• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

যৌক্তিক ব্যাখ্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
যৌক্তিক ব্যাখ্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২২ এপ্রিল ২০২০

সনাতন ধর্মকে নিয়ে বিধর্মীদের কিছু কটুক্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব।

বিধর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রায়ই তাদের নোংরা মনমাসিকতা নিয়ে সনাতন ধর্মালম্বীদের কটুক্তি করে থাকে ।  হয়তো এমন নিচু নোংরা কাজ করার শিক্ষা তাদের ধর্ম বা নোংরা মা বাবার কাছ হতে পেয়ে থাকে, তাই অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করে পৈশাচিক আনন্দ পায় পিচাশগুলো। আমরা এখন সেইসব নোংরা কটুক্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব দিবো ।

০১। কটুক্তিঃ হিন্দুরা লিঙ্গ পূজা করে ।

জবাবঃ দৃষ্টিভঙ্গি বদলান। বাংলা আর সংস্কৃত এক নয়, সংস্কৃতে "শিব লিঙ্গ" মানে হলো "মঙ্গলময় ঈশ্বরের প্রতীক"।



০২। কটুক্তিঃ পৃথিবীতে গরীবেরা খেতে পায়না, কিন্তু হিন্দু পূজায় খাবার বিনষ্ট হয়!




জবাবঃ আপনি কতজন দরিদ্রকে খাইয়েছেন? খাবার কখনো নষ্ট হয়না। এই খাবার ভক্তদের ও বহু দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। পৃথিবীর সকল বড় বড় মন্দিরেই এটা করা হয়, এটাকে অনেকে দরিদ্র নারায়ণ সেবা বলে। এছাড়া অ্যাপল এর প্রতিষ্ঠাতাও ছোট বেলায় দরিদ্রতার কারণে মন্দিরের খাবার খেতে জীবনধারণ করেছিলেন।

০৩। কটুক্তিঃ হিন্দুধর্মে জাতপাত আছে ।

জবাবঃ  জাতপাত নিয়ে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ শ্রীমৎভগবতগীতায় বলেছেন,
                                                                                                     চতুর্বনংময়া সৃষ্টং গুণ কর্ম বিভাগশ।।

অর্থাৎ, গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে চারটি বর্ণ সৃষ্টি করা হয়েছে।  যারা ভালো কাজ করবে ও জ্ঞানী তারা উঁচু জাত ও যারা খারাপ কাজ করবে তারা নীচু জাত। সুতরাং জাতপাত জন্ম নয়, কর্ম অনুসারে।

ঋষি বিশ্বামিত্র অব্রাক্ষণ হিসেবে জন্ম নিলেও পরে কর্ম ও জ্ঞান দিয়ে ব্রাক্ষণ হন, এছাড়া শ্রীরাম কথিত শর্বরীকে নবধারা ভক্তি জ্ঞান দিয়েছেন। ভক্ত রবিদাসকে অপমান করায় স্বর্গের ঘন্টাপর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। ভগবান ভক্তের জাতপাত দেখেন না, দেখেন কর্ম ও ভক্তি। অনেকে হয়তো বলবেনন বেদে নীচু জাতদের নিয়ে অনেক কিছু বলা আছে।
কিন্তু গীতায় বলা আছে, "জন্ম নয় কর্ম অনুযায়ী জাতপাত" মানে ভালো কর্ম উঁচু জাত ও খারপ কাজ করলে নীচু জাত। খারপ কাজ করলে শাস্তির কথা তো সবখানেই আছে, এমনকি দেশের সংবিধানেও।

০৪। কটুক্তিঃ হিন্দুধর্মে সতীদাহ প্রথা আছে ।

জবাবঃ  বেদ ভাষ্যকারগণদের মতে, বেদে সতীদাহের উল্লেখ নেই। বরং স্বামীর মৃত্যুর পর পুনর্বিবাহের ব্যাপারেই তাঁরা মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে অথর্ববেদের দুটি মন্ত্র প্রণিধানযোগ্য-

                                         ইয়ং নারী পতি লোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্ব্য মর্ন্ত্য প্রেতম্।
                                        ধর্মং পুরাণমনু পালয়ন্তী তস্ম্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।।
                                                                                                                           (অথর্ববেদ ১৮.৩.১)

 অর্থঃ হে মনুষ্য! এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাঙ্খা করিয়া মৃত পতির পরে তোমার নিকট আসিয়াছে।সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করতে পারে।

                                        উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকং গতাসুমেতমুপশেষ এহি।
                                        হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভ সিংবভূব।।
                                                                                                                   (অথর্ববেদ ১৮.৩.২)
এই মন্ত্রটি (ঋগবেদ ১০.১৮.৮) এও আছে।

অর্থঃ হে নারী! মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কি ?  বাস্তব জীবনে ফিরে এস। পুনরায় তোমার পাণিগ্রহনকারী পতির সাথে তোমার আবার পত্নীত্ব তৈরী হবে।

বেদের অন্যতম ভাষ্যকার সায়ণাচার্যও তাঁর তৈত্তিরীয় আরণ্যক ভাষ্যে এই মত-ই প্রদান করেন। এছাড়াও পঞ্চসতীর এক সতী কুন্তী, শ্রী রামচন্দ্রের মা কৌশল্লা, কৈকেয়ী, সুমিত্রা, অভিমুন্য পত্নী উত্তরা কেউই পুনরায় বিবাহ না করলেও সতীদাহে যাননি।
  
০৫। কটুক্তিঃ শ্রী কৃষ্ণ ১৬১০০ বিবাহ করেছিলেন!

জবাবঃ নরকাসুর নামের এক অসুর ১৬১০০ নারীকে যুদ্ধবন্দিনী করে রাখে। কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে সমস্ত বন্দী নারীদের মুক্ত করেন। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে বন্দী নারীদের সমাজে কোন সম্মান ছিল না এবং তাদের বিবাহ করত না, কারণ তারা ইতিপূর্বে নরকাসুরের অধীনে ছিল। তাই শ্রী কৃষ্ণ এদের বিবাহ করে সামাজিক মর্যাদা দেন।

০৬। কটুক্তিঃ শ্রী কৃষ্ণ গোপীদের সাথে লীলা করতেন ।

জবাবঃ শ্রী কৃষ্ণ ১০ বছর ৮মাস পর্যন্ত গোকূলে ছিলেন। ১০ বছরের একটা বাচ্চার কাজকে যৌনতার দিক দিয়ে দেখা কতটা হীন মানসিকতার পরিচয় ।

০৭। কটুক্তিঃ হিন্দুরা পূজাতে মদ খায়।

জবাবঃ যেখানে নিরামিষ খেয়ে সংযম রেখে অঞ্জলি দেয়ার বিধান আছে, সেখানে মদ খাওয়াটা কতটা যৌক্তিক তা নিজ বুদ্ধিতে বুঝে নিন।

০৮। কটুক্তিঃ সনাতন ধর্ম শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ।

জবাবঃ বিশ্বব্যাপী সনাতন

১। ভারত, বৃন্দাবন, গয়া, কাশী, সতীপীঠ
২। নেপাল, সীতা মাতার জন্মভূমি, সতীপীঠ
৩। মরিশাস, গঙ্গা তালাও, অসংখ্য মন্দির
৪। বাংলাদেশ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, সতীপীঠ
৫। পাকিস্তান, স্বামীনারায়ন মন্দির, সতীপীঠ
৬। শ্রীলঙ্কা, সতীপীঠ, অসংখ্য মন্দির
৭। আফগানিস্তান, আশা মাই মন্দির, শিব মন্দির
৮। থাইল্যান্ড, গণেশ মন্দির, অসংখ্য মন্দির
৯। ইন্দোনেশিয়া, প্রাণবর্মন মন্দির, অংসখ্য মন্দির
১০। মালয়শিয়া, বাটু কেভস, মরুগান কার্তিক ঠাকুর মন্দির
১১। ইরান, আর্য Arya থেকে Aryairan থেকে ইরান নামের উৎপত্তি
১২। ইরাক ইয়াজিদিদের অধিকাংশ রীতি হিন্দুদের মত। এছাড়া সম্প্রতি রাম, হনুমান এর ভাস্কর্য পাওয়া গেছে
১৩। আজারবাইজান, শতবর্ষ পুরানো নব দূর্গা জোয়ালা মাতা মন্দির ও সংস্কৃত ও পারসিতে শিব গণেশ স্তুুতিলিপি
১৪। জাপান, বহু পুরানো বেনজাইতিন সরস্বতী মন্দির, গণেশ মন্দির
১৫। চীন, ঐতিহাসিক নৃসিংহ মন্দির, কুয়ানজহু শিব মন্দির,
১৬। ওমান, শতবর্ষী শিব ও কৃষ্ণ মন্দির
১৭। দুবাই, বোর দুবাই শিব ও কৃষ্ণ মন্দির
১৮। বাহরাইন, মানামা ইসকন মন্দির,
১৯। কুয়েত স্বামী নারায়ণ মন্দির,
২০। ইসরাইল, তেল হাবিব ইসকন মন্দির
এছাড়াও আমেরিকা, ব্রাজিল, আফ্রিকা, অষ্ট্রেলিয়াতে বহু ইসকন, রামকৃষ্ণ মিশনের মন্দির আছে।
ভারত,নেপাল,মরিশাস হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র। ভারত, নেপাল, মরিশাস, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এর প্রধানমন্ত্রী হিন্দু, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান(২০০৭ সালে) এর সুপ্রিমকোর্ট এর প্রধান বিচারপতি হিন্দু, ইন্দোনেশিয়ার হাইকোর্টের প্রধানবিচারপতি
হিন্দু। ঘানার তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিন্দু, আমেরিকার সিনেট সদস্য হিন্দু, গায়েনার বিরোধীদলীয় নেতা হিন্দু।

০৯। কটুক্তিঃ সনাতন ধর্ম মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে।

জবাবঃ  ভুল... সনাতন ধর্ম কখনো বিধর্মী হত্যা করতে বলে না, সনাতন বলে সবাইকে আপন করে নিতে।

বিঃদ্রঃ আসুন প্রত্যেকটা মিথ্যাচারের জবাব যুক্তি, বুদ্ধি ও ভদ্রতার সহিত দেই। আর_নয়_চুপ_থাকা



পোষ্টঃ জাগো হিন্দু পরিষদ হতে নেওয়া ।



Share:

০২ জুলাই ২০১৮

মৃতের জন্য শোক করা উচিত নয়, শ্ৰীকৃষ্ণ অৰ্জ্জুনকে কিরূপে বুঝালেন ?

ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণ অর্জনকে আত্মজ্ঞান শিক্ষা দিবার জন্য প্ৰথম বুঝিয়ে দিলেন মৃতের জন্য শোক করা ধীমান ব্যক্তির যোগ্য নয়, কেন না আত্মা জন্ম মৃত্যু রহিত। মৃত্যু বিনাশ নয়, তাহা অবস্থান্তর প্রাপ্তি। আমরা শৈশব অতিক্রম করেই যখন যৌবনে প্রবেশ করি এবং যৌবনান্তে যখন জরাগ্রস্ত হই, তখন তো শোক করি না। তবে মৃত্যুর জন্য কেন শোক করব, তাহাও অবস্থান্তর প্রাপ্তি মাত্র; আমাদের শরীর ক্ষয়প্রাপ্ত হয় সত্য, তাহার ধৰ্ম্ম মরণশীলতা; কিন্তু দেহের যথার্থ কর্তা যে আত্মা তিনি জন্ম-মৃত্যু রহিত, অবিনাশী, অক্ষয় এবং নিত্য। যখন দেহের মৃত্যু হয়, তখন দেহস্বামী আত্মা তাহা জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করে নূতন দেহ গ্রহণ করেন। এতদ্ভিন্ন জীবের আদি অব্যক্ত অপ্ৰকাশ, কেবলমাত্ৰ এই লোকে এই জীবন ব্যক্ত। অব্যক্ত আদির জন্য তো আমরা শোক করি না, তবে অব্যক্ত শেষের জন্য কেন শোক করিব ? স্থির বুদ্ধি জ্ঞানী ব্যক্তি এরূপ অবৈধ শোকে অভিভূত হয়েন না। জন্ম হইলেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, যাহা নিশ্চিত তাহার জন্য শোক করা উচিত নয়। ইহা ভিন্ন যাঁহারা আজ আছে তাঁহারা যে পূর্বে ছিলেন না—এমন নয় এবং যাঁহারা আজ নাই, তাঁহারা যে আবার ভবিষ্যতে আসিবেন না, এমনও নয়। যেমন জন্মিলে মৃত্যু নিশ্চিত, তেমনি মৃতের জন্মান্তর প্রাপ্তি সুনিশ্চিত। নিম্ন লিখিত কয়েকটি শ্লোকে ভগবান অর্জনকে মৃত্যু কেন অশোচ্য তাহা বুঝাইয়া দিয়াছেন।


১/ দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনংজরা ,,তথা দেহান্তর প্রাপ্তিঃ ধীরস্তত্ৰ ন মুহ্যতি।। ২/১৩

অনুবাদঃ- দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী ( আত্মা ) এক দেহ থেকে অন্য কোন দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না ।


২/ ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ,,অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।। ২/২০

অনুবাদঃ- আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না৷ তিনি জন্মরহিত শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।


৩/ বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরাণি ,, তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী। ২/২২

অনুবাদঃ- মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।


৪/ অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ,,

অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা। ২/২৮

অনুবাদঃ- হে ভারত ! সমস্ত সৃষ্ট জীব উৎপন্ন হওয়ার আগে অপ্রকাশিত ছিল, তাদের স্থিতিকালে প্রকাশিত থাকে এবং বিনাশের পর আবার অপ্রকাশিত হয়ে যায়। সুতরাং, সেই জন্য শোক করার কি কারণ ?

Collected from: ডি শীল
Share:

০৪ আগস্ট ২০১৭

বলিপ্রথা কি সত্যই হিন্দু তথা সনাতন ধর্মে নিষিদ্ধ?

মনসাপূজা, দুর্গাপূজা এবং কালীপূজা আসলেই দেখি কিছু মানুষ একটিভ হয়ে লেখালেখি এবং প্রচারণা শুরু করে দেয় শাস্ত্রীয় বলিপ্রথার বিরুদ্ধে। তাদের কিছু বালখিল্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চায় সনাতন ধর্মে পশুবলি অধর্মাচরণ এবং অশাস্ত্রীয় । তবে একথা সত্য যে বলি প্রথা অমানবিক এবং অনেকটা দৃষ্টিকটুও বটে।কিন্তু বলিপ্রথা কি সত্যই ধর্মে নিষিদ্ধ?

আমাদের পূজা পদ্ধতি প্রধানত দুইটি ধারায় বিকশিত বৈদিক এবং তান্ত্রিক শাস্ত্রাচার পদ্ধতি । এই দুটি পদ্ধতিতেই পশুবলির বিধান দেয়া আছে।
সারা পৃথিবীর হিন্দু সম্প্রদায় প্রধানত তিনটি প্রধান মতে বিভক্ত শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব। এ তিনটি মতের মধ্যে বৈষ্ণব মতটিকে বাদ দিলে অন্যদুটি মতে পূজা উপাসনার অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই পশুবলির বিধান দেয়া আছে। শাক্ত মতের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দ্বাদশ অধ্যায় (১০,১১, ২০) সহ একাধিক স্থানেই দেবীপুজায় পশুবলির কথা বলা আছে। একইভাবে শৈবদের গ্রন্থাবলীতেও পশুবলির বিধান আবশ্যকীয়ভাবে দেয়া আছে।

শুধুমাত্র বৈষ্ণব পুরাণ এবং শাস্ত্রাবলিতে পশুবলির আবশ্যকতা খুব একটা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে ও উপাসনায় অহিংসা তত্ত্বের প্রভাব এবং শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীমধ্বাচার্য, শ্রীনিম্বার্ক এই প্রধান চার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্যবৃন্দ সকলেই দক্ষিণ ভারতের। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই নিরামিষাশী প্রভাব প্রবল। সেখানে বহু মুসলিম এবং খ্রিস্টানরাও নিরামিষাশী।এই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসেরই সরাসরি প্রভাব পরেছে বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলোর উপরে।

বেদের পরে বৈষ্ণবদের প্রধান গ্রন্থ হলো শ্রীমদ্ভাগবত এবং বিষ্ণু পুরাণ। তবে বৈষ্ণবদের জীবনে শ্রীমদ্ভাগবতের প্রভাব তীব্র এবং অসীম। ফেসবুকে যেহেতু বেশী কথা লেখার সুযোগ নেই তাই পশুবলি এবং মাংসাহার সম্পর্কিত ভাগবতের দুটি স্কন্ধের কয়েকটি শ্লোকের বাংলা অনুবাদ তুলে দিচ্ছি। আপনারা নিজেরা পড়ে নিজেরাই বুঝে যাবেন যে পশুবলি এবং মাংসাহার সম্পর্কে ভাগবতের মতাদর্শ কি।
( এখানে অনুবাদে রণব্রত সেন সম্পাদিত এবং ত্রিপুরাশংকর সেনশাস্ত্রী ভূমিকা সম্বলিত হরফ প্রকাশিত শ্রীমদ্ভাগবত ব্যবহৃত হয়েছে)
"অজগর যাকে গ্রাস করেছে সে যেমন অন্যকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কাল, কর্ম ও ত্রিগুণের অধীন পাঞ্চভৌতিক এই দেহের পক্ষে অন্য কাউকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই। তিনিই সর্বজীবের আত্মা, অথচ অদ্বিতীয়, ঐভাবে স্বপ্রকাশ। তিনিই অন্তরস্থ, তিনিই বহিঃস্থ। এক ঈশ্বরকে মায়া প্রভাবে দেব,মানুষ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে উপস্থিত দেখ।"
( শ্রীমদ্ভাগবত: প্রথম স্কন্ধ, ১৩ অধ্যায়, ৪৫-৪৭)
"শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই।....... কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না। শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, গর্বিত ও পণ্ডিতম্মন্য সেই পাপাচারী নিঃশঙ্কচিত্তে পশুবধ করে, কিন্তু পরলোকে সেই নিহত পশুরাই তাদের মাংস খেয়ে থাকে। এইভাবে যারা পশুহিংসা দ্বারা পরদেহের প্রতি হিংসা করে, তারা সেই সর্বান্তর্যামী শ্রীহরিকেই দ্বেষ করে।"
(শ্রীমদ্ভাগবত : একাদশ স্কন্ধ, ৫ম অধ্যায়, ১৩-১৪)
শ্রীমদ্ভাগবতের দুটি কোটেশনে আপনাদের দুটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করবো-
১.হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই।
২. শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই।....... কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না।
আশাকরি এখানেই আপনারা আপনাদের উত্তর পেয়ে গেছেন যে শ্রীমদ্ভাগবতে পশুবলি এবং মাংসাহার নিষিদ্ধ কি নিষিদ্ধ না?
একারণেই মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে -
দেবোদ্দেশং বিনা ভদ্রে হিংসা সর্বত্র বর্জয়েৎ।(১১.১৪৩)
দেবোদ্দেশে বলিদান উৎসর্গ ব্যতীত সর্বত্রই হিংসা বর্জন করতে হবে।
এবং এ বিষয়ে আরো বলা হয়েছে-
কৃতায়াং বৈধহিংসায়াং নরঃ পাপৈর্ন লিপ্যতে। (১১.১৪৩)
দেবোদ্দেশে বলিদানে যে হিংসা শাস্রে তাকে বৈধহিংসা বলা হয়েছে। হিংসা পাপ, কিন্তু বৈধহিংসায় পাপ স্পর্শ করে না।
আমি বিশ্বাস করি আর না করি, শাস্ত্রে আছে বলিকৃত পশু সকল বন্ধন মুক্ত হয়ে মুক্তিলাভ করে। আমাদের ষড়রিপুর নাশের প্রতীক হিসেবেই পশুবলি দেয়া হয়। যেমন পাঠা হলো অনিষ্টকর কামের প্রতীক, মহিষ হলো ক্রোধের প্রতীক। তবে পশুবলি হয়তো প্রতিকী, কিন্তু সত্যিকারের পশুবলি দেবতার উদ্দেশ্যে আমরা তখনই দিতে পারবো যখন সত্যিসত্যি আমরা আমাদের দেহ থেকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ,মদ ও মাৎসর্য রূপ শরীরস্থ এই ষড়রিপুকেই বিনাশ করে পশুত্ব থেকে
প্রথমে মনুষ্যত্ব এবং অন্তে দেবত্বে পৌছতে পারবো।

শ্রীভগবানের কাছে এই হোক আমাদের প্রার্থনা -
#ধিয়ো_যো_নঃ_প্রচোদয়াৎ।।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

( আমি জানি আমার লেখাটায় কিছু মানুষ দুঃখ পেয়েছেন, অথবা আমার উপরে বিরক্ত হয়েছেন; কিন্তু ঠিক কিছুই করার নেই আমার। গত কয়েকদিনের পশুবলির বিরুদ্ধে প্রচারণায়, অসংখ্য মানুষ আমার কাছে এ বিষয়ে আমার মতামত চায় ম্যসেঞ্জারে অথবা মোবাইলে ফোন করে। তখন আমি তাদের বলি, আমি বিষয়ে ধারাবাহিক দুইতিনটা পোস্ট দিয়ে দেবো। তাই বাধ্য হয়ে ঢেঁকিগেলার মতো এই পোস্টটি দেয়া। কেউ দুঃখ বা কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত!)
Share:

হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে? জানতে হলে পড়তে হবে।

প্রায়ই আপনার মুসলমান বন্ধুদের কাছে আপনাকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় - হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে? কবরও তো দিতে পারতো বা অন্যকিছু করতে পারতো। পুড়িয়ে ফেলা কি অমানবিক নয়?
আমাদের অজ্ঞতার কারণে আমরা প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হই। প্রথমে যে ইনফরমেশনটি আপনার জানা প্রয়োজন তা হলো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ হিন্দু-বৌদ্ধ রীতি অনুসরণ করে অর্থাত মৃতদেহ পুড়িয়ে সৎকার করে। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি জাপান থেকে শুরু করে চীন, করিয়া, ভারত ও অনান্য জাতি এই রীতি অনুসরণ করে। তাহলে আপনি প্রথমত: পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন : ১. পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি জাপানিরা কি তাহলে অমানবিক ? পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কি অমানবিক ? যদি এই অর্ধেক মানুষ অমানবিক হয় তবে এদের মধ্যে কেন আমরা সবচেয়ে কম হানাহানি দেখতে পাই ?
আসুন এবার প্রকৃত উত্তরের দিকে যাই।

১. হিন্দুধর্মে কবর দেয়া বা সমাধি দেয়া নিষিদ্ধ নয়। স্মৃতিশাস্ত্রে স্পষ্টভাবেই এটা অনুমোদিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে এখনও এটা প্রচলিত আছে। যেমন- নাথ বা যোগী সম্প্রদায় এবং সন্ন্যাসীদেরকে সমাধি দেয়া হয়। অনেক জায়গায় দেখা যায় কারও অপমৃত্যু হলে তার শব সমাধি দেয়া হয়, পোড়ানো হয় না।

২. আমরা কথ্য ভাষায় 'লাশ পোড়ানো' বলি, কিন্তু শাস্ত্রীয় ভাষায় এটা 'অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া'। এটা আবার কী? অন্ত+ইষ্টি=অন্ত্যেষ্টি। ইষ্টি মানে যজ্ঞ। অন্ত্যেষ্টি হলো জীবনের শেষ যজ্ঞ।
আমরা জানি, আমাদের সুপ্রাচীন পূর্বপুরুষদের বৈদিক সমাজ ছিল যজ্ঞপ্রধান। জীবনের শুরু 'গর্ভাধান' থেকে জীবনের শেষ 'দেহত্যাগ' সবই হতো ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে। জীবৎকালে প্রতিদিনই পঞ্চমহাযজ্ঞ করতে হতো (এখনও করার বিধান)। এছাড়া অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মতো বিবিধ যজ্ঞে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে 'হবি' (বর্তমানে পূজায় অর্ঘ্য নিবেদনের মতো) উৎসর্গ করা হতো। এ হলো ঈশ্বরের দেয়া জীবন ও দেহ দ্বারা ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রকৃতির উপাদানসমূহ ভোগ করার প্রেক্ষিতে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতাপূর্বক তাঁর উপাসনা করা। তাই অন্ত্যেষ্টি তথা জীবনের শেষ যজ্ঞে ঈশ্বরপ্রদত্ত এই দেহখানি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই 'হবি' বা অর্ঘ্যরূপে উৎসর্গ করা হয়। এটা সত্যিই চমৎকার একটা ব্যাপার!

৩. প্রাচীন দর্শন অনুযায়ী বিশ্বচরাচর তথা আমাদের দেহও পাঁচটি ভূত বা উপাদান দ্বারা তৈরি। একে 'পঞ্চভূত' বলে। এগুলো হলো- ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বাতাস), ব্যোম (আকাশ বা শূন্যস্থান)। যারা বলেন 'মাটির দেহ' বা দেহ শুধু মাটি দিয়ে তৈরি, তাই একে মাটির সাথেই মিশিয়ে দেয়া উচিৎ, তারা অবশ্যই ভুল বলেন। বাস্তবে দেহ এই পাঁচটি উপাদানের সমষ্টি। শবদাহ করার মাধ্যমে দেহকে এই ৫টি উপাদানেই মিশিয়ে দেয়া হয় প্রত্যক্ষভাবে। দাহ শেষে অবশিষ্টাংশ জলে বিসর্জন দেয়া হয়। এজন্য শ্মশান সর্বদাই জলাশয়ের পাশে হয়ে থাকে।
অপরদিকে সমাধি বা কবর দিলে দেহ পঞ্চভূতে লীন হয় বটে, তবে পরোক্ষ ও ধাপে ধাপে। কারণ দেহ মাটির সাথে মেশে পঁচন প্রক্রিয়ায়। কোটি কোটি অনুজীব, পোকা-মাকড়ের খাবারে পরিণত হয় দেহ। এভাবে পঁচে গলে মাটিতে মেশানোই বরং দাহ করার চেয়ে বেশি অমানবিক মনে হয়।
একটা মজার তথ্য দিই। অনেক সময় আমরা বলি, লোকটা তো মরে ভূত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে সে প্রকৃতিতে (পঞ্চভূতে) লীন হয়েছে -এটাই বুঝতে হবে।

৪. মৃত্যু হয় দেহের; আত্মার নয়। অবিনাশী আত্মা অজর, অমর, অক্ষয়, অব্যয়। এটা জগদীশ্বর পরমাত্মার অংশ। ('বিদ্রোহী' কবিতার কয়েক লাইন মনে পড়ে কি?) জড় প্রকৃতির পঞ্চভূতে গড়া দেহ ফিরে যায় পঞ্চভূতে, আর জীবাত্মা ফিরে যায় পরমাত্মাতে। (মৃত্যুর পরে অবশ্যই আর কখনোই আপনি পুরনো দেহে ফিরে আসবেন না, বা কোন প্রকার শাস্তি/আজাব ভোগ করবেন না। শবদাহ করার পরে/মাটিতে মিশে যাওয়ার পরে নিশ্চয়ই লীন হওয়া দেহকে শাস্তি/আজাব যৌক্তিকভাবে সম্ভব নয়।)

৫. মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে শোকের কোন ব্যাপার নয়। তীর্থস্থান বেনারস বা কাশীতে মৃত্যুও একটা উৎসবের ব্যাপার। 
"জাতস্য হি ধ্রুবর্মৃত্যো ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ"-গীতা। 
যে জন্মেছে তার মৃত্যু নিশ্চিত, যে মরেছে তার জন্মও নিশ্চিত।
অতএব, দেহান্তরের নিছক সাধারণ ঘটনায় শোক কেন? বরং জরাজীর্ণ রোগশোকে আক্রান্ত দেহ ছেড়ে জীবাত্মার নতুন সুস্থ-সুন্দর দেহে জীবন আরম্ভের প্রাক্কালে মৃতকে হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানানোই উচিত।

Courtesy by: Rana Nandi

➤ লাইক এবং শেয়ার করে সকলকে জানার জন্য সুযোগ করে দিন।
➤ পোষ্ট গুলো ভালো লাগলে কৃপা পূর্বক পেজটিকে লাইক দিয়ে রাখুন।
Share:

১৩ মার্চ ২০১৭

শ্রীকৃষ্ণের প্রচীন নগরীর হদিশ মিলল জলের তলায়! স্বীকৃতি পুরাতত্ত্ব বিভাগের

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেবের অস্তিত্বের কথা বিশ্বাস করেন না? কিন্তু এবার থেকে বিশ্বাস করতে হবে। শুধু তাই নয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসটাও নতুন করে লেখার হয়তো সময় এসেছে। পুরাণকে কল্পলোকের গল্পকথা ‌যাঁরা মানেন আসলে ‌যে তা ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি এ কথা বলাই ‌যায়। অনেকে ধন্ধে রয়েছেন জলের তলায় থাকা প্রাচীন দ্বরকা নগরী কি আসলে বিষ্ণুলোক?
বহু গবেষক মনে করেন, ভারতের অন্যতম মহাকাব্য মহাভারত সত্যি ঘটনা, তার চরিত্র, কাহিনি বিন্যাস রাজনীতি আসলে সমাজ থেকেই নেওয়া, ‌তার জন্যই এই মহাকাব্য অনেকটাই সমকালীন হয়ে রয়েছে সহস্রাব্দ ধরে।
মহাভারত বা পুরাণের সূত্র মতে, পাণ্ডবদের হস্তিনাপুর জয়ের পর, শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেব মথুরার পরিবর্তে দ্বারকা শহরে থাকতে শুরু করেন। ‌যা অধুনা গুজরাটে অবস্থিত। কিন্তু এই দ্বারকা নগরী আসলে প্রাচীন দ্বারকা নয়। এটা একটা ক্ষুদ্র অংশ বিশেষ। শ্রীকৃষ্ণের নগরী দ্বারকা বর্তমানে রয়েছে জলের তলায়। আর তার হদিশ মিলেছে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের কাছে। গুজরাটের আরব সাগরের পশ্চিমে লম্বায় ১৫ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ৬ কিলোমিটার জুড়ে ছিল প্রাচীন দ্বারকা নগরীর অস্তিত্ব। ‌যার ঐতিহাসিক প্রমাণ্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে হালে।




প্রচীন নগরীর ‌পুরো কাঠামো ইমারৎ, অট্টালিকার স্তম্ভ, গ‌ৃহস্থের ব্যবহা‌র্য যে সমস্ত জিনিস জলের তলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার C14 কার্বন ডেটিং প্র‌যুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, এই সমস্ত জিনিসই প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার বছরের পুরনো। অর্থাৎ এতদিন সাড়ে চার হাজার বছরের সিন্ধু সভ্যতাকে ধরে ইতিহাস তার পথ চলা শুরু করেছিল। কিন্তু এই নয়া তথ্য সেই ইতিহাসকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। মহাভারতকে ‌যদি ২৫০০ বছর আগেকার ঘটনা ধরা হয়, তার মানে শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরী তার থেকেও কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন।
কী ভাবে মিলল এই নগরীর খোঁজ? ভারতের ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ ওসেন টেকনোলজি সমুদ্র দূষণ নিয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। অত্যাধুনিক স্ক্যানার ‌যন্ত্র সোনার, ‌যা জলের তলায় বহু নীচ প‌র্যন্ত শব্দ তরঙ্গের বিম পাঠাতে পারে। সেই ‌যন্ত্র মারফৎ জানতে পারে, জলের প্রায় ১২০ ফুট নীচে একটি প্রকাণ্ড জ্যামিতিক কাঠামো রয়েছে। তারই খোঁজ চালাতে গিয়ে গবেষকদের চোখ কপালে ওঠে। উঠে আসে বিশাল এক প্রচীন নগরীর তথ্য। সময়কাল পরীক্ষা নিরিক্ষার জন্য উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু জিনিস, ‌যার থেকে ‌জানা ‌যায়, এই কাঠামো তৈরি হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার বছরেরও আগে।আন্তর্জাতিক ইতিহাস গবেষকদের দাবি, মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে পুরনো ব‌ৃহৎ নগর বলে বিশ্ব ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। কিন্তু এই আবিষ্কার বিশ্ব ইতিহাসের পাতাকেই ঘেঁটে দিয়েছে। নতুন করে ইতিহাস লেখার প্রয়োজন রয়েছে।
ঐতিহাসিকদের মত, সময়ের সঙ্গে প্রকৃতি তার রূপ পরিবর্তন করেছে। ঠিক ‌যে ভাবে টেথিস সাগর সরে গিয়ে হিমালয়ের জন্ম নিয়েছে, ঠিক তেমনই আরব সাগর স্থান পরিবর্তন করায় একটা ব‌ৃহৎ প্রাচীন নগরী জলের তলায় চলে গিয়েছে। ‌যা বহু বছর ধরে মানুষের কাছে অধরা ছিল। তবে এখন ‌যা প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তার উপর ভর করে আরও গবেষণা চালাতে হবে। ‌যে ইতিহাস মিলেছে তাকেই মাইল ফলক ধরে চললে ভুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানে একটা কথা উল্লেখ্য, একাংশ পৌরাণিক গবেষকদের মত, পুরাণে বলছে, ক্ষীরপাই সমুদ্রের গর্ভে শেষনাগের উপর অনাদি অনন্তকাল ধরে অধিষ্ঠান করছেন ভগবান শ্রীবিষ্ণু সঙ্গে নারায়ণী। তাহলে কি এই আরবসাগরই পুরাণের ক্ষীরপাই? ‌যেখানে সলিল সমাধিতে রয়েছে বিষ্ণুর অন্যতম অবতার শ্রীকৃষ্ণের প্রাচীন বাসভূমি। তাহলে কি এই প্রাচীন দ্বারকা নগরী আসলে বিষ্ণুলোক? মানুন বা মানুন পুরাণ শুধু কল্পনার গল্প বলে না, হয়তো তার রহস্য উন্মোচন হয়, বহু বছর বাদে। ঈশ্বর ‌যে আছেন তার প্রমাণ দেন প্রকৃতিক গর্ভে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বে। তাইতো কখনও কখনও বিজ্ঞানও নিজের কাছে হেরে ‌যায়। আজ বিজ্ঞানের কাছে ‌যা সত্যি আগামিকাল তা মিথ্যে হয়ে দাঁড়ায়।

Share:

০১ এপ্রিল ২০১৬

মৃত্যুর পরে যেভাবে পরিবর্তিত হয় আত্মা ---- শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা অনুসারে

কর্মের আক্ষরিক অর্থ হল কার্য, ক্রিয়া অথবা করণ এবং বলা যেতে পারে এটি হল "কারণ এবং করণের (কার্যের) নৈতিক ধর্ম"। উপনিষদ্ মতে একজন মানুষ (অর্থাত্‍ জীবত্মা) সংস্কার (লব্ধ জ্ঞান) অর্জন করে তার শারিরীক ও মানসিক কর্মের মধ্যে দিয়ে। মানুষের মৃত্যুর পর সমস্ত সংস্কারগুলি যথাযথ ভাবে তার লিঙ্গ-শরীরে (যে শরীর রক্ত-মাংসের শরীর থেকে সুক্ষ অথচ আত্মার থেকে স্থূল) বিদ্যমান থাকে এবং পরজন্মে তার সুনির্দিষ্ট কক্ষপথ তৈরী করে। সুতরাং, একটি সর্বজনীন, নিরপেক্ষ, এবং অব্যর্থ কর্মের ধারণা মানুষের পুনর্জন্মলাভের সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য, এবং পরিবার সম্পর্কিত ধারণার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ভাগ্য প্রভৃতি ধারণাগুলিকে কর্ম একত্রে সংযুক্ত করেছে।
কার্য, কারণ, জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের বৃত্তাকার পরম্পরাই হল সংসার। দেহধারণ এবং কর্মফল ধারণা সম্পর্কে হিন্দুধর্মে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়। শ্রীমদ্ভগ্বতগীতায় বলা হয়েছে --
-
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা
ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী। -- (শ্রীমদ্ভগ্বতগীতা, দ্বিতীয় অধ্যায়, ২২)
-
[ব্যখ্যা: মানুষ যেমন জীর্ণ-শীর্ণ পুরোনো বস্ত্রগুলি ত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ জীবাত্মা পুরোনো শরীর ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহণ করে। (শ্রীমদ্ভগ্বতগীতা, দ্বিতীয় অধ্যায়, ২২)]
-
যেখানে সংসার ক্ষণিকের আনন্দ দেয়, যা মানুষকে আরেকটি বিনাশশীল শরীর পরিগ্রহ করতে উত্সাহী করে। সেখানে মোক্ষ এই সংসারের গণ্ডী থেকে মুক্ত হয়ে চির আনন্দ ও শান্তির বিশ্বাস প্রদান করে। হিন্দুধর্মের বিশ্বাস যে অনেকগুলি জন্মান্তরের পর অবশেষে জীবাত্মা মহাজাগতিক আত্মায় (ব্রহ্ম/পরমাত্মা) মিলিত হতে ব্যাকুল হয়।
জীবনের চরম লক্ষ্যকে (চরম লক্ষ্য বলতে এখানে মোক্ষ অথবা নির্বাণ অথবা সমাধি) বিভিন্ন ভাবে বোঝানো হয়েছে: যেমন ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতার বোধ; যেমন ঈশ্বরের সঙ্গে অবিছ্যেদ্য সম্পর্কের বোধ; যেমন সমস্ত বস্তুর সম্পর্কে অদ্বৈত বোধ; যেমন আত্ম বিষয়ক বিশুদ্ধ নিস্বার্থতা ও জ্ঞান; যেমন নিখুঁত মানসিক শান্তিলাভ; এবং যেমন পার্থিব বাসনার থেকে অনাসক্তি বোধ। এই ধরনের উপলব্ধি মানুষকে সংসার এবং পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করে। আত্মার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাস থাকার ফলে, মৃত্যুকে পরমাত্মার তুলনায় নেহাত্‍ই তুচ্ছ মনে হয়। অতঃপর, একজন ব্যক্তি যার কোন ইচ্ছা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাকি নেই এবং জীবনের কোন দায়িত্বই বাকি নেই অথবা একটিও রিপু দ্বারা আক্রান্ত নয়, সে প্রায়োপবেশন (যার আক্ষরিক অর্থ হল মৃত্যু কামনায় উপবাসের মাধ্যমে দেহত্যাগ) দ্বারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে।


Written by:  Prithwish Ghosh
Share:

মৃত্যুর পরে যেভাবে পরিবর্তিত হয় সাধের মানবদেহ

মৃত্যুর পরে শরীরে ধীরে ধীরে পচন ধরতে শুরু করে -- এ কথা সবারই জানা। কিন্তু মৃত্যুর পর মুহূর্ত থেকে পচন ধরা পর্যন্ত কী কী শারীরিক পরিবর্তন হয় বা কোন কোন পথ ধরে শরীরে পচন ধরতে শুরু করে, আসুন তা জেনে নিই -----
চিকিৎসা শাস্ত্র মতে, মৃত ঘোষণার অর্থ এই নয় যে শরীরের প্রতিটি কোষের মৃত্যু হয়েছে। হৃদযন্ত্র পাম্প করা বন্ধ করলে, কোষ গুলো অক্সিজেন পায় না। অক্সিজেন পাওয়া বন্ধ হলে পেশিীগুলো শিথিল হতে শুরু করে। পাশাপাশি অন্ত্র এবং মূত্রস্থলী খালি হতে শুরু হয়।শরীরের মৃত্যু ঘটলেও, অন্ত্র, ত্বক বা অন্য কোনও অংশে বসবাসকারী কোটি কোটি ব্যাক্টেরিয়া তখনও জীবিত থাকে। মৃত্যুর পর শরীরের অভ্যন্তরে যা ঘটে, সে সবের পিছনেই এই কোটি কোটি ব্যাক্টেরিয়ার অবদান থাকে। 
মৃত্যুর পর সর্বপ্রথম শরীরের তাপমাত্রা প্রতি ঘণ্টায় ১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমতে থাকে। এক্ষেত্রে শরীরের নিম্নাংশে রক্ত এবং তরল পদার্থ জমা হয়। ব্যক্তির ত্বকের আসল রঙের ভিত্তিতে তা ধীরে ধীরে গাঢ় বেগুনি-নীল রঙে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এরপর অত্যধিক ক্যালসিয়াম ক্ষরণের ফলে পেশী গুলো শক্ত হয়ে যায়। ২৪-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত এই অবস্থা থাকে।
এরপর শরীরে পচন ধরতে শুরু করে। রক্ত চলাচল বন্ধ হলে কার্বন-ডাই অক্সাইডের গঠন শুরু হয়, অম্লের মাত্রা বাড়তে থাকে। এর ফলে কোষগুলোতে ভাঙন ধরে। দুই-তিন দিনে শরীর পচতে শুরু করে। পরিপাকনালীতে থাকা ব্যাক্টেরিয়া এবং আণুবীক্ষণিক প্রাণীরা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তলপেট সবুজ বর্ণ ধারণ করে এবং তাতে গ্যাস তৈরি হয় আর তার চাপে শরীরের মলমূত্র নিষ্কাশিত হয়। 'পিউট্রেসিন' এবং 'ক্যাডাভেরিনের' মতো জৈবিক যৌগ শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়লে, দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। এই গন্ধই মৃতদেহের অন্যতম বৈশিষ্ট।
'নেক্রোসিস' পদ্ধতিতে এরপর শরীরের রং কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। মৃতদেহের দুর্গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমায় উচ্ছিষ্ট-ভোগী পোকা-মাকড়। মৃত শরীরকে খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়াও, এই সমস্ত পরজীবী কীট সেখানে ডিমও পাড়ে। ডিম ফুটে বেরোনো শূককীট মাত্র এক সপ্তাহে শরীরের ৬০ শতাংশ নিকেশ করতে পারে। এভাবেই কেটে যায় প্রথম সাতদিন। এর পর ধীরে ধীরে প্রাণহীন মানবদেহ ক্রমে মাংস-চামড়ার খোলস ত্যাগ করে পরিণত হয় হাড় সর্বস্ব কঙ্কালে। 
-
এই হ'ল আমাদের সাধের মানবদেহের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু আত্মা !!!! 
......... পরের পোস্টে জানাব, সঙ্গে থাকুন।

Written by: Prithwish Ghosh

Share:

১৪ অক্টোবর ২০১৫

দুর্গা - ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শ্রীকৃষ্ণ এবং দুর্গা এই বঙ্গদেশের প্রধান আরাধ্য দেবতা। ইঁহাদিগের পূজা না করে এমত হিন্দু প্রায় বঙ্গদেশে নাই। কেবল পূজা নহে, কৃষ্ণভক্তি ও দুর্গাভক্তি এ দেশের লোকের সর্বকর্মব্যাপী হইয়াছে। প্রভাতে উঠিয়া শিশুরাও “দুর্গা দুর্গা” বলিয়া

গাত্রোত্থান করে। যে কিছু লেখা পড়া আরম্ভ করিতে হইলে, আগে দুর্গা নাম লিখিতে হয়। “দুর্গে” “দুর্গে” “দুর্গতিনাশিনি” ইত্যাদি শব্দ অনেকের প্রতিনিঃশ্বাসেই নির্গত হয়। আমাদের প্রধান পর্বাহ দুর্গোৎসব। সেই উৎসব অনেকের জীবনমধ্যে প্রধান কর্ম বা প্রধান আনন্দ। সম্বৎসর তাহারই উদ্যোগে যায়। পথে পথে কালীর মঠ। অমাবস্যায় অমাবস্যায় কালীপূজা। কোন গ্রামে পীড়া আরম্ভ হইলে রক্ষাকালীপূজা। কাহারও কিছু অশুভ সম্ভাবনা হইলেই চণ্ডীপাঠ —অর্থাৎ কালীর মহিমা কীর্তন। ইঁহার প্রীত্যর্থে পূর্ববঙ্গে অনেক প্রাচীন বিজ্ঞ ব্যক্তিও মদ্যপান ও অন্যান্য কুৎসিত কর্মে রত। ফলে এই দেবী বঙ্গদেশ শাসন করিতেছেন। ডাকাইতেরা ইঁহার পূজা না দিয়া ডাকাইতি করে না।
এই দেবী কোথা হইতে আসিলেন? ইনি কে? আমাদিগের হিন্দু ধর্মকে সনাতন ধর্ম বলিবার কারণ এই যে, এই ধর্ম বেদমূলক। যাহা বেদে নাই, তাহা হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত কি না সন্দেহ। যদি হিন্দু ধর্ম সম্বন্ধে কোন গুরুতর কথা বেদে না থাকে, তবে হয় বেদ অসম্পূর্ণ, না হয় সেই কথা হিন্দুধর্মান্তর্গত নহে। বেদ অসম্পূর্ণ ইহা আমরা বলিতে পারি না, কেন না তাহা হইলে হিন্দু ধর্মের মূলোচ্ছেদ করিতে হয়। তবে দ্বিতীয় পক্ষই এমন স্থলে অবলম্বনীয় কি না, তাহা হিন্দুদিগের বিচার্য।

দুর্গার কথা বেদে আছে কি? সকল হিন্দুরই কর্তব্য যে এ কথার অনুসন্ধান করেন। আমরা অদ্য তাঁহাদের এ বিষয়ে কিছু সাহায্য করিব।

অনেকেই জানেন যে বেদ একখানি গ্রন্থ নয়। অথবা চারি বেদ চারিখানি গ্রন্থ মাত্র নহে। কতকগুলিন মন্ত্র, কতকগুলিন “ব্রাহ্মণ” নামক গ্রন্থ, এবং কতকগুলিন উপনিষদ্ লইয়া এক একটি বেদ সম্পূর্ণ। তন্মধ্যে মন্ত্রই বেদের শ্রেষ্ঠাংশ বলা যাইতে পারে।

ইহা একপ্রকার নিশ্চিত যে কোন বৈদিক সংহিতায় এই দেবীর বিশেষ কোন উল্লেখ নাই। ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, বায়ু, সোম, অগ্নি, বিষ্ণু, রুদ্র, অশ্বিনীকুমার প্রভৃতি দেবতার ভূরি ভূরি উল্লেখ ও স্তুতিবাদ আছে; পুষণ, অর্যমন প্রভৃতি এক্ষণে অপরিচিত অনেক দেবতার উল্লেখ আছে, কিন্তু দুর্গা বা কালী বা তাঁহার অন্য কোন নামের বিশেষ উল্লেখ নাই।

ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলের অষ্টমাষ্টকে “রাত্রি পরিশিষ্টে” একটি দুর্গা-স্তব আছে মাত্র। কিন্তু তাহাতে যদিও দুর্গা নাম ব্যবহৃত হইয়াছে, তথাপি তাঁহাকে আমাদের পূজিতা দুর্গা বলা যাইতে পারে না। উহা রাত্রি-স্তোত্র মাত্র। সন্দিহান পাঠকের সন্দেহ ভঞ্জনার্থ, আমরা উহা উদ্ধৃত করিলাম --

আরাত্রি পার্থিবং রজঃ পিতুরপ্রায়ি ধামভিঃ।
দিবঃ সদাংসি বৃহতী বিতিষ্ঠসে ত্বেষাং বর্ততে তমঃ || ১ ||
যে তে রাত্রি নৃচাক্ষসো যুক্তাসো নবতির্নব।
অশীতিঃ সন্ত্বষ্টা উতো তে সপ্ত সপ্ততীঃ || ২ ||
রাত্রিং প্রপদ্যে জননীং সর্বভূতনিবেশনীং।
ভদ্রাং ভগবতীং কৃষ্ণাং বিশ্বস্য জগতো নিশাং || ৩ ||
সম্বেশনীং সংযমনীং গ্রহনক্ষত্রমালিনীম্।
প্রপন্নোহং শিবাং রাত্রিং
ভদ্রে পারং অশীমহি ভদ্রে পারং অশীমহি ওঁ নমঃ || ৪ ||
স্তোষ্যামি প্রযতো দেবীং শরণ্যাং বহ্বৃচপ্রিয়াং।
সহস্রসংমিতাং দুর্গাং জাতবেদসে সুনবাম সোমম্ || ৫ ||
শান্ত্যর্থং তদ্বিজাতীনামৃষিভিঃ সোমপাশ্রিতাঃ (সমুপাশ্রিতাঃ?)
ঋগ্বেদে ত্বং সমুৎপন্নারাতীয়তো নিদহাতি বেদঃ || ৬ ||
যে ত্বাং দেবি প্রপদ্যন্তে ব্রাহ্মণাঃ হব্যবাহিনাং।
অবিদ্যা বহুবিদ্যা বা স নঃ পর্ষদতিদুর্গানি বিশ্বাঃ || ৭ ||
অগ্নিবর্ণাং শুভাং সৌম্যাং কীর্তয়িষ্যন্তি যে দ্বিজাঃ।
তান তারয়তি দুর্গানি নাবেব সিন্ধুং দুরিতাত্যগ্নিঃ || ৮ ||
দুর্গেষু বিষমে ঘোরে সংগ্রামে রিপুসঙ্কটে।
অগ্নিচোরনিপাতেষু দুষ্টগ্রহনিবারণে || ৯ ||
দুর্গেষু বিষমেষু ত্বাং সংগ্রামেষু বনেষু চ।
মোহয়িত্বা প্রপদ্যন্তে তেষাং মে অভয়ং কুরু তেষাং মে অভয়ং
কুরু ওঁ নমঃ || ১০ ||
কেশিনীং সর্বভূতানাং পঞ্চমীতি চ নাম চ।
সা মাং সমা নিশা দেবী সর্বতঃ পরিরক্ষতু সর্বতঃ
পরিরক্ষতু ওঁ নমঃ || ১১ ||
তামগ্নিবর্ণান্তপসা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্মফলেষু জুষ্টাম্।
দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরসে নমঃ || ১২ ||
দুর্গা দুর্গেষু স্থানেষু সন্নোদেবীরভীষ্টয়ে।
য ইমং দুর্গাস্তবং পুণ্যং রাত্রৌ রাত্রৌ সদা পঠেৎ।
রাত্রি কুশিকঃ সৌভরো রাত্রিস্তবো গায়ত্রী রাত্রিসূক্তং জপেন্নিত্যং
তৎকালমুপপদ্যতে || ১৩ ||
এই সংস্কৃত এক এক স্থানে অত্যন্ত দুরূহ, এজন্য আমরা ইহার অনুবাদে সাহসী হইলাম না। ডাক্তার জন মিয়োর কৃত ইংরেজি অনুবাদের অনুবাদ নিম্নে লিখিলাম। তাঁহার অনুবাদও সন্তোষজনক নহে।

“হে রাত্রি! পার্থিব রজঃ তোমার পিতার কিরণে পরিপূর্ণ হইয়াছিল। হে বৃহতি! তুমি দিব্যালয়ে থাক, অতএব তমঃ বর্তে। যে নরদর্শকেরা তোমাতে যুক্ত তাহারা নবনবতি বা অষ্টাশীতি বা সপ্তসপ্ততি হউক (অর্থ কি?) সর্বভূতনিবেশনী, জননী, ভদ্রা, ভগবতী, কৃষ্ণা, এবং বিশ্বজগতের নিশাস্বরূপ রাত্রিকে প্রাপ্ত হই। সকলের প্রবেশকারিণী শাসনকত্রী (?) গ্রহনক্ষত্রমালিনী, মঙ্গলযুক্তা রাত্রিকে আমি প্রাপ্ত হইয়াছি; হে ভদ্রে! আমরা যেন পারে যাই, আমরা যেন পারে যাই, ওঁ নমঃ। দেবী, শরণ্যা বহ্বৃচপ্রিয়া, সহস্রাতুল্যা দুর্গাকে আমি যত্নে তুষ্ট করি। আমরা জাতবেদাকে (অগ্নি) সোমদান করি। দ্বিজাতিগণের শান্ত্যর্থ তুমি ঋষিদিগের আশ্রয় (?) ঋগ্বেদে তুমি সমুৎপন্না অগ্নি অরাতিদিগের দহন করেন (?) দেবি! যে ব্রাহ্মণেরা, অবিদ্যা হউন, বা বহুবিদ্যা হউন, তোমার কাছে আসেন, তিনি (?) আমাদের সকল বিপদে ত্রাণ করিবেন। যে ব্রাহ্মণেরা অগ্নিবর্ণা, শুভা, সৌম্যাকে কীর্তিত করিবে, সমুদ্রে নৌকার ন্যায় অগ্নি তাহাদিগকে বিপদ হইতে পার করিবেন। বিপদে ঘোর বিষম সংগ্রামে, সঙ্কটে বিষয় বিপদে সংগ্রামে, বনে অগ্নিনিপাতে, চোরনিপাতে, দুষ্টগ্রহ নিবারণে, তোমার কাছে আসে, এ সকল হইতে আমাকে অভয় কর! এ সকল হইতে আমাকে অভয় কর! ওঁ নমঃ। যিনি সর্বভূতের কেশিনী, পঞ্চমী নাম যাঁর, সেই দেবী প্রতিরাত্রে সকল হইতে পরিরক্ষণ করুন‌! সকল হইতে আমাকে পরিরক্ষণ করুন! ওঁ নমঃ। অগ্নিবর্ণা তপের দ্বারা জ্বালাবিশিষ্টা, বৈরোচনী কর্মফলে জুষ্টা, দুর্গাদেবীর শরণাগত হই, হে সুবেগবতি! তোমার বেগকে নমস্কার। দুর্গাদেবী বিপদস্থলে আমাদের মঙ্গলার্থ হউন। এই পবিত্র দুর্গা স্তব যে রাত্রে সদা পাঠ করিবে—রাত্রি, কুশিক, সৌভর, রাত্রিস্তব, গায়ত্রী, যে রাত্রিসূক্ত নিত্য জপ করে যে তৎকাল প্রাপ্ত হয়।”

ইহার সকল স্থলে অনুবাদ হইয়া উঠে নাই, এবং যাহা অনুবাদ হইয়াছে তাহার সকল স্থলের কেহ অর্থ করিতে পারে না। কিন্তু এত দূর বুঝা যাইতেছে যে, যদি এই দেবী আমাদের পূজিতা দুর্গা হয়েন, তবে দুর্গা রাত্রির অন্যেতর নাম মাত্র। ইহা ভিন্ন যজুর্বেদের (বাজসনেয়) সংহিতায় এক স্থানে অম্বিকার উল্লেখ আছে। কিন্তু সেখানে অম্বিকা শিবের ভগিনী, যথা --

“এষ তে রুদ্র ভাগঃ স্বস্রা অম্বিকয়া ত্বং জুষস্ব স্বাহা ।।”
আর কোন সংহিতায় কোথাও দুর্গার কোন নামের কোন উল্লেখ নাই।

তৎপরে ব্রাহ্মণ। কোন ব্রাহ্মণে কোন নামে ইঁহার কোন উল্লেখ নাই। তারপর উপনিষদ্। উপনিষদে দুর্গার নাম কোথাও নাই; এক স্থানে উমা হৈমবতী, আর এক স্থানে কালী করালী নামে উল্লেখ আছে। ঐ দুইটি স্থানই আমরা ক্রমশঃ উদ্ধৃত করিতেছি।

প্রথম, কেনোপনিষদে আছে --

“অথ ইন্দ্রম্ অব্রুবন্ মঘবন্নেতদ্বিজানীহি কিমেতদ্‌যক্ষমিতি। তথেতি তদভ্যদ্রবত্তস্মাত্তিরোদধে। স তস্মিন্নেবাকাশে স্ত্রিয়মাজগাম বহুশোভমানামুমাং হৈমবতীম্। তং হোবাচ কিমেতদ্যক্ষমিতি। সা ব্রহ্মেতি হোবাচ ব্রহ্মণো বা এতদ্বিজয়ে মহীয়ধ্বমিতি। ততো হৈব বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি”

“তাঁহারা তখন ইন্দ্রকে বলিলেন, “মঘবন্ এ যক্ষ কি জানুন।” ইন্দ্র “তাই” বলিয়া তাহার কাছে গেলেন, সে অন্তর্ধান হইল।

সেই আকাশে বহুশোভমানা উমা হৈমবতী নামক স্ত্রীলোকের নিকট আসিলেন। তাঁহাকে বলিলেন, “কি এ যক্ষ?” তিনি কহিলেন, “এ ব্রহ্মা, ব্রহ্মার এই বিজয়ে আপনারা মহৎ হউন।” তাহাতে জানিলেন যে, ইতি ব্রহ্ম।”

ইহার অর্থ কি, আমরা বুঝিতে পারিব না, কিন্তু সায়নাচার্য বুঝিয়াছিলেন সন্দেহ নাই। সায়নাচার্য এই উমা হৈমবতীকে ব্রহ্মজ্ঞান বলেন। তৈত্তিরীয় আরণ্যকান্তর্গত এক স্থানে সোম শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন, “হিমবৎপুত্র্যা গৌর্যা ব্রহ্মবিদ্যাভিমানিরূপত্বাৎ গৌরীবাচকো উমাশব্দো ব্রহ্মবিদ্যাং উপলক্ষয়তি। অতএব তলবকারোপনিষদি (ইহারই নামান্তর কেনোপনিষদ্) ব্রহ্মবিদ্যামূর্তিপ্রস্তাবে ব্রহ্মবিদ্যামূর্তিঃ পঠ্যতে। বহুশোভমানামুমাং হৈমবতীং তাং হোবাচ ইতি। তদ্বিষয়তয়া তয়া উময়া সহিতবর্তমানত্বাৎ সোমঃ।”

তবে কেনোপনিষদের উমা হৈমবতী ব্রহ্মবিদ্যামাত্র। মহাভারতীয় ভীষ্মপর্বে অর্জুনকৃত একটি দুর্গাস্তব আছে, তাহাতে দুর্গাকে “ব্রহ্মবিদ্যা” বলা হইয়াছে। যথা—

ত্বং ব্রহ্মবিদ্যা বিদ্যানাং মহানিদ্রা চ দেহিনাং।
দ্বিতীয়, মুণ্ডকোপনিষদে এক স্থানে কালী ও করালী নামের উল্লেখ আছে। কিন্তু সে কোন দেবীর নাম বলিয়া উল্লিখিত হয় নাই --- অগ্নির সপ্তজিহ্বার নামের মধ্যে কালী ও করালী দুইটি নাম, ইহাই কথিত আছে, যথা --

কালী করালী চ মনোজবা চ সুলোহিতা যা চ সুধূম্রবর্ণা।
স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরূপী চ দেবী লোলায়মানা ইতি সপ্ত জিহ্বা।।
কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধূম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী, এবং বিশ্বরূপী এই সাতটি অগ্নির জিহ্বা।

ইহা ভিন্ন বেদে আর কোথাও দুর্গা, কালী, উমা, অম্বিকা প্রভৃতি কোন নামে এই দেবীর কোন উল্লেখ নাই।

তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দুর্গাগায়ত্রী আছে। তাহা এই --

কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারী ধীমহি। তন্নো দুর্গীঃ প্রচোদয়াৎ।

পাঠক দেখিবেন, স্ত্রীলিঙ্গান্ত দুর্গা শব্দের পরিবর্তে পুংলিঙ্গান্ত দুর্গী শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহার জন্য সায়নাচার্য লিখিয়াছেন, “লিঙ্গাদিব্যত্যয়ঃ সর্বত্র ছান্দসো দ্রষ্টব্য।” তিনি কাত্যয়ন শব্দের এই ব্যাখ্যা করেন, “কৃতিং বস্তে ইতি কত্যো রুদ্রঃ। স এবায়নং যস্য সা কাত্যায়নী। অথবা কতস্য ঋষিবিশেষস্য অপত্যং কাত্যঃ।” কন্যাকুমারীর এই রূপ ব্যাখ্যা করেন, “কুৎসিতং অনিষ্টং মায়রতি ইতি কুমারী, কন্যা দীপ্যমানা চাসৌ কুমারী চ কন্যাকুমারী।”

এতদ্ভিন্ন ঋগ্বেদান্তর্গত রাত্রিপরিশিষ্ট হইতে যে দুর্গাস্তব উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহার ১২ সংখ্যক শ্লোক ঐ তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দ্বিতীয় অনুবাকে অগ্নিস্তবে আছে। তাহাতে দুর্গার উল্লেখ আছে, দেখা গিয়াছে। কৈবল্যোপনিষদে “উমা সহায়ম্” বলিয়া মহাদেবের উল্লেখ আছে। কৈবল্যোপনিষদ্ অপেক্ষাকৃত আধুনিক। ঐস্থলে আশ্বলায়ন বক্তা। ওয়েবর বলেন তৈত্তিরীয় আরণ্যের অষ্টাদশ অনুবাদকে “উমাপতয়ে” শব্দ আছে -- কিন্তু ঐ বচন আমরা দেখি নাই। উপনিষদে বা আরণ্যকে আর কোথাও দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায় না।
এক্ষণে জিজ্ঞাস্য, আমাদিগের পূজিত দুর্গা কি রাত্রি, না মহাদেবের ভগিনী, না ব্রহ্মবিদ্যা, না অগ্নিজিহ্বা?


ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
[‘বঙ্গদর্শন’, জ্যৈষ্ঠ ১২৮০, পৃ. ৪৯-৫৩]

Courtesy by: Prithwish Ghosh
Share:

০৩ অক্টোবর ২০১৫

ছোটবেলার একে চন্দ্র দুয়ে পক্ষ থেকে দশে দিক পড়তাম আসুন সেই সংখ্যাগুলোকে আর একটু ভালোভাবে জেনে নিই

ছোটবেলায় একটু কথা বলতে শিখতেই বাড়ীতে গুরুজনেরা সকাল-সন্ধ্যায় মুখে মুখে অ-আ-ক-খ আর এক-এ-চন্দ্র ইত্যাদি পড়তে শুরু করতেন। 'আবৃত্তিঃ সর্বশাস্ত্রাণাং বোধাদপি গরীয়সী'—বুঝতে না-পারলেও মুখস্থ করো। ছন্দোবদ্ধ ছড়ার মতো একে চন্দ্র দুয়ে পক্ষ থেকে দশে দিক আওড়াতে আওড়াতে দশ পর্যন্ত সংখ্যা অধিগত হয়ে যায় অনায়াসে, না-ই বা বোধগম্য হল চার বেদ পঞ্চবাণের তাৎপর্য। সেটা বয়স বাড়ার সাথে সাথে হবে। আসুন আমরা সংখ্যাগুলোকে আর একটু ভালোভাবে জেনে নিই --

 ১ এ চন্দ্র 
---------
শিশুকে 'একে চন্দ্র' বোঝানো যায় অনায়াসে—আকাশের চাঁদ দেখিয়ে। সূর্যকে দেখিয়েও শেখানো বা বোঝানো যেত। তবে চাঁদ হল শিশুর আদরের চাঁদামামা—যাকে কপালে টিপ দেবার জন্যে ডাকা হয়, যাকে ভাত বেড়ে দেওয়া যায় শিশুর ভাত খাবার থালাটির পাশে। আদরের জনকে দিয়েই একের পরিচিতি হোক, ক্রমে তাকে বিস্তৃত হতে হবে ভূমার উপলব্ধি পর্যন্ত। সূর্যের বদলে চন্দ্রকে বেছে নেবার অন্য ব্যাখ্যারও অবতারণা করা যেতে পারে। দিনের আকাশে সূর্য একাই একাধিপতি। রাত্রের আকাশে অগণিত তারার মাঝখানে চাঁদ অনন্য। সাতাশ নক্ষত্র ভার্যার একপতি হিসাবে আর যে চন্দ্রদেবের ক্ষয় রোগের কারণে স্বর্গের দেবতাদের দীপ্তি ম্লান হতে বসেছিল তাঁর মহিমা কিন্তু অপার।
 
 
২ এ পক্ষ
---------
দুয়ে পক্ষ। কী কী পক্ষ? শুক্লপক্ষ আর কৃষ্ণপক্ষ। অমাবস্যার পর থেকে দিনে দিনে চন্দ্র কলার বৃদ্ধি, শেষে পৌঁছিল পূর্ণিমাতে। এটাই শুক্লপক্ষ। পূর্ণিমার পরের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত কৃষ্ণপক্ষ। শুক্লা একাদশীর নিশিতে নিদ্রাহারা শশীকে একলা বসে স্বপ্নপারাবারের খেয়া চালাতে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আবার, গাঙুরের জলে ভেলা-বাওয়া বেহুলার চোখ দিয়ে কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্নায় সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট সমন্বিত বাংলার অপরূপ রূপ দেখেছিলেন জীবনানন্দ। দুই-ই তুল্য পাখির দুই ডানার মতো। দুয়ে পক্ষ পাখির দুই পক্ষও তো হতে পারত, কিংবা আজকের রাজনীতির প্রেক্ষিতে স্বপক্ষ আর বিপক্ষ -- আমরা ওরা। কিন্তু 'দুয়ে পক্ষ'র পক্ষ এদের থেকে দুটিকে বেছে নিয়ে কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না নিশ্চয়।


 ৩ এ নেত্র
---------
'তিনে নেত্র' উচ্চারণ করে একটু থামতে হয়। নিজের দুই নেত্র বন্ধ করে তৃতীয় নেত্রের হদিশ খুঁজতে হয়। দার্শনিকরা বলেন এই তৃতীয় নেত্র
জ্ঞাননেত্র, যা দিয়ে দেখার অতীত কিছু দেখা যায়। যা দেখে শিল্পী করেন শিল্প সৃষ্টি, জ্ঞানী লাভ করেন পরমার্থ। ত্রিনেত্র হলেন মহাদেব। তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে বর্ষিত হয় কখনও রোষাগ্নি, কখনও করুণা আর দাক্ষিণ্য।
 


৪ এ বেদ
---------
চারে বেদ কিংবা চারে চতুর্বেদ। এর অর্থ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। বেদের অর্থ জ্ঞান। পুরুষানুক্রমে লব্ধ জ্ঞানরাশিকে সূত্র ও সংগতি অনুসারে চার ভাগে বিভক্ত করে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন সৃষ্টি
করলেন চতুর্বেদ—ঋক্‌, সাম, যজুঃ ও অথর্ব, পৃথিবীর আদিমতম চারটি গ্রন্থ। মহিমান্বিত হলেন বেদব্যাস নামে। 'ব্যাদে সব আছে' বলে বিদ্রূপ করেছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা সেইসব অত্যুৎসাহীদের যারা বিশ্বাস করতেন ও প্রচার করতেন যে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক কোনো আবিষ্কারই নতুন নয়, সবই বেদে উল্লিখিত আছে। বেদে সব নেই, কিন্তু বেদে আছে মানবিক কর্মকাণ্ডকে সংহত করার নির্দেশনা, বিশ্বরহস্য উন্মোচনের প্রথম প্রচেষ্টা আর আত্মোপলব্ধির প্রয়াস। বেদের অঙ্গ হিসাবে উদ্ভূত হয়েছে উপনিষদ ও বেদান্ত, যেখানে মানবপ্রজ্ঞা আরোহণ করেছে চরমতম শিখরে।


 ৫ এ পঞ্চবাণ
---------------
পাঁচে পঞ্চবাণ। এ পঞ্চবাণের অর্থ বা মর্মগ্রহণ শিশুসাধ্য নয়। পঞ্চবাণ বা পঞ্চশর হলেন মদনদেব, কামের অধিষ্ঠাতা দেবতা। তাঁর আয়ুধ
পুষ্পধনু এবং পাঁচটি বাণ—সম্মোহন, উন্মাদন, শোষণ, তাপন ও স্তম্ভন। পর্যায়ক্রমে এগুলির প্রয়োগ জীবকুলের চিত্তে ও দেহে কী প্রভাব ফেলে এদের নামেই তার প্রকাশ। সৃষ্টিরক্ষায় মদনদেব ও তাঁর পঞ্চবাণের ভূমিকা অপরিহার্য। অসুরনিধন কল্পে কুমার কার্তিকেয়র জন্ম সম্ভাবনায় দেবতাকুলকে উদ্যোগী হতে হয়েছিল মদনদেবকে পাঠিয়ে মহাদেবের ধ্যান ভঙ্গ করতে। তার পরিণাম সর্বজনবিদিত। একাধারে ক্রুদ্ধ মহাদেবের রোষানলে মদনভস্ম আর ধ্যানভঙ্গ মহাদেবের অনুরাগে কুমারসম্ভব। মদনের ভস্ম বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল বলেই সৃষ্টিতরঙ্গ আজও অব্যাহত। শুধু জৈবিক সৃষ্টি নয়, মানবিক প্রেমভিত্তিক অজস্র সাহিত্যসৃষ্টিও। পাশ্চাত্য পুরাকাহিনিতে মদনদেবের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন কিউপিড (Cupid)। তাঁরও অস্ত্র পুষ্পধনু, তবে তাঁর তূণে কতগুলি বাণ তা' বলা হয়নি। তীরবিদ্ধ শিকার তাঁকে প্রশ্ন করতেই পারে 'তোমার তূণে আছে আরো কি বাণ'। মদনদেব যুবা, তাঁর পত্নী রতি। কিউপিড কিন্তু অপাপবিদ্ধ বালক। বালকবীরের বেশে বিশ্বজয় করার রাবীন্দ্রিক কল্পনা কিউপিডে মূর্ত, মদনদেবে নয়।


৬ এ ঋতু
---------
ছয়ে ঋতু -গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত। ষড়ঋতুর আবর্তে নিয়ন্ত্রিত আমাদের জীবনযাত্রা। শিশু তাই স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত হয়ে ওঠে ঋতুগুলির সাথে।
গ্রীষ্মের পরেই আসে একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টি নিয়ে মেঘলা বিষন্ন হেমন্ত। মেঘ আছে, মেঘের আড়ম্বর নেই। আমাদের বর্ষা শুধু যে অন্ন জুগিয়ে চলেছে তা' নয়, তার ঘনঘটায় অভিভূত হয়েছে কবিচিত্ত—কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ। বর্ষার পর শরৎ আসে তার অমল মহিমা নিয়ে - তার সোনা রোদ্দুর, শিউলি ফুল আর ঘাসের আগায় শিশির বিন্দু, মাঠে মাঠে ধান আর 'পারে না বহিতে নদী জলভার'। স্বল্পস্থায়ী হেমন্ত ফসলে ভর্তি মাঠের উপরে সন্ধ্যাবেলায় কুয়াশার আস্তরণ টেনে মনে এঁকে যায় এক স্থায়ী চিত্রপট। পাশ্চাত্য দেশের হেমন্তের মতো গাছের পাতায় রঙের হোলিখেলা চলে না। তবু কবির নজর এড়ায় না 'দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ'।
 

৭ এ সমুদ্র
---------
সাতে সমুদ্র বললেই শিশুর কল্পনায় ভেসে ওঠে সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারের তেপান্তরের মাঠের কথা। সমুদ্র তার চাক্ষুষ দেখা না-থাকলেও

কল্পনা করে নিতে অসুবিধা হয় না সমুদ্র এক অনন্ত বিস্তৃতি জলরাশি। আর একটু বড়ো হয়ে পাঠ্যপুস্তক থেকে সে জানতে পারে পাঁচ মহাসাগরের কথা—অতলান্তিক মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, উত্তর মহাসাগর আর দক্ষিণ মহাসাগর। কিন্তু এই সাতসমুদ্র হল পুরাণে বর্ণিত সাত সমুদ্র—লবণ, ইক্ষুরস, সুরা, ঘৃত, দধি, ক্ষীর ও স্বাদূদক বা মিষ্টিজলের সমুদ্র। এদের ভৌগোলিক দর্শনপ্রাপ্তি সম্ভব নয়। পুরাণে এইসব দেবদুর্লভ সমুদ্রে উপনীত হবার বা সেগুলো ভোগের অধিকার নির্দিষ্ট আছে বিশেষ বিশেষ পুণ্যকর্মের অধিকারীর জন্যে।





 
 ৮ এ অষ্ট বসু
--------------
আটে অষ্ট বসু। কালীপ্রসন্ন সিংহের অনূদিত মহাভারতে পাচ্ছি 'পৃথু ইত্যাদি আট বসু', তাদের মধ্যে আর একটিমাত্র নাম—দ্যু বসু। এঁরা সকলেই দেবতা। 'সংসদ্‌ বাঙ্গালা অভিধান' জানাচ্ছে, এই অষ্টবসু দক্ষ প্রজাপতির কন্যা বসুর আট পুত্র। তাদের নাম—ভব, ধ্রুব, সোম, বিষ্ণু, অনল, অনিল, প্রত্যুষ, প্রভাস (মতান্তরে, প্রভব)।
মহাভারতের আখ্যানমতে পৃথু প্রমুখ অষ্টবসু বশিষ্ঠ মুনির সর্ব সুলক্ষণা গাভী নন্দিনীকে অপহরণ করেছিলেন দ্যু বসুর পত্নীর অভিলাষ পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে। এই পাপের জন্য বশিষ্ঠ তাঁদের মনুষ্য হয়ে জন্মানোর অভিশাপ দিয়েছিলেন। তাঁদের অনুনয়ে বশিষ্ঠ সাতজনের দণ্ড লাঘব করে জন্মের অব্যবহিত পরেই স্বর্গে ফিরে আসার অনুমতি দিয়েছিলেন, শুধু যার জন্যে এই বিপত্তি সেই দ্যু বসুর শাস্তি ধার্য হল যাবজ্জীবন মনুষ্যলোকে কালযাপন। তাঁদের অনুরোধে সুরধুনী গঙ্গা সম্মত হয়েছিলেন নরলোকে এসে তাঁদের গর্ভে ধারণ করতে। শান্তনু-পত্নী হয়ে গঙ্গা সাত সদ্যোজাত পুত্রকে এক এক করে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। শান্তনুর বাধায় গঙ্গা অষ্টম পুত্রকে ভাসিয়ে দিতে পারেন নি, কিন্তু শান্তনুকে ত্যাগ করে স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এই অষ্টম পুত্রই দ্যু বসু—মানবজন্মে যিনি দেবব্রত, পরবর্তীকালে ভীষ্ম।

৯ এ নব গ্রহ
--------------
নয়ে নবগ্রহ। সূর্যের বা অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশে পরিক্রমণকারী মহাজাগতিক বস্তুরা হল গ্রহ। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান মতে সূর্যের গ্রহরা হল—বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন আর প্লুটো। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে
'নয়ে নবগ্রহের' ন'টি গ্রহ হল—সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু আর কেতু। বুঝতে অসুবিধা হয় না খালি চোখে দৃশ্যমান সাতটি উজ্জ্বল আকাশদীপ গ্রহ বলে চিহ্নিত হয়েছে, শুধু রাহু কেতু কল্পনানির্ভর। কিন্তু সেই কল্পনারও একটা ভিত্তি আছে। সারা বছরে একাধিকবার গ্রহণ লাগে সূর্যে আর চন্দ্রে। এক কালো ছায়া এসে গ্রাস করে তাদের, কখনও আংশিকভাবে, কখনও সম্পূর্ণভাবে। কী এই কালো ছায়া? তার সূত্র মিলবে সমুদ্রমন্থনের কাহিনিতে। স্বর্গচ্যুতা লক্ষ্মীকে পাতাল থেকে উদ্ধার করার জন্যে সমুদ্রমন্থনের প্রয়োজন হয়েছিল, আর সে-জন্যে দেবতাদের নিতে হয়েছিল অসুরদের সহায়তা। সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল অমৃতভাণ্ড, যে অমৃত পান করলে অমর হওয়া যায়। তাই তার দাবিদার সুর অসুর দু-দলই। অনাচারী প্রবল দৈত্যদের অমরত্ব থেকে বঞ্চিত করতে দেবতারা সাহায্যপ্রার্থী হলেন বিষ্ণুর। বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ করে অমৃত বন্টন করতে এলেন। কমণ্ডলুর মাঝখানে প্রাচীর দিয়ে একদিকে অমৃত অন্যদিকে দুধ রেখে দুই পঙ্‌ক্তিতে উপবিষ্ট দেব ও অসুরদের মধ্যে অমৃত ও দুধ বন্টন করলেন মোহিনীরূপী বিষ্ণু। রাহু নামের এক চতুর অসুর অমৃতবন্টনে এইরকম বৈষম্যের অনুমান করে ছদ্মবেশে এসে বসেছিল দেবতাদের পঙ্‌ক্তিতে। অমৃতপাত্রে চুমুক দেবার মুহূর্তে সেটা চোখে পড়ে সূর্য আর চন্দ্রের। বিষ্ণুকে সে-সংবাদ দিতেই বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে তার মস্তক ছিন্ন করলেন। অমৃতপানের প্রভাবে মুণ্ড আর ধড় অমর হয়ে আকাশে আবর্তিত হতে লাগল—মুণ্ড রাহু নামেই, আর তার ধড় কেতু। সূর্য আর চন্দ্র তাকে চিহ্নিত করেছিল এই বিদ্বেষে রাহু তাদের পিছনে ধাওয়া করে সর্বদা, আর সুযোগ পেলেই তাদের কামড়ে ধরে বা গিলে ফেলে। কিন্তু তার কাটা মুণ্ড থেকে বেরিয়ে গিয়ে অচিরেই মুক্তি পায় সূর্য আর চন্দ্র।
রাহুর ছিন্ন ধড় কেতু এই নিয়ে মতানৈক্য আছে। অমৃত তো রাহুর গলার নীচে নামেনি, তাহলে তার ধড় অমরত্ব পায় কী ভাবে? তাছাড়া রাহুর গোত্র জৈমিনি, কেতুর গোত্র পৈতিনশ। তাই এই দুই অংশ এক দেহধারীর হতে পারে না। 'ছায়াগ্রহ' বলেও কেতুর উল্লেখ পাওয়া যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে সূর্য ও চন্দ্রের মহাকাশ পরিক্রমণের কক্ষপথ দুটি যে উত্তর দক্ষিণ বিন্দুতে পরস্পরকে অতিক্রম করে যায় সেই দুটি বিন্দুই হল রাহু আর কেতু।

১০ এ দিক
-----------
দশে দিক। দিক তো চারটে - পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর আর দক্ষিণ, খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। পূর্বদিকে সূর্য ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়, শীতে উত্তুরে হাওয়া বয়, গ্রীষ্মে দখিনা। ভারতের ভৌগোলিক সীমানা জানতে বাচ্চাদের পড়তে হয় উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বে মায়ানমার ও চীন, আর পশ্চিমে আরব সাগর ও পাকিস্তান। বাকি দিকগুলো লুকালো কোথায়? -- 'আছে, আছে। সেগুলো হল ঈশান, অগ্নি, নৈঋ'ত, বায়ু, ঊর্ধ্ব আর অধঃ।' সে বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায়। অজ্ঞতা কি শুধু তার একার? বড়োরাই কি সবাই বলতে পারবে কোন্‌টা ঈশান, কোন্‌টা নৈঋ'ত? 

অগ্নিকোণ হ'ল দক্ষিণ-পূর্ব কোণ, অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণদেরও সেটা ভুলে গেলে চলে না। অগ্নিকোণের অধিদেবতা হলেন অগ্নি, যজ্ঞকর্মের অগ্নিকুণ্ডের স্থাপনা করতে হয় যজ্ঞক্ষেত্রের অগ্নিকোণে। নৈঋ'ত হল দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ, যেদিকে আমাদের কেরল মালাবার উপকূল। অবশিষ্ট বায়ু তাহলে অবশ্যই উত্তর-পশ্চিম কোণ। অবিভক্ত ভারতে হাওড়া থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পেশোয়ার পর্যন্ত বায়ু বেগে বায়ুকোণের দিকে ছুটত বলেই কি ট্রেনটির নাম দেওয়া হয়েছিল 'তুফান মেল'? বাকি রইল ঊর্ধ্ব আর অধঃ। মাথার উপরে আকাশের চাঁদোয়া, আর পায়ের নীচে পৃথিবীর ভূমি যা খুঁড়তে খুঁড়তে রসাতল পাতাল পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। মানুষের চিত্তবৃত্তিকে ঊর্ধ্বগামী করাতে হয়, অনবধানে হয় অধঃপতন—রসাতল গমন। উপর-নীচ নির্দেশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন ভারতবর্ষের প্রাচীন দার্শনিকেরা।

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।