সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

প্রথম অধ্যায়ঃ অর্জুন-বিষাদযোগ

................................ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়....................................

                             ✴ ✴ ✴ ✴ ✴ প্রথম অধ্যায়ঃ অর্জুনবিষাদ-যোগ ✴ ✴ ✴ ✴ ✴



ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।
মামকাঃপান্ডুবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।১

অর্থ- ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়, পুণ্যক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধাভিলাশী আমার পুত্রগণ এবং পান্ডুপুত্রগণ সববেত হইয়া কি করিলেন?

আলোচনা: যুদ্ধারম্ভের পূর্বে ব্যাসদেব অন্ধরাজকে যুূ্দ্ধদর্শনার্থ দিব্যচুক্ষু প্রদান করিতে চাইলেন।ধৃতরাষ্ট্র্য তাহাতে অসম্মত হলে ব্যাসদেব রাজ-আমত্য সঞ্জয়কে বর প্রদান করেন।সেই বরপ্রভাবে তিনি দিব্যদৃষ্টি লাভ করিয়া যুদ্ধাদি-সন্দুর্শন ও উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের বাক্যাদি শ্রবণ ও মনোভাব সমস্ত পরিজ্ঞাতত হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের নিকট বর্ণনা করিয়াছিলেন।

এখানে যুদ্ধের কথা হইতেছে, তাই আমাদের কাছে মনে হতে পারে প্রথম শ্লোকে "কুরুক্ষেত্রেও যুদ্ধক্ষেত্র" হওয়ার কথা কিন্তু শ্লোকে "কুরুক্ষেত্রেও যুদ্ধক্ষেত্র" স্থলে "ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে" লেখা হয়েছে।অর্থাৎ ধর্মক্ষেত্র-এই বিশেষণটি ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু কেন?
কুরুক্ষেত্র কে ধর্মক্ষেত্র নামে আখ্যায়িত করার পিছনে কতগুলো যুক্তিসংঙ্গত কারণ আছে।

👍 জাবাল উপনিষদে ও শতপথব্রাহ্মণে ইহাকে দেবযজন অর্থাৎ দেবতাদের 'যজ্ঞস্থান' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।ইহার প্রাচীন নাম সমন্তপঞ্চক।

👍 দুর্যোধনাদির পূর্বপুরুষ বিখ্যাত কুরু রাজা এই স্থানে হল চালনা করে বর লাভ করিয়াছিলেন যে, যে ব্যক্তি এই স্থানে তপস্যা করিবে অথবা যুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ করিবে,সে স্বর্গে গমন করিবে।

👍 বনপর্বের তীর্থযাত্রা পর্বাধ্যায়ে কুরুক্ষেত্রকে তিন লোকের মধ্যে শ্রেষ্ট তীর্থস্থান বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে।

👍 প্রাচীন গ্রন্থাদিতে সর্বত্রই কুরুক্ষেত্রকে ধর্মক্ষেত্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
সুতারাং আমরা এই থেকে বুঝতে পারি এই শ্লোকে কুরুক্ষেত্রের আগে কেন 'ধর্মক্ষেত্র' শব্দটি বসলো কিংবা কুরুক্ষেত্রকে কেন ধর্মক্ষেত্র বলা হয়।


সঞ্জয় উবাচ
দৃষ্ট্রা তু পান্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা।
আচার্যমুপঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ।।২

অর্থ: সঞ্জয় কহিলেন,তখন রাজা দুর্যোধন পান্ডব-সৈন্যদিগকে ব্যূহাকারে সজ্জিত দেখিয়া দ্রোণাচার্য সমীপে যাইয়া এই কথা কহিলেন।

আলোচনা: আজকের আলোচনার অংশে, প্রান্তের কয়েকটি লাইন পড়ে বুঝতে পারবো যে, বাংলাদেশে আমরা সনাতন ধর্মালম্বীরা সংখ্যায় কম হলেও অর্থাৎ সংখ্যালগু হলেও আমরা সবাই যদি সর্বস্তরে ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা আমাদের শক্তি ও আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিরোধিতা করার সাহস পাবেনা। তাই দেখা যাক আজকের আলোচনার অংশবিশেষ।

ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি পারমার্থিক তত্ত্বদর্শন থেকেও বঞ্ছিত ছিলেন। তিনি ভাল ভাবেই জানতেন যে, ধর্মের ব্যাপারে তাঁর পাপিষ্ঠ পুত্রেরাও ছিল তাঁরই মতো অন্ধ এবং তিনি আরোও নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর পাপিষ্ঠ পুত্রেরা পাণ্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে বা, কারণ পাণ্ডবেরা সকলেই জন্ম থেকে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তবুও তিনি ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের প্রভাব সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধৃতরাষ্ট্রের এই প্রশ্ন করার প্রকৃত উদ্দেশ্য সঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই ধৃতরাষ্ট্র নৈরাশ্যগ্রস্থ রাজাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, এই পবিত্র ধর্মক্ষেত্রের প্রভাবের ফলে তাঁর সন্তানেরা পাণ্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে না। সঞ্জয় তখনই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন যে, তাঁর পুত্র দুর্যোধন পাণ্ডবদের মহৎ সৈন্যসজ্জা দর্শন করে, তার বিবরণ দিতে তৎক্ষনাৎ দুর্যোধন সেনাপতি দ্রোণাচার্যের কাছে উপস্থিত হলেন। দুর্যোধনকে যদিও রাজা বলা হয়েছে, তবুও সেই সঙ্কট ময় অবস্থায় তাঁকে তাঁর সেনাপতির কাছে উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে।

এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, চতুর রাজনীতিবিদ্‌ হবার সমস্ত গুনগুলি দুর্যোধনের মধ্যে বর্তমান ছিল। কিন্তু পাণ্ডবদের মহতী সৈন্যসজ্জা দেখে দুর্যোধনের মনে যে মহাভয়ের সঞ্চার হয়েছিল, যার ফলে তিনি তাঁর চতুরতার আবরণে ঢেকে রাখতে পারেননি।


পশ্যৈতাং পান্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্।
ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা।।৩

অর্থঃ- গুরুদেব,আপনার ধীমান্ শিষ্য দ্রুপদপুত্র কর্তৃক ব্যূহবদ্ধ পান্ডবদিগের এই বিশাল সৈন্যদল দেখুন।

আলোচনাঃ- এখানে একটা বিষয় খেয়াল করবেন, " আপনার ধীমান্ শিষ্য" এ কথাটি দুর্যোধন শ্লেষাত্নক ভাবেই ব্যবহার করিয়াছেন।আবার 'ধৃষ্টদ্যুম্ন' না বলিয়া 'দ্রুপদপুত্র' বলিয়া দ্রোণাচার্যের পূর্বশত্রুতা স্মরণ করাইয়া দিতেছেন।পঞ্চপাণ্ডবের পত্নী দ্রৌপদীর পিতা দ্রুপদরাজের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের কিছু রাজনৈতিক মনোমালিণ্য ছিল।এই মনোমালিন্যের ফলে দ্রুপদ এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, এবং সেই যজ্ঞের ফলে তিনি বর লাভ করেন যে,তিনি এক পুত্র লাভ করবেন,যে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করতে সক্ষম হবে।দ্রোনাচার্য এই বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে অবগত ছিলেন,কিন্তু দ্রুপদ তাঁর সেই পুত্র ধৃষ্টদুম্নকে যখন অস্রশিক্ষার জন্য তাঁর কাছে প্রেরণ করেন,তখন উদার হৃদয় সত্যনিষ্ট ব্রাক্ষণ দ্রোণাচার্য তাঁকে সব রকমের অস্রশিক্ষা এবং সমস্ত সামরিক কলা-কৌশলের গুপ্ত তথ্য শিখিয়ে দিতে কোণও দ্বিধা করেনি।

এখন,কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ধৃষ্ট্যদ্যূম্ন পাণ্ডবদের পক্ষে যোগদান করেন এবং পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা তিনিই পরিচালনা করেন, সেই শিক্ষা তিনি দ্রোণাচার্যের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। দ্রোণাচার্যের এই ত্রুটির কথা দুর্যোধন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন,যাতে তিনি পূর্ণ সতর্কতা ও অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।দুর্যোধণ মহৎ ব্রাক্ষণ দ্রোণাচার্যকে এটিও মনে করিয়ে দিলেন যে, পাণ্ডবদের, বিশেষ করে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনি যেন কোন কোমলতা প্রদর্শন না করেন,কারণ তাঁরাও সকলে তাঁর প্রিয় শিষ্য,বিশেষত অর্জুন ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় ও মেধাবী শিষ্য।দুর্যোধন সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন যে, এই ধরনের কোমলতা প্রকাশ পেলে যুদ্ধে অবধারিতভাবে পরাজয় হবে।



অত্র শূরা মহেষ্রাসা ভীমার্জুনসমা যুধি।
যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথ।।৪

ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশীরাজশ্চ বীর্যবান্।
পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ।।৫

যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্।
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।।৬

অর্থঃ- সেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম ও অর্জুনের মতো বীর ধনুর্ধারী রয়েছেন এবং যুযুধান, বিরাট ও দ্রুপদের মতো মহাযোদ্ধা রয়েছেন। সেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ ও শৈব্যের মতো অত্যন্ত বলবান যোদ্ধারাও রয়েছেন। সেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল পরাক্রমশালী উত্তমৌজ, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যোদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।

আলোচনাঃ- যদিও দ্রোণাচার্যের অসীম শোর্য, বীর্য ও সামরিক কলা-কৌশলের কাছে ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন এক অতি নগণ্য প্রতিবন্ধক এবং তাঁর ভয়ে ভীত হবার কোন কারণই ছিল না দ্রোণাচার্যের পক্ষে, কিন্তু ধৃষ্টদ্যুম্ন ছাড়াও পাণ্ডবপক্ষে অন্য অনেক রথী-মহারথী ছিলেন, যাঁরা সত্যিসত্যিই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্যোধনের পক্ষে সেই যুদ্ধজয়ের পথে তাঁরা ছিলেন এক-একটি দুরতিক্রম্য প্রতিবন্ধকের মতো, কারণ তাঁরা ছিলেন ভীম ও অর্জুনের মতো ভয়ংকর। তাঁদের বীরত্বের কথা দুর্যোধন ভালভাবেই জানতেন, তাই তিনি অন্যান্য রথী-মহারথীদেরও ভীম ও অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।


অস্মাকন্তু বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম।
নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে।।৭

অর্থঃ- হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আমার সনৈমধ্যেও যে সকল প্রধান সেনানায়ক আছেন, তাঁহাদিগকে অবগত হউন।আপনার সম্যক্ অবগতির জন্য তাঁহাদিগের নাম বলিতেছি।

ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ।
অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তির্জয়দ্রথঃ।।৮

অর্থঃ- আপনি নিজে,ভীষ্ম,কর্ণ,যুদ্ধজয়ী কৃপ,অশ্বত্থামা, বিকর্ণ, সোমদত্ত-পুত্র এবং জয়দ্রথঃ।

আলোচনাঃ- পাণ্ডব-পক্ষের রথী-মহারথীদের বর্ণনা করবার পর দুর্যোধন তার স্বপক্ষে যে সমস্ত বীরেরা যোগদান করেছেন তাঁদের বর্ণনা করেছে।

আট নং শ্লোকে 'সমিতিঞ্জয়ঃ' শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে সমিতি বা সংগ্রাম জয় করে যে এক কথায় যুদ্ধজয়ী।

উক্ত শ্লোকে আমরা আরো দেখতে পায় যে, বিকর্ণ, অশ্বণ্থামা, সৌমদত্তি বা ভূরিশ্রবা,জয়দ্রথ এবং কর্ণের নাম উল্লেখ আছে যাদের সম্পর্কে আমরা অনেকে হয়তবা অবগত নই। যেমনঃ

👍 কৃপ-দ্রোণাচার্যের শ্যালক।যিনি কৌরবদিগের অস্রগুরু।

👍 বিকর্ণ- যিনি দুর্যোধনের অন্যতম কনিষ্ঠ ভ্রাতা।

👍 সোমদত্তি- বাহ্লীকের রাজা সোমদত্তের পুত্র বিখ্যাত সোমদত্তি বা ভূরিশ্রবা।

👍 জয়দ্রথ- সিন্ধুদেশের রাজা,দুর্যোধনের ভগিনীপতি।

👍 অশ্বণ্থামা- দ্রোণাচার্যের পুত্র।

👍 কর্ণ-যিনি ছিলেন অর্জুনের বৈপিত্রেয় ভ্রাতা,কেন না রাজা পাণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ হবার আগে কুন্তীদেবীর কোলে তাঁর জন্ম হয়।



অন্যে চ বহবঃ শূরাঃ মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ।
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধ-বিশারদাঃ।।৯

অর্থঃ- এছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত । তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্রশস্রে সজ্জিত এবং তাঁরা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ ।

আলোচনাঃ- অন্য আর যে সমস্ত বীরেরা দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন, যেমন-জয়দ্রথ, কৃতবর্মা, শল্য আদি, এঁরা সকলেই দুর্যোধনের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তাই দুর্যোধনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই সমস্ত বীরপুঙ্গবেরা স্বপক্ষে থাকায় তার জয় অনিবার্য । তবে ঊপাপিষ্ট দুর্যোধনের পক্ষ অবলম্বন করার ফলে, কুরুক্ষেত্রের রনাঙ্গনে এঁদের সকলেরই মৃত্যু অবধারিত ছিল যা আমরা পরবর্তী শ্লোকগুলো পাঠ করে বুঝতে পারবো।



অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্।
পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্।।১০

অর্থঃ- ভীষ্মকর্তৃক সম্যক্ রক্ষিত আমাদের সেনা অপরিমিত।আর ভীমকর্তৃক রক্ষিত পান্ডবদের সেনা পরিমিত(অপেক্ষাকৃত অল্প)।

আলোচনাঃ- এই শ্লোকে দুর্যোধন পাণ্ডব-পক্ষ ও কৌরব-পক্ষের সামরিক শক্তির তুলনা করেছে। পিতামহ বীরশ্রেষ্ঠ ভীষ্মদেবের রক্ষণাবেক্ষণাধীন অমিত শক্তিশালী এক সৈন্যবাহিনী ছিল দুর্যোধনের স্বপক্ষে। অপর পক্ষে, পাণ্ডবদের সৈন্যবাহিনী ছিল সীমিত এবং তার সেনাপতি ছিলেন ভীমেসেন, যারা শৌর্যবীর্য ও সৈন্য পরিচালনার ক্ষমতা পিতামহ ভীষ্মদেবের তুলনায় ছিল নিতান্তই নগণ্য।




অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ।
ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি।।১১

অর্থ- আপনারা সককলেই স্ব স্ব বিভাগানুসারে সমস্ত বূহ্যদ্বারে অবস্থিত থাকিয়া ভীষ্মকেই সকল দিক হইতে রক্ষা করিতে থাকুন।

আলোচনা:একবার ভাবুন তো ভীষ্ম সমরে অপরাজেয়, তাঁহার জন্য দুর্যোধনের এত আশঙ্কা কেন এবং সকলে ভীষ্মকে রক্ষা করুন,এই কথা বলেন কেন?

👍দুর্যোধন পূর্বে স্পষ্টই বলিয়াছেন যে- 'ভীষ্ম একাই সসৈন্য পান্ডবগণকে বধ করিতে পারেন,কিন্তু তিনি শিখন্ডীকে বধ করিবেন না,সুতারাং সকলে সতর্ক হইয়া সর্ব দিক হইতে ভীষ্মকে রক্ষা করিবেন। কারণ ভীষ্মের মতো বিচক্ষণ ও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা তার পক্ষের সেনাপতি থাকালে জয় তার হবেই, সে নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিল। আর তাই দুর্যোধনের প্রতিটি কথাতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধজয় সম্বন্ধে তার মনে কোনই সংশয় ছিল না। ভীষ্মের শৌর্যবীর্যের প্রশংসা করার পরে, দুর্যোধন বিবেচনা করে দেখল, অন্যেরা মনে করতে পারে, তাঁদের শৌর্যবীর্যের গুরুত্ব লাগব করে হেয় করা হচ্ছে, তাই তার স্বভাবসুলব কূটনৈতিক চাতুরীর সাহায্য সেই পরস্থিতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সে উপরোক্ত কথাগুলি বলেছিল এভাবে সে মনে করিয়ে দিল যে ভীষ্মদেব যত বড় যোদ্ধাই হন, তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং সব দিক থেকে তাই ভীষ্মদেবকে তাঁদের রক্ষা করা উচিত। যুদ্ধ করতে করতে যদি তিনি কোনও একদিকে এগিয়ে যান, তা হলে শত্রুপক্ষ তার সুযোগ নিয়ে অন্য দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে। তাই অন্য বীরপুঙ্গবেরা যাতে নিজ নিজ স্থানে অধিষ্ঠিত থেকে শক্রসৈন্যকে ব্যূহ ভেদ করতে না দেয়, তার গুরুত্ব সম্বদ্ধে দ্রোণাচার্যেকেও দুর্যোধন মনে করিয়ে দিয়েছিল।



তস্য সংজনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ।
সিংহনাদং বিনদ্যােচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্।।১২

অর্থঃ- তখন প্রতাপশালী কুরুবৃদ্ধ পিতামহ(ভীষ্ম) দুর্যোধনের আনন্দ জন্মাইয়া উচ্চ সিংহনাদ করিয়া শঙ্খধ্বনি করিলেন।

আলোচনাঃ- এখানে হর্ষং দ্বারা আনন্দকে বুঝানো হয়েছে তবে কুরু-রাজবংশের পিতামহ(ভীষ্ম) দুর্যোধনের হৃদকম্প অনুভব করতে পেরে তাঁর স্বভাবসুলভ করুণার বশবর্তী হয়ে তাঁকে উৎসাহিত করবার জন্য সিংহনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন। পরোক্ষভাবে, শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে তিনি তাঁর হতাশাচ্ছন্ন পৌত্র দুর্যোধনের জানিয়ে দিলেন যে, এই যুদ্ধে জয়লাভ করার কোন আশাই তাঁর নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন তাঁর বিপক্ষে। তবুও, ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে জয়-পরাজয়ের কথা বিবেচনা না করে যুদ্ধ করাই তাঁর কর্তব্য এবং এই ব্যাপারে তিনি কোন রকম অবহেলা করবেন না। সেই কথা তিনি দুর্যোধনকে মনে করিয়ে দিলেন।

পরিশেষে উপরের আলোচনা থেকে আমরা এতটুকু হলেও বুঝা উচিত যে, আমাদের ধর্ম এবং আমাদের নৈতিকতা যা বলে তাই আমাদের করা দায়িত্ব ও কর্তব্য। নিজ জন্মদাতা পিতা মাতা বৃদ্ধ হলে আমরা তাদের কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি কারণ এই যুগের কিছু ডিজিটাল বৌরা এসব বৃদ্ধ মানুষ গুলির সাথে নাকি তাল মিলিয়ে বসবাস করতে পারবে না।আর এই ধরনের হীন মন মানসিকতা ও চিন্তা ভাবনাকে কিছু কুলাঙ্গার ছেলেরা সমর্থন করে তার জন্মদাতা পিতা মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে।ধর্মের মতে পিতা মাতা হলেন গুরুজন তাই ধর্ম এবং নৈতিকতার হিসবা অনুসারে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আমাদের নিজ নিজ বাবা মাকে তাদের শেষ জীবন পর্যন্ত শ্রদ্ধা, ভক্তি ভালবাসা দিয়ে নিজের কাছে যত্নসহকারে রাখা। তাহলে আমরাই হতে পারবো আমাদের পিতা মাতার কাছে এক একটা আদর্শ সন্তান।



শ্রীগোপালকৃষ্ণায় নমঃ
।। ওঁ নমো ভগবতে বাসুুদেবায়।।

ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবৎ।।১৩

অর্থ- তখন শঙ্খ,ভেরী,পণব,আনক,গোমুখ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সহসা বাদিত হইলে সে শব্দ তুমুল হইয়া উঠিল।১৩

ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্তিতৌ।
মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ।।১৪

অর্থ- অনন্তর শ্বেতাশ্বযুক্ত(শ্বেতবর্ণ অশ্বযুক্ত) মহারথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন দিব্য-শঙ্খ-ধ্বনি করিলেন।

আলোচনাঃ- এখানে ভীষ্মদেবের শঙ্খের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খকে ‘দিব্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই দিব্য শঙ্খধ্বনি ঘোষণা করল যে, কুরুপক্ষের যুদ্ধজয়ের কোন আশাই নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষে যোগদান করেছেন। জয়স্তু পাণ্ডপুত্রাণাং যেষাং পক্ষে জনার্দনঃ । পাণ্ডবদের জয় অবধারিত, কারণ জনার্দন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন। ভগবান যে পক্ষে যোগদান করেন, সৌভাগ্য-লক্ষ্মীও সেই পক্ষেই থাকেন, কারণ সৌভাগ্য-লক্ষ্মী সর্বদাই তাঁর পতির অনুগামী। তাই বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দিব্য শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে ঘোষিত হল যে, অর্জুনের জন্য বিজয় ও সৌভাগ্য প্রতীক্ষা করছে। তা ছাড়া, যে রথে চড়ে দুই বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা অগ্নিদেব অর্জুনকে দান করেছিলেন এবং সেই দিব্য রথ ছিল সমগ্র ত্রিভুবনে সর্বত্রই অপরাজেয়।

১৩নং শ্লোকে কিছু বিশেষ শব্দও ব্যবহার হয়েছে যেগুলোর সম্পর্কে আমারা অনেকেই অবগত না।যেমন:
১)পণব=মৃদঙ্গ ;
২)আনক=ঢাক ;
৩)গোমুখ=রণশঙ্খ।
আরেকটি বিশেষ কথা হলো সেকালে বিউগল্( bugle) হিসাবে বর্তমান শঙ্খ ছিল।






পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ।
পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদর্র।।১৫

অর্থ- তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।

আলোচনাঃএই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ অর্জুন এবং ভীমকে একটা বিশেষ নামে অখ্যায়িত করা হয়েছে।

👍 হৃষীকেশঃ আমরা জানি যে শ্রীকৃষ্ণের শত নাম রয়েছে, যেখানে প্রায় প্রত্যেকটি নামের পিছনে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে এক একটি ব্যাখ্যা রয়েছে।যেমন: মধু নামক দানবকে সংহার করার জন্য তাঁর নাম মধুসূদন; গাভী ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন বলে তাঁর নাম গোবিন্দ ; বসুদেবের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম বাসুদেব; দেবকীর সন্তানরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম দেবকীনন্দন; বৃন্দাবনে যশোদার সন্তানরূপে তিনি তাঁর বাল্যলীলা প্রদর্শন করেন বলে তাঁর নাম যশোদানন্দন এবং সখা অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম পার্থসারথি। একই ভাবে শ্রীকৃষ্ণকে এই শ্লোক হৃষীকেশ বলা হয়েছে, যেহেতু তিনি হচ্ছেন সমস্ত হৃষীক বা ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর। জীবেরা হচ্ছে তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবদের ইন্দ্রিয়গুলিও হচ্ছে তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই রকম, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে দিব্য নিজেই পরিচালনা করেছিলেন বলে তাঁর নাম হৃষীকেশ।

👍 ধনঞ্জয়ঃ এখানে অর্জুনকে ধনঞ্জয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, কারণ বিভিন্ন যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠিরকে ধন সংগ্রহ করতে সাহায্য করতেন।

👍 বৃকোদরঃ তেমনি ভীমকে এখানে বৃকোদর বলা হয়েছে, কারণ যেমন তিনি হিড়িম্ব আদি দানবকে বধ করার মতো দুঃসাধ্য কাজ সাধন করতে পারতেন, তেমনই তিনি প্রচুর পরিমাণে আহার করতে পারতেন।

সুতরাং পাণ্ডবপক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা যখন তাঁদের বিশেষ ধরনের শঙ্খ বাজালেন, সেই


অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠরঃ ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ।। ১৬ ।।
কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্ঠদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ।। ১৭ ।।
দ্রুপদো দ্রুপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে ।
সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্ ।। ১৮ ।।

অর্থ- কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠর অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘোষ ও মনিপুস্পক নামক শঙ্খ। হে মহারাজ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্ঠদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং সকলে তাঁদের নিজ নিজ শঙ্খ বাজালেন।

আলোচনঃ- তবে একটা কথা পূর্বে বলে রাখি যা আমরা পরবর্তী শ্লোকগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিশদভাবে জানতে পারবো, এখানে সঞ্জয় সুকৌশলে ধৃতরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিলেন যে, পাণ্ডুপুত্রদের প্রতারণা করে তাঁর নিজের ছেলেদের সিংহাসনে বসাবার দুরভিসন্ধি করাটা তাঁর পক্ষে মোটেই প্রশংসনীয় কাজ হয়নি। চারিদিক থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে, কুরুবংশে সমূলে বিনাশ হবে এবং পিতামহ ভীষ্ম থেকে শুরু করে অভিমন্যু আদি পৌত্ররা সকলেই যুদ্ধে নিহত হবেন। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে উপস্থিত রাজা-মহারাজা ও রথী-মহারথীরা সকলেই নিহত হবেন। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং, কারণ তাঁর পুত্রদের দুষ্কর্মে তিনি কখনও কোন রকম বাধা দেননি, উপরন্তু তাঁদের সব রকম দুষ্কর্মে তিনি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।




স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন্ ।। ১৯

অর্থ- সেই তুমুল শব্দ আকাশ ও পৃথিবীতে প্রতিধ্বনিত হইয়া ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রগণ ও তৎপক্ষীয়গণের হৃদয় বির্দীর্ণ করিল।

আলোচনাঃ- ভীষ্মদেব আদি কৌরব-পক্ষের বীরেরা যখন শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, তখন পাণ্ডবদের বুক ভয়ে কেঁপে ওঠেনি। কিন্তু এই শ্লোকে আমারা দেখছি যে, পাণ্ডবদের শঙ্খনাদে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় ভয়ে বিদীর্ণ হল। পাণ্ডবদের মনে কোন ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন সদাচারী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত। ভগবানের কাছে যিনি আত্মসর্মপণ করেন, তাঁর মনে কোন ভয় থাকে না, চরম বিপদেও তিনি থাকেন অবিচলিত।



অথ ব্যবস্থিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পাণ্ডবঃ ।
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ।। ২০ ।।

অর্থ- সেই সময় পাণ্ডুপুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে, তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমরসজ্জায় বিন্যস্ত দেখে, অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন।

আলোচনাঃ- কুরুেক্ষেত্রে যুদ্ধের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, পাণ্ডবদের অপ্রত্যাশিত সৈন্যসজ্জা দেখে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উপস্থিত থেকে পাণ্ডবদের পরিচালিত করেছিলেন, তাই কৌরবদের এই হৃদকম্প হওয়াটা স্বাভাবিক। অর্জুনের রথে হনুমান অঙ্কিত ধ্বজাও একটি বিজয়সূচক ইঙ্গিত, কারণ রাম-রাবণের যুদ্ধে হনুমান শ্রীরামচন্দ্রকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধও অর্জুনকে সাহায্য করবার জন্য তাঁর রথে শ্রীরামচন্দ্র ও হনুমান দুজনকেই উপস্থিত থাকতে দেখতে পাই। শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন শ্রীরামচন্দ্র এবং যেখানে শ্রীরামচন্দ্র, সেখানেই তাঁর নিত্য সেবক ভক্ত-হনুমান এবং নিত্য সঙ্গিনী সীতা লক্ষ্মীদেবী উপস্থিত থাকেন। তাই, অর্জুনের কোন শত্রুর ভয়েই ভীত হবার কারণ ছিল না, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরিচালিত করবার জন্য স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এভাবে, যুদ্ধজয়ের সমস্ত শুভ পরামর্শ অর্জুন পাচ্ছিলেন। তাঁর নিত্যকালের ভক্তের জন্য ভগবানের দ্বারা আয়োজিত এই রকম শুভ পরিস্থিতে সুনিশ্চিত জয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।






অর্জুন উবাচ -সেনয়োরুরভয়োরমধ্যে রথং স্থাপয় মেঅচ্যুত । যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান।। ২১ ।।
কৈরময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন রণসমুদ্যমে ।। ২২ ।।

অর্থ- অর্জুন বললেন- হে অচ্যুত ! তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদলের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।





যোতস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধেরযুদ্ধে প্রিয়চিকিরষবঃ ।। ২৩।।

অর্থ- ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে এখানে যুদ্ধ করতে যারা এসেছে তাদেরকে আমি দেখতে চাই ।

আলোচনাঃ এই কথা সকলেরই জানা ছিল যে, দুর্যোধন তার পিতা ধৃতরাষ্ট্রের সহযোগিতায় অন্যায়ভাবে পাণ্ডবদের রাজ্যত্ব আত্মসাৎ করতে চেষ্টা করেছিল । তাই যারা দুর্যোধনের পক্ষে যোগ দিয়েছিল, তারা সকলেই ছিল "এক গোয়ালের গরু ।" যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন দেখে নিতে চেয়েছিলেন তারা কারা । কৌরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করার সবরকম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার ফলেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আয়োজন করা হয়, তাই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার কোন বাসনা অর্জুনের ছিল না । অর্জুন যদিও স্থির নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, জয় তাঁর হবেই কারণ, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পাশেই বসে আছেন, কিন্তু তবুও যুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি শত্রুপক্ষের সৈন্যবল কতটা তা দেখে নিতে চেয়েছিলেন।





সঞ্জয় উবাচ-

এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত।

সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ম।।২৪।।

অর্থ- সঞ্জয় বললেন- হে ভরত-বংশধর! অর্জুন কর্তৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।

আলোচনাঃ- ২৪নং শ্লোকে ভারত , হৃষীকেশ, গুড়াকেশ শব্দগুলো উল্লেখ আছে।চলুন দেখি এই শব্দগুলো সম্পর্কে গীতায় কি ব্যাখ্যা আছে।

১)ভারত- এখানে ভারতে বলতে ধৃতরাষ্ট্রকে বুঝানো হয়ছে।তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে ,ভারত দ্বারা অন্যত্র অর্জুনকেও উল্লেখ করা হয়েছে।কারণ ইঁহারা উভয়েই দুষ্মন্ত রাজার পুত্র ভরতের বংশধর।তাই ইঁহাদেরকে বিশেষ বিশেষ জায়গায় ভারত বলেও সম্বোধন করা হয়।

২)গুড়াকেশ- এই শ্লোকে অর্জুনকে গুড়াকেশ বলে অভিহিত করা হয়েছে। গুড়াকা মানে হচ্ছে নিদ্রা এবং যিনি নিদ্রা জয় করেছেন, তাকে বলা হয় গুড়াকেশ। নিদ্রা অর্থে অজ্ঞানতাকেও বোঝায়। অতএব শ্রীকৃষ্ণের বন্ধুত্ব লাভ করার ফলে অর্জুন নিদ্রা ও অজ্ঞানতা উভয়কেই জয় করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত অর্জুন এক মুহূর্তের জন্যও শ্রীকৃষ্ণকে বিস্মৃত হতেন না, কারণ এটিই হচ্ছে ভক্তের লক্ষণ। শয়নে অথবা জাগরণে ভক্ত ভগবানের নাম, রূপ, গুন ও লীলা স্মরণে কখনও বিরত হন না। এভাবেই কৃষ্ণভক্ত সর্বদাই কৃষ্ণচিন্তায় মগ্ন থেকে নিদ্রা ও অজ্ঞানতা জয় করতে পারেন। একেই বলা হয় কৃষ্ণভাবনা বা সমাধি।

৩)হৃষীকেশ- হৃষীক ইন্দ্রিয় , তাহার ঈশ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণের প্রভু শ্রীকৃষ্ণ।এই জন্য শ্রীকৃষ্ণের শতনামের এক নাম হৃষীকেশ।





ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাম চ মহিক্ষীতাম ।
উবাচ পার্থ পশ্যৈইতান সমবেতান কুরূনীতি ।।

অর্থ- ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ অন্যান্য নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ ।

আলোচনাঃ- সর্বজীবের পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ জানতেন অর্জুনের মনে কি হচ্ছিল । এই প্রসঙ্গে তাঁকে হৃষীকেশ বলার মধ্যদিয়ে বোঝানো হচ্ছে তিনি সবই জানতেন, তিনি সর্বজ্ঞ । এখানে অর্জুনকে পার্থ, অর্থাৎ পৃথা বা কুন্তীপুত্র বলে অভিহিত করাটাও তাৎপর্যপূর্ণ । বন্ধু হিসেবে তিনি অর্জুনকে জানাতে চেয়েছিলেন যে, যেহেতু অর্জুন হচ্ছেন তাঁর পিতা বসুদেবের ভগ্নী পৃথার পুত্র, তাই তিনি তাঁর রথের সারথী হতে সম্মত হয়েছেন । এখন যখন শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “দেখ পার্থ, সমবেত ধার্তরাষ্ট্রগণ” তখন তিনি কি অর্থ করেছিলেন? সেজন্যই কি অর্জুন সেখানে দাড়িয়ে পড়ে, যুদ্ধ করতে অসম্মত হননি? পিতামহ ভীষ্ম, পিতৃতুল্য আচার্য দ্রোণ এঁদের দেখে কি তাঁর হৃদয় আর্দ্র হয়ে উঠেনি? কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতৃস্বসা কুন্তীর পুত্র অর্জুনের কাছ থেকে এমন আচরন কখনই আশা করেননি । অর্জুনের মনের ভাব বুঝতে পেরে পরিহাসছলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভবিষ্যৎ-বাণী করলেন ।




তত্রাপশ্যৎ স্থিতান পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান ।

আচার্যাম্নাতুলান ভ্রাতৃন পুত্রান পৌত্রান সখীংস্তথা ।।

শ্বশুরান সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুরভয়োরপি ।। ২৬।।

অর্থ- তখন অর্জুন উভয় দলের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাঙ্খীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন ।

আলোচনাঃ– যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন সমস্ত আত্মীয়স্বজনদের দেখতে পেলেন । তিনি ভূরিশ্রবা আদি সমস্ত পিতৃবন্ধুদের দেখলেন; ভীষ্মদেব, সোমদেব আদি পিতামহদের দেখলেন; দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য আদি শিক্ষাগুরুদের দেখলেন; শল্য, শকুনি আদি মাতুলদের দেখলেন; দুর্যোধন আদি ভাইদের দেখলেন; পুত্রতুল্য লক্ষ্মণকে দেখলেন; অশ্বত্থামার মত বন্ধুদের দেখলেন; কৃতবর্মার মত শুভাকাঙ্খীদের দেখলেন । এভাবে শত্রুপক্ষের সেনাদের মধ্যে তিনি শুধুমাত্র আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদেরই দেখলেন ।





তান সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান বন্ধুনবস্থিতান ।

কৃপয়া পরয়াবিস্টো বিষিদন্নীদমব্রবৎ ।। ২৭ ।।

অর্থ- যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত বিষণ্ণ ও কৃপাবিস্ট হয়ে বললেন ।

অর্জুন উবাচ দৃষ্টেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতং । সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুস্যতি ।। ২৮ ।।

অর্থ- অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে ।

আলোচনাঃ- শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে – যস্যাস্তি ভক্তিরভগবত্যকিঞ্চনা সর্বইরগুনৈস্তত্র সমাসতে সুরাঃ । হরাভক্তস্য কুতো মহদগুণা মনোরথেনাসতি ধাবতো বহিঃ।।

“ভগবানের প্রতি যার অবিচলিত ভক্তি আছে, তিনি দেবতাদের সবকয়টি মহৎ গুণের দ্বারা ভূষিত । কিন্তু যে ভগবৎভক্ত নয়, তার যে সব গুণ তা সবই জাগতিক, এবং সেগুলোর কোন মূল্য নেই । কারণ, সে মনধর্মের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সে অবধারিতভাবেই চোখ ধাঁধান জাগতিক শক্তির দ্বারা আকর্ষিত হয়ে পড়ে। "(ভাগবত ৫/১৮/১২)।

অর্থাৎ এই থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, যিনি প্রকৃত ভগবৎ ভক্ত তাঁর মধ্যে সদগুণগুলিই বর্তমান থাকে, যা সাধারণত দেবতা এবং দৈবীভাবাপন্ন মানুষদের মধ্যে কেবল দেখা যায়। পক্ষান্তরে যারা অভক্ত, ভগবৎ-বিমুখ তারা জাগতিক শিক্ষা সংস্কৃতির মাপকাঠিতে যতই উন্নত বলে প্রতীত হোক, তাদের মধ্যে এইসব দৈবী গুণগুলোর প্রকাশ একদমই দেখা যায় না । সেই কারণেই, যে সমস্ত হীন ভাবাপন্ন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবেরা অর্জুনকে সবরকম দুঃখের মধ্যে ফেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, যারা তাঁকে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টায় এই যুদ্ধের আয়োজন করেছিল তাদেরই দেখে অর্জুনের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল । তাঁর স্বপক্ষের সৈন্যদের প্রতি অর্জুনের সহানুভূতি ছিল অতি গভীর কিন্তু এমনকি যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের দেখে এবং আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে অর্জুন শোকাতুর হয়ে পড়েছিলেন । সেই গভীর শোকে তাঁর শরীর কাঁপছিল, মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল । কুরুপক্ষের এই যুদ্ধলালসা তাঁকে আশ্চর্যান্বিত করেছিল । বাস্তবিকপক্ষে সমস্ত শ্রেণীর লোকেরা এবং অর্জুনের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনরা তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে এসেছিল । তিনি বুঝতে পারছিলেন না কেন তাঁর আত্মীয়স্বজনরা তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছিল । তাদের এই নিষ্ঠুর মনোভাব অর্জুনের মত দয়ালু ভগবৎ-ভক্তকে অভিভূত করেছিল । এখানে যদিও উল্লেখ করা হয়নি তবুও আমাদের অনুমান করতে কষ্ট হয়না যে, অর্জুনের শরীর কেবল শুষ্ক ও কম্পিতই হয়নি, সেই সঙ্গে অনুকম্পা ও সহানুভূতিতে তাঁর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ছিল । অর্জুনের এই ধরনের আচরণ তাঁর দুর্বলতার প্রকাশ নয়, এ হচ্ছে তাঁর হৃদয়ের কোমলতার প্রকাশ । ভগবানের ভক্ত করুণার সিন্ধু, অপরের দুঃখে তাঁর অন্তর কাঁদে । তাই শুদ্ধ ভগবৎ-ভক্ত অর্জুন বীরশ্রেষ্ঠ হলেও তাঁর অন্তরের কোমলতার পরিচয় আমরা এখানে পাই ।




বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে।
গাণ্ডীবং সংস্রতে হস্তাৎ ত্বক চৈব পরিদহ্যতে ।। ২৯ ।।

অর্থ- আমার সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হচ্ছে, আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে এবং ত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে।

আলোচনাঃ- শরীরে কম্পন হওয়ার দুটি কারণ আছে এবং রোমাঞ্চিত হওয়ারও দুটি কারণ আছে । তার একটি হচ্ছে চিন্ময় আনন্দের অনুভূতি এবং অন্যটি হচ্ছে প্রচণ্ড জড়-জাগতিক ভয় । অপ্রাকৃত অনুভূতি হলে কোন ভয় থাকেনা । অর্জুনের এই কম্পন ও রোমাঞ্চ অপ্রাকৃত আনন্দের জন্য নয়, পক্ষান্তরে জড় জগতের ভয়ের জন্য । এই ভয়ের উদ্রেক হয়েছিল তাঁর আত্মীয় স্বজনদের প্রাণহানির আশঙ্কার ফলে । তাঁর অন্যান্য লক্ষণ দেখেও আমরা তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি । অর্জুন এতই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর হাত থেকে গাণ্ডীব ধনু খসে পড়েছিল এবং প্রচণ্ড দুঃখে তাঁর হৃদয় দগ্ধ হবার ফলে তাঁর ত্বক জ্বলে যাচ্ছিল । এই সমস্ত কিছুরই মূল কারণ হচ্ছে ভয় । অর্জুন এই মনে করে ভীষণ ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর সমস্ত আত্মীয়-স্বজন সেই যুদ্ধে হত হবে, এবং এই যে হারাবার ভয়, তারই বাহ্যিক প্রকাশ হচ্ছিল তাঁর দেহের কম্পন, রোমাঞ্চ, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, গা জ্বালা করা আদির মাধ্যমে । গভীরভাবে বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই, অর্জুনের এই ভয়ের কারণ হচ্ছে, তিনি তাঁর এই দেহটাকেই তাঁর স্বরূপ বলে মনে করেছিলেন এবং তাঁর দেহের সম্বন্ধে যারা আত্মীয়, তাদের হারাবার শোকে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন ।








চ শকনোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ।

নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরিতানি কেশব ।। ৩০ ।।

অর্থ- হে কেশব! আমি আর স্থির থাকতে পারছি না । আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদভ্রান্ত হচ্ছে । হে কেশী দানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ! আমি কেবল অমঙ্গলসূচক চিহ্নসমূহ দর্শন করছি ।

আলোচনাঃ-আমরা এখানে দেখতে পাই যে, অর্জুন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তাই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর মন এতই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল যে, তিনি আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েছিলেন । জড় জগতের প্রতি অত্যধিক আসক্তি মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে । ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাৎ(ভাগবত ১১/২/৩৭) – এই ধরনের ভীতি ও আত্মবিস্মৃতি তখনই দেখা দেয়, যখন মানুষ জড়া প্রকৃতির দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে । অর্জুন অনুভব করেছিলেন যে, ঐ যুদ্ধের পরিণতি হচ্ছে কেবল স্বজন হত্যা এবং এইভাবে শত্রুনাশ করে যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি কোন সুখই পাবেন না । এখানে, “নিমিত্তানি বিপরিতানি” কথাগুলো তাৎপর্যপূর্ণ । মানুষ যখন নৈরাশ্য ও হতাশা সম্মুখীন হয় তখন মনে করে, “আমার বেঁচে থেকে লাভ কি?” সকলেই কেবল তার নিজের সুখ সুবিধা নিয়ে চিন্তা করে । ভগবানের বিষয়ে কেউ মাথা ঘামায় না । শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাতেই অর্জুন তাঁর প্রকৃত স্বার্থ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রদর্শন করেছেন । মানুষের প্রকৃত স্বার্থ নিহিত রয়েছে বিষ্ণু অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণেরই মাঝে । মায়াবদ্ধ জীবেরা একথা ভুলে গেছে, তাই তারা নানাভাবে কষ্ট পায় । এই দেহাত্মবুদ্ধির প্রভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার ফলে অর্জুন মনে করেছিলেন, তাঁর পক্ষে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয় করাটা হবে গভীর মর্মবেদনার কারণ ।





ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে ।

ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ।। ৩১।।

অর্থ- হে কৃষ্ণ ! যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নিধন করা শ্রেয়স্কর দেখছি না । আমি যুদ্ধে জয়লাভ চাই না, রাজ্য এবং সুখভোগও কামনা করিনা ।

আলোচনাঃ- মায়াবদ্ধ মানুষ বুঝতে পারেনা, তার প্রকৃত স্বার্থ নিহিত রয়েছে বিষ্ণু বা কৃষ্ণের সেবার মধ্যে । এই কথা বুঝতে না পেরে তারা তাদের দেহজাত আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তাদের সাহচর্যে সুখী হতে চায় । জীবনের এই প্রকার অন্ধ ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা এমনকি জাগতিক সুখের কারণগুলিও ভুলে যায় । এখানে অর্জুনের আচরনে আমরা দেখতে পাই তিনি তার ক্ষাত্রধর্মও ভুলে গেছেন । শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দুই ধরনের মানুষ দিব্য আলোকে উদ্ভাসিত সূর্যলোকে উত্তীর্ণ হন । তাঁরা হচ্ছেন – (১) শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞা অনুসারে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে যিনি রণভূমিতে প্রাণত্যাগ করেন এবং (২) যে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী অধ্যাত্ম-চিন্তায় গভীরভাবে অনুরক্ত, তিনি । অর্জুনের অন্তঃকরণ এমন যে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করা দূরের কথা, তিনি তাঁর শত্রুদের পর্যন্ত হত্যা করতে নারাজ ছিলেন । তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে তিনি সুখী হতে পারবেন না । যার ক্ষুধা নেই সে যেমন রান্না করতে চায় না, তেমনি অর্জুনও যুদ্ধ করতে নারাজ ছিলেন । পক্ষান্তরে তিনি স্থির করেছিলেন, অরণ্যের নির্জনতায় নৈরাশ্য-পীড়িত জীবন অতিবাহিত করবেন । অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, এই ধর্ম পালন করার জন্য তাঁর রাজত্বের প্রয়োজন ছিল । কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে পাওয়া সেই রাজত্ব থেকে দুর্যোধন আদি কৌরবেরা তাঁকে বঞ্চিত করার ফলে সেই রাজ্যে তাঁর অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কৌরবদের সাথে তাঁর যুদ্ধ করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল । কিন্তু যুদ্ধে এসে যখন তিনি দেখলেন যে, তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করে সেই রাজ্যে তাঁর অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তখন তিনি গভীর দুঃখ ও নৈরাশ্যে ঠিক করলেন যে, তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে বনবাসী হবেন ।




কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা

যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ। ৩২।
ত ইমেঽবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ

আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ |।৩৩।।
মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা

এতান্ন হন্তুমিচ্ছামি ঘ্নতোঽপি মধুসূদন ||৩৪||
অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে

নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন||৩৫||

অর্থ- হে গোবিন্দ! আমাদের রাজ্যে কি প্রয়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারণেই বা কি প্রয়োজন, যখন দেখছি- যাদের জন্য রাজ্য বা সুখভোগের কামনা তারা সকলেই আজ এই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত? হে মধুসূদন! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়-স্বজন সকলেই প্রাণ ও ধনাদির কথা ত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধ করতে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তারা আমাকে বধ করতে চাইলেও আমি তাদেরকে হত্যা করব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপালক জনার্দন! পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমনকি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই । ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?

আলোচনাঃ- অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে “গোবিন্দ” নামে সম্বোধন করেছেন যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ গো অর্থাৎ গরু ও ইন্দ্রিয়গুলোকে আনন্দ দান করেন । এই তাৎপর্যপূর্ণ নামের দ্বারা তাঁকে সম্বোধন করার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন কিসে তাঁর ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি হবে । বাস্তবিকপক্ষে গোবিন্দ আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে তৃপ্ত করেন না, কিন্তু আমরা যদি গোবিন্দের ইন্দ্রিয়গুলোকে তৃপ্ত করি তাহলে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো এমনিতেই তৃপ্ত হয়ে যায় । দেহাত্ববুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা নিজেদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি নিয়ে ব্যস্ত এবং তারা চায় যে, ভগবান তাদের সকল ইন্দ্রিয়তৃপ্তির যোগান দিয়ে যাবেন । যার যতটা ইন্দ্রিয়তৃপ্তি প্রাপ্য, ভগবান তাকে তা দিয়ে থাকেন । কিন্তু আমরা যা চাইব, ভগবান তা দিয়ে যাবেন সেটা মনে করা ভুল । কিন্তু তার বিপরীত পন্থা গ্রহণ করে অর্থাৎ, যখন আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির কথা না ভেবে গোবিন্দের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির সেবায় ব্রতী হই, তখন গোবিন্দের আশীর্বাদে আমাদের সমস্ত বাসনা আপনা থেকেই তৃপ্ত হয়ে যায় । আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অর্জুনের গভীর মমতা তাঁর স্বভাবজাত করুণার প্রকাশ এবং এই মমতার বশবর্তী হয়ে তিনি যুদ্ধ করতে নারাজ হন । প্রত্যেকেই নিজের সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্য তাঁর বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে দেখাতে চায় । কিন্তু অর্জুন যখন বুঝতে পারলেন যুদ্ধে তাঁর সমস্ত আত্মীয়-স্বজন নিহত হবেন এবং যুদ্ধশেষে সেই যুদ্ধলব্ধ ঐশ্বর্য ভোগ করার জন্য তাঁর সঙ্গে আর কেউ থাকবেনা, তখন তিনি ভয় ও শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন । সাংসারিক মানুষের স্বভাবই হচ্ছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই ধরণের হিসাব-নিকাশ ও জল্পনা-কল্পনা করা । কিন্তু অপ্রাকৃত অনুভুতিসম্পন্ন জীবন অবশ্য ভিন্ন ধরণের । তাই ভগবৎ ভক্তের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের । ভগবানকে তৃপ্ত করাটাই হচ্ছে তাঁর ব্রত, তাই ভগবান যখন চান, তখন পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য গ্রহণ করতেও তিনি কুণ্ঠিত হন না । আবার ভগবান যখন চান না, তখন তিনি একটি কপর্দকও গ্রহণ করেন না । অর্জুন সেই যুদ্ধে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করতে চাইছিলেন না এবং তাদের হত্যা করা যদি এতই জরুরি হয়ে থাকে, তাহলে তিনি চেয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যেন তাদেরকে বিনাশ করুন । তখনও তিনি জানতেন না যে, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আসার আগেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় তারা হত হয়ে আছে এবং সেই ইচ্ছাকে রূপ দেয়ার জন্য তিনি হচ্ছেন একটি উপলক্ষ মাত্র । পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এই কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে । ভগবানের শুদ্ধভক্ত অর্জুনের ইচ্ছাই ছিল না তাঁর দুর্বৃত্ত ভাইদের উপর প্রতিশোধ নেয়ার, কিন্তু ভগবান চেয়েছিলেন তাদের সকলকে বিনাশ করতে । ভগবানের শুদ্ধভক্ত কখনোই কারও প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হন না, অন্যায়ভাবে যে তাঁকে প্রতারণা করে, তাঁর উপরও তিনি করুণা বর্ষণ করেন । কিন্তু ভগবানের ভক্তকে যে আঘাত দেয়, ভগবান কখনোই সেটা সহ্য করেন না । ভগবানের শ্রীচরণে অন্যায় করলে ভগবান ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তাঁর ভক্তের প্রতি অন্যায় ভগবান তাই অর্জুন যদিও সেই দুর্বৃত্তদের ক্ষমা করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভগবান তাদের বিনাশ করা থেকে নিরস্ত হন নি




পাপম্‌ এব আশ্রয়েত্ অস্মান্‌ হত্বা এতান আততায়িনঃ ।
তস্মাত্ ন অর্হা বয়ম্‌ হন্তুম্‌ ধার্তরাষ্ট্রান সবান্ধবান ।
স্বজনম্‌ হি কথম্‌ হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধবম্‌ ।৩৬।

অর্থ- এই ধরনের আততায়িদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্টের পুত্রদের সংহার করা আমাদের উচিত্ হবে না। হে শ্রীকৃষ্ণ লক্ষ্মীপতি মাধব! আত্মীয় স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কি লাভ হবে? আর তা থেকে কেমন করে আমরা সুখী হব?
আলোচনাঃ- আমাদের জানার প্রয়োজন আছে যে, বেদের অনুশাসন অনুয়ায়ী শত্রু ছয় প্রকার-
১) যে বিষ প্রয়োগ করে,
২) যে ঘরে আগুন লাগায়,
৩) যে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে,
৪) যে ধনসম্পদ লুন্ঠন করে,
৫) যে অন্যের জমি দখল করে এবং
৬) যে বিবাহিত স্ত্রীকে হরণ করে।

এই ধরণের আততায়ীদের অবিলম্বে হত্যা করার নির্দেশ শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে এবং এদের হত্যা করলে কোন রকম পাপ হয় না। এই ধরনের শত্রুকে সমূলে বিনাশ করাটাই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক, কিন্তু অর্জুন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁর চরিত্র ছিল সাধুসুলভ, তাই তিনি তাদের সাথে সাধুসুলভ ব্যবহারই করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু এই ধরনের সাধুসুলভ ব্যবহার ক্ষত্রিয়দের জন্য নয় । যদিও উচ্চপদস্থ রাজপুরুষকে সাধুর মতই ধীর, শান্ত ও সংযত হতে হয়, তাই বলে তাঁকে কাপুরুষ হলে চলবে না । যেমন, শ্রীরামচন্দ্র এতই সাধুপ্রকৃতির ছিলেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসে “রামরাজত্ব” শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে আছে, কিন্তু তাঁর চরিত্রে কোনরকমের কাপুরুষতা আমরা দেখতে পাই না । রাবণ ছিল রামের শত্রু, যেহেতু সে তাঁর স্ত্রী সীতাদেবীকে হরণ করেছিল এবং সেইজন্য শ্রীরামচন্দ্র তাকে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল । অর্জুনের ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা দেখতে পাই তাঁর শত্রুরা ছিল অন্য ধরনের । পিতামহ, শিক্ষক, ভাই, বন্ধু এরা সকলেই শত্রু হবার ফলে শত্রুদের প্রতি যেমন আচরণ করা উচিত তিনি তেমন করতে পারছিলেন না । তা ছাড়া, সাধু প্রকৃতির মানুষেরা সবসময়ই ক্ষমাশীল । শাস্ত্রেও সাধুপ্রকৃতির মানুষদের ক্ষমাশীল হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সাধুদের প্রতি এই ধরনের উপদেশ যে-কোন রাজনৈতিক সঙ্কটকালীন অনুশাসন থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ । অর্জুন মনে করেছিলেন, রাজনৈতিক কারণবশত তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করার চেয়ে সাধুসুলভ আচরণ ও ধর্মের ভিত্তিতে তাদের ক্ষমা করাই শ্রেয় । তাই, সাময়িক দেহগত সুখের জন্য এই হত্যাকার্যে লিপ্ত হওয়া তিনি সমীচীন বলে মনে করেননি । তিনি বুঝেছিলেন, রাজ্য ও রাজ্যসুখ অনিত্য । তাই, এই ক্ষণস্থায়ী সুখের জন্য আত্মীয়-স্বজন হত্যার পাপে লিপ্ত হয়ে মুক্তির পথ চিরতরে রুদ্ধ করার ঝুঁকি তিনি কেন নেবেন? এখানে অর্জুন যে শ্রীকৃষ্ণকে ‘মাধব’ অথবা ‘লক্ষ্মীপতি’ বলে সম্বোধন করেছেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ । এই নামের দ্বারা তাকে সম্বোধন করে অর্জুন বুঝিয়ে দিলেন, তিনি হচ্ছেন সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীর পতি, তাই অর্জুনকে এই ধরনের কাজে প্ররোচিত করা তাঁর কর্তব্য নয়, যার পরিণতি হবে দুর্ভাগ্যজনক । শ্রীকৃষ্ণ অবশ্য কাউকেই দুর্ভাগ্য এনে দেন না, সুতরাং তাঁর ভক্তের ক্ষেত্রে তো সেই কথা ওঠেই না ।






যদ্যপ্যেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ |

কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ||৩৭||
কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্ |

কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্জনার্দন ||৩৮।।

অর্থ- হে জনার্দন! যদিও এরা রাজ্যলোভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ করেও এই পাপকর্মে কেন প্রবৃত্ত হব?

আলোচনাঃ- পাশাখেলায় আহ্বান করা হলে কোনও ক্ষত্রিয় বিরোধীপক্ষের সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না । দুর্যোধন সেই যুদ্ধে অর্জুনকে আহবান করেছিলেন, তাই যুদ্ধ করতে অর্জুন বাধ্য ছিলেন । কিন্তু এই অবস্থায় অর্জুন বিবেচনা করে দেখলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধপক্ষ সকলেই এই যুদ্ধের পরিণতি সম্বন্ধে একেবারে অন্ধ হতে পারে, কিন্তু তা বলে তিনি এই যুদ্ধের অমঙ্গলজনক পরিণতি উপলব্ধি করতে পারার পর, সেই যুদ্ধের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারবেন না । এই ধরনের আমন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা তখনই থাকে, যখন তার পরিণতি মঙ্গলজনক হয়, নতুবা এর কোন বাধ্যবাধকতা নেই । এই সব কথা সুচিন্তিতভাবে বিবেচনা করে অর্জুন এই যুদ্ধ থেকে নিরস্ত থাকতে মনস্থির করেছিলেন।




কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ |
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃত্স্নমধর্মোঽভিভবত্যুত ।।৩৯।।

অর্থ- কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয় ।

আলচনাঃ- বর্ণাশ্রম সমাজ-ব্যবস্থায় অনেক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়া আছে, যা পরিবারের প্রতিটি লোকের যথাযথ পারমার্থিক উন্নতি সাধনে সহায়তা করে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যেরা পরিবারভুক্ত অন্য সকলের জন্ম থেকে আরম্ভ করে মৃত্যু পর্যন্ত শুদ্ধিকরণ সংস্কার দ্বারা তাদের যথাযথ মঙ্গল সাধন করার জন্য সর্বদাই তৎপর থাকেন । কিন্তু এই সমস্ত প্রবীণ লোকদের মৃত্যু হলে, মঙ্গলজনক এই সমস্ত পারিবারিক প্রথাকে রূপ দেওয়ার মত কেউ থাকে না। তখন পরিবারের অল্পবয়স্ক সদস্যেরা অমঙ্গলজনক কাজকর্মে লিপ্ত হতে পারে এবং তার ফলে তাদের আত্মার মুক্তির সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই, কোন কারণেই পরিবারের সদস্যদের হতা করা উচিত নয়।





অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ |
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ।।৪০।।

অর্থ- হে কৃষ্ণ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয়! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।

আলোচনাঃ- সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন সৎ জীবনযাপন করে, তখনই সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং মানুষের জীবন অপ্রাকৃত ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ণাশ্রম প্রথার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সমাজ-ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যার ফলে সমাজের মানুষেরা সৎ জীবনযাপন করে সর্বতোভাবে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে। এই ধরনের সৎ জনগণ তখনই উৎপন্ন হন, যখন সমাজের স্ত্রীলোকেরা সৎ চরিত্রবর্তী ও সত্যনিষ্ঠ হয়। শিশুদের মধ্যে যেমন অতি সহজেই বিপথগামী হবার প্রবণতা দেখা যায়, স্ত্রীলোকদের মধ্যেও তেমন অতি সহজেই অধঃপতিত হবার প্রবণতা থাকে। তাই, শিশু ও স্ত্রীলোক উভয়েরই পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ও তত্ত্বাবধানের একান্ত প্রয়োজন। নানা রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়োজিত করার মাধ্যমে স্ত্রীলোকদের চিত্তবৃত্তিকে পবিত্র ও নির্মল রাখা হয় এবং এভাবেই তাদের ব্যভিচারী মনোবৃত্তিকে সংযত করা হয়। চাণক্য পণ্ডিত বলে গেছেন, স্ত্রীলোকেরা সাধারণত অল্পবুদ্ধিসম্পন্না, তাই তারা নির্ভরযোগ্য অথবা বিশ্বস্ত নয়। সেই জন্য তাদের পূজার্চনা আদি গৃহস্থালি নানা রকম ধর্মানুষ্ঠানে সব সময় নিয়োজিত রাখতে হয় এবং তার ফলে তাদের ধর্মে মতি হয় এবং চরিত্র নির্মল হয়। তারা তখন চরিত্রবান, ধর্মপরায়ণ সন্তানের জন্ম দেয়। যারা হয় বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন করার উপযুক্ত। বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন না করলে, স্বভাবতই স্ত্রীলোকেরা অবাধে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে শুরু করে এবং তাদের ব্যভিচারের ফলে সমাজে অবস্থিত সন্তান-সন্ততির জন্ম হয়। দায়িত্বজ্ঞানশূন্য লোকদের পৃষ্ঠপোষকতায় যখন সমাজে ব্যভিচার প্রকট হয়ে ওঠে এবং অবাঞ্ছিত মানুষে সমাজ ছেয়ে যায়, তখন মহামারী ও যুদ্ধ দেখা দিয়ে মানব-সমাজকে ধ্বংসোন্মুখ করে তোলে।





সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ।
পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ।।৪১।।

অর্থ- বর্ণসংকর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণপ্রক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।

আলোচনাঃ- কর্মকাণ্ডের বিধি অনুসারে পিতৃপুরুষের আত্মাদের প্রতি পিণ্ডদান ও জল উৎসর্গ করা প্রয়োজন। এই উৎসর্গ সম্পন্ন করা হয় বিষ্ণুকে পূজা করার মাধ্যমে, কারণ বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত প্রসাদ সেবন করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তিলাভ হয়। অনেক সময় পিতৃপুরুষেরা নানা রকমের পাপের ফল ভোগ করতে থাকে এবং অনেক সময় তাদের কেউ কেউ জড় দেহ পর্যন্ত ধারণ করতে পারে না। সূক্ষ্ম দেহে প্রেতাত্মারূপে থাকতে বাধ্য করা হয়। যখন বংশের কেউ তার পিতৃপুরুষদের ভগবৎ-প্রসাদ উৎসর্গ করে পিণ্ডদান করে, তখন তাদের আত্মা ভূতের দেহ অথবা অন্যান্য দুঃখময় জীবন থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করে। পিতৃপুরুষের আত্মার শান্তির জন্য এই পিণ্ডদান করাটা বংশানুক্রমিক রীতি। তবে যে সমস্ত লোক ভক্তিযোগ সাধন করেন, তাঁদের এই অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন নেই। ভক্তিযোগ সাধন করার মাধ্যমে ভক্ত শত-সহস্র পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তি সাধন করতে পারেন।

শ্রীমদ্ভাগবতে(১১/৫/৪১) বলা হয়েছে- দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং ন কিঙ্করো নায়মৃণী চ রাজন ।সর্বাত্মনা যঃ শরণং শরন্যং গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্তম ।। “যিনি সব রকম কর্তব্য পরিত্যাগ করে মুক্তি দানকারী মুকুন্দের চরণ-কমলে শরণ নিয়েছেন এবং ঐকান্তিকভাবে পন্থাটি গ্রহণ করেছেন, তাঁর আর দেব-দেবী, মুনি-ঋষি, পরিবার-পরিজন মানব-সমাজ ও পিতৃপুরুষের প্রতি কোন কর্তব্য থাকে না। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার ফলে এই ধরনের কর্তব্যগুলি আপনা থেকেই সম্পাদিত হয়ে যায়।”





দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ।
উত্সাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ।।৪২।।

অর্থ- যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়।

আলোচনাঃ- সনাতন-ধর্ম বা বর্ণাশ্রম-ধর্মের মাধ্যমে সমাজ-ব্যবস্থায় যে চারটি বর্ণের উদ্ভব হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ যাতে তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য মুক্তি লাভে সক্ষম হয়। তাই, সমাজের দায়িত্বজ্ঞানশূন্য নেতাদের পরিচালনায় যদি সনাতন-ধর্মের যথাযথ আচরণ না করা হয়, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং ক্রমে ক্রমে মানুষ তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য বিষ্ণুকে ভুলে যায়। এই ধরনের সমাজ-নেতাদের বলা হয় অন্ধ এবং যারা এদের অনুসরণ করে, তারা অবধারিতভাবে অন্ধকূপে পতিত হয়।



উত্সন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন।
নরকে নিযতং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম ।।৪৩।।

অর্থ- হে জনার্দন! আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়।

আলোচনাঃ- অর্জুনের সমস্ত যুক্তি-তর্ক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, পক্ষান্তরে তিনি সাধুসন্ত আদি মহাজনদের কাছ থেকে আহরণ করা জ্ঞানের ভিত্তিতে এই সমস্ত যুক্তির অবতারণা করেছিলেন। প্রকৃত জ্ঞান উপলব্ধি করেছেন যে-মানুষ, তাঁর তত্ত্বাবধানে এই জ্ঞান শিক্ষালাভ না করলে, এই জ্ঞান আহরণ করা যায় না। বর্ণাশ্রম-ধর্মের বিধি অনুসারে মানুষকে মৃত্যুর পূর্বে তার সমস্ত পাপ মোচনের জন্য কতকগুলি প্রায়শ্চিত্ত বিধি পালন করতে হয়। যে সব সময় পাপকার্যে লিপ্ত থেকে জীবন অতিবাহিত করেছে, তার পক্ষে এই বিধি অনুসরন করে প্রায়শ্চিত্ত করাটা অবশ্য কর্তব্য। প্রায়শ্চিত্ত না করলে তার পাপের ফলস্বরূপ মানুষ নরকে পতিত হয়ে নানারকম দুঃখকষ্ট ভোগ করে।







অহো বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যবসিতা বয়ম্। যদ্রাজ্যসুখলোভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ ।।৪৪।।

অর্থ- হায়! কী আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়ে মহাপাপ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছি।

আলোচনাঃ- স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে মাতা-পিতা, ভাই-বন্ধুকে হত্যা করতে দেখা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এর অনেক নজির আছে। কিন্তু ভগবদ্ভক্ত অর্জুন সদাসর্বদা নৈতিক কর্তব্য অকর্তব্যের প্রতি সচেতন, তাই তিনি এই ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকাকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।






যদি মামপ্রতীকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেত্।।৪৫।।

অর্থ- প্রতিরোধ রহিত ও নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে যদি শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা যুদ্ধে বধ করে, তা হলে আমার অধিকতর মঙ্গলই হবে।

আলোচনাঃআমরা জানি যে, ক্ষত্রিয় রণনীতি অনুসারে নিয়ম আছে, শত্রু যদি নিরস্ত্র হয় অথবা যুদ্ধে অনিচ্ছুক হয়, তবে তাকে আক্রমণ করা যাবে না। কিন্তু অর্জুন স্থির করলেন যে, এই রকম বিপজ্জনক অবস্থায় তাঁর শত্রুরা যদি তাঁকে আক্রমণও করে, তবুও তিনি যুদ্ধ করবেন না। তিনি বিবেচনা করে দেখলেন না, শত্রুপক্ষ যুদ্ধ করতে কতটা আগ্রহী ছিল। সুতারাং অর্জুনের এই ধরনের আচরণ থেকে ভগবদ্ভক্তোচিত কোমল হৃদয়বৃত্তির পরিচায়ক প্রকাশ পাই।





সঞ্জয় উবাচ এবমুক্ত্বার্জুনঃ সঙ্খ্যে রথোপস্থ উপাবিশত্।

বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ ।।৪৬।।

অর্থ- সঞ্জয় বললেন- রণক্ষেত্রে এই কথা বলে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে শোকে ভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন।

আলোচনাঃ- শত্রুসৈন্যকে নিরীক্ষণ করতে অর্জুন রথের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি শোকে এতই মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর গাণ্ডীব ধনু ও অক্ষয় তূণ ফেলে দিয়ে, তিনি রথের উপর বসে পড়লেন। এই ধরনের কোমল হৃদয়বৃত্তির মানুষই কেবল ভগবদ্ভক্তি সাধন করার মাধ্যমে সমগ্র জগতের যথার্থ মঙ্গল সাধন করতে পরারেন।

প্রথম অধ্যায়ের বিশ্লষণ ও সার-সংক্ষেপঃ- এই অধ্যায়ে নাম 'সৈন্যদর্শন' বা 'অর্জুন-বিষাদ' যোগ। ইহাতে তত্ত্বকথা কিছু নাই কিন্তু কাব্যাংশে ইহা অতুলনীয়।করুক্ষেত্রে মহাযুদ্ধে আরব্ধপ্রায়, উভয়পক্ষী সুসজ্জিত সৈন্যগণ ব্যুহবদ্ধ হইয়া পরস্পর সম্মুখীন, যোদ্ধৃগণ মহোৎসাহে সিংহনাদ করিয়া শঙ্খধ্বনি করিলেন- রণবাদ্য বাজিয়া উঠিল- শস্ত্রসম্পাত আরম্ভ হইলো। তখন অর্জুনের মহানির্বেদ উপস্থিত। তাঁহার শরীর কাঁপিতে লাগিল,মুখ শুকাইল, দেহ অবসন্ন হইল, হস্ত হইতে গান্ডীব খসিয়া পড়িল।কৃপাবিষ্ট অর্জনের মোহভাব কাব্যতুলিকায় নিঃস্বার্থ উদার করুণরসে অনুরঞ্জিত, যেমন চিত্তমোহকর, তেমন প্রাণস্পর্শী।

ইতি শ্রীমহাভারতে ভীষ্মপর্বণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে অর্জুনবিষাদ-যোগে নাম প্রথমোহধ্যায়।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।



-----------------------------------------------------------------------
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ অন্তে শ্রীকৃষ্ণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা-
-----------------------------------------------------------------------

ওঁ যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং মাত্রাহীনঞ্চ যদ্‌ ভবেৎ ।

পূর্ণং ভবতু ত্বৎ সর্বং ত্বৎ প্রসাদাৎ জনার্দ্দন ।।

মন্ত্র হীনং ক্রিয়া হীনং ভক্তিহীনং জনার্দ্দন ।

যৎ পূজিতং ময়া দেব পরিপূর্ণং তদস্তুমে ।।
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger