• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

শ্রীকৃষ্ণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শ্রীকৃষ্ণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৯ জুন ২০২০

'কৃষ্ণ' নামের ব্যুৎপত্তি

আমরা জানি, পরমেশ্বর ভগবানের অনন্ত নামের মধ্যে 'কৃষ্ণ' নামটি অতি উৎকৃষ্ট ও উৎফুল্ল জনক। এই নামটির উৎপত্তি সম্পর্কিত কিছু ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করা যাক। কৃষ্ণ নামের মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লুকিয়ে আছে। কৃষ্ণ লিখতে হলে, প্রথমে ব লিখে কুন্ডলি দিয়ে ঋ দিয়ে ষ্ণ যোগ করতে হয়।

ক- এর প্রথম টানে ব্রহ্মা, দ্বিতীয় টানে বিষ্ণু, তৃতীয় টানে মহেশ্বর বিরাজ করেন। অর্থাৎ ব হয়ে গেলো। এবার কুন্ডলিনী হলেন রাধা।

ঋ- তে বিরাজ করেন যোগমায়া আর

ষ্ণ- তে বিরাজ করেন ত্রিভূবন, চন্দ্র, অরুন, বরুন , আদি ইত্যাদি।

এই তত্ত্বটি ধ্যান যোগে ঋষি গর্গাচার্য্য মুনি জানতে পেরেছিলেন তখন, যখন নামকরনের জন্য নন্দলাল ও যশোদা ঋষির কাছে গিয়েছিলেন। ঋষি ছিলেন একজন ত্রিকালদর্শী, কৃষ্ণ নামটি ইনি রেখেছিলেন।


সৌরমন্ডলে সূর্যের আকর্ষনে যেমন প্রতিটা গ্রহ বা উপগ্রহ আপন আপন কক্ষপথে ঘুরে চলেছে, তেমনি এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মান্ডকে যিনি নিজের দিকে আকর্ষন করে চলেছেন তিনি হলেন কৃষ্ণ। এই সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষন সত্তা হলেন এই কৃষ্ণ। যাঁর আকর্ষন শক্তি থেকে কেউ রেহাই পেতে পারে না। এই শব্দ থেকেই গতি, শক্তি, রতি ও প্রেমের উদয় হয়।

এখন প্রশ্ন আসে কিসের প্রেম গো! মা যশোমতির বাৎসল্য প্রেম। গোকুলের রাখালদের সখ্য প্রেম। আর ব্রজগোপীদের মধুর প্রেম। এই কৃষ্ণেই হলো ভগবান। এবার মিলিয়ে দেখা যাক বিষয়টি।

ভ- মানে ভূমি,
গ- মানে গগন,
ব- মানে বায়ু,
আ-মানে আগুন আর
ন- মানে নীর।

অর্থাৎ, ভগবান মানে ক্ষিতি-অপ-ত্বেজ-মরুৎ-ব্যোম। ভোগ ভোক্তাকে যিনি সমজ্ঞান করে রেখেছেন, তিনি ভগবান। এটা তো গেলো অন্তর্নীহিত অর্থ। বাহ্যিক অর্থ হলো, 'ভগ' শব্দটির অর্থ হলো ঐশ্বর্য্য, ধার্য্য, জ্ঞান, যশ, শ্রী ও বৈরাগ্য। আর 'বান' মানে অধিকারী। এই ছয় প্রকার সম্পদ যাঁর মধ্যে অনন্ত পরিমানে বিদ্যমান কেবল তিনি ভগবান। ইনি নিরাকার পরমব্রহ্ম। ইনি সব কারণের কারণ, ইনি অবিনাশী, ইনি স্বয়ম্ভু, বেদের মধ্যে ওঁ কার ইনি, জলের মধ্যে রস ইনি, সূর্যের মধ্যে তেজ ইনি, চন্দ্রের মধ্যে শোভা ইনি, একাদশ রুদ্রের মধ্যে ইনি, দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে ইনি, অষ্টবসুর মধ্যে ইনি, এই ঈশ্বর যুগে যুগে বিভিন্ন মানবীয় অবতারে পৃথিবীতে এসেছেন।

যিনি সব করতে পারেন, তিনি কি আর মানব হয়ে পৃথিবীতে আসতে পারেন না? অবশ্যযই পারেন! মা যোশদা কৃষ্ণের মুখের ভিতরে সৌর জগৎ, মহাকাশ, নিহারীকা অর্থাৎ সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ড দর্শন করেছেন। ইনি প্রত্যেকটি জীবদেহেও আছেন। আমার মধ্যে ইনি আর সর্বজীবের মধ্যেও ইনি।

এখানে আমরা একটি বিষয় অবতারনা করতে পারি যে, তাহলে যে ব্যাক্তি অন্যায়, পাপাচার ইত্যাদি করছে, যে মানুষ অন্যকে কষ্ট দিচ্ছে তার মধ্যেও কি কৃষ্ণ আছেন? উত্তর হবে, অবশ্যই আছেন। তবে কারো কর্মের উপর ঈশ্বরের কোনো দ্বায় বা অধিকার নেই। এই সব আমরা করে থাকি যোগমায়ার প্রভাব দ্বারা। যোগ মায়ার সাহায্য না নিলে এই পৃথিবীটাকে ঈশ্বর নাট্য মঞ্চ বানাতে পারবেন না।

সব থেকে পরম সত্য হলো যে, আমরা মাতৃগর্ভে কৃষ্ণকে দর্শন করেছি। যখনই পৃথিবীতে এলাম সঙ্গে সঙ্গে যোগমায়া আমাদের চোখে একটি পর্দা দিয়ে দিলেন। গোবিন্দকে দেখতে না পেয়ে আমরা কেঁন্দে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে মা আমাদের পৃথিবীর অমৃত মুখে তুলে দিলেন। ধীরে ধীরে বড় হলাম। মা পরিচয় করে দিয়ে বললেন, 'এই হলো তোর বাবা, দাদা, কাকা, মামা ইত্যাদি।' কিন্তু আজ পর্যন্ত মা আমাদের পরম আত্মীয় দীনবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করে দেননি। দিনের শেষে যাকে আমাদের প্রয়োজন। ধীরে ধীরে পার্থিব জগতে আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। অন্তরে বিরাজিত গোবিন্দকে ভুলে গেলাম।

কৃষ্ণ কিন্তু যোগমায়ার অধিন নন। যোগমায়াকে কৃষ্ণের অধিনে থাকতে হয়। এনার শক্তির উপরে কেউ নয়। রুক্মিণীদেবীকে যখন আনতে যায়, তখন রুক্মিনী দেবীর ভাই রুক্মী কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন। রুক্মী ছাড়লেন ব্রহ্মাস্ত্র। ব্রহ্মাস্ত্র কৃষ্ণকে প্রনাম করে চলে গেলেন।

 সুভদ্রা কেঁন্দে কেঁন্দে কৃষ্ণকে বলছেন, "দাদা তুমি তো অন্তর্যামী, তুমি জানতে যে অভিমণ্যু যুদ্ধে মারা যাবে, তাহলে তাকে বাচালে না কেনো?"

কৃষ্ণ বললেন, "আমাকেও বিধির বিধান মেনে চলতে হয়।"

গুরু দ্রোন একবার ভীষ্মকে বলছেন যে, কাল শ্রীকৃষ্ণ আসছেন শান্তিরদূত হয়ে। তিনিই এই যুদ্ধটা রুখতে পারবেন। পিতামহ ভীষ্ম বলছেন, "কৃষ্ণকে বুঝবার মতো বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডে কেই নেই। তিনি আশা-নিরাশা, সত্য-অসত্য, ধর্ম-অধর্ম এই সব কিছুর উপরে।

রাধা কৃষ্ণকে বলছেন, "তুমি তো ভক্তের দাস। তাহলে তুমি কথা দাও আমাকে ছেড়ে কো
নোদিন যাবে না।"

কৃষ্ণ দেখলেন যে, তাঁর তো এখনো অনেক কাজ বাকি। কংস বধ, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ, কালযবন বধ, মুর দৈত্য বধ, জরাসন্ধের সঙ্গে যুদ্ধ এই কাজগুলো সবই বাকি। কৃষ্ণ রাধিকাকে বললেন, "ঠিক আছে তুমি যখন যেতে বলবে তখনই যাবো।"

কৃষ্ণ বাকি দেবতাদের স্মরন করলেন। তাঁরা এসে রাধাকে বোঝালেন যেনো এভাবে কৃষ্ণকে ধরে না রাখে। এরফলে রাধা অনুমতি দেয় কৃষ্ণকে যেতে।

শ্রীকৃষ্ণের অনন্তকোটি লীলা। ব্যাসদেবও যা লিখে শেষ করতে পারেন নি। আর আমরা তো অতি অজ্ঞ নগন্য মাত্র।

। জয় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।

  পরমকরুনাময় গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ ভগবান, পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণী আর সকল বৈষ্ণব ভক্ত পার্ষদদের শ্রীচরণকমলে নিরন্তর প্রার্থনা করি, সকলের জীবন যেনো রাধাকৃষ্ণময়তায় পূর্ণ হয়ে, মঙ্গলময়, কল্যাণময়, প্রেমময়, ভক্তিময়, মুক্তিময়, শান্তিময়, সুন্দরময় এবং আনন্দময় হয়ে ওঠে সর্বদা।
"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় হোক সকল ভক্তদের!!
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!

Post: Debendra Biswas
Share:

১৭ এপ্রিল ২০২০

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরর ৬৪ গুন ।

আমাদের ভক্ত বন্ধুদের আহবান করবো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৬৪ গুন সম্বন্ধে জানার জন্য। এই গুন গুলি আমরা দেবী ভগবতীর মধ্যেও দেখতে পাই। এ থেকে শ্রীকৃষ্ণ আর কালী বা শক্তি একাকার হয়ে যায়, যখন শক্তি হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের যোগমায়া শক্তি। শ্রীল রূপ গোস্বামী নানা শাস্ত্র বিচার করে শ্রীকৃষ্ণের নিম্মোক্ত গুণাবলী উল্লেখ করেন। যা হলোঃ

১) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সমস্ত শরীর অপূর্ব মাধুর্য মণ্ডিত, মা মহামায়া হলেন ত্রিলোক সুন্দরী, তাই এক নাম ত্রিপুরসুন্দরী, সেই সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে জগত জননীকে কু ভাবে প্রাপ্ত করতে গিয়ে শুম্ভ নিশুম্ভ সৈন্য সমেত ধ্বংস হয়, রাবণেরও সেই হাল। সীতা দেবী মহা ভগবতী মা লক্ষ্মীর অংশ, তুলসী দেবীর স্বামী জালন্ধর মা পার্বতীকে প্রাপ্ত করতে গিয়ে নিহত হয়।

২) শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত মনোরম, মা হলেন স্বয়ং মনোরমা। হর সুন্দরী।

৩) সমস্ত শুভ লক্ষণ যুক্ত হলেন শ্রীকৃষ্ণ, মা হলেন সকল মঙ্গলের জননী, তাই তিনি মঙ্গলচণ্ডী।

৪) শ্রীকৃষ্ণ হলেন জ্যোতির্ময়, মায়ের দিব্যতেজে অসুর গণ চমকিত হয়েছিলো, মায়ের তেজে সমস্ত জগত ভরে আছে। চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি মায়ের তিনটি নয়ন।

৫) শ্রীকৃষ্ণ বলবান। মা স্বয়ং আদিশক্তি। যুদ্ধে তিনি অনেক বলশালী অসুরদের ছিন্নভিন্ন করেছেন।

৬) শ্রীকৃষ্ণ হলেন নিত্য নব যৌবন সম্পন্ন। মা জগদম্বা নিত্যা। তিনি নব যৌবন সম্পন্না। মায়ের ধ্যান মন্ত্র তাই বলে।

৭) শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত ভাষাতেই পারদর্শী, মা হলেন স্বয়ং বিদ্যারূপিনী সরস্বতী। তাঁর কাছে কোনো ভাষাই গুপ্ত নয়।

৮) শ্রীকৃষ্ণ হলেন সত্যবাদী। মা স্বয়ং সত্যের আধার। সত্য রূপ শিবের শক্তি তিনি।

৯) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রিয় ভাষী। মায়ের কথাও তেমনি অমৃত মধুর। সেই মমতা মাখা কথা শুনতেই মা সারদার কাছে দক্ষিণেশ্বরে কতো ভক্ত ছুটে আসতেন।

১০) শ্রীকৃষ্ণ হলেন বাকপটু। আর মায়ের সরস্বতী রূপের করুণায় সকলের মুখে বাক্য আসে। লেখাপড়া শেখে।

১১) শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম পণ্ডিত। মা হলেন পণ্ডিত গনের মস্তকের মেধা। তিনি নিজেই জ্ঞান রূপিনী। অজ্ঞান নাশ করেন। তাই মায়ের হাতে খড়গ।

১২) শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম বুদ্ধিমান। মা বুদ্ধি রূপে সকল প্রানীতে অবস্থিত। তিনি নিজেই বুদ্ধির জননী।

১৩) শ্রীকৃষ্ণ অপূর্ব প্রতিভাশালী, মা স্বয়ং তাই। যখন গিরিজায়া মা পার্বতী হিমালয় রাজাকে ব্রহ্মজ্ঞান দিয়েছিলেন, তখুনি মায়ের প্রতিভার কথা পাওয়া যায়।

১৪) শ্রীকৃষ্ণ বিদগ্ধ শিল্প কলায় পারদর্শী, মা হলেন শিল্প কলার দেবী বাগদেবী।

১৫) শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত চতুর, মা চতুরতায় শুম্ব নিশুম্ভকে সৈন্য সমেত বধ করেন।



১৬) শ্রীকৃষ্ণ পরম দক্ষ। মা জগত পালিনী শক্তি। তিনি সব কিছুতেই দক্ষ।


১৭) শ্রীকৃষ্ণ হলেন কৃতজ্ঞ। মা ও তাই। ভক্তদের বশে থাকেন।

১৮) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মা ও তাই। অসুর বধের সঙ্কল্পে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

১৯) শ্রীকৃষ্ণ স্থান কাল পাত্র সম্বন্ধে বিচার করতে দক্ষ। মা নিজেও তাই। যাকে যা দেবার তিনি তাকে তাই দেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব একটি উদাহরণ দিয়েছেন। এক বাড়ীতে মাছ এনেছে। এক ছেলের পেট খারাপ। মা তাকে অল্প ঝোল করে দিলেন। যার পেট ভালো তাকে মশলা দ্বারা রান্না করে দিলেন। ঠিক যাকে যা দেবার মা তাকে দেন।

২০) বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান এর পরিপ্রেক্ষিতে দর্শন করতে আর উপদেশ দিতে অত্যান্ত পারদর্শী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। মা স্বয়ং বেদমাতা গায়ত্রী। সমস্ত মন্ত্র তিনি। তিনি তুষ্ট হলে ব্রহ্মজ্ঞান দেন, সমাধি বৈশ্যকে দিয়েছিলেন।

২১) শ্রীকৃষ্ণ হলেন পবিত্র। মা স্বয়ং পবিত্রতার আধার। দক্ষ যজ্ঞে শিব নিন্দা শুনে মা সতী ভেবেছিলেন স্বামী নিন্দা শ্রবন করে তিনি অপবিত্র হয়েছেন, তাই প্রান ত্যাগ করলেন।

২২) শ্রীকৃষ্ণ হলেন সংযত। মহামায়াও তাই। তিনি চাইলে প্রথমেই শুম্ভ নিশুম্ভকে বধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভগবান শিবকে দূত করে অসুরদের বোঝাতে চেয়েছিলেন।

২৩) শ্রীকৃষ্ণ হলেন অবিচলিত। মা নিজেও তাই, শিব শক্তি রূপে অবিচল ভাবে তপঃ রূপা।

২৪) শ্রীকৃষ্ণ হলেন জিতেন্দ্রিয়। মাও তাই। তিনি ইন্দ্রিয় দমন করেছেন। ব্রহ্মচারিণী রূপে তপস্যা করে রিপু দমন করলেন। একদা ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব মা সারদার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তুমি কি আমায় সংসার পথে টানতে এসেছো?’। মা সারদা উত্তর দিলেন, ‘না। আমি তোমার ইষ্ট পথে সাহায্য করতে এসেছি।’ স্বয়ং রতি পতি কামদেব কামাখ্যাধামে মায়ের শরণাগত হয়েছেন।

২৫) শ্রীকৃষ্ণ হলেন ক্ষমাশীল। মা স্বয়ং ক্ষমা রূপে সর্বত্র বিরাজিতা। অসুর রাও মায়ের সন্তান। বধ করার আগে মা শুধরানোর সুযোগ দিলে অসুররা মানে না। তাই মা বধ করতে বাধ্য হন। পরশুরাম গণেশের দন্ত কেটে ফেললেও মা গৌরী তাকে ক্ষমা করেছিলেন।

২৬) শ্রীকৃষ্ণ হলেন গম্ভীর। মা তপস্যা রূপে গম্ভীর।

২৭) শ্রীকৃষ্ণ হলেন আত্মতৃপ্ত। মা নিজেও তাই।

২৮) শ্রীকৃষ্ণ হলেন সম দৃষ্টি সম্পন্ন। মা নিজেও তাই। সবাইকে সমান ভালোবাসেন, অসুরদেরও। তাই অসুরদের শুধরানোর সুযোগ দেন। আবার দোষ করলে দেবতাদেরও শাস্তি দেন। অগ্নি দেবতা যেমন দেবী পার্বতীর কাছে শাপ পেয়েছিলেন। তিনি দেবী বলে দেবতাদের অপরাধকেও ক্ষমা করেন না।

২৯) শ্রীকৃষ্ণ হলেন উদার। মায়ের দয়ার কথা বলে শেষ করা যাবে না। মা নিজেই দয়ার রূপ। মা মানেই দয়াময়ী।

৩০) শ্রীকৃষ্ণ হলেন ধার্মিক। মা নিজে ধর্মের প্রতিমূর্তি। পাতিব্রত্য ধর্ম, মাতৃ ধর্ম তিনি জগতকে শেখান। তিনি শিবজায়াও আবার গণেশ জননী।

৩১) শ্রীকৃষ্ণ হলেন বীর। মা নিজেও বীরাঙ্গনা। দুর্ধর্ষ দানবদের নাশ করেন।

৩২) শ্রীকৃষ্ণ হলেন কৃপাময়। মা স্বয়ং কৃপাময়ী। মায়ের কৃপাতে জগত অন্নপূর্ণা থেকে অন্ন পাচ্ছেন। মা সারদা বলতেন, ‘আমার সন্তান যদি ধূলো কাদা মাখে তাহলে আমাকেই ঝেড়ে কোলে নিতে হবে।’

৩৩) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন শ্রদ্ধাবান। মা স্বয়ং শ্রদ্ধা রূপে বিরাজিতা। যা চণ্ডীর স্তবেই আছে।

৩৪) শ্রীকৃষ্ণ হলেন বিনীত। মা নিজেও তাই। তপস্যাতে বিনীত হয়ে শেষে দেবাদিদেবকেই পতি হিসাবে পেলেন।

৩৫) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন শান্ত। মা শান্ত রূপে গৌরী, উমা।

৩৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন লজ্জাশীল। মা স্বয়ং লজ্জা রূপে বিরাজিতা। সকল প্রানীতে তিনিই লজ্জা। স্বামীর বুকে চরণ রেখে লজ্জায় জিহ্বা বের করেছেন।

৩৭) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন শরণাগতের রক্ষক। মায়ের প্রনাম মন্ত্রে বলে তিনি শরণাগতকে আশ্রয় দান করেন। একবার এক চোর বেলুরে চুরি করেছিলো। স্বামীজি জানতে পেরে তাকে তাড়াবেন ভাবলেন। চোরটি এসে সোজা মায়ের কাছে আশ্রয় নিয়ে বাঁচতে চাইলো। মা সারদা দেবী তাকে ক্ষমা করলেন। মা রক্ষা করলে আর ভয় কি। চোরটি আর কোনো রূপ শাস্তি পায় নি। এমনি মায়ের দয়া।

৩৮) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সুখী। মা নিজে সুখ সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী।

৩৯) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন ভক্তদের হিতৈষী। মা পরম দয়াময়ী। ভক্তদের মঙ্গল করেন। তিনি ভক্তদের উগ্র বিপদ থেকে রক্ষা করেন তাই তিনি উগ্রতারা। তিনি বিপদ দূর করেন তাই তিনি বিপদতারিনী চণ্ডী।

৪০) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন.প্রেমের বশীভূত। প্রেম ভালোবাসা না থাকলে কোনো সাধনা হয় না। মাকে যে প্রেম ভালোবাসা দিয়ে ডাকে মা তাঁর কাছেই যান।

৪১) ভগবান কৃষ্ণ হলেন সর্ব মঙ্গলময়। মায়ের প্রনাম মন্ত্রেই বলা হয় ‘সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে’। মা সকল মঙ্গলের জননী। মায়ের নামেই মঙ্গল নেমে আসে। তাই বৈশাখ মাসে তিনি মঙ্গলচণ্ডী নামে পূজিতা হন।

৪২) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সব চাইতে শক্তিশালী। মা হলেন তাই। আদ্যাশক্তি। মূলাশক্তি।

৪৩) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম যশস্বী। মা হলেন পরমা যশস্বিনী। তাই মায়ের কাছে আমরা অঞ্জলি দিয়ে প্রার্থনা জানাই ‘আয়ু দাও, যশ দাও’।

৪৪) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন ভক্ত বৎসল। মা নিজেও তাই। পুরাকালে মুনি ঋষিরা এই মহাদেবীর স্তব করে মনো বাঞ্ছিত ফল পেতেন। ত্রষ্টা মুনি ইন্দ্রের থেকে প্রতিশোধ নেবার জন্য জগদম্বার তপস্যা করে মনো বাঞ্ছিত ফল পেয়েছিলেন। মেনকা দেবী জগদম্বাকে কন্যা রূপে চেয়েছিলেন। দেবী কন্যা রূপে এসেছিলেন। মাতঙ্গ মুনি দেবীর কাছে বশীকরণ বিদ্যা চেয়েছিলেন মা তাকে তাই দিয়েছিলেন।

৪৫) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সমস্ত স্ত্রীলোকের কাছে আকর্ষণীয়। মা স্বয়ং সকল স্ত্রীর মধ্যে বিরাজিতা। চণ্ডীতে একথা দেবতাদের স্তবে স্পষ্ট। নর রূপে নারায়ন, নারী রূপে লক্ষ্মী। নর আর নারী।

৪৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সকলের আরাধ্য। মা জগদম্বাও তাই। প্রজাপিতা ব্রহ্মা মায়ের আরাধনা করেছিলেন। ত্রিদেব মিলে দেবী কমলার পূজা করেছিলেন। স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্র এই মহামায়ার পূজা করেছিলেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণু মায়ের বগলা রূপকে পূজা করেছিলেন।

৪৭) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন জনপ্রিয়। মা নিজেও তাই। প্রাচীন কাল থেকে পৃথিবীতে অনেক দেশে দেবী রূপে মাকে পূজা করা হতো। ভারতবর্ষের সিন্ধু সভ্যতায় দেবী মূর্তি পূজা হতো। তার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। মায়ের যতো রূপের পূজা হিন্দুর ঘরে ঘরে হয়, ততো আর কারোর বোধ করি হয় না। মায়ের অনন্ত কোটি রূপ।

৪৮) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী। মা নিজে ঐশ্বর্য দায়িনী দেবী লক্ষ্মী। ধনলাভের আশায় সকাম ভক্তেরা বিষ্ণুপ্রিয়ার আরাধনা করি। দোকানে লক্ষ্মী যন্ত্র স্থাপন করি।

৪৯) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সকলের মাননীয়। মা হলেন সকলের মাননীয়া। চৌদ্দ ভুবনের সকলেই দিবারাত্র মায়ের স্তব করে। তিনি দেবতা, অসুর, নাগ, যক্ষ, রক্ষ, কিন্নর, গন্ধর্ব, অপ্সরা, চারন, সিদ্ধ, বেতাল, কুস্মান্ড, মানুষ, পক্ষী, পশু এমনকি ত্রিদেব স্বয়ং মহাদেবীর বন্দনা করেন। বৃন্দাবনের পথে অজস্র ভক্ত দিবারাত্র শ্রীরাধারানীর নাম করে চলছেন।

৫০) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম নিয়ন্ত্রা। মা স্বয়ং ব্রহ্মাণ্ডের ধারিনী শক্তি জগদ্ধাত্রী। তিনি ধারন না করলে গ্রহ গণ কক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতো। জীব কূল টিকতো না। মা সব কিছুই নিয়ন্ত্রন করেন।

৫১) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন অপরিবর্তনশীল। মা নিজেও তাই। যখন যেমন, ঠিক তেমনই রূপ ধারন করেন।

৫২) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সর্বজ্ঞ। মা হলেন মহাযোগিনী।

৫৩) যোগিনী মায়ের সেবা করে। মা সব জানেন। মায়ের কাছে কিছুই গুপ্ত নয়। মা নিজে সর্বজ্ঞ।

৫৪) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন চির নবীন। মা নিজে নবীনা। ধূমাবতী রূপে বিধবা, বৃদ্ধা রূপ ধারন করলেও পুনরায় বগলাএরূপে নবীনা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সচ্চিদানন্দ। মা নিজেই আনন্দময়ী। তাঁর নাশ নেই, জন্ম নেই। তিনি নিজে নিজেই আবির্ভূতা।

৫৫) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সমস্ত রকম যোগের সিদ্ধির অধিকারী। মা স্বয়ং সিদ্ধিদাত্রী। নানা প্রকার সিদ্ধি তিনি তিনি দান করেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে যে ১৮ রকম সিদ্ধির উল্লেখ পাওয়া যায়, মা সব দান করেন। তাই সিদ্ধি লাভের আশায় তান্ত্রিকগণ তন্ত্র সাধনা করেন মাকে তুষ্ট করার জন্য। মায়ের এক নাম সিদ্ধেশ্বরী। সকল প্রকার সিদ্ধি মায়ের চরণ তলে।

৫৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন অচিন্ত্য শক্তি সম্পন্ন। মা ভগবতী স্বয়ং আদিশক্তি। তিনি ব্রহ্মাণী, নারায়নী, মহাকালী। তিনিই সীতা, রুক্মিণী, রাধা, বিষ্ণুপ্রিয়া, সারদা। তিনি মূলশক্তি। সমস্ত শক্তির উৎস তিনি।

৫৭) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দেহ থেকে অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়, মা হলেন সেই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির শক্তি। ব্রহ্মাণ্ড ধারিনী শক্তি। সৃষ্টির পূর্বে যখন কিছুই ছিলো না তখনও তিনি ছিলেন। আবার যখন সব ধ্বংস হবে তখনও তিনি থাকবেন। শক্তির নাশ হয় না।

৫৮) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন সমস্ত অবতারের আদি উৎস। মা হলেন সেই অবতারের শক্তি। শক্তি ভিন্ন ব্রহ্ম জড়।

৫৯) শ্রীকৃষ্ণের হাতে মৃত জনেরা মুক্তি পায়। মা হলেন মোক্ষ প্রদা। সুতরাং মায়ের অস্ত্রে যে সব অসুরগণ নিহত হয়েছে তাঁরা মোক্ষ প্রাপ্তি করবেই, এতে সন্দেহ নেই। তারা দেবাত্মা হবে। তাই মহিষাসুরের পূজা হয়। মা কালীর পূজার সময় তাঁর মুন্ডমালার পূজাও করা হয়।

৬০) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন মুক্তিদাতা। মা সকলের মুক্তি প্রদায়িনী। চণ্ডীর স্তবে একথা স্পষ্ট। মায়ের মায়াজালে যেমন বন্দী হয়, তেমনই মা প্রসন্না হলে মুক্তির পথ তিনিই দেখান।

৬১) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নানারকম লীলা বিলাস করেন, বিশেষ করে বাল্যলীলা। মা হিমালয় ভবনে জন্ম নিয়ে নানান লীলা করছেন। কখনো মা মেনকাকে স্বপ্নে কালী রূপে দেখা দিলেন, কখনো পিতা হিমালয়কে ব্রহ্মজ্ঞান দিলেন। মা সারদা যখন জয়রামবাটিতে তিনিও নানা লীলা প্রকাশ করেছিলেন। কখনো ভীড়ের মধ্যে ওনাকে জিজ্ঞেস করা হলে, ‘তোমার পতি কে’? উনি ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবকেই দেখিয়েছিলেন। বৈকুন্ঠের লক্ষ্মী নারায়নের মর্ত্যলীলা। আবার অন্নপূর্ণা রূপে দুর্ভিক্ষ কালে নিজেই বাতাস করছেন খিচুড়ী ঠান্ডা হবার জন্য যাতে লোকেরা ক্ষিদেতে আর কষ্ট না পায়, তাড়াতাড়ি খেতে পায়। মায়ের লীলাকে বুঝতে পারে। স্বয়ং পরমপিতা ব্রহ্মাও জানেন না। আমরা মানুষগণ তো কোন ছার।

৬২) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন ভক্তগণ পরিবৃত। মা নিজেও তাই। মন্দিরে মন্দিরে সর্বক্ষণ ভক্তরা মায়ের জয়ধ্বনি করেন। দেবীভাগবত পুরান মতে, ত্রিদেব দেবীলোকে গিয়ে দেখলেন সেখানকার ভ্রমর, পাখীগুলি পর্যন্ত দেবীর বীজ উচ্চারন করছে গুনগুন করে। অনেক সেবিকা দেবীর সেবায় রতা।

৬৩) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বাঁশিতে সকলে আকর্ষিত মোহিত হন। মায়ের মায়াতে তো ত্রিলোক আচ্ছন্ন।

৬৪) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন অতুলনীয় সৌন্দর্য মণ্ডিত। মা হলেন সর্ব সুন্দরী। তিনি ষোড়োশী, আবার তিনিই ত্রিপুরাসুন্দরী।


উক্ত ৬৪ গুন আমরা মহামায়ার মধ্যেও দেখতে পাই। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় মহামায়ার মধ্যেও সেই ৬৪ গুন আছে। এ থেকে পরিষ্কার। শ্যাম আর শ্যামা এঁনারা এক। কোনো ভাবেই আলাদা নয়। এখনও কি সেই নবোদিত, নবোসৃষ্ট ভক্তেরা মানবে না যে, মা শ্যামের দাসী নয়, শক্তি। মানলে ভালো, না মানলে তাদেরই অজ্ঞতা, গোঁড়ামী। যাই হোক এই আলোচোনা এখানেই সমাপ্ত করলাম।


জয় জয় জগৎ-জননী! মহামায়া।
দুঃখিত জীবেরে দেহ চরণের ছায়া।।
জয় জয় অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটিশ্বরী।
তুমি যুগে যুগে ধর্ম রাখ অবতরি।।
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরে তোমার মহিমা।
বলিতে না পারে অন্যে কে দিবেক সীমা।।
জগৎ- স্বরূপা তুমি, তুমি সর্ব শক্তি।
তুমি শ্রদ্ধা, দয়া, লজ্জা তুমি বিষ্ণু ভক্তি।।
যত বিদ্যা সকল তোমার মূর্তি ভেদ।
সর্ব–প্রকৃতির শক্তি তুমি কহে বেদ।।
নিখিল ব্রহ্মাণ্ডগণের সর্ব মাতা।
কে তোমার স্বরূপ কহিতে পারে কথা।।
তুমি ত্রিজগতহেতু গুনত্রয়ময়ী।
ব্রহ্মাদি তোমারে নাহি জানে, এই কহি।।
সর্বাশ্রয়া তুমি সর্ব জীবের বসতি।
তুমি আদ্যা অবিকারা পরমা প্রকৃতি।।
জগৎজননী তুমি দ্বিতীয়–রহিতা।
মহীরুপে তুমি সর্ব জীব পাল মাতা।।
জল রূপে তুমি সর্ব জীবের জীবন।
তোমা সঙরিলে খন্ডে অশেষ বন্ধন।।
সাধুজন গৃহে তুমি লক্ষ্মী মূর্তিমতী।
অসাধুর ঘরে তুমি কালরূপাকৃতি।।
তুমি সে করাহ ত্রিজগতে সৃষ্টি-স্থিতি ।
তোমা না ভজিলে পায় ত্রিবিধ দুর্গতি।।
তুমি শ্রদ্ধা বৈষ্ণবের সর্বত্র উদয়া।
রাখহ জননী! দিয়া চরণের ছায়া।।
তোমার মায়ায় মগ্ন সকল সংসার।
তুমি না রাখিলে মাতা! কে রাখিবে আর।।
সবার উদ্ধার লাগি তোমার প্রকাশ।
দুঃখিত জীবের মাতা! কর নিজ দাস।।
ব্রহ্মাদির বন্দ্য তুমি সর্বভূত–বুদ্ধি।
তোমা সঙরিলে সর্ব মন্ত্রাদির শুদ্ধি।।
এই মত স্তুতি করে সকল মহান্ত।
বর–মুখ মহাপ্রভু শুনয়ে নিতান্ত।।
(চৈতন্য ভাগবত, শ্রী বৃন্দাবন দাস ঠাকুর, মধ্য-১৮)
.
।জয় কৃপাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।


পরমকরুনাময় গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ ভগবান পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণী আর সকল বৈষ্ণব ভক্ত-পার্ষদদের শ্রীচরণকমলে নিরন্তর প্রার্থনা করি, সকলের জীবন যেনো রাধাকৃষ্ণময়তায় পূর্ণ হয়ে, মঙ্গলময়, কল্যাণময়, প্রেমময়, ভক্তিময়, মুক্তিময়, শান্তিময়, সুন্দরময় এবং আনন্দময় হয়ে ওঠে।
"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় হোক সকল ভক্তদের!!
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!



Post Courtesy: Debendra Biswas



Share:

০২ এপ্রিল ২০২০

গরুড়পুরাণে উল্লেখিত ভগবান শ্রীনারায়ণের সুদর্শন চক্রের স্তবস্তুতি


ভগবান শ্রীনারায়ণের প্রধান অস্ত্র সুদর্শন চক্র। সুদর্শন চক্র দ্বারা তিঁনি দানব নাশ করে ধর্ম সংস্থাপন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রধান অস্ত্র এই সুদর্শন চক্র । গরুড়পুরাণে উল্লেখিত হয়েছে ভগবানের এই সুদর্শন চক্রের স্তবস্তুতি-
নমঃ সুদর্শনায়ৈব সহস্রাদিত্যবর্চ্চসে ।
জ্বালামালাপ্রদীপ্তায় সহস্রারায় চক্ষুণে ।।
সর্ব্বদুষ্টবিনাশায় সর্ব্বপাতকমর্দ্দিনে ।
সুচক্রায় বিচক্রায় সর্ব্বমন্ত্রবিভেদিনে ।।
প্রসবিত্রে জগদ্ধাত্রে জগদ্বিধ্বংসিনে নমঃ ।
শর্ণ্মদায় চ দেবানাং দুষ্টাসুরবিনাশিনে ।।
উগ্রায় চৈব সৌম্যায় চণ্ডায় চ নমো নমঃ ।
নমশ্চক্ষুঃস্বরূপায় সংসারভয়ভেদিনে ।।
মায়াপঞ্জরভেত্রে চ শিবায় চ নমো নমঃ ।
গ্রহাতিগ্রহরূপায় গ্রহাণাং পতয়ে নমঃ ।।
কালায় মৃত্যবে চৈব ভীমায় চ নমো নমঃ ।
ভক্তানুগ্রহদাত্রে চ ভক্তগোপ্তে নমো নমঃ ।।
বিষ্ণুরূপায় শান্তায় চায়ুধানাং ধরায় চ ।
বিষ্ণুশস্ত্রায় চক্রায় নমো ভূয়ো নমো নমঃ ।।
ইতি স্ত্রোত্রং মহাপুণ্যং চক্রস্য তব কীর্ত্তিতম্‌ ।
যঃ পঠেৎ পরয়া ভক্ত্যা বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি ।।
( গরুড়পুরাণ/ পূর্বখণ্ড/ ত্রয়স্ত্রিংশোহধ্যায়ঃ/ ৯-১৫ )
বাংলা অনুবাদ- সহস্র সূর্যতুল্য তেজোবিশিষ্ট সুদর্শনচক্রকে নমস্কার । সুদর্শন ; তোমার স্বীয় কিরণজালে দিগন্ত ব্যাপ্ত হইয়াছে । তুমি সহস্র অরবিশিষ্ট ও চক্ষুঃস্বরূপ , তোমাকে নমস্কার। হে সুদর্শনচক্র ! তুমি সর্বদুষ্টবিনাশ করে বিবিধ পাপ নিবারণ কর। তুমি সুচক্র ও বিচক্রস্বরূপ , তোমা হইতেই সর্বপ্রকার মন্ত্র প্রকাশিত হইয়াছে । তুমি জগতের সৃষ্টি- স্থিতি- প্রলয় করিতেছ , তোমাকে নমস্কার । তুমি লোকপালনার্থ দুষ্ট অসুরদিগকে বিনাশ কর। তুই দুষ্ট দৈত্যদিগের পক্ষে উগ্রমূর্তি ও শান্তশীল দেবগণের পক্ষে সৌম্যমূর্তি ধারন করিয়াছ । তুমি চণ্ডমূর্তি , জগতের চক্ষুঃস্বরূপ ও সংসারভয়বিনাশকারী তোমাকে নমস্কার । তুমি মায়া পঞ্জর ভেদ কর , তুমি শিবস্বরূপ তোমাকে নমস্কার । তুমি গ্রহদিগেরও গ্রহস্বরূপ এবং গ্রহাধিপতি ; তোমাকে নমস্কার । তুমি কালস্বরূপ, মৃত্যুস্বরূপ ও ভীমরূপী , তোমাকে নমস্কার। তুমি ভক্তবৃন্দের প্রতি অনুগ্রহদানে তাহাদিগকে রক্ষা করিয়া থাক, তোমাকে নমস্কার। তুমি বিষ্ণুরূপী, শান্তশীল ও আয়ুধধারী ; তুমি বিষ্ণুর প্রধান শস্ত্র ; তোমাকে বারংবার নমস্কার। এই মহাপুণ্যস্তব কথিত হল। যে সাধক পরমভক্তি সহকারে এই স্তব পাঠ করে, সে অন্তকালে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয় ।
Share:

২৫ এপ্রিল ২০১৯

কৃষ্ণ বলরাম অর্থনীতি

কৃষ্ণ বলরাম অর্থনীতির মূল কথা হচ্ছে কৃষি এবং গোরক্ষা। বাণ্যিজিক যদিও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবে সে বাণিজ্য নাট-বোল্ট বা লিপস্টিক কিংবা মদ-মাংস ভত্তিক বানিজ্য নয়, কৃষি এবং গোরক্ষা ভিত্তিক। কৃষ্ণ বাঁশি বাজিয়ে গাভী এবং ষাঁড়দের নিয়ন্ত্রন করতেন । আর বলরাম লাঙ্গল দিয়ে কৃষিকাজের মহিমা প্রতিষ্ঠা করেন । গাভী থেকে পাই সুষম পানীয় দুধ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্বালানী ঘুঁটে এবং জৈব সার । ষাঁড় থেকেও পাই ঘুঁটে এবং জৈব সার আর ষাঁড় দিয়েই লাঙ্গল চালিয়ে পাই ধান, চাল, শাক-সবজি ইত্যাদি । এরই নাম KB Economics (কৃষ্ণ বলরাম অর্থনীতি)



তিন মাসে তিন ডাবল

কোন কোন ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে পাঁচ থেকে আট বছরের মধ্যে ডাবল হয় । কিন্তু সেই ডাবল হওয়াটা স্বপ্ন মাত্র কেননা ইতিমধ্যেই জিনিসের দাম কমপক্ষে তিন ডাবল হয়ে গেছে । প্রতি বছর এইভাবে মদ্রাস্ফীতি হয় । আট বছর আগে ৫০ টাকা দিয়ে এক লিটার তেল না কিনে সেই ৫০ টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে আট বছর পরে সেটাকে ডাবল করে অর্থাৎ ১০০ টাকায় এক লিটার তেল কেনার মতো বোকামি আর কি হতে পারে? মাঝখানে শুধু আট বছর অন্য কেউ আপনার টাকা নিয়ে ব্যবসা করে নিল । এছাড়া বিভিন্ন ফান্ডে টাকা রেখে অনেকে তিন বছরে সর্বহারাদের থেকেও নিঃস্ব হতে হয় । অনেক শেয়ার মার্কেটেও বিপুল টাকা হারিয়েছেন । তাছাড়া বাংলাদেশে ইউনিপাই ২ আর ডেস্টিনের খবরতো সবারই জানা আছে । লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু । পৃথিবীতে যতো রকমের ব্যাঙ্ক আছে, তাদের মধ্যে সব থেকে লাভজনক এবং নিরাপদ ব্যাঙ্ক হচ্ছে কৃষ্ণের ব্যাঙ্ক । কৃষ্ণের ব্যাঙ্ক হচ্ছে জমি । মনে করুন আপনি একটি মাত্র ধানের বীজ নিলেন । সেটিকে আধা ইঞ্চি জমিতে রোপন করলেন । তিন মাস ধরে অতি সামান্য যত্ন করার ফলে আপনি সেই একটি ধানের বীজ থেকে কম পক্ষে তিন গুণ ধান পাবেন । অর্থাৎ তা তিন মাসে তিন ডাবল হল । আবার এইভাবে যদি বার বার জমা দিতে থাকেন, তাহলে চক্রবৃদ্ধি সুদের তো কোন তুলনাই চলে না । এইভাবে একট মাত্র ধানের বীজকে আট বছর ধরে চাষ করলে তো তা যে কত ডাবল হবে, তাঁর হিসাব করাও মানুষের পক্ষে কঠিন ।

মানুষ বেশী, জমি কম

অনেকে যুক্তি দেখান যে এই পৃথিবীতে মানুষ বেশী, জমি কম । সে কথা টাকার ক্ষেত্রে আরও বেশো প্রযোজ্য । সমুদ্র পরিমান বেকার সমস্যা দেখে আমরা সকলেই বুঝতে পারছি যে এই পৃথিবীতে মানুষ বেশী টাকা কম । কিংবা টাকার বন্টন সমানভাবে হচ্ছে না । একইভাবে আমরা বলতে পারি যে জমির বন্টনও ঠিকভাবে হচ্ছে না । প্রাচীন রাজারা প্রতিটি পরিবারের প্রয়োজন অনুসারে জমি বন্টন করে দিতেন রেশনের মতো । এ কথা সত্য বাংলাদেশ ও ভারতের কোটি কোটি লোক ভাত খায় । সেই ভাত কি আকাশ থেকে আসে? তা অবশ্যই জমি থেকে আসে । তাঁর মানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমি অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে । যন্ত্র সভ্যতার ফলে ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানই কৃষি বিহীন রান্নাঘর হয়ে যাবে । অর্থাৎ সবাই খাবার খাবে কিন্তু কেউ চাষ করবে না । শ্রীল প্রভুপাদ ১৪ বার পৃথিবী ভ্রমন করে বলেছিলেন যে এই পৃথিবীতে জমি বেশী, মানুষ কম । পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনও হাজার হাজার এখনও হাজার হাজার একর চাষ যোগ্য জমি অনাবাদী হয়ে পড়ে থাকে । কোটি কোটি বিভ্রান্ত মানুষ অভার টাইম ডিউটি করবে, রাতভর ট্রাক চালাবে, তবু জমি চাষের মতো নোংরা কাজ করবে না । কিন্তু সেই নোংরা জমি থেকে উৎপন্ন খাবার কিন্তু কারও কাছেই নোংরা বলে মনে হয় না । কৃষিবাদীরা জানেন যে এই জমি চাষ হচ্ছে ভগবানের পূজা স্বরূপ (বিষ্ণুরারাধ্যতে পুংসাং নান্যত্তৎতোষ কারণম্‌)।

জমির দাম বেশী

অনেকে আবার বলেন যে জমির দাম এত বেশি হয়ে গেছে যে অধিকাংশ মানুষের পক্ষে জমি কেনা সম্ভব না । প্রাচীন কালে জমিকে রেশন মূল্যে বন্টন করা বা বিনামূল্যে প্রজাদের মধ্যে ভূমিদান করা রাজাদের কর্তব্য ছিল । যন্ত্র সভ্যতার অধ্যুষিত গণতন্ত্রে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা কেবলই বাড়বে । এছাড়া জমি কিনতে সক্ষম ব্যক্তিও আজকাল পরিশ্রমের ভয়ে জমি কিনতে আগ্রহী নয় ।

পরিশ্রম করব কেন?

এইভাবে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা কলিযুগে কেবলই বাড়বে । মানুষেরা মনে করে (সকলেই এমন নয়) যে, বাজারে যদি দুধ (নকল দুধ) পাই, তাহলে গরু পালব কেন? বাজারে যদি বউ (নকল বউ) পাই, তাহলে বিয়ে করে বউ পালব কেন? বাজারে যদি খাবার (তা হোক না ভেজালযুক্ত) পাই, তাহলে চাষাবাদের মতো নোংরা কাজ করব কেন? তাই কোটিপতির পক্ষেও আজকাল খাঁটি দুধ বা খাঁটি ঘি কপালে জুটে না ।

বন্যা কিংবা খরার ভয়

বন্যাতে বা খরায় যদি ফসল নষ্ট হয়, তাহলে খাব কি? বানরে যদি ফসল নষ্ট করে তাহলে খাব কি? কিন্তু আমাদের বৃহৎ প্রশ্নটি হল যে, যে কোন অজুহাতে সকলেই যদি চাষাবাদের মাধ্যমে বিষ্ণুর আরাধনা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আপনারা খাবেন কি? মনে রাখবেন কাগজের টাকা কিন্তু খাওয়া যায় না । আর আমরা শাস্ত্র বিশ্বাসী মানুষেরা জানি যে মানুষের পাপ যত বাড়বে, প্রাকৃতিক দুর্যোগও তত বাড়বে । চাষাবাদ করলেও এসব দুর্যোগ হবে, না করলেও হবে । ধর্মপ্রান মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, ভগবানের কৃপায় প্রাকৃতিক দুর্যোগও তত কমে আসবে । খাদ্য গ্রহন তো আমাদের করতেই হবে । তাই কোন পরিস্থিতিতেই চাষাবাদ পরিত্যজ্য নয় ।

প্রকৃত ধনীর সংজ্ঞা

বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে, গবয়া ধনবান ধান্য ধনবান । অর্থাৎ কাগুজে টাকা দিয়ে ধনী বা দরিদ্র নির্ণয় করা উচিত নয় । বৃটিশ সরকার এশিয়া থেকে বিশেষ করে ভারত থেকে জাহাজ ভর্তি স্বর্ণমূদ্রা লণ্ডনে পাচার করার পর ভারতবাসীদের হাতে তুলে দিল কাগজের টাকা । সরল ভারতবাসীরা সেই থেকে তাতে প্রসন্ন । কিন্তু কৃষ্ণবাদীরা জানে যে যাদের গোয়াল ভরা গরু এবং গোলা ভরা ধান রয়েছে তারাই জাগতিক ধনে ধনী । তাঁর সঙ্গে পবিত্র আচরণকারী কৃষ্ণভক্ত পারমার্থিক ধনে সমৃদ্ধ । তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত অর্থে ধনী ।

লেবার খরচ খুব বেশী

লেবারের খরচ যা বেড়েছে, বাজার থেকে খাবার কিনে খেলেই লাভ বেশী । দেখুন, আজকাল কৃষকেরাও আত্মহত্যা করছে । আমাদের প্রশ্ন হলো, সকলেই যদি কিনে খায় তাহলে বেচবে কে?

কেউ না কেউ চাষ করবেই

গল্পে আছে যে এক বাবার সাত ছেলে । সবাই ভাবছিল যে, বাবা যে কোন ভাইয়ের বাড়িতে খেয়ে নেবেন । কিন্তু দেখা গেল বাবা উপবাসী । ঠিক তেমনি, কেউ না কেউ চাষ তো করবেই । এখন দেখা যাচ্ছে, যে বিশ্ব জুড়ে অগনিত শহরে অগণিত মানুষেরা আর কৃষিকাজে আগ্রহী নয় । তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে, কলিযুগে মানুষ দুর্ভিক্ষে পীড়িত হবে । দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মানেই আংশিক দুর্ভিক্ষ ।

কাগুজে টাকার দ্বীপ

মনে করুন একটি দ্বীপে সবাই কাগুজে টাকা বেতন পায় কিন্তু চাষাবাদ করে না । পৃথিবীটা কিন্তু ক্রমে ক্রমে সেদিকেই যাচ্ছে । এমন দিন আসবে যে লক্ষ টাকা দিয়েও খাঁটি দুধ বা খাঁটি ঘি পাওয়া যাবে না ।

প্রয়োজন ভিত্তিক চাষাবাদ

জমি চাষ করতে হবে প্রয়োজন ভিত্তিক, লোভ ভিত্তিক নয় । তাহলে তিন মাস অল্প শ্রম করেই মানুষ সারা বছর আরামে ভজন সাধন করতে পারবে । আধুনিক যুগের লোভী চাষীরা ট্রাকটারাসুর (ট্রাক্টর+অসুর) এবং হিম ঘরের প্রয়োগ করে মুষ্টিমেয় লোককে ধনকুবের বানাচ্ছে বটে কিন্তু অধিকাংশ চাষীর নুন আনতে পান্তা ফুরোয় । মুষ্টিমেয় লোকের লোভ থেকে আবার সৃষ্টি হচ্ছে বেকার সমস্যা । আমাদের জীবনকে শুধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আদর্শে পরিচালিত করতে হবে । না হলে কোন দিক দিয়ে যে কোন সমস্যা চুপিসারে চলে আসবে, অতি চতুর ব্যক্তিও তাঁর বিন্দু বিসর্গও টের পাবে না ।

(সংকলনে - সংকীর্তন মাধব দাস)
Share:

০৭ জানুয়ারি ২০১৯

কলিযুগের গুপ্ত বৃন্দাবন

পাপ ভারাক্রান্ত পৃথিবীর বেদনায় বেদনার্থ হইয়া দ্বাপরে প্রার্থনা করেছিলেন ব্রম্মা আর কলির যুগে শ্রী অদ্বৈতাচার্য। শ্রী অদ্বৈতাচার্য শ্রীহট্র নিবাসী একজন শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত ও নৈষ্ঠিক ব্রাক্ষন ছিলেন।সদাশিবের অবতার হিসাবে তাঁর পরিচিতি ছিল। নবদ্বিপের শান্তিপুরে শ্রী অদ্বৈতাচার্য বসবাস করতেন। তিনি প্রতিদিন মদন গোপালের পাদপদ্মে গঙ্গাজল তুলসী দিয়ে বলিতেন-“প্রভূ মদন গোপাল তুমি ধরার বুকে নামিয়া আস। সত্য ধর্ম সংস্থাপন কর”।



তিনি দূর চিত্তে বলতেন- “করাইবো কৃষ্ণ সর্ব নয়ন গোচর,তবে সে অদ্বৈত নাম কৃষ্ণের কিংকর”ভক্তের ডাকে ভগবান সাড়া দিলেন। একদিন শ্রী অদ্বৈতাচার্য গঙ্গার তীরে বসিয়া মদন গোপাল বলে কাঁদতে ছিলেন। হঠাৎ দেখিলেন একটি তুলসী পত্র স্রোতের বিপরীত দিকে ভাসিয়া চলিছে। তিনি বিস্মিত হলেন এবং তুলসী পত্রের অনুগমন করিলেন। নদীয়ার গঙ্গার ঘাটে তখন অগনিত নরনারী স্নান করছিলেন। উক্ত তুলসী পত্রটি শ্রী হট্রনিবাসী উপেন্দ্র মিশ্রের পুত্র জগন্নাথ মিশ্রের সহধর্মিনী এবং নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যা শচীদেবীর নাভিমূলে এসে ঠেকিয় স্থির হলো। শ্রী অদ্বৈতাচার্য বুঝিলেন মদন গোপাল এই ভাগ্যবতী রমনীর গর্ভেই আসিবেন। শ্রী চৈতন্য গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূ মাতৃগর্ভ সিন্ধুতে আসেন শ্রী হট্র(সিলেট) জেলার ঢাকা দক্ষিন গ্রামে। জগন্নাথ মিশ্রের মাতৃদেবী শোভাময়ী স্বপ্নে দেখেন তাঁর পুত্রবধুর গর্ভে স্বয়ং নারায়ন আবির্ভূত হবেন। তিনি গঙ্গাতীরে জন্মিবেন।

স্বপ্ন দেখে শোভাময়ী দেবী পূত্র ও পুত্রবধুকে নবদ্বিপে পাঠাইয়া দিলেন। এবং যাবার সময় বলেছিলের যিনি আসিবেন তাঁকে আমায় দেখাইও। মহাপ্রভূ শচী দেবীর দশম গর্ভের সন্তান। শচী দেবী ও জগন্নাথ মিশ্রও সপ্নে দেখেছিলেন-শচী কহে-“ মুঞি দেখো আকাশ উপরে,দিব্য মূর্তি লোক সব যেন স্তুতি করে”।

উভয়েই প্রতিক্ষায় থাকলেন সেই উন্নতসত্তা মহাপুরুষের শুভ আবির্ভাবের জন্য। কিন্তু কোথায় সেই মহাপুরুষ! দশ মাস-এগারো মাস-বার মাস গিয়ে তের মাস চলিল। শচীদেবীর জনক প্রখ্যাত জ্যোতিষি নীলাম্বর চক্রবর্তী গনিয়া কহিলেন, এই মাসেই শুভ লগ্নে এক সুলক্ষন পুত্র জন্মিবে।

আবির্ভাবঃ– ফাল্গুন মাস নব-বসন্ত দোল পূর্নিমা তিথি। এই দিনটিতে প্রতি বছরই পূর্নচন্দ্র তাঁর অমল-ধবল-স্নিগ্ধ কিরনে ধরনীকে স্নান করিয়ে দেয়ার জন্য স্বগর্বে উদিত হন। কিন্তু ৮৯২ বঙ্গাব্দের ২৩ ফাল্গুন(১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ) শনিবারে যেনো চন্দ্রের পূর্নতা, স্নিগ্ধতা,শুভ্রতা, সকলই কোন অদ্বিতীয় অভিমর্ত্য চন্দ্রের নিকট তিরস্কৃত। ভূলোকের চন্দ্রের পূর্নতা গোলকের চন্দ্রের পূর্নতার নিকট পরাভূত। এ সত্য প্রচারের জন্য অকলঙ্ক শ্রী চেতন্য গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূর আবির্ভাবের পূর্বে জগচ্চন্দ্র রাহুগ্রস্থ হয়ে পড়ল অর্থাৎ চন্দ্র গ্রহন হল। বিশ্বের চতুর্দিকে হরি নামের ধ্বনি উঠল। কর্মকোলাহল রেখে সবাই খোল করতাল নিয়ে হরিনাম কীর্ত্তন
করছে। হরি নামে মুখরিত চারিদিক এ সময়ে সিংহলগ্নে সিংহ রাশিতে শ্রীশচীর গর্ভসিন্ধু হতে শ্রী মায়া পুরে পূর্ন শশী আনিন্দ্য সুন্দর অমৃত পুরুষ উদিত হলেন। অচৈতন্য বিশ্বে চৈতন্য সঞ্চার হলো। মায়া মরুতে অমৃত মন্দাকিনী প্রবাহিত হলো। অবিরল ধারায় হরি কির্ত্তন সুধাসঞ্জীবনী বর্ষিত হওয়ায বিশ্বের হরিকির্ত্তন-দুর্ভিক্ষ-দুঃখ বিদূরিত শান্তিপুরে শ্রী অদ্বৈতাচার্য ও ঠাকুর হরিদাসসহ সকল ভক্তবৃন্দ আনন্দে নূত্য করলেন।

ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মগ্রহণ করে পরবর্তীকালে বিশ্বম্ভর, নিমাই ও শ্রী চৈতন্য নামের মধ্য দিয়ে বাঙালি সমাজের অবহেলিত মানুষের মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হবেন এটা কে বুঝতে পেরেছিলেন? শ্রী চৈতন্য গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূ ১৪৯১ থেকে ১৪৯৭ পর্যন্ত শাস্ত্রীয় বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।

আনুমানিক ১৫০৫ সাল থেকে তাঁর অধ্যাপনার সূচনা ঘটে। ১৫০৮ সালে গয়াধামে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষাগ্রহণের পর নবদ্বীপে ফিরে বপ্রকাশ ও সংকীর্তন আরম্ভ করেন তিনি। ১৫০৯ সালের শেষদিকে সংকীর্তনাদির অবসান ঘটিয়ে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন ১৫১০ সালে। এরপর তিনি রাঢ়, নীলাচল, বঙ্গদেশ, বৃন্দাবন, প্রয়াগ, কাশী, শান্তিপুর প্রভৃতি জায়গায় ভ্রমণ করে ভক্তিবাদ প্রচার করেন। ১৫৩৩ সালের ২৯ জুন তিনি দেহান্তরী হন।

গুপ্ত বৃন্দাবনঃ-মহাপ্রভু কলিযুগে যুগধর্ম প্রচার করার জন্য অবতরণ করবেন শ্রীজগন্নাথের আঙ্গিনায়, তাই লীলাক্ষেত্র বিস্তার ও লীলাপার্ষদ সাজানোর আয়োজন চলছে চারিদিকে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন লীলা সহচর হয়ে জন্ম হয়েছে দেব-দেবী ও ঋষিকল্প অনেক মহাজনদের। কারণ তাঁরা লীলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ভগবানের আগমনকে স্বাগত জানাবার জন্য ধরাধামে নেমে এসেছেন আগে ভাগেই। গৌরাঙ্গ লীলার শুভ বাস্তবায়নের জন্য শ্রীহট্টের ঢাকাদক্ষিণেও জন্ম নিলেন লীলা সহচরের। ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ ‘ভক্তি ঐশ্বর্য’, আর ‘হট্ট’ শব্দের অর্থ ‘মিলনমেলা’।

তাই শ্রীহট্ট নামটি হল ভক্তের মিলন মেলা। এ হাটে আসে অনেকেই কেনাবেচা করতে। এখানে অমূল্য প্রেমধন ‘শ্রী’ সম্পদ বিনামূল্যে বিক্রি হয়।আর এধন বিক্রি করবেন কষিত-কাঞ্চন-বর্ণধারী গৌর হরি। তাই শ্রীহট্টে মিলায়েছেন আগাম মেলা। এটিই শ্রীহট্ট নামের বৈশিষ্ট্য। আর ঢাকাদক্ষিণের ‘দক্ষিণ’ হওয়ার তাৎপর্য হল- কৃষ্ণের বামে রাই কিশোরী ব্রজের যুগলরূপের বিগ্রহ। আর কৃষ্ণের দক্ষিণে অবস্থান নিয়ে গৌরহরি যেন কৃষ্ণকে ঢেকে অর্থাৎ দ্বাপর লীলা আবরণ করে মধুময় নবদ্বীপ লীলা বিহার করছেন। তাছাড়া এই গৌরলীলা মাধুর্য আস্বাদনে যমের দক্ষিণ দুয়ারটিও বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে- এই তো ঢাকাদক্ষিণ নামের সার্থকতা। সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু একবার মহাপ্রভুকে শান্তিপুরে শ্রীল অদ্বৈত আচার্যের বাড়ীতে নিয়ে আসেন এবং শোকাতুরা জননী শচীদেবীকে পুত্রের দর্শনের জন্য সেখানে নিয়ে আসা হয়। মা এবং ছেলের অপূর্ব মিলনের আনন্দের মধ্য দিয়ে সন্ন্যাসী নিমাই মায়ের হাতের রান্না করা খাবার খান অদ্বৈতের গৃহে। মা জানেন নিমাই সন্ন্যাসী হয়েছে ঠিকই কিন্তু সংসারের কাজ এখনও তাঁর বাকি আছে- গর্ভাশয়ে থাকাবস্থায় তাঁর ঠাকুর-মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এখনও অপূর্ণ রয়েছে। শোভাদেবী আজও হয়তো তাঁর চোখ খুঁইয়ে নাতীর দর্শন আশায় কোনরকমে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাই মা শচীদেবী তাঁকে ঢাকা দক্ষিণে ফিরে গিয়ে তাঁর ঠাকুরমার শেষ ইচ্ছাটি পূর্ণ করার জন্য সন্ন্যাসী নিমাইকে নির্দেশ দিলেন।

বললেন-তোমার পিতামহী আমাকে বলেছিলেন, হে ভাগ্যবতি! তোমার এই গর্ভবাস হতে যে পরম পুরুষ উদয় হবেন, তাঁকে দেখবার জন্য বিশেষ উৎকণ্ঠিতায় আছি। অতএব তাঁকে শীঘ্রই আমার নিকট পাঠাবে। আমি তাঁর মহাবাক্য স্বীকার করে, তোমাকে গর্ভে নিয়ে নবদ্বীপে এসেছিলাম। অতএব এখন তোমাকে আমার প্রতিশ্রুতি বাক্য পালন করতে হবে। অর্থাৎ এখান হতেই তোমাকে পিতামহীর সাথে মিলবার জন্য যেতে হবে।

১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে মায়ের কথামত মহাপ্রভু তাঁর পিতামহীকে দর্শন দেবার জন্য ঢাকাদক্ষিণে আসতে মনস্থ করলেন। মহাপ্রভু মাতৃবাক্য শ্রবণ করে স্বীয় অচিন্তনীয় শক্তিপ্রভাব বিস্তার করে গুপ্তলীলা সহকারে পিতামহী সদনে যাবার জন্য উপক্রম করলেন। শ্রীহট্টের ঢাকাদক্ষিণে যাবার পথে তিনি প্রথমে তাঁর পূর্বপুরুষের নিবাসস্থল শ্রী হট্রের বালাগঞ্জের বরুঙ্গাতে পদার্পণ করলেন। সেখানে তিনি হলচাষরত গো-মোচন করলেন এবং গো- মুখে হরিনাম উচ্চারিত করে গো-মুক্ত করলেন। শ্রীমন্মহাপ্রভু আদিতে প্রপিতামহ শ্রীপাদ মধুকর মিশ্রের বাসভূমি বরগঙ্গা (বুরুঙ্গা) নামক স্থানে পদার্পণ করলেন। তথায় কৃষকগণকে মধ্যাহ্ন সময়ে হালচাষ করতে দেখে, করুণানিধির হৃদয় গো-গণের প্রতি সদয় হল। তিনি তখন কৃষকগণকে বললেন, মধ্যাহ্নকালে চাষ করা মহা পাপ। তোমরা গো-মোচন কর। এই আদেশ শ্রবণ করে রামদাস নামক জনৈক কৃষক সন্ন্যাসবেশী শ্রীগৌরাঙ্গকে বলল, ধান্যক্ষেত্রে অতি অল্প জল রয়েছে। সেইজন্য আজই এই জমি চাষ করা প্রয়োজন। এরর্প শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হল সমীপে গমন করলেন।

শ্রীমন্মহাপ্রভু গোপৃষ্ঠে হস্তস্থাপন করে হরিধ্বনি করতে লাগলেন। তাঁর শ্রীমুখোচ্চারিত শ্রীহরিধ্বনি শ্রবণ করে গো-সকলও মধুময় হরিধ্বনি করতে লাগল। কৃষকেরা প্রায় জলশূন্য কৃষিক্ষেত্রের জন্য বড়ই ব্যস্ত ছিল, কিন্তু সেই ধান্যক্ষেত্রটি সহসা জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। চাষীগণ এইসব অলৌকিক ঘটনা দেখে শীঘ্র গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীগণকে এই অদ্ভুত কথা বললেন। তাহা শ্রবণান্তে, সেই গ্রামস্থ মিশ্রবংশীয় জনগণ সেখানে এসে শ্রীশ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে তাঁর প্রপিতামহ শ্রীপাদ মধুকর মিশ্রের বাড়িতে আনয়ন করলেন। মহাপ্রভুর এরূপ অলৌকিক ভাব দেখে তাঁরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে সাক্ষাৎ নারায়ণজ্ঞানে যথোচিত সেবা করলেন।

এখান থেকে মহাপ্রভু তাঁর পিতৃনিবাস তথা পিতামহ উপেন্দ্র মিশ্রের ঢাকাদক্ষিণের ঠাকুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। ১৫১০ সালের চৈত্রমাসের কোন এক রবিবারে ছুটে আসেন ঢাকাদক্ষিণের গুপ্ত বৃন্দাবন ধামে। তাঁর পিতামহী শোভাদেবী অধীর আগ্রহে নাতীর দর্শন আশায় পথ চেয়ে বসেছিলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের আশা আজ ফলবতী হতে চলল ধর্মপরায়ণা শ্রীল উপেন্দ্র মিশ্রের পতœী বৃদ্ধা শ্রীমতি শোভাদেবী, সর্বদাই মনে মনে চিন্তা করতেন যে, আমি কখন আমার নাতীকে দেখতে পাব। মহাপ্রভু গর্ভাবস্থায় তাঁর চিন্ময়ী দৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন পিতার ঢাকাদক্ষিণের নিবাসস্থানটি। আজ তিনি সেই স্মৃতি বিজরিত শান্তির নীড়ে আবার ফিরে এসেছেন। ঘুরেফিরে দেখছেন বাড়ীর চারিদিক। হঠাৎ শ্রীল পরমানন্দ মিশ্রের পতœী সুশীলাদেবীর নজর পড়ল সন্ন্যাসীর দিকে। কি দিব্যকান্তি চেহারা! আজানুলম্বিত বাহু, সুঠাম পূর্ণদেহী নবীন দণ্ডধারী গৌর তনু! দেখলে মন জুরিয়ে যায় একেবারে। সুশীলাদেবী মুগ্ধনয়নে ভাল করে দেখে নিলেন সন্ন্যাসীকে। পরে দর্শন আশা কিঞ্চিৎ প্রশমিত করে তিনি শ্বাশুড়ী শোভাদেবীকে এই শুভ সংবাদটি দেবার জন্য গৃহাভ্যন্তরে চলে এলেন। সংবাদ পেয়ে শোভাদেবী গৃহাভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন নবীন সন্ন্যাসীকে। শোভাদেবীর মনে আনন্দ আর ধরে না। যে স্বপ্নের প্রাণপুরুষকে দেখার জন্য এতদিন যাঁর তৃষিত নয়ন অপেক্ষা করছিল, সেই প্রাণের ঠাকুর সাক্ষাৎ নারায়ণ আজ তাঁর নয়ন-মন আলো করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই সামনে। একি অদ্ভুত অপার আনন্দ! সেই বৃদ্ধা শ্রীমতি শোভাদেবী, গৃহ হতে বের হয়ে এসে শ্রীনারায়ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখে স্বয়ং ঈশ্বর এখানে এসেছেন এই কথা মনে ভেবে বড়ই প্রফুল্লা হলেন। তারপর তিনি তাঁকে বসতে আসন দিলেন এবং ধর্মপরায়ণা বৃদ্ধা সাশ্রুনয়নে, পুলকিত শরীরে, ধীরে ধীরে মধুর বাক্যে তাঁর স্তব করলেন। নররূপধারী পদ্মপলাশলোচন সচ্চিদানন্দবিগ্রহ স্বর্ণবর্ণ বিষ্ণুকে নমস্কার। হে পুরুষোত্তম! তোমাকে নমস্কার। হে বাঞ্ছিতপ্রদ ভগবান্! তোমাকে প্রণাম করি। ঠাকুরমা দেখছেন সন্ন্যাসীকে, কিন্তু তিনি দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় আদরের নাতীকে। নিশ্চয়ই নারায়ণরূপী এই সন্ন্যাসী তাঁর নাতীর খবর রাখেন। তাই অস্থিরচিত্তে শোভাদেবী এই একটি জিঙ্গাসা নিয়ে সন্ন্যাসীর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি সন্ন্যাসীর মধ্যে দেখতে চেয়েছিলেন স্বপ্নে দেখা সেই প্রাণময় শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিটি।

কিন্তু তিনি আজ দেখছেন কৃষ্ণতনু মূর্তির বদলে তাঁর সামনে গৌরতনু এক নবীন সন্ন্যাসীর দিব্য মূর্তি। তিনি নাতীর কাছে প্রশ্ন ছিলেন, “তোমাকে আমি তো মাতৃগর্ভে এমনরূপে দেখিনি, তোমার মুরলীধারী নবীন-নটবর বেশ শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিটি তুমি কোথায় লুকালে!” প্রভু আর কি করেন, সরল বিশ্বাসী ঠাকুর মা শোভাদেবীকে গৌরা-কৃষ্ণরূপ যুগল মূর্তিতে দর্শন দান করে ধন্য করলেন। মহাপ্রভু পিতামহী শোভাদেবীর অন্তরের ভাব বুঝে তাঁকে দিব্যচক্ষু দান করে চাক্ষুষভাবে দেখিয়ে দিলেন তাঁর আপন স্বরূপটি। জগদীশ্বর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু পিতামহীর সেই কথা শ্রবণান্তে কৃপা করে তাঁকে আপন পরিচয় প্রদান করলেন। সুশীলাদেবী সন্ন্যাসীবেশী এক সুন্দর মহাপুরুষকেই দেখলেন, কিন্তু শোভাদেবী তাঁর মধ্যে দেখলেন সাক্ষাৎ ভগবানকেই। ভক্তের কাছে লুকাতে পারেননি তিনি, ভক্তবৎসল ভগবান্ সন্ন্যাসীবেশের মধ্যেই শোভাদেবীকে দেখালেন তাঁর ভগবৎ স্বরূপটি আর সুশীলাদেবী সন্ন্যাসবেশীকে দেখলেন। তিনি শোভাদেবীকে বললেন, “আমি সেই তো সেই- যিনি তোমার ঘরের নিমাই, তিনিই আবার দ্বাপরের কৃষ্ণ কানাই।” শোভাদেবী ও মহাপ্রভুর ভক্তিপূর্ণ এই ভাববিলাস তাঁর অন্য নাতী প্রদ্যুম্ন মিশ্র সাক্ষাৎ দর্শন করে গর্ভানিষ্ঠান সময়ে, যেরূপে শোভা দেবীর প্রতি দৈববাণী করেছিলেন, তাহাই প্রদর্শিত হল।

পরম ভক্তিমতী বৃদ্ধা, শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীকৃষ্ণ, এই দুইরূপ দেখে বিস্মিত ও পুলকিত হয়ে বললেন, হে ভগবান! তোমাকে নমস্কার। মহাপ্রভু শোভাদেবীকে বলেন, “কষ্ট নিও না ঠাকুর মা, আমার এই যুগলমূর্তি ঠাকুর বাড়ির দেবালয়ে প্রতিষ্ঠিত করে নিত্য পূজার্চনা করবে। আমার বংশের সন্তানেরা শ্রী হট্রের ঢাকাদক্ষিণের দেবালয়ের গৌরবেই আবহমানকাল বেঁচে থাকবে। শ্রী হট্র তথা ঢাকাদক্ষিণ আজ থেকে গুপ্ত বৃন্দাবন বলে পরিচিত হবে। আমি নিত্যকাল এখানে লীলা করব। “বাসুদেব ঘোষ কহে করি জোড় হাত, যেই গৌর সেই কৃষ্ণ সেই গন্নাথ”আসলে কৃষ্ণরূপটি বৃন্দাবনের আর গৌররূপটি নবদ্বীপের। দ্বাপর শেষে কলিতে তাই শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। কলি এসেছে, তাই দ্বাপরের কৃষ্ণের প্রয়োজন এবার চৈতন্যে সীমায়িত হয়েছে। কাজেই প্রেমের রাজা শ্রীচৈতন্যই বামা নায়িকা শ্রীরাধার মত বেদনাভারে প্রাণকৃষ্ণকে খুঁজতে খুঁজতে নামের বাহারে পাগলপারা হয়ে সকলকে প্রেম দান করছেন আর শ্রীমুখে বলছেন, “গোকুলের যে প্রেম হলো নাকো সারা নদীয়ায় তা হবে সারা।”রাধার যে প্রেম কৃষ্ণকে ঘিরে, দ্বাপরে তা পূর্ণ হয় নি, তাই অন্তঃ-কৃষ্ণ বহিঃ-রাধা হয়ে রাধাভাবে আবিষ্ট হয়ে গৌর সুন্দর একই অঙ্গে দুইরূপ হয়ে আস্বাদন করছেন আপনি আপনাকে। এই তো গৌর হরি, কলির প্রেমরতন, দ্বাপরের কৃষ্ণ-কানাই। আমরা তাঁর ভাবগ্রাহী যুগলতনুর রস আস্বাদনের আশায় পথ চেয়ে বসে রই। “স্মরনেরে নব গৌরচন্দ্র মাধব মনোহারী।” পরমাত্মা পূর্ণব্রহ্ম সনাতন দ্বাপরে এসেছিলেন কৃষ্ণ হয়ে, এবার এসেছেন গৌরতনু গৌরহরি হয়ে এই গৌরতনু শ্রীরাধার ভাবকান্তি হৃদয়ে ধারণ করে গৌরহরি হয়েছেন।

কৃষ্ণই রাধা, রাধাই কৃষ্ণ; ভাববিলাসে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে অনন্য রসব্যঞ্জন করেন, আবার ঘনায়িত প্রেমবিগ্রহ হয়ে আপামর ভক্তসঙ্গে প্রেমরসনির্যাস আস্বাদন করেন এবং প্রেমধন্য হয়ে ঐ অপ্রাকৃত রস ভক্তের মাঝে বিতরণ করেন এই রঙ্গমঞ্চের লীলানটবর গৌরসুন্দর নরবপু ধারণ করে সর্বোত্তম নরলীলা করবার জন্য এবার এসেছেন ধরার ধূলায় নেমে। মহাপ্রভু ও তাঁর পার্ষদগণ এক অভিনব প্রেমের উদার দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিলেন পৃথিবীর পাপাসক্ত মানুষের পানে। সে দৃষ্টিতে ছিল প্রাণঢালা প্রেম আর প্রাণপুটিত রসমাধুর্যপূর্ণ অমিয় রসধারা। তিনি পুরাণ-প্রাণ পুরুষ, অনন্য প্রেমের ঠাকুর। তিনি তাঁর অপূর্ব কৃষ্ণকথামৃত দান করে কলিহত জীবের ত্রাণকর্তা হিসেবে আপনার জনের মত মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন। নাম আর প্রেমের মালা গেঁথে তিনি জগতের গলায় পরিয়ে দিয়েছেন অমূল্য এক বরণমালা।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন- “এই গুপ্ত ভাবসিন্ধু, ব্রহ্মা না পায় একবিন্দু,হেন ধন বিলাইল সংসারে”।

Post Courtesy:  Sagar Bhowmick
Share:

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শৈশব

কৃষ্ণের শৈশব সম্বন্ধে কতকগুলি বিশেষ অনৈসর্গিক কথা পুরাণে কথিত হইয়াছে। একে একে তাহার পরিচয় দিতেছি।

১। পূতনাবধ। পূতনা কংসপ্রেরিতা রাক্ষসী। সে পরমরূপবতীর বেশ ধারণ করিয়া নন্দালয়ে কৃষ্ণবধার্থ প্রবেশ করিল। তাহার স্তনে বিষ বিলেপিত ছিল। সে শ্রীকৃষ্ণকে স্তন্যপান করাইতে লাগিল। কৃষ্ণ তাহাকে এরূপ নিপীড়িত করিয়া স্তন্যপান করিলেন যে, পূতনার প্রাণ বহির্গত হইল। সে তখন নিজ রূপ ধারণ করিয়া ছয় ক্রোশ ভূমি ব্যাপিয়া নিপতিত হইল।
মহাভারতেও শিশুপালবধ-পর্বাধ্যায়ে পূতনাবধের প্রসঙ্গ আছে। শিশুপাল, পূতনাকে শকুনি বলিতেছেন। শকুনি বলিলে, গৃধ্র, চীল এবং শ্যামাপক্ষীকেও বুঝায়। বলবান্ শিশুর একটা ক্ষুদ্র পক্ষী বধ করা বিচিত্র নহে।

কিন্তু পূতনার আর একটা অর্থ আছে। আমরা যাহাকে “পেঁচোয় পাওয়া” বলি, সূতিকাগারস্থ শিশুর সেই রোগের নাম পূতনা। সকলেই জানে যে, শিশু বলের সহিত স্তন্যপান করিতে পারিলে এ রোগ আর থাকে না। বোধ হয়, ইহাই পূতনাবধ।

২। শকটবিপর্যয়। যশোদা, কৃষ্ণকে একখানা শকটের নীচে শুয়াইয়া রাখিয়াছিলেন। কৃষ্ণের পদাঘাতে শকট উল্টাইয়া পড়িয়াছিল। ঋগ্বেদসংহিতায় ইন্দ্রকৃত ঊষার শকটভঞ্জনের একটা কথা আছে। এই কৃষ্ণকৃত শকটভঞ্জন, সে প্রাচীন রূপকের নূতন সংস্কারমাত্র হইতে পারে। অনেকগুলি বৈদিক উপাখ্যান কৃষ্ণলীলান্তর্গত হইয়াছে, এমন বিবেচনা করিবার কারণ আছে।

৩। তাহার পর মাতৃক্রোড়ে কৃষ্ণের বিশ্বম্ভরমূর্তিধারণ, এবং স্বীয় ব্যাদিতানন-মধ্যে যশোদাকে বিশ্বরূপ দেখান। এটা প্রথম ভাগবতে দেখিতে পাই। ভাগবতকারেরই রচিত উপন্যাস বোধ হয়।

৪। তৃণাবর্ত। তৃণাবর্ত নামে অসুর কৃষ্ণকে একদা আকাশমার্গে তুলিয়া লইয়া গিয়াছিল। ইহার যেরূপ বর্ণনা দেখা যায়, তাহাতে বোধ হয়, ইহা চক্রবায়ু মাত্র। চক্রবায়ুর রূপ ধরিয়াই অসূর আসিয়াছিল, ভাগবতে এইরূপ কথিত হইয়াছে। এই উপাখ্যানও প্রথম ভাগবতেই দেখিতে পাই। সুতরাং ইহাও অমৌলিক সন্দেহ নাই। চক্রবায়ুতে ছেলে তুলিয়া ফেলাও বিচিত্র নহে।

৫। কৃষ্ণ একদা মৃত্তিকা ভোজন করিয়াছিলেন। কৃষ্ণ সে কথা অস্বীকার করায়, যশোদা তাঁহার মুখের ভিতর দেখিতে চাহিলেন। কৃষ্ণ হাঁ করিয়া বদনমধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দেখাইলেন। এটিও কেবল ভাগবতীয় উপন্যাস।

৬। ভাগবতকার আরও বলেন, কৃষ্ণ হাঁটিয়া বেড়াইতে শিখিলে তিনি গোপীদিগের গৃহে অত্যন্ত দৌরাত্ম্য করিতেন। অন্যান্য দৌরাত্ম্যমধ্যে, ননী মাখন চুরি করিয়া খাইতেন।
বিষ্ণুপুরাণেও এ কথা নাই; মহাভারতেও নাই।

হরিবংশে ননী মাখন চুরির কথা প্রসঙ্গক্রমে আছে। ভাগবতেই ইহার বাড়াবাড়ি। যে শিশুর ধর্মাধর্মজ্ঞান জন্মিবার সময় হয় নাই, সে খাদ্য চুরি করিলে কোন দোষ হইল না। যদি বল যে, কৃষ্ণকে তোমরা ঈশ্বরাবতার বল; তাঁহার কোন বয়সেই জ্ঞানের অভাব থাকিতে পারে না। তাহার উত্তরে কৃষ্ণোপাসকেরা বলিতে পারেন যে, ঈশ্বরের চুরি নাই। জগতই যাঁহার—সব ঘৃত নবনীত মাখন যাঁহার সৃষ্ট—তিনি কার ধন লইয়া চোর হইলেন? সবই ত তাঁহার। আর যদি বল, তিনি মানবধর্মাবলম্বী-মানবধর্মে চুরি অবশ্য পাপ, তাহার উত্তর এই যে, মানবধর্মাবলম্বী শিশুর পাপ নাই, কেন না, শিশুর ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই। কিন্তু এ সকল বিচারে আমাদের কোন প্রয়োজনই নাই—কেন না, কথাটাই অমূলক। যদি মৌলিক কথা হয়, তবে ভাগবতকার, এ কথা যে ভাবে বলিয়াছেন, তাহা বড় মনোহর।

ভাগবতকার বলিয়াছেন যে, ননী মাখন ভগবান্ নিজের জন্য বড় চুরি করিতেন না; বানরদিগকে খাওয়াইতে না পাইলে শুইয়া পড়িয়া কাঁদিতেন। ভাগবতার বলিতে পারেন যে, কৃষ্ণ সর্বভূতে সমদর্শী; গোপীরা যথেষ্ট ক্ষীর নবনীত খায়,—বানরেরা পায় না, এজন্য গোপীদিগের লইয়া বানরদিগকে দেন। তিনি সর্বভূতের ঈশ্বর, গোপী ও বানর তাঁহার নিকট ননী মাখনের তুল্যাধিকারী।

এই শিশু সর্বজনের জন্য সহৃদয়তাপরবশ, সর্বজনের দুঃখমোচনে উদ্যুক্ত। তির্যকজাতি বানরদিগের জন্য তাঁহার কাতরতার ভাগবতকার এই পরিচয় দিয়াছেন। আর একটি দুঃখিনী ফলবিক্রেত্রীর কথা বলিয়াছেন। কৃষ্ণের নিকট সে ফল লইয়া আসিলে কৃষ্ণ অঞ্জলি ভরিয়া তাহাকে রত্ন দিলেন। কথাগুলির ভাগবত ব্যতীত প্রমাণ কিছু নাই; কিন্তু আমরা পরে দেখিব, পরহিতই কৃষ্ণের জীবনের ব্রত।

৭। যমলার্জুনভঙ্গ। একদা কৃষ্ণ বড় “দুরন্তপনা” করিয়াছিলেন বলিয়া, যশোদা তাঁহার পেটে দড়ি বাঁধিয়া, একটা উদূখলে বাঁধিয়া রাখিলেন। কৃষ্ণ উদূখল টানিয়া লইয়া চলিলেন। যমলার্জুন নামে দুইটা গাছ ছিল। কৃষ্ণ তাহার মধ্য দিয়া চলিলেন। উদূখল, গাছের মুলে বাধিয়া গেল। কৃষ্ণ তথাপি চলিলেন। গাছ দুইটা ভাঙ্গিয়া গেল।

এ কথা বিষ্ণুপুরাণে এবং মহাভারতের শিশুপালের তিরস্কারবাক্য আছে। কিন্তু ব্যাপারটা কি? অর্জুন বলে কুরচি গাছকে; যমলার্জুন অর্থে জোড়া কুরচি গাছ। কুরচি গাছ সচরাচর বড় হয় না, এবং অনেক গাছ ছোট দেখা যায়। যদি চারাগাছ হয়, তাহা হইলে বলবান্ শিশুর বলে ঐরূপ অবস্থায় তাহা ভাঙ্গিয়া যাইতে পারে।

কিন্তু ভাগবতকার পূর্বপ্রচলিত কথার উপর, অতিরঞ্জন চেষ্টা করিতে ত্রুটি করেন নাই। গাছ দুইটি কুবেরপুত্র; শাপনিবন্ধন গাছ হইয়াছিল, কৃষ্ণস্পর্শে মুক্ত হইয়া স্বধামে গমন করিল। কৃষ্ণকে বন্ধন করিবার কালে গোকুলে যত দড়ি ছিল, সব যোড়া দিয়াও কচি ছেলের পেট বাঁধা গেল না। শেষে কৃষ্ণ দয়া করিয়া বাঁধা দিলেন।

বিষ্ণুর একটি নাম দামোদর। বহিরিন্দ্রিয়নিগ্রহকে দম বলে। উদ্ উপর, ঋ গমনে, এজন্য উদর অর্থে উৎকৃষ্ট গতি। দমের দ্বারা যিনি উচ্চস্থান পাইয়াছেন, তিনিই দামোদর। শঙ্করাচার্য দামোদর শব্দের অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি বলেন, “দমাদিসাধনেন উদরা উৎকৃষ্টা গতির্যা তয়া গম্যত ইতি দামোদরঃ।” মহাভারতেও আছে, “দমাদ্দামোদরং বিদুঃ।”

কিন্তু দামন্ শব্দে গোরুর দড়িও বুঝায়। যাহার উদর গোরুর দড়িতে বাঁধা হইয়াছিল, সেও দামোদর। গোরুর দড়ির কথাটা উঠিবার আগে দামোদর নামটা প্রচলিত ছিল। নামটি পাইয়া ভাগবতকার দড়ি বাঁধার উপন্যাসটি গড়িয়াছেন, এই বোধ হয় না কি?
এক্ষণে নন্দাদি গোপগণ পূর্ববাসস্থান পরিত্যাগ করিয়া বৃন্দাবনে চলিলেন। কৃষ্ণ নানাবিধ বিপদে পড়িয়াছিলেন, এইরূপ বিবেচনা করিয়াই তাঁহারা বৃন্দাবন গেলেন, এইরূপ পুরাণে লিখিত আছে। বৃন্দাবন অধিকতর সুখের স্থান, এ জন্যও হইতে পারে। হরিবংশে পাওয়া যায়, এই সময় ঘোষনিবাসে বড় বৃকের ভয় হইয়াছিল। গোপেরা তাই সেই স্থান ত্যাগ করিয়া গেল।

=বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়=

Post Courtesy: Sagar Bhowmick
Share:

০২ জুলাই ২০১৮

কৃষ্ণের ইচ্ছাই শেষ ইচ্ছা

মানুষকে ভগবান থেকে দূরে সারানোর প্রধাণ শত্রু হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞান শুধু আধ্যাত্মিক উন্নতিরই প্রতিবন্ধক নয়,ইহা স্বাস্থ্য ও মানসিকতার উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
একদিকে যেমন প্রযুক্তিবিদ্যায় উন্নত,সাথে সাথে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপেও দ্রুত অগ্রগতি।
একটি আনবিক বোমা একটি ক্ষুদ্র দেশকে নিমেষে শেষ করতে সক্ষম।
টেলিভিশন,মোবাইল অনেক উপকার করে,আবার এই দুটি উপকরণের জন্যই আজ আমাদের ১২-১৪ বছরের সন্তানের তাড়াতাড়ি পতনও তো ঘটছে?

আদিম যুগে কোনো বিজ্ঞান ছিল না। তারা ঝড় হলেও ভগবান,বৃষ্টি হলেও,বিদ্যুৎ চমকালেও ভগবানকে স্মরণ করত। তারা এটাই জানত-সবকিছু ভগবানের ইচ্ছাতেই হয়।
একটি শিশুকে দেখুন-সবাই আমরা বলি,শিশু নারায়ণ,কেন?
কারন,শিশুকে এখুনি বকা দিলে কান্না করল,আবার তখুনি ভুলে গিয়ে হাসতে থাকে। তার মধ্যে ক্রোধ থাকে না,হিংসা নেই,লোভ নেই-কত সরলভাবে সব বিশ্বাস করে।
কিন্তু সেই শিশু নারায়ণটিই একটু বড় হয়ে,রাবন,কংসে পরিণত হয়। কেন?
পারপার্শ্বিক পরিবেশ,নিজের পরিবার যেমন,,উন্নত,আধুনিক! পিতামাতা যদি লোভী,উগ্র স্বভাবের হয়,ছেলে কি করে ভাল হবে?
আগে নিজেকে ধার্মিক হতে হবে,তবেই সুসন্তানের আশা করা যেতে পারে। কিন্তু নিজেই অপেক্ষা করে আছে-বুড়ো বয়সে ভক্তি করব।
লক্ষ করে দেখবেন-
কোনো পরিবারের একটি শিশুর স্বভাব-চরিত্র দেখেই বাড়ির বড়দের ব্যবহার আন্দাজ করা যায়-যতই ভালমানুষের ভান করুক।

আধুনিক বিজ্ঞান শুধু পারে-বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে,ভুল জায়গায় মানুষকে আটকে রেখে,সময় নষ্ট করাতে। এদের সাধারণ জ্ঞানের বড়ই অভাব! সাধারণ জ্ঞান বলতে-সব কিছুর পরম কারন শ্রীকৃষ্ণকে স্বীকার করা।
প্রকৃতি প্রতি পদক্ষেপে আমাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছে,তবুও আমরা জল্পনা-কল্পনা করি। যদি জানতে চাওয়া হয়-এত ধরণের গাছ কেন? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি?
ডারউইন পন্ডিত বলে গেছে-প্রাকৃতিক বিবির্তন,নির্বাচনবাদ ইত্যাদি। তাহলে নিশ্চয়ই সেটি প্রকৃতির ইচ্ছা,বিজ্ঞানের কিছুই করার নেই?
সব আপেলই তো গাছ থেকে মাটিতে পড়ে,তাহলে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিয়ে শোরগোল করার প্রয়োজনটা কি?

আচ্ছা শ্রীরামচন্দ্রের সময়ে তো সমুদ্রে শিলা ফেলে ভাসিয়েছলেন। তখন কি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছিল না?
সুতরাং নিয়ম চরম কথা নয়। একজন রাজা যেমন আইন তৈরি করেন,তিনিই পরিবর্তনও করতে পারেন। কেন,দেশের সংবিধান সংশোধন হয় না। কিন্তু সেটা শুধু শাসকই করতে পারেন,সাধারণ প্রজার সেই অধিকার নেই।
বিজ্ঞানকে এটাই অনুরোধ করা,আত্মা ও ভগবান মানুন। তিনিই পরম নিয়ন্তা, আপনারা শুধু তাঁর তৈরি খেলনাগুলো দিয়ে কিছু কসরৎ করে মনোরঞ্জন করাচ্ছেন!

সৃষ্টির আদিতে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন,আছেন এবং প্রলয়কাল পর্যন্ত থাকবেন। কিন্তু এইসব মূর্খ বৈজ্ঞানিকেরা এইসব মানেই না।
নিজে না চাইলে সুবুদ্ধি কখনোই হবে না-কি আপনার,কি আমার!!

Collected from: Sotyer Sondhane

Share:

শ্ৰীকৃষ্ণের আবিৰ্ভাব ও নন্দ মহারাজের ব্ৰত

নন্দ মহারাজের সভায় স্নিগ্ধকন্ঠ এবং মধুকন্ঠ নামে দুজন কবি নিত্যই গীত-নৃত্য করতেন। " স্নিগ্ধকণ্ঠ ” অৰ্থে স্নেহ-মাখা কন্ঠস্বর , আর মধুকণ্ঠ ” অৰ্থে মধু-মাখা কণ্ঠস্বর।

একদিন তারা সভা মধ্যে কিভাবে নন্দ মহারাজ পুত্ৰ প্ৰাপ্ত হলেন সেই বিষয়ে গীত গাইতে লাগলেন । পুত্ৰ লাভের উদ্দেশ্যে নন্দ মহারাজ বহু যাগ-যজ্ঞ সব করেছিলেন , কিন্তু তবুও কোনো পুত্ৰ হলো না । সমস্ত ব্ৰজবাসী আর তার যত বন্ধুজন ছিলেন তারা সবাই কত ব্ৰত করালেন যাতে নন্দ মহারাজ একটি পুত্ৰ প্ৰাপ্ত হন । তবুও যশোদার কোনো পুত্ৰ হলো না । নন্দ মহারাজের রানী যশোমতী অত্যন্ত দুঃখ - শোকে ভোজনাদি ত্যাগ করলেন, আর সর্বদা অধোমুখে ভূমিতে বসে নিরন্তর অশ্ৰপাত করে আপন মনে কাঁদতে থাকেন । নন্দ মহারাজ তা দেখে মনে বড় দুঃখ পান । তিনি নানা উপায়ে তাকে প্ৰবোধ দিয়ে বলতে লাগলেন , “ বিধাতার যা ইচ্ছা তাই হবে । আমরা যে-পুত্ৰ কামনা করছি , তা যজ্ঞ করে হবে না''। 

তখন যশোধা মাতা বললেন , “ শুন প্ৰাণেশ্বর , আমার হৃদয়ের কথা তোমাকে বলছি । আমরা যাগ-যজ্ঞ করেছি এবং সব ব্ৰতও করেছি । কিন্তু আমরা দ্বাদশী পরম-ব্ৰত পালন করিনি''।
এ কথা শুনে নন্দ মহারাজ আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে তখন বললেন , “হে প্রিয়ে , তুমি খুব ভালো কথা শোনালে , সত্যি সত্যি আমরা এই ব্ৰতটি পালন করিনি, তা অবশ্যই পালন করব। তাহলে আমাদের মন-কামনা পূৰ্ণ হবে, দুঃখ দুর হবে''।
অতঃপর নন্দ মহারাজ তার পুরোহিতকে ডেকে এনে দাদ্বাদশী ব্রত পালনের বিধি বুঝে নিলেন ।

স্নিগ্ধকন্ঠ বললেন ,
“ ভাই , তারপর কি হলো । সেই সব এই সভায় খুলে বল''।

তারপর নন্দ মহারাজ এবং যশোমতী রানী এই দ্বাদশীব্রত এক বছর পালন করলেন । ব্রত পালনের শেষে নন্দ মহারাজ এক বড় সূস্বপ্ন দেখেন ।
স্বয়ং শ্ৰীহরি আবিভুত হয়ে তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে বললেন , “হে নন্দ মহারাজ ! তোমার মনস্কামনা অচিরে পূণ হবে। প্রতি কল্পে আমি তোমার পুত্ৰ -রুপে এসে থাকি এবং এই কল্পেও আমি তোমার পুত্ররুপে আসব । তোমাদের গৃহে আমি , শিশুরুপে বিহার করব । প্ৰতিদিন তুমি আমাকে দৰ্শন করতে পারবে এবং তোমার আশ পূৰ্ণ হবে''।
নন্দ মহারাজ এরকম মধুর স্বপ্ন দেখলেন । অতঃপর নন্দ মহারাজ প্ৰভাত হলে মনস্থ করলেন যে, রানী যশোমতী সহ যমুনাতে স্নান করতে যাবেন । তারপর তারা যমুনাতে স্নান করতে আসার সময় দান দেওয়ার জন্য বহুধন সঙ্গে করে নিয়ে এলেন ।

দেবদেবীগন, মুনি , ঋষিগণ সব সেকথা জানতে পেরে ভিক্ষুক বেশে নন্দ মহারাজের কাছ থেকে দান গ্ৰহণ করার জন্য এলেন । যথাবিধি স্নান করে রানীসহ নন্দ মহারাজ নিজ হাতে দান দিতে শুরু করলেন । সবাই নন্দ মহারাজের হাতে দান পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন । তারা সব উচ্চৈঃস্বরে জয়ধ্বনি দিতে লাগলেন , “ নন্দ মহারাজ কি জয় ! যশোমতী রানী কি জয়''।

তারপর নন্দ মহারাজ গৃহে ফিরে এসে শ্ৰীবিষ্ণুর পূজা করলেন । তার নিত্য কমবিধি যত সব সমাপ্ত করার পর তারা দুজনে অতি শীঘ্ৰ সভায় প্ৰবেশ করে গুরু, দ্বিজ এবং পূজ্য জনের বন্দনা করলেন।

তখন স্নিগ্ধ কণ্ঠ হাসতে হাসতে বললেন , তারপর কি হলো ?
অতঃপর মধুকণ্ঠ কথা বলতে শুরু করলেন।

তারপর রাজসভায় নন্দ মহারাজ যেই উপবেশন করলেন এমন সময় দ্বাররক্ষী এসে বলল , “ মহারাজ, একজন তাপসী ব্ৰক্ষাচারিণী এসে অপেক্ষা করছেন''।
সে কথা শুনে নন্দ মহারাজ গাত্ৰোখান করে স্বাগত-পূর্বক তাপসী ব্রহ্মচারিণীকে নিয়ে গিয়ে দিব্যাসনে উপবেসন করালেন । অতঃপর নন্দ মহারাজ তার পাদধৌত করে পূজা করলেন ।

যশোধা মাতা তাপসী ব্রহ্মচারিণীর চরনে পতিত হয়ে কঁদতে থাকেন। যোগিনী যশোধারানীকে উঠিয়ে কোলেতে নিয়ে শুভ আশীৰ্বাদ করে বললেন , “ হে রানী দুঃখ কর না, দুঃখ পরিহার কর। অতি শীঘ্র এক জগৎপতি সুন্দর পুত্ৰ সন্তান তোমার গৰ্ভ হতে জন্ম নেবে''।

সে কথা শুনে উপস্থিত সকল গোপ - গোপীগণ আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উচ্চৈঃস্বরে জয়ধ্বনি দিয়ে বলে উঠলেন , “ নন্দরানী কি জয়''।
নন্দ মহারাজের বড় ভাই উপানন্দ সেই কথা শুনে হেসে হেসে
,বলতে লাগলেন , “এই গোকুল বন দৈত্য-দানব মুক্ত হয়ে মহাতীৰ্থ রুপে পরিগণিত হবে''।

তাপসী ব্ৰহ্মচারিণীর ভবিষ্যৎ বাণী শুনে সকল ব্ৰজবাসীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তারা সব একের পর এক এসে যোগিনী তথা তাপসী ব্ৰহ্মাচারিণীর পাদদ্বয়ে প্ৰণতি করে স্তুতি করলেন । তারপর তারা অতি শিঘ্র তাপসী ব্ৰহ্মচারিণীর থাকার জন্য একটি বিশাল কুটির নির্মাণ করে দিলেন ।

এদিকে নন্দ-মহারাজের অবশ্যই এক সুন্দর পুত্ৰ সন্তান হবে যিনি হবেন সকল জগতের পতি, তা জেনে সবার মনে সুখোদয় হলো।
স্নিগ্ধকন্ঠ ও মধুকন্ঠ দুজনের গলা ধরে নৃত্য কীর্তন করতে লাগল।

'' হে কৃষ্ণ করুনার সিন্ধো দ্বিনবন্ধো জগৎপতে,
গোপেশ গোপিকাকান্ত রাধাকান্ত নমোহস্তু তে''।। (কৃষ্ণ প্রনাম মন্ত্র)

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেন এই ধরা ধামে আসেন ?
কারন তিনি হচ্ছেন, ''সুহৃদং সর্বভূতানাম্‌'' অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ
সমস্ত জীবের সুহৃদ, একমাত্র মঙ্গলাকারী বন্ধু।
তিনি সমস্ত জগতের মঙ্গলের জন্য এখানে আবির্ভূত হন।। 
হরেকৃষ্ণ।।

Collected/courtesy by: Sodkirti Das
Share:

দ্বাদশ পদাবলী বা আদিবীজমন্ত্র

আমরা যারা সনাতন বা বৈদিক ধর্মাবলম্বী, তাদের কাছে শ্রীমদ্ভগবদ গীতা একখানি পবিত্র গ্রন্থ। এ শুধু গ্রন্থ বললে ভুল হবে, গীতা মানব জীবনের দিকনির্দেশনা প্রদান সহ সকল শাস্ত্রের আধার। এই পূণ্য গ্রন্থ পাঠের পুর্বে আমরা একটি শ্লোক পাঠ করে থাকি। "ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়!!" এটি শুধু শ্লোক নয়। গুরু কর্তৃক শিষ্যের কানে দেয়া বীজমন্ত্র ও বটে। এই আদি বীজমন্ত্র বহু মুনি ঋষি নিরন্তর জপ করে সিদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছেন।

. এই শ্লোকে আছে বারটি বর্ণ। যা হলো ওঁ ন, মো, ভ, গ, ব, তে, বা, সু, দে, বা, য়। এই বারটি বর্ণ নিয়ে রচিত হয়েছে বারটি পদাবলী।

যা সবার জানার জন্য পোস্ট করলাম। আশাকরি সবার ভাল লাগবে।


ওঁ-

বীজেতে ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবকে বোঝায়,

রাগদ্বেষাদি যার কৃপায় জয় করা যায়!

রোগে শোকে কাল নিদ্রায় মোরা হই মগন,

দয়াকরে রক্ষা করো হে মধুসূদন!!


ন-

নমি তব শ্রীপদেতে নিলাম শ্মরণ,

অনাশ্রয়ে অনাথের রক্ষো হে মধুসূদন!!


মো-

মোহ মায়ায় স্ত্রীসন্তানে সদা নিমগন,

তৃষ্ণা নিবারণ করো হে মধুসূদন!!



ভ-

ভক্তিহীন শোকে তাপে রত অনুক্ষণ,

পাপ হতে রক্ষা করো হে মধুসূদন!!



গ-

গতাগতি বারংবার করো নিবারণ,

জন্মমৃত্যু রহিত করো হে মধুসূদন!!



ব-

বহুগামীর বহু যোনী করেছি ভ্রমণ,

গর্ভদুঃখ হতে রক্ষো হে মধুসূদন!!



তে-

তেমনি ভোগ করতে হয় কর্ম যেমন,

সংসার মায়ায় রক্ষো হে মধুসুদণ!!

.

বা-

বাক্য দিয়েছিলাম তোমা করিব সাধন,

মায়ামোহে তা' ভুলিলাম হে মধুসুদণ!!

.

সু-

সুকর্ম করিনি আমি আমার এ জীবন,

দুঃখার্ণবে রক্ষা করো হে মধুসুদণ!!

.

দে-

দেহান্তর ছিলাম কতো নাই তা স্মরণ,

জন্মমৃত্যু বন্ধ করো হে মধুসুদণ!!

.

বা-

বাসুদেবে যেনো আমি স্মরি চিরন্তন,

জরাব্যাধি মৃত্যু হতে রক্ষো মধুসুদণ!!

.

য়-

যথা যথা জন্ম আমি করি হে ধারণ,

তব পদে অচলাবস্থা ভক্তি দাও মধুসুদণ!!

.

হে পরমকরুনাময়, সচ্চিদানন্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তোমার সৃষ্টির সকল কিছুই তুমি রক্ষা করো প্রভু। অনাথের নাথ তুমি সকল জীবের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের কারণ। তোমার সৃষ্টির সকল জীব সহ তোমার ভক্তদের একমাত্র রক্ষাকর্তা তুমি। তাই সবার জীবন মঙ্গলময় আর কল্যাণময় করো দয়াময়।(দেবেন্দ্র)

!!হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ

কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে

হরে রাম হরে রাম

রাম রাম হরে হরে!!

!!জয় শ্রীমধুসুদণ!!জয় রাধে!!

!!জয় হোক সকল ভক্তবৃন্দের!!

Collected

Share:

০৬ মে ২০১৮

বিষ্ণু পুরানে সৃষ্টিতত্ত্ব

প্রথমে এ বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির পুর্বে এই মহাবিশ্বে কিছুই ছিল না সম্পূর্ন শূন্য ছিল। সেই শূন্যতার সৃষ্টি মহাজ্যোতি পূঞ্জ থেকে। সেই জ্যোতি ধীরে ধীরে মানুষ রূপ ধারনকরে। সেই আদি পূরুষ হচ্ছে ভগবান নারায়ন।




তারপর নারায়ন যোগ নিদ্রায় মগ্ন হয়। সেই যোগ নিদ্রা থেকে ব্রহ্মজল নির্গত হয় ও ক্ষীর সাগরের তৈরী হয়। এরপর শ্রী নারায়নের নাভী থেকে একটি পদ্মফুলের কলি সৃষ্টি হয় এবং নারায়নের একটি প্রতিরুপ গিয়ে ঐ পদ্মফুলকে প্রস্ফুটিত করে।




ঐ পদ্মথেকে ব্রহ্মার সৃষ্টি হয়। এরপর নারায়নের ভ্র থেকে একটি রুদ্রাক্ষের সৃষ্টি হয়। পরে নারায়নের একটি প্রতিরূপ গিয়ে তার বিষ্ফোরন ঘটিয়ে শিবের সৃষ্টি করে। এরপর ব্রহ্মা ও শিব নারায়নের স্তুতি করে ও তাঁদের পরিচয় জানতে চান, তাঁরা বলেন হে জগদীশ জন্ম যখন দিয়েছেন পরিচয়ও দিন। তখন শ্রী নারায়ন মধুর হাসি হেসে বলেন আমিও যা আপনারাও তা। আমার প্রতিরূপ আপনারা। হে পঞ্চমুখী আপনি ব্রহ্মা (ব্রহ্মা প্রথমে পাঁচ মুখ বিশিষ্ট ছিল এরপর শিব ত্রিশূল দিয়ে একবার ব্রহ্মার একটি মস্তক কাটেন ও ব্রহ্মার পূজা নিষিদ্ধ করেন) আর হে জটাধারী হে ত্রিনেত্রেশ্বর আপনি শিব। আমরা.তিনজন ত্রিদেব।


শ্রী নারায়নের এই উত্তরের পর ব্রহ্মা ও শিব তাঁদের জন্মের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। তখন শ্রী নারায়ন বললেন, হে ব্রহ্মা, হে মহেশ্বর এই সংসারে জন্ম নিলে তাকে কর্মও করতে হয়। আপনাদেরও কর্ম করতে হবে। হে ব্রহ্মা আপনি সৃষ্টিকর্তা আপনি সৃষ্টি করবেন। আর হে মহেশ্বর আপনি সংহার কর্তা আপনি সংহার করবেন।
আর আমি নারায়ন যখন নিরাকার রূপ থেকে সাকার রূপ ধারন করেছি তখন আমাকেও কর্মকরতে হবে। আমি বিষ্ণু রুপে জগতের পালন করব। হে ব্রহ্মা আপনি গিয়ে সৃষ্টি রচনার প্রারম্ভ করুন।🎁🎁

এরপর ব্রহ্মা ও শিব প্রস্হান করলেন। এরপর শ্রীবিষ্ণু শীষ নাগের শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রনব মন্ত্র 'ওঁ' এর উচ্চরন করলেন। তখন তাঁর বাম হাত থেকে মা মহালক্ষী আবির্ভূত হলেন। তখন মা মহালক্ষী শ্রী নারানকে বললেন হে পরমশ্রেষ্ঠ আপনি নিজেই তো সম্পূর্ন ছিলেন, তবে আমায় কেন সৃষ্টি করলেন?

তখন শ্রীবিষ্ণু মধুর হাসি হেসে.বললেন আমি জানি আমি সমূর্ন আমি সেই প্রদীপের মত পূর্ণ যার থেকে অন্য প্রদীপ জ্বালালেও তার পূর্ণ আলো পূর্ণই থাকে। তবু হে প্রিয়া, চাঁদ যেমন চাঁদনী ছাড়া, ফুল যেমন সুগন্ধ ছাড়া, সূর্য যেমন তেজ ছাড়া অপূর্ণ তেমনি আমিও তোমাকে ছাড়া অপূর্ণ। আর আজ থেকে আমি ঘোষনা করছি যে কোন পুরুষ নারীকে ছাড়া সম্পূর্ণ হবে না, আর এই সম্পূর্নতাই নতুন প্রজন্মকে জন্ম দিবে। আর তোমাকেও একটি বর দিচ্ছি আমার নাম
আজ থেকে লক্ষীপতি এবং আমার নারায়ন নামের পূর্বে তোমার নাম যুক্ত হবে। আমার নাম আজ থেক লক্ষীনারায়ন। তখন মা লক্ষী বললেন,.তোমায় কোটি কোটি প্রনাম শ্রীহরি। এবার আমার কাজ বলে দাও। শ্রীবিষ্ণু বললেন তুমি আমার প্রেরণা। আমি তোমার কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই সৃষ্টি পালন করব। আর তুমি ব্রহ্মা
সৃষ্ট প্রানীদের উপর ধনের বর্ষা করবে।



এরপর শ্রীনারায়ন ব্রহ্মার কাজে সহায়তার জন্য যোগ নিদ্রায় মগ্ন হলেন এবং যোগের মাধ্যমে ব্রহ্মাকে শক্তি প্রদান করতে থাকলেন। ভগবান শ্রী বিষ্ণুর এবং ব্রহ্মার শক্তি একত্রিত হয়েও সৃষ্টি রচনার কাজ অগ্রসর হচ্ছিল না। এটাও প্রকৃত পক্ষে শ্রীবিষ্ণুর লীলারই অংশ ছিল। এদিকে সৃষ্টি রচনার কাজ এগোচ্ছে না দেখে ব্রহ্মা বিষ্ণুর শরনাপন্ন হলেন। তখন বিষ্ণু যোগ নিদ্রা মগ্ন ছিলেন। ব্রহ্মা গিয়ে বিষ্ণুর স্তব করতে লাগলেন। বিষ্ণু স্তবে খুশি হয়ে চোখ
খুললেন। ব্রহ্মা বিষ্ণুকে বললেন হে ক্ষীরসাগর বাসী কমল নয়ন রক্ষা কর। বিষ্ণু তাঁর সুমধুর হাসি হেসে বললেন, শান্ত হোন আদি প্রজাপতি, শান্ত হন। অধীরতা ত্রিদেবের মাঝে শোভা পায় না। ব্রহ্মা বললেন কিভাবে শান্ত হব জগদীশ বলুন। আমি সৃষ্টি করার জন্য জন্ম নিয়েছি। কিন্তু আমার এবং আপনার শক্তি মিলেও তো এই
মহান কার্যকে রূপ দিতে পারছে না।



এভাবে চলতে থাকলে তো আমার জন্ম বৃথা হয়ে যাবে। আমাকে এই সংকট থেকে বাঁচান প্রভু। নারায়ন হাসলেন, বললেন, আপনি সৃষ্টি কর্তা, আমি পালন কর্তা কিন্তু আমরা ছাড়াও আর একজন আছে যাঁর কাছে একটা মহান কাজের দায়িত্ব আছে মহাদেব। আপনি তাঁর কাছে যান। তিনি আপনাকে সহায়তা করবে। আর তখনি সৃষ্টি রচনার কাজ সার্থক হবে। কারন সৃষ্টির অর্থই জন্ম পালন এবং ধ্বংস। তিনি সংহার কর্তা। তাঁর শক্তিই সৃষ্টি রচনাতে সাহায্য করবে। শ্রীবিষ্ণুর আদেশে ব্রহ্মা শিবের কাছে গেলেন এবং তাঁকে শ্রীবিষ্ণুর কথা ও অনুরোধ জানালেন। শিব তখন যোগের মাধ্যমে শিব এবং শিবা এই দুই খন্ডে ভাগ হয়ে গেলেন। এই শিবাই আদি শক্তি। এরপর ত্রিদেবের একত্রিত.শক্তি দিয়ে নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্লহ, জীব ও.জড় তৈরী করলেন। এদিকে বিষ্ণু যখন যোগনিদ্রা মগ্ন থেকে ব্রহ্মাকে শক্তি দিচ্ছিলেন তখন তাঁর কান থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুটো অসুর জন্ম নিল। তারা প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। তারা সামনে ব্রহ্মাকে পেয়ে আক্রমন করল। ব্রহ্মা তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বিষ্ণুর শ্মরণে এলেন এবং বিষ্ণু তাদের গদাপ্রহারে হত্যা করলেন। গদার আঘাতে এই বিশালদেহী অসুরদের মেদ ছড়িয়ে পরল। তখন বিষ্ণুর আদেশে ব্রহ্মা এই মেদ বা চর্বি দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। এজন্য পৃথিবীর অপর নাম মেদিনী।

সমগ্র জড় জগৎ সৃষ্টির পর ব্রহ্মা তাঁর চার হাত থেকে চারজন ছোট ছেলেকে তৈরী
করলেন। তাদের নাম সনদ, সনাতন,সনন্দন ও সনদকুমার। ব্রহ্মা তাদের সৃষ্টি পরিচালনা ও
বংশবিস্তার করতে আদেশ দিলেন। কিন্তু তাদের ইচ্ছার অভাব ছিল তাই তারা এতে অপারগতা প্রকাশ করে। যার ফলে ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হয় এবং তাদের দূর করে দেন ব্রহ্মলোক থেকে। এবার ব্রহ্মা ভাবলেন সৃষ্টি রচনার আগে প্রয়োজন ভাল শিক্ষকের তাই তিনি সপ্তর্ষিকে তৈরী করলেন। এরপর তৈরী করলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র দক্ষ
এবং নারদকে। তিনি দক্ষকে প্রজাপতি নিযুক্ত করলেন এবং দেবর্ষি নারদকে ভগবত
ভক্তি প্রচারের নির্দেশ দিলেন। এবার তৈরী করলেন মনু ও শতরূপাকে। এই মনু ও শতরূপাই আমাদের আদি পিতামাতা।



এরপর ব্রহ্মার মনে হলো যে তিনি এই মহান সৃষ্টি রচনা করেছেন। তাঁর মনে অহংকার তৈরী হল। তখন শিব দেখলেন এই অহংকার ঠিক না এতে করে সৃষ্টিতেও অরাজকতা তৈরী হবে তাই তিনি ব্রহ্মার নিকটে গেলেন। কিন্তু ব্রহ্মার অহংকার এতটা চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে শিব শত চেষ্টা করেও বোঝাতে পারলেন না ব্রহ্মাকে। ব্রহ্মা একসময় শিবের অপমান করতে শুরু করলেন। তখন শিব ক্রুদ্ধ হয়ে মহারূদ্র রূপ ধারন করে তাঁর ত্রিশুল ব্রহ্মার দিকে নিক্ষেপ করলেন যা ব্রহ্মার একটি মস্তক কেটে ফেলল। ব্রহ্মাকে শিব সব ধরনের পূজা অর্চনা থেকে
বহিস্কার করলেন। ব্রহ্মা মস্তক কাটার পরে ভগবান সদা শিবের স্বরূপ চিনলেন।
তিনি শিবের স্তব করতে লাগলেন। শিব খুশি হলেন। তিনি বললেন ব্রহ্মাকে, হে আদি
প্রজাপতি অহংকার পতনের মুল। আপনার পন্ঞ্চম মাথাটি ছিল অহংকারের স্বরূপ
যা আমি কেটে ফেলেছি। আপনার অহংকার সমূলে নাশ হয়েছে। এটা বলে শিব অন্তর্ধান হয়ে গেলেন। ব্রহ্মার পুত্রদের মধ্যে সপ্তর্ষি এবং নারদ বুঝেছিলেন যে শিব ব্রহ্মার মঙ্গলেই তাঁর মাথা কেটেছান। এই মাথাটা না কাটলে অহংকারের
কারনে ব্রহ্মা ত্রিদেব হওয়ার মর্যাদা হারাতেন। কিন্তু ব্রহ্মাপুত্র দক্ষ এটা বুঝলেন না। তিনি শিবকে শত্রু ভাবতে লাগলেন।



পরমকরুনাময় সচ্চিদানন্দ গোলোকপতি ভগবান শ্রীহরি ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী
শক্তি শ্রীরাধার চরণকমলে সবার মঙ্গলময়, কল্যাণময়, সুন্দরময় আর শান্তিময়
জীবনের প্রার্থনা আমাদের।




🇯🇦🇾 🇸🇷🇮 🇰🇷🇮🇸🇭🇳🇦

(C)  প্রসেনজিৎ মোহন দাশ
Share:

শ্রীকৃষ্ণের পরম চমৎকারিত্ব

দীর্ঘকাল পূর্বে সরস্বতী নদীর তীরে মহান ঋষিগনের এক সভা বসেছিল যারা সত্ৰ নামে এক যজ্ঞ করেছিলেন। এধরণের সভায় উপস্থিত মহান ঋষিগন সাধারণত বৈদিক বিষয় আর দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, আর এই বিশেষ সভায় নিম্নোক্ত প্রশ্ন গুলো উঠলো: এই জড় জগতের ত্রিদেব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব, যাঁরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত ব্যাপার পরিচালনা করছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে? এই প্রশ্নের ওপর দীর্ঘ আলোচনার পর ব্রহ্মার পুত্র মহর্ষি ভৃগুকে ত্রিদেব কে পরীক্ষা করে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কে তা এই সভাকে জানানোর দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলো।


এভাবে নিযুক্ত হয়ে মহর্ষি ভৃগু প্রথমে তাঁর পিতার নিবাস ব্রহ্মলোকে গেলেন। ত্রিদেব তিন পার্থিব গুণ যাদের নাম সত্ব, রজ আর তম গুণের নিয়ন্ত্রা।ঋষিগনের মহর্ষি ভৃগুকে পরীক্ষা করতে নিযুক্ত করার উদ্দেশ্য ছিল জানা এই যে কে সাত্বিক গুনে পরিপূর্ণ। সুতরাং ভৃগু মুনি তাঁর পিতা ব্রহ্মার কাছে যখন পৌঁছলেন, যেহেতু পরীক্ষা করতে ইচ্ছুক ছিলেন, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই প্রণাম বা প্রার্থনা করে সম্মান জ্ঞাপন করলেন না। পুত্র বা শিষ্যের কর্তব্য পিতা বা গুরুর কাছে গেলে সম্মান জ্ঞাপন করা ও যথাযথ প্রার্থনা করা। কিন্তু ভৃগু মুনি ব্রহ্মাকে অবহেলার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ইচ্ছা করেই এমন করলেন না। ব্রহ্মা তাঁর পুত্রের ধৃষ্টতায় খুব ক্রোধান্বিত হলেন, এবং তাঁর ভাব ভঙ্গিমায় এটা বোঝা গেল। তিনি এমনকি অভিশাপ দিয়ে দণ্ডাদেশ দেওয়ার জন্যও উদ্যত হলেন, কিন্তু যেহেতু ভৃগু তাঁর পুত্র ছিল, তিনি তাঁর মহৎ বুদ্ধিমত্তার দ্বারা নিজের রাগ সম্বরন করলেন। এর অর্থ যদিও রাজসিক গুন তাঁর মধ্যে সর্বাত্মক ছিল, কিন্তু তাঁর এটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছিলো। ব্রহ্মার ক্রোধ আর তাঁর ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা আগুন আর জলের সাথে সম্পর্কিত। সৃষ্টির শুরুতে আগুন থেকে জল তৈরি হয়, কিন্তু জল দিয়েই আগুন নেভানো যায়। অনুরূপ ভাবে রাজসিক গুণের কারণে ব্রহ্মা যদিও রেগে গিয়েছিলেন, তবুও তিনি তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন কারণ ভৃগু ছিলেন তাঁর পুত্র।

ব্রহ্মদেব কে পরীক্ষা করার পর, ভৃগু মুনি সরাসরি কৈলাশ পর্বতে গেলেন, যেখানে শিব বাস করেন। ঘটনাচক্রে ভৃগু মুনি ছিলেন শিবের ভাই। তাই ভৃগু মুনি যেতেই শিব খুব খুশি হয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করতে নিজেই উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু যখন শিব এগিয়ে এলেন, ভৃগু মুনি তাঁকে আলিঙ্গন করতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন "আমার প্রিয় ভ্রাতা, তুমি সব সময় খুব অপবিত্র থাকো। যেহেতু তুমি অঙ্গে ভস্ম লেপন করে থাকো, তুমি খুব পরিষ্কার নও। তাই দয়া করে আমায় স্পর্শ কোরো না।" শিব অপবিত্র একথা বলে যখন ভৃগুমুনি তার ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করতে অস্বীকার করলেন, শিব খুব রেগে গেলেন। বলা হয় যে শরীর, মন বা বাক্য দ্বারা অপরাধ করা হয়। ভৃগুমুনির প্ৰথম অপরাধ যা তিনি ব্রহ্মদেবের কাছে করেছিলেন, তা ছিলো মনের দ্বারা কৃত অপরাধ। তাঁর দ্বিতীয় অপরাধ যা তিনি শিবের কাছে করেছিলেন তাঁকে অপমান করে, তা ছিলো বাক্যের দ্বারা কৃত অপরাধ। যেহেতু তামস গুন শিব এর মধ্যে প্রধাণ, ভৃগুর অপমানসূচক বাক্য শুনে তৎক্ষণাৎ ক্রোধে তাঁর চক্ষু লাল হয়ে গেলো। অনিয়ন্ত্রিত উষ্মায় তিনি ত্রিশূল নিয়ে ভৃগুমুনিকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। সেই সময় শিবপত্নী পার্বতী উপস্থিত ছিলেন। শিবের মতোই তাঁর ব্যক্তিত্বও তিন গুণের সংমিশ্রণ, তাই তাঁকে ত্রিগুনময়ী বলা হয়। এক্ষেত্রে তিনি শিবের সাত্বিক গুন জাগিয়ে তুলে পরিস্থিতি সামলালেন। তিনি তাঁর স্বামীর চরণে পড়লেন আর তাঁর মধুর বচনের দ্বারা ভৃগু মুনির হত্যার বিবেচনা মুক্ত করালেন।
----জয় শ্রীJরাধে গৌবিন্দ---

(C)  Bishojit Das
Share:

২৯ ডিসেম্বর ২০১৭

ভগবান চক্রপাণি শ্রীহরি।

নদীতে অধিকতর বলবান কুমীর কতৃক আক্ৰান্ত গজেন্দ্ৰকে উদ্ধার করার কাহিনী শ্ৰীমদ্ভাগবতের অষ্টম স্কন্ধে বৰ্ণিত হয়েছে । যেহেতু ভগবান পরম - জ্ঞানস্বরপ , তাই তার দিব্য নাম এবং তার চিন্ময় স্বরপে কোন পাৰ্থক্য নেই । কুমীর কতৃক আক্ৰান্ত হয়ে গজেন্দ্ৰ অত্যন্ত পীড়িত হয়েছিল ।

সাধারণত হাতী যদিও কুমীরের থেকে অধিক শক্তিশালী কিন্তু জলে কুমীর হাতীর থেকে অধিক শক্তিশালী। গজেন্দ্ৰ পূৰ্ব্বজন্মে ভগবানের এক মহান ভক্ত ছিলেন , তাই তার পূর্বকৃত সুকৃতির প্রভাবে তিনি দিব্য নাম উচ্চারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন । এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে রক্ষা করেছিলেন

জড় জগতে প্রতিটি জীবই সর্বদা দুঃখ - দুৰ্দশায় পীড়িত, কেননা এই জগতটি এমনই যে প্ৰতি পদক্ষেপেই প্ৰত্যেককে কোন না কোন প্রকার দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয় । কিন্তু কারো যদি পূর্বজন্মের সুকৃতি থাকে , তাহলে তিনি ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে ভগবানের চিন্ময় আনন্দে এই ''দুঃখ্যালয়মশাশ্বতম'' জগতে অবস্থান করেন। সেকথা শ্ৰীমদ্ভগবদগীতায় প্ৰতিপন্ন হয়েছে,

''চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনোহর্জুন,

আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থাথী জ্ঞানী চ ভরতর্ষভ''।। ৭/১৬

''অর্থাৎ হে ভরত শ্রেষ্ঠ অর্জুন, আর্ত, অর্থাথী, জিজ্ঞাসু এবং জ্ঞানী এই চার প্রকার পুন্যকর্মা ব্যাক্তিগন আমার ভজনা করেন।

কিন্তু যারা দুস্কৃতকারী এবং পাপী তারা দুঃখ - দুৰ্দশায় আর্ত হলেও ভগবানের শরণাগত হতে পারে না । সে কথাও শ্ৰীমদ্ভগবদগীতায় প্ৰতিপন্ন হয়েছে ।

''ন মাং দুস্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ,

মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ''। ৭/১৫

অনুবাদঃ মূঢ়া , নরধম , মায়য়া দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসমপন্ন, সেই সমস্ত দুস্কৃতিকারীরা কখনও আমার শরনাগত হতে পারে না''।

গজেন্দ্ৰ যখন আর্ত হয়ে ভগবানের শরণাগত হন। এবং চিৎকার করে তাকে রক্ষা করার জন্য ভগবানকে ডাকতে থাকেন তখন ভগবান তার নিত্য বাহন গরুড়ের পিঠে চড়ে তৎক্ষণাৎ সেখানে এসে উপস্থিত হন এবং দুঃখী গজেন্দ্ৰকে উদ্ধার করেন।

গজেন্দ্ৰ পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে তার সম্পৰ্ক সম্বন্ধে অবগত ছিলেন । তিনি ভগবানকে আদিপুরুষ বা পরম ভোক্তা বলে সম্বোধন করে ডাকতে থাকেন।

ভগবান এবং জীব উভয়ই চেতন এবং তাই উভয়ই ভোক্তা ; কিন্তু ভগবান হচ্ছেন পরম ভোক্তা , কেননা তিনি সবকিছুর স্ৰষ্টা । একটি পরিবারে যেমন পিতা এবং পুত্ৰ উভয়ই নিঃসন্দেহে ভোক্তা , কিন্তু পিতা হচ্ছেন মুখ্য ভোক্তা এবং পুত্ৰ গৌণ ভোক্তা ।

ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত ভালভাবেই জানেন যে এই ব্ৰহ্মাণ্ডের সবকিছুই ভগবানের সম্পত্তি এবং জীব তার জন্য বরাদ্দ অংশটুকুই কেবল ভোগ করতে পারে । যা তার জন্য বরাদ্দ করা হয়নি , তা জীব স্পর্শ করতেও পারেন না। এইভাবে ভগবান এবং জীবের মধ্যে পাৰ্থক্য যিনি অবগত তিনি ভগবানকে প্ৰথমে নিবেদন না করে কোন কিছু গ্ৰহণ করেন না।

গজেন্দ্ৰ ভগবানকে সমগ্ৰ জগতের প্রভু বলে সম্বোধন করেছেন , সেই সূত্ৰে তিনি গজেন্দ্ৰরও প্ৰভু । ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত গজেন্দ্ৰ কুমীরের আক্ৰমণ থেকে রক্ষা লাভের বিশেষ যোগ্য ছিলেন এবং ভগবান যেহেতু প্ৰতিজ্ঞা করেছেন যে তার ভক্ত কখনো বিনষ্ট হবেন না , তাই গজেন্দ্রর পক্ষে রক্ষা লাভের জন্য ভগবানের কাছে প্ৰাৰ্থনা যথাৰ্থই উপযুক্ত ছিল এবং ভগবানও তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছিলেন ।

ভগবান সকলেরই পালক , তবে অহঙ্কারে মত্ত হয়ে ভগবানের শ্ৰেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে তার সমকক্ষ হওয়ার দাবী করার পরিবর্তে যারা তার মাহাত্ম্য স্বীকার করে তার শরণাগত হন , তাদের তিনি সর্বপ্ৰথমে রক্ষা করেন । ভগবান সর্বদাই পরম উৎকৃষ্ট । ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত ভগবানের সঙ্গে তার পাৰ্থক্য সম্বন্ধে অবগত । ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত সৰ্বতোভাবে ভগবানের শরণাগত বলে ভগবান তাকে প্ৰথম সুযোগ দেন ।

কিন্তু যারা ভগবানের অস্তিত্ব অস্বীকার করে নিজেদের ভগবান বলে প্রচার করে , সেই সমস্ত অসুরদের ভগবান কিছু সীমিত শক্তি অনুমোদন করেন যার প্রভাবে তারা আত্মরক্ষা করে । যেহেতু ভগবান হচ্ছেন সকলের থেকে শ্ৰেষ্ঠ , তাই তার পূৰ্ণতাও সর্বশ্ৰেষ্ঠ । তার পূৰ্ণতা কেউ কল্পনাও করতে পারে না ।

তাই ভগবান চক্ৰপাণি শ্ৰীহরি সেই শরণার্থী গজরাজের আর্তনাদ শ্ৰবণ করে পক্ষীরাজ গরুড়ের পৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক তার চক্রের দ্বারা কুমীরের বদন দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন এবং কৃপাপূর্বক গজরাজের শুড় ধরে তাকে কুমীরের মুখ থেকে উদ্ধার করেছিলেন।

(C) প্রসেনজিৎ মোহন দাশ
Share:

ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের মাহাত্ম্য বর্ণনা

ঋ‌ষিগণ বল‌লেন -- বিশ্বব‌ন্দিত ভগবান শংকর ! এবার আমরা বাস‌ু‌দেব শ্রীকৃ‌ষ্ণের মাহাত্ম্য শ্রবণ কর‌তে চাই ।

ম‌হেশ্বর বল‌লেন -- মু‌নিবরগণ ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মার থে‌কেও শ্রেষ্ঠ । সেই সনাতন পুরুষ‌কে শ্রীহ‌রি বলা হয় । তাঁর দেহকা‌ন্তি জাম্বূনদ নামক সুব‌র্ণের ন্যায় তেজস্বী । তি‌নি মেঘবিহীন আকা‌শে উ‌দিত সূ‌র্যের ন্যায় তেজস্বী । তাঁর দশ হাত এবং সেগু‌লি মহান তেজসম্পন্ন । তি‌নি দেবতা‌দের চির শত্রু দৈত্য‌দের বিনাশকারী । তাঁর বক্ষঃস্থ‌লে শ্রীবৎ‌সের চিহ্ন শোভা পায় । তি‌নি হৃষীক অর্থাৎ ই‌ন্দ্রিয়া‌দির প্রভু হওয়ায় তাঁ‌কে হৃষী‌কেশ বলা হয় ।

সমস্ত দেবতা তাঁর পূজা ক‌রেন । ব্রহ্মা তাঁর উদর থে‌কে এবং আ‌মি তাঁর মস্তক থে‌কে উৎপন্ন হ‌য়ে‌ছি । তাঁর মাথার চুল থে‌কে নক্ষত্র ও তারা উদ্ভূত হ‌য়ে‌ছে । দেবতা এবং অসুর তাঁর দে‌হের রোম থে‌কে সৃষ্ট । সমস্ত ঋ‌ষি এবং সনাতনলোক তাঁর শ্রী‌বিগ্রহ থে‌কে উৎপন্ন । শ্রীহ‌রি স্বয়ং সমস্ত দেবতা এবং ব্রহ্মার ধাম । তি‌নিই সমস্ত জগ‌তের স্রষ্টা এবং ত্রি‌লো‌কের স্বামী ।

তি‌নিই সমস্ত চরাচ‌রের প্রাণী‌দের সংহার ক‌রেন । তি‌নি দেবতা‌দের ম‌ধ্যে শ্রেষ্ঠ , তাঁ‌দের রক্ষক এবং শত্রুসন্তপ্তকারী । তি‌নি সর্বজ্ঞ , সব‌কিছু‌তে প‌রিব্যাপ্ত , সর্বব্যাপক এবং সর্ব‌দি‌কে মুখসম্পন্ন । তি‌নিই পরমাত্মা , ই‌ন্দ্রিয়াদির প্রেরক এবং সর্বব্যাপী ম‌হেশ্বর । ত্রি‌লো‌কে তাঁর থে‌কে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই । তি‌নিই সনাতন , মধুসূদন এবং গো‌বিন্দ ইত্যা‌দি না‌মে প্র‌সিদ্ধ ।

সজ্জন‌কে সম্মান প্রদর্শনকারী এই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরু‌ক্ষে‌ত্রের যুদ্ধে সমস্ত রাজা‌দের সংহার করা‌বেন । তি‌নি দেবতা‌দের কার্য‌সি‌দ্ধির জন্য পৃ‌থিবী‌তে মানব - শরীর ধারণ ক‌রে আ‌বির্ভূত হ‌য়ে‌ছেন । তার শ‌ক্তি এবং সহায়তা ছাড়া দেবতারা কো‌নো কাজই কর‌তে পা‌রেন না । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকল প্রাণীর অগ্রগণা , তাই সমস্ত দেবতা তাঁর চর‌ণে মাথা নত ক‌রে ।

দেবতা‌দের রক্ষা এবং তাঁ‌দের কার্য - সাধ‌নে রত এই ভগবান বাসু‌দেব ব্রহ্মস্বরূপ । তি‌নি ব্রহ্ম‌র্ষি‌দের সর্বদা শরণ দি‌য়ে থা‌কেন । ব্রহ্মা এবং আ‌মি ---- দুজ‌নেই তাঁর শরী‌রের ম‌ধ্যে অত্যন্ত সু‌খে অবস্থান ক‌রি । সমস্ত দেবতাও তাঁর শ্রী‌বিগ্র‌হে সুখপূর্বক বাস ক‌রেন ।

তাঁর চোখদু‌টি কম‌লের ম‌তো সুন্দর । তাঁর বক্ষঃস্থ‌লে লক্ষ্মীর বাস , তিনি সর্বদা লক্ষ্মীর স‌ঙ্গে বাস ক‌রেন । তাঁর বি‌শেষ অস্ত্র হল শার্ঙ্গধনুক , সুদর্শন চক্র , নন্দন নামক ধনুক ।তাঁর ধ্বজা‌তে গরু‌ড়ের চিহ্ন আছে । তি‌নি উত্তম শীল , শম , দম , পরাক্রম , বীর্য , সুন্দর দেহ , সুন্দর দর্শন , সু‌ডৌল আকৃ‌তি , ধৈর্য , সরলতা , কোমলতা , রূপ ও বল ইত্যাদি সদ্গুণসম্পন্ন । সর্বপ্রকার দিব্য এবং অদ্ভূত অস্ত্রশস্ত্র তাঁর কা‌ছে সর্বদা মজুত থা‌কে । তি‌নি যোগমায়াসম্পন্ন এবং সহস্র নেত্র সংব‌লিত । তাঁর কো‌নো বিনাশ নেই ।

তি‌নি উদার‌চিত্ত , মিত্র‌দের প্রশংসক , জ্ঞা‌তি এবং বন্ধু - বান্ধব‌দের প্রিয় , ক্ষমাশীল , অহংকারর‌হিত , ব্রাহ্মণভক্ত , বেদ উদ্ধারকারী , ভয়ার্ত মানু‌ষের ভয় হরণকারী ও মিত্র‌দের আনন্দবর্ধনকারী । তি‌নি সমস্ত প্রাণী‌কে শরণ প্রদান ক‌রেন , দীনা‌র্তের রক্ষায় সদা তৎপর , শাস্ত্রজ্ঞাতা , অর্থসম্পন্ন , সমস্ত জগ‌তের বন্দনীয় , শরণাগত শত্রু‌কেও আশ্রয় প্রদান ক‌রেন , ধর্মজ্ঞ , নী‌তিজ্ঞ , নী‌তিমান , ব্রহ্মবাদী এবং জি‌তে‌ন্দ্রিয় । সেই পর‌মেশ্ব‌র‌কে পূজা কর‌লে পরম ধ‌র্মের সি‌দ্ধি হয় ।

তি‌নি মহা‌তেজস্বী দেবতা । তি‌নি প্রজা‌হিতা‌র্থে ধ‌র্মের জন্য কোটি কো‌টি ঋ‌ষি সৃ‌ষ্টি ক‌রে‌ছেন । তাঁর সৃষ্ট সনৎকুমার প্রমুখ ঋ‌ষি আজও গন্ধমাদন পর্ব‌তে তপস্যায় রত আ‌ছেন , তাই ধর্মজ্ঞ উত্তম বক্তা বাসু‌দেব‌কে সর্বদা প্রণাম করা উ‌চিত । ভগবান নারায়ণ দেব‌লো‌কে সর্ব‌শ্রেষ্ঠা । যে তাঁ‌কে বন্দনা ক‌রে , তি‌নিও তার বন্দনা করেন । যে তাঁ‌কে সম্মান ক‌রে , তি‌নিও তাঁর সম্মান ক‌রেন ।

এইরূপ অর্চিত হ‌লে অর্চনা ক‌রেন , পূ‌জিত হ‌লে পূজা ক‌রেন , দর্শনকারী‌দের ওপর সর্বদা কৃপাদৃ‌ষ্টি রা‌খেন এবং শরণাগত‌কে শরণ প্রদান ক‌রেন । আ‌দি‌দেব ভগবান বিষ্ণুর এই উত্তম ব্রত । সজ্জন ব্য‌ক্তি সর্বদাই তাঁর এই ব্রত আচরণ ক‌রেন । তি‌নি সনাতন দেবতা , তাই দেবগণ সর্বদাই তাঁ‌কে পূজা ক‌রেন । যারা তাঁর অনন্যভক্ত , তাঁরা নি‌জেদের সাধনায় অনুরূপ নির্ভয়পদ প্রাপ্ত হন ।

‌দ্বিজগ‌ণের উ‌চিত মন , বাক্য ও ক‌র্মের দ্বারা সর্বদা সেই ভগবা‌নের পূজা করা , প্রণাম করা এবং যত্নসহকা‌রে উপাসনা করে দেবকীনন্দনকে দর্শন লাভ করা ।

মু‌নিবরগণ ! আ‌মি আপনা‌দের এক উত্তম মার্গ জান‌ালাম । কেবল ভগবান ভগবান বাসু‌দেব‌কে দর্শন কর‌লে আপনা‌দের সব দেবতার দর্শন লাভ হ‌বে ।

আ‌মিও মহাবরাহরূপ ধারণকারী সর্ব‌লোক‌পিতামহ জগদীশ্বর‌কে নিত্য প্রণাম ক‌রি । আমরা সকল দেবতা তাঁর শ্রী‌বিগ্র‌হে বাস ক‌রি , সুতরাং তাঁ‌কে দর্শন কর‌লে তিন দেবতার ( ব্রহ্মা , বিষ্ণু , ম‌হেশ্ব‌রের ) দর্শন লাভ হয় । এ‌তে কো‌নো স‌ন্দেহ নেই ।

ত‌পোধনগণ ! আ‌মি আপনা‌দের ওপর অনুগ্রহ ক‌রে ভগবা‌নের প‌বিত্র মাহাত্ম্য এই জন্য শোনালাম , যা‌তে আপনারা যত্ন সহকা‌রে যদু‌শ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের পূজা ক‌রেন ।

দেব‌র্ষি নারদ বল‌লেন - প্রভ‌ু ! ভগবান শংকর হিমালয় শিখ‌রে যাঁর মাহাত্ম্য আমা‌দের ব‌লে‌ছি‌লেন , সেই ব্রহ্মভূত সনাতন পুরুষ আপ‌নিই , শ্রীকৃষ্ণ । আপনার প্রভা‌বে আর এক‌টি আশ্চ‌র্যের ব্যাপার হল এই যে আমরা আপনা‌কে দে‌খে বি‌স্মিত হ‌য়ে‌ছি এবং আমা‌দের পূর্বকথা স্মরণ হ‌য়ে‌ছে । প্র‌ভো ! দেবা‌দি‌দেব ভগবান শংকর আপনার এরূপ মাহাত্ম্যের কথা বর্ণনা ক‌রেছি‌লেন ।

জয় রা‌ধে

জয় শ্রীহরির জয় ।

জয় ভক্তগ‌ণের জয় ।

(C) Joy Shree Radha Madhav
Share:

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

বেদ ও শ্রী কৃষ্ণ

✍বেদ শব্দের অর্থ জ্ঞান এবং সেটি ভগবান থেকে প্রকাশিত হচ্ছে. বেদ শাশ্বত ও অপৌরুষেয়ঃ.

পরম জ্ঞান নিত্য ও কোন মানুষের রচিত নয়.

শাস্ত্রীয় ইতিহাস অনুসারে, সৃষ্টির আদিতে ব্রহ্মান্ডের প্রথম জীব স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা. এই বেদ-জ্ঞান লাভ করেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণর নিকট থেকে,

তার বেণুধ্বনির মাধ্যমে.

যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্ব্বং যো বৈ

বেদাংশ্চ গাপয়তি স্ম কৃষ্ণঃ. (- 1/24 গোপালতাপনী উপনিষদ)

"যিনি সৃষ্টির আদিতে ব্রহ্মাকে বৈদিক জ্ঞান উপদেশ করেছিলেন এবং পূর্বে বৈদিক জ্ঞান বিস্তার করেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণই."

.
ব্রহ্মসংহিতায় শ্রীকৃষ্ণকে বেদের সারসত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে (তুষ্টাব বেদসারেণ স্তোত্রেণানেন কেশবম - 5/28).

বেদ অনুসারে,

ব্রহ্মা ভগবান শ্রীবিষ্ণু হতে উদ্ভূত,  আর শ্রীকৃষ্ণ শ্রীবিষ্ণুরও উৎস. জড় জগতে ভগবানের তিনটি পুরুষাবতার - বিষ্ণুরূপ প্রকাশিতঃ

.

(1) প্রথম পুরুষাবতারঃ কারণোদকশায়ী বিষ্ণু বা মহাবিষ্ণু - কারণ-উদক সাগরে (কার্যকারণ মহাসাগর) শায়িত এই মহাবিষ্ণুর বিরাট শরীর থেকে কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড (universes এর ক্লাস্টার) প্রকাশিত হয়, মহাপ্রলয়ে (অবলুপ্তি) সমস্ত জড় ব্রহ্মান্ড ধ্বংস হয়ে সূক্ষ্ম জড় উপাদনরূপে (মহত্তত্ব) তাঁর দিব্য শরীরে বিলীন হয়.

.

(২) দ্বিতীয় পুরুষাবতারঃ গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু - মহাবিষ্ণু নিজেকে কোটি কোটি রূপে বিস্তার করে প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে প্রবেশ করে ব্রহ্মান্ডের গর্ভোদকে শয়ন করেন.

তারপর ব্রক্ষ্মাকে সৃষ্টি করেন. ব্রহ্মার মাধ্যমে সূর্য ও চতুর্দশ ভুবন বা গ্রহলোকসমূহ (গ্রহ সিস্টেম) সৃষ্টি করেন.

.

(3) তৃতীয় পুরুষাবতারঃ - ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণু - প্রতি ব্রহ্মান্ডে শ্রীবিষ্ণু নিজেকে অসংখ্য রূপে বিস্তার করে করে জীবসত্তাকে ভগবদধামে ফিরে আসতে সাহায্য করার জন্য প্রত্যেক জীব হৃদয়ে পরমাত্মারূপে অবস্থান করেন.

.

এইভাবে, কোটি কোটি, অসংখ্য অনন্তরূপে ভগবান নিজেকে বিস্তার করেন, কিন্তু তিনি 'অদ্বৈতম' (অ দ্বৈত) তিনি এক ও অভিন্ন এবং সকল রূপের পরম উৎস শ্রীকৃষ্ণ স্বরূপ, এটিই বৈদিক শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত.🙂

ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে (5/33) -

অদ্বৈতম-অচ্যুতম-অনাদিম-অনন্তরূপম

আদ্যং পুরাণপুরুষং নবযৌবনঞ্চ.

বেদেষু দুর্লভম-অদুর্লভম-আত্মভক্তৌ

গোবিন্দম-আদি পুরুষং তমহং ভজামি ..

"যিনি অদ্বৈত, অচ্যুত, অনাদি, অনন্তরূপ সম্পন্ন, আদি পুরাণপুরুষ হয়েও নিত্য নব নবায়মান যৌবন সম্পন্ন সুন্দর পুরুষ, বেদাদি শাস্ত্র পাঠে দুর্লভ কিন্তু শুদ্ধ আত্মভক্তির লভ্য, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি."

.

বেদে সর্বদেবতার উপাস্য ভগবান রূপে শ্রীবিষ্ণুকে স্তুতি করা হয়েছে, যেমন ঋগবেদে (১/২২/২০) বলা হয়েছে -

ওঁ তদবিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা

পশ্যন্তি সূরয়ো দিবীব চক্ষুরাততম.

তদবি প্রাসো বিপন্যবো জাগৃবাংষঃ

সমিন্ধতে বিষ্ণোর্যৎ পরমং পদম ..

.

"পরমেশ্বর বিষ্ণুই হচ্ছেন পরম সত্য.

সুরগন তাঁর পাদপদ্ম দর্শনে সর্বদাই উদগ্রীব. সূর্যের মতোই ভগবান তাঁর শক্তি রশ্মির বিস্তার করে সর্বত্র ব্যাপ্ত আছেন. "🙂

ঋগবেদে ১/২২/১৭ ১/২২/১৮,১/১৫৪/১, ১/১৫২/২, ১/১৫৪/৩, ১/১৫৪/৪, ১/১৫৪/৬ নং মন্ত্রে বিষ্ণুর কথা বলা হয়েছে. 🙂

অথর্ব বেদে বলা হয়েছে, যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্বং যো বৈ বেদাংশ্চ গাপয়তি স্ম কৃষ্ণঃ. অর্থাৎ - "ব্রহ্মা, যিনি পূর্বকালে জগতে বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেন,

সেই জ্ঞান তিনি সৃষ্টির আদিতে যাঁর কাছ থেকে প্রাপ্ত হন তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ." 🙂

.

শ্রীবিষ্ণু শ্রীকৃষ্ণেরই প্রকাশ বা বিস্তার, শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত, যেমন সকল বেদ উপনিষদের সার গীতোপনিষদ, ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণু বলে সম্বোধন করা হয়েছে - শমং চ বিষ্ণো (১১/২৪), প্রতপন্তি বিষ্ণুো- (১১/৩০), আদিত্যানাম অহং বিষ্ণু (১০/২১) ইত্যাদি. শ্রীকৃষ্ণই শ্রীবিষ্ণুরূপে সর্বজীবের অন্তরস্থিত পরমাত্মা - অহমাত্মা গূঢ়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ (১০/২০).

বিষ্ণুমূর্তি-সমূহ, রাম-নৃসিংহ ইত্যাদি অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণরই প্রকাশ, অংশ, কলা. শ্রীকৃষ্ণই স্বয়ং ভগবান (এতে চাংশ কলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্ত ভগবান স্বয়ম - ভাগবতম ১/৩/২৪). ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণপরাৎপর পুরুষ, সেজন্য তাঁর থেকে অসংখ্য ভগবৎ-রূপ বিস্তার হলেও তিনি তাঁর পূর্ণ স্বরূপে নিত্য বিরাজমান. শ্রী ঈশোপনিষদে যেমন বলা হয়েছে (১ আবাহন)

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে.

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ..

"পরমেশ্বর ভগবান সর্বতোভাবে পূর্ণ. তিনি সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ বলে এই দৃশ্যমান জগতের মতো তাঁর থেকে উদ্ভূত সব কিছুই সর্বতোভাবে পূর্ণ.

যা কিছু পরম পূর্ণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে তা সবই পূর্ণ.

কিন্তু যেহেতু তিনি হচ্ছেন পরম পূর্ণ, তাই তাঁর থেকে অসংখ্য অখন্ড ও পূর্ণ সত্তা বিনির্গত হলেও তিনি পূর্ণরূপেই অবশিষ্ট থাকেন. "🙂

.

ভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণর কয়েকটি উক্তিঃ

বেদ্যং পবিত্রং ওঙ্কার - ৯/১৭- আমাকে পবিত্র ওঙ্কার বলে জানবে. 🙂

.

প্রণবঃ সর্ববেদেষু - ৭/৮ - সমস্ত বেদে উল্লেখিত প্রণব (ভগবানের নির্বিশেষ নাম) আমিই.

.

বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তম - 15/18 - বেদে আমি পুরুষোত্তম নামে খ্যাত

.

বেদানং সামবেদোহস্মি - ১১/২২ - সমস্ত বেদের মধ্যে আমি সামবেদ

.

ঋক সাম যজুরেব চ - ৯/১৭- ঋক, সাম, যজুর্বেদাদি ও আমি

.

বৃহৎসাম তথা সাম্নাং গায়েত্রী ছন্দসামহম - ১০/৩০- আমি

.

সামবেদের মধ্যে বৃহৎসাম, সমস্ত ছন্দের মধ্যে গায়েত্রী.

.

অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ - ৯/২৯- আমি সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা, প্রভু.

.

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও বিপ্লবাত্মক কথা বলেছেন - তিনি বলেন (গীতা ২/৪২)

"বিবেকবর্জিত লোকেরাই বেদের পুষ্পিত বাক্যে আসক্ত হয়ে স্বর্গসুখ ভোগ, উচ্চকুলে জন্ম, ক্ষমতা লাভ-আদি সকাম কর্মকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে. ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ ও ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা বলে যে, তার ঊধ্বে আর কিছুই নেই.🙂 "

.

ভগবদগীতাকে সমস্ত বেদ-উপনিষদের সার-নির্যাস বলা হয় (সর্বোপনিষদোগাবো). ভগবান শ্রীকৃষ্ণর উক্তি ও ভগবদগীতার তথ্যের সাথে বেদ-উপনিষদের মৌল তত্ত্বের সুস্পষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে. নিম্নে কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করুন -

.

1. ভগবদগীতা - 8/9 নং শ্লোক ও 13/18 নং শ্লোক আর শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের (3/8) নং শ্লোক একই

2. গীতার 15/14 নং শ্লোক আর বৃহদারণ্যক উপনিষদ 5/9/1 নং শ্লোক একই.

3. গীতার 9/10 নং শ্লোক আর ঐতরেয় উপনিষদ 3/11 নং শ্লোক এক.

4. গীতার 15/18 নং শ্লোক আর ছান্দোগ্য উপনিষদ 8/12/13 নং শ্লোকে একই কথা বলা হয়েছে.

5. গীতার 7/2 নং শ্লোক আর মুন্ডক উপনিষদ 1/3 নং শ্লোকে একই কথা বলা হয়েছে.

6. গীতার 10/২ নং শ্লোক আর শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ 6 / 7-8 নং শ্লোক একই.

7. গীতার 2/20 নং শ্লোক আর কঠোপনিষদ 1/2/18 নং শ্লোক একই.

(সংক্ষিপ্ত)

(C)Nilardhitaa Sharma

Share:

০৫ ডিসেম্বর ২০১৭

ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের মাহাত্ম্য বর্ণনা


ঋ‌ষিগণ বল‌লেন -- বিশ্বব‌ন্দিত ভগবান শংকর ! এবার আমরা বাস‌ু‌দেব শ্রীকৃ‌ষ্ণের মাহাত্ম্য শ্রবণ কর‌তে চাই ।

ম‌হেশ্বর বল‌লেন -- মু‌নিবরগণ ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মার থে‌কেও শ্রেষ্ঠ । সেই সনাতন পুরুষ‌কে শ্রীহ‌রি বলা হয় । তাঁর দেহকা‌ন্তি জাম্বূনদ নামক সুব‌র্ণের ন্যায় তেজস্বী । তি‌নি মেঘবিহীন আকা‌শে উ‌দিত সূ‌র্যের ন্যায় তেজস্বী । তাঁর দশ হাত এবং সেগু‌লি মহান তেজসম্পন্ন । তি‌নি দেবতা‌দের চির শত্রু দৈত্য‌দের বিনাশকারী । তাঁর বক্ষঃস্থ‌লে শ্রীবৎ‌সের চিহ্ন শোভা পায় । তি‌নি হৃষীক অর্থাৎ ই‌ন্দ্রিয়া‌দির প্রভু হওয়ায় তাঁ‌কে হৃষী‌কেশ বলা হয় ।

সমস্ত দেবতা তাঁর পূজা ক‌রেন । ব্রহ্মা তাঁর উদর থে‌কে এবং আ‌মি তাঁর মস্তক থে‌কে উৎপন্ন হ‌য়ে‌ছি । তাঁর মাথার চুল থে‌কে নক্ষত্র ও তারা উদ্ভূত হ‌য়ে‌ছে । দেবতা এবং অসুর তাঁর দে‌হের রোম থে‌কে সৃষ্ট । সমস্ত ঋ‌ষি এবং সনাতনলোক তাঁর শ্রী‌বিগ্রহ থে‌কে উৎপন্ন । শ্রীহ‌রি স্বয়ং সমস্ত দেবতা এবং ব্রহ্মার ধাম । তি‌নিই সমস্ত জগ‌তের স্রষ্টা এবং ত্রি‌লো‌কের স্বামী ।

তি‌নিই সমস্ত চরাচ‌রের প্রাণী‌দের সংহার ক‌রেন । তি‌নি দেবতা‌দের ম‌ধ্যে শ্রেষ্ঠ , তাঁ‌দের রক্ষক এবং শত্রুসন্তপ্তকারী । তি‌নি সর্বজ্ঞ , সব‌কিছু‌তে প‌রিব্যাপ্ত , সর্বব্যাপক এবং সর্ব‌দি‌কে মুখসম্পন্ন । তি‌নিই পরমাত্মা , ই‌ন্দ্রিয়াদির প্রেরক এবং সর্বব্যাপী ম‌হেশ্বর । ত্রি‌লো‌কে তাঁর থে‌কে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই । তি‌নিই সনাতন , মধুসূদন এবং গো‌বিন্দ ইত্যা‌দি না‌মে প্র‌সিদ্ধ ।

সজ্জন‌কে সম্মান প্রদর্শনকারী এই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরু‌ক্ষে‌ত্রের যুদ্ধে সমস্ত রাজা‌দের সংহার করা‌বেন । তি‌নি দেবতা‌দের কার্য‌সি‌দ্ধির জন্য পৃ‌থিবী‌তে মানব - শরীর ধারণ ক‌রে আ‌বির্ভূত হ‌য়ে‌ছেন । তার শ‌ক্তি এবং সহায়তা ছাড়া দেবতারা কো‌নো কাজই কর‌তে পা‌রেন না । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকল প্রাণীর অগ্রগণা , তাই সমস্ত দেবতা তাঁর চর‌ণে মাথা নত ক‌রে ।

দেবতা‌দের রক্ষা এবং তাঁ‌দের কার্য - সাধ‌নে রত এই ভগবান বাসু‌দেব ব্রহ্মস্বরূপ । তি‌নি ব্রহ্ম‌র্ষি‌দের সর্বদা শরণ দি‌য়ে থা‌কেন । ব্রহ্মা এবং আ‌মি ---- দুজ‌নেই তাঁর শরী‌রের ম‌ধ্যে অত্যন্ত সু‌খে অবস্থান ক‌রি । সমস্ত দেবতাও তাঁর শ্রী‌বিগ্র‌হে সুখপূর্বক বাস ক‌রেন ।

তাঁর চোখদু‌টি কম‌লের ম‌তো সুন্দর । তাঁর বক্ষঃস্থ‌লে লক্ষ্মীর বাস , তিনি সর্বদা লক্ষ্মীর স‌ঙ্গে বাস ক‌রেন । তাঁর বি‌শেষ অস্ত্র হল শার্ঙ্গধনুক , সুদর্শন চক্র , নন্দন নামক ধনুক ।তাঁর ধ্বজা‌তে গরু‌ড়ের চিহ্ন আছে । তি‌নি উত্তম শীল , শম , দম , পরাক্রম , বীর্য , সুন্দর দেহ , সুন্দর দর্শন , সু‌ডৌল আকৃ‌তি , ধৈর্য , সরলতা , কোমলতা , রূপ ও বল ইত্যাদি সদ্গুণসম্পন্ন । সর্বপ্রকার দিব্য এবং অদ্ভূত অস্ত্রশস্ত্র তাঁর কা‌ছে সর্বদা মজুত থা‌কে । তি‌নি যোগমায়াসম্পন্ন এবং সহস্র নেত্র সংব‌লিত । তাঁর কো‌নো বিনাশ নেই ।

তি‌নি উদার‌চিত্ত , মিত্র‌দের প্রশংসক , জ্ঞা‌তি এবং বন্ধু - বান্ধব‌দের প্রিয় , ক্ষমাশীল , অহংকারর‌হিত , ব্রাহ্মণভক্ত , বেদ উদ্ধারকারী , ভয়ার্ত মানু‌ষের ভয় হরণকারী ও মিত্র‌দের আনন্দবর্ধনকারী । তি‌নি সমস্ত প্রাণী‌কে শরণ প্রদান ক‌রেন , দীনা‌র্তের রক্ষায় সদা তৎপর , শাস্ত্রজ্ঞাতা , অর্থসম্পন্ন , সমস্ত জগ‌তের বন্দনীয় , শরণাগত শত্রু‌কেও আশ্রয় প্রদান ক‌রেন , ধর্মজ্ঞ , নী‌তিজ্ঞ , নী‌তিমান , ব্রহ্মবাদী এবং জি‌তে‌ন্দ্রিয় । সেই পর‌মেশ্ব‌র‌কে পূজা কর‌লে পরম ধ‌র্মের সি‌দ্ধি হয় ।

তি‌নি মহা‌তেজস্বী দেবতা । তি‌নি প্রজা‌হিতা‌র্থে ধ‌র্মের জন্য কোটি কো‌টি ঋ‌ষি সৃ‌ষ্টি ক‌রে‌ছেন । তাঁর সৃষ্ট সনৎকুমার প্রমুখ ঋ‌ষি আজও গন্ধমাদন পর্ব‌তে তপস্যায় রত আ‌ছেন , তাই ধর্মজ্ঞ উত্তম বক্তা বাসু‌দেব‌কে সর্বদা প্রণাম করা উ‌চিত । ভগবান নারায়ণ দেব‌লো‌কে সর্ব‌শ্রেষ্ঠা । যে তাঁ‌কে বন্দনা ক‌রে , তি‌নিও তার বন্দনা করেন । যে তাঁ‌কে সম্মান ক‌রে , তি‌নিও তাঁর সম্মান ক‌রেন ।

এইরূপ অর্চিত হ‌লে অর্চনা ক‌রেন , পূ‌জিত হ‌লে পূজা ক‌রেন , দর্শনকারী‌দের ওপর সর্বদা কৃপাদৃ‌ষ্টি রা‌খেন এবং শরণাগত‌কে শরণ প্রদান ক‌রেন । আ‌দি‌দেব ভগবান বিষ্ণুর এই উত্তম ব্রত । সজ্জন ব্য‌ক্তি সর্বদাই তাঁর এই ব্রত আচরণ ক‌রেন । তি‌নি সনাতন দেবতা , তাই দেবগণ সর্বদাই তাঁ‌কে পূজা ক‌রেন । যারা তাঁর অনন্যভক্ত , তাঁরা নি‌জেদের সাধনায় অনুরূপ নির্ভয়পদ প্রাপ্ত হন ।

‌দ্বিজগ‌ণের উ‌চিত মন , বাক্য ও ক‌র্মের দ্বারা সর্বদা সেই ভগবা‌নের পূজা করা , প্রণাম করা এবং যত্নসহকা‌রে উপাসনা করে দেবকীনন্দনকে দর্শন লাভ করা ।

মু‌নিবরগণ ! আ‌মি আপনা‌দের এক উত্তম মার্গ জান‌ালাম । কেবল ভগবান ভগবান বাসু‌দেব‌কে দর্শন কর‌লে আপনা‌দের সব দেবতার দর্শন লাভ হ‌বে ।

আ‌মিও মহাবরাহরূপ ধারণকারী সর্ব‌লোক‌পিতামহ জগদীশ্বর‌কে নিত্য প্রণাম ক‌রি । আমরা সকল দেবতা তাঁর শ্রী‌বিগ্র‌হে বাস ক‌রি , সুতরাং তাঁ‌কে দর্শন কর‌লে তিন দেবতার ( ব্রহ্মা , বিষ্ণু , ম‌হেশ্ব‌রের ) দর্শন লাভ হয় । এ‌তে কো‌নো স‌ন্দেহ নেই ।

ত‌পোধনগণ ! আ‌মি আপনা‌দের ওপর অনুগ্রহ ক‌রে ভগবা‌নের প‌বিত্র মাহাত্ম্য এই জন্য শোনালাম , যা‌তে আপনারা যত্ন সহকা‌রে যদু‌শ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের পূজা ক‌রেন ।

দেব‌র্ষি নারদ বল‌লেন - প্রভ‌ু ! ভগবান শংকর হিমালয় শিখ‌রে যাঁর মাহাত্ম্য আমা‌দের ব‌লে‌ছি‌লেন , সেই ব্রহ্মভূত সনাতন পুরুষ আপ‌নিই , শ্রীকৃষ্ণ । আপনার প্রভা‌বে আর এক‌টি আশ্চ‌র্যের ব্যাপার হল এই যে আমরা আপনা‌কে দে‌খে বি‌স্মিত হ‌য়ে‌ছি এবং আমা‌দের পূর্বকথা স্মরণ হ‌য়ে‌ছে । প্র‌ভো ! দেবা‌দি‌দেব ভগবান শংকর আপনার এরূপ মাহাত্ম্যের কথা বর্ণনা ক‌রেছি‌লেন ।

জয় রা‌ধে

জয় শ্রীহরির জয় ।

জয় ভক্তগ‌ণের জয় ।
Joy Shree Radha Madhav
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।