সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

মহেশ্বর

দেবাদিদেব মহাদেব শিব যুগ-যুগান্তর ধরে সনাতন ধর্মের সাধনপীঠে বিরাজিত রয়েছেন। তিনিই সহস্রাধিক দিব্য নামে নিত্য বন্দিত হন আসমুদ্র হিমাচলের শত সহস্র দেবালয়ে ও ভক্তদের হৃদয়মন্দিরে। সনাতন হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদী হলেও সত্যদ্রষ্টা মুনিঋষিগণ তাঁদের হৃদয়বেদিতে অভিষিক্ত করেছেন বিভিন্ন সাকার বিগ্রহে কিংবা লিঙ্গমূর্তিতে। উপনিষদে তাঁকে বলা হয়েছে ‘শান্তং শিবং অদ্বৈতম্‌’ অর্থাৎ নির্বিকার অদ্বিতীয় শিব চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা) রূপে, আবার সশক্তিকে প্রকাশে বর্ণিত করা হয়েছে, ‘তমীশ্বরানাং পরমং মহেশ্বরং, তং দেবতানাং পরমং চ দৈবতম্‌’’ পরমদেবতারূপে। প্রকৃতপক্ষে ‘শিব’ শব্দটি হল পরমমঙ্গলের পরিচায়ক। তিনিই আবার সর্বসংহারকারী ধ্বংসের দেবতা রুদ্ররূপেও বন্দিত হয়েছেন বেদ-উপনিষদে।

শিবের এক হাজার আট নামের মধ্যে রুদ্র নামটি বিশেষ নিরিখে মানুষই অভিহিত করেছে। মানুষ যখন বাঁচার তাগিদে অরণ্যে বা পার্বত্য অঞ্চলে দাবানল, নদীতটে বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, কিংবা সমতলে অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে মোকাবিলা করত, সেই ভয় ও ত্রাসের মধ্যে তাদের মনে প্রকটিত হয়েছে এক সংহারকারী সর্বশক্তিমান মহামানবের অস্তিত্বের বোধ। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেই মানুষ তাঁকে অভিহিত করেছে ‘রুদ্র’ নামে।

যজুর্বেদের মহীধর ভাষ্যে আছে, ‘‘যিনি সত্যনিষ্ঠকে জ্ঞানদান করেন, কিন্তু পাপীগণকে দুঃখভোগের মাধ্যমে ক্রন্দন করান, তিনিই রুদ্র।’’ রবণং রুৎ জ্ঞানং... রোদয়তি রুদ্রঃ’’। মানুষ তখনই বিশেষ অনুভূতি দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছে, অলক্ষ্যে বিরাজমান এক নিষ্ঠুর ভয়ংকর দেবতাকে। যাকে তুষ্ট করলে আধিদৈবিক দুর্যোগগুলি থেকে রক্ষা পাওয়া হয়তো সম্ভব হত। কিন্তু চেতনার ক্রমবিকাশে, পরিণত মননে ক্রমে তাঁরা অনুভব করেছে এই অদৃশ্য সত্তার আর একটি পরিচয়ও আছে। ধ্বংসেরই অদৃষ্ট নিয়ন্তার কর্মধারার বাহ্যিক প্রকাশের অন্তরালেই রয়েছে নতুন সৃষ্টির উদ্বোধন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সৃষ্টির বীজ।

প্রলয়ান্তে যে নবীন সৃষ্টির ধারা, সেটি তো ধ্বংসের মধ্য দিয়েই উন্মিষিত হয়। সুতরাং, ধ্বংস ও সৃষ্টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রলয়ের উৎস যিনি, সৃষ্টির উৎসও অলক্ষ্যে অবশ্যই তিনি। তাই পালনও তাঁর দ্বারাই হয়ে থাকে। কারণ সৃষ্ট বস্তু মাত্রই যেমন আপাতভাবে তাঁর দ্বারাই পালিত হচ্ছে, তেমনই প্রকৃতপক্ষে সময়ের মাত্রা ধরে সেটিও ধ্বংসের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যায়। কোনও বস্তু সৃষ্ট হলেও তার ক্ষয় হওয়াটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তাই সৃষ্টিকর্তা, পালন কর্তা ও লয়কর্তাকে আলাদা করা যায় না। তাই তাঁর রূপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর।

মহাভারতে যেমন তাঁর সৌম্য শান্তরূপের বর্ণনা আছে, তেমনই আছে উগ্ররূপেরও। সৌম্যরূপের বর্ণনায় আছে, তিনি চন্দ্রশোভিত জটাযুক্ত প্রসন্নবদন, মৃগচর্মে বস্ত্রাবৃত অভয়প্রদানকারী। কথিত আছে রুদ্রের এই উগ্ররূপটি দেখেছিলেন একমাত্র অশ্বত্থামা। গভীর রাতে ঘুমন্ত পঞ্চপাণ্ডবকে হত্যা করার জন্য তিনি যখন পাণ্ডবদের শিবিরদ্বারে কাপুরুষের মতো উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তিনি এক অতিকায় ভয়ানক দেবমূর্তিকে দণ্ডায়মান দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। সেই অতিকায় তীব্র দীপ্তি-সমন্বিত পুরুষের পরিধানে ছিল রক্তাক্ত ব্যাঘ্রচর্ম, কৃষ্ণাজিন ও কণ্ঠে নাগোপবীত। তাঁর দেহাঙ্গ অগ্নিমুখ সর্প দ্বারা বেষ্টিত ছিল। মহাভারতে বলা হয়েছে, বিগ্রহ নির্মাণ করেই অশ্বত্থামা শিব পূজা করতেন। সুতরাং মহাভারতীয় যুগ থেকেই মূর্তি গড়ে শিবপুজোর প্রচলন ছিল। অশ্বত্থামার পূজিত শিববিগ্রহ হলেন ‘পঞ্চানন’।
সাকাররূপে শিবের পঞ্চানন বিগ্রহের ধ্যানমন্ত্রে আছে, ‘‘পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রং’’। শিবের এই পাঁচটি মুখের নাম উল্লিখিত রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। এই নামগুলি হল—সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ ও ঈশান। নির্বাণতন্ত্রের মতে, ‘সদ্যোজাত’ মুখটি শুদ্ধ স্ফটিকের মতো শুক্লবর্ণ—সেটি পশ্চিমে, ‘বামদেব’ পীতবর্ণ সৌম্য মনোহর—সেটি উত্তরে, ‘অঘোর’ কৃষ্ণবর্ণ ভয়ংকর—সেটি দক্ষিণে; ‘তৎপুরুষ’ রক্তবর্ণ দিব্য মনোরম—সেটি পূর্বে; এবং ‘ঈশান’ শ্যামল সর্বদেব-স্বরূপ শিব সেটি ঊর্ধ্বে। কথিত আছে, শিবের এই পঞ্চমুখ থেকেই ২৮টি আগম (তন্ত্র) রচিত হয়েছে।

কুলার্ণবতন্ত্রে বলা হয়েছে, স্বয়ং শিবের পঞ্চমুখ থেকে ‘পঞ্চ আম্নায়’ [চতুর্বেদ ও আয়ুর্বেদ (ভেষজ বিদ্যা)] প্রকাশিত হয়েছে। কালক্রমে অগ্নি ও ডমরুধারী প্রলয়নৃত্যরত নটরাজরূপী শিবের অভিব্যক্তিকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছে নান্দনিক শিল্পের বহুমুখী প্রসার। বস্তুত ভারতীয় সংস্কৃতিতে নৃত্য, গীত ও বাদ্যচর্চার সুমহান ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে শৈব-সংস্কৃতির ভূমিকা।
শুধু পঞ্চানন, রুদ্র বা শিবরূপেই নয়, বিভিন্ন মূর্তিতে এবং বিভিন্ন নামে যুগ যুগ ধরে তিনি আরাধিত। কিন্তু তাঁর যে প্রতীকী রূপটি পুরাকাল থেকে মহাপূজ্যরূপে সমাদূত, সেটি হল তাঁর লিঙ্গরূপ। শাস্ত্রবচনে লিঙ্গের সংজ্ঞায় আছে—‘‘লীয়তে গম্যতে যত্র যেন সর্বং চরাচরম্‌। তদেব লিঙ্গং ইত্যুক্তং লিঙ্গ তত্ত্ব পরায়ণৈঃ।।’’ অর্থাৎ, নিখিল বিশ্ব চরাচর যাঁকে আশ্রয় করে উদ্ভূত হয়ে ক্রিয়াশীল হয় এবং শেষে যাঁর মধ্যে লীন হয়ে যায় সেই অস্তিত্বই ‘লিঙ্গ’। আবার ‘‘যস্মিন সর্বাণি ভূতানি লীয়ন্তে বুদ্বুদাইব।’’ সমুদ্রে যেমন উত্তাল ঢেউয়ে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়ে পরক্ষণেই আবার সেখানেই লয় প্রাপ্ত হয়, তেমনই সবই ব্যাপ্তিস্বরূপ শিব-অস্তিত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয়ে আবার সেইখানেই লয়প্রাপ্ত হয়। তাই সর্বভূতের সৃষ্টি ও লয়স্থানরূপে লিঙ্গপ্রতীকে শিব আরাধিত হন।

প্রধানত দুই রূপে শিবলিঙ্গের প্রকাশ ঘটে থাকে। প্রথমটি প্রকৃতিজাত ‘স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ’ যা পৃথিবীর ভূমি ভেদ করে উত্থিত। অপরটি মনুষ্য দ্বারা নির্মিত ধাতব, প্রস্তর কিংবা মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্ট লিঙ্গ। এই দুটি ছাড়াও বাণলিঙ্গ এবং পঞ্চভূতাত্মক লিঙ্গ আছে; তেমন ক্ষিতিলিঙ্গ (শর্ব), জললিঙ্গ (ভব), অগ্নিলিঙ্গ (রুদ্র), বায়ুলিঙ্গ (উগ্র) ও আকাশলিঙ্গ (ভীম)। প্রতিটি শিবলিঙ্গেরই একটি পীঠিকা বা ‘আসন’ থাকে। স্কন্দপুরাণে আছে, -- ‘‘আকাশং লিঙ্গ নিত্যাহুঃ। পৃথিবী তস্য পীঠিকা।’’ অর্থাৎ আকাশও একটি লিঙ্গ যার পীঠিকা পৃথিবীই। বস্তুত স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ মাত্রেরই আসন বা পীঠিকা এই পৃথিবী। মানুষের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গগুলির পীঠ উত্তরমুখী করে স্থাপিত হয়। এই পীঠিকাকে গৌরীপীঠ বা গৌরীপট্টও বলা হয়। এই পঞ্চতত্ত্ব লিঙ্গ অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ্‌, তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পঞ্চভূতের নামে পাঁচটি শিবলিঙ্গ দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি তীর্থে আছে।

ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠেও পঞ্চতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ঠাকুরের কথায়, অখণ্ড তত্ত্ব যদি হন অগ্নি, তাহলে আলো হল তাঁর চৈতন্য আর দহনক্ষমতা হল তাঁর শক্তি। তিনি যদি হন সাগর, তবে জল হল তাঁর চৈতন্যস্বরূপ আর ঢেউরূপে প্রবহমানতা হল তাঁর শক্তি-পরিচয়। এই অখণ্ডসত্তা চৈতন্যরূপে যেমন সর্বশক্তিমান, তেমনই শক্তিরূপে চৈতন্যস্বরূপিণী। অর্থাৎ চৈতন্য ও শক্তি অভেদ। একক অদ্বিতীয় অখণ্ড সত্তার নিত্য স্থিতিশীল দিকটি যেমন ‘ব্রহ্মচৈতন্য’ বা শিবস্বরূপ, তেমনই নিত্যগতিশীল দিকটি ব্রহ্মশক্তি। এই হল অখণ্ড শক্তিব্রহ্মবাদ বা শিব-শক্তি তত্ত্বের মূলকথা।
আর ‘বাণলিঙ্গ’ হল ক্ষুদ্রাকার মসৃণগাত্রের শিলাপিণ্ড যা নর্মদা নদীতে পাওয়া যায়। শিবভক্ত বাণাসুরের নামে পরিচায়িত এই লিঙ্গ একাদশ প্রকারের হয়ে থাকে। এই বাণলিঙ্গগুলি প্রতিষ্ঠিত হয় তদুপযোগী আয়তনের ধাতব পীঠিকা নির্মাণ করে, যেটি শুধু পূজাকালেই ব্যবহার্য। এই প্রকৃতির বিস্ময় এই বাণলিঙ্গ সৃষ্টি হত ওঁকারেশ্বরের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অনতিদূরে নর্মদার কোলে ধাবরি কুণ্ডে। মামলেশ্বর বাঁধ নির্মাণের সময় এই প্রকৃতির বিস্ময় ধাবরি কুণ্ডটি বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে বাণলিঙ্গের সৃষ্টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আর মৃত্তিকানির্মিত শিবলিঙ্গ প্রতিবার পূজাকালে নির্মাণ করে পূজান্তে বিসর্জন দিয়ে দিতে হয়।

যে কোনও শিবলিঙ্গেরই তিনটি ভাগ থাকে। নিম্নাংশকে ‘ব্রহ্মা-পীঠ’, মধ্যেরটিকে ‘বিষ্ণু-পিঠ’ এবং উপরিভাগটিকে ‘শিব-পীঠ’ নামে পরিচিত। লিঙ্গরূপী মহাদেবকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকের একশত হস্ত পরিমিত স্থানকে ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতভূমির বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত স্বয়ম্ভূ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গকে বিশেষ ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে মহাতীর্থ মর্যাদায় মান্য করা হয়। তার মধ্যে সমুদ্রতীরে দুটি (সোমনাথ, রামেশ্বর), নদীতীরে তিনটি (বিশ্বেশ্বর, ত্র্যম্ব঩কেশ্বর, মহাকাল), পর্বতে চারটি (কেদারনাথ, মল্লিকার্জুন, ওংকারেশ্বর বা অমলেশ্বর, ভীমাশঙ্কর) এবং সমতলে তিনটি (বৈদ্যনাথ, ঘৃষ্ণেশ্বর ও নাগেশ্বর) জ্যোতির্লিঙ্গ বিরাজমান। এছাড়াও হিমালয়ের গহনে রয়েছে পঞ্চকেদার শিব।

এই জগৎরূপটি দশাগতভাবে নিত্য পরিবর্তনশীল প্রকাশের হলেও এটির আধাররূপ চৈতন্যস্বরূপের কোনও পরিবর্তন নেই। জাগতিক প্রকাশগত ভাবে যে ভেদমূলক অনন্ত নামরূপ সবই সেই অরূপ সত্তারই অন্তর্গত আপেক্ষিক বিকাশপ্রবাহ। তিনিই এক এবং অদ্বিতীয়ম্‌। তিনিই আমাদের সৃষ্টি, রক্ষা, গড়ে তোলেন আবার প্রয়োজনে লয় করেন। তাঁর পুজোয় কোনও আড়ম্বর নেই। বেলপাতা, ধুতরো ফুল আর গঙ্গাজল। এতেই তিনি তুষ্ট।

Written by: Prithwish Ghosh
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger