• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

শিব লিঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শিব লিঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৫ এপ্রিল ২০১৯

গন্ধর্বরাজ পুস্পদন্ত ভগবান শিবের কৃপায় তিনি অষ্টসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

গন্ধর্বরাজ পুস্পদন্ত ছিলেন পরম শিবভক্ত। ভগবান শিবের কৃপায় তিনি অষ্টসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এই সিদ্ধির একটি হল ‘অণিমা’। এই অনিমা নামক সিদ্ধির সহায়তায় যোগসিদ্ধ সাধক নিজেকে ক্ষুদ্র করে আকাশমার্গে বিচরণ করতে পারেন । একদিন পুস্পদন্ত এই সিদ্ধির সহায়তায় বিচরণ করার সময় ধরিত্রীধামে কাশীরাজের পুস্পবাগান দেখতে ফেলেন। নানবিধ পুস্পে শোভিত সেই রাজার বাগান থেকে নিত্য পুস্প সংগ্রহ করে বাবা বিশ্বনাথের পূজোর জন্য মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হত। পুস্পদন্ত মনে করলেন সেই পুস্প নিয়ে ভগবান শিবের পূজা করবেন। এই ভেবে পুস্পদন্ত সেই সকল পুস্প নিয়ে চলে গেলেন। রোজ এমন করতেন। রাজা ভাবলেন কোনো চোর এই কাজ করছে। এই ভেবে সৈন্য পাহারায় রাখলেন। কিন্তু যোগসিদ্ধ পুস্পদন্তের টিক্কির নাগালও এই সেনারা পেলো না। কাশীরাজ ভাবলেন এ নিশ্চয়ই তাহলে কোনো মায়াবী ব্যক্তির কাজ। সেইজন্য কাশীরাজ কাশীর সিদ্ধ যোগী মহাত্মাদের শরণ নিলেন। সিদ্ধ মহাত্মারা যোগসাধনায় দেখলেন এ এক শিবভক্ত যোগীর কাজ।


সিদ্ধযোগীরা রাজাকে আদেশ দিলেন বাবা বিশ্বনাথের পবিত্র নির্মাল্য ও অভিষেকের জল ফুল বাগানে ছিটিয়ে দিতে। তাহলে যখন সেই মায়াবী চোর ফুলচুরি করতে আসবে তখন সে তার শক্তি হারাবে আর ধরা পড়বে। রাজা সেই মত ব্যবস্থা করে দিলেন। বাগানে সৈন্য পাইক আর সেই সিদ্ধ মহাত্মাদের নিয়ে গেলেন। পরদিন প্রভাতে পুস্পদন্ত যোগবলে পুনঃ শিব পূজার পুস্প চুরি করতে এলে ধরা পরে গেলেন। যোগশক্তি সকল লুপ্ত হল। এখন পুস্পদন্ত বিপদে পড়ে ভগবান শিবকে ডাকতে লাগলেন। ভগবান শিব আশুতোষ- অল্পেই তুষ্ট হন। পুস্পদন্ত এক সুন্দর স্তব করে ভগবান শিবকে প্রসন্ন করতে লাগলেন। পুস্প দন্তের গদ্গদ ভক্তিতে উচ্চারিত সেই স্তব শুনে বাবা বিশ্বনাথের ভক্ত সেই যোগীদের অশ্রুধারা বয়ে চলল। এত সুন্দর শিব স্তব। মহাত্মা যোগীদের কেহ কেহ ভাবে বিভোর হয়ে গেলেন সেই স্তব শুনে। এ তো সামান্য চোর নয়। ভগবান শিবের পরম ভক্ত ।

পুস্পদন্তের স্তব শুনে ভগবান শিব প্রসন্ন হয়ে পুনঃ পুস্পদন্তকে যোগশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। পুস্পদন্ত অদৃশ্য হয়ে পলায়ন করলো। সাধু মহাত্মারাও, কাশীরাজকে বোঝালেন এ কোনো সাধারণ চোর নয়- ভগবান শিবের পরম ভক্ত। সাধু যোগীরা পুস্পদন্তকৃত সেই শিবস্তব জনমানসে প্রচার করলেন। সেই স্তবই “শিবমহিস্ন স্ত্রোত্রম্‌” নামে খ্যাত।
Share:

আমাদের শাস্ত্রে অন্যান্য লিঙ্গের তুলনায় বাণালিঙ্গের পূজায় বেশি প্রশংসা লক্ষ্য করা যায়।

আমাদের শাস্ত্রে অন্যান্য লিঙ্গের তুলনায় বাণালিঙ্গের পূজায় বেশি প্রশংসা লক্ষ্য করা যায়। বাণ নামে এক ভক্ত অসুর ছিলেন। তিনি শিবকে তুষ্ট করার জন্য সুন্দর সুন্দর লিঙ্গ তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করতেন। সুতরাং বাণাসুরের দ্বারা তৈরি লিঙ্গকে বাণলিঙ্গ বলে অভিহিত করা হয় । এই সম্বন্ধে পুরাণে যে কাহিনি আছে তা এরকম – অতি প্রাচীনকালে ভারতে বাণ নামে একজন ক্রোধ জয়কারী অসুর ছিলেন। তিনি সর্বদা মহাদেবেন সেবা ও পূজায় রত থাকতেন । বাণ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ একজন শিল্পী । তিনি প্রত্যহ নিজ হাতে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করতেন। আবার পরে তা ধুমধাম করে পূজা করে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠা করতেন। এইভাবে প্রায় শত বছর কেটে গেল। 

তাঁর এরূপ ভক্তিতে স্বয়ং মহাদেব অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং একদিন তিনি ভক্তের কাছে আবির্ভূত হয়ে বললেন- “হে বাণ! তোমার উপর আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। তুমি কি বর চাও বল- আমি এখনই তা পূর্ণ করব।” ভক্ত বাণ মহাদেবের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে বললেন- “হে প্রভু, শাস্ত্রমতে শুভ লক্ষণযুক্ত শিবলিঙ্গ তৈরী করতে আমার খুব কষ্ট হয়। অথচ আমি এরূপ শিবলিঙ্গ তৈরী করার ব্রত নিয়েছি। তাই আমার একান্ত প্রার্থনা- আপনি শুভ লক্ষণযুক্ত কিছু লিঙ্গ আমাকে দিন। আর ঐসব লিঙ্গের অর্চনার দ্বারা সমস্ত অভিলাষ যেন পূর্ণ হয় এবং আমি কৃতার্থ হই।” জগতের অধীশ্বর মহাদেব বাণের এরূপ প্রার্থনা শোনার পর কৈলাস পর্বতের শিখরে ফিরে গেলেন এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় চৌদ্দ কোটি শিবলিঙ্গ প্রস্তুত করলেন। তারপর একদিন শুভক্ষণে নন্দি- ভৃঙ্গিদের দিয়ে ওই শুভ শিবলিঙ্গগুলি বাণাসুরকে প্রদান করলেন। বাণ লিঙ্গগুলি পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তিনি আর লিঙ্গ প্রস্তুত করতে চাইলেন না। তবে এই বিশাল সংখ্যক লিঙ্গগুলি নিয়ে বাণ চিন্তায় পড়লেন। ভাবলেন- যুগে যুগে মানবদের সর্ববিধ মঙ্গলের জন্য এই লিঙ্গগুলি বেগবতী নদীর মধ্যে স্থাপন করা উচিৎ। এরূপ চিন্তা করে তিনি বিভিন্ন পবিত্র স্থানে অনেকগুলি লিঙ্গ স্থাপন করলেন এবং অন্যান্য সমস্ত লিঙ্গগুলির মধ্যে তিনকোটি কালিকাগর্তে , তিনকোটি শ্রীশৈলে , এককোটি কন্যকাশ্রমে এক কোটি নেপালে রক্ষা করেছিলেন। বাণাসুর দ্বারা স্থাপিত এসব লিঙ্গগুলি নদীর স্রোতে ভেসে আসে কিংবা পর্বতের বিভিন্ন জায়গায় এখনও কুড়িয়ে পাওয়া যায় – এইসব ভেসে আসা লিঙ্গ বা কুড়িয়ে পাওয়া লিঙ্গগুলিকে বাণলিঙ্গ বলে চিহ্নিত করা হয় । বিভিন্ন লক্ষণযুক্ত বাণলিঙ্গ আছে। তাঁর পূজানের ফলাফলও পৃথক আছে। বাণলিঙ্গ পূজনের ফলে পূজকের সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি পায়। সুখ, সৌভাগ্য ও আরোগ্য লাভ হয়। যোগঐশ্বর্য ও বিভূতি লাভ হয় । মোট কথা সংসারে শ্রীবৃদ্ধি , আরোগ্যলাভ, সুখ শান্তি- ঐশ্বর্য সবই বানলিঙ্গ পূজা ও ভক্তি দ্বারা লাভ করা যায় ।




( শিব এবং শিবলিঙ্গ মাহাত্ম্য... স্বামী বেদানন্দ... গিরিজা পাবলিশার্স )
Share:

০৭ জানুয়ারি ২০১৯

শিবলিঙ্গে দুধ-জল ঢালার কারন - সবাইকে মনোযোগ সহকারে পড়ার অনুরোধ রইলো


                                                                         *"ওঁ নমঃ শিবায়ঃ*

আজ আমরা একটা সনাতনী নিয়মধারা শিবলিঙ্গে দুধজল ঢালার কারণ সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করবো, যা অনেকেরই অজানা। সবাইকে মনোযোগ সহকারে পড়ার অনুরোধ রইলো। আশাকরি সবারই ভাল লাগবে।

 একবার দেবতা ও অসুরদের মধ্যে যুদ্ধে অমৃত পানের জন্য দেবতারা সমুদ্রমন্থন করেন। সমুদ্রমন্থনের সময় এক পর্যায়ে সমুদ্র থেকে হলাহল নামক মারাত্নক বিষ উত্থিত হয়েছিলো। যেটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল জীবের জীবন বিপন্ন করার ক্ষমতা ছিলো অত্যাধিক।


ভগবান নারায়নের পরামর্শে, শিবশঙ্কর সকল দেবতাদের অনুরোধে এই বিষ থেকে সবাইকে রক্ষা করার ঐশ্বরিক দায়িত্ব নেন । এরপর দায়িত্ব সম্পন্নের জন্যই তিনি সমস্ত বিষ পান করেন এবং কন্ঠে তা সংরক্ষন করে রেখে দেন। আর সে জন্যই শিবের আরেক নাম নীলকন্ঠ। হলাহল বিষের বিষাক্ততার মাত্রা ছিলো প্রচন্ড রকমের বেশি। যদিও শিবের উপরও তার প্রভাব পড়েছিলো। কিন্তু হলাহল বিষের তাপমাত্রার প্রভাব প্রশমিত করার জন্য দেবতারা শিবের জন্য গঙ্গা অভিষেক করেন। আর এই গঙ্গা অভিষেকের মাধ্যমে দেবতারা শিবকে প্রসন্ন করেছিলেন। শিবের সেই গঙ্গা অভিষেকে শুধুমাত্র সাপেরা এগিয়ে এসেছিলো এই ঐশ্বরিক কারণ সমর্পনের জন্য। তারা নিজেরাও বিষের কিছু অংশ পান করে ও তাদের বিষদাঁতে কিছু বিষ গ্রহণ করে। সে জন্যই সেদিন থেকেই কিছু সাপ বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে।


সমুদ্র মন্থনের সময় যে গঙ্গা অভিষেক করা হয়েছিল, শিবের উপাসকদের দ্বারা শিবলিঙ্গে ডাবের জল বা দুধ ঢালার কারণ হচ্ছে, শিবের প্রতি ভক্তদের ভক্তি প্রতিভাস করার জন্য। শিবের পূজায় শিবলিঙ্গে ডাবের জল বা দুধ ঢালা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিষেক ছাড়া শিবের পূজা অসম্পূর্ণ। অভিষেকের সময় এই ডাবের জল বা দুধ ঢালা খুবই পবিত্র। কারণ অভিষেকের দ্বারাই শিবের প্রতি ভক্তদের গভীর অনুরক্তি প্রকাশিত হয়।

এখানে অনেকে বলে থাকে, শিবলিঙ্গে দুধ ঢেলে দুধ অপচয় করা হচ্ছে, যদিও এটা মোটেই সঠিক নয়। কারণ এই দুধের বেশ খানিকটা অংশ চরণামৃত বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয় এবং পূজা শেষে ভক্তদের মাঝে প্রসাদ আকারে বিতরণ করা হয়। তাই দুধ ঢালা কোনো ক্রমেই অপচয় নয় বরং এটা নিষ্কলুষ ভক্তির বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

 শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা নিয়ে অনেকেরই মতানৈক্য আছে। শিবলিঙ্গে দুধ ঢালার কথা শুনলেই এক শ্রেণীর তথাকথিত অজ্ঞ গোষ্ঠী অপপ্রচার করে বেড়ায় যে এটা নাকি অপচয়। ৩৬৪ দিনে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগলে তারা খবর না নিয়ে মদ গাজা প্রভৃতি নেশা দ্রব্যে মগ্ন থাকে যখন শিব রাত্রি আসে তখনই তারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বলে, একদিনের শিব রাত্রিতে নাকি ৩৬৪ দিনে অপুষ্টিতে থাকা শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগে।


আশাকরি যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করেন, পোষ্টখানা পড়ে বিকৃত মনাদের বিকৃত মানষিকতা ঠিক করে নিবে বলে আশা রাখি। তাছাড়া এই পৃথিবীতে আমরা সবাই নিতান্তই তুচ্ছ, আমাদের নিজের বলে কোনো কিছুই নেই। তাই শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা নিয়ে কৈফিয়ত চাওয়ারও কোনো কারণ নেই। মনে রাখতে হবে বাবা মহেশ্বর পরম বৈষ্ণব, অর্থাৎ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর একনিষ্ঠ এবং প্রধান ভক্ত।

 পরমকরুনাময় গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণী আর পরমেশ্বরের সংহারী প্রতিরুপ ভোলামহেশ্বরের চরণকমলে, সবার মঙ্গল, কল্যাণ আর সবাঙ্গীন আনন্দময়তার জন্য প্রার্থনা আমাদের।


"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় হোক সকল ভক্তদের!!
!!জয় শিবশম্ভুর জয়!!
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!

Post Courtesy: দেবেন্দ্র
Share:

০৬ জানুয়ারি ২০১৯

শ্রীশ্রী শিবের অষ্টোত্তর শতনাম

শ্রীশ্রী শিবের প্রণাম মন্ত্রঃ

নমস্তুভ্যং বিরূপাক্ষং নমস্তে দিব্যচক্ষুষে।

নমঃ পিণাকহস্তায় বজ্রহস্তায় বৈ নমঃ।।

নমস্ত্রিশূলহস্তায় দণ্ডপাশাংসিপাণয়ে।

নমস্ত্রৈলোক্যনাথায় ভূতানাং পতয়ে নমঃ।।



শ্রীশ্রী শিবের অষ্টোত্তর শতনামঃ

দিকপতি মহাদেব পৃথিবীর পতি ।

ভূত-গতি ভুত-পতি আর শান্তমতি ।।

শান্তিময় আর নাম হয় হরি হর।

শিবশম্ভু কহে মোরে আর দিগম্বর ।।

দাতা ভোক্তা নাম মোর কর অবধান।

দিনমনি মহীপাল আর অনুপম।।

ভৈরবগণের প্রভু জানিবে শিবানী ।

আশুতোষ কৃপাসিন্ধু আর শূলপাণি।।

ভূতচক্র ভুতপতি আর খগেশ্বর।

খেপা খ্যাতি নাম মোর খ্যাত চরাচর।।

শ্রী অঙ্গ আমারে কহে কাল কালময়।

ত্রিশূলধারী আর নাম সদা দয়াময়।।

জগত পালন নাম বিষ্ণুর ভবন।

ভরণীর নাম এই অতি মনোরম।।

অপর নাম গৌরীবর বলে সর্বজন।

কল্পজাত কল্পময় জানে ত্রিভুবনে।।

কৃপাণধারী কহে মোরে জগত মাঝারে।

সংসারনাশক নাম বিখ্যাত সংসারে।।

রমণীর প্রমুগ্ধ হয় আর এক নাম।

সর্ব্বদেব অধিকারী সুন্দর সুঠাম।।

ত্র্যম্বক এক নাম অপর ত্রিপুরারি।

সকলেতে নাম লয় ত্রি-জগৎ ভরি।।

দীনদুঃখী বলি মোর হয় এক নাম।

আরো কহে সবে মোরে নবঘনশ্যাম।।

ব্যাঘ্রচর্ম্ম পরিধান কেহ কেহ বলে।

বৃষভ বাহন কেহ বলয়ে আমারে।।

বিঘ্নহারী মম নাম জানিবে শিবানী।

অপর নাম হয় বিভু শূলপাণি।।

ত্রিশূলধারী নাম মোর বিদিত ভুবন।

অন্য নাম চণ্ডীবর জ্ঞাত সর্বজন।।

যোগীশ্রেষ্ট বলে দেবী জানিবে আমাকে।

যোগেশ্বর বলে মোরে ব্রম্মাণ্ডের লোকে।।

যমরাজ, কাল, যম, হয় মোর নাম।

শব, মড়া, মম নাম বিদিত ভুবন।।

অন্য এক নাম দেবী ভোলানাথ কয়।

অন্য নাম মহাকাল অপর অভয়।।

ভোলা নামে ডাকে মোরে বিশ্বের মাঝারে।

নীলকণ্ঠ নাম মম খ্যাত চরাচরে।।

উমাপতি নাম মম খ্যাত জগত ঈশ্বর।

নিজে হর হই আমি নাম গৌরীবর।।

বাতরূপী আমি হই জানিবে শিবানী ।

তব স্বামী হই আমি তুমি দাক্ষায়ণী।।

ধূর্জ্জটি অপর নাম খ্যাত চরাচর।

ব্রহ্মাণ্ডে বিখ্যাত নাম আমিই ঈশ্বর ।।



-শ্রীশ্রী শিবের অষ্টোত্তর শতনাম সম্পূর্ণ-



‘শিব বলে কথা মোর শুনিলে মঙ্গলা।

পড়িবে আমার শাস্ত্র বিপদের বেলা।।’

পোষ্ট কার্টেসীঃ অমিত 
Share:

২৪ জুলাই ২০১৭

এই শিবমন্দিরে নন্দীর মূর্তি থেকে ঝরে পড়ে রহস্যময় জলধারা। এ কি ঐশ্বরিক লীলা?



এই মন্দিরের রহস্যময়তা অন্যত্র নিহিত। যে ষাঁড়ের মূ্র্তিটি সবার আগে নজরে এসেছিল বাসিন্দাদের, সেই মূ্র্তিটি ছিল আসলে শিবের সহচর নন্দীর মূ্র্তি। সেই মূর্তির মুখে জমে থাকা মাটি পরিষ্কার করতেই দেখা যায়, নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্ষীণ জলধারা।


১৯৯৭ সালের কোনও এক সকালবেলার ঘটনা। বেঙ্গালুরুর মাল্বেশ্বরম এলাকার বাসিন্দাদের কাছে দিনটা শ‌ুরু হয়েছিল আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই। কিন্তু দিনটির বিশিষ্টতা একটু পরেই বোঝা গেল যখন বিখ্যাত মল্লিকার্জুন স্বামী মন্দিরের সামনের জমিটিতে কোনও একটি নির্মাণকাজের প্রয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হল। কয়েক হাত মাটি খুঁড়তেই কোদাল ঠেকল শক্ত কোনও জিনিসে। মাটি সরাতে পাওয়া গেল এক ষাঁড়ের মূ্র্তি। স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি খবর দিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসে গভীরতর খননকার্য চালিয়ে মাটির তলা থেকে তুলে আনলেন একটি আস্ত শিবমন্দিরকে। গবেষণা করে জানা গেল, এই মন্দির ৪০০ বছর আগে তৈরি। মন্দিরটি পরিচিত হয় নন্দীকেশ্বর বা দক্ষিণমুখ নন্দীতীর্থ মন্দির নামে।


ভারতের মতো ঐতিহাসিক সমৃদ্ধিসম্পন্ন একটি দেশে এরকম অদ্ভুতভাবে একটি প্রাচীন মন্দিরের আবিষ্কার খুব অস্বাভাবিক হয়তো নয়। কিন্তু এই মন্দিরের রহস্যময়তা অন্যত্র নিহিত। যে ষাঁড়ের মূ্র্তিটি সবার আগে নজরে এসেছিল বাসিন্দাদের, সেই মূ্র্তিটি ছিল আসলে শিবের সহচর নন্দীর মূ্র্তি। সেই মূর্তির মুখে জমে থাকা মাটি পরিষ্কার করতেই দেখা যায়, নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্ষীণ জলধারা। আরও মাটি খোঁড়ার পরে দেখা যায়, নন্দীর মূর্তিটির সামনে ফুট দশেক নীচে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জল সোজা এসে পড়ছে সেই শিবলিঙ্গের উপর। শিবলিঙ্গের গা ধুইয়ে দিয়ে সেই জল এসে জমা হচ্ছে আরও নীচে অবস্থিত একটি পুকুরে (সেই পুকুরের বর্তমান নাম কল্যাণী)। আশ্চর্যের বিষয় হল, নন্দীর মুখ থেকে যে জলধারা বেরোতে শুরু করেছিল সেই ১৯৯৭ সালে সেই জলধারা আজও বন্ধ হয়নি। নিরন্তর জল ঝরে চলেছে নন্দীর মুখ থেকে।




কিন্তু এই জলধারার উৎস কী? কী বলছেন বিজ্ঞানীরা? তাঁরা মনে করছেন, ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডারের সঙ্গে কোনওরকম সংযোগ রয়েছে নন্দীর মূর্তিটির। সাইফোন পদ্ধতিতে সেই জল মাটির তলা থেকে নন্দীর মু‌খে উঠে আসছে। কিন্তু সেরকম কোনও ভূগর্ভস্থ জলাধারের খোঁজ পেয়েছেন কি বিজ্ঞানীরা? না, তা তাঁরা পাননি। তবে তাঁরা আশাবাদী যে, অদূর ভবিষ্যতে সেই জলাধারের সন্ধান মিলবে। সে যাই হোক, ভক্তরা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ধার ধারেন না। তাঁদের ধারণা, সবটাই ঈশ্বরের লীলা। স্বয়ং ঈশ্বরের পরিকল্পনাতেই নন্দীর মূর্তির মুখ থেকে নিরন্তর বহে চলেছে জল। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে ভক্তদের মনে এক বিশিষ্ট জায়গা করে নিয়েছে এই নন্দীকেশ্বর মন্দির।

-এবেলা
Share:

এই শিবমন্দিরে দিনে তিনবার বদলে যায় শিব লিঙ্গের রং

অনেকের অনুমান শিবলিঙ্গের রং পরিবর্তনের পিছনে সূর্যালোকের ক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।


অচলেশ্বর শিব মন্দির। ছবি: ইউটিউব থেকে
কথিত আছে, এই স্থানে নাকি মহাদেবের গোড়ালির ছাপ বিদ্যমান। আর তাই কালনিরবধি এটি এক পুণ্যতীর্থ। রাজস্থানের আরাবল্লী রেঞ্জের ছোট জনপদ ঢোলপুর। সন্নিহিত এলাকা বেহড়, চম্বল। একদিকে যদি পাক থেকে থাকে ডাকু মালখান সিং, মান সিং আর ফুলনদেবীর কিংবদন্তি, তা হলে অন্য দিকে অবিচল হয়ে রয়েছে অচলেশ্বর মহাদেবের পুরাণকথা।

















অচলেশ্বর শিবলিঙ্গ, ছবি: ইউটিউব
মিথোলজি যা-ই বলুক না কেন, এই মন্দিরের মহিমা শুধু কাহিনিতে নয়। ঢোলপুর শিব মন্দিরের বিশেষত্ব এখানেই যে, এই মন্দিরে অবস্থানরত শিবলিঙ্গটি দিনে তিন বার রং বদলায়। এই দৃশ্য দেখতেই হাজার হাজার পুণ্যার্থার ভিড় হয় এই মন্দিরে। মানুষের বিশ্বাস, শিবমহিমাতেই এই ‘অলৌকিক’ সম্ভব।































নন্দীমূর্তি, ছবি:ইউটিউব
স্থানীয় কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, এই দেবস্থান ২৫,০০০ বছরেরেও বেশি পুরনো। মন্দির সংলগ্ন একটি পুকুরের পাড়ে পাথরের তিনটি মহিষ মূর্তি রয়েছে, যাদের আকৃতি ও শৈলিই বলে দেয় এই স্থানের প্রাচীনত্ব।মন্দিরের প্রবেশদ্বারে অষ্টধাতুর এক বিশাল নন্দীমূর্তি। কথিত, এই নন্দীর কৃপাতেই নাকি এই মন্দির বার বার রক্ষা পেয়েছে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে।



















রহস্যময় মহিষমূর্তি, ছবি:ইউটিউব
আজকের মন্দিরটি আনুমানিক খ্রিষ্টিয় নবম শতকে তৈরি। মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ শিবলিঙ্গটি স্বয়ম্ভূ। অনেকের অনুমান শিবলিঙ্গের রং পরিবর্তনের পিছনে সূর্যালোকের ক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি। তেমন কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণাও সম্ভব হয়নি এই লিঙ্গকে ঘিরে। যা দেখা যায়, তা হল এই— সকালে এই লিঙ্গের রং থাকে লাল, বেলা বাড়লে তা গেরুয়া হয়ে ওঠে এবং রাত্রে এর রং একেবারেই কালো।

প্রতিবেদন, এবেলা.ইন 
Share:

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

একই শিবলিঙ্গ নিজে নিজেই তিনবার রঙ পাল্টায় দিনে!

আপনি কি শিবঠাকুরের খুব ভক্ত? নিজের যেকোনও ভালো কিছুর জন্য তাঁর উপরই ভরসা করে থাকেন? তাহলে নিশ্চয়ই এনেক শিবমন্দিরে গিয়েছেন এখনও পর্যন্ত। কিন্তু কখনও কি দেখেছেন একই মন্দিরের একই শিবলিঙ্গ নিজে নিজেই সারাদিনে তিনবার তাঁর রঙ পাল্টায়?

অবাক হলেন? সে তো হওয়ারই কথা। কিন্তু এমন জিনিস আপনি অবশ্যই দেখতে পারবেন, যদি যান রাজস্থানে। সেখানকার মাউন্ট আবু মন্দিরে রয়েছে এমন অবাক করা শিবলিঙ্গ। যা সারাদিনে তিনবার তাঁর রঙ পাল্টায়।
এই মন্দিরের নাম অচলেশ্বর মহাদেবের মন্দির। যেটি রয়েছেই অচলেশ্বরে। এই মন্দিরের শিবলিঙ্গ সকালবেলায় থাকে লাল রঙের। বিকেলের দিকে এই শিবলিঙ্গের রঙ নিজে নিজেই হয়ে যায় গেরুয়া রঙের। আর যেই অন্ধকার নেমে আসে এই শিবলিঙ্গের রঙ হয়ে যায় সাদাটে! লোকে বলে এই মন্দিরের শিবঠাকুরের কাছে অবিবাহিতরা তাঁদের বিয়ের জন্য প্রার্থনা করতে আসেন। আর সেই প্রর্থনার পর শিবঠাকুর ঠিক তাঁর মনোকামনা পূরণ করেন।
Share:

০৩ ডিসেম্বর ২০১৫

সহজ সংক্ষেপ শিবপূজাপদ্ধতি

দেবের দেব মহাদেব। এমন মহাশক্তিধর, অথচ অল্পে-তুষ্ট দেবতা হিন্দু দেবমণ্ডলীতে বিরল। রামপ্রসাদের গানে আছে, ‘শিব আশুতোষ মহান দাতা’। সামান্য ফুল-বেলপাতা তাঁর মাথায় দিলে তিনি যা প্রতিদান দেন, তার তুলনা ত্রিজগতে নেই। এমন যে শিব, তাঁকে পূজা করতে কে না চায়? তাছাড়া তাঁর পূজা যে কেউ করতে পারে।

যাঁরা দৈনিক কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তাঁদের প্রিয় দেবতা শিবকে নিত্যপূজা করতে চান, কিন্তু শিবপূজার বিধান সম্পর্কে সম্যক অবগত নন, এমন আপামর জনসাধারণের জন্য সরলভাবে এই পূজাপদ্ধতি প্রণীত হল। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা শিবের পূজা করে থাকে। কারণ, ছেলেবেলায় শিবের পূজা করা বিশেষভাবে উপকারী। আপনার বাড়িতে এমন ছেলে বা মেয়ে থাকলে, তাদের এই পদ্ধতিতে শিবপূজা করা শিখিয়ে দিতে পারেন। প্রবাসী ধর্মপ্রাণ হিন্দুরাও এই পদ্ধতি মেনে সহজেই নিত্য শিবপূজা করতে পারেন। মন্ত্রপাঠ কেউ করতে পারেন, কেউ পারেন না। তাই মন্ত্রপাঠের সমর্থরা কেমনভাবে পূজা করবেন, অসমর্থরাই বা কেমনভাবে করবেন, তাও আলাদা আলাদাভাবে বলে দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রপাঠ প্রসঙ্গে
---------------------
মন্ত্রপাঠ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে, শিব মন্ত্র বা উপচারের বশ নন। আর যাই হোক, যিনি দেবের দেব, তাঁকে আপনি মন্ত্রে ভুলিয়ে উপচার ঘুষ দিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে পারবেন, এমন চিন্তা মনেও স্থান দেবেন না। শিব ভক্তির বশ। ভক্তের হৃদয় তাঁর আড্ডাঘর। শুধুমাত্র ভক্তিদ্বারা পূজা করলে পূজা তাতেই সিদ্ধ হয়। একথাও শাস্ত্রেও স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু আপনার অন্তরের ভক্তি আপনাকে মন্ত্রপাঠে উদ্বুদ্ধ করলে, অবশ্যই মন্ত্র পড়ে পূজা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে মন্ত্রপাঠ শুদ্ধ উচ্চারণে হওয়া উচিৎ এবং আপনারও মন্ত্রের অর্থ জেনে তা পাঠ করা উচিত। তা না করলে মন্ত্রপাঠ বৃথা। তাই নিচে পূজাপদ্ধতি বলার আগে ক্রিয়াকর্ম ও মন্ত্রের অর্থ বা ভাবার্থও দিয়ে দেওয়া হল। মন্ত্র পড়তে না পারলে মন খারাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, মন্ত্রপাঠে অসমর্থ ব্যক্তিরাও ঈশ্বরের কৃপা পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ ভক্তিসহকারে পূজার মূল অর্থটি হৃদয়ঙ্গম করে পূজা করতে হবে। তাঁরা কিভাবে সেই পূজা করবেন, তাও পরে বলে দেওয়া হয়েছে। তবে মনে রাখবেন, দুই পদ্ধতির মূল কথা একই।

পূজাসামগ্রী ও সাধারণ নিয়মকানুন
=========================
এই জিনিসগুলি সাজিয়ে নিয়ে পূজা করতে বসবেন —
১। একটি শিবলিঙ্গ।
২। একটি ছোটো ঘটিতে স্নান করানোর জল।
৩। একটি থালা, একটি গ্লাস ও কোশাকুশি। কোশাকুশি না থাকলে তামা বা পিতলের সাধারণ ছোটো পাত্র ব্যবহার করবেন।
৪। একটু সাদা চন্দন।
৫। একটুখানি আতপ চাল।
৬। কয়েকটি ফুল ও দুটি বেলপাতা (বেলপাতা না থাকলে দুটি তুলসীপাতা দিতে পারেন)।
৭। ধূপ, দীপ।
৮। নৈবেদ্য ও পানীয় জল (আপনার সাধ্য ও ইচ্ছামতো দেবেন। একটা বাতাসা হলেও চলবে।)
৯। প্রণামী (অন্তত একটি টাকা দেবেন। ইচ্ছা করলে বেশিও দিতে পারেন।)
১০। একটি ঘণ্টা।

উপচার সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞাতব্য হল এই যে, চন্দন, ফুল-বেলপাতা, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য এই পঞ্চোপচার পূজার ক্ষেত্রে অপরিহার্য্য। কোনো একটি উপচারের অভাব ঘটলে, সেই উপচারের নাম করে একটু জল দিলেও চলবে। আপনার প্রকৃত ভক্তিই সেই অভাব পূর্ণ করবে, এই কথা জানবেন।

শিবপূজা সর্বদা উত্তরমুখে বসে করবেন এবং শিবলিঙ্গকেও উত্তরমুখী করে রাখবেন। উত্তরদিক ব্রহ্মলোকপথ। তাই পরমব্রহ্মময় শিবের পূজা সর্বদা উত্তরমুখে বসে করাই নিয়ম। শিবলিঙ্গকে তামা বা পাথরের পাত্রে বসানো হয়ে থাকে।

পূজার সাধারণ ক্রম ও সেই সব ক্রিয়াকাণ্ডের অর্থ
==================================
মন্ত্রপাঠ ও ক্রিয়াকাণ্ড অর্থ জেনে করাই উচিত। তাই পূজাপদ্ধতি-বলার আগে তার ক্রম ও ক্রিয়াকাণ্ডের ভাবার্থ বলে দেওয়া ভাল। প্রথমেই আচমন করতে হয়। দেহ ও মন শুদ্ধ না হলে ঈশ্বরপূজার অধিকার জন্মায় না। তাই পূজার সময় প্রথমেই দেহ ও মন শুদ্ধ করতে হয়। দেহ ও মন শুদ্ধ করব কিভাবে? এর উপায় বিষ্ণুস্মরণ। আচমনের মন্ত্রের অর্থটি তাই—‘ আকাশে সূর্যের মতো বিদ্যমান ঈশ্বরকে ব্রহ্মজ্ঞরা সর্বদা দর্শন করেন, আমরাও যেন তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। যে বিষ্ণু সকল অপবিত্রতা দূর করেন, সেই বিষ্ণুকে স্মরণ করে আমরাও যেন দেহে ও মনে শুদ্ধ হতে পারি।’ তারপর স্বস্তিবাচন। স্বস্তিবাচন হল পূজার সাফল্য ও অপরের কল্যাণ কামনা। অপরের কল্যাণ কামনা না করলে কোনো পূজা ফলপ্রসূ হয় না। অপরের অকল্যাণ কামনা করে পূজা করলে, নিজেরই অকল্যাণ হয়। তাই পূজার আগে বিশ্বের সকলের কল্যাণ কামনা করতে হয়।

তারপর জলশুদ্ধি করতে হয়। জলশুদ্ধি আর কিছুই না, যে জলে দেবতার পূজা হয়, সেই জলে তীর্থের আবাহন। জলশুদ্ধির মন্ত্রে সূর্যমণ্ডল থেকে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী—এই সপ্ত পবিত্র নদীদেবীকে জলে আহ্বান করে জলকে শুদ্ধ করে নেওয়া হয়। সেই জল নিজের মাথায় দিলে তীর্থস্নানের ফল হয় আর পূজাদ্রব্যের উপর দিলে সেই সব দ্রব্য শুদ্ধ হয়ে যায়। তারপরসূর্যার্ঘ্য দিতে হয়। সূর্য আমাদের প্রাণের উৎস, সে কথা আধুনিক বিজ্ঞানও মানে। তাই হিন্দুদের পূজার আগে সূর্যকে অর্ঘ্য দিয়ে প্রণাম করার নিয়ম। প্রত্যক্ষ দেবতার প্রতি এ আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধাপ্রদর্শন। এরপর গুরুদেব, পঞ্চদেবতা, নবগ্রহ, ইন্দ্রাদি দশদিকপাল, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার ও ইষ্টদেবতা এবং সর্বদেবদেবীর পূজা। এর মাধ্যমে অন্যান্য দেবদেবীদেরও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতার ছবি বা বিগ্রহ থাকলে, তাঁদেরও এই সময় পূজা করে নেবেন।

তারপর শিবকে স্নান করানো হয়। এখান থেকেই প্রধান পূজা শুরু। স্নানের পর শিবের ধ্যান করে প্রথমে মনে মনে ও পরে উপচারগুলি নিবেদন করে পূজা করবেন। এই সব উপচারই তো ঈশ্বরের সৃষ্ট। তবে এগুলি দিয়ে কেন ঈশ্বরের পূজা করা হয় কেন? কেনই বা এই সব উপচার দেওয়ার নিয়ম। ঈশ্বর আমাদের মালিক, আমরা তাঁর দাস। আমাদের বাড়ির কাজের লোক, নিজের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র এনে আমাদের ঘরের কাজ করে দেয়? আমাদেরই তাকে সামগ্রী জোগাতে হয়। সেই সামগ্রী দিয়ে সে আমাদেরই সেবা করে। ঈশ্বর তেমনই জগতের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, সেই সৃষ্টি দিয়ে যেন আমরা তাঁর সেবা করতে পারি। যে পঞ্চোপচার পূজার কথা বলা হয়েছে, সেই পঞ্চোপচার—অর্থাৎ, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য হল আমাদের প্রাণধারণের প্রধান অবলম্বন পৃথিবী, আকাশ, বায়ু, আগুন ও জলের প্রতীক। এই সব উপচার দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করি, ঈশ্বরের সৃষ্টি এই সব জিনিস আমরা ঈশ্বরের প্রসাদ রূপে গ্রহণ করছি, স্বার্থপরভাবে আপনার সুখের জন্য ভোগ করছি না। উপরন্তু স্বয়ং আমাদের এইভাবেই তাঁর পূজা করতে শিখিয়েছেন। একথাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। পূজার পর জপ করা হয়। জপমাহাত্ম্য দীক্ষিত ব্যক্তিমাত্রেই জানেন, তাই তা আর বলা হল না। জপের পর প্রণাম। প্রণাম করার আগে প্রণামী দেওয়া হয়। এটিও প্রতীকী। আমাদের অর্থাগম হয় ঈশ্বরের কৃপায়, তাই অর্থের অহংকারে আমরা যেন ঈশ্বরকে না বিস্মৃত হই এবং ঈশ্বরের দেওয়া অর্থে ঈশ্বরের সেবায় কোনো কার্পণ্য না দেখাই। অন্য মতে, ঈশ্বরকে আমরা যা দিই, তাই ঈশ্বর সহস্রগুণে আমাদের ফিরিয়ে দেন। প্রণামীর টাকা নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করবেন না। বরং গরিবদুঃখীকে দেবেন। তাতে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ হবে। কিন্তু এটি সকাম ভক্তদের মত। পূজার পর স্তবপাঠাদি করা হয়। এতে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বাড়ে। ঈশ্বরও স্তবপাঠ শুনে প্রসন্ন হন।

পূজাপদ্ধতি
----------------
প্রথমে স্নান ও গুরুনির্দেশিত উপাসনাদি সেরে আসনে বসে শিব ও দুর্গাকে প্রণাম করবেন। তারপর শ্রীগুরু ও ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে ইষ্টমন্ত্র যথাশক্তি জপ করবেন। অদীক্ষিত ও বালকবালিকারা শুধু স্নান সেরে শিবদুর্গাকে প্রণাম করে বসবেন। পূজাস্থান আগেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ধূপদীপ জ্বালিয়ে নেবেন। তারপর নারায়ণকে মনে মনে নমস্কার করে পূজা শুরু করবেন।

মন্ত্রপাঠ সহ পূজা
-------------------------
হাতের তালুতে দু-এক ফোঁটা জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে পান করবেন। মোট তিন বার এইভাবে জল পান করতে হবে। তারপর করজোড়ে বলবেন—
ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্।
ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।
যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।

তারপর পবিত্র বাদ্য ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে স্বস্তিবাচন করবেন—

ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ পূণ্যাহং ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ পূণ্যাহং ওঁ পূণ্যাহং ওঁ পূণ্যাহং।
ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ স্বস্তি ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।
ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ ঋদ্ধিং ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ ঋদ্ধতাম্ ওঁ ঋদ্ধতাম্ ওঁ ঋদ্ধতাম্।
ওঁ স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্ববেদাঃ।
স্বস্তি নস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।

এরপর হাত জোড় করে বলবেন—

ওঁ সূর্যঃ সোমো যমঃ কালঃ সন্ধ্যে ভূতান্যহঃ ক্ষপা। পবনো দিক্পতির্ভূমিরাকাশং খচরামরাঃ।
ব্রাহ্মং শাসনমাস্থায় কল্পধ্বমিহ সন্নিধিম্।।

এরপর জলশুদ্ধি করে নেবেন। জলশুদ্ধির মাধ্যমে সূর্যমণ্ডল থেকে সকল তীর্থকে জলে আহ্বান করে জলকে পবিত্র করা হয়। তারপর সেই পবিত্র জলে পূজার কাজ হয়। ঠাকুরের সামনে নিজের বাঁ হাতের কাছে কোশা রেখে তাতে জল দেবেন। সেই জলে আলতো করে ডান হাতের মধ্যমা আঙুল ঠেকিয়ে (নখ যেন না ঠেকে) বলবেন— ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু-কাবেরি জলেঽস্মিন সন্নিধিং কুরু। তারপর সেই জলে একটা সচন্দনফুল দিয়ে মনে মনে তীর্থদেবতাদের পূজা করবেন। এতে সকল তীর্থের পূজা করা হয়ে যায়। তীর্থপূজা সেরে নিয়ে সেই জল নিজের মাথায় একটু দেবেন। তারপর পূজার সকল দ্রব্যে ছিটিয়ে সব কিছু শুদ্ধ করে নেবেন। তারপর সূর্যের উদ্দ্যেশ্যে একটু জল শিবলিঙ্গে দেবেন। সূর্যকে জল দিয়ে সূর্যপ্রণাম করবেন—
ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।
ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোঽস্মি দিবাকরম্।।

তারপর একে একে গণেশ, শ্রীগুরু, শিব, সূর্য, নারায়ণ, দুর্গা, নবগ্রহ, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, সর্বদেবদেবী ও আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতা থাকলে তাঁদেরকে এবং আপনার ইষ্টদেবতাকে প্রত্যেককে একটি করে সচন্দন ফুল দিয়ে পূজা করবেন। অত ফুল না থাকলে প্রত্যেকে নামে জলশুদ্ধির জল একটু করে শিবলিঙ্গে দেবেন। শিবলিঙ্গে সব দেবদেবীর পূজা হয়, তাই কোনো দেবতার ছবি বা মূর্তি আপনার কাছে না থাকলে তাঁর বা তাঁদের পূজা শিবলিঙ্গেই করতে পারেন।

তারপর শিবঠাকুরকে স্নান করাবেন। একঘটি জল নেবেন। তাতে জলশুদ্ধির জল একটু মিশিয়ে নিতে পারেন বা জলশুদ্ধির পদ্ধতিতে সেই জলটিকেও শুদ্ধ করে নিতে পারেন। তারপর স্নানের মন্ত্রটি পড়ে বাঁ হাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে স্নান করাবেন। স্নানের মন্ত্রটি হল—

ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাত্।।

ওঁ তত্পুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াত্ ওঁ।

স্নান করিয়ে শিবের ধ্যান করবেন (ধ্যানের মন্ত্রটি বঙ্গানুবাদ সহ শেষে দেওয়া আছে) চোখ বন্ধ করে শিবের রূপটি চিন্তা করতে করতে ধ্যানমন্ত্রটি স্মরণ করে ধ্যান করতে পারেন। মন্ত্রটি মুখস্ত না থাকলে, প্রথমে একবার পাঠ করে নিয়ে চোখ বুজে শিবের রূপ ধ্যান করবেন। এইভাবে কয়েক বার করলেই মন্ত্র মুখস্ত হয়ে যাবে, তখন আর মন্ত্রপাঠ না করলেও চলবে। ধ্যানের সময় ভাববেন, আপনি চন্দন, ফুল, বেলপাতা, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য দিয়ে সাক্ষাত্ শিবের পূজা করছেন। শিবঠাকুরও প্রসন্ন হয়ে আপনার পূজা নিচ্ছেন।

এইভাবে কিছুক্ষণ ধ্যান করে পঞ্চোপচারে পূজা করবেন। প্রথমে একটি ফুলে চন্দন মাখিয়ে গন্ধদ্রব্য দেবেন। মন্ত্র—ওঁ নমো শিবায় এষ গন্ধঃ শিবায় নমঃ। তারপর আবার একটি সচন্দন ফুল দিয়ে বলবেন— ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনপুষ্পং শিবায় নমঃ। তারপর চন্দনমাখানো বেলপাতা নেবেন— ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনবিল্বপত্রং শিবায় নমঃ।—মন্ত্রে বেলপাতাটি শিবের মাথায় দেবেন। তারপর ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য ও জল দেবেন—ওঁ নমো শিবায় এষ ধূপঃ শিবায় নমঃ। ওঁ নমো শিবায় এষ দীপঃ শিবায় নমঃ।ওঁ নমো শিবায় ইদং সোপকরণনৈবেদ্যং শিবায় নিবেদয়ামি। ওঁ নমো শিবায় ইদং পানার্থোদকং শিবায় নমঃ। মালা থাকলে ‘ওঁ নমো শিবায় ইদং পুষ্পমাল্যং শিবায় নমঃ’ মন্ত্রে পরাবেন। তারপর সচন্দন ফুল ও বেলপাতা নিয়ে ১, ৩ বা ৫ বার নিম্নোক্ত মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন—ওঁ নমো শিবায় এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি নমো শিবায় নমঃ। এরপর অঙ্গপূজা করতে হয়। অঙ্গপূজা হল শিবের পরিবার ও সাঙ্গোপাঙ্গোদের পূজা।—
ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ গৌর্যৈ নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ অষ্টমূর্তিভ্যো নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ ব্রাহ্ম্যাদ্যাষ্টমাতৃকাভ্যো নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ গণেভ্যো নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ বৃষভায় নমঃ।
এই পাঁচটি মন্ত্র পড়ে প্রত্যেকের নামে একটি করে ফুল বা একটু করে জলশুদ্ধির জল দেবেন।
তারপর আপনার গুরুমন্ত্র ১০৮ বার জপ করবেন। জপ করে হাতে একটু জল নিয়ে শিবকে দিয়ে বলবেন, এই নাও আমার জপের ফল, আমি তোমাকেই সমর্পণ করলাম।
তারপর ঠাকুরকে একটি টাকা (ইচ্ছা করলে বেশিও দিতে পারেন) প্রণাম করবেন—

নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।

পূজার পর সময় পেলে শিবের স্তবস্তোত্রাদিও পাঠ করতে পারেন।

মন্ত্রপাঠে অসমর্থ ব্যক্তিদের জন্য
======================
প্রথমে মনে মনে বিষ্ণুকে স্মরণ করে বলবেন—‘হে ঈশ্বর, তোমাকে আকাশের সূর্যের মতো যেন দেখতে পাই। তুমি পতিতপাবন, আমার সব পাপ মার্জনা করে, আমাকে দেহ ও মনে শুদ্ধ করে তোমার পূজার উপযোগী করে নাও।’ তারপর সর্বান্তকরণে বিশ্বের সকলের কল্যাণ কামনা করবেন। তারপর গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী—এই সাত নদীমাতাকে পাত্রের জলে আহ্বান করবেন। মনে করবেন, তাঁরা যেন সূর্যমণ্ডল থেকে নেমে এসে সেই জলে অবস্থান করলেন। তারপর একটি চন্দন-মাখানো ফুল দিতে তাঁদের পূজা করবেন। সেই জল মাথায় নেবেন, সকল পূজাদ্রব্যের উপর ছিটিয়ে দেবেন। পানের জল ছাড়া পূজার সব কাজে যেখানে জল দেওয়ার কথা আছে, সেখানে এই জলই দেবেন। তারপর কুশীতে করে একটু জল নিয়ে সূর্যের উদ্দেশ্যে দেখিয়ে শিবলিঙ্গের উপর দেবেন। সূর্যকে প্রণাম করবেন। তারপর একে একে গণেশ, শ্রীগুরু, শিব, সূর্য, নারায়ণ, দুর্গা, নবগ্রহ, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, সর্বদেবদেবী ও আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতা থাকলে তাঁদেরকে এবং আপনার ইষ্টদেবতাকে প্রত্যেককে একটি করে সচন্দন ফুল দিয়ে পূজা করবেন। অত ফুল না থাকলে প্রত্যেকে নামে জলশুদ্ধির জল একটু করে শিবলিঙ্গে দেবেন। এবার ঘণ্টা বাজিয়ে এক ঘটি জলে শিবঠাকুরকে স্নান করাবেন। স্নানের জলে ওই সাত নদীমাতাকে আহ্বানকরা তীর্থজল একটু মিশিয়ে নেবেন। তারপর শিবের ধ্যানমন্ত্রটির বাংলা অর্থ ধরে মনে মনে তাঁর মূর্তিচিন্তা করবেন, ভাববেন তিনি আপনার হাত থেকে চন্দন, ফুল-বেলপাতা, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য গ্রহণ করছেন। তারপর একে একে ‘ওঁ নমো শিবায়’ বলে বলে ওই সকল উপচার শিবলিঙ্গে দেবেন বা শিবকে দেখাবেন। মালা থাকলে পরাবেন। তারপর পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। কোনো উপচার না থাকলে, সেই উপচারের নাম করে জল দেবেন। তারপর মা গৌরী ও শিবের সাঙ্গোপাঙ্গোদের নামে দুটি ফুল বা একটু জল দেবেন শিবলিঙ্গে। তারপর জপ করে হাতে একটু জল নিয়ে সেই জল শিবকে দিয়ে বলবেন, এই নাও আমার জপের ফল আমি তোমাকে দিলাম। তারপর ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্রেই প্রণামী দিয়ে প্রণাম করবেন। সকল কাজই ভক্তিসহকারে করবেন। ঈশ্বর আপনার পূজা অবশ্যই গ্রহণ করবেন, এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন।

ধ্যানমন্ত্র
========
ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং
রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।
পদ্মাসীনং সমন্তাত্ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং
বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।।

ওঁ তত্পুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াত্ ওঁ।

বাংলা অর্থ— রজতগিরির ন্যায় তাঁহার আভা, যিনি সুন্দর চন্দ্রকে ভূষণরূপে ধারণ করিয়াছেন, যাঁহার দেহ রত্নময় বেশভূষায় উজ্জ্বল, যিনি পদ্মাসনে উপবিষ্ট, আনন্দময় মূর্তি, চতুর্দিকে দেবতারা তাঁহার স্তব করিতেছেন, যিনি ব্যাঘ্রচর্ম- পরিহিত, যিনি জগতের আদি, জগতের কারণ, সকল প্রকার ভয় নাশক, পঞ্চবদন এবং প্রতিটি বদনে তিনটি চক্ষু, সেই মহেশকে নিত্য এইরূপ ধ্যান করতে হবে।

--------------------------------------------------------------------------
কৃতজ্ঞতা স্বীকার -- আমার পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীগুরুদেব।
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
Share:

০২ ডিসেম্বর ২০১৫

শিবের শরীর পাঁচটি মন্ত্র দ্বারা গঠিত এগুলিকে বলা হয় পঞ্চব্রহ্মণ

কথিত আছে, শিবের শরীর পাঁচটি মন্ত্র দ্বারা গঠিত। এগুলিকে বলা হয় পঞ্চব্রহ্মণ। দেবতা রূপে এই পাঁচটি মন্ত্রের নিজস্ব নাম ও মূর্তিতত্ত্ব বর্তমান:

সদ্যোজাত
বামদেব
অঘোর
তত্পুরুষ
ঈশান


শিবের মূর্তি এই পাঁচটি রূপ পঞ্চাননের আকারে কল্পিত হয়। বিভিন্ন শাস্ত্রে এই পাঁচটি রূপ পঞ্চভূত, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই পাঁচটি মন্ত্র যথাক্রমে ঈশ্বরের মস্তক, বদন, হৃদয়, গুহ্য ও পাদস্বরূপ, এবং যথাক্রমে অনুগ্রহ, তিরোভাব, প্রলয়, স্থিতি ও সৃষ্টিরূপ পঞ্চ কৃত্যেরও কারণ। পতি, পশু ও পাশ ভেবে পদার্থ তিন প্রকার; পতি পদার্থ ভগবান্ শিব, এবং যাঁহারা শিবত্ব পদ প্রাপ্ত হইয়াছেন তাঁহারা, আর শিবত্বপদপ্রাপ্তিসাধন দীক্ষাদি উপায় সকল। পশু পদার্থ জীবাত্মা। ঐ জীবাত্মা মহৎ, ক্ষেত্রজ্ঞাদিপদবাচ্য, দেহাদিভিন্ন, সর্ব্বব্যাপক, নিত্য, অপরিচ্ছিন্ন, দুর্জ্ঞেয় ও কর্ত্তা স্বরূপ। পাশপদার্থ মল, কর্ম্ম, মায়া ও বোধশক্তি ভেদে চার প্রকার। স্বাভাবিক অশুচিকে মল বলে, যেমন চাল তুষদ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে থাকে, সেই রকম ঐ মল দৃক্শক্তি ও ক্রিয়াশক্তিকে আচ্ছাদন করে থাকে।

শিব-অঘোর সাধনায় খুব সুন্দরভাবে, নির্মল চিত্তে কঠোর অথচ ক্রয়ামূলক গুরুমুখী সাধনা-প্রক্রিয়ায় সাধক মনঃ, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্তস্বরূপ অন্তঃকরণ; ভোগসাধন, কলা, কাল, নিয়তি, বিদ্যা, রাগ, প্রকৃতি ও গুণ এই সপ্ত তত্ত্ব; পৃথিবী, জল, তেজঃ, বায়ু ও আকাশ এই পঞ্চভূত; এবং ওই পঞ্চভূতের কারণ স্বরূপ পঞ্চতন্মাত্র চক্ষুঃ, ত্বক্, শ্রোত্র, ঘ্রাণ ও রসনা এই পাঁচটী জ্ঞানেন্দ্রিয়; বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু ও উপস্থ এই পাঁচটী কর্ম্মেন্দ্রিয়; সমুদায়ে একত্রিংশত্তত্ত্বাত্মক সূক্ষ্ম দেহকে লয় করে মন্ত্রেশ্বর পদবী লাভ ও ক্রমে মুক্তি লাভ করেন। খুব কম কথায় এই হল অঘোর সাধনা।

ওঁ অঘোরেভ্য ঘোরেভ্য ঘোরাঘোরেভ্য সর্বেভ্য সর্বাসর্বেভ্য নমস্তঽস্তু রুদ্ররূপেভ্য ------
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
Share:

শিবই সর্বভারতীয় প্রধান দেবতা

শিবই সর্বভারতীয় প্রধান দেবতা। শিবের ইতিহাস কম বিস্ময়কর নয়। কেননা, শিব অনার্য দেবতা, বৈদিক দেবতা নন; ব্রহ্মা, বিষ্ণু-প্রমূখ বৈদিক দেবতাকে অপসারণ করে শিবের সর্বভারতীয় দেবতায় মর্যাদা লাভ যেন ভারতীয় অনার্য ভূমিপুত্রদের বিজয়েরই প্রতীক। শিবের স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে -- শিব ও দুর্গা। সুখতৃষ্ণার্ত মানুষের একান্ত মনের প্রতিচ্ছবি। এ রকম সুখি যুগল জীবন মানুষের জন্মজন্মান্তরের কামনা। দেবী দুর্গার পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীরচন্দ্র সরকার লিখেছেন, ‘পরমাপ্রকৃতি, বিশ্বের আদি কারণ ও শিবপত্নী।’
এই বাক্যটিতে যেন দেবী দুর্গার প্রকৃত পরিচয় অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে -- যে রূপসী মাতৃদেবী বাংলায় পূজিত হন শরত্কালে, যখন নীলাভ আকাশে ফুরফুরে হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় সাদা সাদা মেঘের ভেলা, নদীর ধারে উজ্জ্বল রোদে ফুটে থাকে বাতাসে দোল খাওয়া শাদা শাদা কাশের ফুল আর গ্রামীণ জনপদে দেবীর আগমনী ঘোষনায় উন্মাতাল ঢাকের শব্দে বাঙালির আদিম রক্তস্রোতে জেগে ওঠে এক আদিম মাতৃভক্ত নিষাদ। অস্ট্রিকভাষী নিষাদেরা প্রাচীন বাংলার গভীর অরণ্যে ‘বোঙ্গা’ দেবতার পূজা করত। কোনও কোনও পন্ডিতের ধারণা ওই ‘বোঙ্গা’ থেকেই বাংলা শব্দের উদ্ভব। মনে রাখতে হবে - প্রাচীন বৈদিক আর্যরা করত যজ্ঞ। সে যজ্ঞে পশুবলি হত। বাংলা, প্রাচীন কাল থেকেই যজ্ঞ না করে করত 'পূজা'। বাংলা অবৈদিক আর অনার্য বলেই চিরকালই ছিল পূজার্চনার দেশ। বাঙালি সুপ্রাচীন কাল থেকেই বহু লোকায়ত দেবদেবীর পূজার্চনা করত। গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসুর "বাংলার লৌকিক দেবতা" বইটি থেকে আমরা প্রায় পঁয়ত্রিশটি লৌকিক দেব-দেবীর নাম জানতে পেরেছি। এরা আসলে ছিল বৌদ্ধধর্মের দেবদেবী, বাংলায় বৌদ্ধযুগের অবসানকালে শিবের পক্ষভুক্ত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, বাংলার হিন্দুধর্মটি হল তান্ত্রিক হিন্দুধর্ম। তন্ত্র হল বেদবিরোধী এবং সাধনার বিষয়। যে কারণে বাঙালি তান্ত্রিকেরা দুর্গাকে পরমাপ্রকৃতি, বিশ্বের আদি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর পৌরাণিক আর্যদের মতে দুর্গা ব্রহ্মা, শিব ও বিষ্ণু কর্তৃক সৃষ্ট দেবী ! সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আজ বাঙলার 'তন্ত্র-সাধনায়' দুর্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে 'মার্কেণ্ডেয় পুরাণ'-এর রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য-এর হাত ধরে আর সেই ঘটনাচক্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন মেধস মুনি। এই ভাবেই আদিম শুদ্র জনজাতি তথাকথিত ব্রাহ্মণ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল।
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
Share:

০৬ নভেম্বর ২০১৫

নদী শুকোতেই জেগে উঠছে হাজার শিবলিঙ্গ

প্রচণ্ড গরমে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী। আর সেই শুকনো নদী খাতে ফুটে উঠছে হাজার হাজার শিবলিঙ্গ! আশ্চর্য এই ঘটনার সাক্ষী কর্ণাটকের শালমালা নদী। উত্তর কর্ণাটকের সিরসি এলাকা থেকে ১৭ কিলোমিটারের মধ্যেই শালমালা নদীখাতে এই হাজার শিবলিঙ্গ ক্রমশ পরিস্ফুট হয়ে উঠছে।

ঈশ্বর-বিশ্বাসীদের মধ্যে এই ঘটনা আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। পাথরে খোদাই এই সব শিবলিঙ্গ চাক্ষুস করতে এই এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন বহু পর্যটক। শিবরাত্রিতেও বহু পূণ্যার্থী সমাগম হচ্ছে এখানে। নদীখাতে শিবলিঙ্গগুলির সামনে রয়েছে নন্দীও।


ইতিহাসবিদরা অবশ্য এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১৬৭৮ থেকে ১৭১৮-র মধ্যে সিরসির রাজা সদাশিবরায় শালমালা নদীখাতে এই শিবলিঙ্গ ও নন্দীর মুর্তি তৈরি করান। মনে করা হয়, সদাশিবরায়ের রাজত্ব অবসানের কিছু পরপরই শালমালা নদীতে জলস্তর বৃদ্ধি পায়। জলের নিচে হারিয়ে যায় হাজার হাজার শিবলিঙ্গ। গত কয়েক ​বছরের শুষ্ক আবহাওয়ায় আবার সেগুলি ফুটে ওঠে।

শুধু কর্ণাটক নয়, নদীখাতে ঠিক একইরকম সহস্রলিঙ্গ রয়েছে ভারতের বাইরেও। কম্বোডিয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দু মন্দির আঙ্কোরভাট থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে


নদীখাতে রয়েছে পাথরে খোদাই হাজার হাজার শিবলিঙ্গ। এই সব লিঙ্গ পুজো করা না হলেও সারা বছরই গোটা বিশ্ব থেকে বহু পর্যটক এখানে আসেন। শিবলিঙ্গ ছাড়াও লক্ষ্মী, রাম ও হনুমানের পাথরে খোদাই করা মুর্তিও রয়েছে এখানে। ঠিক কত বছর আগে কে এই মুর্তিগুলি তৈরি করেছিলেন, তার খোঁজ এখনও পাননি ইতিহাসবিদরা। কম্বোডিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বহু হিন্দু মন্দির ও দেবদেবীর মুর্তি ধ্বংস করা হলেও, এই সহস্রলিঙ্গে কখনও ধ্বংসের হাত পড়েনি।
Share:

১২ এপ্রিল ২০১৫

শিবের ধ্যান


শিবের ধ্যানঃ-
ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতসং ।
রত্নাকল্লোজ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্ ।।
পদ্মাসীনং সমস্তাৎ স্ততমমরগণৈ - র্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং ।
বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চাবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্ ।।
( অর্থ- রজত গিরির ন্যায় শুভ্রোজ্জল কান্তি শিবকে ধ্যান করি । মনোহর চন্দ্রকলা তাঁর ললাট ভূষণ , রত্নময় ভূষনে তাঁর দেহ সমুজ্জ্বল । তদীয় বাম হস্ত দ্বয়ে পরশু ও মৃগ মুদ্রা । দক্ষিণ হস্ত দ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা । তিনি ব্যাঘ্র চর্ম পরিধান করে পদ্মাসনে প্রফুল্ল ভাবে সমাসীন । দেব গন চতুর্দিক হতে তাঁর স্তব স্তুতি করছেন । তিনিই বিশ্বের আদি ও মূল কারন এবং নিখিল ভয়নাশক। তিনি পঞ্চ আনন বিশিষ্ট এবং তাঁর প্রতি আননে তিন তিনটি নয়ন । )
এক শিবই নানারূপে নানা নামে নানা স্থানে বিরাজিত। বারানসীতে মহাদেব, প্রয়োগে মহেশ্বর, নৈমিষক্ষেত্রে দেবদেব , গয়া তীর্থে প্রপিতামহ, কুরুক্ষেত্রে কালেশ, প্রভাসে শশিভূষণ, পুষ্করে অয়োগদ্ধ, বিমলেশ্বরে বিশ্ব, অট্টহাসে মহানাদ, মরুকোটে মহোৎকট, শঙ্কুকর্ণে মহাতেজঃ, গোকর্ণে মহাবল, রুদ্রকোটিতে মহাযোগী, স্থলেশ্বরে মহালিঙ্গ, অবন্তীতে মহাকাল, মধ্যমেশ্বরে শর্ব , কেদারে ঈশান দেব, হিমালয়ে রুদ্র, সুবর্ণাক্ষে সহস্রাক্ষ, বৃষে বৃষভধ্বজ, কনখলে উগ্র, ভদ্রকর্ণ হ্রদে শিব, ভৈরবে ভৈরবাকার, ভদ্রপথে ভদ্র, মঙ্গলভাণ্ডে কপর্দী, কালঞ্জরে নীলকণ্ঠ, কাশ্মীরে বিজয়, দেবিকায় উমাপতি, পুরচন্দ্রে তিনিই শঙ্কর। শুধু কি পৃথিবীতে? সত্যলোকে তিনিই ব্রহ্মেশ্বর, বৈকুন্ঠে তিনি সদাশিব, অমরাবতীতে তিনিই অমরেশ্বর, বরুণালয়ে তিনি বরুণেশ্বর, যমালয়ে তিনি কালেশ্বর, বায়ুলোকে পবনেশ্বর, পাতালে হাটকেশ্বর ।
পুরান শাস্ত্রে দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের কথা পাওয়া যায়। দেবতা ও অসুর রা মিলে ক্ষীর সমুদ্র মন্থন করেছিল। সেই মন্থন চলাকালীন ভয়ানক কালকূট বিষ উথিত হয়ে আসে। সেই বিষের বিষাক্ত প্রভাবে সকলেই বিপদগ্রস্ত হয়ে মহাদেবকেই স্মরণ করলেন । মহাদেব এসে সকলকে অভয় দিয়ে সেই বিষ পান করে ধারন করলেন কন্ঠে। বিষের প্রভাবে শিবের কন্ঠ নীল বর্ণ হওয়ায় দেবাদিদেবের একনাম নীলকণ্ঠ। আমাদের অন্তরে যে বিষবাস্প আছে ? তা হরণ করবে কে ? করবেন তিনিই। যিনি শিব। তিনি নীলকণ্ঠ।

Sumon Basak
Share:

শিবলিঙ্গ(ইষ্ঠ লিঙ্গ,ভব লিঙ্গ,প্রাণ লিঙ্গ) :

শিবলিঙ্গ বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে।ইষ্ঠ লিঙ্গ,ভব লিঙ্গ ও প্রাণলিঙ্গ। শিব শব্দের অর্থ মঙ্গলময় এবং লিঙ্গ শব্দের অর্থ প্রতীক; এই কারণে শিবলিঙ্গ শব্দটির অর্থ সর্বমঙ্গলময় বিশ্ববিধাতার প্রতীক।লিঙ্গ তথা লিন্ ও অঙ্গা তথা আত্মা দ্বারা যুক্ত একটি শব্দ,যাতে আত্মা ও পরমাত্মার সার বিদ্যমান। শিব শব্দের অপর একটি অর্থ হল যাঁর মধ্যে প্রলয়ের পর বিশ্ব নিদ্রিত থাকে;এবং লিঙ্গ শব্দটির অর্থও একই – যেখানে বিশ্বধ্বংসের পর যেখানে সকল সৃষ্ট বস্তু বিলীন হয়ে যায়। যেহেতু হিন্দুধর্মের মতে, জগতের সৃষ্টি, রক্ষা ও ধ্বংস একই ঈশ্বরের দ্বারা সম্পন্ন হয়, সেই হেতু শিবলিঙ্গ স্বয়ং পরম ঈশ্বরের প্রতীক রূপে পরিগণিত হয়।ইষ্ঠ লিঙ্গ,যেখানে স্বয়ম মহেশ্বর বিদ্যমান,এই লিঙ্গে ভগবান ভক্তকে বরদান করেন।ভব লিঙ্গ,এতে ভগবান সদাশিব নিরাকার,এই লিঙ্গ অন্তর আত্মা দ্বারা দৃশ্যমান হয়,এটি স্থান বা সময়ের অধীন নয়।প্রাণ লিঙ্গ,ইহা পরমেশ্বরের সত্য,যা কঠোর তপস্যা দ্বারা প্রাপ্ত হয়,ভারতের কেদারনাথ শিবলিঙ্গ প্রাণ লিঙ্গ।
অথর্ববেদ সংহিতা গ্রন্থে যূপস্তম্ভ নামে একপ্রকার বলিদান স্তম্ভের স্তোত্রে প্রথম শিব-লিঙ্গ পূজার কথা জানা যায়। এই স্তোত্রের আদি ও অন্তহীন এক স্তম্ভ বা স্কম্ভ-এর বর্ণনা পাওয়া যায়। এই স্কম্ভ-টি চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত। যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, ছাই, সোম লতা, এবং যজ্ঞকাষ্ঠবাহী ষাঁড়ের ধারণাটির থেকে শিবের উজ্জ্বল দেহ, তাঁর জটাজাল, নীলকণ্ঠ ও বাহন বৃষের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তাই মনে করা হয়, উক্ত যূপস্তম্ভই কালক্রমে শিবলিঙ্গের রূপ ধারণ করেছে।
১৯০০ সালে প্যারিস ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেসে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে বৈদিক যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ ধারণা থেকে। যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ হল বলিদানের হাঁড়িকাঠ। এটিকে অনন্ত ব্রহ্মের একটি প্রতীক মনে করা হয়।
শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ।
শিব এক অনাদি অনন্ত লিঙ্গস্তম্ভের রূপে আবির্ভূত, বিষ্ণু বরাহ বেশে স্তম্ভের নিম্নতল ও ব্রহ্মা ঊর্ধ্বতল সন্ধানে রত। এই অনাদি অনন্ত স্তম্ভটি শিবের অনাদি অনন্ত সত্ত্বার প্রতীক মনে করা হয়।
আবার কেউ কেউ শিব লিঙ্গের ব্যাখ্যা দেন এভাবে, ইহা গোল কিম্বা উপবৃত্তাকার যা কোন বৃত্তাকার ভূমি (base ) কে কেন্দ্র করে স্থাপিত । এই গোল ভূমি কে আদি পরশক্তি বা চূড়ান্ত শক্তি ।আর সেই গোল কিম্বা বৃত্তাকার অংশ দ্বারা অসীম কে বোঝান হয় যার কোন আদি অন্ত নেই অর্থাৎ যা সর্ববিরাজমান । সর্ববিরাজমান অর্থ হল যা সব জায়গায় অবস্থিত ।ইহা দ্বারা বোঝান হয় ঈশ্বর নির্দিষ্ট আকার নাও থাকতে পারে। ঈশ্বর আদি অন্ত জুড়ে সর্বত্র বিরাজমান।
লিঙ্গ শব্দের অর্থ হলো সূক্ষ দেহ। এই দেহটিতে যুক্ত আছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় এবং পাঁচটি প্রান অপান বায়ু, মন ও বুদ্ধি-মোট ১৭টি অবয়ব যুক্ত দেহ। সকল সৃষ্টিরই সূক্ষ শরীর আছে। আমাদের যখন মৃত্যু হয় তখন জীবাত্মা সূক্ষ শরীরে বিচরণ করেন এবং পুনরায় দেহ ধারণ করেন। শিব, রুদ্র, মহাদেব এই তিনটি নামই আমাদের মধ্যে বেশি পরিচিত ও তমোগুণান্বিত আদি দেব। তিনি সংহারক ও মঙ্গল দায়ক। সংহার হতেই আবার সৃষ্টি- এ জন্যই তিনি শিব বা শংকর নামে পরিচিত। যে সুক্ষ শরীরকে আমরা লিঙ্গপূজা নামে পূজা করি তা সৃষ্টির সূক্ষ শরীর প্রকৃতিতে বীজ বপন রুপ সূক্ষ বিষয়টিকে দেখানো হয়েছে।
পঞ্চাক্ষরী মহামন্ত্র ওঁ নমঃ শিবায়।।

Written by:
Shuvo Veer Chowdhury


Share:

শিব লিঙ্গ কী? (পর্ব --১)

এর উত্তরে বলা যায় --- আক্ষরিক বিশ্লেষণে দেখা যায়- ‘শিব’
শব্দের অর্থ ‘মঙ্গল’ আর ‘লিঙ্গ’ শব্দের
অর্থ প্রতীক বা চিহ্ন। শাস্ত্র ‘শিব’
বলতে নিরাকার সর্বব্যাপি পরমাত্মা বা
পরমব্রহ্মকে বোঝায়। তাই ‘শিবলিঙ্গ’
হচ্ছে মঙ্গলময় পরমাত্মার প্রতীক।
[*কেউ কেউ অজ্ঞতা বা হিন্দু বিদ্বেষ থেকে ‘শিবলিঙ্গ’ বলতে পুরুষাঙ্গ বিশেষ মনে
করেন-কিন্তু এটা ভ্রান্ত ধারণা। একথাসহজেই অনুমেয় যে, নিরাকার পরমাত্মার
পুরুষাঙ্গ থাকতে পারে না। লিঙ্গ শব্দের ১০/১২ টি অর্থ কমপক্ষে আছে। তার মধ্যে একটি হল --‘প্রতীক’ বা‘চিহ্ন’। শিবপুরাণ ও অন্যান্য সকলশাস্ত্রেই ‘শিবলিঙ্গ’ বলতে‘পরমব্রহ্মেরপ্রতীক’-ই বোঝানোহয়েছে।]
শাস্ত্র অনুসারে ভগবান শিবব্রহ্ম স্বরূপ হওয়ায় তাঁকে‘নিষ্কল’ (নিরাকার) বলা হয়। যেহেতু তিনি‘সর্বশক্তিমান’ তাই তিনি জগতকল্যাণেরজন্য রূপধারণও করতে পারেন ।রূপবানহওয়ায়তাঁকে‘সকল’ বলা হয়। তাই তিনি‘সকল’ এবং ‘নিষ্কল’-দুইই। শিব নিষ্কল-নিরাকার হওয়ায় তাঁর পূজার আধারভূতলিঙ্গও নিরাকার অর্থাৎ শিবলিঙ্গশিবের নিরাকারস্বরূপেরপ্রতীক।তেমনইশিব সকল বা সাকার হওয়ায় তাঁর পূজারআধারভূত বিগ্রহ সাকাররূপ।‘সকল’ (সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহসাকার) এবং ‘অকল’ (হস্তপদমুখচক্ষুইত্যাদি অঙ্গ-আকার থেকে সর্বতোভাবে রহিত নিরাকার) রূপ হওয়াতেই শিব ‘ব্রহ্ম’ শব্দ দ্বারা কথিতপরমাত্মা।
সে কারনে সকলে লিঙ্গ (নিরাকার স্বরূপ) এবং মূর্তি (সাকার স্বরূপ)-দুয়েতেই পরমেশ্বর শিবের পূজাকরে থাকেন। লিঙ্গ সাক্ষাৎ ব্রহ্মের প্রতীক।
লেখকঃ Prakash Jha, (সম্পাদিত )
Share:

শিব লিঙ্গ কী? (পর্ব --২ )

হাজার বছরের বিদেশি শাসনে পরাধীন থাকায় বিদেশী শাসকগন সনাতন ধর্মকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেছে। শুধু উপাসনালয় ভেঙ্গেই ক্ষান্ত থাকেনি, নানা কুৎসা রটাতেও পিছপা হয়নি। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মুসলিম শাসকরা মন্দির ধ্বংসে মনযোগী ছিল আর ইংরেজরা মন্দির ভাঙ্গেনি ঠিক তবে বুদ্ধিমান পাদ্রীরা আমাদের ধর্মকে আঘাত করেছে অন্যভাবে। ১৮১৫ সালে আ ভিউ অফ দ্য হিস্ট্রি, লিটারেচার, অ্যান্ড মিথোলজি অফ দ্য হিন্দুজ গ্রন্থে লেখক ব্রিটিশ মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ড হিন্দুদের অন্যান্য ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে লিঙ্গপূজারও নিন্দা করেছিলেন। তাঁর মতে লিঙ্গপূজা ছিল, "মানুষের চারিত্রিক অবনতির সর্বনিম্ন পর্যায়"। শিবলিঙ্গের প্রতীকবাদটি তাঁর কাছে ছিল "অত্যন্ত অশালীন; সে সাধারণের রুচির সঙ্গে মেলানোর জন্য এর যতই পরিমার্জনা করা হোক না কেন"। ব্রায়ান পেনিংটনের মতে, ওয়ার্ডের বইখানা "ব্রিটিশদের হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ধারণা ও উপমহাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল।" ব্রিটিশরা মনে করত, শিবলিঙ্গ পুরুষ যৌনাঙ্গে আদলে নির্মিত এবং শিবলিঙ্গের পূজা ভক্তদের মধ্যে কামুকতা বৃদ্ধি করে।প্রতীক।"ডেভিড জেমস স্মিথ প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, শিবলিঙ্গ চিরকালই পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গটি বহন করছে।জেনেন ফলারের মতে, লিঙ্গ "পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে নির্মিত এবং এটি মহাবিশ্ব-রূপী এক প্রবল শক্তির।
আবার ইউরোপের সব বুদ্ধিজীবী হিন্দু বিদ্বেষী ছিল এটা বলা অন্যায় হবে।কারন অনেকেই শিব লিঙ্গ সম্পর্কে উপরোক্ত মতবাদকে গ্রহণ না করে সত্য অনুসন্ধান করেছেন। যেমন ১৮২৫ সালে হোরাস হেম্যান উইলসন দক্ষিণ ভারতের লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় সম্পর্কে একটি বই লিখে এই ধারণা খণ্ডানোর চেষ্টা করেছিলেন।
নৃতাত্ত্বিক ক্রিস্টোফার জন ফুলারের মতে, হিন্দু দেবতাদের মূর্তি সাধারণত মানুষ বা পশুর অনুষঙ্গে নির্মিত হয়। সেক্ষেত্রে প্রতীকরূপী শিবলিঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।কেউ কেউ মনে করেন, লিঙ্গপূজা ভারতীয় আদিবাসী ধর্মগুলি থেকে হিন্দুধর্মে গৃহীত হয়েছে।
এবার আমরা জানব শিবলিঙ্গ আসলে কিঃ
_______________________________________________
শিবলিঙ্গ বা লিঙ্গম্‌ দেবতা শিবের একটি প্রতীক।আমি যদি এক কথায় বলি তাহলে,শিব শব্দের শাব্দিক অর্থ মঙ্গল; আর লিঙ্গ মানে চিহ্ন।অর্থাৎ শিবলিঙ্গ মানে মঙ্গলময় চিহ্ন। হিন্দু মন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবপূজা করা হয়ে থাকে।একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ।
শিব এক অনাদি অনন্ত লিঙ্গস্তম্ভের রূপে আবির্ভূত, বিষ্ণু বরাহ বেশে স্তম্ভের নিম্নতল ও ব্রহ্মা ঊর্ধ্বতল সন্ধানে রত। এই অনাদি অনন্ত স্তম্ভটি শিবের অনাদি অনন্ত সত্ত্বার প্রতীক মনে করা হয়।
শিবলিঙ্গ একটি গোল কিম্বা উপবৃত্তাকার যা কোন বৃত্তাকার ভূমি (base ) কে কেন্দ্র করে স্থাপিত । এই গোল ভূমি কে আদি পরশক্তি বা চূড়ান্ত শক্তি ।আর সেই গোল কিম্বা বৃত্তাকার অংশ দ্বারা অসীম কে বোঝান হয় যার কোন আদি অন্ত নেই অর্থাৎ যা সর্ববিরাজমান । সর্ববিরাজমান অর্থ হল যা সব জায়গায় অবস্থিত ।
শিবলিঙ্গ ধরনাটি সাধারণত infinity বোঝাতে কিম্বা জীবনের continuation বোঝাতে অবতারণা করা হয়।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় অথর্ববেদে একটি স্তম্ভের স্তব করা হয়েছে। এটিই সম্ভবত শিব লিঙ্গ পূজার উৎস। কারোর কারোর মতে যূপস্তম্ভ বা হাঁড়িকাঠের সঙ্গে শিবলিঙ্গের যোগ রয়েছে। উক্ত স্তবটিকে আদি-অন্তহীন এক স্তম্ভ বা স্কম্ভ-এর কথা বলা হয়েছে; এই স্কম্ভ চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত। যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, ছাই, সোমরস ও যজ্ঞের কাঠ বহন করার ষাঁড় ইত্যাদির সঙ্গে শিবের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির যোগ লক্ষিত হয়। মনে করা হয়, কালক্রমে যূপস্তম্ভ শিবলিঙ্গের রূপ নিয়েছিল। লিঙ্গপুরাণে এই স্তোত্রটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি কাহিনির অবতারণা করা হয়। এই কাহিনিতে উক্ত স্তম্ভটিকে শুধু মহানই বলা হয়নি বরং মহাদেব শিবের সর্বোচ্চ সত্ত্বা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত ও কম্বোডিয়ায় প্রচলিত প্রধান শৈব সম্প্রদায় ও অনুশাসন গ্রন্থ শৈবসিদ্ধান্ত মতে, উক্ত শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান উপাস্য দেবতা পঞ্চানন (পাঁচ মাথা-বিশিষ্ট) ও দশভূজ (দশ হাত-বিশিষ্ট) সদাশিব প্রতিষ্ঠা ও পূজার আদর্শ উপাদান হল শিবলিঙ্গ।
মনিয়ার উইলিয়ামস তাঁর ব্রাহ্মণইজম্‌ অ্যান্ড হিন্দুইজম্‌ বইয়ে লিখেছেন, "লিঙ্গ" প্রতীকটি "শৈবদের মনে কোনো অশালীন ধারণা বা যৌন প্রণয়াকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয় না। অন্যদিকে এন. রামচন্দ্র ভট্ট প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গটি অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের রচনা।এম. কে. ভি. নারায়ণ শিবলিঙ্গকে শিবের মানবসদৃশ মূর্তিগুলি থেকে পৃথক করেছেন। তিনি বৈদিক সাহিত্যে লিঙ্গপূজার অনুপস্থিতির কথা বলেছেন এবং এর যৌনাঙ্গের অনুষঙ্গটিকে তান্ত্রিকসূত্র থেকে আগত বলে মত প্রকাশ করেছেন।
১৯০০ সালে প্যারিস ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেসে ভারত সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে বৈদিক যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ ধারণা থেকে। ১৯০০ সালে প্যরিসে হয়ে যাওয়া ধর্মসমূহের ঐতিহাসিক মূল শীর্ষক সম্মেলনে বিশ্ববাসীর সামনে অথর্ববেদের স্কম্ভসুক্তের সাহায্যে তুলে ধরেন যে শিবলিঙ্গ মূলত বিশ্বব্রহ্মান্ডের ই প্রতীক।যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ হল বলিদানের হাঁড়িকাঠ। এটিকে অনন্ত ব্রহ্মের একটি প্রতীক মনে করা হত।জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট শালগ্রাম শিলা ও শিবলিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে এগুলিকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে সৃষ্ট প্রতীক বলে উল্লেখ করে তা পাঠ করলে, তারই প্রতিক্রিয়ায় বিবেকানন্দ এই কথা বলেছিলেন।বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শালগ্রাম শিলাকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গ বলাটা এক কাল্পনিক আবিষ্কার মাত্র। তিনি আরও বলেছিলেন, শিবলিঙ্গর সঙ্গে পুরুষাঙ্গের যোগ বৌদ্ধধর্মের পতনের পর আগত ভারতের অন্ধকার যুগে কিছু অশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তির মস্তিস্কপ্রসূত গল্প।
স্বামী শিবানন্দও শিবলিঙ্গকে যৌনাঙ্গের প্রতীক বলে স্বীকার করেননি।স্বামী শিবানন্দ বলেন,"এটি শুধু ভূল ই নয় বরং অন্ধ অভিযোগ ও বটে যে শিবলিঙ্গ পুরুষলিঙ্গের প্রতিনিধিত্বকারী।"তিনি লিঙ্গপুরানের নিম্নলিখিত শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-
"প্রধানাম প্রকৃতির যদাধুর লিঙ্গমুত্তমম গান্ধবর্নরসাহৃনম শব্দ স্পর্শাদি বর্জিতম"
অর্থাত্‍ লিঙ্গ হল প্রকৃতির সর্বোচ্চ প্রকাশক যা স্পর্শ, বর্ন,গন্ধহীন।
১৮৪০ সালে এইচ. এইচ. উইলসন একই কথা বলেছিলেন।ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ইসারউড লিঙ্গকে যৌন প্রতীক মানতে চাননি।ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়ায় "Lingam" ভুক্তিতেও শিবলিঙ্গকে যৌন প্রতীক বলা হয়নি।
মার্কিন ধর্মীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ওয়েনডি ডনিগার
তাঁর দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্ট্রি বইতে লিখেছেন, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে শিবলিঙ্গকে ঈশ্বরের বিমূর্ত প্রতীক বা দিব্য আলোকস্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব বইতে লিঙ্গের কোনো যৌন অনুষঙ্গ নেই।
হেলেন ব্রুনারের মতে, লিঙ্গের সামনে যে রেখাটি আঁকা হয়, তা পুরুষাঙ্গের গ্ল্যান্স অংশের একটি শৈল্পিক অনুকল্প। এই রেখাটি আঁকার পদ্ধতি মধ্যযুগে লেখা মন্দির প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত অনুশাসন এবং আধুনিক ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠাপদ্ধতির কিছু কিছু প্রথার সঙ্গে যৌন মিলনের অনুষঙ্গ লক্ষ্য করা যায়। যদিও গবেষক এস. এন. বালগঙ্গাধর লিঙ্গের যৌন অর্থটি সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেএই রেখাটি আঁকার পদ্ধতি মধ্যযুগে লেখা মন্দির প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত অনুশাসন এবং আধুনিক ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠাপদ্ধতির কিছু কিছু প্রথার সঙ্গে যৌন মিলনের অনুষঙ্গ লক্ষ্য করা যায়। যদিও গবেষক এস. এন. বালগঙ্গাধর লিঙ্গের যৌন অর্থটি সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেছন।
এ লেখাটা লিখেছি সনাতনীদের জন্য। যারা শিব লিঙ্গ কি তা জানেন না অথবা ভুল জেনে লজ্জিত হন।যারা সর্বদা হিন্দু ধর্মের ছিদ্রান্বেষী তাদের জন্য না কারন ওরা জেগে জেগে ঘুমাতে পছন্দ করে। তবে যারা উদ্দেশ্য মুলক ভাবে শিব লিঙ্গকে অশালীন বলতে চায় তাদের জন্য বলতে চাই দিবা নিশি যে যা ভাবে সব কিছুর ভিতরে তারই প্রতিরূপ খুজে পাবে; এটাই স্বাভাবিক ।
উৎসঃ
http://bangalihindupost.blogspot.in/2013/09/blog-post.html
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।