• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

মন্দির লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মন্দির লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৬ ডিসেম্বর ২০২০

আজ আমি আপনাদের কামরূপ কামাখ্যা মায়ের মন্দিরের রহস্য ও এক সাধিকার সম্পর্কে কিছু বলব।

সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের দেব দেবীর মন্দির আর সেইসব মন্দিরের দেবদেবীর দর্শন ভাগ্যের ব্যাপার। তবে এই সকল মন্দির সম্বন্ধে যে সব অজানা রহস্য আছে তা আমাদের অনেকেরই অজানা। তাই সেই অজানাকে জানতে আজ এই লেখাটি মন দিয়ে পড়ুন। আজ আমি আপনাদের কামরূপ কামাখ্যা মায়ের মন্দিরের রহস্য ও এক সাধিকার সম্পর্কে কিছু বলব।

কামরূপ কামাখ্যা মন্দির ভারতের আসামের গৌহাটি নামক স্থানে নিলাচল নামক পাহাড়ে অবস্থিত। এই প্রাচীন মন্দিরে যেখানে আদি শক্তি মা কামাখ্যার পূজো করা হয়। এটি তন্ত্র সাধনারও একটি অন্যতম প্রধান স্থান। মা এখানে খুবই কৃপাময়ী তাই অম্বুবাচী তিথিতে মেলার সময় এখানে খুব ভিড় হয়।


কালিকাপূরান অনুযায়ী জানা যায় যে মাতা সতীর পিতা প্রজাপতি দক্ষরাজ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। শিব বিদ্বেষী দক্ষরাজ এই যজ্ঞে সতী ও শিবকে নিমন্ত্রণ করেন না। সেই সময় শিব ও সতীর মধ্যে মনোমালিন্য হয় যজ্ঞকে কেন্দ্র করে। পরবর্তী সময়ে শিবের অনুমতি নিয়ে সতী যজ্ঞ স্থানে আসেন। কিন্তু দক্ষরাজ শিবসহ সতীকে অপমান করেন। স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুণ্ডের আগুনে আত্মহুতি দেন দেবী সতী। সতীহারা শিব প্রচন্ড রাগে সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। সমস্ত সৃষ্টিকে বাঁচতে ও সমস্ত দেবতার অনুরোধে বিষ্ণুদেব তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খন্ড খন্ড করে ৫১ টি অংশে বিভক্ত করেন। পরবর্তীকালে সতীর দেহের ৫১ টি অংশ বহু স্থানে পড়ে তৈরি হয় আদি শক্তির পীঠস্থান। কামাখ্যার নীলাচল পাহাড়ে পড়ে এই অংশটি কালক্রমে প্রস্তরীভুত হয় ও এখানে পূজো হয়।

কামাখ্যা মাকে সবাই তন্ত্র সাধনার দেবী বলেন। তাই তন্ত্র সাধনার মূল স্থান কামরূপ কামাখ্যা মন্দির। এই মন্দিরে দশমহাবিদ্যার মাতঙ্গী ও কমলা রূপটিরও পূজা হয় আর গর্ভগৃহের বাইরে মার বাকি মহাবিদ্যার মন্দির রয়েছে।


এখানে মন্দির সকাল ৮ টায় খোলে এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে মায়ের মন্দির খুব রহস্যময় ও আকর্ষণীয়। যে প্রস্তরটি পূজিত হয় ও ফুল দিয়ে ঢাকা থাকে সই খান থেকে প্রাকৃতিক ভাবে অনবরত জল বের হয়। এই জল কোথা থেকে আসছে তা সকলেরই অজানা। প্রতিবছর তিন রাত ও চারদিন অম্বুবাচী তিথিতে মায়ের মন্দির বন্ধ থাকে। সেই সময় এখানে বিরাট মেলা বসে। এই পীঠস্থানে তান্ত্রিক ও অঘোরীদের খুব যাতায়াত। মা এখানে খুবই কৃপাময়ী। ভগবান শিব ও দেবী সতীর প্রিয় স্তান এই তীর্থভুমি।


সেটা ২০০৪ কি ২০০৫ হবে, অম্বুবাচীর মেলায় চলেছি। হেঁটে উঠছি মূল ফটক ধরে। নীলাচল বাসিনী কামরূপা কামেশ্বরীর টানে নীল পাহাড়ে নেমেছে দেশ বিদেশের সাধুর ঢল। যোগী, গৃহী, যতি, ন্যাসী, শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, গানপত্য্ কে নেই সেই দলে? নিরঞ্জনী থেকে মূর্তি পূজারী, সাকারী থেকে নিরাকারী পায়ে পায়ে অম্বুবাচীর মহামেলায় সকলেই নীল পাহাড়ের পাদদেশে।


নীলনয়না সুন্দরীর আকর্ষণে কামাখ্যা পাহাড়ের অমোঘ হাতছানি -- কার সাধ্য এড়ায় সেই চোখের ইশারা! পরতে পরতে যাদু টোনার রোমহর্ষক গালগল্প, সুন্দরীর সন্মোহনে পুরুষের ভেড়া হয়ে ম্যাঁ-ম্যাঁ করে ঘুরে বেড়ানোর টান টান পৌরাণিক কাহিনী! নীলাচলের গুহায় গুহায় রাতভর তন্ত্র জাগরণ -- আদিম রাত নামে ঘোরলাগা চোখে। সুপ্রাচীন কাল থেকে তন্ত্র মন্ত্র ও গুপ্ত সাধনার কেন্দ্র ভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে দেবী তীর্থ কামাখ্যা। মা এখানে চিরযৌবনা কামেশ্বরী। ৬৪ কলার গোপন সাধনা কেন্দ্র। এই শক্তিপীঠের কথা দেবী ভাগবত, দেবী পুরান, তন্ত্র চূড়ামণি, কালিকা পুরাণ, যোগিনী তন্ত্র, হেবজ্র তন্ত্র সহ প্রাচীন গ্রন্ত্রে রয়েছ। ভারতবর্ষের শক্তি সাধনার অত্যন্ত সুপ্রচীন কেন্দ্র কামরূপা কামাখ্যা। অবশেষে গুয়াহাটি কাঁপিয়ে বৃষ্টির মধ্যে ছুটে চলেছে দৈ্ত্যকার বাসগুলো। বৃষ্টির কোপে মানুষ যেখানে নিরাপদ ডেরা খুঁজছে সেখানে পথ চলছে অম্বুবাচীর পথিক। কাতারে কাতারে মানুষ চলছে কামেশ্বরী মা কামাখ্যার টানে।

নীলচলের পাহাড়ি পথ গোটাটা-ই মানুষের দখলে। সবার লক্ষ্য মন্দির, একবার মায়ের দরবারে হাজিরা দিতে পারলেই যেন বিশ্বজয় হয়ে গেল। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে স্বেচ্ছাসেবীরা পানীয় জলের যোগান দিচ্ছে। অম্বুবাচীর মহামেলায় নেই কোন জাতপাতের বালাই। গরিয়া (মুসলমান) ছাত্র সংস্থা অন্য হিন্দু সংস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনদিন ধরে কয়েক হাজার মিনারেল ওয়াটারের বোতল তুলে দিচ্ছে পিপাসিত পূণ্যার্থীর হাতে। যত উপরে উঠছি পায়ের নীচে ছোট হয়ে আসছে গুয়াহাটি শহর।


কখন যে বৃষ্টি থেমে গেল, মেঘ ঝরা আকাশে ফুটে উঠেছে দু-চারটি জোনাকির মতো তারারা। দুই পাশের অন্ধকার ঘন জঙ্গল থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা সঙ্গীত ছাপিয়ে মানুষের বিচিত্র কথনে প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষপুরের আবহসঙ্গীতে যেন ইতিহাস ফুঁড়ে উঠেছে। এ কোন ভারতবর্ষ! অষ্ট্রিক দ্রাবিড, মোঙ্গলীয় হাত ধরাধরি চলছে আদিম শক্তি মাতৃ রূপা কামনা পূরণের দেবীর দরবারে বিচিত্র চাওয়া-পাওয়া নিয়ে।

পথের বাঁকে বাঁকে দেবীর আরাধক গণ বিচিত্র সম্ভার বিছিয়ে রেখেছেন। মেলা যে -- তাই ভক্তিরও প্রদর্শনী আছে। গৌরী মা ও সাজিয়ে বসেছেন রাজপাট। রক্তাম্বরী, বয়স খুব বেশি তখন চল্লিশের আশেপাশে। টল টলে দুটো চোখ কিন্ত নেশার ঘোরে ঘূর্ণায়মান। লম্বা একরাশ চুল পিঠে ছড়ানো, আবার জটও আছে। যে কোন ভদ্র লোকের ঘরের মানান সই গিন্নি হওয়ার ক্ষমতা রাখে। গায়ের রঙ ধবধবে ফরসা। কপালে আধুলি সাইজে লাল সিঁদুরের টিপ। সিঁথিতে লাল রঙ বীভৎস ভাবে লেপ্টে আছে। বুকটা দপ করে উঠল এই মেয়ে এখানে কেন? অম্বুবাচীর মহামেলার প্রদর্শনীতে এ কী করে এলো?

গৌরী মাকে ঘিরে বেশ বড় জটলা। কাছে কী করে যাওয়া যায়! ওই ষন্ডামার্কা ভৈরব কি ওর রক্ষক? লাঠি দিয়ে ভিড় তাড়াচ্ছে যেন মশা মারচ্ছে পটাস পটাস করে। এক কোনে দাঁড়িয়ে আছি। লোকজন প্রনামী নিয়ে আসছে, গৌরী মার ঘোর নামছে। চোখ দুটো আনমনা হয়ে গেল, হঠাৎ বিকট শব্দ করে গৌরী ভাবে পড়ে গেল। ষন্ডাভৈরবকে নীচে ফেলে গৌরী চড়ে বসল তার উপর। যেন শিবের উপর কালী।

চারদিক কাঁপিয়ে শাঁখ করতাল ঊলু ধ্বনি শিঙ্গা বেজে উঠল। দৌড়াদৌড়ি হুড়াহুড়ির মধ্যে ছিটকে পড়লাম। ভাব ধরেছে, ভাব ধরেছে। জবাব উঠছে -- 'আয়, যার যা জানার জেনে নে, যার যা পাওয়ার চেয়ে নে। মা ভরে পড়েছেন।'

আমি এই সব পছন্দ করি না, তাই তাড়াতাড়ি সেই জায়গা ছেড়ে হাঁটা দিলাম।

এরপর কয়েকদিন ধরেই তাকে, কেন জানি না, খুঁজে চলেছি, মন্দিরের পাশে বলিঘরের মধ্যে খুঁজলাম, এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি গৌরী বা কড়ি-মা মূল মন্দিরের পেছনে দিকে, এটাই মনে হয় ওর মূল বসার জায়গা। কড়িমার সঙ্গে পরিচয়ে জানলাম যে ও এই পথে বহু বছর হয়ে গেল। অনেক বছর ধরে এই সময়ে সে না কি কামাখ্যা আসে।

আলাপ থেকে অন্তরঙ্গতা ও বন্ধুত্ব। কড়ির সমস্ত শরীর জুড়ে কড়ির গহনা। কোমরে, হাতে, পায়ে, গলায় অজস্র কড়ির গহনা। কড়ি আসে তারাপীঠ থেকে। ওখানে ওর নাম গৌরী, কেউ বলে কুক্কুরী মা। আটটি কুকুর পাহারা দেয় ওর তারাপীঠের আসন। সেই আসন ও আমাকে ছেড়ে দিতে রাজী আছে, বন্ধুত্ব বলে কথা।

কড়িকে জিজ্ঞেস করলাম - ‘তোমার সাধনা কি?’

চটজলদি জিহ্বাগ্র সূচালো করে কড়ি ‘লিঙ্গ মুদ্রা’ দেখিয়ে দিল। আরেকটি হাত উঠে এলো নাকের ফুটোতে। এই দুই মিলনে শক্তি লাভ। বামাচারী তন্ত্রের কথা বলছে নিরক্ষর কড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে লিঙ্গ যোনির সঙ্গম- ‘জলে নামিবি সাঁতার কাটিবি …তবু চুল ভিজাবি না’।


কড়ির হাতের বিশাল ত্রিশূলটা ছুঁয়ে দেখতে যেতেই ফোঁস করে উঠল কড়ি -- ‘এ্যাই খবরদার কইছি। ত্রিশূলে হাত দিবি না। ভস্ম হয়ে যাবি’।

আমি বললাম -- ‘ও সব ভণ্ডামি অন্যের কাছে করবি কড়ি। তোর ত্রিশূলে কি ভূত প্রেত রয়েছে?’

কড়ি রাগে অগ্নি শর্মা হয়ে আমার কপালে ত্রিশূল উঁচিয়ে ধরলো। এক ভৈরবীর এই ব্যবহারে খুব রাগ হল আমার, কোথা থেকে বল এলো জানি না। ওর হাতের ত্রিশূল কেড়ে নিয়ে উল্টো করে ওর দিকে তাক করলাম এইবার --

বিস্ময়ে কড়ির চক্ষু চড়ক গাছ -- ‘ও মা গো, তুই কি কালীর অবতার!’

এইবার আমার মুচকি হাসার পালা। কত সহজে এরা বন্ধু বনে ও বানায়।

আমি বললাম -- ‘কালীর বাপের বাপ গো, চিনলি না আমাকে!’ তারপর থেকে কড়ি আমার খুব ভালো বন্ধু।

অম্বুবাচীর রাতজাগা সাধনায় ক্লান্ত কড়ি। চোখের নীচে কালি, নতুন বস্ত্রের গরম ও অনিদ্রা তার চকমকে ভাবটি অনেক খানিই ম্লান হয়ে গেছে। লোকে আশীর্বাদ নিতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কড়ির বসার আসনের পেছনে একটি কাপড়ের পুটুলি খক্ খক্ করে কেশে উঠল। একটা মুখ বেরিয়ে এল, কড়ি তাড়াতাড়ি লাল রঙের তরল পদার্থ কাপড়ের পুটুলির মুখ ফাঁকা করে ঢেলে দিল।

-- মানুষ নাকি রে?

কড়ি চোখ টিপে কানে কানে বলল -- ‘আমার গুরু গো। মিনসে সারা রাত চক্রে বসেছিল। গাঁজা চরস এক সঙ্গে টেনে মরতে বসেছে। বুকের হাপরের টান। মানা করলাম, একদমই শুনলো না’।

বোকার মত জিজ্ঞাসা করলাম -- ‘চক্র’ কি রে?’ চোখ মটকে কড়ি আবার জিহ্বা বের মুদ্রা দেখালো।

আমি বললাম -- ‘ওরে বাবা এই বয়সেও!’

কড়ি বললো --- 'আমার গুরু গো, এর হাত ধরে এই পথে এতদুর এয়েছি যে। ফেলাতে পারি না তো। কুকুর শেয়াল থেকে বহুবার বাঁচিয়েছে যে।’

কড়ির চোখের কোনে কি জল? ভৈরবীর কি দয়া মায়াও আছে? গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি তো অটল দেখছি!

কড়ির চোখে উদাসীন দৃষ্টি -- গল্পের গন্ধ পেলাম, পূর্বজীবনের গল্প -- ‘ছিলাম গৌরী সরকার, হইলাম কুক্কুরী মা। তারাপীঠের জাগ্রত ভৈরবী। গৌরী আর দশটা বাঙালি মেয়ের মতোই মা-বাবার সংসারে বড় হচ্ছিল স্বপ্ন নিয়ে।

বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের সাধারণ বাঙালি মেয়ে, স্কুলের মুখ দেখিনি। গরীবের সংসারে লেখাপড়া শিইখ্যা কে কবে লাট-হাকিম হইছে। দেখতে তো ফেলনা নয়। গায়ের চামড়া ফুটফুটা। এক দূর সম্পর্কের ভাইগনার মধ্যস্থতায় বিয়ে ঠিক হইল কালী মন্দিরের এক সেবায়ইতের সঙ্গে।

শ্বশুর বাড়িতে প্রথম রাতে স্বোয়ামীর বদলে ফুলশয্যায় আইলেন মন্দিরের পুজারী। ইয়া তাগড়া চেহারা। দেখে ভয়ে সিটকাই যাই। ও মা গো। 'হে মা কালী বাঁচাও গো'- কত আর্তনাথ করলাম গো। মিনসে ভাগাল-পা, বুড়া সাপ লাজা দিয়্যা বান্ধাইয়া পালাইল গো!

না কেউ বাঁচাতে আসে নাই গো। কেউ আসে না গো। ওই সব কালী দুগ্গা সব মিছা। কামাখ্যা, তারা সব মিছা -- মেয়েছেলের শরম বাচাইতে। সোয়ামী মিনসে বলল গুরুদেবকে তুষ্টি কইরলে ভগমান শক্তি দিবে। আমার জীবন ওই দিনই ঠিক হইয়া গেছে রে। তারপরে কত হাত বদল। শেষে ভাসতে ভাসতে তারাপীঠে আইলাম রে। এই গুরু আশ্রয় দিল, দীক্ষা দিল। এখন কোন পুরুষরে ডরাই না গো। এখন পায়ের তলে পিষে রাখি’।

কড়ির পুরুষ পিটানোও সচক্ষে দেখা গেল। হাতের হরিণের চামডা দিয়ে বানানো বেত, আশীর্বাদ প্রার্থীদের নীল ডাউন করিয়ে পিঠে দু ঘা মেরে বলছে -- ‘যা তোর মঙ্গল হবে’।

প্রণামী না পেলেই হুঙ্কার -- ‘এ্যাই প্রণামী দিলি না’। পিঠে দুই ঘা, তার উপরে প্রণামী।

বেশ আছে কড়িমা গৌরী! অনেক শিক্ষিত মানুষরাও তার আশীর্বাদ প্রার্থী যে!

রাত হলে ঘোর নামে। তন্ত্র মন্ত্রে কামাখ্যাধাম রহস্যময়ী হয়ে উঠে। ভাঙ গাঁজা চরস ভাঙের খোলা ঢালাও ব্যবস্থা। বিনা লাইসেন্সে খুব কম পয়সায় দম দমাদম চলছে। ভৈরবের সঙ্গে ভৈরবী। কেষ্ট ঠাকুরের সঙ্গে রাধারানী। সব ভাবে ভারে পড়ছে। লাখো লাখো লোক চিৎকার করছে, --- ‘জয় মা কামাখ্যা! জয় সিদ্ধেশ্বরী, জয় বিন্ধ্যবাসিনী, জয় রাধারানী, জয় ভুবনেশ্বরী’।

মোহময় রাত, তন্দ্রাহারা রাত, অম্বুবাচীর পুণ্যলগ্নে নিমেষ হারা হয়ে তাকিয়ে থাকে। আসলে অম্বুবাচীতে কামাখ্যাধামে কোন দিন রাত নেই। বরং রাতই জমে উঠে ষোড়শী মেজাজে। রজশ্বলা চিরযৌবনা ষোড়শী কন্যার ৬৪ উপাচারে অঘোরী, বামাচারী, দক্ষিণা ও শৈব-বৈষ্ণবের মাখোমাখো সাধনায় আদিভৌতিক পৃথিবী লাল গেরুয়া সাজে জেগে উঠে তিন দিনের জন্য।

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

২৪ মে ২০২০

ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের এক বিশাল এক শক্তিশালী হিন্দু সাম্রাজ্য কথা জানবো ।

খামের সাম্রাজ্য ( ৮০২-১৪৩১) দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল । ৮০২ সালে চক্রবর্তী সম্রাট দ্বিতীয় জয়বর্মন এই সাম্রাজের প্রতিষ্ঠা করেন । বর্তমানের কম্বোডিয়া,থাইল্যান্ড,লাওস এবং দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গঠিত হয় এই শক্তিশালী হিন্দু সাম্রাজ্য । ১৫ শতাব্দীতে খামের সাম্রাজ্যের পতন হয় । খামেরদের রাজধানী ছিল অঙ্কোরাভাট অর্থাৎ মন্দিরের শহর ।

প্রাচীন মন্দির বলতে মানুষের ধারণা শুধু ভারতবর্ষেই। কিন্তু ভারতবর্ষ থেকেও হাজার মাইল দূরে কম্বোডিয়ায় অবস্থিত সনাতন ধর্মালম্বীদের স্থাপিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মন্দির। শুধু সর্ববৃহৎ বলে নয় এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্য দেখলে রীতিমতো তাজ্জব বনে যেতে হবে।
সব মন্দিরকে ছাপিয়ে এই অঙ্কোরভাট মন্দির অধীষ্ঠিত আছে অনন্য উচ্চতায়। বিস্তারিত বর্ণনার আগে জানিয়ে নেই এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন অঙ্কোরের তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ। দ্বাদশ শতাব্দীতে (১১১৩-১১৫০) নিজের রাজধানী ও প্রধান উপসনালয় হিসেবে এই বিশাল স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ। রাজা সূর্যবর্মণের মৃত্যুর পর মন্দিরের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় তাই মন্দিরের দেয়ালে কিছু কারুকাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তখন দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে এক শক্তিশালী সরকার গঠন করেছিলেন সেটা তাঁর এই স্থাপত্য দেখলেই অনুমান করা যায়৷ তাঁদের সাম্রাজ্যকে বলা হত খামের সাম্রাজ্য। খামের সাম্রাজ্যের আরাধ্য দেব মহাদেব হলেও দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বিষ্ণু দেবের জন্য।
ঙ্কোরভাট নির্মাণশৈলী খামের স্থাপত্যশৈলীকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই মন্দিরের নির্মাণকৌশলে দুইটা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে
১/ টেম্পল মাউন্টেন ধাঁচ (পাহাড়ি মন্দির ধাঁচ)
২/ গ্যালারি মন্দির ধাঁচ


★হিন্দু পূরাণের বিশ্বাস অনুযায়ী পৃথিবীর কেন্দ্র সুমেরু পর্বতে দেব-দেবীদের বসবাস তাই সেই সুমেরু পর্বতের আদলেই এই মন্দিরের মূল অংশ নির্মাণ করা হয়।
মন্দিরের ৫ টি সুইচ চুড়া সুমেরু পর্বতের ৫ টি পর্বতশৃঙ্গকে নির্দেশ করে।
★এই মন্দিরের সুরক্ষার জন্য মন্দিরের চারদিকে রয়েছে বিশাল পরিখা (ধারনা করা হয় কয়েকশত ফুট গভীর পরিখ) ও ৩.৫ কিঃমিঃ দীর্ঘ প্রাচীর। সম্পূর্ণ স্থাপনাটি প্রায় ৫০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
★বাইরের দেয়ালটি দৈর্ঘ্যে ১০২৫ মিটার, প্রস্থে ৮০২ মিটার, এবং উচ্চতায় ৪.৫ মিটার। এর চার দিকে ৩০ মিটার দূরত্বে ১৯০ মিটার চওড়া একটি পরিখা আছে। মন্দিরে প্রবেশ করার জন্য পূর্ব দিকে একটি মাটির পাড় এবং পশ্চিম দিকে একটি বেলেপাথরের পুল রয়েছে। এই পুলটি মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বার, এবং মন্দির নির্মাণের অনেক পরে যোগ করা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এর স্থানে পূর্বে একটি কাঠের পুল ছিলো।
★মূল মন্দিরটি শহরের অন্যান্য স্থাপনা হতে উঁচুতে অবস্থিত। এতে রয়েছে তিনটি পর্যায়ক্রমে উচ্চতর চতুষ্কোণ গ্যালারি, যা শেষ হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় টাওয়ারে। মান্নিকার মতে এই গ্যালারিগুলো যথাক্রমে রাজা, ব্রহ্মা, এবং বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। প্রতিটি গ্যালারির মূল (কার্ডিনাল) বিন্দুগুলোতে একটি করে গোপুরা রয়েছে। ভিতরের দিকের গ্যালারিগুলোর কোণায় রয়েছে টাওয়ার। কেন্দ্রের টাওয়ার এবং চার কোনের চারটি টাওয়ার মিলে পঞ্চবিন্দু নকশা সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের মৃত্যুর পর মন্দিরটি সূর্যবর্মণের সমাধিসৌধ হিসেবেও বিবেচিত হত। আসলে তখনকার সত্যিকার ইতিহাসের কোন সাক্ষ্য এমনকি মন্দিরের পূর্বনাম সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায় না।

১১৭৭ এর দিকে খামেদের চিরশত্রু চামদের দ্ধারা এই মন্দির লুন্ঠিত হয়। ধারণা করা হয় তখন এই মন্দিরের চূড়াগুলো স্বর্ন দিয়ে মোড়ানো ছিল৷ পরবর্তীতে ৭ম জয়বর্মন রাজ্যটিকে পুনর্গঠন করেন ও নতুন রাজধানী করেন অঙ্কোরথমকে এবং বায়ু নগরে প্রধান মন্দির স্থাপন করেন।
তবে কম্বোডিয়ায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচারের সাথে সাথে ১৪ শ থেকে ১৫ শ শতাব্দীর মধ্যে এই হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত হয় কিন্তু এখান থেকে বিষ্ণু মন্দির কখনও স্থানান্তরিত হয় নি এমনকি এই মন্দিরে এখনো প্রধান দেবতা হিসেবে ভগবান বিষ্ণুর পূজা হয়। ষোড়শ শতকের পর থেকে এই মন্দির অবহেলিত হতে শুরু হয় কিন্তু কখনওই পরিত্যক্ত হয় নি। মন্দিরের চারপাশের বিশাল পরিখার জন্যই এই মন্দিরকে জঙ্গলের গাছপালা গ্রাস করতে পারে নি।
পশ্চিমা পরিব্রাজকদের মধ্যে পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারক আন্তোনিও দা মাগদালেনার প্রথম এই মন্দির ভ্রমণ করেন ১৫৮৬ সালের দিকে। এই মন্দির ভ্রমণ করে তিনি লিখেছিলেন।
"এটি (মন্দিরটি) এমন অসাধারণ ভাবে নির্মিত যে, ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। সারা বিশ্বে এরকম আর কোন ভবন বা স্থাপনার অস্তিত্ব নাই। এখানে রয়েছে খিলান ও অন্যান্য কারুকার্য, মানুষের পক্ষে সম্ভাব্য সেরা সৃষ্টি।"
তবে পাশ্চাত্যে এই মন্দিরের কথা ছড়িয়ে পড়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসি অভিযাত্রী অনরি মৌহত এর ভ্রমণকাহিনীর মাধ্যমে। তিনি লিখেছিলেন,
"এই মন্দিরগুলির মধ্যে একটি (আঙ্করভাট), সলোমনের মন্দিরকেও হার মানায়। মাইকেলেঞ্জেলোর মতোই কোন প্রাচীন শিল্পী এটি নির্মাণ করেছেন। আমাদের সবচেয়ে সুন্দর ভবন সমূহের সাথে এটি সমতূল্য। এটি এমনকী প্রাচীন গ্রিস বা প্রাচীন রোমের স্থাপনা গুলির চাইতেও অনেক বেশি রাজকীয়, সুন্দর। বর্তমানে এই দেশটি (কম্বোডিয়া এলাকা) যে বর্বরতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে, তার সাথে এই মন্দিরের বিশালতার ও সৌন্দর্যের এক বিশাল ফারাক রয়েছে।"
বিংশ শতাব্দীতে আঙ্করভাটের ব্যাপক সংস্কার সম্পন্ন হয়। এ সময় প্রধানত এর চারিদিকে গ্রাস করে নেয়া মাটি ও জঙ্গল সাফ করা হয়। গৃহযুদ্ধ ও খ্‌মের রুজ শাসনকালে ১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকগুলিতে সংস্কার কার্য বাধাগ্রস্ত হয়। তবে আঙ্করভাট এলাকায় পরে স্থাপিত মূর্তিগুলি চুরি যাওয়া ও ধ্বংস করে ফেলা ছাড়া মূল মন্দিরের খুব একটা ক্ষতি এসময় হয় নাই।
বর্তমানে আঙ্করভাটের মন্দিরটি কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এটি দেশবাসীর গৌরব। ১৮৬৩ সালে প্রথম প্রবর্তনের পর থেকে কম্বোডিয়ার সব পতাকাতেই আঙ্করভাটের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে।সারা বিশ্বে এটিই একমাত্র ভবন যা কোন দেশের পতাকায় প্রদর্শিত হয়েছে।
#১৯৯০ এর দশক হতে আংকর ওয়তের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এর সাথে সাথে শুরু হয় পর্যটনশিল্প। ভারতের পুরাতাত্তিক সংস্থা ১৯৮৬ হতে ১৯৯২ সালের মধ্যে মন্দিরটিতে সংস্কারের কাজ করে। মন্দিরটি আংকরের বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসাবে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯২ সালে স্বীকৃত হয় এবং সপ্তম আশ্চর্যের নতুন ১৩ স্থাপত্যের তালিকায় জায়গা পায়।
২০১৫ সালে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রোলান্ড ফ্লেচার ও ড. ড্যামিয়ান "গ্রেট অঙ্কোর প্রজেক্ট" নামে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন৷ সেসময় তারা প্রত্নতাত্ত্বিক যাচাইবাছাইয়ের জন্য তীক্ষ্ণ ভূমি রাডার এবং এয়ারবোর্ণ লেজার স্ক্যানিং ব্যবহার করেছিলেন। তারা বলেন মন্দিরটির স্থাপনায় এমন কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে যা কল্পনার অতীত। স্ক্যানিংয়ে তারা এমন এক গঠনশৈলী পান যেটা আগে কখনও দেখা যায় নি৷ এর নাম দেন তারা "রেক্টিলিনিয়ার স্পাইরাল" তথা "সরলরৈখিক কুন্ডলী" যেটা মন্দিরের দক্ষিণ পাশে ৯ বর্গকিলোমিটার এ
লাকাজুড়ে

তারা মন্দিরের চারপাশে আরও কিছু টাওয়ারের সন্ধান পান যেগুলো মাটিচাপা অবস্থায় আছে এবং সম্পূর্ণটাই রহস্যময়।
আজ থেকে ৮০০ বছর আগে খামের সম্রাট দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ কম্বোডিয়ার নির্মাণ করে দিয়ে গেলেন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হিন্দু মন্দির যেটা প্রায় ৬০০ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিল হয়ত এখনও অনেকে এই বিষয় অজ্ঞাত।



©সংগৃহিত
Share:

২০ এপ্রিল ২০২০

প্রহ্লাদপুরী মন্দির, মুলতান পাকিস্তান - এখানেই নৃসিংহ দেব হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করে প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন (ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের ভিডিওসহ) ।

প্রহ্লাদপুরী মন্দিরের ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবর মুল বিগ্রহ
 প্রহ্লাদপুরী মন্দির পাকিস্তানের একটি হিন্দু মন্দির।এটি পাকিস্তানের মুলতানে অবস্থিত। বর্তমানে এই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। প্রহ্লাদ মহারাজের জন্ম হয় ত্রেতাযুগে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান শহরে । কশ্যপ বংশীয় রাজা হিরণ্যকশিপুর পুত্ররূপে তাঁর জন্ম হয় । প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন এক মহান বিষ্ণুভক্ত । কিন্তু তাঁর পিতা ছিলেন বিষ্ণু বিদ্বেষী । পিতা পুত্রের মনোভাবের এই বিরোধের ফলে, দৈত্য পিতা প্রহ্লাদকে নানাভাবে নির্যাতন করেছিল এবং বধ করার চেষ্টা করেছিল । সেই নির্যাতন যখন অসহ্য হয়ে উঠে, তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব রূপে আর্বিভূত হয়ে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছিলেন । বর্তমান পাকিস্তানের মুলতান শহরে প্রাচীন প্রহ্লাদপুরী মন্দির অবস্থিত ।এই স্থানটি পূর্বে কশ্যপপুর নামে পরিচিত ছিল । প্রহ্লাদপুরী মন্দিরটি ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের উদ্দেশ্যে স্বয়ং প্রহ্লাদ মহারাজ নির্মাণ করেছিলেন ।

মুলতাত মুসলমানদের আক্রমণের পর মুলতানের সূর্য মন্দিরের মতো এই মন্দিরটিও ধ্বংস হয়ে যায়। মন্দিরটি তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে এবং ১৯ শতকের সময় একটি আদর্শ মন্দির হয়ে ওঠে। মন্দিরটি মুলতানের দুর্গে একটি উচ্চ স্থানে অবস্থিত। হযরত বাহাহুল হক জাকারিয়ার সমাধির সমীপবর্তী । মন্দিরের কাছে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল । এটি শিখ সাম্রাজ্যের অধীনেও ছিল। এএন খানের মতে শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে মন্দিরটি পুন তৈরি করা হয়। ১৮৩১ সালে আলেকজান্ডার বার্নস মন্দির পরিদর্শন করেন এবং জানালেন যে এটি পরিত্যক্ত হয়েছে এবং এর ছাদ ছিল না। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশরা মুলতানের মুলকাস দুর্গে আক্রমণ করে। একটি কার্তুজ

দুর্গের ভিতরে একটি খোলা জানালাতে রাখা ছিল। বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার কবর , মন্দির ও দুর্গটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।




মন্দিরে একটি প্রধান হলরুম, প্রশস্থ মন্ডপ ছিল । প্রধান মধ্যবর্তী হলে রয়েছে মূল প্রাচীন বিগ্রহের একটি রেপ্লিকা বিগ্রহ । এছাড়া মন্দিরের সন্নিকটে রয়েছে ধর্মশালা । ঐতিহাসিক মতে একসময় এই মন্দিরটি পুরোটাই স্বর্ণ দিয়ে তৈরী ছিল । কিন্তু অজানা এক কারনে একসময় সমগ্র মন্দিরটিই মাটিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে । পরবর্তী একই স্থানে বর্তমান মন্দিরটি তৈরী করা হয় । মুলতানের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য জরিপ ও গবেষণার জন্য আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে পরিদর্শনে আসেন। প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগে উল্লেখ করেন যে, এটি "বর্গক্ষেত্র এবং ইট মন্দির" ছিল। ছাদকে

অবলম্বন দেয়ার জন্য কাঠের স্তম্ভ ছিল। বর্তমান মন্দিরটি ১৮৬১ সালে বদ্বল রাম দাস দ্বারা ১১ হাজার রুপি ব্যয় করে নির্মিত হয়েছিল।

পাকিস্তানের সৃষ্টি হওয়ার পর, অনেক হিন্দু ভারতে চলে যায়। মন্দিরটি দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের সময় মূল নৃসিংহদেবের বিগ্রহটি ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় । এই মন্দিরটিতে থাকা মুল নরসিংহের বিগ্রহটি হরিদ্বারে আছে (নৃসিংহধাম রোড ) । বাবা নারায়ণ দাস বাত্রা মূল বিগ্রহটি ভারতে নিয়ে আসেন। নারায়ণ দাস একজন বিখ্যাত সন্ন্যাসী, যিনি বহু বিদ্যালয় ও কলেজ নির্মাণ করেছেন। সমাজের উন্নয়নের কাজ করার জন্য ২০১৮ সালে পদ্মশ্রী পান তিনি। ১৯৯২ সালে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলে পাকিস্তানের মুসলিম জনতা মন্দিরটি ধ্বংস করেছিল।

এটি একটি প্রাচীন মন্দির। বিশ্বাস করা হয় যে, মন্দিরটি প্রহ্লাদ মন্দিরের স্থানে অবস্থিত। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে হোলিকা দহন পালন শুরু হয়েছে এখান থেকে। এখানে দুই দিন ধরে হোলিকা দহন (Holika Dahan) উৎসব এবং নয় দিন ধরে হোলি পালিত হয়।

হোলিকার দহন হচ্ছে হোলি উৎসবের সবচেয়ে বেশি পরিচিত পৌরাণিক ব্যাখ্যা। ভারতের বিভিন্ন স্থানে হোলিকার মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ বলা হয়, কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই এই বিষয়ে সম্মতি দেখা যায় যে, মুলাস্থান শহরে এই ঘটনাটি ঘটেছিল, যা বর্তমানে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান নামে পরিচিত। এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
  • বিষ্ণু বাঁধা দেন বলে হোলিকা আগুনে পোড়ে
  • ব্রহ্মা হোলিকাকে হোলিকাকে এই শর্তে তার আগুনে না পুড়বার ক্ষমতাটি দান করেছিলেন যে, এই ক্ষমতাটিকে অন্য কারও ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা হবে না।
  • হোলিকা ভাল নারী ছিলেন, এবং তার পোশাকের কারণে তাকে আগুনে পোড়ানো সম্ভব ছিল না। প্রহ্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে এটা জেনে তিনি তার পোশাক প্রহ্লাদকে দিয়ে দেন এবং নিজে আগুনে পুড়ে আত্মত্যাগ করেন।
  • হোলিকা যখন আগুনের উপর বসেন, তিনি তার চাদর পরিধান করেন এবং প্রহ্লাদকে তার কোলের উপর বসান। প্রহ্লাদ বিষ্ণুর প্রতি প্রার্থনা শুরু করলে বিষ্ণ বাতাস পাঠিয়ে দেন, যা হোলিকার চাদরটিকে উড়িয়ে নিয়ে প্রহ্লাদকে তা দিয়ে আবৃত করে। এরফলে প্রহ্লাদ বেঁচে যায়, এবং হোলিকা আগুনে পুড়ে মারা যায়।




প্রহ্লাদপুরী মন্দির,মুলতান
Prahladpuri Temple View.jpg
প্রহ্লাদপুরী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ
ধর্ম
অন্তর্ভুক্তিহিন্দুধর্ম
পরিচালনা সংস্থাপাকিস্তান হিন্দু কাউন্সিল
অবস্থান
স্থাপত্য
ধরনহিন্দু মন্দির
ওয়েবসাইট
http://www.pakistanhinducouncil.org/



তথ্যসূত্রঃ
  1. Syad Muhammad Latif (১৯৬৩)। The early history of Multan। পৃষ্ঠা 3,54। Kasyapa, is believed, according to the Sanscrit texts, to have founded Kashyapa-pura (otherwise known as Multan
  2. Gazetteer of the Multan District, 1923-24 Sir Edward Maclagan, Punjab (Pakistan)। ১৯২৬। পৃষ্ঠা 276–77।
  3. Imperial rule in Punjab: the conquest and administration of Multan, 1818-1881 by J. Royal Roseberry। পৃষ্ঠা 243, 263। 
  4. All the year round , Volume 51। Charles Dickens। ১৮৮৩। 
  5. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৭ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে Survey & Studies for Conservation of Historical Monuments of Multan. Department of Archeology & Museums, Ministry of Culture, Government of Pakistan 
  6. Muslim Saints of South Asia: The Eleventh to Fifteenth Centuries By Anna Suvorova। পৃষ্ঠা 153। 
  7. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১০ এপ্রিল ২০১৯। Cunningham, 129 
  8. Ajudhia Das, who was formerly Mahant of two temples at Multan named Prahlad and N'arasingpuri, was removed from his office on January 23rd, 1913, by a Panchayat appointed at a mass meeting of Hindus which was convened on that date. All India reporter, Volume 3 by D.V. Chitaley, 1923

ধন্যবাদ উইকিপিডিয়াকে ।
Share:

২৫ এপ্রিল ২০১৯

ভারতবর্ষে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ খুবুই জাগ্রত

ভারতবর্ষে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ খুবুই জাগ্রত। জ্যোতির্লিঙ্গ ও সাধারণ ও শিব মন্দিরের মধ্যে তফাৎ এই যে জ্যোতির্লিঙ্গ গুলি ভগবান শিব স্বয়ম্ভু রূপে বা কোনো ভক্তকে কৃপা করে নিজে জ্যোতি রূপে বিরাজ করছেন। জ্যোতির্লিঙ্গ গুলিকে সাক্ষাৎ ভগবান শিব মানা হয়।



১) সোমনাথ - ইনি ভারতের আমেদাবাদে অবস্থিত ।

২) মল্লিকার্জুন- ইনি শ্রীশৈল অন্ধ্রপ্রদেশে অবস্থিত ।

৩) শ্রীমহাকালেশ্বর- ইনি উজ্জয়নী মানে মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত ।

৪) ওঁঙ্কারেশ্বর- ইনি নর্মদা তট মানে মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত ।

৫) শ্রীবৈদ্যনাথ- ইনি ঝাড়খণ্ডে দেওঘরে অবস্থিত। তবে এঁনার আসল মন্দির নিয়ে মতভেদ আছে ।

৬) শ্রীনাগেশ্বর- ইনি গুজরাটে অবস্থিত ।

৭) শ্রীকেদারনাথ- ইনি উত্তরাখণ্ড রাজ্যে অবস্থিত। ঋষি নরনারায়ণের তপঃভূমি ।

৮) শ্রীত্র্যম্বকেশ্বর- ইনি নাসিকে অবস্থিত গোদাবরী তটে । গোদাবরী ভারতের পুন্যা নদী গুলির একটি ।

৯) শ্রীরামেশ্বর- ইনি তামিলনাড়ুতে অবস্থিত। নামের সাথেই এঁনার পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে 'রামনাথ' নামক আরোও একটি লিঙ্গ আছে। তামিল উপকথা মতে হনুমান জী এই লিঙ্গ কৈলাশ থেকে এনেছিলেন।

১০) শ্রীভীমশঙ্কর - ইনি মহারাষ্ট্রে অবস্থিত। তবে অনেকের মতে ইনি অসমে অবস্থিত । জায়গা নিয়ে মতভেদ আছে।

১১) শ্রীবিশ্বেশ্বর- ইনি কাশীতে অবস্থিত।

১২) শ্রীঘুষ্ণেশ্বর- ইনি ইলাপুরে মানে মহারাষ্ট্রে অবস্থিত।
Share:

বছরে মাত্র একদিন নাগপঞ্চমী তিথি ছাড়া বাকী সব দিন এই মন্দির বন্ধ থাকে

উজ্জয়নীর মহাকাল মন্দিরের নাম সবাই শুনেছেন। উজ্জয়নী রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী। রাজা বিক্রমাদিত্য ভগবান মহাকাল আর মাতা হরসিদ্ধিদেবীর ভক্ত ছিলেন। উজ্জয়নীতে 'নাগচন্দ্রেশ্বর' নামক আর একটি শিব মন্দির আছে। কিন্তু এই মন্দিরে রোজ পূজা, রোজ ভক্ত সমাগম নিষিদ্ধ। এমনকি বছরে মাত্র একদিন নাগপঞ্চমী তিথি ছাড়া বাকী সব দিন এই মন্দির বন্ধ থাকে। অর্থাৎ বছরে একটি দিন মাত্র খোলা থাকে। নাগজাতি ভগবান শিবের ভক্ত। এমনকি ভগবান শিবের কণ্ঠের বাসুকী নাগের মাল্য থাকে। বলা হয় নাগচন্দ্রেশ্বর মন্দিরে তক্ষক নাগ বিরাজ করেন। অনন্ত, তক্ষক, বাসুকী নাগকে তিন ভ্রাতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহর্ষি কশ্যপের পত্নী কদ্রু দেবীর সন্তান এঁনারা।

 নাগেদের বাস পাতালে। অনন্ত নাগের ওপর ভগবান বিষ্ণু শয্যা রূপে ক্ষীর সাগরে বিরাজ করেন। আর বাসুকী নাগ ভগবান শিবের ভক্ত ও ভগবান শিবের কণ্ঠে থাকেন। এই মন্দিরে অদ্ভুত এক হর গৌরীর প্রতিমা আছে, যা সাধারণত অন্য মন্দিরে দেখা যায় না। আমরা সাধারণত ভগবান বিষনুকেই নাগছত্রের তলে বিরাজ করতে দেখি কিন্তু এই মন্দিরে ভগবান শিব পার্বতীর মস্তকে নাগছত্র দেখা যায়। এমনকি মাতা উমা ও ভগবান শঙ্কর নাগের ওপর বিরাজিত । এখানে ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর সাথে গণেশ ঠাকুর আছেন। কথিত আছে একবার তক্ষক নাগ ভগবান শিবের তপস্যা করে অমরত্বের আশীর্বাদ পান। এরপর তক্ষক নাগের ইচ্ছা হয় যে সে মহাকাল বনে ভগবান শিবের সান্নিধ্যে এমন স্থানে থাকবেন, যেখানে হৈচৈ কোনো বিঘ্ন যেনো না আসে। ভগবান শিব ভক্তের মনের ইচ্ছা পূর্ণ করে এই মন্দিরে বিরাজ হলেন। তাই নাগ পঞ্চমী তিথি ছাড়া বছরের সব দিন এই মন্দির বন্ধ থাকে। বাকী দিন গুলিতে কেও যান না, পূজাপাঠও করেন না। জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে কালসর্প দোষের উল্লেখ আছে। বলা হয় কালসর্প দোষে পীড়িত কেও এই মন্দিরে নাগপঞ্চমীর দিন ভগবান শিবের দর্শন, পূজা করলে সেই দোষ নিবারণ হয়, এছাড়াও সর্পভয় দূর হয় । এই মন্দির বহু প্রাচীন । রাজা ভোজ এই মন্দিরের নির্মাতা, পরে রাজা সিন্ধিয়াজী এই মন্দিরের সংস্কার করেন। নাগরাজের ওপর বিরাজিত ভগবান শিবের বিরাজিত দিব্য স্বরূপ দেখতে এখানে প্রচুর ভীর হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। কোনোদিন মধ্যপ্রদেশ আসলে অবশ্যই নাগপঞ্চমীর দিন এই মন্দিরে যাবেন। ছবিতে দর্শন করুন 'নাগচন্দ্রেশ্বর' ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর বিগ্রহ ।




( ইওটিউব ও উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত )
Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৮

তারাপীঠ মন্দির

তারাপীঠ মন্দির তৈরী করেছিলেন গন্ধবণিক জয়দত্ত । তবে সেই মন্দির এখন আর নেই। একদা বাণিজ্য সেরে গন্ধ বণিক জয়দত্ত নৌকায় প্রচুত ধন সম্পদ নিয়ে দেশে ফিরছিলেন। দ্বারকা নদীতে তারাপীঠে এসে দুপাশে ঘন জঙ্গল দেখে , রাত হয়ে যাওয়াতে সেইখানেই বণিক মাঝি মাল্লাদের আদেশ দিলেন, এখানেই রাত কাটাতে। সেই রাত্রে হঠাত করে বণিক জয়ের পুত্র ধনঞ্জয় মারা যায়। অকালমৃত্যুতে বণিক খুব ব্যাথা পেয়ে রোদন করতে থাকেন। সেই রাত্রে জয় দত্ত এক নারী কণ্ঠ শোনেন। সেই নারী বলছেন- “বণিক! তোমার নৌকায় কি আছে ?” পুত্রের মৃত্যুতে বণিকের কোনোদিকে খেয়াল নেই। তিন বার প্রশ্ন শোনার পর বণিক বললেন- “ছাই আছে”। পরদিন বণিক প্রভাতে উঠে দেখলেন সব ধন সম্পদ ছাই হয়ে গেছে। বণিক আশ্চর্য হলেন।


এরপর মাঝিরা মাছ ধরে মৃত মাছ একটি পুকুরে ধুতে যাবার সময় মাছ গুলো জ্যান্ত হয়ে সব বেঁচে উঠলো। এই ঘটনা দেখে মাঝিদের কথায় বণিক জয় দত্ত, তাঁর পুত্রের নিথর দেহ সেই পুকুরে স্পর্শ মাত্রই পুত্র বেঁচে উঠলো। আনন্দে বণিক তখন আত্মহারা। বণিক ভাবল নিশ্চয়ই এই স্থানে কোনো দেবী আছেন। যাঁর লীলাতেই এত সব অলৌকিক কাণ্ড হচ্ছে। গন্ধ বণিক সেই স্থানে সেই অচেনা অজানা দেবীর ধ্যানে বসলেন। দেবী তারা প্রসন্ন হয়ে বণিককে এই স্থানে দর্শন দিয়ে মন্দির নির্মাণের আদেশ দিলেন। মন্দির নির্মাণ করে মা তারার পূজা আরম্ভ হল। এরপর জয় দত্তের মন্দির নদী গর্ভে চলে যায়। তারপর ১১৫০ বঙ্গাব্দে জমিদার রামজীবন রায় নতুন করে মা তারার মন্দির নির্মাণ করেন। তিঁনি নাটোরের রাজবংশ নির্মাতা। এরপর থেকে নাটোরের জমিদারী থেকেই মন্দির পরিচালনা করা হত। এরপর বহু জমিদার , রানী মন্দিরের সংস্কার করেন।

তারাপীঠ শ্মশান এক সময় এত গভীর ছিলো যে দিনের আলোতেও সেখানে অন্ধকার বিরাজ করতো। এত ঘন বন। শৃগাল বিরাজ করতো। বাঘেরও আনাগোনা ছিলো। সেই শ্মশানে হাড়হিম পরিবেশ আর নিস্তব্ধতা ছিলো। কেবল তন্ত্র সাধক ভিন্ন সেই শ্মশানে অন্য কেও তিল মাত্র অবস্থান করতে পারতো না। এমনকি শবদাহ করতেও লোকে দল বেঁধে আসতো। শ্মশানের অনেক বিভূতি দেখা যেতো। এখানে ওখানে কেবল ভাঙা কলসি, বাঁশের মাচা, শবের বস্ত্র, হাড় গোড় খুলি ছড়ানো ছিটানো থাকতো। শৃগালেরা মড়দেহ টানাটানি করে খুবলে মাংসাহার করতো- এমনই ছিলো পরিবেশ। বর্তমানে এর ছিঁটেফোঁটাও নেই। ঠকবাজ তান্ত্রিক আর লাইট , হোটেল, মানুষের বসতিতে সেইসব পরিবেশ দিনে দিনে লুপ্ত হয়ে গেছে। তবুও স্থানমাহাত্ম্য কোনোকালেই কম হয় না- এখনও প্রকৃত তন্ত্রসাধকেরাও আসেন তারাপীঠ।

Share:

২৩ আগস্ট ২০১৮

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রকৃত ও অলৌকিক ইতিহাস

ঢাকেশ্বরী মন্দির কত পুরাতন তা সঠিক ভাবে কেহই বলতে পারেনি । বহুবছর অাগে এখানে কিছু কাঠুরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে একটি অষ্টভূজা দূর্গা দেবীর মুর্তি লতাপাতা দ্বারা অাবৃত অবস্থায় দেখতে পান । তারপর তারা সেখানে কুড়ে ঘড়ের মন্দির নির্মাণ করে এবংস্থানটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বলে উক্ত দেবীকে গঙ্গা দেবী রূপে পূজা অর্চনা শুরু করেন । এখানে ঈশ্বরী লতা পাতায় ঢাকা ছিল বিধায় উক্ত মন্দিরটি ঢাকা+ঈশ্বরী = ঢাকেশ্বরী মন্দির বলা হয় । ধীরে ধীরে এখানে ভক্ত সমাগম বাড়তে থাকে ।


বহুকাল পরে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে ‌সেন অামলে রাজা বল্লাল সেন এর মাতা রাজা বিজয় সেনের স্ত্রী অষ্টমী স্নান করার জন্য লাঙ্গলবন্দ এসেছিলেন । এখানে রাত্রিবাসকালীন তিনি দেবী দূর্গার সপ্নাদেষ পান তার স্নান সিদ্ধ হওয়ার জন্য দেবী দর্শন অাবশ্যক। তখন তিনি লোকজনের থেকে খোঁজ নিয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অাসেন এবং মায়ের দর্শন লাভ করে তীর্থ পূর্ণ করেন । তিনি সেই সময় ঢাকেশ্বরীতে অষ্ট ধাতু দিয়ে মায়ের দশভূজা দূর্গা মুর্তি স্থাপন করেন । বিগ্রহের উচ্চতা দেড় ফুটের মতো ,দেবীর দশ হাত, কাত্যায়নী মহিষাসুরমর্দিনী দূর্গা রূপী, পাশে লক্ষী-সরস্বতী ও নিচে কার্তিক-গণেশ ।বাহন রূপে পশুরাজ সিংহ দন্ডায়মান যার ওপর দাঁড়িয়ে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেছেন ।


এবং তিনি এক কক্ষ বিশিষ্ট স্থায়ী মন্দির নির্মাণ করেন, যাহা বর্তমানে মূল মন্দিরের মধ্যের কক্ষ । এবং তিনি ভক্তদের জলের সুবিধার জন্য তিনটি জলকূপও খনন করেন । স্থানীয় লোকজনের নিজ চোখে দেখা এই তিনটি কুপের একটিতে গভীর রাতে দেবী দূর্গা লাল পাইড়ের সাদা শাড়ি পরে স্নান করে অাবার মন্দিরে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যেতেন । প্রচলিত নিয়ম অনুসারে প্রত্যেক ভক্তই তাদের অষ্টমী স্নানের পূর্ণতা পাওয়ার জন্য স্নানের পর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অাসতেন ।


পরবর্তীতে মোঘল অামলে সম্রাট অাকবরের সেনাপতি মানসিংহ সোনারগাঁও এ বারো ভূইয়াদের বিদ্রোহ দমন করতে বাংলায় অাসেন এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ভগ্নাদশা দেখে তিনি তার ব্যক্তিগত তহবিলের অর্থে তার নিজ এলাকা সুদূর রাজস্থান থেকে মিস্ত্রি ও শ্রমিক এনে রাজস্থানী ঘরোনার নকশা অনুযায়ী মূল মন্দিররটি ‌তিন কক্ষ বিশিষ্ট করেন এবং দেবী দূর্গার দুই পাশের কক্ষে শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন । মন্দিরের নিরাপত্তার জন্য দুইটি প্রবেশ দ্বার নির্মান করেন । তিনি ভক্তদের বসবাসের জন্য একটি ধর্মশালাও নির্মান ও একটি পুকুর খনন করেন সর্বশেষ তিনি তার চার বার বাংলা অাগমনের নিদর্শন স্বরূপ চারটি শিব মঠ স্থাপন করেন । মানসিংহ এই বিগ্রহ ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করার পর আজমগড়ের এক তিওয়ারি পরিবারকে সেবায়েত এবং বাংলাদেশের জনৈক দাস পরিবারকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত করেন ।


পরবর্তীতে ভাওয়ালের জমিদার রাজা রাজেন্দ্রনারায়ন রায়বাহাদুর ভাওয়াল ষ্টেটের মালিকানা নির্ধারনের জন্য মন্দির রক্ষণাবেক্ষণকা
রী সুধীর কুমার দাস গং কে ৫ শতাংশ মালিকানা এবং সেবায়েত গং দের ১ আনি ভোগত্বর সহ ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ২০ বিঘা জায়গা দেবোত্তর হিসেবে সিএস রেকর্ডভূক্ত করিয়া দেন ।


দেবী ঢাকেশ্বরী আসল ৮০০ বছরের পুরোনো অাদি বিগ্রহটি ৪৮ সালে দেশভাগ-পরবর্তী হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেড় ধরে সেবায়েত তিওয়ারী পরিবারের শেষ বংশধর বিশাল তেওয়ারীর স্ত্রী কর্তৃক ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় । মূর্তিটি বর্তমানে কলকাতার কুমারটুলি অঞ্চলে দুর্গাচারণ স্ট্রিটে বিরাজ করছে । ‌সেখানেও মন্দিরের নাম শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির | এখন যে বিগ্রহটি ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আছে তা হলো মূল মূর্তির প্রতিরূপ। কলকাতায় বিগ্রহটি আনার পর প্রথম দু'বছর হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটে দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরির বাড়িতে দেবী পূজিতা হন । পরে ১৯৫০ নাগা ব্যাবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী কুমোরটুলি অঞ্চলে দেবীর মন্দির নির্মাণ করে দেন ও প্রতিষ্ঠা করে দেবীর নিত্য সেবার জন্য কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি দান করেন এবং অদ্যবধি এখানেই দেবী পূজিতা হয়ে চলেছেন ।


১৯৬৪ সালে সেই পরিবারের বংশধরেরাই কলকাতায় এসে পুনরায় সেবায়েত নিযুক্ত হন, এখনো তারাই দেবীর নিত্য সেবা করেন । এই ঢাকেশ্বরী দেবীর পূজা পদ্ধাতিও বাংলার চিরপুরাতন পদ্ধতির চেয়ে আলাদা । শারদীয়া দুর্গাপূজার সময় দেবীর পূজা হয় উত্তর ভারতের নবরাত্রির বিধি মেনে । দেবীকে যেভাবে অলংকারহীন এবং প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় লুকিয়ে আনা হয়েছিল, তার ছবিও এই মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রচারের আলোয় ঢাকা পড়ে গেছে কলকাতার ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির। শোভাবাজার ছাড়িয়ে কুমোরটুলির এক অপরিসর গলিতে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে নীরবে নিভৃতে বিরাজমান এই ঢাকেশ্বরী মাতা । ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আদি বিগ্রহ এখানেই প্রতিষ্ঠিত ।


মায়ের অলৌকিক সব ঘটনা বিজড়িত মূল ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত । প্রতিদিন বহূ পূণ্যার্থীর অাগমন ঘটে এখানে । ৪৭ এর দেশভাগ, ৬৪ এর দাঙ্গা, ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বহু ঘাতপ্রতিঘাত, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগের ইতিহাস বুকে নিয়ে সুধীর কুমার দাস ও মন্দিরে বসবাসকারী হিন্দুদের অাত্ম ত্যাগের বিনিময়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে.....।
জঁয় মা ঢাকেশ্বরী
পল্টন দাস, সেবায়েত,
শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির ।

written by: Deb Prosad
Share:

০৫ অক্টোবর ২০১৭

প্রতি গ্রীষ্মেই জল থেকে বেরিয়ে আসে বাঁকুড়ার প্রাচীন এই লক্ষ্মী মন্দির

মুকুটমণিপুরে কংসাবতী জলাধারে বছরের অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে শতাব্দী প্রাচীন লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দির। মার্চের শেষে জলস্তর কিছুটা কমলে দেখা মেলে ইঁট-সুরকির তৈরি এই মন্দিরটি। তাই গরমের মধ্যেও শুধু এই মন্দিরের টানে এখানে ছুটে আসেন রাজ্য ও তার বাইরের পর্যটকরা।

১৯৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কেন্দ্রীয় নদী কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ঠিক হয় খাতড়া ব্লকে নির্মাণ করা হবে জলাধারটি। কিন্তু পরে এই প্রকল্পের বাস্তুকার জওহরলাল দাসের নেতৃত্বে মুকুটমণিপুর সংলগ্ন চিটগিরি-অম্বিকানগরের মাঝে কাঁসাই ও কুমারী নদীর সঙ্গমস্থলে এই প্রকল্পের স্থান নির্বাচন হয়। ১৯৫৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কংসাবতী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পে ১৭৩টি মৌজার মধ্যে বাঁকুড়ার খাতড়ার ৩০টি, রানিবাঁধের ৩৩টি ও পুরুলিয়ার মানবাজার ব্লকের ১১০টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়।

কুমারী অববাহিকায় থাকা সারেঙ্গগড়, চিয়াদা, কাটাকুমারী, ঘোলকুড়ি, পুড্ডি গ্রামের সঙ্গে বড্ডি গ্রামটিও জলের তলায় নিমজ্জিত হয়। এই বড্ডি গ্রামের সুবুদ্ধি পদবিধারী উৎকল ব্রাহ্মণদের কুলদেবতা লক্ষ্মী জনার্দন। এই প্রকল্পের ফলে বাস্তুচ্যুত হলে কুলদেবতা লক্ষ্মী জনার্দনকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান হিড়বাঁধ ব্লকের দিঘি-ভগড়া আমবাগানে চলে যান সুবুদ্ধিরা। বর্তমানে সেখানে নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। আর কংসাবতী প্রকল্পের মধ্যে পড়ে থাকে বিগ্রহশূন্য লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দিরটি।

সুবুদ্ধি পরিবারের বর্তমান সদস্য দয়াময় সুবুদ্ধি বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র পতি ছিলেন অম্বিকানগরের রাজার সভাপণ্ডিত। অম্বিকানগরের তৎকালীন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পতির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে তাঁকে সুবুদ্ধি উপাধি দেন। এবং একই সঙ্গে ঝরিয়া, পরেশনাথ ও পূর্ণাপানি এই তিনটি মৌজা নিষ্কর দান করেন। তখন কৃষ্ণচন্দ্র পতি (সুবুদ্ধি) ইন্দপুরের ফুলকুসমার আদি বাসস্থান ছেড়ে কুমারী নদী সংলগ্ন রানিবাঁধের বড্ডি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে লক্ষ্মী জনার্দনকে একটি মাটির বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করে পূজা শুরু করেন। পরে বাংলা এই বংশের হরগোপাল সুবুদ্ধি ইঁট-সুরকি দিয়ে নতুন মন্দির নির্মাণ করেন।

কিন্তু কংসাবতী প্রকল্পের মধ্যে এই এলাকাটি পড়ায় মন্দির ও বাসস্থান ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তাঁরা। মন্দির সংলগ্ন এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুড়ি হলেও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারদের সৌজন্যে অক্ষত থেকে যায় মন্দিরটি। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্দিরে ব্যবহৃত কড়ি-বরগা চুরি করে নিয়ে গেছে দুষ্কৃতীরা।

সারা বছর জলের নীচে থাকা লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দির দেখতে এই গ্রীষ্মেও কলকাতার বেহালা থেকে ছুটে এসেছেন ইমন ভট্টাচার্য, দুর্গাপুরের তিথি মল্লিকরা। তাঁদের কথায়, এর আগেও এখানে এসেছেন তাঁরা। তখনই জলে ডুবে থাকা এই মন্দিরের কথা শোনেন। তাই এই প্রাচীন মন্দিরটি দেখতে চড়া গরমেও এখানে ছুটে আসা।

বিশিষ্ট গবেষক সৌমেন রক্ষিত বলেন, ইঁট-সুরকি নির্মিত প্রাচীন এই মন্দিরটির সংরক্ষণ জরুরি। মুকুটমণিপুরের পর্যটন মানচিত্রে এটিও একটি অন্যতম দ্রষ্টব্য হতে পারে। একই দাবি জানিয়েছেন, সুবুদ্ধি পরিবারের বর্তমান সদস্যরাও। দীপ সুবুদ্ধি ও হিমাংশু সুবুদ্ধি বলেন, মন্দিরের প্রাচীনতা ও মুকুটমণিপুরে আসা পর্যটকদের কথা ভেবে সরকারের উচিত লক্ষ্মী জনার্দনের ভগ্নপ্রায় মন্দিরটি দ্রুত সংস্কার করে সংরক্ষণ করা।

সংগৃহিত

Share:

২৩ এপ্রিল ২০১৭

বিথঙ্গল আখড়া



হবিগন্জের বানিয়াচং সদর থেকে প্রায় ১১ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমে বিথঙ্গল গ্রামে সগৌরবে টিকে আছে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের নান্দনিক আখড়া। ধারনা করা হচ্ছে খৃস্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে রামকৃষ্ণ গোস্বামী সমগ্র উপমহাদেশ সফর করে বিথঙ্গলে এসে এ আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন।
Image may contain: outdoor



বিথঙ্গলের আখড়ার মতো এমন আখড়া বাংলাদেশে খুব সম্ভব দ্বিতীয়টি নেই। এর সৌন্দর্য, শৈল্পিক সুষমা খুব সহজেই পর্যটকদের বিমুগ্ধ করতে সক্ষম। আখড়াটি নির্মাণ করা হয়েছে পোড়া মাটির ইট এবং অসংখ্য চিত্র পলক দিয়ে। ২৪ হাত লম্বা, ১২০ টি কোঠা, ত্রিখিলান প্রবেশ পথ সম্বলিত আখড়ার নিকটে ৮০ ফুট উচ্চতার একটি মঠ রয়েছে।

মঠের সামনে আছে একটি নাট মন্দির। পূর্ব পার্শ্বে ভান্ডার ঘর, দক্ষিণে ভোগ মন্দির। জানা গেছে, আখড়ার ১২০টি কক্ষে এক একজন বৈষ্ণব বাস করতেন। এই আখড়াকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি উৎসব পালিত হয়। এখানকার দর্শণীয় বস্তুর মধ্যে রয়েছে ২৫ মন ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকি, পিতলের সিংহাসন, রৌপ্য নির্মিত পাখি, মুকুট, কষ্টি পাথরের মূর্তি।
Share:

পুঠিয়া শিব মন্দির, রাজশাহী

Image may contain: sky, outdoor, water and natureপুঠিয়া শিব মন্দির, রাজশাহী

Puthia shiv mandir, rajshahi

পুঠিয়া রাজবাড়ীর প্রবেশপথে পুকুর পাড়ে বড় আকৃতির এ মন্দিরটির নাম শিব মন্দির। পুঠিয়ার রাণী ভুবন মোহিনী দেবী ১৮২৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। 

পুরো মন্দিরের দেয়াল পৌরাণিক কাহিনি চিত্র খচিত। মূল্যবান এ স্থাপনাটি দীর্ঘ দিন পড়ে ছিল অযত্ন আর অবহেলায়। তবে সুখের কথা হলো বর্তমানে এটির সংস্কারের কাজ চলছে। এশিয়ার অন্যতম বড় শিব মন্দির বলা হয় পুঠিয়ার এ মন্দিরটিকে। এর লাগোয়া পূর্ব পাশে গোল গম্বুজ আকৃতির আরেকটি ছোট মন্দির আছে।
Share:

১৩ মার্চ ২০১৭

এই হিন্দুদেবীর মাহাত্ম্য এতোই শক্তিশালী! মুসলিমরাও পুজো করেন

সারা বিশ্বে এমন দেবী মাহাত্ম্য আর দ্বিতীয় খুঁজে পাওয়া ‌যায় না। ‌যেখানে হিন্দুরাতো বটেই ভক্তিভরে পুজো করছেন মুসলিমরাও। না বলপ্রয়োগ করে অন্য ধর্মের মানুষদের পুজো করতে বাধ্য করা হচ্ছে এমন গল্প নয়। দেবী খাঁটি প্রচীন ভারতীয় হলেও, অধুনা কট্টর ইসলামধর্মী একটি দেশেই সগৌরবে পূজিতা হন তিনি। তাঁকে রক্ষা করার জন্য হিন্দু বাহিনীর প্রয়োজন পড়ে না। বরং সর্বজাতির তিনি রক্ষা করে চলেছেন তিনি নিজ হাতে। তাঁর শরণাপন্ন হলে জীবনবোধটাই বদলে ‌যায়। কোনও অনিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

ভারতে এমন বহু জায়গা রয়েছে ‌যেখানে দেব দেবীর মাহাত্ম্য বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে। তার মধ্যে বেশ কিছু জায়গা দুর্গম হলেও জনপদ রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারের তরফে সাজানো হয়েছে, ‌যাতে বেশি করে প‌র্যটকেরা আসেন। কিন্তু হিঙ্গোল মাতার মন্দির তার থেকে অনেকটাই আলাদা। আলাদা ঐশ্ব‌র্যে বা বৈভবে নয়। তিনি স্বয়ং এবং তাঁর মহিমায়।
পাকিস্তান, বালুচিস্তান। আপামর বাঙালি মরুতীর্থ হিংলাজ ছবিটি দেখেননি, এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া ‌যাবে না। কিন্তু এই হিঙ্গোলমাতা বা হিংলাজ মাতা সম্পর্কে কে কতটা জানেন?
করাচি থেকে প্রায় ৩২৮ কিলোমিটার পথ। মাকরান উপকূল রাজপথ ধরে গেলে ঘণ্টা চারেকের রাস্তা। রাস্তা ভালো হলেও, দুর্গম, চারপাশে শুধু শুকনো পাহাড় আর পাহাড়। জনশূন্য পথ। দিনের বেলাতেও গা ছমছমে ব্যপার থাকবেই।

একবার ভেবে দেখুন। একটা সময় এই পথটাই অতিক্রম করতে হত পায়ে হেঁটে।বালিয়াড়ি, মরুভূমি পথ। বেশ কয়েকটা দিন ‌যেত পুণ্যর্থীদের ‌যেতে। বহু মানুষ রাস্তাতেই মারা পড়তেন এ ছাড়া দস্যুদের হানাতো ছিলই। রাস্তার মধ্যে কেউ মারা গেলে তাঁকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও করা ‌যেত না। প্রিয়জনকে ছেড়ে ‌যেতে হত ধু ধু মরুপ্রান্তরেই।
বর্তমানে সেই কষ্ট আর নেই, তবু চলার পথে অনুভব করা ‌যায় কতটা কঠিন এ পথ। ভারতের ইতিহাস বলছে, নানা সময়ে বহু প্রচীন মন্দির নষ্ট হয়েছে মোগল, আফগানদের হাতে। কিন্তু এক এবং অদ্বিতীয় হিংলাজ মাতার মন্দিরকে স্পর্শ করার ক্ষমতা কারও হয়নি।
পুরাণ বলছে, এই মরুক্ষেত্রে সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র পড়েছিল। তাই একান্ন পীঠের মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ বলে ধরা হয়। সতীর ‌যত পীঠ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম পথ এটাই। এবং মানা হয় সেই কারণেই এখানকার পবিত্রতা এখনও অক্ষুণ্ণ।
এখানে দেবীর কোনও প্রথাগত মূর্তি নেই। পাহাড়ের গুহার মধ্যে অধিষ্ঠান করছেন দেবী। এই দেবীকে নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তী রয়েছে। বলা হয় সর্বমনস্কামনাপূর্ণকারী দেবী। অর্থাৎ এই দেবীর কাছে ‌যা চাওয়া হয় তাই মেলে।
এখানে একটা কথা বলা ভালো, সতীর পীট নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক রয়েছে। কারণ ‌যত প্রাচীন সাহিত্য ঘাঁটা হয় তত দেবীর পীঠের সংখ্যা কমতে থাকে। কুলার্নভ তন্ত্রে সতীর ১৮টি পীঠের উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে হিংলাজ মাতা তৃতীয় স্থানে। আবার কুব্জিকা তন্ত্রে ৪২টি পীঠের কথা রয়েছে, ‌যেখানে হিংলাজ মাতা পঞ্চম স্থানে। তন্ত্রচূড়ামণিতে ৪৩টি পীঠের নাম আছে, পরে অবশ্য মোট ৫১টি পীঠের সং‌যোজন হয়।
হিংলাজ মাতা এখানে আরও বেশ কিছু নামে পরিচিত, ‌যেমন কোট্টারি, কোট্টাভি, কোট্টারিশা, ভৈরবী, ভীমলোচনা। এই দেবীকে নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তি রয়েছে। তার মধ্যে বিশেষ তাৎপ‌র্যপূর্ণ ব্রহ্মক্ষত্রিয়ের কাহিনী। একবার পরশুরাম ক্ষত্রিয় নিধনে সারা বিশ্ব ভ্রমণ করছেন। সেই সময় তিনি একবার আসেন এই মরুতে, তখন স্থানীয় ক্ষত্রিয়রা এই দেবীর শরণাপন্ন হন। দেবীই তখন ক্ষত্রিয়দের ব্রাহ্মণ রূপ দান করে পরশুরামের হাত থেকে বাঁচান। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন জয়সেনা। ‌যিনি সিন্ধ প্রদেশের রাজত্ব করেন। কথিত আছে ক্ষত্রিয়দের শুধু বাঁচানোই নয়, পরশুরামকে এই হত্যালীলা থেকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন স্বয়ং হিংলাজ মাতা। পরশুরামকে বলেছিলেন, প্রত্যেক মানব ব্রহ্মার সন্তান। আর ব্রহ্মত্ব আসে সুকর্মের মধ্যে দিয়ে। জাতি দাঙ্গায় ব্রহ্মত্ব প্রমাণ হয় না। পরশুরাম বুঝেছিলেন তিনি ব্রাহ্মণ সন্তান তাই তিনি ক্ষত্রিয় নিধনে নেমে আদপে ব্রহ্মহত্যাই করছেন। অগত্যা ক্ষত্রিয়হত্যা থেকে সরে আসেন তিনি।
সিন্ধ প্রদেশের প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলে দেবীর বাস, অথচ তাৎপ‌র্যপূর্ণ ভাবে দেখা ‌যায় এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ, পুজাচারে মুসলিমদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। পাকিস্তানের মুসলিমরা এই দেবীকে বড়ি নানি বলে সম্বোধন করে। আর এই গুহা মন্দিরকে নানি কি হজ বলেন।
মন্দিরের কাছে আছে একটি কুণ্ড। এটিও বেশ রহস্যময়। কুণ্ডের মধ্যে অবিরাম কাদা মাটি ফুটতে থাকে। কিংবদন্তি রয়েছে, এই ফুটন্ত কুণ্ডের কাছে এসে অন্তর থেকে নিজের জ্ঞানত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলে পাপ স্খলন হয়। বৈজ্ঞানিকদের অবশ্য ‌যুক্তি, ওই কুণ্ডের তলা থেকে কিছু রাসায়নিক গ্যাস নির্গত হয় বলেই এমন চিত্র ধরা পড়ে। স্থানীয়দের অবশ্য প্রশ্ন, এই কুণ্ড ছাড়া আশে পাশের কয়েকশো কিলোমিটার ব্যসে কেন এমন কুণ্ড দ্বিতীয় দেখা ‌যায় না? মন্দিরের কাছেই কেন? আর এই কুণ্ডের মহিমা সেতো ‌যুক্তি দিয়ে বিচার করা ‌যায় না। কিছু শিক্ষা লাভ করা ‌যায় অনুভূতি দিয়ে।
অনেকে বলেন, দেব দেবীতো সর্বত্র বিরাজ করছে, তাহলে এতো কষ্ট করে এতো দুর্গম পথ পেরিয়ে দেবীর দর্শন করতে ‌যাওয়া কেন? উত্তর একটাই, এই ‌যাত্রা জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। তুমি কি জীবনের কষ্টকর, দুর্গম পথকে অতিক্রম করতে চাও? তুমি কি সত্যি সত্যি মানব কল্যাণ পছন্দ করো? তুমি কি সত্যি সত্যি সত্যকে উপলব্ধী করতে চাও মানবজাতির স্বার্থে? তাহলে তোমাকে কষ্ট করতে হবে। সুখ স্বচ্ছন্দ্য তোমার অধিকার, কিন্তু অন্যকে কষ্ট দিয়ে নয়। হত্যা করে নয়। হ্যাঁ বধ করতে হয়েছে প্রয়োজন হলে, তবে সেটা নিজের অন্তরে থাকা অসুর এবং রাক্ষসদের। কারণ কারও ছত্রছায়ায় থেকে ‌যেমন জীবনের মূল্য বোঝা সম্ভব নয়। তেমন জীবনের ‌যাত্রাটাও অনুভব করা সম্ভব নয়। তথাকথিক ধর্ম, জাতির ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন একাংশ মানুষ, তাই তারাও ভিন জাতির হয়েও উপাসনা করেন বড়ি নানির।
কী অবিশ্বাস্য লাগছে? বিশ্বাস করুন, এটাই সত্যি।

Collected from: http://travelweekbazar.com/hindu-muslim-pilgrim-784759/

Share:

২৭ নভেম্বর ২০১৫

ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরের মন্দির

ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর। একদা কলিঙ্গ রাজধানী ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভুবনেশ্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতীত ইতিহাসের সাক্ষী মন্দিরগুলিই প্রধান আকর্ষণ। পাঁচশোরও বেশি মন্দির আছে মন্দিরনগরী ভুবনেশ্বরে। এরমধ্যে উল্লেখ্য- সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত পরশুরামেশ্বর মন্দির, অষ্টম শতকে তৈরি বৈতাল মন্দির, দশম-একাদশ শতকে গড়ে ওঠা মুক্তেশ্বর মন্দির। এরই সমসাময়িক রাজারানি, ব্রহ্মেশ্বর এবং লিঙ্গরাজ মন্দির। মন্দিরগুলির গায়ের ওড়িশি ভাস্কর্যের অপরূপ শিল্পকলা দর্শককে মুগ্ধ করবে।
১০০০ খ্রীষ্টাব্দে রাজা ললাট কেশরী লিঙ্গরাজ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বিশাল এই মন্দিরপ্রাঙ্গণে একসময় ১০৮টি মন্দির ছিল। মূল মন্দিরের উচ্চতা ১৬৫ফুট। মন্দির প্রাঙ্গণটির দৈর্ঘ্য ৫২০ ফুট ও প্রস্থ ৪৬৫ ফুট। গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি চক্রাকার লিঙ্গরাজ মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার তিনটি। কলিঙ্গ স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী মন্দিরটি বিমান, জগমোহন, নাটমন্দির ও ভোগমন্দিরে এই চারঅংশে বিভক্ত। মন্দির ও প্রাচীরের গাত্র ফুল, লতাপাতা প্রভৃতি সূক্ষ্ম কারুকার্য মন্ডিত। মন্দিরমধ্যে গণেশ, কার্তিক, পার্বতীর মূর্তি রয়েছে।
মন্দিরের কাছেই বিন্দু সরোবর। এই সরোবরকে ঘিরে গল্পকথা রয়েছে। পার্বতীর তৃষ্ণা মেটানোর জন্য শিব সমস্ত নদনদীর কাছে অনুরোধ করেন বিন্দু বিন্দু জল দেওয়ার জন্য। সেই বিন্দু বিন্দু জল থেকেই এই সরোবরের সৃষ্টি। কথিত আছে, এই সরোবরে স্নান করলে সর্বপাপ মুক্ত হওয়া যায়। চন্দনযাত্রার সময় লিঙ্গরাজ এই সরোবরে স্নান করেন।
বিন্দু সরোবরের পূর্বপাড়ে অনন্ত বাসুদেব মন্দির। প্রাচীন এই বিষ্ণুমন্দিরটি সম্ভবত ১২৭৮-এ অনঙ্গ ভীমদেবের কন্যা চন্দ্রাদেবী নির্মাণ করেন। মন্দিরের কারুকার্য দেখার মতো।
সিদ্ধারণ্য বা সিদ্ধঅরণ্যটি একসময়ে আম্রকানন বলে পরিচিত ছিল। এখন কেদারগৌরী বা গৌরীকুন্ডের প্রস্রবণটি পুণ্যপুকুর নামে খ্যাত। এখানে রয়েছে নবম শতকে তৈরি মুক্তেশ্বর মন্দিরটি। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মিশ্র প্রভাবের ভাস্কর্যে গড়া দেবমূর্তিগুলো দেখার মতো। এখানে সিদ্ধেশ্বর মন্দিরে গণেশের দন্ডায়মান মূর্তিটি অসাধারণ। মুক্তেশ্বরের বিপরীতে ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দে তৈরি পরশুরামেশ্বর মন্দির। কেদারেশ্বর মন্দিরটি ষষ্ঠ শতকের। কেদারেশ্বরে দুধগঙ্গার জলে নানা ব্যাধির উপশম হয় বলে বিশ্বাস।
সিদ্ধারণ্যের কাছে সুন্দর এক বাগিচার মধ্যে রাজারানি মন্দির। একাদশ শতাব্দীতে তৈরি সূক্ষ্ম কারুকার্য মন্ডিত এই মন্দির ৫৮ ফুট উঁচু। দেওয়ালে, থামে, কুলুঙ্গিতে নানা দেবদেবী, সুন্দরী নারীমূর্তির বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছোট ছোট কাজ দেখার মতো। কথিত আছে, রাজা উদ্যত কেশরী তাঁর রানির ইচ্ছেয় এই মন্দির গড়েন, নাম দেন রাজারানি।

Written by :  Prithwish Ghosh
Share:

কোণারক

ওড়িশার মন্দির ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন নিঃসন্দেহে কোণারকের সূর্যমন্দির। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাতেও
রয়েছে এর নাম। প্রায় একহাজার বছরের স্থাপত্যের ইতিহাসের শেষ পর্যায়ে অসাধারণ এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। মন্দিরটি ঠিক কবে তৈরি হয়েছিল আর কেই বা ছিলেন এর স্রষ্টা তা নিয়ে ইতিহাসে, পুরাণে, গল্পকথায় নানান কাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পুরাণ মতে,
কৃষ্ণপুত্র শাম্ব পিতার অভিশাপে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত হওয়ার পর চন্দ্রভাগা নদীর তীরে সূর্যের আরাধনা করেন। ১২ বছর সাধনা করার পর তাঁর রোগমুক্তি হয়। এরপর শাম্ব একটি সূর্যমন্দির নির্মাণ করেন। পুরী থেকে ৩৫ কিলোমিটার ও ভুবনেশ্বর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরত্বে এই মন্দির। মোটামুটিভাবে, গঙ্গরাজবংশের রাজা নরসিংহদেব লাঙ্গুলীয় পুরন্দর কেশরী (১২৩৮-৬৪)-র আমলেই বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ হয় বলে অনেকেই মনে করেন। তবে এর প্রায় তিনশ বছর পরে মুঘল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল-ফজলের আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে কোণারকের সূর্যমন্দিরের যে উল্লেখ পাওয়া যায় সেই বর্ণনা পড়লে মনে হয় মন্দিরটি আরও প্রাচীন। খুব সম্ভব পুরনো মন্দিরের ওপর নরসিংহদেব নতুন মন্দিরটি তৈরি করান।

কলিঙ্গ স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী ওড়িশার মন্দিরগুলির চারটি অংশ - ভোগমন্ডপ, নাটমন্দির, জগমোহন ও দেউল। কোণারকের মন্দিরে এই নীতি পুরোপুরি মানা হয়
রথারূঢ় সূর্য এই মন্দিরের উপাস্য দেবতা। মন্দিরটিও তাই যেন গড়া রথের আদলেই। উপাস্য ভাস্করমূর্তিটি মুসলিম আক্রমনের সময়েই তৎকালীন সম্রাট মুকুন্দদেব পুরীর মন্দিরে স্থানান্তরিত করেন। রথের দুটি অংশ - মূল অংশ অর্থাৎ যেখানে রথী বসেন, তা হল বড়দেউল। আর সারথির অংশটাই জগমোহন। সূর্যের এই রথের মোট ৭টি অশ্ব- সপ্তাহের সাতবার নির্দেশ করে। একেকদিকে ১২টি করে মোট চব্বিশটি চক্র। একএকটি চক্র এক এক পক্ষকাল। এই প্রকান্ড রথটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬৬মি, প্রস্থে সবচেয়ে চওড়া অংশে ৩০.৫মি। জগমোহনের উচ্চতা ৩৯মি। মূল মন্দিরটি ছিল অন্ততঃ ৭৭মি উচ্চ।
জগমোহনের পূর্বদিকে যে সিঁড়ি আছে তার প্রত্যেকদিকে দুটি করে মোট চারটি চক্র আছে। দক্ষিণ দিকে ছিল চারটি রথাশ্ব। তার ভিতর দুটির মাথা আছে- দ্বিতীয়টির অনেকটাই এখনো অক্ষত আছে। চক্রগুলি মোটামুটি একই রকম, যদিও কারুকাজে তফাত আছে। রথচক্রগুলির ব্যাস ২.৭৪মি, এতে আটটি বড় স্পোক এবং আটটি ছোট স্পোক আছে। বড় স্পোকগুলির মাঝে মোট আটটি এবং চক্রের মাঝে একটি গোলাকার অংশ রয়েছে। তাতে স্ত্রী, পুরুষ, মিথুনচিত্র, দেবদেবীর মূর্তি খোদিত রয়েছে।
সবার নিচে উপান অংশে আছে হাতির সারি, শিকারের দৃশ্য, শোভাযাত্রার দৃশ্য। উপানের ওপরের অংশের ভিতর পাটায় জীবজন্তুর চিত্র ও নানান নকশা কাটা। তলজঙ্ঘাতে কিছু দূরে স্তম্ভের কুলুঙ্গিতে নানান দৃশ্য। দুটি স্তম্ভের মাঝে কখনও দুটি বা তিন-চারটি খাড়া পাথর। এই খাড়া পাথর গুলিতেও নানা ভাস্কর্যের নিদর্শন- মিথুনমূর্তি, অলসকন্যা, বিরাল অথবা নাগমূর্তি। তলজঙ্ঘার ওপরে বন্ধনের তিনটি অংশে নানান নকশা কাটা। উপর জঙ্ঘাতে, নিচের তলজঙ্ঘার স্তম্ভের ওপর আবার একটি করে পদ্মশীর্ষ অর্ধস্তম্ভ, তলজঙ্ঘার মূর্তিগুলির ঠিক ওপর ওপর এখানেও একসারি মূর্তি।
ওপর জঙ্ঘার ওপরে বড়ণ্ডি অংশও অক্ষত নেই। এর কিছুটা ঝোলা বারান্দার মত বাইরে বেরিয়ে আছে। তার গায়ে অপরূপ নকশাকাটা। জগমোহনের তিনদিকে তিনটি দরজা। পূর্বদিকে সিংহদ্বার। তিন দরজার পর বিস্তৃত চাতাল শেষে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে। চতুর্থদিক অর্থাৎ পশ্চিমদিকে বড় দেউলে যাবার দ্বার। জগমোহনটি পঞ্চরথ পীড় দেউল বা ভদ্রদেউল। বাড় অংশে পাঁচ ভাগ- পা-ভাগ, তল জঙ্ঘা, বন্ধন, উপর জঙ্ঘা এবং বরণ্ডি। পা-ভাগের ওপরে তল-জঙ্ঘায় দুই জোড়া করে অর্ধস্তম্ভের মাঝে মাঝে কুলুঙ্গি করা হয়েছে। তাতে অপেক্ষাকৃত বড় মূর্তিগুলি ছিল, যার অনেকগুলিই এখন আর নেই। অলসকন্যা, মিথুনমূর্তি এখনও কিছু কিছু আছে আর রয়েছে রাহাপাগের উল্লম্বনরত বিড়াল, কোনাপাগ ও অনুরথ পাগের খাঁজে গজবিড়াল ও রাক্ষস বিড়ালের মূর্তিগুলি। উপর জঙ্ঘার পরিকল্পনা তলজঙ্ঘার মতই। সবার ওপরে বড়ণ্ডিতেও নানান নকশা রয়েছে।
বড় দেউলের তিনদিকে সূর্যদেবের তিন মূর্তি - দক্ষিণে দন্ডায়মান পূষা, পশ্চিমে দন্ডায়মান সূর্যদেব ও উত্তরে অশ্বপৃষ্ঠে হরিদশ্ব। জগমোহনের পূর্বদ্বারের সামনে ছিল একটি ধ্বজস্তম্ভ। তার শীর্ষে ছিল সূর্যসারথি অরুণের মূর্তি। এই মূর্তিটি এখন পুরীর মন্দিরে আছে।
জগমোহনের তিনদ্বারের সামনে সোপানের কাছে ও মন্দিরের চত্ত্বরের ভিতরেই প্রকান্ড পাদপীঠের ওপর রয়েছে তিনজোড়া বিশালকায় মূর্তি। উত্তরদ্বারের দিকে দুটি হস্তি, দক্ষিণদ্বারে দুটি অশ্ব এবং পূর্বদ্বারে হস্তিদলনকারী শার্দুল মূর্তি।
পীর দেউলের গন্ডিতে তিন পোতাল। প্রথম পোতালের চাতালের চারদিকে চারটি করে মোট ষোলটি কন্যামূর্তি। আর রাহা অবস্থানে ঝুঁকে থাকা আটটি নৃত্যশীল ভৈরবমূর্তি। দ্বিতীয় পোতালেও ষোলটি কন্যামূর্তি। তৃতীয় পোতালে রয়েছে করালদ্রংস্ট্রা সিংহ। তার ওপরে ঘন্টা-শ্রী, আমলক প্রভৃতি। কন্যামূর্তিগুলি সম্ভবত নৃত্যরতা দেবদাসীর। কঙ্কন, কেয়ূর, শতনরী, কর্ণাভরণ মুকুট - অলঙ্কারে শোভিত দেবদাসীদের কেউবা পাখোয়াজ, মাদল, বাঁশি, খঞ্জনি, করতাল, ঝাঁঝর হাতে গীতবাদ্যে মত্ত, কেউবা দর্পনহাতে ব্যস্ত প্রসাধনে। মূল মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিমে সূর্যপত্নী মায়াদেবীর মন্দির। মন্দিরে পাওয়া ভাস্কর্যের বেশকিছু নিদর্শন নিয়ে কাছেই কোণারক মিউজিয়াম। শুক্রবার ছাড়া রোজই খোলা থাকে।
কোণারক থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে চন্দ্রভাগা সংগম- চন্দ্রভাগা নদী মিলেছে বঙ্গোপসাগরে। এখানে সূর্যাস্ত অপরূপ। কোণারক থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কুরুম গ্রামে আবিস্কৃত হয়েছে বৌদ্ধযুগের ধ্বংসাবশেষ। ভূমিস্পর্শ বুদ্ধমূর্তি এবং ১৭ মিটার লম্বা ইঁটের প্রাচীর দ্রষ্টব্য। হিউয়েন সাঙের ভ্রমণকাহিনিতেও এর উল্লেখ আছে।
কোণারক থেকে ৭ কিলোমিটার দূরত্বে কুশভদ্রী নদী ও সমুদ্রের মোহনায় দেবী রামচন্ডীর মন্দির। কোণারক থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে কাকতাপুরে মঙ্গলাদেবী ও বনদুর্গার মন্দির। কাকতাপুর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অস্তরঙ্গা লবণ তৈরি এবং মাছ ধরার কেন্দ্র, এখানে সূর্যাস্তও ভারি সুন্দর। কাকতাপুর থেকে কোণারকের পথে ১৪ কিলোমিটার দূরে চৌরাশি। এখানে রয়েছে নবম শতকের তান্ত্রিক দেবী বরাহমাতার মন্দির আর অমরেশ্বর লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির।
নি। এখানে নাটমন্দির নেই। দেউল ও জগমোহন মিলিয়ে একটা ইউনিট হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এখন আমরা কোণারকে যে মন্দিরটি দেখতে পাই সেটি মন্দিরের জগমোহন ও ভোগমন্ডপ অংশ। মূল মন্দির বা রেখ দেউল বহু শতাব্দী আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষপদে যবন আক্রমনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মূল মন্দিরটি। ক্রমশঃ কালের গহ্বরে তা বিলীন হয়ে যায়। ১৮২৫ সালে এস্টারলিং-এর বর্ণনায় রেখ দেউলের ভগ্নাবশেষের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮৩৭ সালে জেমস ফার্গুসনের হাতে আঁকা ছবিতে রেখ দেউলের একটা অংশ দেখা যায় যার উচ্চতা ছিল ১৪০-১৫০ফুট। অর্থাৎ বর্তমান জগমোহনের চেয়ে উঁচু। কোণারক মন্দিরের প্রকৃত সংরক্ষণ শুরু হয় ১৯০১ সালে, লর্ড কার্জনের আমলে। পুরাতত্ত্ববিদ জন হান্টারের নেতৃত্বে রথের চাকা আর রথের ঘোড়া বালি সরিয়ে বের করে আনা হয়। জগমোহনের ভেতরটাও এই সময়েই বালি দিয়ে বুজিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

Written by: Prithwish Ghosh

Share:

সাক্ষীগোপাল কৃষ্ণের মূর্তি ও মন্দির

সাক্ষী (-ক্ষিন্) বিণ. 
> কোনো বিষয় বা ঘটনা প্রত্যক্ষকারী, প্রত্যক্ষদর্শী; 
> ঘটনা জানে এমন। [সং. 'সাক্ষাত্ দ্রষ্টা' এই অর্থে নি.]।
সাক্ষীগোপাল - বি. 
<> পুরীর নিকটবর্তী স্হানবিশেষ বা ওই স্হানে প্রতিষ্ঠিত শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহবিশেষ; 
> যে ব্যক্তি স্বয়ং নিষ্ক্রিয় থেকে অন্যের কার্যকলাপ লক্ষ করে; 
> ঘটনা দেখে অথচ পুতুলের মতো নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি।
.
পুরীর সন্নিকটে সমুদ্রতীরে সাক্ষীগোপাল কৃষ্ণের মূর্তি ও মন্দির। কীসের সাক্ষ্য দেবার সাক্ষ্যবহন করছে এই মূর্তি? তার পিছনে রয়েছে এক লোককথা। পুরীতে তীর্থ করতে এসে এক প্রৌঢ় বিপ্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর সঙ্গী এক তরুণ বিপ্র শুশ্রূষায় তাঁকে বাঁচিয়ে তুললেন। কৃতজ্ঞ প্রৌঢ় তাঁর কন্যার সঙ্গে তরুণ বিপ্রের বিবাহ দেবেন বলে প্রতিজ্ঞা করলেন। গ্রামে ফিরে কিন্তু ভুলে গেলেন প্রতিজ্ঞার কথা। শ্রীক্ষেত্রে উচ্চারিত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হলে প্রৌঢ় অভিশাপগ্রস্ত হবেন, তাই তরুণ বিপ্র তাঁকে প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিতে প্রৌঢ় বললেন তাঁর এই প্রতিজ্ঞা দেবার সাক্ষী আনতে পারলেই তিনি বিবাহ দেবেন। তরুণ বিপ্র জগন্নাথকে অনুনয় করল সাক্ষী হিসাবে তার সঙ্গে গ্রামে যেতে। জগন্নাথদেব রাজি হলেন এক শর্তে: তিনি তরুণ বিপ্রের পিছু পিছু যাবেন, কিন্তু সে পিছন ফিরে দেখলেই তিনি থেমে যাবেন। তরুণ প্রশ্ন করল কী করে সে বুঝবে যে জগন্নাথ তাঁকে অনুসরণ করছেন। জগন্নাথ জানালেন তাঁর চরণের নূপুরধ্বনিতেই সেটা বোঝা যাবে। যাত্রা শুরু হল। পথ চলতে চলতে নটখট নটবর কৃষ্ণের মাথায় দুষ্টুমি চাপল। কয়েক লহমার জন্যে নূপুর চেপে ধরলেন। নূপুরের আওয়াজ না শুনে আতঙ্কিত তরুণ বিপ্র পিছনে ফিরে তাকালেন। কৃষ্ণ সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলেন। কোন অঘটন সামনে ঘটতে দেখেও যে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে তার জন্যেই এই সাক্ষীগোপাল বিশেষণ।
-
এই মন্দিরে কখনও গেলে পাণ্ডাদের থেকে সাবধান। অযাচিত টাকা-পয়সা দেবার জন্য চাপাচাপি করে।


 লিখেছেনঃ প্রীথিশ ঘোষ
Share:

২৬ নভেম্বর ২০১৫

নীলমাধব ও জগন্নাথ দেব ( পুরীর নীলমাধব মন্দিরের অসংখ্য ছবিসহ )

মালবরাজ ইন্দ্রদুম্ন্য ছিলেন পরম বিষ্ণু ভক্ত। একদিন এক তেজস্বী সন্ন্যাসী তাঁর রাজবাড়ীতে পদার্পণ করলেন। দেব দ্বিজে ভক্তিপরায়ন রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য পরম যত্নে সন্ন্যাসীর সেবা যত্ন করলেন। সন্ন্যাসী ভারতবর্ষের সমস্ত তীর্থের কথা বলে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের নীল পর্বতে ভগবান বিষ্ণুর পূজার কথা জানালেন। এখানে ভগবান বিষ্ণু গুপ্তভাবে শবর দের দ্বারা নীলমাধব রূপে পূজিত হচ্ছেন, নীলমাধব সাক্ষাৎ মুক্তিপ্রদায়ক, তিনি মোক্ষ প্রদান করেন।

সন্ন্যাসীর কথা শুনে ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য ভগবানের রূপ দর্শনে আকুল হলেন। রাজা তাঁর পুরোহিতের ভাই বিদ্যাপতিকে শবর দের রাজ্যে গিয়ে নীলমাধবের সন্ধান করে আনতে বললেন। এরপর শবর দের দেশে এসে বিদ্যাপতি শবর দের রাজা বিশ্বাবসুর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। শবর রাজা বিদ্যাপতিকে স্বাদর অভ্যর্থনা করে অতিথি চর্চার জন্য কন্যা ললিতাকে দায়িত্ব দেন। কিছুদিন থাকার পর বিদ্যাপতি শবর রাজা বিশ্বাবসুর কন্যা ললিতার প্রেমে পড়েন। উভয়ে উভয়কে ভালোবেসে ফেলেন। যার পরিণাম-স্বরূপ ললিতা অন্তঃসত্ত্বা হন। ললিতা এ কথা বিদ্যাপতিকে জানান এবং তাঁকে বিবাহ করতে বলেন। বিদ্যাপতি ললিতাকে এর বিনিময়ে নীলমাধব দর্শনের অভিপ্রায় জানান। ললিতা সে কথা শুনে বিচলিত হয় কিন্তু সে বলে এক সর্তে সে নীলমাধবকে দেখাতে পারে - বিদ্যাপতি যে পথে যাবেন সেই সময় তাঁর দুই চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে অর্থাৎ কাপড়ের পট্টি বাঁধা হবে যাতে তিনি রাস্তা না দেখতে পারেন কিম্বা চিনতে পারেন। বিদ্যাপতি রাজি হয়ে যান। কিন্তু বিদ্যাপতি একটি বুদ্ধি করেন, উনি সঙ্গে করে সরষে নিয়ে যান। হাতে এক মুঠো এক মুঠো করে সরষে নিয়ে সারা রাস্তা ফেলতে ফেলতে যান। এ' সব কাজ ললিতার অগোচরেই সম্পন্ন হয়। বিদ্যাপতির উদ্দেশ্য ছিল নীলমাধবকে পুরীতে নিয়ে যাওয়া। সেই পথ চেনার জন্য উনি সরসের গাছ দেখতে দেখতে নীলমাধবের মন্দিরে পৌঁছন কিন্তু প্রভু নীলমাধব অন্তর্যামী বিদ্যাপতির হাতের নাগাল থেকে অন্তর্ধান হ'ন।
.
বিশ্ববসু কন্যা ললিতার মারফৎ বিদ্যাপতি নীলমাধব কে দর্শন লাভ করলেন বিশ্ববসুর অগোচরে। তারপর বিদ্যাপতি গিয়ে রাজাকে সব জানালেন। রাজা খবর পেয়ে সৈন্য সামন্ত নিয়ে নীলমাধবের দর্শনে আসলেন।
ইন্দ্রদুম্ন্য পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে এসে নীলমাধব দর্শন করতে গেলে শুনলেন নীলমাধব অন্তর্ধান হয়েছেন। মতান্তরে শবর রাজ বিশ্বাবসু সেটিকে লুকিয়ে রাখেন। রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য এতে খুব দুঃখ পেয়ে ভাবলেন প্রভুর যখন দর্শন পেলাম না তখন এই জীবন রেখে কি লাভ? অনশনে প্রান ত্যাগ করাই শ্রেয় । এই ভেবে রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য কুশ শয্যায় শয়ন করলেন। সে' সময় দেবর্ষি নারদ মুনি জানালেন --- “হে রাজন তোমার প্রাণত্যাগের প্রয়োজন নাই। এই স্থানে তোমার মাধ্যমে ভগবান জগন্নাথ দেব দারুব্রহ্ম রূপে পূজা পাবেন। স্বয়ং পিতা ব্রহ্মা একথা জানিয়েছেন।”
রাজা শুনে শান্তি পেলেন। এক রাতের কথা রাজা শয়নে ভগবান বিষ্ণুর স্বপ্ন পেলেন।
স্বপ্নে ভগবান শ্রীহরি বললেন --- “হে রাজন । তুমি আমার প্রিয় ভক্ত। ভক্তদের থেকে আমি কদাপি দূর হই না। আমি সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তোমার নিকট আসছি। পুরীর বাঙ্কিমুহান নামক স্থানে তুমি আমাকে দারুব্রহ্ম রূপে পাবে।”
রাজা সেই স্থানে গিয়ে দারুব্রহ্মের সন্ধান পেলেন। কিন্তু তাকে একচুল ও নড়াতে পারলেন না । রাজা আদেশ দিলেন হাতী দিয়ে টানতে। সহস্র হাতী টেনেও সেই দারুব্রহ্ম কে এক চুলও নড়াতে পারলো না। রাজা আবার হতাশ হলেন।
সেই সময় ভগবান বিষ্ণু স্বপ্নে জানালেন --- “হে রাজন। তুমি হতাশ হইও না। শবর রাজ বিশ্বাবসু আমার পরম ভক্ত। তুমি তাকে সসম্মানে এইস্থানে নিয়ে আসো। আর একটি স্বর্ণ রথ আনয়ন করো।”
রাজা সেই মতো কাজ করলেন। ভক্ত বিশ্বাবসু আসলেন। বিশ্বাবসু, বিদ্যাপতি আর রাজা তিনজনে মিলে দারুব্রহ্ম তুললেন। সেসময় চতুর্দিকে ভক্তেরা কীর্তন করতে লাগলো। তারপর দারুব্রহ্ম কে রথে বসিয়ে তিনজন নিয়ে এলেন।
প্রকাশ থাকে পুরীর দৈতাপতিরা ওই ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতি এবং শবর কন্যা ললিতার বংশধর। তাই ওরা কেবল রথের সময় ভগবান জগন্নাথের সেবা করার অধিকার পান। রথে উপবিষ্ট প্রভু জগন্নাথ বলভদ্র মা সুভদ্রা এবং সুদর্শনের। এই বছরও নব-কলেবর যাত্রায় দৈতাপতিরা দারু অন্বেষণ এবং ব্রহ্ম পরিবর্তনের কাজ সমাপন করেছেন। এ ছাড়া ওনারা পুর্ব বিগ্রহদের পাতালিকরন কাজ সমাপন করেন 'কোইলি বৈকুন্ঠে' ।
রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য সমুদ্রে প্রাপ্ত দারুব্রহ্ম প্রাপ্তির পর গুণ্ডিচা মন্দিরে মহাবেদী নির্মাণ করে যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞ সমাপ্তে দেবর্ষি নারদ মুনির পরামর্শে রাজা সেই দারুব্রহ্ম বৃক্ষ কাটিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরীতে মনোনিবেশ করলেন। এর জন্য অনেক ছুতোর কারিগর কে ডেকে পাঠানো হোলো। কিন্তু বৃক্ষের গায়ে হাতুড়ী, ছেনি ইত্যাদি ঠেকানো মাত্রই যন্ত্র গুলি চূর্ণ হতে লাগলো। রাজা তো মহা সমস্যায় পড়লেন। সেসময় ছদ্দবেশে বিশ্বকর্মা মতান্তরে ভগবান বিষ্ণু এক ছুতোরের বেশে এসে মূর্তি তৈরীতে সম্মত হলেন।
তিনি এসে বললেন- “হে রাজন। আমার নাম অনন্ত মহারাণা। আমি মূর্তি গড়তে পারবো। আমাকে একটি বড় ঘর ও ২১ দিন সময় দিন। আমি তৈরী করবো একটি শর্তে। আমি ২১ দিন দরজা বন্ধ করে কাজ করবো। সেসময় এই ঘরে যেন কেউ না আসে। কেউ যেন দরজা না খোলে।”
অপর দিকে মোটা পারিশ্রামিকের লোভে যে ছুতোররা এসেছিলো তাদের নিরাশ করলেন না অনন্ত মহারাণা।
তিনি বললেন- “হে রাজন । আপনি ইতিপূর্বে যে সকল কারিগর কে এনেছেন, তাদের বলুন তিনটি রথ তৈরী করতে।”
ছদ্দবেশী বিশ্বকর্মা ঘরে ঢুকলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে সেখানে কড়া প্রহরা বসানো হোলো যাতে কাক-পক্ষীও ভেতরে না যেতে পারে। ভেতরে কাজ চলতে লাগলো। কিন্তু রানী গুণ্ডিচার মন মানে না। স্বভাবে নারীজাতির মন চঞ্চলা হয়। রানী গুন্ডিচা ভাবলেন -- “আহা কেমনই বা কারিগর বদ্ধ ঘরে মূর্তি গড়ছেন। কেমন বা নির্মিত হচ্ছে শ্রীবিষ্ণুর বিগ্রহ। একবার দেখেই আসি না। একবার দেখলে বোধ হয় কারিগর অসন্তুষ্ট হবেন না।”
এই ভেবে মহারানী ১৪ দিনের মাথায় মতান্তরে ৯ দিনের মাথায় দরজা খুলে দিলেন। কারিগর ক্রুদ্ধ হয়ে অদৃশ্য হোলো। অসম্পূর্ণ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে রানী ভিরমি খেলেন। একি মূর্তি! নীল নবঘন শ্যামল শ্রীবিষ্ণুর এমন গোলাকৃতি নয়ন, হস্ত পদ হীন, কালো মেঘের মতো গাত্র বর্ণ দেখে মহারানীর মাথা ঘুরতে লাগলো।
রাজার কানে খবর গেলো। রাজা এসে রানীকে খুব তিরস্কার করলেন। বদ্ধ ঘরের মধ্য থেকে এক কারিগরের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় বিচক্ষণ মন্ত্রী জানালেন তিনি সাধারন মানব না কোনো দেবতা হবেন। বিষ্ণু ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য তাঁর আরাধ্য হরির এই রূপ দেখে দুঃখিত হলেন। রাজাকে সেই রাত্রে ভগবান বিষ্ণু আবার স্বপ্ন দিলেন।
বললেন --- “আমার ইচ্ছায় দেবশিল্পী মূর্তি নির্মাণ করতে এসেছিলেন। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ হওয়াতে এই রূপ মূর্তি গঠিত হয়েছে। হে রাজন, তুমি আমার পরম ভক্ত, আমি এই অসম্পূর্ণ মূর্তিতেই তোমার পূজা নেবো। আমি দারুব্রহ্ম রূপে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে নিত্য অবস্থান করবো। আমি প্রাকৃত হস্তপদ রহিত, কিন্তু অপ্রাকৃত হস্তপদাদির দ্বারা ভক্তের সেবাপূজা শ্রদ্ধা গ্রহণ করবো। আমি ত্রিভুবনে সর্বত্র বিচরণ করি। লীলা মাধুর্য প্রকাশের জন্য আমি এখানে এইরূপে অধিষ্ঠান করবো। শোনো নরেশ -- ভক্তেরা আমার এই রূপেই মুরলীধর শ্রীকৃষ্ণ রূপের দর্শন পাবেন। যদি তুমি ইচ্ছা করো তবে ঐশ্বর্য দ্বারা সোনা রূপার হস্ত পদাদি নির্মিত করে আমার সেবা করতে পারো। ” সেইথেকে উল্টো রথের পর একাদশীর দিন তিন ঠাকুরের সুবর্ণ-বেশ রথের ওপর হয়। সেই বেশ দেখলে সাত জন্মের পাপ ক্ষয় হয় যা দেখতে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরী আসেন প্রত্যেক বৎসর।
.
আমরা দেখলাম যে ভগবান বিষ্ণু তাঁর পরম ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য কে স্বপ্নে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এই বলে যে তিনি সেই হস্তপদ রহিত বিকট মূর্তিতেই পূজা নেবেন। সেই স্বপ্ন পর্ব তখনো চলছে। ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে যে ভক্তির সম্বন্ধ তা একে একে উঠে আসছে। নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্নে রাজা তখনও সেই ছদ্দবেশী অনন্ত মহারানার জন্য প্রার্থনা জানিয়ে বলছেন --- “হে প্রভু জনার্দন, যে বৃদ্ধ কারিগরকে দিয়ে তুমি তোমার এই মূর্তি নির্মিত করিয়াছ – আমার অভিলাষ এই যে সেই কারিগরের বংশধরেরাই যেনো তোমার সেবায় রথ যুগ যুগ ধরে প্রস্তুত করিতে পারে।” ভগবান নারায়ন তাঁর ভক্তদের খুবুই স্নেহ করেন। তাই ভগবান একে একে রাজার ইচ্ছা পূর্ণ করতে লাগলেন। এরপর ভগবান বিষ্ণু বললেন --- “হে রাজন। আমার আর এক পরম ভক্ত শবর রাজ বিশ্বাবসু আমাকে নীলমাধব রূপে পূজা করতো- তাঁরই বংশধরেরা আমার সেবক রূপে যুগ যুগ ধরে সেবা করবে । বিদ্যাপতির প্রথম স্ত্রীর সন্তান গন আমার পূজারী হবে। আর বিদ্যাপতির দ্বিতীয়া স্ত্রী তথা বিশ্বাবসুর পুত্রী ললিতার সন্তান এর বংশধরেরা আমার ভোগ রান্নার দায়িত্ব নেবে। আমি তাদের হাতেই সেবা নেবো।”
বিদ্যাপতি প্রথম রাজার আদেশে নীলমাধব সন্ধান করতে গেছিলেন শবর দের দেশে, শবর বা সাঁওতাল যাদের আমরা ছোটো জাত বলে দূর দূর করি --- শ্রীভগবান বিষ্ণু প্রথম তাঁদের দ্বারাই পূজা নিলেন। অপরদিকে তিনি তাঁদের হাতে সেবার আদেশ দিলেন। ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জাতির একত্র মেলবন্ধন ঘটালেন স্বয়ং ভগবান। সেজন্যই বলে পুরীতে জাতি বিচার নেই। জগতের নাথ জগন্নাথ সবার। বিদ্যাপতি শবর দেশে নীলমাধবের সন্ধান করতে গিয়ে বিশ্বাবসুর দুহিতা ললিতার সাথে ভালোবাসা ও বিবাহ করেছিলেন। আর বিদ্যাপতিকে শবর দেশে পৌছানোর জন্য এক রাখাল বালক বারবার পথ প্রদর্শন করেছিলেন। সেই রাখাল বালক আর কেউ নয় স্বয়ং বৃন্দাবনের 'রাখালরাজা নন্দদুলাল'। ইন্দ্রদুম্ন্য স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রতিশ্রুতি দিলেন --- “হে মধূসুদন, প্রতিদিন মাত্র এক প্রহর অর্থাৎ তিন ঘণ্টার জন্য মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকবে, বাকী সময় মন্দিরের দ্বার অবারিত থাকবে, যাতে তোমার সন্তান ভক্তেরা তোমার দর্শন লাভ করে। সারাদিন আপনার ভোজোন চলবে। আপনার হাত কদাপি শুস্ক থাকবে না।”
ভগবান বিষ্ণু রাজাকে তাই বর দিলেন। এবার ভগবান ভক্তের পরীক্ষা নিলেন --- তিনি বললেন --- “এবার নিজের জন্য কিছু প্রার্থনা করো, তুমি আমার ভক্ত।”
প্রকৃত ভক্তেরা নিস্কাম, তাই কোনো প্রকার সুখ ঐশ্বর্য তারা চান না।
রাজা একটি ভয়ানক বর চেয়ে বললেন -- “প্রভু আমাকে এই বর দিন আমি যেন নির্বংশ হই, যাতে আমার বংশধরের কেউ যেন আপনার দেবালয়কে নিজ সম্পত্তি দাবী না করতে পারে।”
ভগবান হরি তাই বর দিলেন। জগন্নাথ মন্দিরে প্রান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা।
.
পদ্মপুরাণে লিখিত আছে ভগবান রামচন্দ্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শত্রুঘ্ন এই স্থানে এসেছিলেন। ব্রহ্ম পুরাণ ও বৃহৎ নারদীয় পুরানে এই স্থানের নাম পাওয়া যায় । জগন্নাথ মন্দিরের মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয় ব্রহ্মা ব্রহ্মলোক থেকে মর্তে এসেছিলেন। তিনিই হয়েছিলেন পুরোহিত। জগন্নাথ দেব রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য কে স্বপ্নে নিত্য পূজোর নিয়মকানুন বলেছিলেন ইন্দ্রদুম্ন্য সেই মতো সব ব্যবস্থা করেন।
স্কন্দপুরান মতে শবর জাতির লোকেরা পূর্বে নীলমাধব রূপে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করতো। ব্রহ্ম পুরাণ ও বৃহৎ নারদীয় পুরান মতে শবর-গণ নীলমাধব রূপী নারায়নের পূজা করতেন ঠিকই কিন্তু তাঁর পূর্বে স্বর্গের দেবতাগণ গুপ্ত রূপে নীলমাধবের পূজা করতেন। পরে শবর গণ সেই খোঁজ পান।
জগন্নাথ দেবের সৃষ্টি সম্বন্ধে ওড়িয়া মহাভারতে এক অদ্ভুত আখ্যান আছে। লীলা সংবরণের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৈকুণ্ঠে গমনের চিন্তা করতে লাগলেন। যদু বংশ গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে। বলরাম ভ্রাতা যোগবলে দেহ রেখেছেন। তিনি এই ভেবে বনে গিয়ে একটি বৃক্ষে আরোহণ করে মহাভারতের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। সেসময় তাঁর চরণ কে পক্ষী ভেবে জরা নামক এক ব্যাধ শর বিদ্ধ করলেন। বলা হয় এই ব্যাধ পূর্ব জন্মে বালী পুত্র অঙ্গদ ছিলেন। ভগবান রাম বালীকে বধ করে অঙ্গদ কে বর দিয়েছিলেন, পর জন্মে শ্রীকৃষ্ণ রূপে তিনি অঙ্গদের শরে দেহ রাখবেন। পরে শ্রীকৃষ্ণ দেহ রাখলে তাঁর দেহকে দ্বারকায় সমুদ্র তটে চন্দন কাষ্ঠে, খাঁটি গো ঘৃতে দাহ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ৬ দিন হলেও ভগবানের শরীর একটুকুও পুড়লো না।
তখন দৈববাণী হোল --- “ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই নশ্বর দেহ আগুনে দাহ করা যাবে না। এই পবিত্র দেহ সমুদ্রে বিসর্জন দাও।” ঠিক সেই মতো সমুদ্রে বিসর্জিত করা হলে সেই দেহ কাষ্ঠে রূপান্তরিত হয়ে ভাসতে ভাসতে এলো। সেই কাষ্ঠ রোহিনীকুণ্ডে পাওয়া যায়। সেই কাষ্ঠ দিয়েই জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরী হোলো।
ওড়িশা ভারতের এক প্রাচীন রাজ্য। এখানকার সংস্কৃতি ও সভ্যতা অনেক পুরানো। জগন্নাথ যেমন বৈষ্ণবদের নিকট বিষ্ণু তেমনি শাক্ত ও শৈবদের নিকট ভৈরব শিব। যে যেমন ভাবে দেখতে চায় --- জগন্নাথ তাঁর কাছে সেরূপেই প্রকাশিত হন। হরিহর অভেদ তত্ত্ব এই শ্রীক্ষেত্রে দেখা যায় । ওড়িশার নানা অঞ্চল জুড়ে বহু প্রাচীন মন্দির আছে। এগুলোর সবকটি সম্বন্ধে লেখা অসম্ভব। কি শিব মন্দির, কি শক্তিপীঠ, কি গোপাল মন্দির এমনকি বৌদ্ধ ও জৈ ধর্মের নিদর্শন ওড়িশা রাজ্য জুড়ে দেখা যায়।
জয় জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথ গামী ............
জগন্নাথ ক্ষেত্র বা ওড়িশা বা ঔড্র দেশ বা নীলাচল ধাম অপূর্ব সুন্দর ক্ষেত্র .....
জয় জগন্নাথ .....
[সাথের ছবিটি -- নীলমাধব মন্দিরের]

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh
 মন্দিরের কিছু ছবি দেওয়া হলোঃ
নীলমাধব মন্দিরের ভিতরে গম্বুজের কারুকার্য্য

নীলমাধব মন্দিরের আঙিনায়  হনুমান মন্দিরে  বজরঙবলী


মহাপ্রভুর সাধন কুটির গম্ভীরায় সংরক্ষিত তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী


পুরীর সি-বিচ্-এ উড়িয়া মহিলারা খুব সকালেই বেলাভুমিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় রত কার্তিক-পূর্ণিমায় ছোট্ট ছেলেটা ভোরবেলা সমুদ্রে নৌকা ভাসাতে ব্যস্ত

নীলমাধব মন্দিরের প্রবেশ দ্বার
সাক্ষীগোপাল
সাক্ষীগোপাল মন্দির
হরিদাস প্রভুর সমাধি ক্ষেত্র


হরিদাস প্রভুর সাধনস্থল সিদ্ধবকুলতলা
নীলমাধব মন্দিরে বিগ্রহের ছবি তোলা নিষেধ তাই ছবি থেকে তোলা ফটোগ্রাফ্

নীলমাধব মন্দিরের চূড়া


নীলমাধব মন্দিরের আঙিনায় কেদারনাথ ও বদ্রীনাথ

Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।