• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

আদ্যশক্তি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আদ্যশক্তি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৪ মে ২০২২

চণ্ডী পাঠ করব কেন?

 শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী বলেছেন- তস্মান্মমৈতন্মাহাত্ম্যং পঠিতব্যং সমাহিতৈঃ।

শ্রোতব্যঞ্চ সদা ভক্তা পরং স্বস্ত্যয়নং হি তৎ ।। (১২/৭)

অর্থাৎ ‘অতএব আমার এই মাহাত্ম্য সমাহিতচিত্তে নিত্য ভক্তিপূর্বক পাঠ বা শ্রবণ করা কর্তব্য। কারণ তাহা অতিশয় মঙ্গলজনক’।‘অতিশয় মঙ্গলজনক’--এই চণ্ডীর কথা আলোচনা করলে আমাদের কী লাভ এখন তা দেখা যাক -------

প্রথম লাভ—কল্যাণ ( ঐহিক ও পারত্রিক )।

দ্বিতীয় লাভ—পাপনাশ ও পাপজনিত আপদ নাশ।

তৃতীয় লাভ—দারিদ্রনাশ।

চতুর্থ লাভ—প্রিয়বিয়োগ নাশ।

পঞ্চম লাভ—শত্রু, দস্যু, রাজা, শস্ত্র, অগ্নি ও জলপ্রবাহ থেকে সমস্ত ভয় নাশ।

ষষ্ঠ লাভ—মহামারীজনিত সর্বপ্রকার উপদ্রব ও ত্রিবিধ উৎপাত দমন।

সপ্তম লাভ—দেবীর প্রসন্নতা ও সন্নিধি।

অষ্টম লাভ—নির্ভীকতা।

নবম লাভ—শত্রুক্ষয়।

দশম লাভ—বংশের উন্নতি।

একাদশ লাভ—শান্তিকর্মে সিদ্ধি।

দ্বাদশ লাভ—গ্রহশান্তি।

ত্রয়োদশ লাভ—দুঃস্বপ্ন সুস্বপ্নে পরিণতি।

চতুর্দশ লাভ— ডাকিনী ও পূতনাদি বালগ্রহ দ্বারা আক্রান্ত শিশুগণের শান্তিলাভ ।

পঞ্চদশ লাভ—বৈরভাব দূরীকরণ ও মিত্রতা স্থাপন।

ষোড়শ লাভ—রাক্ষস, ভূত ও পিশাচগণের বিতাড়ন।

সপ্তদশ লাভ—আরোগ্য।

অষ্টাদশ লাভ—শুভ মতি লাভ অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধি হয় ।

ঊনবিংশ লাভ—সমস্ত সঙ্কট হতে মুক্তি।

এতগুলো লাভ আমাদের হবে। এ সকলই দেবীর শ্রীমুখের বাণী। যদি কোন ব্যক্তি ইহলোকের যাবতীয় উন্নতি চায়, তবে তার এই চণ্ডীতত্ত্ব আলোচনা করা কর্তব্য। রোগ, শোক, আপদ, বিপদ প্রভৃতির বিনাশ সাধন সকল জীবেরই কাম্য। আবার ভক্ত ও জ্ঞানী যারা তারা চায় মুক্তি অর্থাৎ জন্মান্তর নিবারণ। গৃহী কিংবা সন্ন্যাসী সকলেরই চণ্ডীতত্ত্ব আলোচনায় লাভ আছে। যদি আমরা বিশ্বাস করে থাকি, অতীন্দ্রিয় বস্তুকে বা ব্রহ্মকে আমাদের ঋষিরা লাভ করেছিলেন, তবে সেই ব্রহ্মকে অনুভূতিতে আনতে হলে ঋষি প্রদর্শিত পথেই যেতে হবে। তবেই চণ্ডীতত্ত্ব আলোচনা করে ফল পাওয়া যাবে।

Written by: Prithish Ghosh

Share:

০৬ এপ্রিল ২০২১

মা যশোরেশ্বরী

সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন এবং তিনি নিরাকার, তিনি সর্বত্রই বিরাজমান এ বিশ্বাস সকল মানুষই পোষণ করে। তিনি করুনাময় জীব-জগতের পালন কর্তা। কিন্তু মানুষের মন অতি চঞ্চল, কল্পনায় অবগাহন করে চোখের নিমিষে কেউ বিশ্বব্রহ্মান্ড ঘুরে আসে, কেউ গাড়ি, বাড়ি, বিত্ত, বৈভব বৃত্তি গড়ে তোলে, আবার কেউ সেই নিরাকারের নির্দিষ্ট রুপ কল্পনার মধ্য দিয়ে গুনসম্পন্ন দেব-মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলে। অন্তরের খাঁটি বিশ্বাস দ্বারা ধর্ম জেগে ওঠে কর্মের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে নিরাকার সৃষ্টিকর্তার আরাধনার লক্ষ্যে তাঁর একটি রূপ বা মুর্তি স্থাপনের মাধ্যমে শ্রদ্ধাভরে পূজো অর্চনা, গুনগান করে সাধনায় সিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাধারণ ভক্তগণ প্রতিমা পূজা করে থাকেন। 


ঈশ্বর, ভগবান বা পরমপিতার শক্তি সর্বত্রই বিরাজমান। অদৃশ্য সেই মহাশক্তিকে নিরাকার ভাবনা, ধ্যান বা যজ্ঞের দ্বারা আয়ত্ব করা সাধারণ ভক্তের জন্য দুসাধ্য ব্যাপার। কেননা সংসারে স্বাত্ত্বিক রাজসিক, তামসিক এই তিন গুণের মানুষ আছেন। বর্তমান সময়ে তামসিক ও রাজসিক মানুষের সংখ্যা বেশি। তাই দেব-দেবীর মুর্তি বা প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে সাধন ভজনে দ্রুততার সাথে নিবিষ্ট হওয়া বা মনোনিবেশ করা সম্ভব। 

তন্ত্রশাস্ত্র বলেছেন ---- ‘ গাভীর দুগ্ধ তাহার রক্ত হইতে সম্ভুত। রক্ত গাভীর সর্বাঙ্গেই বিরাজিত তাই বলিয়া গাভীর যে কোন অঙ্গে হস্তার্পণ করিলেই দুগ্ধ পাওয়া যায় না। একমাত্র স্তন হইতেই উহা ক্ষরিত হয়। সেই শ্রী ভগবানের উপস্থিতি সর্বত্র সকল সময়ে থাকিলেও তাঁহার স্বরূপ উপলদ্ধি প্রতিমাতেই সর্বাঙ্গসুন্দররূপে হইয়া থাকে।’.

প্রাচীন কাল থেকেই সনাতনী হিন্দু সংস্কৃতিতে তন্ত্রশাস্ত্রমত প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। তান্ত্রিক মতে পূজায় প্রতীক বা প্রতিমা থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে পূজার সকল অর্ঘ প্রতিমা বা মুর্তিকে অবলম্বন করে আবর্তমান। আর বৈদিক মতে, অগ্নিকে সকল শক্তি বা দেবতার উৎস বিশ্বাস ধারণ করে অগ্নিতে দেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞাহুতি প্রদান করা হয়। আগুন বা অগ্নিকে পবিত্র বা নির্মল শক্তি হিসেবে গন্য করা হয়। অগ্নিতে সকল মোহ, দ্বেষ, কাম-ক্রোধ বিসর্জ্জন দিলে আত্মশুদ্ধি ঘটে।

শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্রে আট প্রকার বিগ্রহের কথা বলা হয়েছে ----

‘শৈলী দারুময়ী লৌহ লেপ্যা লেখ্যা সৈকতী।

মনোময়ী মনিময়ী প্রতিমাষ্টবিধা স্মৃতা॥’

------- শিলাময়ী, কাষ্ঠময়ী, লৌহ (সুবর্ণাদিময়ী) লেপ্যা, (মৎচন্দনাদিময়ী) লেখ্যা (চিত্রপটময়ী) বালুকাময়ী, মনোময়ী ও মনিময়ী এই আট প্রকার প্রতিমা হইতে পারে।’ 

তাই মানবজীবনকে স্বার্থক করে তুলতে স্ব স্ব আরাধ্য দেবতা, ঈশ্বর, ভগবান, পরমপিতা যে যে নামেই সম্বোধন করুন না কেন সেই নিরাকার অসীমকে একটি রূপকল্পের গন্ডিতে এনে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সাধন-ভজন করলে তাঁকে পাওয়ার উচ্ছাসে জীবন আন্দময় হয়ে ওঠে এবং সেখানেই প্রতিমা পূজা বা যজ্ঞের সার্থকতা। 

ভগবদ্ গীতায় বলা হয়েছে ---- ‘ময়া তশুমিদং সবং জগদব্যক্ত মুর্তিন।’ ----- অর্থাৎ আমি অব্যক্তরূপে জগৎ সংসার ব্যপিয়া আছি। যিনি ব্যক্ত সাকার; তিনিই অবতার, আবার অব্যক্ত অবস্থায় নিরাকার। অর্থাৎ প্রতীক বা প্রতিমা অব্যক্ত নিরাকার ব্রহ্ম বা আরাধ্য দেবতার প্রতিনিধি। 

সনাতনী শাক্ত বিশ্বাস করে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মের শক্তি হলেন ব্রহ্মময়ী কালী। 

আর কয়েকদিন আগেই কার্তিক অমাবস্যায় হল সেই কালীর বৃহৎ পূজা। মনের অন্ধকার দূর করতে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করে সেখানে কালীমুর্তি স্থাপন করা ছিল এই দিনের মুখ্যকর্ম আর সেই কর্মেই ভৌতিক জীবনের সাফল্যতা। 

এই কালীপূজা বাংলায় প্রগৈতিহাসিক কাল থেকেই চলে আসছে। রাজা থেকে প্রজা, ধনী থেকে দরিদ্র, কেউই বাদ নেই, শক্তিমান হতে সবাই আশা করে। তাই দেখি -- বার ভূঁইয়াদের অন্যতম যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে 'যশোরেশ্বরী' কালিকা মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করে এবং শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন। ভারতচন্দ্র রায় গুনকর তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে লিখেছেন ---

'যশোর নগর ধাম .... প্রতাপ আদিত্য নাম

মহারাজা বঙ্গজ কায়স্থ ।

নাহি মানে বাদশায় .... কেহন নাহি আটে তায়

ভয়ে সব ভূপতি দ্বারস্থ ।।

বরপুত্র ভবানীর .... প্রিয়তম পৃথিবীর

বাহান্ন হাজার যার ঢালী ।

ষোড়ষ হলকা হাতি .... অযুত তুরঙ্গ সাথী

যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী ॥

.

এই আদ্যাশক্তি পরমাপ্রকৃতি যদিও তত্ত্বত অসঙ্গা নির্বিকারা ব্রহ্মচৈতন্যস্বরূপা তবুও নিজ শক্তিবলে তিনিই জগৎ রূপে প্রকাশিত হয়েছেন। সেই আদ্যাশক্তি সূক্ষ্মা, স্থূলা, ব্যক্ত ও অব্যক্ত স্বরূপিণী। নিরাকারা হয়েও সাকারা। তিনি কৃপা না করলে কে তাঁকে জানতে পারে?

-----

স্থানটির নাম ঈশ্বরীপুর। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী। এখন এলাকাটি বংশীপুর হিসেবে পরিচিত। সাতক্ষীরা শহর থেকে সাতক্ষীরা-মুন্সীগঞ্জ সড়ক ধরে প্রায় ৫০ কিলোমিটার গেলে শ্যামনগর। এই উপজেলা সদর থেকে সুন্দরবনের দিকে সোজা আরও ৫ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই বংশীপুর বাজার। এর কিছু দূরেই সুন্দরবন। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতি বিজড়িত এই এলাকার অনেক ইমারত এখন হয়েছে পোড়ো বাড়ি। পঞ্চদশ শতকে যে জনপদ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই এলাকা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে, অতীত স্মৃতিতে। অতীতের স্মৃতি হিসেবে যশোরেশ্বরী কালী মন্দির, দুর্গ, নগর প্রাচীরের কিছু অংশ। বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া এক কালের আদি যমুনা নদীর পাশেই এ ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের রাজধানী ঈশ্বরীপুর। 

১৫৭৩ সালে সিংহাসনে বসেন দাউদশাহ। তার দুই বাল্যবন্ধু শ্রী হরিকে “বিক্রমাদিত্য” এবং জানকিকে ‘বসন্তরায়’ উপাধি দিয়ে তিনি তাদের মন্ত্রী পদে নিযুক্ত করেন। বর্তমানে সুন্দরবন ঘেরা এই এলাকার জলদস্যু, মগ, পর্তুগীজদের লুটতরাজ এবং অত্যাচার দমনের জন্য নবাব দাউদ শাহ বিক্রমাদিত্য ও বসন্তরায়কে দায়িত্ব দেন। বসন্তরায় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের বসন্তপুর এসে ঘাঁটি গাড়েন। এ কারণে এখানকার নাম হয় বসন্তপুর। এখনও এই এলাকাটি বসন্তপুর নামে পরিচিত। বিক্রমাদিত্যকে দেয়া হয় অন্য এক এলাকার দায়িত্ব। 

বিক্রমাদিত্যের পুত্র প্রতাপাদিত্য পিতার জীবদ্দশায় একটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। এ সময়ে নবাব দাউদ শাহের সাথে বিরোধ দেখা দেয় সম্রাট আকবরের। সম্রাট আকবর নবাব দাউদ শাহকে শিক্ষা দেয়ার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। তিনি বিরাট এক রণতরী ও সৈন্য বহর নিয়ে যুদ্ধে চলে আসেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ওই নৌবহরের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং সম্রাট আকবর। সম্রাট আকবর ও নবাব দাউদ শাহের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় ‘রাজমহল’ নামক স্থানে। দীর্ঘ যুদ্ধে নবাব দাউদ শাহ পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে গোপনে তার সমুদয় ধনসম্পদ পাঠিযে দেন রাজা প্রতাপাদিত্যের কাছে। এ বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে পরে প্রতাপাদিত্য ঈশ্বরীপুরে তৈরি করেন বিলাশ বহুল রাজধানী। এক স্থানের ‘যশ’ অন্যস্থানে এনে রাজ্য গড়ার কাহিনী লোকমুখে ফিরতে ফিরতে এ এলাকার নাম হয় যশোজুর বা যশোর।

রাজা প্রতাপাদিত্য নিজেকে ‘স্বাধীন রাজা’ হিসেবে ঘোষণা করেন ১৫৯৯ সালে। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে সুবেদার ইসলাম খাঁর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রতাপাদিত্য ঈশ্বরীপুরে নির্মাণ করেন বহু ইমারত ও দুর্গ। বহিশত্রু থেকে রাজ্য রক্ষা করার জন্য তিনি মুকুন্দপুর থেকে কালীগঞ্জ থানা হয়ে আশাশুনি থানা পর্যন্ত ‘গড়’ খনন করেন। ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত ঈশ্বরীপুরের অনেক স্থান এখনও জঙ্গলাকীর্ণ ও পরিত্যক্ত। কিছু দূর গেলে চোখে পড়ে যশোরেশ্বরী কালী মন্দির। অনেকে এই মন্দিরকে যশোরেশ্বরী দেবীর মন্দির বলে থাকে। এ মন্দিরের কিছু দূরেই রয়েছে ভাঙ্গা বাড়ির মতো ছিল জাহাজঘাটা। এই দুদলি নামকরণেরও ইতিহাস রয়েছে। যমুনা নদীর তীরে ছিল যশোর রাজ্যের রাজধানীর নৌবাহিনীর সদর দফতর। রাজা প্রতাপাদিত্যের নৌবাহিনীর প্রধান ‘ফেডারিক ডুডলির’ নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয় দুদলি। এখানকার চিহ্নটি মুছে গেছে। দখল হয়ে গেছে এই ঐতিহাসিক স্থানটি। ইতিহাস বিজড়িত আজকের জঙ্গলাকীর্ণ সুন্দরবন দেখে বিশ্বাস না হলেও এ কথা সত্য যে, এক সময় এখানে ছিল একটি রাজ্যের রাজধানী। ছিল জনবসতি। ছিল রাজা বাদশাহের পদচারণা। ইতিহাস ও ভগ্ন পুরাকীর্তির কিছু চিহ্ন এখন ও অতীত স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। 

(ছবি -- যশোরেশ্বরী কালী)

 (সাতক্ষীরায় বাড়ী অধুনা ঢাকার প্রতিষ্ঠিত এডভোকেট, Arpan Chakraborty -র 

পাঠানো ছবি ও বিবরণ অনুযায়ী Post-টা করলাম)

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

যশোরেশ্বরী ও বারাসাতের আমডাঙা মন্দিরের 'মা করুণাময়য়ী' ঠাকুরানীর ইতিহাস

 ভারতে মুঘল রাজবংন্সের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের উত্তরসুরী রূপে দিল্লীর সিংহাসনে বসলেন হুমায়ুন পুত্র আকবর। তাঁর লক্ষ্য ছিল এক বিশাল শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠন। সম্রাটের এই সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। সম্রাট আকবর এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যুবরাজ সেলিমকে বাংলাদেশ অভিজানে পাঠান। কিন্তু যশোরের জমিদার প্রতাপাদিত্য (বারোভুঁইয়া) মা যশোরেশ্বরীর আশীর্ব্বাদী ফুল অবলম্বন করে মুঘল আক্রমণের মোকাবিলা করেন। সেই যুদ্ধে যুবরাজ সেলিম পরাজিত হলেন। এর পর সম্রাট আকবর অম্বররাজ সেনাপতি মানসিংহকে দ্বিতীয় বারের জন্য বাংলাদেশ আক্রমনে পাঠান। কৌশলী সেনাপতি মানসিংহ তাঁর চর মারফৎ প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানলেন যে, প্রতাপাদিত্যের শক্তি ও পরাক্রমের উৎস হলেন শ্রীশ্রী মাতা যশোরেশ্বরী।

তাই মানসিংহ এক ব্রাহ্মণের সহায়তায় মন্দির থেকে যশোরেশ্বরী মাতার বিগ্রহকে সরিয়ে নিজ শিবিরে নিয়ে আসেন। এই সংবাদে বিষ্ময়ে হতবাক্ হয়ে প্রতাপাদিত্য মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রামানন্দগিরি গোস্বামীকে যৎপরনাস্তি তিরস্কিৃত করলেন। শোকে বিহ্বল পরম ধার্মিক ব্রাহ্মণ দুঃখে উন্মাদ হয়ে যশোর ত্যাগ করেন। অম্বররাজ ঠিক সেই মুহুর্তে মোঘল বাহিনী নিয়ে প্রতাপাদিত্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাঁকে পরাজিত ও বন্দী করে বাংলাদেশ দখল করলেন।

বাংলাদেশ অভিযান সফল হওয়ার পর অম্বররাজ মাতৃ বিগ্রহকে সন্মানের সাথে অম্বর প্রাসাদে অধিষ্ঠান করালেন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে সেই 'যশোরেশ্বরী' মাতৃবিগ্রহ রাজস্থানের অম্বর ফোর্টে আজও অবস্থান করছেন।

অম্বর ফোর্টে মাতৃবিগ্রহ অধিষ্ঠানের পরেই মহারাজ মানসিংহ দেবীর কাছে স্বপ্নাদেশ পান যে - তিনি যেন, দেবীর প্রধান পুরোহিত পরম ভক্ত ব্রাহ্মণ রামানন্দগিরি গোস্বামীকে দিয়ে দেবীর বিকল্প করুণাময়ী মাতৃমূর্ত্তি তৈরী ও প্রতিষ্ঠান করে আসেন। দেবীর আদেশে মানসিংহ বাংলাদেশে এসে রামানন্দগিরির খোঁজ করে যমুণা শাখা সূবর্ণাবতী (বর্তমান নাম সুঁটির খাল -- জবরদখল হয়ে এই নাম হয়েছে) নদীর তীরবর্তী মাতার বর্ত্তমান মন্দিরের নিকট সেই ব্রাহ্মণের দেখা পান এবং যশোরেশ্বরীর বিকল্প করুণাময়ী মাতৃমূর্ত্তি তৈরী ও  প্রতিষ্ঠান করে আসেন। প্রাচীন সেই পুরোহিতের নাম ও নদীর তীরবর্তী স্থান অনুযায়ী ঐ স্থানের নাম হয় ‘রামডাঙ্গা’। পরবর্ত্তী কালে বাংলা ভাষার বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সেটি ‘আমডাঙ্গা’ নামে এবং মন্দিরটি ‘আমডাঙ্গা করুনাময়ী মঠ’ নামে পরিচিত।

এর পর প্রায় দুশো বছর অতিবাহিত করার পর ১৭৫৬ সালে ইংরেজদের উৎখাত করার জন্য সিরাজদ্দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেন তখন নবাবের সেই বাহিনীতে নদীয়াধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও ছিলেন। বর্ত্তমান মন্দিরের নিকট নবাবের শিবির হয়েছিল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেই শিবিরের পাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে মাতৃমূর্ত্তির জীর্ণ দশা দেখতে পান। সেই সময়েই তিনি মাতৃমূর্ত্তির সামনে বসে প্রার্থনা করেন -- যদি মা তার মনোকামনা পূর্ণ করেন, তা হলে তিনি মাতার মন্দিরের তথা পূজার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থাদি গ্রহন করবেন।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলা পরাজিত ও নিহত হবার পর বাংলার সিংহাসনে বসলেন মীরজাফর, তার পর তাকে পরাজিত করে তার জামতা মীরকাশিম সিংহাসনে বসেন। ১৭৬৪ খ্রীষ্টাব্দে নবাব মীরকাশিম কৃষ্ণচন্দ্রকে মুঙ্গেরে বন্দী করে প্রাণদন্ডের আদেশ দেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এই বিপদে আমডাঙ্গা করুনাময়ী মঠের মোহান্ত পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে করুনাময়ী মাতৃদেবীর আরাধনা করে দৈব শক্তির প্রভাবে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে বিপদ-মুক্ত করেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মাতৃদেবীর এই অপার করুণায় খুশী হয়ে আমডাঙ্গা করুনাময়ী মঠ সংস্কারে ব্রতী হন। শোনা যায় তাঁরই প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মঠের বর্ত্তমান দ্বিতল মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। সেই সময় থেকে এই ‘মঠ’ শুধু বাংলাদেশ নয় সারা ভারতেও পরিচিতি লাভ করে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত করুনাময়ীর জাগ্রত রুপ দর্শন করতে আসা শুরু করেন। মা করুনাময়ীর অপার করুণায় ভক্তগণের মনোবাঞ্ছা পূ্রণ সহ বিবিধ রোগ, জ্বালা নিবারণেরর এক মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয় এই ‘মঠ’।

মঠের প্রথম সেবাইত রামানন্দগিরির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে পরবর্ত্তী কালের মোহান্তগণ মঠকে  ধর্মীয় তথা আধ্যাত্মিক দিক থেকে এক উজ্জ্বল অবস্থায় আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে গিরি অধ্যায়ের শেষ মোহান্ত রতন গিরি মোহান্ত পদে উত্তরাধিকার নিয়ে কলকাতা উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেন। উচ্চ আদালতের সম্মতি অনুযায়ী মহামান্য হাওড়া জেলা জজ করুনাময়ী মঠের পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ তথা প্রশাসক রুপে দায়িত্ব পান। মঠ পরিচালন সংক্রান্ত বিষয়ে পরিচালন কমিটির প্রথম সম্পাদক হন প্রকাশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় মহাশয়। ইতিপূর্বে করুনাময়ী মঠ তারকেশ্বর মন্ডলীর অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল। মোহান্ত পদে গিরি অধ্যায়ের সমাপ্তির পর আশ্রম অধ্যায়ের সূচনা হয়। আমডাঙ্গা মঠের আশ্রম পর্বের প্রথম মোহান্ত হয়ে আসেন দন্ডীস্বামী অচ্যুৎ আশ্রম। পরবর্তী কালে একে একে মোহান্ত পদে অভিষিক্ত হন দন্ডীস্বামী নৃ্সিংহ আশ্রম ও দন্ডীস্বামী বিশ্বেশ্বর আশ্রম, তাঁর আমলে মঠের পূজা ভোগ ও বলিদান সংক্রান্ত বিষয়ে মঠ কমিটির সহিত তাঁর মতবিরোধ চরমে ওঠে। এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৬২ সনে মঠে এক ধর্মীয় বিচার সভা আহূত হয়। এই ধর্মীয় বিচার সভায় কোন সুষ্ঠ নিষ্পত্তি না হওয়ায় অভিমানে দন্ডীস্বামী বিশ্বেশ্বর আশ্রম মঠ পরিত্যাগ করে কাশীবাসী হন। তৎপরবর্ত্তি কালে এক টানা প্রায় ২০ বৎসর মঠ পরিচালন ব্যবস্থা কমিটির নিয়ন্ত্রণে থাকে। মঠ পরিচালন সমিতির দ্বিতীয় সম্পাদক নিযুক্ত হন শ্রীযুক্ত সুধাংশু বন্দোপাধ্যায় মহাশয়। তাঁর আমলে মঠের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে এলাকার জনসাধারণ মহামান্য হাওড়া জেলা জজের দৃষ্টি আকর্ষন করলে তিনি তদন্ত করে কমিটি বাতিল করে দেন।

১৯৮৩ সালের মে মাসে মহামান্য হাওড়া জেলা জজ নূতন পরিচালন সমিতি গঠন করেন এবং এই নবগঠিত পরিচালক সমিতির সম্পাদক রূপে মাননীয় শ্রীযুক্ত শঙ্কর ঘোষ মহাশয়কে মনোনীত করেন। ইতিমধ্যে ১৯৮৪ সালে দীর্ঘ ২২ বছর বাদে মঠে মোহান্ত রুপে তারকেশ্বর মন্ডলীর প্রতিনিধি হয়ে আসেন দন্ডীস্বামী শিবাশ্রম মহারাজ। তাঁর সভাপতিত্বে এবং শ্রীযুক্ত শঙ্কর ঘোষ মহাশয়ের সহৃদতায় মঠে এক স্বর্গীয় অনুভূতি বিরাজ করতে থাকে।

বর্ত্তমান মন্দির সংলগ্ন মায়ের উল্লিখিত ফাঁকা জমিতে মায়ের বাৎসরিক উৎসব উপলক্ষে ২৫ শে ও ২৬ শে ডিসেম্বর বৃহৎ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মঠের বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘রত্নবেদী’। ভারতের মধ্যে একমাত্র শ্রীক্ষেত্র ছাড়া আর কোন তীর্থক্ষেত্রে এই রত্নবেদী নেই। রত্নবেদীর মহাত্ম হল ১০৮ টি নারায়ণ শীলার উপর প্রতিষ্ঠিত এই আসন। শোনা যায় এই রত্নবেদীর আকর্ষনেই মহাসাধক রামপ্রসাদ ও পরমহংস ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণের আগমন ঘটেছিল এই মঠে। 

মঠের দ্বিতীয় দ্রষ্টব্য স্থান হল ‘পঞ্চমুন্ডী আসন’। তন্ত্র সাধকেরা এই আসনে বসে তন্ত্র সাধন করেন। উল্লেখ্য, ব্রহ্মপরায়ন উপাধিকারী সেবাইত নারায়ণ গিরি এই আসনে বসেই সাধনার দ্বারা দৈববলে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে রক্ষা করেন।

মঠের তৃতীয় দ্রষ্টব্য স্থান হল ‘মনসা বেদী (বাস্তুতলা)’। নিষ্ঠাভরে এই বেদীতে দুধ কলা সহযোগে পূজা দিলে সর্পদংশন ভয় দূ্র হয়। এছারা ব্রজমোহন মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের প্রেমময় যুগল মূর্ত্তি মন্দিরের আকর্ষণ বৃদ্ধি করছে। সর্বোপরি শ্রীশ্রী করুনাময়ী মাতা ঠাকুরাণীর কষ্ঠিপাথরের নির্মিত মূর্ত্তিটি মাতার নামকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল করে রেখেছে। মাতার সম্মুখের চন্দন কাঠের সূক্ষ কারুকার্য্য শোভিত দরজাটিও দীর্ঘ ৪৫০ বছরের ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আজও অক্ষত অবস্থায় বর্ত্তমান আছে।

জয় কালী ......

জয় কালী ............

জয় কালী ..............


লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

সহজ কালী 'পূজা পদ্ধতি'

 সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন এবং তিনি নিরাকার, তিনি সর্বত্রই বিরাজমান এ বিশ্বাস সকল মানুষই পোষণ করে। তিনি করুনাময় জীব-জগতের পালন কর্তা। কিন্তু মানুষের মন অতি চঞ্চল, কল্পনায় অবগাহন করে চোখের নিমিষে কেউ বিশ্বব্রহ্মানন্ড ঘুরে আসে, কেউ গাড়ি, বাড়ি, বিত্ত, বৈভব বৃত্তি গড়ে তোলে, আবার কেউ সেই নিরাকারের নির্দিষ্ট রুপ কল্পনার মধ্য দিয়ে গুনসম্পন্ন দেব-মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলে। অন্তরের খাঁটি বিশ্বাস দ্বারা ধর্ম জেগে ওঠে কর্মের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে নিরাকার সৃষ্টিকর্তার আরাধনার লক্ষ্যে তাঁর একটি রূপ বা মুর্তি স্থাপনের মাধ্যমে শ্রদ্ধাভরে পূজো অর্চনা, গুনগান করে সাধনায় সিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাধারণ ভক্তগণ প্রতিমা পূজা করে থাকেন। ঈশ্বর, ভগবান বা পরমপিতার শক্তি সর্বত্রই বিরাজমান। অদৃশ্য সেই মহাশক্তিকে নিরাকার ভাবনা ধ্যান বা যজ্ঞের দ্বারা আয়ত্ব করা সাধারণ ভক্তের জন্য দুসাধ্য ব্যাপার। কেননা সংসারে স্বাত্ত্বিক রাজষিক, তামসিক এই তিন গুণের মানুষ আছেন। বর্তমান সময়ে তামসিক ও রাজষিক মানুষের সংখ্যা বেশি। তাই দেব-দেবীর মুর্তি বা প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে সাধন ভজনে দ্রুততার সাথে নিবিষ্ট হওয়া বা মনোনিবেশ করা সম্ভব। তন্ত্রশাস্ত্র বলেছে, ‘ গাভীর দুগ্ধ তাহার রক্ত হইতে সম্ভুত। রক্ত গাভীর সর্বাঙ্গেই বিরাজিত তাই বলিয়া গাভীর যে কোন অঙ্গে হস্থার্পণ করিলেই দুগ্ধ পাওয়া যায় না। একমাত্র স্তন হইতেই উহা ক্ষরিত হয়। সেই শ্রী ভগবানের উপস্থিতি সর্বত্র সকল সময়ে থাকিলেও তাঁহার স্বরূপ উপলদ্ধি প্রতিমাতেই সর্বাঙ্গসুন্দররূপে হইয়া থাকে।’.

সনাতনী হিন্দু সংস্কৃতিতে তন্ত্রশাস্ত্র মত প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। তান্ত্রিক মতে পূজায় প্রতীক বা প্রতিমা থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে পূজার সকল অর্ঘ প্রতিমা বা মুর্তিকে অবলম্বন করে আবর্তমান। আর বৈদিক মতে, অগ্নিকে সকল শক্তি বা দেবতার উৎস বিশ্বাস ধারণ করে অগ্নিতে দেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞাহুতি প্রদান করা হয়। আগুন বা অগ্নিকে পবিত্র বা নির্মল শক্তি হিসেবে গন্য করা হয়। অগ্নিতে সকল মোহ দ্বেষ, কাম-ক্রোধ বিসর্জ্জন দিলে আত্মশুদ্ধি ঘটে।

শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্র অষ্ট প্রকার বিগ্রহের কথা বলেছে ----

‘শৈলী দারুময়ী লৌহ লেপ্যা লেখ্যা সৈকতী।

মনোময়ী মনিময়ী প্রতিমাষ্টবিধা স্মৃতা॥’

.


------- শিলাময়ী, কাষ্ঠময়ী, লৌহ (সুবর্ণাদিময়ী) লেপ্যা, (মৎচন্দনাদিময়ী) লেখ্যা (চিত্রপটময়ী) বালুকাময়ী, মনোময়ী ও মনিময়ী এই আট প্রকার প্রতিমা হইতে পারে।’

তাই মানবজীবনকে স্বার্থক করে তুলতে স্ব স্ব আরাধ্য দেবতা, ঈশ্বর, ভগবান, পরমপিতা যে যে নামেই সম্বোধন করুন না কেন সেই নিরাকার অসীমকে একটি রূপকল্পের গন্ডিতে এনে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সাধন-ভজন করলে তাঁকে পাওয়ার উচ্ছাসে জীবন আন্দময় হয়ে ওঠে এবং সেখানেই প্রতিমা পূজা বা যজ্ঞের সার্থকতা।

ভগবদ্ গীতায় বলা হয়েছে ----

‘ময়া তশুমিদং সবং জগদব্যক্ত মুর্তিন।’ ----- অর্থাৎ আমি অব্যক্তরূপে জগৎ সংসার ব্যপিয়া আছি। যিনি ব্যক্ত সাকার; তিনিই অবতার, আবার অব্যক্ত অবস্থায় নিরাকার। অর্থাৎ প্রতীক বা প্রতিমা অব্যক্ত নিরাকার ব্রহ্ম বা আরাধ্য দেবতার প্রতিনিধি।

আর কয়েকদিন বাদেই দীপান্বিতা, মনের অন্ধকার দূর করতে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করে সেখানে কালীমুর্তি স্থাপন করা এই দিনের মুখ্যকর্ম। আর সেই কর্মেই ভৌতিক জীবনের সাফল্যতা।

এই কালীপূজা বাংলায় প্রগৈতিহাসিক কাল থেকেই চলে আসছে। রাজা থেকে প্রজা, ধনী থেকে দরিদ্র, কেউই বাদ নেই, শক্তিমান হতে সবাই আশা করে। তাই দেখি -- বার ভূইয়াদের অন্যতম যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে 'যশোরেশ্বরী' কালিকা মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করে এবং শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন। ভারতচন্দ্র রায় গুনকর তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে লিখেছেন ---

'যশোর নগর ধাম .... প্রতাপ আদিত্য নাম

মহারাজা বঙ্গজ কায়স্থ ।

নাহি মানে বাদশায় .... কেহন নাহি আটে তায়

ভয়ে সব ভূপতি দ্বারস্থ ।।

বরপুত্র ভবানীর .... প্রিয়তম পৃথিবীর

বাহান্ন হাজার যার ঢালী ।

ষোড়ষ হলকা হাতি .... অযুত তুরঙ্গ সাতি

যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী ॥

.

এই আদ্যাশক্তি পরমাপ্রকৃতি যদিও তত্ত্বত অসঙ্গা নির্বিকারা ব্রহ্মচৈতন্যস্বরূপা তবুও নিজ শক্তিবলে তিনিই জগৎ রূপে প্রকাশিত হয়েছেন। সেই আদ্যাশক্তি সূক্ষ্মা, স্থূলা, ব্যক্ত ও অব্যক্ত স্বরূপিণী। নিরাকারা হয়েও সাকারা। তিনি কৃপা না করলে কে তাঁকে জানতে পারে?

একজন তান্ত্রিক প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করে এবং সেই চৈতন্যময়ী শক্তিকে বাঙালি হিন্দুর মানবীয় উপলব্ধির সীমানায় নিয়ে এসে সেই চৈতন্যময়ী শক্তির সঙ্গে মাতাপিতার সর্ম্পক স্থাপন করে, সেই চৈতন্যময়ী শক্তিকে দেবীরূপে কল্পনা করে পূজা করে। তন্ত্রের প্রধান একটি সিদ্ধান্তই হল এই যে প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করা। কিন্তু, বিশ্বজগতে সবই তো শক্তির সমাহার। যে শক্তিকে জড়বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। আধুনিক সভ্যতা এই মূলতত্ত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত।

প্রকৃতির সূত্র আবিস্কার করে এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা যৌক্তিক এই প্রশ্নও তো আজকাল উঠছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি হটকারী কিনা, পরিবেশ বিপর্যয়ের মূলে এই দর্শন সক্রিয় কিনা- এসব প্রশ্নও নিয়েও তো আমরা আজ উদ্বিগ্ন।

তন্ত্র কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তার কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, 'মা' বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে; দেবী মা (প্রকৃতি) কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে।

..............

আসুন অনেক মন্ত্রের মধ্যে উচ্চারনে সহজ এবং সরল একটি সহজ প্রক্রিয়া এবং ধ্যান মন্ত্র জেনে নিই -----

৺রী মায়ের ছবি/মূর্ত্তি/ঘট/পটের সামনে শুদ্ধাসন পেতে বসুন ------------

ভক্তিযুক্ত মনে ----------

-

১ম ধাপ --- (করজোড়ে নীচের ধ্যান মন্ত্র পাঠ করুন)

ওঁ শবারুঢ়াং মহাভীমাং ঘোরদংস্ট্রাং বরপ্রদাম।

হাস্যযুক্তাং ত্রিনেত্রাঞ্চ কপালকর্ত্তৃকাকরাম।।

মুক্তকেশীং লোলজিহ্বাং পিবন্তীং রুধিরং মুহু।

চতুর্ব্বাহু যুতাং দেবীং বরাভয়করাং স্মরেৎ।।


২য় ধাপ ----- (গায়ত্রী দ্বারা মাতৃমন্ত্র জাগ্রত বা শক্তিশালী করুন)

মায়ের গায়ত্রী মন্ত্র -- ওঁ কালিকায়ৈ বিদ্মহে শশ্মানবাসিন্যৈ ধিমহি তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ ……… (১০ বার জপ করুন)

এর পর নিচের মন্ত্রে হাতে একটু জল নিয়ে জপ বিসর্জন করুন ----

ওঁ গুহ্যাতিগুহ্য গোপ্তৃীং ত্বং গৃহানস্মতং কৃতং জপো,

সিদ্ধির্ভবতু মে দেবি তৎ প্রসাদৎ সুরেশ্বরী৷৷


৩য় ধাপ ------ এবার পঞ্চোপচারে দেবীর পূজা করুন -----

ক্রীং এষ গন্ধঃ শ্রীমৎ দক্ষিণা কালিকায়ৈ নমঃ

ক্রীং এতানি পুষ্পানি শ্রীমৎ দক্ষিণা কালিকায়ৈ নমঃ

ক্রীং এষ ধূপঃ শ্রীমৎ দক্ষিণা কালিকায়ৈ নমঃ

ক্রীং এষ দীপঃ শ্রীমৎ দক্ষিণা কালিকায়ৈ নমঃ

ক্রীং এতৎ নৈবেদ্যং শ্রীমৎ দক্ষিণা কালিকায়ৈ নমঃ


৪র্থ ধাপ ------ এবার প্রণাম করুন ------


মা কালীর প্রণাম মন্ত্র

---------------------------------

ওঁ সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণি নমোহস্তুতেঃ।।

ওঁ সৃষ্টি-স্থিতি বিনাশানাং শক্তিভৃতে সনাতনী।

গুণাশ্রয়ে গুণময়ী নারায়ণি নমোহস্তুতেঃ।।

ওঁ শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে।

সর্বস্যার্তি হরে দেবী নারায়ণি নমোহস্তুতে।।

ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।

দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বহা স্বধা নমোঽস্তুতে।।


৫ম ধাপ ------- (মায়ের কবচ পাঠ করুন)


কালীকবচম

========

ভৈরব উবাচ --

কালিকা যা মহাবিদ্যা কথিতা ভুবি দুর্ল্লভা।

তথাপি হৃদয়ে শল্যমস্তি দেবি কৃপাং কুরু।।

কবচন্ত মহাদেবী কথয়সানুকম্পা।

যদি নো কথ্যতে মাতব্বিমুঞ্চামি তদা তনুম।।


দেব্যুবাচ --

শংকাপি জায়তে বৎস তব স্নেহাৎ প্রকাশিতম।

ন বক্তব্যং ন দ্রষ্টব্যমতি গুহ্যতমং মহৎ।।

কালিকা জগতাং মাতা শোকদুঃখাদি বিনাশিনী।

বিশেষত কলি যুগে, মহাপাতকহারিণী।।

কালী মে পুরুতঃ পাঠু পৃষ্ঠতশ্চ কপালিনী।

কুল্বা মে দক্ষিনে পাতু করণৌ চগ্রোপ্রভামতা।।

বদনং পাতু মে দীপ্তা নীলা চ চিবুকং সদা।

ঘনা গ্রীবাং সদা পাতু বলাকা বাহুযুগ্মকম।।

মাত্রা পাতু করদ্বন্দং বক্ষো মুদ্রা সদাবতু।

মিতা পাতু স্তনদ্বন্দং যোনিং মন্ডল দেবতা।

ব্রাম্মী মে জঠরং পাতু, নাভিং নারায়ণীং তথা।

ঊরু মাহেশ্মরী নিত্যং চামুন্ডা পাতু লিঙ্গকম।

কৌমারী চ কটিং পাতু তথৈব জানুযুগ্মকম।

অপরাজিতা পাদৌ মে বারাহী পাতু চাঙ্গুলীঃ।

সন্ধিস্থানং নারসিংহী পত্রস্থা দেবতাবতু

রক্ষাহীনঞ্চ যৎ স্থানং বর্জ্জিতং কবচেন তু।

তৎ সর্ব্বং রক্ষ মে দেবী কালিকে ঘোর দক্ষিণে।

ঊর্দ্ধং-মধ্যস্তথা দিক্ষু পাতু দেবী স্বয়ং বপুঃ।।

হিংস্রেভ্যঃ সর্ব্বদা পাতু সাধকঞ্চ জলাধিকাৎ।

দক্ষিণা কালিকে দেবী ব্যাপকত্তে সদাবতু।

ইদং কবচমজ্ঞাতা যো জপেদ্দেবদক্ষিনাম

ন পুজাফলমাপ্নোতি বিঘ্নস্তস্য পদে পদে।

কবচেনাবৃতো নিত্যং যত্র তত্রৈব গচ্ছতি

তত্র তত্রভয়ং তস্য ন ক্ষোভং বিদ্যতে ক্কচিৎ।

----------- দক্ষিনকালিকা কবচং সম্পূর্ণম্ -----


৬ষ্ঠ ধাপ ------ এর পর আবার জপ, নিচে জপ মন্ত্র দেওয়া ----- জপ করুন

*** ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ


এর পর নিচের মন্ত্রে হাতে একটু জল নিয়ে জপ বিসর্জন করুন ----

ওঁ গুহ্যাতিগুহ্য গোপ্তৃ ত্বং গৃহানস্মতং কৃতং জপং,

সিদ্ধির্ভবতু মে দেবি তৎ প্রসাদৎ সুরেশ্বরী৷৷


৭ম ধাপ ------ এরপর শ্রীশ্রীদক্ষিণকালিকা স্তোত্রম্ পাঠ করুন ----


শ্রীশ্রীদক্ষিণকালিকা স্তোত্রম্

======================

ওঁ কৃশোদরি মহাচণ্ডী মুক্তকেশিং বলীপ্রিয়ে।

কুলাচারপ্রসন্নাস্যে নমস্তে শঙ্করপ্রিয়ে।।

ঘোরদংষ্ট্রে কোটোরাক্ষি কিটিশব্দ প্রসাধিনী।

ঘুরঘোররাবাস্ফারে নমস্তে চিতাবাসিনী।।

বন্ধুকপুষ্পসঙ্কাশে ত্রিপুরে ভয়নাশিনী।

ভাগ্যোদয়সমুৎপন্নে নমস্তে বরবন্দিনী।।

জয় দেবি জগদ্ধাত্রী ত্রিপুরাদ্যে ত্রিদেবতে।

ভক্তেভ্যো বরদে দেবি মহষঘ্নি নমোহস্তুতে।।

ঘোরবিঘ্নবিনাশায় কুলাচারসমৃদ্ধয়ে।

নমমি বরদে দেবি মুণ্ডমালা বিভূষনে।।

রক্তধারাসমাকীর্ণে করকাঞ্চীবিভূষিতে।

সর্ব্ববিঘ্নহরে কালী নমস্তে ভৈরবপ্রিয়ে।।

নমস্তে দক্ষিণামূর্ত্তে কালী ত্রিপুরভৈরবী।

ভিন্নাঞ্জনচয়প্রক্ষে প্রবীণশবসংস্থিতে।।

গলচ্ছ্রোণিতধারাভিঃ স্মেরাননসরোরুহে।

পীনোন্নতকুচদ্বন্দ্বো নমস্তে ঘোরদক্ষিণে।।

আরক্তমুখশান্তাভির্নেত্রালিভির্বিরাজিতে।

শবদ্বয় কৃতোত্তংসে নমস্তে মদবিহ্বলে।।

পঞ্চাশন্মুণ্ডঘটিতমালা লোহিত লোহিতে।।

নানামণিবিশোভাঢ্যে নমস্তে ব্রহ্মসেবিতে।।

শবাস্থিকৃতকেয়ুর, শঙ্খ-কঙ্কন-মণ্ডিতে।

শববক্ষঃ সমারুঢ়ে নমস্তে বিষ্ণুপূজিতে।।

শবমাংস কৃতগ্রাসে অট্টহাসে মুহুর্মুহু।

মুখশীঘ্রস্মিতামোদে নমস্তে শিববন্দিতে।।

খড়্গমুণ্ডধরে বামে সব্যে (অ) ভয়বরপ্রদে।

দন্তুরে চ মহারৌদ্রে নমস্তে চণ্ডনাদিতে।।

ত্বং গতিঃ পরমা দেবি ত্বং মাতা পরমেশ্বরী।

ত্রাহি মাং করুণাসাদ্রে নমস্তে চণ্ডনায়িকে।।

নমস্তে কালিকে দেবি নমস্তে ভক্তবৎসলে।

মুর্খতাং হর মে দেবি প্রতিভা জয়দায়িনী।।

গদ্যপদ্যময়ীং বাণীং তর্কব্যাকরণাদিকম্।

অনধীতগতাং বিদ্যাং দেহি দক্ষিণকালিকে।।

জয়ং দেহি সভামধ্যে ধনং দেহি ধনাগমে।

দেহি মে চিরজীবিত্বং কালিকে রক্ষ দক্ষিণে।।

রাজ্যং দেহি যশো দেহি পুত্রান্ দারান্ ধনং তথা।

দেহান্তে দেহি মে মুক্তিং জগন্মাতঃ প্রসীদ মে।।

ওঁ মঙ্গলা ভৈরবী দুর্গা কালিকা ত্রিদশেশ্বরী।

উমা হৈমবতীকন্যা কল্যাণী ভৈরবেশ্বরী।।

কালী ব্রাহ্মী চ মাহেশী কৌমারী বৈষ্ণবী তথা।

বারাহী বাসলী চণ্ডী ত্বাং জগুর্ম্মুনয়ঃ সদা।।

উগ্রতারেতি তারেতি শিবত্যেকজটেতি চ।

লোকোত্তরেতি কালেতি গীয়তে কৃতিভিঃ সদা।।

যথা কালী তথা তারা তথা ছিন্না চ কুল্লকা।

একমূর্ত্তিশ্চতুর্ভেদ দেবি ত্বং কালিকা পুরা।।

একত্রিবিধা দেবী কোটিধানন্তরূপিনী।

অঙ্গাঙ্গিকৈর্নামভেদৈঃ কালিকেতি প্রগীয়তে।

শম্ভুঃ পঞ্চমুখেনৈব গুণান্ বক্তুং ন তে ক্ষমঃ।

চাপল্যৈর্যৎ কৃতং স্তোত্রং ক্ষমস্ব বরদা ভব।।

প্রাণান্ রক্ষ যশো রক্ষ পুত্রান্ দারান্ ধনং তথা।

সর্ব্বকালে সর্ব্বদেশে পাহি মাং দক্ষিণকালিকে।।

যঃ সংপূজ্য পঠেৎ স্তোত্রং দিবা বা রাত্রিসন্ধ্যায়োঃ।

ধনং ধান্যং তথা পুত্রং লভতে নাত্র সংশয়।।


শ্রীমন্মহাকালবিরচিত শ্রীমদ্দক্ষিণকালিকাস্তোত্রং সম্পূর্ণম্।।


৮ম ধাপ ------ এবার বন্দনা করুন ---

ওঁ মহামায়ে জগন্মাত কালিকে ঘোর দক্ষিণে ৷

গৃহাণ্ বন্দনে দেবী নমস্তে শংকর প্রিয়ে ৷৷

ওঁ প্রচন্ডে পুত্রদে নিত্যং সুপ্রীতে সুর নায়িকে ৷

কুলদ্যোতকরে চোগ্রে জয়ং দেহী নমোহস্তুতে ৷৷


৯ম ধাপ ----------- এর পর অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করে নিচের মন্ত্র পড়ে কাজ শেষ করে আপনার সমস্যা বা মনোবাসনা মায়ের চরণে নিবেদন করুন -----

ওঁ যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং মাত্রাহীনঞ্চ য়দ্ ভবেৎ ৷

পুরনং ভবতু যৎ সর্ব, তৎ প্রসাদৎ সুরেশ্বরী ৷৷


(কৃতজ্ঞতা স্বীকার -- শ্রী গুরুদেব)

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

১৬ ডিসেম্বর ২০২০

শ্মশানের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা জানলে মানুষের কামনা বাসনা এমনিই পালিয়ে যাবে।

 'শ্মশান' শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমরা মনে মনে বেশ ভীত হয়ে পড়ি। শ্মশান থেকে কেউ ঘুরে এলেই তাকে অপবিত্র ভেবে স্নান করিয়ে তবেই ঘরে ঢুকতে দিই, মনে করি শ্মশান অপবিত্র স্থান। কিন্তু, বাইরে অপবিত্র হলেও শ্মশান ঘুরলে মনের অপবিত্র ভাব আপনিই দূর হয়ে যায়।


শ্মশানের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা জানলে মানুষের কামনা বাসনা এমনিই পালিয়ে যাবে। শত শত তীর্থ ভ্রমণ করে যে সাধন-শিক্ষা লাভ না হয়, শ্মশানে কিছুদিন যদি মানুষ থাকে তবে তার সাধনার ভিত মজবুত হয় ও শিক্ষা লাভ হয়। তখন সাধকের কামনা শূন্য হৃদয়ে মহাশক্তি কালী সহসাই উপস্থিত হন। তাই সাধু ও শব শ্মশানেই বাস করেন, কারণ শ্মশান খুব পবিত্র স্থান !


বাস্তব জগতে যেমন শ্মশান আছে ঠিক তেমনই মানুষের দেহেও শ্মশান আছে। আমাদের দেহের মস্তিষ্কের নীচের দিকে -- ইড়া, পিঙ্গলা নাড়ীর মধ্যে শুষুম্না নাড়ীর সঙ্গমস্থল বা ত্রিবেণী হল সেই শ্মশান। যোগশাস্ত্রে এই স্থানকে আজ্ঞাচক্র বলেন। ভগবান ভোলানাথ সেই শ্মশানে অবস্থান করে আপন মনে ধ্যানজপ করেন।

যাদের চিত্ত কামনা-বাসনা বিরহিত হয়ে শুদ্ধ হয়, যে সাধক পরমব্রহ্মে শরণাগত, খুব জপ করে, তারা কালীর ডাক শুনতে পায়। যে সাধক ধ্যান-জপ নিয়মিত করে না, যে সাধক একাগ্র ও আকুল নয় তাদের কাছে কালী ঘুমিয়েই থাকে। যে সাধক অনুক্ষণ কেবল কালী-স্মরণ করে তার হৃদয়ে কালী সদা জাগ্রত হয়ে থাকে, ধ্যান-জপ নিয়মিত হলেই সেই সাধকের হৃদয়ে কালীস্থিতি অনুভুত হয়। কালী তখন সেই সাধকের সামনেই প্রকট হয়ে কর্ম্মক্ষয় করে দিয়ে সাধকপ্রবরকে সন্তানস্নেহে কোলে তুলে নেয়, সাধকের পুনর্জন্ম আর হয় না।

কালী কালী
লিখেছেনঃ 


Share:

মা সন্তোষীর ব্রত

মা সন্তোষী তুষ্টা হন সামান্য উপাচারেই। রাশি রাশি ভোগ মা কখনোই চান না। সামান্য ছোলা আর আঁখের গুড় মায়ের পূজায় প্রধান উপাদান। নিয়ম মতোন শুকনো ভাজা ছোলা আঁখের গুড়ের সাথে দিতে হয়। কিন্তু হিন্দু বাঙ্গালী ভিজানো ছোলা, আঁখের গুড়ের সাথে মায়ের সামনে ভোগ নিবেদন করেন। সব মতই চলবে। যে, যেভাবে মায়ের পূজো করেন। পূজোর পর প্রসাদের অল্প অংশ গোমাতাকে প্রদান করতে হয়। তবে মা সন্তোষী পূজাতে টক বা অম্ল জাতীয় ফল বা কোন নৈবেদ্য প্রদান করা নিষিদ্ধ। সেজন্য মায়ের ব্রতকারিণী ও পূজারীগণ শুক্রবার টক জাতীয় ফল, ছানা, অম্বল ও টক পদার্থ বর্জন করেন। এমন কি ছানা থেকে প্রস্তুত কোন মিষ্টান্ন মায়ের ভোগে দেওয়া নিষেধ। নিমকি বানিয়ে চিনির রসে ডুবিয়ে কেবল মায়ের উদ্দেশ্যে মিষ্টি নিবেদন করা হয়। ১৬ শুক্রবার ধরে পূজা করার নিয়ম যথা বিধানে। এরপর উদযাপন করতে হয়। উদযাপনের দিন ৭ টি বালক কে ভোজন করিয়ে তাদের দক্ষিণা ও পান-কলা হাতে দিতে হয়। বালকদেরও ঐ শুক্রবার টক খাওয়া নিষেধ। এইভাবে যিনি সন্তোষী মাতার ব্রত পালন করেন - তিনি সর্ব সুখ প্রাপ্ত করেন।


ব্রতকথা

রামু নামক এক সরল সাধাসিধে লোক ছিল। সে বড় ছয় দাদার সাথে মাঠে কৃষিকাজ করত। বাড়ী ছিল একান্নবর্তী পরিবার। বাড়ীর কর্তা ছিলেন এক বিধবা বৃদ্ধা মা। ফসল ঘরে তোলার পর ভাগ বাটোয়ারা করে যা উঠতো তাই সাত ভাই পেতো।


রামু ছিল বোকা ও সরল মনের। ভাইরা এমনকি ছয় বৌদি এর সুযোগ নিতো। মাঝে মাঝে বৌদিরা লুকিয়ে রামুকে এঁঠো-কাটা খেতে দিতো। সরল মনের রামু কিছুই বুঝতো না। একদা সাবিত্রী নামের এক সর্ব সুলক্ষণা কন্যার সাথে রামুর বিবাহ হল।


নতুন বৌ নিয়ে রামুর সুখে সংসার কাটছিল। একদিন সাবিত্রী জানতে পারলো বড় ছয় বৌদি রামুকে উচ্ছিষ্ট খেতে দেয়। রামু নিজেও এই দৃশ্য চোখে দেখলো। এই নিয়ে সে একদিন প্রতিবাদ করলো। এতে ছয় বৌদি আর ছয় দাদা মিলে রামুকে খুব অপমান করলো। রামু মনের দুঃখে প্রতিজ্ঞা করলো --‘যোগ্য মর্যাদা নিয়েই, কিছু করে সে এই বাড়ীতে বুক ফুলিয়ে আসবে।’ এই প্রতিজ্ঞা করে রামু গৃহত্যাগ করলো। তখন ছয় বৌদি আর ছয় দাদার রাগ গিয়ে পড়লো বেচারী সাবিত্রীর উপরে। সাবিত্রীকে ভীষন অত্যাচার শুরু করলো। সংসারের সব কাজ করাতে লাগলো।


দেখতে দেখতে সাবিত্রীর অঙ্গের লাবন্য মলিন হল। সন্ধ্যায় সে ঘরে আসতো। দুটি রুটি আর নারকেলের মালায় তে জল জুটতো তাঁর কপালে। একদিন সাবিত্রী জঙ্গলে কাঠ আনতে গিয়ে দেখে সেখানে দেবকন্যারা কি যেন ব্রত করছে। সাবিত্রী সব জিজ্ঞেস করলে দেবকন্যারা জানালো তারা মা সন্তোষীর ব্রত করছে। মায়ের কৃপায় সর্ব সুখ আসে। সাবিত্রী ভাবল সেও মা সন্তোষীর ব্রত করবে। দেবকন্যাদের কাছে নিয়ম শিখে ষোলো শুক্রবারের মা সন্তোষীর ব্রত শুরু করলো।


অপরদিকে রামু শহরে গিয়ে এক বড় স্বর্ণকারের দোকানে চাকরী পেয়েছিল। হঠাৎ তার বাড়ীর কথা, সাবিত্রীর কথা মনে পড়াতে বাড়ী ফিরতে চাইলো। স্বর্ণকার রামুকে অনেক ধন দৌলত দিয়ে বিদায় করলো। বাড়ী ফিরে রামু দেখে সাবিত্রীর দুর্দশা। রামু তাঁর ছয় দাদা, বৌদিকে খুব বকাঝকা করে সাবিত্রীকে নিয়ে অন্যত্র চলে গেলো। বিশাল বাড়ী বানিয়ে সাবিত্রীকে নিয়ে সুখে থাকতে লাগলো। একদা সাবিত্রী ভাবলেন মা সন্তোষীর উদযাপনে সকলকে নিমন্ত্রণ করবেন। প্রতিবেশী সবাইকে আমন্ত্রণ জানালো হল, ছয় দাদা, ছয় বৌদি, শাশুড়ীকে আমন্ত্রণ জানালো। ছয় বৌদির মধ্যে দুই বৌদি সাবিত্রীর সুখ ঐশ্বর্য দেখে হিংসায় জলতে লাগলো। তারা মায়ের প্রসাদে লেবুর রস দিয়ে দিলো। এতে মা খুব ক্ষিপ্তা হলেন। দুই বৌ বিকলাঙ্গ হয়ে গেলো। অবশেষে সাবিত্রীর কঠোর প্রার্থনায় মা সন্তোষী দুই বৌকে ভালো করে দিলেন। এই ভাবে সাবিত্রীর জীবনে সুখ নেমে আসল।

-


প্রত্যেক শুক্রবার তাঁর পূজা হয়। বাংলার ঘরে ঘরে এবং প্রতিটি নর-নারীর মুখে মুখে কলিযুগের সর্বদুঃখ বিনাশিনী দেবী মায়ের এই দেবীর আপার মহাত্ম্য ও অপরিসীম করুনা প্রচারিত। অগণিত ভক্তবৃন্দ সন্তোষীমাতার যশোগানে মুখরিত। জানি না, বাংলার মহাদুর্দিনের সন্ধিক্ষণে আমাদের অগণিত মা, ভাইবোন বন্ধুদের সর্বস্নেহময়ী সন্তোষী মায়ের কাছে বিনীত কি প্রার্থনা! তারা মায়ের কাছে কি চেয়েছেন আর মা কি দিয়েছেন -- এর সঠিক উত্তর তারাই দেবেন, যাঁরা মায়ের চরণে মনপ্রাণ উৎসর্গ করে তাঁর কৃপালাভে ধন্য হয়েছেন।


তবে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ভক্তের মুখে শোনা কথা যে, মা সাক্ষাৎ বলরুপিনী। মা তাঁর আরাধনায় আড়ম্বর চান না, তিনি চান ভক্তির পূজা। এক বিন্দু চোখের জল, ধান, দূর্বা ও ফুল, সাধ্যমত উপকরণ, গুড় আর ছোলা --- মা এতেই পরম তৃপ্তি লাভ করেন এবং ভক্তের সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। তাই আজ অন্নাভাবে বহু দুঃখ জর্জরিত নর-নারী এই পরমা ঈশ্বরী দেবীর কাছে তাঁদের দুঃখ-দুদর্শা লাঘবের জন্য ব্যাকুল প্রার্থনা জানান। প্রতি শুক্রবারে আমাদের সতী সাধ্বী মা-বোনেরা ঘরে ঘরে সন্তোষী মায়ের ছবি ও ঘট স্থাপন করে বিশুদ্ধ ভাবে পূজার আয়োজন করে থাকেন এবং টক জাতীয় খাবার বর্জন করেন। সর্বসিদ্ধিদাত্রী এই মায়ের পূজায় সকল দেব-দেবী তুষ্ট হয়ে থাকেন। অনেকেই এই পুজায় সুফল পেয়েছেন। মনোকষ্ট, অর্থকষ্ট, বাধা-বিঘ্ন, দাম্পত্য জীবনের কলহ বা অশান্তি, গ্রহদোষ, পুনর্জীবন লাভ করতে এই দেবীর পূজা কর অবশ্য কর্তব্য। মা সন্তোষী যে কোন অশুভ ভাব দূর করেন এবং তার বরাভয় বা আশীর্বাদ প্রদান করেন।


হিংসা, লোভ, লালসা, রাগ, নেশা, নির্যাতন থেকে বিরত থেকে আসুন আমরা সবাই সন্তোষীমাতার ধ্যানে মগ্ন হই। আসুন, কালবিলম্ব না করে আমরা সকলেই তাঁর চরণে প্রণাম জানিয়ে মাতৃপূজায় জীবন উৎসর্গ করে মানবজীবন সার্থক করি।

লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

১২ মে ২০২০

মধ্যযুগ হতে পরম্পরা থেকে চলছে গৃহে গৃহে দেবী মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত ও পূজা ।



ভারতবর্ষে বহু প্রাচীন কাল থেকে মাতৃদেবী বা আদিশক্তির পূজো হয়ে আসছে । অনার্য বা দ্রাবিড় জাতির মধ্যেও মাতৃকা দেবীর পূজা দেখা যায়। উপনিষদের যুগে কাত্যায়নী, কন্যাকুমারী দেবীর পূজো প্রচলিত ছিল। উমা- হৈমবতী দেবীর নামও পাওয়া যায় । মহাভারতে বিন্ধ্যবাসিনী ও মহিষাসুর মর্দিনীর নাম পাওয়া যায় । এই ভাবে আমরা চণ্ডিকা দেবীর উপাসনা বিধিও দেখি । অতি প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় সংসারের মঙ্গল কামনায় মহিলা গন বৈশাখ মাসে মঙ্গলচণ্ডীর পূজো করে থাকেন । পুরানের দেবী চণ্ডী অস্ত্রধারিনী, অসুর মর্দিনী । কিন্তু মঙ্গলচণ্ডী দেবীর যে পট ছবি আমরা দেখি তাতে তিনি দ্বিভুজা, হাতে পদ্ম পুস্প, পদ্মাসীনা । সমগ্র মাতৃত্বের রূপ দেবীর মধ্যে প্রস্ফুটিত । চণ্ডীদেবীর কথা বৃহধর্ম পুরানে পাওয়া যায় । ভবিষ্য পুরানে মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের উল্লেখ আছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে ইনি কেবল স্ত্রীলোকের দ্বারা পূজিতা বলা হয়েছে । চণ্ডীমঙ্গল কাব্য অনুসারে চন্ডী দেবীর আবির্ভাবের প্রথম পর্বে দেখি কালকেতু ও ফুল্লরার কথা। কালকেতু জাতিতে শবর ব্যাধ, তার পত্নী ফুল্লরা এক শবরী । কালকেতু বনে শিকার করে মাংস হাটে বিক্রি করে সংসার চালাতো। একদা দেবী চণ্ডী তাঁদের গৃহে ছদ্দবেশে এসে পরীক্ষা নেন। কালকেতু ও ফুল্লরাকে শেষে দশভুজা রূপে দর্শন দিয়ে তাঁদের গুজরাট প্রদেশের অধিপতি করেন ।


অপর ঘটনা দেখি সেখানে ধনপতি বণিক ও খুল্লনার ঘটনা । চণ্ডিমঙ্গল কাব্যের ঘটনা অনুসারে ধনপতি সদাগর এর দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল খুল্লনা। ধনপতি গর্বে উন্মত্ত হয়ে একদা চণ্ডী দেবীর ঘট ভেঙ্গে ফেলে। এরপর সদাগর বাণিজ্যে গিয়ে দেবীর এক অদ্ভুত রূপ দেখতে পায়। এই রূপ ‘কমলেকামিনী’ নামে মঙ্গল কাব্যে আখ্যায়িত হয়েছে । দেবী এক পদ্মের ওপর বসে একটি হাতি একবার শুঁড়ে ধরে গিলে ফেলছেন, আবার বমন করে বের করে দিচ্ছেন । এই ঘটনা দেখে বিস্মিত ধনপতি সিংহলের রাজাকে গিয়ে জানালেন। সিংহলের রাজা এই দৃশ্য দেখতে পায়নি দেবীর মায়ায়। রাজা তখন মিথ্যেবাদী সন্দেহে ধনপতিকে বন্দী করে রাখে। দেবীকে অবজ্ঞা করার শাস্তি সে পায় । অপরদিকে খুল্লনার পুত্র শ্রীমন্ত একদা সিংহল যাত্রা করে । কালক্রমে সেও সিংহল রাজের আদেশে বন্দী হয় । অবশেষে দেবীর কৃপায় তারা মুক্ত হয়ে স্বদেশে ফেরে। ততদিনে ধনপতি বনিক মায়ের একজন ভক্ত হয়ে ওঠে ।

বাঙ্গালী কবিগণ মধ্যযুগে চণ্ডিমঙ্গলের ওপর কাব্য রচনা করেন । মানিক দত্ত, মাধব আচার্য, মুকুন্দরাম এঁনারা চণ্ডিমঙ্গল কাব্যের উল্লেখযোগ্য কবি। এঁদের সেরা হলেন মুকুন্দরাম । তিনি ‘কবিকঙ্কন’ উপাধি পান । এমন বলা যায় পুরানের অসুরনাশিনী দেবী দুর্গাই মঙ্গলকাব্যের দেবী চণ্ডী। মধ্যযুগে মঙ্গলচণ্ডীর গান, পালা আড়ম্বরে পালিত হতো। সেই সময় গৃহে চণ্ডীপূজো হতো। সেই পরম্পরা থেকে চলছে গৃহে গৃহে দেবী মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত ও পূজা। দেবী সকল প্রকার অশুভ, জড়তা, অমঙ্গল নাশ করেন । দেবীর কৃপায় মঙ্গল হয় । তাই তিনি মা মঙ্গলচণ্ডী ।


Share:

বাংলা সাহিত্যের চণ্ডীমঙ্গল কাব্য ও বাংলায় গৃহে গৃহে আরাধিতা মঙ্গলচণ্ডী নিয়ে কিছু কথা।



চণ্ডীমঙ্গল কাব্য বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের মধ্যে একটি স্থান অধিকার করে আছে । এই কাব্য “ভবানীমঙ্গল” নামেও উল্লেখিত। এথেকে বোঝা যায় বাংলায় একসময় চণ্ডী আরাধনার ব্যপক প্রচলন ছিলো, বর্তমানে তিনিই মঙ্গলচণ্ডী নামে গৃহে গৃহে আরাধিতা । যতগুলি লেখকের লিখিত ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য পাওয়া যায়- সবটিতেই দুটি কাহানীর উল্লেখ পাওয়া যায়- ১) আক্ষেটি খণ্ড ( কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান ), ২) বণিক খণ্ড ( ধনপতি বণিকের উপাখ্যান, কমলেকামিনী মূর্তি দর্শন ) । এছাড়া গ্রন্থের পূর্বে “দেবখণ্ড” নামক একটি অধ্যায় দেখা যায় যেখানে শিব পার্বতীর কাহানী ও দেবতাদের বন্দনা । চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আদি রচয়িতা মানিক দত্ত । গবেষক দের মতে মাণিক দত্ত মালদহ এর কবি। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম তাঁর রচিত চণ্ডীমঙ্গলে বারংবার শ্রদ্ধার সহিত মাণিক দত্তের নাম উল্লেখ করেছেন । চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের অন্য কবি দ্বিজমাধব বা মাধব আচার্য । গবেষক দের মতে ১৫৭৯ শকাব্দে ইনি গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন , তিনি প্রথমে নবদ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন, পড়ে চট্টগ্রামে চলে যান।


“চণ্ডীমঙ্গল” কাব্যের সবচেয়ে উল্লেখ্য কবি হলেন কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী । বর্ধমানের দামিন্যা গ্রামে এঁনার জন্ম । পড়ে ইনি পরিবার এর সাথে জন্মভূমি ছেড়ে মেদিনীপুরের ব্রাহ্মণভূমির জমিদার বাঁকুড়া রায়ের আশ্রয়ে আসেন । এইসময় একদা দেবী চণ্ডী স্বপ্নে মুকুন্দরামকে দর্শন দিয়ে তাঁর মহিমা বিষয়ক গ্রন্থ লেখতে আদেশ করেন । মুকুন্দরাম একসময় জমিদার বাঁকুড়া রায়ের সন্তানের গৃহশিক্ষক ছিলেন । পরবর্তীতে মুকুন্দরামের সেই ছাত্র জমিদার হয়ে মুকুন্দরামকে চণ্ডীকাব্য লিখতে অনুরোধ জানান। স্বপ্নাদেশ ও জমিদারের ইচ্ছা মেনে মুকুন্দরাম “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্য রচনা করতে বসলেন । আনুমানিক ১৫৮৪ সনে তাঁর গ্রন্থ লেখা সমাপ্ত হয় । এই কাব্য “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্যের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় । কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান চণ্ডীমঙ্গলের সবথেকে জনপ্রিয় উপাখ্যান । দেবাদিদেব মহাদেবের অভিশাপে ইন্দ্রপুত্র নীলাম্বর শাপিত হয়ে মর্তে ব্যাধ হয়ে জন্ম নেন, তাঁর নাম কালকেতু , অপরদিকে নীলাম্বরের স্ত্রী ছায়া স্বামীকে অনুসরণ করে মর্তে ব্যাধিনী হয়ে জন্মান- এঁর নাম ফুল্লরা। দরিদ্র পরিবারের ব্যাধ আর ব্যাধিনী দম্পতি কে দিয়েই দেবী চণ্ডী তাঁর লীলা আরম্ভ করেন । ব্যাধ কালকেতু দেবীর কৃপায় গুজরাট নগরীর রাজা হন । আজোও দেবী মঙ্গলচণ্ডীর পূজায় পাঁচালীতে দেবীর এই লীলামাহাত্ম্য পাঠ হয় ।
Share:

১৭ এপ্রিল ২০২০

শ্রীব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে প্রকৃতিখন্ডে উল্লেখিত শ্রীকৃষ্ণকৃতং দুর্গাস্তোত্রম

।।শ্রীকৃষ্ণ উবাচ।।

ত্বমেবসর্বজননী মূলপ্রকৃতিরীশ্বরী।
ত্বমেবাদ্যা সৃষ্টিবিধৌ স্বেচ্ছয়া ত্রিগুণাত্মিকা ।।
কায়ার্থে সগুণা ত্বঞ্চ বস্তুতো নির্গুণা স্বয়ং ।
পরব্রহ্মস্বরূপা ত্বং সত্যা নিত্যা সনাতনী ।।
তেজঃস্বরূপা পরমা ভক্তানুগ্রহবিগ্রহা ।
সর্বস্বরূপা সর্বেশা সর্বাধারপরাৎপরা ।।
সর্ববীজস্বরূপা চ সর্বপূজ্যা নিরাশ্রয়া ।
সর্বজ্ঞা সর্বতোভদ্রা সর্বমঙ্গলমঙ্গলা ।।
সর্ববুদ্ধিস্বরূপা চ সর্বশক্তি স্বরূপিণী ।
সর্বজ্ঞানপ্রদা দেবী সর্বজ্ঞা সর্বভাবিনী ।।
ত্বং স্বাহা দেবদানে চ পিতৃদানে স্বধা স্বয়ম্ ।
দক্ষিণা সর্বদানে চ সর্বশক্তি স্বরুপিণী ।।
নিদ্রা ত্বঞ্চ দয়া ত্বঞ্চ তৃষ্ণা ত্বঞ্চ চাত্মনঃ প্রিয়া ।
ক্ষুৎক্ষান্তিঃ শান্তিরীশাচ কান্তিঃ সৃষ্টিশ্চ শাশ্বতী ।।
শ্রদ্ধা পুষ্টিশ্চ তন্দ্রাচ লজ্জা শোভা দয়া তথা ।
সতাং সম্পদস্বরূপা শ্রীর্বিপত্তিরসতামিহ ।।
প্রীতিরূপা পুণ্যবতাং পাপীনাং কলহাঙ্কুরা ।
শশ্বৎকর্মময়ী শক্তিঃ সর্বদা সর্বজীবিনাম্ ।।
দেবেভ্যো স্বপদদাত্রী ধাতুর্ধাত্রী কৃপাময়ী ।
হিতায় সর্বদেবানাং সর্বাসুরবিনাশিনী ।।
যোগনিদ্রা যোগরূপা যোগদাত্রী চ যোগীনাং ।
সিদ্ধিস্বরূপা সিদ্ধানাং সিদ্ধিদাতা সিদ্ধিযোগিনী ।।
মাহেশ্বরী চ ব্রহ্মাণী বিষ্ণুমায়া চ বৈষ্ণবী ।
ভদ্রদা ভদ্রকালী চ সর্বলোকভয়ঙ্করী ।।
গ্রামে গ্রামে গ্রাম্যদেবী গৃহদেবী গৃহে গৃহে ।
সতাং কীর্তি প্রতিষ্ঠা চ নিন্দা ত্বমসতাং সদা ।।
মহাযুদ্ধে মহামারী দুষ্টসংহাররুপিণী ।
রক্ষাস্বরূপা শিষ্টানাং মাতৈব হিতকারিণী ।।
বন্ধাপূজ্যা স্তুতা ত্বঞ্চ ব্রহ্মাদীনাঞ্চ সর্বদা ।
ব্রাহ্মণ্যরুপা বিপ্রাণাং তপস্যা চ তপস্বিনাম্ ।।
বিদ্যা বিদ্যাবতাং ত্বঞ্চ ব্রহ্মাদীনাং চ সর্বদা ।
মেধাস্মৃতিস্বরুপাচ প্রতিভা প্রতিভাবতাম্ ।।
রাজ্ঞা প্রতাপরুপাচ বিশাং বাণিজ্যরুপিণী ।
সৃষ্টৌ সৃষ্টিস্বরুপা ত্বং রক্ষারূপাচ পালনে ।।
তথান্তে ত্বং মহামারী বিশ্বস্য বিশ্বপূজিতে ।
কালরাত্রির্মহারাত্রির্মোহরাত্রিশ্চ মোহিনী ।।
দুরত্বয়া মে মায়া ত্বং যয়া সম্মোহিতং জগত ।
যয়া মুগ্ধো হি বিদ্যাশ্চ মোক্ষমার্গ ন পশ্যতি ।।
ইত্যাত্মনা কৃতং স্তোত্রং দুর্গয়া দুর্গনাশনম্ ।
পূজাকালে পঠেদ্ যো হি সিদ্ধির্ভবতি বাঞ্ছিতা ।।
বন্ধাচ কাকবন্ধাচ মৃতবৎসা চ দুর্ভগা ।
শ্রুত্বা স্তোত্রং বর্ষমেকং সুপুত্রং লভতে ধ্রুবম্ ।।
কারাগারে মহাঘোরে যো বদ্ধো দৃঢ়বন্ধনে ।
শ্রুত্বা স্তোত্রং মাসমেকং বন্ধনান্মুচ্যতে ধ্রুবম্ ।।
যক্ষগ্রস্তো গলৎকুষ্টি মহাশূলী মহাজ্বরী ।
শ্রুত্বা স্তোত্রং বর্ষমেকং সদ্যো রোগাৎ প্রমুচ্যতে ।।
পুত্রর্ভেদে প্রজার্ভেদে পত্নীর্ভেদে চ দুর্গতঃ ।
শ্রুত্বা স্তোত্রং মাসমেকং লভতে নাত্র সংশয়ঃ ।।
রাজদ্বারে শ্মশানেচ মহারণ্যে রণস্থলে ।
হিংস্রজন্তুসমীপে চ শ্রুত্বা স্তোত্রং প্রমুচ্চতে ।।
গৃহদাহেচ দাবাগ্নে দস্যুসৈন্যসমন্বিতে ।
স্তোত্রশ্রবণমাত্রেণ লভতে নাত্র সংশয়ঃ ।।
মহাদরিদ্রো মুর্খশ্চ বর্ষ স্তোত্রং পঠেতু যঃ ।
বিদ্যাবান ধনবাংশ্চৈব স ভবেন্নাত্র সংশয়ঃ ।।
 
।। ইতি শ্রীব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে প্রকৃতিখন্ডে শ্রীকৃষ্ণকৃতং দুর্গাস্তোত্র সম্পুর্ণম্ ।।

Post:  আমার দুর্গা
Share:

০৩ এপ্রিল ২০২০

দেবীর স্তব বরাহ পুরাণ হতে (বঙ্গানুবাদ সহ)

নমো দেবি মহাভাগে গম্ভীরে ভীমদর্শনে ।
জয়স্থে স্থিতিসিন্ধান্তে ত্রিনেত্রে বিশ্বতোমুখি ।।
বিদ্যাবিদ্যে জপে জাপ্যে মহিষাসুরমর্দ্দিনি ।
সর্ব্বজ্ঞে সর্ব্বদেবেশি বিশ্বরূপিণি বৈষ্ণবী ।।
বীতশোকে ধ্রুবে দেবি পদ্মাপত্রশুভেক্ষণে ।
শুদ্ধসত্ত্বব্রতস্থে চ চণ্ডরূপে বিভাবরি ।।
ঋদ্ধিসিদ্ধিপ্রদে দেবী বিদ্যেহবিদ্যেহুমৃতে শিবে ।
শাঙ্করী বৈষ্ণবী ব্রাক্ষ্মী সর্ব্বদেবনমস্কৃতে ।।
ঘন্টাহস্তে ত্রিশূলাগ্রে মহামহিষমর্দিনী ।
উগ্ররূপে বিরূপাক্ষি মহামারেহহুমৃতস্রবে ।।
সর্ব্বসত্ত্বহইতে দেবি সর্ব্বসত্ত্বময়ে ধ্রুবে ।
বিদ্যাপুরাণশিল্পানাং জননী ভূতধারিণি ।।
সর্ব্বদেরহস্যানাং সর্ব্বসত্ত্ববতাং শুভে ।
ত্বমেব শরবৎ দেবি বিদ্যেহবিদ্যে শ্রিয়েহম্বিকে ।।
বিরূপাক্ষি তথা ক্ষান্তিঃ ক্ষোভিতান্তর্জ্জলেহযলে ।
নমোহস্ত্য তে মহাদেবি নমস্তে পরমেশ্বরী ।।
শরণং ত্বাৎ প্রপদ্যতে দেবি পরমেশ্বরী ।
ন তেষাৎ জায়তে কিঞ্চিৎশুভৎ রণসঙ্কটে ।।
যশ্চ ব্যাঘ্রভয়ে ঘোরে চৌররাজভয়ে তথা ।
স্তবমেনৎ সদা দেবি পঠিষ্যতি যতাত্মবান ।।
নিগড়স্থোহপি যো দেবি ত্বাৎ স্মরিষ্যতি মানবঃ ।
সোহপি বন্ধৈর্ব্বিনির্ম্মুক্তঃ সুসুখং বসতে সুখী ।।
( বরাহ পুরাণ... ষন্নবতিতমোহধ্যায়ঃ... শ্লোক- ৫১-৬১ )
অর্থাৎ- হে দেবী! হে মহাভাগে ! হে ভীমদর্শনে ! বিজয়ে ! স্থিরসিদ্ধান্তে ! বিশ্বতোমুখি ! ত্রিনেত্র! বিব্যাবিদ্যে ! জপ্যে ! জাপ্যে ! মহিষাসুরমর্দিনী ! তুমি সর্বগামিনী সমস্ত দেবগনের ঈশ্বরী , সমস্ত বিশ্বস্বরূপা বৈষ্ণবী , এবং বীতশোকা । হে ধ্রুবে ! দেবি! কমললোচনে ! তুমি শুদ্ধসত্ত্ব ! তোমার অবস্থিতিস্থান বহু , তুমিই চণ্ডরূপা , বিভাবরী , তুমিই সকলের সর্ব প্রকার সম্পদ ও সর্বপ্রকার সিদ্ধিবিধায়িনী । হে দেবী বিদ্যে! অবিদ্যে! অমৃতে ! শিবে! শাঙ্করী ! বৈষ্ণবী ! ব্রাক্ষ্মি ! তুমি সর্বদেবের নমস্কৃত । হে ঘণ্টাহস্তে ! ত্রিশূলপাণে ! মহামহিষমর্দিনী ! উগ্ররূপে ! বিরূপাক্ষি ! মহামায়ে! অমৃতস্রাবিণি ! তুমি সর্বপ্রানীর হিতকার্য্যে তৎপর ! হে দেবি ! তুমি সর্বজীবরূপিনী । সমস্ত বিদ্যা , সমুদয় পুরাণ ও সর্ব প্রকার শিল্প , সকল বেদ ও সকল রহস্য এ সমস্তের জননী । হে সত্ত্বগুণাবিলম্বীদিগের শুভকারিণী ! তুমিই সকলের একমাত্র আশ্রয় । হে বণ্যে ! অবিদ্যে ! শ্রিয়ে ! অম্বিকে ! বিরূপাক্ষী ! তুমিই ক্ষমা , তুমিই রসাতলবিক্ষোভিণী, হে অমলে ! মহাদেবি! পরমেশ্বরী ! তোমাকে আমাদিগের নমস্কার ! হে দেবি! যাহারা রনসঙ্কটে পড়িয়া তোমার শরণাপন্ন হয়, তাঁহাদিগের কোনোই বিপদ ঘটে না । হে পরমেশ্বরী ! ঘোরতর ব্যাঘ্রভয়ে কিম্ভা রাজভয়ে ভীত হইয়া সেজন সংযতচিত্তে এইরূপে তোমার স্তব করে, যেজন বিপনন হইয়া তোমায় স্মরণ করে , তাহার সমস্ত ভয়কারণ দূর হয় । যে জন শৃঙ্খলিত হইয়া বা বন্দী হইয়া বিপদে তোমায় শরণ করে, তাহার কোনো বিপদ থাকে না, সে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করে।
Share:

০২ এপ্রিল ২০২০

দেবতারা ভগবতীর স্তুতি করেছিলেন।

দেবতারা ভগবতীর স্তুতি করেছিলেন। যথা-
উ বিতর্কে চ মা লক্ষ্মীবহুরূপা বিদৃশ্যতে ।
উমা তস্মাচ্চ তে নাম নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।।
( ভবিষ্যপুরাণ... দ্বিতীয় খণ্ড...১৮ তম অধ্যায়... ৬৭ )
অর্থাৎ- ‘উ’ এই শব্দ বিতর্কে এসেছিল এবং মা শব্দে লক্ষ্মী বহুরূপা দৃশ্য হয়েছিল এই কারণে তুমি ‘উমা’ এই নামে প্রসিদ্ধ হইবে। হে দেবী উমা তোমাকে আমাদের সকলের বারবার প্রণাম ।
কতিচিদয়নান্যেব ব্রহ্মাণ্ডেহ স্মিঞ্ছিবে তব ।
কাত্যায়নী হি বিজ্ঞেয়া নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।।
( ভবিষ্যপুরাণ... দ্বিতীয় খণ্ড...১৮ তম অধ্যায়...৬৮ )
অর্থাৎ- হে শিবে, এই ব্রহ্মাণ্ডে তোমার কত অয়ন ( স্থান ) তাই তোমার নাম ‘কাত্যায়নী’। হে কাত্যায়নী দেবী, তোমাকে আমাদের সকলের বারবার প্রণাম ।
গৌরবর্ণাচ্চ বৈ গৌরী শ্যামবর্ণাচ্চ কালিকা ।
রক্তবর্ণাদ্বেমবতী নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।।
( ভবিষ্যপুরাণ... দ্বিতীয় খণ্ড...১৮ তম অধ্যায়...৬৯ )
অর্থাৎ- আপনি অত্যন্ত গৌরবর্ণ , এই কারণে আপনি ‘গৌরী’ এই শুভ নামে পরিচিতা । আপনার শ্যামবর্ণের জন্য কালিকা নামে খ্যাতা । আপনার বর্ণ কখনও রক্তবর্ণ , আপনি ‘হেমবতী’ । হে তিনবর্ণা দেবী, আপনাকে আমাদের সকলের বারবার প্রণাম ।
ভবস্য দয়িতা ত্বং বৈ ভবানী রুদ্রসংযুতা ।
দুর্গা ত্বং যোগি সুস্প্রাপ্যা নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।।
( ভবিষ্যপুরাণ... দ্বিতীয় খণ্ড...১৮ তম অধ্যায়...৭০ )
অর্থাৎ- আপনি ভবপত্নী এই কারণে আপনি ভবানী আপনি যোগিগণের দ্বারা দুস্প্রাপ্য সুতরাং আপনি ‘দুর্গা’। দুর্গাদেবী আপনাকে আমাদের সকলের বারবার প্রণাম ।
নান্তং জগ্মুবয়ং তে বৈ চন্ডিকা নাম বিশ্রুতা ।
অম্বা ত্বং মাতৃভুতা নো নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।।
( ভবিষ্যপুরাণ... দ্বিতীয় খণ্ড...১৮ তম অধ্যায়...৭১ )
অর্থাৎ- আপনার অনন্ত নামের কারণে আমরা আপনাকে অন্তপর্যন্ত প্রাপ্ত হয়নি । আপনার ‘চণ্ডিকা’ এই নাম পরম প্রসিদ্ধা। আপনি আমাদের মাতৃভুজা অম্বা, এই কারণে অম্বা দেবী- আপনাকে আমাদের সকলের বারবার প্রণাম ।
Share:

মহাভাগবত পুরাণে দেবী সতীর দশমহাবিদ্যা রূপ ধারণের উল্লেখ পাওয়া যায় ।

মহাভাগবত পুরাণ “দেবী”র লীলা বিষয়ক। এই পুরাণের নাম অনেকেই জানেন না। মহাভাগবত পুরাণে দেবী সতীর দশমহাবিদ্যা রূপ ধারণের উল্লেখ পাওয়া যায় । মহাভাগবত পুরাণের অষ্টম অধ্যায়ে এই উপাখ্যান পাওয়া যায় । ঘটনাচক্র এমন দেবর্ষির মুখে পিতৃগৃহে যজ্ঞের অনুষ্ঠান শুনে সতী দেবী সেখানে যাবার ইচ্ছা পোষোন করেন। ভগবান শিব অনেক বুঝালেন। সতী দেবী বললেন- “হে শম্ভু! আপনার নিন্দা শ্রবণ করার ইচ্ছা আমার বিন্দুমাত্র নেই। কিন্তু তবুও আমি সেখানে যেতে চাই। সেখানে সকল দেবতা আমন্ত্রিত, কেবল আপনি ছাড়া। আমার পিতা যা করছেন তা সকল প্রজারা দেখছে। যদি আমার পিতা আপনাকে যজ্ঞে আমন্ত্রণ করে আপনার আহুতি না দেয় তাহলে পৃথিবীতে কোনো যজ্ঞেই আপনাকে আহুতি দেবে না। সেজন্য আমি আমার পিতাকে বুঝিয়ে আপনার যজ্ঞভাগ সুনিশ্চিত করবো, নচেৎ এই দেহ ত্যাগ করব”। ( মহাভাগবত পুরাণ/ অষ্টম অধ্যায়/ ৩৮-৪২ )
এই শুনে ভগবান শিব বললেন- “ আমার বারণ সর্তেও তুমি মানবে না ? দুর্বুদ্ধি ব্যাক্তি নিজে অন্যায় করে অন্যকে দোষ দেয় । হে দক্ষপুত্রী আমি জানি তুমি আমার আদেশ মানবে না। আমার আদেশের অপেক্ষায় কেন আছ ? যা ইচ্ছে করতে পারো”। ( মহাভাগবত পুরাণ/ অষ্টম অধ্যায়/ ৪৩-৪৪ )
এই শুনে ভগবতী সতী ভাবলেন, “এই শঙ্কর পূর্বে আমাকে পত্নীরূপে প্রাপ্তির জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। এখন আমাকে পত্নী রূপে প্রাপ্তির পর অবজ্ঞা করছেন। এখন আমি আমার প্রভাব দেখাবো।” এই বলে দেবী সতী ক্রোধে চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করলেন। ( মহাভাগবত পুরাণ/ অষ্টম অধ্যায়/ ৪৫-৪৭ )
এই বলে ক্ষিপ্ত হয়ে ভগবতী সতী কালী রূপ ধারণ করলেন, উক্ত রূপের বর্ণনা করেছেন এই ভাবে- দিগম্বরী, কেশ উন্মুক্ত, জিহ্বা লকলকে , চতুর্ভুজা । দেহ জ্যোতি কালাগ্নি সমান তেজময়ী। মুণ্ডমালিনী সেই দেবী ভয়ানক গর্জন করছেন । কোটি সূর্যের মতো আভাযুক্ত মস্তকে চন্দ্ররেখা ছিল। সূর্যের আভাযুক্ত কীরিটে দেবীর ললাট ঝলমল করছিল । ( মহাভাগবত পুরাণ/ অষ্টম অধ্যায়/৪৯-৫২)
এইদেখে ভগবান শিব দিগবিদিকে গমন করতে চাইলে দেবীর নয় রূপ- তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা দশদিকে ঘিরে ধরলেন । ( মহাভাগবত পুরাণ/ অষ্টম অধ্যায়/৬২-৬৩ )
ভগবান শিব তখন জিজ্ঞেস করলেন- “হে শ্যামবর্ণা দেবী! তুমি কে? আমার প্রাণপ্রিয়া সতী কই ?” এই শুনে দেবী নিজ বিদ্যাদের নাম সকল পরিচয় দিলেন। দেবী আরোও বললেন- “হে মহেশ্বর! এই দেবীদের পূজাতে চতুর্বিধ ফল লাভ হয়। এঁনাদের কৃপায় মারণ, উচাটণ, শোষণ , মোহন, দ্রাবণ, বশীকরণ , স্তম্ভন হয়। মনের বিদ্বেষ নাশ হয় । সে সকল মন্ত্র খুব গোপোনীয়। প্রকাশ করতে নেই। হে মহেশ্বর! এই দেবীদের মন্ত্র- যন্ত্র- পূজা- যজ্ঞ নিয়ম- উপাসনার আচার নিয়ম ইত্যাদির বর্ণনা আপনিই করবেন । এই বিষয়ে আপনার থেকে বড় বক্তা আর কেও নেই । আপনার দেওয়া সে সকল উপদেশ “আগমশাস্ত্র” নামে প্রসিদ্ধ হবে। হে শঙ্কর ! আগম আর বেদ আমার দুই হস্ত । সেই দুহাতে আমি সমগ্র জগত ধরে আছি। যে সকল মূর্খ এই দুপথ ছেড়ে দেয়- সে আমার হাত হতে পতিত হয়ে অধঃপতন প্রাপ্ত করে। যে মানব আগম বা বেদের বিরোধিতা করে তার উদ্ধারে আমিও অসমর্থ। তাই মানুষের উচিৎ এই দুই পথকে সম্মান করা আর অজ্ঞানতাবশেও এদের নিন্দা না করা। এই মহাবিদ্যাদের সাধকদের উচিৎ সদগুরুর দেওয়া বিধিবিধানে পূজাদি করা আর পূজা বিধান- মন্ত্র- আচার গুপ্ত রাখা। হে দেবাদিদেব! এসকল আমি আপনাকে বললাম, কারণ আমি আপনার প্রিয়তমা পত্নী আর আপনি আমার প্রিয়তম স্বামী। এখন আমি দক্ষ ভবনে যাচ্ছি। কৃপা করে অনুমতি দিন।” ( মহাভাগবত পুরাণ/ অষ্টম অধ্যায়/৭২-৮৭ )
এরপর দেবী দক্ষের মহলে গিয়ে প্রাণ ত্যাগ করেন। দেবীর শরীর থেকে শক্তিপীঠ সৃষ্টি হয়। ভগবান শিব হলেন আদিগুরু। তিঁনিই তন্ত্রের গুরু।
Share:

“দেবীপুরাণে” রুরু দৈত্যের ঘটনা অন্যভাবে বর্ণিত। সেখানে অষ্টমাতৃকার আবির্ভাবের কথাও আছে।

শিবমহাপুরাণের ধর্মসংহিতাতে দেবীর দ্বারা রুরু দৈত্য বধের আখ্যান দেখা যায়। “দেবীপুরাণে” রুরু দৈত্যের ঘটনা অন্যভাবে বর্ণিত। সেখানে অষ্টমাতৃকার আবির্ভাবের কথাও আছে। শিবমহাপুরাণে লেখা আছে- রুরু দানব, দেবী পার্বতীকে প্রাপ্তি করার জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মার উপাসনা করেন । প্রজাপতি ব্রহ্মা তুষ্ট হয়ে বরদান করতে আসলে অসুর রুরু চাইল- “হে প্রজাপতি । স্ত্রীদিগকে নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভীত নই। মহাদেব যেনো আমার বশ্যতা স্বীকার করেন। আর দেবী পার্বতী যেনো আমাকে গ্রহণ করেন।”
এই শুনে প্রজাপতি ব্রহ্মা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন- “রে দুরাচারী! তোমার প্রার্থনা কখনো ফলবে না।”
ব্রক্ষ্মোবাচঃ-
জগন্মাতা পার্ব্বতী লোকপূজ্যা
কালত্রয়ে কুত্রচিদপ্যনার্য্য।।
( শিবমহাপুরাণ/ ধর্মসংহিতা / ষষ্ঠোহধ্যায়/ ১০)
অর্থাৎ- ওরে অধম! দেবী পার্বতী জগতের মাতৃস্বরূপা এবং তিনি লোকত্রয়ে কালত্রয়ে পূজিতা
ব্রহ্মা আরোও বললেন- “মূর্খ দানব! দেবী মহামায়াকে ভার্য্যা রূপে গ্রহণ করিবার পূর্বে স্বয়ং দেবাদিদেব অবধি কঠোর সাধনা করেছিলেন। তোর এত সাহস সেই দেবীকে কামনা করিস! তোমার এই সর্বনাশা কামনা তোমাকে ধ্বংস করবে।”
দানব রুরু বলল- “প্রজাপতি! যদি আপনি আমাকে , দেবী পার্বতী প্রদান না করেন তাহলে আমি কঠোর তপ করবো। আমার তপাগ্নিতে ত্রিলোক ভস্মীভূত হবে।”
ব্রহ্মা প্রস্থান করলে অসুর রুরু কঠোর তপ সাধনা করল। তার তপাগ্নিতে ত্রিলোক ভস্মীভূত হতে লাগল। কৈলাসে হর গৌরী এই তপাগ্নি দেখলেন। দেবাদিদেব তখন মহাদেবীকে সব ঘটনা বর্ণনা করলেন। মহাদেবী ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন- “সে অসুরের এত দুঃসাহস যে আমাকে কামনা করে!”
এই বলে দেবী পার্বতী ক্রুদ্ধ হয়ে অসুরের তপস্যাস্থানে গেলেন। পথে দেখলেন এক স্থানে গজ আর সিংহ যুদ্ধ করছে। দেবী দুই পশুকে বধ করলেন, তাদের রক্তে দেবীর শরীর রক্তবর্ণ হল। দেবী দুই পশুর চর্ম ধারণ করলেন। তারপর অসুরের সম্মুখে গেলেন। অসুর দেবীকে দেখে চিনতে পারলো না। অসুর বলল- “দেবী তুমি কে ? আমি তো তোমাকে কামনা করি নাই। তুমি ত পার্বতী নও। আমার তপস্যা খণ্ডনের জন্য এখুনি তোমাকে যমালয়ে প্রেরণ করবো।”
এই বলে অসুর রুরু গদা নিয়ে রে রে করে তেরে এলো। দেবীও মুষ্টিযুদ্ধ আরম্ভ করলেন। দেবীর সাথে যুদ্ধে রুরু ধরাশায়ী হল। দানবরাজ রুরু এরপর গাছ, পাথর তুলে নানা মায়াবিদ্যা দ্বারা দেবীর সহিত যুদ্ধ আরম্ভ করলো। কিন্তু দেবী , অসুরের সব প্রহার ব্যর্থ করল। দারুন ক্ষতবিক্ষত হয়ে অসুর রুরু পলায়ন করল। দেবীও তার পেছন পেছন চললেন। অসুর রুরু নানালোকে গমন করল, কিন্তু নিস্তার পেলো না। দেবী ভয়ানক রূপে তার পেছনে ধাবামান হচ্ছেন। অসুর ব্রহ্মলোকে গেলো। সেখানেও নিস্তার পেলো না। ব্রহ্মা বললেন- “ওরে মন্দবুদ্ধি! আমি তোকে পূর্বেই মানা করেছিলাম। তখন আমার বাক্য শুনিস নি। এখন আদিশক্তির প্রকোপ থেকে তোর নিস্তার নেই।”
দেবী সেই অসুরকে ধরলেন। রুরু দৈত্যের দেহ গজ চর্মে আবৃত করে ছিন্নভিন্ন করলেন অসুরের শরীর। তারপর দেবী রক্ত মাংস ভক্ষণ করলেন ( শিবমহাপুরাণ/ ধর্মসংহিতা / ষষ্ঠোহধ্যায়/ ৪১-৪৩ )। এই ভাবে দেবী, রুরু অসুরের সংহার করলেন। এরপর ভগবান শিব আলিঙ্গন করে দেবীকে শান্ত করলেন। দেবী গর্জচর্ম ও সিংহচর্ম , ভগবান শিবকে প্রদান করলেন । তৎকালে ঋষি- মুনি- দেবতা- সিদ্ধ- চারণ- অসুর- মানুষ- কিন্নর সকলে নানা স্তবস্তুতি করে ভগবতীকে পূজা করলেন।
( শিবমহাপুরাণ/ ধর্মসংহিতা / ষষ্ঠোহধ্যায় )
Share:

মা কালীর, দারুকাসুর বধ

মা কালীর, দারুক অসুরের নিধনের ঘটনা লিঙ্গপুরাণে পাওয়া যায়। দারুক নামক এক অসুর তপস্যা করে বরদান প্রাপ্ত করেছিলো যে সে কেবল নারীর হাতেই বধ হবে। সেই অসুরের ত্রাসে সর্বত্র হাহাকার উঠেছিলো। এমনকি দেবতারা পরাজিত হয়ে স্ত্রীরূপ ধরে সে অসুরের সাথে যুদ্ধ করতে এসে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিলো। পরাজিত দেবতারা , প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে গিয়ে প্রার্থনা করে বলল- “হে প্রজাপতি ! দুঃসাধ্য দারুকাসুর এই জগতকে অতিশয় পীড়া প্রদান করছে। আমরাও তাহার নিকট পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছি। আমাদের রাজ্য সেই অসুর হস্তগত করেছে।” একথা শুনে প্রজাপতি ব্রহ্মা, ভগবান বিষ্ণু ও দেবতাদের সহিত কৈলাস শিব পার্বতীর সন্নিকটে গেলেন। ভব ভবানীকে প্রনাম করে দারুক অসুরের কথা সবিস্তারে জানিয়ে বললেন-“হে দেবাদিদেব! সেই অসুর কেবল নারীর হাতেই বধ্য। আপনি সেই বেদ- ব্রাহ্মণ বিরোধী অসুরের বিনাশের ব্যবস্থা করুন।” একথা শোনার পর ভগবান শিব হাসতে হাসতে তার বামে উপবিষ্টা দেবী পার্বতীকে বললেন-“ হে বরাননে ! সেই অসুর কেবল নারীর হাতেই বধ্য। অতএব সেই অসুরের বধ করার জন্য তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি।” ভগবান শিবের আদেশ মেনে দেবী পার্বতী সূক্ষ্ম রূপে ভগবান শিবের মধ্যে প্রবেশ করলেন। এত সূক্ষ্ম ভাবে যে দেবতারা এমনকি ব্রহ্মাও টের পেলেন না।
ভগবান শিবের শরীরে প্রবেশ করে দেবী , মহাদেবের কণ্ঠের বিষের প্রভাবে কালকণ্ঠী হয়ে ভগবান শিবের কপালের নয়ন থেকে প্রকট হলেন। কিন্তু মা কালীর এত ক্রুদ্ধ রূপ দেখে দেবতারা এমনকি ব্রহ্মা ও ভগবান বিষ্ণু পলায়ন করেন। দেবীর অঙ্গে ভগবান শিবের মতো বাঘছাল, কণ্ঠে সর্প, হাতে ত্রিশূল সর্প বলয় আদি বর্তমান ছিলো। মস্তকে ছিলো অর্ধচন্দ্র। দেবী প্রলয় নৃত্য আরম্ভ করে যুদ্ধে প্রবেশ করলেন। দেবীর শরীর থেকে সিদ্ধ, পিশাচ আদি সব প্রকট হল। তাদের সাথে অসুর বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হল। দেবীর সেই কোপে দারুকাসুরের সেনা সকল ছিন্নভিন্ন হল। শির- হস্ত- পদ খণ্ড খণ্ড হয়ে চারপাশে পড়লো। অসুর বিধ্বংসী রূপ তেমন দেবীর। দেখতে দেখতে দারুকাসুরের জীবন সমাপন হল দেবী কালীর হাতে। পরমেশ্বরী দেবী কালীর নৃত্যে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই যেনো লয় পেতে লাগলো। মেদিনী ফেটে যেতে লাগলো। দেবীর হুঙ্কারে দিগবিদিগ কম্পিত হল।
মহাদেবের কণ্ঠের কালকূট বিষের প্রভাবে দেবী কালী আবির্ভাব হয়েছিলো। আর দেবী কালস্বরূপিনী হয়ে সব কিছুই নাশ করতে থাকলেন। দেবতারা পুনঃ ভগবান শিবের স্তব করলেন। ভগবান শিব শ্মশানে এক ছোট্ট শিশুর রূপ ধারণ করে রইলেন। চারিদিকে চিতা জ্বলছে- সেই শ্মশানে দেবী কালী হন হন করে প্রবেশ করলেন। শিশুরূপী মহাদেব করুণ কণ্ঠে রোদোন করতে লাগলেন। এই দেখে দেবী কালীর মনে বাৎসল্যের উদয় হল। শিশুকে ক্রোড়ে নিয়ে স্তন্যপান করালেন। মহাদেব স্তন্যপানের অছিলায় দেবীর শরীর থেকে কালকূট বিষ গ্রহণ করলেন। সেই সময় শিশুরূপে মহাদেব ক্ষেত্রপালক হলেন। ক্রমে মহাদেব ক্ষেত্রপাল হয়ে ৮ ভাগ হলেন। দেবী কালীর ক্রোধ প্রশমন হল। দেবী কালী তখন ভূত প্রেত পিশাচবাহিনীর সাথে নৃত্য আরম্ভ করলেন। ভগবান শিবও আনন্দে নৃত্য করতে থাকলেন। 
 
লিঙ্গপুরাণ... পূর্বভাগ...ষড়ধিকশততম অধ্যায় ( ১- ২৮ )
Share:

০১ এপ্রিল ২০২০

বাসন্তীপূজার দিন পশ্চিমবাংলার রীতি অশোক ষষ্ঠী পালনের। কি এবং কেন এই অশোক ষষ্ঠী?

বাসন্তীপূজার দিন পশ্চিমবাংলার রীতি অশোক ষষ্ঠী পালনের। কি এবং কেন এই অশোক ষষ্ঠী?
বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল ।
একদিন সেই ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে অশোকগাছের নীচে এক সদ্য প্রসূতা কন্যাকে কাঁদতে দেখলেন । দৈবযোগে ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারলেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের । ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন করতে লাগলেন । তার নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল । যৌবনে উত্তীর্ণ হল ।
এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ঐ পরমাসুন্দরী অশোকাকে একদিন দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন । ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষির আগমন হল সেই স্থানে । রাজপুত্র অশোকার পাণিপ্রার্থী হয়ে ঋষিকে অনুরোধ জানালে ঋষি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে তাতে সম্মতি দিলেন ।
অশোকাকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিয়ে ঋষি বললেন :
" আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হ'লে কন্যা । যদি কখনো বিপদে পড় আশ্রমে চলে এস । আর রাজপুরী থেকে চিনে একাএকা এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তাই এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম । এখন যাবার সময় এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও । পরে কখনো প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে উত্পন্ন অশোকগাছ বরাবর চিনে পায়েহেঁটে তুমি চলে আসতে পারবে "
অশোকফুলের বীজ সযত্নে আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সাথে পতিগৃহে যাত্রা করল । যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা । রাজপুরীতে পৌঁছালে রাজা-রাণী সস্নেহে তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন । অশোকা আর রাজপুত্রের বাড়বাড়ন্ত সংসারে সুখের বন্যা । অশোকা ক্রমে সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল । অশোকার শ্বশুর রাজামশাই মারা গেলেন শ্রাদ্ধের দিন অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা । ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা । রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে । পরদিন ভোরে উঠে দেখল সাতছেলে-বৌ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে আশোকা তা দেখে ঋষির কথা ভাবলে । রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল ।
ততদিনে বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা । ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই অশোকা ঋষিকে দেখে কেঁদে উঠলো । ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সাথে করে রাজবাড়ী ফিরে গেলেন । কমন্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে দিলেন অশোকার মৃত ছেলে বৌ নাতিপুতির গায়ে । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল ।
ঋষি বললেন অশোকষষ্টীর ব্রত পালন করলে কখনো শোক প্রবেশ করবেনা সংসারে ।
Share:

ভগবতী শঙ্করার্দ্ধশরীরিণী কে?

কূর্ম্ম পুরাণে উল্লিখিত আছে, ঋষি মুনিরা কূর্মরূপী ভগবানকে প্রশ্ন করেছিলেন- “যে শিবশক্তি প্রথমে দাক্ষায়ণী সতী হইয়া পরে হিমালয়সুতারূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন , সেই ভগবতী শঙ্করার্দ্ধশরীরিণী কে? আপনি যথাবৃন্তান্ত আমাদের বলুন।”
ভগবান কূর্ম বলছেন-
যা সা মাহেশ্বরী শক্তির্জ্ঞানরূপাতিলালসা ।
ব্যোমসংজ্ঞা পরা কাষ্ঠা সেয়ং হৈমবতী মতা ।।
শিবা সর্ব্বগতানন্তা গুণাতীতানিষ্কলা ।
একানেকবিভাগস্থা জ্ঞানরূপাতিলালসা ।।
অনন্যা নিস্কলে তত্ত্বে সংস্থিতা তস্য তেজসা ।
স্বাভাবিকী চ তন্মূলা প্রভা তানোরিবামলা ।।
একা মাহেশ্বরী শক্তিরনেকোপাধযোগতঃ ।
পরাবরেণ রূপেণ ক্রীড়তে তস্য সন্নিধৌ ।।
সেয়ং করোতি সকলং তস্যাঃ কার্য্যমিদং জগৎ ।
ন কার্য্যং নাপি করণমীশ্বরস্যেতি সুরয়ঃ ।।
চতস্রঃ শক্তয়ো দেব্যাঃ স্বরূপত্বেন সস্থিতাঃ ।
অধিষ্ঠানবশাৎ তস্যাঃ শৃণুধ্বং মুনিপুঙ্গবাঃ ।।
শান্তির্বিদ্যা প্রতিষ্ঠা চনিবৃত্তিশ্চেতি তাঃস্মৃতাঃ ।
চতুর্বহস্ততো দেবঃ প্রোচ্যতে পরমেশ্বরঃ ।।
অনয়া পরয়া দেবঃ স্বাত্মানন্দং সমশ্ন্যুতে ।
চতুর্ষ্বপি চ বেদেষু চতুর্বৃত্তির্মহেশ্বরঃ ।।
অস্যাস্ত্বনাদিসংসিদ্ধমৈশ্বর্য্যমতুলং মহৎ ।
তৎসম্বন্ধাদনন্তা সা রুদ্রেণ পরমাত্মনা ।।
সৈষা সর্ব্বেশ্বরী দেবী সর্ব্বভূতপ্রবর্ত্তিকা ।
প্রোচ্যতে ভগবান্‌ কালো হরিপ্রাণো মহেশ্বরঃ ।।
( কূর্ম্মপুরাণ/ পূর্বভাগ/ দ্বাদশ অধ্যায়/ ৬-১৫)
অর্থাৎ- ভগবান কূর্ম বলছেন, যিনি সেই জ্ঞানস্বরূপা ব্যোমসংজ্ঞা মাহেশ্বরী শক্তি , তাঁহাকেই এই হৈমবতী বলিয়া জানিবে । তিনি শিবা, সর্ব পদার্থে সম্যকরূপে অবস্থিতা, অন্তরহিতা গুণাতীতা , নিরবয়বা , একা অথচ অনেক বিভাগরূপে সংস্থিতা, জ্ঞানরূপা, অতিলালসা, অদ্বিতীয়া , ব্রহ্মতেজোরূপে পরব্রহ্মে সংস্থিতা , সূর্য্যের অমলপ্রভার ন্যায় তন্মুলা ও নিত্যা; সেই মাহেশ্বরী শক্তি একা হইয়াও উপাধিযোগে অনেকা । তিনি পরাবররূপে মহাদেবের সন্নিধানে ক্রীড়া করিতেছেন । সেই দেবীই এই সকল করিতেছেন এই জগত তাহারই কার্য্য ; পণ্ডিতেরা বলেন ঈশ্বরের কোন কার্য্য বা করণ নাই । হে মুনিপুঙ্গবগণ ! সেই দেবীর অধিষ্ঠান বশে স্বরূপত্বরূপে সংস্থিতা চারিটি শক্তি আছে । সেই হেতু দেব পরমেশ্বর চতুর্ব্যুহ বলিয়া বিখ্যাত । পরমেশ্বর এই প্রধানা দেবীর সহিতই স্বীয় আত্মানন্দ অনুভব করিয়া থাকেন । মহাদেব চারিবেদে চারিরূপে অবস্থিত । এই দেবীর যে মহৎ অতুল ঐশ্বর্য্য , তাহা অনাদি বলিয়া সংসিদ্ধ । সেই হেতু পরমাত্মা রুদ্রের যোগে ইনি অনন্তা নামে অভিহিতা । সেই এই দেবীই সর্ব্বভূতপ্রবর্ত্তিকা ও সকলের ঈশ্বরী এবং হরির প্রাণ মহেশ্বর সর্বভূতের কাল বলে কথিত হন।
Share:

মা অন্নপূর্ণা মা আদিশক্তির একটি রূপ

মা অন্নপূর্ণা মা আদিশক্তির একটি রূপ। লোকগাঁথা অনুযায়ী স্বয়ং ভগবান শিব হলেন ভিক্ষুক। একবার তিঁনি হিমালয় মহলে হিমালয় কন্যার কাছে ভিক্ষা চাইতে গিয়েছিলেন। দেবী পার্বতী, চিনতে পেরেছিলেন। তারপর ভিক্ষা দেন। আবার অন্য মতে বলা হয় একবার ভগবান শিব অন্নকে মায়া , ভ্রান্ত বলায় দেবী উমার সাথে কিছুটা দাম্পত্য কলহ হয়। দেবী তখন সকল অন্ন হরণ করেন। কাশীপুরে হলেন দেবী “অন্নদা” বা “অন্নপূর্ণা”। দুখী ক্ষুধায় কাতর জীবের জন্য খুললেন “অন্নসত্র”। এদিকে হা অন্ন রব উঠলে দেবতারা গিয়ে ভগবান শিবের শরণাপন্ন হন। ভগবান শিব ভিক্ষায় বের হয়ে কোথাও অন্ন পেলেন না। তখন মা লক্ষ্মীর কাছে অন্ন ভিক্ষা করতে গিয়ে শোনেন সেখানেও অন্ন নেই। দেবী লক্ষ্মী অন্নপূর্ণার কথা শোনালে , ভগবান শিব অন্নপূর্ণার কাছে ভিক্ষা চান। দেবী অন্নপূর্ণা তখন ভগবান শিবকে অন্ন ভিক্ষা দিলেন। ভগবান শিবের ইচ্ছায় দেবশিল্পী কাশীতে অন্নপূর্ণার মন্দির গড়লেন। কিছু কিছু মতে কাশী সতীপীঠের দেবী রূপে অন্নপূর্ণা ও ভৈরব বিশ্বনাথের উল্লেখ আছে ।
উপনিষদে আছে অন্নই ব্রহ্ম। অন্নকে ত্যাগ করে কিছুই হয় না। সত্যি অন্ন ব্যাঞ্জন নষ্ট করা পাপ। জীব স্বরূপত শিব। ভিক্ষুক – ক্ষুধায় কাতরকে অন্ন দান করা কর্তব্য। দেবাদিদেব নিজেই ভিক্ষুক রূপে এসেছিলেন দেবীর কাছে। অন্নের তুলনা হয় না। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাঠ ভরে ওঠে সোনালী ধানে। মা অন্নপূর্ণার বাস্তবিক রূপ। আর লাঙল টানার প্রতীক বলদ হয়েছেন তাই মায়ের বাহন । রায়গুনাকর ভারতচন্দ্র ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভাকবি। কবি সুন্দর ছন্দে দেবী অন্নপূর্ণার , ভগবান শিবকে অন্ন পরিবেশন বর্ণনা করেছেন।
অন্নপূর্ণা দিলা শিবেরে অন্ন।
অন্ন খান শিব সুখ- সম্পন্ন ।।
কারণ অমৃত পুরিত করি ।
রত্নপাত্র দিলা ঈশ্বরী ।।
সঘৃত পলান্নে পুরিয়া হাতা ।
পরশেন হরে হরিষে মাতা ।।
পঞ্চমুখে শিব খাবেন কত ।
পুরেন উদরে সাধের মতো ।।
Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৮

দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয়জন হলেন দেবী তারা



কিছু কিছু জনের মতে তারাপীঠকে শক্তিপীঠ ধরা হয় । দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয়জন হলেন দেবী তারা । ভগবতী সতী মায়ের তিনটি নয়নের মণি বিন্দু বত্রিশ যোজন অন্তর ত্রিকোনাকারে তিনটি স্থানে পতিত হয়েছিলো । মিথিলার পূর্ব- দক্ষিণ কোণে ভাগীরথীর উত্তরদিকে ত্রিমুখী নদীর পূর্বে সতী দেবীর বাম নয়নের মণি পতিত হয়েছিলো । সেজন্য এই স্থানের নাম “নীল সরস্বতী তারাপীঠ” । বগুড়া জেলায় করতোয়া নদীর পশ্চিমে সতীর দক্ষিণ নয়নের মণি পতিত হয়েছিলো এইস্থান কে বলা হয় “মহাদেবী ভবানী তারাপীঠ” । বক্রেশ্বরের ঈশান কোনে উত্তর বাহিনী দ্বারকা নদীর পূর্ব তীরে মহা শ্মশানে শ্বেত শিমূল বৃক্ষ তলে দেবী সতীর ঊর্ধ্ব নয়ন তারা পতিত হয় । এই স্থানকে “শিলাময়ী দেবী চণ্ডী ভগবতী উগ্র তারা” বলা হয় । ব্রহ্মার মানসপুত্র মহর্ষি বশিষ্ঠ বহু যুগ ধরে নীলাচলে তারাদেবীর সাধনা করে সিদ্ধিলাভে ব্যর্থ হয়েছিলেন । এরপর পিতা ব্রহ্মার আদেশে বশিষ্ঠ মুনি কামাখ্যা শক্তিপীঠে গিয়ে তারা উপাসনায় ব্রতী হয়ে সেখানেও নিস্ফল হলেন। তখন ক্রোধে বশিষ্ঠ মুনি তারাবীজকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে দেবী দৈববাণী করে জানালেন- “তুমি আমার সাধনার আচার পদ্ধতি জানো না, তাই ব্যর্থ হয়েছো। তুমি মহাচীনে বিষ্ণু অবতার বুদ্ধের নিকট যাও। তিনি তোমাকে আমার সাধনার পথ বলে দেবেন।”




বশিষ্ঠ মুনি এরপর ভগবান বুদ্ধের কাছে সাধনার আচার পদ্ধতি শিখলেন । ভগবান বুদ্ধ তাঁকে বক্রেশ্বরের ঈশাণ কোনে বৈদ্যনাথ ধামের পূর্ব দিকে দ্বারকা নদীর পূর্ব তীরে শ্বেত শিমূল বৃক্ষ তলে সাধনার আদেশ দিলেন । এই সাথে বলে দিলে সেখানেই তোমার আরাধিতা দেবী শিলাময়ী রূপে আছেন। ভগবান বুদ্ধের নির্দেশ মেনে মহামুনি বশিষ্ঠ সেই স্থানে এসে তারা সাধনা শুরু করলেন । কোজাগোরী লক্ষ্মী পূজার পূর্ব দিন অর্থাৎ শুক্লা চতুর্দশী তে মুনি তাঁর আরাধ্য তারা দেবীর দর্শন পেলেন । বশিষ্ঠ মুনির সাধনার সেই পঞ্চমুণ্ডি আসনে পরবর্তী কালে নাটোরের রাজা রামকৃষ্ণ, আনন্দনাথ , পণ্ডিত মোক্ষদানন্দ , সাধক বামাক্ষ্যাপা এই আসনে বসে সিদ্ধ হয়েছিলেন ।
Share:

০১ ডিসেম্বর ২০১৭

দেবী মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবণে কী ফল ?

দেবী মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবণে কী ফল, শ্রীশ্রীচণ্ডীর দ্বাদশ অধ্যায়ে সব কথা দেবীর নিজের শ্রীমুখেই বলেছেন। বিশ্বাস করলেই ফল পাওয়া যায়, কারণ শাস্ত্র বিশ্বাসীর জন্য, অবিশ্বাসীর জন্য নয়। দেবীর কথাগুলো আমাদের মত বিশ্বাসীর জন্য বেদবাক্য ও একমাত্র অবলম্বন। সত্যস্বরূপা তিনি, সুতরাং দেবীর কথাও মূর্তিমান সত্য। জ্ঞানস্বরূপা তিনি, সুতরাং দেবীর কথাও জ্ঞানময়। আনন্দস্বরূপা তিনি, সুতরাং দেবীর কথাও আনন্দের মূর্তি, আনন্দের খনি।
-
শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী বলেছেন -----
তস্মান্মমৈতন্মাহাত্ম্যং পঠিতব্যং সমাহিতৈঃ।
শ্রোতব্যঞ্চ সদা ভক্তা পরং স্বস্ত্যয়নং হি তৎ।।'' (১২/৭)
-
------ ‘অতএব আমার এই মাহাত্ম্য সমাহিতচিত্তে নিত্য ভক্তিপূর্বক পাঠ বা শ্রবণ করা কর্তব্য। কারণ তাহা অতিশয় মঙ্গলজনক’। ‘অতিশয় মঙ্গলজনক’--এই চণ্ডীর কথা আলোচনা করলে আমাদের কী লাভ এখন তা দেখা যাক ----
-
প্রথম লাভ—কল্যাণ (ঐহিক ও পারত্রিক)
দ্বিতীয় লাভ—পাপনাশ ও পাপজনিত আপদ নাশ।
তৃতীয় লাভ—দারিদ্রনাশ।
চতুর্থ লাভ—প্রিয়বিয়োগ নাশ।
পঞ্চম লাভ—শত্রু, দস্যু, রাজা, শস্ত্র, অগ্নি ও জলপ্রবাহ থেকে সমস্ত ভয় নাশ।
ষষ্ঠ লাভ—মহামারীজনিত সর্বপ্রকার উপদ্রব ও ত্রিবিধ উৎপাত দমন।
সপ্তম লাভ—দেবীর প্রসন্নতা ও সন্নিধি।
অষ্টম লাভ—নির্ভীকতা।
নবম লাভ—শত্রুক্ষয়।
দশম লাভ—বংশের উন্নতি।
একাদশ লাভ—শান্তিকর্মে সিদ্ধি।
দ্বাদশ লাভ—গ্রহশান্তি।
ত্রয়োদশ লাভ—দুঃস্বপ্ন সুস্বপ্নে পরিণতি।
চতুর্দশ লাভ— ডাকিনী ও পূতনাদি বালগ্রহ দ্বারা আক্রান্ত শিশুগণের শান্তিলাভ।
পঞ্চদশ লাভ—বৈরভাব দূরীকরণ ও মিত্রতা স্থাপন।
ষোড়শ লাভ—রাক্ষস, ভূত ও পিশাচগণের বিতাড়ন।
সপ্তদশ লাভ—আরোগ্য।
অষ্টাদশ লাভ—শুভ মতি লাভ অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধি হয় ।
ঊনবিংশ লাভ—সমস্ত সঙ্কট হতে মুক্তি।

Prithwish Ghosh


Share:

০৫ অক্টোবর ২০১৭

সন্ধিপূজা

দুর্গাপূজায় অষ্টমীর শেষ ও নবমী তিথির প্রথম দণ্ডে ৪৮ মিনিট কেই "সন্ধিপূজা" বলা হয়। এই সময় দেবী দুর্গার মধ্যে "চামুণ্ডা" দেবীর আবির্ভাব ঘটে । এই সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা করা হয়। সন্ধিপূজা যথাবিহিত সুসম্পন্ন হলে দুর্গাপূজা সার্থক হয়েছে বলা চলে। এই সময় দেবীর ধ্যান, দেবীর লীলা চিন্তন স্মরণ , বীজ মন্ত্র জপ করলে তা অতি উত্তম হয় ।

কে এই দেবী চামুণ্ডা! শুম্ভ নিশুম্ভ বধ করতে দেবী পার্বতীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে কৌশিকী দেবী প্রকট হন। এই কৌশিকী দেবীকে পরাজিত করবার মানসে শুম্ভ ও নিশুম্ভ চণ্ড ও মুণ্ড নামক মহাসুর দ্বয়কে প্রেরণ করে। চণ্ড মুণ্ডকে সেনা সহ আসতে দেখে দেবী কৌশিকী ভ্রুকুটি থেকে দেবী চামুণ্ডার আবির্ভাব হয়। তিনি বিচিত্র নর কঙ্কাল ধারিনী, নৃমুণ্ডমালিনী, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা , অস্থি চর্ম সার দেহ দেবীর। অতি ভীষনা , বিশাল বদনা , লোলজিহ্বা , ভয়ঙ্করী , কোটর গতা , আরক্ত চক্ষু বিশিষ্টা এবং সিংহ নাদে দিক মণ্ডল পূর্ণ কারিনী । সেই ভয়ংকরা দেবী ভীষন হুঙ্কার দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন । সেই দেবী প্রচুর অসুর সেনাকে মূঠে মূঠে তুলে চিবিয়ে খেতে লাগলেন ।

 অসুরেরা যত অস্ত্র দেবীর পানে নিক্ষেপ করল , দেবীর শরীরে লাগতেই অস্ত্র গুলো ভেঙ্গে যেতে লাগল । দেবী হাজারে হাজারে অসুর সেনাদের ভক্ষণ করতে লাগলেন । রথ , অশ্ব , হাতী গুলোকে ধরে মুখে নিয়ে তা চিবিয়ে খেতে লাগলেন । রক্তে তার দন্ত গুলি লাল হয়ে গেল । কত গুলি অসুরকে দেবী তার চরণ ভারে পিষে বধ করলেন । কোন কোন অসুর দেবীর খড়গের আঘাতে মারা গেল । আবার কিছু অসুর দেবীর দাতে চর্বিত হয়ে মারা গেলো । যুদ্ধক্ষেত্রে এই ভাবে দেবী অসুর দের ধ্বংস করে ফেললেন ।

এ দেখে চণ্ড অসুর হাজার হাজার চক্রাস্ত্র নিক্ষেপ করে দেবীকে আচ্ছন্ন করে ফেললেন । বাণের প্রভাবে সূর্য ঢাকা পড়ল । দেবী তখন তার খড়গ তুলে ‘হং’ শব্দ করে চন্ডের দিকে ধেয়ে গেল । দেবী চন্ডের চুলের মুঠি ধরে এক কোপে চণ্ডের শিরোচ্ছেদ করে ফেললেন । চন্ড অসুর বধ হল ।
চন্ড নিহত হয়েছে দেখে ক্রোধে মুন্ড দেবীর দিকে ধেয়ে গেলো । দেবী তার রক্তাক্ত খড়গ দিয়ে আর এক কোপে মুন্ড এর শিরোচ্ছেদ করলেন । এভাবে মুণ্ড বধ হল । বাদবাকী জিবীত অসুর রা এ দেখে ভয়ে পালালো । দেবতারা আনন্দে দেবীর জয়ধ্বনি করলেন ।

দেবী চন্ড আর মুণ্ড এর ছিন্ন মস্তক নিয়ে দেবী মহামায়ার কাছে এসে বিকট অট্টহাসি হেসে বললেন – “ এই যুদ্ধরূপ যজ্ঞে আমি আপনাকে চন্ড ও মুন্ড নামে দুই মহাপশুর মস্তক উপহার দিলাম । এখন আপনি নিজেই শুম্ভ ও নিশুম্ভ কে বধ করবেন ।”

দেবী অম্বিকা মধুর স্মরে বললেন – “ হে দেবী , যেহেতু তুমি চন্ড ও মুণ্ডের বধ করে মাথা দুটি আমার নিকট নিয়ে এসেছো , সেজন্য আজ থেকে তুমি জগতে ‘চামুন্ডা’ নামে বিখ্যাত হবে ।”

চামুণ্ডার ধ্যান
= = = = =
কালী করালবদনা বিনিস্ক্রান্তসিপাশিনী ।।
বিচিত্র- খট্টাঙ্গধরা নরমালাবিভূষণা ।
দ্বীপিচর্ম- পরীধানা শুস্কমাংসাতিভৈরবা ।।
অতিবিস্তারবদনা জিহ্বাললনভীষণা ।
নিমগ্নারক্তনয়না নাদাপূরিতদিঙমুখা ।।
Like us: সনাতন সন্দেশ - Sanatan Swandesh
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।