২৩ নভেম্বর ২০১৭

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: চতুর্দশ অধ্যায় – গুণত্রয়-বিভাগযোগ

শ্রীভগবান্ উবাচ—
পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানমুত্তমম্ ।
যজ্জ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্ব্বে পরাং সিদ্ধিমিতো গতাঃ ॥১॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ বলিলেন) জ্ঞানানাং (জ্ঞান সাধন সমূহের মধ্যে) পরং (অতি) উত্তমম্ (উত্তম) জ্ঞানম্ (উপদেশ) ভূয়ঃ (পুনর্ব্বার) প্রবক্ষ্যামি (বলিব), যৎ (যাহা) জ্ঞাত্বা (অবগত হইয়া) সর্ব্বে (সকল) মুনয়ঃ (মুনিগণ) ইতঃ (এই দেহবন্ধন হইতে) পরাং (পরম) সিদ্ধিং (সিদ্ধি) গতাঃ (লাভ করিয়াছেন) ॥১॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—অতঃপর জ্ঞানসাধন সমূহের মধ্যে অতি উত্তম জ্ঞান পুনরায় তোমাকে বলিব, যাহা জানিয়া মুনিসমূহ এই জগৎ হইতে পরমসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন ॥১॥

ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্ম্যমাগতাঃ ।
সর্গেঽপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ ॥২॥

ইদং (এই) জ্ঞানম্ (জ্ঞান) উপাশ্রিত্য (আশ্রয় করিয়া) [জীবঃ] (জীব) মম (আমার) সাধর্ম্ম্যম্ (সারূপ্য ধর্ম্ম) আগতাঃ [সন্তঃ] (প্রাপ্ত হইয়া) সর্গে অপি (বিশ্ব সৃষ্টিকালেও) ন উপ জায়ন্তে (উৎপন্ন হয় না) প্রলয়ে চ (এবং প্রলয়কালেও) ন ব্যথন্তি (বিনাশ ব্যথা অনুভব করে না) ॥২॥

এই জ্ঞানকে আশ্রয় করিয়া (বহুলাংশে) আমার সহিত সমধর্ম্মী জীব বিশ্বসৃষ্টিকালেও উৎপন্ন হয় না এবং প্রলয়েও বিনাশ ব্যথা অনুভব করে না ॥২॥

মম যোনির্মহদ্ব্রহ্ম তস্মিন্ গর্ব্ভং দধাম্যহম্ ।
সম্ভবঃ সর্ব্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত ॥৩॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) মহৎব্রহ্ম (দেশ বা কালের দ্বারা অবিভক্ত ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি) মম (আমার) যোনিঃ (গর্ভাধানের স্থান), তস্মিন্ (তাহাতেই) গর্ব্ভং [তটস্থাশক্তি জাত] (জীবরূপ বীজ) অহং (আমি) দধামি (অর্পণ করি), ততঃ (তাহা হইতে) সর্ব্বভূতানাং (সকল জীবের) সম্ভবঃ (উৎপত্তি) ভবতি (হয়) ॥৩॥

হে ভারত ! প্রধান সংজ্ঞক প্রকৃতি আমার গর্ভাধানের স্থান, তাহাতেই আমি (তটস্থাশক্তি জীবরূপ) বীজ নিক্ষেপ করি । তাহা হইতে ব্রহ্মাদি সমস্ত জীবের জন্ম হয় ॥৩॥

সর্ব্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্ত্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদ্­যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা ॥৪॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে কুন্তীপুত্ত্র !) সর্ব্বযোনিষু (দেব মনুষ্যাদি সকল যোনিতে) যাঃ (যে সকল) মূর্ত্তয়ঃ (শরীর) সম্ভবন্তি (উৎপন্ন হয়), তাসাং (তাহাদিগের) মহৎ ব্রহ্ম (ব্রহ্মরূপা প্রকৃতিই) যোনিঃ (প্রসূতি) অহং (আমি) বীজপ্রদঃ (গর্ভাধান কর্ত্তা) পিতা (পিতা) ॥৪॥

হে কৌন্তেয় ! দেব মনুষ্যাদি সমস্ত যোনিতে যে সকল দেহ উৎপন্ন হয়, ব্রহ্মরূপা প্রকৃতিই তাহাদের প্রসূতি এবং আমিই (কারণ-চৈতন্য) গর্ভাধানকারী পিতা ॥৪॥

সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ ।
নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্ ॥৫॥

[হে] মহাবাহো ! (হে মহাবীর !) প্রকৃতি সম্ভবাঃ (প্রকৃতি হইতে অভিব্যক্ত) সত্ত্বং রজঃ তমঃ ইতি (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনটী) গুণাঃ (গুণ) দেহে (জড়দেহ মধ্যে) অব্যয়ম্ (নির্ব্বিকার) দেহিনম্ (জীবাত্মাকে) নিবধ্নন্তি (সুখ দুঃখ মোহাদি দ্বারা সংযুক্ত করে) ॥৫॥

হে মহাবীর অর্জ্জুন ! প্রকৃতি হইতে প্রকটিত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই গুণত্রয় জড়দেহমধ্যে অবস্থিত অব্যয় চিৎস্বরূপ জীবাত্মাকে সুখ-দুঃখ মোহদি দ্বারা বন্ধন করে ॥৫॥

তত্র সত্ত্বং নির্ম্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়ম্ ।
সুখসঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ ॥৬॥

[হে] অনঘ ! (হে নিস্পাপ !) তত্র (সেই গুণত্রয়ের মধ্যে) নির্ম্মলত্বাৎ (স্বচ্ছতা হেতু) প্রকাশকম্ (বস্তুর স্বরূপ প্রকাশকারী) অনাময়ম্ (ও শান্ত স্বভাব) সত্ত্বং (সত্ত্বগুণই) সুখসঙ্গেন (সুখাসক্তি) জ্ঞানসঙ্গেন চ (ও জ্ঞানাসক্তি দ্বারা) [জীবং] (জীবাত্মাকে) বধ্নাতি (আবদ্ধ করে) ॥৬॥

হে নিষ্পাপ ! সেই গুণত্রয়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত নির্ম্মলতা প্রযুক্ত বস্তুর স্বরূপ প্রকাশক ও শান্ত স্বভাব সত্ত্বগুণই সুখাসক্তি ও জ্ঞানাসক্তি দ্বারা দেহমধ্যে জীবাত্মাকে আবদ্ধ করে ॥৬॥

রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভবম্ ।
তন্নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্ম্মসঙ্গেন দেহিনম্ ॥৭॥

[হে] কৌন্তেয় ! (হে কুন্তীপুত্ত্র !) রজঃ (রজোগুণকে) রাগাত্মকং (ভোগানুরাগস্বরূপ) তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভবম্ (অপ্রাপ্ত বিষয়ে অভিলাষ ও প্রাপ্ত বিষয়ে আসক্তির উৎপাদক) বিদ্ধি (জানিবে), তৎ (সেই রজোগুণ) দেহিনম্ (জীবকে) কর্ম্মসঙ্গেন (কর্ম্মাসক্তি দ্বারা) নিবধ্নাতি (নিবদ্ধ করে) ॥৭॥

হে কুন্তীপুত্ত্র ! রজোগুণকে ভোগানুরাগস্বরূপ জানিবে । অপ্রাপ্ত বিষয়ে অভিলাষ ও প্রাপ্তবিষয়ে আসক্তির উৎপাদক সেই রজোগুণ কর্ম্মাসক্তি দ্বারা জীবাত্মাকে আবদ্ধ করে ॥৭॥

তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্ব্বদেহিনাম্ ।
প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিবধ্নাতি ভারত ॥৮॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) তমঃ তু (আর তমোগুণ) অজ্ঞানজং (অজ্ঞান হইতে জাত) সর্ব্বদেহিনাম্ (সকল জীবের) মোহনং (ভ্রান্তির জনক) বিদ্ধি (জানিবে), তৎ (সেই তমোগুণ) [জীবং] (জীবাত্মাকে) প্রমাদালস্যনিদ্রাভিঃ (অনবধান, আলস্য ও নিদ্রা দ্বারা) নিবধ্নাতি (আবদ্ধ করে) ॥৮॥

হে ভারত! আর তমোগুণ অজ্ঞান হইতে জাত ও সমস্ত জীবের মুগ্ধকারী বলিয়া জানিবে । এই তমোগুণ দেহীকে অনবধান, আলস্য ও নিদ্রাদ্বারা আবদ্ধ করে ॥৮॥

সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্ম্মণি ভারত ।
জ্ঞানমাবৃত্য তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত ॥৯॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) সত্ত্বং (সত্ত্বগুণ) সুখে (সুখে) রজঃ (রজোগুণ) কর্ম্মণি (কর্ম্মে) [জীবং] (জীবাত্মাকে) সঞ্জয়তি (আবদ্ধ করে), তমঃ তু (তমোগুণ কিন্তু) জ্ঞানম্ (জ্ঞানকে) আবৃত্য (আচ্ছাদন করিয়া) প্রমাদে (প্রমাদ) উত (এবং আলস্যাদিতে) সঞ্জয়তি (আবদ্ধ করে) ॥৯॥

হে অর্জ্জুন ! সত্ত্বগুণ সুখে ও রজোগুণ কর্ম্মে জীবাত্মাকে আবদ্ধ করে । তমোগুণ কিন্তু জীবের জ্ঞানকে আচ্ছাদন করিয়া প্রমাদ এবং আলস্যাদিতে আবদ্ধ করে ॥৯॥

রজস্তমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত ।
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা ॥১০॥

[হে] ভারত ! (হে অর্জ্জুন !) সত্ত্বং (সত্ত্বগুণ) রজঃ তমঃ চ (রজঃ ও তমোগুণকে) অভিভূয় (অভিভূত করিয়া) ভবতি (উদ্ভূত হয়), রজঃ (রজোগুণ) সত্ত্বং তমঃ চ এব (সত্ত্ব ও তমোগুণকেও) তথা (তদ্রূপ) তমঃ (তমোগুণ) সত্ত্বং রজঃ (সত্ত্ব ও রজোগুণকে) [অভিভূয় ভবতি] (পরাজিত করিয়া প্রাধান্য লাভ করে) ॥১০॥

হে ভারত ! সত্ত্বগুণ—রজোগুণ ও তমোগুণকে অভিভূত করিয়া, রজোগুণ—সত্ত্ব ও তমোগুণকে এবং তমোগুণ—সত্ত্ব ও রজোগুণকে পরাজিত করিয়া নিজের প্রাধান্য বিস্তার করে ॥১০॥

সর্ব্বদ্বারেষু দেহেঽস্মিন্ প্রকাশ উপজায়তে ।
জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ্বিবৃদ্ধং সত্ত্বমিত্যুত ॥১১॥

যদা (যে কালে) অস্মিন্ দেহে (এই দেহে) সর্ব্বদ্বারেষু (সকল জ্ঞানেন্দ্রিয়ে) প্রকাশঃ (শব্দাদির স্বরূপ প্রকাশরূপ) জ্ঞানং (জ্ঞান) উপজায়তে (সম্যক্ উৎপন্ন হয়), তদা (তখনই) সত্ত্বম্ (সত্ত্বগুণ) বিবৃদ্ধং (বর্দ্ধিত হইয়াছে) ইতি (ইহা) বিদ্যাৎ (জানিবে), উত (এবং সুখলক্ষণ দ্বারাও বুঝিবে) ॥১১॥

যখন এই দেহে সমস্ত জ্ঞানেন্দ্রিয়ে বিষয়ের যাথার্থ্য প্রকাশরূপ জ্ঞান সমধিক উৎপন্ন হয়, তখনই সত্ত্বগুণ বিশেষ বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া জানিবে, এবং পূর্ব্বোক্ত সুখলক্ষণ দ্বারাও বুঝিবে ॥১১॥

লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্ম্মণামশমঃ স্পৃহা ।
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ ॥১২॥

[হে] ভরতর্ষভ ! (হে ভরতশ্রেষ্ঠ !) লোভঃ (লোভ) প্রবৃত্তিঃ (নানা কর্ম্ম করিবার ইচ্ছা) কর্ম্মণাম্ (বিবিধ কর্ম্মের) আরম্ভঃ (উদ্যম) অশমঃ (বিষয়ভোগে অনিবৃত্তি) স্পৃহা (বিষয়াভিলাষ) এতানি (এই সকল) রজসি (রজোগুণ) বিবৃদ্ধে [সতি] (বর্দ্ধিত হইলে) জায়ন্তে (উৎপন্ন হইয়া থাকে) ॥১২॥

হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন ! রজোগুণ বিশেষ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে লোভ, কর্ম্মপ্রবৃত্তি, নানা কর্ম্মারম্ভ, ভোগে অনিবৃত্তি ও স্পৃহা এই সমস্ত উৎপত্তি লাভ করে ॥১২॥

অপ্রকাশোঽপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ ।
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন ॥১৩॥

[হে] কুরুনন্দন ! (হে কুরুবংশীয় !) অপ্রকাশঃ (বিবেক রাহিত্য) অপ্রবৃত্তিঃ চ (প্রযত্নহীনতা) প্রমাদঃ (অনবধানতা) মোহঃ এব চ (ও মিথ্যা অভিনিবেশ) এতানি (এই সকল চিহ্ন) তমসি (তমোগুণ) বিবৃদ্ধে [সতি] (প্রবল হইলে) জায়ন্তে (উৎপন্ন হয়) ॥১৩॥

হে কুরুনন্দন ! তমোগুণ প্রবল হইলে বিবেকাভাব, উদ্যমাভাব, অনবধানতা ও মিথ্যাভিনিবেশ এই সকল চিহ্ন প্রকাশ পাইয়া থাকে ॥১৩॥

যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ ।
তদোত্তমবিদাং লোকানমলান প্রতিপদ্যতে ॥১৪॥

যদা (যখন) সত্ত্বে (সত্ত্বগুণ) প্রবৃদ্ধে [সতি] (বৃদ্ধি পাইলে) দেহভৃৎ (দেহী-জীব) প্রলয়ং (মৃত্যু) যাতি (প্রাপ্ত হয়), তদা (তখন) উত্তমবিদাং (হিরণ্যগর্ভাদির উপাসকগণের) অমলান্ (পবিত্র) লোকান্ (লোকসমূহ) প্রতিপদ্যতে (প্রাপ্ত হয়) ॥১৪॥

সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি সময়ে যদি জীব মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে হিরণ্যগর্ভাদির উপাসকগণের পবিত্র লোকসমূহে সে গমন করে ॥১৪॥

রজসি প্রলয়ং গত্বা কর্ম্মসঙ্গিষু জায়তে ।
তথা প্রলীনস্তমসি মূঢ়যোনিষু জায়তে ॥১৫॥

[জীবঃ] (জীব) রজসি [প্রবৃদ্ধে] (রজোগুণের বৃদ্ধিকালে) প্রলয়ং গত্বা (মৃত্যু হইলে) কর্ম্মসঙ্গিষু (কর্ম্মাসক্ত মনুষ্য মধ্যে) জায়তে (জন্মলাভ করে) ; তথা (তদ্রূপ) তমসি [বিবৃদ্ধে] (তমোগুণের বৃদ্ধিকালে) প্রলীনঃ [সন্] (মৃত্যুপ্রাপ্ত হইয়া) মূঢ়যোনিষু (পশু প্রভৃতির মধ্যে) জায়তে (জন্মগ্রহণ করে) ॥১৫॥

রজোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হইলে জীব কর্ম্মাসক্ত লোক-মধ্যে এবং তমোগুণের বৃদ্ধি কালে মৃত্যু ঘটিলে পশ্বাদির মধ্যে জন্মগ্রহণ করে ॥১৫॥

কর্ম্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্ম্মলং ফলম্ ।
রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্ ॥১৬॥

[পণ্ডিতাঃ] (পণ্ডিতগণ) সুকৃতস্য কর্ম্মণঃ (সাত্ত্বিক কর্ম্মের) নির্ম্মলং (নিরুপদ্রব) সাত্ত্বিকং (সুখকর) ফলং (ফল), রজসঃ তু (ও রাজসিক কর্ম্মের) দুঃখম্ (দুঃখময়) ফলম্ (ফল) [এবং] তমসঃ (তামসিক কর্ম্মের) অজ্ঞানং (অচেতনত্ব) ফলম্ (ফল) আহুঃ (বলিয়া থাকেন) ॥১৬॥

সাত্ত্বিক কর্ম্মের নির্ম্মল সুখকর ফল ও রাজসিক কর্ম্মের দুঃখময় ফল, এবং তামসিক কর্ম্মের অজ্ঞানময় বা অচেতনত্ব ফল—পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন ॥১৬॥

সত্ত্বাৎ সংজায়তে জ্ঞানং রজসো লোভ এব চ ।
প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতোঽজ্ঞানমেব চ ॥১৭॥

সত্ত্বাৎ (সত্ত্বগুণ হইতে) জ্ঞানং (জ্ঞান), রজসঃ চ (ও রজোগুণ হইতে) লোভঃ এব (লোভই) সংজায়তে (উৎপন্ন হয়) । [এবং] তমসঃ (তমোগুণ হইতে) প্রমাদমোহৌ (প্রমাদ ও মোহ) ভবতঃ (উৎপন্ন হয়), অজ্ঞানং এব চ (এবং অজ্ঞানও) [ভবতি] (উৎপন্ন হইয়া থাকে) ॥১৭॥

সত্ত্বগুণ হইতে জ্ঞান ও রজোগুণ হইতে লোভ এবং তমোগুণ হইতে প্রমাদ, মোহ ও অজ্ঞানই উৎপন্ন হইয়া থাকে ॥১৭॥

ঊর্দ্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ ॥১৮॥

সত্ত্বস্থাঃ (সত্ত্বগুণযুক্ত ব্যক্তিগণ) ঊর্দ্ধ্বং (সত্যলোক পর্য্যন্ত) গচ্ছন্তি (গমন করেন) রাজসাঃ (রজোগুণী লোক সকল) মধ্যে (মনুষ্যলোকে) তিষ্ঠন্তি (অবস্থান করেন), জঘন্য-গুণবৃত্তিস্থাঃ (প্রমাদ ও আলস্যাদি পরায়ণ) তামসাঃ (তমোগুণযুক্ত ব্যক্তিগণ) অধঃ (নরকাদি নিম্নতর লোক) গচ্ছন্তি (গমন করে) ॥১৮॥

সত্ত্বগুণযুক্ত জনগণ ঊর্দ্ধ্বে (সত্যলোক পর্য্যন্ত) গমন করে, রজোগুণযুক্ত ব্যক্তিগণ মধ্যে (মনুষ্যলোকে) অবস্থান করে, এবং ঘৃণ্য তামস প্রকৃতি ব্যক্তিগণ (নরকাদি) নিম্নতর লোকে গমন করে ॥১৮॥

নান্যং গুণেভ্যঃ কর্ত্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি ।
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোঽধিগচ্ছতি ॥১৯॥

যদা (যখন) দ্রষ্টা (জীব) গুণেভ্যঃ (গুণত্রয় হইতে) অন্যং (পৃথক্ কাহাকে) কর্ত্তারং (কর্ত্তা বলিয়া) ন অনুপশ্যতি (দর্শন করেন না), গুণেভ্য চ (এবং গুণত্রয়ের) পরং (অতীত ও অধিশ্বরকে) বেত্তি (জানিতে পারেন) [তদা] (তখন) সঃ (সেই জীব) মদ্ভাবং (আমাতে ভাবভক্তি) অধিগচ্ছতি (লাভ করেন) ॥১৯॥

যখন জীব গুণময় জগতে গুণত্রয় হইতে পৃথক্ কর্ত্তা দেখিতে পান না, এবং গুণত্রয়ের অতীত অধীশ্বরকে জানিতে পারেন, তখন তিনি আমার প্রতি ভাবভক্তি লাভ করেন ॥১৯॥

গুণানেতানতীত্য ত্রীন্ দেহী দেহসমুদ্ভবান্ ।
জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোঽমৃতমশ্নুতে ॥২০॥

দেহী (জীব) দেহসমুদ্ভবান্ (দেহের উৎপাদক) এতান্ (এই) ত্রীন্গুণান্ (তিনটী গুণকে) অতীত্য (অতিক্রম করিয়া) জন্ম-মৃত্যু-জরা-দুঃখৈঃ (জন্ম, মৃত্যু, জরা ও দুঃখ হইতে) বিমুক্তাঃ [সন্] (সম্যক্ মুক্ত হইয়া) অমৃতম্ (নির্গুণ প্রেমরূপ অমৃত) অশ্নুতে (ভোগ করেন) ॥২০॥

জীব দেহের সংঘটক এই তিনটি গুণকে অতিক্রম করিলে জন্ম, মৃত্যু, জরা ও দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া নির্গুণ প্রেমরূপ অমৃত আস্বাদন করিতে থাকেন ॥২০॥

শ্রীঅর্জ্জুন উবাচ—
কৈর্লিঙ্গৈস্ত্রীন্ গুণানেতানতীতো ভবতি প্রভো ।
কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রীন্ গুণানতিবর্ত্ততে ॥২১॥

অর্জ্জুনঃ উবাচ (অর্জ্জুন বলিলেন) [হে] প্রভো ! (হে প্রভো !) কৈঃ লিঙ্গৈঃ (কি কি চিহ্ন দ্বারা) এতান্ (এই) ত্রীন্ (তিন) গুণান্ (গুণ) অতীতঃ (অতিক্রমকারী ব্যক্তি) [জ্ঞেয়ঃ] (জ্ঞাত) ভবতি (হন) ? কিমাচারঃ (কিরূপ আচরণ করেন ?) কথং চ (ও কি প্রকারে) এতান্ (এই) ত্রীন্গুণান্ (তিন গুণকে) অতিবর্ত্ততে (অতিক্রম করেন ?) ॥২১॥

অর্জ্জুন বলিলেন—হে প্রভো ! কি কি লক্ষণ দ্বারা ত্রিগুণাতীত ব্যক্তি পরিজ্ঞাত হন ? তাঁহার আচরণ কিরূপ এবং কি উপায় অবলম্বনে তিনি এই গুণকে অতিক্রম করেন ? ॥২১॥

শ্রীভগবানুবাচ—
প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মোহমেব ব পাণ্ডব ।
ন দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্ক্ষতি ॥২২॥
উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে ।
গুণা বর্ত্তন্ত ইতেবং যোঽবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে ॥২৩॥
সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ ॥২৪॥
মানাপমানয়োস্তুল্যস্তুল্যো মিত্রারিপক্ষয়োঃ ।
সর্ব্বারম্ভপরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে ॥২৫॥

শ্রীভগবান্ উবাচ (শ্রীভগবান্ কহিলেন) [হে] পাণ্ডব ! (হে পাণ্ডপুত্ত্র !) যঃ (যিনি) প্রকাশং চ (প্রকাশ) প্রবৃত্তিং চ (প্রবৃত্তি) মোহম্ এব চ (এবং মোহ) সংপ্রবৃত্তানি (স্বতঃপ্রাপ্ত হইলে) ন দ্বেষ্টি (দ্বেষ করেন না) নিবৃত্তানি (উহাদের নিবৃত্তিও) ন কাঙ্ক্ষতি (আকাঙ্ক্ষা করে না) । যঃ (যিনি) উদাসীনবৎ (উদাসীনের ন্যায়) আসীনঃ (অবস্থিত) [সন্] (হইয়া) গুণৈঃ (গুণকার্য্য সুখদুঃখাদিকর্ত্তৃক) ন বিচাল্যতে (বিচালিত হন না) ; গুণাঃ (গুণ সকল) গুণেষু বর্ত্তন্তে (স্ব স্ব কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতেছে) ইতি এবং (জ্ঞাত্ত্বা] (এই রূপ জানিয়া) অবতিষ্ঠতি (সুস্থির থাকেন) ন ইঙ্গতে (চঞ্চল হন না) । [যঃ] (যিনি) সমদুঃখসুখঃ (সুখে ও দুঃখে সমবুদ্ধি বিশিষ্ট) স্বস্থঃ (স্বরূপনিষ্ঠ) সমলোষ্ট্রশ্মকাঞ্চনঃ (মৃৎপিণ্ড প্রস্তর ও কাঞ্চনে সমভাবাপন্ন) তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ঃ (প্রিয় ও অপ্রিয় বস্তুতে তুল্যবুদ্ধি) ধীরঃ (বুদ্ধিমান্) তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ (নিজের নিন্দা ও স্তুতিতে সমানজ্ঞানবিশিষ্ট) মানাপমানয়োঃ (মান ও অপমানে) তুল্যঃ (সমান) মিত্রারিপক্ষয়োঃ (মিত্রপক্ষে ও শত্রুপক্ষে) তুল্যঃ (তুল্য) সর্ব্বারম্ভ-পরিত্যাগী (আসক্তি ও বৈরাগ্যের সর্ব্বপ্রকারারম্ভপরিত্যাগী) সঃ (সেই ব্যক্তি) গুণাতীতঃ (গুণাতীত বলিয়া) উচ্যতে (কথিত হন) ॥২২–২৫॥

শ্রীভগবান্ কহিলেন—হে পাণ্ডব ! যিনি (সত্ত্বকার্য্য) প্রকাশ, (রজঃ কার্য্য) প্রবৃত্তি ও (তমঃ কার্য্য) মোহ স্বতঃ আসিয়া উপস্থিত হইলে দ্বেষ করেন না, এবং উহাদের নিবৃত্তিরও আকাঙ্ক্ষা করেন না । যিনি উদাসীনের ন্যায় অবস্থিত হইয়া গুণকার্য্য (সুখ দুঃখাদি) দ্বারা বিচলিত হন না, ‘গুণসমূহ (নিজ নিজ বিষয়ে) প্রবৃত্ত হইতেছে’ এইরূপ মনে করিয়া সুস্থির থাকেন,—চঞ্চল হন না ; যিনি সুখে ও দুঃখে সমভাবাপন্ন, আত্মনিষ্ঠ, মৃত্তিকাখণ্ড, পাথর ও সুবর্ণে সমবুদ্ধিযুক্ত, প্রিয় ও অপ্রিয় বস্তুলাভে সমজ্ঞানবিশিষ্ট, ধীর, নিজের নিন্দা ও স্তুতিতে তুল্যবুদ্ধি সম্পন্ন ; মান ও অপমানে, মিত্রপক্ষ ও শত্রুপক্ষে তুল্যভাব এবং আসক্তি ও বৈরাগ্যের উৎপাদকসমূহপরিত্যাগী—সেই ব্যক্তিই গুণাতীত বলিয়া কথিত হন ॥২২–২৫॥

মাঞ্চ যোঽব্যভিচারণে ভক্তিযোগেন সেবতে ।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে ॥২৬॥

যঃ (যিনি) অব্যভিচারেণ (জ্ঞান-কর্ম্মাদি-দোষবর্জ্জিত) ভক্তিযোগেন (শুদ্ধভক্তিযোগ দ্বারা) মাং চ (শ্যামসুন্দরাকার পরমেশ্বর আমাকেই) সেবতে (সেবা করেন), সঃ (তিনি) এতান্ (এই) গুণান্ (গুণত্রয়কে) সমতীত্য (সম্যক্ অতিক্রম করিয়া) ব্রহ্মভূয়ায় (চিৎস্বরূপ-সিদ্ধির) কল্পতে (যোগ্য হন) ॥২৬॥

যিনি (জ্ঞানকর্ম্মাদি দোষবর্জ্জিত) শুদ্ধ ভক্তিযোগ দ্বারা (শ্যামসুন্দরাকার) আমাকেই সেবা করেন, তিনি এই গুণত্রয়কে সম্যক্ অতিক্রম করিয়া চিৎস্বরূপসিদ্ধির যোগ্য হন ॥২৬॥

ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ ।
শাশ্বতস্য চ ধর্ম্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ ॥২৭॥

হি (যে হেতু) অহম্ (আমি) ব্রহ্মণঃ (অখণ্ড চৈতন্যের) অব্যয়স্য (অফুরন্ত) অমৃতস্য (অমৃতের), শাশ্বতস্য (নিত্য) ধর্ম্মস্য (লীলার), ঐকান্তিকস্য চ (ও ঐকান্তিক) সুখস্য (প্রেমসুধাস্বাদনের) প্রতিষ্ঠা (মূল অবলম্বন) ॥২৭॥

আমিই অখণ্ড চৈতন্যের, অফুরন্ত অমৃতের, নিত্যলীলার ও ঐকান্তিক প্রেমসুধাস্বাদনের মূল অবলম্বন ॥২৭॥

ইতি শ্রীমহাভারতে শতসাহস্র্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং
ভীষ্মপর্ব্বণি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষদ্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে
শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসংবাদে গুণত্রয়-বিভাগ-যোগো
নাম চতুর্দ্দশোঽধ্যায়ঃ ॥১৪॥

ইতি চতুর্দ্দশ অধ্যায়ের অন্বয় সমাপ্ত ॥

                                                                                                   গ্রন্থ-সম্পাদক—
                                                                                       ত্রিদণ্ডিভিক্ষু—শ্রীভক্তিরক্ষক শ্রীধর
                                                                                         শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ, নবদ্বীপ
                                                                                        শ্রীজন্মাষ্টমী বঙ্গাব্দ ১৩৬৮ সাল

(১) পূর্ব অধ্যায়ে বলা হইয়াছে, সকল কর্ত্রিত্বই প্রকৃতির, পুরুষ অকর্তা । প্রকৃতির গুণসঙ্গবশতঃই জীবের সদসদ্‌ যোনিতে জন্ম ও সুখ-দুঃখ ভোগ অর্থাৎ সংসারিত্ব । এই গুণ কি, উহাদের লক্ষণ কি, উহারা কি ভাবে জীবকে আবদ্ধ করে, কিরূপে প্রকৃতি হইতে বিবিধ সৃষ্টি হয়, ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই বলা হয় নাই । সেই হেতু এই প্রকৃতি-তত্ত্ব বা ত্রিগুণ-তত্ত্বই আবার বলিতেছেন ।

(২) সাধর্ম্য = স্বরূপতা অর্থাৎ আমি যেমন ত্রিগুণাতীত এইরূপ ত্রিগুণাতীত অবস্থা ।

(৩,৪) মহদ্‌ব্রহ্ম = প্রকৃতি; ‘গর্ভাধান করি’ = সর্বভূতের জন্মকারণ স্বরূপ বীজ প্রকৃতিরূপ যোনিতে আধান করি । ভূতগণকে তাহাদের স্বীয় প্রাক্তন কর্মানুসারে ক্ষেত্রের সহিত সংযোজিত করি । অথবা প্রকৃতিতে আমার সঙ্কল্পিত বীজ আধান করি অর্থাৎ আমার সঙ্কল্পানুসারেই প্রকৃতি সৃষ্টি করে । ঈশ্বরের সৃষ্টি-সঙ্কল্পই গর্ভাধানস্বরূপ – প্রকৃতির স্বতন্ত্র সৃষ্টি-সামর্থ্য নাই । বেদান্তে ইহাকেই ‘ঈক্ষণ’ বলে (জ্ঞান-বিজ্ঞান-যোগে ‘সাংখ্যের সৃষ্টিতত্ত্ব – প্রকৃতি ও পুরুষ’ দ্রষ্টব্য) ।

(৫) জীবাত্মা অবিকারী হইলেও প্রকৃতির গুণসঙ্গবশতঃ দেহাত্মভাব প্রাপ্ত হওয়ায় সুখ-দুঃখ মোহাদিতে জড়িত হইয়া পড়েন । ত্রিগুণের বন্ধন = প্রকৃতি-সংযোগে পুরুষের সংসারবন্ধন ।

(৬) সত্ত্বগুণের বন্ধন – সত্ত্বগুণের মুখ্য ধর্ম – সুখ ও জ্ঞান – এই দুইটিও বন্ধনের কারণ বলা হইতেছে । সত্ত্বগুণ দুই প্রকার – (i) মিশ্রসত্ত্ব অর্থাৎ রজস্তমো-মিশ্রিত সত্ত্ব এবং (ii) শুদ্ধসত্ত্ব অর্থাৎ রজস্তমো-বর্জিত সত্ত্ব । রজস্তমোবর্জিত বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণের লক্ষণ = নিস্ত্রৈগুণ্য বা ত্রিগুণাতীতের অবস্থা অর্থাৎ নির্দ্বন্দ্বভাব, বিমল সদানন্দ এবং অপরোক্ষ আত্মানুভূতির অবস্থা । গীতায় নিস্ত্রৈগুণ্য বলিতে ‘নিত্য শুদ্ধসত্ত্বগুণাশ্রিত’ বুঝায় । এই হেতুই ২|৪ শ্লোকে শ্রীভগবান অর্জুনকে ‘নিস্ত্রৈগুণ্য’ হইতে বলিয়াও ‘নিত্যসত্ত্বস্থ’ হইতে বলিয়াছেন ।
সত্ত্বগুণ জলের ন্যায় নির্মল হইলেও অপর দুইটির সহিত মিশ্রিত থাকায় উহা বন্ধনের কারণ হয় । “সত্ত্বগুণের খুব প্রাধান্য হইলেও তাহা প্রকৃত স্বাধীনতার অবস্থা নহে কারণ অন্যান্য গুণের ন্যায়ই বাসনা (মহত্তর) ও অহঙ্কারের (শুদ্ধতর) দ্বারাই বন্ধন করে । সাত্ত্বিক অহঙ্কারের উদাহরণ – আমি সাধু, আমি জ্ঞানী । প্রকৃত স্বাধীনতা, চরম স্বরাজ্য তখনই আরম্ভ হইবে যখন প্রাকৃত আত্মার উপরে আমরা পরমাত্মাকে দেখিতে পাইব, ধরিতে পারিব । আমাদের ক্ষুদ্র ‘আমি’ – আমাদের অহঙ্কার এই পরমাত্মাকে দেখিতে দেয় না । ইহার জন্য আমাদিগকে গুণত্রয়ের বহু ঊর্ধ্বে উঠিতে হইবে, ত্রিগুণাতীত হইতে হইবে, কারণ পরমাত্মা সত্ত্বগুণেরও উপরে ।” …[abridged from শ্রীঅরবিন্দের গীতা (অনিলবরণ)] ।

(১০-১৩) সত্ত্বগুণ, রজোগুণ ও তমোগুণ কখনও পৃথক্‌ পৃথক্‌ থাকে না, একত্রেই থাকে । কিন্তু জীবের পূর্ব কর্মানুসারে অদৃষ্টবশে কখনও সত্ত্বগুণ অপর দুইটিকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয় এবং জীবকে সুখাদিতে আসক্ত করে । এইরূপ কোথাও রজোগুণ প্রবল হইয়া কর্মাসক্তি, বিষয়-স্পৃহা, অস্থিরতা জন্মায় বা তমোগুণ প্রবল হইয়া নিদ্রা, অনুদ্যম, প্রমাদ, কর্তব্যের বিস্মৃতি, বুদ্ধি-বিপর্যয়, আলস্যাদি উৎপন্ন করে । এই হেতুই জীবের সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক এইরূপ বিভিন্ন প্রকৃতি বা স্বভাব দৃষ্ট হয় ।

(১৮) সত্ত্বগুণ-প্রধান ব্যক্তিগণ স্বর্গাদি দিব্যলোক প্রাপ্ত হন । কিন্তু তাহা হইলেও তাহাদের মোক্ষলাভ বা ভগবৎপ্রাপ্তি ঘটে না । ঐ সকল লোক হইতেও পতন আছে । তবে মোক্ষলাভ কিসে হয় ? – পরের দুই শ্লোক ।

(২০) প্রকৃতির গুণসঙ্গবশতঃই জীবের দেহোৎপত্তি ও সংসারিত্ব । এই ত্রিগুণ অতিক্রম করিতে পারিলেই মোক্ষ । তাহার উপায় কি ? সাংখ্যদর্শন বলেন যে, জীব যখন বুঝিতে পারে যে প্রকৃতি পৃথক্‌, আমি পৃথক্‌, তখনই তাহার মুক্তি হয় । কিন্তু বেদান্ত ও গীতা সাংখ্যের এই প্রকৃতি-পুরুষরূপী দ্বৈতকে মূল তত্ত্ব বলিয়া স্বীকার করেন না । সুতরাং এই কথাটিই গীতায় এইরূপ ভাবে বলা হয় যে, প্রকৃতি ও পুরুষের উপরে যে পরমাত্মা বা পুরুষোত্তম আছেন, সেই পরমাত্মাকে যখন জীব জানিতে পারে, তখনই তাহার মোক্ষ বা ব্রহ্মলাভ হয় ।

(২১) ব্রাহ্মীস্থিতি = স্থিতপ্রজ্ঞ অথবা ত্রিগুণাতীতের অবস্থা

(২২,২৩) দেহে প্রকৃতির কার্য চলিতেছে চলুক । আমি উহাতে লিপ্ত নই । আমি অকর্তা, উদাসীন্, সাক্ষিস্বরূপ । এই জ্ঞান যাঁহার হইয়াছে তিনিই ত্রিগুণাতীত ।

(২৫) আরম্ভ = ঐহিক বা পারত্রিক ফল কামনা করিয়া কর্মের উদ্যোগ । সর্বারম্ভপরিত্যাগী = এইরূপ আরম্ভ যিনি করেন না । উদাহরণ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ।

(২৭) আমিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা – ভগবৎ-তত্ত্ব ও ব্রহ্মতত্ত্ব

সাংখ্যমতে ত্রিগুণাতীত হইয়া বা কৈবল্য লাভের একমাত্র উপায় পঞ্চবিংশতি তত্ত্বের জ্ঞান [সাংখ্যসূত্র ৩|২৩] । পাতঞ্জলমতে ধ্যান-ধারণা ও পরিশেষে নির্বীজ সমাধি; সাংখ্যে যাহাকে প্রকৃতি বলে, অদ্বৈত বেদান্তে তাহাই অজ্ঞান বা মায়া । বেদান্ত মতেও জ্ঞানই ব্রহ্মভাব বা মোক্ষলাভের উপায়, ব্রহ্মসূত্রে কোথাও ‘ভক্তি’ শব্দ নাই । কিন্তু এস্থলে ভগবান্‌ বলিতেছেন – ত্রিগুণাতীত হইয়া ব্রহ্মভাব লাভের উপায় আমাতে অব্যভিচারিণী ভক্তি; আমাকে একান্ত ভক্তিযোগে সেবা করিলেই ত্রিগুণাতীত হইয়া ব্রহ্মভাব লাভ করা যায়, কারণ আমিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা [১৪|২৬,২৭]; ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইলে আমাতে পরাভক্তি জন্মে [১৮|৫৪] । ‘আমি’ বলিতে অবশ্য এস্থলে বুঝায় ভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণ । কিন্তু ভগবানে ও ব্রহ্মে কি কোন পার্থক্য আছে ? আছেও; নাইও । স্বরূপতঃ না থাকিলেও সাধকের নিকট যে পার্থক্য আছে তাহা বুঝা যায় দ্বাদশ অধ্যায়ে অর্জুনের প্রশ্নে – ‘তোমাকে যাঁহারা ত্বদ্‌গতচিত্ত হইয়া ভজনা করেন, আর যাঁহারা অক্ষর ব্রহ্ম চন্তা করেন, এ উভয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সাধক কে ?’ তদুত্তরে শ্রীভগবান্‌ বলিলেন – ‘আমার ভক্তই শ্রেষ্ঠ সাধক, তবে অক্ষর ব্রহ্মচিন্তকেরাও আমাকেই পান ।’ এই কথার মর্ম – অক্ষর ব্রহ্ম আমিই, ব্রহ্মভাব আমারই বিভাব, নির্গুণভাবে আমি অক্ষর ব্রহ্ম, সগুণভাবে আমি বিশ্বরূপ, লীলাভাবে আমি অবতার – আমি পুরুষোত্তমই পরতত্ত্ব । ব্রহ্ম, আত্মা, বিরাট্‌, বৈশ্বানর, তৈজস, প্রাজ্ঞ, তুরীয় – সকলই আমি, সকল অবস্থাই আমার বিভাব বা বিভিন্ন ভাব । এই সগুণ-নির্গুণ, সৃষ্টিস্থিতি-প্রলয়কর্তা, যজ্ঞ-তপস্যার ভোক্তা, সর্বলোকমহেশ্বর পরমাত্মা পুরুষোত্তমই ভগবৎ-তত্ত্ব; আর উহার যে অনির্দেশ্য, অক্ষর, নির্বিশেষ নির্গুণ বিভাব, তাহাই ব্রহ্মতত্ত্ব । এই অর্থে বলা হইয়াছে, আমিই ব্রহ্মের অথবা শাশ্বত ধর্মের প্রতিষ্ঠা ।

সাধনপথে ভক্তির উপযোগিতা স্বীকার করিলেই ভগবত্তত্তের শ্রেষ্ঠতা স্বতঃই আসিবে, এই হেতু গীতা বেদান্তাদি শাস্ত্রের মূলতত্ত্ব স্বীকার করিলেও উহাতে ঈশ্বর-বাদেরই প্রাধান্য । ‘গীতা সাধারণভাবে সেই সেই দর্শনের (সাংখ্য, বেদান্তাদির) মূল প্রতিপাদ্য অঙ্গীকার করিয়া তাহার সহিত ঈশ্বরবাদ সংযুক্ত করিয়া তাহাদিগকে সুসম্পূর্ণ করিয়াছেন । এই ঈশ্বরবাদই গীতার প্রাণ; গীতার আদি, অন্ত, মধ্য – সমস্তই ঈশ্বরবাদে সমুজ্জল ।’ – বেদান্তরত্ন হীরেন্দ্রনাথ, গীতায় ঈশ্বরবাদ ।

সংগ্রহঃ ০১। sanatandharmatattva.wordpress.com
০২। http://www.scsmathinternational.com
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।