• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

মহাভারত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মহাভারত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৬ ডিসেম্বর ২০২০

আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই মহাভারত সম্পর্কে

 আপনি কি মহাভারত পড়েছেন? পড়েননি? তা হলে জেনে নিন, মহাভারত কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ১৮টি অধ্যায় তথা ‘পর্ব’ ও ১০০টি ‘উপপর্ব’ রয়েছে, আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই মহাভারত সম্পর্কে ---


(১) আদিপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৭৯০০ টি

ঋষি বৈশম্পায়ন রাজা জন্মেজয়ের প্রায়শ্চিত্ত যজ্ঞে তাঁকে এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের মহাভারত কথা শোনান ও সেই কাহিনি শুনে লোমহর্ষণপুত্র সৌতি নৈমিষারণ্যে যজ্ঞরত শৌনক ও অন্যান্য মুনিদের ঐ কাহিনি শোনাতে শুরু করেন – ভৃগুবংশ পরিচয়, কুরুবংশ, মহারাজ শান্তনু ও ভীষ্মের কথা, পাণ্ডব ও কৌরবদের জন্ম, জতুগৃহদাহ, পাণ্ডব ও দ্রৌপদীর বিবাহ ও কৃষ্ণার্জুন কর্তৃক খাণ্ডববনদাহ।


(২) সভাপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ২৫১১ টি

ময়দানব কর্তৃক ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবদের প্রাসাদ নির্মাণ, রাজসূয় যজ্ঞে যুধিষ্ঠিরের সম্রাট পদ লাভ ও কৌরবদের ঈর্ষা, শকুনির কপট দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবদের রাজ্য ও সম্পদ হরণ, দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও পাণ্ডবদের ১২ বছর বনবাস ও ১ বছর অজ্ঞাতবাস নির্ধারণ


(৩) বনপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ১১৬৬৪ টি

১২ বৎসরব্যাপী বনবাসে পাণ্ডবদের জীবনযাপন ও বিচিত্র কাহিনি শ্রবণ, অর্জুনের বিবিধ দৈবঅস্ত্র লাভ, কৃষ্ণ কর্তৃক দূর্বাসার দর্পচূর্ণ, জয়দ্রথের দ্রৌপদী হরণ।


(৪) বিরাটপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ২০৫০ টি

মৎস্যদেশে রাজা বিরাটের কাছে ছদ্মবেশে পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদীর আশ্রয়, যুদ্ধে কৌবরদের পরাজয়, উত্তরা-অভিমন্যুর বিবাহ।


(৫) উদ্যোগপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৬৬৯৮ টি

পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি, যাদব সাহায্য প্রার্থনায় অর্জুন ও দুর্যোধনের দ্বারকায় গমন, অর্জুনের কৃষ্ণ প্রাপ্তি, পাণ্ডবদের শান্তিদূত রূপে শ্রীকৃষ্ণের হস্তিনাপুরে গমন ও বিভূতি প্রদর্শন।


(৬) ভীষ্মপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৫৮৮৪ টি

যুদ্ধারম্ভ, রণক্ষেত্র দর্শনে অর্জুনের বিষাদ, শ্রীকৃষ্ণের যোগধর্ম কথন ও বিশ্বরূপ প্রদর্শন, ভীষ্মের পরাক্রমে কৃষ্ণের ক্ষোভ ও অস্ত্রনিক্ষেপ, অর্জুন কর্তৃক ভীষ্ম দমন ও শরশয্যা নির্মাণ। এই পর্বে অর্জুনকে কৃষ্ণ মহামূল্যবান গীতা দান করেন।


(৭) দ্রোণপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৮৯০৯টি

দ্রোণকে সেনাপতিত্বে বরণ, সপ্তরথী কর্তৃক অভিমন্যু বধ, জয়দ্রথ বধ, যুধিষ্ঠিরের মিথ্যা বাক্যের ছলনায় ধৃষ্টদ্যুম্ন কর্তৃক দ্রোণবধ।


(৮) কর্ণপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৪৯৬৪ টি

কর্ণকে সেনাপতিত্বে বরণ, ভীম কর্তৃক দুঃশাসন বধ, মেদিনীতে কর্ণের রথচক্রের পতন ও সেই সুযোগে অর্জুন কর্তৃক কর্ণবধ।


(৯) শল্যপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৩২২০টি

যুদ্ধের অন্তিম দিন, শল্যবধ, সহদেব কর্তৃক শকুনিবধ, ভীম কর্তৃক দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ ও দুর্যোধনের মৃত্যু


(১০) সৌপ্তিকপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৮৭০টি

রাতে গোপনে অশ্বত্থমার পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ, ঘুমন্ত দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, ধৃষ্টদ্যুম্নাদি হত্যা, অশ্বত্থামা ও অর্জুনের যুদ্ধ, অশ্বত্থামার দিব্য শিরোমণি হরণ।


(১১) স্ত্রীপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৭৭৪ টি

ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক লৌহভীম চূর্ণকরণ, স্বজনহারাদের বিলাপ ও মৃতদেহ সৎকার, কৃষ্ণের প্রতি গান্ধারীর অভিশাপ।


(১২) শান্তিপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ১৪৭৩২টি

যুধিষ্ঠিরের রাজপদে অভিষেক, যুধিষ্ঠিরের প্রতি ভীষ্মের হিতোপদেশ ও ধর্মব্যাখ্যা।


(১৩) অনুশাসনপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৮০০০টি

ভীষ্মদেবের স্বর্গারোহণ ও যুধিষ্ঠিরের রাজ্যশাসন।


(১৪) অশ্বমেধপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৩৩২০ টি

যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞ, অর্জুনের দিগ্বিজয়ে যাত্রা, বভ্রুবাহন ও অর্জুনের যুদ্ধ।


(১৫) আশ্রমবাসিকপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ১৫০৬ টি

ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, কুন্তী ও বিদুরের বানপ্রস্থ গ্রহণ, বিদুরের দেহত্যাগ, দাবানলে বাকিদের মৃত্যু।


(১৬) মৌষলপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ৩২০ টি

যদুবালকদের প্রতি মুনিদের অভিশাপ, প্রভাসে মৌষলযুদ্ধে যদুবংশ ধ্বংস, বলরাম ও কৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ, দ্বারকা নগরীর পতন।


(১৭) মহাপ্রস্থানিকপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ১২৩ টি

পাণ্ডব ও দ্রৌপদীর মহাপ্রস্থানে গমন, দ্রৌপদী, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবের পতন


(১৮)স্বর্গারোহণপর্ব -- শ্লোক সংখ্যা -- ২০৩ টি

ধর্ম কর্তৃক যুধিষ্ঠিরকে পরীক্ষা, যুধিষ্ঠিরের নরকদর্শন, পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদীর স্বর্গলাভ ।

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কুরুক্ষেত্রের সৃষ্টি কিভাবে হলো ? কুরুক্ষেত্র কি শুধুই যুদ্ধক্ষেত্র নাকি অন্য কিছু ?

কুরুক্ষেত্র একটি চক্র বা জনপদ। ঐ চক্র এখনকার স্থানেশ্বর বা থানেশ্বর নগরের দক্ষিণবর্ত্তী। আম্বালা নগর হইতে উহা ১৫ ক্রোশ দক্ষিণ। পানিপাট হইতে উহা ২০ ক্রোশ উত্তর। কুরুক্ষেত্র ও পানিপাট ভারতবর্ষের যুদ্ধক্ষেত্র, ভারতের ভাগ্য অনেক বার ঐ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি পাইয়াছে। “ক্ষেত্র” নাম শুনিয়া ভরসা করি, কেহ একখানি মাঠ বুঝিবেন না। কুরুক্ষেত্র প্রাচীন কালেই পঞ্চ যোজন দৈর্ঘ্যে এবং পঞ্চ যোজন প্রস্থে। এই জন্য উহাকে সমন্তপঞ্চক বলা যাইত। চক্রের সীমা এখন আরও বাড়িয়া গিয়াছে।





কুরু নামে এক জন চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন। তাঁহা হইতেই এই চক্রের নাম কুরুক্ষেত্র হইয়াছে। তিনি দুর্য্যোধনাদির ও পাণ্ডবদিগের পূর্ব্বপুরুষ; এজন্য দুর্য্যোধনাদিকে কৌরব বলা হয়, এবং কখন কখন পাণ্ডবদিগকেও বলা হয়। তিনি এই স্থানে তপস্যা করিয়া বর লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্য ইহার নাম কুরুক্ষেত্র। মহাভারতে কথিত হইয়াছে যে, তাঁহার তপস্যার কারণেই উহা পুণ্যতীর্থ। ফলে চিরকালই কুরুক্ষেত্র পুণ্যক্ষেত্র বা ধর্ম্মক্ষেত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ। শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, “দেবাঃ হ বৈ সত্রং নিষেদুরগ্নিরিন্দ্রঃ সোমো মখো বিষ্ণুর্বিশ্বেদেবা অন্যত্রেবাশ্বিভ্যাম্। তেষাং কুরুক্ষেত্রং দেবযজনমাস। তস্মাদাহুঃ কুরুক্ষেত্রং দেবযজনম্।” অর্থাৎ দেবতারা এইখানে যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এজন্য ইহাকে “দেবতাদিগের যজ্ঞস্থান” বলে।

মহাভারতের বনপর্ব্বের তীর্থযাত্রা পর্ব্বাধ্যায়ে কথিত হইয়াছে যে, কুরুক্ষেত্র ত্রিলোকীর মধ্যে প্রধান তীর্থ। বনপর্ব্বে কুরুক্ষেত্রের সীমা এইরূপ লেখা আছে-“উত্তরে সরস্বতী, দক্ষিণে দৃষদ্বতী; কুরুক্ষেত্র এই উভয় নদীর মধ্যবর্ত্তী।” (৮৩ অধ্যায়) মনুসংহিতায় বিখ্যাত ব্রহ্মাবর্ত্তেরও ঠিক সেই সীমা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।-
সরস্বতীদৃষদ্বত্যোর্দেবনদ্যোর্যন্তরং।
তং দেবনির্ম্মিতং দেশং ব্রহ্মাবর্তং প্রচক্ষতে || ২। ১৭।

অতএব কুরুক্ষেত্র এবং ব্রহ্মাবর্ত্ত একই। কালিদাসের নিম্নলিখিত কবিতাতে তাহাই বুঝা যাইতেছে।
ব্রহ্মাবর্ত্তং জনপদমথচ্ছায়য়া গাহমানঃ
ক্ষেত্রং ক্ষত্রপ্রঘনপিশুনং কৌরবং তদ্ভজেথাঃ।
রাজন্যানাং শিতশরশতৈর্যত্র গাণ্ডীবধন্বা
ধারাপাতৈস্ত্বমিব কমলান্যভ্যবর্ষন্ মুখানি ||
-মেঘদূত ৪৯।
কিন্তু মনুতে আবার অন্য প্রকার আছে। যথা-
কুরুক্ষেত্রঞ্চ মৎস্যাশ্চ পঞ্চলাঃ শূরসেনকাঃ।
এষ ব্রহ্মর্ষিদেশো বৈ ব্রহ্মাবর্ত্তাদনন্তরঃ ||

অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ে চৈনিক পরিব্রাজক হিউন্থসাঙ্‌ও ইহাকে স্বীয় গ্রন্থে “ধর্ম্মক্ষেত্র” বলিয়াছেন।1
কুরুক্ষেত্র আজিও পুণ্যতীর্থ বলিয়া ভারতবর্ষে পরিচিত; অনেক যোগী সন্ন্যাসী তথা পরিভ্রমণ করেন। কুরুক্ষেত্রে অনেক ভিন্ন ভিন্ন তীর্থ আছে। তাহার মধ্যে কতকগুলি মহাভারতের যুদ্ধের স্মরাক স্বরূপ। যে স্থানে অভিমন্যু সপ্তরথিকর্ত্তৃক অন্যায়-যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেন, সে স্থানকে এক্ষণে ‘অভিমন্যুক্ষেত্র’ বা ‘অমিন’ বলিয়া থাকে। যেখানে আজিও পুত্রহীনারা পুত্রকামনায় অদিতির মন্দিরে অদিতির উপাসনা করে। যেখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদিগের সৎকার সমাপন হইয়াছিল, ক্ষেত্রের যে ভাগ সেই বীরগণের অস্থিতে সমাকীর্ণ হইয়াছিল, এখনও তাহাকে ‘অস্থিপুর’ বলে। যেখানে সাত্যকিতে ও ভূরিশ্রবাতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়, এবং অর্জ্জুন সাত্যকির রক্ষার্থ অন্যায় করিয়া ভূরিশ্রবার বাহুচ্ছেদ করেন, সে স্থানকে এক্ষণে ‘ভোর’ বলে। জনপ্রবাদ আছে যে, ভূরিশ্রবার সালঙ্কার ছিন্ন হস্ত পক্ষীতে লইয়া যায়। সেই ছিন্ন হস্তের অলঙ্কারে একখণ্ড বহুমূল্য হীরক ছিল। তাহাই কহীনুর, এক্ষণে ভারতেশ্বরীর অঙ্গে শোভা পাইতেছে। কথাটা যে সত্য, তাহার অবশ্য কোন প্রমাণ নাই।

কুরুক্ষেত্রের নাম বাঙ্গালীমাত্রেরই মুখে আছে। একটা কিছু গোল দেখিলে বাঙ্গালীর মেয়েরাও বলে, “কুরুক্ষেত্র হইতেছে”। অথচ কুরুক্ষেত্রের সবিশেষ তত্ত্ব কেহই জানে না। বিশেষ টম্‌সন, হুইলর প্রভৃতি ইংরেজ লেখকেরা সবিশেষ না জানিয়া অনেক গোলযোগ বাধাইয়াছেন। তাই কুরুক্ষেত্রের কথা এখানে এত সবিস্তারে লেখা গেল।

 সংগৃহীত
Share:

১৮ মে ২০১৭

মহাভারত থেকে কিছু দার্শণিক জীবনদর্শন মূলকতথ্য ও ব্যাখা


পুঁথি ঘেঁটে যা জানা যায়, সে সময়কার জনসংখ্যার আশি শতাংশ পুরুষ মহাভারতের ১৮ দিনের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

যুদ্ধ শেষে সঞ্জয় কুরুক্ষেত্রের সেই জায়গায় গমন করেন যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল।


কুরুক্ষেত্রের জমিতে দাঁড়িয়ে উনি ভাবতে থাকেন, সত্যিই কি সেই জায়গার মাটি যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে,মহাপ্রতাপশালী পান্ডব এবং কৌরবদের রক্তে শুষে নিয়েছে। এই চিন্তা যখন ওনার মস্তিষ্কে বিরাজ করিছে, এক কম্পিত কন্ঠ, বৃদ্ধের কোমল ধ্বনি তাঁর কানে বেজে ওঠে। তিনি শুনতে পান,

"তুমি কখনোই সত্য জানতে পারবে না বৎস..!!"

ঘুরে দাঁড়াতে সঞ্জয় গেরুয়া বস্ত্রধারী এক বৃদ্ধকে ধুলোর স্তম্ভ থেকে উঠে আসতে দেখেন।

-আমি জানি বৎস, তুমি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিষয় জানতে চাও কিন্তু ততক্ষণ তা তোমার বোধগম্য হইবে না, যতক্ষণ না তুমি বাস্তবে যুদ্ধটা কি বস্তু, সেটা বুঝিবে।

মৃদু হেসে বৃদ্ধ বলেন।

-তার মানে..?

-মহাভারত একটি দৃষ্টান্ত, একটি মহাকাব্য, হয়ত বাস্তব, হয়ত বা দর্শন।

মৃদু-মন্দ হেসে বৃদ্ধ সঞ্জয়ের দিকে তাকান। তাঁর মনে আরও প্রশ্ন উদ্রেক করাই বোধহয় তাঁর লক্ষ।

-আপনি দয়া করে যদি বলেন ওই দর্শন বস্তুটি কি..??

সঞ্জয় অনুরোধ করেন।

নিশ্চয়, এই বলিয়া বৃদ্ধ আরম্ভ করেন,

-পঞ্চপান্ডব আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় বই কিছু না। দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ ও ধ্বনি।

আর কৌরবরা কি, তা কি জান তুমি..?? দৃষ্টি সরু করে বৃদ্ধ শুধান।

কৌরব আমাদের একশতদোষ যারা নিত্য, প্রতিমুহূর্ত আমাদের ওই পাঁচ ইন্দ্রিয়কে আক্রমণ করছে। জান কখন..??

সঞ্জয় আবার মাথা নাড়েন।

-শ্রীকৃষ্ণ যখন তোমার রথের সারথি হন, তখন..!!

বৃদ্ধ ঝকঝকে হাসি হাসেন এবং সঞ্জয় এই অন্তর্নিহিত জ্ঞান প্রাপ্তিযোগে অবাক চোখে বৃদ্ধকে দেখেন।

-শ্রীকৃষ্ণ তোমার অন্তর ধ্বনি, তোমার আত্মা, তোমার পথপ্রদর্শনকারি আলোককস্তম্ভ এবং তুমি যদি তাঁর হাতে নিজেকে সমর্পিত করে দাও, তুমি চিন্তামুক্ত থাকবে জীবনে।

সঞ্জয় বোকার মত বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু শীঘ্রই আবার সামলে নিয়ে পরের প্রশ্ন করেন,

-তাহলে দ্রোণাচার্য, ভীষ্মপিতামহ কেন কৌরবের হয়ে লড়াই করলেন, যদি কৌরবরা দোষী হয়..??

ধীরে মাথা সঞ্চালন করে বৃদ্ধ বলেন,

-ইহার মানে, যখন তুমি বড় হও, তোমার ধারণা বয়স্ক মানুষদের প্রতি বদল হতে থাকে। ছেলেবেলায় যে বয়ঃজ্যেষ্টদের মনে হত তারা সঠিক, বড় হয়ে বুঝতে পার, ততটা ঠিক নন তারা। তাদেরও দোষ আছে। এবং একটা দিন আসে যখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাদের সংগ তোমার জন্যে ভাল কি মন্দ। তারপর এটাও হয়ত তুমি উপলব্ধি কর একটা সময়, তাদের সাথে লড়াই করাই তোমার জন্যে মংগলের। বেড়ে ওঠার ইহাই সবচাইতে কঠিন পক্ষ এবং সেইজন্যেই গীতার সারমর্ম জানা দরকার।

বাকরূদ্ধ হইয়া সঞ্জয় মাটির ওপর হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়েন। ইহার কারণ এই নয় যে এই বাণী ক্লান্তিজনিত তাঁর কাছে বরং এই দর্শনের মাত্রাধিকতায় তিনি আবিভূত হইয়া পড়েন।

-তাহলে কর্ণকে কি বলবেন..??

-আহ্, তুমি সর্বোত্তম প্রশ্ন সবার শেষে করেছ। কর্ণ তোমার ইন্দ্রিয়গণের ভ্রাতা। সে বাসনা। সে তোমারই এক অংশ কিন্তু সে সংগ দেয় দোষের। যদিও সে দোষীর সংগ দিয়ে মনে মনে পীড়া অনুভব করে কিন্তু নিজেকে ঠিক সাবস্ত করার জন্যে নানান যুক্তি দেয়, ঠিক যেমন তোমার বাসনা সর্বক্ষণ তোমায় যুক্তি যুগিয়ে চলে। তোমার বাসনা তোমায় মিথ্যে যুক্তি দিয়ে মন ভোলানোর চেষ্টা করেনা কি সর্বদা..??

সঞ্জয় নিঃশব্দে মাথা নাড়ান।

এক দৃষ্টিতে তিনি কুরুভুমির দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে তাঁর লক্ষ-কোটি চিন্তা তোলপাড় করে। প্রতিটি কথা গুছিয়ে তিনি সামঞ্জস্য তৈরি করার চেষ্টা করেন। খানিক বাদে যখন তিনি মাথা তোলেন, বৃদ্ধ তখন সেখান থেকে প্রস্থান করেছেন। ধুলোর স্তম্ভে আবার মিলিয়ে গেছেন।

পেছনে ফেলে রেখে, এক চিলতে জীবনদর্শন..!!🙏👏🙏

সংগৃহিতঃ https://www.facebook.com/Sri.Krishna.Net.1/?hc_ref=PAGES_TIMELINE


Share:

২২ মার্চ ২০১৬

মহাভারতের সময় হতে ইন্দ্রপ্রস্থের ৪,১৭৫+ বছরের রাজাদের তালিকা

(নিজে সংগ্রহ করুন অন্যকে সংগ্রহে রাখতে অনুপ্রানিত করুন। আমাদের গৌরবের ও ঐতিহ্যের বিষয় গুলি আমাদের নতুন প্রজন্মের জানা উচিৎ)

নিম্নোক্ত সমস্ত তথ্যের জন্য শ্রী দয়ানন্দ সরস্বতীর নিকট আমার কৃতজ্ঞ সেই সাথে এই সব তথ্য দয়ানন্দ সরস্বতী যাঁদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন তাঁদের প্রতি ভক্তি ভরা প্রনাম জ্ঞাপন করছি।

ইন্দ্র প্রস্ত তথা আর্যাবর্তের রাজাদের ধারাবাহিক পরিচিতি ও রাজত্ব কালের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন প্রাতঃস্মরণীয় জ্ঞানী দয়ানন্দ সরস্বতী। তিনি এই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন - রাজপুতনার অন্তর্গত উদয়পুর মেদার রাজ্যের রাজধানী, চিতোরগড়ের শ্রিনাথদ্বার হতে প্রকাশিত এবং বিদ্যার্থী সম্মিলিত "হরিশ্চন্দ্র চন্দ্রিকা" এবং "মোহঞ্চন্দ্রিকা" নামক পাক্ষিক পত্রিকা হইতে। উক্ত পত্রিকাদ্বয়ের সম্পাদক মহাশয় ১৭৮২ বিক্রমাব্দে লিখিত একখানি গ্রন্থ তাহার কোন বন্ধুর নিকত হতে প্রাপ্ত হয়ে তাথেকে সংগ্রহ করে প্রচলিত ১৯৩৯ সালে মুদ্রন করেন।

ইন্দ্রপ্রস্থের শেষ রাজা ছিলেন শ্রী যশপাল। রাজা শ্রী যুধিষ্ঠির থেকে যশপাল পর্যন্ত আনুমানিক ১২৪ জন রাজা, মোট ৪,১৭৫ বছর ৯ মাস ১৪ দিন রাজত্ব করেছিলেন।

শ্রীমান যুধিষ্ঠির প্রভৃতি আনুমানিক ৩০ পুরুষ ১,৭৭০ বছর ১১ মাস ১০ দিন রাজত্ব করেছিলেন। নিম্নে তার বিবরণ তুলে ধরা হলোঃ

১। রাজা যুধিষ্ঠির – ৩৬ বছর ৯ মাস ১৪ দিন
২। রাজা পরীক্ষিত = ৬০–৮–২৫ (৬০ বছর-৮ মাস – ২৫ দিন)
৩। রাজা জনমেজয় = ৮৪–৭-২৩
৪। রাজা অশ্বমেধ = ৮২-৮-৩২
৫। দ্বিতীয় রাম = ৮৮-২-৮
৬। ছত্রমল = ৮১-১১-২৭
৭। চিত্ররথ = ৭৫-৩-১৮
৮। দুষ্টশৈল্য = ৭৫-১০-২৪
৯। রাজাউগ্র সেন = ৭৮-৭-২১
১০। শূরসেন = ৭৮-০৭-২১
১১। ভুবনপতি = ৬৯-৫-৫
১২। রণজিৎ = ৬৫-১০-০৪
১৩। ঋক্ষক = ৬৪-৭-৪
১৪। সুখদেব = ৬২-০-২৪
১৫। নরহরিদেব = ৫১-১০-০২
১৬। সুচিরথ = ৪২-১১-০২
১৭। শূরসেন (২য়) = ৫৮-১০-০৮
১৮। পর্বতসেন = ৫৫-০৮-১০
১৯। মেধাবী = ৫২-১০-১০
২০। সোনচীর = ৫০-০৮-২১
২১। ভীমদেব = ৪৭-০৯-২০
২২। নৃহরিদেব = ৪৫-১১-২৩
২৩। পূর্ণমল = ৪৪-০৮-০৭
২৪। করদবী = ৮৮-১০-০৮
২৫। অলংমিক = ৫০-১১-০৮
২৬। উদয়পাল = ৩৮-০৯-০
২৭। দুবনমল = ৪০-১০-২৬
২৮। দমাত = ৩২-০-০
২৯। ভীমপাল = ৫৮-০৫-০৮
৩০। ক্ষেমক = ৪৮-১১-২১

মুলত পাণ্ডু বংশের রাজত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায়। রাজা ক্ষেমকের প্রধান মন্ত্রী বিশ্রবা ক্ষেমক রাজাকে নিহত করে সিংহাসন অধিকার করেন। তাঁর ১৪ পুরুষ ৫০০ বছর ৩ মাস ১৭ দিন রাজত্ব করেন। তাঁদের তালিকাঃ

১। বিশ্রবা = ১৭-০৩-২৯
২। পুরসেনী = ৪২-০৮-২১
৩। বীরসেনী = ৫২-১০-০৭
৪। ফবঙ্গশায়ী = ৪৭-০৮-২৩
৫। হরিজিৎ = ৩৫-০৯-১৭
৬। পরমসেনী = ৪৪-০২-২৩
৭। সুখপাতাল = ৩০-০২-২১
৮। কদ্রুত = ৪২-০৯-২৪
৯। সজ্জ = ৩২-০২-১৪
১০। ফমরচূড় = ২৭-০৩-১৬
১১। অমীপাল = ২২-১১-২৫
১২। দশরথ = ২৫-০৪-১২
১৩। বীরসাল = ৩১-০৮-১১
১৪। বীরসালসেন = ৪১-০০-১৪

রাজা বীরসাল সেনের প্রধান মন্ত্রী বীরমহা প্রধান তাঁহাকে হত্যা করিয়া রাজ্যাধিকার করেন। তাঁহার বংশ ১৬ পুরুষ ৪৪৫ বৎসর ৫ মাস ৩ দিন রাজত্ব করেন। তাঁদের তালিকা

১। রাজা বীরমহা = ৩৫-১০-০৮
২। অজিত সিংহ = ২৭-০৭-১৯
৩। সর্বদত্ত = ২৮-০৩-১০
৪। ভুবনপতি = ১৫-০৪-১০
৫। বীরসেন (প্রথম) = ২১-০২-১৩
৬। মহীপাল = ৪০-০৮-০৭
৭। শত্রুশাল = ২৬-০৪-০৩
৮। সঙ্গরাজ = ১৭-০২-১০
৯। তেজপাল = ২৮-১১-১০
১০। মানিক চাঁদ = ৩৭-০৭-২১
১১। কামসেনী = ৪২-০৫-১০
১২। শত্রুমর্দন = ০৮-১১-১৩
১৩। জীবনলোক = ২৮-০৯-১৭
১৪। হরিরাও = ২৬-১০-২৯
১৫। বীরসেন (২য়) = ৩৫-০২-২০
১৬। আদিত্যকেতু = ২৩-১১-১৩
প্রয়োগের রাজা ‘ধন্ধব’ মগধদেশের রাজা আদিত্যকেতুকে হত্যা করে রাজ্যাধিকার করেন। তাঁহার বংশ ৯ পুরুষ, ৩৭৪ বছর ১১ মাস ২৬ দিন রাজত্ব করেন। তাঁদের তালিকা
১। রাজা ধন্ধর = ৪২-০৭-২৪
২। মহর্ষি = ৪১-০২-২৯
৩। সনরচ্চী = ৫০-১০-১৯
৪। মহাযুদ্ধ = ২০-০৩-০৮
৫। দূরনাথ = ২৮-০৫-২৫
৬। জীবনরাজ = ৪৫-০২-০৫
৭। রুদ্রসেন = ৪৭-০৪-২৮
৮। অরীলক = ৫২-১০-০৮
৯। রাজপাল = ৩৬-০০-০০

সামন্ত মহান পাল রাজা রাজপালকে হত্যা করে রাজ্যাধিকার করেন। তিনি এক পুরুষে ১৪ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর কোন বৃদ্ধি নাই।

রাজা বিক্রমাদিত্য অবন্তিকা (উজ্জায়নী) হইতে আক্রমণ চালাইয়া রাজা মহানপালকে হত্যা করে রাজ্যাধীকার করেন। তাঁহার বংশ ১ পুরুষ ৩৯ বছর রাজত্ব করেন। তাঁহার কোন বৃদ্ধি নাই।

শালিবাহনের মন্ত্রী সমুদ্রপাল, যোগীপৈঠনের রাজা বিক্রমাদিত্যকে হত্যা করে রাজ্যাধিকার করেন। তাঁহার বংশ ১৬ পুরুষ, ৩৭২ বছর, ৪ মাস ২৭ দিন রাজত্ব করেন। তাঁহাদের তালিকা-

১। সমুদ্রপাল = ৫৪-০২-২০
২। চন্দ্রপাল = ৩৬-০৫-০৪
৩। সাহায়পাল = ১১-০৪-১১
৪। দেবপাল = ২৭-০১-১৭
৫। নরসিংহপাল = ১৮-০০-২০
৬। সামপাল = ২৭-০১-১৭
৭। রঘুপাল = ২২-০৩-২৫
৮। গোবিন্দপাল = ২৭-০১-১৭
৯। অমৃতপাল = ৩৬-১০-১৩
১০। বলীপাল = ১৩-০৮-০৪
১১। মহীপাল = ১৩-০৮-০৪

রাজা মহাবাহু রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া তপস্যার্থে বনে গমন করেন। ইহা শুনিয়া বঙ্গ দেশের রাজা আধীসেন ইন্দ্রপ্রস্থে আসিয়া নিজে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন। তাঁর বংশ ১২ পুরুষ, ১৫১ বৎসর ১১ মাস ২ দিন রাজত্ব করেন। তাঁদের তালিকা –

১। রাজা আধীসেন = ১৮-০৫-২১
২। বিলাবলসেন = ১২-০৪-০২
৩। কেশবসেন = ১৫-০৭-১২
৪। মাধবসেন = ১২-০৪-০২
৫। ময়ূরসেন = ২০-১১-২৭
৬। ভীমসেন = ০৫-১০-০৯
৭। কল্যানসেন = ০৪-০৮-২১
৮। হরিসেন = ১২-০০-২৫
৯। ক্ষেমসেন = ০৮-১১-১৫
১০। নারায়ণসেন = ০২-০২-২৯
১১। লক্ষ্মীসেন = ২৬-১০-০০
১২। দামোদর সেন = ১১-০৫-১৯

রাজা দামোদরসেন তাঁর পাত্রমিত্রদিগকে অনেক কষ্ট দিতেন। এই নিমিত্ত তাঁর জনৈক পাত্রমিত্র দীপ্তসিংহ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং তাঁকে যুদ্ধে নিহত করে স্বয়ং রাজত্ব করা আরম্ভ করেন। তাঁহার বংশ ৬ পুরুষ, ১০৭ বৎসর ৬ মাস ২ দিন রাজত্ব করেন। তাঁদের তালিকা –

১। দীপসিংহ = ১৭-০১-১৬
২। রাজসিংহ = ১৪-০৫-০০
৩। রণসিংহ = ০৯-০৮-১১
৪। নরসিংহ = ১৩-০২-২৯
৬। জীবনসিংহ = ০৮-০০-০১

কোন কারণ বশতঃ রাজা জীবনসিংহ তাঁহার সমস্ত সৈন্য উত্তরদিকে প্রেরণ করেন। বৈরাটের রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান সেই সংবাদ পেয়ে জীবনসিংহকে আক্রমণ করেন এবং তাঁহাকে যুদ্ধে নিহত করিয়া ইন্দ্রপ্রস্থে রাজত্ব করা আরম্ভ করেন। তাঁর বংশ ৫ পুরুষ, ৮৬ বৎসর ০ মাস ২০ দিন রাজত্ব করেন। তাঁহাদের তালিকা –

১। পৃথ্বী রাজ = ১২-০২০১৯
২। অভয়পাল = ১৪-০৫-১৭
৩। দুর্জ্জব পাল = ১১-০৪-১৪
৪। উদয়পাল = ১১-০৭-০৩
৫। যশপাল = ৩৬-০৪-২৭

সুলতান শাহাবুদ্দিন ঘোরী গজনীর দুর্গা হতে রাজা যশপালকে আক্রমণ করেন এবং ১২৪৯ সালে তাঁকে প্রয়োগের দুর্গে বন্ধী করেন। অতঃপর সুলতান শাহাবুদ্দিন ইদ্রপ্রস্থে (দিল্লীতে) রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন। তাঁর বংশ ৫৩, ৭৪৫ বৎসর, ১ মাস ও ১৭ দিন রাজত্ব করেন। এ সম্পর্কে বহু তথ্য লিখিত আছে তাই আর উল্লেখ করছিনা।

ঈশ্বর সকল শুভ শক্তির ও ধর্মের ধারকদের মঙ্গল করুন।

Written by:  Ashok Chakraborty
Share:

১৬ মার্চ ২০১৬

এক অজানা কাহিনী বৌদ্ধ মন্দিরের ২ কিলোমিটার দেওয়াল জুড়ে রয়েছে মহাভারতের কাহিনী

মন্দিরের ২ কিমি দেওয়াল জুড়ে রামায়ণ! বৌদ্ধমন্দিরের দেওয়ালে আঁকা রামায়ণের দৃশ্য। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত এমারেল্ড বৌদ্ধমন্দিরে গেলে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।

মন্দিরের প্রায় ২ কিলোমিটার দেওয়ালজুড়ে আঁকা রয়েছে হিন্দু দেবদেবীর বীরত্বের কাহিনি। ব্যাঙ্ককের প্রাণকেন্দ্রে রয়্যাল প্যালেসের কাছেই অবস্থিত এমারেল্ড বৌদ্ধ মন্দির।

সেদেশের ভাষায় যা ওয়াট ফ্রা ক্রিউ নামে পরিচিত। বিরাট মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে ১০০টিরও বেশি বহুতল। আর মন্দিরে যে বিশাল বৌদ্ধমূর্তিটি রয়েছে, তাকেই দেশের রক্ষাকবচ হিসেবে বিশ্বাস করেন সে দেশের মানুষ।
 




কমপ্লেক্সটি একটা বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ২ কিলোমিটারের সেই দেওয়ালেই আঁকা রয়েছে রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনার দৃশ্য। শুধু ছবিই নয়, প্রত্যেক ছবির নীচে রয়েছে সেই ছবির বর্ণনা।

রামায়ণের থাই ভার্সান রামাকিয়েণের নায়ক ফ্রা রামা ( দেবতা রাম) - র বীরকাহিনি লেখা রয়েছে ১৭৮টি প্যানেলে। মন্দিরটি বহু প্রাচীন হলেও , এই আঁকাগুলিকে তরতাজা রাখতে কয়েক বছর অন্তর অন্তর তাতে পড়ে তুলির ছোঁয়া। শেষবার এই ছবিতে শিল্পীর হাত পড়েছে ২০০৪ সালে।




রামাকিয়েণে গঠনগত দিকে বাল্মীকির গল্পই মোটের উপর অপরিবর্তিত। তবে কিছু চরিত্র ও ঘটনায় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

 থাইল্যান্ডের শাসক ও অধিকাংশ নাগরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও , অষ্টদশ শতাব্দীর রামাকিয়েণই সেখানে জাতীয় মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃত।

Share:

২৮ জানুয়ারি ২০১৬

রাজ্য ও ক্ষমতার লালসার কাছে স্নেহ,আত্মীয়-স্বজন বা বৈবাহিক সম্পর্ক- কোন কিছুরই দাম থাকে না।

মহাভারতের কাহিনী পর্যালোচনা করলে একটি জিনিস আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, “রাজ্য ও ক্ষমতার লালসা এমনই এক বিচিত্র স্বভাব তৈরি করে, যেখানে স্নেহ,আত্মীয়-স্বজন বা বৈবাহিক সম্পর্ক- কোন কিছুরই দাম থাকে না।”
যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে বিদর্ভ এর রাজা ভীষ্মক। যার মেয়ে রুক্মিণীকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণবিয়ে করে। মহাভারতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিণীর এই বিয়ের মধ্য একটা রাজনৈতিক অভিসন্ধি কাজ করেছিল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি রুক্মিণীর ভালোবাসা হয়তো এখানে প্রধান প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছে কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই বিবাহের বাড়তি ফলটা ভেবেছিলো তাঁর অনুকূলে ফলবে। কিন্তু, সেটা ঘটেনি।

ভীষ্মকের মেয়ে রুক্মিণীকে বিয়ে করে শ্রীকৃষ্ণ ভেবেছিলেন, - মেয়ের জন্যই বৈবাহিক কারণেভীষ্মক শ্রীকৃষ্ণের অনুকূলে আচরণ করবে। অর্থ্যাৎ এই বিবাহের মাধ্যমে যাদব ও বিদর্ভের মধ্য একটি সুসম্পর্ক স্থাপিত হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেটা হয় নি।
কারণ, ভীষ্মক চেয়েছিল তাঁর মেয়ে রুক্মিণীকে নিজের অনুগত শিষ্য জরাসন্ধের সেনাপতি ‘শিশুপালে’র সাথে বিয়ে দিতে। অন্যদিকে, ভীষ্মকের ছেলে রুক্মী ছিল শিশুপালের অন্ধ সমর্থক। এই অবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সুকৌশলে রুক্মিণীকে বিয়ের আগের দিন বিদর্ভ থেকে হরণ করে দ্বারকায় নিয়ে যায় এবং সেখানে রুক্মিণীর ইচ্ছায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাদের বিয়ে হয়।

বিবাহসভায় জরাসন্ধ-শিশুপালের এই অপমান ভীষ্মককে সহ্য করতে হয় এবং এই ঘটনায় ভীষ্মক আরও ক্ষিপ্ত হন। কিন্তু, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভেবেছিলেন- এই ক্ষোভ সাময়িকভাবে থাকবে এবং মেয়ের প্রতি স্নেহবশতই ভীষ্মকের কৃষ্ণ-বিরোধিতা কমে আসবে ও জরাসন্ধের সাথে ভীষ্মকের দূরত্ব বাড়বে। কিন্তু, বাস্তবে তা হয়নি।
একটি বিষয় এখানে স্পষ্ট যে, “মহাভারতে কুরু-পাণ্ডবের জ্ঞাতি-রাজনীতিতে প্রবেশ করার আগে এতদিন ধরে মগধরাজ জরাসন্ধকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছিল, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছেন নিজের হাতে।”
আর সেজন্যই, যতক্ষণ না অধার্মিক জরাসন্ধকে শেষ করা যাচ্ছে; ততক্ষন যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের ফলপ্রাপ্তি অসম্ভব।
মহাভারতের সময়ে কুরুবংশ, মদ্রবংশ, দ্রুপদ, ভীষ্মক (ভোজ বংশের অধিপতি), শিশুপাল, পৌন্ড্র-বাসুদেব, সিন্ধুরাজ বৃদ্ধক্ষত্র এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম (যাদবকুল ও বৃষ্ণিবংশ) এঁরাই ছিল সবথেকে শক্তিশালী রাজা।
এদের মধ্য জরাসন্ধ ছিল ক্ষত্রিয় বিরোধী। যিনি ৮৬ জন রাজাকে বন্দী করে রেখেছিলো;১০০ জন পূর্ণ হলেই তিনি তাদের বলি দিতেন। মগধরাজ জরাসন্ধের নিজেরই ছিল বিশ অক্ষৌহিনী সৈন্য। তাঁর ভয়ে ভীত হয়ে বহু রাজা উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতে পালিয়ে যায়। চেদিরাজ শিশুপাল জরাসন্ধের সেনাপতি।

সেসময় বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশের নাম ছিল পুন্ড্রবর্ধন; যার রাজা ছিল পৌন্ড্র-বাসুদেব (যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতই চক্রক্ষেপণ করতে পারে বলে নিজেই “বাসুদেব” উপাধি ধারণ করেছিলো)। এই পৌন্ড্র-বাসুদেব ছিল শ্রীকৃষ্ণ বিরোধী। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রতাপশালী বীর ভীষ্মক; যার মেয়ে রুক্মিণীকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিয়ে করেছিলেন।
আমরা সকলেই জানি যে, “শান্তিস্থাপন ও ধর্মরাজ্য সংস্থাপন”- এই দুই কাজ করতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। যুদ্ধমত্ত অধার্মিক শক্তিকে ধ্বংস করে নতুনভাবে যুধিষ্ঠিরের মত শান্তিকামী ও ধার্মিক রাজাকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে নতুন ভাবে রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আর সেজন্যই, রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে অধার্মিক জরাসন্ধকে বধ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন যুধিষ্ঠিরের হাতে। এটাই ছিল ধর্মরাজ্য প্রবর্তনের জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রথম প্রয়াস।
শ্বশুর জরাসন্ধের জোর দেখিয়ে কংসের অত্যাচার যখন চরমে উঠলো; তখন শ্রীকৃষ্ণ কংসকে বধ করেন। কংস মারা যাবার পরে মথুরাবাসী একটা বড় অত্যাচার থেকে মুক্তি পেল; কিন্তু তাঁরা এবার আরও বড় আক্রমণের মুখে পড়ে গেলেন। কংসের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দুই স্ত্রী বাপের বাড়ি গিয়ে পিতা জরাসন্ধকে উত্তেজিত করলেন পতি হত্যাকারী শ্রীকৃষ্ণকে চরম দণ্ড দেওয়ার জন্য। কিন্তু, জরাসন্ধ বার বার মথুরা আক্রমণ করেও, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামকে পরাজিত করতে পারে নি।
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
Share:

০১ নভেম্বর ২০১৫

প্রাত্যহিক জীবনে বেদের চেয়ে শ্রীমদ্ভাগবদগীতার প্রাধান্য কেন ?

বেদ আমাদের আদি ও প্রধম ধর্মগ্রন্থ । এই ধর্মগ্রন্থের বাণীগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিপর্তনীয় । এ জন্য এই গ্রন্থের বাণী বেদবাক্য নামে সমাজে পরিচিত । ঋগবেদে ইন্দ্র অগ্নি বরুণ সূর্য্য প্রভৃতি দেবতার স্তব স্তুতি আছে ।আমাদের ধর্ম যেহেতু মানব সভ্যতার আদি আর্য সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরা অনুসরণ করতো সেহেতু এই আর্যগণ এই সকল দেবতার স্তব স্তুতি করতো যা বেদে উল্লেখ রয়েছে ।তাঁরা এ সকল দেবদেবতার উদ্দেশ্যে যাগযজ্ঞ করে অভীষ্ট ফল লাভ করতেন ।বেদের প্রধান মূল কথা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা এক এবং অদ্বিতীয় । আমাদের ধর্মের পূর্বপুরুষ যারা আর্য নামে খ্যাত ছিল তারা জানতেন যে ইন্দ্র অগ্নি বরুণ প্রভৃতি দেবগণ ভগবানের শক্তির বিভিন্ন বিকাশ । বর্তমান বিজ্ঞান জগতে সূর্যকে সকল শক্তির উত্‍স মনে করা হয় । হিন্দু ধর্মে সূর্যকে তাই দেবতা মনে করে সূর্যদেব বলা হয় । সূর্যদেবতার ক্ষমতা জানার পর হিন্দুরা সূর্যকে পূজা করতে শিখল । অন্যদিকে সূর্যের উপস্থিতিতে উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ করে এবং খাদ্য তৈরী করে তারাই সকল প্রাণী জগতকে এই ধরাধামে টিকিয়ে রেখেছে । তাই আমরা সকল প্রাণী উদ্ভিদের অতিথি ।


এই সময় যাগযজ্ঞাদির প্রাধান্য সমাজে খুবই বৃদ্ধি পায় । বৈদিক ধর্ম তখন কর্ম প্রধান হয়ে উঠল । ঋগবেদ, সামবেদ ও যজর্বেদে এই ধর্মই প্রতিপাদিত হল ।ব্রাহ্মন গ্রন্থগুলি যজ্ঞের নিয়ম কানুনে পরিপূর্ণ হইল ।ফলে কেবল কর্ম দ্বারা স্বর্গ লাভ হয় এই মতবাদ প্রচলিত হল । কিন্তু এই মতবাদ সকলের মনঃপুত হল না এবং এমনকি সকলের গ্রহণযোগ্যতা ও লাভ করল না । তারা চিন্তা করলেন ঈশ্বরকে জানতে না পারলে মানুষের কিছু মোক্ষলাভ অর্থাত্‍ ঈশ্বরকে লাভ করা সম্ভব নয় । ঈশ্বরকে জানতে হলে জ্ঞানের দরকার ।

এমতাবস্থায় বৈদিক ধর্মে দুইটি রূপ দেখা দিল । একটি হল কর্ম প্রধান ধর্ম অপরটি হল জ্ঞান প্রধান ।কর্ম প্রধান রূপে কর্মকে এজগতে সকল সুখ শান্তি লাভ এবং পরকালে স্বর্গপ্রাপ্তি বলে বিবেচনা করা হয় ।আর জ্ঞান প্রধান ধর্মে ব্রহ্মকে সত্য বলে ধরে নেয়া হয় এবং জগত সংসার মিথ্যা বা মায়ার বন্ধন বলে বিবেচনা করা হয় ।

উপরোক্ত দুটি মতবাদে সমাজে চলতে থাকায় মানুষ বিব্রতবোধ করলো এবং কোনটা সঠিক বলে মেনে চলা উচিত তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়লো ।এমনি এক সংকটজনক মূহুর্তে আর্বিভূত হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।তিনি কর্মবাদ জ্ঞানবাদ ও ভক্তিবাদের প্রবর্তন করে শ্রীগীতার কর্ম জ্ঞান ও ভক্তি সমন্বয় সাধন করলেন।কুরুক্ষেত্রের ধর্ম যুদ্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই সমন্বয়ের প্রকাশ অর্জুনকে করলেন যেখানে সপ্তশতী শ্লোকের মাধ্যমে এই অমিয় বাণী ব্যক্ত হয় ।

শ্রীগীতার প্রথম কথা হলো নিষ্কাম কর্ম কর । এভাবে কাজ করতে করতে জ্ঞানের উদয় হবে । আর জ্ঞান বলে কর্মী বুঝতে পারবেন ভগবানই হচ্ছে সকল কারণের কারণ এবং এ সমস্থ সকল কাজ ভগবানের জ্ঞান সাধনায় ভক্তি আসে । ভক্ত মন প্রাণ উজাড় করে ভগবানকে আত্মসমর্পন করলে মোক্ষলাভ হয় । শ্রীমদ্ভাগবদগীতায় আমাদের প্রাত্যহিক চলার দিক নির্দেশনা অতি সুন্দরভাবে বিস্তৃত হওয়ায় বেদের চেয়ে এই গ্রন্থের পঠন ও অনুশীলন , প্রশিক্ষণ ও আত্মস্থ করা হয় সবচেয়ে বেশী ।

লিখেছেন-
অধ্যাপক ড.অমূল্য বিকাশ বসাক
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ।
Share:

০৯ এপ্রিল ২০১৫

মহাভারত

মহাভারত সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন ভারতের দুটি প্রধান মহাকাব্যের অন্যতম (অপরটি হল রামায়ণ)। এই মহাকাব্যটি হিন্দুশাস্ত্রের ইতিহাস অংশের অন্তর্গত। মহাভারত-এর মূল উপজীব্য বিষয় হল কৌরব ও পাণ্ডবদের গৃহবিবাদ এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাবলি। তবে এই আখ্যানভাগের বাইরেও দর্শন ও ভক্তির অধিকাংশ উপাদানই এই মহাকাব্যে সংযোজিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – এই চার পুরুষার্থ-সংক্রান্ত একটি আলোচনা (১২।১৬১) সংযোজিত হয়েছে এই গ্রন্থে। মহাভারত-এর অন্তর্গত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা ও উপাখ্যানগুলি হল ভগবদ্গীতা, দময়ন্তীর উপাখ্যান, রামায়ণ-এর একটি সংক্ষিপ্ত পাঠান্তর ইত্যাদি। এগুলিকে মহাভারত-রচয়িতার নিজস্ব সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাভারত-এর রচয়িতা ব্যাসদেব। অনেক গবেষক এই মহাকাব্যের ঐতিহাসিক বিকাশ ও রচনাকালীন স্তরগুলি নিয়ে গবেষণা করেছেন। অধুনা প্রাপ্ত পাঠটির প্রাচীনতম অংশটি মোটামুটি ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ রচিত হয়। মহাভারতের মূলপাঠটি তার বর্তমান রূপটি পরিগ্রহ করে গুপ্তযুগের প্রথমাংশে (খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী)। মহাভারত কথাটির অর্থ হল ভরত বংশের মহান উপাখ্যান। গ্রন্থেই উল্লিখিত হয়েছে যে ভারত নামে ২৪,০০০ শ্লোকবিশিষ্ট একটি ক্ষুদ্রতর আখ্যান থেকে মহাভারত মহাকাব্যের কাহিনিটি বিস্তার লাভ করে। মহাভারত-এ এক লক্ষ শ্লোক ও দীর্ঘ গদ্যাংশ রয়েছে। এই মহাকাব্যের শব্দসংখ্যা প্রায় আঠারো লক্ষ। মহাভারত মহাকাব্যটির আয়তন ইলিয়াড ও ওডিসি কাব্যদ্বয়ের সম্মিলিত আয়তনের দশগুণ এবং রামায়ণ-এর চারগুণ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ব্যাসদেব এই মহাকাব্যের রচয়িতা। তিনি এই আখ্যানকাব্যের অন্যতম চরিত্রও বটে। মহাভারত-এর প্রথম অংশের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যাসদেবের অনুরোধে তাঁর নির্দেশনা মতো গণেশ এই মহাকাব্য লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব নেন। গণেশ একটি শর্তে এই কাজে রাজি হয়েছিলেন। তাঁর শর্ত ছিল ব্যাস একবারও না থেমে সমগ্র মহাকাব্যটি আবৃত্তি করবেন। ব্যাস রাজি হন, কিন্তু তিনিও পাল্টা শর্ত দেন যে গণেশও প্রতিটি শ্লোকের অর্থ না বুঝে লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না। মহাভারত মহাকাব্যটি গল্পের মধ্য গল্প শৈলীতে রচিত। এই শৈলী ভারতের অনেক ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রচনার বৈশিষ্ট্য। অর্জুনের প্রপৌত্র জনমেজয়ের নিকট এই কাহিনি পাঠ করে শোনান ব্যাসদেবের শিষ্য বৈশম্পায়ন। অনেক বছর পরে, জনমেজয়ের নিকট বৈশম্পায়নের এই মহাভারত কথনের ঘটনাটি পেশাদার কথক উগ্রশ্রবা সৌতি কর্তৃক ঋষিদের একটি যজ্ঞসমাবেশে কথিত হয়। কাহিনীর শুরু প্রকৃতপক্ষে ভরত রাজার সময় থেকে। কিন্তু বহু পুস্তকে রাজা শান্তনুর সময় থেকে কাহিনী শুরু করা হয়। পিতৃসত্য পালনের জন্য শান্তনুর পুত্র দেবব্রত আজীবন বিবাহ করেন নি ও রাজসিংহাসনে বসেন নি। এই ভীষণ প্রতিজ্ঞান জন্য তাঁকে ভীষ্ম বলা হয়। ভীষ্মের কণিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য রাজত্ব চালান তাঁর ছিল দুই পুত্র - ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ায় পাণ্ডু রাজা হন। কিন্তু পাণ্ডুর অকালমৃত্যুর পর রাজত্ব ধৃতরাষ্ট্রের তত্বাবধানে আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় মহাভারতের মহাবিরোধ। কে রাজা হবেন - পাণ্ডুর পুত্র, না ধৃতরাষ্ট্রের ? শুরু হয় হিংসা, ষড়যন্ত্র, কপট দ্যূতক্রীড়া বনবাস ইত্যাদি । কাহিনীর পরিণতি অষ্টাদশদিবসব্যাপী এক সংহারক যুদ্ধ - যাতে ভারতবর্ষের বহু রাজার প্রাণ যায় । মৃত্যু হয় ধৃতরাষ্টের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন সহ মোট শতপুত্রের। শেষে রাজত্ব পান জ্যেষ্ঠ পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির। সমস্ত কাহিনীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখ্য চালকের ভূমিকায় থাকেন। এই কাহিনীর আধ্যাত্মিক সারাংশ হল ধর্মের জয় ও অধর্মের নাশ।


ডাওনলোড করুন মহাভারতের  পিডিএফ বইঃ এখানে


Share:

১৮ মার্চ ২০১৫

কন্যাকুমারী মন্দির,কন্যা কুমারী অন্তরীপ,তামিল নাড়ু


কন্যাকুমারী মন্দিরটি ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কন্যাকুমারী জেলার অন্তর্গত একটি শহর। ইংরেজিতে এই শহরকে Cape Comorin বা কুমারী অন্তরীপ বলা হয়। এই শহরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণতম বিন্দুতে অবস্থিত। কন্যাকুমারী জেলার সদর শহর নাগেরকইল এই শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কন্যাকুমারী একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রাচীনকালেও কন্যাকুমারী ছিল তামিলাকাম বা প্রাচীন তামিল দেশের দক্ষিণতম অঞ্চল। কন্যাকুমারী নামটি এসেছে হিন্দু দেবী কন্যাকুমারীর (যাঁর স্থানীয় নাম কুমারী আম্মান) নামানুসারে। এই শহরের সৈকত অঞ্চলে যেখানে আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর পরস্পর মিলিত হয়েছে, সেখানেই দেবী কুমারীর মন্দির অবস্থিত।
আনুমানিক ৩০০০ বছরের কুমারী আম্মানকে পুজো করে আসছেন হিন্দু ভক্তরা। সমুদ্র সৈকতের কিনারায় পাথর দিয়ে তৈরি মন্দিরে দেবী কন্যাকুমারীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মন্দিরের মুল ফটকটি উত্তর দিকে। এই ফটকটি বিশেষ কয়েকটি দিন ছাড়া প্রতিদিনই খোলা থাকে। এই মন্দিরে পূজো দেওয়ার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণত, দক্ষিণ ভারতের সমস্ত মন্দিরেই প্রবেশ কালে পুরুষদের গায়ের জামা খুলতে হয়। তারপরেই মন্দিরের অন্দরমহলে প্রবেশ করা যায়। কন্যাকুমারীতেও তাই। এখানে পূজা দেওয়ার আগে লারী-পুরুষ উভয়কেই সমুদ্রে মন্ত্র পড়ে স্নান করে, ভিজে জামা কাপড়েই প্রবেশ করতে হয়।
হিন্দু মতে দেবী কুমারী হলেন পার্বতীর আরেক রূপ।যাঁর রূপে মোহিত হয়ে মহাদেব তাঁকে বিয়ে করতে চায়। বিয়ের দিনই দেখা পাওয়া যায় না শিবের। কুমারী দেবীর বিয়ের দিন যা যা রান্না করা হয়েছিল তা সব ফেলে দেওয়া হয়। ভক্তরা মনে করেন, সেই সব রান্না না করা চাল, শস্য ফেলে দেওয়ায় সমুদ্রতট তৈরি হয়েছে।
আবার রামায়ণ থেকে এই কন্যাকুমারী মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করেন, রাম- রাবণের যুদ্ধে মৃত লক্ষ্মণের দেহে প্রাণ আনার জন্য সঞ্জীবনী গাছের মূল আনতে গিয়েছিল হনুমান। কিন্তু গাছ না চেনায় সে পড়েছিল মহা বিপদে। শেষে গাছ না চেনার জন্য মারুনথুভাজ মালাই নামে পুরো পাহারটাই তুলে নিয়ে গিয়ে হাজির করেছিলেন অগস্থা মুনির সামনে। আসলে আগস্থা মুনি ছিলেন আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রের পণ্ডিত। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, কন্যাকুমারীর কিছু দূরেই অগস্থে্স্বরম নামে একটি গ্রাম ছিল। সেটি আজ একটি আশ্রমে পরিণত হয়েছে। পর্যটকেরা সেই পাহাড়ে উঠে আশ্রমে যান। সেখান থেকেই পরিষ্কার দেখা যায় কন্যাকুমারী মন্দিরটি।
এই শহরের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলির মধ্যে দেবী কুমারীর মন্দির, বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল, প্রাচীন তামিল কবি তিরুবল্লুবরের ১৩৩ ফিট উঁচু মূর্তি এবং গান্ধীমণ্ডপম্‌ (ভারত মহাসাগরের জলে মহাত্মা গান্ধীর চিতাভষ্ম বিসর্জনের আগে এখানে তা রাখা হয়েছিল) রয়েছে।


Bangali Hindu Post (বাঙ্গালি হিন্দু পোস্ট)
Share:

যক্ষপ্রশ্ন (মহাভারত থেকে অনূদিত নির্বাচিত অংশ)

রচনা-পরিচিতিঃ
বলা হয়, ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে।’ অর্থাৎ মহাভারত-এ যা নেই, তা ভূভারতে নেই। হিন্দুদের দু-টি মহাকাব্যের অন্যতম হল মহাভারত। আঠারো পর্বে বিন্যস্ত এই মহাগ্রন্থ শুধুমাত্র বিশ্বের বৃহত্তম নীতিমূলক মহাকাব্যই নয়, বরং হিন্দুধর্মের বিশ্বকোষ-স্বরূপ। মহাকাব্যের মূল আলোচ্য বিষয় পাণ্ডব ও কৌরবদের পারিবারিক বিবাদের ইতিহাস। তা সত্ত্বেও হিন্দুধর্মের প্রতিটি আধ্যাত্মিক ও নীতিমূলক বিষয় এই বইতে আলোচিত হয়েছে।
এখানে অনূদিত ‘যক্ষপ্রশ্ন’ অংশটি মহাভারত-এর বনপর্ব-এর অন্তর্গত। এটি ছদ্মবেশী যমের সঙ্গে পাণ্ডবাগ্রজ যুধিষ্ঠিরের একটি কথোপকথন। যম যক্ষের রূপ ধরে এসে যুধিষ্ঠিরকে কতগুলি অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির খুব সংক্ষেপে ধর্মের কয়েকটি গূঢ় তত্ত্ব বর্ণনা করেন।
নির্বাচিত অংশঃ
যক্ষ বললেন–কিভাবে কোনো ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারে? কিভাবে সে মহৎ হতে পারে? কিভাবে সে দ্বিতীয় হতে পারে? এবং, হে রাজা, কিভাবে সে বুদ্ধিমান হতে পারে?
যুধিষ্ঠির বললেন–বেদ অধ্যয়ন করে একজন ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারে। সাধুসুলভ ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে সে মহৎ হতে পারে। সাহস অবলম্বন করে সে দ্বিতীয় হতে পারে। এবং গুরুজনের সেবা করে সে বুদ্ধিমান হতে পারে।
(শ্লোকসংখ্যা ৪৭-৪৮)
যক্ষ বললেন–ব্রাহ্মণদের দেবত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় কিসে? ব্রাহ্মণের গুণ কী? ব্রাহ্মণদের মানুষ-সুলভ বৈশিষ্ট্য কী? এবং ব্রাহ্মণদের দোষ কী?
যুধিষ্ঠির বললেন–বেদ অধ্যয়ন ব্রাহ্মণদের মধ্যে দেবত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ব্রহ্মচর্য ব্রাহ্মণের গুণ। নশ্বরতা ব্রাহ্মণের মানুষ-সুলভ বৈশিষ্ট্য। নিন্দাবাদ করা ব্রাহ্মণের দোষ।
(শ্লোকসংখ্যা ৪৯-৫০)
যক্ষ বললেন–কে পৃথিবীর চেয়েও ভারী? কে স্বর্গের চেয়েও উঁচু? কে বায়ুর চেয়েও দ্রুতগামী? ঘাসের চেয়েও সংখ্যায় বেশি কী?
যুধিষ্ঠির বললেন–মা পৃথিবীর চেয়েও ভারী। বাবা স্বর্গের চেয়েও উঁচু। মন বায়ুর চেয়েও দ্রুতগামী। দুশ্চিন্তা ঘাসের চেয়েও সংখ্যায় বেশি।
(শ্লোকসংখ্যা ৫৯-৬০)
যক্ষ বললেন–ধর্মের সর্বোচ্চ আশ্রয় কী? খ্যাতির সর্বোচ্চ আশ্রয় কী? স্বর্গের সর্বোচ্চ আশ্রয় কী? সুখের সর্বোচ্চ আশ্রয় কী?
যুধিষ্ঠির বললেন–ঔদার্য ধর্মের সর্বোচ্চ আশ্রয়। উপহার খ্যাতির সর্বোচ্চ আশ্রয়। সত্য স্বর্গের সর্বোচ্চ আশ্রয়। সৎ কাজ সুখের সর্বোচ্চ আশ্রয়।
(শ্লোকসংখ্যা ৬৯-৭০)
যক্ষ বললেন–সকল প্রশংসনীয় বস্তুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রশংসনীয় কোনটি? সকল ধনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধন কোনটি? সকল প্রাপ্তির শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি কোনটি? সকল সুখের শ্রেষ্ঠ সুখ কোনটি?
যুধিষ্ঠির বললেন–দক্ষতা সকল প্রশংসনীয় বস্তুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রশংসনীয়। বিদ্যা সকল ধনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধন। সুস্বাস্থ্য সকল প্রাপ্তির মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। সন্তুষ্টি সকল সুখের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুখ।
(শ্লোকসংখ্যা ৭৩-৭৪)
যক্ষ বললেন–পৃথিবীতে পরম ধর্ম কী? কোন গুণটি সর্বদাই ফল দেয়? কাকে নিয়ন্ত্রণ করলে অনুশোচনা করতে হয় না? এবং কার সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হয় না?
যুধিষ্ঠির বললেন–আঘাত না করাই পরম ধর্ম। তিন বেদে উক্ত ক্রিয়াকর্ম সর্বদাই ফল দেয়। মনকে নিয়ন্ত্রণ করলে অনুশোচনা করতে হয় না। এবং ভাল লোকের সঙ্গ কখনও ত্যাগ করতে হয় না।
(শ্লোকসংখ্যা ৭৫-৭৬)
যক্ষ বললেন–কোন শত্রু অপরাজেয়? কী মানুষের মধ্যে দুরারোগ্য রোগের জন্ম দেয়? কাকে সৎ ও কাকে অসৎ মানুষ বলা হয়?
যুধিষ্ঠির বললেন–রাগ হল অপরাজেয় শত্রু। কামুকতা মানুষের মধ্যে দুরারোগ্য রোগ স্থাপন করে। যে লোক সকলের মঙ্গল চায়, সেই সৎ; যে নির্দয় সেই অসৎ।
(শ্লোকসংখ্যা ৯১-৯২)
যক্ষ বললেন–হে রাজা, মোহ কী? গর্ব কী? আলস্যের থেকে কী জানা যায়? শোকের থেকে কী প্রকাশ পায়?
যুধিষ্ঠির বললেন–নিজের কর্তব্যকে না জানার নাম মোহ। নিজের কথা বেশি ভাবাই গর্ব। নিজের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন না করাই আলস্য। অজ্ঞানই শোক।
(শ্লোকসংখ্যা ৯৩-৯৪)
যক্ষ বললেন–ঋষিরা কাকে স্থৈর্য বলেছেন? সাহস কী? স্নান কোনটি? কী দান নামে পরিচিত?
যুধিষ্ঠির বললেন–নিজ কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার নামই স্থৈর্য। ইন্দ্রিয়জয়ই সত্যকারের সাহস। মন থেকে সব কলুষ ধুয়ে ফেলার নামই স্নান। সকল জীবকে রক্ষা করাই দান।
(শ্লোকসংখ্যা ৯৫-৯৬)
যক্ষ বললেন–হে রাজা, জন্ম, কাজ, অধ্যয়ন বা শাস্ত্রপাঠ-শ্রবণ–এর মধ্যে কোনটির দ্বারা কোনো ব্যক্তি ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করতে পারে?
যুধিষ্ঠির বললেন–হে যক্ষ, শোনো! জন্ম, অধ্যয়ন বা শাস্ত্রপাঠ-শ্রবণ–কোনোটিই ব্রাহ্মণত্ব লাভের পন্থা নয়। নিঃসন্দেহে বলা চলে, কাজের মাধ্যমেই মানুষ ব্রাহ্মণ হতে পারে।
(শ্লোকসংখ্যা ১০৭-১০৮)
তর্কের মাধ্যমে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা যায় না। শ্রুতিশাস্ত্রগুলিও পরস্পরবিরোধী। এমন একজন ঋষিও নেই যাঁর কথা সবাই মেনে নেয়। ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত। তাই মহান ব্যক্তিগণ যে পথে চলেন, সেই পথই ধর্মের পথ।
(শ্লোকসংখ্যা ১১৭)

Bangali Hindu Post (বাঙ্গালি হিন্দু পোস্ট)
Share:

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪

শুভ-কর্মে তাঁর রুচি ছিল বলে পরে তিনি অর্জুন নামে পরিচিত


অর্জুন পাণ্ডু ও কুন্তির তৃতীয় পুত্র। অর্জুনের জন্মনাম ছিল কৃষ্ণ। শুভ-কর্মে তাঁর রুচি ছিল বলে পরে তিনি অর্জুন নামে পরিচিত হন। অর্জুনের আরও অনেকগুলি নাম ছিল। পৃথার (কুন্তির জন্মনাম) পুত্র বলে তিনি ওঁকে অনেকে পার্থ বলে সম্বোধন করতেন। ওঁর অন্য নামগুলি হল – ধনঞ্জয়, বিজয়, শ্বেতবাহন, ফাল্গুন, কিরীটী, বিভৎসু , সব্যসাচী , জিষ্ণু ও গুড়াকেশ। অর্জুন ছিলেন কৌরব ও পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের প্রিয়তম শিষ্য। গুরুদক্ষিণা স্বরূপ দ্রোণাচার্য যখন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের বন্দিত্ব চান, তখন মূলত অর্জুনের বীরত্বতেই তা সম্ভব হয়। ওঁদের শৌর্যবীর্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্র ও তাঁর পুত্ররা ওঁদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন জেনে পাণ্ডবরা বেশ কিছুদিন ছদ্মবেশে ছিলেন।এই সময় ব্রাহ্মণবেশে অর্জুন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের যজ্ঞবেদিসম্ভূত কন্যা দ্রৌপদী স্বয়ংবর সভায় লক্ষ্যভেদ করে তাঁর বরমাল্য পান। পুত্র ঘরে কি এনেছে না দেখে মাতা কুন্তি, সবাই সমান ভাবে ভাগ করে নেও, বলায় পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গেই দ্রৌপদীর বিবাহ হয়।

দেবর্ষি নারদের উপদেশে পাণ্ডবরা নিয়ম করেছিলেন যে, দ্রৌপদী যে সময়ে এক ভ্রাতার সঙ্গে থাকছেন,সেই সময় অন্য কোনও ভ্রাতা তাঁদের শয়ন-গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন না। করলে তাঁকে ১২বছর বনবাস করতে হবে। ঘটনাচক্রে এক ব্রাহ্মণের গোধন রক্ষা করার জন্য অস্ত্র আনতে অর্জুন যুধিষ্ঠির ও কৃষ্ণার শয়ন-গৃহে ঢুকতে বাধ্য হলেন। যুধিষ্ঠির এতে নিয়ম ভঙ্গ হয় নি বললেও, অর্জুন বনবাসে চলে যান।বনবাস সময়কালে একে একে চিত্রাঙ্গদা , সুভদ্রার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় । দ্রুপদ-রাজের কন্যা দ্রৌপদী ছাড়াও অর্জুনের আরও তিনজনকে বিবাহ করেছিলেন। এঁরা হলেন – কৌরব্যনাগের কন্যা উলুপী, মণিপুররাজ চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা এবং কৃষ্ণ ভগিনী সুভদ্রা। ওঁর চার পুত্রের নাম শ্রুতকীর্তি (দ্রৌপদীর গর্ভজাত) ,ইরাবান্ (উলুপীর গর্ভজাত), বভ্রুবাহন (চিত্রাঙ্গদার গর্ভজাত) ও অভিমন্যু (সুভদ্রার গর্ভজাত)।

অগ্নিদেবের হিতার্থে খাণ্ডব অরণ্য যাতে কৃষ্ণ ও অর্জুন দহনে করতে পারেন,তারজন্য বরুণদেব অর্জুনকে একটি রথ আর সেই সঙ্গে বিখ্যাত গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দিয়েছিলেন। এই অস্ত্র পেয়ে অর্জুন বিশেষভাবে বলশালী হন। দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে পাণ্ডবরা যখন বনবাস করছিলেন,তখন যুধিষ্ঠিরের আদেশে দিব্যাস্ত্রলাভের জন্য অর্জুন ইন্দ্রলোকে যান। ইন্দ্র তাঁকে মহাদেবের আরাধনা করতে বলেন।তাই করে অর্জুন মহাদেবের কাছ থেকে পাশুপত অস্ত্র পান। এরপর ইন্দ্র নিজেও অর্জুনকে নানাবিধ দিব্যাস্ত্রে শিক্ষা দেন। ইন্দ্রের নির্দেশে ইন্দ্রসখা চিত্রসেন অর্জুনকে গীত ও নৃত্যে পারদর্শী করেন। সেইখানে নৃত্যরতা অপ্সরাদের মধ্যে উর্বশীর দিকে অর্জুন বারবার তাকাচ্ছিলেন বলে, ইন্দ্র উর্বশীকে অর্জুনের সাথে দেখা করতে বলেন। অর্জুন কামনা করে উর্বশী দিকে তাকান নি, উর্বশীকে পুরু বংশের জননী হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু অর্জুন উর্বশীকে প্রত্যাখ্যান করায় উর্বশী অপমানিত হয়ে অর্জুনকে অভিশাপ দিলেন যে, অর্জুনকে নর্তকরূপে স্ত্রীলোকদের মধ্যে নপুংশক হয়ে থাকবেন। উর্বশীর এই অভিশাপ পাণ্ডবরা যখন বিরাটরাজের সভায় অজ্ঞাতবাস করছিলেন,তখন খুব কাজে লেগেছিল। সেখানে অর্জুন বৃহন্নলা সেজে বিরাটরাজের অন্তঃপুরচারিণীগনকে নৃত্য, গীত ইত্যাদি শিক্ষা দিয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয়ের অন্যতম কারণ হল অর্জুনের রণনৈপুন্য। কৌরবদের বহু বীর যুদ্ধকালে ওঁর হস্তে নিহত হয়েছেন। সন্মুখ সমরে ভগদত্ত, জয়দ্রথ, কর্ণকে তিনি বধ করেছেন।
Share:

০৪ জুলাই ২০১৪

অর্জ্জুনকর্ত্তৃক যাদব-নরনারীরক্ষা-ব্যবস্থা, বসুদেবের মৃত্যু–দেবকী প্রভৃতির সহমরণ, বসুদেব ও রামকৃষ্ণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, যাদবনারীগণসহ অর্জ্জুনের হস্তিনাযাত্রা, সমুদ্রের দ্বারকাপুরীগ্রাস, দস্যুগণকর্ত্তৃক দ্বারকারমণী-আক্রমণ, রমণীগণের উদ্ধারে অর্জ্জুনের অসামর্থ্য, বজ্রের হস্তে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার-অর্পণ

অর্জ্জুনকর্ত্তৃক যাদব-নরনারীরক্ষা-ব্যবস্থা
মহাত্মা বসুদেব এই কথা কহিলে, শত্রুতাপন মহাবীর ধনঞ্জয় একান্ত বিমনায়মান হইয়া তাঁহাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, “মাতুল! আমি কোন ক্রমেই এই কেশব ও অন্যান্য বীরগণপরিশূন্য রাজধানী দর্শনে সমর্থ হইতেছি না। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী ও আমি আমরা সকলেই একাত্মা। এই যদুকুলক্ষয় শ্রবণ করিলে, আমার ন্যায় তাঁহাদেরও যাহার পর নাই ক্লেশ হইবে। এক্ষণে মহারাজ যুধিষ্ঠিরেরও মর্ত্ত্যলোক হইতে প্রস্থানসময় সমুপস্থিত হইয়াছে। অতএব আর এ স্থানে অধিক দিন অবস্থান করা আমার উচিত নহে। আমি অচিরাৎ বৃষ্ণিবংশীয় বালক ও বনিতাদিগকে লইয়া ইন্দ্রপ্রস্থে গমন করিব।”
মহাবীর ধনঞ্জয় মাতুলকে এই কথা কহিয়া দারুককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “দারুক! আমি বৃষ্ণিবংশীয় অমাত্যদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাসনা করি, অতএব তুমি সত্বরে আমাকে তাঁহাদের নিকট লইয়া চল।” এই কথা কহিয়া তিনি দারুকের সহিত মহারথ যাদবগণের নিমিত্ত শোক করিতে করিতে তাঁহাদের সভায় সমুপস্থিত হইলেন। অনন্তর তিনি তথায় আসন পরিগ্রহ করিলে, অমাত্যগণ, প্রকৃতিমণ্ডল এবং ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর অর্জ্জুন সেই দীনচিত্ত মৃতকল্প ব্যক্তিদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ! আমিওঅন্ধকদিগের পরিবারদিগকে লইয়া ইন্দ্রপ্রস্থে গমন করিব। কৃষ্ণের পৌত্ত্র বজ্র ঐ নগরে রাজা হইয়া তোমাদিগকে প্রতিপালন করিবেন। এই নগর অচিরাৎ সমুদ্রজলে প্লাবিত হইবে। অতএব তোমরা অবিলম্বে যান ও রত্নসমুদায় সুসজ্জিত কর। সপ্তম দিবসে সূর্য্যোদয়সময়ে আমাদিগকে এই নগরের বহির্ভাগে অবস্থান করিতে হইবে। অতএব তোমরা আর বিলম্ব করিও না, শীঘ্র সুসজ্জিত হও।”
বসুদেবের মৃত্যু–দেবকী প্রভৃতির সহমরণ
মহাত্মা ধনঞ্জয় এই কথা কহিলে, তাঁহারা সকলেই সত্বরে সুসজ্জিত হইতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জ্জুন শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া কৃষ্ণের গৃহে সেই রজনী অতিবাহিত করিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে প্রবলপ্রতাপ মহাত্মা বসুদেব যোগাবলম্বন পূর্ব্বক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া উৎকৃষ্ট গতিলাভ করিলেন। তখন তাঁহার অন্তঃপুরমধ্যে ঘোরতর ক্রন্দনশব্দ সমুত্থিত হইয়া সমুদায় পুরী প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। কামিনীগণ মাল্য ও আভরণ পরিত্যাগ পূর্ব্বক আলোলয়িতকেশে বক্ষঃস্থলে করাঘাত করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা অর্জ্জুন সেই বসুদেবের মৃতদেহ বহুমূল্য নরযানে আরোপিত করিয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। দ্বারকাবাসিগণ দুঃখশোকে একান্ত অভিভূত হইয়া, তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল। ভৃত্যগণ শ্বেতচ্ছত্র ও যাজকগণ প্রদীপ্ত পাবক লইয়া সেই শিবিকাযানের অগ্রে অগ্রে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। দেবকী, ভদ্রা, রোহিণী ও মদিরা নামে বসুদেবের পত্নীচতুষ্টয় তাঁহার সহমৃতা হইবার মানসে দিব্য অলঙ্কারে বিভূষিত ও অসংখ্য কামিনীগণে পরিবেষ্টিত হইয়া তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। ঐ সময় জীবদ্দশায় যে স্থান বসুদেবের মনোরম ছিল, বান্ধবগণ সেই স্থানে তাঁহাকে উপনীত করিয়া তাঁহার প্রেতকৃত্য সম্পাদন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন তাঁহার দেবকীপ্রভৃতি পত্নীচতুষ্টয় তাঁহাকে প্রজ্বলিত চিতাতে আরোপিত দেখিয়া তদপুরি সমারূঢ় হইলেন।
বসুদেব ও রামকৃষ্ণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
মহাত্মা অর্জ্জুন চন্দনাদি বিবিধ সুগন্ধ কাষ্ঠ দ্বারা পত্নীসমবেত বসুদেবের দাহকার্য্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সেই প্রজ্বলিত চিতানলের শব্দ, সামবেত্তাদিগের বেদাধ্যয়ন ও অন্যান্য মানবগণের রোদনধ্বনিপ্রভাবে পরিবর্দ্ধিত হইয়া সেই স্থান প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। অনন্তর তিনি বজ্রপ্রভৃতি যদুবংশীয় কুমারগণ ওকামিনীগণের সহিত সমবেত হইয়া বসুদেবের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিলেন।
এইরূপে বসুদেবের ঔর্দ্ধ্বদেহিক কার্য্য সম্পাদন হইলে, পরমধার্ম্মিক ধনঞ্জয় যে স্থলে বৃষ্ণিবংশীয়েরা বিনষ্ট হইয়াছিলেন, সেই স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। তখন সেই ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মুসলনিহত বৃষ্ণিগণকে নিপতিত সন্দর্শন করিয়া তাঁহার দুঃখের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি জ্যেষ্ঠতানুসারে তাহাদিগের সকলের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিয়া অন্বেষণ দ্বারা বলদেব ও বাসুদেবের শরীরদ্বয় আহরণ পূর্ব্বক চিতানলে ভস্মসাৎ করিলেন।
যাদবনারীগণসহ অর্জ্জুনের হস্তিনাযাত্রা
মহাত্মা অর্জ্জুন এইরূপে শাস্ত্রানুসারে বৃষ্ণিবংশীয়দিগের প্রেতকার্য্য সম্পাদন করিয়া সপ্তম দিবসে রথারোহণে ইন্দ্রপ্রস্থাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন বৃষ্ণিবংশীয় কামিনীগণ শোকার্ত্ত হইয়া রোদন করিতে করিতে অশ্ব, গো, গর্দ্দভ ও উষ্ট্রসমাযুক্ত রথে আরোহণ পূর্ব্বক তাঁহার অনুগমনে প্রবৃত্ত হইলেন। ভৃত্য অশ্বারোহী ও রথীগণ এবং পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকসমুদায় অর্জ্জুনের আজ্ঞানুসারে বৃদ্ধ, বালক ও কামিনীগণকে পরিবেষ্টন করিয়া গমন করিতে লাগিল। গজারোহিগণ পর্ব্বতাকার গজসমুদায়ে আরোহণ পূর্ব্বক ধাবমান হইল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় বালকগণ, বাসুদেবের ষোড়শ সহস্র পত্নী ও পৌত্ত্র বজ্রকে অগ্রসর করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভোজ, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশের যে কত অনাথা কামিনী পার্থের সহিত গমন করিয়াছিলেন, তাহার আর সংখ্যা নাই। এইরূপে মহারথ অর্জ্জুন সেই যদুবংশীয় অসংখ্য লোক সমভিব্যাহারে দ্বারকা নগর হইতে বহির্গত হইলেন।
সমুদ্রের দ্বারকাপুরীগ্রাস
দ্বারকাবাসী লোকসমুদায় নগর হইতে নির্গত হইলে পর, মহাত্মা অর্জ্জুন উঁহাদের সহিত ঐ বিবিধ রত্নপরিপূর্ণ নগরের যে অংশ অতিক্রম করিতে লাগিলেন, সেই অংশ অচিরাৎ সমুদ্রজলে প্লাবিত হইতে লাগিল। তখন দ্বারকাবাসী লোকসমুদায় সেই অদ্ভূত ব্যাপারসন্দর্শনে নিতান্ত চমৎকৃত হইয়া ‘দৈবের কি আশ্চর্য্য ঘটনা’ এই কথা বলিতে বলিতে দ্রুতপদে ধাবমান হইল। অনন্তর মহাবীর ধনঞ্জয় সেই যদুবংশীয় কামিনীগণ ও অন্যান্য যোধগণসমভিব্যাহারে ক্রমে ক্রমে নদীতীর, রমণীয় কানন ও পর্ব্বতপ্রদেশে অবস্থান করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দিন পরে তিনি অতি সমৃদ্ধিসম্পন্ন পঞ্চনদ দেশে সমুপস্থিত হইয়া পশু ও ধান্যপরিপূর্ণ প্রদেশে অবস্থিতি করিলেন। ঐ স্থানে দস্যুগণ ধনঞ্জয় একাকী সেই অনাথা যদুকুলকামিনীগণকে লইয়া যাইতেছেন দেখিয়া, অর্থলোভে তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিতে বাসনা করিয়া পরস্পর এইরূপ মন্ত্রণা করিল যে, “ধনঞ্জয় একাকী কতকগুলি বৃদ্ধ, বালক ও বনিতাসমভিব্যাহারে গমন করিতেছে। উহার অনুগামী যোধগণেরও তাদৃশ ক্ষমতা নাই। অতএব চল, আমরা উহাদিগকে আক্রমণ করিয়া উহাদের ধনরত্নসমুদায় অপহরণ করি।”
দস্যুগণকর্ত্তৃক দ্বারকারমণী-আক্রমণ
এইরূপ পরামর্শ করিয়া সেই দস্যুগণ লগুড়হস্তে সিংহনাদশব্দে দ্বারকাবাসী লোকদিগকে বিত্রাসিত করিয়া তথায় উপস্থিত হইল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় অনুচরগণের সহিত তাহাদের অভিমুখীন হইয়া তাহাদিগকে কহিলেন, দস্যুগণ! যদি তোমাদিগের জীবিত থাকিবার বাসনা থাকে, তাহা হইলে অচিরাৎ প্রতিনিবৃত্ত হও, নচেৎ আমি নিশ্চয়ই শরনিকর দ্বারা তোমাদিগকে নিহত করিব। পাণ্ডুনন্দন এইরূপে তাহাদিগকে ভয়প্রদর্শন করিলেও তাহারা তাঁহার বাক্য অগ্রাহ্য করিয়া দ্বারকাবাসী লোকদিগকে আক্রমণ করিল।
রমণীগণের উদ্ধারে অর্জ্জুনের অসামর্থ্য
তখন মহাবীর ধনঞ্জয় রোষভরে স্বীয় গাণ্ডীব শরাসনে জ্যারোপণ করিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু তৎকালে ঐ কার্য্য তাঁহার নিতান্ত কষ্টকর বোধ হইতে লাগিল। পরিশেষে তিনি অতি কষ্টে সেই শরাসনে জ্যারোপণ করিয়া দিব্যাস্ত্রসমুদায় চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু ঐ সময় কোন ক্রমে সেই অস্ত্রসমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল না। তিনি স্বীয় ভুজবীর্য্যের হানি ও দিব্যাস্ত্রসমুদায়ের অস্মরণনিবন্ধন নিতান্ত লজ্জিত হইলেন। ঐ সময় বৃষ্ণিবংশীয়দিগের হস্তী, অশ্ব ও রথারোহী যোধগণও সেই দস্যুগণকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত বিশেষ যত্ন করিতে লাগিল, কিন্তু কোন ক্রমেই কৃতকার্য্য হইতে সমর্থ হইল না। দস্যুগণ যে দিকে গমন করিতে লাগিল, মহাবীর অর্জ্জুন যত্ন পূর্ব্বক সেই দিক্ রক্ষা করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে নিবারণ করিতে পারিলেন না।
অনন্তর দস্যুগণ সৈন্যগণের সমক্ষেই অবলাদিগকে অপহরণ করিতে লাগিল এবং কোন কোন কামিনী ইচ্ছা পূর্ব্বক তাহাদিগের সহিত গমন করিতে আরম্ভ করিল। মহাত্মা অর্জ্জুন তদ্দর্শনে নিতান্ত উদ্বিগ্ন বৃষ্ণিবংশীয়দিগের ভৃত্যগণের সহিত মিলিত হইয়া তূণীর হইতে শরসমুদায় নিষ্কাশন পূর্ব্বক দস্যুগণের প্রতি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহার অক্ষয় তূণীরের মধ্যস্থ বাণসমুদায়ও ক্ষণকালের মধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হইল। শরসমুদায় নিঃশেষ হইলে, পাণ্ডুনন্দন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া শরাসনের অগ্রভাগ দ্বারা দস্যুগণকে প্রহার করিতে লাগিলেন। কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে নিরাকৃত করিতে পারিলেন না। পরিশেষে সেই দস্যুগণ তাঁহার সম্মুখ হইতেই বৃষ্ণি ও অন্ধকদিগের অতি উৎকৃষ্ট কামিনীগণকে অপহরণ করিয়া পলায়ন করিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় দিব্যাস্ত্র, ভুজবীর্য্য ও তূণীরস্থ শরসমুদায়ের ক্ষয়নিবন্ধন নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া দৈবদুর্ব্বিপাক স্মরণপূর্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইলেন।
বজ্রের হস্তে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার-অর্পণ
অনন্তর তিনি সেই হৃতাবশিষ্ট কামিনীগণ ও রত্নরাশি সমভিব্যাহারে কুরুক্ষেত্রে সমুপস্থিত হইয়া হার্দ্দিক্যতনয় ও ভোজকুলকামিনীগণকে মার্ত্তিকাবর্ত নগরে, অবশিষ্ট বালক, বৃদ্ধ ও বনিতাগণকে ইন্দ্রপ্রস্থে এবং সাত্যকিপুত্ত্রকে সরস্বতীনগরীতে সন্নিবেশিত করিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার কৃষ্ণের পৌত্ত্র বজ্রের প্রতি সমর্পিত হইল। ঐ সময় অক্রূরের পত্নীগণ প্রব্রজ্যাগ্রহণে উদ্যত হইলে, বজ্র বারংবার তাঁহাদিগকে নিষেধ করিতে লাগিলেন; কিন্তু কিছুতেই তাঁহারা প্রতিনিবৃত্ত হইলেন না। রুক্মিণী, গান্ধারী, শৈব্যা, হৈমবতী ও দেবী জাম্ববতী ইঁহারা সকলে হুতাশনে প্রবেশ পূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিলেন। কৃষ্ণের অন্যান্য পত্নীগণ তপস্যা করিবার মানসে অরণ্যে প্রবিষ্ট হইয়া ফলমূল ভোজন পূর্ব্বক হিমালয় অতিক্রম করিয়া কলাপগ্রামে উপস্থিত হইলেন। অনন্তর মহাত্মা ধনঞ্জয় দ্বারকাবাসী লোকদিগকে যথোপযুক্ত স্থানবিভাগ প্রদান করিয়া বজ্রের হস্তে সমর্পণ করিলেন।

Share:

অর্জ্জুনের আগমন–দ্বারকা দুর্দ্দশাদর্শনে বিলাপ । যাদবগণের দুর্দ্দশাদর্শনে অর্জ্জুনের বিলাপ, যদুবংশধ্বংসে বসুদেবের বিলাপ ,

অর্জ্জুনের আগমন–দ্বারকা দুর্দ্দশাদর্শনে বিলাপ
এ দিকে কৃষ্ণসারথি দারুক হস্তিনায় সমুপস্থিত হইয়া পাণ্ডবগণের নিকট যদুকুলের নিধনবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলে, পাণ্ডবগণ উহা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত শোকসন্তপ্ত ও ব্যাকুলচিত্ত হইলেন। তখন বাসুদেবের প্রিয় সখা মহাবীর ধনঞ্জয় ভ্রাতৃগণকে আমন্ত্রণ পূর্ব্বক মাতুল বসুদেবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত দারুকের সহিত দ্বারকাভিমুখে যাত্রা করিলেন। অনন্তর তিনি দ্বারকায় সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ঐ নগরী অনাথা রমণীর ন্যায় নিতান্ত হীনদশা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ সময় বাসুদেবের অন্তঃপুরস্থ রমণীগণ তাঁহার বিরহে নিতান্ত কাতর হইয়াছিলেন; তাঁহারা অর্জ্জুনকে দর্শন করিবামাত্র উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। বাসুদেবের যে ষোড়শসহস্র মহিষী ছিলেন, তাঁহারা অর্জ্জুনকে সমাগত দেখিয়া হাহাকার করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই পতিপুত্ত্রবিহীনা রমণীগণের আর্ত্তনাদ শ্রবণে অর্জ্জুনের নয়নযুগল বাষ্পবারিতে পরিপূর্ণ হওয়াতে, তিনি তৎকালে কিছুমাত্র দর্শন করিতে সমর্থ হইলেন না।
যাদবগণের দুর্দ্দশাদর্শনে অর্জ্জুনের বিলাপ
ঐ সময় সেই বীরশূন্য দ্বারকাপুরীকে বৈতরণী নদীর ন্যায় তাঁহার বোধ হইতে লাগিল। তিনি বৃষ্ণি ও অন্ধকগণকে উহার জল, অশ্বসমুদায়কে মৎস্য, রথসমুদায়কে উড়ুপ, বাদিত্র ও রথনির্ঘোষকে তরঙ্গ, গৃহসোপানসমুদায়কে মহাহ্রদ, রত্নসমুদায়কে শৈবাল, পথসমুদায়কে আবর্ত্ত, চত্বরসমুদায়কে স্তিমিত হ্রদ এবং বলদেব ও বাসুদেবকে মহানক্র বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি সেই দ্বারকাপুরী ও বাসুদেবের বনিতাদিগকে হেমন্তকালীন নলিনীর ন্যায় নিতান্ত শ্রীভ্রষ্ট ও প্রভাশূন্য দর্শন করিয়া বাষ্পাকুলিত লোচনে রোদন করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন বাসুদেবমহিষী সত্যভামা, রুক্মিণী ও অন্যান্য রমণীগণ অর্জ্জুনের নিকট বেগে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে পরিবেষ্টন পূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ রোদন করিলেন এবং তৎপরে তাঁহাকে ধরাতল হইতে উত্থাপন পূর্ব্বক কাঞ্চনময় পীঠে উপবেশন করাইয়া তাঁহার চতুর্দ্দিকে অবস্থান করিতে লাগিলেন।

যদুবংশধ্বংসে বসুদেবের বিলাপ
বৈশম্পায়ন বলিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাত্মা অর্জ্জুন মনে মনে বাসুদেবের স্তব করিয়া স্ত্রীগণকে আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক মাতুলের সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে তাঁহার গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন, মহাত্মা বসুদেব পুত্ত্রশোকে নিতান্ত সন্তপ্ত হইয়া শয়ান রহিয়াছেন। তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া ধনঞ্জয়ের দুঃখের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি বাষ্পপূর্ণনয়নে রোদন করিতে করিতে তাঁহার চরণযুগল বন্দনা করিলেন।
মহাত্মা বসুদেব ভাগিনেয় অর্জ্জুনকে সমাগত দেখিয়া নিতান্ত দৌর্ব্বল্যনিবন্ধন তাঁহার মস্তকাঘ্রাণ করিতে সমর্থ না হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক পুত্ত্র, পৌত্ত্র, দৌহিত্র ও বান্ধবগণের নিমিত্ত রোদন করিতে করিতে কহিলেন, “ধনঞ্জয়! যাহারা অসংখ্য ভূপতি ও দানবগণকে পরাজিত করিয়াছিল, আজি আমি তাহাদিগকে না দেখিয়াও জীবিত রহিয়াছি! তুমি যে প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকিকে প্রিয়শিষ্য বলিয়া সর্ব্বদা প্রশংসা করিতে এবং যাহারা বৃষ্ণিবংশের অতিরথ বলিয়া বিখ্যাত ও বাসুদেবের নিতান্ত প্রিয়পাত্র ছিল, এক্ষণে তাহাদিগেরই দুর্নীতিনিবন্ধন এই যদুকুলের ক্ষয় হইয়াছে। অথবা উহাদের এ বিষয়ে দোষ কি? ব্রহ্মশাপই ইহার মূল কারণ।
“পূর্ব্বে যে কৃষ্ণ মহাবলপরাক্রান্ত কেশী, কংস, শিশুপাল, নিষাদরাজ একলব্য, কাশিরাজ, কালিঙ্গগণ, মাগধগণ, গান্ধারগণ এবং প্রাচ্য, দাক্ষিণাত্য ও পার্ব্বতীয় ভূপালগণকে নিহত করিয়াছিলেন, এক্ষণে তিনিও এই যদুকুল ক্ষয় হইতে দেখিয়া উপেক্ষা করিয়াছেন। তুমি, দেবর্ষি নারদ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ তোমরা সকলেই যাঁহাকে সনাতন দেবদেব বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাক, তিনি এক্ষণে স্বচক্ষে জ্ঞাতিবধ প্রত্যক্ষ করিয়া উপেক্ষা করিলেন। বোধ হয়, গান্ধারী ও ঋষিগণের বাক্য অন্যথা করিতে তাঁহার বাসনা হয় নাই।
“তোমার পৌত্র পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র দ্বারা দগ্ধ হইলে, তিনিই তাঁহার জীবন দান করিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে স্বীয় পরিজনদিগকে রক্ষা করিতে তাঁহার বাসনা হইল না। তাঁহার পুত্র, পৌত্র, সখা ও ভ্রাতৃগণ সকলে নিহত হইলে, তিনি আমার নিকট আগমন পূর্ব্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘পিতঃ! আজি এই যদুকুল একবারে নিঃশেষিত হইল। আমার প্রিয় সখা অর্জ্জুন দ্বারকায় আগমন করিলে, আপনি তাঁহার নিকট এই কুলক্ষয়ের বিষয় আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করিবেন। আমি অর্জ্জুনের নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছি। তিনি এই নিদারুণ সংবাদ শ্রবণ করিলে, কখনই হস্তিনায় অবস্থান করিতে পারিবেন না। অর্জ্জুনের সহিত আমার কিছুমাত্র প্রভেদ নাই। অতএব ঐ মহাত্মা এ স্থানে আগমন করিয়া যাহা কহিবেন, আপনি অবিচারিতচিত্তে তাহার অনুষ্ঠান করিবেন। তাঁহা দ্বারাই আপনার ঔর্দ্ধ্বদেহিক কার্য্যসম্পাদন এবং এই বালক ও রমণীগণের রক্ষা হইবে। তিনি এই স্থান হইতে প্রতিগমন করিবমাত্র এই অসংখ্য প্রাচীর ও অট্টালিকাসম্পন্ন দ্বারকাপুরী সমুদ্রজলে প্লাবিত হইয়া যাইবে। আমি এক্ষণে বলদেবের সহিত কোন পবিত্র স্থানে সমুপস্থিত হইয়া কাল প্রতীক্ষায় অবস্থান করিব।’
“অচিন্ত্যপরাক্রম মহাত্মা হৃষীকেশ এই বলিয়া আমাকে বালকগণের সহিত এই স্থানে রাখিয়া যে কোথায় গমন করিয়াছেন, কিছুই বলিতে পারি না। আমি নিতান্ত শোকাকুল হইয়া দিবারাত্রি বলদেব, বাসুদেব ও জ্ঞাতিগণকে স্মরণ পূর্ব্বক অনাহারে কালহরণ করিতেছি। আর আমার জীবন ধারণ ও ভোজন করিতে প্রবৃত্তি নাই। এক্ষণে সৌভাগ্যবশতঃ তোমার সহিত আমার সাক্ষাৎকার লাভ হইল। অতএব তুমি অবিলম্বে বাসুদেবের বাক্যানুরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান কর। এক্ষণে এই রাজ্য, স্ত্রী ও রত্নসমুদায় তোমার অধিকৃত হইল। আমি অচিরাৎ তোমার সমক্ষেই প্রাণত্যাগ করিব।”

Share:

অর্জ্জুননিকটে কৃষ্ণের যাদবধ্বংসসংবাদ-প্রেরণ । পুরনারীরক্ষার্থ কৃষ্ণের ব্যবস্থা । বলদেবের অন্তর্দ্ধান । ব্যাধবাণে আহত কৃষ্ণের অন্তর্দ্ধান

অর্জ্জুননিকটে কৃষ্ণের যাদবধ্বংসসংবাদ-প্রেরণ
বৈশম্পায়ণ বলিলেন, মহাত্মা বভ্রু ও দারুক এই কথা কহিলে, মহামতি বাসুদেব তাঁহাদের বাক্যে সম্মত হইয়া তাঁহাদিগের সহিত অমিতপরাক্রম বলভদ্রের উদ্দেশে গমন করিয়া ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে করিতে দেখিলেন, ঐ মহাবীর অতি নির্জ্জন প্রদেশে বৃক্ষমূলে উপবিষ্ট হইয়া চিন্তা করিতেছেন। মহাত্মা হৃষীকেশ বলভদ্রকে তদবস্থ দেখিয়া দারুককে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, “সারথে! তুমি সত্বর হস্তিনানগরে গমন করিয়া অর্জ্জুনের নিকট যাদবদিগের বিনাশবৃত্তান্ত সমুদায় নিবেদন কর। তাহা হইলে তিনি অবিলম্বে দ্বারকায় আগমন করিবেন।” বাসুদেব এইরূপ আদেশ করিলে, দারুক অবিলম্বে রথারোহণে কৌরবরাজধানীতে প্রস্থান করিলেন।
পুরনারীরক্ষার্থ কৃষ্ণের ব্যবস্থা
তখন মহাত্মা কেশব সমীপস্থিত বভ্রুকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ভদ্র! তুমি অবিলম্বে অন্তঃপুরকামিনীগণের রক্ষার্থ গমন কর। দস্যুগণ যেন ধনলোভে তাহাদিগকে হিংসা না করে।”
মহাবীর বভ্রু ঐ সময় মদমত্ত ও জ্ঞাতিবধনিবন্ধন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া জনার্দ্দনের নিকট উপবেশন পূর্ব্বক বিশ্রাম করিতেছিলেন। মহাত্মা মধুসূদন এই কথা কহিবামাত্র তিনি যেমন স্ত্রীগণের রক্ষণার্থ ধাবমান হইলেন, অমনি সেই ব্রহ্মশাপসম্ভূত মুষল এক ব্যাধের লৌহময় মুদ্গরে আবির্ভূত ও তাঁহার গাত্রে নিপতিত হইয়া তাঁহার প্রাণসংহার করিল। তখন মহাত্মা হৃষীকেশ বভ্রুকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া স্বীয় অগ্রজ বলদেবকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, “মহাত্মন্! আমি যে কালপর্য্যন্ত কাহারও প্রতি স্ত্রীগণের রক্ষণাবেক্ষণের ভার সমর্পণ করিয়া প্রত্যাগমন না করি, সেই কালপর্য্যন্ত আপনি এই স্থানে আমার প্রতীক্ষা করুন।”
এই কথা কহিয়া, বাসুদেব অচিরাৎ নগরমধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক পিতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “মহাশয়! যে পর্য্যন্ত ধনঞ্জয় এখানে আগমন না করেন, সেই পর্য্যন্ত আপনি অন্তঃপুরস্থ কামিনীদিগকে রক্ষা করুন। জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলদেব বনমধ্যে আমার নিমিত্ত প্রতীক্ষা করিতেছেন; অতএব আমি এক্ষণে তাঁহার নিকট চলিলাম। পূর্ব্বে আমি কুরুপাণ্ডবযুদ্ধে কৌরব ও অন্যান্য নরপতিগণের নিধন দর্শন করিয়াছি, এক্ষণে আবার আমাকে যদুবংশের নিধনও প্রত্যক্ষ করিতে হইল। আজি যাদবগণের বিরহে এই পুরী আমার চক্ষুর শল্যস্বরূপ বোধ হইতেছে। অতএব আমি অচিরাৎ বনগমন করিয়া, বলদেবের সহিত তীব্রতর তপোনুষ্ঠান করি।”
বলদেবের অন্তর্দ্ধান
মহামতি বাসুদেব এই কথা কহিয়া, পিতার চরণবন্দন পূর্ব্বক অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। তিনি বহির্গত হইবামাত্র অন্তঃপুরমধ্যে বালক ও বনিতাদিগের ঘোরতর আর্ত্তনাদ সমুত্থিত হইল। তখন ধীমান্ বাসুদেব অবলাগণের রোদনশব্দ শ্রবণে পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, “হে সীমন্তিনীগণ! মহাত্মা ধনঞ্জয় এই নগরে আগমন করিতেছেন, তিনি তোমাদিগের দুঃখমোচন করিবেন। অতএব তোমরা আর রোদন করিও না।”
এই কথা কহিয়া মহামতি মধুসূদন অবিলম্বে নির্জ্জন বনপ্রদেশে গমন করিয়া দেখিলেন, বলদেব যোগাসনে আসীন রহিয়াছেন এবং তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে এক বৃহদাকার শ্বেতবর্ণ সর্প বিনির্গত হইতেছে। ঐ সর্পের মস্তক সহস্রসংখ্যক ও মুখ রক্তবর্ণ। সর্প দেখিতে দেখিতে বলদেবের মুখ হইতে বহির্গত হইয়া সমুদ্রাভিমুখে ধাবমান হইল। তখন সাগর, দিব্য নদীসমুদায়, জলাধিপতি বরুণ এবং কর্কোটক, বাসুকি, তক্ষক, পৃথ্রুশ্রবাঃ, বরুণ, কুঞ্জর, মিশ্রী, শঙ্খ, কুমুদ, পুণ্ডরীক, ধৃতরাষ্ট্র, হ্রাদ, ক্রাধ, শিতিকণ্ঠ, উগ্রতেজা, চক্রমন্দ, অতিষণ্ড, দুর্ম্মুখ ও অম্বরীষ প্রভৃতি নাগগণ সেই সর্পকে প্রত্যুদ্গমন পূর্ব্বক স্বাগতপ্রশ্ন ও পাদ্য অর্ঘ্যাদি দ্বারা অর্চ্চনা করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই সর্প বলদেবের মুখ হইতে বহির্গত হইলে, তাঁহার দেহ নিতান্ত নিশ্চেষ্ট হইল। তখন সর্ব্বজ্ঞ দিব্যচক্ষু ভগবান্ বাসুদেব জ্যেষ্টভ্রাতা দেহত্যাগ করিলেন বিবেচনা করিয়া চিন্তাকুলিতচিত্তে সেই বিজন পথে পরিভ্রমণ করিতে করিতে ভূতলে উপবেশন করিলেন।
ব্যাধবাণে আহত কৃষ্ণের অন্তর্দ্ধান
ঐ সময় পূর্ব্বে গান্ধারী তাঁহাকে যাহা কহিয়াছিলেন এবং তিনি উচ্ছিষ্ট পায়স পদতলে লিপ্ত না করাতে দুর্ব্বাসা যে সমুদায় বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলেন, সেই সমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল। তখন তিনি নারদ, দুর্ব্বাসা ও কণ্বের বাক্য প্রতিপালন, তাঁহার স্বর্গগমনবিষয়ে দেবতাদিগের সন্দেহভঞ্জন ও ত্রিলোকপালন করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে মর্ত্ত্যলোক পরিত্যাগ করিতে হইবে, বিবেচনা করিয়া ইন্দ্রিয়সংযম ও মহাযোগ অবলম্বন পূর্ব্বক ভূতলে শয়ন করিলেন। ঐ সময় জরানামক ব্যাধ মৃগবিনাশবাসনায় সেই স্থানে সমাগত হইয়া দূর হইতে যোগাসনে শয়ান কেশবকে অবলোকন পূর্ব্বক মৃগ জ্ঞান করিয়া, তাঁহার প্রতি শর নিক্ষেপ করিল। ঐ শর নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র উহা দ্বারা হৃষীকেশের পদতল বিদ্ধ হইল। তখন সেই ব্যাধ মৃগগ্রহণবাসনায় সত্বরে তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিল, এক অনেকবাহুসম্পন্ন পীতাম্বরধারী যোগাসনে শয়ান পুরুষ তাহার শরে বিদ্ধ হইয়াছেন। লুব্ধক তাঁহাকে দর্শন করিবামাত্র আপনাকে অপরাধী বিবেচনা করিয়া, শঙ্কিতমনে তাঁহার চরণে নিপতিত হইল। তখন মহাত্মা মধুসূদন তাহাকে আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক অচিরাৎ আকাশমণ্ডল উদ্ভাসিত করিয়া স্বর্গে গমন করিলেন।
ঐ সময় ইন্দ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং রুদ্র, আদিত্য, বসু, বিশ্বদেব, মুনি, সিদ্ধ, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণ তাঁহার প্রত্যুদ্গমনার্থ নির্গত হইলেন; তখন ভগবান্ নারায়ণ তাঁহাদের কর্ত্তৃক সৎকৃত হইয়া তাঁহাদের সহিত স্বীয় অপ্রমেয় স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। দেবতা, মহর্ষি, সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা ও সাধ্যগণ তাঁহার যথোচিত পূজা করিতে লাগিলেন; মুনিগণ ঋগ্বেদপাঠ ও গন্ধর্ব্বগণ সংগীত দ্বারা তাঁহার স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন এবং দেবরাজ ইন্দ্র আহ্লাদিতচিত্তে তাঁহার অভিনন্দনে প্রবৃত্ত হইলেন।
Share:

কৃষ্ণের প্রতি শোকসন্তপ্তা গান্ধারীর অভিশাপ

কৃষ্ণের প্রতি শোকসন্তপ্তা গান্ধারীর অভিশাপ
“হে কৃষ্ণ! ঐ দেখ, বৃষভস্কন্ধ দুর্দ্ধর্ষ কাম্বোজরাজ নিহত হইয়া ধূলিশয্যায় শয়ান রহিয়াছেন। উনি পূর্ব্বে কাম্বোজ দেশীয় মহার্হ আস্তরণমণ্ডিত শয্যায় শয়ন করিতেন। ঐ দেখ, উঁহার বনিতা প্রিয়তমের চন্দনচর্চ্চিত বাহুদ্বয় শোণিতলিপ্ত দেখিয়া শোকাকুলিত চিত্তে বিলাপ বাক্যে কহিতেছে, হা নাথ! তোমার এই সুন্দর অঙ্গুলিসমন্বিত বাহুদ্বয় পরিঘ তুল্য ছিল। পূর্ব্বে যখন আমি তোমার এই ভুজদ্বয়ের মধ্যে অবস্থান করিতাম, তখন রতি আমারে এক মুহূর্ত্তও পরিত্যাগ করিত না। এক্ষণে তোমার অভাবে আমার কি গতি হইবে! কাম্বোজরাজমহিষী এই বলিয়া অনাথার ন্যায় মধুর স্বরে রোদন করত বিকম্পিত হইতেছে। ঐ দেখ, কলিঙ্গরাজের উভয় পার্শ্বে সমবস্থিত কামিনীগণ দিব্য মাল্যের ন্যায় আতপতাপিত হইয়াও শ্রীভ্রষ্ট হইতেছে না। ঐ দেখ, মগধদেশীয় রমণীগণ প্রদীপ্তাঙ্গদধারী মগধরাজ জয়ৎসেনের চতুর্দ্দিক্ পরিবেষ্টন করিয়া রোদন করিতেছে। ঐ বিশাললোচনা সুস্বর সম্পন্না রমণীগণের শ্রুতিসুখকর মধুর নিনাদে আমার অন্তঃকরণ বিমোহিতপ্রায় হইতেছে। ঐ কামিনীগণ পূর্ব্বে মহামূল্য আস্তরণমণ্ডিত শয্যায় শয়ন করিত, এক্ষণে উহারা শোকাকুলিত চিত্তে আভরণ সকল ইতস্তত নিক্ষেপ করিয়া রোদন করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইতেছে। ঐ দেখ, কোশলরাজপুত্ত্র বৃহদ্বলের নারীগণ পতিরে পরিবেষ্টন পূর্ব্বক রোদন করিতেছে এবং ব্যাকুল মনে উঁহার হৃদয়গত শরজাল উদ্ধৃত করিতে করিতে বারংবার মূর্চ্ছিত হইতেছে। আতপতাপ ও পরিশ্রমে উহাদিগের মুখমণ্ডল ম্লান হইয়া গিয়াছে। ঐ দেখ, ধৃষ্টদ্যুম্নের সুবর্ণ মাল্যধারী অঙ্গদসমলঙ্কৃত অল্পবয়স্ক আত্মজগণ নিহত হইয়া সমরাঙ্গণে শয়ান রহিয়াছে। উহারা পাবক তুল্য প্রতাপশালী দ্রোণের বাণপথে পতিত হইয়া শলভের ন্যায় নিহত হইয়াছে। ঐ দেখ, রুচিরাঙ্গদধারী কেকয় দেশীয় পাঁচ ভ্রাতা দ্রোণশরে নিহত ও সমরশয্যায় শয়ান হইয়া প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় শোভা পাইতেছেন। উঁহাদের তপ্ত কাঞ্চন নির্ম্মিত বর্ম্ম, বিচিত্র ধ্বজ, রথ ও মাল্যের প্রভাবে সমরাঙ্গন দেদীপ্যমান হইয়াছে। ঐ দেখ, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ অরণ্য মধ্যে সিংহনিপাতিত মত্ত মাতঙ্গের ন্যায় দ্রোণশরে নিহত হইয়া ধরাতলে শয়ান রহিয়াছেন। উঁহার সুনির্ম্মল পাণ্ডুবর্ণ আতপত্র শরৎকালীন নিশাকরের ন্যায় শোভা পাইতেছে। ঐ পাঞ্চালরাজের পুত্ত্রবধূ ও ভার্য্যারা দুঃখিত মনে উঁহার মৃতদেহ দগ্ধ করিয়া দক্ষিণ দিক্ গমন করিতেছে।
“ঐ দেখ, চেদিদেশাধিপতি মহাবীর ধৃষ্টকেতু অসংখ্য শত্রু সংহার পূর্ব্বক স্বয়ং দ্রোণশরে নিহত হইয়া সমরাঙ্গনে শয়ান রহিয়াছেন। বিহঙ্গেরা উঁহার কলেবর ছিন্ন ভিন্ন করিয়াছে। উঁহার ভার্য্যারা রণস্থলে উপস্থিত হইয়া উঁহারে অঙ্কে আরোপণ পূর্ব্বক অনবরত রোদন করিয়া স্থানান্তরিত করিতেছে। ঐ দেখ, উঁহার চারুকুণ্ডলমণ্ডিত মহাবল পরাক্রান্ত আত্মজ দ্রোণশরে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া রণস্থলে নিপতিত রহিয়াছে। ঐ বীর অদ্যাপি স্বীয় পিতারে পরিত্যাগ করে নাই। আমার পৌত্ত্র লক্ষ্মণও ধৃষ্টকেতুর পুত্ত্রের ন্যায় স্বীয় পিতার অনুগমন করিয়াছে। ঐ দেখ, কাঞ্চনাঙ্গদ সমলঙ্কৃত কাঞ্চন বর্ম্মধারী বিমল মাল্যসুশোভিত বৃষভলোচন অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ বসন্তকালে বায়ুবেগবিপাটিত কুসুমপরিশোভিত শালবৃক্ষদ্বয়ের ন্যায় ভূতলে শয়ান রহিয়াছে। হে কৃষ্ণ! পাণ্ডবেরা যখন মহাবীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, কৃপ, দুর্য্যোধন, অশ্বত্থামা, জয়দ্রথ, সোমদত্ত, বিকর্ণ ও কৃতবর্ম্মার হস্ত হইতে বিমুক্ত হইয়াছে, তখন উহারা ও তুমি অবধ্য। ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি মহাবীরগণ শস্ত্রবলে দেবগণকেও বিনাশ করিতে সমর্থ ছিলেন। কিন্তু কালের কি কুটিল গতি! আজি তাঁহারাই নিহত হইয়া সমরাঙ্গনে শয়ান রহিয়াছেন। দৈবের অসাধ্য কিছুই নাই। হে বাসুদেব! তুমি যখন শান্তিস্থাপনে অকৃতকার্য্য হইয়া বিরাট নগরে প্রত্যাগমন করিয়াছিলে, তখনই আমি স্থির করিয়াছিলাম যে, আমার পুত্ত্রগণ নিহত হইয়াছে। তৎকালে মহাত্মা ভীষ্ম ও বিদুর আমারে কহিয়াছিলেন, তুমি আপনার পুত্ত্রগণের প্রতি আর স্নেহ প্রদর্শন করিও না। সেই মহাত্মাদিগের বাক্য কদাপি মিথ্যা হইবার নহে। ঐ দেখ, আমার পুত্ত্রেরা পাণ্ডবগণের রোষানলে ভস্মসাৎ হইয়া গিয়াছে।”
হে মহারাজ! গান্ধারতনয়া এই বলিয়া দুঃখশোকে একান্ত অধীর ও হতজ্ঞান হইয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে ক্রোধভরে বাসুদেবের প্রতি দোষারোপ করিয়া কহিলেন, “জনার্দ্দন! যখন কৌরব ও পাণ্ডবগণ পরস্পরের ক্রোধানলে পরস্পর দগ্ধ হয়, তৎকালে তুমি কি নিমিত্ত তদ্বিষয়ে উপেক্ষা প্রদর্শন করিলে? তোমার বহুসংখ্যক ভৃত্য ও সৈন্য বিদ্যমান আছে; তুমি শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন, বাক্যবিশারদ ও অসাধারণ বলবীর্য্যশালী, তথাপি ইচ্ছা পূর্ব্বক কৌরবগণের বিনাশে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছ। অতএব তোমারে অবশ্যই ইহার ফলভোগ করিতে হইবে। আমি পতিশুশ্রূষা দ্বারা যে কিছু তপঃসঞ্চয় করিয়াছি, সেই নিতান্ত দুর্লভ তপঃপ্রভাবে তোমারে অভিশাপ প্রদান করিতেছি যে, তুমি যেমন কৌরব ও পাণ্ডবগণের জ্ঞাতি বিনাশে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছ, তেমনি তোমার আপনার জ্ঞাতিবর্গও তোমা কর্ত্তৃক বিনষ্ট হইবে। অতঃপর ষট্‌ত্রিংশৎ বর্ষ সমুপস্থিত হইলে তুমি অমাত্য, জ্ঞাতি ও পুত্ত্রহীন এবং বনচারী হইয়া অতি কুৎসিত উপায় দ্বারা নিহত হইবে। তোমার কুলরমণীগণও ভরতবংশীয় মহিলাগণের ন্যায় পুত্ত্রহীন ও বন্ধুবান্ধব বিহীন হইয়া বিলাপ ও পরিতাপ করিবে।”
তখন মহামতি বাসুদেব গান্ধারীর মুখে এই কথা শ্রবণ করিয়া হাস্যমুখে তাঁহারে কহিলেন, “দেবি! আমা ব্যতিরেকে যদুবংশীয়দিগকে বিনাশ করে, এমন আর কেহই নাই। আমি যে যদুবংশ ধ্বংস করিব, তাহা বহুদিন অবধারণ করিয়া রাখিয়াছি। আমার যাহা অবশ্য কর্ত্তব্য, এক্ষণে আপনি তাহাই কহিলেন। যাদবেরা মনুষ্য বা দেব দানবগণের বধ্য নহে; সুতরাং তাঁহারা পরস্পর বিনষ্ট হইবেন।” বাসুদেব এই কথা কহিবামাত্র পাণ্ডবেরা ভীত ও উদ্বিগ্ন হইয়া প্রাণ ধারণ বিষয়ে এককালে হতাশ হইলেন।
Share:

কৃষ্ণের দুর্য্যোধনগৃহে গমন–আতিথ্য প্রত্যাখ্যান । আতিথ্যপ্রত্যাখানের কারণ প্রদর্শন ।বিদুরগৃহে কৃষ্ণের অন্নভোজন


কৃষ্ণের দুর্য্যোধনগৃহে গমন–আতিথ্য প্রত্যাখ্যান
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ভূপাল! মহাত্মা গোবিন্দ এই রূপে স্বীয় পিতৃস্বসাকে আমন্ত্রণ ও প্রদক্ষিণ করিয়া অসামান্য শ্রীসম্পন্ন, পুরন্দরগৃহসদৃশ, বিচিত্রাসনযুক্ত দুর্য্যোধনের গৃহে গমন করিলেন। তিনি দ্বারবান্ কর্ত্তৃক অনিবারিত হইয়া ক্রমে ক্রমে তিন কক্ষা অতিক্রমপূর্ব্বক গিরিশৃঙ্গের ন্যায় সমুন্নত, সুধাধবল, পরম শোভাসম্পন্ন প্রাসাদে আরোহণ করিলেন এবং দেখিলেন, মহাবাহু দুর্য্যোধন বহুল ভূপাল ও কৌরবগণে পরিবেষ্টিত হইয়া মহার্হ আসনে উপবিষ্ট আছেন; দুঃশাসন, কর্ণ ও শকুনি তাঁহার সমীপে অত্যুৎকৃষ্ট আসনে সমাসীন রহিয়াছেন। মহাযশাঃ ধৃতরাষ্ট্রতনয় গোবিন্দকে অবলোকন করিবামাত্র অমাত্যগণ সমভিব্যাহারে আসন হইতে উত্থিত হইয়া তাঁহার অভ্যর্থনা করিলেন। বৃষ্ণিবংশাবতংস বাসুদেব এই রূপে দুর্য্যোধনের সহিত মিলিত হইয়া পরিশেষে বয়ঃক্রমানুসারে সমুদায় ভূপতিগণের সহিত আলাপ করিয়া বিবিধ আস্তরণে আস্তীর্ণ জাম্বূনদময় পর্য্যঙ্কে উপবিষ্ট হইলেন। দুর্য্যোধন তাঁহাকে গো, মধুপর্ক, জল, গৃহ ও রাজ্য সমর্পণ করিলে, অন্যান্য কৌরবগণ তাঁহাকে অর্চ্চনা করিতে লাগিলেন।
অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন কৃষ্ণকে ভোজন করিতে নিমন্ত্রণ করিলে, তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন না। তখন দুর্য্যোধন কর্ণের সমক্ষে শঠতাপূর্ণ হৃদয়ে মৃদুবাক্যে বাসুদেবকে কহিলেন, “হে জনার্দ্দন! এই সমুদায় অন্ন, পান, বসন ও শয়ন আপনার নিমিত্তই আনীত হইয়াছে; আপনি কি নিমিত্ত ইহা গ্রহণ করিতেছেন না? আপনি আমাদের উভয় পক্ষের সাহায্যকারী ও হিতানুষ্ঠানপরায়ণ এবং আমার পিতার আত্মীয় ও দয়িত। আপনি ধর্ম্মার্থের তত্ত্ব যথার্থ রূপে অবগত আছেন; অতএব আপনার নিকট উক্ত বিষয়ের কারণ অবগত হইতে ইচ্ছা করি।”
আতিথ্যপ্রত্যাখানের কারণ প্রদর্শন
মহামতি গোবিন্দ দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণান্তর তাঁহার বিপুল বাহু গ্রহণ করিয়া মেঘগম্ভীর নিঃস্বনে স্পষ্টাক্ষর, অর্থপূর্ণ, হেতুগর্ভ বাক্য কহিতে লাগিলেন, “হে দুর্য্যোধন! দূতগণ কার্য্যসমাধানান্তেই ভোজন ও পূজা গ্রহণ করিয়া থাকে; অতএব আমি কৃতকার্য্য হইলেই আপনার পূজা গ্রহণ করিব।”
(অসম্পূর্ণ)
বিদুরগৃহে কৃষ্ণের অন্নভোজন
(অসম্পূর্ণ)

Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।