সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( উত্তরকাণ্ড পর্ব –৩৫ )

ভগ্নদূত বিষন্ন হয়ে অযোধ্যা চলে গেলো। মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র শত্রুঘ্ন আদি সেনা অশ্ব কে দেখতে না পেয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করলো। দূত সব কিছু ব্যক্ত করলো। বলিল- “মহারাজ! মহর্ষি বাল্মিকীর সহিত যে দুইজন বালক এসেছিলো তাহারা কেবল সঙ্গীত শিক্ষা নয়, অস্ত্র শিক্ষাও উত্তম রূপে প্রাপ্তি করেছে। তাহারাই অশ্ব আটক করে রেখেছে। শ্রীশত্রুঘ্ন তাহাদের হস্তে পরাজিত হয়ে নিদারুন আহত হয়েছেন। দুই বালক একাই বহু সেনা নাশ করেছে। মহর্ষির আশ্রমে রক্ত নদীর ধারা প্রবাহিত হয়েছে।” ভগবান শ্রীরাম অবাক হলেন। সকল পার্ষদেরা অবাক হল। ঐ দুই কোমল বালকের এত শক্তি যে লবণ অসুর বধকারীকে মূর্ছিত করে বহু বীর সেনা নাশ করেছে! তাহাদের বয়সী বালকেরা সামান্য ধনুর্বাণ তুলতেই পারে না। আর তাহারা দিব্যাস্ত্র সকল চালনা করছে। কে সেই বালক? মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র কিছুক্ষণ ভাবলেন । ভরত এসে বলল- “অগ্রজ! পূর্বে একবার আমদিগের বংশের পূর্বপুরুষ রাজা সগরের অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব দেবরাজ পুরন্দর হরণ করে যজ্ঞ পণ্ড করেছিলেন। বোধ হয় দুই বালকের বেশে কোন দেবতা আবির্ভূত হয়েছে। শত্রুঘ্নকে পরাজিত করেছে তাহারা। কিন্তু ভরতের বিক্রম দেখেনি। কৃপা করে আমাকে অনুমতি দিন। আমি অশ্ব ফিরিয়ে আনবো।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “যাও ভ্রাতা! তবে দুই বালক কে বধ করবে না। প্রথমে তাহাদের প্রলোভন দেখিয়ে অশ্ব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেবে। যদি না মানে তবে তাহাদিগকে বন্দী করে অশ্ব নিয়ে আসবে।” তিন অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে ভরত গমন করলো। সকলে দুই বালকের প্রতাপের কথা শুনে অতি বিস্মিত হল। তপোবনে আশ্রম বালকেরা সেই যজ্ঞ অশ্ব নিয়ে খেলা করছিলো। মাতা সীতা দেবী কিছুই জানেন না। তিঁনি দুর্গা দেবীর ব্রত করছিলেন । দুই বালক ধনুর্বাণ উঁচিয়ে অশ্ব প্রহরা দিতে লাগলো।

হঠাত দেখলো সামনে জঙ্গল কাঁপিয়ে কোটি কোটি সেনা আসছে। হস্তীগুলির পদচালনায় মেদিনী কাঁপছে। অশ্বের খুঁড়ের সাথে সাথে ধূলির ঝড় উঠেছে। অসংখ্য সেনার কোলাহলে বৃক্ষের পাখ পাখালী ভয়ে আকশে উড়ে যাচ্ছে। রথের চাকার আওয়াজ ক্রমাগত শোনা যাচ্ছে । ভরত সেই সময় তিন অক্ষৌহিণী রথ নিয়ে আসলো। ভরত দেখলো চারপাশে সেনাদের দেহ, হস্তী- অশ্ব ও রথের ভগ্ন টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । মনে হয় যেনো এখানে শক্তিশালী দুই রাজার যুদ্ধ হয়েছে । কে বিশ্বাস করবে যে ঐ দুই বালক মিলে এত সেনা নাশ করেছে । ভরত মিষ্ট ভাষায় বলল- “বালক! তোমদের দেখে কোনরূপ ক্রোধ নয় বরং স্নেহ উৎপন্ন হচ্ছে। তোমাদের দেখে আমার হৃদয় বিগলিত হচ্ছে । তোমরা অতি বালক। জানি ক্রীড়াচ্ছল্লে অশ্ব আটক করে তোমরা আমার ভ্রাতা শত্রুঘ্ন কে মূর্ছিত করেছ। তোমরা বীর। কিন্তু এই অশ্ব সাধারণ অশ্ব নয়। ইহা অযোধ্যা সম্রাট মহারাজ শ্রীরামচন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব। ইহা ফিরিয়ে দাও- নচেৎ যজ্ঞ সফল হবে না । তোমরা চাইলে এখুনি আমি তোমাদের এইরকম সদৃশ শত অশ্ব প্রদান করবো। তোমরা তাহা নিয়ে ইহা ফিরিয়ে দাও।” লব ও কুশ বলল- “অশ্ব আমরা কেবল মহারাজ শ্রীরামচন্দ্রকে ফিরিয়ে দেবো। আপনাকে নয়। ওঁনাকে যুদ্ধে আসতে বলুন। দেখি উনি কেমন বীর। আমাদের বালক বলে উপহাস করছেন, যুদ্ধের সময় ইহার সমুচিত উত্তর দেবো। সাপ ছোট হোক আর বড়- উভয়ের বিষ প্রাণঘাতী হয়। সুতরাং আমাদের বালক বলে উপহাস না করে যুদ্ধ করুন বা অযোধ্যায় ফিরে মহারাজ শ্রীরামচন্দ্রকে যুদ্ধে প্রেরণ করুন।” লব কুশের এমন উত্তর শুনে ভরত ক্রোধাম্বিত হল। বলল- “তোমরা বড় দাম্ভিক বালক। তোমরা বরং হস্তে সঙ্গীতের জন্য বীনা ধারণ করো। তোমাদের এই বয়স যুদ্ধ করবার জন্য নয়। সুতরাং অবাধ্য না হয়ে শান্তি মতো অশ্ব ফিরিয়ে দাও।” লব কুশ বলল- “আপনি বাক্যবাণ প্রয়োগ না করে ধনুক থেকে বাণ নিক্ষেপ করুন- দেখি আপনি কেমন বীর আর দেখি এই যুদ্ধে কে পরাজিত হয়!”

ভরতের ইশারা তে অয্যোধ্যার সেনারা পাশ, রজ্জু নিয়ে লব কুশকে বন্দী করতে অগ্রসর হলে লব ও কুশ বায়ুবাণ নিক্ষেপ করলো। উভয়ের অস্ত্রে বণে যেনো প্রলয় ঝড় উঠলো। বড় বড় বৃক্ষগুলি হেলে গিয়ে যেনো ভূমি স্পর্শ করলো এত সেই প্রলয় বায়ুর তেজ। সেই সকল সেনারা বহু ঊর্ধ্বে উঠে ভূমিতে পড়ে পঞ্চত্ব লাভ করলো। অনান্য সেনারা হৈ হৈ করে ছুটলো। লব ও কুশ পর্বত বান নিক্ষেপ করা মাত্রই বিশাল এক পর্বত গগন থেকে সশব্দে তাহাদের ওপর পতিত হল। ভরত এই যুদ্ধ দেখে অবাক । লব ও কুশ “চক্রবাণ” নিক্ষেপ করে সেনা সকল, হস্তী, অশ্ব গুলি দ্বিখণ্ড করলো। রথ গুলি টুকরো হল। অয্যোধ্যার সেনারা বর্শা, শর, গদা নিক্ষেপ করলো। আকাশ অন্ধকার হয়ে সেগুলো আসতে থাকলে লব ও কুশ অগ্নিবাণে সেসকল ভস্ম করে দিলো। সেই সকল অস্ত্র ভস্ম হয়ে বাতাসে মিলে গেলো। ভরত ধনুক থেকে লক্ষ লক্ষ বাণ নিক্ষেপ করে চারপাশে ঢেকে দিলো, পালটা লব ও কুশ লক্ষ বাণ নিক্ষেপ করে সে সকল অস্ত্র চ্ছেদন করলো। ভরতের দিব্যাস্ত্র সকল চূর্ণ করলো। ভরত ভাবল এবার অতি ক্ষমতাসম্পন্ন দিব্যাস্ত্র সকল নিক্ষেপ করতে। ভরত অর্ধচন্দ্র ও চক্রবাণ নিক্ষেপ করলো। লব ও কুশ সূর্যবাণ ও তেজবাণ নিক্ষেপ করে ভরতের অস্ত্র ধ্বংস করলো। ভরত একে একে যমবাণ, অগ্নিবাণ, সূচীমুখ, শিলামুখ অস্ত্র সকল ছুঁড়তে লাগলো। লব ও কুশ কালবাণ, বরুণবাণ, মহামুখ, সুমুখ অস্ত্র নিক্ষেপ করে ভরতের অস্ত্র সকল চূর্ণ করলেন। ভরতের মায়াবাণ, যক্ষবাণ ধ্বংস করে দিয়ে লব কুশ এমন ভাবে বাণ চালনা আরম্ভ হল, যে ভরতের আশেপাশে সকল সেনার হাত , পা, মুণ্ড কেটে বহু দূরে চলে গেলো। ভরতের ধনুক, রথ চূর্ণ হল। লব ও কুশ ধূম্রবাণ নিক্ষেপ করলো। ভরত মূর্ছা গেলো।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger