ঞ থাকবে।” এই বলে ভগবান শ্রীরামের আদেশে আক্রমণ করা হল। লঙ্কার দ্বার খুলতেই রাক্ষসেরা বের হল ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger