• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

স্মরনীয় যারা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মরনীয় যারা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৫ মে ২০২২

রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়

 রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়

(১৮৮৫ সালের ১২ এপ্রিল - ১৯৩০ সালের ২৩ মে)

ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও লিপিবিশারদ রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার মুর্শিদাবাদের বাহরামপুরে ১৮৮৫ সালের ১২ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তাকে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের অগ্রনায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কারক হিসাবে বেশি পরিচিত।

তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালের মহেঞ্জোদারো সভ্যতা ও হরপ্পা সভ্যতার প্রধান স্থানগুলো আবিষ্কার করেন। এ সভ্যতার বিশদ ব্যাখ্যা করে কয়েকটি প্রবন্ধ ও বই লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- ‘অ্যান ইন্ডিয়ান সিটি ফাইভ থাউজেন্ড ইয়ার্স এগো’ (১৯২৮), ‘মোহেন-জোদারো’, ‘প্রিহিস্ট্রিক, অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড হিন্দু ইন্ডিয়া’ (১৯৩৪) এবং ‘মহেঞ্জোদারো- এ ফরগোটেন রিপোর্ট’ (১৯৮৪)। ‘দ্য অরিজিন অব দ্য বেঙ্গলি স্ক্রিপ্ট’ (১৯১৯) বইয়ের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবিলি রিসার্চ প্রাইজ লাভ করেন। তিনিই প্রথমবারের মতো বাংলা লিপির মুল উৎস প্রোটো-বাংলা লিপি নিয়ে কাজ করেন। তার ধ্রুপদী কাজের মধ্যে রয়েছে মধ্যযুগীর ভারতের মুদ্রা এবং ভারতের মূর্তিশিল্প বিশেষ করে গুপ্ত ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের ওপর গবেষণা। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়ান মিডায়েভ্যাল স্কুল অব স্কালর্চার’।


তিনি ‘হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ (১৯২৪) ও ‘এ জুনিয়র হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ (১৯২৮) নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুটি পাঠ্যপুস্তক লিখেছেন। ১৯২৪ সালে দেওয়া বক্তৃতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘দ্য এজ অব দ্য ইম্পেরিয়াল গুপ্তস’ (১৯৩৩)। দুই খণ্ডে লিখেছেন ‘বাংলার ইতিহাস’ (১৯১৪ ও ১৯১৭)। এটি বাংলা ইতিহাস নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লেখা প্রথম দিকের কাজগুলোর একটি। দুই খণ্ডে লিখেছেন ‘হিস্ট্রি অব উড়িষ্যা : ফ্রম দ্য আর্লিয়েস্ট টাইমস টু দ্য ব্রিটিশ পিরিয়ড’ (১৯৩০ ও ১৯৩১)। গবেষণামুলক আরও কিছু বই হলো- ‘প্রাচীন মুদ্রা’ (১৯১৫), ‘দ্য পালাস অব বেঙ্গল’ (১৯১৫), ‘দ্য টেম্পল অব দ্য শিবা অ্যাট ভূমারা’ (১৯২৪), ‘দ্য পালিওগ্রাফি অব হাতি গুম্পা অ্যান্ড নানাঘাট ইন্সক্রিপ্টশনস’ (১৯২৪), ‘বাস রিলিফস অব বাদামি’ (১৯২৮) এবং ‘দ্য হায়হাইয়াস অব ত্রিপুরা অ্যান্ড দেয়ার মনুমেন্টস’ (১৯৩১)। এ ছাড়া তিনি কিছু উপন্যাস লিখেছেন। এর মধ্যে কিছু উপন্যাস ইতিহাস আশ্রয়ী।

রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ১৯৩০ সালের ২৩ মে মৃত্যুবরণ করেন।


Written by: Prithwish Ghosh

Share:

১৬ ডিসেম্বর ২০২০

পৃথিবীর জীব-কল্যাণ ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ভারতীয় আর্য(হিন্দু)-দের অবদানের এক ক্ষুদ্র অংশ

 এই উপমহাদেশ জ্ঞান চর্চায় সভ্য-পৃথিবীর পথ প্রদর্শক ছিল ভারতীয় মনীষা, তারই প্রমান মেলে এই পরিসখ্যানে। আজ আমেরিকা ইউরোপ আমাদের মাথার উপর ছড়ি ঘুরায়, আমরা কি তা একটুও ভেবে দেখি? কেন? আসলে আমরা আমাদের ইতিহাস জানিনা।

পৃথিবীর জীব-কল্যাণ ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ভারতীয় আর্য(হিন্দু)-দের অবদানের এক ক্ষুদ্র অংশঃ


=> দশমিক পদ্ধতির প্রথম প্রচলন ও ব্যবহার করেন-মহর্ষি আর্যভট্ট

=> প্রথম সাইন(sine) সারণী তৈরী করেন-আর্যভট্ট

=> Continued Fraction আবিষ্কার করেন-ভাস্কর আচার্য্য (Vaskar II)

=> শল্যবিদ্যার জনক (The Father of Surgery) বলা হয়- মহর্ষী শুশ্রুতকে

=> ঔষধের জনক (The Father of Medicine) বলা হয়- মহর্ষী চরককে।

=> প্রথম পরিপাক(Digestion), বিপাক(Metabolism) (দেহমধ্যে সজীব উত্পাদনের রাসায়নিক পরিবর্তন) ও রোগ প্রতিরোধ(Immunity) এই তিনের ধারনা প্রদান ও ব্যাখ্যা করেন-মহর্ষী চরক।

=> পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণিকার পরমাণু নাম করণ প্রথম করেন-কণাদ।

=> পৃথিবীর প্রথম বীজ গণিতের উপর বই রচনা করেন-মহর্ষি আর্যভট্ট.

=> পাই এর নির্ভুল মান ও পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রথম প্রায় নির্ভুল মাপেন- মহর্ষি আর্যভট্ট

=> কৃত্রিম জীন আবিস্কারক -হরগোবিন্দ খোরানা

=> প্লাস্টিক সার্জারীর জনক - মহর্ষি শুশ্রুত

=> শূন্যের (০) ব্যবহার প্রথম চালু করেন আর্য্যভট্ট

=> গাছের প্রাণ আছে তা সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন স্যার জগদীশচন্দ্র বসু

=> পৃথিবীর প্রথম ও সর্ব প্রাচীন ২টি বিশ্ববিদ্যালয় হল প্রাচীন ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ততকালে চীন, জাপান, গ্রিস, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরপের নানান অংশ থেকেও ছাত্ররা জ্ঞান অর্জন করতে আসত। এর মধ্যে নালন্দা ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ধ্বংস করেন এবং তক্ষশিলারও একই পরিণতি হয়। বলাবাহুল্য এই বিশ্ববিদ্যালয় দুটো ধ্বংস না হলে এই উপমহাদেশ এখন ও পৃথিবীতে রাজত্ব করতো।

=> ব্রহ্মগুপ্ত, শ্রীনিবাস রামানুজন, মহাবীর, বৌধ্যায়ন, কাত্যায়ন, মানব, পিঙ্গল, মাধব কর, নাগার্জুন 

ইত্যাদিরা সকলেই হিন্দু কেউই সেকুলার না তালিকা বাড়ালে আর শেষ করা যাবে না।

উল্লেখ্য এখন নাসার ৩৬ শতাংশ বিজ্ঞানী ভারতীয় তথা হিন্দু, আর ভারতের ISRO-র কথা তো বাদই দিলাম ।

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

১৮ এপ্রিল ২০২০

“দয়াময়” এর প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি মনোমোহন দত্তের জীবন-কথা


মহর্ষি মনোমোহন দত্ত একজন মানবতাবাদী । তিনি মরমী সাধক ও আধ্যাত্মিক সাধনার সমন্বয়বাদী ধারার একজন জ্যোতির্ময় ঋষি। যিনি একইসঙ্গে সঙ্গীত রচনার মাধ্যমে ধর্ম সাধনার কাজটিও করে গেছেন সযতনে। ‘মলয়া’ সংকলনটি সঙ্গীত হিসেবে যেমনি অনন্য,এতে প্রতিফলিত ধর্মদশর্ন , ভাবসম্পদ এবং বিষয়বস্তু তেমন সমৃদ্ধ ও নান্দনিক।

এই মাধূর্যময় মলয়া সঙ্গীতের প্রবক্তা মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। সঙ্গীতজ্ঞ এই মহান সাধক-কবি জন্মগহ্র ণ করেন (১২৮৪ বাংলার ১০ মাঘ) ১৮৭৭ সালে; তিতাস বিধৌত ব্রা হ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার ছায়া-সুনিবিড় সাতমোড়া গ্রামে। মনোমোহন দত্তের পূর্বপুরুষ ঢাকা সোনারগাঁয়ের জমিদার রাজবল্লভ দত্ত। জমিদারীর মোহকে পাশ কাটিয়ে, চলে আসেন তিনি সাতমোড়া গ্রামে। রাজবল্লভের পুত্র বৈদ্যনাথ দত্ত। তিনি ছিলেন সঙ্গীতের সমঝদার ও শ্যামা সঙ্গীতের রচয়িতা। বৈদ্যনাথের পুত্র পদ্মনাথ দত্ত। তিনি পেশায় ছিলেন কবিরাজ, কিন্তু অধ্যাত্মবাদে সমর্পিত প্রাণ। লোকশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি মৃত্যুর এক সপ্তাহ পূর্বেই নিজের মৃত্যুর দিন-ক্ষণ বলে গিয়েছিলেন। এই পদ্মনাথ দত্তের জেষ্ট্য পুত্রই হলেন মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। পূর্বেই বলেছি, তাঁর জন্ম (১২৮৪ বাংলা সালের ১০ মাঘ) ১৮৭৭ সালে এবং মৃত্যু (১৩১৬ বাংলা সালের ২০ আশ্বিন) ১৯০৯ সালে। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩২ বছর। ক্ষণজন্মা এই ঋতিক্ব কবি তাঁর অল্পায়ু-জীবনে যে সৃষ্টিকর্ম ও সাধনার চিহ্ন রেখে গেছেন- তা চিরকালের সম্পদ ও পাথেয় হয়ে থাকবে। মনোমোহন দত্তের আত্মজীবনী থেকে তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পকের্ জানা যায়;



বাড়ীতে গ্রামস্থ রামজীবন চক্রবর্তী নামক এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের পাঠশালা ছিল তাহাতেই আমার হাতেখড়ি বা অ, আ, ক, খ আরম্ভ হয়। এইভাবে পাঠশালাতে ক্রমে প্রথমভাগ শেষ দ্বিতীয়ভাগ একবার শেষ করা হইল ও তার পরেই পাঠশালা উঠিয়া গেল। গ্রামের ছাত্রবৃত্তি স্কুলে আমাকে ভর্তি করাইয়া দিলেন।১



মহর্ষি মনোমোহন দত্ত পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী। পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যক্রমের বাইরের পাঠেও তাঁর ছিল গভীর মনোযোগ। তাঁর ‘মলয়া’ (১ম ও ২য় খন্ড) ছাড়াও প্রকাশিত- অপ্রকাশিত ২৩টি গ্রন্থের মধ্যে সেই নিবিড় অধ্যয়নের ছাপ পরিদৃষ্ট হয়। ছাত্র হিসেবে তিনি যে মেধাবী ছিলেন, তার বহু নিদর্শন মেলে। তাঁর আত্মজীবনীতে ও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এসব তথ্য;



কিছুকাল পর ১২৯৬/৯৭ মধ্যে বার বৎসর বয়সে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলাম। স্কুলে সাহিত্য ও ইতিহাস বেশ ভাল বুঝিতাম, কিন্তু গণিত জ্যামিতি প্রভৃতি একরকম চালাইয়া নিতাম---- প্রাণে এতই কৌতূহল যে, খুব ভাল লেখাপড়া শিখিয়া বড় বিদ্বান হইব এবং সংসারের বাজারে লোকে যাহাকে বড়মানুষ বলে সেইরূপ বড় মানুষ হইব।



কিন্তু নিয়তি-তাড়িত মানুষের মতোই বিধি বাম হইলেন। তবে একে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যা-ই আখ্যা দেওয়া হউক না কেন, মনোমোহনের বড়লোক হবার সপ্ন অন্য পথে সম্প্রসারিত হলো। তিনি যাপিত জীবনে কোটিপতি কিংবা বড়লোক না হয়ে, আধ্যাত্মিক সাধন-জীবনের ঐশ্বর্য আর মলয়া সঙ্গীতের মতো অনন্য ভাবসম্পদ দিয়ে, আমাদের অন্তরাত্মাকে নির্মল ও পরিশুদ্ধ করার রসদ যুগিয়ে গেলেন। তবে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষা পাস করার পর সহপাঠীরা উচ্চতর শিক্ষার জন্যে বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি হলে, আথির্ক অনটন ও পারিবারিক ঔদাসীন্যের কারণে মনোমোহনের স্কুলে ভর্তি হওয়া আর সম্ভব হলো না। স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে এবং সহপাঠীদের সঙ্গ-হারা হয়ে মনোমোহন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। মানসিক যন্ত্রনায় বিপর্যস্ত মনোমোহন এ সময় লোকচক্ষুর আড়ালে যেনো সেচ্ছা নির্বাসন বেছে নিলেন। এমনকি সহপাঠীদের কাছ থেকেও নিজেকে আড়াল করে রাখলেন। পরের বছর ১২৯৮/৯৯ বঙ্গাব্দে তাঁর বড় চাচার প্রচেষ্টায় মুরাদনগর ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পেলেন তিনি। কৈশোর বয়সের আবেগজাত মানসে, সহপাঠীদের এক ক্লাস উপরে উঠে পড়ার বিষয়টি তীবভ্রাবে রেখাপাত করে তাঁর মনে। কোনোভাবেই তিনি মনে শান্তি পাচ্ছিলেন না। কয়েক মাস অতিবাহিত হলে, তিনি নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তন করে মুরাদনগরে আর ফিরে যাননি। এ যেনো বাংলার আরেক দুখু মিয়ার (কাজী নজরুল ইসলামের) দুঃখময় জীবন! নিরন্তর প্রচেষ্টার পরও একাডেমিক পড়াশোনার অগ্রগতি যাঁর ভাগ্যে জোটেনি। তবুও দমে যাননি মনোমোহন। এরপর মনোমোহন উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় কেন্দুয়া রওয়ানা হন। কিন্তু সেখানেও তিনি বেশিদিন থাকতে পারেননি। কেন্দুয়া থাকাকালীন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানতে পাই তাঁর জীবনীতে;



স্কুলে ভর্তি হইলাম। কেন্দুয়া হইতে প্রায় তিন মাইলের ও কিছু বেশি পথ হইবে। প্রত্যহ আসা যাওয়া করিতে হইত। প্রাতে প্রায় আট কি সাড়ে আটটার সময় আগের দিনের পান্তা বা ঠান্ডা ভাত, বাসী ব্যঞ্জন, ক্বচিৎ কোনোদিন গরম ভাত বেগুন সিদ্ধ খাইয়া চলিতাম। বিকালে পাঁচ কি সাড়ে পাঁচটায় আসিয়া দুই প্রহরের রান্না করা ঠান্ডা ভাত খাওয়া হইত। -বাড়ীর গিন্নী বড়ই বিরক্ত ভাবিতেন। দ্বিতীয় আর এক যন্ত্রণা --- কর্তার দুইটি ছেলে নিতান্ত অনাবিষ্ট ও দুষ্টু, তাহাদিগকে প্রথম ভাগ পড়াইতে হইত। কথা শুনিত না, গালিগালাজ মারধর করিয়া জ্বালাতন করিত, কতকদিন কাটাইলাম- সাত আট মাস পরে ১২৯৯ সনের জ্যৈষ্ঠ মাসে বন্ধের সময় বাড়ীতে আসিলাম। সেখানকার কষ্ট অত্যাচারে পিতামাতার মন ও নিজের মন ফিরিয়া গেল। অদৃষ্টকে ধিক্কার দিয়া অন্য চেষ্টায় বাড়িতে বসিয়া দিন গুনিতে লাগিলাম। ৩



সকল প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, হতাশাগ্রস্ত মনোমোহনকে তাঁদের এক আত্মীয় সিরাজুল ইসলাম খাঁ, মোক্তারি পরীক্ষা দেয়ার পরামর্শ দিলেন। মনোমোহন তাতে সম্মতি দিলেন। সকল প্রকার বাধা-বিপত্তি ঠেলে মোক্তারি পরীক্ষা দিয়ে তিনি অকৃতকার্য হলেন। দমে যাননি মনোমোহন। তারপরও মনে প্রেরণা যুগিয়ে মনোমোহন ওকালতি পড়বার জন্যে আগরতলাতে যান। বইপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে, তিনি ওকালতি পড়ার আশা পরিত্যাগ করলেন। একই সময়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের কালীকচ্ছের আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ গুরু আনন্দস্বামীর সন্ধান পান। তিনি ওকালতি পড়ার চেয়ে, আনন্দস্বামীর সান্নিধ্য লাভকে Ñশ্রেয় মনে করলেন। ছাত্রবৃত্তি লাভের পর পুনঃপুন চেষ্টার পরও,তাঁর পক্ষে একাডেমিক বিদ্যা অর্জন সম্ভব হলো না। এমনকি মোক্তারি বা ওকালতি পাস করে ব্যবহারিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্নেরও অবসান ঘটলো। বদলে যায় তাঁর জীবনের গতি-প্রকৃতি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্ভব না হলেও অধ্যাত্মবাদী চেতনায় ঋদ্ধ হতে থাকেন মনোমোহন। তাঁর জীবনের এই বাঁকপরিবর্তন কে আমরা ব্যথর্তার উপশমে জীবন থেকে পলায়ন হিসেবে চিহ্নিত করি না, কারণ তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যেও সহজাত ভাবুকতা ও ধ্যান-মগ্নতার বৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল ছিল। তা না হলে, সোনারগাঁয়ের জমিদারীর মোহ কাটিয়ে তাঁর পূর্বপুরুষ কখনো সাতমোড়ার মতো অজ-পাড়াগাঁয়ে এসে বসতি গড়তেন না। বংশ-পরম্পরায় মনোমোহনও সেই ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী হবেনÑএটা স্বাভাবিক। জাগতিকতার বলয়ের মধ্যে থেকেও তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার জগতে প্রবেশ করলেন। জানা যায়, ১৮ বছর বয়সেই তিনি গুরুমুখী হয়ে যান এবং ধর্ম সাধনার মাধ্যমে, সাহিত্য ও সঙ্গীত সৃষ্টির মাধ্যমে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে অগ্রসর হতে শুরু করেন। আনন্দস্বামী মনোমোহন দত্তের প্রথম এবং প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু হলেও, তিনি বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগুরুদেরও সান্নিধ্যে গিয়েছেন। বিভিন্ন ধর্মের জ্ঞান লাভ করতে এবং সর্বধর্ম সমন্বয় সাধনার জন্যই তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টা। আনন্দ স্বামীর পর, চট্টগ্রামের মাইজভা-ার পীরের সান্নিধ্যেÑসূফী ভাবনার প্রেরণা লাভের বিষয়টিও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষণজন্মা এই প্রবাদপুরুষ ১৩০৮ বঙ্গাব্দের ২৭শে ভাদ্র, পিতা-মাতার ইচ্ছায় বিবাহ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলাস্থ ছয়ফুলাø কান্দি গ্রামের অধিবাসী দীননাথ দত্তের কন্যা সৌদামিনী দত্তের সাথে মনোমোহনের বিবাহ হয়। বিবাহের সাতবছর পর, ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ২৭ শে আশ্বিন, একমাত্র পুত্র সুধীরচন্দ্র দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। সুধীচন্দ্রের বয়স যখন এক বছর, তখন তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। ১৩১৬ বঙ্গাব্দের ২০আশ্বিন; মনোমোহন ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে যান। মনোমোহনের মৃত্যুর পর,তাঁর ¯ী¿ সৌদামিনী দত্ত সাতমোড়া আনন্দআশ্রমের দায়িত্ব নেন এবং মনোমোহনের বাণী প্রচারে ভূমিকা পালন করেন। সে সময়ই সাতমোড়া আনন্দআশ্রম ও মনোমোহনের ধর্ম-দশর্ন এবং মানবতাবাদী চেতনার দ্রুত প্রসার ঘটতে শুরু করে। সৌদামিনী দত্তের ছেলে সুধীরচন্দ্র দত্ত পরবর্তীকালে এই গুরুভার গ্রহণ করেন। সুধীরচন্দ্র মৃত্যুবরণ করলে, সুধীরচন্দ্রের ছেলে বিল্বভূষণ দত্ত ও তাঁর স্ত্রী শংকরী দত্ত এই ধর্মসাধনা ও আনন্দআশ্রমের প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিবছর ১০ মাঘ, সাতমোড়া আনন্দ আশ্রমে মহর্ষির জন্মদিন জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। বহু লোক সমাগম ও ভক্তের মিছিল চলে সেখানে। ২-৩ দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের অনেক প্রতিথযশা শিল্পী, কবি, আলোচক, সাংবাদিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হন সেই পূণ্যভ’মিতে। প্রগাঢ় ভক্তি ও শৃঙ্খলার সাথে সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ভক্তের নিবেদিত মনপ্রাণ এক অতীন্দ্রিয় ভাবলোকে বিচরণ করে; নিরন্তর ভেসে চলে এক অসামান্য আনন্দ স্রোতে।








তথ্য নির্দেশ
১. সুকুমার বিশ্বাস, মনোমোহন দত্ত, বাংলা একাডেমি,ঢাকা, ১৯৮৯, পৃ.৮
২. সুকুমার বিশ্বাস, পূর্বোক্ত, পৃ.৮
৩. সুকুমার বিশ্বাস, পূর্বোক্ত, পৃ.৯



প্রাবন্ধিক : মোহাম্মদ শেখ সাদী,
প্রভাষক, বাংলা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মূল পোষ্টঃ http://maharsemonomohan.org/bn/doyamoy-bn
Share:

১৭ এপ্রিল ২০২০

১৮৯৯ সালে প্লেগ কলকাতায় যখন ভয়ানক রূপ ধারন করেন তখনকার সিস্টার নিবেদিতার একটি ঘটনা ।

১৮৯৯ সালে প্লেগ কলকাতায় ভয়ানক রূপ ধারণ করে। সিস্টার নিবেদিতাও মহামারীতে, মানব সেবার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। একদিন তিনি স্বয়ং ঝাড়ু লইয়া রাস্তা পরিষ্কার করিতে উদ্যত হইলে পাড়ার যুবকগণ লজ্জিত হইয়া রাস্তা পরিষ্কার রাখিবার দায়িত্ব গ্রহণ করে । স্বাস্থ্য- সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধের নির্দেশ যুক্ত হ্যাণ্ডবিল ছাপাইয়া প্রতি পল্লীতে বিতরণ করা হইয়াছিল । মারাত্মক রোগের ভয় উপেক্ষা করিয়ে নিবেদিতা কিরূপ আন্তরিকতার সহিত রোগীর শুশ্রূষা করিতেন , তাহার বিবরণ প্রত্যক্ষদর্শী ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর দিয়াছেন-
“১৮৯৯ খৃষ্টাব্দে প্লেগ সংহারকরূপে দেখা দেয় । পূর্ববৎসর তাহার আবির্ভাব সূচনায় বিধিব্যবস্থা – বিভীষিকা ভয়ে ভীত জনগণ শহর হইতে পলায়ন করে। ... এই বৎসর ছোটোলাট স্যার জন উডবার্ণ আশ্বাস দেন, কোন রোগীকে বলপূর্বক গৃহান্তরিত করা হইবে না। ... সেই সময়ে একদিন চৈত্রের মধ্যাহ্নে রোগি- পরিদর্শনান্তে গৃহে ফিরিয়া দেখিলাম , দ্বারপথে ধূলি- ধূসর কাষ্ঠাসনে একজন য়ূরোপীয় মহিলা উপবিষ্টা । ইনিই ভগিনী নিবেদিতা; একটি সংবাদ জানিবার জন্য আমার আগমন প্রতীক্ষায় বহুক্ষণ অপেক্ষা করিতেছেন ।
সেইদিন প্রাতে বাগবাজারে কোন বস্তীতে আমি একটি প্লেগাক্রান্ত শিশুকে দেখিতে গিয়াছিলাম। রোগীর ব্যবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যই সিস্টার নিবেদিতার আগমন । আমি বলিলাম – ‘রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন’। বাগদীবস্তিতে কিরূপে বিজ্ঞান- সম্মত পরিচর্যা সম্ভব , তাহার আলোচনা করিয়া আমি তাঁহাকে বিশেষ সাবধান হইতে বলিলাম । অপরাহ্ণে পুনরায় রোগী দেখিতে যাইয়া দেখিলাম , সেই অস্বাস্থ্যকর পল্লীতে , সেই আর্দ্র – জীর্ণ কুটিরে নিবেদিতা রোগগ্রস্ত শিশুটিকে ক্রোড়ে লইয়া বসিয়া আছেন । দিনের পর রাত্রি , রাত্রির পর দিন তিনি স্বীয় আবাস পরিত্যাগ করিয়া সেই কুটীরে রোগীর সেবায় নিযুক্তা রহিলেন। গৃহ পরিশোধিত করা প্রয়োজন । তিনি স্বয়ং একখানি ক্ষুদ্র মই লইয়া গৃহে চুনকাম করিতে লাগিলেন। রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়াও তাঁহার শুশ্রূষার শৈথিল্য সঞ্চারিত হইল না। দুইদিন পর শিশু এই করুণাময়ীর স্নেহ- তপ্ত অঙ্কে অন্তিম নিদ্রায় নিদ্রিত হইল।”
মৃত্যুর পূর্বে শিশুটি তাঁহাকেই জননী মনে করিয়া জড়াইয়া ধরিয়া ‘মা’ , ‘মা’ করিয়াছিল। তাঁহার আপ্রাণ চেষ্টা বিফল করিয়া এই শিশুটির মৃত্যু তাঁহাকে বিশেষ বিচলিত করে। নিবেদিতার ‘Studies From an Eastern Home’ নামক পুস্তকে ‘প্লেগ’ নামে একটি প্রবন্ধ আছে । এই প্রবন্ধে প্লেগের আবির্ভাবে পল্লীর তদনীন্তন অবস্থা এবং বিশেষ করিয়া এই শিশুটির মৃত্যুর বর্ণনা আছে; নাই শুধু তিনি নিজে মূর্তিমতী করুণার ন্যায় কিরূপে এই সেবাকার্যে নিজেকে উৎসর্গ করিয়াছিলেন তাহার উল্লেখ। বস্তুত এই কার্যের দ্বারাই নিবেদিতা কেবল সুপরিচিত নহে, সকলের শ্রদ্ধার পাত্রী হইয়াছিলেন। এই মারাত্মক রোগের আক্রমণ- প্রতিরোধের জন্য পরমাত্মীয়ের ন্যায় তাঁহার নিরলস উদ্যম ও ঐকান্তিক সেবা- শুশ্রূষা কে উপেক্ষা করিতে পারে!
( ভগিনী নিবেদিতা... প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা )

Share:

১০ এপ্রিল ২০২০

স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীঃ কালাজ্বরের ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কারক ব্রিটিশ ভারতের একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক ।

স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী (১৯ ডিসেম্বর ১৮৭৩ — ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬) ব্রিটিশ ভারতের একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক ছিলেন। তিনি কালাজ্বরের ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার করেন।

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী ১৮৭৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর পূর্ব বর্ধমানের সরডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নীলমণি ব্রহ্মচারী ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়েজের বেতনভুক্ত চিকিৎসক। এবং মা ছিলেন সৌরভ সুন্দরী দেবী।

 উপেন্দ্রনাথ জামালপুরে পূর্ব রেলওয়ের জামালপুর ইস্টার্ন রেলওয়েজ বয়েজ হাই স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন। ১৮৯৩ সালে বর্তমান হুগলি মহঃসীন কলেজ থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ১৮৯৪ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজে রসায়নে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এল.এম.এফ. এবং ১৮৯৯ সালে ভেষজবিজ্ঞান ও শল্যচিকিৎসায় প্রথম স্থান নিয়ে এম.বি. পাস করেন এবং গুডিভ ও ম্যাকলাউড পদক পান। ১৯০২ সালে এম.ডি. এবং এরপর শারীরতত্ত্বে পিএইচ.ডি. উপাধি পান। পিএইচডিতে তার গবেষণার বিষয় ছিল রক্তের লোহিতকণিকার ভাঙ্গণ। এছাড়াও তিনি কোট্‌স পদক, গ্রিফিথ পুরস্কার ও মিন্টো পদক পান ।

১৮৯৯ খ্রিষ্ঠাব্দে তিনি প্রাদেশিক স্বাস্থ্যসেবায় যোগদান করেন। প্রথমে তিনি ঢাকা মেডিকেল স্কুল (বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ) এবং পরবর্তীতে ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে (বর্তমানে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ) চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯০৫ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে ভেষজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে এবং ১৯২৩ থেকে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে অতিরিক্ত চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে সরকারী কাজ থেকে অবসর নিয়ে কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে ক্রান্তীয় ভেষজবিজ্ঞানের সাম্মানিক অধ্যাপক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-রসায়নের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

 ১৯২০ সালে উপেন্দ্রনাথ তৈরি করেন ইউরিয়া স্টিবামাইন। ১৯২২ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ মেডিক্যাল রিসার্চে ৮ জন কালাজ্বর রোগীকে সুস্থ করার বিবরণসহ উপেন্দ্রনাথের আবিষ্কারের কথা প্রকাশিত হয়। তিনি তার গবেষণা পত্রে ওষুধটির বিষাক্ততা সম্পর্কে আলোচনা করেন। ১৯২৩ সালের জুলাই মাসে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেটে ইউরিয়া স্টিবামাইন সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশিত হয়। ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে উপেন্দ্রনাথ আরো কিছু তথ্য প্রকাশ করেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেটে। কালাজ্বর ছাড়াও উপেন্দ্রনাথ ফাইলেরিয়া, ডায়াবেটিস, কুষ্ঠ, মেনিনজাইটিস প্রভৃতি নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্বন্ধে রচনাবলীর মধ্যে ট্রিটিজ অন কালাজ্বর বিখ্যাত।

 উপেন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডের র‌য়্যাল সোসাইটি অফ মেডিসিনের সভ্য, ইন্দোরে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের (১৯৩৬) সভাপতি এবং নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে দেশী ওষুধ প্রস্তুত করেন।

 কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গ্রিফিথ মেমোরিয়াল পুরস্কারে সম্মানিত করেছিল। স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন তাকে মিন্টো পদক দিয়েছিল। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল তাকে স্যার উইলিয়াম জোনস পদকে সম্মানিত করেছিল। এছাড়াও তিনি কাইজার-ই-হিন্দ স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাকে রায়বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে উপেন্দ্রনাথ ব্র্‌হ্মচারী নাইট উপাধি পান। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তাকে মেডিসিনে নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয়েছিল।

 তথ্যসূত্র
01.সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান প্রথম খণ্ড - সংশোধিত চতুর্থ সংস্করণ - সাহিত্য সংসদ 
02.চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস — উনিশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব - বিনয় ভুষণ রায়, প্রথম সম্পাদনা

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী
Upendranath Brahmachari.jpg
জন্ম১৯ ডিসেম্বর ১৮৭৩
পূর্বস্থলী
মৃত্যু৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ (বয়স ৭২)
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারতীয়
পেশাচিকিৎসক
Share:

সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরঃ তারার বিবর্তন এবং জীবনচক্র সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী।

সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর

সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর (১৯ অক্টোবর, ১৯১০ - ২১ আগস্ট, ১৯৯৫) ভারতে জন্মগ্রহণকারী এক জন মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী। তিনি এক তামিল পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তারার বিবর্তন এবং জীবনচক্র সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আবিষ্কারের জন্য তাঁকে উইলিয়াম আলফ্রেড ফাউলারের সঙ্গে যৌথ ভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তারার বিবর্তন বিষয়ে তাঁর আবিষ্কৃত বিষয়টির নাম চন্দ্রশেখর সীমা।

গবেষণা

১৯২৮ সালে চন্দ্রশেখর ব্রিটেনের স্বনামধন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটনের অধীনে অধ্যয়নের জন্য কেমব্রিজে আসেন। ভারত থেকে ইংল্যান্ড আসার পথে জাহাজে বসে তিনি গাণিতিক ভাবে চিন্তা করতে থাকেন, একটি তারার ভর সর্বোচ্চ কত হলে সব জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর তার মহাকর্ষীয় সংকোচন ঠেকানোর মতো বল সৃষ্টি হতে পারে। তিনি দেখেন জ্বালানিবিহীন তারাটি সংকুচিত হতে হতে যখন অনেক ছোট হয়ে যাবে তখন এর কণাগুলো পরস্পরের অতি সন্নিকটে আসবে এবং একটি অপজাত অবস্থার সৃষ্টি হবে। পাউলির বর্জন নীতি অনুসারে একই অরবিটালের দু’টি ইলেকট্রনের স্পিন ভিন্ন হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে হেতু পারমানবিক গঠন নেই, তাই অতি সন্নিকটে অবস্থিত অপজাত কণাই ইলেকট্রনের কাজটি করবে, অর্থাৎ তাদের গতিবেগ (স্পিনের বদলে) হতে হবে অনেক ভিন্ন। এর ফলে কণাগুলো একে অন্যের কাছ থেকে প্রবল বেগে দূরে সরে যাবে যা তারাকে প্রসারিত করার জন্য একটি বহির্মুখি বল প্রয়োগ করবে। এ ভাবে মহাকর্ষীয় সংকোচন ও অপজাত চাপের মধ্যে যে সাম্যাবস্থার সৃষ্টি হবে তার কারণে শ্বেত বামন তারার জন্ম হবে। অবশ্য চন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন, বর্জন নীতি একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই সাম্যাবস্থা রক্ষার মতো অপজাত চাপ সরবরাহ করতে পারে। সাধারণ আপেক্ষিকতা আলোর বেগকে সর্বোচ্চ বলে সব কণার বেগ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিল। তাই দেখা গেল, এক সময় বর্জন নীতির কারণে সৃষ্ট অপজাত চাপ মহাকর্ষীয় সংকোচন বলের কাছে হার মানবে। চন্দ্র হিসাব করে দেখেন, যে তারার ভর সূর্যের ভরের ১.৪ গুণের চেয়ে বেশি তার মহাকর্ষীয় সংকোচন বল অপজাত চাপের থেকে বেশি হবে এবং তারাটিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এই সীমাটিকে চন্দ্রশেখর সীমা বলা হয়।
চন্দ্রশেখর সীমা হল স্থিতিশীল শীতল শ্বেত বামন তারকার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভর। ভর এর চাইতে বেশি হলে তারকাটি চুপসে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে।
১৯৩১ সালে ভারতীয় জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর দেখান যে, একটি শ্বেত বামন তারকার জন্য এই ভরের মান ১.৪১ সৌরভরের সমান। এবং এই পর্যায়ে তারাটি ঘূর্ণায়মান হবে। তাঁর নামানুসারে এই সীমার নামকরণ করা হয়েছে। তবে দ্রুত এবং বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন ঘূর্ণন হার বিশিষ্ট তারার জন্য ডুরিসেন (১৯৭৫) দেখান যে, এই ভরের মান ৩ সৌরভরের সমান হতে পারে। শ্বেত বামন তারার ভর বেশি হলে মহাকর্ষ একে সংকুচিত করে ফেলতে চায়। ফলে এর অন্তর্গত ইলেকট্রনগুলি উচ্চতর শক্তিদশায় পৌছে এবং এদের গতিবেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপও বাড়তে থাকে। পদার্থের এ ধরনের পরিস্থিতিকে বলে অপজাত অবস্থা (degenerate matter)। মহাকর্ষের ক্রমবর্ধমান চাপে একই কোয়ান্টাম দশায় একাধিক ইলেকট্রন থাকার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু ইলেকট্রন হল ফার্মিয়ন। এরা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মেনে চলে। এরা পলির বর্জন নীতি অনুমোদন করে। পলির বর্জন নীতি অনুযায়ী একই কোয়ান্টাম দশায় একাধিক ইলেকট্রন থাকতে পারে না। তাই একাধিক ইলেকট্রনকে একই কোয়ান্টাম দশায় আসতে বাধ্য করা হলে এরা এক রকমের চাপ দেয় যা ফার্মি-চাপ বা অপজাত চাপ নামে পরিচিত। এই চাপের উপস্থিতিতে তারাটি অন্তর্মুখী মহাকর্ষ বলকে কোনও ক্রমে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় এবং শ্বেত বামনে পরিণত হয়। চন্দ্রশেখর গাণিতিক ভাবে দেখান যে, সর্বোচ্চ যে ভর থাকলে তারাটি এই অবস্থায় পৌছতে পারে তা ১.৪১ সৌরভরের সমান। এরচেয়ে বেশি ভরবিশিষ্ট তারার পরিণতি কৃষ্ণবিবর।
সূত্র : বিশ্বের সেরা ১০১ বিজ্ঞানীর জীবনী, আ. ন. ম. মিজানুর রহমান পাটওয়ারি, মিজান পাবলিশার্স, ঢাকা


সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর Nobel prize medal.svg
সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর.png
সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর
দেশীয় নামசுப்பிரமணியன் சந்திரசேகர்
জন্ম১৯ অক্টোবর ১৯১০
পাঞ্জাব, লাহোর, ব্রিটিশ ভারত, বর্তমানে পাকিস্তানে
মৃত্যু২১ আগস্ট ১৯৯৫ (বয়স ৮৪)
শিকাগো, ইলিনয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
বাসস্থানব্রিটিশ ভারত (১৯১০-১৯৩০), ব্রিটেন(1930-1937), যুক্তরাষ্ট্র (১৯৩৭-১৯৯৫)
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারত (১৯১০-১৯৪৭), ভারত (১৯৪৭-১৯৫৩), যুক্তরাষ্ট্র (১৯৫৩-১৯৯৫)
কর্মক্ষেত্রজ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান
প্রতিষ্ঠানশিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রাক্তন ছাত্রট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ
প্রেসিডেন্সি কলেজ, মাদ্রাজ
পিএইচডি উপদেষ্টারাল্‌ফ এইচ ফাউলার
আর্থার স্ট্যানলি এডিংটন
পিএইচডি ছাত্ররাডোনাল্ড এডওয়ার্ড অস্টারব্রক
পরিচিতির কারণচন্দ্রশেখর সীমা
উল্লেখযোগ্য
পুরস্কার
নোবেল পুরস্কার.png পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার (১৯৮৩)
কপলি মেডেল (১৯৮৪)
ন্যাশনাল মেডেল অফ সাইন্স (১৯৬৭)
পদ্মবিভূষণ (১৯৬৮)
স্বাক্ষর
Share:

আপনি জানেন কি সমগ্র বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত মানুষদের সাময়িক চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে যে হাইড্রক্সিক্লোরকুইনের ব্যবহার হচ্ছে তা বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালসের তৈরী।

বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত মানুষদের সাময়িক চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বে হাইড্রক্সিক্লোরকুইনের চাহিদা বেড়ে গেছে। যা তখন তৈরী হয়েছিল বাঙ্গালী বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালসে। বিশ্বযুদ্ধ কিংবা মহামারী, ১২৮ বছরে বারবার " উদ্ধারকর্তা" বেঙ্গল কেমিক্যালস।

১৯২৩ সাল, অর্থাৎ প্রায় এক শতাব্দী আগের কথা। ভারতের উত্তরবঙ্গ জুড়ে সে-বছর প্রবল বন্যা। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। তাদের সাহায্যের জন্য আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তৈরি করলেন বেঙ্গল রিলিফ কমিটি। সামান্য চাঁদার অর্থে কিছুটা খাবার তারা তুলে দিতে পারছিল দুর্গত মানুষদের মুখে। কিন্তু এর মধ্যেই নতুন উপদ্রব শুরু করেছে কলেরা এবং টাইফয়েড। আক্রান্ত বহু মানুষ। সেইসব মরণাপন্ন রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করতে এগিয়ে এসেছিল বেঙ্গল কেমিক্যালস।

বর্তমানের দিকে তাকিয়ে দেখলেও, ছবিটা প্রায় একই। করোনা আক্রান্ত মানুষদের সাময়িক চিকিৎসার ব্যবস্থা হিসাবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গিয়েছে হাইড্রক্সিক্লোরকুইন ওষুধটির। বাজারে যখন কাঁচামালেরই জোগান প্রায় নেই বললেই চলে, তখন এই বিপুল উৎপাদন সম্ভব হবে কী করে? আর সেই পরিকাঠামোই বা কোথায়?

এমন পরিস্থিতিতেই এগিয়ে এল বেঙ্গল কেমিক্যালস। ১২৮ বছর পেরিয়ে আজও দেশের দুর্দিনে সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে এই সংস্থা। এই প্রথমবার তো নয়। দীর্ঘ ইতিহাসে বারবার এমন জরুরি পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসেছে বেঙ্গল কেমিক্যালস।

আবার খানিকটা পিছনের দিকে তাকানো যাক। ১৮৯৮ সাল। বেঙ্গল কেমিক্যালসের বয়স মাত্র ৬ বছর। তখন অবশ্য নাম ছিল ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল ওয়ার্ক’। তেমন বড় কারখানা কিছুই নেই, সামান্য ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজ চলে। এর মধ্যেই কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছে প্লেগ। আক্রান্ত বহু মানুষ। আর প্লেগের হাত থেকে বাঁচার প্রথম শর্ত ঘর পরিষ্কার এবং কীটপতঙ্গ মুক্ত রাখা। কিন্তু স্যানিটেশনের যাবতীয় যা সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আসে তার দাম আকাশছোঁয়া। সেবারেও এগিয়ে এসেছিল বেঙ্গল কেমিক্যালস। সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে তাঁরা তৈরি করেছিলেন ফিনাইল এবং ন্যাপথলিন বল।

শুধু দেশের সাধারণ মানুষ নয়, সরকারের দিকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। ১৯১৪ সাল, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের জন্য কিছু অ্যাসিড এবং রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োজন হয় ব্রিটিশ সরকারের। কিন্তু এতদিন এসব দ্রব্যের জন্য নির্ভর করা যেত জার্মানির উপর। এখন তো জার্মানি প্রতিপক্ষ দলে। তাহলে উপায়? উপায় সেই উপনিবেশের দেশীয় একটি কারখানা, বেঙ্গল কেমিক্যালস। যুদ্ধের যাবতীয় রাসায়নিক দ্রব্যের উৎপাদনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান।

সরকারও অবশ্য সেই উপকারের মর্যাদা রেখেছিল। যুদ্ধের পর কোম্পানির মূলধন বেড়েছিল প্রায় ২০ গুণ। সরকার অনেক সম্মানও দিয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রকে। তবে বেঙ্গল কেমিক্যালসের চাহিদা হয়তো এসব কিছুই ছিল না। বরং জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে থাকার যতটুকু সামর্থ্য তার আছে, সেটুকুই সম্পূর্ণ দিয়ে যেতে চায়। তাই তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার আহত সৈনিকদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসে এই প্রতিষ্ঠান। অগ্নিযুগের বিপ্লবীরাও সাহায্য পেয়েছেন নানা সময়।

১৮৯২ সালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের উদ্যোগে সামান্য একটি ভেষজ গবেষণাগার হিসাবে আত্মপ্রকাশ বেঙ্গল কেমিক্যালসের। কালক্রমে একটি রাসায়নিক কারখানা হয়ে ওঠে ১৯০৫ সালে। প্রথম দেশীয় ওষুধ নির্মাতা সংস্থা এটি। ক্রমশ বাড়তে থাকে উৎপাদন। ১৯৩১ সালে শুরু হয় গ্ল্যান্ড প্রোডাক্টের প্রস্তুতি, ১৯৩২ সালে ভিটামিন প্রস্তুতি।

আজও নতুন নতুন ওষুধের উৎপাদন বজায় রেখেছে এই প্রতিষ্ঠান। আমরা শুধু ইতিহাসের পাতাতেই পড়েছি এই প্রতিষ্ঠানের কথা। কিন্তু বেঙ্গল কেমিক্যালস তার দায়িত্ব ভোলেনি। বিধ্বস্ত পৃথিবীতে আজও মসীহা বেঙ্গল কেমিক্যালস।

তথ্য- সংগৃহীত।
Share:

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকল ওয়ার্কস ।

ফুলুকে বলা হয় 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী'। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলত ফুলু নাকি বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে বিপ্লবী। ফুলু নাকি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলোনের সময় বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার টাকা দিত। ফুলুর দেশপ্রেম এতই উগ্র ছিল, যে ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ অফিসার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, 'স্যার পি.সি. রায়ের মতো লোক যদি আধ-ডজন থাকতেন, এতদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে যেত।' ১৯১৯ সালে ফুলুকে ব্রিটিশরা দিয়েছিল Companion of the Indian Empire(C.I.E.) উপাধি, সেই বছরই কলকাতার টাউন হলে রাউলাট বিলের বিরোধিতায় গর্জে উঠেছিল ফুলু, বলেছিল, 'দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না।'
প্রেসিডেন্সি কলেজে ২৭ বছর পড়িয়েছে ফুলু। ক্লাসে ফুলু পড়াতো বাংলা ভাষায়। নীচের দিকেই ক্লাস নিতে ভালোবাসত ফুলু, সে বলত 'কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমত আকার দিতে পারে হাইস্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়।' সে সব সময় চাইত তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাপিয়ে যাক। তাই সে লিখেছিল , ' সর্বত্র জয় অনুসন্ধান করিবে, কিন্ত পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া সুখী হইবে।' ফুলুর এক মুসলিম ছাত্র ছিলেন ডঃ কুদরত-ই খুদা। ১৯১৫ সালে কেমিস্ট্রিতে এম.এস.সি পরীক্ষায় কুদরত-ই খুদা প্রথম শ্রেণী পাওয়ায় কয়েকজন কট্টর হিন্দু শিক্ষক ফুলুকে অনুরোধ করেছিলেন কুদরত-ই খুদাকে প্রথম শ্রেণী না দেওয়ার জন্য। কিন্ত ফুলু যে অসাম্প্রদায়িক পিতার ভাবাদর্শে দীক্ষিত। ফুলুর কাছে যে যোগ্য সে যোগ্যই। তাই ফুলু রাজি হয়নি।

ফুলুকে একবার বিশ্বকবি লিখেওছিলেন, '…যেসব জন্ম-সাহিত্যিক গোলমালের মধ্যে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে, জাত খুইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাদের ফের জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন।' আসলে বিশ্বকবি অনুভব করেছিলেন, বিলেতে পড়াশুনা করলেও এবং ইংরেজিতে চোস্ত হলেও বাংলা ভাষা ছিল ফুলুর প্রাণ এবং ফুলুর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সাহিত্যিক। ফুলুর ৭০ তম জন্মজয়ন্তীর দিনে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন, আবেগমথিত কণ্ঠে বিশ্বকবি বলেছিলেন, 'আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় একঘাটে এসে পৌছেছি।' সেদিন রবীন্দ্রনাথ ফুলুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি তাম্রফলক, তাতে খোদাই করা ছিল কবির লেখা দুটি লাইন -'প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়, করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।'
ছোটবেলা থেকেই কলা খেতে ভালোবাসত ফুলু, সকালে টিফিন করত দুটো কলা দিয়ে। চাঁপাকলা ফুলুর খুব প্রিয় ছিল। সেই সময় এক পয়সায় দুটো চাঁপাকলা পাওয়া যেত। একদিন এক ছাত্র স্যারের জন্য তিন পয়সা দিয়ে দুটো কলা নিয়ে আসায় কি রাগ ফুলুর, ছাত্রকে বলেছিল, 'নবাবি করতে শিখেছ, আমায় পথে বসাবে?'
এর কিছুক্ষণ পরেই কংগ্রেস নেতা ড . প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসেছিলেন ফুলুর কাছে, তাঁর তিনহাজার টাকা দরকার ছিল। যে যুগে এক পয়সায় দুটো কলা পাওয়া যেত, সে যুগে তিন হাজার টাকার মুল্য সহজেই অনুমেয়। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনহাজার টাকার চেক লিখে দিয়েছিল ফুলু।
'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' রাড়ুলীর ফুলুর নাম তখন সারা বিশ্ব জানে। সাইমন কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজের কথা ও ফুলুর কথা লন্ডনে অনেক শুনেছিল। তারা কলকাতায় এসে বিজ্ঞান কলেজ পরিদর্শনে এসেছিল, আসল উদ্দেশ্য ছিল ফুলুকে দেখা। এক দুপুরে তারা ফুলুর ঘরে এসে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিস্কারক স্যার পি,সি,রায় গামছা পরে চেয়ারে বসে আছেন। কারণ ফুলু তার ধুতি খানা কেচে রোদে শুকাতে দিয়েছিল। ঘরের এক কোণে স্টোভ জ্বলছে, নিজের খাবার নিজেই রান্না করছিল ফুলু। একটু লজ্জা না পেয়ে ফুলু নাকি সেই অবস্থাতেই সাইমন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
তিনি বুঝেছিলেন, ‘‘একটা সমগ্র জাতি শুধুমাত্র কেরানী বা মসীজীবী’’ হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বাঙালি জাতিকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখালেন তিনি। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকল ওয়ার্কস। মূলধন বলতে ছিল, মাত্র আটশো টাকা আর পূর্ণ আত্মবিশ্বাস।
তাঁর আদর্শ বাঙালি পালন করে না।
আজকের প্রজন্ম তাঁর নামও শোনেনি।
আমাদের ক্ষমা করবেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।
সংগৃহীত


Share:

০৬ জানুয়ারি ২০১৯

বিশ্বের প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউইটি হিসেবে ভারতকন্যা অরুনিমা সিনহার অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসন জয়

আমরা জীবনে কত ক্ষুদ্র ব্যাপার নিয়ে আক্ষেপ করি, হতাশ হই, অহংকার করি, কাড়াকাড়ি করি, "লড়াই" করি.....একে বলে লড়াই, একে বলে জীবন❤
"দিনটা ছিল ২০১১ সালের ১২ই এপ্রিল।

বাইশ বছরের একটা মেয়ে লক্ষনৌ থেকে পদ্মাবতী এক্সপ্রেসে উঠেছিল দিল্লী যাবে বলে। রাতের ট্রেন, তাড়াহুড়োয় সে একাই চলেছে।

মনে তার চাপা আনন্দ। CISF এ চাকরিটা এবার বোধ হয় হয়েই যাবে। আর হবে নাই বা কেন? জাতীয়স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় সে, সঙ্গে ফুটবলও খেলে মাঝেমাঝেই। স্পোর্টস কোটায় অনেকদিন আগেই তার চাকরিটা হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল, এখনো যে হয়নি এটাই আশ্চর্যের।

মেয়েটা যখন লক্ষনৌ থেকে ট্রেনে উঠল তখন রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ ইন্টারভিউয়ের চিঠি আসায় তাড়াহুড়োয় রিজার্ভেশন কিছুতেই পাওয়া যায়নি, মেয়েটা কোনোরকমে জেনারেল কামরায় একটু জায়গা পেয়ে চুপ করে বসেছিল। ঘুমোলে চলবে না, সঙ্গের ব্যাগে টাকাপয়সা, রেজাল্ট, খেলার সার্টিফিকেট সবই আছে।

তবু একনাগাড়ে বসে থাকলে সবারই ঝিমুনি আসে। তার ওপর রাতের ট্রেন এমনিতেই জোরে চলে। ফলে পদ্মাবতী এক্সপ্রেস যখন চেনাতি ষ্টেশন থেকে জোরে হুইসল বাজিয়ে রওনা দিল, মেয়েটা ঘুমে প্রায় ঢুলে পড়েছে পাশের দেহাতী মহিলাটির কাঁধে। সারাদিন মাঠে প্র্যাকটিস করে এমনিতে ক্লান্ত ছিল, তার ওপর জানলা দিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া, ঘুম তো আসতে বাধ্য।

কামরার অন্য লোকেরাও ঝিমোচ্ছে। কেউ বা তখনো জেগে আছে, হাই তুলছে ঘনঘন।

মেয়েটা একটা ব্যাপার বুঝতে পারেনি, ও যেখানে বসেছিল, তার চেয়ে কয়েকহাত দূরে তিনজোড়া চোখ ওর ওপর সমানে নজর রাখছিল। একা সোমত্ত মেয়ে রাতের সাধারণ কামরায় বিরল তো বটেই, তবে তার চেয়েও বেশি যেটা ওই চোখগুলোকে আকর্ষণ করছিল, সেটা হল মেয়েটার গলায় ট্রেনের দুলুনিতে মৃদুমন্দ দুলতে থাকা খাঁটি সোনার হারটা। টি-শার্টের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

লোকতিনটে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। যখন বুঝল মেয়েটা অকাতরে ঘুমোচ্ছে, ক্লান্ত চোখদুটো একদম বোজা, নিঃশ্বাস পড়ছে একলয়ে, তখন একজন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।

মেয়েটা বসেছিল লোয়ার বার্থের একদম কোণায়। লোকটা কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বাথরুম যেতে যেতে একটুও না ঝুঁকে অভিজ্ঞ হাতটা রাখল মেয়েটার গলায়।

কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড। তারপরেই টান মেরে ছিঁড়ে নিল হারটা।

পরিকল্পনাটা ছিল, লোকটা হারটা ছিনিয়ে নিয়েই বাথরুমের দিকে চলে যাবে, আর সেটা মেয়েটা বা অন্য কেউ দেখে ফেলার আগেই বাকি দুজন গিয়ে পরিস্থিতি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে।

কিন্তু প্ল্যানমাফিক ব্যাপারটা এগোল না। মেয়েটার গলা থেকে হারটা ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল, মুহূর্তে কি হচ্ছে বুঝতে পেরে হাত দিয়ে লোকোটার কাছ থেকে হারটা টানতে শুরু করল মেয়েটা।

মুশকো লোকটা পরিস্তিহিত বেগতিক দেখে সেই অবস্থাতেই টানতে টানতে বাথরুমের দিকে চলল। বাকি দুজন লোকও এগিয়ে আসতে লাগল। মেয়েটাও ছাড়ার বান্দা নয়, এই হারটা তার সর্বস্ব, সে হ্যাচড়াতে হ্যাচড়ড়াতে লোকটার সঙ্গে যেতে লাগল, সঙ্গে মুখে চিৎকার করতে লাগল, “চোর! চোর! বচাইয়ে মুঝে!”

অদ্ভুত ব্যাপার! মেয়েটার তারস্বরে চিৎকারে যারা জেগেছিল তারা তো সচকিত হয়ে উঠলই, কামরায় যারা ঘুমোচ্ছিল, তারাও ধড়মড়িয়ে উঠল। কিন্তু তিনটে লোকের সঙ্গে একটা মেয়ে একা লড়ে যাচ্ছে দেখেও তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তারা শুধু নিজেদের চোখগুল দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দৃশ্যটা গিলতে লাগল।

একজনও এগিয়ে এল না।

ওদিকে মেয়েটা লোকতিনটের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে বাথরুমের আগের ফাঁকা জায়গাটায় এসে পড়েছে। ট্রেন ততক্ষণে বেরিলির কাছাকাছি এসে গেছে, হু হু করে হাওয়া ঢুকছে খোলা দরজা দিয়ে।

মেয়েটার হাতদুটো মুচড়ে ধরেছিল একটা লোক, সেই অবস্থাতেই একটা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে প্রাণপণে ঘুষি চালাল লোকটার মুখে। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় লোকটা ওর পেটে প্রচণ্ড জোরে হাত দিয়ে আঘাত করল। আঘাতের তীব্রতায় মেয়েটার নাকমুখ কুঁচকে গেলেও সে ততক্ষণে দাঁত বসিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছে তৃতীয় লোকটার হাত, চামড়া ছিঁড়ে মাংস দেখা যাচ্ছে সেখানে।

মিনিটতিনেকের মধ্যেই লোকগুলো প্রমাদ গুণল। বেরিলি ষ্টেশন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢুকবে ট্রেন, এই মেয়ে তো সহজে ছাড়ার বান্দা নয়! এত কিল-চড়-ঘুসিতেও ঠাণ্ডা হচ্ছে না!

লোকতিনটে একঝলক নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল, তারপর চোখ বুলিয়ে কামরার ভেতরের দিকে। সেখানে তখনো অন্তত তিরিশজোড়া চোখ এদিকে উৎসুক নয়নে চেয়ে আছে, কিন্তু কারুর কোন বক্তব্য নেই। নাহ, এদের নিয়ে চাপ নেই।

যে লোকটা হারটা প্রথম ছিঁড়তে গিয়েছিল, সে নিজের ঠোঁটটা চেটে নিল একবার, মেয়েটার দুটো হাতই পেছন দিকে চেপে ধরা আছে, তবু সে পা দিয়ে লাথি কষিয়ে যাচ্ছে।

প্রথম লোকটা ইশারা করতেই প্রায় আলোর গতিতে লোক তিনটে গিয়ে গেল দরজার দিকে, তারপর হু হু গতিতে ছুটতে থাকা ট্রেন থেকে পোড়া সিগারেটের টুকরো ফেলার মত ছুঁড়ে ফেলে দিল বাইশ বছরের জাতীয় স্তরে ভলিবল খেলা মেয়েটাকে।

মুহূর্তে একরাশ কালো শূন্যতা। অন্ধকার হয়ে গেল একটা সোনালী ভবিষ্যৎ। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল অনেক স্বপ্ন।

মেয়েটা ছিটকে পড়ল পাশের রেললাইনের ট্র্যাকে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিয়তির টানে সেই লাইনে ছুটে এল আরেকটা ট্রেন। ওর বাঁ পা’টা ট্রেন থেকে পড়ে আগেই ভেঙে গিয়েছিল, এবার তার ওপর ট্রেন ছুটে গিয়ে বড় থেকে ছোট, সবরকম হাড়গুলোকে ধুলোর মত গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিল। তলপেটে আগে থেকেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল, এখন প্রচণ্ড আঘাতে চিড় ধরল তলপেটের নীচের হাড়গুলোতেও। কোমরের প্রধান হাড়টাও মড়মড়িয়ে ভেঙে গেল।

অমানুষিক কষ্ট সহ্য করতে করতে মেয়েটা জ্ঞান হারাল।

কি ভাবছেন? কষ্টে মুচড়ে উঠছে মন? রাগ হচ্ছে কামরার নীরব দর্শকগুলোর প্রতি?

দাঁড়ান। গল্প এখনো শেষ হয়নি।

কাট-টু।

২০১১ থেকে এবার সোজা চলে আসুন ২০১৯ সালের ৪ঠা জানুয়ারি। হ্যাঁ হ্যাঁ, মাত্র গতকালই। গতকাল সেই মেয়েটা অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসন জয় করেছে। বিশ্বের প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউইটি হিসেবে।




হ্যাঁ, এই ভারতকন্যার নাম অরুনিমা সিনহা।

অরুণিমা ২০১৩ সালেই মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ফেলেছে, তার একটা পা প্রোস্থেটিক, অর্থাৎ অ্যাম্পিউট করা। আর বাকি শরীরটা অজস্র জায়গায় ভাঙা।

একটা রাতের মধ্যে সে যখন জাতীয় স্তরের খেলোয়াড় থেকে প্রতিবন্ধীতে পরিণত হয়েছিল, আশপাশের মানুষগুলর চোখে ফুটে উঠেছিল বেদনা, হতাশা।

আহা! এমন মেয়েটা শেষ হয়ে গেল!

সেই করুণা অরুণিমা নিতে পারেনি। সে কারুর করুণার পাত্রী নয়। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর মাসকয়েক হাসপাতালে থেকে সে যখন ছাড়া পেয়েছিল, তারপর থেকেই শুরু করে দিয়েছিল বিরামহীন ট্রেনিং। মাত্র দুইবছরের মধ্যে প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউটি হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে সে চমকে দিয়েছিল সবাইকে।

সঙ্গে সে এই ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যেই শুরু করে দিয়েছে নিজের সংস্থা অরুণিমা ফাউন্ডেশন যারা দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলায় প্রেরণা জোগায়, সাহায্য করে। ২০১৫ সালে সে পেয়েছে পদ্মশ্রী, সংবর্ধিত হয়েছে দেশেবিদেশে।

গতকাল অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসন জয় করার পর সে জানিয়েছে পৃথিবীর সব উঁচু শৃঙ্গগুলো সে জয় করতে চায়। চূড়ায় উঠে সে বলতে চায়, “দ্যাখো আই এম অন দ্য টপ!"

সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায় হতাশা, অসম্ভব, শেষের মত শব্দগুলোকে। পাল্টে দিতে চায় সেই মানুষগুলোর ধারণাকে যারা ভেবেছিলেন ও চিরকালের মত শেষ হয়ে গেছে।

আসুন মন থেকে শুভেচ্ছা জানাই, গর্বিত হই এই ভারতীয়ের জন্য।

এই জয় সে উৎসর্গ করেছে তার সবচেয়ে শ্রদ্ধার ব্যক্তিত্ব স্বামী বিবেকানন্দকে।

বিনোদন জগতের সামান্য মুচমুচে খবরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি, কিন্তু এই ধরণের সত্যিকারের হিরোদের আমরা কজন চিনি? কজন জানি?

অরুণিমা-র মত হিরো আরো উঠে আসুক, সমস্ত নেগেটিভিটিকে হেলায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে জয় করুক তারা স্বপ্ন, এমনই আশা রইল।

যারা প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রামে, পরীক্ষায়, বা সামাজিক সমস্যায় হতাশ হয়ে পড়েন, তাঁদের মনেও কিন্তু কোন এককোণে অরুণিমা সিনহা লুকিয়ে রয়েছে।

দরকার শুধু তাকে মন থেকে বের করে আনার!

#দেবারতি_মুখোপাধ্যায়"

Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৮

কালীমহারাজ ( স্বামী অভেদানন্দ )

তাঁহার পিতার নাম রসিকলাল, মাতার নাম নয়নতারা দেবী। নয়নতারা দেবী মা কালীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যে এমন একটি পুত্র সন্তানের যিঁনি ধার্মিক ও সাধু হবেন। এর পরেই ১৮৬৬ সালে ২ অক্টোবর ( বাংলা ১২৭৩ , ১৭ আশ্বিন, কৃষ্ণা নবমী ) স্বামী অভেদানন্দ জী মহারাজের জন্ম হয়। নয়নতারা দেবীর বিশ্বাস ছিলো মা কালীর কৃপাতেই এই নবজাতকের আগমন হয়েছিলো। মা নয়নতারা দেবী পুত্রের নাম রেখেছিলেন কালীপ্রসাদ। কালীপ্রসাদ বাল্যকাল হতেই সংস্কৃতে অগাধ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। সম্ভবত ১৮৮৪ সালে তিঁনি পদব্রজে দক্ষিণেশ্বরে যান। সেখানে গিয়ে শোনেন ঠাকুর কলকাতায় গেছেন, রাত্রে আসবেন। অগ্যতা সেখানেই অপেক্ষা শুরু। এই সময় সেদিনই আর এক যুবক সেখানে আসেন। উত্তরকালে ইনি ঠাকুরের ত্যাগী সন্ন্যাসী শিষ্য স্বামী রামকৃষ্ণানন্দজী মহারাজ । রাত্রি নয়টার দিকে ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে আসলেন। ঠাকুরের কাছে নিজ পরিচয় দিয়ে কালীমহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন- "আমার যোগসাধনার ইচ্ছা আছে, আপনি শিখাবেন কি?" পরমহংস দেব কিছুকাল মৌন থেকে বললেন- "তোমার এই বয়সেই যোগ শিক্ষার ইচ্ছা হয়েছে- এ অতি ভালো লক্ষণ। তুমি পূর্বজন্মে যোগী ছিলে। কিন্তু তোমার একটু বাকী ছিলো। এই তোমার শেষ জন্ম। আমি তোমায় যোগ শিক্ষা দেবো । আজ বিশ্রাম করো ; কাল এসো।"


এরপর কালীমহারাজ ঠাকুরের কাছে গেলে , ঠাকুর তাঁর জিহ্বাতে কোনো মন্ত্র লেখে দেন। কালীপ্রসাদ মহারাজ এরপর গভীর ধ্যানে মগ্ন হন। ধ্যানে তাঁর অনেক দেব দেবী দর্শন হয়েছিলো। আর মধ্যে দেখেছিলেন ঠাকুরকে। দেখলেন সব দেব দেবী একত্রে ঠাকুরের দেহে মিলে গেলো। এই ঘটনা তিঁনি ঠাকুরকে বলেছিলেন। ঠাকুর বললেন- "তোর বৈকুণ্ঠদর্শন হয়ে গেল; এখন হতে তুই অরূপের ঘরে উঠলি। আর রূপ দেখতে পাবি না।"ঠাকুরের দেহত্যাগের পর যে সকল ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, তিনি তাঁহাদের মধ্যে একজন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং কঠোরতার সহিত ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক পঠন-পাঠনে নিমগ্ন থাকিতেন। গুরুভ্রাতাগণের নিকট তিনি ছিলেন ‘কালী তপস্বী’।

কালীপ্রসাদ ভারতের সমস্ত তীর্থক্ষেত্র পদব্রজে পরিদর্শন করেন। ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইংল্যাণ্ডের Christo-Theosophical Society-তে ধর্মবিষয়ে বক্তৃতা দেন। ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে তিনি আমেরিকায় ‘বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করেন এবং ১৯২১ সাল পর্যন্ত সেখানে বেদান্ত প্রচার করিতে থাকেন। এইসময় তিনি পাশ্চাত্যের বহুদেশে যান এবং বহু খ্যাতিমান লোকের সহিত মতবিনিময় করেন। প্রেততত্ত্ববিদ হিসাবেও তিনি বিদেশে খ্যাতিলাভ করেন। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ফিরিয়া তিনি ‘রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করেন। এই ‘সোসাইটি’র মাধ্যমে এবং তাঁহার প্রকাশিত “বিশ্ববাণী” পত্রিকার মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী ও ভাবধারাকে দিকে দিকে প্রচার করেন । ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি দার্জিলিঙ-এ ‘রামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন । ১৯৩৭ সালে ঠাকুরের জন্মশতবার্শিকী উপলক্ষে কলিকাতা টাউন হলে আয়োজিত ধর্মসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে ৮ সেপ্টেম্বর তিঁনি দেহ রাখেন। ভারতবর্ষ ও বিদেশে বেদান্তবাদ প্রচারে তাঁর ভূমিকা অনেক। কালীপ্রসাদ রচিত কয়েকটি গ্রন্থ: আমার জীবনকথা, কাশ্মীর ও তিব্বতে, পুনর্জন্মবাদ, বেদান্তবাণী, ব্রহ্মবিজ্ঞান, মরণের পারে, যোগশিক্ষা, সমাজ ও ধর্ম, হিন্দু ধর্মে নারীর স্থান, শ্রীরামকৃষ্ণ স্তোত্র রত্নাকর ইত্যাদি। জন্মতিথিতে প্রণাম জানাই।
Share:

স্বামী অভেদানন্দ

কাশীপুরের বাগানে অবস্থানকালে পাশ্চাত্য- বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান , পাশ্চাত্য ন্যায় ও দর্শন প্রভৃতি পড়িবার বাসনা আমার অন্তরে বলবতী হইল। নাট্যাচার্য্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ ‘সায়েন্স- এ্যাসেসিয়শন’ – এ ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের বক্তৃতা শুনিতে যান জানিতে পারিয়া আমিও কাশীপুর হইতে পদব্রজে বৌবাজারে তথায় কয়েকবার গিয়েছিলাম। ক্রমে বিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতি পড়িবার ইচ্ছা আমার পূর্ণ হইয়াছিল। আমি পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানাদি শাস্ত্রে ব্যুৎপন্ন লাভ করিবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পাঠে মনোনিবেশ করিলাম। ক্রমে গ্যানোর পদার্থবিজ্ঞান , হার্সেলের জ্যোতির্বিজ্ঞান , জন স্টুয়ার্ট মিলের তর্কশাস্ত্র ও ধর্মের বক্তৃতাবলী , লুইসের দর্শনের ইতিহাস , হ্যামিল্টনের দর্শন প্রভৃতি গ্রন্থ আয়ত্ত করিলাম। একদিন সেই তর্কশাস্ত্র পড়িবার সময়ে পরমহংসদেব আমায় জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ‘কিরে, কি বই পড়ছিস?’




আমি উত্তর দিলামঃ ‘ইংরাজী ন্যায়শাস্ত্র।’

পরমহংসদেব বলিলেনঃ ‘ওতে কি শেখায়?’

আমি বলিলামঃ ‘এতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমণাসম্বন্ধে তর্ক, যুক্তি ও বিচার শেখায়।’

পরমহংসদেব বলিলেনঃ ‘তুই তো দেখছি এখানে ছেলেদের মধ্যে বই পড়া ঢোকালি। তবে জানিস, বই – পড়া- বিদ্যা কিছু নয়। আপনাকে মারতে গেলে একটা নরুণ দিয়ে মারা যায়, কিন্তু অপরকে মারতে গেলে ঢাল তরোয়াল প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্রের দরকার হয়। বই পড়া তারই জন্য। যারা লোকশিক্ষা দেবে তাদের পড়ার দরকার আছে।’

এই বলিয়া তিনি নীরব থাকিলেন, কিন্তু আমাকে বই পড়তে নিষেধ করিলেন না। এখন বুঝিতে পারিতেছি যে, তিনি আমাকে সর্বশাস্ত্রবিশারদ করিয়া ভ্যবিষতে প্রচারকার্যে নিযুক্ত করিবেন – সেইজন্য আমাকে বই পড়িতে নিষেধ করেন নাই। তীক্ষ্ণবুদ্ধির প্রভাবে আমি সকলেরই প্রশংসা অর্জন করিয়াছিলাম । নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে মাঝে মাঝে তুমুল তর্ক করিতাম । আমার বুদ্ধির প্রশংসা করিয়া একদিন পরমহংসদেব আমায় ডাকিয়া বলিলেনঃ ‘ ছেলেদের মধ্যে তুইও বুদ্ধিমান। নরেনের নীচেই তোর বুদ্ধি। নরেন যেমন একটা মত চালাতে পারে, তুইও সে রকম পারবি।’

( আমার জীবনকথা ১ম খণ্ড ... স্বামী অভেদানন্দ... শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ )
Share:

২৯ ডিসেম্বর ২০১৭

শিক্ষাবিদ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিশারদ, সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা যোগেশচন্দ্র ঘোষ



''খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি''

মানুষকে রোগ থেকে স্বল্প মূল্যে মুক্তি দিতে এক রসায়নবিদ ও পাশ্চাত্যে বিদ্যাপ্রাপ্ত চিকিৎসক দেশীয় গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরির কাজে আত্মনিয়োজিত হন । নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তিনি ১৯১৪ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গেন্ডারিয়ায় ৭১ দীননাথ সেন রোডে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। শত বছরের ঐতিহ্যস্নাত প্রতিষ্ঠান সাধনা ঔষধালয় উপমহাদেশের আধুনিক আয়ুর্বেদ ঔষধালয়ের অন্যতম পথিকৃৎ এক প্রতিষ্ঠান, এর শেকড় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়ায় হলেও তা একসময় ডানা মেলেছিল চীনসহ ইউরোপ-আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে। বিপুল সাফল্যের কারনে এক সময় চীন ও উত্তর আমেরিকায় সাধনা ঔষধালয়ের শাখা বা এজেন্সী ছিল ।

ভারতবর্ষে আয়ুর্বেদের ইতিহাস ৫ হাজার বছরের পুরনো হলেও এ শাস্ত্রের প্রথম লিখিত বই ‘চরক সংহিতা’। বইটির রচয়িতা চরকের জন্ম ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সংস্কৃতে লিখিত বইটি অনূদিত হয়েছে ল্যাটিন, আরবি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায়। আজ থেকে হাজার বছর আগে যখন আজকের পাশ্চাত্যে হাসপাতালের ধারণা ছিল না, তখন এখানে আয়ুর্বেদের বেশ কয়েকটি আরোগ্যশালার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয়, আয়ুর্বেদ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারপর হাজার বছরের পথপরিক্রমায় আয়ুর্বেদের জনপ্রিয়তা যখন ক্ষীণ হয়ে এসেছিল, তখন একে পুনরুজ্জীবন করতে নেমেছিলেন পাশ্চাত্য প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ।

শিক্ষাবিদ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিশারদ, সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ১৮৮৭ সালে মাদারীপুর গোঁসাইরহাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯০২ সালে ঢাকা জুবিলী স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ, ১৯০৬ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে এমএ পাস করেন।

স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি স্বদেশীকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকান্ডের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তাঁর বন্ধুদের অনেকেই তখন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি সরাসরি এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে পড়ার সময়ে সেখানে শিক্ষক হিসেবে পান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে। প্রফুল্লচন্দ্র রায়ই তাঁকে দেশজ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগানোর জন্য ব্যাপক উৎসাহিত করেন।

১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইংল্যান্ড চলে যান। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি-বাকরি নিয়ে বেশ স্বচ্ছন্দেই জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে দেশে ফিরে আসেন।

১৯০৮ সালে দেশে ফিরেই যোগেশচন্দ্র ঘোষ যোগ দেন ভাগলপুর কলেজে। সেখানে একটানা চার বছর রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে গৌরবের সঙ্গে কাজ করেন। পরে চলে আসেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। ১৯১২ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর তিনি জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তাঁর চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজকেও একই গতিতে এগিয়ে নিয়ে যান।

১৯১৪ সালে নিজের প্রতিষ্ঠিত সাধনা ঔষধলায় পরিচালনার কাজে তার নিরলস গবেষণা এ দেশে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতি ও আয়ুর্বেদ ওষুধ প্রস্তুত প্রণালিকে আধুনিক মানে উন্নীত করেছিল । তিনি আয়ুর্বেদ শাস্ত্র সম্পর্কিত বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তার গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘অগ্নিমান্দ্য ও কোষ্ঠবদ্ধ’, ‘আরোগ্যের পথ’, ‘গ্রহ-চিকিৎসা’, ‘চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি’, ‘চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা ও মুখরোগ চিকিৎসা’, ‘আমরা কোন পথে’, ‘আয়ুর্বেদ ইতিহাস Whither Bound Are We I Home Treatment ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৯১১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটির ফেলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেমিক্যাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে এদেশের বহু হিন্দু পরিবার ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ ফেলে দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে যায়; অনেক মুসলিম পরিবার বাংলাদেশে চলে আসে, কিন্তু যোগেশচন্দ্র ঘোষ তা করেননি। তিনি দেশের মায়ায় বাঁধা পড়ে এখানেই থেকে যান। বারবার তাঁর জীবনে নানা দুঃসময় এসেছে, তবু কেউ তাঁকে নিজ দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি। ১৯৬৪ সালে যখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার শহর হিসেবে ঢাকার কুখ্যাতি ছড়িয়েছে, তখনও নির্দ্বিধায় সব সঙ্কট মোকাবিলা করেছেন তিনি।

সাংবাদিকদের কাছে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আসিফ সিরাজ নামে এক ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন, ''সেই দুর্যোগকালে আমরা তাঁর কাছে ছুটে যাই তাঁর সাহায্যের আশায়। তিনি আমাদের বিমুখ করেননি। তাঁর সাধনা ঔষধালয়ের বিরাট লৌহকপাট খুলে দেন। গেন্ডারিয়া, দনিয়া ও শনিরআখড়ার ভীতসন্ত্রস্ত হিন্দু পরিবার তাঁর কারখানায় নিশ্চিন্তে আশ্রয় পায়, বেঁচে যায়।

দারোয়ানরা বন্দুক হাতে পাহাড়া দিতেন, আর আমরা ছেলেরা রাস্তায় লাঠি-হকিস্টিক নিয়ে এবং কারখানার ভেতরে হামলা হলে তিনি দারোয়ানদের গুলি চালানোর হুকুম দেয়ায় রায়টকারীরা হামলা করার সাহস পায়নি। এখন ভাবি, কারখানার নিরাপত্তা, লুটপাটের কথা ভেবে তিনি তো আমাদের ফিরিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, আর এখানেই তাঁর মহানুভবতা, মানবতাবোধ। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। এমন মানুষকেও মরে যেতে হয় হায়েনাদের হাতে। গেন্ডারিয়ার এমন কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন নেই, যারা তাঁর কাছ থেকে কমবেশি আর্থিক সহযোগিতা পায়নি।’'

পঁচিশে মার্চ ১৯৭১। পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার অনেকেই এরই মধ্যে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। পুরো এলাকায় বাড়ি আর কারখানা মিলিয়ে চৌহদ্দিতে কেবল যোগেশচন্দ্র ঘোষ থেকে গেলেন। বিরাট এলাকাজুড়ে তাঁর একমাত্র সাধনাস্থল সাধনা ঔষধালয় কারখানা। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়, করেছেন গবেষণা। এখানকার একেকটা ইটে আছে তাঁর মমতার ছোঁয়া! নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সাথীরা কারখানার শ্রমিকরা।

সবাই যখন কাজ সেরে ফিরে যেত তখন কেবল থাকতেন সুরুজ মিয়া এবং রামপাল। সুরুজ মিয়া এবং রামপাল কারখানার দারোয়ান। তাঁরা দীর্ঘ ১৭ বছর যোগেশচন্দ্রের সঙ্গে কাটিয়েছে। ২৫ শে মার্চের পর সবাই যখন একে একে চলে গেল, গেলেন না কেবল এই ২ জন ! ২৫ শে মার্চের পরের ঘটনা। ৩ এপ্রিল গভীর রাত। একটি মিলিটারী জীপ এসে থামলো। ৫/৬ জন পাকিস্তানী সৈনিক জীপ থেকে নামলো। একে একে গেটের তালা ভেঙ্গে ফেললো তারা। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লো।

পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠেছিল । সেনাদের দিকে তাক করে তিনিও গুলি ছোড়া শুরু করলেন। শুরু হলো অসম যুদ্ধ। সামান্য অস্ত্র, সামান্যতম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী একজন সাধারণ বাঙ্গালী সুরুজ মিয়া পাহারাদারের কাছে হার মানলো পাকিস্তানী সৈন্যরা। রাতের আধারে পাক সেনারা একপ্রকার পালিয়ে গেল। সুরুজ মিয়া যোগেশ চন্দ্রকে বললেন সেখান পালিয়ে যেতে। যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এই সব ছেড়ে আমি কোথায় যাবো ?

পাকিস্তানী আর্মি আবারও ফিরে এলো, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং লোকবল নিয়ে। পাক সেনারা নীচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করালো। পরে যোগেশচন্দ্র ঘোষকে উপরে নিয়ে গেল, পাকিস্তানী সেনারা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে, বুলেটের গুলিতে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে । তাদের উল্লাসধ্বনি নীচে পর্যন্ত ভেসে আসছিল, নীচের লোকজন সুযোগ বুঝে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। জানা যায়, পাকিস্তানি আর্মিরা শুধু তাঁকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ চন্দ্র ঘোষের অর্জিত অনেক অর্থ-সম্পদ। সেদিন ছিল ৪ এপ্রিল। তখন যোগেনচন্দ্র ঘোষের বয়স ৮৪ বছর ।

অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ পরিবারের সদস্যের মতোই আপন করে নিতেন। শেষের দিকে খুব বেশি একটা বাইরে বেরোতেন না, শুধু নিজের পড়াশোনা আর গবেষণা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, সকাল-বিকাল ঘরের সামনের খোলা ছাদে পায়চারি করতেন। প্রতিদিন ঘণ্টাখানেকের জন্য নিচে নেমে আসতেন; রোগী দেখতেন; ব্যবস্থাপত্র দিতেন। এছাড়া অফিস ও কারখানার কাজকর্ম তদারকি করতেন এবং ‘সাধনার বাঁদর’ বলে খ্যাত কুঠুরি মৃগয়াদের খাদ্য খাওয়াতেন। এই ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিন।

অধ্যক্ষ ডা. যোগেশচন্দ্র ঘোষ নিজের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশজ মানুষের সংযোগের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘'ব্যক্তিগত কল্যাণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া দেশের বৃহত্তম কল্যাণ কামনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিলে সেই প্রতিষ্ঠান দেশেরও প্রিয় হয়। সিংহ যখন জাগে, তখন তাহার স্বপ্ন, তন্দ্রা এবং নিদ্রা যায় না, তাহার সিংহত্ব জাগে। জাতি যখন জাগে, তখন সকল দিক দিয়াই জাগে। একার চেষ্টাতে জাগে না, সকলের চেষ্টাতেই জাগে। সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি লইয়া দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হউক, এই কামনা প্রতিদিনের কামনা। সুতরাং জনসাধারণ সাধনা ঔষধালয়কে তাঁহাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলিয়া গণ্য করিবেন না কেন ?'’

(C) Ashish Roy
Share:

১৭ নভেম্বর ২০১৭

স্বামী প্রণবানন্দ ব্রহ্মচারীর বীরভাবাপন্ন নমশূদ্র শ্রেনীকে বিরাট হিন্দুসমাজের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে দেন ।

নমশূদ্র সমাজ উচ্চবর্ণের হিন্দুর নিকট অবহেলিত , ঘৃণিত উপেক্ষিত । এরা ছিল অত্যন্ত সাহসী ও বীরভাবাপন্ন । চাষবাসে দক্ষ, লাঠি , ঢাল, সড়কী খেলায় ওস্তাদ । স্বামী প্রণবানন্দ ব্রহ্মচারী সেই নমশূদ্র শ্রেনীকে বিরাট হিন্দুসমাজের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে তাদেরকে আমন্ত্রণ করে নানাভাবে উৎসাহিত করতে লাগলেন। সর্বসাধারণের সহিত এক লাইনে বসিয়ে খাওয়ানো, যাত্রাগান শিক্ষা, কৃষ্ণলীলা , বিভিন্ন পৌরাণিক যাত্রার বই তাদের মধ্যে প্রচলণ করে তাদেরকে হিন্দুভাবে অনুপ্রাণিত করতে লাগলেন । নৌকা বাওয়া, ঢাল সড়কী খেলার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের মধ্যে বীরত্বের ভাব জাগিয়ে তুলতে লাগলেন । সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারীগণকে তাদের বাড়ী পাঠাতেন । ব্রহ্মচারী দিগদের মধ্যে কেহ কেহ পূর্ব সংস্কার বশত আপত্তির সুরে বলতেন যে, “নমশূদ্রদের বাড়িতে কি যাওয়া যায় ? ওখানে কি খাওয়া যায় ? কি করে রুচী হবে ইত্যাদি।”

তখন পতিত পাবন শ্রীঠাকুর কম্বুকণ্ঠে গর্জন করে উঠতেন। বলতেন- “কেন ওরা কি মানুষ না ? ওরা কি কারো থেকে পরিষ্কার কম থাকে ? উচ্চবর্ণের হিন্দু থেকেও সর্ববিষয়ে নিষ্ঠা সম্পন্ন ওরা । আমি নিজে ওদের হাতে খাই । ওদের ঘৃণা করবার কি আছে ? এত বড় একটা নমশূদ্র সমাজকে আমরা এই হিন্দুসমাজ থেকে বাদ দিয়ে চলব ? এ আমাদের সমাজের মহাপাপ । এতবড় একটা ক্ষত্রিয় জাতিকে বাদ দিয়ে হিন্দুসমাজ দাঁড়াবে কোথায় ? মানুষ মানুষকে ঘৃণা করবার কি আছে ? বড় যে, সে যদি ছোটকে তার দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করে তাকে সৎ আচার বিচার শিক্ষা দিয়ে উঠিয়ে নিতে না পারল তবে বড়র মহত্ত্ব কোথায় ? শুধু বড় বলিলেই কি সে বড় হয়ে যায় ? তার গুণ থাকা চাই। আমি কি কাহাকেও ভুল পথ দেখাতে পারি ? আমি আজ যে পথ দেখাচ্ছি তাই-ই অভ্রান্ত পথ । সময় হইলে তখন নিজেরা বুঝবে, ভবিষ্যতে গুরুতর বিপদ আসছে। যার জ্ঞান আছে সে বুঝবে।”

শ্রীশ্রী আচার্যদেবের দর্শনে এসে নমশূদ্র সর্দারগণ তাঁকে প্রণাম করলে তিনি তাদের সকলকে বসতে আদেশ করলেন । এত স্নেহ, ভালোবাসা, এমন প্রাণ জুড়ানো মধুর বাণী তারা যেন কোথাও পায়নি । শুধু উচ্চবর্ণের হিন্দুর কাছে কেন, এমন আদর দরদ তারা জীবনে কখনও অনুভব করেনি কোথাও । তখন লীগ মন্ত্রীসভার শাসন । সবদিক দিয়ে হিন্দুরা কোণঠাসা । যুক্তবাংলার সেদিন সর্বত্র হিন্দুরা নির্যাতিত। লীগ নমশূদ্র নেতাকে মন্ত্রীসভায় এনে নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মনোবল আকর্ষণ করিতেছে । পতিতপাবন শ্রীঠাকুর সেদিন হিন্দুসমাজকে এই ঘোরতর বিপদ হতে উদ্ধার করলেন। উচ্চবর্ণের মধ্যে একসময় রব উঠেছিল যে “আচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী উচ্চবর্ণের হিন্দু ও নমশূদ্রদের একত্রে বসিয়ে জাতিচ্যুত করেছেন।” পরে যখন উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাঁর আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও ভাব বুঝতে পারল তখন সেই ক্ষণিকের গুঞ্জন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ।

( শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবমধুর লীলাপ্রসঙ্গ- স্বামী অরূপানন্দ )
Share:

১৫ অক্টোবর ২০১৭

মীরা বাঈ কে! তাকে নিয়েই বা এত আরাধনা কেন! জল্পনা-কল্পনাই বা কেন?

মীরা  বাঈের বাড়ি রাজস্থান। মীরা  বাঈের বাবা যোধপুরের প্রতিষ্ঠাতা সম্মানিত এবং প্রতাপশালী রতন সিং। গ্রামে একদিন এক সন্ন্যাসী ঘন সবুজ অরণ্যের ভেতর থেকে আর্বিভূত হলেন। রতন সিং এর কার্যকলাপে খুশী হয়ে তিনি তাকে একটি কৃষ্ণের মূর্তি উপহার দিলেন। ছোট খাট এই মূর্তিটি গাড় নীল- মাথার চারিদিকে সোনালী আরও বিভিন্ন রঙ এর ছটা। রঙ এবং ছোটখাট গঠনের জন্য মূর্তিটি খুব গভীর লাগে। মীরার বয়স তখন মাত্র তিন বছর। কৃষ্ণের এই মূর্তি নিজের অধিকারে পাবার জন্য মীরা  বাঈ অনুরোধের পাশাপাশী কান্না-কাটি জুড়ে দিল।

ছোট্ট মীরার কাছে কৃষ্ণের অবহেলা হতে পারে ভেবে তার বাবা কিছুতেই তাকে তা দিতে রাজি হলেন না। কিন্তু মীরার যে তা লাগবেই- সে যেন নাছোড়াবান্দা! একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তার বাবা সেটি তাকে দিয়ে দিলেন। এরপর থেকেই কৃষ্ণ হয়ে উঠলো মীরার পরম বন্ধু। সে সারাদিন কৃষ্ণের সাথে কথা বলে, সময় কাটায়। কৃষ্ণ সম্পর্কে যেকোনো গল্পের প্রতি মীরার তীব্র কামনা। ধীরে ধীরে কৃষ্ণ হয়ে উঠল মীরার প্রেমিক। মীরা কৃষ্ণকে হরি বলে ডাকতো- তাকে ভেবে এমন গান লিখতো যেগুলো ‘ভজন’ নামে পরিচিত।

শ্রীকৃষ্ণ দুজন নারীকে ভয়ানক রকম পাগলিনী করেছিলেন। এর মধ্যে একজন বাংলার রাধা, আরেকজন এই রাজস্থানের মীরা বাঈ।  মীরা বাঈ খুবই ঐতিহাসিকভাবে সত্য একজন নারী যে কৃষ্ণপ্রেমে উজাড় হয়ে ছিলেন সারাটা জীবন।
আজ থেকে কম করে হলেও ৫০০ বছর আগের এই ঘটনা বহুদিন পর্যন্ত মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থেকেছে। মীরা প্রায় চার হাজার ভজন রচনা করেছিলেন। ভারতের পথে পথে এমনকি বাংলাদেশের রাস্তায়ও এগুলো এখনো শোনা যায়। তাছাড়া ইউটিউবে অনেক মীরার ভজন পাবেন। কি চমৎকার সুরেলা আর লিরিকের প্রচণ্ড আবেদন।

একদিন মীরা আর তার মা সময় কাটাচ্ছিল। মায়ের সাথে পুতুলের বিয়ে-পুতুলের বিয়ে খেলতে মীরার বিষয়টা খুব চমৎকার লাগল। ও আগ্রহ নিয়ে মাকে বলল, “মা, আমার স্বামী কে হবে?” মা খুব একটা অবাক হলেন না। তখন ৯-১০ বছরেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। তখন অল্প বয়সে বিয়ে ভাবনা এখনকার মতো এরকম লজ্জাকর নয়। মা বললেন, “তোমার তো স্বামী আছেই, কৃষ্ণ তোমার স্বামী।”
এরপর থেকেই কৃষ্ণের প্রতি মীরার ভাব বদলাতে লাগল। একথাটাই হয়তো মীরাকে সাবালিকা করেছিল। কিছুদিন পরে মাত্র আট বছর বয়সে মীরার একবার বিয়ে হয়ে গেল মেওয়ারের রাজার সঙ্গে। সে বিবাহের কারণটি ছিল রাজনৈতিক। শেষ পর্যন্ত, সে বিয়ে টেকেনি। মীরা সাবালিকা হতে থাকল।

খুব অল্প বয়সে ভারত বর্ষের হিন্দু মেয়েরা রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি জেনে যায়। বিশেষ করে মথুরা-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের উপাখ্যানটি। আর দশ জনের মতো মীরাও জেনেছিল। কিন্তু মীরার কৃষ্ণের প্রতি যে প্রেম, যে কামনা- তা সে অস্বীকার করতে পারত না। তার মনের মধ্যে ছটফট, সারা দিন শুধু কৃষ্ণের ভাবনা। সে ভজনে ভজনে সুরের তালে জানতে চাইল-

ওরে নীল যমুনার জল
বললে মোরে বল
কোথায় ঘনশ্যাম।

কৃষ্ণের গায়ের রং-কে মীরা ঘনশ্যাম বলেছে। হরি ছাড়াও কৃষ্ণের আরেক নাম শ্যাম। গানে আছে,

শামরে তোমার সনে/শামরে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে আজ (২)
এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলব রে শ্যাম

মীরার মা মারা গেলে মীরা পড়ে গেল জীবনের গভীর জলে। তার বাবা তাকে রাজা ভোজরাজের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। অবশ্য শ্বশুরবাড়ি গিয়েও মীরা কৃষ্ণচর্চা চালিয়ে যেতে লাগল। এই নিয়ে পারিবারিক ঝামেলাও হলো। রাজা ভোজরাজের মা কিছুতেই মীরার এই অতি ‘কৃষ্ণপ্রীতি’ পছন্দ করতে পারছিলেন না, তিনি ভোজরাজের উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছিলেন এই ব্যাপারে। ভোজরাজ প্রথমে অনুরোধ করলেন, কৃষ্ণ ছেড়ে কালীর দিকে মনোযোগ দিতে। মীরার উত্তর,  “আমি তো পারিনা”। ভোজরাজ পরে কঠোর হলেন, অন্যায় করলেন। মীরার একই উত্তর, “আমি যে পারি না”।

মীরার মন-প্রান জুড়ে কৃষ্ণ। কৃষ্ণ বন্দনা। এই গাইছে- এই নাচছে। সারাদিন কৃষ্ণকে ভেবে ভেবে হয় না তার কোন কাজ। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামলেই যখন সবকিছু চুপচাপ হয়ে যায়। নীরব পরিবেশে মনের উপর নিয়ন্ত্রন করা যায় বেশী, তখন গভীর ধ্যানে কৃষ্ণ ভজন না গাইলে যেন শান্তি আসে না মীরার মনে-প্রাণে। মীরা কৃষ্ণকে পুরো মন দিয়ে, সারা দেহ দিয়ে পেতে চাইত। এই ইরোটিক দিকটি মীরার ভজনে (ভক্তিগীতি) এক বিশেষভাবে উঠে আসে। একটা ভজনে মীরা, শ্রোতাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,

“আনন্দের সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে মীরা ওকে অভ্যন্তরে নেয়!”

 প্রচণ্ড সত্যবাদী ছিলেন মীরা বাঈ। ইতিহাসে এরকম বেশী একটা দেখা যায় না। শ্রী কৃষ্ণের প্রতি মীরার টানটা মানসিক। কারণ সে শ্রী কৃষ্ণকে ভালোবেসেছিল। ভারতবর্ষের চিরায়ত ভক্তি দিয়েই মীরা শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবেসেছিল। গানে গানে মীরার মন ভরত।

কথাগুলো শুনতে মজার মনে হলেও মীরার জন্য এসব করা অতটা সহজ ছিল না। শাশুড়ি মীরার নাচ এবং ভজনে বাধা দিতেন। কয়েকদিন বাকযুদ্ধ চলল। পরে শুরু হল ধারাবাহিক নির্যাতন। ক্রমাগত নির্যাতন।

এদিকে পথে পথে ছড়িয়ে গেছে মীরার গান। মুখে মুখে পৌছে গেছে সে সুর। মীরার জনপ্রিয়তা বাড়ল এবং অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বও বাড়ল। ওদিকে নানারকম কুৎসা রটনা হল তার নামে। চরিত্রকে নষ্টা মেয়ে হিসাবে উপস্থাপন করা হলো। তাতে অবশ্য মীরার কিছু গেলো-আসলো না। মীরাকে দমাবে সাধ্য কার! মীরা ঘোষনা দিল ‘মীরা মীরাকে কৃষ্ণের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছে’। বাইজেন্টাইন সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার মতো মীরাকেও সাপ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে মারার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু মীরাকে ‘শেষ করে দেয়া’ সম্ভব হলো না।

উত্তর ভারত ছাড়িয়ে মধ্য ভারতে পৌছে গেল মীরার ভজন। তার খ্যাতি মোগল সম্রাট আকবর পর্যন্ত পৌছে গেল এবং ফলাফলে আকবরও তার কাছে পৌছালেন; এরকম ‘সংশয়ী ইতিহাস’ পাওয়া যায়। নানান শত্রুতার ঝুট ঝামেলা পেরিয়ে আকবর মীরার এলাকায় আসলেন। রাজপোশাক ছেড়ে ভিক্ষুক বেশে তানসেনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন মীরা বাইয়ের বাড়ির দিকে।

আকবর উপহার দিলেন মীরাকে। আকবরের আসা নিয়ে, উপহার দেয়া নিয়ে, স্বামীর সাথে কাটাকাটি হল মীরার। জাত-পাতের ব্যাপার ছিল তখনকার ধর্মে। মীরার স্বামী মীরাকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা যেতে বললেন। প্রথমে মীরা রাজী হল, নদীর দিকে গেল। মীরার যা স্বভাব- একটু পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে সাথে কিছু ভক্ত নিয়ে সোজা বিন্দাবনের দিকে হাঁটা ধরল।

তারপরে সেখানের মন্দিরে থেকেই কৃষ্ণ ভক্তি করতে থাকল সে। ওর সর্বাধিক গান এখানে বসেই লেখা। মন্দিরে নিশ্চয়ই মীরা সঠিক সুযোগ পেয়েছিল- পেয়েছিল যথেষ্ট স্বাধীনতা। মন ভরে কৃষ্ণনাম জব করতে পেরেছে সে। কৃষ্ণের মূর্তির কাছে বিলিয়ে দিতে পেরেছে নিজেকে। কৃষ্ণ যাতে মীরার প্রতিটা নিশ্বাস শুনতে পাক- সেই চেষ্টা করেছে।

গাইতে গাইতে, অধীর, এক চাঁদ জাগা রাতে,
নাচতে নাচতে, মীরা, সকাল করে পৃথিবিতে।

মীরা লিখেছে- ‘আমি সহমরণে যাব না। আমি গান গাইব কৃষ্ণের। আমি সহমরণে যাব না। কেননা আমার হৃদয়ে যে শুধুই হরি নাম অঙ্কিত।’

শেষের বছরগুলোতে সন্ন্যাসীনি হয়ে গুজরাটের দ্বারকায় মীরাকে দেখা গিয়েছিল। ১৫৪৭ সাল থেকে মীরা আর নেই। নানা কাহিনি প্রচলিত মীরাকে নিয়ে। অনেকে বলেন মীরা প্রায় ৫ হাজার গান লিখেছে। যদিও পাওয়া যায় ৪০০-৫০০। মীরাকে নিয়ে শুধু গান নয়, হয়েছে সিনেমা-নাটক-সিরিয়াল। লেখা হয়েছে উপন্যাস-কবিতা। আঁকা হয়েছে মীরা আর কৃষ্ণের হাজার হাজার ছবি। ভারতের অসাধারন কবি গুলজার নিজেই মীরা-কে নিয়ে একটা চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। সেখানে মীরা চরিত্রে অভিনয় করেছে হেমা মালিনী। অসাধারন এই মুভিতে ফুটে উঠেছে মীরার একটা দিক।

By Jubaead Dweep
Share:

২৫ আগস্ট ২০১৭

গুরু নানক

কিছু মহামানবের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদানের কারণেই আজকের এই সমৃদ্ধ মানবজীবন। এই মহামানবেরা আজন্মকাল তাদের চিন্তা ও চেতনা দিয়ে আমাদের জীবন ও জগৎ পরিপূর্ণ করার চেষ্টা করে গেছেন। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান সব শাখাই সমৃদ্ধ হয়েছে এই মহামানবদের হাতে। যাদের মমতার স্পর্শে মানুষে মানুষে রচিত হয়েছে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন। তাদেরই একজন হচ্ছেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক।

ভারতে তখন সুলতানী আমল। পশ্চিম পাঞ্জাবের তালওয়ান্দি (বর্তমান নাম নানকানা সাহেব) গ্রামে থাকতেন মেহেতা কল্যাণ বাই নামে এক সামন্য চাষী। সামান্য কিছু জমিজমা ছিল তার। গাঁয়ের লোক তাকে ডাকত মেহেতা কালু বলে। তার স্থীর নাম ছিল ত্রিপতা। এই ত্রিপতার গর্ভেই ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেছিলন গুরু নানক। ছেলেবেলা থেকেই তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল পিতামাতার। একমাত্র সন্তান। তবু তার সবকিছুই যেন কেমন অদ্ভুত। আত্মভোলার মতো ঘুরে বেড়ান, সাধু-সন্ন্যাসীদের দেখলেই তাদের কাছে ছুটে যান। নির্জনে বসে থাকেন।

বাবা-মা ভেবেছিল লেখাপড়া করলেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। ৬ বছর বয়সে তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো গ্রামের পাঠশালায়। সেখানে মাতৃভাষা ছাড়াও শিখেছিলেন ফার্সি ভাষা। তিনবছর পর সংস্কৃত শিক্ষার জন্য তাকে পাঠানো হলো ব্রিজনাথ শর্মা নামে এক পন্ডিতের কাছে। কিন্ত নানকের পাঠ্যবিষয় বাদ দিয়ে ঈশ্বর, ধর্ম আধ্যাত্নিক বিষয়েই ছিল গভীর আগ্রহ। গতানুগতিক পড়াশুনাতে তার কোনো আগ্রহ নেই দেখে বাবা ঠিক করলেন নানককে বাড়ির গরু –ছাগল চরাবার ভার দেবেন।

একদিন নানক ঘুমিয়ে পড়লে তার গরুর পাল ঘুরতে ঘুরতে একজনের ক্ষেতে ঢুকে পড়ল। ক্ষেতের মালিক নালিশ জানালো জমিদারের কাছে। ডাক পড়লো নানকের। নানক জমিদারের কাছে গিয়ে বললেন, আমার গরু কোনো জমির ফসল নষ্ট করেনি। নানকের কথা শুনে জমিদারের লোকজন মাঠে গিয়ে দেখে জমির ফসল যেমন ছিল তেমনই আছে। ক্ষেতের মালিকতো বিস্ময়ে হতবাক।

নানককে এবার ভর্তি করা হলো ফার্সি ভাষার এক মৌলবীর স্কুলে। কিন্তু পড়ায় কোন মন নেই তার। বই-শ্লেট তুলে রেখে নানক মৌলবীকে জিজ্ঞাসা করে ঈশ্বরের কথা, ধর্মের কথা, এই জগৎ সৃষ্টির কথা। অধিকাংশ প্রশ্নেরই কোনো জবাব দিতে পারেন না মৌলবী। ছেলেকে বিষয়মুখী করতে না পেরে মহাভাবনায় পড়ে গেলেন বাবা। নানকের বোনের স্বামী জয়রাম ছিলেন সুলতান দৌলত খাঁ লোদীর দেওয়ান। অবশেষে তার সুপারিশে সুলতানের গুদাম ঘরের দেখাশুনার চাকরি পেলেন নানক। যখন কোনো দুঃখী মানুষ আসত তিনি গুদাম থেকে খাবার দান করতেন। নিজে যা মাইনে পেতেন তার অর্ধেকই গরিব-দুঃখী মানুষের পেছনে খরচ করতেন। কিন্তু নানকের এই সেবার কাজকে ভালোভাবে দেখত না কিছু মানুষ। তারা সুলতানের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানাল, নানক গুদামের মাল বিলেয়ে দিচ্ছে। সুলতান কয়েকজন কর্মচারীর উপর তদন্তের ভার দিলেন। সবকিছু পরীক্ষা করে দেখা গেল গুদামের সব মাল হিসেব মতোই আছে।

এদিকে নানক কাজকর্মে মন দিয়েছে জেনে তার বাবা নানকের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মেয়ের নাম সুলখানি। এই সুলখানির গর্ভে নানকের দুটি সন্তান জন্ম হয়-শ্রীচাঁদ ও লক্ষ্ণীদাস। একদিন খুব সকালে নানক নদীতে গেলেন গোসল করতে। গোসল শেষ করতেই তার অন্তরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল। নিজের অজান্তেই ছুটে গেলেন কিছুদূর একটি পাহাড়ের দিকে। সেখানে পাহাড়ের গুহায় বসে ধ্যানে মগ্ন হয়ে গেলেন। ভুলে গেলেন ঘর-বাড়ি, সংসার ও স্ত্রী-পুত্র। তিনদিন তিনরাত্রি কেটে গেল। অবশেষে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করলেন নিজ অন্তরে।

প্রায় কুড়ি বছর ধরে নানক দেশে দেশে তার ধর্মপ্রচার করেছিলেন। পাঁয়ে হেটে, বনজঙ্গল, নদী-নালা, কত মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তর, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে তাকে চলতে হতো। যেখানেই তিনি যেতেন, ফুলের সৌরভের মতো মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হতো। তিনি তাদের বলতেন, ঈশ্বর এক অদ্বিতীয়। তিনি সকলকে বলতেন, সত্য পথে চল, সৎ জীবন যাপন কর, ঈশ্বরের নামকর। তিনি বলতেন, ঈশ্বর মানুষের ধর্ম দেখেন না। তার জাতি দেখেন না, ধনী –দরিদ্র দেখেন না, তার চোখে সকলেই সমান। তিনি শুধু বিচার করেন মানুষের কর্ম। যে মানুষ যেমন কাজ করবে সে তেমনি ফল ভোগ করবে। ধর্মের নামে কুসংস্কার, গোঁড়ামী, বাহ্যিক আচার-আচরণকে তিনি কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন।

একবার নানক স্থির করলেন, মুসলমানদের দুই পবিত্র তীর্থস্থান মক্কা আর মদিনায় যাবেন। নানকের সঙ্গী হন পীর সৈয়দ আহমেদ হাসান ও পীর জালালউদ্দীন। এরা মুসলামান হলেও নানকের আধ্যাত্বিক শক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। নানকের পরনে মুসলমান দরবেশের পোষাক। মক্কা-মদিনা হয়ে নানক যান প্যালেষ্টাইন। বহু দিন নিজের স্বদেশভূমি ত্যাগ করে এসেছেন এবার ফেরার পথ ধরলেন নানক। পথ চলতে চলতে নানক নির্জন প্রান্তরে এসে পৌঁছলেন। দীর্ঘ পথশ্রমে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এক শিষ্যকে বললেন, দেখতো কাছাকাছি কোথাও জল আছে কিনা। শিষ্য গিয়ে দেখে কাছের গ্রামে একটা পুকুর রয়েছে। কিন্তু পুকুরে এক ফোটা জল নেই। শিষ্য ফিরে এসে সব কথা বলতেই নানক বললেন, গুরুর নাম করে সেখানে আবার যাও জল পাবে। এবার পুকুরে যেতেই শিষ্য বিস্ময়ে হতবাক, সমস্ত পুকুর জল আর জল, কি অপূর্ব সে জলর স্বাদ। ঠিক যেন অমৃত। লোকে তার নাম দিল অমৃত সায়র। আর তার থেকেই অমৃতসর কথাটির উৎপত্তি। ১৮০২ সালে মহারাজ রঞ্জিত সিং ওই পুকুর সংস্কার করে স্বর্ণমন্দির স্থাপন করেন। এই স্বর্ণমন্দির শিখদের এক পবিত্র তীর্থ।

১৫৩৯ সালের কথা- নানক বুঝতে পেরেছিলেন তার জীবনের কাল শেষ হয়ে এসেছে। তিনি সে কথা বলতেই দলে দলে তার শিষ্যরা এসে উপস্থিত হলো। এদের মধ্যে যেমন ছিল হিন্দু তেমনি ছিল মুসলমান। নানক বুঝতে পেরেছিলেন তার দেহ সৎকার করা নিয়া হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিবাদ দেখা দেবে। তাই দুই দলের শিষ্যদের ডেকে বললেন, তোমরা ফুল নিয়ে এসে আমার দুপাশে রাখ। যাদের ফুল সতেজ থাকবে তারাই আমার দেহের সৎকারের অধিকারী হবে। এবার তোমরা প্রার্থনা শুরু কর।

সমস্ত রাত ধরে চলল প্রার্থনা, ভজন, নামগান। ভোরবেলায় দরজা খুলতেই সকলে দেখল নানকের দেহ নেই। সেখানে রয়েছে রাশিরাশি তাজাফুল। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এইভাবে মৃত্যুর মধ্যেও মানুষের মিলন ঘটিয়ে গেলেন গুরু নানক।

Courtesy by: Prithwish Ghosh
Share:

০৯ জুলাই ২০১৭

বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, বিখ্যাত কিংবদন্তী চিকিৎসক, মানবদরদী, সকলের প্রিয় ও সদালাপী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়

স্বাধীন ভারতে বিখ্যাত নাগরিকদের ঘিরে পাঠযোগ্য জীবনকথা লেখার রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। যা এখন পাওয়া যায় তা অষ্টোত্তর শতনাম অথবা চুপিচুপি প্রচারিত কেচ্ছাকথা। অথচ এঁদের সম্বন্ধে বিপুল তথ্য এবং শতসহস্র আলোকচিত্র বিভিন্ন জায়গায় এখনও ছড়িয়ে রয়েছে।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এ বিষয়ে কিছুটা ভাগ্যবান, চিকিৎসক হিসেবে তাঁর নানা গল্পগাথা আজও রূপকথার মতো বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে আছে এবং তাঁর গুণমুগ্ধ কর্মচারীরা পরবর্তী সময়ে কিছু মূল্যবান লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন। সে সব ধৈর্যসহকারে উল্টে দেখলে বোঝা যায় এক কিংবদন্তি চিকিৎসক বঙ্গীয় ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে তাঁর মাসিক লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে বিপন্ন বাঙালিদের রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই জীবনকথা কিছুটা জানা থাকলে নিরন্তর জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত ও হতাশ বঙ্গবাসীরা কিছু নতুন পথ খুঁজে পেতে পারেন।
আমার এক পরলোকগত বন্ধু রসিকতা করে বলতেন, পরের ধন অপহরণ করে নিজের বলে চালানোয় আমরা কারও থেকে কম যাই না। তা না হলে কটকের সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু এবং পটনার সন্তান বিধানচন্দ্রকে আমরা সেন্ট পার্সেন্ট বেঙ্গলি স্ট্যাম্প দিয়ে দিলাম, চেপে গেলাম যে এঁদের কেউই এন্ট্রান্স পাশ করার আগে কলকাতায় বসবাস করেননি।
পরবর্তী কালে বিধানচন্দ্র বাংলা-বিহার সংযুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু পারেননি। তিনি সফল হলে কী হত তা আন্দাজ করতে আজ আর কারও আগ্রহ নেই।
সীমাহীন প্রতিভা, মানুষের জন্য অনন্ত ভালবাসা, বিস্ময়কর পরিশ্রমের ক্ষমতা নিয়ে বিধানচন্দ্র সংখ্যাহীন মানুষের ভালবাসা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু জীবনকালে তিনি যে সব নিন্দা অকারণে নতমস্তকে গ্রহণ করে গিয়েছেন তারও তুলনা নেই। তাঁর চরিত্র নিয়ে দেওয়াল লিখন ছড়িয়েছে। নিন্দুকরা তাঁকে ঘিরে ধরে কুৎসিত গালাগালি করেছে, এমনকী জামা গেঞ্জি ছিঁড়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এবং যিনি দেশের কাজে একের পর এক সম্পত্তি বন্ধক দিয়েছেন অথবা বিক্রি করে দিয়েছেন, তাঁকে চোর বলা হয়েছে এবং সরকারকে ঠকিয়েছেন বলা হয়েছে।
আঘাত পেলেও ডাক্তার রায়কে বিচলিত দেখাত না। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, “তোমার সাধ্যমতো চেষ্টা করো, এবং বাকিটা ভগবানের উপর ছেড়ে দাও।” আবার কখনও কখনও মেডিক্যাল কলেজের প্রিয় মাস্টারমশাই কর্নেল লুকিসকে স্মরণ করে বলতেন, “হাত গুটিয়ে বসে থাকার চেয়ে চেষ্টা করে হেরে যাওয়া ভাল।”
আবার কখনও কখনও মা-বাবাকে স্মরণ করতেন। “মা-বাবার কাছ থেকে তিনটে জিনিস শিখেছিলাম স্বার্থহীন সেবা, সাম্যের ভাব এবং কখনও পরাজয় না মেনে নেওয়া।”
আর যাঁরা তাঁর নিন্দায় মুখর ছিলেন তাঁদের সম্বন্ধে জীবনসায়াহ্নে বলেছিলেন, “আমি যখন মরব তখন ওই লোকগুলোই বলবে, ‘লোকটা ভাল ছিল গো, আরও কিছু দিন বাঁচলে পারত’।”
.....
ঠাকুমা নাম রেখেছিলেন ভজন। আর তাঁর ভাল নাম রাখার দিনে হাজির ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। পটনার মেধাবী ছেলে কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য এসে যে সব কাণ্ড করলেন তা বুলেট পয়েন্টে বলে নেওয়া যেতে পারে।
ডাক্তারি পড়বার বিশেষ বাসনা বিধানচন্দ্রের ছিল না, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ফর্মের জন্য আবেদন করেছিলেন। ডাক্তারির ফর্মটা আগে আসায় ওইটাই আবেদন করলেন। পূরণ করে পাঠিয়ে দিলেন।
থাকতেন কলেজ স্ট্রিট ওয়াই এম সি এ-তে। অর্থাভাব প্রবল, মাস্টারমশায়রা ছাত্রকে অবসর সময়ে ধনী রোগীদের বাড়িতে মেল নার্স হবার সুযোগ করে দিতেন। রোগীর বাড়িতে বারো ঘণ্টার ডিউটিতে পারিশ্রমিক আট টাকা।
মহাপুরুষরা সমকালের অক্লান্ত যন্ত্রণা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে পারেন না। জেনে রাখা ভাল, যাঁর চিকিৎসাখ্যাতি এক দিন কিংবদন্তি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এমবি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। আবার তিনিই মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে বিলেত গিয়ে দু’বছরে মেডিসিন ও সার্জারির চূড়ান্ত সম্মান এম আর সি পি এবং এফ আর সি এস প্রায় একই সঙ্গে অর্জন করেছিলেন।
বিভিন্ন অপমান কাণ্ডের সঙ্গে সায়েবরা জড়িত ছিলেন। কিন্তু দেশবাসীরা তাঁর জীবনকালে যে সব যন্ত্রণা ও অপমান তাঁকে করেছিলেন তা ভাবা যায় না।
যখন লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন তখন হাওড়া-কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে কুৎসিত ভাষায় লেখা হল: ‘বাংলার কুলনারী হও সাবধান, বাংলার মসনদে নলিনী বিধান।’
১৯১১ সালে ডাক্তার রায় বিলেত থেকে যখন কলকাতায় ফিরলেন তাঁর কাছে মাত্র পাঁচ টাকা। বিলেত যাবার আগে কলকাতায় বিধানবাবুর ফি ছিল দু’টাকা।
আদিতে তাঁর ঠিকানা ৬৭/১ হ্যারিসন রোড, পরে দিলখুশ কেবিনের কাছে, ৮৪ হ্যারিসন রোড। সেখানে ছিলেন ১৯১৬ পর্যন্ত, এর পর আসেন ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে। শোনা যায়, উপার্জন বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় তিনি বাড়িতে রক্ত ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করেন।
পেশায় বিপুল সাফল্য বিধানচন্দ্রকে বিশেষ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মাত্র সাড়ে আট বছরের প্র্যাকটিসে কলকাতায় প্রাসাদোপম বাড়ি এবং গাড়ির মালিক হওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না।
তাঁর রোগীর তালিকায় তখন কোন বিখ্যাত মানুষ নেই? এর মধ্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও আছেন। শোনা যায়, গোড়ার দিকে জোড়াসাঁকোর জন্যও ভিজিট নিতেন, যদিও পরবর্তী সময়ে দু’জনে খুব কাছাকাছি আসেন।
চিত্তরঞ্জন দাশের মহাপ্রয়াণের পর দেশবন্ধুর একটা ছবি বিক্রি করে বিধানচন্দ্র কিছু টাকা তোলবার পরিকল্পনা করেন। এ বিষয়ে পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য একটি চিঠিতে লেখেন, “চিত্তরঞ্জনের একটা ছবি নিয়ে বিধানচন্দ্র রায় কবির কাছে গিয়ে বললেন এর উপর একটা কবিতা লিখে দিন।
“ডাক্তার, এ তো প্রেসক্রিপশন করা নয়। কাগজ ধরলে আর চটপট করে লেখা হয়ে গেল।”
উত্তর: “বেশ অপেক্ষা করছি।”
কিন্তু বেশি ক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ছবির উপর সেই অপূর্ব কবিতাটি লেখা হল এসেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”
ডাক্তার রায়ের বিশাল প্র্যাকটিসের কোনও মাপজোক আজও হয়নি। কলকাতার বাইরেও বার্মা থেকে বালুচিস্তান পর্যন্ত তাঁর ডাক্তারি দাপট, যার একমাত্র তুলনা স্যর নীলরতন সরকার। শোনা যায়, তাঁর এক আপনজনের প্রতি তরুণ চিকিৎসক এক সময় আসক্ত হন, কিন্তু আর্থিক বৈষম্য সেই শুভকর্মকে সম্ভব করেনি।
প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পর বিধানচন্দ্র এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন নেতাজির জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৮ এবং তার সাত দিন পর শুক্রবার দিল্লিতে গাঁধীজি নিহত হলেন।
যখন ডা. রায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন তার আগের মাসে ডাক্তারি থেকে আয় ৪২০০০ টাকা, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজেই মাইনে ঠিক করলেন ১৪০০ টাকা, বয়স ৬৫। নিকটজনদের বললেন, “দশটা বছর কম হলে ভাল হত।” তার উপর চোখের সমস্যা, ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার করতেন এবং খুব লম্বা কিছু পাঠ এড়িয়ে চলতেন। এই জন্যই বোধ হয় নিন্দুকেরা প্রচার করেছিল, ডা. রায় বাংলার দিগ্বিজয়ী লেখকদের কোনও লেখাই পড়েন না, যদিও ক্ষণজন্মা লেখকরা সানন্দে তাঁকে স্বাক্ষরিত বই দিতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি খুবই খাতির করতেন। এবং স্বাভাবিক সৌজন্যে বলতেন, লেখার অভ্যাসটা যেন ছেড়ে দেবেন না।
তবু বাংলা সাহিত্য ও সিনেমার মস্ত উপকার তিনি করেছিলেন। বান্ধবী বেলা সেনের কথায়, সত্যজিৎ রায়ের অসমাপ্ত ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘পথের পাঁচালী’ তিনি দেখেন এবং সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এই ছবিটির সরকারি প্রযোজনার ব্যবস্থা করেন।
১৯৪৮ থেকে বাংলার ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে বিধানচন্দ্র রাইটার্সের লালবাড়িতে সাড়ে চোদ্দো বছর বসেছিলেন। তাঁর সেক্রেটারি সরোজ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, প্রথম দু’বছর তিনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন। জমি বিক্রি করলেন, শেয়ার বিক্রি করলেন, এমনকী শৈলশহর শিলং-এর প্রিয় বাড়িটাও বিক্রি করলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বাড়িতে বিনা পয়সায় নিয়মিত রোগী দেখতেন সকাল সাতটায়। এবং তার জন্য দু’জন ডাক্তারকে নিজের পয়সায় নিয়োগ করেছিলেন। ব্যক্তিগত স্টাফের মাইনে দিতেন নিজের গ্যাঁট থেকে।
ডাক্তার রায়ের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে নানা রকম গুজব রটত। কিন্তু তাঁর প্রথম জীবনীকার কে পি টমাস স্পষ্ট বলেছেন, তিনি ধূমপান বা মদ্যপান কোনওটাই করতেন না।
কে পি টমাস লিখেছেন, তাঁর চিরকুমারত্বের পিছনে কোনও কাহিনি আছে কিনা তা তিনি কখনও জানতে চাননি। একদিন (১৯৫৫) দিল্লি-বোম্বাই পরিভ্রমণ করে বিমানে ফিরলেন দুপুর একটায়। সঙ্গে সঙ্গে রাইটার্সে চলে গেলেন, ফিরলেন সাড়ে ৭টায়।
৬৫ বছর বয়সে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বিধানচন্দ্র যে অমানুষিক পরিশ্রমের বোঝা বহন করেছেন তার কিছু বিবরণ জীবনীকাররা আমাদের দিয়েছেন।
ভোর পাঁচটায় উঠে গীতা ও ব্রহ্মস্তোত্র পড়ে, স্নান সেরে, সাড়ে ৬টায় ব্রেকফাস্ট খেয়ে, দু ঘণ্টা ধরে বিনামূল্যে ১৬ জন রোগী দেখে রাইটার্স বিল্ডিংস-এ আসতেন সবার আগে।
ব্রেকফাস্টে থাকত একটি টোস্ট, একটি ডিম, বেলপানা অথবা পেঁপে ও এক কাপ কফি। ভাল কফির সমঝদার ছিলেন। ভাল কফি পেলেই বন্ধুদের খাওয়াতেন।
তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন তাঁকে ডিফেন্স কারখানায় বিশেষ ভাবে তৈরি কফি গ্রাইন্ডার উপহার দিয়েছিলেন। খুবই মিতাহারী ছিলেন। সাধারণত বাইরে নিমন্ত্রণ খেতে যেতেন না। রসিকতা করতেন হসপিটালিটি অনেক সময় হসটিলিটি হয়ে যায়। রাইটার্সে সকাল ন’টা থেকে দশটা জরুরি ফাইল দেখতেন। তারপর সচিবদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথাবার্তা চলত বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা, তারপর অ্যান্টি চেম্বারে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন ও বিশ্রাম। পরবর্তী সময়ে অসুস্থতার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ি চলে এসে খাওয়াদাওয়া করে সামান্য বিশ্রামের পরে আবার রাইটার্স। এবং সেখানে রাত ৮টা পর্যন্ত। তাঁর ছিল দুটি দুর্বলতা। কয়েকবার স্নান করে নিতেন এবং সবাইকে বলতেন রাত ন’টায় শুয়ে পড়া ভাল।
এ বার ধন্বন্তরির নিজের স্বাস্থ্য! সর্দিকাশি ইত্যাদি ছোট ছোট রোগে সেই ছোটবেলা থেকেই ভুগতেন। তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক করেছিল ১৯৩০ সালে, তখন তিনি কংগ্রেসের কাজে আমদাবাদ থেকে দিল্লির পথে।
এই অ্যাটাক নিয়ে তেমন হইচই হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে। এবারেও তাঁকে অমানুষিক পরিশ্রম থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যেতে হয়নি। শুধু দৈনিক রুটিনের পরিবর্তন করে দুপুরে ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করতে আসতেন এবং বাড়িতেই ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম করে আবার রাইটার্সে যেতেন।
অন্তিমপর্বের শুরু ২৪ জুন ১৯৬২। রাইটার্সে ওইটাই তাঁর শেষ দিন। নিমপীঠের এক সন্ন্যাসীকে বললেন, “শরীর যেমন ঠেকছে কাল নাও আসতে পারি।’ মাথায় তখন যন্ত্রণা।
পরের দিন বাড়িতে ডাক্তার শৈলেন সেন ও যোগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হল। তাঁদের সিদ্ধান্ত হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। ৩০ জুন ডাক্তার রায় তাঁর প্রিয় বন্ধু ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, ‘‘আমি তিরিশ বছর হৃদরোগের চিকিৎসা করে আসছি, আমার কতটা কী হয়েছে আমি তা ভাল করেই বুঝতে পারছি। কোনও ওষুধই আমাকে ভাল করতে পারবে না।”
১ জুলাই তাঁর জন্মদিন। সেদিনই তাঁর তিরোধান দিবস। ওই দিন তাঁর আত্মীয়স্বজনরা এলেন। পরিচারক কৃত্তিবাসের হাত থেকে এক গ্লাস মুসুম্বির রস খেলেন। বন্ধু সার্জেন ললিতমোহনকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ললিত আমার গুরুও বটে, ওর কাছ থেকে কত কিছু শিখেছি।
তার পর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বললেন, “আমি দীর্ঘ জীবন বেঁচেছি। জীবনের সব কাজ আমি সমাধা করেছি। আমার আর কিছু করার নেই।” এর পর বললেন, আমার পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এর পরেই নাকে নল পরানো, ইঞ্জেকশন এবং ১১টা ৫৫ মিনিটে অমৃতপথ যাত্রা।
দুঃসংবাদ পেয়ে দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তীদেবী বলেছিলেন, বিধান পুণ্যাত্মা, তাই জন্মদিনেই চলে গেল। ভগবান বুদ্ধও তাঁর জন্মদিনে সমাধি লাভ করেছিলেন।
দেহাবসানের কয়েক বছর আগে কেওড়াতলা শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লির সূচনা করতে এসে বিধানচন্দ্র বলেছিলেন, “ওহে আমাকে এই ইলেকট্রিক চুল্লিতে পোড়াবে।” ২ জুলাই ১৯৬২ তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়েছিল।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।