• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

ভক্তিবাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভক্তিবাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৮ মে ২০২২

ভক্তি-পথ

চতুর্বিধ যোগসাধনার অন্যতম ভক্তি। বর্তমানে 'ভক্তি' কিংবা 'ভক্ত' শব্দটির কিছুটা ভুল অর্থে প্রয়োগ আমরা শুনতে পাই। যেমন কোনও মঠ বা মন্দিরে সমাগত সকল দর্শনার্থীদেরকে একসঙ্গে বিশেষায়িত করতে 'ভক্ত' শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায়, কিংবা 'সাধু ও ভক্ত' বলে দুটি পৃথক শ্রেণির উল্লেখ করা হয়, গেরুয়া পরলে তিনি সাধু, আর সাধারণ জামা-প্যান্ট পরলে তিনি ভক্ত।

যেন সাধু ও ভক্ত আলাদা দুটি গোষ্ঠী। যেন সাধু যিনি তিনি ভক্তগোষ্ঠীর নন আবার গেরুয়া না পরলে তিনি যেন 'সাধু' বা সাধক নন।

ঠাকুর-স্বামীজির অনুধ্যানে আমাদের মনে হয়েছে 'ভক্তি' ও 'ভক্ত' শব্দের এহেন প্রয়োগ বিভ্রান্তিকর।

ভক্তি একটি আধ্যাত্মিক সাধন-পথ। যিনি ভক্ত তিনি অবশ্যই সাধক বা সাধু। সুতরাং ভক্ত ও সাধু আলাদা লাইনে দাঁড়ানো 'পৃথক শ্রেণি' নয়।

অধ্যাত্ম-সাধনপথ বা যোগ চারপ্রকার :

জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, রাজযোগ এবং ভক্তিযোগ। সাধক তাঁর ক্ষমতা ও রুচি অনুযায়ী এই চারটি পথের এক বা একাধিক পথে সাধনা করতে পারেন। তবে এগুলির মধ্যে ভক্তিযোগ সহজতম ও মধুরতম পন্থা।

স্বামী বিবেকানন্দের মতে ভক্তিযোগে ভক্তিই একাধারে উদ্দেশ্য এবং উপায় দুইই। অপরপক্ষে অন্যান্য যোগের পদ্ধতিগুলি শুধু উপায়মাত্র, উদ্দেশ্য নয়।

অর্থাৎ ভক্তিযোগে সাধক চান ইষ্টের প্রতি নিবিড় ভক্তি। আবার এই ভক্তিলাভের উপায়ও ভক্তি

ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ শেখান, 'ভক্তিকামনা কামনার মধ্যে নয়।'

অর্থাৎ অন্য কামনায় মানুষের বদ্ধতা বাড়ে, মানুষ জাগতিক মোহের জালে ছটফট করে; কিন্তু 'ভক্তি-কামনা কামনার মধ্যে নয়', কারণ এই কামনার তীব্রতায় মানুষের স্বরূপের জাগতিক আচ্ছাদন ক্ষীয়মাণ হয়।

ভক্তি খুব মন্থর পদ্ধতি কিন্তু ভক্তি থেকে উৎপন্ন আনন্দ সাধককে সাধনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, তাই এক্ষেত্রে সাধককে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বা কষ্ট করে সাধনা করতে হয়না।

সাধনার আনন্দই নেশার মত সাধককে সাধনায় ডুবিয়ে রাখে।

ভক্তিপথে জোর করে ইন্দ্রিয়দমন করতে হয়না। কারণ ভক্তের জাগতিক উদ্দীপনাগুলির অভিমুখ ঈশ্বরের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় ভক্তিযোগে।

ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ শিক্ষা দেন কামকে ঈশ্বরীয় প্রেমে পরিণত করতে, ক্রোধকে আধ্যাত্মিক তেজে পরিণত করতে।

ভক্তরাজ প্রহ্লাদ প্রার্থনা করছেন, 'হে প্রভু বিষয়ী লোকের যেমন জাগতিক ভোগ্যবিষয়ে তীব্র আসক্তি, তোমার প্রতি আমার সেইরূপ আসক্তি দাও।'

- এই হল ভক্তের প্রার্থনা।

ভক্ত আসক্তি ত্যাগ করেননা, শুধু সেই আসক্তিকে ঈশ্বরের অভিমুখী করে দেন।

ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন :

'এমনি মিষ্টি খেলে অসুখ হয়, কিন্তু মিছরির মিষ্টি মিষ্টির মধ্যে নয়।'

ঠিক তেমনই কামনা-বাসনা ঈশ্বরীয় পথের প্রতিবন্ধক, কিন্তু 'ভক্তি-কামনা' কামনার মধ্যে নয়।

ভক্তিপথে জাগতিক আসক্তিকে ঈশ্বরীয় প্রেমে রূপান্তরিত করতে হয়। ঈশ্বরে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ভয়মুক্ত হতে হয়।

শ্রীম (মহেন্দ্র নাথ গুপ্ত) বলতেন, 'সর্বদা বাপ-মা ওয়ালা ছেলের মতো নির্ভয়ে থাকো।'

এভাবেই ভক্ত ঈশ্বরে শরণাগতির মাধ্যমে জাগতিক ভয় ও দুশ্চিন্তার ঊর্ধ্বে এক আনন্দঘন জগতে বিরাজ করেন।

অর্থাৎ সর্বদা সর্বভাবে ঈশ্বরের সাথে যুক্ত থাকাই ভক্তিপথের সাধনা।

ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ শেখাচ্ছেন, একটি পাত্র থেকে আরেকটি পাত্রে তেল ঢাললে যেমন নিরবচ্ছিন্নভাবে তেলের ধারা পতিত হয় , তেমনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ঈশ্বরের স্মরণ-মনন করতে হয়। খুব সহজ উপমা দিয়ে তিনি বোঝাচ্ছেন : যেমন যার দাঁতে ব্যাথা হয়েছে সে সব কাজ করে, সবার সাথে কথা বলে; কিন্তু মনটি সর্বক্ষণ ওই ব্যাথার দিকে পড়ে থাকে। ঠিক তেমনি সব অবস্থায় ভক্ত নিজেকে ঈশ্বরের সাথে যুক্ত রাখেন।

সর্বদা ইষ্টের স্মরণ ভক্তের স্বাভাবিক অবস্থা। কোনও প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদে যেমন সর্বদাই সেই মানুষটিকে মনে পড়ে, ঠিক তেমনই ভক্ত সর্বদা ইষ্টস্মরণে নিয়োজিত না থেকে পারেন না। তিনি সংসারে থাকেন, সব কাজ করেন কিন্তু অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো প্রিয়তমের রূপ ও তাঁর নাম সর্বদাই স্মরণপথে উদিত হয়।

স্বাভাবিক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো ইষ্টমন্ত্র তাঁর মনে উচ্চারিত হয়ে চলে। ডুবন্ত ব্যক্তি যেমন প্রাণপণে কোনও অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করে, ভক্তও তেমনি ইষ্টের নাম ও রূপকে আঁকড়ে ধরে জীবনযাপন করেন।

ক্রমে তাঁর নিজের সকল জাগতিক সত্তা-বোধ ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে, কেবল 'আমি ঈশ্বরের অংশ, আমি তাঁর' এই পরিচয়টুকুই অবশিষ্ট থাকে।

এই হ'ল ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণকথিত

'ভক্তের আমি'।

প্রাচীন ভারতে নারদ নামে একজন ঋষি ছিলেন। মহর্ষি নারদ 'ভক্তিসূত্রম্' নামক আধ্যাত্মিক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি তাঁর এই গ্রন্থে লিখেছেন :

'নারদস্তু তদর্পিতাখিলাচারতা

তদ্বিস্মরণে পরমব্যাকুলতেতি।'

অর্থাৎ ঋষি নারদের মতে সকল কর্ম ঈশ্বরে অর্পণ করা এবং ঈশ্বরের সামান্যতম বিস্মরণেও তীব্র ব্যাকুলতার উদ্ভব

-- এই অবস্থা লাভই 'ভক্তি'।

ভক্তি ত্রিমাত্রিক। এর প্রথম মাত্রা হ'ল :

ঈশ্বরের প্রতি ভয়হীনতা। ভয় যেখানে, ভালোবাসা সেখানে থাকেনা।

দ্বিতীয় মাত্রা :

'নিষ্ঠা', অর্থাৎ এককেন্দ্রিকতা। মহাবীর হনুমানের উক্তি : 'শ্রীনাথে জানকিনাথে অভেদ পরমাত্মনি, তথাপি মম সর্বস্ব রাম: কমললোচন।' অর্থাৎ 'আমি জানি শ্রীনাথ বা লক্ষ্মীপতি নারায়ণ এবং জানকিনাথ বা রামচন্দ্র এঁরা পারমার্থিক ভাবে অভেদ, তথাপি সেই কমললোচন রামই আমার সর্বস্ব।'

-- এই হল নিষ্ঠা। একে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন 'অব্যভিচারিণী ভক্তি'।

তৃতীয় মাত্রা : 'প্রত্যাশাহীনতা'। প্রকৃত ভক্ত কখনো বলেননা, 'এত পুজো, জপ করলাম তবু আমার কী হ'ল!' ভক্ত ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসেন।

না ভালোবেসে থাকতে পারেননা, তাই ভালোবাসেন। বিনিময়ে কোনও প্রত্যাশা করেননা। একে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন 'অহৈতুকী ভক্তি'।


✍️ লেখক : তাপস কুমার ঘোষ

Share:

০৫ মে ২০২২

‘রামের ইচ্ছা’ গল্পটি কি?

 একজন ভক্ত -- ‘রামের ইচ্ছা’ গল্পটি কি?

শ্রীরামকৃষ্ণ -- “..........সমস্ত তাঁকে সমর্পণ করো -- তাঁকে আত্মসমর্পণ করো। তাহলে আর কোন গোল থাকবে না। তখন দেখবে, তিনিই সব করছেন। সবই রামের ইচ্ছা।” কোন এক গ্রামে একটি তাঁতী থাকে। বড় ধার্মিক, সকলেই তাকে বিশ্বাস করে আর ভালবাসে। তাঁতী হাটে গিয়ে কাপড় বিক্রি করে। খরিদ্দার দাম জিজ্ঞাসা করলে বলে, রামের ইচ্ছা, সুতার দাম একটাকা, রামের ইচ্ছা মেহন্নতের দাম চারি আনা, রামের ইচ্ছা, মুনাফা দুই আনা। কাপড়ের দাম রামের ইচ্ছা একটাকা ছয় আনা। লোকের এত বিশ্বাস যে তৎক্ষণাৎ দাম ফেলে দিয়ে কাপড় নিত। লোকটি ভারী ভক্ত, রাত্রিতে খাওয়াদাওয়ার পরে অনেকক্ষণ চণ্ডীমণ্ডপে বসে ঈশ্বরচিন্তা করে, তাঁর নামগুণকীর্তন করে। একদিন অনেক রাত হয়েছে, লোকটির ঘুম হচ্ছে না, বসে আছে, এক-একবার তামাক খাচ্ছে; এমন সময় সেই পথ দিয়ে একদল ডাকাত ডাকাতি করতে যাচ্ছে। তাদের মুটের অভাব হওয়াতে ওই তাঁতীকে এসে বললে, আয় আমাদের সঙ্গে -- এই বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল। তারপর একজন গৃহস্থের বাড়ি গিয়ে ডাকাতি করলে। কতকগুলো জিনিস তাঁতীর মাথায় দিলে। এমন সময় পুলিশ এসে পড়ল। ডাকাতেরা পালাল, কেবল তাঁতীটি মাথায় মোট ধরা পড়ল। সে রাত্রি তাকে হাজতে রাখা হল। পরদিন ম্যাজিস্টার সাহেবের কাছে বিচার। গ্রামের লোক জানতে পেরে সব এসে উপস্থিত। তারা সকলে বললে, ‘হুজুর! এ-লোক কখনও ডাকাতি করতে পারে না’। সাহেব তখন তাঁতীকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘কি গো, তোমার কি হয়েছে বল’। তাঁতী বললে, ‘হুজুর! রামের ইচ্ছা, আমি রাত্রিতে ভাত খেলুম। তারপরে রামের ইচ্ছা, আমি চণ্ডীমণ্ডপে বসে আছি, রামের ইচ্ছা অনেক রাত হল। আমি, রামের ইচ্ছা, তাঁর চিন্তা করছিলাম আর তাঁর নাম গুনগাণ করছিলাম। এমন সময়ে রামের ইচ্ছা, একদল ডাকাত সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। রামের ইচ্ছা তারা আমায় ধরে টেনে লয়ে গেল। রামের ইচ্ছা, তারা এক গৃহস্থের বাড়ি ডাকাতি করলে। রামের ইচ্ছা, আমার মাথায় মোট দিল। এমন সময় রামের ইচ্ছা, পুলিস এসে পড়ল। রামের ইচ্ছা, আমি ধরা পড়লুম। তখন রামের ইচ্ছা, পুলিসের লোকেরা হাজতে দিল। আজ সকালে রামের ইচ্ছা, হুজুরের কাছে এনেছে’।

“অমন ধার্মিক লোক দেখে, সাহেব তাঁতীটিকে ছেড়ে দিবার হুকুম দিলেন। তাঁতী রাস্তায় বন্ধুদের বললে, রামের ইচ্ছা, আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। সংসার করা, সন্ন্যাস করা, সবই রামের ইচ্ছা। তাই তাঁর উপর সব ফেলে দিয়ে সংসারে কাজ কর।

“তা না হলে আর কিই বা করবে?

“একজন কেরানি জেলে গিছিল। জেল খাটা শেষ হলে, সে জেল থেকে বেরিয়ে এল। এখন জেল থেকে এসে, সে কি কেবল ধেই ধেই করে নাচবে? না, কেরানিগিরিই করবে?

“সংসারী যদি জীবন্মুক্ত হয়, সে মনে করলে অনায়াসে সংসারে থাকতে পারে। জার জ্ঞানলাভ হয়েছে, তার এখান সেখান নাই। তার সব সমান। যার সেখানে আছে, তার এখানেও আছে।


Written by: Prithwish Ghosh

Share:

১৬ ডিসেম্বর ২০২০

কলিযুগের গুপ্ত বৃন্দাবন

 পাপ ভারাক্রান্ত পৃথিবীর বেদনায় বেদনার্থ হইয়া দ্বাপরে প্রার্থনা করেছিলেন ব্রম্মা আর কলির যুগে শ্রী অদ্বৈতাচার্য। শ্রী অদ্বৈতাচার্য শ্রীহট্র নিবাসী একজন শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত ও নৈষ্ঠিক ব্রাক্ষন ছিলেন।সদাশিবের অবতার হিসাবে তাঁর পরিচিতি ছিল। নবদ্বিপের শান্তিপুরে শ্রী অদ্বৈতাচার্য বসবাস করতেন। তিনি প্রতিদিন মদন গোপালের পাদপদ্মে গঙ্গাজল তুলসী দিয়ে বলিতেন-“প্রভূ মদন গোপাল তুমি ধরার বুকে নামিয়া আস। সত্য ধর্ম সংস্থাপন কর”।

তিনি দূর চিত্তে বলতেন- “করাইবো কৃষ্ণ সর্ব নয়ন গোচর,তবে সে অদ্বৈত নাম কৃষ্ণের কিংকর”ভক্তের ডাকে ভগবান সাড়া দিলেন। একদিন শ্রী অদ্বৈতাচার্য গঙ্গার তীরে বসিয়া মদন গোপাল বলে কাঁদতে ছিলেন। হঠাৎ দেখিলেন একটি তুলসী পত্র স্রোতের বিপরীত দিকে ভাসিয়া চলিছে। তিনি বিস্মিত হলেন এবং তুলসী পত্রের অনুগমন করিলেন। নদীয়ার গঙ্গার ঘাটে তখন অগনিত নরনারী স্নান করছিলেন। উক্ত তুলসী পত্রটি শ্রী হট্রনিবাসী উপেন্দ্র মিশ্রের পুত্র জগন্নাথ মিশ্রের সহধর্মিনী এবং নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যা শচীদেবীর নাভিমূলে এসে ঠেকিয় স্থির হলো। শ্রী অদ্বৈতাচার্য বুঝিলেন মদন গোপাল এই ভাগ্যবতী রমনীর গর্ভেই আসিবেন। শ্রী চৈতন্য গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূ মাতৃগর্ভ সিন্ধুতে আসেন শ্রী হট্র(সিলেট) জেলার ঢাকা দক্ষিন গ্রামে। জগন্নাথ মিশ্রের মাতৃদেবী শোভাময়ী স্বপ্নে দেখেন তাঁর পুত্রবধুর গর্ভে স্বয়ং নারায়ন আবির্ভূত হবেন। তিনি গঙ্গাতীরে জন্মিবেন।

স্বপ্ন দেখে শোভাময়ী দেবী পূত্র ও পুত্রবধুকে নবদ্বিপে পাঠাইয়া দিলেন। এবং যাবার সময় বলেছিলের যিনি আসিবেন তাঁকে আমায় দেখাইও। মহাপ্রভূ শচী দেবীর দশম গর্ভের সন্তান। শচী দেবী ও জগন্নাথ মিশ্রও সপ্নে দেখেছিলেন-শচী কহে-“ মুঞি দেখো আকাশ উপরে,দিব্য মূর্তি লোক সব যেন স্তুতি করে”।

উভয়েই প্রতিক্ষায় থাকলেন সেই উন্নতসত্তা মহাপুরুষের শুভ আবির্ভাবের জন্য। কিন্তু কোথায় সেই মহাপুরুষ! দশ মাস-এগারো মাস-বার মাস গিয়ে তের মাস চলিল। শচীদেবীর জনক প্রখ্যাত জ্যোতিষি নীলাম্বর চক্রবর্তী গনিয়া কহিলেন, এই মাসেই শুভ লগ্নে এক সুলক্ষন পুত্র জন্মিবে।

আবির্ভাবঃ– ফাল্গুন মাস নব-বসন্ত দোল পূর্নিমা তিথি। এই দিনটিতে প্রতি বছরই পূর্নচন্দ্র তাঁর অমল-ধবল-স্নিগ্ধ কিরনে ধরনীকে স্নান করিয়ে দেয়ার জন্য স্বগর্বে উদিত হন। কিন্তু ৮৯২ বঙ্গাব্দের ২৩ ফাল্গুন(১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ) শনিবারে যেনো চন্দ্রের পূর্নতা, স্নিগ্ধতা,শুভ্রতা, সকলই কোন অদ্বিতীয় অভিমর্ত্য চন্দ্রের নিকট তিরস্কৃত। ভূলোকের চন্দ্রের পূর্নতা গোলকের চন্দ্রের পূর্নতার নিকট পরাভূত। এ সত্য প্রচারের জন্য অকলঙ্ক শ্রী চেতন্য গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূর আবির্ভাবের পূর্বে জগচ্চন্দ্র রাহুগ্রস্থ হয়ে পড়ল অর্থাৎ চন্দ্র গ্রহন হল। বিশ্বের চতুর্দিকে হরি নামের ধ্বনি উঠল। কর্মকোলাহল রেখে সবাই খোল করতাল নিয়ে হরিনাম কীর্ত্তন

করছে। হরি নামে মুখরিত চারিদিক এ সময়ে সিংহলগ্নে সিংহ রাশিতে শ্রীশচীর গর্ভসিন্ধু হতে শ্রী মায়া পুরে পূর্ন শশী আনিন্দ্য সুন্দর অমৃত পুরুষ উদিত হলেন। অচৈতন্য বিশ্বে চৈতন্য সঞ্চার হলো। মায়া মরুতে অমৃত মন্দাকিনী প্রবাহিত হলো। অবিরল ধারায় হরি কির্ত্তন সুধাসঞ্জীবনী বর্ষিত হওয়ায বিশ্বের হরিকির্ত্তন-দুর্ভিক্ষ-দুঃখ বিদূরিত শান্তিপুরে শ্রী অদ্বৈতাচার্য ও ঠাকুর হরিদাসসহ সকল ভক্তবৃন্দ আনন্দে নূত্য করলেন।

ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মগ্রহণ করে পরবর্তীকালে বিশ্বম্ভর, নিমাই ও শ্রী চৈতন্য নামের মধ্য দিয়ে বাঙালি সমাজের অবহেলিত মানুষের মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হবেন এটা কে বুঝতে পেরেছিলেন? শ্রী চৈতন্য গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূ ১৪৯১ থেকে ১৪৯৭ পর্যন্ত শাস্ত্রীয় বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।

আনুমানিক ১৫০৫ সাল থেকে তাঁর অধ্যাপনার সূচনা ঘটে। ১৫০৮ সালে গয়াধামে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষাগ্রহণের পর নবদ্বীপে ফিরে বপ্রকাশ ও সংকীর্তন আরম্ভ করেন তিনি। ১৫০৯ সালের শেষদিকে সংকীর্তনাদির অবসান ঘটিয়ে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন ১৫১০ সালে। এরপর তিনি রাঢ়, নীলাচল, বঙ্গদেশ, বৃন্দাবন, প্রয়াগ, কাশী, শান্তিপুর প্রভৃতি জায়গায় ভ্রমণ করে ভক্তিবাদ প্রচার করেন। ১৫৩৩ সালের ২৯ জুন তিনি দেহান্তরী হন।

গুপ্ত বৃন্দাবনঃ-মহাপ্রভু কলিযুগে যুগধর্ম প্রচার করার জন্য অবতরণ করবেন শ্রীজগন্নাথের আঙ্গিনায়, তাই লীলাক্ষেত্র বিস্তার ও লীলাপার্ষদ সাজানোর আয়োজন চলছে চারিদিকে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন লীলা সহচর হয়ে জন্ম হয়েছে দেব-দেবী ও ঋষিকল্প অনেক মহাজনদের। কারণ তাঁরা লীলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ভগবানের আগমনকে স্বাগত জানাবার জন্য ধরাধামে নেমে এসেছেন আগে ভাগেই। গৌরাঙ্গ লীলার শুভ বাস্তবায়নের জন্য শ্রীহট্টের ঢাকাদক্ষিণেও জন্ম নিলেন লীলা সহচরের। ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ ‘ভক্তি ঐশ্বর্য’, আর ‘হট্ট’ শব্দের অর্থ ‘মিলনমেলা’।

তাই শ্রীহট্ট নামটি হল ভক্তের মিলন মেলা। এ হাটে আসে অনেকেই কেনাবেচা করতে। এখানে অমূল্য প্রেমধন ‘শ্রী’ সম্পদ বিনামূল্যে বিক্রি হয়।আর এধন বিক্রি করবেন কষিত-কাঞ্চন-বর্ণধারী গৌর হরি। তাই শ্রীহট্টে মিলায়েছেন আগাম মেলা। এটিই শ্রীহট্ট নামের বৈশিষ্ট্য। আর ঢাকাদক্ষিণের ‘দক্ষিণ’ হওয়ার তাৎপর্য হল- কৃষ্ণের বামে রাই কিশোরী ব্রজের যুগলরূপের বিগ্রহ। আর কৃষ্ণের দক্ষিণে অবস্থান নিয়ে গৌরহরি যেন কৃষ্ণকে ঢেকে অর্থাৎ দ্বাপর লীলা আবরণ করে মধুময় নবদ্বীপ লীলা বিহার করছেন। তাছাড়া এই গৌরলীলা মাধুর্য আস্বাদনে যমের দক্ষিণ দুয়ারটিও বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে- এই তো ঢাকাদক্ষিণ নামের সার্থকতা। সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু একবার মহাপ্রভুকে শান্তিপুরে শ্রীল অদ্বৈত আচার্যের বাড়ীতে নিয়ে আসেন এবং শোকাতুরা জননী শচীদেবীকে পুত্রের দর্শনের জন্য সেখানে নিয়ে আসা হয়। মা এবং ছেলের অপূর্ব মিলনের আনন্দের মধ্য দিয়ে সন্ন্যাসী নিমাই মায়ের হাতের রান্না করা খাবার খান অদ্বৈতের গৃহে। মা জানেন নিমাই সন্ন্যাসী হয়েছে ঠিকই কিন্তু সংসারের কাজ এখনও তাঁর বাকি আছে- গর্ভাশয়ে থাকাবস্থায় তাঁর ঠাকুর-মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এখনও অপূর্ণ রয়েছে। শোভাদেবী আজও হয়তো তাঁর চোখ খুঁইয়ে নাতীর দর্শন আশায় কোনরকমে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাই মা শচীদেবী তাঁকে ঢাকা দক্ষিণে ফিরে গিয়ে তাঁর ঠাকুরমার শেষ ইচ্ছাটি পূর্ণ করার জন্য সন্ন্যাসী নিমাইকে নির্দেশ দিলেন।

বললেন-তোমার পিতামহী আমাকে বলেছিলেন, হে ভাগ্যবতি! তোমার এই গর্ভবাস হতে যে পরম পুরুষ উদয় হবেন, তাঁকে দেখবার জন্য বিশেষ উৎকণ্ঠিতায় আছি। অতএব তাঁকে শীঘ্রই আমার নিকট পাঠাবে। আমি তাঁর মহাবাক্য স্বীকার করে, তোমাকে গর্ভে নিয়ে নবদ্বীপে এসেছিলাম। অতএব এখন তোমাকে আমার প্রতিশ্রুতি বাক্য পালন করতে হবে। অর্থাৎ এখান হতেই তোমাকে পিতামহীর সাথে মিলবার জন্য যেতে হবে।

১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে মায়ের কথামত মহাপ্রভু তাঁর পিতামহীকে দর্শন দেবার জন্য ঢাকাদক্ষিণে আসতে মনস্থ করলেন। মহাপ্রভু মাতৃবাক্য শ্রবণ করে স্বীয় অচিন্তনীয় শক্তিপ্রভাব বিস্তার করে গুপ্তলীলা সহকারে পিতামহী সদনে যাবার জন্য উপক্রম করলেন। শ্রীহট্টের ঢাকাদক্ষিণে যাবার পথে তিনি প্রথমে তাঁর পূর্বপুরুষের নিবাসস্থল শ্রী হট্রের বালাগঞ্জের বরুঙ্গাতে পদার্পণ করলেন। সেখানে তিনি হলচাষরত গো-মোচন করলেন এবং গো- মুখে হরিনাম উচ্চারিত করে গো-মুক্ত করলেন। শ্রীমন্মহাপ্রভু আদিতে প্রপিতামহ শ্রীপাদ মধুকর মিশ্রের বাসভূমি বরগঙ্গা (বুরুঙ্গা) নামক স্থানে পদার্পণ করলেন। তথায় কৃষকগণকে মধ্যাহ্ন সময়ে হালচাষ করতে দেখে, করুণানিধির হৃদয় গো-গণের প্রতি সদয় হল। তিনি তখন কৃষকগণকে বললেন, মধ্যাহ্নকালে চাষ করা মহা পাপ। তোমরা গো-মোচন কর। এই আদেশ শ্রবণ করে রামদাস নামক জনৈক কৃষক সন্ন্যাসবেশী শ্রীগৌরাঙ্গকে বলল, ধান্যক্ষেত্রে অতি অল্প জল রয়েছে। সেইজন্য আজই এই জমি চাষ করা প্রয়োজন। এরর্প শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হল সমীপে গমন করলেন।

শ্রীমহাপ্রভু গোপৃষ্ঠে হস্তস্থাপন করে হরিধ্বনি করতে লাগলেন। তাঁর শ্রীমুখোচ্চারিত শ্রীহরিধ্বনি শ্রবণ করে গো-সকলও মধুময় হরিধ্বনি করতে লাগল। কৃষকেরা প্রায় জলশূন্য কৃষিক্ষেত্রের জন্য বড়ই ব্যস্ত ছিল, কিন্তু সেই ধান্যক্ষেত্রটি সহসা জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। চাষীগণ এইসব অলৌকিক ঘটনা দেখে শীঘ্র গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীগণকে এই অদ্ভুত কথা বললেন। তাহা শ্রবণান্তে, সেই গ্রামস্থ মিশ্রবংশীয় জনগণ সেখানে এসে শ্রীশ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে তাঁর প্রপিতামহ শ্রীপাদ মধুকর মিশ্রের বাড়িতে আনয়ন করলেন। মহাপ্রভুর এরূপ অলৌকিক ভাব দেখে তাঁরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে সাক্ষাৎ নারায়ণজ্ঞানে যথোচিত সেবা করলেন।

এখান থেকে মহাপ্রভু তাঁর পিতৃনিবাস তথা পিতামহ উপেন্দ্র মিশ্রের ঢাকাদক্ষিণের ঠাকুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। ১৫১০ সালের চৈত্রমাসের কোন এক রবিবারে ছুটে আসেন ঢাকাদক্ষিণের গুপ্ত বৃন্দাবন ধামে। তাঁর পিতামহী শোভাদেবী অধীর আগ্রহে নাতীর দর্শন আশায় পথ চেয়ে বসেছিলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের আশা আজ ফলবতী হতে চলল ধর্মপরায়ণা শ্রীল উপেন্দ্র মিশ্রের পতœী বৃদ্ধা শ্রীমতি শোভাদেবী, সর্বদাই মনে মনে চিন্তা করতেন যে, আমি কখন আমার নাতীকে দেখতে পাব। মহাপ্রভু গর্ভাবস্থায় তাঁর চিন্ময়ী দৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন পিতার ঢাকাদক্ষিণের নিবাসস্থানটি। আজ তিনি সেই স্মৃতি বিজরিত শান্তির নীড়ে আবার ফিরে এসেছেন। ঘুরেফিরে দেখছেন বাড়ীর চারিদিক। হঠাৎ শ্রীল পরমানন্দ মিশ্রের পতœী সুশীলাদেবীর নজর পড়ল সন্ন্যাসীর দিকে। কি দিব্যকান্তি চেহারা! আজানুলম্বিত বাহু, সুঠাম পূর্ণদেহী নবীন দণ্ডধারী গৌর তনু! দেখলে মন জুরিয়ে যায় একেবারে। সুশীলাদেবী মুগ্ধনয়নে ভাল করে দেখে নিলেন সন্ন্যাসীকে। পরে দর্শন আশা কিঞ্চিৎ প্রশমিত করে তিনি শ্বাশুড়ী শোভাদেবীকে এই শুভ সংবাদটি দেবার জন্য গৃহাভ্যন্তরে চলে এলেন। সংবাদ পেয়ে শোভাদেবী গৃহাভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন নবীন সন্ন্যাসীকে। শোভাদেবীর মনে আনন্দ আর ধরে না। যে স্বপ্নের প্রাণপুরুষকে দেখার জন্য এতদিন যাঁর তৃষিত নয়ন অপেক্ষা করছিল, সেই প্রাণের ঠাকুর সাক্ষাৎ নারায়ণ আজ তাঁর নয়ন-মন আলো করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই সামনে। একি অদ্ভুত অপার আনন্দ! সেই বৃদ্ধা শ্রীমতি শোভাদেবী, গৃহ হতে বের হয়ে এসে শ্রীনারায়ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখে স্বয়ং ঈশ্বর এখানে এসেছেন এই কথা মনে ভেবে বড়ই প্রফুল্লা হলেন। তারপর তিনি তাঁকে বসতে আসন দিলেন এবং ধর্মপরায়ণা বৃদ্ধা সাশ্রুনয়নে, পুলকিত শরীরে, ধীরে ধীরে মধুর বাক্যে তাঁর স্তব করলেন। নররূপধারী পদ্মপলাশলোচন সচ্চিদানন্দবিগ্রহ স্বর্ণবর্ণ বিষ্ণুকে নমস্কার। হে পুরুষোত্তম! তোমাকে নমস্কার। হে বাঞ্ছিতপ্রদ ভগবান্! তোমাকে প্রণাম করি। ঠাকুরমা দেখছেন সন্ন্যাসীকে, কিন্তু তিনি দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় আদরের নাতীকে। নিশ্চয়ই নারায়ণরূপী এই সন্ন্যাসী তাঁর নাতীর খবর রাখেন। তাই অস্থিরচিত্তে শোভাদেবী এই একটি জিঙ্গাসা নিয়ে সন্ন্যাসীর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি সন্ন্যাসীর মধ্যে দেখতে চেয়েছিলেন স্বপ্নে দেখা সেই প্রাণময় শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিটি।

কিন্তু তিনি আজ দেখছেন কৃষ্ণতনু মূর্তির বদলে তাঁর সামনে গৌরতনু এক নবীন সন্ন্যাসীর দিব্য মূর্তি। তিনি নাতীর কাছে প্রশ্ন ছিলেন, “তোমাকে আমি তো মাতৃগর্ভে এমনরূপে দেখিনি, তোমার মুরলীধারী নবীন-নটবর বেশ শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিটি তুমি কোথায় লুকালে!” প্রভু আর কি করেন, সরল বিশ্বাসী ঠাকুর মা শোভাদেবীকে গৌরা-কৃষ্ণরূপ যুগল মূর্তিতে দর্শন দান করে ধন্য করলেন। মহাপ্রভু পিতামহী শোভাদেবীর অন্তরের ভাব বুঝে তাঁকে দিব্যচক্ষু দান করে চাক্ষুষভাবে দেখিয়ে দিলেন তাঁর আপন স্বরূপটি। জগদীশ্বর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু পিতামহীর সেই কথা শ্রবণান্তে কৃপা করে তাঁকে আপন পরিচয় প্রদান করলেন। সুশীলাদেবী সন্ন্যাসীবেশী এক সুন্দর মহাপুরুষকেই দেখলেন, কিন্তু শোভাদেবী তাঁর মধ্যে দেখলেন সাক্ষাৎ ভগবানকেই। ভক্তের কাছে লুকাতে পারেননি তিনি, ভক্তবৎসল ভগবান্ সন্ন্যাসীবেশের মধ্যেই শোভাদেবীকে দেখালেন তাঁর ভগবৎ স্বরূপটি আর সুশীলাদেবী সন্ন্যাসবেশীকে দেখলেন। তিনি শোভাদেবীকে বললেন, “আমি সেই তো সেই- যিনি তোমার ঘরের নিমাই, তিনিই আবার দ্বাপরের কৃষ্ণ কানাই।” শোভাদেবী ও মহাপ্রভুর ভক্তিপূর্ণ এই ভাববিলাস তাঁর অন্য নাতী প্রদ্যুম্ন মিশ্র সাক্ষাৎ দর্শন করে গর্ভানিষ্ঠান সময়ে, যেরূপে শোভা দেবীর প্রতি দৈববাণী করেছিলেন, তাহাই প্রদর্শিত হল।

পরম ভক্তিমতী বৃদ্ধা, শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীকৃষ্ণ, এই দুইরূপ দেখে বিস্মিত ও পুলকিত হয়ে বললেন, হে ভগবান! তোমাকে নমস্কার। মহাপ্রভু শোভাদেবীকে বলেন, “কষ্ট নিও না ঠাকুর মা, আমার এই যুগলমূর্তি ঠাকুর বাড়ির দেবালয়ে প্রতিষ্ঠিত করে নিত্য পূজার্চনা করবে। আমার বংশের সন্তানেরা শ্রী হট্রের ঢাকাদক্ষিণের দেবালয়ের গৌরবেই আবহমানকাল বেঁচে থাকবে। শ্রী হট্র তথা ঢাকাদক্ষিণ আজ থেকে গুপ্ত বৃন্দাবন বলে পরিচিত হবে। আমি নিত্যকাল এখানে লীলা করব। “বাসুদেব ঘোষ কহে করি জোড় হাত, যেই গৌর সেই কৃষ্ণ সেই গন্নাথ”আসলে কৃষ্ণরূপটি বৃন্দাবনের আর গৌররূপটি নবদ্বীপের। দ্বাপর শেষে কলিতে তাই শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। কলি এসেছে, তাই দ্বাপরের কৃষ্ণের প্রয়োজন এবার চৈতন্যে সীমায়িত হয়েছে। কাজেই প্রেমের রাজা শ্রীচৈতন্যই বামা নায়িকা শ্রীরাধার মত বেদনাভারে প্রাণকৃষ্ণকে খুঁজতে খুঁজতে নামের বাহারে পাগলপারা হয়ে সকলকে প্রেম দান করছেন আর শ্রীমুখে বলছেন, “গোকুলের যে প্রেম হলো নাকো সারা নদীয়ায় তা হবে সারা।”রাধার যে প্রেম কৃষ্ণকে ঘিরে, দ্বাপরে তা পূর্ণ হয় নি, তাই অন্তঃ-কৃষ্ণ বহিঃ-রাধা হয়ে রাধাভাবে আবিষ্ট হয়ে গৌর সুন্দর একই অঙ্গে দুইরূপ হয়ে আস্বাদন করছেন আপনি আপনাকে। এই তো গৌর হরি, কলির প্রেমরতন, দ্বাপরের কৃষ্ণ-কানাই। আমরা তাঁর ভাবগ্রাহী যুগলতনুর রস আস্বাদনের আশায় পথ চেয়ে বসে রই। “স্মরনেরে নব গৌরচন্দ্র মাধব মনোহারী।” পরমাত্মা পূর্ণব্রহ্ম সনাতন দ্বাপরে এসেছিলেন কৃষ্ণ হয়ে, এবার এসেছেন গৌরতনু গৌরহরি হয়ে এই গৌরতনু শ্রীরাধার ভাবকান্তি হৃদয়ে ধারণ করে গৌরহরি হয়েছেন।

কৃষ্ণই রাধা, রাধাই কৃষ্ণ; ভাববিলাসে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে অনন্য রসব্যঞ্জন করেন, আবার ঘনায়িত প্রেমবিগ্রহ হয়ে আপামর ভক্তসঙ্গে প্রেমরসনির্যাস আস্বাদন করেন এবং প্রেমধন্য হয়ে ঐ অপ্রাকৃত রস ভক্তের মাঝে বিতরণ করেন এই রঙ্গমঞ্চের লীলানটবর গৌরসুন্দর নরবপু ধারণ করে সর্বোত্তম নরলীলা করবার জন্য এবার এসেছেন ধরার ধূলায় নেমে। মহাপ্রভু ও তাঁর পার্ষদগণ এক অভিনব প্রেমের উদার দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিলেন পৃথিবীর পাপাসক্ত মানুষের পানে। সে দৃষ্টিতে ছিল প্রাণঢালা প্রেম আর প্রাণপুটিত রসমাধুর্যপূর্ণ অমিয় রসধারা। তিনি পুরাণ-প্রাণ পুরুষ, অনন্য প্রেমের ঠাকুর। তিনি তাঁর অপূর্ব কৃষ্ণকথামৃত দান করে কলিহত জীবের ত্রাণকর্তা হিসেবে আপনার জনের মত মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন। নাম আর প্রেমের মালা গেঁথে তিনি জগতের গলায় পরিয়ে দিয়েছেন অমূল্য এক বরণমালা।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন- “এই গুপ্ত ভাবসিন্ধু, ব্রহ্মা না পায় একবিন্দু,হেন ধন বিলাইল সংসারে”।


সংগৃহিত করা হয়েছে Sagar Bhowmick দাদার পোষ্ট হতে ।

Share:

০৭ জানুয়ারি ২০১৯

সনাতন ধর্মে জন্মান্তরবাদের ব্যাখ্যা

সনাতন বৈদিক বা হিন্দুধর্মের জন্মান্তরবাদ (পুনর্জন্ম) সম্পর্কে  কিছু জানার জন্য আমাদের কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। ব্যাখ্যা গুলো এমন-

  •  হিন্দুধর্ম বিশ্বাস করে যে জীবের মৃত্যুর পর জীব পুনরায় জন্মগ্রহন করে। হিন্দুধর্মে পুনর্জন্মকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কিন্তু সকলেই মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসী। পুনর্জন্মের অর্থ হলো-
“জীবের মৃত্যুর পর আত্মা পুনরায় নতুন দেহ ধারণ করে”।
 
  • যদিও বহু ধর্ম পুনর্জন্মে বিশ্বাসী, তবু একমাত্র হিন্দুধর্মেই এই জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী। আত্মার নতুন দেহ ধারণের মূলে রয়েছে। আত্মা যে এক শাশ্বত সত্ত্বা, এই ধারণা। বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যেও আত্মা এক অবিনাশী সত্ত্বা- এই বিশ্বাস না থাকলে জীবের পুনর্জন্মের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সেই কারণে হিন্দু জড়বাদী তত্ত্ববাদীগণ কোন শাশ্বত আত্মার অস্তিত্বে, মুত্যু পরবর্তী জীবনে এবং আত্মার পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেনা।
  •   হিন্দুধর্মে জীবাত্মা এক অপরিবর্তনীয় সত্ত্বা। যার প্রকৃতি হলো ঐশ্বরিক। যেমন অগ্নি থেকে নির্গত অগ্নি স্ফুলিঙ্গ অগ্নির সংঙ্গে অভিন্ন, তেমনি যে জীবাত্মা ঈশ্বর থেকে উদ্ভূত সেই জীবাত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে অভিন্ন। জীবাত্মার এই প্রকৃতি স্বীকার করে নিলেই জীবাত্মার জন্মান্তর গ্রহণ এবং জন্মান্তরের মধ্য দিয়ে তার বিবর্তনকে সমর্থন করা চলে। আত্মা নিত্য, শাশ্বত সত্ত্বা হওয়াতে, আত্মার জন্ম ও মৃত্যুকে যথাক্রমে সম্পূর্ণ নতুন প্রারম্ভ বা পরিপূর্ণ বিনাশ রূপে গ্রহণ করা চলে না। বরং জীবাত্মার পুনর্জন্ম অর্থ হলো নতুন দেহধারণ এবং মৃত্যু অর্থ হলো জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করাকে বোঝায়।
  •   গীতায় বলা হয়েছে-
“যেমন মনুষ জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে সেই রূপে
আত্মা জীর্ণ শরীর পরিত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর পরিগ্রহ করে”।

আত্মার শাশ্বত প্রকৃতি যেমন জীবের জন্মান্তর গ্রহণ সম্ভব করে তোলে, ঈশ্বরের সঙ্গে জীবাত্মার অভিন্নতা জন্মান্তর গ্রহণের বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। বেদে, উপনিষদে এবং ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে যে, জীবাত্মা স্বরূপতঃ ঈশ্বরের সঙ্গে অভিন্ন। কিন্তু জাগতিক বস্তুর প্রতি আসক্তি বশতঃই আত্মাকে দেহ ধারণ করতে হয়।

  •   জীবের একাধিক জন্ম-গ্রহণের কারণ হলো তার ভোগাকাঙ্ক্ষা। গীতায় বলা হয়েছে-
“পুরুষ প্রকৃতির সংসর্গ বশতঃ প্রকৃতির গুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ, তমো গুণের ধর্ম সুখ দুঃখ মোহাদিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েন এবং আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি কর্তা, আমার কর্ম ইত্যাদি অভিমান করতঃ কর্ম নাশে আবদ্ধ হন। এই সকল কর্ম ফলভোগের জন্য তাকে বার বার জন্ম গ্রহন করতে হয়।"

সুতরাং 'এই প্রকৃতির সংসর্গ থেকে মুক্ত হতে না পরলে, তার জন্মকর্মের বন্ধন থেকে নিস্তার নেই।'

  •   আত্মা পরমাত্মা থেকে ভিন্ন এবং দেহ-মন সংগঠনের সঙ্গে অভিন্ন, এই ভ্রান্ত ধারণার জন্যই আত্মার পুনঃ পুনঃ দেহধারণ। জীবাত্মা তার যথাযথ স্বরূপ সাময়িকভাবে বিস্মৃত হয় সত্য, কিন্তু জীবাত্মার ঐশ্বরিক প্রকৃতি লুপ্ত হয় না এবং জীবাত্মাকে তার সুপ্ত ঐশ্বরিক প্রকৃতিকে লাভ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। জীব পুনঃ পুনঃ জন্ম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার লক্ষ্য লাভ করার দিকে চালিত হয়। অর্থাৎ জীবের সঙ্গে তার ঐশ্বরিক প্রকৃতির তাদত্ম্যের উপলব্ধি- এই লক্ষ্যে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত জীবের পুনর্জন্মের নিরোধ ঘটে না। বস্তত: এই ধারণাই পুনর্জন্মের বিষয়টিকে তাৎপর্যময় করে তোলে। সকল বদ্ধ জীবই এই পুনর্জন্মের অধীন। আর পুনর্জন্ম বন্ধ বা না হওয়ার অর্থ জীবাত্মার পরমাত্মায় বিলীন বা মহামিলন হওয়া।
  •   কাজেই পুনর্জন্ম কোনী রহস্যময় অদৃষ্টের খেয়াল খুশীর ব্যাপার নয়। বরং এক ঐশ্বরিক পরিকল্পনার বা জগতের নৈতিক শৃঙ্খলার অংশ স্বরূপ। যা সকল প্রাণীতেই সংঘটিত হয়ে থাকে, তা সে বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক।

 পরমকরুনাময় গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণীসহ সকল পূণ্য- মহাত্মাদের চরণকমলে সবারই মঙ্গলময়, কল্যাণময়, সুন্দরময়, শান্তিময় আর আনন্দময় জীবনের প্রার্থনা আমাদের।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় হোক সকল ভক্তদের!!
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!

Post courtesy: দেবেন্দ্র
Share:

০৩ জুলাই ২০১৮

সংসা‌রে থে‌কে ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের সাধন - ভজন কর‌তে প্র‌য়োজন হৃদ‌য়ের শুদ্ধ ইচ্ছা

যখন আমরা গভীর নিদ্রাভিভূত হই তখন আমা‌দের কিছুই ম‌নে থা‌কে না , এই অ‌ভিজ্ঞাতা আমা‌দের সক‌লের হ‌য়ে‌ছে । টাকা - পয়সা , জ‌মি - জমা , আত্মীয়স্বজন কোনও কিছুই ম‌নে থা‌কে না , সেইরকম অবস্থায় কি আমা‌দের কোনও দুঃখ হয় ? গভীর ঘু‌মে কোনও জি‌নি‌সের স‌ঙ্গে আমা‌দের সম্বন্ধ না থাক‌লেও আমা‌দের দুঃখ হয় না , বরং আমরা সুখ অনুভব ক‌রি । তা‌তে প্রমাণ হয় যে সংসা‌রের স‌ঙ্গে সম্ব‌ন্ধে সুখ হয় না ।

আমরা ম‌নে ক‌রি যে , য‌দি আমরা ধনদৌলত পে‌য়ে যাই , বড় প‌দে চাকরী হয় , মান সম্মান পাই , ভোগ , আরাম পাই তাহ‌লে আমরা সুখী হবো । ভে‌বে দেখা উ‌চিত যে গাঢ় ঘু‌মের সময় কোনও প্রাণী বা বস্তুর স‌ঙ্গে সম্বন্ধ না থাক‌লে দুঃখ না হ‌য়ে সুখই হয় তখন এইসব জি‌নিস পে‌লে সুখ কি ক‌রে পাওয়া যা‌বে ?

জাগৃ‌তির বস্তু স্ব‌প্নে এবং স্ব‌প্নের বস্তু সুষু‌প্তি‌তে থা‌কে না । তাৎপর্য হ‌লো এই যে জাগৃ‌তি এবং স্ব‌প্নের বস্তুগু‌লি ছাড়াও আমরা থা‌কি । এ‌তে প্রমাণ হ‌লো যে বস্তু ব্যতি‌রে‌কেও আমরা সু‌খে থাকতে পা‌রি । অর্থাৎ আমা‌দের থাকা বস্তু , অবস্থা প্রভৃ‌তির আশ্রিত নয় । এতে বুঝা গেল যে , বস্তু , পদার্থ , ব্য‌ক্তি প্রভৃ‌তির দ্বারা আমরা সুখী হব আর ঐগুলি ছাড়া আমরা দুঃখী হব , একথা ভুল ।

যখন জাগ্রত থা‌কি তখন আমার অ‌নেক জি‌নিস ছাড়াই থা‌কি , যেমন ধরুন আপনার মোবাইল নষ্ট হ‌য়ে গেল , তা মেরামত কর‌তে বেশ ক‌য়েক‌দিন লাগতে পা‌রে , তখন কিন্তু আপ‌না‌কে মোবাইল ছাড়া থাক‌তেই হ‌বে । আর আপ‌নি যে‌কোন ভা‌বে হোক থাক‌বেন । যখন আমরা ঘুমায় তখন কিন্তু সব কিছু ছাড়াই আমরা থা‌কি , প‌রিবার , বন্ধু - বান্ধব , আত্মীয়স্বজন , আ‌রো যা যা আ‌ছে এবং তার দ্বারা আমরা শ‌ক্তি লাভ ক‌রি । গভীর ঘুম এ‌লে স্বাস্থ্য ভা‌লো থা‌কে এবং জে‌গে উঠ‌লে ব্যবহার ভাল হয় । ভে‌বে দেখুন যখন কোনপ্রকার চিন্তা থা‌কে না তখন কি আপনি ভা‌লো থা‌কেন না ?

য‌দি জাগ্রত অবস্থাতেই আমরা বস্তুগু‌লির স‌ঙ্গে ভিন্ন হ‌য়ে যাই , সেগু‌লির স‌ঙ্গে সম্বন্ধ না রা‌খি , তা‌দের আশ্রয় না নিই তাহ‌লে আমার জীবন্মুক্ত হ‌য়ে যাব । নিদ্রায় তো বেহুঁশ ( অজ্ঞান ) অবস্থায় থা‌কে ,‌ সেজন্য তা‌তে জীবন্মুক্ত হয় না । সকল বস্তুর স‌ঙ্গে সম্বন্ধ - বি‌চ্ছেদ হওয়া হ‌লো মু‌ক্তি । মু‌ক্তিতে যত আনন্দ , বন্ধ‌নে তত নয় । বন্ধ‌নের স‌ঙ্গে সম্পর্ক বি‌চ্ছেদ হ‌লেই মু‌ক্তির আনন্দ হয় । ঘু‌মের সময় বস্তুগু‌লি‌কে ভু‌লে থাক‌লেও যখন সুখ শা‌ন্তি পাওয়া যা‌য় তখন জ্ঞানত সেগু‌লির স‌ঙ্গে সম্বন্ধ - বি‌চ্ছেদ কর‌লে কতই না সুখ - শা‌ন্তি পাওয়া যা‌বে ।

শরীর এবং সংসার এক । এগু‌লির এক‌টি আর এক‌টি থে‌কে আলাদা হতে পা‌রে না । শরী‌রের সংসার‌কে প্র‌য়োজন এবং সংসা‌রের শরীর‌কে প্র‌য়োজন । কিন্তু আমরা স্বয়ং ( আত্মা ) শরীর থে‌কে আলাদা এবং শরীর ছাড়াই থাক‌তে পা‌রি । এই শরীর তৈ‌রি হবার আ‌গেও আমরা ছিলাম এবং শরীর নষ্ট হ‌য়ে গে‌লেও আমরা থাকব _ য‌দি এই কথা জানা না থা‌কে তাহ‌লে এ‌টি তো জানা আ‌ছে যে গাঢ় ঘু‌মের সময় শরী‌রের স্মরণই যখন থা‌কে না তখনও আমরা থা‌কি এবং সু‌খেই থা‌কি । শরী‌রের স‌ঙ্গে সম্বন্ধ না থাক‌লে শরীর সুস্থ থা‌কে । সংসা‌রের স‌ঙ্গে সম্বন্ধ বি‌চ্ছেদ হ‌লে আমরাও ঠিক থাকব এবং সংসারও ঠিক থাক‌বে ।

শরীরা‌দি বস্তুগু‌লির ধারণা ও দাসত্ব মন থে‌কে দূর ক‌রে দি‌লে খুবই আনন্দ হ‌বে , এরই নাম জীবন্মক্তি । শরীর , আত্মীয় , ধন প্রভৃ‌তি রাখুন কিন্তু এর দাসত্ব করা যা‌বে না । আমরা যারা জড় বস্তুর দাসত্ব ক‌রি তারা জড় বস্তুর আজ্ঞায় চ‌লি , কিন্তু আমরা তো চৈতন্যময় । জাগ্রত , স্বপ্ন এবং সুষু‌প্তি এই তিন‌টি অবস্থা থে‌কেই আমরা ভিন্ন । এই অবস্থানগু‌লির প‌রিবর্তন হয় , কিন্তু আমা‌দের প‌রিবর্তন হয় না । আমরা এই অবস্থাগু‌লি‌কে জা‌নি আর অবস্থাগু‌লিও জানার । তাই এগু‌লি থে‌কে আমরা ভিন্ন । যেমন , ছাদ‌কে আমরা জা‌নি যে এ‌টি ছাদ । তাহ‌লে বোঝা গেল যে , আমরা ছাদ থে‌কে ভিন্ন । অতএব আমরা বস্তু , পরি‌স্থি‌তি , অবস্থা প্রভৃ‌তি থে‌কে ভিন্ন _ এই অ‌ভিজ্ঞতাই হল মু‌ক্তি ।

আমরা সংসা‌রের থে‌কে ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের সাধন - ভজন কর‌তে পা‌রি । তার জন্য প্র‌য়োজন আমা‌দের হৃদ‌য়ে শুদ্ধ ইচ্ছা । যখন আমরা ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের প্র‌তি একাগ্রতার স‌ঙ্গে ভ‌ক্তি করবো তখন সংসারের বস্তুর প্র‌তি আমা‌দের আগ্রহ ধী‌রে ধী‌রে কম‌তে থা‌কবে । যেমন , য‌দি হা‌তের কোথায় কে‌টে গে‌লে , সেখা‌নে ওষুধ দি‌লে ধী‌রে ধী‌রে সেই ক্ষত সে‌রে যা‌য় , তেমন‌নি যদি আমা‌দের মনও ভগবান শ্রী‌গো‌বিন্দের প্র‌তি একাগ্রভা‌বে থা‌কলে ত‌বে বাই‌রের বস্তুসকল আমাদের চিত্ত‌কে বি‌ক্ষিপ্ত কর‌তে পার‌বে না । ম‌নে , হৃদয়ে একান্ত শুদ্ধ ইচ্ছা , প্রেম , ভ‌ক্তি থাকা প্র‌য়োজন । যখন আমরা কৃষ্ণভাবনায় হ‌য়ে ভ‌ক্তি করব তখন কামনা বাসনা থাক‌লেও তা ধী‌রে ধী‌রে সম্পূর্ণ চ‌লে যা‌বে । শুধু শ্রীকৃ‌ষ্ণের শ্রীচর‌ণে আত্মসমর্পণ কর‌তে হ‌বে ।

জয় রা‌ধে ..........
ভুলক্রু‌টি মার্জনা কর‌বেন .......
শ্রীরাধা‌গো‌বিন্দ সক‌লের মঙ্গল করুন
নিতাই গৌর হ‌রিবল .

Post: Joy Shree Radha Madhav

Share:

৩১ মে ২০১৮

মহ‌র্ষি ব্যাস‌দে‌বের রাজা যু‌ধি‌ষ্ঠির‌কে অশ্মা মু‌নির ক‌থিত ধ‌র্মোপ‌দেশ বর্ণনা

শ্রী বৈশম্পায়ন বল‌লেন -- জন‌মেজয় ! পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠপুত্র রাজা যু‌ধি‌ষ্ঠির‌কে তাঁর আত্মীয়‌দের শো‌কে সন্তপ্ত হ‌য়ে প্রাণ‌বিসর্জন দি‌তে প্রস্তুত দেখে শ্রীব্যাস‌দেব তাঁর শোক দূর করার উ‌দ্দে‌শ্যে বল‌লেন -- " যু‌ধি‌ষ্ঠির ! এই বিষ‌য়ে অশ্মা ব্রাহ্মণ ক‌থিত এক প্রাচীন ই‌তিহাস আ‌ছে , মন দি‌য়ে শো‌নো ।

একবার বি‌দেহরাজ জনক দুঃখ ও শো‌কের বশীভূত হ‌য়ে মহাম‌তি বিপ্রবর অশ্মা‌কে জিজ্ঞাসা‌ কর‌লেন যে , " যারা নি‌জেদের কল্যাণ চায় , তা‌দের কীরূপ আচরণ করা উ‌চিত ? "

অশ্মা বল‌লেন __ " রাজন ! মানুষ যখন জন্মায় , তখন থে‌কেই দুঃখ ও শোক তার নিত্যসঙ্গী । এগু‌লি মানু‌ষের জ্ঞান‌কে এমনভা‌বে ছিন্ন‌ভিন্ন ক‌রে যেমন বায়ু মেঘ‌কে ক‌রে থা‌কে । সেইজন্যই মানু‌ষের ম‌নে দৃঢ় ধারণা হয় যে " আ‌মি কুলীন , আ‌মি সিদ্ধ , আ‌মি কো‌নো সাধারণ মানুষ নই । " সেই ধারণার বশীভূত হ‌য়ে সে পিতা পিতামহ থে‌কে প্রাপ্ত সম্পদ খরচ ক‌রে ভিখা‌রি হ‌য়ে যায় এবং অ‌ন্যের অর্থ হস্তগত করার চিন্তা কর‌তে থা‌কে । নি‌জের মর্যাদার বিষয় তার খেয়াল থা‌কে না । সে অনু‌চিত প‌থে ধন জমা‌তে থা‌কে । তাই রাজারা তা‌কে দণ্ডপ্রদান ক‌রেন ।

তাই মানু‌ষের সুখ বা দুঃখ যাই আসুক , তা স্বাভা‌বিকভা‌বে মে‌নে নেওয়াই উ‌চিত । কারণ তা দূর করার কো‌নো উপায় নেই । অ‌প্রিয় ঘটনা , প্রিয়জ‌নের বি‌চ্ছেদ - বি‌য়োগ , ইষ্ট , অ‌নিষ্ট , সুখ - দুঃখ _ এসবই প্রারব্ধ ( ভাগ্য ) অনুুসা‌রে হয় । তেমনই জন্ম - মৃত্যু ও লাভ - ক্ষ‌তিও দৈবাধীন । চি‌কিৎসক‌কেও রোগী হ‌তে দেখা যায় , বলবান ব্য‌ক্তিও কখ‌নো কখ‌নো শ‌ক্তিহীন হ‌য়ে প‌ড়ে , ধনী ব্য‌ক্তি‌কেও ভিখারী হ‌তে দেখা যায় । কা‌লের এই গ‌তি বড় রহস্যময় ।

উচ্চবং‌শে জন্ম , পুরুষার্থ , আ‌রোগ্য , রূপ , সৌভাগ্য , ঐশ্বর্য _ এ সবই প্রার‌ব্ধের অধীন । যে ভিখারী , প্র‌তিপাল‌নের কষ্ট হ‌লেও ক‌য়েক‌টি সন্তান তার গৃ‌হে জন্ম নেয় , আর যে সম্পন্ন , এক‌টি সন্তানও তার ভাগ্যে জো‌টে না । বিধাতার কর্ম বড়ই বি‌চিত্র । ব্যা‌ধি , অ‌গ্নি , জল , শস্ত্র , ক্ষুধা , তৃষ্ণা , বিপদ , বিষ , জ্বর , মৃত্যু , উচ্চস্থান থে‌কে পতন __ এ সবই জী‌বের জন্মা‌নোর স‌ঙ্গেই স্থির হ‌য়ে যায় । সেই নিয়ম অনুসা‌রেই তা‌কে এই প‌রি‌স্থি‌তি‌তে যে‌তে হয় । আজ পর্যন্ত কেউ এর থে‌কে মু‌ক্তি পায়‌নি , পা‌বেও না ।

এইভা‌বে কা‌লের প্রভা‌বেই জীব‌দের অনুকূল ও প্র‌তিকূল পদা‌র্থের স‌ঙ্গে সম্পর্ক স্থা‌পিত হয় । বায়ু , আকাশ , অ‌গ্নি , চন্দ্র , সূর্য , দিন , রাত , নক্ষত্র , নদী ও পবর্ত‌কেও কাল ব্যতীত অন্য কে সৃ‌ষ্টি ক‌রে এবং স্থির রা‌খে ? শীত - গ্রীষ্ম ও বর্ষার চক্রও কাল‌যো‌গে প‌রিব‌র্তিত হয় । মানু‌ষের সুখ - দুঃ‌খের বিষ‌য়েও একই ব্যাপার । রাজন্ ! মানু‌ষের ওপর যখন জরা - মৃত্যুর আক্রমণ হয় তখন কো‌নো ওষুধ , মন্ত্র , হোম , যজ্ঞ তা‌কে রক্ষা কর‌তে পা‌রে না ।

ইহজগ‌তে বহু পিতা - মাতা , স্ত্রী - পুত্র আমা‌দের হ‌য়ে‌ছিল , কিন্তু বাস্ত‌বে চিন্তা ক‌রে দেখ , তারা কার এবং আমরা কা‌দের আপন বলব ? পথ চলার সময় পথচারী‌দের ম‌তোই আমা‌দের স্ত্রী - বন্ধু ও সুহৃদগ‌ণের স‌ঙ্গে কালযাপন হয় । সুতরাং বিচারশীল মানুষ‌দের ম‌নে ম‌নে চিন্তা করা উ‌চিত যে __ " আ‌মি কোথায় ? " " কোনখা‌নে যাব ? " " আ‌মি কে ? " " এখা‌নে কেন এ‌সে‌ছি " এবং " কার জন্য কেন শোক কর‌ছি ? " এই জগৎ - সংসার অ‌নিত্য , চ‌ক্রের ন্যায় তা প‌রিব‌র্তিত হ‌য়ে চ‌লে‌ছে । জীবন - প‌থে মাতা - পিতা , ভাই - বোন , মিত্রা‌দির সমাগম যেমন পাস্থশালায় এক‌ত্রিত প‌থিক‌দের ম‌তো ।

কল্যাণকারী ব্য‌ক্তি‌দের শাস্ত্রাজ্ঞা উল্লঙ্ঘন না ক‌রে তা‌তে শ্রদ্ধা রাখা উ‌চিত । পিতৃ - পিতাম‌হের শ্রাদ্ধ - তর্পণ , দেবতা‌দের পূজা এবং যজ্ঞানুষ্ঠান ঠিকম‌তো সম্পন্ন ক‌রে ত‌বেই ধর্ম - অর্থ - কাম উপ‌ভোগ করা উ‌চিত । হায় ! এই সমগ্র জগৎ অগাধ কালসমু‌দ্রে ভে‌সে যা‌চ্ছে । এ‌তে জরা - মৃত্যুর ন্যায় অসংখ্য জন্তু ভ‌র্তি ; কিন্তু জী‌বের তা‌তে খেয়ালই নেই । চিকিৎসকগ‌ণও অত্যন্ত তীক্ষ্ম - কটু নানা প্রকার ঔষধ দি‌য়ে থা‌কেন , তবুও জীব এই মৃত্যু্কে উল্লঙ্ঘন কর‌তে সক্ষম হয় না ।

বড় বড় চি‌কিৎসকগণও যেমন এই জরা - বৃদ্ধত্ব দূর কর‌তে পা‌রেন না , তেমনই তপস্বী , স্বাধ্যায় - শীল , দানী , বড় বড় যজ্ঞকারী ব্য‌ক্তিগণও জরা - মৃত্যু রোধ কর‌তে পা‌রেন না । দিন - রাত , পক্ষ , মাস , বর্ষ উপ‌স্থিত হ‌য়ে চির‌দি‌নের জন্য হা‌রি‌য়ে যায় , মৃত্যুর এই দীর্ঘ পথ সকল জীব‌কেই অ‌তিক্রম কর‌তে হয় ।

সুতরাং এমন কোন মানুষ নেই , যা‌কে কা‌লের বশীভূত হ‌য়ে যে‌তে না হয় । নিজ দে‌হের স‌ঙ্গেই যখন চিরস্থায়ী সম্পর্ক থা‌কে না , তখন অন্যান্য জ‌নের স‌ঙ্গে কী ক‌রে থাক‌বে ? রাজন্ ! আজ তোমার পিতা - পিতামহ কোথায় গে‌লেন ? এখন তু‌মিও তাঁ‌দের দেখ‌তে পাচ্ছ না , তাঁরাও তোমা‌কে দেখ‌চ্ছেন না । স্বর্গ বা নরক‌কে মানুষ চর্মচ‌ক্ষে দেখ‌তে পায় না । সেগু‌লি দেখার জন্য সৎপুরু‌ষেরা শা‌স্ত্রের সাহায্য নেন । সুতরাং তু‌মি শাস্ত্রানুরূপ আচরণই ক‌রো ।

মানু‌ষের প্রথম জীব‌নে ব্রহ্মচর্য পালন করা উ‌চিত । তারপর গৃহস্থাশ্র‌মে এ‌সে পিতৃ - পিতামহ ও দেবতা‌দের ঋণ থে‌কে মুক্ত হওয়ার জন্য যজ্ঞানুষ্ঠান এবং সন্তান উৎপাদন কর‌বে । এরূপ সূক্ষ্মদর্শী গৃহস্থ‌দের নিজ হৃদ‌য়ের শোক প‌রিত্যাগ ক‌রে ইহ‌লোক , স্বর্গ‌লোক ও পরমাত্মার আরাধনা করা উ‌চিত । যে রাজা শাস্ত্রানু‌সা‌রে ধর্ম আচরণ ও দ্রব্য সংগ্রহ ক‌রেন , সমস্ত জগ‌তে তাঁর সুষশ ছ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়ে ।

ব্যাস‌দেব বল‌লেন -- যু‌ধি‌ষ্ঠির ! অশ্মা মু‌নির কা‌ছে এইভাবে ধর্মরহস্য জে‌নে রাজা জন‌কের বু‌দ্ধি শুদ্ধ হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছিল , তাঁর সমস্ত ম‌নোরথ পূর্ণ হ‌য়ে‌ছিল এবং তি‌নি শোকহীন হ‌য়ে মু‌নির অনুম‌তি নি‌য়ে নিজ ভব‌নে চ‌লে গি‌য়েছি‌লেন । তু‌মিও তাঁ‌র ম‌তো শোক ত্যাগ ক‌রে উ‌ঠে দাঁড়াও । মন‌কে প্রসন্ন ক‌রো এবং শাস্ত্রধর্ম অনুসা‌রে জয় করা এই পৃ‌থিবীর রাজ্যশাসন ক‌রো ।

জয় রাধে ।
জয় হোক সকল ভক্তবৃ‌ন্দের ।
শ্রীম‌তি রাধারাণী সক‌লের মঙ্গল করুণ ।
Share:

জীবনের প্রকৃত সমস্যা কি??

একসময় যমরাজ,যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেন-পৃথিবীতে সবচেয়ে আশ্চর্যকর জিনিষ কি? উত্তরে তিনি বলেন-মানুষ দেখছে তার পিতামাতা,বন্ধুবান্ধব,আত্মীয়স্বজন,সবার মৃত্যু হচ্ছে,তবুও সে ভাবে-সে বেঁচে থাকবে!
ঠিক একটা ছাগলকে বলি দেওয়া দেখেও,অপর ছাগল সন্তুষ্ট মনে ঘাস খেতে থাকে। শুধু ইন্দ্রিয় সুখভোগ নিয়েই তৃপ্ত।
আবার যদি কারও মৃত্যুর জ্ঞান আছে,তাহলে এটা জানেনা মৃত্যুর পরে কি হবে? জিজ্ঞাসা করে দেখুন,বলবে-আমার জানা নেই!
এটাই প্রকৃত সমস্যা।


আমাদের প্রধাণ চারটি সমস্যা - জন্ম,মৃত্যু,জরা, ব্যাধি। আমরা মরতে চাইনা,তবুও মৃত্যু আসে। রোগাক্রান্ত হতে কেউ চায় না। কিন্তু যখন রোগে ধরে,তখন ভাবে-ডাক্তারের কাছে যাব,কতকগুলি ওষুধ দেবেন,সেগুলি সেবন করলে আমি ভাল হয়ে যাব,ব্যাস problem solved.
আর বৃদ্ধ হতে তো কেউই চায় না। সারাজীবন জওয়ান থাকব। তা কি হয়? এগুলোই সমস্যা।
শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতে ১২৫ বছর বয়সেও ২৫ বছরের যুবক মনে হতো। কারন সেটা চিন্ময় শরীর। আমাদেরও ভগবান সেই দেহ দিতে উৎসুক। তবে তার জন্য চেষ্টাতো করতে হবে।

কিভাবে চেষ্টা করব?
দেখুন ছোটবেলায় ১ থেকে ৯ এবং ০ যথাযথ শিখে নিয়ে,আজ সমস্ত গণিতশাস্ত্র জানা হয়ে গেছে। ঠিক তেমন,কেউ যখন কৃষ্ণকে জানতে পারে,তার সমস্ত জানা হয়ে যায়।
তবে কৃষ্ণকে জানব কিভাবে?
যেখানে ব্রহ্মা হাজার বছর চেষ্টা করেও কৃষ্ণকে জানতে পারেনি!
কৃষ্ণের মতো কৃপালু আর নেই। মহাপ্রভু শিক্ষাষ্টকে বলেছেন-
" চেতোদর্পণমার্জনম "-অর্থাৎ মনরূপী আয়নাকে ঘষে ঘষে আগে পরিস্কার করো-মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন দিয়ে। যত বড় পাপীই হোক এই একটা মন্ত্রেই সিদ্ধি,,সাথে গুরু
মন্ত্র।
জগাই-মাধাই এই নামে উদ্ধার পেল। হরিদাস ঠাকুরকে বিচলিত করতে গিয়ে,এক বেশ্যা শুধু এই মহামন্ত্রের বলে ভক্তে পরিনত হলো।

অনেক পন্ডিত ব্যক্তি তর্কে আসেন-নাকি বেদান্ত পড়তেই হবে। অবশ্যই বেদান্ত=বেদ+অন্ত--অর্থাৎ শিক্ষার যেখানে শেষ।
আচ্ছা ভক্ত ধ্রুব ও প্রহ্লাদ ওইটুকু বয়সেই কি বেদান্ত পড়েছিল? আর কোনো অশিক্ষিত ব্যক্তি যদি বেদান্ত না পড়তে পারে,ভগবান কি তাকে স্বীকার করবেন না?
কলিযুগে বেদান্ত নয়,তবে ভাগবত আর গীতা পড়তেই হবে।
যে যুগে যেটা সম্ভব।

আমার গুরু বলেন-
টাকা মাটি-এই কথাটা ঠিক না। টাকা কি করে মাটি হয়? কিন্তু টাকাকে উল্টান,হবে কাটা।
টাকা- কাটা। টাকা বেশী হয়ে গেলে সেই টাকাই আপনাকে কাঁটার মতো বিঁধবে-ইহা সত্য।

বেদ-পন্ডিতগণ এটা কি জানেন,ডাক্তারের কাছে সব রোগের জন্য একটা ওষুধ থাকে- that is called " panancea ".
শ্রীকৃষ্ণ যেমন- সর্বকারনকারনম
তেমনই
মহামন্ত্র--সর্বদুঃখহরণম।

প্ররোচিত না হয়ে মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করে যান। চিন্তা নেই,মহাপ্রভু কথা দিয়েছেন-উদ্ধার করবেন।

(c) Joy Shree Radha Madhav
Share:

পরমাত্মাতত্ত্ব যখন এতই সুগম যে সেই দি‌কে দৃ‌ষ্টি দেওয়া মাত্র তার প্রা‌প্তি হয়ে যায় , তাহ‌লে এ‌তে বাধা কী ?

 যে রী‌তি‌তে সাংসা‌রিক বস্তু পাওয়া যায় সেই রী‌তি‌তে পরমাত্মারও প্রা‌প্তি হয় -- এটা মে‌নে নেওয়াই পরমাত্ম‌াপ্রা‌প্তির পথে বড় বাধা । সাংসা‌রিক বস্তুর প্রা‌প্তি তো ক‌র্মের দ্বারা হয় কিন্তু তার পরমাত্মার প্রাপ্তি ক‌র্মের দ্বারা হয় না , তা হয় ভাব এবং বো‌ধের দ্বারা । তার কারণ সাংসা‌রিক বস্তুগু‌লি‌কে তৈ‌রি কর‌তে হয় , উৎপন্ন কর‌তে হয় , কোথাও থে‌কে নি‌য়ে আস‌তে হয় , তার জন্য কোথাও যে‌তে হয় । কিন্তু পরমাত্মার জন্য কোথাও যে‌তে হয় না ।

পর‌মেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পরমাত্মারূ‌পে সক‌লের হৃদ‌য়ে আ‌ছেন । শ্রীকৃষ্ণ হ‌লেন খুব কা‌ছের আপনজন । প‌রিবার ব‌লেন বা সমাজ বা দেশ সক‌লে তো বিপ‌দে অনেক প‌রে আ‌স‌বে কিন্তু য‌দি শ্রীকৃষ্ণ‌কে স্মরণ করা হয় ত‌বে তি‌নি কোন না কোনভা‌বে রক্ষা কর‌বেন । তাই আমা‌দের সব‌চে‌য়ে আপনজন হ‌লে আমাদের হৃদ‌য়ে থাকা শ্রীকৃষ্ণ । আপ‌নি য‌দি একাগ্রভা‌বে তাঁ‌কে ডা‌কেন তি‌নি অবশ্যই সাড়া দি‌বেন য‌দি ম‌নে দৃঢ় বিশ্বাস থা‌কে ।

পরমাত্ম সমগ্র দেশ , কাল , বস্তু , ব্য‌ক্তি , প‌রি‌স্থি‌তি , ঘটনা অবস্থা প্রভৃ‌তি‌তে যেমনকার তেমন বিদ্যামান থাকেন । তাঁর প্রা‌প্তি‌র জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা নেই , এই জন্যই তাঁ‌কে পাওয়া যা‌চ্ছে না । আকাঙ্ক্ষা না হওয়ার কারণ শরী‌রের স‌ঙ্গে একত্ব মে‌নে নি‌য়ে সুখ‌ভোগ করা । যেমন জা‌লে আটকে পড়া মাছ এ‌গো‌তে পা‌রে না তেমনই সাংসা‌রিক সু‌খে জ‌ড়ি‌য়ে পড়া মানু‌ষের দৃ‌ষ্টি পরমাত্মার দি‌কে এ‌গো‌তে পা‌রে না । কেবল এইটুকু নয় , সাংসারিক সুখ ( ভোগ এবং সংগ্রহ ) - এ আসক্ত মানুষ পরমাত্মা‌কে প্রাপ্ত করার সিদ্ধান্তও নি‌তে পা‌রে না ।

সুখ‌ভোগ হল নি‌জের বি‌বেক‌কে অনাদর করা । য‌দি মানুষ নি‌জের বি‌বেক‌কে গুরুত্ব দেয় তাহ‌লে সে সুখ ভোগ কর‌তে পা‌রে না । কারণ ভোগ্য বস্তু‌কে স্থায়ী ম‌নে ক‌রেই সুখ‌ভোগ হ‌য়ে থা‌কে । তাকে স্থায়ী ম‌নে না কর‌লে সুখ‌ভোগ হ‌তেই পা‌রে না । শরীর - সংসার প্রতি মুহূ‌র্তে বদলা‌চ্ছে , মুহূ‌র্তের জন্যও স্থির থাকে না - এই বোধ হ‌লে মানুষ সুখ‌ভোগ কর‌তেই পা‌রে না ।

কারণ বি‌বেক জাগ্রত হ‌লে মানু‌ষের স্থি‌তি শরীরে থা‌কে না , তা থা‌কে স্বরূ‌পে । তাই মানু‌ষের উ‌চিত বি‌বেক‌কে গুরুত্ব দেওয়া । বি‌বেক‌কে মানুষ য‌দি গুরুত্ব না দেয় ত‌বে কি গাছ গুরুত্ব দে‌বে ? জন্তুরা গুরুত্ব দে‌বে ? তাহলে মানু‌ষের স‌ঙ্গে জন্তুর প্র‌ভেদ কোথায় হল ?

সংসা‌রে কো‌নো বস্তুই স্থির নয় । প্র‌ত্যেক বস্তু প্র‌তি মুহূ‌র্তে বিনা‌শের দি‌কে যা‌চ্ছে । এই কথা‌টি শিখ‌তে হ‌বে না , বুঝ‌তে হ‌বে , অনুভব কর‌তে হ‌বে । অনুভব কর‌লে সুখাস‌ক্তি থাক‌বে না ।
Share:

এক‌টি শিক্ষামূলক গল্প ( সাধু - স‌ন্তের শরণাগ‌তি )

এক গ্রা‌মে এক রাজপুত ছিল । তার আত্মীয় স্বজ‌নের ম‌ধ্যে এক‌টি ছে‌লে ছাড়া আর কেউ বেঁ‌চে ছিল না । সে সেই রাজপু‌তের বা‌ড়ি‌তে কাজ কর‌তে লাগল । প্র‌ত্যেক দিন ভো‌রে সে গোরু বাছুর চরা‌তে যেত আর ফি‌রে এ‌সে খাবার খেত । এইভাবে দিন কাটছিল ।

এক‌দিন দুপু‌রে সে গোরু চ‌রি‌য়ে ফি‌রে এ‌লে রাজপু‌তের প‌রিচারিকা তা‌কে ঠাণ্ডা রু‌টি খে‌তে দিল । তখন ছে‌লে‌টি বলল " একটু দই / ঘোল পে‌লে ভা‌লো হত । " প‌রিচা‌রিকা বলল -- " যা - যা তোর জন্য আবার এসব কর‌তে পারব না । যা , এম‌নিই খে‌য়ে নে , না খে‌লে তোর যা ইচ্ছা কর । " সেই ছে‌লে‌টির তখন খুব রাগ হ‌লো , সে ভাবল যে আ‌মি এত রো‌দে গোরু চ‌রি‌য়ে এলাম , একটু দই চাইলাম তো মুখ ঝাম্ টা দিল । সে ক্ষি‌ধে নি‌য়েই সেখান থে‌কে চ‌লে গেল ।

গ্রা‌মের কা‌ছেই এক‌টি শহর ছিল । সেই শহরে এক‌টি সাধু‌দের দল এ‌সে‌ছিল । ছে‌লেটি সেইখানে চ‌লে গেল । সাধুরা তাকে খে‌তে দিল আর জিজ্ঞাসা করল - " তোমার সংসা‌রে কে কে আ‌ছে ? " সে বলল , " কেউ নেই । " তখন সাধুরা বলল - " তু‌মি সাধু হ‌য়ে যাও । " ছে‌লে‌টি সাধু হ‌য়ে গেল । প‌রে সে পড়া‌শোনা ক‌রার জন্য কাশী গেল । সেখা‌নে লেখাপড়া শিখে খুব বিদ্বান হ‌লো । ক‌য়েক বছর প‌রে সে মণ্ড‌লেশ্বর ( মোহন্ত ) নির্বা‌চিত হল । মণ্ড‌লেশ্বর হবার পর এক‌দিন তার সেই পুরা‌নো শহর থে‌কে নিমন্ত্রণ এ‌লো । সেই সাধু‌টি তখন নি‌জের মণ্ডলীর সাধু‌দের নি‌য়ে সেখা‌নে এ‌লেন ।

যে রাজপু‌তের কা‌ছে তি‌নি আ‌গে কাজ কর‌তেন , সেই রাজপুত বৃদ্ধ হ‌য়ে‌ছি‌লো । সেই রাজপুত তাঁর কা‌ছে এ‌সে সৎসঙ্গ কর‌লেন এবং প্রার্থনা জানা‌লেন - " মহারাজ ! একবার আমার কু‌টি‌রে পদার্পণ করুন , যা‌তে আমার কু‌টির প‌বিত্র হয় । " মণ্ড‌লেশ্বর সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ কর‌লেন ।

মণ্ড‌লেশ্বর তাঁর মণ্ডলীর সাধু‌দের নি‌য়ে রাজপু‌তের গৃ‌হে গে‌লেন । খাবার সময় হ‌লে পং‌ক্তি ভোজ‌নের ব্যবস্থা হ‌লো এবং সক‌লে মি‌লে খে‌তে বস‌লেন । গীতার পঞ্চদশ অধ্যায় পাঠ করা হ‌লো এবং তারপরে সক‌লে খে‌তে শুরু কর‌লেন । মহারা‌জের সাম‌নে নানাপ্রকার সুখাদ্য থ‌রে থরে সাজা‌নো ছিল । সেই রাজপুত মণ্ড‌লেশ্বর মহারা‌জের কা‌ছে এ‌লেন , তাঁর স‌ঙ্গে তাঁর প‌রিচারক হা‌তে হালুয়ার পাত্র নি‌য়ে এ‌লো ।

রাজপুতও মহারা‌জকে অনু‌রোধ কর‌তে লাগলেন যা‌তে তি‌নি অনন্তঃ একটু হালুয়া তাঁর হাত থে‌কে নেন । মহারাজ তাই‌তে হে‌সে ফেল‌লেন । তাঁর হা‌সি দে‌খে রাজপুত আশ্বর্যান্বিত হ‌য়ে জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " আপ‌নি হাস‌ছেন কেন ? " মহারাজ বল‌লেন , " আমার একটা পুরা‌নো কথা ম‌নে প‌ড়ে হা‌সি পেল । " রাজপুত জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " কি কথা , আমাকে বলুন ! "

মহারাজ তখন সবাই‌কে উ‌দ্দে‌শ্য ক‌রে বল‌লেন , " ও‌হে , তোমরা একটু অ‌পেক্ষা ক‌রো , ব‌সো , জ‌মিদার এক‌টি পু‌রো‌নো কথা জান‌তে চাই‌ছেন , তাই ব‌লি শো‌নো । " মহারাজ রাজপুত‌কে জিজ্ঞাসা কর‌লেন , " আপনার জ্ঞা‌তির একজন আপনার স‌ঙ্গে থাকত , সেই প‌রিবা‌রের কেউ আ‌ছে কি ? " রাজপুত বল‌লেন , " এক‌টি ছে‌লে শুধু ছিল , সে কিছু‌দিন গোরু চরাত , তারপর কি জা‌নি কোথায় চ‌লে গেল ! অ‌নেক‌দিন হ‌য়ে গেল , আর সে ফি‌রে এ‌লো না । "

মহারাজ বল‌লেন , " আমিই সেই ছে‌লে ! কা‌ছেই এক সাধুমণ্ডল এ‌সে‌ছি‌লো , আ‌মি সেখানেই গি‌য়ে‌ছিলাম । প‌রে কাশী চ‌লে যাই , সেখা‌নে লেখাপড়া শি‌খে প‌রে মণ্ড‌লেশ্বর হ‌য়ে‌ছি । এই সেই দালান , এখা‌নেই এক‌দিন আপনার বা‌ড়ির প‌রিচা‌রিকা আমাকে সামান্য একটু দই দি‌তে আপ‌ত্তি ক‌রে‌ছিল । আজ সেই আমিই আর এই সেই দালান , আপ‌নিও সেই একই ব্য‌ক্তি , যি‌নি নি‌জের হাতে আমা‌কে মোহন‌ভোগ দি‌য়ে বল‌ছেন যে দয়া ক‌রে আ‌মি যেন আপনার হাত থে‌কে একটু মোহন ভোগ খাই ! "

" চাই‌লে পাওয়া যায় না ঘোল , তবু হলাম ধন্য ।

গলায় বা‌ধে মোহন ভোগ এ‌তো সাধু স‌ঙ্গের পুণ্য ।। "

সাধু‌দের শরণ গ্রহণ কর‌লে এমনই হয় যে , যেখা‌নে সামান্য ঘোল পাওয়া যায় না , সেখা‌নে মোহন ভোগও গলায় আট‌কে যায় । য‌দি কেউ ভগবা‌নের শরণ গ্রহণ ক‌রেন তাহ‌লে তি‌নি সাধু‌দেরও বরণীয় হ‌য়ে ও‌ঠেন । লক্ষপ‌তি বা কো‌টিপ‌তি হ‌লে নয় , ভগবানের শরণাগত হ‌লে , ভগবানের ভক্ত হ‌লে ত‌বেই স্বাধীন হওয়া যায় এবং তা একমাত্র মনুষ্যজ‌ন্মেই সম্ভব ।

ম‌নে রাখা দরকার যে , আমরা একজন ব্য‌ক্তির বাই‌রে দে‌খে বিচার ক‌রি কিন্তু তার মধ্যে কি আ‌ছে তা আমরা জা‌নি না । তাই যে যেমনই হোক না কেন কাউ‌কে নিচু বা খারাপ ম‌নে করা উ‌চিত নয় । যেমন আ‌জ যে সাধারণ সে হয়ত একজন ডাক্তার হ‌বে আর চি‌কিৎসা করার জন্য তার কা‌ছে যে‌তে হ‌বে । যার জন্ম যেমনই হোক না কেন মানুষ তার ক‌র্ম্মে প‌রিচিত হয় ।

 (c) Joy Shree Radha Madhav
Share:

মানুষ কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয় না , প্রত্যুত " অন্যত্র কর্ম " কর‌লে অর্থাৎ নি‌জের জন্য কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয়

মানুষ কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয় না , প্রত্যুত " অন্যত্র কর্ম " কর‌লে অর্থাৎ নি‌জের জন্য কর্ম কর‌লে আবদ্ধ হয় । মানুষ কর্মবন্ধন থে‌কে তখনই মুক্ত হ‌তে সক্ষম হয় , যখন সে জগৎসংসার থে‌কে প্রাপ্ত শরীর , বস্তু , যোগ্যতা এবং সামর্থ্য জগ‌তেরই সেবায় নি‌য়ো‌জিত ক‌রে এবং তার প‌রিবর্তে কো‌নো কিছু আশা না ক‌রে , কেননা আমরা প্রকৃতপ‌ক্ষে যা চাই জগৎ আমা‌দের তা দি‌তেই পা‌রে না ।

আমরা সুখ চাই , অমরত্ব চাই , নি‌শ্চিন্ততা চাই , নির্ভয় হ‌তে চাই , স্বাধীনতা চাই । কিন্তু এসব সংসার থে‌কে পাওয়া সম্ভব নয় । সংসার থে‌কে সম্পর্ক ছেদ হ‌লেই তা পাওয়া সম্ভব । সংসা‌রের স‌ঙ্গে সম্পর্ক বি‌ছিন্ন করার জন্য আমা‌দের উ‌চিত সংসার থে‌কে প্রাপ্ত বস্তু সংসা‌রের সেবা‌তেই নি‌য়োগ করা ।

সৎ - অসৎ - এর বিচার করায় অসমর্থ পশু - পক্ষী - বৃক্ষ ইত্যা‌দির দ্বারা স্বাভা‌বিক প‌রোপকার ( কর্তব্য ) পালিত হয় । কিন্তু মানুষ ভগবৎ - কৃপায় বি‌শেষভা‌বে বি‌বেচনা করার শ‌ক্তি ( বি‌বেক ) লাভ ক‌রে‌ছে । সুতরাং সে য‌দি নিজ বি‌বেচনা‌কে ( বি‌বেক‌কে ) গুরুত্ব দি‌য়ে কো‌নোরূপ অকর্তব্য না ক‌রে , ত‌বে তার দ্বারা স্বাভা‌বিকভা‌বেই লোক - হিতার্থ কর্ম হওয়া সম্ভব ।


ব্রহ্মা মানুষ‌কে বল‌লেন , " তোমরা নি‌জে‌দের কর্তব্য পালন দ্বারা সব‌কিছুর বৃ‌দ্ধি‌তে সহায়তা ক‌রো , উন্ন‌তি‌তে সাহায্য ক‌রো । এরূপ কর‌লে তোমরা কর্তব্যকর্ম করার উপ‌যোগী সামগ্রী পে‌তে থাক‌বে , কখনো তার অভাব হ‌বে না । " ভগবা‌নের নি‌র্দে‌শে এবং তাঁর শ‌ক্তি‌তে ব্রহ্মা প্রজা সৃ‌ষ্টি ক‌রেন । সুতরাং মূল স্রষ্টা প্রকৃতপ‌ক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণই । নিষ্কামভা‌বে অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের জন্য কর্ম কর‌লে মানুষ মুক্ত হ‌য়ে যায় এবং সকামভা‌বে অর্থাৎ শুধুমাত্র নি‌জের জন্য কর‌লে মানুষ বন্ধন দ্বারা আবদ্ধ হ‌য়ে প‌ড়ে । কেননা সকামক‌র্মে ফ‌লের আশায় থাকায় সেই ফল ভোগ কর‌তে হয় তাই সকামকর্ম বন্ধনের কারণ ।

প্রকৃতপ‌ক্ষে চিন্তা কর‌লে দেখা যায় , বর্তমান মানব সমা‌জে আমা‌দের উন্ন‌তি থে‌কে অবন‌তি বে‌শি হয় । কেননা প্রথমত মিথ্যা কথা বলা , হিংসা , লোভ - লালসা , অহংকার , ক্রোধ ইত্যা‌দির বি‌ভিন্ন কার‌ণে আমরা অপর‌কে কষ্ট দি‌য়ে থা‌কি । ফ‌লে অপ‌রের তো ক্ষ‌তি হয়ই বরং নি‌জের বে‌শি ক্ষ‌তি হ‌য়ে যায় । আমরা চিন্তা না ক‌রে কর্ম ক‌রি । প‌রে অনুশোচনা কর‌তে হয় ।

মানু‌ষের শরীর প্রকৃতপ‌ক্ষে ভোগসু‌খের জন্য নয় । তাই " সাংসা‌রিক সুখ‌ভোগ ক‌রো " -- এরূপ নি‌র্দেশ বা বিধান কো‌নো সৎ - শা‌স্ত্রে নেই । সমাজও যেমন সুখ ভোগ করার নি‌র্দেশ দেয় না । শাস্ত্র এবং সমাজ অপর‌কে সুখী করার নি‌র্দেশই দি‌য়ে থা‌কে । কিন্তু আমরা কতটা কর‌তে পা‌রি সেটা আমাদের উপর নির্ভর ক‌রে । অপ‌রের উপকার কর‌লে নি‌জের কোন ক্ষ‌তি হয় না । যতটুকু সম্ভব সক‌লের সেবা করার কর্তব্য ।

কর্ম‌যোগী সর্বদা দেওয়ার ভাবই পোষণ ক‌রেন , গ্রহণ করার নয় । শুধু টাকা দি‌য়ে সাহায্য কর‌তে হ‌বে এমন নয় , কত কর্ম আ‌ছে যা টাকা ছাড়াও করা যায় । য‌দি আমাদের অপর‌কে কিছু দেওয়ার প‌রিবর্তে নি‌জের স্বা‌র্থের জন্য কিছু গ্রহণ ক‌রার ইচ্ছা থা‌কে তাহ‌লে তা কল্যানপ্রাপ্তি‌তে বাধা দেয় এবং তার স‌ঙ্গে সাংসা‌রিক বস্তুসামগী প্রা‌প্তি‌তেও অন্তরা‌য়ের সৃ‌ষ্টি হয় । প্রায় সক‌লেই অনুভব ক‌রে যে সংসা‌রে যারা চা‌হিদা পোষণ ক‌রে তা‌দের কেউই কিছু দি‌তে চায় না । তাই ব্রহ্মা ব‌লে‌ছেন যে , কো‌নো কিছুর আশা না ক‌রে নিঃস্বার্থভা‌বে কর্তব্যপালন কর‌লেই মানুষ নিজ উন্ন‌তি ( কল্যাণ ) সাধন কর‌তে সক্ষম হয় ।

কেউ আমার উপকার করুক বা না করুক , আমার কর্তব্য হল তা‌কে সেবা করা । এখা‌নে শুধু পদ‌সেবার কথা বলা হয়‌নি , অ‌নেক রকম সেবা করা যায় । অ‌ন্যে কী ক‌রে , কী ক‌রে না , আমা‌কে সুখ দেয় , না দেয় দুঃখ দেয় এসব আমার দেখার দরকার নেই , কারণ অপ‌রের কর্ত‌ব্যের খোঁজ যে ক‌রে সে নিজ কর্তব্য হ‌তে বিচ্যুত হয় । প‌রিণা‌মে তার পতন ঘ‌টে । অন্য‌কে দি‌য়ে কর্তব্যপালন করা‌নো আমার অ‌ধিকার নয় । সক‌লের হিতা‌র্থে শুধু আমা‌দের নি‌জের নিজের কর্তব্যপালন কর‌তে হ‌বে যা‌তে সবাই সুখী হয় । সেবা করার সময় নি‌জের বু‌দ্ধি , সামর্থ্য , সময় এবং বস্তুসামগ্রী পুর‌োপু‌রিভা‌বে অপ‌রের হিতা‌র্থে নি‌য়োগ করা চাই অর্থাৎ যৎ‌কি‌ঞ্চিৎও নি‌জের জন্য অ‌বশিষ্ট রূ‌পে রাখা উ‌চিত নয় ।

🌹🌹 জয় শ্রীরা‌ধে 🌺🌺
==============


(c)  Joy Shree Radha Madhav
Share:

একাগ্রভা‌বে গবানকে স্মরণ কর‌তে হ‌বে, তবেই ভগবানের সাক্ষাৎ পাবেন ।

কেউ যেমনই অজ্ঞানী অথবা মূর্খ হোক না কেন , য‌দি সে ঈশ্ব‌রের অনন্যভ‌ক্তি কর‌তে শুরু ক‌রে বা জ্ঞানী মহাত্মার কা‌ছে গমন ক‌রে কিছু শ্রবণ ক‌রে আর তদনুসা‌রে আচরণ শুরু ক‌রে তাহ‌লে সেও পরমপদ পে‌তে পা‌রে । অর্থাৎ শ্রবণ তারপর নি‌র্দেশ অনুসা‌রে চল‌লে জীবন ধী‌রে ধী‌রে প‌রিবর্তন হ‌তে থাক‌বে ফ‌লে পারমা‌র্থিক জীব‌নে এ‌গি‌য়ে যাওয়া যা‌বে ।

মূর্খ হ‌লেও চিন্তা নেই তা‌কে মহাত্মা বা স্বয়ং ভগবানই জ্ঞান দান কর‌তে পা‌রেন । পাপী , মূর্খ হ‌লেও আয়ুর অল্পকাল অবশিষ্ট থাক‌লেও ভগবা‌নের কৃপায় মু‌ক্তি হতে পা‌রে । কেবল এক‌টি কাজ কর‌তে হ‌বে । " ভগবান আ‌ছেন " --- এই সুদৃঢ় বিশ্বাস নি‌য়ে ওঠা বসা , ক্ষুধা - তৃষ্ণা নিবারণ , চলা - ফেরা , শোওয়া - জাগ‌রণ সবসময় সতত ভগবান‌কে স্মর‌ণে রাখ‌তে হ‌বে ।

ধরুন , পরীক্ষা ১ বছর পর হ‌বে । এখন আ‌মি কি করলাম আজ যে পড়া ছিল চিন্তা করলাম আগামীকাল পড়ব , আগামীকাল বললাম পরশু পড়ব , এমন কর‌তে করতে পরীক্ষা চ‌লে এ‌লো । সারাবছর তো পড়া হয়‌নি তাই পরীক্ষার আ‌গের দিন কিছু প‌ড়ে নি‌লে অনন্তপ‌ক্ষে পরীক্ষার দিন কিছু লিখ‌তে পার‌বে হয়ত পাসও হ‌য়ে যা‌বে । তেম‌নি সারা‌দিন থে‌কে কিছু সময় ভগবা‌নের নাম স্মর‌ণে ব্যস্ত রাখ‌লে অ‌ন্তি‌মে ভা‌লো কিছু হ‌বেই ।

আপ‌নি বল‌বেন যে নিদ্রাগমন কা‌লে তো ভগবান‌কে স্মরণ হয় না । তাহ‌লে বলব য‌দি দি‌নে ভগবা‌নের স্মরণ - মনন চ‌লে তাহ‌লে রা‌ত্রেও তা অব্যাহত থাক‌বে কারণ যে কার্য দি‌নে করা হয় তা রা‌ত্রেও স্ব‌প্নে আস‌তে থা‌কে । রা‌ত্রিকা‌লে স্মরণ যা‌তে হয় তার একটা সহজ উপায় আ‌ছে । শয়নকা‌লে শু‌য়েও তা করা যে‌তে পা‌রে । দশ - প‌নে‌রো মিনিট জাগ‌তিক সংকল্প প্রবাহ থে‌কে দূ‌রে গি‌য়ে ভগবা‌নের নাম রূপ স্মরণ ক‌রে ও তাঁর লীলাসকল মনন কর‌তে কর‌তে ঘু‌মি‌য়ে পড়ুন । তা‌তে রা‌ত্রে ভগবা‌নের স্মরণ হ‌তে থা‌কবে ।

হ্যাঁ ত‌বে লীলা সকল একাগ্রভা‌বে স্মরণ কর‌তে হ‌বে । প্রিয়া যেমন প্রিয়ার প্র‌তি একাগ্র থা‌কে তেম‌নি আপ‌নিও ভগবা‌নের প্রে‌মের প্র‌তি একাগ্র থে‌কে লীলা সকল স্মরণ কর‌বেন । আসল কথা যে , সতত ভগবান‌কে ম‌নে রাখুন , কখ‌নো তাঁ‌কে ভু‌ল‌বেন না । য‌দি ত্রিভুব‌নের রাজ্যলাভও হয় সে‌টিও অ‌তি নগন্য ম‌নে ক‌রে ত্যাগ কর‌বেন কিন্তু ভগবানের স্মরণ - মনন ছাড়‌বেন না । য‌দি কখ‌নো ভগবা‌নের বিস্মরণ না হয় আর যার একমাত্র ভগবানই পরম‌প্রিয় ও সর্বস্ব , সেই ধন্য ।

শ্রীমদ্ভাগব‌তে বলা আ‌ছে --

‌ত্রিভুব‌বিভব‌হেত‌বেহপ্যকুন্ঠস্মৃ‌তির‌জিাত্মসুরা‌দি‌ভি‌র্বিমৃগ্যাৎ ।

ন চল‌তি ভগবৎপদার‌বিন্দাল্লব‌নি‌মিষার্ধম‌পি যঃ স বৈষ্ণবাগ্র্য়ঃ ।।

‌বিসৃ‌জ‌তি হৃদয়ং ন যস্য সাক্ষাদ্ধ‌রিরবশা‌ভি‌হিতোহপ্যঘৌঘনাশঃ ।

প্রণয়রশনয়া ধৃতাঙ্‌ঘ্রিপদ্মঃ স ভব‌তি ভাগবতপ্রধান উক্তঃ ।। ( ১১ \ ২ \ ৫৩ , ৫৫ )

" ত্রিভুব‌নের রাজ্য‌বৈভ‌বের জন্য যার ভগবৎ‌চিন্তা বি‌ঘ্নিত হয় না , যে ভগবা‌নেরই মন স‌ন্নি‌বিষ্টকারী , দেবতা‌দি দ্বারা কা‌ঙ্ক্ষিত ভগবৎ চরণকম‌লের স্মর‌ণে মুহূ‌র্তের জন্যও বিচ্যুত হয় না , সেই ভগবদ্ভ‌ক্ত‌দের ম‌ধ্যে অগ্রগণ্য হয় । বিবশ হ‌য়ে নাম উচ্চারণকারীরও যি‌নি সম্পূর্ণ পাপ ধ্বংস ক‌রেন , সেই সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম পর‌মেশ্বর ভক্ত‌কে কখ‌নো ত্যাগ কর‌তে পা‌রেন না কারণ তাঁর পাদপদ্ম ভ‌ক্তের প্রেম রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ থা‌কে । তা‌কেই ভগবদ্ভক্ত‌দের ম‌ধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হয় । "

 (c) Joy Shree Radha Madhav
Share:

সংস‌ার ও ভগবান

এই দুই‌য়ের সম্পর্ক দুপ্রকা‌রের । সংসা‌রের স‌ঙ্গে শুধু মে‌নে নেওয়া সম্পর্ক আর ভগবা‌নের স‌ঙ্গে সম্পর্ক বাস্ত‌বিক । সাংসা‌রিক সম্পর্ক মানুষ‌কে পরাধীন ক‌রে , গোলাম বানায় , ভগবা‌নের সম্পর্ক মানুষ‌কে স্বাধীন ক‌রে , চিন্ময় ক‌রে ।

‌কোনো বিষ‌য়ে নি‌জের ম‌ধ্যে কো‌নো বৈ‌শিষ্ট্য দেখা হল প্রকৃতপ‌ক্ষে পরাধীনতা । মানুষ য‌দি বিদ্যা , বু‌দ্ধি , ধন - সম্প‌ত্তি , ত্যাগ , বৈরাগ্য ইত্যা‌দি কো‌নো বিষ‌য়ের জন্য নি‌জে‌কে বি‌শিষ্ট ব‌লে ম‌নে ক‌রে তাহ‌লে প্রকৃতপ‌ক্ষে তা ওই বিদ্যা ইত্যাদিরই পরাধীনতা , দাসত্ব হ‌য়ে থাকে ।
যেমন ,‌ কেউ য‌দি অ‌র্থের জন্য নি‌জে‌কে বি‌শিষ্ট ব‌লে ম‌নে ক‌রে , তাহ‌লে সেই বৈ‌শিষ্ট্য অ‌র্থেরই , মানুষ‌টির নয় । সে নি‌জে‌কে অ‌র্থের মা‌লিক ম‌নে কর‌লেও , আস‌লে সে অ‌র্থের গোলাম ।

সংসা‌রের বৈ‌শিষ্ট্যই হল যে সাংসা‌রিক কো‌নো বস্তু নি‌য়ে যে ব্য‌ক্তি নি‌জে‌কে বি‌শেষ কিছু ব‌লে ম‌নে ক‌রে , সেই বস্তু‌টিই তাকে তুচ্ছ ক‌রে দেয় , পদদ‌লিত করে রা‌খে । কিন্তু যিনি ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের আ‌শ্রিত হ‌য়ে সর্বদা তাঁর ওপর নির্ভর করে থা‌কেন , তি‌নি নিজস্ব কো‌নো বৈ‌শিষ্ট্য দে‌খেন না , বরং ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই অ‌লৌ‌কিকত্ব , বি‌শেষত্ব ও বি‌চিত্র - ভাব প্রত্যক্ষ ক‌রেন ।


ভগবান তাঁ‌কে তাঁর মাথার মণি ক‌রে রাখুন , বা নি‌জের প্রভু করে নিন , তাহ‌লেও তার কো‌নো বিষ‌য়ে অহংভাব আসে না । এরূপ ভ‌ক্তের ম‌ধ্যে শ্রীকৃ‌ষ্ণের বি‌শেষ আ‌বির্ভূত হয় । কারও কারও ম‌ধ্যে এই বি‌শেষ ভাব এত বে‌শি দেখা যায় যে তাঁর শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি ইত্যা‌দি প্রাকৃত বস্তুগু‌লিও চিন্ময় হ‌য়ে ও‌ঠে । তাঁর ম‌ধ্যে জড়‌ত্বের একান্তই অভাব হয়ে যায় ।

এরূপ ভগবা‌নের কত প্রে‌মিক ভক্ত ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণে মি‌শে গে‌ছেন , শেষকা‌লে তাঁদের দেহও পাওয়া যায়‌নি । যেমন , ভ‌ক্তিম‌তি মীরা সশরী‌রে ভগবানের বিগ্র‌হে লীন হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছি‌লেন । কেবল চিহ্নরূ‌পে তাঁর শা‌ড়ির এক‌টি ছোট টুক‌রো বিগ্র‌হের মু‌খে আট‌কে ছিল , আর কিছুই ছিল না । এইভা‌বে সন্ত তুকারামও সশরী‌রে বৈকু‌ন্ঠে গমন ক‌রে‌ছি‌লেন ।

জ্ঞানমা‌র্গে শরীর চিন্ময়ত্ব লাভ ক‌রে না । কারণ জ্ঞানী অসৎ - এর স‌ঙ্গে সম্বন্ধ বি‌চ্ছেদ ক‌রে , অসৎ - এর থে‌কে পৃথক হ‌য়ে স্বয়ং চিন্ময় - ত‌ত্ত্বে স্থিত হন । কিন্তু ভক্ত যখন ভগবা‌নের সম্মুখীন হন , তখন তাঁর দেহ - মন - প্রাণ - ই‌ন্দ্রিয় সবই ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের সম্মুখীন হ‌য়ে যায় । তাৎপর্য হল এই যে , যাঁর দৃষ্টি‌তে চিন্ময় - তত্ত্ব ছাড়া জড়‌ত্বের কো‌নো পৃথক অ‌স্তিত্ব নেই , সেই চিন্ময়তা তাঁর শরীর ইত্যা‌দি‌তে প‌রিব্যাপ্ত হ‌য় এবং শরীরা‌দি চিন্ময়ত্ব লাভ ক‌রে । সাধারণ লো‌কে তাঁর শরী‌রে জড়ত্ব দেখ‌লেও , বাস্ত‌বে তাঁর শরীর চিন্ময় হ‌য়ে যায় ।

সর্ব‌তোভা‌বে ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হ‌লে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা শরণাগতের জন্য বি‌শেষভা‌বে প্রক‌টিত হয় , কিন্তু জগৎ‌কে স্নেহপূর্বক পালনকারিণী এবং শ্রীকৃ‌ষ্ণে অ‌ভিন্ন বাৎসল্যময়ী মাতা লক্ষ্মী‌দেবীর প্রভুর শরণাগত‌দের প্র‌তি কত স্নেহ , কত ভা‌লোবাসা , তার বর্ণনা কেউ কর‌তে পা‌রে না ।

সর্ব‌তোভা‌বে ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হ‌লে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা শরণাগতের জন্য বি‌শেষভা‌বে প্রক‌টিত হয় , কিন্তু জগৎ‌কে স্নেহপূর্বক পালনকারিণী এবং শ্রীকৃ‌ষ্ণে অ‌ভিন্ন বাৎসল্যময়ী মাতা লক্ষ্মী‌দেবীর প্রভুর শরণাগত‌দের প্র‌তি কত স্নেহ , কত ভা‌লোবাসা , তার বর্ণনা কেউ কর‌তে পা‌রে না । লৌ‌কিক ব্যবহা‌রেও দেখ‌া যায় যে প‌তিব্রতা স্ত্রী পিতৃভক্ত পুত্র‌কে অত্যন্ত ভা‌লোবা‌সেন ।

আমা‌দের ম‌নে রাখ‌তে হ‌বে যে , আমরা জড় জগতে মায়ার দ্বারা আবদ্ধ । ফ‌লে আমাদের বিবেক- বু‌দ্ধিও মায়ার দ্বারা আবদ্ধ । তাই জড় বু‌দ্ধি য‌দি যখন আমরা বিচার ক‌রি তা সবসময় স‌ঠিক হয় না । ভ্রমবশত আমা‌দের নানা প্রকার বস্তু‌তে দৃ‌ষ্টি আকর্ষণ হওয়ায় আমা‌দের বু‌দ্ধিও ভ্রষ্ট হয় । তাই ম‌নে রাখা উ‌চিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকল কিছুর ঊ‌র্ধ্বে আর আমরা তাঁর সেবকমাত্র । তাই সর্বস্ব শ্রীকৃষ্ণ‌কে সমর্পণ ক‌রে একাগ্রতার সা‌থে জীবন অ‌তিবা‌হিত করা উ‌চিত ।


(c) Joy Shree Radha Madhav
Share:

শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি , প্রাণ ইত্যা‌দি সব‌কিছু ভগবা‌নেরই , নি‌জের নয়

শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি , প্রাণ ইত্যা‌দি সব‌কিছু ভগবা‌নেরই , নি‌জের নয় । সুতরাং এ‌দের দ্বারা হওয়া ক্রিয়াগু‌লি‌কে ভ‌ক্তি‌যোগী কী ক‌রে নি‌জের ব‌লে ম‌নে কর‌বেন ? সেইজন্য তাঁর এই ভাব থা‌কে , ' ক্রিয়ামাত্রই ভগবা‌নের দ্বারা এবং ভগবা‌নের জন্যই হ‌চ্ছে , আ‌মি তো নি‌মিত্তমাত্র । ' শ্রীকৃষ্ণই নিজ ( আমার ) ই‌ন্দ্রি‌য়ের দ্বারা নি‌জেই সব ক্রিয়া কর‌ছেন - এই কথা‌টি ঠিকভা‌বে উপল‌ব্ধি করে সমস্ত ক্রিয়াগু‌লির কর্তা শ্রীকৃষ্ণ এরূপ স্বীকার করা হল উপ‌রের পদগু‌লির অর্থ ।


শরীরা‌দি বস্তুসকল নি‌জের নয় , বস্তুত এগু‌লি এখা‌নে প্রাপ্ত হ‌য়ে‌ছে এবং ছে‌ড়ে চ‌লে যা‌চ্ছে । এগু‌লি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্য , ভগবৎ প্রীতা‌র্থে অপ‌রের সেবা করার জন্যই পাওয়া গি‌য়ে‌ছে । এগু‌লির উপর আমা‌দের স্বতন্ত্র অ‌ধিকার নেই অর্থাৎ এগু‌লি আমরা নিজ ইচ্ছানুযায়ী রাখ‌তেও পা‌রি না , প‌রিবর্তন কর‌তেও পা‌রি না । সেইজন্যই এই শরীর ইত্যা‌দি‌কে এবং এর দ্বারা হওয়া কর্মসকল‌কে নি‌জের ব‌লে ম‌নে করা সততা নয় । অতএব মানুষ‌কে সততার স‌ঙ্গে , যাঁর বস্তু তাঁর ( অর্থাৎ শ্রীকৃ‌ষ্ণের ) ব‌লে মান‌তে হ‌বে । কারণ এই সমস্ত বস্তুই তাঁর ।

কর্ম‌যোগী তাঁর সমস্ত ক্রিয়া এবং পদার্থ " জগৎ - সংসার " - কে , জ্ঞানযোগী " প্রকৃ‌তি " - কে এবং ভ‌ক্তি‌যোগী " ভগবান শ্রীকৃষ্ণ‌কে " - কে অর্পণ ক‌রেন । প্রকৃ‌তি এবং সংসার - দু‌য়েরই প্রভু ভগবান । সুতরাং ক্রিয়া এবং পদার্থ সমস্ত শ্রীকৃষ্ণ‌কে অর্পণ করাই হল শ্রেষ্ঠতা । কো‌নো প্রাণী , পদার্থ , শরীর , ই‌ন্দ্রিয় , মন , বু‌দ্ধি , প্রাণ , ক্রিয়া ইত্যা‌দি‌তে বিন্দুমাত্র অনুরাগ , আকর্ষণ , আস‌ক্তি , গুরুত্ব , মমতা , কামনা ইত্যা‌দি না থাকাই হল সর্ব‌তোভা‌বে আস‌ক্তি ত্যাগ ।

শাস্ত্রীয় দৃ‌ষ্টি‌তে জন্ম - মৃত্যুর কারণ " অজ্ঞান " হ‌লেও সাধ‌নের দৃ‌ষ্টি‌তে আস‌ক্তি - ই জন্ম - মৃত্যুর প্রধান কারণ । অজ্ঞান ( জ্ঞা‌নের অভাব ) আস‌ক্তির ওপ‌রে স্থিত । সেইজন্য আ‌সক্তি চ‌লে গে‌লে অজ্ঞানও নাশ হয় । এই অনুরাগ বা আস‌ক্তি হ‌তেই কামনা উৎপন্ন হয় । কামনাই সমস্ত পা‌পের মূল । এইজন্য পা‌পের মূল কারণ আস‌ক্তি ত্যা‌গের কথা এখা‌নে বলা হ‌য়ে‌ছে । কারণ এ‌টি থাক‌লে মানুষ পা‌পের হাত থে‌কে রক্ষা পায় না আর এ‌টি না থাক‌লে মানুষ পা‌পে লিপ্ত হয় না ।

কো‌নো ক্রিয়া করার সময় ক্রিয়াজ‌নিত সুখ গ্রহণ কর‌লে বা তার ফ‌লে আসক্ত হ‌লে সেই ক্রিয়া হ‌তে সম্বন্ধ ত্যাগ হয় না , বরং আস‌ক্তি দূর হওয়ার প‌রিব‌র্তে আরো বে‌ড়ে যায় । কো‌নো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ ক‌র্মের ফলস্বরূপ কো‌নো বস্তু কামনা করাই যে আস‌ক্তি তাই নয় , এমন‌কি ক্রিয়ার সময়ও আপনা‌তে মহত্ব বা ভা‌লোত্ব আ‌রোপ করা আর অন্য‌দের দি‌য়ে ভা‌লো বলা‌নোর ভাব পোষণ করাও আস‌ক্তিই ।

সেইজন্য নি‌জের জন্য কিছু কর‌তে নেই । যে কর্ম দ্বারা নি‌জের বিন্দুমাত্র সুখ পাবার ইচ্ছা হয় , সেই কৃতকর্ম নি‌জের জন্য হয়ে যায় । নিজ সুখ - সু‌বিধা এবং সম্মা‌নের ইচ্ছা সর্ব‌তোভা‌বে ত্যাগ ক‌রে কর্ম করাই উপ‌রিউক্ত পদগু‌লির অ‌ভিপ্রায় ।

এ‌টি অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় যে , ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হ‌য়ে ভ‌ক্তি‌যোগী সংসা‌রে থে‌কে ভগবা‌নে নি‌বে‌দিতভা‌বে কর্মসম্পন্ন কর‌লে কর্ম দ্বারা বন্ধনপ্রাপ্ত হন না । যেমন পদ্মপাতা জ‌লে উৎপন্ন হ‌য়ে , জ‌লে থে‌কেও জল থে‌কে নি‌র্লিপ্ত থা‌কে , তেম‌নি ভ‌ক্তি‌যোগী সংসারে থে‌কে সমস্ত ক্রিয়া কর‌লেও ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের শরণাগত হওয়ায় সংসা‌রে সর্বদা সর্ব‌তোভা‌বে নি‌র্লিপ্ত থা‌কেন ।

ভগবান শ্রীকৃ‌ষ্ণের প্র‌তি বিমুখ হ‌য়ে সংস‌া‌রের কামনা করাই সমস্ত পা‌পের প্রধান কারণ । কামনা উৎপন্ন হয় আ‌স‌ক্তি থে‌কে । তাই আ‌সক্তি সর্ব‌তোভা‌বে দূর হ‌লে কামনা থা‌কে না । আর তার ফ‌লে পাপ হওয়ার সম্ভাবনাও থা‌কে না । ধূম্রে অ‌গ্নির ন্যায় সকল ক‌র্মেই কো‌নো না কোনো দোষ যুক্ত থা‌কে । কিন্তু যি‌নি আশা , কামনা এবং আস‌ক্তি ত্যাগ ক‌রে‌ছেন , তাঁকে এই দোষগু‌লি স্পর্শ ক‌রে না । আস‌ক্তি র‌হিত হ‌য়ে ভগবা‌নের জন্য কর্ম কর‌লে এর প্রভাবে স‌ঞ্চিত সমস্ত পাপ বিলীন হ‌য়ে যায় । সুতরাং ভ‌ক্তি‌যোগীর কো‌নোভা‌বেই পা‌পের সঙ্গে সম্পর্ক থা‌কে না ।

" পা‌পেন " পদ‌টি কর্ম দ্বারা হওয়া সেই পাপ - পূণ্যরূপ ফ‌লের বাচক , যে‌টি পরবর্তী জন্ম আর‌ম্ভের কারণ হয় । ভ‌ক্তি‌যোগী সেই পাপ - পুণ্যরূপ ফলে কখ‌নো লিপ্ত হন না অর্থাৎ বন্ধনপ্রাপ্ত হন না ।

এখা‌নে সগুণ ঈশ্বর‌কে ' ব্রহ্ম ' বলার অর্থ হল যে ঈশ্বর সগুণ , নির্গুণ , সাকার , নিরাকার সবই ; কারণ তি‌নি সমগ্র । সমগ্রর ম‌ধ্যে সবই অন্তর্ভুক্ত । শ্রীমদ্ভাগব‌তেও ব্রহ্ম ( নির্গুণ - নিরাকার ) , পরমাত্মা ( সগুণ - নিরাকার ) এবং ভগবান ( সগুণ - সাকার ) এই তিন‌কে একই বলা হ‌য়ে‌ছে । তাৎপর্য এই যে " সগুণ " - এর ম‌ধ্যে ব্রহ্ম , পরমাত্মা এবং ভগবান - এই তিন‌টিই অন্তর্ভুক্ত , কিন্তু ' নির্গুণ ' - এর ম‌ধ্যে কেবল ব্রহ্মকেই ধরা হয় , কারণ নির্গু‌ণে গুণ নিষিদ্ধ । তাই নির্গুণ সী‌মিত আর সগুণ সমগ্র ।

‌বৈষ্ণবভক্তগণ সগুণ - সাকার ভগবা‌নের উৎসব‌কে " ব্রহ্মোৎসব " না‌মে অ‌ভি‌হিত ক‌রেন । অর্জুনও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ‌কে " ব্রহ্ম " না‌মে অ‌ভি‌হিত ক‌রেছেন - " পরং ব্রহ্ম পরং ধাম প‌বিত্রং পরমং ভবান্ " । গীতায় ব্রহ্ম‌কে তি‌ন‌টি না‌মে অ‌ভি‌হিত করা হয়ে‌ছে __ " ওঁ " , " তৎ " , এবং " সৎ " । নাম - নামীর স‌ঙ্গে সম্প‌র্কিত হওয়ায় এ‌টি সগুণ ।

 (C) Joy Shree Radha Madhav
Share:

০৩ জানুয়ারি ২০১৮

হরে কৃষ্ণ মালা জপ নিয়মসহ জপ ধ্যান সম্পর্কে শ্রী শ্রী মা সারদা দেবী

"ভগবানের নাম (জপ) করে মানুষ পবিত্র হয়। যেমন ঝড়ে মেঘ উড়িয়ে নেয়, তেমনি তাঁর নামে বিষয় মেঘ কেটে যাবে।"

"কত সৌভাগ্যে এই জন্ম! খুব করে ভগবান কে ডেকে যাও। খাটতে হয়, না খাটালে কি কিছু হয়! সংসারের কাজকর্মের মধ্যেও একটি সময় করে নিতে হয়। আমার কথা কি বলব, আমি তখন দক্ষিণেশ্বরে। রাত তিনটের সময় উঠে জপে বসতুম।"

"মন না বসলেও জপ করতে ছাড়বে না নাম করতে করতে মন আপনি স্থির হয়ে যাবে। বাতাস থাকলে প্রদীপের শিখা স্থির থাকে না, কামনা বাসনা থাকলেও মন স্থির হয় না।"
অভ্যাসের কত শক্তি! জপ অভ্যাস করতে করতে মানুষ সিদ্ধ হয়। জপাৎ সিদ্ধি, জপাৎ সিদ্ধি, জপাৎ সিদ্ধি! সংখ্যার দিকে মন রেখে জপ করলে সংখ্যার দিকে মন থাকে, এমনি জপ করবে।"

" জপ ধ্যান করতে করতে দেখবে ঠাকুর কথা কবেন। মনে যে বাসোনাটি হবে তখুনি পূর্ণ করে দেবেন। কি শান্তি প্রাণে আসবে।"

মালায় নাম জপের নিয়ম বর্ণনা-

মালা গোপনে রাখিয়া ভজনের জন্য নতুন কাপড়ের একটি থলি প্রস্তুত করিয়া তন্মধ্যে মালা রাখিতে হয়। ঐ থলির মধ্যে দক্ষিণ হস্ত প্রবেশ করাইয়া তর্জ্জনী অঙ্গুলিকে ছিদ্র দিয়া থলির বাহিরে রাখিতে হইবে। কারন তর্জ্জনী দ্বারা স্পর্শ করিতে নাই। মোটা মালার দিক হইতে জপ আরম্ভ করিতে হয় এবং সমস্ত মালা একবার জপ শেষ হইলে ঘুরাইয়া লইয়া সরু দিক হইতে পুনরায় জপ করিতে হয় ; যেহেতু মেরুলঙ্ঘন করিয়া জপ করিতে নাই, করিলে তাহা বিফল হয় । মধ্যমাঙ্গুলির মধ্যভাগের উপর মালা রাখিয়া অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা এক একটি মালা আকর্ষণপূর্ব্বক এক একবার শ্রী হরিনাম মহামন্ত্র জপ করিতে হয়। এইরুপ 108 টি মালা সব একবার জপ হইলে এক ফেরা হয় ।এরুপ 4 ফেরায় এক গ্রন্থি হয় । 16 গ্রন্থিতে লক্ষ নাম জপ হয় । লক্ষ নাম জপের নিয়ম করা পরম সৌভাগ্যের বিষয় । থলির বাহিরে চারটি ক্ষুদ্র মালা বাঁধিয়া ফেরার সংখ্যা রাখিতে হয় এবং এক গ্রন্থির অধিক জপ করতে হইলে প্রয়োজনানুযায়ী আরও গোটাকতক ক্ষুদ্র মালা পৃথক বাঁধিয়া গ্রন্থির সংখ্যা করিতে হয় । এক গ্রন্থির কমে নাম জপের নিয়ম করিতে নাই । দীক্ষিত জন বীজ মন্ত্র বা গায়ত্রী দশবার হস্তের পর্বে বা মালায় জপ করিয়া, মহামন্ত্র ষোড়শী হরি নাম ১০৮ বার মালায় জপ করিবেন।

মালা জপের সময় নাম স্মরণ মন্ত্রঃ-

নাম চিন্তামণি-রুপং নামৈব পরমা গতিঃ।
নাম্নঃ পরতরং নাস্তি তস্মান্নাম উপাস্মহে।।

অর্থঃ- শ্রীহরি নাম চিন্তামণি ও পরমা গতি, নাম হইতে শ্রেষ্ঠ(উপাস্য) বস্তু আর কিছুই নাই। তাই শ্রী নামের স্মরণ নিলাম।

নামের মধ্যে দিয়াই শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান-

ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম-রুপং বেনুরন্ধ্র-করাঞ্চিতং।
গো, গোপ, গোপী মণ্ডল-মধ্যস্থং শোভিতং নন্দ নন্দনং।।
অর্থ- গো, গোপ, গোপীগণ মধ্যস্থ বেনুরন্ধ্রে করে যুক্ত, বাদনরত ত্রিভুজঙ্গ ভঙ্গিম শ্রীনন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে ধ্যান করিতেছি। নাম জপের প্রথমে ও শেষে শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম করিবেন।
শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম মন্ত্রঃ-
নমো নলিন-নেত্রায় বেণু বাদ্য-বিনোদিনে।
রাধা ধর সুধা পান শালিনে বন মালিনে।।

মালা জপ আরম্ভের মন্ত্রঃ-
অবিঘ্ন করু মালে, ত্বং হরি নাম-জপেষু চ।
শ্রীরাধা কৃষ্ণয়োর্দাস্যং দেহি মালে, তু প্রার্থয়ে।।
অর্থঃ- হে মালে তোমাতে হরি নাম জপ করিতেছি আমার সর্ব্ব বিঘ্ন দূরকর এবং শ্রীরাধা কৃষ্ণের দাস্য দান কর, এই প্রার্থনা করিতেছি।

মালা জপান্তে নিন্মরুপ জপ সমর্পণ করিতে হয়ঃ-

গুহাতিগুহ গোপ্তা ত্বং গৃহাণাস্মং কৃতং জপং ।
সিদ্বি ভবতু-মে দেব ত্বৎ প্রসাদাৎ জনার্দ্দন।।
অর্থঃ হে পরম দেব, পরম অভিষ্্‌ পরমপ্রিয় শ্রীকৃষ্ণ তুমি গুহ্য ও অতি গুহ্য বস্তুকে রক্ষা কর। অতএব আমার এই নাম জপ তুমি গ্রহন কর। হে দেব তোমার প্রসাদে আমার সর্বসিন্ধ লাভ।

ক্ষমা প্রার্থনা মন্ত্রঃ-

ওঁ নমো যদক্ষরং পরিভ্রস্টং মাত্রা হিনঞ্চ যদ ভবেৎ।
পূর্নং ভবতু তৎ সর্বং ত্বৎ প্রসাদাত জনার্দ্দন ॥
অর্থঃ- আমার উক্ত কার্যে যদি কোন আচার বাদ যাইয়া থাকে বা মাত্রা বিবর্তিত থাকে হে ভগবান তোমার অনুগ্রহে তা পূর্নত্ব প্রাপ্ত হউক।
বিদ্রঃ- ভ্রমক্রমে বা কোনও অনিবার্য কারণবশতঃ কোন দিন মালা জপ বন্ধ থাকিলে তৎপর দিন তার প্রায়শ্চিত্তস্বরুপ চতুর্গুণ জপ করিয়া পরে দৈনিক নিয়মের জপ করিবেন ।

সৌজন্যে- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল​ ।

Share:

০২ ডিসেম্বর ২০১৭

ভক্তি কাকে বলে

যে কর্ম দ্বারা মনে, ঈশ্বরের প্রতি ঐকান্তিক প্রেম জন্মায় এবং ঈশ্বর ‘সর্ব ভূতময়’ এই জ্ঞানের উদয় হয়ে সকল জীবের প্রতি দয়া স্নেহ ও ভালবাসা জন্মায় তাকে-ই বলে ভক্তি।


গুরু ভক্তি অভিলাষে
থাকবি তক্তে বসে,
নাম ধরে ডাকবি ...ওরে ভোলামন,
মিলবে তোর মনের মানুষ .....যা বলি তাই শোন .......

ভগবান সর্বশক্তিমান, অন্তর্যামী, বিচারকর্তা, এই জ্ঞান উদয় হওয়াতে ভগবানের প্রতি ভয় জন্মায়, ভয় হতে ভগবানে বিশ্বাস আসে। এই বিশ্বাস ক্রমে ক্রমে অটল বিশ্বাসে পূর্ণ হলে, তখন-ই আসে ভগবানে পূর্ণ ভক্তি। এই ভক্তি ক্রমে ক্রমে অচলা ভক্তিতে পরিণত হলে তাকে বলে প্রেম। যখন ভক্তের মনে প্রেমের সঞ্চার হয় তখন ভগবানকে কাছে পাওয়ার জন্য ভক্তের মন উদগ্রীব হয়ে উঠে। ভক্তির অপর নাম --- ভালবাসা। ভালবাসা, ভক্তি, স্নেহ, প্রেম বস্তুত একই, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন নামে অভিহিত হয়ে থাকে। পরমেশ্বর ভগবানকে সাকার ভাবে শ্রদ্ধার সাথে তার সেবা পূজা অচর্না এবং ভগবানের নাম, গুণগান, শ্রবণ কীর্ত্তন, করার নাম-ই ভক্তি মার্গ বা ভক্তি যোগ। যারা ঈশ্বরকে সাকার রূপ ভেবে তার সেবা পূজা ও ভক্তি নিবেদন করে তাদের কে বলা হয় ভক্ত।

ভক্তি যোগের মাধ্যমে উপাসনায় ব্রতী হওয়া সহজ ও উত্তম পথ। ‘জীব-ঈশ্বরে’ মানব মনে সাতন্ত্র বোধের কারণে ঈশ্বরের সাথে, আমি-তুমি, তুমি-আমি এরূপ অনুভাবাত্মক জ্ঞানের উদয় হয়। যারা ভক্তি মার্গের মাধ্যমে ঈশ্বর উপাসনায় ব্রতী হয় তাদের কে বলা হয় ভক্ত। ভক্তের মনে ভক্তির অঙ্কুর হলে তখন ভগবানের নামের প্রতি শ্রদ্ধা হয় এবং নামে রুচি হয়। আর তখন-ই ভক্তের মন বলে --- তুমি ভগবান আমি ভক্ত, আমি তোমার শ্রীচরণের দাস-তুমি-ই আমার প্রভূ, তুমি সৃষ্টিকর্তা; আমি সৃষ্ট, আমি অধম অপরাধী, তুমি মহান আমার সকল অপরাধ ক্ষমা কর। মানুষ নিজেকে অপরাধী মনে করলে মনে অনুশোচনা হয়, মনে অনুশোচনা হলে, অসৎ-মিথ্যাকে ত্যাগ করা এবং সৎ ও সত্যকে গ্রহণ করার জন্য সচেষ্ট হয়।

সংস্কৃত ভজ্ ধাতু হতে ভক্তি শব্দের উৎপত্তি, সংস্কৃত ভজ্ ধাতুর বাংলা অর্থ হল ভেদ জ্ঞান জীব-ঈশ্বরে মানব মনের যে অভেদ জ্ঞান তাকেই বলে অদ্বৈতবাদ; “জীব-ঈশ্বরে” মানব মনের যে স্বাতন্ত্রবোধ একেই বলে দ্বৈতবাদ। এই দ্বৈতবাদী চিন্তা ধারার কারণে ভক্তি মার্গ বা ভক্তিযোগের উৎপত্তি। জ্ঞান মার্গের চিন্তা ধারায়, ঈশ্বর নিরাকার সর্বভূতময়, জীব-ঈশ্বরে অভেদ জ্ঞান। কর্মমার্গ চিন্তা ধারায়, ঈশ্বর আমাতেই বিরাজমান (পরমাত্মা) জ্যোতিঃ স্বরূপ। এই জ্ঞান মার্গ, কর্মমার্গ বিষয়ে অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন অতি সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না, এবং ধারণায় আনতে পারে না, তাই মায়ামুগ্ধ সংসারী মানুষের জন্য ভক্তিমার্গ-ই শ্রেষ্ঠ।

লেখকঃ প্রীথিষ ঘোষ
Share:

২৩ নভেম্বর ২০১৭

প্রসঙ্গ- ‘মায়াবাদ’


যোগমায়া
যোগমায়া = অনাদি অনির্বাচ্য অজ্ঞান । – [আনন্দগিরি]গুণত্রয়ের সংযোগই, সংঘটনই যোগ । যোগই মায়া । – [শঙ্করাচার্য]অঘটনঘটনপটীয়সী মায়া – [শ্রীধরস্বামী]আত্মার সঙ্কল্পানুবিধায়িনী মায়া – [মধুসূদন সরস্বতী]
অধ্যাত্মবিজ্ঞানের এই শ্রেষ্ঠ মতটি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধৰ্ম কর্তৃক জগতে প্রচারিত। সেদিনকার খ্ৰীষ্ট ও মুসলমানধৰ্ম এ মতটা হৃদয়ঙ্গম করতে অক্ষম। গ্ৰীসদেশে মহাত্মা প্লেটো ও নিজপুস্তকে এই শ্রেষ্ঠ মত প্রচার করেন। আধুনিক জড়বাদী, স্থুলদর্শী বিজ্ঞান এই মত আদৌ গ্রহন করে না; কারণ ইহার মতে তোমার অস্তিত্বের ন্যায় এই প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান জগতের অস্তিত্ব সকলের নিকট সত্য, মহাসত্য এবং কদাচ মিথ্যাজ্ঞানসম্ভুত হইতে পারে না।
বেদান্তের মায়াবাদের প্রকৃত তাৎপৰ্য্য অতীব দুরূহ। অনেক পণ্ডিত মায়াবাদ ব্যাখ্যা করার সময় দৃষ্টান্ত দেন, যেমন অন্ধকারে রজুদর্শনে সর্পভ্রম হয়, তারপরে রজ্জুজ্ঞান হইলে অলীক সর্পজ্ঞান মন হতে দূরীভূত হয়, সেইরূপ সংসারে পরমার্থ জ্ঞান হইলে সংসারের যাবতীয় মায়াজ্ঞান মন হতে দূরীভূত হয়; তখন সংসারের কোন ভেদাভেদজ্ঞান থাকে না এবং সকলই ব্ৰহ্মময় বলে বোধ হয়। তাঁহাদের মতে, ইহাই মায়াবাদের প্রকৃত তাৎপর্য্য। কিন্তু জৈন ও বৌদ্ধপণ্ডিতগণ এর ব্যাখ্যা করেন নিজের ধর্ম মত অনুসারে। যাহা হউক, এস্থলে মায়াবাদের প্রকৃত তত্ত্ব উদঘাটন করা কর্তব্য।
শাস্ত্রে মায়াশব্দ দুই প্রকার অর্থে ব্যবহৃত। ইহার প্রথম অর্থে অতিরিক্ত মোহ বুঝায়; যেমন দেহ, পুত্র, কলাত্রাদি সংসারের ক্ষণভঙ্গুর বিষয়ে মানব-মন স্বভাবতঃ মায়ায় মুগ্ধ। এ মায়াবন্ধন ছেদন করা ইহার পক্ষে অনেক সময় দুঃসাধ্য বটে, কিন্তু সংসারে বৈরাগ্য উপস্থিত হলে, ইহা অপেক্ষাকৃত সহজ সেইরূপ সংসারের যাবতীয় অনিত্য মিথ্যাজ্ঞান লাভ করতঃ পরব্রহ্মকে ভুলে গিয়ে সকল বিষয়ে আমার আমার যে মিথ্যাজ্ঞান মনে উদয় হয়, তাহাও এর মায়াজ্ঞান। শাস্ত্রোক্ত পরমহংসমার্গ অবলম্বন করিলে এ মায়াজ্ঞান দূরীভূত হইতে পারে।
3662526_orig
মায়াশব্দের দ্বিতীয় অর্থে মহামোহ বুঝায়, যা ছেদন করা মনের পক্ষে একেবারে সম্পূর্ণরূপ অসাধ্য। পরমহংস হউন, যোগী হউন, গৃহস্থ হউন, এ মহামায়ার মহা বন্ধন মানব কোনকালে এ জগতে ছেদন করতে পারে না। যতদিন তিনি স্থুলদেহ ধারণ করিয়া ইহলোকে বা জীবনের এই সমতল ক্ষেত্রে (this plane of existence ) বাহ্যজগতের সহিত বিবিধ সম্বন্ধে সম্বদ্ধ হয়ে বিচরণ করেন, ততদিন যে মহামায়ার মহাবরণে তিনি মুগ্ধ, সে মহাবরণ তিনি কদাচ ভেদ করিতে পারেন না। এ মহামায় তাহার অস্তিত্বের মূলে সংলগ্ন। এ স্থুলদেহ সৰ্ব্বজ্ঞ মায়াতীত আত্মার মায়াদেহ মাত্র। এ মায়াদেহে নিবদ্ধ(বদ্ধ, আটকানো) হইলেই আত্মা মায়ামুগ্ধ হয় এবং বাস্তব পদার্থ বুঝতে পারে না। এ মায়াদেহ ত্যাগ করলে, ইহসংসারের যাবতীয় মায়াজ্ঞান হতে আত্মা ও নর্মুক্ত হয়। এজন্য বিশ্বব্যাপারের ঘাহা কিছু আমাদের নয়নগোচর হয়, তার সমস্তই মিথ্যাজ্ঞানসম্ভুত, তাহ সংবৃতি(লুকায়িত বা আচ্ছাদিত)মূলক (relative); কিন্তু বস্তুত: উহারা কি, উহাদের বাস্তবরূপ কি, তা আমরা অবগত নই: এবং কোনকালে অবগত হইব না।
এই যে অন্ধকারে পথে যেতে যেতে তুমি একখণ্ড রজ্জ্ব অবলোকন করতে করতে সর্পভ্রমে ভয়বিহবল হয়ে পিছনে ফিরে আস, পরে উহাকে ভালরূপ নিরীক্ষণ করাতে তোমার সর্পভ্রম দূর হয় এবং সেইসঙ্গে তোমার মনও সুস্থির হয়; এই যে রেলগাড়িতে যাইতে যাইতে তুমি চতুর্দিকস্থ বৃক্ষসমূহকে চলায়মান দেখ,পরে সামান্য পর্যালোচনা করে বুঝতে পার, যে গাড়ির গতিবশতঃ বৃক্ষ গুলি বিপরীতদিকে চলায়মান; আবার যখন তুমি ভাবতে থাক, ধরিত্রী স্বয়ং উহার পৃষ্ঠস্থ যাবতীয় পদার্থ ও চতুদিকস্থ বায়ুরাশি লয়ে আকাশপথে অসীমবেগে ভ্ৰাম্যমান, তারজন্য প্রতিদিন সূৰ্য্যকে প্রাতঃকালে, পূৰ্ব্বদিকে উদয় হতে ও পশ্চিম দিকে অস্ত যাইতে দেখ এবং রাত্রিকালে আকাশস্থ যাবতীয় নক্ষত্রমণ্ডল ধ্রুবতারার চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করতে দেখ; এই যে একজন পথিক মরুভূমিতে যাইতে যাইতে পিপাসায় আতুর হয়ে পুরোভাগে জলাশয় দেখে এবং জলপানার্থ যেমন উহার দিকে ধাবমান হয়, অমনি জলাশয়টি আরও দূরে পলায়ন করে; এখন জিজ্ঞাসা এ সকল দৃশ্যপটল তোমার মনে কিরূপ বোধ হয় ? এরা কি তোমার মায়ামুগ্ধ মনের মায়াজ্ঞান, না এরা তোমার চোখের ভ্রান্তিদর্শন ? এরা তোমার ভ্রান্তিদর্শন মাত্র এবং কখনোই মায়াজ্ঞাম নয়। এরূপ ভ্রান্তিদর্শন উৎপাদনে যে মহামায়ার কথা উপরে লিখিত, উহার কিছুমাত্র অনুশাসন নাই। এ সকল কেবল আমাদের দর্শনশক্তির ভ্রান্তিমাত্র। অল্পমাত্র জ্ঞান লাভেই এরূপ ভ্রাস্তির দূরকরণ হয়।
কিন্তু এই যে অশ্বখ বৃক্ষটি যা বিশাল ও বহুবিস্তৃত শাখা প্রশাখা লইয়া তোমার সামনে দাড়িয়ে আছে, যার প্রতিকৃতি তোমার নয়ন অভ্যন্তরে বিপরীতভাবে প্রতিবিম্বিত এবং যার রূপ তুমি যাবজ্জীবন একরূপ দেখে থাক, ইহা তোমার মায়ামুগ্ধ মনের মায়াজ্ঞান। প্রকৃতি ঐ বৃক্ষের সাথে তোমার চক্ষু ও মনের যেরূপ সম্বন্ধ স্থিরীকৃত করিয়া দেয়, তাহাতে তুমি উহাকে চিরদিন একরূপ দেখ। আলোক যোগে বৃক্ষটির যেরূপ প্রতিবিম্ব তোমার নয়নদ্বয়ে পতিত হয়, অধ্যাসবশতঃ তুমি উহার চিরপরিচিত রূপটা নয়নগোচর কর এবং বাহ্যজগতে উহার অবস্থিতি অনুভব কর। তুমি কখনো বলতে পার না, যে উহার বাস্তবরূপ ঠিক ঐ প্রকার। আবার তুমি ঐ বৃক্ষটি যেমন দেখ, একটা পিপীলিকাও যে উহাকে ঐরূপ দেখে, তা ও তুমি বলতে পার না। এতেই কি বোধ হয় না, যে অশ্বথবৃক্ষটির জ্ঞান তোমার মায়াজ্ঞান মাত্র ? সেইরূপ এ জগতের যাবতীয় পদার্থের জ্ঞান আমাদের মায়াজ্ঞান মাত্র। এখন যে মায়ার আবরণে আবৃত হয়ে আমাদের জীবাত্মা এ সংসারে মায়াজ্ঞানলাভ করে, তাহাই মহামায়া।p1030044
মায়া দ্বারা চালিত হয়ে আমরা বিশ্ব প্রপঞ্চের যে জ্ঞানলাভ করি, তা আমাদের মায়াজনিত মিথ্যাজ্ঞান, অথচ ইহাই আবার আমাদের মায়াজনিত সত্যজ্ঞান। যতদিন আমরা মায়ায় মুগ্ধ হয়ে এই মায়াময় জগতে অবস্থান করি, ততদিন ঐ মায়াজনিত মিথ্যাজ্ঞানই আমাদের নিকট মহাসত্য জ্ঞানে পূজিত হয়। এতদ্ব্যতীত আমাদের অন্য গতি নেই। এ স্থানে জগৎ মায়াময় এবং আমরাও সকলে সমভাবে মায়ামুগ্ধ; তারজন্য আমরা কখনো ময়াজনিত জ্ঞানকে মিথ্যাজ্ঞান বলে জানতে পারি না। কিন্তু যাহারা মহামায়া হতে মুক্ত, তাঁদের নিকট আমাদের মায়াজনিতজ্ঞান মিথ্যাজ্ঞান বলিয়া বিবেচিত হয়। এখন এ সংসারে এমন লোক অতীব বিরল। পরমহংস হউন, যোগী হউন, মহামায়ার মহামোহ ভেদ করা সকলের পক্ষে সমান অসাধ্য। একমাত্র পরব্রহ্মই মায়াতীত। সেজন্য তাঁহারই নিকট আমাদের যাবতীয় জ্ঞান মিথ্যাজ্ঞান; অথবা যে সকল দেবতা অল্পাধিক মায়ামুক্ত, তাহাদের নিকটও আমাদের এ মায়াজ্ঞান মিথ্যাজ্ঞান মাত্র। দেখ, এই বিশ্বকে তুমি ও আমি যেরূপ দেখি, সকলেই ঠিক সেইরূপ দেখেন; কিন্তু ইহার বাস্তবরূপ কি, তাহা তুমিও জান না, আমিও জানি না এবং বোধ হয় দেবতারাও জানেন না।
এখন দেখা যাউক, আমরা কি প্রকারে সংসারের মায়াজ্ঞানলাভ করি। এ মন্বন্তরে (পুরাণমতে এক এক মনুর অধিকার কাল) পঞ্চেন্দ্রিয়ই মনের দ্বারস্বরূপ এবং পঞ্চেন্দ্রিয়যোগেই মন জগতের যাবতীয় জ্ঞানলাভ করে। পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে চক্ষু আবার সর্বশ্রেষ্ঠ। পদার্থের জ্ঞানলাভে চক্ষুই সৰ্ব্বাপেক্ষ আমাদের অধিক সাহায্য করে। পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে যদি কোন ইন্দ্রিয়ের অভাব হয়, অপরগুলি উহার অভাব পুরণ করতে চেষ্ট পায় ; যেমন অন্ধ ব্যক্তির লাঠি স্পর্শযোগে অনেকস্থানে চোখের কাজ করতে দেথা যায়।
এ সংসারে মানবমন ও চক্ষুর যেরূপ সম্বন্ধ এবং উহাদের যেরূপ প্রকৃতি, তাহাতে তুমি দর্শনশক্তি দ্বারা যাবতীয় পদার্থের একপ্রকার জ্ঞানলাভ কর। যদি কোন কারণে তোমার চক্ষুদ্বয় বিকৃত হয়, পদার্থবিশেষের জ্ঞানও তখন অন্যরূপ হয়। দেখ, গোলাপ ফুলটা তোমার চক্ষে কেমন সুন্দর ও রমণীয়! যদি তোমার চক্ষু বিকৃত হয়ে যায়, তুমি তাকে অন্যরূপ দেখ, অথবা যদি তোমার মন বিকৃত হয়ে যায়, উত্তম চক্ষু সত্ত্বেও তুমি উহাকে অন্যরূপ দেখে থাক। যখন তোমার চক্ষুদ্বয় এই সুবিস্তৃত, পরিদৃশ্যমান জগৎসমক্ষে উল্মীলিত হয় এবং তোমার মনও ঐদিকে ধাবিত হয়, তখন তুমি এর বিচিত্ররূপদৰ্শনে বিমুগ্ধ হও। চক্ষুদ্বয় নিমীলিত করে দেখ, সেই অপরূপ দৃশ্যটা তৎক্ষণাৎ তোমার মানসপট হইতে অন্তহৃত হয়ে যায় এবং জগৎও ঘোরান্ধকারে আবৃত হয়। তখনই তুমি স্পষ্টই বুঝতে পার, এ বিশ্বপ্রপঞ্চ কেবল মায়াময়।hqdefault
একজন জন্মান্ধকে জিজ্ঞাসা কর, তোমার সন্মুখস্থ বৃক্ষবিশেষের বা জন্তু-বিশেষের স্বরূপ কি প্রকার ? দর্শন ব্যতীত অন্য ইন্দ্রিয়যোগে তাহার মনে ঐ পদার্থ বা জন্তুর যেরূপ জ্ঞান ও স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম হয়, তাহাই সেই হতভাগ্য ব্যক্তি উল্লেখ করে। তুমি দণ্ডায়মান হয়ে তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, তুমি দণ্ডায়মান আছ, কি উপবিষ্ট আছ ? তোমার বাক্য উচ্চদেশ হতে নিঃসৃত হইতেছে শ্রবণ করিয়া সে ব্যক্তি বলিয়া থাকে, তুমি দণ্ডায়মান আছ। তোমার মায়াজ্ঞান তোমার নিকট যেরূপ সত্য, তাহার মায়াজ্ঞান তাহার নিকটও সেইরূপ সত্য।
জীবজগৎ পৰ্য্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায়, অনেক নিকৃষ্টজীবে ইন্দ্রিয়গণ অতি অস্ফুটভাবে বর্তমান; এমন কি, অনেক জীবে এক বা ততোধিক ইন্দ্রিয়ের অভাব দেখা যায়; অথচ সকলেই দেহযাত্রা নিৰ্ব্বাহ উপযোগী যাবতীয় কৰ্ম সুচারুরূপে সম্পাদন করে। প্রকৃতি যাবতীয় জীবজন্তুকে স্ব স্ব অবস্থার উপযোগী করিয়া দেয়। এতে বোধ হয়, সকল জীবের মায়াজ্ঞান বিভিন্ন। যে জীব যে অবস্থায় পতিত, উহার মায়াজ্ঞান সেই অবস্থার উপযোগী। পিপীলিকা একখণ্ড মিষ্টান্ন দেখে অপর পিপীলিকাগণকে কিরূপে আহবান করে, তা আমরা অবগত নই; কেবল পিপীলিকারাই তা বুঝিতে পারে।
তত্ত্ববিদ্যা উপদেশ দেয়, এক এক মন্বস্তরে মানবের এক একটা ইন্দ্রিয় স্ফুরিত; সেজন্য প্রত্যেক মন্বন্তরে তাহার মায়াজ্ঞানও বিভিন্ন। এখন আমরা এই কাৰ্য্যকারণাত্মক বিশ্বের যেরূপ জ্ঞানলাভ করি, পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব মম্বন্তরে মনুপুত্ৰগণ বোধ হয় অন্তপ্রকার জ্ঞানলাভ করিয়া যান। স্বায়ম্ভব মন্বন্তরে যে মায়াজ্ঞান প্রচলিত, চাক্ষুস মন্বন্তরে তা বিভিন্ন এবং বৈবস্বত মন্বন্তরে তা আরও বিভিন্ন। এস্থলে জড়বিজ্ঞান সাহঙ্কারে যে উপদেশ দেয়, চিরদিন ভৌতিক শক্তি একরূপ, তা আমরা কখনো গ্রহন করিতে পারি না।
বাসুদেব জ্ঞানীর আত্মা, তাই তিনি জ্ঞানীর প্রিয়
আমার মায়া দ্বারা সাংখোক্ত স্বতন্ত্র প্রকৃতি নিষিদ্ধ হইয়াছে । – [শ্বেতাশ্বতর উপঃ, ৪|১০]অনুভবসিদ্ধা মায়া; অকস্মাৎ ইহাকে অস্বীকার করা যায় না । আবার জ্ঞানোদয়ে দেখা যায় না । – [আনন্দগিরি]
অদ্বৈতবাদী বৈদাস্তিক পণ্ডিতদিগের মতে যা সৎ, তা মায়াতীত এবং যা অসৎ, তা মায়াবিশিষ্ট। একমাত্র পরব্রহ্মই সৎ বা সত্যস্বরূপ, এজন্য তিনি বেদে ওঁ তৎসৎ ও সচ্চিদানন্দ বলিয়া কথিত। এই বিশ্ব প্রপঞ্চ মায়াময়, এজন্য ইহা অসৎ, ক্ষণে ক্ষণে ইহা পরিবৰ্ত্তিত এবং ইহাতে ত্রিগুণের অনন্তলীলা প্রকাশিত।
বিশিষ্টাদ্বৈতবাদীদিগের মতে এই কাৰ্য্যকারণত্মক বিশ্বপ্রপঞ্চ, যা আমাদের চৰ্ম্মচক্ষের সমক্ষে প্রত্যক্ষীভূত, তাহাই সৎ বা সত্যস্বরূপ; আর যে সকল বিষয় প্রত্যক্ষ হয় না, তাহাই অসৎ বা মিথ্যা। সৎ ও অসৎ এই দুইটা শব্দের তাৎপর্য্যে এত পার্থক্য থাকায়, সমগ্র হিন্দু শাস্ত্রে যে কত গোলযোগ উপস্থিত, তা এস্থলে বর্ণন করবার “আবশ্যকতা নাই। পরব্রহ্মের মহামায়া দুরত্যয়া। ইহার অনুশাসন পরিহার করা জীবের অসাধ্য।
ত্রিভির্গুণময়ৈর্ভাবৈরেভিঃ সর্ব্বমিদং জগৎ ।
মোহিতং নাভিজানাতি মামেভ্যঃ পরমব্যয়ম্ ॥১৩॥
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া ।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥১৪॥ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সপ্তম অধ্যায়)
“মায়ার ত্রিগুণে সমস্ত জগৎ বিমুগ্ধ, তজ্জন্ত গুণাতীত, মায়াতীত অবিনশ্বর পরমাত্মা যে আমি, অমাকে কেহ জানিতে পারে না। আমার এই গুণময়ী দৈবী মায়া লোকে অতিকষ্টে পরিহার করে। কেবল যাঁহারা আমাকে প্রাপ্ত হন, তাহারাই আমার এই মায়া হইতে উত্তীর্ণ হন।”
যে মহাত্মা অসাধারণ যোগবলে সমাধিস্থ হইয়া মায়ামুগ্ধ দেহের চব্বিশ তত্ত্বের ক্রমশঃ লয় সাধন করতঃ পরব্রহ্মের সহিত নিজ আত্মার মিলন করতে পারেন, তিনিই সমাধির অবস্থার মায়া হতে বিচ্যুত হন। সমাধি ভঙ্গ হলেই তিনি ও পূৰ্ব্বের ন্যায় মায়াবিশিষ্ট অবস্থা প্রাপ্ত হন। কলিযুগের কয়জন লোক সেরূপ যোগাভ্যাস করতে পারেন, বল ? অৰ্দ্ধঘণ্টার জন্য নিমীলিতাক্ষ হইয়া এক প্রাণে, একধ্যানে ঈশ্বরে চিত্ত সমাহিত করতে পারলে, যে তুমি সমাধিস্থ হয়ে মায়ামুক্ত হও, তা কখনো মনে করিও না। চব্বিশতত্ত্বের লয়সাধন করে প্রকৃত সমাধিস্থ হওয়া কত সাধনাসাপেক্ষ, তা মহাত্মাগণই জানেন।
জীবাত্মা মহামায়া দ্বারা অনস্ত কাল চালিত। কেবল যে ইহসংসারে জীবাত্মা ইহাদ্বারা চালিত, এমন নহে; অন্যান্য লোকে ও জীবাত্মা ইহাদ্বারা সম্যক পরিচালিত। যখন নিজ কৰ্ম্মফল কর্তৃক চালিত হয়ে জীব জীবনের বিবিধাবস্থাপন্ন ভিন্ন ভিন্ন সমতলক্ষেত্রে বা ভিন্ন ভিন্ন লোকে পরিভ্রমণ করে, তখনও ইহা এই মহামায়া দ্বারা চালিত হইয়া ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানলাভ করতে থাকে ও ভিন্ন ভিন্ন সুখ ও দুঃখ ভোগ করতে থাকে। যুগযুগান্তরে, কল্পকল্লান্তরে কোটি কোটি বৎসরের পর শিক্ষা ও সংযম দ্বারা ক্রমোন্নত হয়ে যখন জীবাত্মা পরব্রহ্মে মিলিত হয়ে নিৰ্ব্বাণপদ প্রাপ্ত হয়, তখনই ইহা মহামায়া হইতে একেবারে বিমুক্ত হয়। তদ্ভিন্ন সকল লোকে ও সকল অবস্থায় জীবাত্মা মায়া হইতে অব্যাহতি প্রাপ্ত হয় না এবং সুখদুঃখরূপ মহাবৰ্ত্তে পতিত হইয়া ঘুর্ণায়মান হয়।
পাঠক! তুমি আজ কলিযুগে মানবাকারে এই সংসারে বিচরণ করে সংসারের যাবতীয় পদার্থের একপ্রকার জ্ঞানলাভ করতেছ এবং তুমি আজ একপ্রকার প্রাকৃতিক নিয়মাবলি দ্বারা চালিত। হয়ত লক্ষ লক্ষ বৎসর পরে তোমারই জীবাত্মা এই জন্ম বিস্মৃত হয়ে পুনরায় এ জগতে বিচরণ করবে। তখন তোমার জীবাত্মা বিভিন্নপ্রকার ভৌতিক নিয়মাবলি দ্বারা চালিত হবে এবং বিভিন্ন প্রকার জ্ঞানলাভ করবে। কখন বা দেবলোকে, কথন ব৷ তপলোকে, কখন বা জনলোকে, কথন বা সত্যলোকে তোমার জীবাত্মা বিচরণ করবে এবং সকল অবস্থায় একমাত্র মায়া দ্বারা ইহা চালিত হবে। সেজন্য সনাতন হিন্দুধৰ্ম আমাদিগকে এই মহাশক্তি মায়াদেবীর নিকট মস্তক অবনত করিতে উপদেশ দেয়। জগদম্বা মহেশ্বরীই মায়াদেবী। এস, আমরা তাহার শ্ৰীচরণকমলে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান পূৰ্ব্বক সাষ্টাঙ্গে প্রণত হই।
এখন মায়াবাদের উপর আধুনিক উন্নত জড়বিজ্ঞান কিরূপ মতামত প্রকাশ করে, তা ও সকলের জানা উচিত। বিজ্ঞান মায়াবাদের উপর উপহাস ও বিদ্রুপ করে। ইহার মতে মায়াবাদরূপ কতকগুলি কাল্পনিক জ্ঞানে মানবমনকে বিভোর করলে, সংসারের অণুমাত্র উপকার নাই বরং উহাদ্বারা ইহার প্রভূত অনিষ্ট সাধন হয়; কারণ লোকে মায়াবাদ পাঠ করিয়া সংসার উপেক্ষা করিতে শিক্ষা করে মাত্র। অতএব এ সকল মতামত সমাজে যত অপ্রচলিত হয়, সমাজের ততই মঙ্গল। বিজ্ঞানের মতে যে জ্ঞান তুমি মায়াজ্ঞান বা মিথ্যাজ্ঞান বলিয়া উপেক্ষা করিতে শিক্ষা কর, তাহাই তোমার যথার্থ ও সত্যজ্ঞান এবং উহার উন্নতিতে তোমার উন্নতি এবং তোমার সমাজের উন্নতি। অতএব সেই যথার্থ জ্ঞান শিক্ষা করাই জীবনের মুখ্যব্রত হওয়া উচিত। সে জ্ঞানকে কি কখনো মিথ্যাজ্ঞান বলে উপেক্ষা করা যায় ? অধ্যাত্মবিজ্ঞান বলুক, বেদান্ত বলুক, আর যে শাস্ত্র বলুক না কেন, উহাদের বিকৃত উপদেশে কে কৰ্ণপাত করে ? যতদিন তুমি এ জগতে থাক, ততদিন কেবল ঐ মিথ্যা, তথাকথিত মায়াজ্ঞান লইয়াই তোমায় থাকিতে হয়। ঐ মিথ্যাজ্ঞান ত্যাগ করিলে, কোথায় তুমি অন্য সত্যজ্ঞান পাবে ? তবে কেন তুমি মায়াবাদের কুহকজালে পতিত হও? আরও দেখ, বেদান্তের মায়াবাদ দ্বারা লোকে সংসারাশ্রম ত্যাগ করতঃ বন জঙ্গলে গিয়া বাস করিতে শিক্ষা করে এবং সেইসঙ্গে পৃথিবীকে জঙ্গলাকীর্ণ করে। কিন্তু লোকে বিজ্ঞানানুশীলন করিয়া বন জঙ্গল পরিষ্কার করতঃ পৃথিবীকে নন্দনকানন ও প্রমোদোদ্যান করে। তবে কেন এই অত্যুজ্জল বিংশ শতাব্দীতে মায়াবাদের কথা উত্থাপন করিয়া জিহবা অপবিত্র কর ? ঐ সকল অশ্লীল, অশ্রোতব্য কথা যতই পুস্তক হইতে দূরীভূত হয়, সমাজের ততই মঙ্গল।
এখন সমাজে জড়বিজ্ঞানের অধিক প্রতিপত্তি ও সমাদর। অতএব উহারই উপদেশ শিরোধাৰ্য্য করা সকলের কৰ্ত্তব্য।illusion-2
শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : সপ্তম অধ্যায় – জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ ভগবান সকল জীবের কল্যাণ চিন্তা করে ঘোষনা করছেন-
[ভগবৎতত্ত্ব কি, কিরূপে তদ্‌গত-চিত্ত হওয়া যায় – শ্রীভগবান্‌ স্বয়ং এই অধ্যায়ে তাহা বলিতেছেন ।]
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন – হে পার্থ, ভক্ত সর্বতোভাবে আমার শরণাগত হইয়া (অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞ, দান বা তপস্যাদি কর্মের ফলাশ্রয় না করিয়া) আমাতে মনোনিবেশ-পূর্বক যোগাভ্যাস করিলে বিভূতি, বল, শক্তি ও ঐশ্বর্যাদিসম্পন্ন পুর্ণস্বরূপে (সগুণ ও নির্গুণরূপে) আমাকে নিঃসংশয়ে যেরূপে জানিতে পারিবে, তাহা শ্রবণ কর । ১
অপরোক্ষ অনুভূতির সহিত মদ্‌বিশয়ক এই জ্ঞান নিঃশেষে তোমাকে উপদেশ দিব । স্বানুভূতির সহিত তাহা লাভ করিলে সংসারে আর অন্য কিছু জ্ঞাতব্য অবশিষ্ট থাকে না । ২
বিদ্রঃ- মায়াবাদ সম্পর্কে শ্ৰীশ্ৰীনাথ ঘোষ বৈজ্ঞানিক হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ থেকে আলোকপাত। মনে রাখবেন, চৈতন্য মহাপ্রভু যে ‘মায়াবাদী’ কথার উল্লেখ করেছেন তা বৌদ্ধ মায়াবাদ কে উদ্দেশ্য করে।
তথ্যসুত্র- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, বৈজ্ঞানিক হিন্দু ধর্ম, দর্শন সমগ্র।
নিবেদনে- শ্রী কৃষ্ণকমল
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।