• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

তীর্থস্থান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
তীর্থস্থান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৮ মে ২০১৭

পণাতীর্থের উৎপত্তি কথা

No automatic alt text available.হরেকৃষ্ণ! শ্রীঅদ্বৈত প্রভুর জননী শ্রীমতি নাভাদেবীর একবার গঙ্গাস্নানের বাসনা হয়। তিনি শেষরাতে স্বপ্নে দেখেন- তোঁর কোলের শিশুটি চতুর্ভূজ জ্যোতির্ময় সর্বমঙ্গলময় স্বয়ং মহাবিষ্ণু। এরূপ দিব্য দর্শনে শ্রীমতি নাভাদেবী তাঁর স্তবস্তুতি করেন। ঐশ্বর্য ভাবান্বিতা মাতৃদেবীকে তিনি সান্তনা প্রদান করে সমস্ত তীর্থ এনে তাতে তাঁকে স্নান করাবার কথা বলেন। শ্রীমতি নাভাদেবী নিদ্রা ভঙ্গে স্বপ্নের বিষয় স্মরণ করে চিন্তামগ্ন হন। তিনি স্বপ্নের বিষয় প্রথমে অঙ্গীকার করলেও পরে পুত্রের অনুরোধে তা প্রকাশ করে রোদন করতে থাকেন। আমি ‘পণ’ অর্থাৎ প্রতিজ্ঞঅ করে বলছি- তোমার ইচ্ছে পূরণের জন্য আমি আজ রাতে সকল তীর্থকে আনয়ন করব তাতে তুমি স্নান করবে। অদ্বৈত প্রভু রাতেই যোগাবলম্বন পূর্বক তীর্থগণকে আকর্ষন করলে, সমস্ত তীর্থ শ্রীঅদ্বৈত প্রভূর কাছে উপস্থিত হয়ে তাদের আহ্বানের কারণ জিজ্ঞেস করেন। শ্রীঅদ্বৈত প্রভু বলেন- কধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে (মহাবারুণি) তোমরা সকলে এখানে পর্বতোপরি বিহার করবে- সকলে আমার কাছে এই ‘পণ’ করো। গঙ্গা-যমুনাদি সকল তীর্থই শ্রীঅদ্বৈতাচার্য প্রভূর আজ্ঞা স্বীকার করে পর্বতে বিহার করতে থাকেন।
শ্রীদ্বৈতচন্দ্র প্রভাতকালে জননী নাভাদেবীকে বলেন- মা! পর্বতপরি সমস্ত তীর্থ এসেছে, তুমি সেখানে গিয়ে স্নান করো। শ্রীমতি নাভাদেবী কৌতুহলবশত পুত্রসহ সেখানে যান। শ্রীঅদ্বৈতচন্দ্র জননী নাভাদেবীর পাশে দাঁড়িয়ে শঙ্গ-ঘন্টা বাজিয়ে ঊচ্চেঃস্বরে হরিধ্বনি করতে থাকেন। হরিধ্বনি করামাত্রই অঝোরে জলের প্রবাহ পতিত হতে থাকে। শ্রীঅদ্বৈতচন্দ্র তখন বলেন, - দেখ মা তীর্থের জল পড়ছে। এখানে এখন সকল তীর্থ অবস্থান করছে। ঐদেখ মা, মেঘের মতো যমুনার জল তোমাকে ভিজিয়ে ফেলেছে, গঙ্গার পুণ্যসলিলবিন্দু তোমাকে সিক্ত করছে। এভাবে অন্যাণ্য সকল তীর্থরে পূণ্য সলিলরাশি পতিত হতে থাকে। অতি আশ্চর্য এ দৃশ্য দর্শন করে এবং পুত্রের বাক্য শ্রবণে শ্রীমতি নাভাদেবীর বিশ্বাস হয় যে, সত্য সত্যই এখানে তীর্থ সকল এসেছেন। তিনি অত্যন্ত ভক্তিভরে তীর্থসমূহকে প্রণাম করে সেই জলে স্নান করলেন। সেই থেকে এ স্থান ‘পণাতীর্থ’ নামে খ্যাত হয়। শ্রীঅদ্বৈত প্রভু কর্তৃক স্বীয় জননী নাভাদেবীর অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য এবং তীর্থগনের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে (মহাবারুণি) এখানে আবির্ভূত হওয়ার জন্য ‘পণ’ করার কারণেই পণাতীর্থের প্রসিদ্ধি। মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদর্শীতে এখানে মেলা বসে। ঐ পূণ্য স্নানের দিনে অদ্যাপিও লক্ষ-লক্ষ তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়।


 Courtesy by: প্রশ্ন করুন, উত্তর পাবেন। সনাতন ধর্মের হাজারও প্রশ্ন এবং উত্তর
Share:

২৬ ডিসেম্বর ২০১৬

প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

                                               কৈলাশনাথ মন্দির   

১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।





প্রধান মন্দির- নন্দী মন্ডপ-এ লিঙাম অবস্থিত। নন্দী মন্ডপ ১৬ টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে যার উচ্চতা ২৯.৩ মিঃ। নন্দী মডপে একটি বিশাল আকৃতির পাথরের তৈরী হাতি বিদ্যমান। একটি জীবন্ত পাথরের সেতু দ্বারা নন্দী মন্ডপ ও শিব মন্দিরের যোগাযোগ সাধিত হয়েছে। এই স্থাপনাটি তৎকালীন শিল্পীদের প্রতিভার সাক্ষর বহন করে। এই মন্দির তৈরীতে হয় ২,০০,০০০ টন পাথর কেটে, যার জন্য সময় লেগেছিল ১০০ বছর।

ইতিহাসঃ

কৈলাশ নাথ  মন্দিরটির নির্মাতার নাম  শিলালিপিতে না থাকলেও এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে এটি একটি রাষ্ট্রকূটের  রাজা  দ্বারা নির্মান লাভ করেন ।সাধারণত রাষ্ট্রকূটের রাজা কৃষ্ণকে এর নির্মাতা মনে করা হয়  দুটি লিপির  উপর ভিত্তি করে,   যেটায় মন্দিরের সাথে  "কৃষ্ণরাজা" এর (IAST Kṛṣṇarāja) (৭৫৬-৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ)সংযোগ দেখা যায় ।

কর্করাজা-২ ( গুজরাটের একটি  শাখা রাষ্ট্রকূটের শাসক) এর বরোদা তাম্রলিপিতে (৮১২-৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ) বর্তমান গুজরাটের একটি গ্রামে অনুদান দেবার কথা উল্লেখ আছে।  এটায় কৈলাশ নাথের  পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কৃষ্ণরাজার নাম এবং ইলোপুরা (ইলোরা) নামে একটি শিব মন্দিরেরও উল্লেখ আছে ।এটায় বলা ছিল যে, রাজা একটি বিষ্ময়কর মন্দির নির্মান করান যা দেখে দেবতা ও নির্মান শিল্পীরাও আশ্চর্য হয়ে গেলেন ।  অধিকাংশ পন্ডিত মনে করেন যে, এটি একটি তথ্যসূত্র কৈলাসনাথ শিব মন্দিরের ইলোরায় ।

কৈলাস মন্দিরের বৈশিষ্ট্যগুলোয় একাধিক স্বতন্ত্র স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শৈলীর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । মন্দিরের এই অপেক্ষাকৃত বৃহৎ আকার ও সম্বিলিত গঠনের কারনে , কিছু পণ্ডিতগন  মনে করেন একাধিক রাজাদের রাজত্বকালে এটি নির্মান হয়েছে। কিছু মন্দিরের নির্মান শৈলী একই রকম দশাবতর গুহায় পরিলক্ষ্যিত হয় যা মন্দিরের পাশে অবস্থিত।দশাবতার গুহায় একটি শিলালিপি রয়েছে যেখানে কৃষ্ণরাজার পূর্বসূরীগন ও ভাতিজা দন্তিদূর্গার (৭৩৫-৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)কথা উল্লেখ রয়েছে ।H. Goetz (১৯৫২) অনুমান করেন, রাজা দন্তিদূর্গার সময় এটি নির্মান কাজ শুরু হয় এবং রাজা কৃষ্ণ তা প্রথম শেষ করেন যেটি বর্তমান মন্দির থেকে অনেক ছোট ।



                                                      ইলোরা গুহাসমূহ



ইলোরা ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আওরঙ্গবাদ শহর থেকে ৩০ কিমি (১৮.৬ মাইল) দূরে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রাষ্ট্রকুট রাজবংশ এই নিদর্শনের স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেছিল। এখানে রয়েছে প্রচুর স্মৃতি সংবলিত গুহার সারি। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে।
ভারতের শিলা কেটে কোন কিছু তৈরি করার প্রাচীন প্রতিরূপ স্থাপত্যটি এখানে অণুসৃত হয়েছে। এখানে মোট ৩৪টি গুহা রয়েছে যেগুলো চরনন্দ্রী পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে খনন করে উদ্ধার করা হয়েছে। গুহাগুলোতে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মের মন্দিরের স্বাক্ষর রয়েছে। ৫ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে এই ধর্মীয় স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়েছিল। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের ১২টি হিন্দু ধর্মের ১৭টি এবং জৈন ধর্মের ৫টি মন্দির রয়েছে। সব ধর্মের উপাসনালয়ের এই সহাবস্থান সে যুগের ভারতবর্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন বহন করে। ইলোরা –কে ভেলুরা অথবা এলুরা বলা হয়। এটি প্রাচীন এলাপুরা নামের বিকৃত শব্দ। 

ইতিহাসঃ

ইলোরা গুহা মন্দির কালাচুরি, চালুক্য ও রাষ্ট্রকুট শাসনামলে তৈরী হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। নবম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকুটের শাসনামলে তৈরী হয় জগন্নাথ সভা (পাচটি জৈন মন্দিরের সমষ্টি)


০১। বৌদ্ধ গুহাসমূহঃ
                                             এই গুহাসমূহ খ্রিস্টাব্দ ৫ম-৭ম শতাব্দীতে স্থাপিত হয়। ধারণা করা হয় যে, বৌদ্ধ গুহাসমূহ প্রাথমিক স্থাপনারগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। প্রথম পর্যায়ে ১-৫ নাম্বার গুহা (৪০০-৬০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬-১২ নাম্বার গুহা (মধ্য ৭ম-মধ্য ৮ম খ্রিস্টাব্দ)। কিন্তু বর্তমানে এইটা আধুনিক বিশেষজ্ঞদের কাছে এইটা নিশ্চিত যে, হিন্দু গুয়া ( ২৭, ২৯, ২১, ২৮, ১৯, ২৬, ২০, ১৭ এবং ১৪ নাঃ গুহা) এর আগে তৈরী। সর্বপ্রথম স্থাপিত বৌদ্ধ গুহা ৬ নাম্বার গুহা ডান পাশের ৫, ২, ৩, ৫ এবং ৪, ৭, ৮, ১০ ও ৯ নাঃ ব্লক। আর সর্বশেষ স্থাপিত গুহা হল ১১ ও ১২ নাঃ গুহা। সকল বৌদ্ধ গুহা স্থাপিত হয় ৬৩০-৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।

এই বিশাল স্থাপনাটি বেশিরভাগ বিহার ও মঠের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে বড়, পাহাড়ের হায়ে খোদাইকৃত বহুতল ভবন (বাসস্থান, শোবার ঘর, রান্নাঘর এবং অন্যান্য কক্ষ) বিদ্যমান। এই স্থাপনার কিছু গুহাতে পাহাড়ের গায়ে খোদাইকৃত গৌতম বুদ্ধ, বৌদিসত্তব ও পন্ডিতদের প্রতিমা সংবলিত মন্দির বিদ্যমান।

সবচেয়ে বিখ্যাত বৌদ্ধ গুহা হল ১০ নাম্বার গুহা, একটি চৈত্য হল (চন্দরশালা) অথবা ভিশভাক্রাম গুহা, যা “কারপেন্টার’স কেভ” ('Carpenter's Cave') নামে সর্বাধিক পরিচিত। এই গুহাটিতে অনেকটা গির্জার মত একটি বিশাল হল বিদ্যমান যার নাম চৈত্য, যার ছাদ এমন ভাবে খোদাইকৃত যে দেখতে অনেকটা কাঠের বিমের মত। এই গুহার ঠি মধ্যখানে একটি ১৫ ফুট লম্বা আসনকৃত বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। অন্যান্য বৌদ্ধ গুহার মধ্যে ১-৯ নাঃ গুহা হল মঠ এবং দো-তাল (১১ নাম্বার গুহা) ও তিন-তাল (১২ নাম্বার গুহা) তিনতলা ।


০২। গুহা-১০ঃ
                        গুহা-১০ একটি বিহার যার আট ক্ষুদ্র কক্ষ বিশিষ্ট। যার চারটি ক্ষুদ্র কক্ষ সামনের দেয়ালের সাথে লাগানো বাকি চারটি ক্ষুদ্র কক্ষ পেছনের দেয়ালের সাথে লাগানো। এই গুহার সামনে একটি ক্ষুদ্র কক্ষসহ খোদাইকৃত স্তম্ভ আছে। সম্ভবত এই গুহাটি অন্যান্য বিহারের সরবরাহকৃত খাদ্য ভান্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হত।

০৩। বিশ্বকর্মাঃ
                               বৌদ্ধ গুহাসমূহের মধ্যে বিশ্বকর্মা একমাত্র চৈত্য গৃহ। এই গুহা স্থানীয়ভাবে বিশ্বকর্মা বা সুতার কা ঝপদা (Sutar ka jhopda/ carpenter's hut) নামে ডাকা হয়। এই গুহার নকশা দেখতে অনেকটা অজন্তা গুহাসমূহের মন্দিরের ১৯ ও ২৬ নাম্বার গুহার মত। ৭০০ খ্রিস্টাব্দতে এই গুহা স্থাপিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। চৈত্য গুহায় একসময় একটি বড় দেয়াল ছিল, যা বর্তমানে নেই। এই গুহার প্রধান হল একটি চক্রাকারে তৈরী এবং এর চারপাশে অষ্টভূজাকৃতির ২৮ স্তম্ভ বিদ্যমান।

০৪। হিন্দু গুহাঃ

হিন্দু গুহাসমূহ স্থাপিত হয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে অষ্টম শতাব্দীর শেষ সময়ের মধ্যে। প্রাথমিক গুহাসমূহ (১৭-২৯ নাম্বার গুহা) তৈরী হয় কালাচুরির শাসনামলে। সর্বপ্রথম নির্মান করা হয় ২৮, ২৭ ও ১৯ নাম্বার গুহা। এই গুহাগুলো নির্মাণ করা হয় প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ২৯ ও ২১ নাম্বার গুহার নির্মানের কৌশল অবলম্বন করে। ১৪, ১৫ ও ১৬ নাম্বার গুহা তৈরী হয় রাষ্ট্রকূটের শাসনামলে। সকল স্থাপনা বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও সুচারু দক্ষতার পরিচায়ক। কিছু কিছু স্থাপনা এতটাই জটিল যে এর নির্মাণকাজ সমাপ্ত করতে কয়েক বংশপরাম্পরা পরিকল্পনা ও পরিচালনার প্রয়োজন হয়েছিল।



                                                    
                                                                                                 নৃত্যরত অবস্থায় শিব (১৬ নাম্বার গুহা)

০৫। দশাবতারঃ
দশাবতার (১৫ নাঃ গুহা) প্রাথমিকভাবে ছিল বৌদ্ধ মন্দির। এই মন্দিরটির গঠনগত দিক থেকে ১১ ও ১২ নাম্বার গুহার সাথে সাদৃশ্য আছে। দেয়ালের খিলান থেকে মেঝের উপরের অংশের একটি বিশাল স্থাপত্য কলা বিদ্যমান যা বিভিন্ন দৃশ্য দিয়ে সাজানো। এই দৃশ্যের মধ্যে বিষ্ণুর দশাবতার চেহারা অন্তর্ভুক্ত আছে।




                                           
                   একটি দেয়াল খোদাই শিল্প, শিবের সাথে কল্যাণাসুন্দ্রার বিবাহ এবং পার্বতী


০৬। অন্যান্য হিন্দু মন্দিরঃ  অন্যান্য উল্লেখযোগ্য হিন্দু মন্দিরগুলো হল রামেশ্বর (২১ নাম্বার গুহা), যার প্রবেশদ্বারের সম্মুখে গঙ্গা ও যমুনা মূর্তি খচিত। ধুমুর লিনা (২৯ নাম্বার গুহা) যা দকেহতে অনেকটা মুম্বাইয়ের নিকটে অবস্থিত এলিফ্যান্ট দ্বীপের গুহার মত। অপর দুইটি মন্দির হল, রাভন কি খাই (১৪ নাম্বার গুহা) এবং নীলকণ্ঠ (২২ নাম্বার গুহা) যেখানে অনেক স্থাপত্যের নিদর্শন বিদ্যমান। অন্যান্য হিন্দু গুহাগুলো হল, কুম্ভারব্দা (২৫ নাম্বার গুহা) এবং গোপেলিনা (২৭ নাম্বার     গুহা), এতে তেমন উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন নেই।                                                                                               ২১ নাম্বার গুহা




০৭। জৈন গুহাঃ 
                            ইলোরা মোট পাচটি জৈন গুহা আছে যা খ্রিষ্টীয় নবম থকে দশম শতাব্দীর মধ্যে স্থাপিত। এর সবগুলো গুহা ডিঘাম্বরা’র সাথে সম্পর্কযুক্ত। জৈন গুহাগুলো জৈন দার্শনিক ও ঐতিহ্যের ধারক। এই গুহাগুলো কঠোর তপস্যার অনুভূতির প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু এসব এখন অন্যান্য গুহার তুলনায় তেমন বৃহৎ নয়। কিন্তু এসব গুহা বিভিন্ন শিল্পকলার পরিচয় বহন করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জৈন মন্দিরগুলো হল ছোট কৈলাশ (৩০ নাম্বার গুহা), ইন্দ্র সভা (৩২ নাম্বার গুহা) এবং জগন্নাথসভা (৩৩ নাম্বার গুহা)। ৩১ নাম্বার গুহাও জৈন গুহা কিন্তু এটি একটি অসমাপ্ত চার স্তম্ভবিশিষ্ট্য হল এবং একটি মন্দিরের সমন্বয়ে গঠিত। ৩৪ নাম্বার গুহাটি আয়তনে ছোট যা ৩৩ নাম্বার গুহার বামদিকে অবস্থিত। অন্যান্য ভক্তিমূলক খোদাইচিহ্ন, একটি স্থান যার নাম সামভতস্বর্ণ যা ইলোরায় বিদ্যমান। সামভতস্বর্ণ জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি বিশেষ স্থান।

০৮। ইন্দ্রসভাঃ
                       ইন্দ্র সভা (৩২ নাম্বার গুহা) দ্বীতলবিশিষ্ট গুহা যাতে একটিমাত্র পাথর কেটে তৈরী মন্দির বিদ্যমান। এর ছাদের দেয়ালে অপূর্ব সুন্দর করে কাটা পদ্মফুল বিদ্যমান।

০৯। অন্যান্য জৈন গুহাঃ

অন্যান্য জৈন গুহাগুলোও জটিল শিল্পকলায় পরিপূর্ণ। অনেক স্থাপনার ছাদ খুবই উচ্চমানের ছবি সংবলিত, যার অনেকগুলো অংশ এখনো বিদ্যমান।

ইলোরার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যঃ

ইলোরা ওয়েস্টার্ন ঘাটের সমতল ভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রাচীন আগ্নেয়গিরি কর্মকান্ডের ফলে এই এলাকায় বিভিন্ন স্তরে গঠিত, যা ডেকান ফাদ (Deccan Traps )নামে পরিচিত। ক্রেটাচিয়াসের সময়, একটি আগ্নেয়গিরি ইলোরা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে গঠিত হয়েছিল।

ইলোরা বিভিন্ন খোদাইচিহ্ন

ইলোরায় খ্রিস্টাব্দ ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর অনেক খোদাইচিহ্ন বিদ্যমান। তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল রাষ্ট্রকুট দান্তিদুর্গা (৭৫৩-৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ) যা ১৫ নাম্বার গুহার মন্ডপের পেছনের দেয়ালে খোদাইকৃত। এটি খোদাই করা হয় রাষ্ট্রেকুটের বিজয়ানন্দে। কৈলাশ মন্দিরের খোদাইচিহ্নগুলো খ্রিস্টাব্দ ৯-১৫ শতাব্দীর মধ্যে অঙ্কিত। জৈন গুহার জগন্নাথসভায় তিনটি খোদাইচিহ্ন আছে। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত পার্সভান্ত মন্দিরে একাদশ শতাব্দীর একটি খোদাইচিহ্ন আছে। মহা কৈলাশ (১৬ নাম্বার গুহা) কৃষ্ণা (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৭-৮৭ খ্রিস্টাব্দ) দিগ্বিবিজয়ী এবং দান্তিদুর্গার কাকা তার সম্মানার্থে তৈরী হয়। কার্কা II (খ্রিস্টপূর্ব ৮১২-১৩খ্রিস্টাব্দ)  এর অনুদানে ইলোরার একটি পাহাড়ে মহান স্মৃতিচিহ্ন খোদাইকৃত একটি তামার থালা স্থাপিত হয়। অজন্তা গুহার ন্যায়, ইলোরা গুহাসমূহ কখনো ধ্বংসের সম্মুখীন হয় নি। বিভিন্ন লেখা ও ভ্রমণকাহিনী থেকে পাওয়া যায় যে, ইলোরায় নিয়মিত পরিদর্শন করা হত। তার মধ্যে প্রথমে লেখা পাওয়া যায় আরব ভূতত্ত্ববিদ আল-মাসা’উদি, যা লেখা হয় খ্রিস্টাব্দ দশম শতাব্দীতে। ১৩৫২ সালে সুলতান হাসাব বাহ্মী, যিনি এই স্থানে কিছুকাল অবস্থান করেন ও পরিদর্শন করেন। অন্যান্যের মধ্যে ফিরিশ্তা, থেভেনট (১৬৩৩-১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দ), নিকালো মানাউচি (১৬৫৩-১৭০৮ খ্রিস্টাব্দ), চার্লস ওয়্যার ম্যতালেট (১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ), এবং সেলী (১৮২৪ খ্রিস্টাব্দ)।

অন্যান্য ছবিঃ

১। কৈলাশ মন্দিরে পাথর খচিত স্তম্ভঃ

০২। একটি পাথরের সেতু নন্দী মন্ডপ ও ও প্রধান মন্দিরের যোগাযোগ রক্ষা করেছেঃ


০৩। কৈলাস স্তম্ভে খোদাইচিহ্নঃ


০৪। ইলোরা গুহার খোদাইশিল্প

০৫। সিতার পুকুর (Sita ki Nahani)

০৬। অম্বিকা মূর্তি, ৩৪ নাম্বার গুহা


Share:

১১ জুলাই ২০১৬

ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের সূর্য মন্দির



ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের এই সূর্য মন্দিরকে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য ইউনেসকো বিশ্ব সভ্যতার একটি উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে । উড়িষ্যায় পুরী ও ভুবনেশ্বরের কাছে বঙ্গোপসাগরের বেলাভূমিতে ১৩ শ শতকে পূর্ব-গঙ্গা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ নরসিংহ দেব সূর্য দেবতার আরাধনার জন্য এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন ।এই মন্দির তার অভিনব আকার,বিশালত্ব আর কারুকার্যের জন্য ভারতের সপ্তমাশ্চর্যের অন্যতম । তামিল শব্দ কোণ আর সংস্কৃত শব্দ অর্ক মিলে কোনার্ক শব্দটির সৃষ্টি । উড়িষ্যা ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে নির্মিত মন্দিরটি ধূসর বেলে পাথরে বিশাল একটি রথের আকারে গড়া হয়েছে । সমুদ্র থেকে উঠে আসা সূর্যদেবের বিশাল রথ,তার সামনে রয়েছে সাত জোড়া ঘোড়া । বারো জোড়া বিশাল চাকার ওপর পুরো মন্দিরটি নির্মিত ।চাকার কারুকার্য দর্শকদের জন্য একটি প্রধান আকর্ষণ । প্রতিটি চাকা একেকটি সূর্যঘড়ি ।চাকার ভেতরের দাঁড়গুলো সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা। এখনো নিখুঁতভাবে সময় জানা যায় এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে ।মন্দিরের প্রবেশ পথেই রয়েছে বিশাল দুটি সিংহের মূর্তি যারা লড়াই করছে দুটি রণহস্তীর সঙ্গে ।

Written by :  জয় রায়
Share:

২৭ নভেম্বর ২০১৫

ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরের মন্দির

ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর। একদা কলিঙ্গ রাজধানী ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভুবনেশ্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতীত ইতিহাসের সাক্ষী মন্দিরগুলিই প্রধান আকর্ষণ। পাঁচশোরও বেশি মন্দির আছে মন্দিরনগরী ভুবনেশ্বরে। এরমধ্যে উল্লেখ্য- সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত পরশুরামেশ্বর মন্দির, অষ্টম শতকে তৈরি বৈতাল মন্দির, দশম-একাদশ শতকে গড়ে ওঠা মুক্তেশ্বর মন্দির। এরই সমসাময়িক রাজারানি, ব্রহ্মেশ্বর এবং লিঙ্গরাজ মন্দির। মন্দিরগুলির গায়ের ওড়িশি ভাস্কর্যের অপরূপ শিল্পকলা দর্শককে মুগ্ধ করবে।
১০০০ খ্রীষ্টাব্দে রাজা ললাট কেশরী লিঙ্গরাজ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বিশাল এই মন্দিরপ্রাঙ্গণে একসময় ১০৮টি মন্দির ছিল। মূল মন্দিরের উচ্চতা ১৬৫ফুট। মন্দির প্রাঙ্গণটির দৈর্ঘ্য ৫২০ ফুট ও প্রস্থ ৪৬৫ ফুট। গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি চক্রাকার লিঙ্গরাজ মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার তিনটি। কলিঙ্গ স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী মন্দিরটি বিমান, জগমোহন, নাটমন্দির ও ভোগমন্দিরে এই চারঅংশে বিভক্ত। মন্দির ও প্রাচীরের গাত্র ফুল, লতাপাতা প্রভৃতি সূক্ষ্ম কারুকার্য মন্ডিত। মন্দিরমধ্যে গণেশ, কার্তিক, পার্বতীর মূর্তি রয়েছে।
মন্দিরের কাছেই বিন্দু সরোবর। এই সরোবরকে ঘিরে গল্পকথা রয়েছে। পার্বতীর তৃষ্ণা মেটানোর জন্য শিব সমস্ত নদনদীর কাছে অনুরোধ করেন বিন্দু বিন্দু জল দেওয়ার জন্য। সেই বিন্দু বিন্দু জল থেকেই এই সরোবরের সৃষ্টি। কথিত আছে, এই সরোবরে স্নান করলে সর্বপাপ মুক্ত হওয়া যায়। চন্দনযাত্রার সময় লিঙ্গরাজ এই সরোবরে স্নান করেন।
বিন্দু সরোবরের পূর্বপাড়ে অনন্ত বাসুদেব মন্দির। প্রাচীন এই বিষ্ণুমন্দিরটি সম্ভবত ১২৭৮-এ অনঙ্গ ভীমদেবের কন্যা চন্দ্রাদেবী নির্মাণ করেন। মন্দিরের কারুকার্য দেখার মতো।
সিদ্ধারণ্য বা সিদ্ধঅরণ্যটি একসময়ে আম্রকানন বলে পরিচিত ছিল। এখন কেদারগৌরী বা গৌরীকুন্ডের প্রস্রবণটি পুণ্যপুকুর নামে খ্যাত। এখানে রয়েছে নবম শতকে তৈরি মুক্তেশ্বর মন্দিরটি। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মিশ্র প্রভাবের ভাস্কর্যে গড়া দেবমূর্তিগুলো দেখার মতো। এখানে সিদ্ধেশ্বর মন্দিরে গণেশের দন্ডায়মান মূর্তিটি অসাধারণ। মুক্তেশ্বরের বিপরীতে ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দে তৈরি পরশুরামেশ্বর মন্দির। কেদারেশ্বর মন্দিরটি ষষ্ঠ শতকের। কেদারেশ্বরে দুধগঙ্গার জলে নানা ব্যাধির উপশম হয় বলে বিশ্বাস।
সিদ্ধারণ্যের কাছে সুন্দর এক বাগিচার মধ্যে রাজারানি মন্দির। একাদশ শতাব্দীতে তৈরি সূক্ষ্ম কারুকার্য মন্ডিত এই মন্দির ৫৮ ফুট উঁচু। দেওয়ালে, থামে, কুলুঙ্গিতে নানা দেবদেবী, সুন্দরী নারীমূর্তির বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছোট ছোট কাজ দেখার মতো। কথিত আছে, রাজা উদ্যত কেশরী তাঁর রানির ইচ্ছেয় এই মন্দির গড়েন, নাম দেন রাজারানি।

Written by :  Prithwish Ghosh
Share:

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫

মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী ।  পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।


এই শহরের সূচনা সেই গান্ধার যুগে এবং এখানেই রয়েছে প্রাচীন গান্ধারি শহর তক্ষশীলার পুরাতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। প্রাচীন তক্ষশীলা শহর ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং বর্তমান সময়েও উক্ত ধর্মদুটির ঐতিহ্যে এ স্থানটির একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৮০ সালে বেশকিছু এলাকাসহ তক্ষশীলাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষনা করা হয়। গার্ডিয়ান পত্রিকা ২০০৬ সালে এটিকে পাকিস্তানের শীর্ষ পর্যটন স্থান হিসেবে নির্বাচিত করে।
তক্ষশীলার বৌদ্ধবিহার
তক্ষশিলায় প্রাপ্ত মূর্তি
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত খ্রিষ্টপূর্ব- ২০০-১০০ অব্দের তক্ষশীলার মুদ্রা

 হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে— দশরথের পৌত্র এবং ভরত গান্ধার দেশ জয় করে নিজের পুত্র তক্ষের নামানুসারে তক্ষশীলা ও পুষ্কলের নামানুসারে পুষ্কলাবতী নগর স্থাপন করেন । মহাভারতের মতে এই স্থান গান্ধারের অন্তর্গত। রাজা জনমেজয় এই নগরীতে সর্পযজ্ঞ করেছিলেন। এই নগরীর ভগ্নাবশেষ এখনও বর্তমান।



কিংবদন্তীতে রয়েছে, তক্ষ একটি রাজ্য শাসন করতেন যার নাম ছিল তক্ষ খন্ড এবং তিনিই তক্ষশীলা নগরের প্রতিষ্ঠা করেন। দামোদর ধর্মানন্দ কসামবি প্রবর্তিত অন্য একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, তক্ষশীল নামটি তক্ষক শব্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত যা ছুতার বা সূত্রধর শব্দের সংস্কৃতরূপ এবং এই শব্দটি প্রাচীন ভারতের নাগা জনগোষ্ঠীর অপর একটি নাম। এই জাতির নামানুসারে এই স্থানের নামকরণ করা হয়েছিল তক্ষখণ্ড। কালক্রমে তক্ষখণ্ড নামটি তক্ষশীলা নামে পরিবর্তিত হয়।


খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০-৪৬৫ অব্দের ভিতরে পারশ্যে রাজারা এই অঞ্চলে অনেকগুলো সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ঐতিহাসিক প্লিনির মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০-৫৩০ অব্দের ভিতরে পারশ্য সম্রাট কাইরাস ভারতে কয়েকবার আক্রমণ করেন এবং কপিশা নগরী দখল করতে সমর্থ হন। আরিয়ান নামক অপর একজন ঐতিহাসিকের মতে- কাইরাস কাবুল ও সিন্ধু নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল দখল করে নেন এবং এই অঞ্চল থেকে কর আদায় করতেন। কাইরাসের তৃতীয় উত্তরসূরী সম্রাট প্রথম দারায়ুস খ্রিষ্টপূর্ব ৫২২ অব্দ থেকে ৪৮৬ অব্দের ভিতরে গান্ধার, সিন্ধু-উপত্যাকা এবং পাঞ্জাব দখল করেন। এরপর জারেক্সিস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৬ অব্দ পর্যন্ত এই অঞ্চলের উপরে আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হন। এই সময় এই অঞ্চলের অন্যান্য এলাকার সাথে তক্ষশিলাও পারসিকদের অধিকারে ছিল।খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৫ অব্দের দিকে চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন তক্ষশীলা পরিদর্শন করেন এবং এই স্থানকে অত্যন্ত পবিত্র এলাকা হিসাবে উল্লেখ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দেআলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হয়ে তক্ষশিলায় প্রবেশ করেন। এই সময় তক্ষশিলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে তক্ষশিলায় অভ্যর্থনা করেন। এরপর অভিসার জাতির নেতাও আলেকজান্ডারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে। এরপর আলেকজান্ডার তক্ষশিলা থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ঝিলম নদী পার হয়ে পুরুর রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। আলেকজান্ডারের ভারত ত্যাগের আগে ঝিলম ও বিপাশা নদীর মধ্যাভাগের অঞ্চল পুরুকে এবং সিন্ধু ঝিলম নদীর মধ্যভাগের অঞ্চল অম্ভির কাছে ছেড়ে দেন। এরপর চন্দ্রগুপ্তের গুরু এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌটিল্যের (চাণক্য) পৃষ্ঠপোষকতায় তক্ষশিলায় রাজত্বের পত্তন করেন চন্দ্রগুপ্ত। কালক্রমে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বিশাল রাজত্বের অধিকারী হন। চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পুত্র বিন্দুসারে কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর, তক্ষশীলাবাসী রাজশক্তির অত্যাচরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিন্দুসারে নির্দেশে তাঁর যুবরাজ অশোক তক্ষশীলার বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দের দিকে অশোক রাজত্ব লাভ করেন। তখন মৌর্য রাজাদের রাজধানী ছিল পাটালীপুত্র। কিন্তু তক্ষশিলা বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। অশোক পাটালিপুত্র থেকে তক্ষশিলার ভিতরে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেন।

খ্রিষ্টাপূর্ব ১৮৫ অব্দের দিকে শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করেন তাঁর সেনাপতি পুষ্যমিত্র। এই সময় মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের আত্মীয় যজ্ঞসেন বিদর্ভের স্বাধীন রাজা হিসাবে ঘোষণা দেন। পুষ্যমিত্রের সাথে যজ্ঞসেনের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হলে, যজ্ঞসেন পরাজিত হন। পরে যজ্ঞসেনের দুই আত্মীয়ের ভিতর বিদর্ভরাজ্যকে ভাগ করে দেওয়া হয়। পুষ্যামিত্রের রাজত্বকালে গ্রিকরা তাঁর রাজ্য আক্রমণ করলে, গ্রিকরা পরাজিত হয়। পুষ্যামিত্র বৌদ্ধধর্ম-বিদ্বেষী ছিলেন। ফলে তাঁর সময় তক্ষশীলা গুরুত্ব হারাতে থাকে। অনেকে মনে করেন এই সময় তক্ষশীলারা বৌদ্ধ-স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৯ অব্দে পুষ্যামিত্র পরলোক গমন করার পর, তাঁর পুত্র অগ্নিমিত্র বিদিশার ক্ষমতা দখল করেন এবং বিদর্ভরাজকে পরাজিত করেন। অগ্নিমিত্রের পর পর এদের উত্তরপুরুষরা রাজত্বের সমৃদ্ধিকে বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। এই বংশের শেষ সম্রাট সুমিত, মুলাদেব নামক এক আততায়ীর হাতে নিহত হন। এরপর এই অঞ্চলে শুঙ্গবংশের রাজত্ব শুরু হয়। এই রাজবংশের রাজত্বকালে গ্রিকরা তক্ষশীল দখল করে নেয়। এরপর শকদের কাছে গ্রিকরা ক্ষমতা হারায় এবং তক্ষশিলা শকদের অধীনে চলে যায়। এপর শকদের উৎখাত করে ভারতে আধিপত্য বিস্তার করে কুষাণ রাজবংশ। কুষাণদের রাজ্য বিস্তারের সময় তক্ষশীলা ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী সময় কুষাণ রাজবংশের শাসনমলেই তক্ষশিলা আবার তার পুরানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে থাকে। কালক্রমে তক্ষশীলা বৌদ্ধদের বিহার ও শিক্ষাকেন্দ্রে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। বৌদ্ধ রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে, হিন্দু রাজারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তশালী হয়ে উঠে। বৌদ্ধধর্ম-বিদ্বেষী রাজাদের দ্বারা তক্ষশীলা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এছাড়া পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-ছাত্র হীন কাঠামোতে পরিণত হয়। এবং তক্ষশীলা জন-পরিত্যাক্ত নগরীতে পরিণত হয়। ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে তক্ষশীলায় সর্বশেষ আক্রমণটি আসে হুনদের পক্ষ থেকে। এরপর পুরো তক্ষশীলা ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়:

ব্যবেলিয়ন, গ্রীস, সিরিয়া, পারস্য, আরব, চীন সহ পৃথীবির বিভিন্ন দেশ থেকে বিদ্যা লোভী ছাত্ররা এখানে এসে ভীড় করত প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা,  এবড়ো থেবড়ো অমসৃন পথের দুঃসহ যন্ত্রনা ও যাত্রা পথে মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে উচ্চ শিক্ষার হিরন্ময় সাফল্য লাভের আসায়।
তক্ষশীলায় যাওয়া আসার তিনটি প্রধান পথ খোলা ছিল সেসময়-
উত্তরা পথঃ ভারত বর্ষের তৎলালীন মগধের রাজধানী পাটালিপুত্র হয়ে গান্ধারা রাজ্যে প্রবেশ করেছিল।
উত্তর-পশ্চিমা পথঃ বেকট্রিয়া, কেপিসা হয়ে পুষ্কালাভাটি। অর্থাৎ এই পথটি বর্তমানে গ্রীক, ইরান, চীন উজবেকস্থান, আফগানিস্থান হয়ে পেশোয়ারে প্রবেশ করেছিল।
সিন্ধু পথঃ কাশ্মির, শ্রীনগর, পাকিস্তানের খাইবার পাক্তুনখোয়া, হরিপুর উপত্যকা, চীন হয়ে মধ্য এশিয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত।
এই সব যাত্রা পথের বিপদ, ক্লান্তি ও দুঃস্বপ্নকে জয় করে তক্ষশীলায় দেশী বিদেশী ছাত্র সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০,৫০০ ছাত্রদের লেখা-পড়া, থাকা-খাওয়া বাবদ প্রচুর পয়সা গুনতে হত তক্ষশীলায়। বয়স কম পক্ষে ১৬ বা তার চেয়ে বেশী বয়সের শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তির সুযোগ দেয়া হত। তবে শর্ত ছিল তাদের অবশ্যই নিজ নিজ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার অধ্যায়টি শেষ করে এসে তক্ষশীলায় পড়ার উপযুক্ততা প্রমান দিতে হবে। নগদ পয়সা ছাড়াও সোনা দানা জমা দিয়েও পড়ার ব্যবস্থা ছিল। পড়াশুনার খরচ বাবদ ধনী ছাত্রদের কাছ থেকে অগ্রিম ১০০০ মুদ্রা বা কম বেশী অর্থ জমা নেওয়া হত। মেধাবী অথচ হত দরিদ্রদের বিশেষ ছাড় দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। নিয়ম এত কঠোর ছিল রাজার ছেলে হয়েও যোগ্যতা প্রমানে ব্যর্থ হলে তক্ষশীলায় পড়ার কোন প্রকার সুযোগ দেয়া হত না। ছাত্রদের যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের পছন্দসই বিষয় পড়ার সুযোগ থাকত। ভেদাস, ভাষা, ব্যাকরন, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, ধনু বিদ্যা, রাজনীতি, যুদ্ধ বিদ্যা, জ্যোতিঃশাস্ত্র, হিসাব বিজ্ঞান, গনিত, অর্থনীতি, গান, নাচ, হস্তশিল্প, ইত্যাদি বিষয় সহ এখানে কোর্সের সংখ্যা ছিল ৬০ ঊর্ধ। কোর্স চলাকালীন সময় শিক্ষক যদি মনে করেন তাঁর কোন ছাত্র ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ার উপযুক্ত নয় বা কোন কারনে উপযুক্ততা হারিয়েছে সেক্ষেত্রে শিক্ষক চাইলে তাকে  বিদায় করার ক্ষমতা রাখতেন। প্রায় প্রত্যেকটা পাঠ্য বিষয়ের মেয়াদ ছিল ৮ বছর ব্যাপি। দিনের সাথে সাথে রাতের বেলায়ও শিক্ষক ছাত্রের বিদ্যা দান ও গ্রহনের অপূর্ব কোলাহলে চঞ্চল থাকত এই শিক্ষানিকেতন।
আধুনিক কালের এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা যুগের সূচনার আগে মানুষের জীবন রক্ষায় একমাত্র ভরসা ছিল গাছ-পালা, কান্ড, ফল-মূলের নির্যাস দিয়ে তৈরী ঔষধ। চিকিৎসা শাস্ত্রে যা ভেষজ বা আয়ুর্বেদ নামে পরিচিত। বর্তমানে অবশ্য তা হারবাল চিকিৎসা নামে সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে। তক্ষশীলা ছিল ভেষজ ও শৈল্য চিকিৎসা বিদ্যার প্রাণ কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন রোগের কারন ও প্রতিকার নিয়ে চলত দিন রাত গবেষনা। রোগ যন্ত্রনা নিয়ন্ত্রন ও মানুষেয় দীর্ঘ আয়ু লাভের প্রচেষ্টায় বছরে বছরে উৎপাদন করা হত প্রচুর চিকিৎসক। তাদের অনেকে নিজ সৃষ্টি কর্মের যোগ্যতা, প্রতিভা ও নিরলস প্রচেষ্টায় স্থান দখল করে উজ্জ্বল হয়ে আছেন প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা ইতিহাসের পাতা জুড়ে।
সাফল্যের সাথে কোর্স শেষে কোন প্রকার সনদ প্রদানের ব্যবস্থা সে আমলে গড়ে না উঠলেও শিক্ষা শেষে ছাত্ররা নিজ নিজ দেশে ফিরে আসলে মর্যাদা পেত বরেণ্য পন্ডিত ব্যক্তি রূপে। কোন ছাত্র তার শিক্ষা খরচ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে গুরু গৃহের কৃষিকাজ, পানি আনা, আগুনের জন্য শুকনো কাঠ জোগাড় করা সহ বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজ করে তা শোধ করার রেওয়াজ ছিল তক্ষশীলায়।
সেই সময় সম্ভবত নারীদের উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন অবকাঠামো তৎলালীন সমাজে গড়ে উঠেনি। তক্ষশীলায় নারী শিক্ষার কোন প্রমান এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য পণ্ডিতবর্গ:


০১. চাণক্য (অর্থনীতিবিদ):

তক্ষশীলা ও চাণক্য যেন ছাপানো মুদ্রার এপিট ওপিট। তক্ষশীলা নিয়ে কোন কথা উঠলেই যেমন চাণক্যর নাম আসে অবধারিত ভাবে তেমনি চাণক্যর জীবনী তক্ষশীলাকে বাদ দিয়ে আলোচনা করলে তা হবে অসম্পূর্ন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রখর মেধা, বাস্তববাদী ও অসাধারন পান্ডিত্যের অধিকারী এই মহা পুরুষ টির শিক্ষা-দীক্ষা ও কর্ম জীবনের প্রথম অধ্যায়টি কাটে তক্ষশীলায়।তিনি তক্ষশীলার রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে আচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন অনেক দিন।

ব্রাহ্মন পরিবারে জন্ম নেয়া মহাপুরুষটির পিতা মাতার দেয়া নাম ছিল “বিষ্ণুপদ”। “কূটিলা গোত্র” থেকে এসেছেন বলে গোত্র নামকে অক্ষয় করতে “কৌটিল্য” ছদ্ম নামে লেখেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “অর্থশাস্ত্র”। নামে “অর্থশাস্ত্র” হলেও মূলত তা ছিল রাজ্য শাসন ও কূটনৈতিক কলা কৌশল বিষয়ক সুপরামর্শ।“অর্থশাস্ত্র”র মোট ভাগ ১৫ টি। গ্রন্থে মোট শ্লোক সংখ্যা ৬০০০ রাষ্ট্র বিজ্ঞান, শত্রু দমন, রাজস্ব, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন, প্রভৃতি রাষ্ট্র ও জন কল্যান মূলক বিষয় নিয়ে এই ১৫টি ভাগ গঠিত। খ্রীষ্ট পূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে “চানকা” গ্রামে জন্ম নেওয়ায় বিষ্ণুপদ “চানক্য” নামে ব্যাপক পরিচিতি পান। আবার কোন কোন ইতিহাসবিদদের ধারনা পিতার নাম “চানক” অনুসারে তাঁর নাম হয় “চাণক্য”।

মগধ রাজা “ধনানন্দ”র রাজসভা থেকে বিতাড়িত হয়ে “চাণক্য” ও দাসী “মুরা”র গর্ভে জন্ম নেওয়া “ধনানন্দ”র সৎভাই রাজ্য থেকে বিতারিত “চন্দ্রগুপ্ত” দুজনে মিলে অপমানের প্রতিষোধ নিতে গড়ে তোলেন এক বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনী। যা নন্দ বংশের রাজা “ধনানন্দ”কে শেষ পর্যন্ত পরাজিত করে গোড়াপত্তন করেন ইতিহাসখ্যাত “মৌর্যবংশ”।

০২. পাণিনি (ব্যাকরণবিদ, অষ্টাধ্যায়ী নামক ব্যাকরণের রচয়িতা):

গান্ধারা রাজ্যের “শালাতুর” বর্তমান লাহোরে জন্ম নেয়া পাণিনি তক্ষশীলা বিশ্ব বিদ্যালয়ের আরেক মহান সৃষ্টি। তাঁর জন্ম সন নিয়ে প্রচুর মতানৈক্য আছে ইতিহাসবিদদের মাঝে। তিনি “অষ্টাধ্যায়ী” নামক সংষ্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা হিসাবে বেশ সুপরিচিত। এই গ্রন্থে তিনি সংষ্কৃত রূপমূলতত্ত্বের ৩৯৫৯টি নতুন নিয়ম যোগ করেন। “অষ্টাধ্যায়ী” প্রাচীন সংষ্কৃত ভাষায় রচিত ব্যাকরণগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত। পাণিনি তাঁর ব্যাকরণে শব্দের উৎপত্তি, ধ্বনি তত্ত্ব, বর্ণমালা, উচ্চারণ, সন্ধির নিয়ম কানুন বিজ্ঞান সন্মত করে উপস্থাপন করে গেছেন অত্যন্ত সাবলীল ভাবে।
পণি বা পাণিন হল একটি গোত্রের নাম। গোত্রের নামানুসারে তাঁর নাম হয় “পাণিনি” তাঁর পিতার নাম ছিল শলঙ্ক।তাই পণিনির আরেক নাম “শালাঙ্কি”। তাঁর মা ছিলেন দক্ষ জাতির কণ্যা। তাই অনেকে আবার তাঁকে “দাক্ষিপুত্র” নামেও অভিহত করেন।
০৩. চরক (চিকিৎসক, চরক সংহিতা নামক আয়ুর্বেদ-গ্রন্থের রচয়িতা): 

২০০ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করা চরক চিকিৎসা শাস্ত্রে তক্ষশীলার আরেক বিস্ময়কর অবদান। যোগ সাধনা চর্চার জন্য অনেকে আবার তাকে চরক মুনি বা ঋষি হিসাবে ডেকে থাকেন। তাঁর অনেক অনুসারী ছিল। ছিলেন কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্র “চরক সংহিতা” রচনা করে।
আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে এই বই এনে দিয়েছে বৈপ্লবিক ছোঁয়া। প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয় এই “চরক সংহিতা”এই গ্রন্থে তিনি ৫০০ ঔষধের বর্ননা লিপি বদ্ধ করেছেন।
চরক-সংহিতায় মতে “তাকেই বলে ভেষজ যাতে হয় আরোগ্য”।
চরক ও সুশ্রম্নত সংহিতায় উল্লেখ আছে কাঁচা আমলকির রসের সাথে ২/১ কোয়া রসুন বাটা খেলে যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়। অতএব আর দেরি নয়, কোন রকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনাও একেবারে শুন্যের কোঠায়। দীর্ঘ যৌবন প্রত্যাশীরা যৌবন ধরে রাখতে শেষ চেষ্টা চালিয়ে দেখতে পারেন একবার।
০৪. জীবক (শৈল্য চিকিৎসক, গৌতমবুদ্ধের চিকিৎসক):

তক্ষশীলার শৈল্য চিকিৎসা বিদ্যায় জীবক ছিলেন আরেক অনন্য সৃষ্টি। ইতিহাসবিদদের মতে তার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৬ থেকে ৪৮৬ অব্দের কোন এক সময়ে। তিনি প্রায় ৭ বছর তক্ষশীলায় চিকিৎশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। তিনি ছিলেন মগধ রাজ্যের অধিপতি রাজা বিম্বিসার ও বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। জীবক ছিলেন বুদ্ধের সমসাময়িক এবং প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের আরেক নক্ষত্র আত্রেয়-এর সেরা শিষ্য। তিনি শরীর ও শল্য উভয় বিদ্যায় সমানে দক্ষতা অর্জন করেন। রোগীর নাড়ী পড়ার অপূর্ব ক্ষমতা রাখতেন তিনি। ছিলেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। জটিল অপারেশনেও তাঁর ক্ষমতা ছিল বলে শোনা যায়। রোগ নির্ণয় এবং তার প্রতিষেধক নিয়ে জীবক লিখিছিলেন অসংখ্য গ্রন্থ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাশ্যপ-সংহিতা।
ছাত্রবস্থায় চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর প্রজ্ঞা নিয়ে একটি গল্প চালু আছে তা হলো- তক্ষশীলার জনৈক শিক্ষক তার ছাত্রদের একটি বাগানে নিয়ে বলেন সেখান থেকে গুন হীন উদ্ভিদ খুঁজে বের করতে। শুরু হল খোজা খুজির প্রতিযোগীতা কিন্তু জীবক বাদে অন্য শিষ্যরা তাদের মতে নির্গুণ উদ্ভিদ হাত বোঝাই করে এনে তুলে দেন গুরুর হাতে। কিন্তু জীবক অনেক খোজা খুজি করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এলেন ভগ্ন হৃদয়ে শুন্য হাতে। ফিরে এসে তাঁর শিক্ষককে জানালেন তিনি এমন কোনো উদ্ভিদ খুঁজে পাননি যার ভেতরে কোন না কোন গুণ নেই। শিক্ষক যারপরনাই খুশি হয়ে বলল্লেন একমাত্র জীবকের শিক্ষাই সম্পূর্ণ হয়েছে।
এছাড়াও রাজা প্রসেনজিত, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, মোহালির মত আরো অসংখ্য ইতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রাত-দিন নীরব নিভৃতে সুনিপুন ভাবে তৈরী করে গেছে এই মহান প্রতিষ্ঠানটি।
চাণক্য, আত্রেয়, বিষ্ণু শর্মা, নাগার্জুনের মত ইতিহাস খ্যাত প্রথিযশা জ্ঞান তাপস পন্ডিত ব্যক্তিদের শিক্ষক রূপে পেয়ে তক্ষশীলার সুখ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল অনতিক্রম্য উচ্চতায়, দ্রুত নজর কেড়েছিল বিশ্ব দরবারে। তক্ষশীলার খ্যাতির পরশ গ্রিক সেনাপতি আলেকজেন্ডারকে এতটাই তন্ময় করেছিল তিনি তক্ষশীলা দখল করার পর সাথে করে কিছু শিক্ষক তার সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাচীন শিল্প সভ্যতায় উন্নত গ্রীক সভ্যতাকে আরো গতিশীল করার মানসে।
ছাত্রদের সুশিক্ষা, পন্ডিত শিক্ষকদের সৎ,মানবিক, সুস্থ চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ শুধু বাক সর্বস্ব ছিল না, তার প্রয়োগিক চর্চা করতেন তাদের ব্যবহারিক জীবনে। আমারা তার ঐতিহাসিক প্রমান পাই আলেকজেন্ডারের আগ্রাসী আক্রমনে যখন গৃহ, সহায়-সম্বল, ভিটা-মাটি অর্থ-বিত্ত সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচতে তক্ষশীলার কোলে আশ্রয় নেয়। এই অনাকাঙ্খিত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কি করা উচিত তা নিয়ে তক্ষশীলার রাজা এক পরামর্শ সভার আয়োজন করে। সে সভায় তক্ষশীলার শিক্ষক মন্ডলি এই সব উদ্বাস্তু লোকদের তক্ষশীলায় ভূমি দানে তাঁদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা, শিল্প, সভ্যতাকে প্রগতির পক্ষে পরিচালিত করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে উৎপত্তি বিলয়ের জাগতিক ব্যতয়হীন নিয়ম রক্ষার্থে বোধহয় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদী পারস্য, গ্রীক, রোমান, শক, কুষান, আক্রমণ। এই সব আক্রমনে সৃষ্ট অস্থির রাজনৈতিক ঘোর অন্ধকার পরিমন্ডলে আগুয়ান অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিরাপত্তাহীনতার দুশ্চিন্তায় ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে শুরু করে শিক্ষক ও ছাত্র সংখ্যা। ৪৫০ খ্রীষ্টাব্দে সর্ব শেষ আক্রমণটি আসে হুন দের পক্ষ থেকে। এভাবে বার বার সাম্রাজ্যবাদীর হিংস্র থাবার কবলে পড়ে ধীরে ধীরে মৃত্যু গ্রাস করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ব বিদ্যালয়টিকে। স্তব্দ হয় তার পথ চলা। শোকের মাতমে যেন অব্যবহৃত ইট সুড়কির দালান কোঠা গুলোতে ধুলোর আস্তর ঢেলে স্মৃতি সমাধি তৈরী করে প্রকৃতি নিজের হাতেই।

সূত্র:
ভারতের ইতিহাস। অতুলচন্দ্র রায়/প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।
বাংলা বিশ্বকোষ। দ্বিতীয় খণ্ড। নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা। ডিসেম্বর ১৯৭৫।
 এবং মুক্তমনা বল্গ হতে ।

ছবিঃ নিরঞ্জন হাওলাদার ও উইকিপিডিয়া হতে


Share:

১৮ জুলাই ২০১৫

শ্রীজগন্নাথ পুরী (পর্ব ০২)

জগন্নাথ পুরীর আরেক নাম হল ‘শ্রীক্ষেত্র’ । শ্রী শব্দের অর্থ শ্রীদেবী বা লক্ষ্মীদেবী, যিনি ভগবান শ্রীবিষ্ণুর স্বরূপশক্তি । যে ভূমিখন্ড শ্রীশক্তির প্রভাবান্বিত, সেই ক্ষেত্র শ্রীক্ষেত্র নামে প্রসিদ্ধ ।
শ্রীদেবী শ্রীমতি রাধারাণীর অংশপ্রকাশ । যেসব ভক্তগণ মাধুর্যরসাশ্রিত, মাধুর্য রসে যারা ভগবানের আরাধনা করেন, তাদের মতানুসারে এ ক্ষেত্র সর্বোচ্চ স্তরে সেবাভাব প্রকটিত করেছেঃ মাধুর্য এবং ঔদার্য ।
শ্রীক্ষেত্র বা উৎকল ৪ ভাগে বিভক্ত, যা ভগবান বিষ্ণুর শ্রীহস্তধৃত ৪ টি অস্ত্রের দ্যোতক । এ ৪ ক্ষেত্র শঙ্খক্ষেত্র (পুরী শহর), পদ্মক্ষেত্র (কোণার্ক), চক্রক্ষেত্র (ভুবনেশ্বর) এবং গদাক্ষেত্র (যাজপুর) নামে খ্যাত । সমগ্র ক্ষেত্রমন্ডল দশ যোজন পরিধি বিশিষ্ট ।
ঐ দশ যোজন পরিধির মধ্যে অবস্থিত পুরী শঙ্খক্ষেত্র নামে বিদিত, কারণ পুরীর পরিধি শঙ্খের ন্যায় আকার-বিশিষ্ট । পুরীক্ষেত্র পাচ ক্রোশ পরিমাণ আয়তন বিশিষ্ট, এবং মধ্যে তিন ক্রোশ মহাসাগরের নীচে নিমজ্জিত, দুই ক্রোশ স্থলভূমি । পুরীর ভূভাগ স্বর্ণাভ বালুকারাশি দ্বারা আবৃত এবং এক নীলাভ পর্বত বা নীলাচল দ্বারা শোভিত । শ্রীক্ষেত্রের অন্তর্গত চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে এ শঙ্খক্ষেত্র অত্যন্ত বিশিষ্ট, কেননা এখানে পরমপুরুষ ভগবান স্বয়ং মহাদধি বা মহাসাগরের তীরে নীল পর্বত, নীলাদ্রির উপরে তার অর্চা-বিগ্রহ স্বরূপে বিরাজ করছেন । ভগবান বলেছেন যে, এ স্থান অতি সংগুপ্ত, এমনকি ব্রহ্মার কাছেও ।
স্কন্দপুরানে লক্ষ্মীদেবী বলেছেন
পঞ্চক্রোশং ইদং ক্ষেত্রং সমুদ্রান্ত ব্যবস্থিতম্ ।
দ্বি ক্রোশং তীর্থ রাজস্য তটভূমৌ সুনির্মলম্ ।।
সুবর্ণবালুকাকীর্ণং নীল পর্বত শোভিতম্ ।
যোহসৌ বিশ্বেশ্বরো দেবঃ সাক্ষান্নারায়ণাত্মকম্ ।।
“এ ক্ষেত্র পঞ্চক্রোশ পরিমিত আয়তন বিশিষ্ট এবং সমুদ্রতীরে অবস্থিত । এই পঞ্চক্রোশের মধ্যে দ্বিক্রোশ পরিমিত স্থলভাগ সমুদ্রতট ভাগে অবস্থিত এবং সুনির্মল, অতি পবিত্র । এ স্থান স্বর্ণবর্ণ বালুকারাশি সমাবৃত এবং নীলপর্বত দ্বারা সুশোভিত । সাক্ষাৎ নারায়ণ এখানে বিশ্বেশ্বর রূপে বিরাজিত রয়েছেন ।”
এই শ্রী মন্দির বা জগন্নাথ মন্দির পাহারা দেওয়ার কাজ শিব ও হনুমানকে দিয়েছিল গত পোষ্টে আমরা কানপাতা হনুমানের কাহিনী বর্ণনা করেছিলাম আজকে আমরা আলোচনা করব বর্গী হনুমানের…
বর্গী হনুমান
জগন্নাথ মন্দিরের পশ্চিম দিকে লোকনাথ রোডে বর্গী হনুমান মন্দির অবস্থিত । পূর্বে বর্গীরা (মহারাষ্ট্রের এক জনজাতি) এই পথ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যেত, এর ফলে শ্রীমন্দিরে ও পুরীর মানুষদের মধ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি হত । এই বর্গীরা হনুমানের ভক্ত, সেজন্য তাদের পুরী প্রবেশ বন্ধ করতে এই অঞ্চলে একটি হনুমান মূর্তি মন্দিরে স্থাপন করা হয় ।
বর্গীরা হনুমান মূর্তি অতিক্রম করে যেতে অনিচ্ছুক ছিল, সেজন্য এইভাবে মহারাষ্ট্রের দুর্ধর্ষ বর্গীদের আক্রমণ থেকে পুরী রক্ষা পেয়েছিল ।
Share:

১১ জুলাই ২০১৫

তক্ষশীলার পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দির

তক্ষশীলা পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।

এই শহরের সূচনা সেই গান্ধার যুগে এবং এখানেই রয়েছে প্রাচীন গান্ধারি শহর তক্ষশীলার পুরাতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। প্রাচীন তক্ষশীলা শহর ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং বর্তমান সময়েও উক্ত ধর্মদুটির ঐতিহ্যে এ স্থানটির একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।
১৯৮০ সালে বেশকিছু এলাকাসহ তক্ষশীলাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষনা করা হয়। কিন্তু সন্ত্রাসী এই রাষ্ট্রটির অবহেলায় তক্ষশীলার ঐতিহ্য আজ মলিন ।
ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন তক্ষশীলার একটি হিন্দু মন্দির ।
Share:

৩০ জুন ২০১৫

কামাখ্যার সংক্ষিপ্ত কাহিনী


নরকাসুর এর ঘটনা কামরূপের আধ্যাত্মিক উপাখ্যানের সাথে জড়িয়ে আছে। ভগবান নারায়ন যখন বরাহ অবতার ধারন করেন তখন ধরিত্রী দেবীর সাথে মিলনে নরক অসুরের জন্ম হয়। নরক প্রথমে সৎ উত্তম চরিত্রের একজন ব্যাক্তি ছিল।সে সময় কামরূপ কিরাত দের দ্বারা পরিচালিত ছিল। রাজা ছিলেন কিরাত রাজ ঘটক।ধরিত্রীর আশীর্বাদে নরক কিরাত দের যুদ্ধে পরাস্ত ও ঘটক কে বধ করে নিজেই কামরূপের রাজা হন। ভগবান বিষ্ণু, বিদর্ভ রাজ্যের রাজকন্যা মায়ার সাথে, নরকের বিবাহ দিয়ে কিছু আদেশ করেন পুত্রকে। যথা ----
-
‘মহাদেবীং মহামায়াং জগম্মাতরম্বিকাম ।
কামাখ্যাং ত্বং বিনা পুত্র নান্যদেবং যজিষ্যসি ।।
ইতোহন্যথা ত্বং বিহরণ্ হতপ্রানো ভবিষ্যসি ।
তস্মান্নরক যত্নেন সময়ং প্রতিপালয়।।‘ --- (কালিকাপুরান, অষ্টত্রিংশ অধ্যায়, ৪৪-১৪৫)
-
অর্থাৎ- দ্বার প্রান্তে তোমার পুত্র লাভ হইবে । ইতিমধ্যে দেবতা ও ব্রাহ্মণ বিরোধী হবে না এবং আসুরী প্রবৃত্তি প্রদর্শন করবে না। জগত মাতা মহামায়া কামাখ্যা দেবী ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করবে না, অন্যথায় গতপ্রান হবে ।
পুরান মতে নারায়নের নির্দেশ পালন করে নরক অসুর সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগ শাসন করল। অপরদিকে শোনিতপুরের রাজা বলি পুত্র বানের সাথে নরকের বন্ধুত্ব হল। বান ছিল অসুর, কথায় বলে ‘অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। তাই হল, কূট বানের সাথে মিশে নরক অসৎ হল। কামাখ্যা পূজা ত্যাগ করলো, ব্রাহ্মণ হত্যা করতে লাগলো, স্বর্গ দখল করে নিল। স্বর্গ হারা দেবতা গণ প্রজাপতির কাছে নিজেদের দুঃখের কথা বিবরণ করলে প্রজাপতি জানালেন তোমরা মহামায়ার বন্দনা করো। ভগবতী দেবতাদের প্রার্থনায় সাড়া দিলেন। কালিকাপুরান মতে একদিন মহর্ষি বশিষ্ঠ কামাখ্যা দর্শনে যাচ্ছিলেন। সে সময় নরক অসুর তাকে বাঁধা দান করলেন। এতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বশিষ্ঠ অভিশাপ দিলেন – ‘তুই যতদিন জীবিত থাকবি, ততদিন জগতমাতা কামাখ্যা দেবী সপরিবারে অন্তর্ধান করুন।’
বশিষ্ঠের অভিশাপে নরকের কাল সময় নির্ধারিত হল। এরপর দেবী মহামায়া কামাখ্যামোহ বিস্তার করে নরকাসুরকে ভ্রমিত করলেন।ভগবান বিষ্ণু সৃষ্টি রক্ষার্থে নিজ পুত্র নরককে সংহার করলেন। নরকের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ভগদত্ত কামরূপের রাজা হ’ন। ভগদত্তের বংশ লোপ হলে কামরূপ রাজ্যের পরাক্রম হ্রাস পায়। পরে বিশ্বকর্মা দ্বারা স্থাপিত মন্দির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেই পবিত্র, যোনিমুদ্রা, কুন্ড গাছগাছালীতে ঢেকে যায়। পর্বতে হিংস্র জন্তু দের আস্তানা হয়ে ওঠে। স্থানীয় আদিবাসী গণ ঐ জঙ্গলে ঢাকা কুন্ডে পশু পক্ষী বলি দিয়ে পূজা করতো, গবাদি পশু হারালে ঐ কুন্ডে দুগ্ধ দিয়ে মানত করলে- মানত ফলে যেতো।
এরপর বহু পড়ে কোচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ এই পীঠ উদ্ধার ও মন্দির নির্মাণ করেন। কামরূপ অভিযান কালে কোচ (কোচবিহার রাজ বংশ) নরপতি রাজা বিশ্বসিংহ দেবীর এই পীঠ উদ্ধার ও মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। আহোম রাজার সাথে যুদ্ধ চলার সময় একদিন তিনি ও তাঁর ভাই শিবসিংহ মূল সৈন্য দল থেকে পৃথক হয়ে পড়েন এবং তাঁরা দুজন ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে এই পর্বতে জঙ্গলে ঢাকা কুন্ডের সামনে এসে উপস্থিত হন। তারা জানতেন না সেটি দেবী পীঠ। উভয়ে দেখলেন সামনে এক বৃদ্ধা পূজা করছেন। দুইজন গিয়ে সেই বৃদ্ধার কাছে জল চাইলেন।
বৃদ্ধা বললেন - ‘সামনের ঝর্না থেকে জল পান করো।’
জল পান করে এসে রাজা বিশ্বসিংহ ও তাঁর ভাই শিবসিংহ জানতে চাইলেন এই মৃত্তিকা স্তূপের সামনে কার পূজা করছেন?
বৃদ্ধা জানালো- ‘ইনি দেবী, এখানে যে যা প্রার্থনা ব্যক্ত করে- দেবী তাঁর সেই ইচ্ছাই পূর্ণ করেন, এর অন্যথা হয় না।’
শুনে রাজা বিশ্বসিংহ মনে মনে প্রার্থনা করলেন -- তিনি যেনো তাঁর হারানো সেনাদলকে ফিরে পান। তাঁর রাজ্য যেন নিষ্কণ্টক হয়। মহারাজ সেখানে প্রতিশ্রুতি দিলেন প্রার্থনা পূর্ণ হলে তিনি এখানে সোনার মন্দির ও নিত্য পূজোর ব্যবস্থা করবেন। বৃদ্ধা জানালেন, দেবীকে ছাগাদি বলি, সিঁদুর, গন্ধ, পুস্প, রক্তবস্ত্র, অলংকার দ্বারা পূজা করতে হয়। যাই হোক, মহাদেবী ভবানী কামাখ্যা রাজার ইচ্ছা পূর্ণ করলেন, রাজার বাসনা পূর্ণ হল।
অপর একটি জনশ্রুতি অনুসারে – একদিন রাজা বিশ্বসিংহ ঐ স্থানে এসে ঐ কুন্ডের মাহাত্ম্য শুনলেন। তিনি ভাবলেন পরীক্ষা করে দেখা যাক সত্যই এই কুন্ডে ইচ্ছা পূরনের কোন শক্তি আছে কিনা। এই ভেবে তিনি তার আঙুলের একটি হীরক আংটি ঐ কুন্ডে ফেলে মনে মনে বললেন- ‘যদি কাশীতে গঙ্গা তে আমি এই আংটি ফেরত পাই, তবেই দেবীর মহিমা মানবো।’ এই ঘটনার পর একদা তিনি কাশীধামে গিয়ে তর্পণ কালে ঐ আংটি পুনরায় ফেরত পেলেন। তিনি ঐ কুন্ডের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে আরও জানার জন্য পণ্ডিত দের একটি বিচারসভা বসালেন। পণ্ডিত গণ শাস্ত্র ঘেটে জানালেন যে, ঐ স্থানে দেবী সতীর যোনিদেশ পতিত হয়েছে এবং দেবী সেখানে কামাখ্যা রূপে বিরাজিতা। এই শুনে মহারাজ সেখানে মন্দির নির্মাণে অগ্রসর হলেন।
রাজার আদেশে লোকজন লেগে কাজে নেমে পড়লো। জঙ্গল পরিষ্কার করে কুন্ড উদ্ধারের সময়, বিশ্বকর্মা স্থাপিত মন্দিরের ভিত উদ্ধার হল। যোনীমুদ্রা সহ মূল পীঠ আবিস্কৃত হল। রাজা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন সোনায় মুড়ে মন্দির বানাবেন। কিন্তু অত সোনা পাওয়া মুস্কিল।তাই কেবল ইট দ্বারা মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা হল। কিন্তু প্রতি দিন মন্দিরের ইট খসে খসে পড়তে লাগলো। একদা রাজা বিশ্বসিংহ কে স্বপ্নে মা দেখা দিয়ে বললেন – ‘হে রাজন।কি প্রতিজ্ঞা করেছিলে মনে কর, সোনার মন্দির করবে বলেছিলে- তা কি বিস্মৃত হয়েছ?’ রাজা গদগদ হয়ে বলল --- ‘মা সন্তানের অপরাধ ক্ষমা কর। এত স্বর্ণ কোথায় পাবো?’ মা জানালেন- ‘চিন্তার কিছু নাই। প্রতি ইষ্টকে এ এক রতি করে সোনা দিবে।’ রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই মতো মন্দির নির্মাণ করলেন। অসমের শুয়ালকুচি গ্রামের ব্রাহ্মণদের পুরোহিত হিসাবে নিযুক্ত করা হল। মন্দির স্থাপনার পর প্রতিষ্ঠা ও নিত্য পূজার ব্যবস্থা করা হল। বর্তমানে সে বংশানুক্রমিক ভাবে সেই পুরোহিতগণই মায়ের নিত্য পূজা করেন। এই স্থানে তন্ত্র, পুরান আলোচনা হতে লাগলো। সাধুরা এখানেই তন্ত্র সাধনা করতে লাগলেন।সেই সব শাস্ত্রের জীর্ণ লিপি এখনও আসামের কিছু স্থানে পাওয়া যায়, কিছু গৃহে দেখা যায়।
১৫৩৪ খ্রীঃ রাজা বিশ্বসিংহের মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর পুত্র মল্লদেব ‘নরনারায়ণ’ নাম নিয়ে কোচবিহারের রাজ সিংহাসনে বসেন। রাজা নরনারায়ণ নিজ ভ্রাতা শুক্লধ্বজ কে ‘চিলারায়’ নাম দিয়ে কোচ রাজ্যের সেনাপতি পদে নিযুক্ত করেন। এরপর দুভাই মিলে রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করতে উদ্যোগী হন। ১৫৪৬ খ্রীঃ তারা আহোম রাজ খোরাকে পরাজিত করেন। অপর দিকে তখন গৌড় বঙ্গে ছিল মুসলিম শাসন। নসরৎ শাহের পুত্র ফিরোজ শাহ তখন বাংলার শাসনকর্তা। ১৫৩৮ খ্রীঃ শের খাঁ জোর করে গৌড় দখল করে নেন। আহোম রাজ্যের সাথে যখন কোচ রাজা নরনারায়ণ যুদ্ধে মগ্ন তখন ১৫৫৩ খ্রীঃ কালাপাহাড় কামরূপ আক্রমণ করেন। দেশে রাজা নেই, ফলে কালাপাহাড় বাধাহীন ভাবে একের পর এক মন্দির, মূর্তি, দেবালয় ধ্বংস করে এগিয়ে গেলো। এরপর তার কোপ পড়লো কামাখ্যা মন্দিরে।কালাপাহার কামাখ্যা মন্দিরে উপরিভাগের অনেক প্রাচীন মূর্তি ও স্থাপত্য ধ্বংস করলেন। অন্যত্র যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় কোচ রাজা নরনারায়ণ এই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেন নি। এখনও কামরূপে গেলে কালাপাহারের হাতে ভাঙ্গচুর হওয়া মূর্তির ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। মহারাজ নরনারায়ণ ও চিলারায় অনেক স্থান বিজয় করে রাজ্যে এসে কালাপাহারের কীর্তি কলাপ দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে মুসলিম রাজ্য গৌড় আক্রমণ করেন। যুদ্ধ জয়ের আগে চিলারায় কামাখ্যা মন্দিরে এসে ভগ্ন অবস্থা দেখে মন্দির সংস্কারের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। কামাখ্যা দেবীর কাছে যুদ্ধে জয়ের আশীর্বাদ চাইলেন। এই সময় তিনি মন্দিরের পুরোহিত কেন্দুকেলাই ঠাকুরকে কোন কারনে অপমান করে চলে যান।কেন্দুকেলাই ঠাকুর খুব বড় মাপের ভক্ত পূজারী ছিলেন। তিনি যখন আরতি করতেন মা নিজে এসে দেখা দিতেন, নৃত্য করতেন।অপরদিকে চিলারায় বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে গৌড়ের বাদশা সোলেমানের নিকট পরাজিত ও বন্দী হলেন। একদা কারাবন্দী চিলারায়কে মা কামাখ্যা স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন- “কাল নবাবের মাকে সর্পে দংশন করবে, এতে নবাব এর মাতার জীবন সংশয় উপস্থিত হবে, আমার কৃপায় তুমি তাকে বাঁচিয়ে তুলবে।” ঠিক তাই হল। পরদিন নবাবের মাকে সাপে কাটলো। কত ওঝা, বৈদ্য, হাকিম, কবিরাজ ডাকা হল।সকলের চেষ্টাই বিফল হল।নবাবের মা জীবনের শেষ সীমানায়। তখন চিলারায় জানালো, একবার চেষ্টা করে দেখা যাক।চিলারায় কে নবাবের মাতার সামনে নিয়ে আসা হল। চিলা রায় কামাখ্যা মায়ের কাছে প্রার্থনা জানালেন। মা কামাখ্যা নবাবের মাকে সুস্থ করে জীবন ফিরিয়ে দিলেন।
এর পর নবাব, চিলারায়ের কাছে অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকট করলেন। নবাবের মা চিলারায়কে নিজ পুত্রের মতো স্নেহ করলেন।নবাব সোলেমান, চিলারায়ের সাথে ভাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে সসম্মানে মুক্তি দিলেন। রাজ্যে ফিরে এসে কোচ নৃপতি নরনারায়ণ আর চিলারায় মিলে মন্দির সংস্কারে ব্রত হলেন। ১৫৫৫-১৫৬৫ খ্রীঃ মধ্যে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। শুভ দিনে পূজার জন্য রাজা নরনারায়ণ তাঁর পত্নী রানী ভানুমতী, আর চিলারায় তাঁর পত্নী চন্দ্রপ্রভাকে নিয়ে নীল পর্বতে গমন করলেন। শাস্ত্র মতে পূজা সুসম্পন্ন হল। প্রচুর দান করা হল। রাজা অনেক জমি দেবীর সেবার জন্য দান করলেন।সেবাইত দান করে তাঁদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করলেন।এছাড়া নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু সেনা রেখে গেলেন।
কেন্দুকেলাই ঠাকুরের অনেক ভক্তি। মা নিজে এসে ঠাকুরকে দেখা দিতেন, ভোগ খেতেন, আরতির সময় নাচতেন, দরজা বন্ধ করে কেন্দুকেলাই ঠাকুর মায়ের আরতি করতেন, বাইরে ঢাক, দামামা, ঢোল, শঙ্খ, কাঁসর , ভেরী , তুরী বাজতো, ভেতরে ঠাকুর আরতি করতেন, কেউ বাঁধা দিতো না। বাইরের লোক মাঝে মাঝে কেবল ভেতর থেকে ভেসে আসা নূপুরের ধ্বনি শুনতেন। কেউ উঁকিঝুঁকি মারার দুঃসাহস দেখাতো না। যারা সরল মনের ছিলেন তাঁরা কেন্দুকেলাই ঠাকুরকে খুব ভালোবাসতেন। বিপদে আপদে ঠাকুরের কাছে যেতেন।ঠাকুরের কথা মা শুনতেন। অনেক মৃতপ্রায় লোক মায়ের কৃপায় সুস্থ ও আরোগ্য জীবন লাভ করতো।আর কুটিল মানুষ বিশেষত কিছু পুরোহিত আর রাজ কর্মচারী কেন্দুকেলাই ঠাকুরকে মোটেও সহ্য করতে পারতো না, নানা অপবাদ দিতো, ভণ্ড বলে গালাগালি করতো। একবার ঠাকুরকে ‘চোর’ বদনাম দেওয়াও হয়েছিল। মায়ের কৃপায় ঠাকুর সেই অপবাদ থেকে মুক্তি পান। তিনি যে নির্দোষ – প্রমানিত হয়। কালে কালে কোচ রাজাও ঠাকুরের কিছুটা বিরোধী হয়ে ওঠেন। কারন কুচক্রী পুরোহিত আর রাজ কর্মচারীরা সমানে ঠাকুরের নামে নানান কথা বানিয়ে বানিয়ে রাজার কান ভরতে লাগলেন। রাজা নরনারায়ণ কোনরূপ সত্যতা যাচাই না করে সেই কুটিল মানসিকতা সম্পন্ন লোকেদের কথা বিশ্বাস করতে লাগলেন।
একদা নরনারায়ণ কামাখ্যা ধামে গিয়ে ঠাকুর কেন্দুকেলাই কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- “শুনলাম আপনি যখন আরতি করেন, তখন নাকি মা নিজে এসে আপনাকে দর্শন দান করেন, ইহা কি সত্য ?”
কেন্দুকেলাই ঠাকুর জানালেন- “আজ্ঞে যথার্থ শুনেছেন মহারাজ। কৃপাময়ী জননী কৃপা করে আমাকে দর্শন দান দিয়াছেন।”
এই শুনে রাজা নরনারায়ণ খুবুই খুশী হয়ে বললেন- “আমিও দেখতে চাই মাকে। আপনি যখন আরতি করবেন, তখন আমি মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে মায়ের দিব্য রূপ দর্শন করবো।”
কেন্দুকেলাই ঠাকুর খুবুই ভীত হয়ে বললেন- “সাবধান মহারাজ। এভাবে ছলাকলার আশ্রয় করে মায়ের দর্শন আপনি পাবেন না।উল্টে আপনার ক্ষতি হবে। আপনি মায়ের তপস্যা করুন। ব্রহ্মময়ী জননী সন্তুষ্ট হলে তিনি আপনাকে নিশ্চয়ই দর্শন দান দিবেন।”
এভাবে ঠাকুর রাজাকে বুঝিয়ে চলে গেলো। একদা সন্ধ্যা আরতিতে মগ্ন ছিলেন কেন্দুকেলাই ঠাকুর, মন্দিরের দ্বার বন্ধ, ভিতরে ঠাকুর আরতি করছেন, বাইরে নানান বাদ্য বাজছিল, রাজা নরনারায়ণ ও অন্য এক কুটিল পূজারী সেখানে চুপিচুপি এসে উত্তর দিকের গবাক্ষ দিয়ে উকি দিয়ে দেখতে লাগলেন। মহামায়া কামাখ্যা দেবী সব জানতে পারলেন। দেবী ভীষনা ক্রুদ্ধ হয়ে বিকট আওয়াজে দিকবিদিক প্রকম্পিত করে সেই কুটিল পূজারীর মাথায় চপেটাঘাত করে শাপ দিয়ে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করলেন। মা কামাখ্যা নরনারায়ণ কে অভিশাপ দিয়ে বলেন- “এই মুহূর্তে তোমাকে নীলাচল পর্বত পরিত্যাগ করতে হবে। তুমি কিংবা তোমার বংশধরেরা যদি কখনো আমার মন্দির বা নীলাচল পর্বতে আসে, তবে সে নির্বংশ হবে।”
এই অভিশাপ পেয়ে রাজা নরনারায়ণ রাজ্যে ফিরে গেলেন, তার পর থেকে এখন অবধি কোচ রাজার বংশধরেরা কোনদিন আর নীলাচল পর্বতে যান না, দেবীর মন্দির বা নীলাচল পর্বত দর্শন করেন না। এরপর মন্দির সেবার ভার পড়ে আহোম রাজগনের ওপর।
-
একটা জিনিষ ভাবার বিষয় রাজা নরনারায়ণের পূর্ব পুরুষ রাজা বিশ্বসিংহ এই কামাখ্যা মন্দির নির্মাণ করেন, রাজা নরনারায়ণ এই মন্দির সংস্কার করেন, কিন্তু মা তাঁদের এমন শাপ কেন দিলেন? বস্তুত মা পাপীদের কোনদিন ক্ষমা করেন না, সে মায়ের যত বড় ভক্তই হোক না কেন। কেন্দুকেলাই ঠাকুরকে বারংবার অপমান, সত্যতার যাচাই না করা- মায়ের ভক্ত হলেও সে রেহাই পাই নি। বস্তুত ভক্ত পাপাচারে লিপ্ত হলে ভগবান তাকে বাঁচান না। শুধরানোর সুযোগ দেন। যেমন মা কামাখ্যা, কেন্দুকেলাই ঠাকুরের মুখ দিয়ে রাজাকে সাবধান করেছিলেন, রাজা শোনেনি। কেন্দুকেলাই ঠাকুরের কথা শুনে রাজা ছলাকলা ত্যাগ করে ভক্তি মার্গ অবলম্বন করলে মায়ের দিব্য দর্শন অবশ্যই পেতেন। রাবন কে ভগবান শিব বাচান নি। ঠিক জরাসন্ধ কে শিব বাঁচান নি। নরক অসুর তার পিতা নারায়নের হাতেই নিহত হয়েছিলেন। সুতরাং ভক্ত যদি পাপাচার করে তার সাত খুন মাফ- এমন ভাবার কোন কারন নেই। ভগবানের চোখে সবাই সমান।এই হল কামাখ্যার সংক্ষিপ্ত কাহিনী ।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

১২ এপ্রিল ২০১৫

তীর্থস্থান ও মন্দির পরিচিতি পর্ব- ০৩


সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ ধাম:
---------------------------
সুদর্শন চক্র দ্বারা খন্ডনকৃত সতীর ডান হাত পড়ে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ ধামে। গবেষকদের মতে সতীর স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ ধামের নাম প্রথমে ছিল সতীকুন্ড কালের বিবর্তনে তা সীতাকুন্ড হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।তবে বিষয়টি বির্তকিত। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী(শিব চতুর্দশী) তিথিতে মানুষের মেলা বসে চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত সীতাকুন্ড পাহাড়ে। ৩৫০ কিলোমিটারের এক বিশাল অংশের পাহাড় এলাকা ঘিরেই আবর্তিত এ তীর্থক্ষেত্র। এ অংশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। পাশাপাশি এখানে দুই পাহাড়ের শীর্ষস্থানে আছে দুটি মন্দিরের অবস্থান। একটি বিরুপাক্ষ মন্দির অন্যটি চন্দ্রনাথ মন্দির। চন্দ্রনাথ মন্দিরটি সমতল ভূমি থেকে ১৩০০ ফুট উচ্চে পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত।এ মন্দির তথা পাহাড় একে অন্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে চন্দ্রনাথ ধাম হিসাবে পরিচিতি লাভ করে । প্রতি বছর শ্রীশ্রী শিবরাত্রি ব্রত উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রধান তীর্থস্থান হিসাবে খ্যাত চন্দ্রনাথ ধামে বসে মানুষের মিলন মেলা।

তীর্থস্থান পবিত্র স্থান। তীর্থের জল, মাটি বাতাস সবই পবিত্র ।তাইতো তীর্থ স্থানে গেলে মন পবিত্র হয়। মনে ধর্ম ভাব জাগে। ধর্মভাব জাগরনে মনের কলুষতা দূর হয়। পাপ কাজ থেকে মনকে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তীর্থস্থান মানুষের মিলন মেলার স্থান। সেখানে গেলে কোন হিংসা-বিদ্বেষ, উচু নীচু ভেদ বৈষম্য কিংবা জাগতিক লোকসানের চিন্তাবোধ থাকেনা। তীর্থস্থান ভ্রমনের ফলে মনের ময়লা দূর হয়,পূর্ন্য আসে,মন জুড়ায়,অশান্তি দুর হয়।তাইতো কবি বলেছেন-
‘‘তীর্থের মহিমা না করা যায় বর্নন,
করিলে ভ্রমন হয় মনের পবিত্রতায় পূন্য সঞ্চালন’’।

সীতা মন্দির নামে পাহাড়ের পাদদেশে আছে একটি মন্দির। এ মন্দিরটির অবস্থান আকর্ষনীয়। ধর্মীয় গাম্ভীর্যের ভাব আর প্রকৃতির নির্ঝরনী শব্দ দুয়ে মিলে মনোরম দূশ্য মুগ্ধ করে আগন্তুক ভক্তদের। উক্ত মন্দির অভ্যন্তরে আছে চতুর্ভূজা সীতাদেবীর মূর্তি। ত্রিপুরার ইতিহাসের তথ্যানুযায়ী সম্ভুনাথ মন্দিরের প্রথম কাজ হয়েছিল ১৫০১ খ্রিষ্ঠাব্দে ।১৯২০/১৯২৪ সালে এ মন্দিরটি সংস্কার করেন ত্রিপুরার মহারানী রত্নমঞ্জরী। এ ছাড়াও মধ্যবর্তী পাহাড়ে আছে আরও বেশ কয়েকটি মন্দির। স্বয়ম্ভুনাথ, রামকুন্ড, লক্ষনকুন্ড মন্দিরের নাম বিশেষভাবে উল্যেখযোগ্য।উল্লেখিত মন্দির গুলোর মধ্যে এই তিথিতে ভক্ত সমাগম ও পুজার্চনা হয় সম্ভুনাথ মন্দিরে। কেননা সুউচ্চ পাহাড়ে যাদের পক্ষে উঠা সম্ভব হয়না তারাই এ মন্দিরে পুজার্চনা করেন। সম্ভুনাথ মন্দিরটি ষোড়শ শতাব্দিতে ধনমানিক্য বাহাদুর, পরৈকোড়ার জমিদার বৃন্দাবন দেওয়ানের মাতা দুর্গারানী, প্রতাপ চৌধুরী ও মুক্তাগাছার জমিদার বিদ্যাময়ী দেবীর অর্থায়নে নির্মিত। ১৯২৩ সালে বর্ধমান জেলার শিয়ালশোলের রাজা শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ মালিয়া শম্ভুনাথ মন্দিরে যাওয়ার ৬৮টি সিড়ি নির্মান করে দেন। চন্দ্রনাথ পাদদেশ থেকে শীর্ষস্থান পর্যন্ত থাক থাক করে বানানো হয়েছে সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জন বানিয়ে দিয়েছেন। অধিকাংশ সিঁড়ির গায়ে খোদিত আছে উদ্যোক্তার নাম। পাপ খন্ডন অথবা নিকট আত্নীয়দের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে সিঁড়িগুলো। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়,সিঁড়ি নির্মানের প্রথম উদ্যোগ গ্রহন করেন চব্বিশ পরগনা নিবাসী শ্রীগঙ্গারাম বিশ্বাস।তার বৃদ্ধ মাতা চন্দ্রনাথ দর্শনে এসে পাহাড়ী দূর্গমপথে পৌছুতে পারেননি চন্দ্রনাথ মন্দিরে।এ কারনে বৃদ্ধমাতা ছেলেকে নির্দেশ দেন- সীতাকুন্ড পাহাড়ে সিঁড়ি নির্মান করে দেওয়ার। মাতৃ আজ্ঞা পালন করতে ১২৭০ বঙ্গাব্দে শ্রীগঙ্গারাম বিশ্বাস সীতাকুন্ডের পাহাড়ী পথে ৭৮২টি সিঁড়ি নির্মান করেন। নানা কারনে সিঁড়ি গুলো ক্ষতিগ্রস্থ হলে ১৩২৯ বঙ্গাব্দে সিঁড়িগুলো সংস্কার করে দেন চব্বিশ পরগনার জমিদার শ্রীসূর্যকান্ত রায় চৌধুরী। এরপর শ্রীগোপাল চন্দ্র সাহা ও মধুসূধন সাহা নামের দুই সহোদর বিরুপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত প্রায় ১.২৫ কিলোমিটারের পথে সিঁড়ি নির্মান করে দেন। এছাড়াও অন্নদা রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় ও বসন্ত কুমারী দেবীর নামে রয়েছে কিছু সিঁড়ি। এ সিঁড়িগুলো নির্মানের ফলে তীর্থযাত্রীরা পৌছাতে পারেন শীর্ষস্থানে। মূল পাহাড়ী চুঁড়ায় অবস্থিত মন্দিরটি চন্দ্রনাথ মন্দির এবং সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গে অবস্থিত বিরুপাক্ষ মন্দির।পরৈকোড়ার জমিদার নারায়ন লালা এ মন্দিরগুলোর নির্মাতা। তিনি চন্দ্রনাথ মন্দির ও বিরুপাক্ষ মন্দিরের জল সরবরাহের খরচ নির্বাহে ৮০০দ্রোন লাখেরাজ ভূমি দান করেছিলেন। ১৩২৫ সালে মন্দির গুলো ক্ষতিগ্রস্থ হলে রংপুরের ডিমলার রানী শ্রীমতী বৃন্দারানী চৌধুরানী বহু অর্থ ব্যায় করে মন্দিরগুলোর সংস্কার করে দেন।এ ছাড়াও তিনি ১৩০৪ বঙ্গাব্দে চন্দ্রনাথ ও বিরুপাক্ষ মন্দিরের সিঁড়ি ও লৌহ সেতু নির্মান করে দেন এবং তাঁর স্বামী রাজা শ্রীজানকি বল্লভ সেনের নামে স্মৃতি ফলক দেন। মন্দির নির্মান,সংস্কার ও উন্নয়নে আরও অনেক ব্যাক্তির অবদান রয়েছে। এর মধ্যে ত্রিপুরার রাজা শ্রীগোবিন্দ মানিক্য,সরোয়াতলী গ্রামের জমিদার শ্রীরাম সুন্দর সেন এবং ময়মনসিংহের জমিদার রাজেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী অন্যতম।

বর্তমানে মন্দিরগুলো হারিয়েছে পূর্বশ্রী।তাই, সংস্কার করা জরুরী।





অ্যাঙ্কর ওয়াট:
--------------

পৃথিবীর বড় বড় মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে 'অ্যাঙ্কর ওয়াট' মন্দির।
এটি একটি বিষ্ণু মন্দির। চতুর্দিকে পরিখা বিশিষ্ট অ্যাঙ্কর ওয়াট আজও জগতের অন্যতম ধর্মস্থান বলে স্বীকৃত। উত্তর-পশ্চিম কম্বোডিয়ার অ্যাঙ্কর শহরে বিখ্যাত এ মন্দিরটি অবস্থিত। দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কম্বোডিয়ার খেমার হিন্দু রাজা দ্বিতীয় জয়বর্মণ এ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। রাজা সূর্যবর্মণ ১১১৩ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করে ছিলেন। অ্যাঙ্কর ওয়াটের অবস্থান কম্বোডিয়ার উত্তরে। সিয়াম রিয়াপে। অ্যাঙ্কর প্রদেশের রাজধানী সিয়াম রিয়াপ। অ্যাঙ্কর ছিল প্রাচীন খেমার সাম্রাজ্যের রাজধানী। কম্বোডিয়ার অধিবাসীরা প্রধানত খেমার। নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে খেমার সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। খেমার সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল অ্যাঙ্কর। অ্যাঙ্কর শব্দটি সংস্কৃত নগর শব্দ থেকে উদ্ভূত। সংস্কৃত শব্দের পেছনে অবশ্য কারণ রয়েছে। বাণিজ্য ও অন্যান্য সূত্রে ভারতীয় বৈদিক ধর্ম কম্বোডিয়া অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল। খেমার জনগণও সাদরে সেই ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর সেটিই ছিল স্বাভাবিক। কেননা, এর আগে কম্বুজদেশায় (কম্বোডিয়ার পুরনো নাম) জনগণ ছিল সর্বপ্রাণবাদী।অর্থাৎ তারা ধহরসরংস এ বিশ্বাসী ছিল।অপরদিকে ভারতীয় বৈদিক ধর্মটি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বহু ঈশ্বরবাদী হলেও এর মূলে রয়েছে একেশ্বরবাদ। দীর্ঘকাল ধরে কোনো মানবসংস্কৃতিই সর্বপ্রাণবাদী হয়ে থাকতে পারে না। মানবসংস্কৃতি সব সময়ই একেশ্বরবাদী ধ্যানধারণা গ্রহণ করে। মানবচেতনার বিকাশের জন্যই এমনটা ঘটে বলে মনে হয়। কম্বোডিয়াতেও তাই-ই হয়েছিল। সেখান থেকেই কম্বোডিয়ায় বিষ্ণু ধর্মের উত্থান। আর ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে খেমার রাজা এই বিখ্যাত মন্দিরটি নির্মাণ করেন। 'অ্যাঙ্কর ওয়াট' মন্দিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫০ মিটার ১৭০০ গজ এবং প্রস্থ প্রায় ১৪০০ মিটার। জলাভূমির উপর দিয়ে নির্মিত একটি সুন্দর রাস্তা পশ্চিম দিক থেকে মন্দিরে এসে মিশেছে। প্রথম দিকে এ মন্দিরটিতে ৯টি গম্বুজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র পাঁচটি গম্বুজ খাড়াভাবে দণ্ডায়মান। সূর্য সেনের নিজ স্মৃতি চিহ্নরূপে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। কেন্দ্রীয় স্মারক চিহ্নটি বোস্টন নগরকে নির্দেশ করে।মন্দির চত্বরে বেশ সুন্দর সুন্দর চারকোণা পীঠিকা রয়েছে। মন্দিরটির সিঁড়ি ও স্তম্ভগুলো নিখুঁত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। যা এক শৈল্পিক নৈপুণ্যতার নির্দেশক। ভাস্কর্যগুলোর বিষয়বস্তু নেওয়া হয়েছে প্রধানত হিন্দু মহাকাব্য থেকে।তবে মন্দিরটিতে পার্থিব শৌর্য বীর্যের অনেক চিত্রও অঙ্কিত রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ভঙ্গিমায় খোদিত রয়েছে অনেক অপ্সরার মূর্তি। এ মন্দিরটি ছাড়াও খেমার রাজারা কম্বোডিয়ায় আরো অনেক মন্দির তৈরি করেছিলেন। আজও এ মন্দিরগুলো তৎকালীন সময়ের চারু ও কারুশিল্পের আদর্শ প্রতীক হযে দাঁড়িয়ে আছে।




ভবানীপুর মন্দির:
------------------
ভবানীপুর বাংলাদেশের বগুড়া জেলার শেরপুরে করতোয়া তটে অবস্থিত সতী মাতা তারার একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম এবং ভক্তদের জন্য এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান।

সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞের পর সতী মাতা দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করলে বিষ্ণু দেব সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতী মাতার দেহখন্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের ৫১টি স্থানে পতিত হয় এবং এ সকল স্থানসমূহ শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি পায়। বিভিন্ন সূত্র মতে, করতোয়াতটের এ ভবানীপুরে সতী মাতা তারার বাম পায়ের অলঙ্কার বা বাম পাঁজর পড়েছিল বলে জানা যায়। ভবানীপুর বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত শক্তিপীঠসমূহের মধ্যে অন্যতম। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ- বিদেশের ভক্তরা সারা বছর এখানে তীর্থে আসেন। শক্তি দেবী ও ভৈরব এই শক্তিপীঠের শক্তি দেবী অর্পণা এবং ভৈরব বামন নামে পরিচিত।

কথিত আছে যে এখানে একদা একজন শাঁখাওয়ালা (শাঁখা নির্মাতা) ভবানীপুর মন্দিরের ধারের গভীর জঙ্গলের পাশের একটি পুকুরের ধার অতিক্রম করছিলেন।এমন সময় সিঁথিতে সিঁদুর দেয়া একটি ছোট মেয়ে তার কাছে গিয়ে বলেছিল যে সে নাটোর রাজবাড়ির রাজকন্যা।সে শাঁখাওয়ালার কাছ থেকে এক জোড়া শাঁখা কিনল এবং বলল যে শাঁখাওয়ালা যেন নাটোরের মহারাণীকে বলেন যে প্রাসাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা ঝুড়ি থেকে তার শাঁখার দাম দিয়ে দেন। শাঁখাওয়ালা মেয়েটির বিনীত কথায় মুগ্ধ হয়ে তাকে শাঁখা দিয়ে দিলেন। শাঁখাওয়ালার মুখ থেকে ছোট মেয়েটির কথা শুনে মহারাণী লোকজন ও সেই শাঁখাওয়ালাকে নিয়ে মেয়েটির বলা জায়গায় গেলেন। শাঁখাওয়ালার প্রার্থনা শুনে মা ভবানী সেই শাঁখা-পুকুর থেকে তার দুই হাতের শাঁখা তুলে দেখালেন। মহারানী ও সেখানে উপস্থিত লোকজন এতে বিস্মিত হলেন এবং মা ভবানীর (মা তারার) মহিমা এই উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। এই কিংবদন্তির শাঁখা-পুকুরে তীর্থযাত্রীরা স্নান করেন।

মন্দিরের পরিচিতি
চার একর (১২ বিঘা) জমির ওপর প্রাচীর বেষ্টিত মন্দির চত্বর। মূলমন্দির, বেলবরণ তলা, শিব মন্দির ৪টি, পাতাল ভৈরব শিব মন্দির, গোপাল মন্দির, বাসুদেব মন্দির ও নাট মন্দির/আটচালা। উত্তরাংশে সেবা অঙ্গন, পবিত্র শাঁখা পুকুর, স্নানঘাট দুটি, বেষ্টনী প্রাচীরের বাইরে চারটি শিব মন্দির ও একটি পঞ্চমুন্ড আসন।

প্রভাতী ও বাল্যভোগ, দুপুরে পূজা ও অন্নভোগ, সন্ধ্যায় আরতি ও ভোগ।প্রতি দিন মন্দিরে আগত ভক্তরা মিষ্টান্ন ও অন্ন ভোগ দিতে পারেন ও পরে প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন। উত্সব-পার্বণ সমূহ হচ্ছে, মাঘী পূর্ণিমা (মাঘ-ফাল্গুন), রাম নবমী (চৈত্র- বৈশাখ), শারদীয় দুর্গোত্সব, দীপান্বিতা শ্যামাপূজা এবং নবান্ন (অগ্রহায়ণ মাসে তিথি অনুযায়ী)।

মন্দির তত্ত্বাবধান ১৯৯১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ভবানীপুর মন্দির সংস্কার, উন্নয়ন ও পরিচালনা কমিটির দ্বারা মা ভবানীর সম্পত্তিসমূহ তত্ত্বাবধানসহ মন্দিরের সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্ত্তু দেবোত্তর বা অর্পিত সম্পত্তি আইনের অপপ্রয়োগের কারণে মা ভবানীর অনেক সম্পত্তি অবৈধভাবে বেহাত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া কমিটির প্রাক্তন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী ২০০৪ সালে আততায়ীদের হাতে নিহত হওয়ার পর ৭ বছর গত হলেও তার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ ও দন্ডিত করা হয়নি।তদুপরি ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য ভক্তদের জন্য নির্মাণাধীন অতিথিশালা অবৈধভাবে ভেঙ্গে ফেলেন।

সৌজন্যেঃ রথযাত্রা

Share:

তীর্থস্থান ও মন্দির পরিচিতি পর্ব- ০২

কাশী বিশ্বনাথ :
---------------
কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ভারতের একটি বিখ্যাত মন্দির। এটি উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বারাণসীতে অবস্থিত। মন্দিরটি গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির " জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির" নামে পরিচিত শিবের বারোটি পবিত্রতম মন্দিরের অন্যতম। মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব "বিশ্বনাথ" বা "বিশ্বেশ্বর" নামে পূজিত হন। বারাণসী শহরের অপর নাম "কাশী" এই কারণে মন্দিরটি "কাশী বিশ্বনাথ মন্দির" নামে পরিচিত। মন্দিরের ১৫.৫ মিটার উঁচু চূড়াটি সোনায় মোড়া। তাই মন্দিরটিকে স্বর্ণমন্দিরও বলা হয়ে থাকে। পুরাণে এই মন্দিরটির উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরটি শৈবধর্মের প্রধান কেন্দ্রগুলির অন্যতম। অতীতে বহুবার এই মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের পাশে জ্ঞানবাপী মসজিদ নামে একটি মসজিদ রয়েছে। আদি মন্দিরটি এই মসজিদের জায়গাটিতেই অবস্থিত ছিল। বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে ইন্দোরের মহারানি অহিল্যা বাই হোলকর তৈরি করে দেন।১৯৮৩ সাল থেকে উত্তরপ্রদেশ সরকার এই মন্দিরটি পরিচালনা করে আসছেন।

স্কন্দ পুরাণের কাশীখণ্ডে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।একাদশ শতাব্দীতে হরিচন্দ্র মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। ১১৯৪ সালে মহম্মদ ঘোরি বারাণসীর অন্যান্য মন্দিরগুলির সঙ্গে এই মন্দিরটিও ধ্বংস করে দেন। এরপরেই আবার মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। এরপর কুতুবুদ্দিন আইবক মন্দিরটি ধ্বংস করেন। আইবকের মৃত্যুর পর মন্দিরটি আবার নির্মিত হয়। ১৩৫১ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলক মন্দিরটি আবার ধ্বংস করেন। ১৫৮৫ সালে আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল আবার মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।এরপর ১৬৬৯ সালে আওরঙ্গজেব পুনরায় মন্দিরটি ধ্বংস করে জ্ঞানবাপী মসজিদ তৈরি করান। এই মসজিদটি আজও মন্দিরের পাশে অবস্থিত। মসজিদের পিছনে পুরনো মন্দিরের কিছু ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়। বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে ইন্দোরের মহারানি অহিল্যা বাই হোলকর তৈরি করে দিয়েছিলেন। ১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবের শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিংহ মন্দিরের চূড়াটি ১০০০ কিলোগ্রাম সোনা দিয়ে মুড়ে দেন।

মন্দির চত্বরটি অনেকগুলি ছোটো ছোটো মন্দির নিয়ে গঠিত। এই মন্দিরগুলি গঙ্গার তীরে "বিশ্বনাথ গলি" নামে একটি গলিতে অবস্থিত। প্রধান মন্দিরের মধ্যে একটি ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু ও ৯০ সেন্টিমিটার পরিধির শিবলিঙ্গ রূপার বেদির উপর স্থাপিত।ছোটো মন্দিরগুলির নাম কালভৈরব, দণ্ডপাণি, অবিমুক্তেশ্বর, বিষ্ণু, বিনায়ক, শনীশ্বর, বিরূপাক্ষ ও বিরূপাক্ষ গৌরী মন্দির। মন্দিরের মধ্যে জ্ঞানবাপী নামে একটি ছোটো কুয়ো আছে। মুসলমান আক্রমণের সময় প্রধান পুরোহিত স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গটি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সেটি নিয়ে এই কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরটি পবিত্রতম মন্দিরগুলির অন্যতম। আদি শঙ্করাচার্য, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, গোস্বামী তুলসীদাস, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, গুরু নানক প্রমুখ ধর্মনেতারা এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, গঙ্গায় একটি ডুব দিয়ে এই মন্দির দর্শন করলে মোক্ষ লাভ করা সম্ভব।


তথ্যসূত্র -উইকিপিডিয়া




বৈদিক প্লানেটরিয়াম মন্দির:
-----------------------------
শ্রী চৈতন্যের জন্মস্থান করেন পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় মায়াপুর গ্রামে। এখানে ইসকন প্রতিষ্ঠিত চন্দ্রোদয় মন্দির আছে। এই মন্দিরের অনেক সেবক শ্বেতাঙ্গ, যারা ইউরোপ ও আমেরিকার নানা দেশ থেকে এসে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছেন । তবে যেকোনো ধর্মের মানুষ এখানে স্বাগত ।

এই মায়াপুরে নির্মিত হচ্ছে বৈদিক প্লানেটরিয়াম মন্দির (ছবি) যা ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিট্যাল বিল্ডিং এর অনুরূপ প্রায় ৩০০ফুট উঁচু ,গম্বুজ আকৃতির মন্দির - শ্রীশ্রী গৌর নিতাই মন্দির । শ্রীশ্রী রাধামাধব এবং বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামীর নিত্য সেবা পূজা সম্পন্ন করার মানসে শ্রীমদ্ভাগবতে ৫ম স্কন্ধে বর্ণিত নির্দেশনা মতো অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে।

৬০মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এই বৈদিক প্লানেটরিয়াম মন্দিরের কাজ আগামী ২০১৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ইসকন কর্তৃপক্ষ।





সোমনাথ মন্দির:
-----------------
সোমনাথ মন্দির ভারতের একটি প্রসিদ্ধ শিব মন্দির। গুজরাট রাজ্যের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের বেরাবলের নিকটস্থ প্রভাস ক্ষেত্রে এই মন্দির অবস্থিত। শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে পবিত্রতম। সোমনাথ শব্দটির অর্থ “চন্দ্র দেবতার রক্ষাকর্তা”। সোমনাথ মন্দিরটি ‘চিরন্তন পীঠ’ নামে পরিচিত। কারণ অতীতে ছয় বার ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও মন্দিরটি সত্বর পুনর্নিমিত হয়।১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে জুনাগড়ের ভারতভুক্তির সময় এই অঞ্চল পরিদর্শন করে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মন্দিরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান ভারত সরকারের অপর এক মন্ত্রী কে. এম. মুন্সি।হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দক্ষ প্রজাপতি কর্তৃক অভিশপ্ত হয়ে চন্দ্র প্রভাস তীর্থে শিবের আরাধনা করলে, শিব তাঁর অভিশাপ অংশত নির্মূল করেন। এই কারণে চন্দ্র সোমনাথে শিবের একটি স্বর্ণমন্দির নির্মাণ করেন। পরে রাবণ রৌপ্য ও কৃষ্ণ চন্দনকাষ্ঠ দ্বারা মন্দিরটি পুনর্নিমাণ করেছিলেন। গুজরাটের সোলাঙ্কি শাসক ভীমদেব মন্দিরটি নির্মাণ করেন প্রস্তরে। প্রসঙ্গত, সোলাঙ্কি ছিল ভারতের পাঁচ রাজপুত রাজ্যের অন্যতম।

সোমনাথ মন্দিরের আরাধ্য দেবতা শিব সোমেশ্বর মহাদেব নামে পরিচিত। পুরাণ অনুসারে, সত্যযুগে সোমেশ্বর মহাদেব ভৈরবেশ্বর, ত্রেতাযুগে শ্রাবণিকেশ্বর ও দ্বাপর যুগে শ্রীগলেশ্বর নামে পরিচিত ছিলেন। চন্দ্র তাঁর স্ত্রী রোহিণীর প্রতি অত্যধিক আসক্তি বশত তাঁর অন্য ছাব্বিশ স্ত্রীকে উপেক্ষা করতে থাকেন। এই ছাব্বিশ জন ছিলেন দক্ষ প্রজাপতির কন্যা। এই কারণে দক্ষ তাঁকে ক্ষয়িত হওয়ার অভিশাপ দেন। প্রভাস তীর্থে চন্দ্র শিবের আরাধনা করলে শিব তাঁর অভিশাপ অংশত নির্মূল করেন। এরপর ব্রহ্মার উপদেশে কৃতজ্ঞতাবশত চন্দ্র সোমনাথে একটি স্বর্ণ শিবমন্দির নির্মাণ করেন। পরে রাবণ রৌপ্যে, কৃষ্ণ চন্দনকাষ্ঠে এবং রাজা ভীমদেব প্রস্তরে মন্দিরটি পুনর্নিমাণ করেছিলেন।

সোমনাথের প্রথম মন্দিরটি খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকে বিদ্যমান ছিল।গুজরাটের বল্লভীর যাদব রাজারা ৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন।৭২৫ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধের আরব শাসনকর্তা জুনায়েদ তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে এই মন্দিরটি ধ্বংস করে দেন।
তারপর ৮১৫ খ্রিস্টাব্দে গুজ্জর প্রতিহার রাজা দ্বিতীয় নাগভট্ট সোমনাথের তৃতীয় মন্দিরটি নির্মাণ করান। এই মন্দিরটি ছিল লাল বেলেপাথরে নির্মিত সুবিশাল একটি মন্দির। ১০২৪ খ্রিস্টাব্দে মামুদ গজনি আরেকবার মন্দিরটি ধ্বংস করেন।
১০২৬ থেকে ১০৪২ খ্রিস্টাব্দের মাঝে কোনো এক সময়ে গুজ্জর পরমার রাজা মালোয়ার ভোজ ও সোলাঙ্কি রাজা আনহিলওয়ারার প্রথম ভীমদেব আবার মন্দিরটি নির্মাণ করান। এই মন্দিরটি ছিল কাঠের তৈরি। কুমারপাল (রাজত্বকাল ১১৪৩-৭২) কাঠের বদলে একটি পাথরের মন্দির তৈরি করে দেন।১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সৈন্যবাহিনী পুনরায় মন্দিরটি ধ্বংস করে।
হাসান নিজামির তাজ-উল-মাসির লিখেছেন, গুজরাটের রাজা করণ পরাজিত হন, তাঁর সেনাবাহিনী পলায়ন করে, "পঞ্চাশ হাজার কাফেরকে তরবারির আঘাতে নরকে নিক্ষেপ করা হয়" এবং "বিজয়ীদের হাতে আসে কুড়ি হাজারেরও বেশি ক্রীতদাস ও অগণিত গবাদি পশু"।

১৩০৮ খ্রিস্টাব্দে সৌরাষ্ট্রের চূড়াসম রাজা মহীপাল দেব আবার মন্দিরটি নির্মাণ করান। তাঁর পুত্র খেঙ্গর ১৩২৬ থেকে ১৩৫১ সালের মাঝে কোনো এক সময়ে মন্দিরে শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠা করেন।১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের সুলতান প্রথম মুজফফর শাহ আবার মন্দিরটি ধ্বংস করেন।মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হলে ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের সুলতান মাহমুদ বেগদা আবার এটি ধ্বংস করে দেন।কিন্তু এবারও মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মন্দিরটি ধ্বংস করেন।আওরঙ্গজেব সোমনাথ মন্দিরের জায়গায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদে হিন্দু শাস্ত্র-ভিত্তিক মোটিফগুলি সম্পূর্ণ ঢাকা পড়েনি।পরে ১৭৮৩ সালে পুণের পেশোয়া, নাগপুরের রাজা ভোঁসলে, কোলহাপুরের ছত্রপতি ভোঁসলে, ইন্দোরের রানি অহল্যাবাই হোলকর ও গোয়ালিয়রের শ্রীমন্ত পাতিলবুয়া সিন্ধের যৌথ প্রচেষ্টায় মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মূল মন্দিরটি মসজিদে পরিণত হওয়ায় সেই জায়গায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ধ্বংসাবশেষের পাশে।

তেরো শতকের আরব ভূগোলবিদ আসারু-ল-বিলাদ ওয়ান্ডারস অফ থিংস ক্রিয়েটেড, অ্যান্ড মার্ভেলস অফ থিংস এক্সিস্টিং বইতে লিখেছেন যে “সোমনাথ: ভারতের বিখ্যাত শহর, সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত এবং সমুদ্রের তরঙ্গবিধৌত। এই স্থানের বিস্ময়কর স্থানগুলির মধ্যে একটি হল এক মন্দির যেখানে সোমনাথ নামে একটি বিগ্রহ রয়েছে। বিগ্রহটি মন্দিরের মাঝখানে নিচের কোনোরকম ঠেকনা ছাড়াই উপর থেকে ঝুলে রয়েছে। হিন্দুরা এটিকে খুব শ্রদ্ধা করে। বিগ্রহটিকে ওভাবে ঝুলতে দেখে মুসলমানই হোক, আর কাফেরই হোক, সবাই আশ্চর্য হয়ে যায়। চন্দ্রগ্রহণের দিন হিন্দুরা এই মন্দিরে তীর্থ করতে আসে। সেই সময় লক্ষ লক্ষ লোক এই মন্দিরে ভিড় জমান।" “সুলতান ইয়ামিনু-দ দৌলা মাহমুদ বিন সুবুক্তিগিন ভারতের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তিনি ভেবেছিলেন সোমনাথ ধ্বংস করে দিলেই হিন্দুদের মুসলমান করা যাবে। তাই তিনি সোমনাথ ধ্বংস করার ব্যাপারে বিশেষভাবে যত্নবান হন। এর ফলে হাজার হাজার হিন্দুকে জোর করে মুসলমান করা হয়। তিনি ৪১৬ হিজরির জিল্কাদা মাসের মাঝামাঝি সময় (১০২৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) এসেছিলেন।
"বিহগ্রের দিকে সুলতান আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর লুটের মাল নিয়ে যাওয়ার হুকুম দিলেন। ধনসম্পদ তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল। সেখানে সোনা ও রুপো দিয়ে তৈরি অনেক মূর্তি ছিল। রত্নখচিত অনেক পাত্র ছিল। ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সেসব জিনিস সেই মন্দিরে পাঠিয়েছিলেন। মন্দির থেকে লুণ্ঠিত দ্রব্যের মোট অর্থমূল্য ছিল কুড়ি হাজার দিনারেরও বেশি।


পশুপতিনাথ মন্দির:
--------------------
পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত এই শিবমন্দির ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্যতম।এটি নেপালের প্রাচীনতম মন্দির।নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর পূর্বদিকে বাগমতি নদীর তীরে পশুপতিনাথ মন্দির অবস্থিত।শিবের আরেক নাম পশুপতি।মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়েছে একবার শিব ও পার্বতী কাঠমান্ডু উপত্যকায় বাগমতী নদীর তীরে বেড়াতে আসেন ।নদী ও বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে শিব পার্বতী মুগ্ধ হয়ে নিজেদের হরিণে পরিণত করে এই এলাকায় ঘুরে বেড়ানো শুরু করলেন।কিছুদিন পরেই দেবতা ও মানুষরা শিবকে খুঁজতে শুরু করলেন।বিভিন্ন ঘটনার পর দেবতারা শিবকে খুঁজে পেলেও তিনি এই স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন।শেষ পর্যন্ত শিব ঘোষণা করলেন যেহেতু তিনি বাগমতীর তীরে হরিণ বেশে ঘুরেছেন সেহেতু তিনি এখানে পশুপতিনাথ বা পশুদের অধিকর্তা বলে পরিচিত হবেন।এই মন্দির কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা সঠিক ভাবে জানা না গেলেও চতুর্থ শতাব্দী থেকে এখানে মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল।৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে লিচ্ছবি রাজা সুপুস পদেভ এখানে একটি পাঁচ তলা মন্দির নির্মাণ করেন।একাদশ শতকে রাজা শিবদেব এই মন্দিরের সংস্কার করেন।১৭শ শতকে রাজা ভূপেন্দ্র মল্ল মন্দিরটি পুনর্নিমাণ করেন ।

প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢোকার পর একটি বিশাল প্রাঙ্গনের মাঝখানে পশুপতিনাথের মূল মন্দিরটি নেপালের প্যাগোডা রীতিতে তৈরি।কৌণিক গঠন,কাঠের কারুকার্য এ সবই নেপালের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির অংশ। মন্দিরটি চারকোণা ।একস্তর বিশিষ্ট ভিত্তিভূমির ওপর স্থাপিত মন্দিরটি ভূমি থেকে ২৩.৬ মিটার উঁচু ।মন্দিরটির সারা গায়ে সোনা ও রূপার কারুকাজ করা ।দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা হয়েছে মন্দিরের দেয়ালে । দু'স্তর বিশিষ্ট ছাদ তামার তৈরি তাতে সোনার প্রলেপ দেওয়া ।মন্দিরটির চারটি প্রধান দরজা । চারটি দরজাই রূপা দিয়ে মোড়া ।প্রতিটি দরজার দু'পাশে সোনা দিয়ে প্রধান দেবদেবীদের মূর্তি তৈরি করা হয়েছে ।মন্দিরের ভিতরে রয়েছে একটি পবিত্র কক্ষ ।এই চারটি মুখ পশুপতিনাথ বা শিবের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কিত চার দেব বিষ্ণু,সূর্য,পার্বতী ও গণেষের । মন্দিরের চূড়া সোনার তৈরি । পশ্চিম দরজার সামনে রয়েছে একটি বিশাল ষাঁড়ের মূর্তি যার নাম নন্দী ।নন্দী মূর্তিটি ব্রোঞ্জের তৈরি সোনার প্রলেপ দেওয়া ।মন্দিরের ছাদের নিচের দেয়ালে সপ্তদশ শতাব্দীতে কাঠের অপূর্ব কারুকার্যের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শিব,পার্বতী,গণেষ,কুমার কার্তিক এবং যোগিনীদের মূর্তি ।

এছাড়া রয়েছে হনুমান,রাম,সীতা,লক্ষ্মণসহ রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র ও পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী ও দেবদেবীর ছবি । পশুপতিনাথের প্রাঙ্গনেই রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি প্রাচীন মন্দির ।মন্দিরের দক্ষিণে আছে ৭ম শতকে তৈরি লিচ্ছবি মন্দির চাদেশ্বর,উত্তরে রয়েছে নবম শতকে নির্মিত ব্রহ্মা মন্দির ।এছাড়া রয়েছে একাদশ শতকে নির্মিত গুহেশ্বরী মন্দির,চতুর্দশ শতকে নির্মিত রাম মন্দির ও বৈষ্ণব মন্দির। পশুপতিনাথের উত্তর-পূর্বদিকে আছে প্রাচীন বাসুকিনাথের মন্দির ।নাগ দেবতা বাসুকি পশুপতিনাথ শিবের সঙ্গী ।মূল মন্দিরে প্রবেশের আগে অনেকেই বাসুকিনাথের মন্দিরে পূজা দেন।পশুপতিনাথের মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলছে বাগমতী নদী ।পুণ্যার্থীরা এই নদীতে স্নান করেন। এজন্য নদীর দু'তীরে রয়েছে অনেক ঘাট।এর মধ্যে উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠিত আর্য ঘাট বিশেষ গুরুত্ব বহন করে ।এ ঘাটে শুধু মাত্র নেপালের রাজপরিবারের সদস্যদের মরদেহ দাহ করা হতো । তবে ভষ্মেশ্বর ঘাটে মূল শ্মশান অবস্থিত ।এই ঘাট হলো কাঠমান্ডু উপত্যকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শ্মশান ঘাট । নদীর তীরে গেলেই দেখা যায় সারি সারি চিতা জ্বলছে। গৌরি ঘাট হলো নারীদের স্নানের জন্য বহুল ব্যবহৃত ঘাট ।

নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির তার অপূর্ব শৈল্পিক কারুকার্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্ব বিখ্যাত । পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক পশুপতিনাথের মন্দির দেখতে যান । 




সূর্য মন্দির কোনার্ক:
---------------------

ভারতের বিখ্যাত সূর্য মন্দির কোনার্ক ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের এই সূর্য মন্দিরকে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য ইউনেস্কো বিশ্ব সভ্যতার একটি উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে।উড়িষ্যায় পুরী ও ভুবনেশ্বরের কাছে বঙ্গোপসাগরের বেলাভূমিতে ১৩ শ শতকে পূর্ব-গঙ্গা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ নরসিংহ দেব সূর্য দেবতার আরাধনার জন্য এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন।এই মন্দির তার অভিনব আকার,বিশালত্ব আর কারুকার্যের জন্য ভারতের সপ্তমাশ্চর্যের অন্যতম।তামিল শব্দ কোণ আর সংস্কৃত শব্দ অর্ক মিলে কোনার্ক শব্দটির সৃষ্টি।উড়িষ্যা ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে নির্মিত মন্দিরটি ধূসর বেলে পাথরে বিশাল একটি রথের আকারে গড়া হয়েছে।সমুদ্র থেকে উঠে আসা সূর্যদেবের বিশাল রথ,তার সামনে রয়েছে সাত জোড়া ঘোড়া।বারো জোড়া বিশাল চাকার ওপর পুরো মন্দিরটি নির্মিত।চাকার কারুকার্য দর্শকদের জন্য একটি প্রধান আকর্ষণ।প্রতিটি চাকা একেকটি সূর্যঘড়ি।চাকার ভেতরের দাঁড়গুলো সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা।এখনো নিখুঁতভাবে সময় জানা যায় এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে।মন্দিরের প্রবেশ পথেই রয়েছে বিশাল দুটি সিংহের মূর্তি যারা লড়াই করছে দুটি রণহস্তীর সঙ্গে।মন্দিরের বেদী থেকে শুরু করে চূড়া পর্যন্ত
প্রতি ইঞ্চি জায়গায় পাথরের ভাস্কর্য ও
কারুকার্য রয়েছে ।
দেবতা,অপ্সরা,কিন্নর,যক্ষ,গন্ধর্ব,নাগ,মানুষ,বিভি
ন্ন প্রাণী,পৌরাণিক বিভিন্ন ঘটনার
প্রতিরূপ,নৃত্যরত নরনারী,প্রেমিক
যুগল,রাজদরবারের বিভিন্ন দৃশ্য,শিকারের দৃশ্য
ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাথরের বুকে ।মূর্তিগুলোর
মানবিক আবেদন,নিখুঁত গড়ন,লীলায়িত
ভঙ্গী শিল্পকলার চরম উত্‍কর্ষের নিদর্শন ।
কলিঙ্গ রীতিতে নির্মিত মন্দিরের
চূড়াগুলো পিরামিড আকৃতির।মন্দিরের
সামনে রয়েছে নাটমন্ডপ ।এখানে একসময়
দেবদাসীরা দেবতার উদ্দেশ্যে পূজানৃত্য পরিবেশন
করতেন ।মন্দিরের
ভিতরে রয়েছে নাটমন্দির,ভোগমন্দির ও গর্ভগৃহ।
মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৮৫৭ ফুট ।
তবে মন্দিরের অনেক অংশ এখন
বালিতে দেবে গেছে । মন্দিরের দেয়াল এখনো ২০০
ফুট উঁচু।
মন্দিরে সূর্যদেবতার যে বিশাল বিগ্রহ ছিল
তা এখন নেই ।কালের করাল গ্রাসে স্থাপনার অনেকটাই আজ
ধ্বংসপ্রাপ্ত ।কথিত আছে যে বাংলার সুলতান
সুলেমান খান কারানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের
আক্রমণে কোনার্ক মন্দির প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত
হয় ।উড়িষ্যার ইতিহাস অনুযায়ী কালাপাহাড়
১৫০৮ সালে কোনার্ক আক্রমণ করে ।
১৬২৬ সালে খুরদার তত্কালীন রাজা পুরুষোত্তম
দেবের পুত্র নরশিমা দেব সূর্যদেবের
বিগ্রহটি পুরীর জগন্নাথের মন্দিরে নিয়ে যান ।
সেখানে একটি পৃথক মন্দিরে সূর্য ও চন্দ্র দেবতার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় । শুধু বিগ্রহই নয় তিনি কোনার্ক মন্দির থেকে কারুকার্য করা অনেক পাথর পুরীর মন্দিরে নিয়ে যান। এমনকি নবগ্রহ পথ নামে একটি বিশাল প্রস্তর খন্ডও তিনি পুরীতে নিয়ে যান ।মারাঠা শাসনামলে কোনার্ক মন্দির থেকে অনেক ভাস্কর্য ও প্রস্তরখন্ড পুরীতে নিয়ে যাওয়া হয় । ১৭৭৯ সালে কোনার্ক থেকে অরুণ কুম্ভ নামে বিশাল একটি স্তম্ভ নিয়ে পুরীর সিংহদ্বারের সামনে স্থাপন করা হয় । এই সময় মারাঠা প্রশাসন কোনার্কের নাট মন্ডপটি অপ্রয়োজনীয় মনে করে ভেঙ্গে ফেলে ।সূর্যদেবের বিগ্রহ অপসারণের পর
কোনার্কে পূজা ও আরতি বন্ধ হয়ে যায় । পর্তুগীজ জলদস্যুদের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে কোনার্ক বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

আঠারশ' শতক নাগাদ কোনার্ক মন্দির তার সকল গৌরব হারিয়ে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে ।মন্দিরের অনেক অংশ বালির নিচে চাপা পড়ে যায় ।মন্দির চত্বর ও এর আশেপাশের এলাকা ধীরে ধীরে ঘন অরণ্যে ছেয়ে যায় ।বুনো জন্তুরা বাসা বাঁধে মন্দিরের ভিতর ।জলদস্যু ও ডাকাতের আস্তানায় পরিণত হয় কোনার্ক মন্দির । সেসময় দিনের আলোতেও সাধারণ মানুষ ভয়ে এর ত্রিসীমানায় যেত না। বিংশ শতাব্দীতে প্রত্নতত্ববিদরা কোনার্ক মন্দির পুনরাবিষ্কার করেন। খননের ফলে লোকচক্ষুর সামনে উন্মোচিত হয়।

কোনার্ক মন্দিরের অপূর্ব স্থাপত্য শৈলী,বিষ্ময়কর ভাস্কর্যকীর্তি ও অনন্য শিল্প সম্ভার।কোনার্ক মন্দিরের অনেক শিল্প কীর্তি এখন সূর্য মন্দির জাদুঘর ও উড়িষ্যার জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে।প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী কোনার্কের সূর্য মন্দির দেখতে আসেন। প্রাচীন ভারতীয় স্থপতি ও ভাস্করদের শিল্পনৈপুণ্য ও সৃষ্টিশীলতা আজও মানুষকে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে।


সৌজন্যেঃ রথযাত্রা
 
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।