• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

ভাগবত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভাগবত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৬ জুন ২০১৬

ভাগবত ধর্ম সম্পর্কে জগদীশচন্দ্র ঘোষ

পৌরাণিক অবতার-তত্ত্ব, প্রতীকোপসনা এবং ইষ্টমূর্তির নানাবিধ ধ্যানধারণা প্রভৃতি ভক্তিমার্গের আবশ্যক অঙ্গগুলির প্রকৃত মর্ম হৃদ্গত না করে এক অখণ্ড বস্তুকে আমরা খণ্ড-খণ্ড করিয়া ‘ব্যক্তি’রূপে কল্পনা করে থাকি এবং জড়োপাসকের মতো তাই নিয়ে বাদ-বসংবাদ করি। তাই শ্রী গীতায় শ্রীভগবান স্পষ্টাক্ষরে বলেছেন -- 'অল্পবুদ্ধি মানব আমার পরম তত্ত্ব না জেনে অব্যক্ত অব্যয়স্বরূপ আমাতে ব্যক্তিত্ব আরোপ করে থাকে (‘অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবদ্ধয়ঃ’, গী -- ৭-২৪)
বস্তুত বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, ব্রাহ্ম ইত্যাদি ঈশ্বরবাদী মাত্রেই যাঁর উপাসনা করেন, তিনিই বাসুদেব। অবতারবাদ ইত্যাদি যাঁরা মানেন না, তাঁরাও বাসুদেবেরই উপাসনা করেন এবং বাসুদেব তা' অগ্রাহ্য করেন না, এই তাঁর শ্রীমুখের বাণী (‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে’, গী|৪|১১)
ভগবান বাসুদেব কর্তৃক যে উদার সর্বজনীন ধর্মমত গীতায় কথিত হইয়াছে তাহাই ভাগবত ধর্ম।
‘বাসুদেব’ শব্দ পরব্রহ্মবাচক।
সর্বভূতে বাস করেন বলিয়াই তিনি বাসুদেব (‘সর্বভূতাধিবাসশ্চ বাসুদেবস্ততো হ্যহম্‌’, মভাঃ - শাঃ - ৩৪১-৪১; বস্‌ – বাস করা), ‘ব্রহ্ম’ শব্দেরও এই অর্থ (‘বৃহত্ত্বাৎ ব্রহ্ম’, ‘যেন সর্বম্‌ ইদং ততম্‌’, গী -- ২-১৭)। এই ভাবে তিনি, সমস্ত কিছু ব্যাপিয়া আছেন বলেই তিনি আবার ‘বিষ্ণু’ (বিষ্‌ – বিস্তারে)। ব্রহ্মবাদী বলেন -- সমস্তই ব্রহ্ম (‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’); গীতা বলেন -- সমস্তই বাসুদেব (‘বাসুদেবঃ সর্বমিতি’, গী -- ৭-১৯); বিষ্ণুপুরাণ বলেন – জগৎ বিষ্ণুময় (‘ইদং বিষ্ণুময়ং জগৎ’) । সর্বত্রই এক তত্ত্ব। বস্তুত শ্রীকৃষ্ণ বসুদেবের পুত্র বলেই যে বাসুদেব তা নন, শ্রীকৃষ্ণ-অবতারের পূর্বেও যাঁরা পরব্রহ্মের অবতার বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছেন, তাঁরাও ভগবান ‘বাসুদেব’ বলেই আখ্যাত হহয়েছেন [ভাঃ ৫-৫-৬; ৫-৬-১৬]।
.
-- ভাগবত ধর্ম সম্পর্কে জগদীশচন্দ্র ঘোষ।

Courtesy by: Prithwish Ghosh
Share:

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

ভক্তিযোগই হচ্ছে ভগবানকে লাভ করার -সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা

শ্রীমৎ ভগবদ্গীতায় চারটি যোগের কথা বলা হয়েছে ----
১.কর্মযোগ
২. জ্ঞানযোগ
৩. ধ্যানযোগ
৪. ভক্তিযোগ।
-
কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ এবং ধ্যানযোগের মাধ্যমে ভগবানকে আংশিক ভাবে জানা যায়। কিন্ত ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন -- “ভক্ত্যা মামভিজানাতি” অথাৎ ভক্তির দ্বারাই ভগবানকে পূর্ণরূপে জানা যায়। তাই ভক্তিযোগই হচ্ছে ভগবানকে লাভ করার -সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা।
-
নীচে ভক্তির নয়টি পন্থা অনুশীলন করে ভগবানকে লাভ করেছেন তাঁদের দৃষ্টান্ত দেওয়া হল --
১. শ্রবণ --- মহারাজ পরীক্ষিত কেবল শ্রবণের মাধ্যমে ভগবদ্ধাম লাভ করেন। তিনি শ্রীল শুকদেবের নিকট থেকে কেবলমাত্র ৭ (সাত) দিন শ্রীকৃষ্ণ মহিমা শ্রবণ করেছিলেন।
২. কীর্তন --- শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানকে লাভ করেন। তাঁর পিতা মহান ঋষি ব্যাসদেবের নিকট থেকে লব্দ অপ্রাকৃত সংবাদ- ভগবৎ গুন অবিকৃতভাবে কীর্তনের মাধ্যমে।
৩. স্মরণ --- মহারাজ প্রহ্লাদ ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত দেবর্ষি নারদ মুনির উপদেশ অনুসারে সর্বদা ভগবানকে স্মরণের মাধ্যমে পরম গতি প্রাপ্ত হন।
৪. বন্দনা --- কেবল স্তবের দ্বারা ভগবানের বন্দনা করার মাধ্যমে অক্রুর পরমপদ প্রাপ্ত হন।
৫. অর্চন --- (পূজা)- মহারাজ পৃথু কেবল ভগবানের পূজা করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সিদ্ধি প্রাপ্ত হন।
৬. পাদসেবন (সেবা) --- সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, লক্ষীদেবী কেবল একস্থানে উপবেশন করে শ্রী নারায়ণের পাদসেবা করে সাফল্য লাভ করেন।
৭. দাস্য (আজ্ঞা পালন) --- শ্রীরামচন্দ্রের সেবক মহাভক্ত হনুমান কেবল ভগবানের আজ্ঞা পালনের মাধ্যমে পরম গতি লাভ করেন।
৮. সখ্য ( ভগবানের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন) --- মহাবীর অর্জুন ভগবানের সঙ্গে সখ্যতা করার মাধ্যমে পূর্ণ সিদ্ধি অর্জন করেন। অত্যন্ত প্রীত হয়ে ভগবান অর্জুন ও অর্জুনের ভবিষ্যৎ অনুগামী মানুষদের জন্য ভগবদ্গীতার অমৃতময় জ্ঞান উপদেশ করেন।
৯. আত্মনিবেদন --- মহারাজ বলি তাঁর যথা সর্বস্ব এমনকি নিজ দেহটিকে ও ভগবানকে নিবেদনের মাধ্যমে পূর্ণ সাফল্য প্রাপ্ত হন।
অম্বরীষ মহারাজ উপরোক্ত নয়টি ভক্তির পন্থাই অনুশীলন করতেন এবং এভাবেই তিনিও পরমপদ প্রাপ্ত হন।মূলতঃ সকলের হৃদয়ে ভগবানের প্রতি ভক্তি গুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু জড় জাগতিক সঙ্গের প্রভাবে তা জড় কলুষের দ্বারা আবৃত হয়ে রয়েছে। এই জড় কলুষ থেকে আমাদের হৃদয়কে নির্মল করতে হবে। তাহলে সুপ্ত কৃষ্ণ ভক্তি জাগ্রত হবে। সেটিই হচ্ছে ভক্তিযোগের পূর্ণ পন্থা। ভক্তিযোগ অনুশীলন করতে হলে সদ্গুরুর তত্তাবধানে কতগুলো বিধিনিষেধ পালন করতে হবে। যেমন - সূর্য উদয়ের পূর্বে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে আরতি করা, হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করা। ফুল তুলে ভগবানের শ্রীচরণে নিবেদন করা, ভোগ রান্না করে তা ভগবানকে নিবেদন করা, ভক্ত সঙ্গ করা, নিরন্তর শুদ্ধ ভক্তের কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবন করা, এই ভক্তিযোগ অনুশীলন করলে আমাদের হৃদয়ের কলুষতা দূরীভূত হয়। আমরা কৃষ্ণ ভক্তির স্তরে উন্নীত হতে পারি। তাই সদ্গুরুর তত্ত্বাবধানে বিধিবদ্ধ ভাবে ভক্তিযোগ অবলম্বন করলে অবশ্যই কৃষ্ণ ভক্তি লাভ করা যায়।

Written by : Prithwish Ghosh
Share:

১২ এপ্রিল ২০১৫

ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য -পর্ব ০৪

ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের প্রকারভেদ দেখানো হল মহাবিশ্বের ব বিশ্বব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ ২ ভাবে হয়
১) বিশ্বব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ
২) ব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ

বিশ্বব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ আবার ২ ভাবে হয়
ক) ব্রহ্মান্ডের আয়তনের সম্প্রসারণ
খ) বিশ্বব্রহ্মান্ডের আবরনের সম্প্রসারণ এখা
নে ব্রহ্মান্ডের আয়তনের সম্প্রসারণ থেকে মহাশূন্যে ব্রহ্মান্ডপুঞ্জ বা ছায়াপথের সম্প্রসারণ হয় ।

আবার ব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ ২ ভাবে হয়
১) বিশ্বব্রহ্মান্ডের গোলকের সম্প্রসারণ এখানে বিশ্বব্রহ্মান্ডের গোলকের সম্প্রসারণ থেকে ব্রহ্মান্ডের ভিতরে গ্রহ নক্ষত্রের সম্প্রসারণ
২) বিশ্বব্রহ্মান্ডের আবরণের সম্প্রসারণ

আমরা আজকে আলোচনা করব ব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ ব্রহ্মান্ডের সম্প্রসারণ (Expansion of Universe)

১) ব্রহ্মান্ডের গোলকের সম্প্রসারণ ব্রহ্মান্ডগুলি কারণ সমুদ্রের জলে বুদবুদের আকারে সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে এই বুদবুদের মধ্যে ভগবানের একটি শক্তি প্রবেশ করে, ইহার নাম গর্ভোদক শক্তি, বুদবুদ রূপ ব্রহ্মান্ডের মধ্যে যখন শক্তি প্রবেশ করে তখন ব্রহ্মান্ড সম্প্রসারিত হয়ে নিজস্ব আকার ধারণ করে । এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া কারণ সমুদ্রে হয় এবং এর জন্য্ কোটি কোটি বছর সময় লাগে । ব্রহ্মান্ডের ভিতরে গ্রহ নক্ষত্রের সম্প্রসারণ (Expansion of Planets in Universe) প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে একটি করে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয় । প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের আয়তন ভিন্ন রকমের যেমন আমরা যে ব্রহ্মান্ডে বাস করি এর মধ্যের আয়তন ৫০ কোটি যোজন বা ৪০০ কোটি মাইল । এভাবে প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে নির্দিষ্ট আয়তনের ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয় । এই নির্দিষ্ট জায়গা সৃষ্টির জন্য বুদবুদ বা ব্রহ্মান্ডগুলির সম্প্রসারণ হতে হয় । প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের মধ্যে অসংখ্য গ্রহ, নক্ষত্র তৈরী হয় সেগুলি সম্প্রসারিত হয়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থান নেয়, এভাবে ব্রহ্মান্ডের ভিতরে সম্প্রসারণ ঘটে থাকে ।

২) ব্রহ্মান্ডের আবরণের সম্প্রসারণ ( Expansion of the covering of Universe) আমি ব্রহ্মান্ড আলোচনা পর্বে ব্রহ্মান্ডের আবরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি । প্রতিটি ব্রহ্মান্ড গোলক ৭ টি আবরণ দ্বারা আবৃত, প্রতিটি আবরণ পূর্বটি অপেক্ষা ১০ গুণ অধিক চওড়া ।

ব্রহ্মান্ডের আবরণের বর্ণনা তদন্ডং বিশেষাখ্যং ক্রমবৃদ্ধৈর্দশোত্তরৈঃ ।
তোয়াদিভিঃ পরিবৃতং প্রধানেনাবৃতৈর্বহিঃ যত্রলোকবিতানোহয়ং রূপং ভগবতো হরেঃ (ভাগবত ৩/২৬/৫২)

অনুবাদ
এই ব্রহ্মান্ডকে বলা হয় জড়া প্রকৃতির প্রকাশ তাহাতে জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, অহংকার এবং মহত্তত্ত্বের যে আবরণ রহিয়াছে, তাহা ক্রমান্বয়ে পূর্বটির থেকে পরবর্তী আবরণটি দশ গুণ অধিক এবং তাহার শেষ আবরণটি হইতেছে প্রধানের আবরণ । এই ব্রহ্মান্ডে ভগবানের বিরাটরূপ বিরাজ করিতেছে, যাহার দেহের একটি অংশ হইতেছে চতুর্দশ ভুবন ।

এই শ্লোকে ব্রহ্মান্ডের ৭ টি আবরণের নাম ও কোনটি কি পদার্থ দ্বারা তৈরী সেটা বর্ণনা করা হয়েছে ।

এভাবে ব্রহ্মান্ডের আবরণগুলি প্রথম আবরণ থেকে ৭ম আবরণ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত হতে থাকে । এই সম্প্রসারণের জন্য লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে । এখানে প্রথম ৪ টি আবরণ জল, আগুন, বায়ু, আকাশ এগুলি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা আছে কিন্তু পরের অহংকার, মহতত্ত্ব, প্রধান এই তিনটি আবরণ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের কোন ধারনা নাই, বিজ্ঞানীরা আকাশ বা ইথারকে সবচেয়ে সূক্ষ্ম পদার্থ হিসাবে বিবেচনা করছে । কিন্তু ভাগবত বলছে আরো সূক্ষ্মতম পদার্থ রয়েছে যেমন অহংকার, মহতত্ত্ব ও প্রধান । এগুলি এতো সূক্ষ্ম যে সাধারন বিজ্ঞান দিয়ে এগুলি উপলব্ধি করা যায় না । সেজন্য আকাশ, অহংকার, মহতত্ত্ব, প্রধানকে সাধারন বিবেচনায় শূন্যস্থান বলা যেতে পারে ।

আমাদের ব্রহ্মান্ডের আবরনের পর শূন্যস্থানের পরিমাণ

আকাশ = ১০০০০ X যোজন অহংকার = ১০০০০০ X যোজন মহতত্ত্ব = ১০০০০০০ X যোজন প্রধান = ১০০০০০০০ X যোজন মোট = ১১১১০০০০X যোজন বা ১১১১০০০০ × ৫০ কোটি যোজন [আমাদের ব্রহ্মান্ডের ব্যাস = ৫০ কোটি যোজন] বা ১১১১০০০০ × ৫০ × ৮ কোটি মাইল [১ যোজন=৮ মাইল] বা ৬৮২৫ আলোকবর্ষ (মোটামুটি)

সুতরাং বলা যেতে পারে আমাদের ব্রহ্মান্ডের আবরণের পর শূন্যস্থানের পরিমাণ প্রায় ৬৮২৫ আলোক বর্ষ । এ হিসাব থেকে বলা যেতে পারে বিজ্ঞানীরা দুটি ব্রহ্মান্ড বা নীহারিকার মধ্যবর্তী যে বিশাল ফাঁকা জায়গা দেখতে পাচ্ছেন সেই ফাঁকা জায়গায় উৎস এই বিষয়টি, এভাবে ব্রহ্মান্ডের আবরণগুলি যখন সম্প্রসারিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্রহ্মান্ডের রূপ ধারণ করে তখন ব্রহ্মান্ডগুলি কারণ সমুদ্রে ভাসতে থাকে । অর্থাৎ ব্রহ্মান্ডগুলি পানির তুলনায় হালকা হয়ে যায় এবং ইহা মহাশূন্যে ভাসমান হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে । পরবর্তী পোষ্টে বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করা হবে ।


বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ (Expansion of whole Universe)

১) বিশ্বব্রহ্মান্ডের আয়তনের সম্প্রসারণ
ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে চিন্ময় জগতের নীচে জড় জগত বা মহাবিশ্ব অবস্থিত । যখন জড় জগত সৃষ্টির সময় হয় তখন কৃষ্ণ গোলক বৃন্দাবন থেকে সৃষ্টির পরিকল্পনা করেন । সেজন্য চিন্ময় জগতের নীচে একটি গোলাকার বল তৈরী হয়, ইহা মহাবিশ্বের গোলক । এ গোলক কোটি কোটি বছর ধরে সম্প্রসারিত হয়ে মহাবিশ্বের গোলকে পরিণত হয়, এর মধ্যে অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয় ।

২) মহাশূন্যে ব্রহ্মান্ডপুঞ্জ বা ছায়া পথের সম্প্রসারণ ( Expansion of Universe in the space of Universal globe)

ব্রহ্মান্ডপুঞ্জের সম্প্রসারণ ( Expansion of Milky Way)
আমরা আগের আলোচনা দেখেছি ব্রহ্মান্ডগুলি কারণ সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় অবস্থান করছে অর্থাৎ ব্রহ্মান্ডগুলি পানির থেকে হালকা রূপ ধারণ করে । এ অবস্থায় ব্রহ্মান্ডগুলি কারণ সমুদ্রের জলে ঝাঁকে ঝাঁকে অবস্থান করে অর্থাৎ এক জায়গায় অনেকগুলো ব্রহ্মান্ড আঙ্গুর ফলের মতো থোকা বাধিঁয়া থাকে । যখন কারণ সমুদ্রে অবস্থিত মহাবিষ্ণু শ্বাস ত্যাগ করেন তখন সবগুলি ব্রহ্মান্ড কারণ সমুদ্রে থেকে উথিত হতে শুরু করে মহাশূন্যে নিজেদের অবস্থান দখল করে এই ব্রহ্মান্ডপুঞ্জকে বিজ্ঞানীরা ছায়াপথ বা Milky Way বলছেন ।

ভাগবত অনুসারে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে = ১৫৫৫২০১৯৬০৮৫৩০৯৮ বছর আগে ।

ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে মহাবিশ্বের আয়ু = ৩১১০৪০০০০০০০০০০০ বছর বা ৩১১০৪০০০ কোটি বছর । এ সময়ের পর মহাবিশ্ব সর্বতভাবে ধ্বংশ হয়ে যাবে একে মহাপ্রলয় বলে । মহাবিশ্বের আয়ু ২ টি পর্বে বিভক্ত ১ম অর্ধ এবং ২য় অর্ধ, প্রথম অর্ধ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে আমরা এখন ২য় অর্ধে বসবাস করছি ।

এ বিষয়টি গত ২৩/১০/২০০২ ইং তারিখে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । খবরে উল্লেখ করা হয়েছে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি অধ্যাপক আন্দ্রেই লিনদ ও তাঁহার স্ত্রী রেনেটা কালোশ বলেছেন, এতোদিন ধারনা করা হতো মহাবিশ্ব বয়সে তরুণ কিন্তু সেটা সঠিক নয় । তারা উল্লেখ করেছেন মহাবিশ্ব মাঝ বয়স অতিক্রম করিয়াছে । তারা আরো বলেছেন যেমনটি ধারনা করা হতো তার আরও আগে মহাবিশ্ব ধ্বংশ হয়ে যাবে । তাদের এই ধারণা ভাগবতের আলোকে সঠিক । ভাগবতে আরো বর্ননা করা হয়েছে মহাবিশ্বের জীবনীতে দিনের সংখ্যা ৩৬০০০ । বর্তমান আমরা ১৮০০১ তম দিবসে বসবাস করছি । মহাবিশ্বেরর ১ দিন সমান আমাদের ৪৩২ কোটি বছর । মহাবিশ্বের জীবনী দুইটি পর্বে বিভক্তঃ প্রথম অর্ধ এবং ২য় অর্ধ, দুইটি পর্বের মিলনকে বলা হয় জীবনী সন্ধি বা ক্রান্তিলগ্ন বর্তমানে আমরা ক্রান্তিলগ্নে বসবাস করছি ।

ব্রহ্মার শতবর্ষ আয়ু দুই ভাগে বিভক্ত
যদর্ধমায়ুস্তস্য পরার্ধমভিধীয়তে ।
পূর্বঃ পরার্ধোহপক্রান্তো হ্যপরোহদ্য প্রবর্ততে ।। (ভাগবত ৩/১১/৩৪)
অনুবাদ
ব্রহ্মার শতবর্ষ আয়ু দুভাগে বিভক্ত । তাঁহারা আয়ুর প্রথম অর্ধভাগ ইতিমধ্যেই গত হইয়াছে এবং দ্বিতীয়ার্ধ এখন চলিতেছে ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মার আয়ু ১০০ বছর ইহা দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম অর্ধ ইতিমধ্যে গত হয়েছে (অর্থাৎ ব্রহ্মার বয়স এখন ৫০ বছরের চেয়ে বেশি), এখন দ্বিতীয় অর্ধ চলছে । ব্রহ্মার আয়ুর ১ দিনকে মহাবিশ্বের ১ দিন হিসাবে ধরা হয় যাহা ৪৩২ কোটি বছর । অর্থাৎ ব্রহ্মার ১২ ঘন্টা = এই পৃথিবীর ৪৩২ কোটি বছরের সমান । এ হিসেবে ব্রহ্মা ১০০ বছর বাঁচে যা ৩১১০৪০০০,০০০০০০০০ বছরের সমান । ব্রহ্মার বয়সকে মহাবিশ্বের বয়স হিসেবে বিবেচনা করা হয় ।

পরবর্তী পোষ্টে বিগ ক্রাঞ্চ বা মহাসংকোচন নিয়ে আলোচনা করা হবে । এখানে আরেকটি পয়েন্ট আলোচনা করা হয় নাই তা হলো ‘বিশ্বব্রহ্মান্ডের গোলকের আবরণের সম্প্রসারণ’ এটা বিগ ক্রাঞ্চের পর আলোচনা করা হবে ।


মহাসংকোচন (Big Crunch)

ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে, মহাবিশ্বের জীবনের প্রথম অর্ধ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সম্প্রারণ হতে থাকে । এর পর শুরু হয় ক্রান্তিলগ্ন এ সময় মহাবিশ্বকে মোটামুটি স্থির বলা যায় । এর পর মহাবিশ্বের সংকোচন শুরু হয় যা দ্বিতীয় অর্ধ পর্যন্ত চলে । যদিও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে ১৫৫৫২০১৯৬০৮৫৩০৯৮ বছর আগে কিন্তু প্রথম দিকে অত্যন্ত দ্রুত বেগে সম্প্রসারন হয়েছে এর পর সম্প্রসারনের হার ধীরে ধীরে কমতে কমতে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়, তাকে ক্রান্তিলগ্ন বলে । বর্তমানে আমরা ক্রান্তিলগ্নে অবস্থান করছি অর্থাৎ মহাবিশ্বের সম্প্রসারন শেষ পর্যায়ে পৌছিয়ে, কিছুদিন পর ধীরে ধীরে সংকোচন শুরু হবে যা ১৫৫৫১৯৮০৩৯১৪৬৯০২ বছর ধরে চলবে । এই সময়ের পর মহাসংকোচনের মাধ্যমে সমস্ত ব্রহ্মান্ড কারণ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে একে বলা হয় মহাপ্রলয় বা মহাসংকোচন । বিজ্ঞানীরা একে Big Crunch (বিগ ক্রাঞ্চ) বলে ।

মহাপ্রলয়ের পর মহাবিশ্বের গোলক ৩১১,০৪০০০০,০০০০০০০০ বছর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে, একে মহাবিশ্বের মৃত অববসস্থা বলে । বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের এই অন্ধকার অবস্থাকে কৃষ্ণগহব (Black Hole) বলে । মহাবিশ্ব ৩১১,০৪০০০০,০০০০০০০০ বছর মৃত অবস্থায় থাকবার পর আবার জীবিত হয় অর্থাৎ পুণরায় মহাবিশ্বের সৃষ্টি শুরু হয় । মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর ৩১১,০৪০০০০,০০০০০০০০ বছর অবস্থান করে আবার ধ্বংশ প্রাপ্ত হয়, ধ্বংস অবস্থার পর আবার সৃষ্টি হয় । এ ভাবে এ জড়জগতের সৃষ্টি, অবস্থান ও ধ্বংস শাশ্বত নিয়মে চলছেে এক অর্থে এর কোন শুরু বা শেষ নাই ।

কারণ সমুদ্র

বিজ্ঞানীদের ধারনা এই মহাবিশ্ব একসময় কৃষ্ণ গহবরে বিলীন হয়ে যাবে, একে তারা বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) বলে । ভাগবতে উল্লেখিত কারণ সমুদ্রকে বিজ্ঞানীদের কৃষ্ণ গহবরের সাথে তুলনা করা যায় । কেননা এই মহাবিশ্ব এক সময় কারণ সমুদ্রে ধ্বংস হয়ে যাবে । সুতরাং সিধান্ত করা যায়, ভাগবতের কারণ সমুদ্রকে বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণ গহবর হিসেবে মনে করছেন ।

বিশ্বব্রহ্মান্ড কারণ সমুদ্রে অবস্থিত মহাবিষ্ণুতে বিলীন হওয়াকে বিজ্ঞানীরা Big Crunch (বিগ ক্রাঞ্চ) বলেন।

স এষ আদ্যঃ পুরুষঃ কল্পে কল্পে সৃজত্যজঃ ।
আত্মাত্মন্যাত্মনাত্মানং স সংযচ্ছিতি পাতি চ ।। (ভাগবত ২/৬/৩৯)
অনুবাদ
সেই আদিপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মরহিত হওয়া সত্ত্বেও প্রথম অবতার মহাবিষ্ণু রূপে নিজেকে বিস্তার করিয়া এই ব্যক্ত জগতের সৃষ্টি করেন । তাঁহার মধ্যেই অবশ্য সৃষ্টি প্রকাশিত হয় এবং জড় পদার্থ ও জড় অভিব্যক্তি সবই তিনি স্বয়ং । কিছুকালের জন্য তিনি তাহাদের পালন করেন এবং তারপর তিনি পুনরায় তাহাদের আত্মসাৎ করিয়া নেন ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে মহাবিষ্ণু থেকে জগতসমূহ সৃষ্টি হচ্ছে, তিনি কিছুদিন পালন করেন তারপর আবার মহাবিশ্ব আত্মসাৎ কর নেন । মহাবিশ্বের আত্মসাৎ হওয়াকে বিজ্ঞানীরা Big Crunch (বিগ ক্রাঞ্চ) বলে থাকেন ।

জড় জগতের সৃষ্টি ও ধ্বংস চক্রকারে চলছে
সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্ ।
কল্পক্ষয়ে পুনস্তানৌ কল্পানি কল্পাদৌ বিসৃাম্যহম্ ।।
প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুণঃ পুণঃ ।
ভুতগ্রামমিমং কৃৎস্নমবশং প্রকৃতের্বশাৎ ।। (গীতা ৯/৭-৮)
অনুবাদ
কল্পান্তে সম্পূর্ণ সৃষ্টি, যথা জড় জগত এবং প্র্রকৃতিতে ক্লেশ প্রাপ্ত জীব আমার দিব্য দেহে লয় প্রাপ্ত হয় এবং নতুন কল্পের আরম্ভে আমার ইচ্ছার প্রভাবে তাহারা পুণরায় প্রকাশিত হয় । এভাবে প্রকৃতি আমার নিয়ন্ত্রনে পরিচালিত হয় । আমার ইচছার প্রভাবে তা পুণঃপুণঃ প্রকট হয় এবং লয় হয় ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে এ জগত পুনঃপুনঃ সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে ।

জড় জগত শাশ্বত
যথেদানীং তথাগ্র্রে চ পশ্চাদপ্যেতদীদৃশম্ (ভাগবত ৩/১০/১৩)
অনুবাদ
এ জড় সৃষ্টি এখন যেমন আছে, পূবেও তেমনই ছিল এবং ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে ।

এ শ্লোকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, এই জগত শাশ্বত এখন আছে অতীতে ছিল এবং ভবিষ্যতে থাকবে ।

ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হবে যখন ব্রহ্মান্ডগুলি স্ব স্ব স্থান দখল করবে তখন সম্প্রসারন বন্ধ হয়ে যায় এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারন অসীম পর্যায়ে হয় না, কারন মহাবিশ্ব একটি গোলকের মধ্যে অবস্থিত এবং এর আবরন রয়েছে ।

পরবর্তী পোষ্টে বিশ্বব্রহ্মান্ডের গোলকের আবরণের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করা হবে ।

বিশ্বব্রহ্মান্ডের গোলকের আবরণের সম্প্রসারণ (Expansion of the Layer of Whole Universal Globe)

প্রতিটি ব্রহ্মান্ড একটি গোলকের মধ্যে অবস্থিত এবং আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে । এর আবরণগুলি সম্প্রসারণ হয় ঠিক সেরকম এই বিশ্বব্রহ্মান্ড একটি গোলকের মধ্যে অবস্থিত, এই গোলকের মধ্যে অনন্তকোটি ব্রহ্মান্ড অবস্থিত তা হলে বিবেচনা করতে হবে মহাবিশ্বের গোলক কত বড় । এ বিষয়টি আমি পূর্বে আলোচনা করে প্রমান করেছি মহাবিশ্বের আয়তন অসীম । এ বিষয়টি সঠিক, আবার মহাবিশ্বের আয়তন অসীম নয় এটাও সঠিক ।

মহাবিশ্বের গোলকের ৭ টি আবরনের বর্ণনা
নভো দদাতি শ্বসতাং পদং যন্নিয়মাদদঃ
লোকং স্বদেহং তনুতে মহান্ সপ্তভিরাবৃতম্ ।। (ভাগবত ৩/২৯/৪৩)
অনুবাদ
পরমেশ্বর ভগবান নিয়ন্ত্রনে আকাশ অন্তরীক্ষে বিভিন্ন গ্রহদের স্থান প্রদান করে, যেখানে অসংখ্য প্রাণী বাস করে । তাঁহার পরম নিয়ন্ত্রনে সমগ্র ব্রহ্মান্ডের বিরাট শরীর সপ্ত আবরণসহ বিস্তৃত বিশ্বব্রহ্মান্ডের আবরণের ধারনা হয় ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে সমগ্র ব্রহ্মান্ডের অসংখ্য গ্রহে অসংখ্য প্রাণী বাস করে এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের ৭ টি আবরণ আছে ।

আগে আমরা আলোচনা থেকে দেখেছি, ব্রহ্মান্ডের আবরণ এর ব্যাসের প্রায় ১ কোটি ১১ লক্ষ গুণ চওড়া ঠিক সেরকম মহাবিশ্বের গোলকের আবরণ এর ব্যাসের ১ কোটি ১১ লক্ষ গুণ চওড়া এবং এ আবরণগুলি স্তরে স্তরে সম্প্রসারিত হয়, যার জন্য লক্ষ কোটি বছর সময় লাগে ।

ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে যদি কেউ মনের বেগে কোটি কোটি বছর ধরে বিশ্বব্রহ্মান্ডের আবরণ ভেদ করতে চাই, তা হলে তাহার পক্ষে সম্ভব নয় । আধুনিক বিজ্ঞানীরা আলোর গতিকে সবচেয়ে দ্রুতগামী হিসাবে আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু বৈদিক শাস্ত্র আলোর গতির চেয়ে দ্রুতগামী রথ বা মহাশূন্য যান তৈরী করতে পারতেন যেগুলি মনের গতিতে চলে ।

আলোর চেয়ে দ্রুতগামী মহাশূন্য যান সৃষ্টি
যো বামশ্বিনা মনসো জবীয়ান্রথঃ স্বশো বিশ আজিগতি ।
যেন গচ্ছথঃ সুকৃতো দূরোণং তেন নরা বতিরস্মভ্যং যাতৃম ।। (ঋকবেদ ১/১১৭/২)
অনুবাদ
হে অশ্বিদ্বয় ! তোমাদের মনের অপেক্ষাও বেগবান ও শোভনীয় যে অশ্বযুক্ত রথ সম প্রজাবর্গের সম্মূখে গমন করে এবং যে রথে তোমরা শুভ কর্মা লোকের গৃহে গমন কর, হে নুতুদ্বয় ! সে রথে আমাদের গৃহে এস ।
ঋক বেদের এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, মনের গতির মত গতি সম্পন্ন মহাশূন্য যান তৈরী সম্ভব ।

আইনষ্টাইন-এর বিখ্যাত সমীকরণ E = mc²
এ সূত্র অনুসারে কোন বস্তুর গতি যদি আলোর গতির সমান হয়, তবে ঐ বস্তুর ভর অসীম হবে, অসীম ভরের বস্তুর জন্য অসীম শক্তির প্রয়োজন সেটা সম্ভব নয়, তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা আলোকের চেয়ে দ্রুত কোন কিছুর গতি হতে পারে না কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রে এ জগত ভিন্ন আর একটি জগতের বর্ণনা আছে, সে জগতের নাম চিন্ময় জগত বা বিপরীত জগত । আমি আলোচনা করেছি বিপরীত জগত আমাদের জগতের নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, সেখানকার নীতিমালা আলাদা সেজন্য আমাদের জগতে যা সম্ভব নয় তা চিন্ময় জগতে সম্ভব হতে পারে ।

আমরা বিশ্বব্রহ্মান্ডের এ সকল আলোচনা থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছি বুদবুদ তত্ত্বের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে । এর পর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটেছে এবং পরিশেষে মহাসংকোচন (Big Crunch) এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের ধ্বংস হবে । সুতরাং বুদবুদ তত্ত্ব (Bubble Theory) এবং মহাসংকোচন (Big Crunch) এ দুটি তত্ত্ব মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও ধ্বংসের জন্য প্রযোজ্য ।

এ তত্ত্বগুলি ব্রহ্মান্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় । প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে একটি করে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয় মহাবিষ্ফোরণ (Big Bang) তত্ত্বের মাধ্যমে যা পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে । বিজ্ঞানীরা ব্রহ্মান্ড এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের মধ্যে সুষ্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেন নাই সেজন্য তাঁরা সকল তত্ত্বকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রণালী হিসাবে বর্ণনা করবার চেষ্টা করছেন এর ফলে তত্ত্বগুলি পরস্পর বিরোধী হিসেবে দেখা দিচ্ছে কিন্তু ভাগবত সে সমস্যার সমাধান করে সবগুলি তত্ত্বের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করেছে, যা বিজ্ঞানী হকিং এর আকুল আবেদন ।

বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্ব আলোচনার সারাংশ (A Brief Discussion about Whole Universe)

১) মহাবিশ্ব একটি যা গোলাকার আবরণ দ্বারা আবৃত ।

২) মহাবিশ্বের গোলকের অর্ধেক চিন্ময়জল বা বিপরীত পদার্থ দ্বারা পূর্ণ, এর নাম কারণ সমুদ্র ।

৩) মহাবিশ্বর আয়তন অচিন্ত্য অর্থাৎ একটি বিচারে অসীম এবং অন্য বিচারে অসীম নয় ।

৪) কারণ সমুদ্রে বুদবুদের আকারে ব্রহ্মান্ডগুলি সৃষ্টি হয়েছে, একে বিজ্ঞানীরা বুদবুদ তত্ত্ব বলে ।

৫) প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে গর্ভোদকশক্তি প্রবেশ করে একে পূর্ণাঙ্গ ব্রহ্মান্ডে প্রকাশ করে ।

৬) গর্ভোদক শক্তি দুই ভাগে বিভক্ত হয় অনন্ত শক্তি ও পরমাণু শক্তি ।

৭) অনন্ত শক্তির দ্বারা গ্রহ নক্ষত্র মহাশূন্য ভাসমান থাকে এবং নিজস্ব কক্ষপথে ভ্রমণ করে । অনন্তশক্তির অপর নাম সংকর্ষশক্তি । এ নামের সাথে বিজ্ঞানীদের মাধ্যাকর্ষণ নামের মিল আছে ।

৮) পরমাণুশক্তি পরমাণুতে প্রবেশ করে পরমাণুর গঠন ঠিক রাখে এবং পরমাণুকে কার্যশীল করে ।

৯) মহাবিশ্বের সম্প্রসারন ৮ টি ধাপে সম্পূর্ণ হয় ।

১০) কারণ সমুদ্রে বুদবুদের মাধ্যমে ১৫৫৫২০১৯৬০৮৫৩০৯৮ বছর আগে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে, একে বিজ্ঞানীরা বুদবুদ তত্ত্ব বলে ।

১১) মহাসংকোচনের মাধ্যমে ১৫৫৫২০১৯৬০৮৫৩০৯৮ বছর পর মহাবিশ্ব ধ্বংশ হবে একে মহহাপ্রলয় বা বিগ ক্রাঞ্চ বলে ।

১২) বুদবুদ তত্ত্ব (Bubble Theory) এবং মহাসংকোচন তত্ত্ব (Big Crunch Theory) দুইটি বিশ্বব্রহ্মান্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিন্তু ব্রহ্মান্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নহে ।

১৩) আলোর গতির চেয়ে দ্রুতগামী মহাশূন্য যান বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণিত আছে যেটা মনের গতিতে চলে ।

১৪) কারণ সমুদ্রকে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বড় ব্লাকহোল (Black Hole) মনে করছেন যাহাতে এই মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে ।

১৫) মহাবিশ্ব ধ্বংসের পর মহাবিশ্বের গোলকের উপরের অর্ধেক ফাঁকা জায়গা অন্ধকারে পরিণত হয় একে কৃষ্ণ গহবর (Black Hole) বলা যেতে পারে ।

পরবর্তী পোষ্টে ভাগবতের আলোকে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি রহস্য আলোচনা করা হবে । (চলবে……..
Written by shusanta banda

Share:

ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য -পর্ব ০৩

মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদিতে সমস্ত পদার্থ গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভি নামক একটি বিন্দুতে ঘনীভূত ছিল,এই পদার্থের নাম ‘প্রধান’।ইহা চিন্ময় পদার্থ বা বিপরীত পদার্থ বা বিজ্ঞানের ভাষায় এন্টিকার্ক দ্বারা তৈরী পদার্থ বলা যাইতে পারে।বিজ্ঞানীরা বলেছেন বিপরীত কণিকা দিয়ে গঠিত পদার্থের বা মহাবিশ্বের আচরণ আমাদের মহাবিশ্বের চাইতে পৃথক হবে।আমি যে‘প্রধান’নামক বিপরীত পদার্থের উল্লেখ করেছি,তা আমাদের বৈজ্ঞানিক কোন নীতিমালা মানবে না,চিন্ময় পদার্থ চিন্ময় জগতের ভিন্ন নীতিমালা মানিয়া চলবে,কিন্তু বিজ্ঞানীরা সেই জগতের নীতিমালা জানে না।‘প্রধান’নামক এই বিপরীত পদার্থ থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে,‘প্রধান’যেহেতু এই জগতের কোন নীতিমালা মেনে চলে না সেজন্য বিজ্ঞানীরা বলছেন সৃষ্টির আদিতে সমস্ত বৈজ্ঞানিক বিধিগুলি ভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল।সৃষ্টির শুরুতে বৈজ্ঞানিক বিধিগুলি ভঙ্গ হওয়ার কারন হইল‘প্রধান’নামক যে চিন্ময় পদার্থ থেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে,তা এ জগতের কোন নীতিমালা মেনে চলে না।

‘প্রধান’ চিন্ময় বা বিপরীত পদার্থ।ইহা এই জড় মহাবিশ্বের কোন নীতি মেনে চলে না।সেজন্য ‘প্রধান’-এর আয়তন আমাদের মহাবিশ্বের কোন পদ্ধতির দ্বারা মাপা সম্ভব নয়,‘প্রধান’আমাদের কাছে অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত,এর আয়তন আমাদের জগতের নীতিতে শূন্য হবে।এজন্য বিজ্ঞানীরা বলছেন মহাবিশ্বের আয়তন সৃষ্টির শুরুতে শূন্য ছিল।প্রকৃত বিচারে ‘প্রধান’ কোন শূন্য পদার্থ নয় ইহা বিপরীত পদার্থ সেই জন্য ইহাকে সাধারণ পদ্ধতিতে মাপা সম্ভব নয়।

মানুষের শরীরটি জড় পদার্থ অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের পদার্থ,মানুষের মধ্যে যে আত্মা আছে তাকে বলা হয় চিন্ময় পদার্থ অর্থাৎ বিপরীত পদার্থ।এই চিন্ময় আত্মার প্রভাব আমরা অনুভব করিতে পারি কিন্তু যদি আমরা আত্মাকে আমাদের পদ্ধতি দ্বারা মাপতে চাই তবে সেটা সম্ভব নয়।তখন আমরা বলিব আত্মার কোন আয়তন নাই বা আয়তন শূন্য কিন্তু বৈদিক শাস্ত্র চিন্ময় জগতের নীতমালার সাথে পরিচিত,সেজন্য ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে আত্মার আয়তন একটি চুলের অগ্র্রভাগের দশ হাজার ভাগের একভাগ।

আত্মার আয়তন সম্বন্ধে বেদে বলা হয়েছে

বালাগ্রশতভাগস্য শতধা কল্পিতস্য চ।
ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেয়ঃ স চানন্ত্যায় কল্পতে॥(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৫/৯)

অনুবাদ
কেশাগ্রকে শতভাগে ভাগ করিয়া তাহাকে আবার শতভাগে ভাগ করিলে তাহার যে আয়তন হয়,আত্মার আয়তনও ততখানি।

কেশাগ্রশতভাগস্য শতাংশঃসদৃশাত্নকঃ।
জীবঃ সূক্ষস্বরূপপোহয়ং সংখ্যাতীতো হি চিৎকণঃ॥(ভাগবত)

অনুবাদ
অসংখ্য যে চিৎকণা (আত্মা) রহিয়াছে,তাহার আয়তন কেশাগ্রের দশ সহস্র ভাগের এক ভাগের সমান ।একটি কেশাগ্রের দশ সহস্রভাগের একভাগ অর্থাৎ একটি চুলের দশ হাজার ভাগের একভাগ অর্থাৎ আত্মা অত্যন্ত ক্ষুদ্র শক্তি কণিকা যা ভগবানের অংশ।সুতরাং দেখা যাচ্ছে আত্মার আয়তন আছে,কিন্তু সেটা আমাদের এই জগতের কোন পদ্ধতি দ্বারা মাপা সম্ভব নয়।ঠিক সেরকম প্রধানের আয়তন আছে,কিন্তু সেটা বৈজ্ঞানিকেরা এই জগতের পদ্ধতি দ্বারা মাপতে পারে না।সেজন্য তারা বলছে সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের আয়তন শূন্য ছিল।কিন্তু প্রকৃতি বিচারে মহাবিশ্বের আয়তন শূন্য ছিল না।

আমাদের এই শরীরটি জড় পদার্থ যতক্ষন এর মধ্যে আত্মা থাকে, ততক্ষণ ইহা জীবিত থাকে । যখন আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যায়, তখন দেহ প্রানহীন জড় পদার্থে পরিণত হয় । আমাদের এই জড় শরীর সৃষ্টির জন্য চিন্ময় আত্মা দায়ী অর্থাৎ চিন্ময় বস্তুর প্রভাবে জড় পদার্থ সৃষ্টি হয় । মানব দেহ বিশ্লেষণ করলে মাটি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ (ইথার) পাওয়া যাবে । কিন্তু এই বস্তুগুলির সমন্বয় ঘটাইয়া মানব শরীর সৃষ্টি সম্ভব নয় কারণ এগুলো সকলেই জড় বা প্রাণহীন ইহাদের জীবন্ত কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা নাই । আম গাছে যতক্ষন আত্মা থাকে ততক্ষন ইহা আম তৈরী করতে পারে কিন্তু যখন আত্মা থাকে না তখন গাছ মৃত জড় পদার্থে পরিণত হয়, সেই কাঠ দ্বারা টেবিল বানানো যেতে পারে কিন্তু টেবিল থেকে আম গাছ বানানো সম্ভব নয় ।

সুতরাং জড় কোন বস্তুর সৃষ্টির পেছনে চিন্ময় আত্মার প্রভাব থাকতে হবে, চিন্ময় বস্তুর প্রভাব ছাড়া কোন কিছু সৃষ্টি সম্ভব নয় । আমাদের এই মহাবিশ্ব জড় বা প্রাণহীন এই জড় পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে চিন্ময় বস্তুর প্রভাবে । ভাগবতে সেই পদার্থের নাম ‘প্রধান’ বলে উল্লেখ করেছে । চিন্ময় বস্তু থেকে যখন কোন জড় বস্তু সৃষ্টি হয় তখন একটি মাধ্যম প্রয়োজন হয় যেমন – আম তৈরীর জন্য আত্মার মাধ্যম হহল আমগাছ । মানব শরীর তৈরীর জন্য আত্মার মাধ্যম হল মানুষ, ঠিক সে রকম চিন্ময় বস্তু প্রধান হতে জড় বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন, সেই মাধ্যম হল অগ্নিদেব বা আগুন বা তাপমাত্রা মাধ্যম যেহেতু জড় অর্থাৎ এই জগতের বস্তু সেজন্য সেটাকে মাপা সম্ভব । ‘প্রধান’-এর উপর যখন তাপমাত্রা ক্রিয়া করে তখন এর পরিমান ছিল অসীম বা অনন্ত । বিজ্ঞানীরা সেটা বলেছেন সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের আয়তন ছিল শূন্য এবং তাপমাত্রা ছিল অসীম । প্রধানের উপর যখন অসীম তাপমাত্রা ক্রিয়া করে তখন প্রধান ক্ষোভিত বা বিস্ফোরিত হয়ে মহতত্ত্ব নামক জড় পদার্থের সৃষ্টি করে । পরবর্তীতে এই মহতত্ত্ব থেকে বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি হয় ।এই বিস্ফোরণকে বিজ্ঞানীরা হট বিগ ব্যাঙ্গ (Hot Big Bang) বা উত্তপ্ত মহাবিস্ফোরণ বলে । এর নাম বিগব্যাঙ্গ থিওরী (Big Bang Theory) । পরবর্তীতে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ।
চিন্ময় জগত সম্বন্ধে আলোচনার সারাংশ (A
brief discussion about spiritual
World)
১। আমরা যে জগতে বাস করি তা ছাড়া আরো একটি জগত আছে এর নাম চিন্ময় জগত ।
২। চিন্ময় জগত জড় জগতের ৩ গুণ বড় ।
৩। চিন্ময় জগতকে বিজ্ঞানের ভাষায় বিপরীত জগত বলা যেতে পারে ।
৪। চিন্ময় জগতের সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই ।
৫। চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ গ্রহের নাম ‘গোলকবৃন্দাবন’ এখানে ভগবান থাকেন ।
৬। চিন্ময় জগতের কালের কোন প্রভাব নেই, সেজন্য সেখানে কেউ মৃত্যু বরণ করে না ।
৭। আত্মা চিন্ময় জগত থেকে এসেছে ।
৮। চিন্ময় জগতে আলোর জন্য সূর্য বা চন্দ্রের প্রয়োজন নাই ।
৯। চিন্ময় জগত চিন্তামনি বা পরশ পাথর দ্বারা তৈরী ।
১০। চিন্ময় জগত সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের আংশিক ধারণা আছে । বিজ্ঞানীদের ভাষায় এর নাম বিপরীত জগত ।
১১। কার্ক (Quark) হল মৌল কণিকা ইহা দ্বারা মহাবিশ্ব গঠিত ।
১২। কার্ক থেকে বিপরীত কার্ক এবং বিপরীত কার্ক থেকে কার্ক তৈরী হতে পারে ।
১৩। ‘প্রধান’ হল চিন্ময় বা বিপরীত পদার্থ যা থেকে মহাবিশ্ব তৈরী হয়েছে ।
১৪। সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের আয়তন ছিল শূন্য এবং তাপমাত্রা ছিল অসীম ।
১৫। ‘প্রধান’-এর উপর যখন অসীম তাপমাত্রা ক্রিয়া করে তখন ‘প্রধান’ ক্ষোভিত বা বিস্ফোরিত হয় একে বিজ্ঞানীরা বিগব্যাঙ্গ (Big Bang) বা বৃহৎ বিস্ফোরন বলে ।
১৬। জড় জগত চিন্ময় জগতের বিপরীত প্রতিফলন এবং জড় জগত চিন্ময় জগতের নীচে অবস্থিত ।


বৈদিক বিশ্বব্রাহ্মান্ড সৃষ্টি প্রনালী [vedic concept of creation of whole world]

আমরা যে সৌর পরিবারে বসবাস করি এর সাথে আরো কিছু গ্রহ নক্ষত্র যোগ করিলে আমাদের ব্রাহ্মান্ড গঠিত হয় । এ রকম কোটি কোটি ব্রাহ্মান্ড সমন্বয়ে গঠিত হয় বিশ্বব্রাহ্মান্ড ।প্রতিটি ব্রাহ্মান্ডের আয়তন ভিন্ন রকমের । ভাগবতে বর্ননা করা হইয়াছে এই বিশ্বব্রাহ্মান্ড সৃষ্টি হয় চিন্ময় জগত থেকে আর আগে চিন্ময় জগত সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে । চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ গ্রহের নাম গোলক বৃন্দাবন । এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিত্য বা সর্বদা বর্তমান থাকেন অর্থাৎ এটা তার নিজের বাসস্থান বা ধাম । ভগবান কখনো তার নিজের ধাম ত্যাগ করিয়া কোথাও যান না, তবে যখন জড় জগতে যাওয়ার প্রয়োজন হয় তখন তিনি নিজের থেকে ছায়া কৃষ্ণ তৈরী করিয়া জড় জগতে পাঠান । বেদে উল্লেখ করা হইয়াছে ছায়াকৃষ্ণ এবং মূলকৃষ্ণ এক ও অভিন্ন উভয়ের শক্তি সমান।

যখন মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় হয়, তখন কৃষ্ণ গোলক বৃন্দাবন থেকে সৃষ্টির পরিকল্পনা করেন এবং চিন্ময় জগতের নিচে গোলাকার বলের মত ফাঁকা জায়গা সৃষ্টি করেন । এই গোলাকার বলকে বলা হয় বিশ্বব্রাহ্মান্ডের গোলক। ইহার মধ্যে অনন্ত কোটি ব্রাহ্মান্ড সৃষ্টি হয় । জড় জগত বা মহাবিশ্ব সষ্টির কারন চিন্ময়জগত।

সায়ম্ভূবতন্ত্রে চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রের প্রভাব সম্বন্ধে শিব এবং পার্বতীর আলোচনায় তা প্রতিপন্ন হইয়াছে ।
সেখানে বলা হইয়াছে

চিন্ময়জগতের নিচে জড়জগত অবস্থিত
নানাকল্পলতাকীণং বৈকুন্ঠং ব্যাপকং স্মরেৎ।
অধঃ সাম্যং গুণানাঞ্চ প্রকৃতিঃ সর্বকারণম্।।(চৈতণ্য চরিতামৃত১/৫/১৮)
অনুবাদ
মন্ত্র জপ করিবার সময় সর্বদা চিজ্জগতের কথা স্মরন করা উচিত, যাহা বৈকুন্ঠলোকের অধোভাগে জড় সৃষ্টির কারণস্বরূপা প্রকৃতি অবস্থিত।

এই শ্লোকে বর্ননা করা হইয়াছে চিন্ময়জগত (বৈকুন্ঠে লোকে) এর অধোভাগ বা নিচে জড় জগত অবস্থিত ।
বিশ্ব ব্রাহ্মান্ড সৃষ্টির ধারবাহিক বর্ননা ভগবতে বর্ননা করা হইয়াছে আমি এখানে অত্যন্ত সংক্ষেপে কিছু উল্লেখ করলাম । মহাবিশ্বের জন্য যে গোলক সৃষ্টি হইয়াছে সৃষ্টির অদিতে সেই গোলকের অর্ধেক জল দ্বারা পূর্ণ করা হয়।

ব্রাহ্মান্ডের অর্ধেক জল দ্বারা পূর্ণ করিল
জল ভরি’ অর্ধ তাঁহা কৈল নিজ-বাস।
আর অর্ধে কৈল চৌদ্দভূবন প্রকাশ।।(চৈতণ্য চরিতামৃত১/৫/৯৮)
অনুবাদ
ব্রাহ্মান্ডের অর্ধভাগ জল পূর্ণ করিয়া তিনি সেইখানে তাঁহার নিজের আবাসস্থল তৈরী করিলেন এবং বাকি অর্ধাংশে চতুর্দশভূবন সৃষ্টি করিলেন।

এখানে বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন করতে পারেন সৃষ্টির শুরুতে পানি আসিল কিভাবে, ইহা হইতে পারে না, ইহা অবাস্তব কিন্ত ভাগবত ইহার প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছে এই জল সাধারন জড় জগতের জল নয় । ইহা চিন্ময় জগতের অপ্রাকৃত জল এবং ইহা চিন্ময় জগত থেকে কৃষ্ণের নির্দেশে আসিয়াছে।

মহাবিশ্বের গোলকের অর্ধেক যখন চিন্ময় জল দ্বারা পূর্ণ হয় তখন ইহাকে বলা হয় কারন সমূদ্র (casual occan)। এই কারন সমূদ্র বিশ্বব্রাহ্মান্ড সৃষ্টির মূল কারন । এই কারন সমূদ্র চিন্ময় বস্তু, ইহা জড় বস্তু নয় । সেজন্য দেখা যাইতেছে, এই মহাবিশ্বের অর্ধেক জড় বা প্রাণহীন আর অর্ধেক চিন্ময় বা জীবন্ত।সুতরাং দেখা যাইতেছে এই মহাবিশ্বের পদার্থ এবং বিপরীত পদার্থের পরিমান সমান অর্থাৎ শক্তি (positive force) এবং বিপরীত শক্তি (anti force) সমান, সেজন্য উভয়ের যোগফফল শূন্য। এইজন্য বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে শক্তির পরিমান 0(শূন্য)বলিয়া থাকেন।

যখন কারন সমূদ্র জল দ্বারা পূর্ণ হয় তখন গোলক বৃন্দাবনের কৃষ্ণের শরীর হইতে একটি ছায়াকৃষ্ণ বাহির হইয়া কারন সমূদ্রে প্রবেশ করেন।
এই ছায়া কৃষ্ণের নাম মহাবিষ্ণু যিনি কিছুদিন এই চিন্ময় জলে যোগনিদ্রায় (অপ্রাকৃত নিদ্রা)থাকেন।

মহাবিষ্ণু বা হিরন্ময় একহাজার দিব্য বছর জলে থাকে
হিরন্ময় স পুরুষঃ সহস্রপরিবৎসরান্।
অন্ডকোশ উবাসাপ্সু সর্বসত্ত্বোপবৃংহিতঃ।(ভাগবত ৩/৬/৬)।
অনুবাদ
হিরন্ময় নামক বিরাট পুরুষ একহাজার দিব্য বৎসর ব্রহ্মান্ডের জলে বাস করিয়াছিলেন এবং সমস্ত জীবেরাও তাঁহার সঙ্গে শায়িত ছিল ।

এই শ্লোকে বর্ননা করা হইয়াছে, মহাবিষ্ণু শক্তি ১০০০ দিব্য বছর বা ৩৬৫০০০০ বছর কারন সমূদ্রে যোগনিদ্রায়(অপ্রাকৃত নিদ্রা) ছিলেন । তারপর তাঁহার শরীর হইতে কোটি কোটি ব্রাহ্মান্ডের বীজ বুদবুদ আকারে বাহির হয় এই বুদবুদগুলি পরবর্তীতে প্রতেকটি একটি করিয়া পূর্ণাঙ্গ ব্রাহ্মান্ডে পপররিনত হয়।

কারন সমূদ্রে বুদবুদের আকারে ব্রাহ্মান্ড সৃষ্টি
যঃ কারণার্ণবজলে ভজতি স্ম যোগ-নিদ্রামনন্তজগদন্ডসরোমকূপঃ।
আধারশক্তিমবল্যম্ব্য পরাংস্বমূর্তি গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।। (ব্রহ্ম সংহিতা ৫/৪৭)
এখানে ব্রহ্মাজী বলিয়াছেন, আমি সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি, যিনি তাঁহার অংশাবতার মহাবিষ্ণুরূপে যোগনিদ্রায় শায়িত এবং তাঁহার দিব্য শরীরের রোমকূপ থেকে অসংখ্য ব্রাহ্মান্ড বুদবুদ আকারে প্রকাশিত হইতেছে।

এই শ্লোকে বর্ননা করা হইয়াছে, মহাবিষ্ণু কারন সমূদ্রে যোগনিদ্রায় শায়িত
আছেন এবং তাঁহার দিব্য(চিন্ময়) শরীরের রোমকূপ থেকে বুদবুদ আকারে
অসংখ্য ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হইতেছে ।পরবর্তীতে প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে যে ফাঁকা জায়গা থাকে সেখানে একটা করে ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হয় । বুদবুদগুলি কারণ সমুদ্রের মধ্যে হাজার হাজার দিব্য বছর নিমজ্জিত অবস্থায় থাকে ।

ব্রহ্মান্ডগুলি সৃষ্টির পর কারণ সমুদ্রের কারণ বারীতে হাজার হাজার বছর নিমজ্জিত থাকে
বর্ষপূগসহস্রান্তে তদন্ডুমুদকেশয়ম্
কালকর্মস্বভাবস্থো জীবোহজবিমজীবয়ৎ ।। (ভাগবত ২/৫/৩৪)
অনুবাদ
এইভাবে সমস্ত ব্রহ্মান্ডসমূহ হাজার হাজার বছর কারণ সমুদ্রের জলে নিমজ্জিত ছিল । তারপর সমস্ত জীবের ঈশ্বর তাহাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া সেগুলিকে পূর্ণরূপে সজীব করেন ।

এই শ্লোকে বর্ননা করা হইয়াছে ব্রহ্মান্ডগুলি সৃষ্টির পর কারণ সমুদ্রের কারণ বারীতে (জল) হাজার হাজার বছর নিমজ্জিত থাকে । বুদবুদগুলি কারণ সমুদ্রের মধ্যে গুচ্ছ আকারে অবস্থান করে অর্থাৎ একসাথে পুঁথি মালার মত থাকে ।

ব্রহ্মান্ডগুলি পুঁথিমালার মত একসাথে অবস্থান করে
মত্তঃ পরতরং নান্যৎকিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় ।
ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সুত্রে মণিগনা ইব ।। (গীতা ৭/৭)
অনুবাদ
হে ধনঞ্চয় (অর্জুন), আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই । সূত্রে যেমন মণিসমূহ গাঁথা থাকে, তেমনই সমস্ত বিশ্বই আমাতে ওতঃপ্রোতভাবে অবস্থান করে ।

এই শ্লোকে বর্ননা করা হইয়াছে ব্রহ্মান্ডগুলি গুচ্ছ আকারে থাকে ।
প্রতি গুচ্ছে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি বুদবুদ থাকে, পরবর্তীতে এই বুদবুদগুলি যখন মহাশূন্যে গুচ্ছ আকারে ভাসমান হয় তখন একে ব্রহ্মান্ডপুঞ্জ বলে । বিজ্ঞানীরা এই ব্রহ্মান্ডপুঞ্জকে ছায়াপথ বা Milky way বলে । বিজ্ঞানীরা প্রমান করেছে আমাদের নীহারিকাতে দৃশ্যমান তাঁরকার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার কোটি । আমি বিজ্ঞান পর্বে আলোচনা করেছি মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য যে সকল তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য তারমধ্যে বুদবুদতত্ত্ব (Bubble Theory) অন্যতম ।

সংক্ষেপে বিজ্ঞানীদের বুদবুদ তত্ত্বের উল্লেখ করছি (A Brife concept about Bubbling theory)
ম্যাসচুসেটস্ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির বৈজ্ঞানিক অ্যালান গুথ (Alan Guth)-এর চেষ্টা ছিল মহাবিশ্বের এমন একটি প্রতিরূপ অন্বেষণ করা, যে প্রতিরূপে বহু প্রাথমিক আকার বিবর্তনের ফলে আধুনিক মহাবিশ্বের মতো একটি জিনিস সৃষ্টি হয়েছে । গুথের এই আলোচনা থেকে বুঝা যায় মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে বহু প্রাথমিক আকার থেকে পরবর্তীতে সেই প্রাথমিক আকারগুলি বিবর্তনে মাধ্যমে বর্তমান মহাবিশ্বের সৃষ্টি করেছে । গুথের এই ধারণা বুদবুদ তত্ত্বের জন্ম দিয়াছে । মহাবিশ্বের যে প্রাথমিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন ছিল, সেটা ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে প্রতিটি বুদবুদ বিবর্তনেরর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ব্রহ্মান্ডে পরিণত হয় । সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞানী গুথের ধারণা ভাগবতের ধারণার সাথে মিল আছে ।

গুথের বুদবুদ তত্ত্বটি হল ফুটন্ত পানিতে যেমন বুদবুদ উঠতে থাকে, ঠিক সেরকম সময়ের নদীতে অসংখ্য বুদবুদ সৃষ্টি হচ্ছে পরবর্তীতে এই বুদবুদগুলি মহাশূন্যে অসংখ্য বিশ্ব বা ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করছে । গুথের ধারনা বুদবুদগুলি একে অন্যের সাথে মিলিত হতে থাকে এবং সবগুলি বুদবুদ মিলিত হয়ে একটি বুদবুদে রিণত হয় যে বুদবুদের মধ্যে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে । গুথ নিজেই তাঁহার তত্ত্বের সমস্যা বর্ণনা করে বলেছেন মহাবিশ্ব এতো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল যে, বুদবুদগুলি যদি আলোকের গতিতে বৃদ্ধি পায় তা হলেও এরা পরস্পর থেকে দূরে অপসারণ করতে থাকবে । সুতরাং বুদবুদ গুলি যুক্ত হতে পারবে না ।

এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানী হকিং বর্ণনা করেছেন ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি মস্কোতে একটি কণাবাদী মহাকর্ষ (Quantum Gravity) সম্পর্কীয় আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছিলেন । শ্রোতাদের ভিতরে মস্কোর লেবেডভ ইন্সিটিটিউটের একজন তরুণ রুশ ছিলেন, তাহার নাম আন্দ্রে লিন্ডে (Andrei Linde)। তিনি মন্তব্য করেছিলেন বুদবুদগুলি সংযুক্ত না হওয়ার অসুবিধা এড়ানো যায় যদি বুদবুদগুলি এতোবড় হয় যে মহাবিশ্বে আমাদের অঞ্চলটি সম্পূর্ণ একটি বুদবুদের অন্তর্ভূক্ত হয় ।

বিজ্ঞানীদের এই বুদবুদ তত্ত্বের সাথে ভাগবতের বুদবুদের মাধ্যমে সৃষ্টি তত্ত্বের যথেষ্ট মিল রয়েছে । গুথ বলেছেন বুদবুদগুলি সময়ের নদীতে তৈরী হয়েছে, কিন্তু ভাগবতে বর্ণনা রয়েছে বুদবুদগুলি কারণ সমুদ্রের কারণ বারীতে সৃষ্টি হয় । বিজ্ঞানীরা বুদবুদগুলি এক অন্যের সাথে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সমস্যার কথা বলেছেন কিন্তু ভাগবতে সেই সমস্যার সমাধান করে বলেছে বুদবুদগুলি একে অন্যের সাথে মিলিত হয় না । প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে একটি করে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়, যার কিছু ধারণা আন্দ্রে লিন্ডে করেছেন। সুতরাং বলা যেতে পারে বিজ্ঞানীরা বুদবুদতত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে আংশিক ধারনা ব্যক্ত করেছেন, ভাগবত সেটা অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ও গঠনমূলকভাবে বর্ণনা করেছে । এখানে উল্লেখ করে রাখা ভাল যে ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে বুদবুদ তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে আর প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে যে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়েছে সেটা বিগ ব্যাঙ্গ (Big Bang) বা বৃহৎ বিষ্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে যা আমি পরবর্তীতে আলোচনা করব ।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বুদবুদ তত্ত্ব এবং বিগ ব্যাঙ্গ তত্ত্ব দুটিকে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি প্রণালী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন । কিন্তু ভাগবতের বর্ণনা মাধ্যমে সামঞ্জস্যতা লাভ করেছে যা পরে আলোচনা করা হবে । বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন সবগুলি বুদবুদ মিলিত হয়ে একটি বড় বুদবুদের মত তৈরী হয়, যার মধ্যে বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্ব অবস্থিত অর্থাৎ মহাবিশ্ব একটি গোলাকার বলের মধ্যে অবস্থিত বা মহাবিশ্বের একটি গোলক রয়েছে । এই বিষয়টি ভাগবতে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে মহাবিশ্ব একটি গোলকের মধ্যে অবস্থিত । মহাবিশ্ব যেহেতু একটি গোলকের মধ্যে অবস্থিত, সেজন্য মহাবিশ্বের স্থানের সীমা রয়েছে আবার ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে ব্রহ্মান্ডের সংখ্যা অনন্তকোটি । অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডের অন্য জায়গার প্রয়োজন অনন্ত……….. তা হলে এই বিষয় দুটি পরস্পর বিরোধী হয়ে যায় । এ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে মহাবিশ্বের গোলক এত বড় যে সেটা মানুষের পক্ষে মাপা বা ধারনা করা সম্ভব নয় । সেজন্য মানুষের কাছে মহাবিশ্বের আয়তন অসীম বলে মনে হবে কিন্তু প্রকৃত বিচারে মহাবিশ্বের একটি গোলাকার বাউন্ডরী রয়েছে ।একে মহাবিশ্বের গোলক বলে, যা বিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরী হয়েছে । এ গোলকের মধ্যে অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড বুদবুদ আকার অবস্থান করছে । সুতরাং যদি বলা হয় মহাবিশ্বের আয়তন অসীম সেটাও সঠিক আবার মহাবিশ্বের আয়তন অসীম নয় সীমিত সেটাও সঠিক ।

একই সাথে দুটি পরস্পর বিরোধী বিষয় কিভাবে সঠিক হয় সে সম্বন্ধে ভাগবতে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে এর নাম ‘অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্ব’ । এই তত্ত্বের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অচিন্ত্য মানে যা মানুষের কল্পণার বাহিরে অর্থাৎ মানুষ তার সীমিত জ্ঞান দ্বারা বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবে না । আর ভেদাভেদ শব্দের অর্থ ভেদ আছে আবার ভেদ নাই অর্থাৎ একই সাথে দুটি পরস্পর বিরোধী ধারনা সঠিক হবে । এর একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন- এক বিন্দু জল আর সমুদ্র এই দুটি বিষয় একটি বিচারে উভয়ে সমান, সেটা হল গুণগত দিক অর্থাৎ গুণগত দিক দিয়ে এক বিন্দু জলের মধ্যে যা আছে বিশাল সমুদ্রের মধ্যে তা আছে কিন্তু পরিমাণের দিক দিয়ে দুটি বস্তু এক নয় । কোন কোন বিজ্ঞানী মহাবিশ্বকে অসীম বলে ব্যাখ্যা করেছেন আবার কোন কোন বিজ্ঞানী মহাবিশ্বকে সসীম বা সীমিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন, এই উভয় ধারণা ভাগবতের আলোকে সঠিক ।

আন্দ্রে লিন্ডে নামক একজন রুশ বিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন বুদবুদগুলি সংযুক্ত না হওয়ার অসুবিধা এড়ানো যায় যদি বুদবুদ গুলি এতো বড় হয় যে মহাবিশ্বে আমাদের অঞ্চলটি সম্পূর্ণ একটি বুদবুদের অন্তর্ভূক্ত হয় ।



ব্রহ্মান্ডগুলি কিভাবে মহাশূন্যে উথিত হয় (What is the procedure of Universe)

এ যাবৎ আমরা আলোচনা করে দেখলাম ব্রহ্মান্ডগুলি হাজার হাজার বছর ধরে বুদবুদের আকারে কারণ সমুদ্রের জলে নিমজ্জিত আছে । আমরা জানি, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের গোলকের অর্ধেক চিন্ময় জল দ্বারা পূর্ণ, বাকী উপরের অর্ধেক ফাঁকা মহাশূন্য । মহাবিশ্বের কোন দিক উপর আর কোন দিক নীচে সেটা নির্ণয় করা হয় চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ গ্রহ গোলক বৃন্দাবনের সাথে তুলনা করে, গোলক বৃন্দাবন সবার উপরে অবস্থিত, আমাদের মহাবিশ্ব চিন্ময় জগতের নীচে অবস্থিত । সেজন্য মহাবিশ্বের গোলকের অর্ধেক জল দ্বারা পূর্ণ অংশকে বলা হয় বিশ্বব্রহ্মান্ডের নিম্নভাগ আর উপরের ফাঁকা জায়গায় নাম উপরিভাগ । ব্রহ্মান্ডগুলি হাজার হাজার বছর কারণ সমুদ্রে নিমজ্জিত থাকবার পর মহাবিষ্ণু থেকে একটি শক্তি বাহির হয়ে প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে প্রবেশ করেন এর নাম ‘গর্ভোদকশক্তি’ ।

ব্রহ্মান্ডের গোলক ১০০০ বছর কারণ সমুদ্রে থাকে । সোহশয়িষ্টাব্ধিসলিলে আন্ডকোশো নিরাত্মকঃ সাগ্রং বৈ বর্ষসাহস্রমন্ববাৎসীত্তমীশ্বরঃ (ভাগবত ৩/২০/১৫)

অনুবাদ
সেই হিরন্ময় অন্ডটি অচেতন অবস্থায় এক সহস্র বৎসরেরও অধিক কাল কারণ সমুদ্রের জলে শায়িত ছিল । তারপর ভগবান গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে তাহাতে প্রবেশ করেন । এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মান্ডরূপী যে বুদবুদ সেটা অচেতন বা মৃতরূপে ১০০০ (এক হাজার) বছরের বেশি সময় কারণ সমুদ্রের জলে ছিল । তারপর সেটাকে জীবন্ত করবার জন্য ভগবানের একটি শক্তি সেই ব্রহ্মান্ডে প্রবেশ করলেন, এই শক্তির নাম ‘গর্ভোদকশক্তি’ । যখন বুদবুদ রূপ ব্রহ্মান্ডের মধ্যে শক্তি প্রবেশ করল তখন ব্রহ্মান্ডটি কার্যশীল হল ।

গর্ভোদক শক্তি ব্রহ্মান্ডগুলিতে প্রবেশ করবার পর এই শক্তি দুই ভাগে বিভক্ত হয় ।
১। অনন্ত শক্তি
২। পরমাণু শক্তি

ভগবানের শক্তি দুই ভাগে বিভক্ত হল একোহপ্যসৌ রচয়িতং জগদন্ডকোটিং যচ্ছক্তিরস্তি জগদন্ডচয়া যদন্তঃ অন্ডান্ত রস্থপরমাণুচয়ান্তরস্থং গোবিন্দমাদি পুরুষং তমহং ভজামি ।। (ব্রহ্ম সংহিতা ৫/৩৫)

অনুবাদ
আমি পরমেশ্বর ভগবান গোবিন্দের ভজনা করি, যিনি তাঁহার এক অংশের দ্বারা প্রতিটি ব্রহ্মান্ড এবং প্রতিটি পরমাণুতে প্রবিষ্ট হইয়াছেন, এইভাবে তিনি সমগ্র সৃষ্টিতে তাঁহার অনন্ত শক্তির প্রকাশ করিয়াছেন । এই শ্লোকে ভগবানের দুইটি শক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে একটি শক্তি প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে প্রবেশ করেছেন এর নাম অনন্ত শক্তি আর একটি শক্তি প্রতিটি পরমাণুতে প্রবেশ করেছেন এর নাম পরমাণু শক্তি । কারণ সমুদ্রের জলে নিমজ্জিত ব্রহ্মান্ডগুলি যখন এইভাবে অনন্ত শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন ব্রহ্মান্ডগুলি মহাশূন্যে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় । কারণ সমুদ্রের জলে অবস্থানরত কোটি কোটি ব্রহ্মান্ডগুলি কার্যশীল হওয়ার পর সমুদ্রে অবস্থিত মহাবিষ্ণু যখন শ্বাস ত্যাগ করেন তখন সমস্ত ব্রহ্মান্ডগুলি অনন্তশক্তির প্রভাবে মহাশূন্যে গমন করতে থাকে ।

ব্রহ্মান্ডগুলি মহাশূন্যে উথিত হওয়া যস্যৈকনিশ্বসিতকালমথাবলম্ব্য জীবন্তি লোমবিলজা জগদন্ডনাথাঃ বিষ্ণূর্মহান্ স ইহ যস্য কলাবিশেষো গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।। (ব্রহ্ম-সংহিতায় ৫/৪৮)

অনুবাদ
মহাবিষ্ণু বা কারণার্ণবশায়ী বিষ্ণুর একটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে অনন্ত ব্রহ্মান্ড সমূহ প্রকাশিত হয়, আর সেই মহাবিষ্ণু হইতেছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোবিন্দের একটি অংশ মাত্র ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে অনন্ত ব্রহ্মান্ড সমূহ মহাবিষ্ণুর নিঃশ্বাসের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে মহাশূণ্যে গমন করছে । মহাশূন্যে ব্রহ্মান্ডপূঞ্জ বা ছায়া পথগুলি যাওয়ার পর মহাবিষ্ণুর শ্বাস ত্যাগের শক্তিতে অপসরণ হওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমস্ত মহাশূন্যে স্থান দখল করে, এর নাম মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ । একে বিজ্ঞানীরা প্রসারমান মহাবিশ্ব (Expanding Universe) বলে ।

পরবর্তী পোষ্টে আলোচনা করা হবে ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ । (চলবে………)
লিখেছেন - Shusanta Banda

Share:

ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য -পর্ব ০২

বিভিন্ন ব্রহ্মান্ডে প্রাণী আছে কিনা? (Are there any life in defferent Universe) বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের সৌর জগতের মত মহাবিশ্বে আরো অসংখ্য সৌর জগত রহিয়াছে । সে সকল স্থানে বুদ্ধিমান জীব থাকা সম্ভব । এ ব্যাপারে ভাগবত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডে অনন্ত কোটি জীব রহিয়াছে । তবে বিভিন্ন ব্রহ্মান্ডের পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন সেজন্য্ সে সকল স্থানে বিভিন্ন প্রকারের জীব রহিয়াছে । ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে এ মহাবিশ্বে ৮৪ লক্ষ রকমের জীব রয়েছে । মহাবিশ্বের বিভিন্ন গ্রহে মানুষ আছে

নভো দদাতি শ্বসতাং পদং যন্নিয়মাদদঃ ।
লোকং স্বদেহং তনুতে মহান্ সপ্তভিরাববৃতম্ ।। (ভাগবত ৩/২৯/৪৩)

অনুবাদ
পরমেশ্বর ভগবানের নিয়ন্ত্রণে আকাশ অন্তরীক্ষে বিভিন্ন গ্রহদের স্থান প্রদান করে, যেইখানে অসংখ্য প্র্রাণী বাস করে । তাঁহার পরম নয়ন্ত্রনে সমগ্র ব্রহ্মান্ডের বিরাট শরীর সপ্ত আবরণসহ বিস্তৃত বিশ্বব্রহ্মান্ডের আবরণের ধারণা হয় ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে সমগ্র ব্রহ্মান্ডের অসংখ্য গ্রহে অসংখ্য প্রাণী বাস করে এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের ৭ টি আবরণ আছে । সে বিষয়টি উল্লেখ করা হইয়াছে । বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের ৭ টি আবরণ আছে । অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডে অনন্ত কোটি জীব আছে, সে সকল ব্রহ্মান্ডে মানুষসহ সব ধরনের জীব আছে । সে সব ব্রহ্মান্ডের মানুষের ধর্ম কি ? তাদের জীবনযাত্রার মান কেমন ? তাহাদের সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা ভাগবতে আছে । আমি সংক্ষেপে বিভিন্ন ব্রহ্মান্ডের মানুষের বৈশিষ্ট্য কিছু আলোচনা করছি । বিভিন্ন ব্রহ্মান্ডের জীবের বর্ণনা

ভাবয়ত্যেষ সত্ত্বেন লোকন্ বৈ লোকভাবনঃ ।
লীলাবতারানুরতো দেবতির্যঙ্ নরাদিষু ।। (ভাগবত ১/২/৩৪)

অনুবাদ
এ ভাবে সমস্ত জগতের পতি দেবতা, মনুষ্য এবং পশু অধ্যুষিত সমস্ত গ্রহ লোকগুলি প্রতিপালন করেন । বিভিন্ন অবতারে তিনি তাঁহার লীলা-বিলাস করিয়া বিশুদ্ধ-সত্ত্বে অধিষ্ঠিত হইয়াও জীবসমূহকে উদ্ধার করেন ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে অনন্ত কোটি জড় ব্রহ্মান্ড রয়েছে এবং প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে অসংখ্য গ্রহ রয়েছে । সেখানে অসংখ্য জীব প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিরাজ করছে । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছায়ারূপ প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে এবং প্রতিটি গ্রহে অবতরণ করেন । তিনি বিভিন্ন গ্রহে জীবদের মাঝে তাঁহার বৈদিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন, যাহাতে তাহারা চিন্ময় জগতে ফিরিয়া যাওয়ার যোগ্যতা লাভ করিতে পারে । ভগবাণ তাঁহার অপ্রাকৃত স্থিতির পরিবর্তন করেন না, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিবেশে এবং বিভিন্ন সমাজে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন বলিয়া মনে হয় । প্রতিটি ব্রহ্মান্ড নিয়ন্ত্রনের জন্য কৃষ্ণ একজন প্রতিনিধি নির্ধারণ করিয়াছেন, তাঁহার নাম ব্রহ্মা । প্রত্যেক ব্রহ্মান্ডের সর্বোচ্চ গ্রহের নাম ব্রহ্মালোক বা সত্যলোক, সেই গ্রহে ব্রহ্মা বসবাস করেন । ব্রহ্মার ১ দিনকে উক্ত ব্রহ্মান্ডের ১ দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয়, বিভিন্ন ব্রহ্মান্ডের দিনের সময় উক্ত ব্রহ্মান্ডের আয়তন দ্বারা নির্ধারণ করা হয় ।

যেমন – আমাদের ব্রহ্মান্ড সবচেয়ে ছোট, এই ব্রহ্মান্ডের ১ দিন আমাদের পৃথিবীর হিসাবে ৪৩২ কোটি বছর সেরকম আমাদের পাশ্ববর্তী ব্রহ্মান্ডের আয়তন আমাদের চেয়ে সামান্য বড়, সেখানকার ব্রহ্মান্ডের ১ দিন ৪৩২ কোটি বছরের কিছু বেশী হইবে । এভাবে প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের ১ দিন অন্য ব্রহ্মান্ড থেকে আলাদা । ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে প্রত্যেক ব্রহ্মান্ডের ১ দিনে কৃষ্ণ একবার করে সেই ব্রহ্মান্ডে যান । আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে কৃষ্ণ আমাদের ব্রহ্মান্ডের পৃথিবী বা মর্ত্যলোক নামক গ্রহে আসিয়েছিলেন, তিনি পৃথিবীতে আবার ৮৬৪ কোটি বছর পর আসিবেন ।

ব্রহ্মার ১ দিনে কৃষ্ণ একবার সেই ব্রহ্মান্ডে যান ব্রহ্মার এক দিনে তিহোঁ একবার ।
অবতীর্ণ হঞা করেন প্রকট বিহার ।। (চৈতণ্য চরিতামৃত পাতা ১২৬ শ্লোক ৬)

অনুবাদ
ব্রহ্মার একদিনে একবার তিনি তাঁহার আপ্রাকৃত লীলা প্রকট করিবার জন্য এই জড় জগতে অবতীর্ণ হন । এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মার ১ দিনে কৃষ্ণ সেই ব্রহ্মান্ডে একবার যান । এভাবে বিবেচনা করলে বোঝা যায় প্র্রতিটি ব্রহ্মান্ডে অসংখ্য মানুষ রহিয়াছে এবং সে সকল ব্রহ্মান্ডে সনাতন ধর্ম বর্তমান রয়েছে । অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডে ও চিন্ময় জগতে বৈদিক ধর্ম বিদ্যমান ।এ জন্য এই ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম ।

ব্রহ্মান্ড সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা (Concept of Scientists About Universe) 

ব্রহ্মান্ড বিষয়ে বিজ্ঞানীদের সুস্পষ্ট কোন ধারনা নাই, তারা বিশ্বব্রহ্মান্ডের মাঝে কিছু মসৃণ অঞ্চল দেখতে পান সেগুলিকে আমাদের মত সৌর জগত মনে করেন, এই মসৃণ অঞ্চলগুলি সৌর জগত সেটা সঠিক এবং ভাগবতের আলোকে এই মসৃণ অঞ্চলগুলিকে ব্রহ্মান্ডের অভ্যন্তরভাগ বলা হয় আর ইহার চতুর্দিকে যে অমসৃণ স্থান বিদ্যমান সেগুলি ব্রহ্মান্ডের আবরণ । বিজ্ঞানীরা ব্রহ্মান্ড এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের মধ্যে কোন সুস্পস্ট পার্থক্য আবিষ্কার করতে পারে নাই । সেজন্য মহাবিশ্ব বিষয়ে তারা যে মতবাদগুলি আবিষ্কার করেছেন সেগুলি অসম্পূর্ণ এবং পরস্পর বিরোধি বলে মনে হয়, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি পর্বে আলোচনা করা হবে । ভাগবতে যেমন প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের বর্ণনা নির্দিষ্ট ভাবে করা হয়েছে বিজ্ঞানীরা সেভাবে আবিষ্কার করতে পারে নাই ।যেমন আমরা যে ব্রহ্মান্ডে বসবাস করি ইহার ব্যাস ৫০ কোটি যোজন বা ৪০০ কোটি মাইল [১ যোজন = ৮ মাইল]এবং এর আবরণ ব্যাসের ১ কোটি ১১ লক্ষ গুণ বেশি চওড়া এবং আবরণগুলি ৭ টি স্তরে বিভক্ত,ইহাতে আগুনের স্তর ৪০,০০০ কোটি মাইল চওড়া এভাবে অন্য আবরণগুলি বর্ণনা নিখুঁতভাবে করা হয়েছে যাহা করিতে বিজ্ঞানীরা অক্ষম।

চিন্ময়জগত বা বিপরীত জগত (Spiritual World or Anti Material World)

ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে জড় জগত ছাড়া আরো একটি জগত আছে, সেটা হল চিন্ময়জগত । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, চিন্ময় জগত জড় জগতের চেয়ে তিন গুণ বড় । ভগবানের এক অংশে জড় জগত অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তর্বাজুন ।
বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ ।। (গীতা ১০/৪২)

অনুবাদ
হে অর্জুন, অধিক আর কি বলিব, এইমাত্র জানিয়া রাখ যে, আমি আমার এক অংশের দ্বারা সমগ্র জগতে ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছি ।

জড়জগত যদি অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডের সমান হয় তবে চিন্ময় জগত কত বড় সেটা আমাদের ধারনার বাইরে । চিন্ময় জগতের সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই, ইহা শাশ্বত নিত্য বস্তু ।

চিন্ময় জগত শাশ্বত

পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎসনাতনঃ ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি ।। (গীতা ৮/২০)

অনুবাদ
আর একটি প্রকৃতি রহিয়াছে, যাহা নিত্য এবং ব্যক্ত ও অব্যক্ত বস্তুর অতীত । ব্রহ্মা থেকে স্থাবর জঙ্গম আদি সমস্ত ভূত বিনষ্ট হইলেও তাহা বিনষ্ট হয় না ।

এই শ্লোকে চিন্ময় জগতের সুন্দর বর্ণনা করা হইয়াছে । চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ গ্রহকে বলা হয় গোলক বৃন্দাবন এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিত্য অর্থাৎ সর্বদা বর্তমান থাকেন অর্থাৎ এটা তাহার নিজের বাসস্থান বা ধাম ।

গোলক বৃন্দাবন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিজস্ব ধাম

আনন্দচিন্ময়রসপ্রতিভাবিতাভি-স্তাভির্য এব নিজরূপতয়াকলাভিঃ গোলক এব নিবসত্যখিলাত্মভ তো গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।। (ব্রহ্ম সংহিতা ৫/৩৭)

অনুবাদ
পরমেশ্বর ভগবান, গোবিন্দ, যিনি তাঁহার সবিশেষ রূপের কিরণের দ্বারা সকলের ইন্দ্র্রিয়সমূহকে উজ্জীবিত করেন, তিনি গোলক নামক তাঁহার স্বীয় অপ্রাকৃত ধামে সর্বদা বিরাজ করেন । তথাপি তিনি তাঁহার আহ্লাদিনী-শক্তির তুল্য আনন্দময় দিব্য কিরণের প্রসারের দ্বারা তাহার সৃষ্টির সর্বত্র বিরাজমান ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ভগবান সর্বদা গোলক নামক অপ্রাকৃত বা চিন্ময় ধামে অবস্থান করেন । ভগবান কখনও তাঁহার নিজের ধাম ত্যাগ করিয়া কোথাও যান না । তবে যখন জড় জগতে যাওয়ার প্র্রয়োজন হয়, তখন তিনি নিজের থেকে ছায়া কৃষ্ণ তৈরী করে জড় জগতে পাঠান । ভাগবতে উল্লেখ করা হয়েছে ছায়াকৃষ্ণ এবং মূলকৃষ্ণ এক ও অভিন্ন, উভয়ের শক্তি সমান । ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা যে জড়জগতে বাস করি সেটা হল চিন্ময় জগতের বিপরীত প্রতিফলন বা বিপরীত অবস্থা । জড় জগতের যেমন সৃষ্টি ও ধ্বংস আছে, ঠিক সেরকম চিন্ময় জগতের সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই, অর্থাৎ জড় জগতের বিপরীত অবস্থা । চিন্ময় জগত শাশ্বত, নিত্য এবং অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান । সৃষ্টিকর্তার যেমন সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই, ঠিক সেরকম চিন্ময় জগতের সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই । জন্ম, মৃত্যু, জড়াব্যাধি এই সকল বিষয় চিন্ময় জগতে নাই । চিন্ময় জগতে মানুষের বয়স বৃদ্ধি পায় না কারণ সেখানে কালের কোন প্রভাব নাই ।

চিন্ময় জগতে কালের প্রভাব নাই 

প্রবর্ততে যত্র রজস্তমস্তয়োঃ সত্ত্বং চ মিশ্রং ন চ কালবিক্রমঃ ।
ন য্ত্র মায়া কিমুতাপরে হরে- রনুব্রতা যত্র সুরাসুরার্চিতাঃ ।।
(ভাগবত ২/৯/১০)

অনুবাদ
ভগবানের সেই ধামে রজো তমোগুণ নাই, এমনকি সেখানে সত্ত্বগুনেরও প্রভাব নাই । সেখানে বহিরঙ্গা মায়াশক্তির প্রভাব তো দূরের কথা, কালেরও প্রভাব নাই । মায়া সেখানে প্রবেশ করিতে পারে না । সুর এবং অসুর উভয়ে কোনরম ভেদবুদ্ধি না করিয়াই ভগবানের পূজা করেন । 

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, চিন্ময় জগতে কালের কোন প্রভাব নাই । কাল এক প্রকার শক্তি, এই শক্তির দ্বারা ভগবান জড় জগতসহ সবকিছু সৃষ্টি, ধ্বংস এবং নিয়ন্ত্রন করেন, কালের প্রভাবে সব কিছু পরিবর্তিত হয়, আজকের যুবক ৫০ বছর পর বৃদ্ধে পরিণত হয় কালের প্রভাবে । যেহেতু চিন্ময় জগতে কালের কোন প্রভাব নাই, তাই সেখানে সবকিছু অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকে ।(বিঃ দ্রঃ – কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে গীতার জ্ঞান দান করছিলেন তখন কৃষ্ণের বয়স ছিল ১২৫ বছর কিন্তু তার এত বয়স সত্ত্বেও তাকে দেখা গিয়েছিল ২৫ বছরের যুবকের মত কারন ভগবান কৃষ্ণের দেহ ছিল চিন্ময় [সৎ, চিৎ, আনন্দময়]তাই তার উপর কালর প্রভাব পরে না) ।

চিন্ময় জগতে সব কিছু জীবন্ত যেখানে জড় বা প্রাণহীন কোন বস্তু নাই । আমরা জড় জগতে প্রানীর দেহে যে আত্মার প্রভাব অনুভব করি, সেই আত্মা জড় জগত থেকে সৃষ্টি হয় নাই । আত্মা চিন্ময় বস্তু, ইহার কোন সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই । সেজন্য ইহা চিন্ময় জগতের বস্তু অর্থাৎ আত্মা চিন্ময় জগত থেকে এই জড় জগতে এসেছে । আত্মাকে সাধারণ ভাষায় জীবন বা প্রাণ বলে । কিছু বিজ্ঞানী মত প্রকাশ করিয়াছেন গভীর সমুদ্রে সূর্যলোকের প্রভাবে কতগুলি জড় বস্তুর সম্মিলনে প্রাণ বা জীবন বা আত্মা সৃষ্টি হয়েছে । আবার কেউ বলছেন পানি থেকে জীবন সৃষ্টি হয়ছে । আমাদের মনে রাখতে হবে, জড় বা প্রাণহীন বস্তু থেকে জীবন সৃষ্টি হতে পারে না । জীবন বা আত্মা হল উৎকৃষ্ট উচ্চ স্তরের বস্তু সেটা কখনও নিম্নস্তরের জড় বস্তু থেকে সৃষ্টি হতে পারে না । বিজ্ঞানীরা বহুদিন যাবৎ গবেষণা করছে এই মহাবিশ্বে জীবন বা আত্মা কোথা থেকে এসেছে । সেই প্রশ্নের উত্তরে ভাগবত বলিতেছে আত্মা চিন্ময় জগত থেকে এসেছে ।চিন্ময় জগতের চিন্ময় ব অপ্রাকৃত বস্তু, এর সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই চিন্ময় জগত থেকে আত্মার আগমন হয়েছে এবং চিন্ময় জগতে ফিরে যাওয়া ইহার মূল লক্ষ্য-এই জন্য মানব জীবনের মূল লক্ষ্য হল শ্বাশত জীবন অর্থাৎ চিন্ময় জগতে ফিরে যাওয়া।

আত্মা চিন্ময় জগত থেকে আসে 

অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরাম্ ।
জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ ।। (গীতা ৭/৫) 

অনুবাদ
হে মহাবহো, এই নিকৃষ্টা প্রকৃতি ব্যতীত আমার আর একটি উৎকৃষ্টা প্রকৃতি রহিয়াছে । সেই প্রকৃতি চৈতন্য স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হইয়া এই জড় জগতকে ধারণ করিয়া আছে ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ভগবানের অন্য একটি উৎকৃষ্টা চৈতন্য স্বরূপা অর্থাৎ চিন্ময় জগত আছে যা জীবভূত অর্থাৎ সেখান থেকে জীবন বা আত্মা এসেছে । চিন্ময় জগতকে আলোকিত করার জন্য জড় জগতের মত সূর্যালোকের প্রয়োজন নাই । সূর্যালোকের যে উৎস ব্রহ্ম জ্যোতি, তাহার দ্বারা চিন্ময় জগত আলোকিত হয় । চিন্ময় জগতে সূর্যোলোক বা চন্দ্রালোকের প্রয়োজন নাই 

ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো না শশাঙ্কো ন পাবকঃ ।
যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ।। (গীতা ১৫/৬)

অনুবাদ
আমার সেই রম ধাম সূর্য, চন্দ্র অথবা বিদুৎ আলোকিত করিতে পারে না । সেখানে গেলে আর এই জড় জগতে ফিরিয়া আসিতে হয় না ।

এ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে পরমধাম বা চিন্ময় জগত সূর্য, চন্দ্র বা বিদুৎ আলোকিত করতে পারে না । চিন্ময় জগতের জলও জীবন্ত বস্তুর মত ক্রিয়া করে । যেমন – ব্রহ্মা হিরণ্যকশিপুর ভক্ষিত শরীরে যখন চিন্ময় জল সিঞ্চন করেন, তখন হিরণ্যকশিপু নব যৌবন প্রাপ্ত হয় । চিন্ময় জলের প্রভাব 

ইত্যুক্তৃদিভাবো দেবো ভক্ষিতাঙ্গং পিপীলিকৈঃ ।
কমন্ডলুলেনৌক্ষদ্দিব্যেনামোঘরাধসা ।। (ভাগবত ৭/৩/২২) 

অনুবাদ
শ্রীনারদ মুনি বললেন – হিরণ্যকশিপুকে এই কথা বলিয়া, এই ব্রহ্মান্ডের আদিদেব ব্রহ্মা তাহার কমন্ডুলু থেকে অব্যর্থ দিব্য জল নিয়া পিপীলিকা কর্তৃক ভক্ষিত হিরণ্যকশিপুর দেহে সিঞ্চন করিয়াছিলেন । তাহার ফলে হিরণ্যকশিপুর শরীর পুণরুজ্জীবিত হইয়াছিল । মানুষ উন্নত কর্মের দ্বারা চিন্ময় শরীর লাভ করতে পারে, সেই শরীর দ্বারা সে মহাশূন্য ভ্রমণ করতে পারে এবং ভগবানের সঙ্গ করার সুযোগ পায়।

নারদ মুনির শরীর চিন্ময়

প্রযুজ্যমানে ময়ি তাং শুদ্ধাং ভাগবতীং তনুম্ ।
আরব্ধকর্মনির্বাণো ন্যপতৎ পাঞ্চভৌতিকঃ ।। (ভাগবত ১/৬/২৮)

অনুবাদ
এই শ্লোকে নারদ মুনি তাহার জড় শরীর ত্যাগের পর চিন্ময় শরীর লাভের কথা বর্ণনা করেছেন । চিন্ময় জগতের বিপরীত প্রতিফলন এই জড় জগত বা বিশ্বব্রহ্মান্ড । আমাদের এই মহাবিশ্ব যা দ্বারা তৈরী এর বিপরীত পদার্থ দ্বারা চিন্ময় জগত তৈরী । ভগবানের জড় জগতের ধাম চিন্ময় জগতের প্রতিরূপ কৃষ্ণলোক সম্বন্ধে জীব গোস্বামী স্কন্দ পুরাণের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন 

যা যথা ভুবি বর্তন্তে পুর্যো ভগবতঃ প্রিয়াঃ তাস্তথা সন্তি বৈকুন্ঠে তদ্ভল্লীলার্থমা দৃতাঃ ।। 

জড় জগতে দ্বারকা, মথুরা এবং গোলোক আদি ভগবানের ধামসমূহ চিৎজগতে ভগবতধামের অবিকল । সায়ম্ভূবতন্ত্রে চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রের প্রভাব সম্বন্ধে শিব এবং পার্বতীর আলোচনায় তা প্রতিপন্ন হয়েছে । সেখানে বলা হয়েছে চিন্ময় জগতের নীচে জড়জগত অবস্থিত

নানাকল্পলতাকীর্ণং বৈকুন্ঠং ব্যাপকং স্মরেৎ ।
অধঃ সাম্যং গুণানাঞ্চ প্রকৃতিঃ সর্বকারণম্ ।। (চৈতন্য চরিতামৃত ১/৫/১৮
অনুবাদ
মন্ত্র জপ করিবার সময় সর্বদা চিৎজগতের কথা স্মরণ করা উচিত, যাহা অন্তহীনভাবে ব্যাপ্ত এবং সমস্ত মনোরথ পূর্ণকারী কল্পবৃক্ষে পূর্ণ । সেই বৈকুন্ঠলোকের আধোভাগে জড় সৃষ্টির কারণস্বরূপা প্রকৃতি অবস্থিতা । এখানে বর্ণনা করা হয়েছে চিন্ময় জগতের নীচে জড় জগত অবস্থিত । 

চিন্ময় জগত সন্মন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা (Concept of Scientists about Spiritual World)

চিন্ময় জগত বা বিপরীত জগত সন্মন্ধে বিজ্ঞানীদের সুস্পষ্ট কোন ধরনা নাই তবে চিন্ময় জগতের কিছু ইঙ্গিত বিজ্ঞানীদের বিবরণে পাওয়া যায় ।

ষ্টিফেন হকিং রচিত কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বইটিতে তিনি বর্ণনা করেছেন । বিজ্ঞানীদের ধারনা ইলেকট্রনের নিশ্চয় একটি জুড়ি থাকবে অর্থাৎ থাকবে একটি বিপরীত ইলেকট্রন (Anti-Electron) কিংবা পজিট্রন । ১৯৩২ সালে পজিট্রন আবিষ্কৃত হয় । ফলে ডিরাকের তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণিত হয়, এই আবিষ্কার ১৯৩৩ সালে ডিরাকের নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির পথিকৃৎ । আমরা এখন জানি প্রতিটি কণিকারই একটি বিপরীত-কণিকা (Anti-Particle) আছে । তাহার সঙ্গে কণিকাটি বিনাশপ্রাপ্ত (annhilated) হতে পারে (বলবাহী কণাগুলির ক্ষেত্রে বিপরীত কণিকা এবং কণিকাটি অভিন্ন) । বিপরীত কণিকা দ্বারা গঠিত বিপরীত পৃথিবী এবং বিপরীত মানুষও থাকতে পারে । কিন্তু আপনার বিপরীত সত্তার সঙ্গে দেখা হলে তাহার সঙ্গে করমর্দন করবেন না । তা করিলে আলোর ঝলকে মিলাইয়া যাবেন ।

বিজ্ঞানীদের এ বর্ণনা থেকে ধারনা করা যায় তারা একটি বিপরীত জগতের কথা ভাবিতেছেন এবং বিপরীত পদার্থের মানুষ থাকাও সম্ভব বিজ্ঞানীদের এই ধারনা আংশিকভাবে চিন্ময় জগতকে ইঙ্গিত করে ।
একটি পরমাণু ইলেকট্রন (Electron), প্রোটন (Proton) এবং নিউট্রন (Neutron) কণিকা দ্বারা গঠিত । ২০(বিশ) বছর আগ পর্যন্ত মনে করা হত এইগুলি মৌল কণিকা । কিন্তু ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানী মারে গেলম্যান (Murray Gell Mann) প্রমাণ করেন নিউট্রন এবং প্রোটন কার্ক (Quark) নামক কণিকা দ্বারা গঠিত । প্রতিটি নিউট্রন এবং প্রোটন ৩টি করে কার্ক দ্বারা গঠিত । এ আবিষ্কারের জন্য গেলম্যান সাহেব নোবেল প্রাইজ পান । এখন পর্যন্ত কার্ককে মৌল কণা হিসাবে বিবেচনা করা হয় ।

অন্যান্য নীহারিকাতে পদার্থ প্রোটন এবং নিউট্রন অথবা বিপরীত প্রোটন এবং বিপরীত নিউট্রন দ্বারা গঠিত কিনা এ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কোন প্রত্যক্ষ প্রমান নাই । একই নীহারিকাতে দুইয়ের মিশ্রণ থাকতে পারে না । কতগুলি নীহারিকা পদার্থ দিয়ে গঠিত এবং কতগুলি নীহারিকা বিপরীত পদার্থ দিয়ে গঠিত এরকম সম্ভবনা নাই ।

বিপরীত কার্কের তুলনায় কার্কের সংখ্যা অত বেশী কেন ? দুইয়ের সংখ্যা এক না হওয়ার কারণ কি ? দুইয়ের সংখ্যা সমান না হওয়া আমাদের সৌভাগ্য । তাহার কারণ, সে রকম হলে সমস্ত কার্ক এবং বিপরীত কার্ক মহাবিশ্বের আদিমকালে পরস্পরকে ধ্বংস করিয়া ফেলিত । মহাবিশ্ব বিকিরণে ভর্তি থাকিত, কিন্তু বিশেষ কোন পদার্থ থাকত না । মনুষ্যজীবন বিকাশ লাভ করবার মতো কোন নীহারিকা, কোন তাঁরকা, কোন গ্রহ থাকত না । শুরুতে যদি দুইয়ের সংখ্যা সমান থাকিয়াও থাকে, তা হলে এখন কার্কের সংখ্যা এত বেশী কেন ? সৌভাগ্যক্রমে সে সম্পর্কে ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বগুলি একটি ব্যাখ্যা দিতে পারে । আমরা দেখেছি উচ্চশক্তিতে কার্কের বিপরীত ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হওয়ার অনুমোদন Gut-এর আছে । এর বিপরীত পদ্ধতি অর্থাৎ কার্কের ইলেকট্রনের রূপান্তর এবং ইলেকট্রন বিপরীত ইলেকট্রনে রূপান্তর তাহারা অনুমোদন করে । মহাবিশ্বের অতি আদিম যুগে একটা সময় ছিল যখন মহাবিশ্ব এত উত্তপ্ত হওয়ার ফলে কণিকা শক্তি এত উচ্চমানের হত যে এই সমস্ত রূপান্তর সম্ভবপর ছিল কিন্তু তাহার ফলে কার্কের সংখ্যা বিপরীত কার্কের চাইতে বেশী হইবে কেন ? তার কারন পদার্থবিদ্যার বিধিগুলি কণিকা এবং বিপরীত কণিকার ক্ষেত্রে অভিন্ন নয় ।

আপনি যদি সমস্ত কণিকা এবং প্রতিকণিকার গতি বিপরীতমুখী করে দেন, তা হলে তন্ত্রটি (system) অতীত কালে যা ছিল সে অবস্থায় ফিরে যাবে । অর্থাৎ বিধিগুলি কালের সম্মুখ অভিমুখে এবং পশ্চাৎ অভিমুখে একই হবে ।

১৯৫৬ সালে সুং দাও লী (Tsung Dao Lee) এবং চেন নিং ইয়াং (Chen Ning Yang) নামে দুজন আমেরিকান পদার্থবিদ প্রস্তাবনা করেন যে, আসলে দুর্বল বল (weak force) প্রতিসাম্য P মানে না ।
পরের বছর লী এবং ইয়াং তাহাদের চিন্তাধারা জন্য নোবেল পুরষ্কার পান । এইও দেখা গিয়েছিল যে, দুর্বল বল প্রতিসাম্য-C মেনে চলে না ।

অর্থাৎ এর ফলে বিপরীত কণিকা দিয়ে গঠিত মহাবিশ্বের আচরণ আমাদের মহাবিশ্বের চাইতে পৃথক হবে ।
আদিম মহাবিশ্ব অবশ্যই প্রতিসাম্য-T মানে না: সময় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয় । সময়ের অভিমুখ পশ্চাদ্ বর্তী হলে মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হবে । এই আলোচনার মাধ্যমে বিজ্ঞানীর মতামত প্রকাশ করেছেন, মহাবিশ্বের বিপরীত কার্কের (Anti Quark) তুলনায় কার্কের (Quark) সংখ্যা এত বেশী কেন ?

এই প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেছেন কার্ক এবং বিপরীত কার্কের সংখ্যা সমান হলে একে অপরকে ধ্বংস করিয়া ফেলিত, সেজন্য কার্কের সংখ্যা বেশি ।

আবার বিজ্ঞানী Gut অনুমোদন করেছেন উচ্চ তাপমাত্রা কার্ক থেকে এন্টিকার্ক বা বিপরীত কার্ক হতে পারে এবং বিপরীত কার্ক থেকে কার্ক হতে পারে । সহজভাবে বলা যেতে পারে পদার্থ থেকে বিপরীত পদার্থ এবং বিপরীত পদার্থ থেকে পদার্থ হতে পারে ।

এই বিষয়টি ভাগবতে আরো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে । ভাগবতে পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা পরবর্তীতে মহাবিশ্ব সূষ্টি পর্বে আলোচনা করিব । (চলবে..........)

লিখেছেনঃ সুশান্ত ব্ন্দ

Share:

ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য -পর্ব ০১

ভাগবতের আলোকে কোয়ান্টাম থিওরী (Quantum Theory) -
ভাগবতে মহাবিশ্বের যে পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা প্রদান করিয়াছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব সেটার অংশ বিশেষ । ভাগবতের আলোকে কোয়ান্টাম তত্ত্ব এখানে আলোচনা করা হল । পরমাণুর সংজ্ঞা -

চরমঃ সদ্বিশেষাণামনেকোহসংযুতঃ সদা ।
পরমাণুঃ স বিজ্ঞেয়ো নৃণামৈক্যভ্রমো যতঃ ।। (ভাগবত ৩/১১/১)

অনুবাদ - জড় জগতের যে ক্ষুদ্রতম অংশ অবিভাজ্য এবং দেহরূপে যাহার গঠন হয় না, তাহাকে বলা হয় পরমাণু । তাহা সর্বদা তাহার অদৃশ্য অস্তিত্ব নিয়ে বিদ্যমান থাকে, এমনকি প্রলয়ের পরেও । জড় দেহ এই প্রকার পরমাণুর সমণ্বয়, কিন্তু সাধারন মানুষের সেই সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে । এই শ্লোকে পরমাণুর সংজ্ঞা প্রদান করা হইয়াছে । এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী পোষ্টে আলোচনা করব ।মহাবিশ্ব পরমাণু দ্বারা গঠিত -

সত এব পদার্থস্য স্বরূপাবস্থিতস্য যৎ ।
কৈবল্যং পরমমহানবিশেষো নিরন্তর ।।(ভাগবত ৩/১১/২)

অনুবাদ - পরমাণু হইতেছে ব্যক্ত জগতের চরম অবস্থা । যখন তাহারা বিভিন্ন প্রকারের শরীর নির্মাণ না করিয়া তাহাদের স্বরূপে স্থিত থাকে, তখন তাহাদের বলা হয় পরম মহৎ ।ভৌতিক রূপে নিশ্চয়ই অনেক প্রকারের শরীর রহিয়াছে, কিন্তু পরমাণুর দ্বারা সমগ্র জগৎ সৃষ্টি হয় । এই শ্লোকে বর্ণনা করা হইয়াছে, পরমাণু দ্বারা জগত গঠিত যাহা কোয়ান্টাম তত্ত্বে বলা হইয়াছে । ভগবান পরমাণু থেকে বিশাল ব্রহ্মান্ড সব জায়গায় বিরাজিত -

পরমাণুপরমমহতো-সত্বমাদ্যন্তান্তরবর্তী ত্রয়বিধুরঃ ।
আদাবন্তেহপি চ সত্ত্বানাং যদ্ ধ্রুবং তদেবান্তরালেহপি ।।(ভাগবত ৬/১৬/৩৬)

অনুবাদ - এই জগতে পরমাণু থেকে শুরু করিয়া বিশাল ব্রহ্মান্ড এবং মহত্তত্ত্ব পর্যন্ত সব কিছুরই আদি, মধ্য এবং অন্তে আপনি বর্তমান রহিয়াছেন । অথচ আপনি আদি, মধ্য এবং অন্ত রহিত সনাতন । এই তিনটি অবস্থাতেই আপনার অবস্থা উপলব্ধি করা যায় বলিয়া আপনি নিত্য । যখন জগতের অস্তিত্ব থাকে না, তখন আপনি আদি শক্তিরূপে বিদ্যমান থাকেন । এই শ্লোকে বর্ণনা করা হইয়াছে প্রলয়ের সময় পরমাণু ধ্বংস হইয়া শক্তিতে পরিণত হয়, আবার যখন সৃষ্টি শুরু হয় তখন শক্তি থেকে পরমাণু সৃষ্টি হয় । পরবর্তী পোষ্টে আমি আলোচনা করব সৃষ্টির শুরুতে গর্ভোদক নামক শক্তি থেকে সবকিছু সৃষ্টি হয় ।কোয়ান্টাম তত্ত্বে বর্ণনা করা হইয়াছে শক্তি হইতে পরমাণু সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু শক্তি আসল কোথা থেকে ? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা বলেছেন এই মহাবিশ্বে সর্বমোট শক্তির পরিমাণ ০ (শূন্য) । এই প্রশ্নের সাথে এই উত্তরের কি সামঞ্জস্য তা আমি উপলব্ধি করতে পারছি না । আমাদের প্রশ্ন শক্তি আসল কোথা থেকে ? তার উত্তরে বলল, মহাবিশ্বের সর্বমোট শক্তির পরিমাণ শূন্য । কিভাবে এই সমস্যার সমাধান হল তা আমি উপলব্ধি করতে পারছি না । শক্তি কোথা হইতে আসিল-

শাস্ত্রে তা এভাবে প্রদান করিয়াছে
একোহপ্যসৌ রচয়িতুং জগদন্ডকোটিং যচ্ছক্তিরস্তি
জগদন্ডচয়া যদন্তঃ
অন্ডান্তরস্থপরমাণুচয়ান্তরস্থং
গোবিন্দমাদি পুরুষং তমহং ভজামি ।। (ব্রহ্ম সংহিতায় ৫/৩৫)

অনুবাদ – আমি পরমেশ্বর ভগবান গোবিন্দের ভজনা করি, যিনি তাঁহার এক অংশের দ্বারা প্রতিটি ব্রহ্মান্ড এবং প্রতিটি পরমাণুতে প্রবিষ্ট হইয়াছেন, এইভাবে তিনি সমগ্র সৃষ্টিতে তাঁহার অনন্ত শক্তির প্রকাশ করিয়াছেন ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হইয়াছে ভগবানের শক্তি পরমাণুতে প্রবেশ করিবার ফলে সৃষ্টি কার্যক্রম শুরু হয় অর্থাৎ পরমাণু ভগবানের শক্তি থেকে সৃষ্টি হয় । শক্তি আসিল কোথা থেকে তার উত্তর শাস্ত্রে বলা হয়েছে, শক্তি ভগবান থেকে এসেছে । পরে আমি ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি পর্বে আলোচনা করব এই মহাবিশ্ব প্রধান নামক একটি চিন্ময় বা বিপরীত পদার্থ থেকে সৃষ্টি হয়েছে । সুতরাং বলা যায় পরমাণু চিন্ময় বা বিপরীত পদার্থ থেকে সৃষ্টি হয়েছে যা বিজ্ঞানীদের ধারণা । সুতরাং বলা যায় বৈজ্ঞানিকেরা যে অসম্পূর্ণ কণাবাদী তত্ত্ব (Quantum Theory) আবিষ্কার করেছেন ভাগবত সেটাকে আরো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করিয়াছে ।


বৈদিক মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য (The Vedic Concept of Creation of the whole Universe)

মহাবিশ্ব আসিয়াছে কোথা থেকে এবং যাচ্ছে বা কোথায় ? মহাবিশ্বের কি কোন শুরু ছিল ? যদি থাকিয়া থাকে তবে তাহার আগে কি ঘটেছিল ? কালের চরিত্র কি ? কাল কি কখনও শেষ হবে ? আমি কে ? কোথা হইতে আসিয়াছি ? কোথায় যাব ? আমি এরূপ প্রশ্ন করিতেছি কেন ? এ সকল মানুষের শাশ্বত প্রশ্ন এর সঠিক উত্তর জানবার জন্য বিজ্ঞানীরা বহুদিন যাবৎ গবেষণা করিতেছে । এসব বিষয় নিয়ে অসংখ্য বিজ্ঞানী গবেষণা করিয়াছেন এবং এখনো করছে । তাহারা ইতিমধ্যে মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য বিষয়ে অনেক তত্ত্ব, মতবাদ, হাইপোথিসিস, সূত্র আবিষ্কার করেছেন । বিজ্ঞানীদের অনেক আবিষ্কার আছে পরস্পর বিরোধী একটির সাথে অন্যটির মিল নেই । মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য বিষয়ে যে সকল মতবাদ বিজ্ঞানীরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করিতেছে সেইগুলি নিম্নে প্রকাশ করা হইল ।

১। আইনষ্টাইনের ব্যাপক আপেক্ষিক তত্ত্ব (Einstein’s Law of Relativity)
২। বিগব্যাঙ্গ থিওরী (Big Bang Theory)
৩। বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch Theory)
৪। বুদবুদ তত্ত্ব (Bubbles Theory)
৫। কণাবাদীতত্ত্ব (Quantum Theory)
৬। মানবতত্ত্ব নীতি (Anthropic Principle) ক) দুর্বল মানবতত্ত্ব নীতি (Weak Anthropic Principle)
খ) সবল মানবতত্ত্ব নীতি (Strong Anthropic Principle) এই নীতিগুলি সম্বন্ধে ভাগবতে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে । দেখা গিয়াছে বেশিরভাগ নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য নাই । আজ বিজ্ঞানী সমাজের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ সম্পূর্ণ তত্ত্ব আবিষ্কার করা এবং আমরা যে বিশ্বে বসবাস করি তাহার একটি সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া ।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী স্টিফেন ডব্লূ হকিং তাঁহার A Brief History of Time (কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস) বইটিতে আবেদন করেছেন ভবিষ্যতে হয়ত আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান মানুষের আগমন ঘটবে যারা মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রদান করতে পারবে । আমার মতে ভাগবত (বৈদিক শাস্ত্র) মানুষের সেই আদিম ইচ্ছাকে পূরণ করিতে পারবে । ভাগবতে বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্বের গঠন সম্বন্ধে অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ও গঠনমূলক বর্ণনা করেছে যদি সেইসব বর্ণনা পূর্ণাঙ্গভাবে উল্লেখ করা হয় তা হলে একটি বৃহৎ গ্রন্থে রূপ নিবে সেইজন্য অত্যন্ত সংক্ষেপে কিছু উল্লেখ করা হল যারা বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি রহস্য পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে চান তাদেরকে ভাগবত পড়িতে হবে । ভাগবতের আলোকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য উপলব্ধি করতে হলে আমাদের কয়েকটি বিষয় সম্বন্ধে ধারণা নিতে হইবে ।

জড় জগত (Material World) আমরা যে জগতে বাস করি তাকে জড় জগত বলে । এই জগত জড় অর্থাৎ প্রাণহীন, ইহার সৃষ্টি ও ধ্বংস আছে । এই সৃষ্টি ও ধ্বংস কার্যক্রম চক্রাকারে চলিতে থাকে অর্থাৎ প্রথমে সৃষ্টি হয় তারপর কিছুদিন অবস্থান করে, কিছুদিন পর আবার ধ্বংস হয় । সুতরাং জড় জগতের সৃষ্টি, অবস্থান এবং ধ্বংস শাশ্বত নিয়মে নির্দিষ্ট সময় পর পর ঘটিতেছে । এইভাবে বিচার করিলে দেখা যায়, জড় জগতের সৃষ্টি ও ধ্বংস শাশ্বত ইহার কোন শুরু বা শেষ নাই ।

জড় জগত পুণঃপুণঃ সৃষ্টি ও ধ্বংস হয় ----

সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতং যান্তি মামিকাম্ ।
কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্ ।।
প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্নমবশং প্রকৃতের্বশাৎ ।। (ভাগবত ২/১০/৩)

অনুবাদ কল্পান্তে সম্পূর্ণ সৃষ্টি, যথা জড় জগত এবং প্রকৃতিতে ক্লেশ প্রাপ্ত জীব আমার দিব্য দেহে লয় প্রাপ্ত হয় এবং নতুন কল্পের আরম্ভে আমার ইচ্ছার প্রভাবে তাহারা পুণরায় প্রকাশিত হয় । এ ভাবে প্রকৃতি আমার নিয়ন্ত্রনে পরিচালিত হয় । আমার ইচ্ছার প্রভাবে তাহা পুণঃপুণঃ প্রকট হয় এবং লয় হয় ।

স এষ আদ্যঃ পুরুষঃ কল্পে কল্পে সৃজত্যজঃ ।
আত্মাত্মন্যাত্মনাত্মানং স সংযচ্ছতি পাতি চ ।। (ভাগবত ২/৬/৩৯)

অনুবাদ
সেই আদিপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মরহিত হওয়া সত্ত্বেও প্রথম অবতার মহাবিষ্ণু রূপে নিজেকে বিস্তার করিয়া এই ব্যক্ত জগতের সৃষ্টি করেন । তাঁহার মধ্যেই অবশ্য সৃষ্টি প্রকাশিত হয় এবং জড় পদার্থ ও জড় অভিব্যক্তি সবই তিনি স্বয়ং কিছুকালের জন্য তিনি তাহাদের পালন করেন এবং তারপর তিনি পুণরায় তাহাদের আত্মসাৎ করিয়া নেন । উপরের শ্লোক দুইটি থেকে বুঝা যায় জড়জগত পুণঃপুণঃ সৃষ্টি এবং ধ্বংস হচ্ছে । আমরা জড় জগতের একটি ব্রহ্মান্ডের মধ্যে অবস্থিত পৃথিবী নামক গ্রহে বসবাস করিতেছি । এরকম অনন্তকোটি ব্রহ্মান্ড নিয়া বিশ্ব ব্রহ্মান্ড গঠিত । ইহাকে জড়জগত বলে ।

ব্রহ্মান্ডের সংখ্যা --------

ক্ষিত্যাদিভিরেষ কিলাবৃতঃ সপ্তভির্দশগুণোত তরৈরন্ডকোশঃ । যত্র পতত্যণুকল্পঃ সহস্রকোটিকোটিভি স্তদনন্তঃ ।। (ভাগবত ৬/১৬/৩৭)

অনুবাদ
প্রতিটি ব্রহ্মান্ড মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ, মহতত্ত্ব এবং অহংকার এই সাতটি আবরণের দ্বারা আচ্ছাদিত এবং প্রতিটি আবরণ পূর্ববর্তী থেকে দশগুন অধিক । এই ব্রহ্মান্ডটি ছাড়া আরও কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড রহিয়াছে এবং সেইগুলি আপনার মধ্যে পরমাণুর মতো পরিভ্রমণ করিতেছে । তাই আপনি অনন্ত নামে প্রসিদ্ধ ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হইয়াছে ব্রহ্মান্ডের সংখ্যা কোটি কোটি । জড় জগত সম্বন্ধে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা সঠিক । কারণ বিজ্ঞানে বলা হয়েছে কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র লইয়া এই মহাবিশ্ব বা বিশ্বব্রহ্মান্ড গঠিত ।


ব্রহ্মান্ড কতগুলি গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র নিয়ে একটি ব্রহ্মান্ড গঠিত হয় ।যেমন – আমাদের সৌর পরিবারের সাথে আরো কিছু গ্রহ নক্ষত্র যোগ করিলে আমাদের ব্রহ্মান্ড গঠিত হয় ।ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে প্রত্যেকটি ব্রহ্মান্ডের একটি নির্দিষ্ট আয়তন এবং আবরণ রয়েছে।প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের ব্যাসের গভীরতা আলাদা আলাদা ।যেমন –আমাদের ব্রহ্মান্ডেরর ব্যাস

শ্রীশুক উবাচ এতাবানেব ভূবলয়স্য সন্নিবেশঃ।
প্রমাণলক্ষণতো ব্যাখ্যাতঃ॥(ভাগবত ৫/২১/১)

অনুবাদ
শুকদেব গোস্বামী বলিলেন–হে রাজন,এইভাবে আমি প্রমাণ এবং লক্ষণ প্রদর্শন পূর্বক ব্রহ্মান্ডের পরিমাণ বর্ণনা করিলাম।

এই শ্লোকে আমাদের ব্রহ্মান্ডের ব্যাসের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।পরবর্তী শ্লোকে দেখিব আমাদের ব্রহ্মান্ডের ব্যাস ৫০কোটি যোজন বা ৪০০কোটি মাইল।আমাদের ব্রহ্মান্ডকে ৪গুন ধরিয়া অন্য ব্রহ্মান্ডগুলি বড় হইতে থাকে অর্থাৎ আমাদের পরবর্তী ব্রহ্মান্ডের আয়তন ৫গুণ।ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে এইভাবে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি গুণ বড় ব্রহ্মান্ড রয়েছে।ব্রহ্মান্ডের আবরণ (Layer of Universe) প্রত্যকটি ব্রহ্মান্ড ৭টি আবরনের দ্বারা আবৃত।ব্রহ্মান্ডের আবরনের ধরন ও ব্যাস

বিকারৈঃ সহিতো যুক্তৈর্বিশেষাদিভিরাবৃতঃ। আন্ডকোশো বহিরয়ং পঞ্চাশৎ কোটিবিস্তৃতঃ॥(ভাগবত ৩/১১/৪০)

অনুবাদ
আটটি জড় উপাদানের সমন্বয়ে ষোড়শ প্রকার বিকার থেকে প্রকাশিত এই যে ব্রহ্মান্ড,তাহার অভ্যন্তর পঞ্চাশ কোটি যোজন বিস্তৃত এবং নিম্নলিখিত আবরণের দ্বারা আবৃত।

এইখানে ব্রহ্মান্ডের আবরণের কথা বলা হয়েছে এবং ব্রহ্মান্ডের ব্যাস ৫০কোটি যোজন তাহা উল্লেখ করা হয়েছে।এখানে ব্রহ্মান্ডের আবরণের যে উপাদান সেইগুলিকে বিকার গ্রস্ত বলা হয়েছে অর্থাৎ গ্যাসীয় অবস্থায় বিদ্যমান।যেমন–জলের আবরণ ইহা H2 ও O2গ্যাস দ্বারা গঠিত,ব্রহ্মান্ডের আবরণগুলি বিকার গ্রস্ত হওয়ার জন্য একটি ব্রহ্মান্ড থেকে অন্য ব্রহ্মান্ডে আলোক রশ্মি গমন করতে পারে । ব্রহ্মান্ডের আবরণ

দশোত্তরাধিকৈর্যত্র প্রবিষ্টঃ পরমাণুবৎ।
লক্ষ্যতেহন্তর্গতাশ্চান্যে কোটিশো হ্যন্ডরাশয়ঃ॥(ভাগবত ৩/১১/৪১)

অনুবাদ
ব্রহ্মান্ডকে আবৃত করে যে সমস্ত তত্ত্ব,তাহা উত্তরোত্তর দশগুন অধিক বিস্তৃত এবং সমস্ত ব্রহ্মান্ডগুলি এক বিশাল সমন্বয়ের পরমাণু মতো প্রতিভাত হয় ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হইয়াছে ব্রহ্মান্ডের প্রথম আবরন থেকে দ্বিতীয় আবরণ দশ গুন বড়,তৃতীয় আবরণ আবার দ্বিতীয় থেকে দশ গুন বড় এভাবে ক্রমান্বয়ে আবরণগুলির বিস্তৃতি বাড়িতে থাকে।শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে আরো বর্ণনা করা হয়েছে আবরণগুলি বৃত্তাকারে ব্রহ্মান্ডকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে এই জন্য ইহা দেখতে একটি পরমাণুর মত গোল।এখানে ব্রহ্মান্ডের আবরণকে পরমাণুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যাহা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।একটি পরমাণুতে প্রোটন ও নিউট্রনকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রন গুলি এমনভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে যাহাতে কেন্দ্রকে বাহির হইতে দেখ যায় ঠিক সেরকম ব্রহ্মান্ডের ৭টি আবরণ থাকা সত্ত্বেও ব্রহ্মান্ডকে বাহির হইতে দেখ যায় এবং ব্রহ্মান্ড থেকে আলোক নির্গত হইতে পারে।প্রত্যেকটি ব্রহ্মান্ড গোলাকার বল বা পরমাণু মত সেই বিষয়টিও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের ভিতরে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা রয়েছে যাহা গোলাকার।প্রতিটি ব্রহ্মান্ড ৭টি আবরণ দ্বারা আবৃত সেই আবরণগুলি বিভিন্ন পদার্থ দ্বারা গঠিত।

ব্রহ্মান্ডের আবরণের বিস্তৃতি এতদন্ডং বিশেষাখ্যং ক্রমবৃদ্ধৈর্দশোত্তরৈঃ।
তোয়াদিভিঃ পরিবৃতং প্রধানেনাবৃতৈর্বহিঃ।
যত্র্রলোকবিতানোহয়ং রূপং ভগবতো হরেঃ॥(ভাগবত ৩/২৬/৫২)

অনুবাদ
এই ব্রহ্মান্ডকে বলা হয় জড়া প্রকৃতির প্রকাশ।তাহাতে জল,অগ্নি,বায়ু,আকাশ,অহংকার এবং মহত্তত্ত্বের যে আবরণ রহিয়াছে,তাহা ক্রমান্বয়ে পূর্বটির থেকে পরবর্তী আবরণটি দশ গুণ অধিক এবং তাহার শেষ আবরনটি হইতেছে প্রধানের আবরণ।এই ব্রহ্মান্ডে ভগবানের বিরাটরূপ বিরাজ করিতেছে,যাহার দেহের একটি অংশ হচ্ছে চতুর্দশ ভুবন।এই শ্লোকে ব্রহ্মান্ডের ৭টি আবরণের পদার্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।প্রতিটি আবরণ পূবটির থেকে ১০ গুণ চওড়া।যেমন ব্রহ্মান্ডের প্রথম আবরণটি জলের তৈরী এখানে জল মানে জলের বিকার অবস্থা যা আগের শ্লোকে দেখানো হয়েছে অর্থাৎ জলের বায়বীয় অবস্থায় অবস্থান করে।ব্রহ্মান্ডের ব্যাস ৫০ কোটি যোজন অর্থাৎ জলের আবরণ ৫০×১০=৫০০ কোটি যোজন পুরু।এইভাবে পরবর্তী আবরণগুলি বৃদ্ধি পেতে থাকে।

যদি ব্রহ্মান্ডের ব্যাস X ধরা হয় তা হলে ব্রহ্মান্ডের আবরণকে নিম্নলিখিত ভাবে প্রকাশ করা যায়।

ব্রহ্মান্ডের আবরণগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

১ম আবরণ১০×X=১০Xবিস্তৃতি/চওড়া জল (বিকার অবস্থা)দিয়ে তৈরী

২য় আবরণ১০X×১০=১০০X বিস্তৃতি/ চওড়া আগুন দিয়ে তৈরী

৩য় আবরণ১০০X×১০=১০০০X বিস্তৃতি/ চওড়া বায়ু দিয়ে তৈরী

৪র্থ আবরণ১০০০X×১০=১০০০০X বিস্তৃতি/চওড়া আকাশ(ইথার)

৫ম আবরণ ১০০০০X×১০=১০০০০০X বিস্তৃতি/চওড়া অহংকার(সূক্ষ্ম পদার্থ যা সাধারণভাবে অনুভব করা যায় না কিন্তু ইহা জড় পদার্থ)

৬ষ্ঠ আবরণ১০০০০০X×১০=১০০০০০০X বিস্তৃতি/চওড়া মহতত্ত্ব (বিশ্বব্রহ্মান্ড তৈরীর প্রাথমিক পদার্থ যা দ্বারা ব্রহ্মান্ড তৈরী হয়)

৭ম আবরণ১০০০০০০X×১০=১০০০০০০০০X বিস্তৃতি/চওড়া প্রধান(সূক্ষ্ম অব্যক্ত বস্তু, যা অনুভব করা যায় না, ইহাকে সাধারণভাবে শূন্যস্থান বলা যাইতে পারে)

মোট–১১১১১১১০X বিস্তৃতি/চওড়া

উপরের হিসাব থেকে দেখা যায় ব্রহ্মান্ডের মোট আবরণের বিস্তৃতি ব্রহ্মান্ডের ব্যাসের ১কোটি ১১লক্ষ গুণ বড়, এভাবে হিসাব করলে দেখা যায় আমাদের পার্শ্ববর্তী ব্রহ্মান্ডের আবরণের বিস্তৃতি আমাদের চেয়ে একটু বেশী কারণ আমাদের নিকটতম ব্রহ্মান্ডটি ৫গুণ আর আমাদের ব্রহ্মান্ডটি ৪গুণ সুতরাং আমাদের চেয়ে কিছুটা বড় সেজন্য সেটির আবরণ আমাদের চেয়ে আরো একটু পুরু হইবে।

আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাজাগতিক পদার্থ (Interstellar Galactic Material)দুইটি নক্ষত্র বা ছায়াপথের (Milky Way) মাঝে বিজ্ঞানীরা বিশাল বিশাল জায়গা শূন্যস্থান দেখতে পাইতেছেন ।এ জায়গাগুলি ধূলিবালিসহ বিভিন্ন তরল ও গ্যাসীয় পদার্থ দ্বারা ভর্তি,বিজ্ঞানীরা মনে করছেন,দুইটি ছায়াপথের মাঝের আয়তন এত বেশী যাহা ছায়াপথ বা নক্ষত্রের নিজের আয়তন থেকে অনেক বেশী।এই জন্য Interstellar Galactic Material কে তাহারা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন ।বিজ্ঞানীরা যাহাকে আন্তঃনাক্ষত্র্রিক মহাজাগতিক পদার্থ বলছে ভাগবতের বর্ণনা অনুসারে সেটা হল ব্রহ্মান্ডের আবরণ এই আবরণ জল, আগুন, বায়ু, আকাশ (ইথার),মহতত্ত্ব ইত্যাদি দ্বারা গঠিত।সেজন্য ইহাকে ধূলাবালি পূর্ণ অসম বলিয়া মনে হয় ।ব্রহ্মান্ডের আবরণের দৈর্ঘ্য উক্ত ব্রহ্মান্ডের ব্যাসের ১ কোটি ১১ লক্ষ গুণ বড়।সুতরাং ব্রহ্মান্ডের নিজস্ব আয়তন থেকে আবরন অনেক বড়, সেটাই বিজ্ঞানীরা প্রতিপন্ন করেছেন ।তারা বলছেন আন্তঃনক্ষত্রিক জাগতিক পদার্থের পরিমান অনেক বেশি ।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন,আদিম মহাবিশ্ব সম্ভবত অত্যন্ত বিশৃংঙ্খলা এবং নিয়ম বিহীন অবস্থায় ছিল । বিজ্ঞানী সমাজের ধারনা মহাবিশ্ব যদি সত্যিই স্থানিকভাবে অসীম হয় কিংবা মহাবিশ্বগুলির সংখ্যা যদি অনন্ত হয় তা হলে সম্ভবত কোন স্থানে এমন কতগুলি বৃহৎ অঞ্চল থাকবে যেগুলো হয়েছিল মসৃণ-সমরূপভাবে । ব্যাপারটা অনেকটা সেই বহূ পরিচিত বাঁদরের বিরাট দলের মত । তাহারা টাইপরাইটারের আঙ্গুল ঠুকিয়ে চলিয়াছে – যাহা ছাপা হচ্ছে তাহার বেশির ভাগটাই ভূষিমাল কিন্তু দৈবাৎ তারা শেক্সপিয়ারের একটি সনেটও টাইপ করিয়া ফেলিতে পারে । তেমনিভাবে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে এমন কি হতে পারে যে আমরা এমন একটি অঞ্চলে রয়েছি যেটা ঘটনাচক্রে মসৃন এবং নিয়মবদ্ধ ? আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটি খুবই অসম্ভব মনে হতে পারে কারণ ওই রকম মসৃণ অঞ্চলের চাইতে বিশৃঙ্খল এবং নিয়মবিহীন অঞ্চলের সংখ্যা অনেক বেশি । কিন্তু যদি অনুমান করা যায় মসৃন অঞ্চলগুলিতেই নীহারিকা এবং তাঁরকা গঠিত হয়েছে এবং এই সমস্ত অঞ্চলেই আমাদের মত আত্মজ (self replicating) সৃষ্টি করিতে সক্ষম জটিল জীব বিকাশের মতো সঠিক পরিস্থিতি রয়েছে এবং এই জীবরাই প্রশ্ন করতে সক্ষম মহাবিশ্ব এরকম মসৃণ কেন ?এটা হইল যাহাকে নরত্বীয় নীতি (anthropic princple) বা মানবতত্ত্ব নীতি বলে ।

বিজ্ঞানীরা এই আলোচনা থেকে প্রতিপন্ন করা যায় মহাবিশ্ব যদি অসীম হয় এবং ব্রহ্মান্ডের সংখ্যা অনন্ত হয় তা হলে বৃহৎ বৃহৎ মসৃণ সমরূপ অঞ্চল থাকবে । বিজ্ঞানীদের এই মতবাদের সাথে ভাগবত একমত । কারণ ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মান্ডের সংখ্যা অনন্ত কোটি এবং প্র্রত্যেকটি ব্রহ্মান্ডে গ্রহ নক্ষত্র সজ্জিত সুশৃঙ্খল সৌর পরিবার রয়েছে । প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে একটি সূর্য ব্রহ্মান্ডের মাঝখানে অবস্থান করিয়া সম্পূর্ণ ব্রহ্মান্ডকে তাপ ও আলোক প্রদানের মাধ্যমে জীবিত রেখেছে এবং প্রতি ব্রহ্মান্ডে আমাদের চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান মানুষসহ ৮৪ লক্ষ প্রজাতির জীব রয়েছে । সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞানীদের এই ধারনার সাথে ভাগবতের মিল আছে । এই আলোচনার অন্য অংশে বর্ণনা করা হয়েছে কতগুলি বানর টাইপ করতে করতে ঘটনাচক্রে যেমন শেক্সপিয়ারের একটি সনেট কবিতা টাইপ করতে পারে ঠিক সেইরকম কোন ঘটনা চক্রে এই মহাবিশ্বে মসৃণ অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে ফলে মানুষের মত বুদ্ধিমান জীবের সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে।ভাগবত এই অংশের তীব্র প্রতিবাদ করয়া বলেছে এই মহাবিশ্বে কোন কিছু ঘটনা চক্রে হঠাৎ ঘটে নাই সকল সৃষ্টির পিছনে সৃষ্টিকর্তার সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রন রহিয়াছে ।

অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডে সুশৃংঙ্খল সাজানো পরিবেশ রয়েছে যস্য প্রভা প্রভবতো জগদন্ডকোটিকোটিষবশেষবসুধাদিবিভূতিভিন্নম্ । তদ্ ব্রহ্ম নিষ্কলমনন্তমেষভ ূতং গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।।(ব্রহ্ম- সংহিতা ৫/৪০) অনুবাদ অনন্তকোটি ব্রহ্মান্ডে অনন্ত বসূধাদি বিভূতির দ্বারা যিনি ভেদপ্রাপ্ত হইয়াছেন, সেই পূর্ণ, নিরবিচ্ছিন্ন এবং অশেষভূত ব্রহ্ম যাঁহার প্রভা, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি । অনন্তকোটি ব্রহ্মান্ডের প্রতিটি ব্রহ্মান্ডই বিভিন্ন আকৃতি এবং পরিবেশ সমন্বিত অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্রে পূর্ণ । সে সমস্ত প্রকাশিত হয়েছে অনন্ত অদ্বয়-ব্রহ্ম থেকে, যাহা পূর্ণ জ্ঞানে বিরাজমান । সেই অন্তহীন ব্রহ্মজ্যোতির উৎস হচ্ছে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীগোবিন্দের চিন্ময় দেহ এবং সেই গোবিন্দই আদি পুরুষরূপে বন্দিত হয়েছেন।

এখানে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মান্ডের সংখ্যা অনন্তকোটি এবং প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের সুনির্দিষ্ট সজানো গোছানো সুন্দর পরিবেশ রয়েছে যা জীব বসবাসের উপযুক্ত এবং ব্রহ্মান্ডগুলি ভগবাণের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে । সুতরাং বিজ্ঞানীদের যে ধারনা মহাবিশ্বের মসৃণ অঞ্চল ঘটনাচক্রে সৃষ্টি হয়েছে ভাগবত সেটা সমরর্থন করে না ।। আসলে যে বিষয়টি ঘটছে তা হল একটি ব্রহ্মান্ডের আবরণগুলির দৈর্ঘ্য ইহর ব্যাসের ১ কোটি ১১ লক্ষ গুণ বড় এবং আবরণ আগুন, পানি, বায়ু ইত্যাদি দ্বারা গঠিত । সেজজন্য ইহা অসম, অস্থির, বিশৃংঙ্খল বলিয়া মনে হয় । আমরা যদি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের কথা বিবেচনা করি তা হলে দেখা যাবে মসৃণ ব্রহ্মান্ডের তুলনায় অমসৃণ জায়গা ১ কোটি ১১ লক্ষ গুণ বেশী । এজন্য বিজ্ঞানীরা এই মহাবিশ্বকে অমসৃন বিশৃংঙ্খল বলিয়া ভাবিতেছেন । বিজ্ঞানীরা এ বিশাল পরিমাণ আন্তঃনক্ষত্রিক বস্তু লয়ে গুরুত্ব সহকারে গবেষনা করছেন । এ বিষয়ে বিজ্ঞানী বয়চটের অভিমত আন্তঃছায়াপথ বা আন্তঃনাক্ষত্রিক (Interstellar Galactic Material) সংযোগকারী এ সব গ্যাস পিন্ডের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অত্যাধিক।কেননা “বিশ্ব সৃষ্টির বিবর্তন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে যে ধারণা এখন চালু রয়েছে” – এসব সংযোগকারী গ্যাসপিন্ড সেই ধারণা বহুলাংশে বদলে দিতে পারে । বিজ্ঞানীদের ধারনা বিশ্বসৃষ্টির বিবর্তনে হয়ত এই আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুর ভূমিকা রয়েছে, সেজন্য তারা এই বস্তুগুলিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন । আমি আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণ করেছি ভাগবত যাকে ব্রহ্মান্ডের আবরণ বলিতেছে বিজ্ঞানীরা সেটাকে আন্তঃনাক্ষত্রিক পদার্থ বলিতেছেন ।

লিখেছেনঃ সুশান্ত বন্দ


Share:

বেদ ও বিজ্ঞান by নিলয় দাস

পৃথিবী ও গ্রহসমূহের গতি ও মধ্যাকর্ষন শক্তি
স্যার আইজাক নিউটন ও অন্যান্য অনেক বিজ্ঞানীদের কল্যানে আজ এ তত্ত প্রতিষ্ঠিত যে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহসমূহ সূর্যকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে।কিন্তু এরও হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং পবিত্রতম ধর্মগ্রন্থ বেদ এ সম্পর্কে কি বলেছে তার কিছু নমুনা দেখে নেয়া যাক।
ঋগবেদ ১০.২২.১৪
অহস্ত য়দপদি(য়দ-অপদি)
বরধত খ শচীবির
বেদ্যানাম । সুষমপরি প্রদক্ষিনিত্‍ বিশ্যব্যে নি সিস্নাথা।।
অনুবাদ-
"পৃথিবীর নেই হস্ত বা পদ,তবুও তা গতিশীল।এর উপর অবস্থিত বস্তুসমূহ ও এটার সাথে গতিশীল।এটি সূর্যের চারদিকে ঘূর্নায়মান।"
এখানে,
অহস্ত-হাতহীন
অপদ-পাহীন
খ-পৃথিবী
বরধত-গতিশীল
শুষুনাম পরি-উপরিস্থিত বস্তুসমূহ।
ঋগবেদ ১০.১৪৯.১
সবিতা যন্ত্রেহ পৃথিবী- মরামদক্ষম্ভলে(পৃথিবীম-অরামদ) সবিতা
দ্যমধত(দ্যম অধ্যত)।
অশ্বমিবাদুক্ষদ( অশ্বম-ইব-অধুক্ষত) ধুনিম অন্তরীক্ষ মতুরতেবাধ
য় সবিতা সমুদ্রম।।
অনুবাদ-
"সূর্য তার পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহসমূহকে তার আকর্ষনশক্তির সাহায্যে বেধে রেখেছে।এটার চারপাশে সেগুলো ঘূর্নায়মান ঠিক যেমন প্রশিক্ষক এর চারপাশে প্রশিক্ষনরত অশ্ব বলগা দিয়ে ঘোরে।"
এখানে,
সবিতা-সূর্য
যন্ত্রেহ-বলগা
পৃথিবীম-পৃথিবী
অরামদ-বেধে রাখা
দ্যম অধ্যত-অন্য গ্রহসকল
অশ্বম-ইব-অধুক্ষত-ঠিক যেন ঘোড়ার মত
ঋগবেদ ৮.১২.২৮
"হে ঈশ্বর,তোমার শক্তিবলে যাতে রয়েছে আকর্ষন এবং গতিরক্ষমতা,তার মাধ্যমে তুমি সারা জগতে রেখেছ ভারসাম্যপূর্ন"
ঋগবেদ ১.৩৫.৯
হিরস্যপানি সবিতা বিকারসভির উভে দ্যবা পৃথিবী অন্তর ইযতে।
অপমিবাম বাধাতে য়েতি
সূর্যম অভি কষ্নেন রাজস ধ্যম য়োতি॥
অনুবাদ-
"সূর্য নিজপথে ঘোরে এবং তা পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহসমূহকে আকর্ষনশক্তি দ্বারা এমন উপায়ে চালিত করে যাতে তাদের একে অপরের সাথে সংঘর্ষ না হয়"
যজুর্বেদ ৩৩.৪৩
"সূর্য ঘুরছে তার নিজ কক্ষপথে সাথে নিয়ে সকল গ্রহকে আকর্ষনশক্তির বলে"
ঋগবেদ ১.১৬৪.১৩
"সূর্য ঘোরে তার নিজ কক্ষপথে এবং এর আকর্ষনশক্তির প্রভাবে অন্যান্য গ্রহসমূহ ও ঘোরে কারন সূর্য তাদের তুলনায় অধিক ভারী(মহাকর্ষ এর উপর ভর-শক্তি সমীকরন এর প্রভাব)


বেদ ও তড়িত্‍শক্তি
অথর্ববেদ বিভিন্ন প্রায়োগিক বিদ্যার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ তা আমরা সবাই জানি।দেখে নেয়া যাক তড়িত্‍ শক্তি সম্পর্কে পবিত্র এই জ্ঞানের উত্‍স কি বলেছে-

অথর্ববেদ ২০/৭/২
"নব য়ো নবতি পুরো বিভেদ
বাহভোত জাসা অহি ছ
বৃত্রাহাভদিত"
অনুবাদ-
বিদ্যুত্‍ যা এর বাহুর(ইলেকট্রন এবং প্রোটন)সাহায্যে পদার্থকে ৯৯টি শাখায় বিভক্ত করে যেসকল সূর্যালোকে অবস্থান করে।
এখানে আধুনিক বিজ্ঞানীদের কর্তৃক বর্ণিত ৯৯টি কনা যা সকল পরমানুর তড়িত্‍ ভাঙ্গন এর ফলে সৃষ্ট তা বলা হয়েছে।উল্লেখ্য যে এদের প্রত্যেকটিকে সূর্যকর্তৃক বিকীর্ন অতিবেগুনী রশ্মি তে পাওয়া যায়।

অথর্ববেদ ২০/০৭/৩
"সন ইন্দ্রঃ শিবাঃ য়ক্ষবাদ গোমদববম উরধারেব দোহাতে"
অনুবাদ-এই অসাধারন শক্তি আমাদের বন্ধু হতে পারে যার মাধ্যমে আমরা আমাদের বাড়িঘর আলোময় করে তুলতে পারি,পারি শস্যক্ষেত্রে কাজে লাগাতে।

অথর্ববেদ ২০.৭.৪
"ইন্দ্র নতুবিদন্ধ সুতং সোমাং হর্য পুরুষ্তুতে পিবা বৃহসত্‍ ততৃপিম"
অনুবাদ-জ্ঞানীদের পরামর্শ অনুসারে আমরা একে কাজে লাগাতে পরি দ্রব্যাদি সংরক্ষনে(রেফ্রিজারেটর) তাদের মাধ্যমে যারা এতে দক্ষ।এটিকে নিরাপদে ব্যবহার করি যাতে এটি বিপদ সৃষ্টি না করে।

অথর্ববেদ ২০.৩.১
"বজ্রিনেম সন্দিনাম সোম্যমমদ ইন্দ্রম রথে বহতা হর্যতাহরি পুরুনাস্ময় সবনানি হর্যাতা ইন্দ্রারা সোমা হারায়ো দধিবীরে"
অনুবাদ-সেই দ্রুত গতিশীল দুই বস্তু(ইলেকট্রন ও প্রোটন) যার আকর্ষন ও বিকর্ষন ক্ষমতা আছে তা বিদ্যুত্‍ চালনা করে।এটি বজ্রের ন্যয় শক্তিশালী,আমাদের উপকারী।এটি উত্‍পন্নের জন্য রয়েছে তরল উত্‍স(বিদ্যুত্‍ উত্‍পন্নের তরল জ্বালানী)
অথর্ববেদ ২০.৩.২
"আড়ং কামোয়ো হর্যো দধীনবীরে স্থিরানো হিন্বানোহায়াযো হরি তুরা অর্বধ্বিয়র হরিবিজোড়সামিয়াত ে স অস্য কামাম হরিবন্তমানসে"
অনুবাদ-সেই দুই গতিশীল শক্তি দুই দিকে গতিশীল(ইলেকট্রন ও প্রোটন এর বিপরীত দিকে গতি) যার মাধ্যমে উত্‍পন্ন শক্তিকে আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারি।
এছাড়া বিদ্যুত্‍ এর আরো বিভিন্ন ব্যবহার রয়েছে -
তৈত্তিরীয় উপনিষদ ৭.৩.২
এ জলবিদ্যুত্‍
তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৩.২ এ তাপবিদ্যুত্‍
ঋগবেদ ১.৩২.১৩ এ মেঘে মেঘে ঘর্ষনের ফলে বিদ্যুত্‍ উত্‍পাদনের উল্লেখ
ঋগবেদ ১.৬.৫ এ বায়ুর মাধ্যমেবিদ্যুত্‍ শক্তি উত্‍পাদন
ঋগবেদ ১.১৬৮.৮ এ বলা হয়েছে যখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ে তখন নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয় আর সেই গতিময় জল থেকে বিদ্যুত্‍ উত্‍পাদন সম্ভব।
ঋগবেদ ৫.৮৭.১০
এ শব্দ বড় করতে বিদ্যুতের ব্যবহার(মাইক্রো ফোন)
বিদ্যুত্‍ এর ব্যবহার আরো পাবেন
ঋগবেদ ৫.৫৪.১১
৫.৫২.৬
৩.১.১৪
৫.৮৬.১৩
ধন্যবাদ সকলকে,নমস্কার।(বিঃদ্রঃ পবিত্র অথর্ববেদের অনুবাদ নেয়া হয়েছে শ্রী দেবীচাঁদ এর অনুবাদ থেকে)
- See more at: http://bangalihindupost.blogspot.in/2012/08/blog-post_13.html#sthash.1WaTl1gY.dpuf
Share:

০৯ এপ্রিল ২০১৫

ভাগবতের আলোকে মানব শরীর সৃষ্টি (পর্ব ০৩)

ব্রহ্মা ৩ বার বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন

ভগবান্‌ ব্রহ্মা র্কাৎস্ন্যেন ত্রিরন্বীক্ষ্য মণীষয়া ।
তদধ্যবসাৎ কূটস্থো রতিরাত্মন্‌ যতো ভবেৎ ।। (ভাগবত ২/২/৩৪)
অনুবাদ
মহাত্মা ব্রহ্মা, গভীর মনোনিবেশ সহকারে একাগ্রচিত্তে তিনবার বেদ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করিয়া স্থির করিয়াছিলেন যে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকর্ষণই হইতেছে ধর্মানুষ্ঠানের পরম পূর্ণতা ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মা ৩ বার বেদ অধ্যয়ন করেন এবং কৃষ্ণ যে সব কিছুর মূল সেটা উপলব্ধি করতে পারেন । এখন প্রশ্ন হতে পারে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথমে ব্রহ্মা বেদ কোথায় পেল । এ বিষয়ে ভাগবতে বলা হয়েছে মহাপ্রলয়ের সময় এই মহাবিশ্ব যখন ধ্বংস হয় তখন ভগবান মৎস্যরূপে ধারণ করে একটি নৌকার মাধ্যমে বেদ রক্ষা করেন, পরবর্তীতে আবার যখন সৃষ্টি কার্য শুরু হয় তখন ভগবান ব্রহ্মাকে বেদ দান করেন, সেই বৈদিক জ্ঞান দ্বারা ব্রহ্মা মহাবিশ্বের সৃষ্টি করেন ।

ভগবান বেদ উদ্ধার করে ব্রহ্মাকে দান করেন

বেদান্‌ যুগান্তে তমসা তিরস্কৃতান্‌
রসাতলাদ্‌যো নৃতুরঙ্গবিগ্রহঃ
প্রত্যাদদে বৈ করয়েহভিযাচতে
তৈস্মে নমস্তেহবিতথেহিতায় ইতি ।। (ভাগবত ৫/১৮/৬)
অনুবাদ
কল্পান্তে মূর্তিমান অজ্ঞানরূপী দৈত্য যখন সমস্ত বেদ অপহরণ করিয়া রসাতলে নিয়া গিয়েছিল, তখন ভগবান হয়গ্রীব মূর্তি প্রকট করিয়া বেদ উদ্ধার করিয়াছিলেন এবং ব্রহ্মা প্রার্থনা করিলে তিনি তাঁকে তা প্রদান করিয়াছিলেন । সেই সত্যসংকল্প পরমেশ্বর ভগবানকে সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ভগবান রসাতলে নামক গ্রহ থেকে বেদ এনে ব্রহ্মাকে প্রদান করলেন । বৈদিক শাস্ত্র বা বেদ শুধুমাত্র পৃথিবীতে বর্তমান সেটা নয় । এই মহাবিশ্বের সকল ব্রহ্মাণ্ডে বেদ বিদ্যমান ।

ভগবান বেদ রক্ষা করেন

মৎস্যো যুগান্তসময়ে মনুনোপলবদ্ধঃ ক্ষোণীময়ো খিলজীবনিকায়কেতঃ ।
বিস্রংসিতানুরুভয়ে সলিলে মুখান্মে আদায় তত্র বিজহার হ বেদমার্গান্‌ ।। (ভাগবত ২/৭/১২)
অনুবাদ
কল্পান্তে সত্যব্রত নামক ভাবী বৈবস্তত মনু দেখিতে পাইবেন যে মৎস্যাবতাররূপে ভগবান পৃথিবী পর্যন্ত সর্বপ্রকার জীবাত্মাদের আশ্রয় । কেননা কল্পান্তে প্রলয় বারির ভয়ে ভীত হইয়া বেদ-সমূহ আমার (ব্রহ্মার) মুখ থেকে নির্গত হয় এবং ভগবান তখন সেই বিশাল জল রাশি দর্শন করিয়া উৎফুল্ল হন এবং বেদসমূহকে রক্ষা করেন ।

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে মহাপ্রলয়ের সময় ভগবান বেদ রক্ষা করেন । এই আলোচনা থেকে বলা যায় সৃষ্টির প্রথমে ব্রহ্মা যে বেদ প্রাপ্ত হয় সেটা ভগবান ব্রহ্মাকে দান করেন যা আগে থেকে ছিল ।

(চলবে............)

সংকীর্তন মাধব‎
Share:

০৭ এপ্রিল ২০১৫

ভাগবতের আলোকে মানব শরীর সৃষ্টি (পর্ব ০২)

ব্রহ্মা সরাসরি ভগবানের নিকট থেকে দেহ লাভ করেন
সর্ববদময়েনেদমাত্মানাত্মাত্মযোনিনা ।
প্রজাঃ সৃজ যথাপূর্বং যাশ্চ ময্যনুশেরতে ।। (ভাগবত ৩/৯/৪৩)
অনুবাদ – আমার নির্দেশ অনুসরণ করিয়া, পূর্ণ বৈদিক জ্ঞানের দ্বারা এবং সর্ব কারণের পরম কারণ আমার থেকে সরাসরিভাবে তুমি যে দেহ প্রাপ্ত হইয়াছ, তাহার দ্বারা তুমি এখন পূর্বের মতো প্রজা সৃষ্টি কর ।
এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মা সরাসরি ভগবানের শরীর থেকে তার শরীর লাভ করেছেন । এই বিষয়টি সহজেই উপলব্ধি করা যায় সেটা হল এক জনের শরীর থেকে আর একটি শরীর তৈরী করা যায়, বিজ্ঞানীরা ইদানিং ক্লোনিং নামক একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন যার মাধ্যমে একজনের শরীর থেকে আরো একটি শরীর সৃষ্টি করা যায়, সুতরাং বলা যায় ভাগবতে ব্রহ্মার সৃষ্টি বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক ।
এখন প্রশ্ন হতে পারে ভগবানের সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে ? সেই প্রশ্নের উত্তরে বেদান্ত সূত্রে বলা হয়েছে
জন্মদাস্য যতঃ
অনুবাদ – এই মহাবিশ্ব সহ যাবতীয় কিছু ভগবান থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তিনি অজাত অর্থাৎ তাঁহার কোন সৃষ্টি নাই, তিনি অনাদি অর্থাৎ সবকিছুর আদিতে তিনি ছিলেন ।
সুতরাং বলা যায় ভগবানের কোন সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই কিন্তু সবকিছু তাঁহার নিকট থেকে সৃষ্টি হয়েছে ।
ব্রহ্মার শরীর মহত্তত্ত্ব দ্বারা সৃষ্টি
যস্যাদ্য আসীদ্‌ গূণবিগ্রহো মহান্‌ বিজ্ঞানধিষ্ণ্যো ভগবানজঃ কিল ।
যৎসম্ভবোহহং ত্রিবৃতা স্বতেজসা বৈকারিকং তামসমৈন্দ্রিয়ং সৃজে ।। (ভাগবত ৫/১৭/২২)
অনুবাদ – ভগবান থেকেই ব্রহ্মার উৎপত্তি হয়, যাঁহার শরীর মহত্তত্ত্বের দ্বারা নির্মিত এবং যিনি রজোগুণ-প্রধান বুদ্ধির আশ্রয় । সেই ব্রহ্মা থেকে অহংকার তত্ত্ব আমি রুদ্র জন্ম গ্রহণ করিয়াছি । আমার শক্তির দ্বারা আমি অন্য সমস্ত দেবতাদের, পঞ্চমহাভূত এবং ইন্দিয়বর্গের সৃষ্টি করি ।
এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রহ্মার শরীর ভগবান থেকে সৃষ্টি হয়েছে যা মহত্তত্ত্ব দ্বারা তৈরী । মহত্তত্ত্ব এমন একটি পদার্থ যার মধ্যে এই মহাবিশ্বের সকল প্রাণীর বীজ বা জেনেটিক ইনফরমেশন নিহিত আছে ।
মহত্তত্ত্বের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশকারী বীজ নিহিত আছে
ততোহভবন্‌ মহত্তত্ত্বব্যক্তাৎকালচোদিতাৎ
বিজ্ঞানাত্মাত্মদেহস্থং বিশ্বং ব্যঞ্জংস্তমোনুদঃ ।। (ভাগবত ৩/৫/২৭)
অনুবাদ
তারপর কালের প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে মহত্তত্ত্ব আবির্ভূত হইয়াছিল এবং এই বিশুদ্ধ সত্ত্বস্বরূপ মহত্তত্ত্বে ভগবান তাঁহার স্বীয় শরীর থেকে ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশকারী বীজ বপন করিয়াছিলেন ।
এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে মহত্তত্ত্বের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির বীজ নিহিত আছে যা দ্বারা ব্রহ্মার শরীর তৈরী । সুতরাং বলা যায় ব্রহ্মার শরীর হতে এই মহাবিশ্বের সকল প্রাণী সৃষ্টি হতে পারে ।
মহত্তত্ত্বের বিস্তৃতি
বিশ্বমাত্মগতং ব্যঞ্জন্‌ কূটস্থো জগদষ্কুরঃ
স্বতেজসাপিবত্তীব্রমাত্মপ্রস্বাপনং তমঃ ।। (ভাগবত ৩/২৬/২০)
অনুবাদ – এইভাবে, বৈচিত্র্য প্রকাশ করিবার পর, জ্যোতির্ময় মহত্তত্ত্ব, যাহার মধ্যে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের বীজ নিহিত রহিয়াছে, যাহা সমগ্র জগতের অঙ্কুর-স্বরূপ এবং প্রলয়ের সময় যাহা বিনষ্ট হইয়া যায় না, প্রলয়ের সময় তাহার জ্যোতিকে আবৃত করে যে তম, তাহাকে পান করিয়াছিল অর্থাৎ লোপ করিয়াছিল ।
এই শ্লোকের ব্যাখ্যা পূর্বে করা হয়েছে এখানে সংক্ষেপে বলা যায় মহত্তত্ত্ব হল সমগ্র জগত প্রকাশের অঙ্কুর স্বরূপ অর্থাৎ এই মহাবিশ্বে যে ৮৪ লক্ষ রকমের প্রজাতি আছে তাদের সৃষ্টির বীজ বা জেনেটিক ইনফরমেশন এই মহত্তত্ত্বের মধ্যে আছে ।
এই সকল আলোচনা থেকে উপলব্ধি করা যায় ব্রহ্মার শরীর সরাসরি ভগবান থেকে লাভ করেছে এবং তা মহত্তত্ত্ব নামক পদার্থ দ্বারা তৈরী ।
ভগবানের নাভি পদ্ম থেকে ব্রহ্মার জন্ম
তস্য নাভেঃ সম্ভবৎ পদ্মকোষো হিরন্ময়ঃ ।
তস্মিঞ্জজ্ঞে মহারাজ স্বয়ম্ভূশ্চতুরাননঃ ।। (ভাগবত ৯/১/৯)
অনুবাদ – হে মহারাজ পরীক্ষিৎ ! সেই পরম পুরুষ ভগবানের নাভি থেকে একটি স্বর্ণময় পদ্ম উদ্ভূত হইয়াছিল, সেই পদ্মে চতুর্মুখ ব্রহ্মার জন্ম হইয়াছিল ।
এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে ভগবানের নাভি থেকে ব্রহ্মার জন্ম হয় । ব্রহ্মা সৃষ্টির পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মাকে এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির নির্দেশ প্রদান করলেন । মহাবিশ্ব সৃষ্টির নির্দেশ পাওয়ার পর ব্রহ্মা কিভাবে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা যায় সেই বিষয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন তখন ভগবান ব্রহ্মার হৃদয়ে বেদের জ্ঞান প্রকাশ করলেন । সেই বৈদিক জ্ঞান দ্বারা ব্রহ্মা সৃষ্টি কার্য করতে লাগলেন ।
(চলবে......)

সংকীর্তন মাধব
Share:

০৬ এপ্রিল ২০১৫

ভাগবতের আলোকে মানব শরীর সৃষ্টি (পর্ব ০১)

ভাগবতে মানব শরীর সৃষ্ট বিষয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে তা অত্যন্ত গভীর এবং ব্যাপক তাই সংক্ষেপে আপনাদের সামনে তুলে ধরব ।

ভাগবতে আলোকে মানব শরীর সৃষ্টিকে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়


১) যৌন জীবন বহির্ভূত পদ্ধতি
২) যৌন জীবন পদ্ধতি

যৌন জীবন বহির্ভূত পদ্ধতি
যৌন জীবন ছাড়া একটি প্রাণী হতে নতুন একটি প্রাণী তৈরী করা সম্ভব । এই বিষটি বিজ্ঞানীরা ইদানিং প্রমাণ করেছেন । এর নাম ক্লোনিং পদ্ধতি । এই বিষয়ে ভাগবতে বিস্তারিত বর্ণনা করা আছে ।

ভাগবতে বর্ণনা করা আছে মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ নামক পঞ্চভূত এবং ১৯টি সূক্ষ্ম তত্ত্ব মোট ২৪টি তত্ত্বের সমন্বয়ে আমাদের শরীর সৃষ্টি হয় । মানব শরীর বিশ্লেষন করলে পঞ্চমহাভূতসহ আরো অন্যান্য তত্ত্ব পাওয়া যাবে কিন্তু সেগুলোর সমন্বয় করে মানব শরীর সৃষ্টি করা স্মভব নয় । চিনিকে বিশ্লেষণ করলে জল এবং কয়লা পাওয়া যায় কিন্তু জল এবং কয়লার দ্বারা পুনরায় চিনি তৈরী করা সম্ভব না । চিনি তৈরীর জন্য আঁখ নামক উদ্ভিদের প্রয়োজন হয় যা চিন্ময় শক্তি আত্মার প্রভাবে সৃষ্টি হয় । আঁখ গাছে আত্মা থাকার কারণে গাছটি বড় হয়ে আঁখের রস সৃষ্টি করে যার দ্বারা চিনি তৈরী হয় অর্থাৎ চিনি তৈরীর জন্য আত্মা নামক শক্তির প্রয়োজন । উপর থেকে নীচের দিকে নামা সম্ভব কিন্তু নীচ হতে উপরে যাওয়া সম্ভব না সুতরাং বলা যায় আত্মার প্রভাবে যে বস্তুর সৃষ্টি হয় সেটির মধ্যে যে জড় বস্তু থাকে সেগুলির দ্বারা আগের বস্তু সৃষ্টি করা সম্ভব নয় ।

ঠিক সেরকম মানব শরীরকে বিশ্লেষণ করলে পঞ্চমহাভূত অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, বোম (মাটি, জল, আগুণ, বায়ু, আকাশ বা ইথার) পাওয়া যাবে কিন্তু আমরা যদি জল, মাটি ইত্যাদি নিয়ে মানব শরীর তৈরী করতে চাই তবে সেটা সম্ভব নয় অর্থাৎ কোন জড় বস্তু দ্বারা জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি হয় না । জীবন্ত বস্তু সৃষ্টির জন্য জীবন্ত শক্তি আত্মার প্রয়োজন । ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে এই মহাবিশ্বের প্রথম জীব ব্রহ্মা তিনি তার শরীর ভগবানের নিকট থেকে লাভ করেছে ।

(চলবে...)


সংকীর্তন মাধব

Share:

৩০ মার্চ ২০১৫

সনাতন ধর্ম

জানি না কতটুকু তুলে ধরতে পেরেছিঃ
সনাতন ধর্ম হচ্ছে মহাসাগর বিশেষ। মনে করা যাক পুকুরের ছোট্ট একটি মাছকে মহাসাগরে ফেলে দেয়া হল। মাছটি সারা জীবন পুকুরের ছোট্ট পরিধিতে জীবন অতিবাহিত করেছে। তার কাছে তার ভূবন ততটুকুই (পুকুর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ)। মহাসাগর সম্পর্কে কোন ধারণা লাভ যেমন ছোট্ট মাছের পক্ষে সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি দু-একটি গ্রন্থ পড়ে বা কারো মুখ থেতে শুনে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে ধারণা লাভ সম্ভব নয়। মহাসাগরের সুবিশাল পরিধি সম্পর্কে ধারণা পেতে যেমন নিয়ম মাফিক পদ্ধতিতে অগ্রসর হতে হয়! ঠিক তেমনি সনাতন ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হলে আমাদের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই অগ্রসর হতে হবে।
অনেকেই মনে করে সনাতন ধর্ম হচ্ছে হিন্দু ধর্ম! মূর্তি বা প্রতিমা পূজায় বিশ্বাসী! আবার অনেকেই সনাতন ধর্মকে ‘হিন্দু ধর্ম’ বলে আখ্যায়িত করে! যা নিত্যান্তই ভুল একটি ধারণা। সনাতন ধর্মের ভিত্তি বৈদিক শাস্ত্রের কোথায়ও ‘হিন্দু’ শব্দটির উল্লেখ নেই। নেই এই জন্য যে, তা আধুনিক কালে (ঊনবিংশ শতাব্দীতে) সৃষ্টি হয়েছে! বা কালক্রমে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সনাতন ধর্মকে ‘হিন্দু ধর্মে’ পরিণত করা হয়েছে! হিন্দু একটি নির্দিষ্ট জাতি! হিন্দু ধর্ম বলতে বোঝায় হিন্দু জাতির ধর্ম! বৈদিক শাস্ত্রের কোথায়ও কোন জাতি, গোষ্ঠী, বর্ণ বা সমাজের ধর্ম হিসেবে সনাতন ধর্মকে অভিহিত করা হয়নি। অভিহিত করা হয়েছে মানব জাতির বা জৈব ধর্ম (জীবের ধর্ম) হিসেবে।
সনাতন ধর্মের প্রকৃত রূপ উন্মোচনের জন্য আমাদের যে ধর্ম গ্রন্থগুলি পাঠ আবশ্যক তা হলো-
১। বেদ-৪টি (ঋকবেদ, সামবেদ, যর্জুবেদ, অথর্ববেদ)
২। উপনিষদ-১০৮টি
৩। গীতা-১টি (৭০০শ্লোক)
৪। ভাগবত-১টি (১৮,০০০শ্লোক)
৫। মহাভারত-১টি (৬০,০০০শ্লোক)
৬। পুরাণ-১৮টি
৭। রামায়ণ-১টি
৮। চৈতন্য চরিতামৃত-১টি
এই গ্রন্থগুলোর পাঠ করলে জানা যাবে সনাতন ধর্মের কলেবর কতো বিশাল আর জ্ঞানগভীর। তবে রামায়ন আর মহাভারতে বৈদিক যুগের ইতিহাস লিপিবদ্ধ। ধর্মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেতে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে ভাগবতের। তবে উল্লেখিত প্রতিটি গ্রন্থই মহা মূল্যবান আর প্রয়োজনীয়।
মানব জাতির স্বভাব হচ্ছে সহজ এবং সরল বিষয়গুলির প্রতি আসক্ত হওয়া। কঠিন বিষয়বস্তু এড়িয়ে চলা। যা আমাদের সমাজে আমরা পরিলক্ষিত করি। ধর্মের বেলায় ও একই ব্যাপারটি ঘটেছে। এতো বিশাল বৈদিক শাস্ত্রের ধারে কাছে না গিয়ে লোকজন সহজ এবং সরল দেব-দেবীর পূজায় নিজেদের ব্যস্ত রাখে। আর অন্যদিকে আমাদের সমাজের তথাকথিত জন্মগত ব্রাহ্মণ (পুরোহিত বা হোতা) নামধারী ব্যবসায়ীরা তাদের উদর পরিপূর্ণ করার জন্য সমাজে দেব-দেবী পূজার আজ্ঞা দেন। আজ্ঞা বলার কারণ অনেক। সমাজে সহজ সরল মানুষজন তাদের (পুরোহিতদের) অত্যাধিক শ্রদ্ধা ভক্তি করেন। পুরোহিতরা যে সিদ্ধান্ত দেন তা-ই শিরোধার্য হিসেবে ধরে নেন। আমি অনেক নামদারী ব্রাহ্মণের কাছে বৈদিক শাস্ত্র গুলোর নাম শুনতে চাইলে তারা প্রকৃতপক্ষে তা বলতে ব্যর্থ হন। যারা একটি ধর্মের শাস্ত্রীয় গ্রন্থের নাম বলতে অক্ষম, তাদের ব্রাহ্মণ বলার যুক্তি কোথায় আমি বুঝি না! তবে এখনও পুরোহিতদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী এবং শাস্ত্রজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি রয়েছেন। তবে তাঁরা কেন চুপচাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যান তা আমার কাছে রীতিমতো বিস্ময়!
দেব-দেবী পূজাকে ভাগবতের আলোকে অপধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অপধর্ম অর্থ্যাৎ ধর্মের সঠিক রূপ নয়। অপধর্মের অনুসারীরা স্বর্গসুখ আর জড় পৃথিবীতে সুখে থাকার আশায় উপরোক্ত পূজা-পাঠ করেন। যা সনাতন ধর্ম কোনভাবেই প্রকৃত রূপ হিসেবে সমর্থন করে না। প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে স্বর্গ-নরক-পৃথিবী সবকিছুর ভালবাসা কাটিয়ে আত্মাকে চিন্ময় জগতে নিয়ে পরম ব্রহ্মের সেবায় নিযুক্ত করা। এখানে শত-সহস্র দেবতা-উপদেবতাদের পূজা-পাঠ করার কোন সুযোগ নেই।
অনেকেই হয়ত ভাবেন আধুনিকযুগে এতো সময় কোথায় ঐ সব গ্রন্থগুলোর পাঠ করার। আবার আর্থিক দিকেরও একটি বিষয় এখানে রয়েছে। দেব-দেবী পূজায় কি অর্থ ও সময় খরচ হয় না! বরং মাত্রাতিরিক্ত খরচ হয় বিভিন্ন পূজানুষ্ঠানে! যার এক পঞ্চমাংশ সময় ও অর্থ খরচ করে সনাতন ধর্মের প্রকৃত রূপের অনুসন্ধান সম্ভব।
Credit:লিটন দেব জয়
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।