• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

দেব দেবী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দেব দেবী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৮ মে ২০২২

দেবী গঙ্গা

স্বামী বিবেকানন্দ তখন ব্রিটেনে। তাঁর এক ব্রিটিশ অনুগামী স্বামীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'স্বামীজি, কোন নদীর জল আপনার সবচেয়ে বেশি পছন্দ?'

স্বামীজি ওই ব্যক্তির দিকে ফিরে উত্তর দিলেন,

'টেমস নদীর জল।'

টেমস হল ব্রিটেনের একটি বিখ্যাত নদী। ওই ব্যক্তি বললেন,

 'স্বামীজি, আমরা তো ভেবেছিলাম আপনি বলবেন - গঙ্গা নদীর জল।' স্বামীজি বললেন,

 'গঙ্গায় জল কোথায়! ও তো অমৃত। জলের সাথে কি তার তুলনা হয়?'

গঙ্গার উৎসস্থল গঙ্গোত্রী ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উত্তরকাশী জেলাতে অবস্থিত। এটি ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এই স্থান হিমাদ্রি হিমালয়ে ৩,১০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। গঙ্গোত্রীর নিকট গোমুখে গঙ্গার উৎস। এটি গঙ্গোত্রী শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে গঙ্গোত্রী হিমবাহের উপর অবস্থিত। এখানে দেবী গঙ্গার মন্দির আছে।

পুরাণ অনুসারে, রাজা ভগীরথের পূর্বপুরুষের পাপস্খালনের জন্য গঙ্গা অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁর অবতরণের আগে রাজা ভগীরথ এখানে অনেকদিন তপস্যা করেছিলেন। এখানে ভগীরথ শিলা আজও রয়েছে, যেখানে রাজা ভগীরথ ভগবান শিবের তপস্যা করেছিলেন।


 

গঙ্গোত্রী থেকে ১.৫ কিমি দুরত্বে রয়েছে পঞ্চ-পাণ্ডবের স্মৃতি বিজড়িত পাণ্ডব-গুহা। মহাভারত অনুসারে এখানে পাণ্ডবরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। 

গঙ্গোত্রী ছোট চার ধাম তীর্থ-চতুষ্টয়ের একটি। এখানে গঙ্গা নদীর নাম ভাগীরথী নদী। গঙ্গোত্রী থেকে দেবপ্রয়াগ পর্যন্ত গঙ্গা ভাগীরথী নামে প্রবাহিত, তারপর অলকানন্দা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গঙ্গা নাম ধারণ।  

গঙ্গা সনাতন হিন্দু-ধর্মে পূজিতা হন দেবীরূপে। মনে করা হয় যে ভগবান শ্রীহরিই গঙ্গারূপে আবির্ভূত হয়েছেন। বেদান্তে বলা হয়েছে 'সর্বং খলু ইদং ব্রহ্ম।' কিন্তু সব কিছুতেই ব্রহ্মের প্রকাশ হলেও কোনও কোনও বস্তুতে তাঁর বিশেষ প্রকাশ। গঙ্গা-জলেও ব্রহ্মের বিশেষ প্রকাশ। তাই গঙ্গা-জল ভারতে অত্যন্ত পবিত্র বস্তুরূপে গণ্য হয়। গঙ্গাজলের বিশেষত্ব হল যে এই জল দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখলেও নষ্ট হয়না। এর নিশ্চয় কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ আছে, কিন্তু আমাদের বিশ্বাস গঙ্গাজল চির পবিত্র। এই জলের ছোঁয়ায় তাই আমাদের দেহ-মন শুদ্ধ হয়। ভারতীয় সনাতন ধর্মের সাধকগণ গঙ্গা-স্নান, গঙ্গা-দর্শন এগুলোর মধ্যে দিয়ে অনাবিল শান্তি ও শুদ্ধতা অনুভব করেন। 

মহাভারতে পাই, মহর্ষি পুলস্ত্য কুরুপিতামহ ভীষ্মকে বলছেন- 'গঙ্গে' 'গঙ্গে'  এরূপ নাম স্মরণে সকল পাপ খণ্ডিত হয়, গঙ্গা দর্শনে মঙ্গল প্রাপ্তি ঘটে। গঙ্গাবারি পানে কূল ধন্য হয়।  মহর্ষি পুলস্ত্য আরও বলেছেন,  'যেথায় গঙ্গা আছে সেটাই দেশ, গঙ্গা তীরের   তপোবন সিদ্ধভূমি।'


© লেখক : তাপস কুমার ঘোষ 

Share:

১৬ ডিসেম্বর ২০২০

হেরম্বগণেশ হলেন গণেশের ৩২টি জনপ্রিয়তম রূপের অন্যতম ।

হেরম্বগণেশ বা হেরম্ব (সংস্কৃত: हेरम्ब, Heraṃba) হলেন হিন্দু দেবতা গণেশের (গণপতি) পঞ্চমুণ্ডবিশিষ্ট মূর্তি। ইনি হেরম্বগণপতি নামেও পরিচিত। নেপাল রাষ্ট্রে এই মূর্তিটি বিশেষ জনপ্রিয়। গণেশের তান্ত্রিক উপাসনায় এই মূর্তিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হেরম্বগণেশ হলেন গণেশের ৩২টি জনপ্রিয়তম রূপের অন্যতম।

মুদ্গলপুরাণ গ্রন্থে ‘হেরম্বগণপতি’ নামটি হল গণেশের ৩২টি নামের অন্যতম। স্কন্দপুরাণ গ্রন্থে হেরম্ববিনায়ককে বারাণসীর নিকটস্থ ৫৬ জন বিনায়কের অন্যতম বলা হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ (৮টি নাম), পদ্মপুরাণ (১২টি নাম) ও চিন্ত্যাগম (১৬ গণপতি) গ্রন্থে গণেশের যে নামের তালিকা পাওয়া যায়, তাতে হেরম্ব নামটি অন্যতম।গণেশপুরাণ গ্রন্থেও গণেশের একটি বিশেষণ হল হেরম্ব।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ গ্রন্থে ‘হেরম্ব’ শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ‘হে’ অক্ষরের মাধ্যমে অসহায়তা বা দুর্বলতা বোঝায় এবং ‘রম্ব’ শব্দটির মাধ্যমে দুর্বলকে রক্ষা করা ও তাদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা বোঝায়। অর্থাৎ ‘হেরম্ব’ শব্দের অর্থ ‘দুর্বলের রক্ষাকর্তা’।

হেরম্বগণেশের মূর্তিতে পাঁচটি হস্তিমুণ্ড দেখা যায়। চারটি চার প্রধান দিকে মুখ করা এবং পঞ্চম মস্তকটি উপরের দিকে মুখ করা অবস্থায় থাকে। হেরম্বগণেশের পাঁচটি মস্তকের বর্ণ তার পিতা শিবের পাঁচ রূপভেদ ঈশান, তৎপুরুষ, অঘোর, বামদেব ও সদ্যোজাতের গাত্রবর্ণের অনুরূপ। এই পাঁচটি মস্তক শক্তির প্রতীক। তার গাত্রবর্ণ স্বর্ণাভ হলুদ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার গায়ের রং সাদা।

হেরম্বগণেশের বাহন সিংহ। সিংহবাহন হেরম্বগণেশের রাজকীয় সত্ত্বা ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির প্রতীক। কথিত আছে, এই বাহনটি তার মা পার্বতীর বাহন। পার্বতীর থেকেই তিনি এই বাহনটি পেয়েছেন। সিংহ বাহন হলেও, কোনো কোনো মূর্তিতে গণেশের নিজস্ব বাহন মুষিককেও (ইঁদুর) সঙ্গে দেখা যায়। ১১শ-১৩শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ওড়িশায় নির্মিত একটি মূর্তিতে হেরম্বগণেশের আসনের পাশে একটি ইঁদুর দেখা যায়। নেপালের ভক্তপুরে নির্মিত একটি মূর্তিতে দেখা যায়, হেরম্বগণেশ দুটি ইঁদুরের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। নেপালে হেরম্বগণেশকে সাধারণত সিংহ ও ইঁদুরের সঙ্গে দেখা যায়।

মূর্তিতত্ত্ব-সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলিতে হেরম্বগণেশের দশটি হাতের উল্লেখ আছে। তিনি একটি পাশ, দন্ত (নিজের ভগ্নদন্ত), অক্ষমালা, একটি পরশু (যুদ্ধের কুঠার), তিনমাথাওয়ালা মুগুর ও একটি মোদক ধরে থাকেন। দুটি হাত দেখা যায় বরদামুদ্রা (বরদানকারী ভঙ্গিমা) ও অভয়মুদ্রায় (অভয়দানকারী ভঙ্গিমা)। অন্যান্য বিবরণ অনুসারে, তার হাতে একটি মালা ও একটি ফল থাকে। কোনো কোনো মূর্তিতে তার হাতে একটি অঙ্কুশ থাকে। কোনো কোনো মূর্তিতে আবার দেখা যায়, হেরম্বগণেশের কোলে তার স্ত্রী বসে আছেন এবং হেরম্বগণেশ তাকে আদর করছেন।

হেরম্বগণেশ হলেন দুর্বলের রক্ষাকর্তা। তিনি নির্ভীকতা ও শত্রুকে জয় বা ধ্বংস করার শক্তি প্রদান করতে পারেন।

গণেশের তান্ত্রিক পূজায় হেরম্বগণেশ জনপ্রিয়। হৈরম্ভ বা হেরুম্ব সম্প্রদায় নামে একটি তান্ত্রিক সম্প্রদায়ে একজন দেবী বা শক্তি সহ হেরম্বগণেশ পূজিত হন। এই দেবীকে তার স্ত্রী মনে করা হলেও সাধারণভাবে তাকে তার মা পার্বতীই মনে করা হয়। হেরম্বগণেশ ছয়টি অভিচার ক্রিয়ার (অশুভ উদ্দেশ্যে মন্ত্রের প্রয়োগ) সঙ্গে যুক্ত। মনে করা হয়, তার মন্ত্র উচ্চারণ করে মন্ত্র-উচ্চারণকারী নিজের শত্রুকে মোহগ্রস্থ করতে পারেন, আকর্ষণ করতে পারেন, ঈর্ষান্বিত করতে পারেন, বশ করতে পারেন, অসার করতে পারেন বা হত্যা করতে পারেন।


তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

০১।  Royina Grewal (২০০৯)। Book of Ganesha। Penguin Books Limited। পৃষ্ঠা 67–8। আইএসবিএন 978-93-5118-091-3।

০২।  Grimes, John A. (১৯৯৫), Ganapati: Song of the Self, SUNY Series in Religious Studies, Albany: State University of New York Press, পৃষ্ঠা 52–59, আইএসবিএন 0-7914-2440-5

০৩।  Greg Bailey (২০০৮)। Gaṇeśapurāṇa: Krīḍākhaṇḍa। Otto Harrassowitz Verlag। পৃষ্ঠা 656। আইএসবিএন 978-3-447-05472-0।

০৪।  Rao, T.A. Gopinatha (১৯১৬)। Elements of Hindu Iconography। 1: Part I। Madras: Law Printing House। পৃষ্ঠা 46–7, 57, 65।

০৫।  Satguru Sivaya Subramuniyaswami। Loving Ganesha। Himalayan Academy Publications। পৃষ্ঠা 69। আইএসবিএন 978-1-934145-17-3।

০৬।  Alexandra Anna Enrica van der Geer (২০০৮)। Animals in Stone: Indian Mammals , Sculptured Through Time। BRILL। পৃষ্ঠা 78, 81, 335, 345। আইএসবিএন 90-04-16819-2।

 ০৭। T.K.Jagannathan। Sri Ganesha। Pustak Mahal। পৃষ্ঠা 104। আইএসবিএন 978-81-223-1054-2।

 ০৮। Martin-Dubost, Paul (১৯৯৭), Gaņeśa: The Enchanter of the Three Worlds, Mumbai: Project for Indian Cultural Studies, পৃষ্ঠা 158, আইএসবিএন 81-900184-3-4

০৯।  Roshen Dalal (২০১৪)। Hinduism: An Alphabetical Guide। Penguin Books Limited। পৃষ্ঠা 470। আইএসবিএন 978-81-8475-277-9।

Share:

১০ জুলাই ২০২০

আজ নাগপঞ্চমী। ভগবান হরির বিছানা নাগ শয্যা, ভগবান শিবের কণ্ঠের ভূষণ নাগরাজ বাসুকী, মনসার হস্তে সর্প, দুর্গা দেবীর হস্তে সর্প, গণেশের নাগ যজ্ঞ উপবীত ।

আজ নাগপঞ্চমী। হিন্দুরা তাহাদিগের আরাধ্য দেবদেবী রূপে বিভিন্ন পশু জন্তু পক্ষীর ধারনা করে নেয় । যেমন শিবের বাহন ষাঁড়, দুর্গার বাহন সিংহ বা বাঘ, বিষ্ণুর বাহন গরুড় পক্ষী, শণির বাহন শকুন এমনকি গণেশের বাহন রূপে ইঁদুর বলা হয়। জীবজন্তু দের প্রতি সম্মান ও বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি বজায় রাখতেই বোধ হয়ে শাস্ত্রে দেবদেবীর বাহন রূপে এই সব পশু পক্ষী কে বাহন রূপে লেখা হয়েছে । হিন্দুরা নাগের পূজো করে এই নিয়ে যেমন অন্য ধর্মীরা খোঁচা দেয় তেমনি হিন্দুরাও জানে না । না জেনে নিজ ধর্মকে কুসংস্কার ভাবে । সর্পের উল্লেখ বিভিন্ন পুরাণ ও তন্ত্রে পাওয়া যায় । ভগবান হরির বিছানা নাগ শয্যা, ভগবান শিবের কণ্ঠের ভূষণ নাগরাজ বাসুকী, মনসার হস্তে সর্প, দুর্গা দেবীর হস্তে সর্প, গণেশের নাগ যজ্ঞ উপবীত । তন্ত্রেও সর্পের সাথে দেবীর যোগ দেখা যায়। দেবী তারার সাথে সর্প, ছিন্নমস্তার নাগ যজ্ঞ উপবীত, গুহ্যকালীর কাছে নাগের অবস্থান ইত্যাদি ইত্যাদি । একদিকে দেখা যায় সাপেরা ইঁদুর ভক্ষণ করে , ইঁদুর গ্রামাঞ্চলে ফসলের ভীষণ ক্ষতি করে। একদিকে সর্প পূজার মাধ্যমে আছে সর্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ । বস্তুত হিন্দুধর্মে বাহন রূপে যে পশু পাখীর উল্লেখ প্রতিজনেরই সেই দেব দেবীর সাথে জড়িত তত্ত্বকথা আছে।

অপরদিকে সর্প কে কুলকুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক ধরা হয় । ঘুমন্ত অবস্থায় এই কুণ্ডলিনী প্যাচে পড়ে থাকে। যোগীরা যোগসাধনার মাধ্যমে এই কুলকুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ ঘটান । জাগ্রত অবস্থায় এই কুণ্ডলিনী মহাশক্তি সর্পের মতো তির্যক গতিশীলা । এই দিক থেকে কুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক রূপে সর্পের আরাধনা হয় । এই কারণে দেব দেবীদের হস্তে সর্প বা নাগ যজ্ঞ উপবীত থাকে। যা কুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক । সাপেদের সাথে যোগীদের অনেকটা মিল আছে । নাগেরা একাচারী, অনিকেত, সাবধান ও গুহা বা গর্ত বাসী। শীতের কটি মাস সে বায়ু ভক্ষণ করে নিশ্চুপ পড়ে থাকে, হাতের সামনে যা আসে তাই খায় । পূর্বকালে যোগীরা এমন একচারী, সংসার বিষয়ে সাবধান ও গুহা বা অরণ্য বা নির্জন স্থান জঙ্গল বাসী হতেন। কুম্ভক যোগে বায়ু নিরোধ পূর্বক সাধনা করেন যোগীরা । তাঁরা এই যোগসাধনা অবলম্বন পূর্বক জাগিয়ে তুলতেন সুপ্ত কুণ্ডলিনী শক্তিকে । এই সর্পকে তাই সেই যোগসাধনার কুণ্ডলিনী শক্তি রূপে পূজা করে আসা হয় আদিকাল থেকে ।



Share:

২৬ এপ্রিল ২০২০

আজ দেবী ধূমাবতীর আবির্ভাব তিথি

আজ দেবী ধূমাবতীর আবির্ভাব তিথি। বলা হয় একবার দেবীর খুব ক্ষুধার উদ্রেগ হয়েছিল। ভগবান শিবের কাছে বার কয়েক আহার প্রার্থনা করলেন। কিন্তু ভগবান শিব বললেন, সবুর করো। অর্থাৎ অপেক্ষা করো। দেবীর ক্ষুধা সহ্য হল না। তিনি ভগবান শিবকেই গ্রাস করলেন। স্বামীহীনা হবার জন্য দেবী হলেন বিধবা। দেবীর এই রূপ "ধূমাবতী" নামে খ্যাতা হল। অপর একটি মতানুসারে
দেবী সতী, দক্ষযজ্ঞে আত্মাহুতি দিলে, দেবীর শরীরের ধূম থেকে এই দেবীর উৎপত্তি হয়। দেবী ধূমাবতী বিধবা, শরীরে বয়স্কা বৃদ্ধার ছাপ। ইনি ময়লা জীর্ণ সাদা থান পরিধান করেন। কাকচিহ্ন ধ্বজ থাকে এনার রথে। রথের চারপাশে কাক থাকে। হস্তে কূলা, ঝাঁটা থাকে। ধুম্রাসুর নামক এক অসুরকে বধ করেছিলেন এই দেবী। দেবী ধূমাবতীর আওয়াজ শত শত শৃগালের ন্যায়। এঁনার দৃষ্টি খুব প্রখর। ধূম রূপে সর্বত্র তিনি যাতায়াত করতে পারেন। যাই হোক, ভগবান শিবকে ভক্ষণের পর, ভগবান শিব পুনঃ ধূম রূপে দেবীর শরীর থেকে নির্গত হলেন।

Share:

২২ এপ্রিল ২০২০

দুর্বা ও গণেশ

আপনারা হয়তো দেখেছেন গনেশ কে দূর্বা দান করতে। কথিত আছে গনেশকে ২১গাছি দূর্বা দিয়ে প্রার্থনা করলে গণেশ ঠাকুর প্রসন্ন হন। রামেশ্বরমের মন্দিরে দেখেছি দুর্বা দিয়ে গণেশ কে আপাদমস্তক আবৃত করে দেওয়া হয়। এর পিছনে যা কাহিনী আছে তা সংক্ষেপে কিছু লিখছি।

একসময় অনলাসুর নামে এক মহা প্রতাপবান ও অত্যাচারী অসুর ছিল, জানা যায় অনলাসুর যমরাজ ও অপ্সরা তিলত্তোমার ছেলে ছিল। সেই অনলাসুর একবার তপস্যার দ্বারা দেবাদিদেব মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে বর লাভ করেছিল। বর হিসেবে তাঁর চোখ থেকে আগুনের গোলা বের করার ক্ষমতা লাভ করে এবং সেই থেকে তাঁর নাম হয় অনলাসুর। অনল মানে আগুন।এই মহাশক্তির বলীয়ান হয়ে অনলাসুর প্রবল অত্যাচারি হয়ে উঠে।নির্দয় ভাবে সে সকলকে হত্যা করতে শুরু করে। সাধু-সন্ন্যাসীদের যাগযজ্ঞ নষ্ট করে নির্বিচারে লুন্ঠন হত্যা করতে থাকে।এমনকি তাঁর হাত থেকে দেবতারাও নিস্তার পেলেন না।অনলাসুরের ভয়ে তাঁরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে থাকেন।অনলাসুর তাঁর চোখ থেকে আগুন গোলা দিয়ে চারিদিক ধংশ করতে থাকে, স্বর্গ মর্ত্ত পাতালে শুরু হয়ে যায় হাহাকার।

অনলাসুর স্বর্গ থেকে দেবতাদের তাড়িয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে হত্যা করতে উদ্যত হলে ইন্দ্র সেখান থেকে পালিয়ে যান। ইন্দ্রের পলায়নের পর অনলাসুর স্বর্গ রাজ্যে অধিকার করে বসে।

অনলাসুরের ভয়ে ভীত হয়ে অত্যাচারিত দেবতারা দেবগুরু বৃহস্পতির নির্দেশে ভগবান গনেশের শরনাপন্ন হয়ে গণেশ কে অনলাসুর থেকে স্বর্গ কে উদ্ধার ও দেবগন কে রক্ষা করার প্রার্থনা জানান। দেবতাদের কাতর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে ভগবান গণেশ তাঁদের কে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। গণেশ জানতেন যে অনলাসুর প্রচন্ড পরাক্রমী তাই তিনি অনলাসুর কে বধ করার জন্যে কৌশল অবলম্বন করলেন। গণেশ নিজেকে একটি ছোট্ট শিশুতে পরিনত করে অনলাসুরের সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন।অনলাসুরের চোখ থেকে নির্গত আগুনের গোলা গুলিদের তিনি কৌশলে এড়িয়ে যেতে থাকলেন কিন্তু সেই ভয়ানক আগুনের গোলা গুলি চারিদিক ধ্বংস করতে শুরু করলো। অনেকক্ষন যুদ্ধের পর অনলাসুর যখন শিশুরূপী গণেশ কে গ্রাস করতে উদ্যত হল। গণেশ তখন তাঁর বিরাট-রূপ ধারন করে অনলাসুর কে গিলে ফেলেন।

এদিকে অনলাসুর কে গিলে ফেলায় গণেশের শরীরের ভিতর সৃষ্টি হয় প্রচন্ড যন্ত্রণার। সেই যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকেন, তাঁর এই অবস্থা দেখে স্বর্গের সকল দেবতারা মিলে গণেশের যন্ত্রণা দূর করার চেস্টা করতে থাকেন। দেবী পার্বতী গণেশের সর্বাঙ্গে চন্দনের প্রলেপ দিলেন,কিন্তু সেই আগুনের জ্বালার কোন প্রশমন হল না।দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর গলার সাপ দিয়ে গণেশের কোমর বেঁধে দিলেন,কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলো না। আগুনের সেই ভীষণ যন্ত্রণায় গণেশ ছটফট করতে থাকেন।ভগবান বিষ্ণু তখন প্রচুর পরিমানে পদ্মের জল ছিটিয়ে দিলেন গণেশের গায়ে,সেই থেকে গণেশের এক নাম হয় পদ্মপাণি। তাতেও কোন লাভ হলো না।চন্দ্রদেব তাই দেখে গণেশের মাথার উপর অবস্থিত হয়ে শীতলতা প্রদান করতে শুরু করলেন সেই জন্য গণেশের আরেক নাম হয় ভালচন্দ্র। সকল প্রচেষ্টা বিফল হতে দেখে মহামুনি কাশ্যপ ২১টি দুর্বা গণেশের মাথায় নিবেদন করেন এবং সেই দুর্বা গুলিই গণেশের যন্ত্রণার অবসান ঘটালো, সেই দুর্বা গুলি দ্বারাই গণেশের শান্তি ফিরে এলো।এতে সন্তুষ্ট হয়ে গণেশ ঘোষণা করলেন যে দুর্বাই হবে উনার সবচাইতে প্রিয় আর যেই ভক্ত শ্রদ্ধা সহকারে ২১ টি দুর্বা গণেশকে নিবেদন করবে তাঁর জীবন ধনধান্যে পরিপূর্ণ হবে ও তাঁর জীবনে নেমে আসবে সুখ। পৃথিবীর সকল প্রকার জ্বালা যন্ত্রণা থেকে তাঁর জীবন হবে মুক্ত।আবার এই ২১ টি দুর্বার মাহাত্ম্য হিসেবে বর্ণিত আছে যে এই ২১টি দুর্বা কিন্তু প্রতীকী। এই ২১ টি দুর্বা হচ্ছে আমাদের মধ্যে পঞ্চ ভুত, পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, ও মন এই সকলের প্রতীক।

Post Courtesy: Soikot Kumar


Share:

০৫ এপ্রিল ২০২০

ভবিষ্যপুরাণে উল্লেখিত ভগবান সূর্যের স্তব

ভবিষ্যপুরাণে উল্লেখিত ভগবান সূর্যের স্তবঃ-
ভগবন্তং ভগকরং শান্তচিত্তমনুত্তমম্‌ ।
দেবমার্গপ্রণেতারং প্রনতোস্মি রবিং সদা।।
অর্থাৎ- ষড়ৈশ্বর্যযুক্ত এবং ষড়ৈশ্বর্য্যদায়ী শান্ত চিত্তযুক্ত, ভগবান –দেবতাদের পথ প্রণেতা সূর্য্যদেবকে আমি সদা প্রণাম করি ।
শাশ্বতং শোভানং শুদ্ধং চিত্রভানুং দিবস্পতিম্‌ ।
দেবদেবেশমীশেশং প্রনতোস্মি দিবাকরম্‌ ।।
অর্থাৎ- যিনি দেবদেবেশ শাশ্বত , শোভন, শুদ্ধ, দিবাস্পতি, চিত্রভানু দিবাকর এবং দেবতাদেরও দেবতা তাকে আমি প্রণাম করছি।
সর্ব্বদুঃখহরং দেবং সর্ব্বদুঃখহরং রবিম্‌ ।
বরাননং বরাংগং চ বরস্থানং বরপ্রদম্‌ ।।
বেরণ্যং বরদং নিত্যং প্রণয়োহস্তি বিভাবসুম্‌ ।
অকম যর্মমনং চেন্দ্রং বিষ্ণুমীশং দিবাকরম্‌ ।।
দেবশ্বরং দেবরতং প্রণতোহস্থি বিভাবসুম্‌ ।
সা ইদং শৃণুয়ান্নিত্যং ব্রহ্মণোক্তং স্তবং পরমম্‌ ।
স হি কীর্তিং পরাং প্রাপ্য পুনঃ সূর্য্যপূরং ব্রজেৎ ।।
অর্থাৎ- সমস্ত প্রকার দুঃখহারী দেব তথা সর্বদুঃখহর রবি বরাননযুক্ত , শ্রেষ্ঠ অঙ্গযুক্ত , বরদানকারী , বরেণ্য নিত্য বরদ এই ভগবান বিভাবসুকে আমি প্রণাম করি । অর্ক, অর্য্যমা, ইন্দ্র, বিষ্ণু, ঈশ, দিবাকর , দেবেশ্বর দেবরত এবং বিভাবসুকে আমি প্রণাম করি । এই প্রকারে ব্রহ্মার দ্বারা কৃত এই স্তুতি যে নিত্য শ্রবণ করবে সে পরম কীর্তি লাভ করে সূর্য্যপুরে গমন করবে ।
( ভবিষ্যপুরাণ/ব্রাহ্ম খণ্ড/ ২০ অধ্যায়/ ৩৬-৪০)
Share:

২৫ এপ্রিল ২০১৯

হিন্দুসঙ্গীতের মূলভিত্তি হল তার রাগরাগিণী।

হিন্দুসঙ্গীতের মূলভিত্তি হল তার রাগরাগিণী। ছয়টি মূলরাগ আর তা থেকে উৎপন্ন রাগিণী আর তাদের পুত্রগণক্রমে ১২৬টি শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যেক রাগের আবার অন্ততঃ পাঁচটি করে সুর আছে, যেমন ‘বাদী’ অর্থাৎ রাগরাগিণীতে যে স্বরের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়, তার নাম বাদী। বাদীর সহগামী সুরকে বলে ‘সংবাদী’ আর বাকী সব সুরকে বলে ‘অনুবাদী’ বা অংশ; আর যে রাগে যে সুর সংযোজিত হলে রাগভ্রষ্ট হয়, তাকে বলে ‘বিবাদী’। রাগের বাদী সুর হচ্ছে রাজা, সংবাদী সুর প্রধানমন্ত্রী, অনুবাদী সুর ভৃত্য আর বিবাদী সুর বৈরী অর্থাৎ শত্রুর মত। প্রাচীন ঋষিরা মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে শব্দের ঐক্যসূত্র আবিস্কার করেছিলেন।

ভারতীয় সঙ্গীতে সুরসপ্তক বাইশটি ‘শ্রুতি’ তে বিভক্ত। শ্রুতি হচ্ছে স্বরগত শ্রবণেন্দ্রিয়গ্রাহ্য সূক্ষ্মবিভাগ মাত্র। পাশ্চত্য সঙ্গীতের স্বরগ্রামের মাত্র বারটি শ্রুতির সাহায্যে এ রকম সূক্ষ্ম বিস্তার দুস্প্রাপ্য। আবার হিন্দু পুরাণের এই সপ্তসুরের প্রত্যেক সুরের একটি করে বর্ণ আছে; যেমন



সা- হরিৎবর্ণ – ময়ূরের কেকাধ্বনি,

রে- রক্তবর্ণ- ভরতপক্ষী,

গা- স্বর্ণবর্ণ – ছাগ,

মা- হরিদ্রাভ- শ্বেতবর্ণ, সারস পক্ষী

পা- কৃষ্ণবর্ণ- বুলবুল পাখী

ধা- হরিদ্রাবর্ণ – অশ্বের হ্রেষারব

নি- সকল বর্ণের সমন্বয়- হস্তীর বৃংহিত ধ্বনি ।

( যোগী কথামৃত... পরমহংস যোগানন্দ )
Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৮

দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয়জন হলেন দেবী তারা



কিছু কিছু জনের মতে তারাপীঠকে শক্তিপীঠ ধরা হয় । দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয়জন হলেন দেবী তারা । ভগবতী সতী মায়ের তিনটি নয়নের মণি বিন্দু বত্রিশ যোজন অন্তর ত্রিকোনাকারে তিনটি স্থানে পতিত হয়েছিলো । মিথিলার পূর্ব- দক্ষিণ কোণে ভাগীরথীর উত্তরদিকে ত্রিমুখী নদীর পূর্বে সতী দেবীর বাম নয়নের মণি পতিত হয়েছিলো । সেজন্য এই স্থানের নাম “নীল সরস্বতী তারাপীঠ” । বগুড়া জেলায় করতোয়া নদীর পশ্চিমে সতীর দক্ষিণ নয়নের মণি পতিত হয়েছিলো এইস্থান কে বলা হয় “মহাদেবী ভবানী তারাপীঠ” । বক্রেশ্বরের ঈশান কোনে উত্তর বাহিনী দ্বারকা নদীর পূর্ব তীরে মহা শ্মশানে শ্বেত শিমূল বৃক্ষ তলে দেবী সতীর ঊর্ধ্ব নয়ন তারা পতিত হয় । এই স্থানকে “শিলাময়ী দেবী চণ্ডী ভগবতী উগ্র তারা” বলা হয় । ব্রহ্মার মানসপুত্র মহর্ষি বশিষ্ঠ বহু যুগ ধরে নীলাচলে তারাদেবীর সাধনা করে সিদ্ধিলাভে ব্যর্থ হয়েছিলেন । এরপর পিতা ব্রহ্মার আদেশে বশিষ্ঠ মুনি কামাখ্যা শক্তিপীঠে গিয়ে তারা উপাসনায় ব্রতী হয়ে সেখানেও নিস্ফল হলেন। তখন ক্রোধে বশিষ্ঠ মুনি তারাবীজকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে দেবী দৈববাণী করে জানালেন- “তুমি আমার সাধনার আচার পদ্ধতি জানো না, তাই ব্যর্থ হয়েছো। তুমি মহাচীনে বিষ্ণু অবতার বুদ্ধের নিকট যাও। তিনি তোমাকে আমার সাধনার পথ বলে দেবেন।”




বশিষ্ঠ মুনি এরপর ভগবান বুদ্ধের কাছে সাধনার আচার পদ্ধতি শিখলেন । ভগবান বুদ্ধ তাঁকে বক্রেশ্বরের ঈশাণ কোনে বৈদ্যনাথ ধামের পূর্ব দিকে দ্বারকা নদীর পূর্ব তীরে শ্বেত শিমূল বৃক্ষ তলে সাধনার আদেশ দিলেন । এই সাথে বলে দিলে সেখানেই তোমার আরাধিতা দেবী শিলাময়ী রূপে আছেন। ভগবান বুদ্ধের নির্দেশ মেনে মহামুনি বশিষ্ঠ সেই স্থানে এসে তারা সাধনা শুরু করলেন । কোজাগোরী লক্ষ্মী পূজার পূর্ব দিন অর্থাৎ শুক্লা চতুর্দশী তে মুনি তাঁর আরাধ্য তারা দেবীর দর্শন পেলেন । বশিষ্ঠ মুনির সাধনার সেই পঞ্চমুণ্ডি আসনে পরবর্তী কালে নাটোরের রাজা রামকৃষ্ণ, আনন্দনাথ , পণ্ডিত মোক্ষদানন্দ , সাধক বামাক্ষ্যাপা এই আসনে বসে সিদ্ধ হয়েছিলেন ।
Share:

ভগবান শিবকে দূত করে প্রেরণ করার জন্য দেবীর একটি রূপের নাম শিবদূতী

অসুরদিগকে সুপথে ফেরাবার জন্য দেবী একবার ভগবান শিবকে দূত করে অসুরদের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। ভগবান শিবকে দূত করে প্রেরণ করার জন্য দেবীর একটি রূপের নাম শিবদূতী, ইঁনিই অপরাজিতা। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লিখিত আছে-

ততো দেবীশরীরাত্তু বিনিস্কান্তাতিভীষণা ।
চণ্ডিকাশক্তিরত্যুগ্রা শিবাশতনিনাদিনী ।।
সা চাহ ধূম্রজটিলমীশানমপরাজিতা ।
দূতত্বং গচ্ছ ভগবন্‌ পার্শ্বং শুম্ভনিশুম্ভয়োঃ ।।
ব্রুহি শুম্ভং নিশুম্ভঞ্চ দানবাবতির্বিতৌ ।
যে চান্যে দানবাস্ত্রত্র যুদ্ধায় সমুপস্থিতাঃ ।।
ত্রৈলোক্যমিন্দ্রো লভতাং দেবাঃ সন্তু হবির্ভুজঃ ।
যুয়ং প্রয়াত পাতালং যদি জীবিতমিচ্ছথ ।।
বলাবলেপাদথ চেদ্‌ ভবোন্ত যুদ্ধকাঙ্ক্ষিণঃ ।
তদাগচ্ছত তৃপ্যন্তু মচ্ছিবাঃ পিশিতেন বঃ ।।
যতো নিযুক্ত দৌত্যেন তয়া দেব্যা শিবঃ স্বয়ম্‌ ।
শিবদূতীতি লোকেহস্মিস্ততঃ সা খ্যাতিমাগতা ।।
( শ্রীশ্রীচণ্ডী... অষ্টম অধ্যায়... শ্লোক- ২৩-২৮ )



অর্থাৎ- অনন্তর দেবীর শরীর থেকে অতিভীষণা, অত্যুগ্রা , অসংখ্য শৃগালের ন্যায় শব্দকারিনী চণ্ডিকাশক্তি আবির্ভূতা হইলেন। এবং সেই অপরাজিতা দেবী ধূম্রবর্ণজটাধারী মহাদেবকে বলিলেন- ভগবন্‌ , আপনি শুম্ভ ও নিশুম্ভকে এবং অনান্য যে সকল দানব তথায় যুদ্ধের ইচ্ছায় সমবেত হইয়াছে তাহাদিগকে বলুন- পুনরায় ইন্দ্র ত্রৈলোক্যের অধিপতি হউনএবং দেবতাবৃন্দ যজ্ঞের আহুতি ভোগ করুন। যদি তোমরা বাঁচিতে ইচ্ছা কর তবে পাতালে প্রবেশ কর। আর যদি বলগর্বহেতু তোমরা যুদ্ধের অভিলাষী হও তাহলে এসো, আমার শৃগালীরা তোমাদের মাংস আহার করে পরিতৃপ্ত হোক । সাক্ষাৎ শিবকে দেবী দৌতকার্য্যে নিযুক্ত করেছিলেন বলে এই জগতে তিনি শিবদূতী নামে প্রসিদ্ধা হলেন।

কিন্তু অসুরেরা দেবীর এই প্রস্তাব মেনে নেয় নি। তারা যুদ্ধেই এসেছে। শিবদূতীদেবীর যুদ্ধ কৌশলও চণ্ডীতে উল্লেখিত। দেবীকে অসংখ্য শৃগালের ন্যায় শব্দকারিনী বলা হয়েছে। চণ্ডীতে লিখিত হয়েছে-

চণ্ডাট্টহাসৈরসুরাঃ শিবদূত্যাভিদূষিতাঃ ।
পেতুঃ পৃথিব্যাং পতিতাংস্তাংশ্চখাদাথ সা তদা ।।
( শ্রীশ্রীচণ্ডী... অষ্টম অধ্যায়... শ্লোক- ৩৮ )

অর্থাৎ- শিবদূতীর উৎকট অট্টহাস্যে মূর্ছিত হইয়া অসুরেরা ধরাশায়ী হইতে লাগিল। আর তিনি পতিত অসুরদের ভক্ষণ করতে লাগলেন।

শিবদূতীস্বরূপেণ হতদৈত্যমহাবলে ।
ঘোররূপে মহারাবে নারায়ণি নমোহস্তু তে ।।
Share:

চামুণ্ডাদেবীর আবির্ভাব

চামুণ্ডা দেবী প্রকট হয়েছিলেন দেবী কৌষিকীর ললাট দেশ থেকে। চণ্ড ও মুণ্ড নামক অসুরদ্বয় কে নিহত করবার জন্যই চামুণ্ডাদেবীর আবির্ভাব। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লেখা আছে-

ততঃ কোপঞ্চকারোচ্চৈরম্‌বিকা তানরীন্‌ প্রতি ।
কোপেন চাস্যা বদনং মসীবর্নমভূৎ তদা ।।
ভ্রকুটিকুটিলাৎ তস্যা ললাটফলকাদ্‌দ্রুতম্‌ ।
কালী করালবদনা বিনিস্ক্রান্তসিপাশিনী ।।
বিচিত্রখট্বাঙ্গধরা নরমালাবিভূষণা ।
দ্বীপিচর্মপরীধানা শুস্কমাংসাতিভৈরবা ।।
অতিবিস্তারবদনা জিহ্বাললনভীষণা ।
নিমগ্নারক্তনয়না নাদাপূরিতদিঙ্‌মুখা ।।
( শ্রীশ্রীচণ্ডী... সপ্তম অধ্যায়... শ্লোক- ৫- ৮ )



অর্থাৎ- তখন অম্বিকা সেই শত্রুগণের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধা হইলেন এবং ভীষণ ক্রোধে তাঁহার মুখমণ্ডল কৃষ্ণবর্ণ হইল। তখন দেবীর ভ্রূকুটি কুটিল ললাটদেশ হতে শীঘ্র খড়্গধরা ও পাশহস্তা ভীষনবদনা কালী বিনিঃসৃতা হইলেন। অম্বিকার ললাটোদ্ভুতা সেই চামুণ্ডা দেবী বিচিত্র নরকঙ্কালধারিণী, নৃমুণ্ডমালিনী, ব্যাঘ্র- চর্ম পরিহিতা , অস্থিচর্মমাত্রদেহা , অতিভীষণা, বিশাল- বদনা, লোলজিহ্বায় ভয়প্রদা,কোটরগত আরক্ত চক্ষুবিশিষ্টা এবং বিকট শব্দে চারপাশ পূর্ণকারিণী।

দেবী অসুরসেনাদের মধ্যে প্রবেশ করে অসুরদের বধ ও ভক্ষণ করতে লাগলেন। এমনকি অশ্ব- সারথি- সহিত অসুরদের রথ শুদ্ধ মুখে নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেললেন। অসুরদের কাওকে কেশ এবং গ্রীবা ধরে বধ করলেন। কতেক অসুর দেবীর চরণে দলিত হল। এমনকি অসুরেরা যে সকল অস্ত্র নিক্ষেপ করলো- দেবী সেই অস্ত্রগুলিও চিবিয়ে ভক্ষণ করলেন। কোনো অসুরকে দেবী খড়্গ দিয়ে বধ, কাহাকে খট্বাঙ্গের প্রহারে হত কাওকে চর্বণ করে বধ করলেন। দেবীর ভীম বিক্রমে দানবিক আঘাত ক্রমশ শক্তিহীন হলে চণ্ডমুণ্ডের সাথে দেবী কালীর যুদ্ধ আরম্ভ হল। দেবী কালী ‘হুং’ শব্দ করে চণ্ডের কেশ ধরে খড়্গ দিয়ে শিরোচ্ছেদ করলেন। মুণ্ড এরপর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে দেবী খড়্গ দিয়ে তারও শিরোচ্ছেদ করলেন। রক্তারক্তি মাখা দেবীর সমগ্র শরীর, খড়্গও রক্তে রাঙা। সেই অবস্থায় দেবী চামুণ্ডা হাতে চণ্ড- মুণ্ডের শির নিয়ে দেবী কৌশিকীকে উপহার দিলেন। দেবী কৌশিকী প্রীতা হয়ে বললেন-

যস্মাচ্চণ্ডচ্চ মুণ্ডচ্চ গৃহীত্বা ত্বমুপাগতা।
চামুণ্ডেতি ততো লোকে খ্যাতা দেবি ভবিষ্যসি ।
( শ্রীশ্রীচণ্ডী... সপ্তম অধ্যায়... শ্লোক- ২৭ )

অর্থাৎ- দেবি, তুমি চণ্ড ও মুণ্ডের মস্তকদ্বয় আমার নিকট আনিয়াছ বলিয়া ধরিত্রীতে তুমি চামুণ্ডা নামে বিখ্যাত হইবে।

এই দেবী রক্তবীজের রক্ত পান করেছিলেন। কোনো কোনো চণ্ডীর ব্যাখাকার এই চামুণ্ডাদেবীকেই তন্ত্রের দেবী কালিকা বলে উল্লেখ করেছেন।

দংষ্ট্রাকরালবদনে শিরোমালাবিভূষণে ।
চামুণ্ডে মুণ্ডমথনে নারায়ণি নমোহস্তু তে ।।

এই হল সংক্ষিপ্ত অষ্টমাতৃকার কথা। এছাড়াও তিনটি শক্তির নাম আছে। এঁনারা হলেন কুবের দেবের শক্তি কৌবেরী, বরুণের শক্তি বারুনী আর যমের শক্তি যামিনী।

Sumon Basak

Share:

দেবী দুর্গার সাথে মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী, সিদ্ধিদাতা শ্রীগনেশ ও দেবসেনাপতি কার্ত্তিক কেন থাকেন ?

 ছোটোবেলায় আমাদের গল্প শোনানো হতো- দেবী দুর্গা বা পার্বতীর , দুই মেয়ে দুই ছেলে। দেবী পার্বতীর সন্তান রূপে পুরাণে কার্ত্তিক ও গণেশের কথা থাকলেও, কোনো পুরাণেই আমরা দেবীর কন্যাসন্তান রূপে লক্ষ্মী, সরস্বতীর উল্লেখ পাই না । শ্রীশ্রীচণ্ডীতে আমরা মহিষমর্দিনী দেবীর সাথে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক, গণেশের উল্লেখ পাই না। তবে এঁনারা কেন থাকেন ? দেবী দুর্গা সর্ব দেবতার তেজপুঞ্জীভূতা মহাশক্তি। অসুর ধ্বংসের জন্য দেবতার তেজ একত্রিত হয়েই দেবীর আগমন ঘটেছিলো ( দেবীর সৃষ্টি বলা সমীচীন না। কারন সেই ভগবতীর জন্ম – মৃত্যু বলে কিছু নেই। বিশেষ বিশেষ সময়ে যেখন সৃষ্টির তিন স্তম্ভ ব্রহ্মা- বিষ্ণু- মহেশ অপারগ হন- তখনই ভগবতীর আবির্ভাব ঘটে। দেবীর আগমনের উদ্দেশ্য সর্বহিত ও দানব নাশ ) । সিদ্ধিদাতা শ্রীগনেশ শ্রম শক্তি অর্থাৎ শূদ্র শক্তির প্রতীক।



 শূদ্র যেমন তাহার অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা সমাজ কে সকল সেবা প্রদান করেন। লক্ষ্মী দেবী বৈশ্যশক্তির প্রতীক অর্থাৎ বণিক শ্রেনী যেমন ব্যাবসা বাণিজ্যের দ্বারা সমাজের আর্থিক ভিত মজবুত করেন। মা লক্ষ্মীকে ঐশ্বর্য ও ধন সম্পদের দেবী বলে। কুমার কার্ত্তিক ক্ষত্রিয়শক্তির প্রতীক। কুমার কার্ত্তিক দেবতাদের সেনাপতি। তারকাসুর সহ অসুর ধ্বংস করে শান্তি স্থাপন তাঁহার উদ্দেশ্য ছিলো। তিঁনি যুদ্ধ বিগ্রহ করেন এমন কি তাঁর বাহন ময়ূর অল্প নিদ্রিত ও সর্প কূল কে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে যুদ্ধে নিপুন এক সেনার মতো পরিচয় দেয় । ক্ষত্রিয় গণ যুদ্ধ করে শত্রু নাশ করে সমাজ কে সুরক্ষিত করেন । রাজা হলেন ক্ষত্রিয়- তিনি শত্রু নাশ করে প্রজাদের সন্তানবৎ পালন করেন । মা সরস্বতী বিদ্যার দেবী। তিঁনি ব্রহ্মণ্য শক্তির প্রতীক। ব্রাহ্মণ বেদ জ্ঞান প্রসার করে সকলের অজ্ঞানতা দূর করে সমাজকে বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেন । ব্রাহ্মণ শাস্ত্র জ্ঞান প্রদান করে অন্ধকার দূর করেন , তাই সর্বশুক্লা দেবী সরস্বতী ব্রাহ্মণশক্তির প্রতীক। মা দুর্গার কাঠমোয় তাই দেখা যায় শূদ্রশক্তি, বৈশ্যশক্তি , ক্ষত্রিয়শক্তি ও ব্রহ্মণ্যশক্তি এক সাথে বর্তমান- আর মধ্যে অসুরদলনী মা দুর্গা অসুর নিধন মূর্তিতে আবির্ভূতা । চতুর্বর্ণ একত্র হলেই মা মহাশক্তির আবির্ভাব ঘটে- আর স্থাপিত হয় বৈদিক সমাজ । হি স্বয়ং ঋষিকন্যা পরমাত্মার সহিত নিজ অভেদ জ্ঞান করে “দেবীসুক্তে” বলেছেন –


অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসুনাং
চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্ ।
তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা
ভুরিস্তাত্রাং ভূর্য্যাবেশয়ন্তীম্ ।।

( অর্থাৎ- আমি রাষ্ট্রী, রাষ্ট্রের অধীশ্বরী । রাজ্যরক্ষার্থ যে সম্পদের প্রয়োজন আমি তাহার বিধানকর্তা । সংসারের শান্তিলাভের জন্য যে ব্রহ্মজ্ঞান প্রয়োজন, আমি তাহাই জানি। আমি এক হইয়াও বহুরূপা । সর্ব জীবে আমি বহু রূপে প্রবিষ্ট হইয়া আছি । দৈবী সম্পৎশালী দেবতাগণ যাহা সাধন করেন সকলই আমার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয় । )

এটাই আদর্শ বৈদিক সনাতন ধর্মীয় রাষ্ট্রের মূর্তি।
Share:

লক্ষ্মীদেবীর বাহনটি পেঁচা

লক্ষ্মীদেবীর বাহনটি পেঁচা। লক্ষ্মী এমন সুন্দরী, আর বাহনটি এমন কদাকার। পেঁচা দিবান্ধ। ধনশালী হইলেই লোক প্রায়শঃ অন্ধ হইয়া যায়। ধনী হইবার পূর্বে ভাবে- ধন হইলে সকলের উপকার করিব। আত্মীয় স্বজনদের আর দুঃখকষ্টে থাকিতে দিব না। কিন্তু ধন পাওয়া মাত্র সে পেঁচক হইইয়া যায়।

লক্ষ্মীমান হইয়াও চক্ষুষ্মান এমন মানুষ কি নাই? আছে। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচক তাঁহাদের প্রতি ভালকথা বলে- “ভাই অন্ধ হও। মিথ্যার পথে ধন আসিবে, চুরির পথে ধন আসিবে, ঘুষের পথে ধন আসিবে, এই সব বিষয়ে অন্ধ হইয়া যাও। যাহারা এই সব কুৎসিত পথে ধনশালী হইয়াছে তাহাদের দিকে তাকাইও না।”


পেঁচক বলে, “আমি যমের দূত । কুপথে যদি ধন অন্বেষণ কর, তবে যমের দণ্ড মাথায় পড়িবে। আমার প্রভু যমের চিন্তা কর। মৃত্যুর কথা ভাব। কিছুই সঙ্গে যাইবে না। সুতরাং হীন পথে ধন আনিও না, পবিত্র পথে ধন আয় কর। পবিত্র কার্য্যে ব্যয় কর।” যাহার মুক্তি পথের সাধক, পেঁচক তাহাদিগকে গীতার বাণী স্মরণ করাইয়া দেয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিয়াছেন-

যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্ত্তি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ ।।

যোগী আর ভোগী জীবের কথা বলিতেছেন । ভোগীর পক্ষে যা রাত্রি, যোগীর পক্ষে তা দিন। ভোগীর যা দিন, যোগীর তা রাত্রি। ভোগী আধ্যাত্মিক বহুবিষয়ে ঘুমন্ত, বিষয়সম্ভোগে সজাগ। কিন্তু সংযতেন্দ্রিয় যোগী আত্মিক বিষয়ে সজাগ, বিষয়ে ভোগে উদাসীন অচেতন তুল্য।

পেঁচক মুক্তিকামী সাধককে বলে, “সকলে যখন ঘুমায় তুমি আমার মত জাগিয়া থাক। আর সকলে যখন জাগ্রত তখন তুমি আমার মত ঘুমাইতে শিখ, তবেই সাধনে সিদ্ধি। কৈবল্যধন লাভ।”

পরমার্থধনাভিলাষী সাধক পেঁচার মত রাত্রি জাগিয়া সাধন করে। লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্জনে থাকে। লক্ষ্মীমার বাহনরূপে আসন লইয়া পেঁচকের যে ভাষণ তাহা বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন প্রকার সাধকের উপাদেয় সম্পদ ।

( মা দুর্গার কাঠামো... ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী )


Sumon Basak
Share:

মা লক্ষ্মীর আবির্ভাব কি ভাবে হয়েছিলো ?

 বহু পূর্বের কথা। এক সময় দুর্বাসা মুনি একটি পুস্পমাল্য দেবরাজ ইন্দ্রকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজা ইন্দ্রদেব তুচ্ছ জ্ঞান করে সেই পুস্পমাল্য দিলেন ঐরাবতকে । ঐরাবত সেই পুস্পমাল্যের কদর বুঝতে না পেরে পায়ে পিষ্ট করে ফেলল। ইন্দ্রদেবতা আর তার বাহনের এই রূপ আস্ফালন দম্ভ দেখে দুর্বাসা মুনি ক্রোধে ইন্দ্রকে শ্রীভ্রষ্ট হবার শাপ দিলেন। লক্ষ্মী দেবীকে হারিয়ে দেবতারা খুব দুঃখে কষ্টে পড়ে ত্রিদেবের আদেশে ক্ষীর সমুদ্র মন্থন করার পরামর্শ দিলেন। এই মন্থনের অন্য উদ্দেশ্য ছিলো অমৃত প্রাপ্তি। মন্দার পর্বতকে মন্থন দণ্ড বানিয়ে ভগবান নারায়ন কূর্ম অবতার নিয়ে পৃষ্ঠে নিলেন, বাসুকী নাগ হলেন রজ্জু। ত্রিদেবের আদেশে দেবতা ও অসুরেরা মিলে মন্থন আরম্ভ করলেন । ক্ষীর সমুদ্র মন্থন আরম্ভ হতেই একে একে উঠে আসতে লাগলো বারুনী, সুন্দরী অপ্সরা সকল, ৩ রকমের অদ্ভুদ দিব্য ক্ষমতা সম্পন্ন প্রানী, কামধেনু সুরভি, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব , মণি মুক্তা, কৌস্তভ মণি। কিন্তু মন্থন দণ্ড তে ঘুরতে ঘুরতে যখন বাসুকী নাগ বিষবমি আরম্ভ করলো তখন মন্থন স্তব্ধ হল। বিষের প্রভাবে দেবতাকূল এমনকি অসুরকূল যারা বাসুকী নাগের মস্তকের দিকে ছিলো তারা ত বটেই, সমস্ত দিকে বিষাক্ত আবহাওয়াতে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠলো। এরপর ভগবান শিব সেই “হলাহল” নামক বিষ পান করে হলেন “নীলকণ্ঠ”।


পারিজাত নামক বৃক্ষ উঠে এলো। শার্ঙ্গ ধনুক, চন্দ্র দেবতা উঠে এলেন । শঙ্খ, জ্যেষ্ঠা , বরুণ দেবের ছাতা, দেবমাতা অদিতির কুণ্ডল, কল্পতরুবৃক্ষ, নিদ্রা উঠে এলো। অন্তিমে এলেন মা লক্ষ্মী দেবী। ঐশ্বর্য ও “শ্রী”, ধন সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা লক্ষ্মী উঠে এলেন। এরপর এলেন ধন্বন্তরি দেব, হস্তে অমৃত কলস নিয়ে। এসব পৌরাণিক আখ্যান। মানুষের মনেই দেবতা ও অসুর দুই পক্ষই থাকে। এই দুই পক্ষের মধ্যেই অবিরত টানাহ্যাঁচড়া চলে। দেবতার পাল্লা যখন প্রবল হয় তখন দেবী লক্ষ্মীর মতো সদাচারশীলা দেবী, হস্তির ন্যায় শান্ত ধীর বিচক্ষনতা, অশ্বের ন্যায় জড়তা ভাব নষ্টকারী ইত্যাদি দেখা যায়। অসুরের পাল্লা ভারী হলে নিদ্রা, অলসতা , মদিরা ইত্যাদি প্রভাব দেখা যায়। দেবী লক্ষ্মীর এক নাম “সাগরনন্দিনী”- কারণ মা লক্ষ্মী সমুদ্রে প্রবেশ করেছিলেন সাগর রাজার কন্যারূপে। সাগররাজ রত্নাকর দেবীর পিতা রূপে ভগবান বিষ্ণুর সাথে কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। মা হলেন সাগরকন্যা, তাই ত সাগর থেকে জাত কড়ি, শঙ্খ মা লক্ষ্মীর এত প্রিয়। মা লক্ষ্মীর বাহন রূপে পেঁচক কোন পুরাণে আছে থাকলে জানাবেন। মা লক্ষ্মী পদ্মালয়া। পেঁচক বাহন কি ভাবে হলেন জানাবেন।


Sumon Basak

Share:

০২ জুলাই ২০১৮

ব্রহ্মার অভিমান ভঙ্গ

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বাংশ প্রকাশ, পুরুষাবতার গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে শ্বেতবরাহ কল্পে চতুর্মুখ ব্রহ্মার জন্ম এবং ইনিই প্রতি কল্পে ব্রহ্মান্ডের প্রথম জীব ।
ভগবান ব্রহ্মার মধ্যে সৃস্টিশক্তি সঞ্চার ও সৃস্টি করবার জন্য রজোগুন দিয়েছেন , যার মধ্যে রয়েছে, সংকল্প - আগ্রহ - প্রচেষ্টা ।
এই জন্য ব্রহ্মা রজোগুনাবতার ।
ব্রহ্মা ভগবান প্রদত্ত চৌদ্দ ভূবনে সমস্ত জীবদেরকে যার যার বিগত কর্মফল অনুযায়ী পুনরায় সৃস্টি করলেন । 


চতুর্মুখ ব্রহ্মা স্থাবর ,জঙ্ঘম, ভুচর, খেচর, জলচর, ও উভয়চর প্রানী-প্রজাতি করলেন যেমন,
নয় লক্ষ রকমের জলজপ্রানী,
কুড়ি লক্ষ রকমের গাছপালা,
এগারো লক্ষ রকমের কীট-পতঙ্গ,
দশ লক্ষ রকমের পাখী,
ত্রিশ লক্ষ রকমের পশু, ও
চার লক্ষ রকমের মানুষ প্রজাতি সৃস্টি করলেন ।
একদিন ব্রহ্মা অহংকার বশতঃ মনে করলেন, 'আমিই সবকিছু করেছি । আমিই সমগ্র মহাবিশ্বের সৃস্টিকর্তা ,আমিই ব্রম্মান্ডের মালিক । শ্রীমদ্ভাগবতে বর্নিত আছে দ্বারকাতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মাজীকে আহ্বান করলেন । ব্রহ্মা এসে পৌছালে প্রধান ফটকের দ্বারপালগন জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কোন ব্রহ্মা । ব্রহ্মা বিস্মিত হয়ে বললেন, আমি চতুর্মুখ ব্রহ্মা ।
তারপর সভাকক্ষে প্রবেশ করে দেখলেন বহু বহু ব্রম্মান্ডসমূহ থেকে আগত অসংখ্য ব্রহ্মা সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ কে প্রনতি নিবেদন করছে । আমাদের ব্রম্মান্ডের চতুর্মুখ ব্রহ্মা নিজকে সবচেয়ে ছোট বলে অনুভব করলেন । ভগবান সকল ব্রহ্মাদের কে ডেকে কুশল বিনিময় করে একে একে সকলকে বিদায় দিলেন । তখন চতুর্মুখ ব্রহ্মার বিষন্ন বদন দর্শন করে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, হে ব্রহ্মা । বলুন আপনার কি অভিপ্রায় ?
ব্রহ্মা বললেন, আমি বড় অভিমানী, আমি মনে করেছি আমি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তি । সেই মোহ আমার দুর হয়েছে , আমার চেয়েও অসংখ্য কোটি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি রয়েছেন , তা আমি বুঝতে পারলাম । আমার এই চৌদ্দভূবন ব্রম্মান্ড ছাড়াও অনন্তকোটি ব্রম্মান্ড রয়েছে ।
এবার আমার সেই বুদ্বি জন্মেছে । হে ভগবান আমি বুঝেছি আমিই সবচেয়ে ছোট , আমার চিন্তাধারা অতি তুচ্ছ । আপনি আমার সমস্ত অভিমান, ও অহংকার দুর করুন , আপনার চরনে স্থান দিন এবং আমাকে শুদ্ধভক্তি প্রধান করুন ।।হরেকৃষ্ণ।।


Collected: Bharoti Rani Das
Share:

২১ ডিসেম্বর ২০১৭

দেবী সরস্বতী, নিত্য তিনি বিদ্যাদেবী কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস কি?

দেবনাগরী:- সরস্বতী
লিপ্যন্তর:- সনাতনী জ্ঞানমঞ্জুরী
অন্তর্ভুক্তি:- ত্রিদেবী, জ্ঞানদেবী, সংগীতাজ্ঞ ও শিল্পকলা
আসন:- শ্বেত পদ্মাসন
আবাস:- ব্রহ্মলোক
মন্ত্র:- ॐ শ্রী সরস্বত্যৈ নমঃ
সঙ্গী:- ব্রহ্মা জ্ঞানীরুপে
বাহন:- ময়ূর, হংস
পিতৃতর্পণ:- শুক্লামাঘী তিথি শুক্লাপঞ্চমী(বসন্ত পঞ্চমী)
সমাপন:- তশীতলষষ্ঠী

সরস্বতীর পূজার প্রচলন তথ্য:-

সরস্বতী হলেন জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার হিন্দু দেবী। তিনি সরস্বতী-লক্ষ্মী-পার্বতী, এই ত্রিদেবীর অন্যতম। এই ত্রিদেবীর কাজ হল ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবকে যথাক্রমে জগৎ, সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংস করতে সাহায্য করা। সরস্বতীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগবেদে। বৈদিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত তিনি হিন্দুধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবী। হিন্দুরা বসন্তপঞ্চমী (মাঘ মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথি) তিথিতে সরস্বতী পূজা করে। এই দিন ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের হাতেখড়ি হয়। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীরাও সরস্বতীর পূজা করেন। জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে ভারতের বাইরে জাপান, ভিয়েতনাম, বালি (ইন্দোনেশিয়া), নেপাল, বাংলাদেশ, গ্রেটব্রিটেন, সাইপ্রাস, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা ও মায়ানমারেও সরস্বতী পূজার প্রচলন আছে।

সরস্বতীর মূর্তি কল্পনা তথ্য:-

ধ্যানমন্ত্রে বর্ণিত মূর্তিকল্পটিতে দেবী সরস্বতীকে শ্বেতবর্ণা, শ্বেত পদ্মে আসীনা, মুক্তার হারে ভুষিতা, পদ্মলোচনা ও বীণা পুস্তক ধারিণী এক দিব্য নারী মূর্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাই ধ্যান মন্ত্রে বলা হয়েছে:-

ওঁ তরুণশ কলমিন্দো র্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ কুচভরন মিতাঙ্গী সন্নিষণ্ণা সিতাব্জে।
নিজকর কমলোদ্যল্লেখনী পুস্তকশ্রীঃ সকল বিভবসিদ্ধৈ পাতু বাগ্দেবতা নঃ।।

অনুবাদ:- “চন্দ্রের নূতন কলাধারিণী, শুভ্রকান্তি, কুচভরনমিতাঙ্গী, শ্বেত পদ্মাসনে (উত্তমরূপে) আসীনা, হস্তে ধৃত লেখনী ও পুস্তকের দ্বারা শোভমানা বাগ্‌দেবী সকল বিভবপ্রাপ্তির জন্য আমাদিগকে রক্ষা করুন।”

আবার পদ্মপুরাণে উল্লিখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে:-

শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।
শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা।।
শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।
শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা।।

অনুবাদ:- “দেবী সরস্বতী আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা।

সরস্বতী মূর্তির প্রকাশ:-

ধ্যান বা স্তোত্রবন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভূজা অথবা চতুর্ভূজা এবং মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভূজা সরস্বতী পূজিত হন। ইনি অক্ষমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদ পুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভূজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা হাতে বীণাধারিণী রুপে পূজিত হন।

শ্রী শ্রী সরস্বতী পুষ্পাঞ্জলী মন্ত্রঃ

ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।
বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ।।
এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ।।

প্রনাম মন্ত্রঃ

নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমোহস্তুতে।।
জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে। বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।

সরস্বতীর স্তবঃ

শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষ্পোপশোভিতা। শ্বেতাম্ভরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা।। শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা। শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারব‌ভূষিতা বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্ব্বৈর্চ্চিতা দেবদানবৈঃ। পূঝিতা মুনিভি: সর্ব্বৈঋষিভিঃ স্তূয়তে সদা।। স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্। যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়ং সর্ব্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে।।

সনাতনী পুরাণে সরস্বতীর প্রকাশ:-

ব্রহ্মা তাঁর কন্যা সরস্বতীর প্রতি দুর্ব্যবহার করলে শিব তাঁকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন। সেই থেকে শিবের নির্দেশে গায়ত্রী ও সরস্বতীর তপস্যাস্থলে দুটি প্রসিদ্ধ তীর্থ সৃষ্টি হয়। জগতে সকল দেবতা তীর্থ আছে, শুধু ব্রহ্মার তীর্থ নেই – একথা ভেবে ব্রহ্মা পৃথিবীতে নিজের তীর্থ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তিনি একটি সর্বরত্নময়ী শিলা পৃথিবীতে নিক্ষেপ করলেন। সেটি চমৎকারপুরে এসে পড়ল। ব্রহ্মা সেখানেই নিজের তীর্থ স্থাপন করবেন বলে ভাবলেন। ব্রহ্মার নির্দেশে সরস্বতী পাতাল থেকে উঠে এলেন। ব্রহ্মা তাঁকে বললেন, “তুমি এখানে আমার কাছে সব সময় থাকো। আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা তর্পণ করব।” সরস্বতী ভয় পেয়ে বললেন, “আমি লোকের স্পর্শ ভয় পাই বলে সব সময় পাতালে থাকি। কিন্তু আপনার আদেশ আমি অমান্যও করতে পারি না। আপনি সব দিক বিচার করে একটি ব্যবস্থা করুন।” তখন ব্রহ্মা সরস্বতীর অবস্থানের জন্য একটি হ্রদ খনন করলেন। সরস্বতী সেই হ্রদে অবস্থান করতে লাগলেন। ব্রহ্মা ভয়ংকর সাপেদের সেই হ্রদ ও সরস্বতীর রক্ষক নিযুক্ত করলেন।
(তথ্যসূত্র:- স্কন্ধপুরাণ)

"শুক্ল যজুর্রবেদ" অনুসারে, একসময় ইন্দ্রের শরীরের শক্তি চলে যাওয়ার ফলে তিনি মেষ আকৃতি গ্রহণ করেন। সেসময় ইন্দ্রের চিকিৎসার দায়িত্ব ছিল স্বর্গের অশ্বিনীদ্বয়ের উপর এবং সেবা-শুশ্রুষার ভার ছিল সরস্বতীর হাতে। সংগীত ও নৃত্যপ্রেমী ইন্দ্র সরস্বতীর গানবাজনা ও সেবায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে মেষটি দান করেন।
(তথ্যসূত্র:- শুক্ল যজুর্রবেদ)

বাল্মীকি রামায়ণে সরস্বতীর প্রকাশ:-

রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহবল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মত প্রকাশিত হয়েছিলেন। (তথ্যসূত্র:- বাল্মীকি রামায়ণ)

সরস+বতী=সরস্বতী অর্থ জ্যোতিময়ী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেকবার ইড়া, ভারতী, সরস্বতীকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীতী জন্মে যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি। ব্রহ্মা যখন সৃষ্টিকার্য শুরু করেন তখন জ্ঞান সংকটে সৃষ্টিকার্যের ব্যাঘাত ঘটে। তখনই ব্রহ্মা বিষ্ণুর স্মরণাপন্ন হয়, পালনকারী বিষ্ণু সমাধানের পথ না পেয়ে শিবকে স্তব করে। অতঃপর শিব বৈকুণ্ঠে উপস্থিত হয় এবং সৃষ্টিকারী ব্রহ্মাকে বলেন, গায়ত্রী কন্যা (ব্রহ্মা ও ব্রহ্মাপত্নী গায়ত্রী কন্যা) সরস্বতীই আপনার জ্ঞানধারী হবে। তখন ব্রহ্মাদেব সরস্বতীকে প্রকট করলেন। এরপরে বিষ্ণু সরস্বতীকে ময়ূর প্রদান করলেন এবং শিব শ্বেতপদ্ম ও বীণা প্রদান করে, তখন ব্রহ্মা সরস্বতীকে শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষণা করে। পরক্ষণে সরস্বতী ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবকে বললেন, হে ত্রিদেব আপনারা আমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন "আমি কৃতার্ত" মার্জনা করবেন কিন্তু আমার অস্তিত্ব কি? তখন ব্রহ্মা দেবী সরস্বতীকে সর্বদেবসত্তা, বিষ্ণু সর্বজ্ঞানী, শিব সর্বপূজিত বরে ধন্য করেন। এই ত্রিদেবের বরে সরস্বতী এক বিরাট জোতির্ময় রুপ ধারণ করে, যা সূর্যের ন্যায় আলোকময়; সেইক্ষণ থেকে দেবী সরস্বতী সূর্যাগ্নি নামে খ্যাত। আজ সমগ্র বিশ্বে যে বেদ, পুরাণ, উপনিষদ, বিদ্যা, সংগীত, ও শিল্পকলার প্রকাশ তা দেবী সরস্বতীর কৃপান্নিত জ্ঞানালোকে।

সর্বসাকুল্যে দেবী সরস্বতী সৃষ্টির আদি থেকে আজ আধুনিককাল পর্যন্ত পূজিত হয়ে আসছেন, সনাতনী সমাজ তথা হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী দেবী সরস্বতী শান্তির প্রতীক ও জ্ঞানের ভাণ্ডার। বিভিন্ন পুরাণ ও বেদ সম্বন্ধে হিন্দুরা অবগত নাহলেও, সৃষ্টির এই প্রাচীন দেবী পরিপূর্ণ ভাবে আজ সনাতনী সমাজে পরিলক্ষিত একজন। এই দেবী সবাইকে বিদ্যা বুদ্ধি প্রদান করুক এই কামনায় করি।

(c) Mishon Mojumder
Share:

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

নারদের জীবন চরিত

নারদ হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে- ব্রহ্মার মানসপুত্র। ইনি ত্রিকালজ্ঞ, বেদজ্ঞ ও তপস্বী। নারদ শব্দের অর্থ জল। ইনি সবসময় তর্পণের জন্য জলদান করতেন বলে এঁর নাম হয় নারদ।

ভগবত মতে- ইনি জনৈক ব্রাহ্মণের এক দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি তাঁর মায়ের আদেশে সবসময় যোগীদের সেবা করতেন এবং এই যোগীদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে ধর্মপরায়ণ হয়ে উঠেন। এই সময় সাপের কামড়ে তাঁর মায়ের মৃত্যু ঘটে। এরপর ইনি তপস্যার জন্য বনে যান। ইনি মাত্র একবার ঈশ্বরের দর্শন লাভ করতে সক্ষম হন। ঈশ্বরকে পাবার জন্য আকুল চেষ্টা করেও ঈশ্বরকে ইনি দ্বিতীয় বার দর্শন করতে পারলেন না। এরপর ইনি বিভিন্ন সাধুদের সেবা করে তাঁর বুদ্ধিকে দৃঢ় করেন এবং ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থেকেই পৃথিবী ভ্রমণ করতে থাকেন। এই ভ্রমণের মধ্য দিয়েই ইনি ঈশ্বরে লীন হয়ে যান।


এরপর কল্প শেষে বিষ্ণু যখন সমুদ্রের জলে শায়িত ছিলেন, তখন তাঁর নিঃশ্বাস যোগে নারদ বিষ্ণুর অন্তরে প্রবেশ করেন। বিষ্ণু তাঁর নিদ্রা ত্যাগ করে যখন সৃষ্টির ইচ্ছা করেন তখন তাঁর ইন্দ্রিয় থেকে ব্রহ্মার উৎপত্তি হয় এবং ব্রহ্মার মন থেকে নারদ আবির্ভূত হন। ইনি সেই থেকে দেবদত্ত বীণায় হরি গান করে সর্বত্র ভ্রমণ করতে থাকেন।


ব্রহ্মাবৈবর্ত পুরাণের মতে- এঁর জন্ম হয়ে ছিল ব্রহ্মার কণ্ঠ থেকে। প্রথমে ব্রহ্মা তাঁকে সৃষ্টির ভার দেন। সৃষ্টির কাজে ব্যস্ত থাকলে ঈশ্বর চিন্তা বিঘ্নিত হবে বিবেচনা করে ইনি ব্রহ্মার আদেশ মানতে রাজী হলেন না। ফলে ব্রহ্মা তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, নারদকে গন্ধমাদন পর্বতে গন্ধর্বযোনিতে জন্মগ্রহণ করতে হবে। যথা সময়ে ইনি গন্ধর্বযোনিতে জন্মগ্রহণ করেন। এই সময় তাঁর নাম ছিল উপবর্হণ। এই জন্মে ইনি চিত্ররথের ৫০টি কন্যাকে বিবাহ করেন। এর পরে ইনি এক আসরে রম্ভার নাচ দেখে উত্তেজিত হলে, তাঁর বীর্যপাত হয়। এতে ব্রহ্মা আরও ক্রুদ্ধ হয়ে- তাঁকে মানুষ হয়ে জন্মানোর অভিশাপ দেন। ব্রহ্মার এই অভিশাপে কলাবতী নামক এক নারীর গর্ভে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণরা নারদকে ব্রহ্মার পুত্র জেনে তাঁকে বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত করেন। এরপর তিনি বিষ্ণুর ধ্যান করতে করতে ব্রহ্মে লীন হয়ে যান।


কয়েক কল্প পরে ব্রহ্মা পুনরায় সৃষ্টি আরম্ভ করলে আবার ইনি জন্মগ্রহণ করেন। এইবার ইনি বীণা যোগে সঙ্গীত পরিবেশন করে সকলকে মোহিত করা শুরু করেন। পুরাণ মতে- নারদ সর্বদাই নানা রাগ-রাগিণী যুক্ত সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। কিন্তু সবসময় তাঁর সঙ্গীতে কিছু না কিছু ত্রুটি থেকে যেতো। কিন্তু নারদ এই ত্রুটি নিজে বুঝতে পারতেন না, সেই কারণে নারদ তাঁর নিজের গান নিয়ে খুব গর্ব করতেন। নারদের এই গর্বকে খর্ব করার জন্য একবার রাগ-রাগিণীরা বিকলাঙ্গ নর-নারীর রূপ গ্রহণ করে নারদের যাত্রা পথে উপস্থিত হলেন। নারদ এই বিষয় অবগত ছিলেন না বলে- ইনি উক্ত বিকলাঙ্গ নারী-পুরুষরূপী রাগ-রাগিণীকে তাঁদেরকে বিকলাঙ্গের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।

 তখন তাঁরা বললেন যে, তাঁরা নারদের বিকৃত সঙ্গীতের রূপ। নারদ এই কথা শুনে ব্যাকুল হয়ে, তাঁদেরকে প্রকৃষ্টরূপে সঙ্গীত পরিবেশনের উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। উত্তরে তাঁরা বললেন যে, মহাদেবের গান শুনলে তাঁদের বিকলাঙ্গতা দূর হবে। এরপর নারদ মহাদেবের কাছে সঙ্গীত শোনার আবেদন জানালে- মহাদেব জানালেন যে, প্রকৃষ্ট শ্রোতা ছাড়া তিনি গান শোনাবেন না। পরে নারদ মহাদেবের পরামর্শ অনুসারে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু-কে অনুরোধ করে আসরে নিয়ে আসেন। মহাদেবের গান শোনার পর রাগ-রাগিণীদের বিকলাঙ্গতা দূর হয়। এই সঙ্গীতের মর্ম ব্রহ্মা বুঝতে পারলেন না। কিন্তু বিষ্ণু কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে ইনি আংশিক দ্রবীভূত হন। 

বিষ্ণুর এই দ্রবীভূত অংশ ব্রহ্মা তাঁর কমণ্ডলুতে ধারণ করেন। বিষ্ণুর এই দ্রবীভূত অংশই গঙ্গা নামে খ্যাত হয়। নারদের সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ লক্ষ্য করে, বিষ্ণু উলুকেশ্বর নামক এক গন্ধর্বের কাছে তাঁকে সঙ্গীত শিক্ষার জন্য পাঠান।

তাঁকে বিভিন্নস্থানে বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা যায়। ইনি কৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্ত পূর্বেই কংসকে জানিয়েছিলেন, ধ্রুবের তপস্যায় মন্ত্রদাতা ছিলেন, মহাদেব-পার্বতীর বিবাহের ঘটক ছিলেন, দক্ষের অহঙ্কার নাশে ইনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। রাময়ণের মূল কাহিনী তিনি বাল্মীকিকে শুনিয়েছিলেন। পরে এই কাহিনী অবলম্বনে বাল্মীকি রামায়ণ রচনা করেছিলেন। এছাড়া ইনি দূত হিসাবেও বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ইনি কথা গোপন করে রাখতে পারতেন না। কখনো কখনো অবিবেচকের মতো কথা বলে, বিপর্যয় ডেকে আনতেন। কংসের কাছে কৃষ্ণের কাছে জন্মগ্রহণ এবং কৃষ্ণকর্তৃক কংসবধের কথা বলেছিলেন। বিন্ধ্যপর্বতের কাছে সুমেরুর গুণকীর্তন করে, পৃথিবী বিপর্যস্ত করেন। পরে এই বিপর্যয় থেকে অগস্ত্য মুনি পৃথিবী রক্ষা করেন।

(C) Sk Basak
Share:

০২ ডিসেম্বর ২০১৭

শনি সম্পর্কে দু'একটি কথা

৯-এ নবগ্রহ। আর নবগ্রহের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত গ্রহটি হল শনি ওরফে শনৈশ্চর। ‘শনির দৃষ্টি’বা ‘শনির দশা’ কথাটা রাজ্যের যত অশুভ ও অমঙ্গলের সমার্থক শব্দ; এমনই শনির কুখ্যাতি! যাঁর দৃষ্টিতে গণেশের মতো জাঁদরেল দেবতার মুন্ডু উড়ে যেতে পারে, তাঁর কাছে মানুষ তো কোন ছাড়! আর তাই স্বর্গপাড়ার এই মস্তান-দেবতাটিকে তুষ্ট করতে ভারতের পথে-ঘাটে-ফুটপাথে কিংবা প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে মন্দিরে প্রতি শনিবার বসে বারোয়ারি শনিপুজোর আসর; গ্রহবিপ্রেরা এই ‘মারণ’ দৃষ্টির কোপ থেকে মানুষকে বাঁচাতে দেন হরেক রকমের গ্রহশান্তির বিধান।
কিন্তু এই ভয়ংকর দেবতাটি সম্পর্কে আমরা জানি কতটুকুই বা?

আসুন পুরাণের তালপাতার পুথি খুলে জেনে নিই আমাদের অতিপরিচিত শনিদেবকে ---
শনি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা যতই ভয়ভীতিমিশ্রিত হোক না কেন, মৎস্য পুরাণ কিন্তু শনিকে লোকহিতকর গ্রহের তালিকাতেই ফেলেছে। মৎস্য ও সৌর পুরাণের মতে, শনি বিবস্বান (সূর্য) ও ছায়ার পুত্র। আবার অগ্নি পুরাণের মতে, বিবস্বানের পত্নীর সংজ্ঞার গর্ভে শনির জন্ম। এদিকে মার্কণ্ডেয়, বায়ু, ব্রহ্মাণ্ড, বিষ্ণু ও কূর্ম পুরাণ মতে, শনি বা শনৈশ্চর অষ্টরুদ্রের প্রথম রুদ্রের পুত্র। তাঁর মায়ের নাম সুবর্চলা।

স্কন্দ পুরাণের আবন্ত্য খণ্ডে আছে, শনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন শিপ্রা ও ক্ষাতা নদীর সংযোগস্থলে। উক্ত পুরাণেই শনির জন্ম নিয়ে একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনির অবতারণা করা হয়েছে: শনি জন্মগ্রহণ করেই ত্রিলোক আক্রমণ করে বসলেন এবং রোহিণীর পথ ভেদ করলেন। সারা ব্রহ্মাণ্ড শঙ্কিত হয়ে উঠল। ইন্দ্র প্রতিকার চাইতে ছুটলেন ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা সূর্যের কাছে গিয়ে শনিকে সংযত করতে বললেন। কিন্তু ততক্ষণে শনির দৃষ্টিপাতে সূর্যেরই পা-দুটি পুড়ে গিয়েছে। তিনি কিছুই করতে পারলেন না। তিনি ব্রহ্মাকেই উলটে শনিকে সংযত করার অনুরোধ করলেন। ব্রহ্মা গেলেন বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণুও নিজে কিছু করতে পারবেন না ভেবে ব্রহ্মাকে নিয়ে চললেন শিবের কাছে। শিব শনিকে ডেকে পাঠালেন। শনি বাধ্য ছেলের মতো মাথাটি নিচু করে এলেন শিবের কাছে। শিব শনিকে অত্যাচার করতে বারণ করলেন। তখন শনি শিবকে তাঁর জন্য খাদ্য, পানীয় ও বাসস্থানের নির্দেশ করতে বললেন।

তখন শিবই ঠিক করে দিলেন—শনি মেষ ইত্যাদি রাশিতে তিরিশ মাস করে থেকে মানুষের পিছনে লাগবেন এবং এই করেই তাঁর হাড় জুড়াবে। অষ্টম, চতুর্থ, দ্বিতীয়, দ্বাদশ ও জন্মরাশিতে অবস্থান হলে তিনি সর্বদাই বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন হবেন। কিন্তু তৃতীয়, ষষ্ঠ বা একাদশ স্থানে এলে তিনি মানুষের ভাল করবেন এবং তখন মানুষও তাঁকে পূজা করবে। পঞ্চম বা নবম স্থানে এলে তিনি উদাসীন থাকবেন। এও ঠিক হল, অন্যান্য গ্রহদের তুলনায় তিনি বেশি পূজা ও শ্রেষ্ঠতম স্থান পাবেন। পৃথিবীতে স্থির গতির জন্য তাঁর নাম হবে স্থাবর। আর রাশিতে মন্দ গতির জন্য তাঁর নাম হবে শনৈশ্চর। তাঁর গায়ের রং হবে হাতি বা মহাদেবের গলার রঙের মতো। তাঁর চোখ থাকবে নিচের দিকে। সন্তুষ্ট হলে তিনি লোককে দেবেন রাজ্য, অসন্তুষ্ট হলে লোকের প্রাণ নেবেন। শনির দৃষ্টি যার দিকেই পড়বে, তিনি দেবতাই হোন, বা দৈত্য, মানব, উপদেবতাই হোন, পুড়ে মরতে হবেই হবে। এই কথা বলে শিব শনিকে মহাকালবনে বাস করতে বললেন।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের গণেশের জন্মকাহিনির সঙ্গে শনির যোগের কথা অনেকেই জানেন। তবু সেটার উল্লেখ না করলে এই রচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উক্ত পুরাণ মতে, শনি আদৌ কুদৃষ্টি নিয়ে জন্মাননি; বরং স্ত্রীর অভিশাপই তাঁর কুদৃষ্টির কারণ। একদিন শনি ধ্যান করছিলেন, এমন সময় তাঁর স্ত্রী সুন্দর বেশভূষা করে এসে তাঁর কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করলেন। ধ্যানমগ্ন শনি কিন্তু স্ত্রীর দিকে ফিরেও চাইলেন না। অতৃপ্তকাম শনিপত্নী তখন শনিকে অভিশাপ দিলেন, “আমার দিকে ফিরেও চাইলে না তুমি! যাও, অভিশাপ দিলুম, এরপর থেকে যার দিকেই চাইবে, সে-ই ভষ্ম হয়ে যাবে।” এরপর ঘটনাচক্রে গণেশের জন্ম হল। সকল দেবদেবীর সঙ্গে শনিও গেলেন গণেশকে দেখতে। কিন্তু স্ত্রীর অভিশাপের কথা স্মরণ করে তিনি গণেশের মুখের দিকে তাকালেন না। পার্বতী শনির এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে শনি অভিশাপের বৃত্তান্ত খুলে বলেন। কিন্তু পার্বতী সেকথা বিশ্বাস করলেন না। তিনি শনিকে পীড়াপীড়ি করতে শুরু করলেন। বারংবার অনুরোধের পর শনি শুধু আড়চোখে একবার গণেশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাতেই গণেশের মুণ্ড দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাজা দশরথের সঙ্গে শনির সাক্ষাৎকারের একটি বর্ণনা আছে। কৃত্তিবাস এই কাহিনিটি আহরণ করেছেন স্কন্দ পুরাণের নাগর ও প্রভাস খণ্ড থেকে—তবে একটু অন্যভাবে। উক্ত পুরাণের মতে, অযোধ্যার জ্যোতিষীগণ দশরথকে সাবধান করে বলেছিলেন, শনিগ্রহ শীঘ্রই রোহিণী ভেদ করবেন। আর তার ফলে বারো বছর ধরে রাজ্যে ভীষণ অনাবৃষ্টি হবে।

 এই কথা শুনে ইন্দ্রের দেওয়া দিব্য রথে চড়ে দশরথ তৎক্ষণাৎ শনির পিছন ছুটলেন। সূর্য ও চন্দ্রের পথ অতিক্রম করে একেবারে নক্ষত্রমণ্ডলে গিয়ে শনির সামনে উপস্থিত হয়ে রাজা বললেন, “তুমি রোহিণীর পথ পরিত্যাগ কর। না করলে, আমি তোমাকে বধ করব।” শনি দশরথের এই রকম সাহস দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি রাজার পরিচয় জানতে চাইলে দশরথ আত্মপরিচয় দিলেন। শুনে শনি বললেন, “আমি তোমার সাহস দেখে অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। আমি যার দিকে তাকাই, সেই ভষ্ম হয়ে যায়। তবু তুমি প্রজাহিতের জন্য নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে আমার কাছে এসেছো, এতে আমি আরও বেশি খুশি হয়েছি। যাও, আমি কথা দিলাম, রোহিণীর পথ আমি আর কোনোদিনও ভেদ করব না।” কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে, অনাবৃষ্টি শুরু হওয়ার পর দশরথ শনির কাছে গিয়েছিলেন।

এবার চলে যাই দেশান্তরের পুরাণে। আমরা হিন্দুরা যে গ্রহটিকে শনি নামে চিহ্নিত করেছি, পাশ্চাত্য জগতে সেই গ্রহটির নাম স্যাটার্ন (Saturn)। রোমান দেবতা। তবে রোমান পুরাণের অন্যান্য দেবতাদের মতো ইনিও গ্রিক পুরাণ থেকে আমদানিকৃত। গ্রিক পুরাণে স্যাটার্নের নাম ক্রোনাস। স্যাটার্নের নাম অনুসারে স্যাটারডে, যেমন শনির নামে শনিবার। এছাড়া শনি ও ক্রোনাস/স্যাটার্নের মধ্যে মিল অল্পই। কালিকা পুরাণে শনির ধ্যানমন্ত্রে আছে --
ইন্দ্রনীলনিভঃ শূলী বরদো গৃধ্রবাহনঃ।
পাশবাণাসনধরো ধ্যাতব্যোঽর্কসুতঃ।।

অর্থাৎ, “নীলকান্তমণির মতো গাত্রবর্ণবিশিষ্ট; শূল, বরমুদ্রা, পাশ ও ধনুর্বাণধারী; শকুনিবাহন সূর্যপুত্র শনিকে ধ্যান করি।” মহানির্বাণ তন্ত্রে আরও এক ধাপ উঠে বলা হয়েছে, শনি হলেন কানা ও খোঁড়া। বলাবাহুল্য, এই চেহারার সঙ্গে ক্রোনাস/স্যাটার্নের চেহারার মিল আদৌ নেই। তাঁর হাতে থাকে কাস্তে। গ্রিক পুরাণে ক্রোনাস হলেন দেবরাজ জিউসের পিতা। তিনি ব্রহ্মাণ্ডপিতা ইউরেনাসের পুত্র। পিতাকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করে তিনি ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর হন। অত্যন্ত ক্ষমতালোভী ছিলেন। তাঁর ছেলেরা যাতে তাঁকে অনুসরণ করে সিংহাসনের দখল না নিতে পারে, সেজন্য তিনি নিজের ছেলেমেয়েদেরই ভক্ষণ করতেন। শেষে পুত্র জিউসের হাতে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয় এবং তিনি কৃষিকর্মের দেবতা হয়ে থেকে যান। রোমান স্যাটার্নও কৃষিকাজ, মুক্তি ও সময়ের দেবতা। সেই হিসেবেও দেখা যায়, শনির মতো লোকপীড়নকারী চরিত্র এঁদের নয়।

শেষ পাতে, জ্যোতিষ থেকে চলে আসি জ্যোতির্বিজ্ঞানে। হিন্দুপুরাণের শনি যতই কুৎসিত এবং ক্ল্যাসিক্যাল পুরাণের স্যাটার্ন যতই নৃশংস হোন না কেন, আমাদের সৌরজগতের ষষ্ঠ গ্রহটি কিন্তু রূপে গুণে অসামান্য। তার কারণ, অবশ্যই এই গ্রহকে ঘিরে থাকা চাকতিগুলি; জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা বলি ‘শনির বলয়’। তুষারকণা, খুচরো পাথর আর ধূলিকণায় সৃষ্ট মোট নয়টি পূর্ণ ও তিনটি অর্ধবলয় শনিকে সর্বদা ঘিরে থাকে। শনি দৈত্যাকার গ্রহ; এর গড় ব্যাস পৃথিবীর তুলনায় নয় গুণ বড়ো। এর অভ্যন্তরভাগে আছে লোহা, নিকেল এবং সিলিকন ও অক্সিজেন মিশ্রিত পাথর। তার উপর যথাক্রমে একটি গভীর ধাতব হাইড্রোজেন স্তর, একটি তরল হাইড্রোজেন ও তরল হিলিয়াম স্তর এবং সবশেষে বাইরে একটি গ্যাসীয় স্তরের আস্তরণ। আমাদের শনিদেবের গায়ের রং নীলকান্তমণির মতো (শ্রদ্ধেয় হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে এই রং বিষ্ণুর থেকে ধার করা)।

 শনি গ্রহের রং কিন্তু হালকা হলুদ। এর কারণ শনির বায়ুমণ্ডলের উচ্চবর্তী স্তরে অবস্থিত অ্যামোনিয়া ক্রিস্টাল। শনির ধাতব হাইড্রোজেন স্তরে প্রবাহিত হয় এক ধরনের বিদ্যুত প্রবাহ। এই বিদ্যুৎ প্রবাহ থেকেই শনির গ্রহীয় চৌম্বক ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটেছে। এখনও পর্যন্ত শনির বাষট্টিটি চাঁদ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং তার মধ্যে তিপ্পান্নটির সরকারিভাবে নামকরণ করা হয়েছে। অবশ্য এগুলি ছাড়াও শনির শতাধিক উপচাঁদ বা চন্দ্রাণু (Moonlets) আছে। সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটান শনির বৃহত্তম উপগ্রহ। এটি আকারে মঙ্গলের চেয়েও বড়ো এবং এটিই সৌরজগতের একমাত্র উপগ্রহ যার একটি সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল আছে।

লেখকঃ প্রীথিষ ঘোষ
Share:

০১ ডিসেম্বর ২০১৭

ত্রিনাথ ঠাকুর হলেন একত্রে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের সম্মিলিত রূপ

ত্রিনাথ ঠাকুরের নাম সবাই শুনেছেন । ত্রিদেব বলতে আমরা বুঝি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের তিন স্তম্ভ । যথা প্রজাপতি ব্রহ্মা, ভগবান বিষ্ণু ও ভগবান মহেশ্বর । আর ত্রিনাথ ঠাকুর হলেন একত্রে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের সম্মিলিত রূপ। এক দেহেই তিন জনের বিরাজমান রূপ। এঁনাকে “দত্তাগুরু” বা “ভগবান দত্তাত্রেয়” নামে ডাকা হয়। কিভাবে ত্রিনাথ ঠাকুরের উদ্ভব হল ?

বহু পূর্বের কথা । মহর্ষি অত্রি মুনির পত্নী দেবী অনুসূয়া ছিলেন পরম সাধ্বী সতী নারী। তাঁর পাতিব্রতের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলো। পরম সাধ্বী সতী অনুসূয়া ভারতীয় নারীজাতির ও ভারতীয় সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। কোনো এক সময়ের কথা- তাঁর সতীত্বের পরীক্ষা নিতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর আসেন । দেবী অনুসুয়া সতীত্ব বলে এই তিন সৃষ্টির স্তম্ভকে সদ্যজাত শিশুতে পরিণত করে মাতৃত্ব প্রদান করেন । অপরদিকে শিশু রূপে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর মাতা অনুসুয়ার বাৎসল্যে আনন্দেই ছিলেন। কিন্তু সৃষ্টির তিন স্তম্ভ এভাবে শিশু রূপে থাকার দরুন সৃষ্টিকাজ ব্যহত হতে থাকে ।

দেবী সরস্বতী, দেবী লক্ষ্মী ও দেবী পার্বতী বিচলিত হন । নারদ মুনির কাছে সব ঘটনা জানতে চাইলে দেবর্ষি ব্যক্ত করেন । এরপর তিন দেবী, অনুসুয়া দেবীর আশ্রমে এসে নিজ স্বামীদের এই রকম শিশু অবস্থা দেখে আশ্চর্য ও হতচকিত হলেন। দেবী অনুসূয়ার সতীত্বের প্রশংসা করে স্বামীদের ভিক্ষা চান । তখন দেবী অনুসুয়ার কৃপায় ত্রিদেব নিজেদের পূর্বাবস্থা প্রাপ্তি করলেন। কিন্তু মায়ের মন কিভাবে সন্তান দের বিদায় দেবেন। কিছুকালের জন্য হলেও ত্রিদেবের জননী হয়েছিলেন, আর ত্রিদেব হয়েছিলেন সন্তান । তখন ত্রিদেব একত্রে “দত্তাগুরু” বা “ত্রিনাথ” নামে প্রকটিত হলেন। মূলে এঁনাকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার গণ্য করলেও সাথে ভগবান শিব ও প্রজাপতি ব্রহ্মাও যুক্ত হন । পূর্ববঙ্গে এঁনার পূজা প্রচলিত । গরুর নতুন বাছুর জন্ম নিলে ক্ষীরের নাড়ু দিয়ে ত্রিনাথের পূজা করতে দেখা যায় । ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে মাতা অনুসুয়ার নাম আজোও স্মরণীয় ।
Share:

০৫ অক্টোবর ২০১৭

মা লক্ষ্মীর আবির্ভাব কি ভাবে হয়েছিলো ?

এই ঘটনা জানতে যেতে হবে পৌরাণিক যুগে। বহু পূর্বের কথা। এক সময় দুর্বাসা মুনি একটি পুস্পমাল্য দেবরাজ ইন্দ্রকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজা ইন্দ্রদেব তুচ্ছ জ্ঞান করে সেই পুস্পমাল্য দিলেন ঐরাবতকে । ঐরাবত সেই পুস্পমাল্যের কদর বুঝতে না পেরে পায়ে পিষ্ট করে ফেলল। ইন্দ্রদেবতা আর তার বাহনের এই রূপ আস্ফালন দম্ভ দেখে দুর্বাসা মুনি ক্রোধে ইন্দ্রকে শ্রীভ্রষ্ট হবার শাপ দিলেন। লক্ষ্মী দেবীকে হারিয়ে দেবতারা খুব দুঃখে কষ্টে পড়ে ত্রিদেবের আদেশে ক্ষীর সমুদ্র মন্থন করার পরামর্শ দিলেন। এই মন্থনের অন্য উদ্দেশ্য ছিলো অমৃত প্রাপ্তি। মন্দার পর্বতকে মন্থন দণ্ড বানিয়ে ভগবান নারায়ন কূর্ম অবতার নিয়ে পৃষ্ঠে নিলেন, বাসুকী নাগ হলেন রজ্জু।
ত্রিদেবের আদেশে দেবতা ও অসুরেরা মিলে মন্থন আরম্ভ করলেন । ক্ষীর সমুদ্র মন্থন আরম্ভ হতেই একে একে উঠে আসতে লাগলো বারুনী, সুন্দরী অপ্সরা সকল, ৩ রকমের অদ্ভুদ দিব্য ক্ষমতা সম্পন্ন প্রানী, কামধেনু সুরভি, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব , মণি মুক্তা, কৌস্তভ মণি। কিন্তু মন্থন দণ্ড তে ঘুরতে ঘুরতে যখন বাসুকী নাগ বিষবমি আরম্ভ করলো তখন মন্থন স্তব্ধ হল। বিষের প্রভাবে দেবতাকূল এমনকি অসুরকূল যারা বাসুকী নাগের মস্তকের দিকে ছিলো তারা ত বটেই, সমস্ত দিকে বিষাক্ত আবহাওয়াতে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠলো। এরপর ভগবান শিব সেই “হলাহল” নামক বিষ পান করে হলেন “নীলকণ্ঠ”।
পারিজাত নামক বৃক্ষ উঠে এলো। শার্ঙ্গ ধনুক, চন্দ্র দেবতা উঠে এলেন । শঙ্খ, জ্যেষ্ঠা , বরুণ দেবের ছাতা, দেবমাতা অদিতির কুণ্ডল, কল্পতরুবৃক্ষ, নিদ্রা উঠে এলো। অন্তিমে এলেন মা লক্ষ্মী দেবী। ঐশ্বর্য ও “শ্রী”, ধন সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা লক্ষ্মী উঠে এলেন। এরপর এলেন ধন্বন্তরি দেব, হস্তে অমৃত কলস নিয়ে। এসব পৌরাণিক আখ্যান। মানুষের মনেই দেবতা ও অসুর দুই পক্ষই থাকে। এই দুই পক্ষের মধ্যেই অবিরত টানাহ্যাঁচড়া চলে।
দেবতার পাল্লা যখন প্রবল হয় তখন দেবী লক্ষ্মীর মতো সদাচারশীলা দেবী, হস্তির ন্যায় শান্ত ধীর বিচক্ষনতা, অশ্বের ন্যায় জড়তা ভাব নষ্টকারী ইত্যাদি দেখা যায়। অসুরের পাল্লা ভারী হলে নিদ্রা, অলসতা , মদিরা, বিষ ইত্যাদি প্রভাব দেখা যায়, অবশ্য আশার আলো ভগবানের শরণ নিলে তিনি এই বিষও হরণ করেন । দেবী লক্ষ্মীর এক নাম “সাগরনন্দিনী”- কারণ মা লক্ষ্মী সমুদ্রে প্রবেশ করেছিলেন সাগর রাজার কন্যারূপে। সাগররাজ রত্নাকর দেবীর পিতা রূপে ভগবান বিষ্ণুর সাথে কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। মা হলেন সাগরকন্যা, তাই ত সাগর থেকে জাত কড়ি, শঙ্খ মা লক্ষ্মীর এত প্রিয়।
লাইক দিনঃ www.facebook.com/shonatonsondesh
⚠ ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আরো বেশী মানুষের কাছে পৌছাতে সাহায্য করবেন ।
Share:

গীতা পাঠের সময় গীতায় উল্লেখিত কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্নের অর্থ ও ব্যাখ্যা

গীতা পাঠের সময় আমরা প্রায়ই অর্থ ও ব্যাখ্যার মধ্যে কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্ন দেখতে পাই, কিন্ত আমরা অনেকে এসব সাঙ্কেতিক চিহ্ন না বুঝে এড়িয়ে যায়। বুঝতে চেষ্টা করি না এইসব সাঙ্কেতিক চিহ্ন দ্বারা মূলত কি বুঝানো হয়েছে। তাই গীতায় উল্লেখিত কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্নের অর্থ তুলে ধরলাম।
১) ঋক্ - ঋগ্বেদ;
২) ঈশ - ঈশাবাস্যোপনিষৎ;
৩) কঠ - কঠোপনিষৎ;
৪) কেন - কেনোপনিষৎ;
৫) কৌষী - কৌষীতক্যুপনিষৎ;
৬) ছান্দোঃ - ছান্দোগ্যোপনিষৎ;
৬) তৈত্তি - তৈত্তিরীয় উপনিষৎ;
৭) মু বা মুন্ডক - মিন্ডকোপনিষৎ;
৮) মান্ডু - মান্ডুক্যোপনিষৎ;
৯) মৈত্র্য - মৈত্র্যুপনিষৎ;
১০) শ্বেত - শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ;
১১) ব্রঃ সূঃ বা বেঃ সূত্র - বেদান্ত দর্শন বা ব্রহ্মসূত্র;
১২) প্রশ্ন - প্রশ্নোপনিষৎ;
১৩) বৃঃ বা বৃহ - বৃহদারণ্যকোপনিষৎ;
১৪) সাঃ সূঃ - সাংখ্যসূত্র;
১৫) সাঃ কাঃ - সাংখ্যকারিকা;
১৬) যোঃ সূঃ বা যোগসূত্র - পাতঞ্জল যোগসূত্র;
১৭) যোঃ বাঃ - যোগবাশিষ্ঠ;
১৮) ভঃ রঃ সিঃ - ভক্তিরসামৃতসিন্ধু;
১৯) ভাঃ - শ্রীমদ্ভাগবত ( স্কন্ধ, অধ্যায়, শ্লোক) (ভাঃ ৪।২।১) অর্থাৎ শ্রীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধ দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম শ্লোক।
২০) মভাঃ - মহাভারত (পর্ব প্রথম অক্ষর বা প্রথম দুই অক্ষর পর্বজ্ঞাপক; যথা - শাং = শান্তি পর্ব, বন = বন পর্ব,), অধ্যায়, শ্লোক;
২১) গী, গীঃ বা গীতা - প্রথম সংখ্যা অধ্যায়জ্ঞাপক, পরবর্তী সংখ্যা শ্লোকজ্ঞাপক;
২২) বিঃ পুঃ - বিষ্ণুপুরাণ;
২৩) বৃহঃ নাঃ পুঃ - বৃহন্নারদীয় পুরাণ ;
২৪) চৈঃ চঃ - শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত; খন্ড, অধ্যায়, শ্লোক;
২৫) (।।) - প্রত্যেকটা সংস্কৃত শ্লোকের শেষ লাইনের শেষে দুইটি দাঁড়ি (।।) চিহ্ন দেখা যায়, যার অর্থ কিংবা যা দ্বারা বুঝানো হয় উক্ত লাইনটি দুই বার পাঠ করতে হবে।

লেখকঃ বাপ্পী কুড়ি
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।