• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

গীতার বানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গীতার বানী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৯ জুন ২০২০

গীতার ১৮টি গুহ্যনাম মাহাত্ম

আমরা শ্রীমদ্ভগবদ গীতা পাঠ শেষে, গীতার মাহাত্ম কিছুটা হলেও পাঠ করে থাকি। এই মাহাত্মে দুটো শ্লোক আছে, যা গীতার গুহ্যনাম।

"গঙ্গা গীতা চ সাবিত্রী সীতা সত্যা পতিব্রতা।
ব্রহ্মা বলির্ব্রহ্মবিদ্যা ত্রিসন্ধ্যা মুক্তিগেহিনী।।
অর্ধমাত্রা চিদানন্দা ভবগ্নী ভ্রান্তিনাশিনী।
বেদত্রয়ী পরানন্দা তত্ত্বার্থ জ্ঞানমঞ্জরী।।"

এই শ্লোকদ্বয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে শ্রীগীতার আঠারটি নাম, যা গীতার গুহ্যনাম হিসেবে পরিচিত। অনেকেই জানেনা, এই আঠারটি গুহ্যনামের মহাত্ম। বন্ধুদের জ্ঞাতার্থে সেই গুহ্যনাম মাহাত্ম উল্ল্যেখ করার চেষ্টা করছি।

০১) গঙ্গা:- এর অর্থ হলো, গঙ্গায় ডুব দিলে কোনো ব্যাক্তি তার সকল পাপ নাশ করতে পারে। তাই সবার প্রথমে গঙ্গার নাম নেয়া হয়।

০২) গীতা:- যে ব্যাক্তি গীতাপাঠ করে, সেই মুহুর্তেই তার সকল পাপ নাশ হয়। তাই এখানে গীতার কথা বলা হয়েছে।

০৩) সাবিত্রী:- তিনি এতোটাই সতী ছিলেন যে, সে তাঁর মৃত স্বামীর প্রান ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাই এখানে সাবিত্রীর নাম বলা হয়েছে।

০৪) সীতা:- ভগবান রামের স্ত্রী,মাতা সীতা এতোটাই পবিত্র ছিলেন যে, রাবণ শত চেষ্টার পরেও তা নষ্ট করতে পারে নি। তাই সীতা নাম মহাপবিত্র বলা হয়।

০৫) সত্যা:- সত্যা বলতে আমাদের আত্মার কথা বলা হয়েছে। আত্মা যেমন অমর গীতাও তেমনি অমর।

০৬) পতিব্রতা:- পতিব্রতা বলতে ভগবানের প্রতি আনুগত্য থাকা। কারন একমাত্র ভগবান পুরুষ, আর সবই প্রকৃতি। অর্থাৎ তিনি সকলের পতি আর আমরা সকলেই তাঁর পত্নী।

০৭) ব্রহ্মাবলী:- ব্রহ্মশক্তী থেকে নির্গত শক্তীকে বলা হয় ব্রহ্মাবলী। যা অবিনশ্বর, যে শক্তির বিনাশ নেই।

০৮) ব্রহ্মবিদ্যা:- ব্রহ্মবিদ্যাকে আমরা ব্রহ্মাবলীর অনুরুপ বলতে পারি।

০৯) ত্রিসন্ধ্যা:- ত্রিসন্ধ্যা মানে হলো তিন কালের সমষ্ঠী। যথা, ইহকাল, বর্তমান কাল ও পরকাল।

১০) মুক্তিগেহিনী:- গীতা পাঠ করলেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই গীতা মুক্তির স্বরুপ হিসেবে এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে।

১১) অর্ধমাত্রা:- গীতায় ভগবান বলেছেন, গীতা তাঁর অর্ধক, যার আশ্রয়ে তিনি এ বিশ্বব্রহ্মান্ড নিয়ন্ত্রন করেন। তাই এই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে।

১২) চিদানন্দা:- চিৎ বা জ্ঞান জগতের যে আনন্দ তাই চিদানন্দা।

১৩) ভবগ্নী:- অগ্নি যেমন সোনাকে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় পরিবর্তন করে। ঠিক তেমনি গীতাই পারে আমাদের ভব সংসারের সকল পাপ দুর করতে।

১৪) ভ্রান্তিনাশিনী:- আমরা আমাদের চারপাশের জিনিস দেখে, মায়ার প্রভাবে বিভ্রান্ত হই। আর একমাত্র গীতাই পারে আমাদের এই ভ্রান্তি নাশ করতে।

১৫) বেদত্রয়ী:- ত্রিবেদের সমন্বয়ে গঠীত শক্তিই হলো বেদত্রই।

১৬) পরানন্দা:- অপরের দোষ না দেখে, তার ভাল দিক দেখার মধ্যে যে আনন্দ। গীতায় তার কথাই বলা হয়েছে।

১৭) তত্ত্বার্থ:- গীতা পৃথিবীর তত্ত্ব ও তথ্য সমৃদ্ধ সকল জ্ঞান তথা বিজ্ঞানের আধার।

১৮) জ্ঞানমঞ্জরী:- একজন মানুষ বা জীবন জগতের জন্য যে সকল জ্ঞানের প্রয়োজন, তার সকল কিছুই গীতায় মঞ্জুরীকৃত আছে। তাই শ্রীগীতা জ্ঞানমঞ্জরী।


 এই হলো শ্রীমদ্ভগবদ গীতার আঠারটি গুহ্যনামের সংক্ষিপ্ত মাহাত্ম। আশাকরি কৌতুহলী ভক্ত পাঠকেরা বিষয়টি জেনে ও অন্যকে জানিয়ে আনন্দিত হবে।

।জয় শ্রীমদ্ভগবদ গীতার জয়।

.
# পরমকরুণাময় গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণী আর সকল বৈষ্ণব ভক্ত পার্যদদের শ্রীচরণে নিবেদন, সকলের জীবন শ্রীগীতার আদর্শে মঙ্গলময়, কল্যানময়, প্রেমময়, ভক্তিময়, মুক্তিময়, শান্তিময়, সুন্দরময় এবং আনন্দময় করে রাখুন সর্বক্ষণ।(দেবেন্দ্র)
"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় হোক সকল ভক্তদের!!
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!

Post: Debendra Biswas
Share:

০১ এপ্রিল ২০১৮

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা দর্শন

বলা হয়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী। এটি মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে সংক্ষেপে ভগবদ্গীতা বা শ্রীগীতা বা আরো সংক্ষেপে গীতা বলা হয়। ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের সমরাঙ্গনে কৌরবসৈন্য ও পাণ্ডবসৈন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধার্থে সজ্জিত হলে, যুদ্ধে প্রতিপক্ষে অবস্থানকারী আত্মীয়বর্গকে হত্যা করতে হবে ভেবে অন্যতম পাণ্ডব সেনাধ্যক্ষ ধনুর্ধর অর্জুন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আত্মীয়হত্যা অসঙ্গত বিবেচনা করে ক্ষণিক বৈরাগ্যের মোহাক্রান্ত অর্জুন যুদ্ধে নিবৃত্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর রথের সারথিরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে বিশদ তত্ত্বসমৃদ্ধ উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে অর্জুনের মোহ দূর করে স্বকর্মে প্রবৃত্ত করেছিলেন, মুখ্যত তা-ই ভগবদ্গীতা।

গীতার গুরুত্ব বোঝাতে গীতামাহাত্ম্যে বলা হয়েছে-
‘সর্ব্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ।
পার্থো বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ’।।
অর্থাৎ : সমস্ত উপনিষদ গাভী, শ্রীকৃষ্ণ দোহনকর্তা, অর্জুন বৎস ও সুধীগণ ভোক্তা, গীতামৃত উপাদেয় দুগ্ধ।
এদ্বারা এটাই প্রতিপন্ন করা হচ্ছে যে, ভগবদ্গীতা উপনিষদের সারগ্রন্থ মাত্র। এছাড়াও ভাগবতের বরাহপুরাণোক্ত দীর্ঘ গীতামাহাত্ম্যের একটি শ্লোকে ভগবান বিষ্ণুর উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে-
‘গীতাশ্রয়েহহং তিষ্ঠামি গীতা মে চোত্তমং গৃহম্’।
গীতাজ্ঞানমুপাশ্রিত্য ত্রীন্ লোকান্ পালয়াম্যহম্’।।
অর্থাৎ : আমি গীতার আশ্রয়ে অবস্থান করি এবং গীতা আমার উত্তম গৃহ। গীতাজ্ঞান আশ্রয় করে আমি ত্রিলোক পালন করি।
গীতার এ গুরুত্ব বিবেচনা করেই বেদান্তশাস্ত্রে গীতাকে প্রাচীন বারোটি উপনিষদের সমশ্রেণীর কাতারে ত্রয়োদশ উপনিষদ বলেও গণ্য করা হয়। বেদের মতো গীতা সব সম্প্রদায়েরই মান্য। এজন্যেই পরবর্তীকালের শঙ্করাচার্য, রামানুজ, শ্রীধরস্বামী, মাধবাচার্য, বলদেব প্রমুখ শ্রেষ্ঠ আচার্যরা সকলেই গীতার জ্ঞানকে শিরোধার্য করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ উপসম্প্রদায়ের মতের পরিপোষণের জন্য ভগবদ্গীতার টীকাভাষ্যও রচনা করেছেন। এর মধ্যে শাঙ্করভাষ্য এবং শ্রীধরস্বামীর টীকাই সমধিক প্রসিদ্ধ। তবে শঙ্করাচার্যের শাঙ্করভাষ্যকে পরিপূর্ণ উপনিষদানুসারী বলে বিবেচনা করা হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আঠারটি যোগ বা অধ্যায়ে মোট ৭০০ শ্লোক রয়েছে। গীতার অধ্যায়সমূহ যথাক্রমে- (১) অর্জুন বিষাদযোগ, (২) সাংখ্যযোগ, (৩) কর্মযোগ, (৪) জ্ঞানযোগ, (৫) সন্ন্যাসযোগ, (৬) ধ্যানযোগ বা অভ্যাসযোগ, (৭) জ্ঞান-বিজ্ঞানযোগ, (৮) অক্ষর-ব্রহ্মযোগ, (৯) রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ, (১০) বিভূতিযোগ, (১১) বিশ্বরূপ-দর্শনযোগ, (১২) ভক্তিযোগ, (১৩) ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ, (১৪) গুণত্রয়-বিভাগযোগ, (১৫) পুরুষোত্তমযোগ, (১৬) দৈবাসুরসম্পদ-বিভাগযোগ, (১৭) শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগযোগ, (১৮) মোক্ষযোগ।

এই আঠারটি অধ্যায়ের মোট ৭০০ শ্লোকের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্রের উদ্ধৃতিতে ১টি, সঞ্জয়ের উদ্ধৃতিতে ৪০টি, অর্জুনের উদ্ধৃতিতে ৮৫টি এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্ধৃতিতে ৫৭৪টি শ্লোক রয়েছে। এসব শ্লোকের মাধ্যমে মূলত অর্জুনের জিজ্ঞাসু মনের সশ্রদ্ধ প্রশ্ন ও তার প্রেক্ষিতে যথাযোগ্য উত্তর দিতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তি, প্রেম, আত্মা, জ্ঞান, সকাম-কর্ম, নিষ্কাম-কর্ম, সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্ম প্রভৃতি সম্পর্কিত যাবতীয় দর্শন ও তত্ত্বজ্ঞান উপস্থাপন ও তার বিশ্লেষণ করে অর্জুনের সকল কৌতুহল ও জ্ঞানতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেন। এজন্যেই গীতাকে পরম ভক্তি সহকারে সকল শাস্ত্রের সার বলা হয়।

জীবের চূড়ান্ত লক্ষ্য মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে গীতা কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়ে সম্পূর্ণ সাধনতত্ত্ব প্রচার করে। কর্মের সাথে জ্ঞানের এবং জ্ঞানের সাথে ভক্তির সংযোগে সাধনা সম্পূর্ণতা লাভ করে। তবে কর্মযোগই গীতার মুখ্য আলোচ্য বিষয়। কিন্তু এই কর্ম হবে নিষ্কাম কর্ম, অর্থাৎ ফলের আশা না করে কর্ম করে যাওয়া। যেমন-
‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত¡কর্মণি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৪৭)।
অর্থাৎ : কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়। অতএব কর্ম করো। সুতরাং কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু হয়ো না। আবার কর্মত্যাগেও তোমার প্রবৃত্তি না হোক (গীতা-২/৪৭)।
কিন্তু কেন এই কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু না হয়ে অর্থাৎ কাম্য-কর্ম বাদ দিয়ে কেবল নিষ্কাম কর্ম করে যাওয়া ? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন-
‘দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ ধনঞ্জয়।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৪৯)।
‘কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ।
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫১)।
অর্থাৎ :
হে ধনঞ্জয়, কাম্য-কর্ম নিষ্কাম-কর্ম অপেক্ষা নিতান্ত নিকৃষ্ট। অতএব তুমি কামনাশূন্য হয়ে সমত্ব বুদ্ধির (সম্যক জ্ঞানের) আশ্রয় গ্রহণ করো। যারা ফলাকাঙ্ক্ষী হয়ে কর্ম করে তারা অতি হীন (গীতা-২/৪৯)। নিষ্কাম কর্মযোগী মনীষিগণ কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মরূপ বন্ধন হতে মুক্ত হন এবং সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত (পাপ ও পুণ্য উভয় হতে মুক্ত হয়ে) ব্রহ্মপদ লাভ করেন (গীতা-২/৫১)।
গীতার মতে ফলাসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান বন্ধনের কারণ। আসক্তি ও অহংবুদ্ধি ত্যাগ করে ফলাফলে উদাসীন হয়ে কর্ম সম্পাদনে বন্ধন হয় না। অর্থাৎ সর্বকর্ম ঈশ্বরে সমর্পণ করে ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জন ও অহংবুদ্ধি বা কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করাই নিষ্কার্ম কর্মের লক্ষণ। কিন্তু আত্মজ্ঞান ব্যতীত এই আসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান দূর হয় না। তাই শ্রীকৃষ্ণ বলেন-
‘যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫২)।
‘শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৩)।
অর্থাৎ :
যখন তোমার বুদ্ধি (জ্ঞান) মোহাত্মক অবিবেকরূপ কলুষ অতিক্রম করবে, তখন তুমি শ্রোতব্য ও শ্রুত কর্মফল বিষয়ে বৈরাগ্যলাভ করবে (নিষ্পৃহ হবে) (গীতা-২/৫২)। নানা কর্মফল শ্রবণে বিক্ষিপ্ত তোমার চিত্ত যখন পরমাত্মাতে স্থির ও অচল হবে, তখন তুমি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করবে (গীতা-২/৫৩)।
অতএব কর্মযোগ সিদ্ধিলাভের জন্য জ্ঞানলাভের দরকার। আত্মজ্ঞান লাভ হলে ভগবানে পরমভক্তি জন্মায়। এর মাধ্যমেই সমত্ব-বুদ্ধি বা সম্যক-জ্ঞান জন্মায়। এই সমত্ব বুদ্ধিকেই বলা হয় স্থিতপ্রজ্ঞা। গীতায় এই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে শ্রীভগবান বলেন-
‘প্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনোগতান্ ।
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৫)।
দুঃখেষ¦নুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৬)।
অর্থাৎ :
হে পার্থ, বাহ্যলাভে নিরপেক্ষ ও পরমার্থদর্শনে প্রত্যগাত্মাতেই পরিতৃপ্ত হয়ে যখন যোগী সমস্ত মনোগত বাসনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলে উক্ত হন (গীতা-২/৫৫)। দুঃখে উদ্বেগহীন, সুখে নিঃস্পৃহ এবং আসক্তিশূন্য ভয়মুক্ত ও ক্রোধরহিত মুনিই স্থিতপ্রজ্ঞ বলে উক্ত হন (গীতা-২/৫৬)।
এখানে প্রশ্ন আসে, কর্মযোগ অপেক্ষা সমত্ব-বুদ্ধি বা সম্যক-জ্ঞানই যদি শ্রেষ্ঠ হয় তাহলে সব কামনা বর্জন করে সাম্যবুদ্ধি বা সম্যকজ্ঞান লাভ করলেই তো জীবের মোক্ষ লাভ হয়, কর্মের আবশ্যকতা কী ? তাই অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন-
‘জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।
তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/১)।
অর্থাৎ : হে জনার্দন, যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে এই হিংসাত্মক (যুদ্ধ) কর্মে নিযুক্ত করছেন কেন (গীতা-৩/১)?
বলাবাহুল্য, গীতায় কর্মকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এমনকি ইহলোকে মোক্ষলাভের যে দুটি মার্গ রয়েছে- সন্ন্যাস মার্গ ও কর্মযোগ মার্গ, সেখানেও কর্মযোগকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়েছে। কেননা, সন্ন্যাস মার্গে যে মোক্ষ লাভ হয় তা জ্ঞানের ফলে, কর্ম ত্যাগের জন্য নয়। যেমন গীতার সন্ন্যাসযোগে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
‘সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ।
তয়োস্তু কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/২)।
‘সন্ন্যাসস্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/৬)।
অর্থাৎ :
সন্ন্যাস বা কর্মের ত্যাগ ও কর্মের অনুষ্ঠান উভয়ই মুক্তিমার্গ; কিন্তু তাদের মধ্যে জ্ঞানহীন কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান উৎকৃষ্টতর (গীতা-৫/২)। হে মহাবাহো, নিষ্কাম কর্মযোগ ব্যতীত জ্ঞানযুক্ত পরমার্থ সন্ন্যাস লাভ করা অসম্ভব। নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হলেই নিষ্ঠ ব্যক্তি সন্ন্যাসী হয়ে অচিরে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হন (গীতা-৫/৬)।
এছাড়াও জ্ঞান ও কর্মের পরস্পর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বোঝাতে গীতায় জ্ঞানযোগে বলা হয়েছে যে-
‘ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৩৮)।
অর্থাৎ : জ্ঞানের তুল্য পবিত্র বস্তু ইহজগতে নেই। দীর্ঘকাল প্রযত্ন দ্বারা কর্মযোগে চিত্ত শুদ্ধ হলেই মুমুক্ষু ব্যক্তি সেই আত্মজ্ঞান (ব্রহ্মজ্ঞান) লাভ করেন (গীতা-৪/৩৮)।
তাই কর্ম নাকি জ্ঞান শ্রেষ্ঠ, অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন-
‘লোকেহস্মিন্ দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৩)।
‘ন কর্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্যং পুরুষোহশ্লুতে।
ন চ সংন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৪)।
‘ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।
কার্যতে হ্যবশঃ কর্ম সর্বঃ প্রকৃতিজৈর্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৫)।
অর্থাৎ :
হে অনঘ অর্জুন, ইহলোকে জ্ঞানাধিকারিগণের জন্য জ্ঞানযোগ এবং নিষ্কাম কর্মিগণের জন্য কর্মযোগ- এই দুই প্রকার নিষ্ঠার বিষয় সৃষ্টির প্রারম্ভে আমি বেদমুখে বলেছি (গীতা-৩/৩)। কর্মানুষ্ঠান না করে কেউ নৈষ্কর্ম্য বা মোক্ষ লাভ করতে পারে না। আবার কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধি ও আত্মবিবেক না হলে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি হয় না। কেবলমাত্র জ্ঞানশূন্য কর্মত্যাগ দ্বারা এ অবস্থালাভ অসম্ভব (গীতা-৩/৪)। কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না। অ-স্বতন্ত্র প্রকৃতির (মায়াজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের) প্রভাবে সকলেই কর্ম করতে বাধ্য হয় (গীতা-৩/৫)।
এ প্রেক্ষিতে শ্রীকৃষ্ণ আরো বলেন-
‘কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৬)।
‘যস্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেহর্জুন।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৭)।
‘নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্মণঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৮)।
অর্থাৎ :
যে ব্যক্তি কর্মেন্দ্রিয়গুলিকে কর্মবিরত করে মনে মনে তাদের বিষয় চিন্তা করে তারা মিথ্যাচারী (গীতা-৩/৬)। কিন্তু যারা ইন্দ্রিয়গুলি সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্ম করেন তারাই শ্রেষ্ঠ (গীতা-৩/৭)। তুমি শাস্ত্রবিহিত নিত্যকর্ম করো। কর্ম না করা অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়। কর্মহীন হলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হবে না (গীতা-৩/৮)।
তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আসক্তিহীন হয়ে কর্তব্যরূপে সবসময় বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান করার উপদেশ দেন। যে কর্ম যার পক্ষে বিহিত তাই তার পক্ষে যজ্ঞস্বরূপ। অনাসক্ত হয়ে কর্ম করলে মানুষ মোক্ষ লাভ করে। কারণ এই যথার্থ কর্ম ঈশ্বরের প্রীতির জন্যেই করা হয়-
‘যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্মবন্ধনঃ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৯)।
অর্থাৎ : যজ্ঞার্থে বা ঈশ্বরের প্রীতির জন্য অনুষ্ঠিত কর্ম ব্যতীত অন্য কর্ম বন্ধনের কারণ হয়। অতএব, তুমি ভগবানের উদ্দেশ্যে অনাসক্ত হয়ে বর্ণাশ্রমোচিত সকল কর্ম করো (গীতা-৩/৯)।
এবং বিহিত কর্মযোগের সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে গীতার সেই প্রসিদ্ধ শ্লোকটি উচ্চারিত হয় এভাবে-
‘শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৩৫)।
অর্থাৎ : স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। (বর্ণাশ্রমবিহিত) স্বধর্মসাধনে নিধনও কল্যাণকর; কিন্তু অন্যের (বর্ণাশ্রমোচিত) ধর্মের অনুষ্ঠান অধোগতির কারণ বলে বিপজ্জনক (গীতা-৩/৩৫)।
বর্ণাশ্রমে বিভক্ত সমাজে জন্মজাত চারটি বর্ণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের জন্য ঈশ্বরবিহিত যে যে কর্ম নির্ধারণ করা আছে প্রত্যেকের জন্য তা-ই স্বধর্ম অনুষ্ঠান। কারণ এই বর্ণগুলি ঈশ্বরসৃষ্ট এবং তাদের কর্মবণ্টনও ঈশ্বরই করে রেখেছেন প্রকৃতিজাত বা স্বভাবজাত করে-
‘চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/১৩)।
‘ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈর্মুক্তং যদেভিঃ স্যাৎত্রিভির্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪০)।
‘ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাঞ্চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪১)।
‘শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪২)।
‘শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্ ।
দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৩)।
‘কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্ ।
পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৪)।
‘স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ’। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৫)।
অর্থাৎ :
গুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি চারটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) সৃষ্টি করেছি। আমি মায়িক (মায়ারূপ) ব্যবহারে চতুর্বর্ণের সৃষ্টিকর্তা হলেও আমাকে পরমার্থদৃষ্টিতে অব্যয় অকর্তা ও অসংসারী বলে জানবে (গীতা-৪/১৩)। পৃথিবীতে বা স্বর্গে এমন কোন প্রাণী (মানুষ বা দেবতা) বা বস্তু নেই, যা এই প্রকৃতিজাত ও বন্ধনের কারণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই) ত্রিগুণ থেকে মুক্ত (গীতা-১৮/৪০)। হে পরন্তপ, প্রকৃতিজাত ত্রিগুণানুসারেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রেরও কর্মসমূহ পৃথক পৃথক রূপে ভাগ করা হয়েছে (গীতা-১৮/৪১)। বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, বাচিক ও মানসিক তপস্যা; অন্তর্বহিঃ শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতি এবং শাস্ত্রে ও ভগবানে বিশ্বাস- এই সকল ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত (রজোমিশ্রিত সত্ত্বগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪২)। পরাক্রম, তেজ, ধৃতি, কর্মকুশলতা, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা ও শাসনক্ষমতা- এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত (স্বভাবজ সত্ত্বমিশ্রিত রজোগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪৩)। কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য বৈশ্যের স্বভাবজাত (স্বভাবজ তমোমিশ্রিত রজোগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম। (অন্য বর্ণের) সেবা বা পরিচর্যা শূদ্রদের স্বভাবজাত (রজোমিশ্রিত তমোগুণের দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪৪)। মানুষ নিজ নিজ বর্ণ ও আশ্রমের কর্মে নিরত থেকে জ্ঞান, নিষ্ঠা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সিদ্ধিলাভ করে (গীতা-১৮/৪৫)।
সহজভাবে বললে, বিহিত কর্ম মানে আরোপিত কর্ম যা ঈশ্বরকর্তৃক নির্দেশিত। কর্মফলের আশা ত্যাগ করে আসক্তিহীন কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞানরূপ সন্ন্যাসমার্গে উত্তীর্ণ হওয়াই গীতার মতে জীবের মোক্ষ বা সংসার-মুক্তির অনিবার্য শর্ত। কিন্তু ভক্তি বিনে জ্ঞান হয় না। এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পরমেশ্বর পরমব্রহ্মের প্রতি অবিচল ভক্তি থাকা আবশ্যক। তাই গীতায় শ্রীভগবান বলছেন-
‘মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৬৫)।
অর্থাৎ : তুমি আমাতে চিত্ত স্থির করো, ভজনশীল ও পূজনশীল হও। আমাকে নমস্কার করো। আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি, এভাবেই তুমি আমাকে পাবে (গীতা-১৮/৬৫)।
কিন্তু যা-ই করো না কেন, কোনভাবেই কর্মযোগ উপেক্ষা করে নয়। সকল শাস্ত্রের সারগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সার-কথাটাও সম্ভবত এই যে-
‘শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্ জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে।
ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১২/১২)।
অর্থাৎ : অবিবেচকপূর্বক অভ্যাস অপেক্ষা শ্রুতি (বেদোক্ত শাস্ত্রাদি) ও যুক্তি দ্বারা আত্মনিশ্চয় উৎকৃষ্ট। আত্মনিশ্চয় অপেক্ষা জ্ঞানপূর্বক ধ্যান শ্রেষ্ঠ। জ্ঞানপূর্বক ধ্যান অপেক্ষা কর্মফলত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কর্মফল ত্যাগের অব্যবহিত পরেই সহেতুক সংসার নিবৃত্তিরূপ পরম শান্তিলাভ হয় (গীতা-১২/১২)।
মূলত, কর্মযোগকে ঘিরেই গীতার মুখ্য আলোচ্য বিষয় গীতার মূলতত্ত্ব, মূলনীতি, আত্ম-তত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব, ব্রহ্মতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে যত প্রকার জ্ঞান উপদিষ্ট হয়েছে, অর্জুনকে তা উপলব্ধি করতে হয়েছে। এবং তার উপলক্ষ হয়ে এটি একটি অন্যতম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবেও ভারতীয় লোকসমাজে সর্বাদৃত হয়েছে।

লেখকঃ রণদীপম বসু
Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৭

গীতায় আশ্রয়ের বর্ণনা

জীবমা‌ত্রেরই স্বভাব হ‌চ্ছে যে সে কা‌রো না কা‌রো আশ্রয় গ্রহণ কর‌তে চায় এবং আশ্রিত থা‌কে । মনুষ্য ,পশু , পক্ষী , বৃক্ষ , লতা ইত্যা‌দি সমস্তই কা‌রো না করো আশ্রয় গ্রহণ ক‌রে থা‌কে , কারণ জীবমাত্রই সাক্ষাৎ পরমাত্মার অংশ । তারই জন্য জীব যতক্ষণ নিজ অংশী পরমাত্মার আশ্রয় গ্রহণ না ক‌রে , ততক্ষণ সে অপ‌রের আশ্রয় নি‌তে থা‌কে , পরাধীন হ‌তে থা‌কে এবং দুঃখও পে‌তে থা‌কে ।

মানু‌ষের বি‌বেক‌বোধ আ‌ছে অথচ নিজ বি‌বেক‌কে গুরত্ব না দি‌য়ে সে স্বয়ং সাক্ষাৎ অ‌বিনাশী পরমাত্মার চেতন অংশ হওয়া সত্ত্বেও বিনাশশীল জড়বস্তুর আশ্রয় গ্রহণ ক‌রে অর্থাৎ শরীর , বল , বু‌দ্ধি , যোগ্যতা , আত্মীয়- স্বজন , ধন - সম্প‌ত্তি ইত্যা‌দির আশ্রিত হয় - এ‌টি মনুষ্য - জীব‌নের এক‌টি মারাত্ম ভ্রা‌ন্তি ।

গীতায় অর্জুন ভগবা‌নের আশ্রয় গ্রহণ কর‌েই নিজ কল্যা‌ণের কথা জিজ্ঞাসা ক‌রে‌ছেন । যতক্ষণ পর্যনাত অর্জুন ভগবা‌নের আশ্রয় গ্রহণ ক‌রেন নি , ততক্ষণ গীতার উপ‌দেশ আরম্ভ হয় নি । উপ‌দে‌শের আরম্ভ এবং অবসান ভগবৎ আশ্র‌য়েরই কথা বলা হ‌য়ে‌ছে ।

ঈশ্বরপ্রদত্ত স্বাধীনতায় মানুষ তার ইচ্ছাম‌তো যে কা‌রোরই আশ্রয় গ্রহণ বর‌তে পা‌রে । সুতরাং কেউ কেউ নিজ কামনাপূ‌র্তির উ‌দ্দে‌শ্যে দেবতা‌দের আশ্রয় গ্রহণ ক‌রে । কিন্তু প‌রিণা‌মে তারা বিনাশশীল ফলই লাভ ক‌রে থা‌কে । কিছু মানুষ ভোগা‌দি কামনায় বে‌দোক্ত সকাম অনুষ্ঠা‌নের আশ্রয় নেয় এবং প‌রিণা‌মে তারা পুনঃ পুনঃ মর্ত্য‌লো‌কে আগমন ক‌রে ।

কিছু মানুষ আবার ভগবা‌নেরও আশ্রয় নেয় না এবং ভগবান‌কে ভগবান ব‌লে ম‌নে ক‌রে না , সুতরাং এইসব মানু‌ষের মধ্যে কেউ আসুরীভা‌বের আশ্রয় নেয় । কিছু ব্য‌ক্তি আসুরী , রাক্ষসী এবং মোহিনী প্রকৃতির আশ্রয় নেয় । কেউ কেউ অপূরণীয় কামনায় বশীভূত হয় । কেউ আমৃত্যু অপার চিন্তার আশ্রয় নেয় । কেউ অহংকার , দুরাগ্রহ , গর্ব , কামনা এবং ক্রোধের আশ্রয় নেয় । এই আশ্রয় নেয় । এই আশ্রয় নেওয়ার ফ‌লস্বরূপ তা‌দের বাবংবার চুরাশী লক্ষ যো‌নি এবং নর‌কে পরিভ্রম‌ণ কর‌তে হয় । এও এক তার ভ্রা‌ন্তি ।

ভগবদ্মুখীন মানুষ ভগবা‌নের এবং তাঁর দয়া , ক্ষমা , সমতা ইত্যা‌দি গুণগু‌ণির ( দৈবী সম্প‌দের ) আশ্রয় গ্রহণ ক‌রে এবং প‌রিণা‌মে ভগবান‌কে লাভ ক‌রে । সুতরাং গীতায় ' মামুপা‌শ্রিতঃ ' ( ৪\১০) , ' মদাশ্রয়ঃ ' ( ৭\১ ) , ' মা‌মেব যে প্রপদ্য‌ন্তে ( ৭\১৪ ) , ' মামা‌শ্রিত্য যত‌ন্তি যে ' ( ৭\২৯ ) , ' মাং হি পার্থ ব্যপা‌শ্রিতা ' ( ৯\৩২ ) , মদ্ব্যপাশ্রয়ঃ ' ( ১৮\৫৬ ) , ' ত‌মেব শরণয় গচ্ছ ' ( ১৮\৬২ ) , ' মা‌মেকং শরণং ব্রজ ' ( ১৮\৬৬ ) ইত্যা‌দি পদগু‌লি‌তে ভগবা‌নের আশ্র‌য়ের কথা বলা হ‌য়ে‌ছে , এবং ' দৈবী প্রকৃ‌তিমা‌শ্রিতা ' ( ৯\১৩ ) এবং ' বু‌দ্ধি‌যোগমুপাশ্রিত্য' ' ( ১৮\৫৭) পদগু‌লি‌তে দৈবী সম্প‌দের আশ্র‌য়ের কথা বলা হ‌য়ে‌ছে ।

এর তাৎপর্য এই যে , গীতায় যেসকল সাধন প্রণালীর কথা বলা হ‌য়ে‌ছে , তার ম‌ধ্যে সব থে‌কে শ্রেষ্ঠ এবং সহজ সাধন হ‌লো ভগবা‌নের শরণাগত হওয়া । যে ভগবা‌নের শরণাগত হয়ে সাধনা ক‌রে তার সাধনার সি‌দ্ধি খুবই শীঘ্র এবং সহজে হয় ।

এই কথা ভগবা‌ন গীতায় স্পষ্টভা‌বেই ব‌লে‌ছেন , যে আমার শরণাগত হয়ে সমস্ত কর্ম আমা‌তে অর্পন ক‌রে , আ‌মি সেই ভক্তকে মৃত্যুরূপ সংসার- সাগর থে‌কে অ‌চিরাৎ উদ্ধার ক‌রে থা‌কি । যারা আমার আশ্রয় নি‌য়ে মু‌ক্তিলা‌ভের জন্য যত্ন ক‌রে তারা ব্রহ্ম , অধ্যাত্ম এবং সম্পূর্ণ কর্ম তথা অ‌ধিভূত , অ‌ধি‌দৈব এবং অ‌ধিযজ্ঞ সহ আমা‌কে জান‌তে পা‌রে অর্থাৎ আমার সমগ্ররূপ অবগত হয় । ভগবান তাঁর আশ্রয় গ্রহণকারী ভক্ত‌দের সমস্ত যোগী‌দের ম‌ধ্যে শ্রেষ্ঠ ব‌লে জা‌নি‌য়ে‌ছেন । সুতরাং সাধ‌কদের উ‌চিত তাঁরা যে সাধনাই করুন ভগবা‌নের আশ্রয় নি‌য়েই তা করা ।

জীব স্বয়ং পরমাত্মার অংশ এবং স্থূল , সূক্ষ্ম ও কারণ -শরীর প্রকৃ‌তির অংশ । ক্রিয়া এবং পদা‌র্থের যে আশ্রয় তা স্থূল শরী‌রের আশ্রয় ( স্থল শরীর ছাড়াও অর্থ , গৃহ , পুত্র , পৌত্র , আত্মীয় , জ‌মি - জায়গা ইত্যা‌দির যে আশ্রয় তা তো বি‌শেষভা‌বেই জড়‌ত্বের আশ্রয় ) । বিদ্যা , বু‌দ্ধি , সদ্গুণ , যোগ্যতা প্রভৃ‌তির যে আশ্রয় তথা চিন্তা , ধ্যান , মননের যে আশ্রয় তা সবই সূক্ষ্ম - শরী‌রের আশ্রয় ।

যাতে ব্যুত্থান ( উত্তরণ ) হয় , সেই সমা‌ধির আশ্রয় নেওয়া হ‌লো কারণ - শরী‌রের আশ্রয় । আর সমা‌ধি দ্বারা যে সকল সি‌দ্ধি প্র‌া‌প্তি হয় , নি‌জের ম‌ধ্যে যা মহত্ত্বরূ‌পে প্রকা‌শিত হয় সে সবই সমা‌ধি‌কে‌ন্দ্রিক কা‌র্যের আশ্রয় - এ সবই হ‌লো বিনাশশীল বস্তুর আশ্রয় ।

জপ - ধ্যান , কথা - কীর্তন ইত্যা‌দির আশ্রয় হ‌লো সাধ‌নের আশ্রয় । ' আ‌মি ভগবা‌নেরই ' - এইপ্রকার ভগবা‌নের সঙ্গে একমাত্র সম্প‌র্কিত হওয়া হ‌লো সা‌ধ্যের ( ভগরা‌নের ) আশ্রয় । সাধ‌নের আশ্রয় নি‌লে সাধন - ভজন কর‌তে হয় , কিন্তু সা‌ধ্যের আশ্রয় নি‌লে সাধন স্বতঃস্ফূর্ত হয় , কর‌তে হয় না । বিনাশশীলের আশ্রয় দূরীভূত হ‌লেই ভগবৎপ্রা‌প্তির অনুভূ‌তি স্বতঃই হ‌য়ে যায় ।

কারণ ভগবান নিত্যপ্রাপ্ত , কেবল ক্ষণভঙ্গুর আশ্রয় গ্রহনই হ‌লো ঈশ্বর- প্রাপ্তির একমাত্র অন্তরায় । তাই সব‌কিছু ত্যাগ ক‌রে কেবলামাত্র ভগবা‌নের চর‌ণে আশ্রয় নিলে তি‌নিই তা‌কে নি‌জের আশ্রয় নে‌বেন । ভক্ত হ‌লেন ভগবা‌নের আর ভগবা‌ন ভ‌ক্তের । প্রেম- প্রী‌তি , ভাব -ভ‌ক্তি না থাক‌লে তা কখনই হয় ।

COurtesy by: Joy Shree Radha Madhav
Share:

গীতায় এক প্রত্যয়ের ম‌হিমা

জীবাত্মায় এক অং‌শে পরমাত্মা অপর অং‌শে প্রকৃ‌তির অ‌ধিষ্ঠান । জীবাত্মা যখন পরমাত্মার দি‌কে অগ্রসর হয় , তখন তার ম‌ধ্যে নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি আ‌সে আর যখন সে প্রকৃ‌তির অংশ শরীর ও সংসা‌রের দি‌কে চা‌লিত হয় , তখন তার বু‌দ্ধি বহু দি‌কে ধা‌বিত হয় , ত‌ার অব্যবসা‌য়া‌ত্মিকা ব‌ু‌দ্ধি হয় ।

তাৎপর্য এই যে , পারমা‌র্থিক সাধ‌কের এইপ্রকার নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি হয় যে , " পরমাত্মা‌কে পে‌তে হ‌বে , তা‌তে যাই হোন না কেন । ' কিন্তু যে ব্য‌ক্তি সাংসা‌রিক ধন - সম্পত্তি সংগ্রহ কর‌তে ও জাগ‌তিক সুখ‌ভোগ কর‌তে চায় , তার পরমাত্মাপ্রা‌প্তির উপায়স্বরূপ নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি হয় না ।

অপরপ‌ক্ষে জাগ‌তিক ভোগ প্রা‌প্তির জন্য তার ম‌নে বিচা‌রের শেষ থা‌কে না । এর কারণ হ‌চ্ছে যে , পরমাত্মা এক এবং তাঁ‌কে পাবার নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধিও একই হয় । সাংসা‌রিক ভোগ অসংখ্য এবং তা ভোগ করবার ( ধন - সম্পত্তি ) সাধনও অ‌নেক , তাই সেইসব প্রা‌প্তির এক‌নিষ্ঠ বু‌দ্ধিও হয় না ।

পরমাত্মা সগুণ , নির্গুণ ইত্যা‌দি স্বরূ‌পের ভেদ থাক‌লে‌ও এইসকল স্বরূপ তত্ত্বতঃ এক এবং নিত্য । সুতরাং পরমাত্মার কোন এক‌টি স্বরূ‌পের প্রা‌প্তির নিশ্চয়তাও একই হয় । পরমাত্মাপ্রা‌প্তির লক্ষ্য য‌দি এক নিশ্চয় হয় , তাহ‌লে সমস্ত সাধনই সহজ সরল হ‌য়ে যায় এবং উ‌দ্দে‌শ্যে সি‌দ্ধির জন্য তৎপরতাও স্বতঃই হ‌য়ে যায় ।

যেমন কেউ য‌দি নি‌জে‌কে ঈশ্ব‌রের ভক্ত ব‌লে মে‌নে নেয় , তাহলে ঈশ্ব‌রের ভ‌ক্তি করা তার প‌ক্ষে স্বাভাবিক হ‌য়ে যায় । অর্থাৎ ভ‌ক্তি সম্বন্ধীয় কথা সে তখন গ্রহণ ক‌রে এবং ভ‌ক্তি -‌বি‌রোধী কথা সে তৎক্ষণাৎ ত্যাগ ক‌রে । কারণ সে তখন এই কথাই ভা‌বে যে , ' আ‌মি ভক্ত , কা‌জেই ভ‌ক্তি -‌বিরুদ্ধ কাজ আম‌ার করা উ‌চিত নয় । '

কিন্তু যা‌দের লক্ষ্য থা‌কে সংসা‌র- ভো‌গের , তা‌দের কখনও এ‌দি‌কে কখনও ও‌দি‌কে , এইরূপ নানারকম বাসনা ম‌নে জন্মা‌তে থা‌কে । সেই বাসনার কখনও অন্ত হয় না , কেননা এক বাসনা পূ‌রিত হবার সঙ্গে স‌ঙ্গে নতুন বাসনা উৎপন্ন হ‌তে থা‌কে । ফলে জীবন দুঃ‌খে প‌রিপূর্ণ হয়ে যায় ।

এই ব্যবসায়া‌ত্মিকা ( নিয়শ্চা‌ত্মিকা ) বুুদ্ধির এমনই ম‌হিমা যে অতি দুরাচার বা অ‌তি পাপ্র‌ি ব্য‌ক্তিও য‌দি , " আ‌মি পরমাত্ম‌া‌কে প্রাপ্ত হব ' - এইরূপ সিদ্ধান্ত ক‌রে , তাহ‌লে সে খুব শীঘ্র ধর্মাত্মা হ‌য়ে যায় । শুধু ধর্মাত্মাই নয় , তার নিত্য শা‌ন্তি লাভ হয় অর্থাৎ তার উ‌দ্দেশ্য সিদ্ধ হয় ।

অব্যবসায়া‌ত্মিকা বুদ্ধিযুক্ত মানুষ যতবার জন্ম নেয় ততবারই সে নানা উ‌দ্যোগ , প‌রিশ্রম কর‌তে থা‌কে , কিন্তু তার বাসনার পরিপূ‌র্তি হয় না । আস‌লে , নতুন নতুন বাসনা জন্মা‌তে থা‌কে , যার কখনো শেষ হয় না । য‌দি কখনও কোনও বাসনার পূ‌র্তি হয় , তাহ‌লে সেটিও ভ‌বিষ্য‌তে নতুন - নতুন কামনা সৃ‌ষ্টির কার‌ণ প‌রিণত হবে ।

এই তাৎপর্য এই যে , ব্যবসায়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি হ‌লে অব্যবসায়া‌ত্মিকা ব‌ু‌দ্ধি চ‌লে যায় , কিন্তু অব্যবসায়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি থাক‌া‌তে কখনো ব্যবসায়া‌ত্মিকা ( নিশ্চয়া‌ত্মিকা ) বু‌দ্ধি হয় না । সুতরাং মানু‌ষের উ‌চিত যে ,সে যেন শীঘ্র পরমাত্মা - প্রাপ্তি‌কে স্থির লক্ষ্য ক‌রে নেয় । কারণ পরমাত্মা - প্র‌া‌প্তির জন্য শরীর পাত হ‌য়ে গে‌লে আমরা ভগবৎপ্রা‌প্তি থে‌কে ব‌ঞ্চিতই র‌য়ে যায় ।


Courtsy by: Joy Shree Radha Madhav
Share:

গীতায় দৈবী এবং আসুরী সম্পদ্

দৈবী এবং আসুুরী - এ‌ই দু‌টি শ‌ব্দের ম‌ধ্যে ' দেব ' নাম দেবতা‌দের নয় , তা হ‌লো পরমাত্মার , এবং ' অসুর ' নাম রাক্ষস‌দের নয় , তা আস‌লে প্রা‌ণে রমণকারী‌দের নাম । গীতায় ' দেব‌দেব ' ( ১০\১৫ ) , ' দেবম্ ' ( ১১ \১১ , ১৪ ) , ' দেব‌দেবস্য ' ( ১১\১৩ ) , ' দেব ' ( ১১ \১৫ ) ইত্যা‌দি প‌দে পরমাত্মার উ‌দ্দে‌শ্যেই ' দেব ' শব্দ প্র‌য়োগ করা হ‌য়ে‌ছে । ' আসুরং ভাবম্ ' ( ৭\১৫ ) , ' অাসুরঃ ' ( ১৬\৬ ) , ' আসুর‌নিশ্চয়ান্ ' ( ১৭\৬ ) ইত্যা‌দি পদ প্রা‌ণে আস‌ক্তিসম্পন্ন ব্য‌ক্তিদের জন্য ' আসুর ' শ‌ব্দের প্র‌য়োগ হ‌য়ে‌ছে ।

' দেব ' অর্থাৎ পরমাত্মার যত গুণ আ‌ছে সেগু‌লি‌কে ' দৈবী গুণ ' ব‌লে । এই দৈবীগুণ পরমাত্মা‌কে প্রাপ্ত করার পুঁ‌জি হওয়ায় এ‌কে ' দেবী সম্পদ্ ' বলা হয় - ';‌দৈবী সম্পদ‌্ -বি‌মোক্ষায় ' ( ১৬ \ ৫ ) । সাধকেরা এই দেবী সম্প‌দের আশ্রয় নিয়ে ভগবা‌নের ভজনা ক‌রেন ( ৯\১৩ ) ।

' অসু ' প্র‌া‌ণের নাম । সেই প্রা‌ণের নাম। সেই প্রা‌ণে যে রমণ ক‌রে , প্রা‌ণের ভরণ - পোষণ - রক্ষণ কর‌তে চায় , তা‌কে অসুর ব‌লে , এবং ঐসব অসুর‌দের যে স্বভাব , যে গুণ থা‌কে তা‌কেই ' আসুরী গুণ ' ব‌লে । এই আসুরীগুণ মানুষ‌কে বারংবার জন্ম - মৃত্যু চক্র , চুরাশী লক্ষ যো‌নি এবং নর‌কে নি‌য়ে যাওয়ার কারণ হওয়ার তা‌কে আসুরী সম্পদ্ ব‌লে - ' নিবদ্ধায়াসুরী মতা ' ( ১৬\৫ ) । মূঢ় ব্য‌ক্তিগণই আসুরী সম্প‌দের আশ্রয় নেয় ( ৯\১২ ) ।

সংসার থে‌কে বিমুখ হ‌য়ে এবং দৈবী সম্প‌দের আশ্রয় নি‌য়ে পরমাত্মার প্রা‌প্তি লাভ কর‌তে ইচ্ছুক ব্য‌ত্তি দুই প্রকা‌রের ----

১ । সগু‌ণোপাসক ( ভক্ত ) --- সগু‌ণোপাসক‌দের ম‌ধ্যে শ্রদ্ধা , বিশ্বাস এবং ভা‌বের প্রাধান্য হয় , অতএব সে ' অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধিঃ --- নাতিমা‌নিতা ' ( ১৬ \ ১ - ৩ ) - এই ২৬টি গুণ ধারণ ক‌রে । যেমন ভয়শূন্যতা , সত্তার প‌বিত্রতা , পারমা‌র্থিক জ্ঞা‌নের অনুশীলন , দান , আত্মসংযম , যজ্ঞ অনুষ্ঠান , বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন , তপশ্চর্যা , সরলতা , অ‌হিংসা , সত্যবা‌দিতা , ক্রোধশূন্যতা , বৈরাগ্য , শা‌ন্তি , অ‌ন্যের দোষ দর্শন না করা , সমস্ত জী‌বে দয়া , লোভহীনতা , মৃদুতা , লজ্জা , অচপলতা , তেজ , ক্ষমা , ধৈর্য , শে‌ৗচ , মাৎসর্য শূন্যতা , অ‌ভিমান শূন্যতা । এই সাধক সর্বত্র ভগবান‌কে দর্শন ক‌রেন এবং সর্বপ্রথম অভয় হ‌য়ে যায় , তখন তার ম‌ধ্যে অমা‌নিত্ব স্বাভা‌বিকভা‌বে এ‌সে যায় ।

২ । নির্গুণোপাসক ( জ্ঞানী ) - নির্গুণ উপাসক‌দের শরীর - শরীরীর ( আত্মা ) বি‌বেক - বিচা‌রের প্রাধান্য থা‌কে , সুতরাং সে , ' অমা‌নিত্বমদ‌ম্ভিত্ব ---- তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্ ' ( ১৩ \ ৭ - ১১ ) - এই ২০ প্রকার গুণ ধারণ ক‌রে। অমা‌নিত্ব , দম্ভশূন্যতা , অ‌হিংসা , স‌হিষ্ণুতা , সরলতা , সদ্গুরুর সেবা , শে‌ৗচ , স্থৈর্য , আত্মসংযম , ইন্দ্রিয় - বিষ‌য়ে বৈরাগ্য অহঙ্কারশূনতা জন্ম - মৃত্যু - জরা - ব্যাধি - দুঃখ আ‌দির দোষ দর্শন , স্ত্রী - পুত্রা‌দি‌তে আস‌ক্তিশূন্যতা , স্ত্রী - পুত্রা‌দির সুখ - দুঃ‌খে ঔদাসীন্য , সর্বদা সম‌চিত্তত্ব , আমার প্র‌তি অনন্যা ও অব্য‌ভিচারিণী ভ‌ক্তি , নির্জন স্থা‌নে প্রিয়তা , জনাকীর্ণ স্থা‌নে অরু‌চি অধ্যাত্ম জ্ঞা‌নে নিত্যত্ববু‌দ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞা‌নের প্র‌য়োজন অনুসন্ধান - এই সমস্ত জ্ঞান ব‌লে ক‌থিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান । এইরূপ সাধ‌কে প্রথ‌মে অমা‌নিত্ব ভাব আ‌সে এবং তারপর সে সর্বত্র পরমাত্মা‌কে অনুভব ক‌রে অভয় হ‌য়ে যায় ।

উপ‌রিউক্ত দুই প্রকা‌রের সাধ‌কের ম‌ধ্যে দৈবী সম্পদ্ সাধন রূ‌পে থা‌কে । সিদ্ধ মহাপুরুষ‌দের ম‌ধ্যে এই দেবী সম্পদ্ স্বতঃ স্বাভাবিকভা‌বে থা‌কে । বাস্ত‌বে সিদ্ধ মহাপুরুষ গুণাতীত , কিন্তু তি‌নি সাধন অবস্থায় প্রথম‌দি‌কে দৈবী সম্প‌দের সহা‌য়েই সাধনা ক‌রে‌ছেন । সুতরাং সিদ্ধ হওয়ার পরও তাঁর দৈবী - স্বভাব বজায় থা‌কে । ঐ সিদ্ধপুরুষ‌দের ম‌ধ্যে সিদ্ধভক্তদের স্বাভা‌বিক দৈবী সম্পদের গু‌ণের বর্ণনা দ্বাদশ অধ্যা‌য়ের ত্র‌য়োদশ শ্লোক থে‌কে উন‌বিংশ শ্লোক পর্যন্ত করা হ‌য়ে‌ছে এবং সিদ্ধ - জ্ঞানী‌দের স্বাভা‌বিক দৈবী সম্প‌দের গু‌ণের বর্ণনা চতুর্দশ অধ্যা‌য়ের বাইশ থে‌কে পঁ‌চিশ সংখ্যক শ্লোক পর্যন্ত করা হ‌য়ে‌ছে ।

আসুরী সম্পদ ধারণকারীও দুই প্রকা‌রের হয় --

১ । সকামভা‌বে দেবতা‌দের উপাসনাকারী - সকামভা‌বে দেবতা‌দির পূজা - উপাসনা ক‌রে ব্রহ্ম‌লোক পর্যন্ত গমনকারী সমস্ত মানুষই আসুরী সম্প‌দের অ‌ধিকারী । কারণ তা‌দের উ‌দ্দেশ্য ভোগ উপ‌ভোগ করা , তাই তারা ভো‌গে‌তেই আসক্ত ও তম্ময় থা‌কে ( ২\ ৪২ - ৪৪ , ৭\ ২০ - ২৩ , ৯\ ২০ - ২১ ) । এরূপ মানু‌ষেরা যে ফল লাভ ক‌রে তা বিনাশশীল , অন্তহীন নয় - ' অন্তুবত্তু ফলং তেষাম্ ' ( ৭\২৩ ) এবং তারা পুনঃপুনঃ জন্ম - মৃত্যু চ‌ক্রে আব‌র্তিত হয় -- ' গতাগতং কামকামা লভ‌ন্তে ' ( ৯\২১ ) ।

তাৎপর্য এই যে , যা‌দের উ‌দ্দে‌শ্যে সুখ , আরাম , ভোগ - বিলাস ও বিনাশশীল পদার্থ , তারা সক‌লেই আসুরী সম্পদ্ যুক্ত এবং যা‌দের উ‌দ্দে‌শ্যে ভগবা‌নের প্রসন্নতা , লোকসংগ্রহ এবং জগ‌তের কল্যা‌ণে কর্ম করা , তারা সক‌লে দৈবী সম্পদ্ সম্পন্ন হয় ।

২ । কাম - ক্রোধা‌দির আশ্রয় নি‌য়ে দুর্গুণ - দুরাচা‌রে প্রবৃত্ত ব্য‌ক্তি - যেসব মানুষ কাম , ক্রোধ , অহংকার ইত্যা‌দির আশ্রয় গ্রহণ ক‌রে তারা মিথ্যা , কপটতা , ছলনা , বিশ্বাসঘাতকতা , শঠতা , হিংসা ইত্যা‌দির দ্বারা অপর‌কে দুঃ‌খ দেয় । এইসব ব্য‌ক্তি পা‌পের তারতম্য অনুযায়ী পশু , পক্ষী , কীট , পতঙ্গ , বৃক্ষ , লতা আ‌দি আসুরী জন্ম লাভ ক‌রে ( ১৬\১৯ ) এবং কুম্ভীপাক , রৌরব ইত্যা‌দি নর‌কে গমন ক‌রে ( ১৬ \১৬ ) ।

এর তাৎপর্য এই যে , ভগবৎপরায়ণ হ‌লে দৈবী সম্পদ্ প্রকট হয় , য‌া মানুষ‌কে সংসা‌রবন্ধন থে‌কে মুক্ত ক‌রে । পিণ্ড‌পোষণপরায়ণ , ভোগপরায়ণ হ‌লে এবং নতুন নতুন বস্তু আশা করা ও প্রাপ্ত বস্তু ধ‌রে রাখা - এই ভাব হ‌লে আসুরী সম্প‌ত্তি আ‌সে , যা মানু‌ষের বন্ধন ও পত‌নের কারণ । সুতরাং সাধ‌কের উ‌চিত যে , সে যেন দৈবী সম্পদ‌্কে গুরুত্ব দেয় এবং আসুরী ভাব‌কে সদা প‌রিত্যাগ ক‌রে । তাহ‌লে তার উ‌দ্দে‌শ্য শেষ পর্যন্ত সিদ্ধ হ‌বেই ।

Courtesy by: Joy Shree Radha Madhav
Share:

২৩ এপ্রিল ২০১৭

হিন্দু ধর্ম একটি নদীর মত যা এক বড় নদীর মত আপনধারায় প্রবাহমান - ড. এপিজে আবদুল কালাম।

২০১১ সালের ১ জুলাই। দিল্লীর স্বামীনারায়ণ অক্ষরধামে ‘Hinduism, An Introduction’ নামে বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুল কালাম।

Swaminarayan Aksharpith থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে হিন্দু ধর্মের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ভাষণ দিতে গিয়ে ড. আবদুল কালাম বলেন, “ হিন্দু ধর্ম যথার্থ অর্থেই একটি স্বাভাবিক ধর্ম। এর সহনশীলতা এবং নৈতিকতার জন্য আজ এক সভ্য সমাজ হিন্দু ধর্ম গড়তে পেরেছে। বইটি যখন আমি পড়লাম তখন আমি দেখলাম হিন্দু ধর্ম একটি নদীর মত যা এক বড় নদীর মত আপনধারায় প্রবাহমান।”

উল্লেখ্য ড. আবদুল কালাম একজন নিরামিষভোজী তামিল এবং তিনি গীতাপাঠ করেন।
Share:

১২ নভেম্বর ২০১৬

কোন সময়েই আত্মাকে মনবুদ্ধির সহিতও অভিন্নরূপে গণ্য করা যায় না …(দেহের সঙ্গে তো দূরের কথা

প্রত্যেকে মনে করেন, তাঁহার পথই শ্রেষ্ঠ পথ। খুব ভাল! কিন্তু মনে রাখিবেন—ইহা আপনার পক্ষেই ভাল হইতে পারে। একই খাদ্য যাহা একজনের পক্ষে দুষ্পাচ্য, অপরের পক্ষে তাহা সুপাচ্য। যেহেতু ইহা আপনার পক্ষে ভাল, অতএব আপনার পদ্ধতিই প্রত্যেকের অবলম্বনীয়—সহসা এরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া বসিবেন না। জ্যাকের কোট সবসময় জন বা মেরীর গায়ে না-ও লাগিতে পারে। যাহাদের শিক্ষা-দীক্ষা নাই, যাহারা চিন্তা করে না—এরূপ নরনারীকে জোর করিয়া এই রকম একটা ধরাবাঁধা ধর্মবিশ্বাসের ভিতর ঢুকাইয়া দেওয়া হয়! স্বাধীনভাবে চিন্তা করুন; বরং নাস্তিক বা জড়বাদী হওয়াও ভাল, তবু বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবহার করুন! এ ব্যক্তির পদ্ধতি ভুল—এ-কথা বলিবার অধিকার আপনার আছে? আপনার নিকট ইহা ভ্রান্ত হইতে পারে, কিন্তু ইহার নিন্দা করিবার অধিকার আপনার নাই। অর্থাৎ এই মত অবলম্বন করিলে আপনার অবনতি হইবে; কিন্তু এ-কথা বলা যায় না যে, ঐ ব্যক্তিও অবনত হইবে; তাই শ্রীকৃষ্ণের উপদেশঃ যদি তুমি জ্ঞানী হও, তবে একজনের দুর্বলতা দেখিয়া তাহাকে মন্দ বলিও না।

যদি পার তাহার স্তরে নামিয়া তাহাকে সাহায্য কর। ক্রমে ক্রমে তাহাকে উন্নত হইতে হইবে। পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে আমি হয়তো তাহার মগজে পাঁচ ঝুড়ি তথ্য সরবরাহ করিতে পারি, কিন্তু তাহাতে তাহার কী ভাল হইবে? পূর্বাপেক্ষা হয়তো তাহার অবস্থা খারাপই হইবে।

কর্মের এই বন্ধন কোথা হইতে আসে? আমরা আত্মাকে কর্মদ্বারা শৃঙ্খলিত করি। আমাদের ভারতীয় মতে সত্তার দুইটি দিক্‌—একদিকে প্রকৃতি, অন্যদিকে আত্মা। প্রকৃতি বলিতে শুধু বহির্জগতের বস্তুসমূহ বোঝায় না; আমাদের শরীর মন বুদ্ধি—এমন কি ‘অহঙ্কার’ পর্যন্ত এই প্রকৃতির অন্তর্গত। অনন্ত জ্যোতির্ময় শাশ্বত আত্মা এই সকলের ঊর্ধ্বে। এই মতে আত্মা প্রকৃতি হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, আত্মা চিরকাল ছিলেন এবং চিরকাল থাকিবেন। … কোন সময়েই আত্মাকে মনবুদ্ধির সহিতও অভিন্নরূপে গণ্য করা যায় না …(দেহের সঙ্গে তো দূরের কথা)।

�স্বামী_বিবেকানন্দ_গীতা_প্রসঙ্গে�
Share:

হে কৃষ্ণ, যদি জ্ঞানকে কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করেন, তবে কর্মের উপদেশ দিতেছেন কেন?

অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ আপনি আমাকে কর্মের উপদেশ দিতেছেন, অথচ ব্রহ্মজ্ঞানকে জীবনের উচ্চতম অবস্থা বলিয়া প্রশংসা করিয়াছেন। হে কৃষ্ণ, যদি জ্ঞানকে কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করেন, তবে কর্মের উপদেশ দিতেছেন কেন?২২

শ্রীকৃষ্ণঃ অতি প্রাচীনকাল হইতে দুইটি সাধনপথ প্রচলিত আছে। জ্ঞানানুরাগী দার্শনিকগণ জ্ঞানযোগের এবং নিষ্কামকর্মিগণ কর্মযোগের কথা বলেন। কিন্তু কর্ম ত্যাগ করিয়া শান্তি লাভ করিতে পারে না। এ-জীবনে কর্ম বন্ধ করিয়া থাকা মুহূর্তমাত্র সম্ভব নয়। প্রকৃতির গুণগুলিই মানুষকে কর্ম করিতে বাধ্য করে। যে ব্যক্তি বাহ্য কর্ম বন্ধ করিয়া মনে মনে কর্মের কথা চিন্তা করে, সে কিছুই লাভ করিতে পারে না। সে মিথ্যাচারী হইয়া যায়। কিন্তু যিনি মনের শক্তি দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলিকে ধীরে ধীরে বশীভূত করিয়া কর্মে নিযুক্ত করেন, তিনি পূর্বোক্ত ব্যক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। অতএব তুমি কর্ম কর।২৩

‘যদি তুমি এ রহস্য বুঝিয়া থাক যে, তোমার কোন কর্তব্য নাই—তুমি মুক্ত, তথাপি অপরের কল্যাণের জন্য তোমাকে কর্ম করিতে হইবে। কারণ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ যাহা আচরণ করেন, সাধারণ লোকে তাহাই অনুসরণ করে।’২৪

পরা শান্তির অধিকারী মুক্ত মহাপুরুষ যদি কর্মত্যাগ করেন, তবে যাহারা সেই জ্ঞান ও শান্তি লাভ করে নাই, তাহারা মহাপুরুষকে অনুকরণ করিবার চেষ্টা করিবে এবং তাহাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হইবে।

‘হে পার্থ, ত্রিভুবনে আমার অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য কিছুই নাই, তথাপি আমি সর্বদা কর্মে ব্যাপৃত আছি। যদি আমি মুহূর্তের জন্য কর্ম না করি, তবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হইয়া যাইবে।’২৫

‘অজ্ঞ ব্যক্তিরা ফলাকাঙ্ক্ষী হইয়া যেরূপ কর্ম করে, জ্ঞানিগণকে অনাসক্তভাবে এবং কোন ফলের আকাঙ্ক্ষা না করিয়া সেইরূপ কর্ম করিতে হইবে।’২৬

আপনি যদি জ্ঞানের অধিকারী হন, তবু অজ্ঞান ব্যক্তিদের বালসুলভ বিশ্বাসকে বিভ্রান্ত করিবেন না। পরন্তু তাহাদের স্তরে নামিয়া আসিয়া তাহাদিগকে ক্রমশঃ উন্নত করিবার চেষ্টা করুন।

#স্বামী_বিবেকানন্দ_গীতা_প্রসঙ্গে
Share:

১২ জুলাই ২০১৫

ভগবদগীতা নামক অমূল্য গ্রন্থটির প্রাচীনকালের অস্তিত্ব ও এর উত্‍পত্তি

প্রথমেই আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই "প্রস্থানত্রয়ী" শব্দটির সাথে।প্রস্থানত্রয়ী হল বেদান্ত দর্শনের মূল তিনটি গ্রন্থ-
১)উপনিষদ,এটি হল উপদেশ প্রস্থান।
২)ব্রহ্মসূত্র,যাকে বলা হয় ন্যয় প্রস্থান।
৩)ভগবদগীতা,এটিকে বলা হয় সাধনা প্রস্থান।
বেদান্তের চারটি শাখার ই প্রতিষ্ঠাতাগুরুগণ এই তিনটি গ্রন্থের ভাষ্য রচনা করে গিয়েছেন।তাঁরা হলেন যথাক্রমে-
জগতগুরু আদি শংকরাচার্য,যিনি ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন।তিনি অদ্বৈতবেদান্ত শাখার প্রতিষ্ঠাতা।শংকরাচার্যের গীতাভাষ্য হিন্দুধর্মীয় পন্ডিতমহলে অত্যন্ত বিখ্যাত।কথা হল ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেয়া এই মহান সাধক কিভাবে গীতাভাষ্য রচনা করলেন যদি ১৭৫৫ সালের আগে গীতা নামের কোন আলাদা বই ই না থাকে!!!
একইভাবে বিশিষ্টদ্বৈত বেদান্তের প্রতিষ্ঠানা রামানুজাচার্য ১০১৭ সালে জন্মগ্রহন করেন।তিনিও গীতাভাষ্য রচনা করেছিলেন।অর্থাত্‍ সেই সময়েও গীতা নামে আলাদা গ্রন্থ ছিল এবং খুব বিখ্যাত ই ছিল!
একইভাবে গীতার ভাষ্যকারী দ্বৈতঅদ্বৈত শাখার প্রতিষ্ঠাতা নিম্বাকাচার্য এবং দ্বৈতবেদান্তের প্রতিষ্ঠাতা মধ্বাচার্য যথাক্রমে ত্রয়োদশ শতাব্দী এবং ১১৯৯ সালে জন্মগ্রহন করেন।এছাড়া বিখ্যাত শৈব দার্শনিক অভিনবগুপ্ত দশম শতাব্দীতে, শ্রী শ্রী চৈতন্য ১৪৮৬ সালে এবং ধ্যনেশ্বর ১২৭৫ সালে তামিল ভাষায় গীতাভাষ্য রচনা করেন।এছাড়া প্রখ্যাত আরব পর্যটক আলবেরুনী ১০১৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ভারত সফরকালে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে গীতার কথাও উল্লেখ করেন।অর্থাত্‍ এটা পরিস্কার যে পিনাকী বাবুর ১৭৫৫ সালে গীতা উদ্ভবের তত্ত্বটা নিতান্তই হাস্যকর।
গবেষকদের দৃষ্টিতে শ্রীমদভগবদগীতার আলাদা গ্রন্থ রুপে আবির্ভাবের সময়কাল
প্রফেসর Jeaneane Fowler এর মতে গীতার উত্‍পত্তি খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ সালে(২০০B.C),KK Nair এর অনুযায়ী তা ১৫০B.C তে,কাশী নাথ উপাধ্যায় এর মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালে এবং Eliot Deustch এর মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ সালের মধ্যে।প্রকৃতপক্ষে গীতার প্রথম ইংরেজী অনুবাদ করেন চার্লস উইলকিন্স ১৭৯৫ সালে।সেটা গীতার প্রথম ইংরেজী অনুবাদ,প্রথম গীতা নয়।
গীতার একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে-
"ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে"
অর্থাত্‍ জ্ঞানের মত পবিত্র এই সংসারে আর কিছু নেই।তাই পিনাকী বাবুর মত অকালকুষ্মান্ডদের প্রতি আহ্বান,জ্ঞানের পেছনে ছুটুন,সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে নয়।
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি
‪#‎অগ্নিবীর‬
Share:

১২ এপ্রিল ২০১৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতার উত্‍পত্তি ও ইতিকথা

শ্রীমদ্ভগবদগীতা বহু প্রাচীন কাল থেকে একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে । আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে দ্বাপর যুগে শ্রীগীতার এ অমিয় বাণী কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে অর্জুনকে ব্যক্ত করেছিলেন । কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যিনি মহর্ষি ব্যাসদেব নামে সমধিক পরিচিত তিনি মহাভারত রচনা করে এই কথোপকথন ভীষ্ম পর্বের ২৫ অধ্যায় হতে ৪২ অধ্যায় পর্যন্ত সপ্তশতী শ্লোকে অন্তর্ভূক্ত করেন । মহর্ষি শংকরাচার্য সর্বপ্রথম মূল মহাভারতে নিহিত শ্রীগীতা অংশের কোনরূপ বিকৃত না করে পরম যত্নসহকারে প্রতিটি অধ্যায়কে হুবহু চয়ন করে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থরূপে শ্রীমদ্ভগবদগীতা প্রবর্তন করেন । অবশ্য শ্রীগীতার উত্‍পত্তি আর ও অনেক প্রাচীন । শ্রীমদ্ভগবদগীতার ৪র্থ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে এর উত্‍পত্তি ও ইতিকথা সর্ম্পকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে ।
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্‌ ।
বিবস্বান্‌মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীত্‍ । ৪/১
অনুবাদ :
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন - আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ করেছিলাম । সূর্য তা মানব জাতির জনক মনুকে বলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন ।
শ্রীমদ্ভগবদগীতার উত্‍পত্তি ইতিহাস অতি পুরাতন । পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই শ্রীগীতার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন । সূর্যকে একটি শক্তিরূপে কল্পনা করে প্রাচীন কাল থেকে তাকে দেবতা হিসেবে মনে করা হত। তিনি সকল গ্রহের রাজা । অশেষ তেজবিশিষ্ট এবং জগতের চক্ষুস্বরূপ । মানুষ যেমন চক্ষু ব্যতীত কোন কিছু দেখতে পায়না তেমনি সূর্য ছাড়া সারা পৃথিবী অন্ধকার । তিনি অন্যান্য গ্রহকে তাপ ও আলো দান করেন । ভগবান অতি কৃপা করে প্রথম শিষ্যরূপে সূর্যদেব (বিবস্বান)কে গ্রহণ করেন এবং তাকে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সমুদয় জ্ঞান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিবস্বানের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রহের রাজাদেরকেও তা দান করেছিলেন ।পৃথিবীতে যখন ত্রেতা যুগ শুরু হয় তখন তার প্রারম্ভে ভগবত্‍তত্ত্ব জ্ঞান বিবস্বান (সূর্যদেব) মানব জাতির জনক মনুকে দান করেন । মনু পরবর্তীকালে এই তত্ত্বজ্ঞান তার পুত্র সসাগরা পৃথিবীর অধিশ্বর এবং রঘু বংশের জনক ইক্ষ্বাকুকে দান করেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রঘু বংশে শ্রীরামচন্দ্র আর্বিভূত হন । অতএব এই শ্রীগীতার তত্ত্ববাণীর জ্ঞান শুরু থেকে শিষ্যতে পরম্পরাক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ও প্রবাহিত হয়ে আসছে । কিন্তু এক সময় এই পরম্পরা ছিন্ন হয়ে যায় এবং এই জ্ঞান আমরা হারিয়ে ফেলি । তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে এসে আবার এই জ্ঞান দান করলেন ।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন সূর্যদেব বিবস্বনকে শ্রীমদ্ভগবদগীতা শোনান তখন অর্জুনও অন্যকোন রূপে সেখানে উপস্থিত ছিলেন । কিন্তু ভগবানের সাথে পার্থক্য হচ্ছে যে , অর্জুন তা ভুলে গেছেন । কিন্তু ভগবান তা ভোলেন নি । তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতার ৪র্থ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকে বলেছেন-
বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন ।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ॥ ৪/৫
অনুবাদ
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন - হে পরন্তপ অর্জুন, আমার এবং তোমার বহু জন্ম অতীতে হয়েছে । আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি কিন্তু তুমি তা পারো না ।
মানুষ কথনো পূর্ব জন্মের ঘটনা প্রবাহ জানতে পারেনা । তাই দ্বাপর যুগে অর্জুন কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার বিপক্ষীয় কুরুবংশের আত্মীয় স্বজনদের বধ করে রাজ্য লাভ করতে কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না । কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই পূর্বে প্রচারিত শ্রীমদ্ভাগবদগীতার বাণী পুনরায় শোনানোর কারণে অর্জুনের জ্ঞান ফিরে আসে এবং ধর্মযুদ্ধ করতে মনস্থির করলেন ।
তথ্যসূত্র রথযাত্রা
Share:

নিউজিল্যান্ডে সনাতন ধর্ম : কিছু তথ্য

* নিউজিল্যান্ডে সনাতন ধর্ম fastest growing religions । ১৯৯৬ তে হিন্দুজনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ২৬,০০০ । ২০০১ সালে তা দাড়ায় ৪০,০০ । সর্বশেষ ২০০৬ সালের হিসাবমতে ৬৫,০০০ অথাৎ এই কয়েক বছরে হিন্দু সংখ্যা ৬২ % বৃদ্ধি পেয়েছে ।
* শুধু তাই নয় হিন্দুরা নিউজিল্যান্ডে সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । ১.৭ % । খ্রিস্টানদের পরেই অবস্থান ।
* নিউজিল্যান্ডে ইসকন সহ বিভিন্ন সনাতন সংগঠনের ভালো উপস্থিতি আছে । রাজধানী ওয়েলিংটন সহ বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য মন্দির আছে ।
* বলতে গেলে নিউজিল্যান্ডের হাসপাতালগুলো পরিচালনা করে হিন্দুরাই । হিন্দু ডাক্তার , ইন্জিনিয়ারদের ছড়াছড়ি নিউজিল্যান্ডে !!
* ২০০৮ সালে একটি কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় যার থিম ছিল "Sustaining New Zealand Communities with Yoga, Meditation and Ayurveda".
* ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জন কিস ভাগবতগীতা গ্রহন করছেন । সম্প্রতি তিনি একটি মন্দির দর্শন করে অভিভূত হন এবং সনাতন ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন ।
-------------------------
শেয়ার করে তথ্যগুলো ছড়িয়ে দিন
Share:

দ্যূতক্রিয়া


জুয়া খেলা বা দ্যূতক্রিয়া যা পাশাখেলা নামেও প্রাচীন ভারতবর্ষে পরিচিত ছিল।পৃথিবীর যতগুলো প্রাচীনতম ক্রীড়া প্রচলিত ছিল তার মধ্যে একটি এই দ্যূতক্রিয়া।


মহাভারতে আমরা দেখতে পাই জীবনঘনিষ্ঠ ঘটনার সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে এই পাশাখেলার কবলে পড়ে পঞ্চপাণ্ডবরা রাজ্য হারিয়েছিলেন,সী মাহীন দুঃখকষ্টে পতিত হয়েছিলেন।


পবিত্র বেদে মদ্যপান,নেশাদ্র ব্য গ্রহনের পাশাপাশি এই দ্যূতক্রিয়াকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে মানবজাতির কল্যানের জন্য ই।আমাদের এক পাঠকের প্রশ্ন ছিল পবিত্র বেদাদি শাস্ত্রে এই দ্যূতক্রিয়া সম্পর্কে কি বলা হয়েছে।


ঋগ্বেদ এর দশম মণ্ডলের ৩৪ তম সুক্তের নাম ‘অক্ষকিতব নিন্দা’ সুক্ত।সংস্কৃত অক্ষকিতব অর্থ ই হল দ্যূতক্রিয়া করে যে বা জুয়াড়ি।অক্ষ হচ্ছে ‘বিভিতক’ নামক একধরনের বৃক্ষের অপর নাম যার বৈজ্ঞানিক নাম Terminalia bellirica.এই গাছ থেকেই তখনকার সময় এ অক্ষ তথা পাশাখেলার গুটি বানানো হত তাই এই খেলার নাম অক্ষ(অক্ষক্রীড় া বা পাশাখেলা))।


তাই অক্ষকিতব সুক্ত এর তৃতীয় হতে দ্বাদশ মন্ত্র পর্যন্ত জুয়া খেলার কুফল বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-


“একজন জুয়াড়িকে(যে অক্ষ খেলে) কেউ পছন্দ করেনা।তার বাবা-মা,স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন,বন ্ধুবান্ধব কেউ না,একটি বৃদ্ধ,ক্লান্ত অশ্বের মত ই সে মুল্যহীন হয়ে পড়ে,কেউ ই তাকে গুরুত্ব দেয়না,কেনই বা দেবে?
অক্ষক্রীড়া অনুচিত তা জেনেও বারবার ওই ব্যাক্তি এই নেশা ছাড়তে পারেনা,এই দুর্দশা ক্রমশ তাকে ছুরির ন্যায় বিদ্ধ করতে থাকে,আগুনের ন্যায় দগ্ধ করতে থাকে,অসহ্য ব্যথার ন্যায় ভোগাতে থাকে,এই খেলায় জয়ী যা লাভ করে তাও একসময় ঠিক ই হারিয়ে যায়,প্রথমে অনেক মধুর মনে হলেও তা একসময় তাকে টুকরো টুকরো করে দেয়......।“
(১০.৩৪.৩-১২)


তাই ঋগ্বেদ ১০.৩৪.১৩ বলছে,
অক্ষৈর্মা দিব্যঃ কৃষিমিত কৃষস্ব বিত্তে রমস্ব বহু মন্যমানঃ।
তত্র গাবঃ কিতব তত্র জায়া তন্মে বি চষ্টে সবিতায়মর্য।।


অনুবাদ-
“হে মনুষ্য,পাশা খেলোনা,তোমার ভুমি আছে,অর্থ-সম্পত্ তি আছে।যা তোমাদের আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাক।তোমার পরিবার আছে, স্ত্রী আছে,এসব নিয়ে সুখে থাক।এটাই আলোকপ্রদর্শনকার ী পরমাত্মার প্রদত্ত জ্ঞান।”


উল্লেখ্য যে পবিত্র বেদের এই অক্ষকিতব সুক্ত কে মানবইতিহাসের প্রাচীনতম কাব্যরত্ন হিসেবে অভিহিত করা হয়।Arthur Anthony Macdonell তাঁর A History of Sanskrit Literature গ্রন্থে বলেছিলেন,
"বেদকে পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ ধরে বলা যায় যে এই কাব্যটি(সুক্তটি ) প্রাচীনতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম।"


মহাঋষি মনু তাই বলেছিলেন,
“দ্যূতমেতৎ পুরাকল্পে দৃষ্টং বৈরকরং মহৎ।
তস্মাদ্ দ্যুতং ন সেবেত হাস্যর্থমপি বুদ্ধিমান্।।
(মনুসংহিতা ৯.২২৭)


অনুবাদ-দ্যূতক্র ীড়া অত্যন্ত অনিষ্টকর একটি অভ্যাস।তাই বুদ্ধিমান ব্যাক্তির কখনো দুষ্টামির ছলেও পাশাখেলা উচিৎ নয়।


ওম শান্তি শান্তি শান্তি
Share:

১৮ মার্চ ২০১৫

Vedic Granth

  1. What are Vedic Granth? আমাদের ধর্মিয় গ্রন্থগুলি কি কি তার উপর এই article টা তৈরী করলাম (অনেক ক্ষণ লেগেছে); সূর্য তখন পশ্চিমের আঁকাশে, এখন মধ্যরাত:

১। Veda / Shruti / Samhita: There are four Vedas which are as follows: Rig Veda, Yajur Veda, Sam Veda and Atharva Veda. বেদ চারিটি ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব। 

২। Upved: There are 5 Upveda which are as follows: Ayurveda (Sciences relating to LIFE and MEDICINE, Dhanurveda, Gandharva Veda, Shilpa Veda (Sthapatya Ved), Artha Veda. বেদের আরেক নাম শ্রুতি হলেও, উপবেদের সাথে শ্রুতির কোন যোগ নাই। এই বেদ সাধারণত বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ। সকল বেদেরই উপবেদ আছে। ঋগ্বেদের উপবেদ আয়ুর্বেদ, যজুর্বেদের উপবেদ ধনুর্বেদ, সামবেদের উপবেদ গন্ধর্ববেদ এবং অথর্ববেদের উপবেদ স্থাপত্যবেদ বা শিল্প বেদ। সর্বশেষ উপবেদের নাম 'অর্থ বেদ'। আয়ুর্বেদে রয়েছে জীবন ও চিকিৎসা অর্থ্যাৎ Ayurveda is related to the secret of life and the science of long life. ধনুর্বেদে রয়েছে - সমরবিদ্যা (যুদ্ধের কৌশল), আধ্যাত্মিকতা, কর্ম জ্ঞান, কূটনীতিবিদ্যা, কর্তব্য জ্ঞান, নাগরিক জ্ঞান সহ প্রভৃতি বিষয়। গন্ধর্ববেদ হলো সঙ্গীত ও প্রাকৃতিক সুর যা সামবেদের উপবেদ হয়েছে। অর্থ্যাৎ Gandharvaveda is the science of music, derived from the Sama-Veda. শিল্প বেদে রয়েছে স্থাপত্য, স্থাপত্যবিদ্যা, স্থাপত্যশিল্প, শিল্পকলা, নির্মাণকৌশল ইত্যাদি বিষয়ক জ্ঞান। অর্থ্যাৎ Shilpa Veda (Sthapatya Ved) deals with Hindu architecture and various Hindu arts. সর্বশেষ উপবেদের নাম হলো 'অর্থবেদ' যাতে রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক, ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা অর্থ্যাৎ it deals with social, economic, and political systems. সংক্ষেপে এই হইল 'উপবেদ'! 

৩। Vedang: There are six Vedanga which are as follows: (i) Siksha (Education), (ii) Kalpa (Creation), (iii) Vyakarana (Grammer), (iv) Nirukta (Etymology), (v) Chhanda (Metres), and (vi) Jyotisha (Mathematics & Astronomy). শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতিষ ও নিরুক্ত এই ছয়টি বেদের অঙ্গ তাই বেদাঙ্গ। 

(৪) Brahman: "A Brahman is a book which tells the meaning of Vedic Mantras and its use". বৈদিক যজ্ঞের ক্রিয়া প্রণালী, ক্রিয়ার তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য নির্ণয় ও ব্যাখ্যা ও আখ্যানাদি বর্ণনা করাই ব্রাক্ষ্মণগ্রন্থের প্রধান উদ্দেশ্য। ব্রাক্ষ্মণ ভাগ সাধারণত গদ্যে রচিত; কিন্তু কোন কোন স্থানে গাথা বা পদ্যময় অংশও আছে। অর্থ্যাৎ যে গ্রন্থে যজ্ঞ ও তার বিধি-বিধান পাওয়া যায় সেই গ্রন্থই ব্রাক্ষ্মণ নামে খ্যাত। In ancient times there where many Brahmanas, but currently only six are to be found:- (i) Aitareya Brahman Granth based on Rig Veda authored (ঋকবেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ ঐতিরেয় ব্রাক্ষ্মণ) (ii) Shankhyayan Brahman Granth based on Rig Veda (ঋকবেদের আরেকটি ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ সংখ্যায়ণ ব্রাক্ষ্মণ) (iii) Kaushtiki Brahman based on Rig Veda (এবং ঋকবেদের আরও একটি ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ কৌষীতকি ব্রাক্ষ্মণ) (iv) Shatapath Brahman Granth based on Yajurveda (যজুঃ বেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ শতপথ ব্রাক্ষ্মণ) (v) Maha-Tandya Brahman Granth based on Sam Veda (সামবেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ মহাতান্ড্যব্রাক্ষ্মণ) (vi) Gopath Brahman Granth based on Atharva Veda (অথর্ব বেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ গোপথ ব্রাক্ষ্মণ) অর্থ্যাৎ ঋক্ বেদের ব্রাক্ষ্মণগ্রন্থ ৩টি, যজুঃ বেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ ১টি, সামবেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ ১টি এবং অথর্ব বেদের ব্রাক্ষ্মণ গ্রন্থ ১টি মোট ৬টি ব্রাক্ষ্মণগ্রন্থ। 

(৫) Aranyak: Aranyak Granth contains the extracts from Brahman Granths. বেদের উপসংহার ভাগ ব্রাক্ষ্মণ। এই ব্রাক্ষ্মণের উপসংহার ভাগ আরণ্যক। 

(৬) Sutra Granth: There are nine Vedic Sutra Granth which are as follows: Grihay Sutra(গৃহ সূত্র), Dharma Sutra(ধর্ম সূত্র), Shrota Sutra(শ্রোতা সূত্র), Ashvalayana(অশবালায়ন সূত্র), Gobhil(গোভিল), Paraskar(প্রসাকর সূত্র), Koshitaki(কোশিতকি), Katyayana(কাত্যায়ন সূত্র), Bodhayana(বোধায়ন সূত্র). 

(৭) Smritis: Smriti(s) are the books of social, economic and political laws. স্মৃতি শাস্ত্র দুইটি, (এক) মনুস্মৃতি যা বৈবাস্বত মনু কর্তৃক রচিত। ১২টি অধ্যায় আছে এতে। (দুই) যাজ্ঞবাল্ক্য স্মৃতি যা ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য কর্তৃক রচিত। ৩টি অধ্যায় আছে এতে।

(৮) Darshan: There are six Darshan Shashtras - also known as Upaang or Shat Darshan (The Six Visualisation); they are: (i) Purva Mimaansa / Mimaansa Shashtra by Rishi Jaimini (ঋষি জৈমিনীকৃত পূর্ব-মীমাংসা বা মীমাংসা দর্শন) (ii) Vaisheshika Shashtra by Rishi Kannaad (ঋষি কণাদকৃত বৈশেষিক দর্শন) (iii) Nyaaya Shashtra by Rishi Gautam (ঋষি গৌতমকৃত ন্যায় দর্শন) (iv) Yoga Shashtra by Rishi Patanjali (ঋষি পাতজ্ঞলিকৃত যোগ দর্শন) (v) Sankhya Shashtra by Rishi Kapil (ঋষি কপিলকৃত সাংখ্য দর্শন) (vi) Uttar Mimaansa / Vedaant Shashtra by Rishi Veda Vyaas / Baadaraayana (ঋষি বেদব্যাসকৃত উত্তর মীমাংসা বা বেদান্ত দর্শন) । 

(৯) Upanishads: The Upanishads mostly explain in details Vedic Theology including metaphysics, spiritual and mystical powers and concepts of the God. উপনিষদ বেদের শিরোভাগ। এই জন্য এর নাম বেদান্ত। উপনিষদ বিভিন্ন ঋষি কর্তৃক কথিত হয়েছে। এদের সংখ্যা অনেক তার মধ্যে ১১টি উপনিষদ প্রচীন ও প্রামাণ্য বলে গণ্য। এরা হলো: ঈশোপনিষদ (যজুর্বেদ ভিত্তিক), কেনোপনিষদ (সামবেদ ভিত্তিক), প্রশ্নোপনিষদ (অথর্ববেদ ভিত্তকি), মান্ডুুক্য উপনিষদ (অথর্ববেদ ভিত্তিক), মুন্ডক উপনিষদ (অথর্ব বেদ ভিত্তিক), ঐতরেয় উপনিষদ (ঋকবেদ ভিত্তিক), তৈতরীয় উপনিষদ (যজুর্বেদ ভিত্তিক), ছান্দোগ্য উপনিষদ (সামবেদ ভিত্তিক), বৃহদারণ্যক উপনিষদ (যজুর্বেদ ভিত্তিক), শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (অথর্ববেদ ভিত্তিক)। ইত্যাদি। 

(১০) Itihas / Epics (Ramayan & Maha-Bharat including Bhagavad Gita): These are also called the great epics of Hinduism, they are: (i) Ramayan (The history of Sri Ram of liberating India from Raavan rajya and establishing Ram rajya) by Maharshi Valmiki (মহর্ষি বাল্মীকি রামায়ণ রচয়িতা, তিনি আদি কবি এবং রাজ দশরথের সমবয়ষ্ক ছিলেন) (ii) Mahabharat (The history of Sri Krishna of uniting the Indian Sub Continent) by Maharshi Ved Vyaas (মহাভারতের রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাস ইনি কৃষ্ণদ্বপৈায়ন নামেও পরিচিত, শ্রীমদ্ভগবদগীতা মাহাভারতের অংশ)

(১১) Niti / Ethics: নীতি শাস্ত্রগুলির মধ্যে Vidur Neeti (বিদুর নীতি), Chaanakyaa Neeti (চাণক্য নীতি), Bhartrihari Neeti ( ভারতিহারি ) Shikra Neeti (Shukra Neeti - Neetishashtra of Sage Shukracharya, the teaching of Guru Shukracharya, Brife from the Mahabharat)

পরিশেষে, সকলকে জানাই 'नमस्ते' !
Bangali Hindu Post (বাঙ্গালি হিন্দু পোস্ট)



Share:

১৩ ডিসেম্বর ২০১৩

গীতা জয়ন্তী:

গীতা জয়ন্তী (আপডেট)
এই তিথিতেই পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা বীর অর্জুনকে ৫১৫০ (৩১৩৮ খ্রীঃপূঃ নভেম্বর ০২ তারিখ শুক্রবার) বছর আগে কুরুক্ষেত্র (৬০ কিঃমিঃ) নামক স্থানে ভগবদ্গীতার জ্ঞান দান করেছিলেন । তাই এই মহিমা মণ্ডিত তিথিকে গীতা জয়ন্তী তিথি বলা হয় ।
গীতা সর্ম্পকে কিছু বহিরঙ্গা জ্ঞান
১। গীতা হচ্ছে সমস্ত শাস্ত্রের সারতিসার এমনকি গীতায় এমন কিছু আছে যা অন্যান্য কোন শাস্ত্রে পাওয়া যায় না । যেমন – ৫ম পুরুষার্থ
২। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের ২৫ থেকে ৪২ নং অধ্যায়ের এই ১৮ টি অধ্যায় হল ভগবদগীতা বা গীতোপনিষদ ।
৩। গীতায় আছে ৭০০ শ্লোক (কেউ বলে ৭৪৫ শ্লোক) আছে । তার মধ্যে ধৃতরাষ্ট্র বলেন ১টি শ্লোক, সঞ্জয় বলেন ৪০টি শ্লোক, অর্জুন বলেন ৮৫টি শ্লোক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন ৫৭৪টি শ্লোক । আর পুরো গীতায় ৯৫৮০ টি সংস্কৃত শব্দ আছে ।
৪। গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম ৬টি অধ্যায়কে বলে কর্মষটক, মাঝখানের ৬টি অধ্যায়কে বলে ভক্তিষটক, আর বাকি ৬টি অধ্যায়কে বলে জ্ঞানষটক ।
৫। গীতা পড়লে ৫টি জিনিষ সর্ম্পকে জানা যায় – ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কাল ও কর্ম ।
৬। যদিও গীতার জ্ঞান ৫০০০ বছর আগে বলেছিল কিন্তু ভগবান চতুর্থ অধ্যায় বলেছেন এই জ্ঞান তিনি এর আগেও বলেছেন, মহাভারতের শান্তিপর্বে (৩৪৮/৫২-৫২) গীতার ইতিহাস উল্লেখ আছে । তার মানে গীতা প্রথমে বলা হয় ১২,০৪,০০,০০০ বছর আগে, মানব সমাজে এই জ্ঞান প্রায় ২০,০০,০০০ বছর ধরে বর্তমান, কিন্তু কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে গেলে পুনরায় আবার তা অর্জুনকে দেন ।
৭। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মাত্র ৪০ মিনিটে এই গীতার জ্ঞান দেন ।
৮। গীতার মাহাত্ম্য অনেকে করে গেছেন তার মধ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য, স্কন্দপুরাণ থেকে শ্রীল ব্যাসদেব, শ্রীবৈষ্ণবীয় তন্ত্রসারে গীতা মাহাত্ম্য আর আছে পদ্মপুরাণে দেবাদিদেব শিব কর্তৃক ১৮টি অধ্যায়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন ।
৯। গীতাতে অর্জুনের ২০টি নাম আর কৃষ্ণের ৩৩টি নামের উল্লেখ করা হয়েছে ।
১০। গীতাতে মাং এবং মামেব কথাটি বেশি আছে, যোগ শব্দটি আছে ৭৮ বার, যোগী আছে ২৮ বার আর যুক্ত আছে ৪৯ বার ।
১১। গীতার ২য় অধ্যায়কে বলা হয় গীতার সারাংশ ।
১২। ভগবান যখন বিশ্বরূপ দেখান তখন কাল থেমে যায় ।
১৩। ভগবান শুধু যুদ্ধের আগেই গীতা বলেনি ১৮ দিন যুদ্ধের মাঝখানেও গীতা বলেছে ।
১৪। গীতায় অর্জুন ১৬টি প্রশ্ন করে আর কৃষ্ণ তার উত্তর দেন, কৃষ্ণ তা ৫৭৪টি শ্লোকের মাধ্যমে উত্তর দেন ।
১৫। পুরো গীতার সারমর্ম মাত্র ৪টি শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, ১০ অধ্যায়ের ৮ থেকে ১১ নং শ্লোক ।
১৬। পুরো গীতায় অর্জুন ৪৫ নামে কৃষ্ণকে সম্বধোন করছেন, আর কৃষ্ণ অর্জুনকে ২১টি নামে সম্বধোন করেছেন ।
১৭। গীতার ৫ম অধ্যায় ১৩ থেকে ১৬ নং শ্লোকে তিনজন কর্তার কথা বলা হয়েছে ।
১৮। গীতায় ৩টি গুণ, ৩টি দুঃখ আর ৪টি আমাদের প্রধান সমস্যার কথা বলেছে ।
১৯। ত্রিশ্লোকী গীতার জ্ঞান ঃ যা বেদ ও বেদান্তের সার, ১৫ অধ্যায়ের ১৬ থেকে ১৮ নং শ্লোক ।
২০। গীতায় ২৬টি গুণের কথা বলা হয়েছে আর ৬টি আসুরিক প্রবৃত্তির কথা বলা হয়েছে ।
২১। নরকের ৩টি দ্বারের কথা বলা হয়েছে (কাম, ক্রোধ ও লোভ)
২২। গীতার ১৮ অধ্যায় ব্রাক্ষ্মনের ৯টি গুণ, ক্ষত্রিয়ের ৭টি গুণ, বৈশ্যের ৩টি গুণ আর শুদ্রের ১টি গুণ ।
২৩। ৩টি কর্মের প্রেরণা আর ৩টি কর্মের আশ্রয়ের কথা বলা আছে ।
২৪। বেদান্ত শাস্ত্রের সিধান্ত অনুসারে কর্মসমূহের সিদ্ধির উদ্দেশ্যে ৫টি নির্দিষ্ট কারণ কথা বলা হয়েছে ।
২৫। গুণ অনুসারে ৩ প্রকারের ত্যাগের কথা বলা হয়েছে ।
২৬। ৩ প্রকারের আহার, যজ্ঞ, তপস্যা, শ্রদ্ধা, পূজা ও দানের কথা বলা হয়েছে ।
২৭। ২টি স্বভাবের জীবের কথা বলা হয়েছে ।
২৮। ২ প্রকার জীবের কথা বলা হয়েছে ।
২৯। ১৮টি আত্মজ্ঞানের সাধনার গুনের কথা বলা হয়েছে ।
৩০। ব্রক্ষ্ম উপলব্ধির ৫টি স্তরের কথা বলা হয়েছে ।
৩১। ভক্তদের ৩৬ টি গুণের কথা বলা হয়েছে ।
৩২। গীতায় ২৫ জন সৃষ্টের কথা বলা হয়েছে যারা স্থাবর, জঙ্গম ও সমস্ত প্রজাদের সৃষ্টি করেছেন ।
৩৩। গীতায় নারীর ৭টি গুণের কথা বলা হয়েছে ।
৩৪। ৪ প্রকার সুকৃতিবান ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে । আর ৪ প্রকার দুষ্কৃতিবানের কথা বলা হয়েছে ।
৩৫। জড়া প্রকৃতির ৮টি উপাদানের কথা বলা হয়েছে ।
(সংক্ষিপ্ত)
Courtesy By: Susanta Banda
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।