• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

পরমেশ্বর ভগবান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পরমেশ্বর ভগবান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৫ মে ২০২২

ভগবান, ঈশ্বর ও ব্রহ্ম --২

 এই বার আসব শ্রীকৃষ্ণ যে ভগবান তার শাস্ত্রীয় কিছু সামান্য প্রমান দিয়ে ---


আমরা জানি যে 'যা নেই মহাভারতে তা নেই ভারতে', তাই প্রথমেই মহাভারতে চলুন, ভীষ্মপর্বে। ভীষ্মদেব দেহত্যাগ করবেন, শরশয্যায় শুয়ে আছেন, পাণ্ডবেরা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সকলে দাঁড়িয়ে। তাঁরা দেখলেন যে, ভীষ্মদেবের চোখ দিয়ে জল পড়ছে। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, ‘ভাই, কি অশ্চর্য! পিতামহ, যিনি স্বয়ং ভীষ্মদেব, সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, জ্ঞানী, অষ্টবসুর এক বসু, তিনিও দেহত্যাগের সময় মায়াতে কাঁদছেন।’

শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মদেবকে এ-কথা বলাতে তিনি বললেন, ‘কৃষ্ণ, তুমি বেশ জানো, আমি সেজন্য কাঁদছি না! যখন ভাবছি যে, যে পাণ্ডবদের স্বয়ং ভগবান নিজে সারথি, তাদেরও দুঃখ-বিপদের শেষ নাই, তখন এই মনে করে কাঁদছি যে, ভগবানের কার্য কিছুই বুঝতে পারলাম না।’

তারপর বললেন --

যশ্চ মানুষমাত্রোহ‘য়মিতি ব্রুয়াৎ স মন্দধীঃ৷

হৃষীকেশমবিজ্ঞানাত্তমাহু পুরষাধমম্৷৷ --(মহাভারত, ভীষ্মপর্ব, ৬৫/১৯)

—“যে লোক অজ্ঞানবশতঃ এই হৃষীকেশকে মানুষমাত্র বলিবে সে মন্দবুদ্ধি, সকলে তাকে ‘নরাধম’ বলিবে"৷ তো স্বয়ং গঙগাপূত্র, জ্ঞানী, ব্রহ্মচারী, বিবেচক মহাযোদ্ধা, জ্ঞানবৃদ্ধ ভীষ্মের উপলব্ধির কি কোনও মূল্য নেই!

আবার আসি মহাভারতের যুদ্ধকালীন একটি প্রসঙ্গে। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ তখন ভরষন গতিতে চলছে। এমন একটি দিন আসে যখন অর্জুন ও কর্ণ পরস্পরের সামনা সামনি হয়ে পড়ে।

যুদ্ধ চলাকালীন, অর্জুনের একটা তীর লেগে কর্ণের রথ ২৫/৩০ হাত পিছনে ছিটকে পড়ে। আর এদিকে কর্ণের একটা তীরের আঘাতে অর্জুনের রথ কেবল ২/৩ হাত পিছনে যায়।

আর তা দেখে শ্রীকৃষ্ণ দুহাত তুলে, "বাহ্ কর্ণ বাহ্" বলে কর্ণের লক্ষ্যভেদের প্রশংসা করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণের এরূপ আচরণে অর্জুনের মধ্যে জেদ চলে আসে। তিনি আরও দূর্বার বেগে আঘাত করতে থাকেন। বার বার আঘাত করে কর্ণের রথকে পিছে নিতে থাকেন। কিন্তু তাঁর এই পরাক্রম দেখা সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণ চুপ করে থাকেন। কিন্তু যেই কর্ণের তীর ছুঁড়ে অর্জুনের রথকে ২/৩ হাত পিছনে সরিয়ে দেয়, ঠিক তখনই শ্রীকৃষ্ণ অতি উৎসাহের সাথে বলে উঠেন, "বাহ্ কর্ণ বাহ্, তোমার লক্ষ্যভেদের তুলনা নেই"।

এভাবে বার বার শ্রীকৃষ্ণকে কর্ণের পক্ষে প্রশংসা করতে শুনে অর্জুন অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করেন, "হে কেশব! তুমি আমার এমন পরাক্রম দেখা সত্ত্বেও আমার প্রহারের প্রশংসা না করে কর্ণের ওই দুর্বল প্রহারের প্রশংসা করে চলেছ। কেন কেশব? কেন এমন পক্ষপাত করছ তুমি? তোমার এমন আচরণ আমার হৃদয়কে বড় ব্যথিত করে তুলেছে।"

শ্রীকৃষ্ণ মুচকি হেসে বললেন, "হে পার্থ! তোমার রথকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, রথের ধ্বজায় হনুমান, চক্র তথা চাকায় শেষনাগ আর সারথি রূপে স্বয়ং নারায়ণ আছে। তা সত্ত্বেও যদি কারও প্রহারের ফলে এই রথ এক চুল পরিমাণও নড়ে ওঠে, তবে তা কিন্তু কোন সাধারণ বিষয় নয়। আর এখানে তো কর্ণের একটি প্রহারের চোটে তা ২/৩ হাত পিছনে চলে যাচ্ছে, তবে কি কর্ণের প্রশংসা পাওয়া উচিত নয়? এমন বীরের তো প্রশংসা করতেই হয়।"

শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনে তখনকার মত অর্জুন চুপ হয়ে গেলেও মন থেকে তা মেনে নিতে পারেননি। আর এদিকে অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরেও চুপ করেছিলেন।

যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর যখন রথ থেকে নামার সময় হয় তখন শ্রীকৃষ্ণ সর্বপ্রথম অর্জুনকে রথ থেকে নামতে বলেন। অর্জুন নেমে যাওয়ার পর শ্রীকৃষ্ণ রথের ঘোড়াগুলিকে মুক্ত করে সর্বশেষ নিজে রথ থেকে অবতরণ করেন।

শ্রীকৃষ্ণ রথ থেকে নামার সাথে সাথেই রথে আগুন জ্বলে উঠে। তারপর মুহুর্তের মধ্যেই তা ভষ্ম হয়ে যায়।

প্রকৃতপক্ষে রথটি কিন্তু কর্ণের প্রহারে অনেক আগেই ভষ্ম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু রথের উপরে স্বয়ং ভগবান বিরাজমান ছিলেন, তাই ভষ্ম হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রথটি চলমান ছিল।

এই দৃশ্য দেখার পর অর্জুন সমস্ত বিষয়টি বুঝতে পারেন, এবং তাঁর মনের সকল অহংকার মুহুর্তের মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। অর্জুনের দর্প হরণ করেছিলেন বলে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম রাখেন "দর্পহারী"।

এভাবে আমাদের দর্পহারী শ্রীহরি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কেবল বাইরের দৃশ্যমান শত্রুকেই নয় বরং অর্জুনের মনে দখল করে থাকা "দর্প" নামক শত্রুকেও বিনাশ করেন এবং আমরা তাঁর ভগবত্তা বুঝতে পারি।

এই বার আসুন ভাগবতে ---

অবতারা হ্যসংখ্যেয়া হরেঃ সত্ত্বনিধের্দ্ধিজাঃ ।

যথাবিদাসিনঃ কুল্যাঃ সরসঃ স্যুঃ সহস্রশঃ ।। (ভাগবত ১/৩/২৬)

অনুবাদ --- হে ব্রাহ্মণগণ! বিশাল জলাশয় থেকে যেমন অসংখ্য নদী প্রবাহিত হয়, ঠিক তেমনই ভগবানের থেকে অসংখ্য অবতার প্রকাশিত হন ।

আবার ভাগবতে দেখি --

“এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্

ইন্দ্রারিব্যাকুলং লােকং মৃড়য়ন্তি যুগে যুগে”॥ (ভাগবত ১/৩/২৮)

অনুবাদ --- পূর্বোল্লিখিত এই সমস্ত (বিষ্ণুর) অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা কলা অবতার, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। যখন নাস্তিকদের অত্যাচার বেড়ে যায় তখন আস্তিকদের রক্ষা করার জন্য ভগবান এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন ।

শ্রীব্রহ্মসংহিতায় ব্রহ্মা বলছেন---

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহ।

অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্॥

অনুবাদ --- ভগবান শ্রীকৃষ্ণই হলেন একমাত্র ইশ্বর, তাঁর বিগ্রহ সৎ, চিৎ এবং আনন্দময়। তিনি আদিপুরুষ গোবিন্দ এবং সর্বকারণের কারণ॥

মহাপ্রভু উল্লেখ করেছেন---

একেলা ঈশ্বর কৃষ্ণ আর সব ভৃত্য।

যারে যৈছে নাচায় সে তৈছে করে নৃত্য॥

পূর্ববর্তী মহাজনগণ শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলে স্বীকার করে আসছেন।

আর সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা অংশের প্রকাশ, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান। তাই শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের আদিরূপ। তিনিই হচ্ছেন পরম সত্য, তিনিই হচ্ছেন পরমাত্মা ও নির্বিশেষ ব্রহ্মের উৎস।

পরমহংস শিরোমণি শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে (২/৮৮) বলেছেন –

যাঁর ভগবত্তা হৈতে অন্যের ভগবত্তা।

‘স্বয়ং ভগবান’- শব্দের তাহাতেই সত্তা।। -- চৈতন্য চরিতামৃত (২/৮৮)

অর্থাৎ “যাঁর ভগবত্তা থেকে অন্যের ভগবত্তা প্রকাশ পায়, তাঁকেই ‘স্বয়ং ভগবান’ বলা যায় । তাঁর মধ্যেই সেই সত্তা বিরাজমান।”

পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেব বা শ্রীকৃষ্ণ, যিনি বসুদেবের পুত্র অথবা নন্দ মহারাজের পুত্র বলে প্রসিদ্ধ, তিনি সর্ব ঐশ্বর্যে পূর্ণ -- তিনি সমগ্র ঐশ্বর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র বীর্য, সমগ্র শ্রী, সমগ্র জ্ঞান এবং সমগ্র বৈরাগ্য তার মধ্যে পূর্ণরূপে বিরাজমান ছিল।

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বর্যের একটি অংশ নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপে প্রকাশিত এবং অপর একটি অংশ পরমাত্মারূপে প্রকাশিত। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেই পুরুষ রূপ হচ্ছে আদি পরমাত্মা।

সনাতন দর্শনানুযায়ী জড় সৃষ্টিতে তিনটি পুরুষ রূপ রয়েছে, যারা কারণােদকশায়ী বিষ্ণু, গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু এবং ক্ষীরােদকশায়ী বিষ্ণু নামে পরিচিত। এই তিন বিষ্ণুই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অংশকলা। বিষ্ণু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বাংশ অর্থাৎ স্বয়ং ভগবান তাই বিষ্ণু আর কৃষ্ণের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

'এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্।' অর্থাৎ ভগবানের সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন পুরুষাবতারদের অংশ অথবা কলা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান।

উক্ত দুটি শ্লোকগুলিতে ব্যবহৃত ‘ভগবান্’ বলতে কি বুঝায় তা এবার আলোচনা করব। ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ঐশ্বর্য বা গুণশক্তি।

ঐশ্বর্যস্য সমগ্রস্য বীর্যস্য যশসঃ শ্রিয়ঃ।

জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব ষন্নং ভগ ইতীঙ্গনা।। (বিষ্ণু পুরাণ ৬/৫/৭৪)

অর্থাৎ “সমগ্র ঐশ্বর্য্য, সমগ্র বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র শ্রী (সৌন্দর্য ও সম্পত্তি) সমগ্র জ্ঞান, এবং সমগ্র বৈরাগ্য এই ছয়টি মহাশক্তির নাম ‘ভগ’। সুতরাং এই সকল মহাশক্তি যাতে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে বর্তমান তিনিই ভগবান।”

এই শ্লোক দ্বারা প্রমাণিত হয় যে ঐশ্বর্যাদি ষড়বিধ মহাশক্তিসম্পন্ন সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান। এই ঐশ্বর্যাদি বলতে কি বুঝায় তা আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করা নিই –


ঐশ্বর্য --- ঐশ্বর্য অর্থে সর্ববশীকারিতা – যে শক্তিতে কেবল ঈশ্বরের ভাব প্রকাশিত হয়। ঈশ্বর বলতে ‘কর্তুমকর্তুং অন্যথা কর্তুং সমর্থঃ।’ সুতরাং যে শক্তি সকলকে বশীভূত করতে পারে তারই নাম ঐশ্বর্য ।

শ্রীভগবানের কূর্ম, বরাহ, রাম, নৃসিংহাদি স্বাংশ স্বরূপের মধ্যে ঐশ্বর্যের প্রকাশ থাকলেও তাঁর পরিপূর্ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহে পূর্ণ মাধুর্যের প্রকাশ। তাঁর লীলায় এই মাধুর্য প্রকাশের আধিক্য থাকার জন্যই ভক্তরা তাঁর সম্বন্ধে ঐশ্বর্যজ্ঞানহীন শুদ্ধভক্তি দ্বারা তাতে প্রাণ মন ঢেলে সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। সেই জন্য যে লীলা তিনি নরলীলাভাবে প্রকাশ করেছেন এবং এই মনুষ্যভাবের যে লীলাতে মধুরভাবে প্রকাশ হয় সেটিই তাঁর মাধুর্য লীলা। আর

এই ‘মাধুর্য ভগবত্তা সার’। শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ, যিনি শাশ্বত কাল ধরে, সম্পূর্ণভাবে সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী। শ্রীকৃষ্ণই পূর্ণ ঐশ্বর্যসম্পন্ন পরমপুরুষ, পরমেশ্বর ভগবান। পূর্ণমাত্রায় ঐশ্বর্য সমূহের অধিকারী হওয়ার শ্রীকৃষ্ণ পরম আকর্ষক, তিনি সর্বাকর্ষক পরমপুরুষ, সেজন্যই তাঁর নাম ‘কৃষ্ণ’, যিনি সকলকে আকর্ষক-পূর্বক আনন্দ প্রদান করেন।


বীর্য (পরম শক্তিমান) --- বীর্য অর্থে শ্রীভগবানের অচিন্ত্য মহাশক্তি প্রকাশক পরাক্রমকে বুঝায়। এই পরাক্রম তাঁর মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, রাম, নৃসিংহাদি অবতারে প্রকৃষ্টরূপে প্রকাশিত হয়েছে। শ্রীরামচন্দ্র অবতারে তাঁর তাড়কাবধ, হরধনু ভঙ্গ, লঙ্কাবিজয় প্রভৃতিতে সম্পূর্ণ বীর্য অর্থাৎ পরাক্রমের প্রকাশ পেয়েছে। পরিপূর্ণ স্বরূপ কৃষ্ণ অবতারেও দাবাগ্নি ভক্ষণ, কংস রঙ্গালয় এবং অবশেষে তার দন্তোৎপাটন করে তা দ্বারা হস্তীপালকসহ হস্তীকে সংহার। প্রবল পরাক্রান্ত জরাসন্ধের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত করে রুক্ষ্মিণীকে রথে আরোহণ করিয়ে তাঁর পাণিগ্রহন-সবই শ্রীকৃষ্ণের অমিত পরাক্রমের পরিচয় । শ্রীকৃষ্ণের অন্যান্য লীলায়ও তাঁর অত্যদ্ভূত ঐশ্বর্য ও বীর্যের প্রকাশ থাকলেও অধিকাংশ

স্থলে তা মাধুর্যমন্ডিত-তাঁর নরলীলার অতিক্রম করেনি।

শ্রীভগবানের কৃষ্ণলীলায় যেমন পূতনা রাক্ষসী বধের বৃত্তান্ত পাওয়া যায়, তেমনই তাঁর রামলীলাতেও তাড়কা রাক্ষসীর বধের বৃত্তান্ত আছে। কিন্তু পূতনাবধে যে অচিন্ত্য মহাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় অন্যলীলায় সেরকম নয় । দুই বৃত্তান্তেই রাক্ষসীবধ-কিন্তু রামলীলায় শ্রীরামচন্দ্র বিশ্বামিত্রের নিকট অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন এবং সেই বজ্রতেজসম্পন্ন অস্ত্রদ্বারা তাড়কাকে নিহিত করেছিলেন।

কৃষ্ণলীলায় পূতনাবধকালে কোনো অস্ত্রশিক্ষার প্রয়োজন হয়নি; তিনি ৬ দিন মাত্র বয়সে শৈশব অবস্থায় স্তন চুষতে চুষতেই বিরাট দেহধারী পূতনাকে বধ করেছিলেন।

কৃষ্ণলীলায় যেমন গোবর্ধন ধারণ বৃত্তান্ত দেখা যায় তেমনই তাঁর কূর্মলীলায় কূর্ম-মূর্তিতে মন্দার পর্বতকে পৃষ্ঠে ধারণ করেছিলেন। কিন্তু কূর্মলীলায় সেই মন্দার পর্বতকে ধারণ করার জন্য তাঁর পৃষ্ঠদেশকে এক লক্ষ যোজন বিস্তৃত করতে হয়েছিল।

পক্ষান্তরে, কৃষ্ণলীলায় যখন তিনি মাত্র সাত বছর বয়স্ক বালক তখন তাঁর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল দ্বারা ক্রমাগত ৭ দিন পর্যন্ত বিশাল গোবর্ধন পর্বতকে ধারণ করে দন্ডায়মান ছিলেন । রাসলীলা আরম্ভে শ্রীকৃষ্ণ বংশীধ্বনি করলেন। ঐ ধ্বনি ৮৪ ক্রোশ ব্যাপী ব্রজমন্ডলে ব্যাপ্ত হল। যেখানে যত প্রেমবতী ব্রজাঙ্গনা ছিলেন তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের মধুর বংশীধ্বনিতে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে এলেন।

‘জগৌ কলং বামদৃশাং মনোহরম’ -- (ভাগবত ১০/২৯/৩) অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ সুলোচনা ব্রজাঙ্গনাদের মনোহারী মধুর বেণুসঙ্গীত আরম্ভ করলেন। সুতরাং বুঝা যায় একমাত্র প্রেমবতী গোপাঙ্গনারাই কেবল সেই মধুর ধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। সেটি শ্রীকৃষ্ণের অচিন্ত্য মাধুর্য, ঐশ্বর্য ও বীর্যশক্তির পরিচয়। কৃষ্ণ যখন মাতা যশোদাকে তার মুখের ভিতর অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড বা বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু অনেকে বলে কিভাবে সম্ভব। অনন্তকোটি বিশ্বব্রহ্মান্ড ছোট্ট শিশুর মুখে! প্রকৃতপক্ষে এইসব কৃষ্ণের ভগবত্তা। উদাহরণ স্বরূপঃ একটি ছোট্ট মোবাইল স্ক্রীনে যদি ইন্টারনেট, টিভি, সিনেমা, গান মোটকথা পুরো বিশ্বের সব কিছুই দেখা যাই তাহলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে কেন নই। শ্রীকৃষ্ণই যে একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান তাঁর প্রমাণ তাঁর অদ্ভূত লীলার আলোকে প্রমাণ করা যায়।


যশ --- শ্রীভগবানের যশ, তাঁর সদগুণ, খ্যাতি, ভক্তবাৎসল্য, প্রেমাধীনতা প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণলীলায় এই যশ আরও মাধুর্যমন্ডিতভাবে প্রকাশিত। রাম নৃসিংহাদি লীলায় তিনি অসুর বিনাশ করেছিলেন। কিন্তু কাউকেও মুক্তি প্রদান করেননি। একমাত্র কৃষ্ণলীলায় তিনি তাঁর হাতে নিহত অসুরদেরকে মুক্তি প্রদান করে ‘হতারিগতি দায়কত্ব’ যশ লাভ করেছিলেন।

বিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত আছে বৈকুন্ঠপার্ষদ জয়-বিজয়, সনক-সনাতনাদির অভিশাপে অসুর দেহ লাভ করে যথাক্রমে হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ, রাবণ ও কুম্ভকর্ণ এবং অবশেষে শিশুপাল ও দন্তবক্র রূপে জন্মগ্রহণ করেন। হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের হাতে নিহত হওয়ার সময় নৃসিংহদেবকে ভগবান বলে ধারণা করতে পারেনি, অদ্ভূত জীব বলেই ধারণা করেছিল। রজোগুণাক্রান্ত

চিত্তে নৃসিংহদেবের পরাক্রমমাত্র চিন্তা করতে করতে নিহিত হয়েছিল। তাই পরজন্মে রাবণ হয়ে জন্মগ্রহণ করে ত্রৈলোক্যের ঐশ্বর্য লাভ করতে পেরেছিল।

নৃসিংহদেবের ভগবত্তা চিত্তের আবেশ না হওয়ায় সংসার মুক্তিও লাভ করতে পারেনি। রাবণরূপে জন্মগ্রহণ করেও কামাসক্ত ছিল এবং শ্রীরামচন্দ্রের পত্নী জানকীকে সাধরণ জীব মনে করে ভোগ করবার জন্য প্রয়াসী হয়েছিল। তাই

শ্রীরামচন্দ্রের হাতে নিহিত হয়ও শিশুপাল রূপে চেদিরাজকুলে জন্মগ্রহণ করে অতুল ঐশ্বর্য ভোগেরই অধিকারী হল। কিন্তু এজন্মে শিশুপাল তার পূর্ব জন্মের সঞ্চিত দ্বেষবশতঃ নিরন্তর কৃষ্ণকে নিন্দা করত-শয়নে, স্বপনে, আহারে, বিহারে নিন্দাচ্ছলে কৃষ্ণনাম করে শ্রীভগবানের সর্ববিধ নাম গ্রহণ করত। শুধু নামগ্রহণ নয় নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি তার হৃদয়ে উদ্ভাসিত থাকত। নিরন্তর এই কৃষ্ণনামোচ্চারণ ও কৃষ্ণের রূপচিন্তায় তার সর্ববিধ দোষ স্খলিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এতেই বুঝা যায় যে, শ্রীভগবানের সর্ববিধ মূর্তিতেই তাঁর ঐশ্বর্য বীর্যাদি মহাশক্তি বর্তমান থাকলেও একমাত্র স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিতে সেইসবের পূর্ণ বিকাশ এবং এই লীলায় শ্রীভগবান অসুরদেরকে চিরতরে সংসার বন্ধন হতে মুক্তিদান করে হতারিগতিদায়করূপ অতুলনীয় অংশের প্রকাশ করেছিলেন।


শ্রী (রূপবত্তা) --- শ্রী অর্থে সৌন্দর্য ও সম্পদ দুই’ই হতে পারে। সমগ্র শ্রী অর্থে সৌন্দর্য বুঝালে শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্য যে সর্ববিস্ময়কারিণী তা ভাগবতে (৩/১১/১২) বর্ণিত আছে।

যন্মর্ত্যলীলৌপয়িকং স্বযোগ-মায়াবলং দর্শয়তা গৃহীতম্।

বিস্মাপনং স্বস্য চ সৌভগর্দ্ধেঃ পরং পদং ভূষণভূষণাঙ্গম্ ।।

অর্থাৎ ভগবান এই জগতে স্বীয় যোগামায়াবলে প্রকটিত হয়েছেন। সেই মূর্তি মর্ত্যলীলার উপযোগী; তা এতই মনোরম যে, তাতে কৃষ্ণের নিজেরও বিস্ময় হয়-তা সৌভাগ্যের পরাকাষ্ঠা এবং সমস্ত সুন্দরের সুন্দর অর্থাৎ সমস্ত লৌকিক দৃশ্যের মধ্যে পরম অলৌকিক।

শ্রীচৈতণ্য চরিতামৃতে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বর্ণনা করেছেন ---

সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য, মাধুর্য, বৈদগ্ধ্য-বিলাস।

ব্রজেন্দ্রনন্দনে ইহা অধিক উল্লাস।।

গোবিন্দের মাধুরী দেখি’ বাসুদেবের ক্ষোভ।

সে মাধুরী আস্বাদিতে উপজয় লোভ।।

মথুরায় যৈছে গন্ধর্বনৃত্য-দরশনে।

পুনঃ দ্বারকাতে যৈছে চিত্র-বিলোকনে।। (চৈঃ চঃ মধ্য লীলা ২০/১৭৮, ১৭৯, ১৮১)

অর্থাৎ সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য, মাধুর্য, বৈদগ্ধবিলাস আদি গুণগুলি বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ থেকে ব্রজন্দনন্দন কৃষ্ণে অধিক উপাদেয়। গোবিন্দের মাধুর্য দেখে বাসুদেবের ক্ষোভ হয় এবং সেই মাধুরী আস্বাদন করার জন্য তাঁর লোভ হয়। মথুরায়

গন্ধর্ব নৃত্য দর্শন করে এবং দ্বারকায় চিত্র দর্শন করে বাসুদেব গোবিন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

আবার ‘শ্রী’ অর্থে যদি সম্পদ ধরা যায়, তাহলে তাতেও সর্বসম্পদ পরিপূর্ণভাবে শ্রীকৃষ্ণে বিকশিত । যেমন --

শ্রীব্রহ্মসংহিতায় (৫/৫৬) বলা হয়ছে ---

শ্রিয়ঃ কান্তাঃ কান্তঃ পরমপুরুষঃ কল্পতরবো

দ্রুমা ভূমিশ্চিন্তামমণি-গণময়ী তোয়মমৃতম্।

কথা গানং নাট্যং গমনমপি বংশী প্রিয়সখী

চিদানন্দং জ্যোতিঃ পরমপি তদাস্বাদ্যমপি চ।।

অর্থাৎ ব্রহ্মা নিজ ইষ্টদেব শ্রীগোবিন্দের নিজধাম বৃন্দাবনের সম্পদ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন – এই বৃন্দাবন ধামের কৃষ্ণকান্তাগণ সকলেই লক্ষী এবং কান্ত পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, বৃক্ষসকল কল্পতরু, ভূমি চিন্তামণি, জল অমৃত, স্বাভাবিক

কথাই গান, সহজ গমনে নৃত্য, শ্রীকৃষ্ণের বংশীই প্রিয়সখী, চিদানন্দই পরমজ্যোতিঃ স্বরূপ চন্দ্র সূর্য এবং সেই চিদানন্দ বস্তুও আস্বাদ্য।

বৃন্দাবনের কৃষ্ণকান্তাগণ (গোপীগণ) স্বয়ং লহ্মী অপেক্ষা অনেক গুণবতী। (শ্রীরাধিকা লহ্মীগণের অংশনী, গোপীগণ তাঁর কায়ব্যূহ), বৃন্দাবনের বৃক্ষসকল সাধারন বৃক্ষের মতো নয় -কল্পবৃক্ষের মতো যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। বৃন্দাবনের ভূমি সাধারণ মাটি নয়-তা চিন্তামণিময়। চিন্তামণির নিকট যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। বৃন্দাবনের জল অমৃতের মত স্বাদবিশিষ্ট। বৃন্দাবনবাসীদের স্বাভাবিক কথাবার্তা গীতের মতো মধুর। তাঁদের স্বাভাবিক চলাফেরাই নৃত্যের মত সুন্দর। শ্রীবৃন্দাবনে চিদানন্দ জ্যোতিই চন্দ্র সূর্য রূপে মূর্তিমান হয়ে আস্বাদ্য হন। প্রাকৃত চন্দ্র সূর্য জড়বস্তু-সকল সময়ে আনন্দদায়ক নয়, চন্দ্র অপূর্ণ কলা-অবস্থায় আনন্দদায়ক নয়। মধ্যাহ্নকালীন সূর্য খরতাবশতঃ জ্বালাকর, কিন্তু শ্রীবৃন্দাবনের চন্দ্র, সূর্য জড়বস্তু নয় -- চিন্ময়, সর্বদাই আনন্দপ্রদ।


জ্ঞান -- জ্ঞানশক্তি বলে শ্রীভগবান সর্বজ্ঞ, স্বপ্রকাশ। জ্ঞান অর্থে জীবের ক্ষে কোনো বস্তু বিশেষ সম্বন্ধে চিত্তের ভাব। জীবের পক্ষে কোনো বস্তুকে দেখতে হলে, শুনতে হলে আঘ্রাণ করতে হলে, আস্বাদন করতে হলে, বা স্পর্শ করতে হলে যথাক্রমে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক-এই সব ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে নিতে হয়, কিন্তু শ্রীভগবানের পক্ষে তাঁর স্বরূপভূত জ্ঞান কোনো বস্তু বিশেষকে অপেক্ষা করে না । সেইজন্য তাঁকে অতীত বা ভবিষ্যতের সর্ববিষয়ে জ্ঞানবান বলা হয়-‘সঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিৎ’ (শ্রুতি)।

আবার গীতার ৭ম অধ্যায়ের ২৬নং শ্লোকে ভগবান নিজমুখে বলেছেন ---

'বেদাহং সমতীতানি বর্তমানানি চার্জুন।

ভবিষ্যানি চ ভূতানি মাং তু বেদ ন কশ্চন।।'

শ্রীকৃষ্ণের সর্বজ্ঞতার কথা চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাই, যখন তিনি মাত্র ৬ দিনের শিশু এবং মা যশোদার স্তন্যপান করেছেন সেই সময় পূতনা রাক্ষসী বাৎসল্যময়ী মাতৃমূর্তিবেশে উপস্থিত হলে চরাচরের অন্তর্যামীর নিকট পূতনারাক্ষসীর আগমনের উদ্দেশ্য অজানা ছিল না। তাই তাঁকে দেখে তার মুখ দর্শনে অনিচ্ছুক হয়ে চক্ষু বন্ধ করে রেখেছিলেন। “বিবুধ্য তাং বাক-মারিকাগ্রহং চরাচরাত্মা স নিমীলিতেক্ষণঃ।” আবার ব্রহ্মমোহন লীলায় দেখতে পাই ব্রহ্মা যখন শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা পরীক্ষা করার জন্য গোবৎস ও গোপবালকদেরকে মায়ামুগ্ধ করে বহুদূরে স্থানান্তরিত করে রেখেছিলেন তখন পর্যন্ত সর্বজ্ঞ কৃষ্ণ মুগ্ধ বালকের মতো বনভূমির সর্বত্র সখাদের ও গোবৎসদেরকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন । অবশেষে তাঁর সর্বজ্ঞতাশক্তির প্রভাবে জানতে পারলেন যে, ব্রহ্মাই ঐসকল সখা ও গোবৎসদেরকে স্থানান্তিরিত করেছেন।


বৈরাগ্য --- সাধারনতঃ মায়িক বস্তুতে আসক্ত না হওয়াকেই বৈরাগ্য বলা হয়। জীবের পক্ষে এই বৈরাগ্য সাধনার দ্বারা লাভ করতে হয়। কিন্তু শ্রীভগবানের পক্ষে কোনো সাধনের আবশ্যকতা হয় না। বৈরাগ্য তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ গো-গোপ ও গোপিদের সঙ্গে কত না ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন, তবুও হঠাৎ তাঁদেরকে ত্যাগ করে মথুরায় চলে গেলেন । মথুরায় থাকাকালেও তিনি যুধিষ্ঠিরাদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কাম্যবনে এসেছিলেন। বৃন্দাবন সেখান থেকে বেশী দূরে নয়, অথচ তিনি সেখানে একবারও গেলেন না। ঠিক তেমনিই দ্বারকা-লীলাতেও তিনি পুত্র-পৌত্রাদি আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কতনা ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করেছেন, কিন্তু হঠাৎ ব্রহ্মশাপ-ছলে যদুকুল ধ্বংশ করলেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি কতটা অনাশক্ত। অতএব এ পর্যন্ত শ্রীভগবানের ষড়বিধ ‘ভগ’ অর্থাৎ ঐশ্বর্যের কথা আলোচনা করে আমরা এই সিধান্তে উপনীত হতে পারি যে, কেবল কৃষ্ণই একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান আর কেউ নন ।


Written by: Prithwish Ghosh

Share:

২৭ এপ্রিল ২০২১

শ্রী হয়গ্রীব হলেন ভগবান শ্রী বিষ্ণুর অবতার।

শ্রী হয়গ্রীব হলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার।তিনি হিন্দু ধর্মের জনপ্রিয় দেবতা।ভারতের বিভিন্ন স্থানে তার পূজা করা হয় ।আসামের হয়গ্রীব মাধব মন্দির তার মধ্যে অন‍্যতম।তার নামে হয়গ্রীব উপনিষদ রয়েছে।

'মধু' এবং 'কৈটভ' নামের দুটি অসুর বেদের সৃষ্টির সময়ে ব্রহ্মার থেকে সেগুলি চুরি করে নেয়। ব্রহ্মা বিষ্ণুকে যোগনিদ্রা থেকে জাগিয়ে বেদ উদ্ধারের জন্য অনুরোধ করেন। তখন বিষ্ণু 'হয়গ্রীবে'র রূপ ধারণ করে রসাতলে যান এবং বেদসমূহ উদ্ধার করে এনে ব্রহ্মাকে দেন।  এর পরে বিষ্ণু উত্তর-পূর্বে এসে হয়গ্রীব রূপে শুয়ে পড়েন। মধু এবং কৈটভ ঘুরে এসে বিষ্ণুকে যুদ্ধ করতে বলে। সেই যুদ্ধে বিষ্ণু অসুর দুজনকে পরাস্ত করে প্রাণনাশ করেন।












আরেক মতে ভগবান বিষ্ণু ঔর্বঋষির তপস্যা ভঙ্গকারী জ্বরাসুর, হয়াসুর ইত্যাদি পাঁচজন অসুরকে বধ করে হয়গ্রীব মাধব নামের পর্বতে অবস্থান করে আছেন। কালিকা পুরাণ মতে, এই তীর্থস্থানের প্রতিষ্ঠাতা ঔর্বঋষি।।

দেবীভাগবত পুরাণেও এক আশ্চর্য কাহিনির সন্ধান মেলে। সূর্যের ছেলে রেবন্ত কোনো এক সময় উচ্চৈঃশ্রবা নামক ঘোড়ায় চড়ে বৈকুণ্ঠে বেড়াতে এসেছিলেন। উচ্চৈঃশ্রবা একে অশ্বরাজ, সে ও লক্ষ্মীর মতোই সমুদ্রমন্থনের সময় উদ্ভূত। ঘোড়াটিকে লক্ষ্মী নিজের ভাইয়ের মতো দেখতেন। তাই উচ্চৈঃশ্রবা বৈকুণ্ঠে আসতেই তিনি স্বামীকে ছেড়ে ঘোড়ার আদরযত্ন নিয়ে পড়লেন। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা রেবন্তকে দেখে অবাক হলেন নারায়ণও। তিনি লক্ষ্মীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই ছেলেটি কে?” লক্ষ্মী তখন ঘোড়ার আপ্যায়নে ব্যস্ত। কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেও কথার উত্তর না পেয়ে লক্ষ্মীর উপর বেজায় খাপ্পা হয়ে উঠলেন নারায়ণ। স্ত্রীকে অভিশাপ দিয়ে বসলেন, “ঘোড়া নিয়ে এত আদিখ্যেতা যখন, তখন মর্ত্যে মাদীঘোড়া হয়ে জন্মাও গে!” যতই হোক, নারায়ণ লক্ষ্মীর স্বামী; লক্ষ্মীও নারায়ণের স্ত্রী। অভিশাপ শুনে লক্ষ্মীর খুব কষ্ট হল। নারায়ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তিনি শাপমুক্ত হয়ে আবার বৈকুণ্ঠে ফিরতে পারবেন। নারায়ণ বললেন, মর্ত্যে গিয়ে লক্ষ্মীর নারায়ণ-তুল্য এক ছেলে হবে। তারপরই লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠে ফিরতে পারবেন। এরপর যথারীতি মর্ত্যে মাদী ঘোড়া হয়ে জন্মালেন লক্ষ্মী। মর্ত্যে গিয়ে তিনি শিবের তপস্যা করলেন। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব বর দিতে এলে লক্ষ্মী বললেন, তার সন্তান যেন নারায়ণের ঔরসেই জন্মায়। শিবের পরামর্শে নারায়ণ হয়গ্রীব অবতার গ্রহণ করে ঘোটকীরূপিণী লক্ষ্মীকে বিয়ে করলেন। তাদের ছেলে হলে লক্ষ্মী শাপমুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে গেলেন।


অন‍্যমতে, ঋষি কশ‍্যপ ও দনুর পুত্র হয়গ্রীব আদ‍্যাশক্তি মহামায়ার বরে বলীয়ান হয়ে ইন্দ্রের অমরাবতী আক্রমণ করে। দেবীর বরে অন্য কোনো হয়গ্রীবই তাকে হত‍্যা করতে পারবে। তখন দেবতারা ভগবান বিষ্ণুর কাছে যান। ভগবান বিষ্ণু মধু -কৈটভের সাথে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে ধনুকের উপর মাথা রেখে নিদ্রায় মগ্ন ছিলেন। তখন ব্রহ্মা ভম্রিদের আদেশ দেন ভগবান বিষ্ণুর ধনুকটির জ‍্যা কর্তন করার। পরিবর্তে, ভম্রিরা যজ্ঞের বেদির বাহিরে পরে থাকা আহুতি পাবে। তখন জ‍্যা কাটতেই ভগবান বিষ্ণুর মস্তক কেটে লবণ সাগরে পড়ল। দেবতারা তখন দেবী মহামায়ার স্তব করলে দেবী মহামায়া বলেন যে তার মায়াতেই এসব ঘটেছে। পূর্বে বিষ্ণু দেবী লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে হাসলে দেবী লক্ষ্মী মনে করেন যে বিষ্ণু তার রূপকে অবহেলা করছেন। দেবী লক্ষ্মী তখন ভগবান বিষ্ণুকে অভিশাপ দিয়ে বসেন যে তার এই সুন্দর মস্তক কেটে যাবে। সে অভিশাপই সত‍্য হয়েছে। তখন তিনি ব্রহ্মাকে বিষ্ণুর মস্তকে হয় বা অশ্বের মস্তক লাগাতে বলেন। ব্রহ্মা তা-ই করলেন। তখন বিষ্ণুর নাম হয় হয়গ্রীব। ভগবান হয়গ্রীব তখন দানব হয়গ্রীবকে যুদ্ধে পরাস্ত খরে তাকে হত‍্যা করেন। হয়গ্রীব ছিলেন মহাজ্ঞানী। তিনি মহর্ষি অগস্ত‍্যকে ললিতোপাখ‍্যান শ্রবণ করান ।

হয়গ্রীব উপনিষদ্‌

হয়গ্রীব উপনিষদ্‌ বা হয়গ্রীবোপনিষদ্‌ (সংস্কৃত: हयग्रीव उपनिषत्) হল একটি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ। এটি ১০৮টি উপনিষদের অন্যতম। হয়গ্রীব উপনিষদ্‌ সংস্কৃত ভাষায় রচিত এবং বিষ্ণুর অশ্বমস্তক-বিশিষ্ট অবতার হয়গ্রীবের প্রতি উৎসর্গিত। এটি বিষ্ণু-উপাসক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ এবং অথর্ববেদের সঙ্গে যুক্ত। যে হয়গ্রীব বেদের মূর্তস্বরূপ চিত্ত বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী, সেই হয়গ্রীবের পূজার মন্ত্রগুলি এই উপনিষদের প্রধান আলোচ্য।

কথিত আছে, বিষ্ণুর বাহন গরুড় তিরুবন্তিপুরমে শ্রী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সন্ত ও গুরু বেদান্ত দেশিকাকে হয়গ্রীব মন্ত্রগুলি শিখিয়েছিলেন।

হয়গ্রীব উপনিষদ্‌ দুটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই উপনিষদে মোট শ্লোকের সংখ্যা ২০। ব্রহ্মা তার পুত্র ঋষি নারদকে শিক্ষা দিচ্ছেন - এই আকারে এই উপনিষদ্‌টি রচিত হয়েছে। গ্রন্থের শুরুতেই বিষ্ণুকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর রূপে বন্দনা করা হয়েছে এবং তার কাছে তার সকল ভক্তের কল্যাণকামনা করা হয়েছে। সকলের কল্যাণের জন্য ইন্দ্র, গরুড়, সূর্য ও বৃহস্পতিকেও বন্দনা করা হয়েছে।


নারদ তার পিতা ব্রহ্মাকে সকল পাপ নির্মূলকারী এবং জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ বিতরণকারী ব্রহ্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছেন। ব্রহ্মা বলছেন, যে হয়গ্রীবের মন্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারে, সে শ্রুতি, স্মৃতি, ইতিহাস ও পুরাণ শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং ধনবান হতে পারেন। এরপর ব্রহ্মা হয়গ্রীব পূজার বিভিন্ন মন্ত্র বর্ণনা করতে শুরু করেন।


প্রথম মন্ত্রে বিষ্ণুকে হয়গ্রীব রূপে জাগতিক বিশ্বের বাইরে অবস্থানকারী ও ত্রাণকর্তারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় মন্ত্রে হয়গ্রীবকে ঋক্‌, সাম, যজুর্বেদ ও ওঙ্কারের মূর্তি বলা হয়েছে। তাকে পৃথিবীতে বেদ-আনয়নকারী অশ্বমস্তক-বিশিষ্ট অবতার বলা হয়েছে। তৃতীয় মন্ত্রে বেদের মূর্তি হয়গ্রীবের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে তিনি যেন এই উপনিষদের পাঠকের কাছে বেদজ্ঞান প্রকাশ করেন এবং বলা হয়েছে এই দেবতার গুণকীর্তন করেন ওঙ্কার ও বেদসমূহ। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষির নাম হিসেবে ব্রহ্মা, অত্রি, রবি, সবিতা ও ভার্গবের নাম করা হয়েছে। এই মন্ত্রগুলির ছন্দ হল গায়ত্রী, ত্রিষ্টুভ ও অনুষ্টুভ এবং দেবতা হলেন হয়গ্রীব। বীজমন্ত্রটি হল হ্লৌঁ, শক্তি হল সোহম, কীলক হল হ্লুঁ, বিনিয়োগ হল ভোগ ও মোক্ষ। শেষে অ, উ ও ম এই তিন অক্ষরের সাহায্যে অঙ্গন্যাসের কথা বলা হয়েছে। এরপর ধ্যানমন্ত্রটি বর্ণিত হয়েছে। এই ধ্যানমন্ত্রের সাহায্যে পূজক দেবতার মূর্তিটি মনে মনে কল্পনা করতে পারেন। এই মন্ত্রে হয়গ্রীবকে চতুর্ভূজ বলা হয়েছে। তার চার হাতের তিনটিতে রয়েছে শঙ্খ, সুদর্শন চক্র ও গ্রন্থ এবং চতুর্থ হাতে রয়েছে মহামুদ্রা। ২৯-অক্ষরবিশিষ্ট মন্ত্র (ওঁ শ্রীঁ হ্লৌঁ ওঁ নমো ভগবতে হয়গ্রীবায় বিষ্ণবে মহ্যং মেধাং প্রজ্ঞাং প্রয়চ্চ স্বাহা) ও ২৮-অক্ষরবিশিষ্ট মন্ত্র (ওঁ শ্রীঁ হ্রীঁ ঐঁ ঐঁ ঐঁ ক্লীঁ ক্লীঁ সৌহ্‌ সৌহ্‌ হ্রীঁ ওঁ নমো ভগবতে হয়গ্রীবায় মহ্যং মেধাং প্রজ্ঞাং প্রয়চ্চ স্বাহা) - এই দুই মন্ত্রের কথা বলে প্রথম অধ্যায় শেষ হচ্ছে।


দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতে ব্রহ্মে হয়গ্রীবের বীজমন্ত্রটির কথা বলছেন। তিনি এই মন্ত্রটি প্রথমে শিবকে শিখিয়েছিলেন। শিব এই মন্ত্র সঙ্কর্ষণকে, সঙ্কর্ষণ নারদকে এবং নারদ ব্যাসকে শেখান। ব্যাসকে জগতকে এই মন্ত্র শিক্ষা দেন। হয়গ্রীবের বীজমন্ত্রটিকে এই উপনিষদে "মন্ত্ররাজ" বলা হয়েছে। এই মন্ত্র সূর্য ও অন্যান্য দেবতারা জপ করেন এবং এই মন্ত্রই হয়গ্রীবের বাণীমূর্তি। যিনি এই মন্ত্র জপ করেন, তিনি সর্বোচ্চ জ্ঞান এবং দিকপাল, রাজন্যবর্গ ও নাগের অধিপতি হন।


কথিত আছে অন্য একটি মন্ত্র অমৃতং কুরু কুরু স্বাহা (অনুগ্রহ করে আমাকে অমর করুন) জপকারীকে জ্ঞান, ধন ও অষ্ট সিদ্ধ প্রদান করে। আরও বলা হয়েছে হ্লৌঁ সকলসম্রাজ্ঞেন সিদ্ধিং কুরু কুরু স্বাহা এই সকল মন্ত্রগুলি জানতে সাহায্য করে। যারা এই মন্ত্রগুলি জপ করে, তাদের সব পাপ ধুয়ে যায় এবং তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র হয়। জীবনে সে দেহের উপর কর্তত্ব করে এবং মৃত্যুর পর মোক্ষ লাভ করে। প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম, (জ্ঞানই ব্রহ্ম), তত্ত্বমসি (তুমিই সে), অয়মাত্মা ব্রহ্ম (আমার আত্মাই ব্রহ্ম) এবং অহং ব্রহ্মাস্মি (আমিই ব্রহ্ম) - এই চারটি বৈদিক মহাবাক্যের অর্থ সে অনুধাবন করতে সমর্থ হয়। এরপর চারটি বৈদিক মন্ত্র পাঠ করা হয়। এগুলি হল : (১) যদ্‌ বাক্‌ বদন্তি, (২) গৌরিমিমায়া, (৩) ওষ্টাপিধান ও (৪) সা সর্পরীরাতিম।


উপনিষদ্‌ গ্রন্থাবলির রীতি অনুসারে, হয়গ্রীব উপনিষদের শেষে এই গ্রন্থটির মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে। একাদশী তিথিতে এই উপনিষদ পাঠ করলে হয়গ্রীবের আশীর্বাদ পাওয়া যায় এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে জীবনের শেষে মোক্ষ লাভও হয়ে থাকে। গ্রন্থের শেষে একটি প্রার্থনায় বলা হয়েছে এই মন্ত্রগুলি ব্রহজ্ঞান এবং এই ভক্ত যেন হয়গ্রীব এবং এই মন্ত্রগুলিকে কখনও না ভুলে যান।

তথ্যসুত্রঃ উইকিপিডিয়া


Share:

২২ এপ্রিল ২০২০

বৈশাখী শুক্লা চতুর্দশীর সন্ধ্যায়, শ্রীহরির অবতার রূপে শ্রীশ্রীনৃসিংহ ভগবান প্রকট হয়েছিলেন।

শ্রীশ্রীনৃসিংহ ভগবান দেখতে বা শুনতে ভয়ঙ্কর হলেও তিনি হচ্ছেন ভক্তিতত্ত্বের অনন্য উদাহরণ স্বরূপ। আমরা জানি, ঈশ্বরের দিকের আমরা এক পা এগিয়ে গেলে তিনি আমাদের দিকে দশ পা এগিয়ে আসেন দর্শন দানের জন্য। সেই এক পা এগানোটাই হচ্ছে কঠিন। এর নানা পথ আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে ভক্তি। ভক্তির দ্বারা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তিনি আসেন, চাই প্রবল ভরসা 'তাঁর' প্রতি। এই ভরসা ছিল বলেই 'রাম' নামে সমুদ্র পাথর ভেসে সেতু নির্মিত হয়েছিল ভক্ত হনুমানের দ্বারা। তবে হ্যাঁ, ভক্তিতে বোকা হলে চলবে না, যাকে অজ্ঞানতা বলে। ভক্ত প্রহ্লাদের সেই ভরসা ছিল বলেই তিনি বিশ্বাসের সাথে বলতে পেরেছিলেন তাঁর ভগবান স্তম্ভের মধ্যেও আছেন।



বহু লক্ষ বৎসর পূর্বে বৈশাখী শুক্লা চতুর্দশীর সন্ধ্যায়,  শ্রীহরির অবতার রূপে শ্রীশ্রীনরসিংহ ভগবান প্রকট হয়েছিলেন ।

সক্রেটিস বলেছিলেন ‘নিজেকে জানো’। এই রকম একটি স্বার্থপর উক্তি কি করে এত জনপ্রিয়তা পেল আমার মাথায় ধরে না। আমার মতে উক্তিটি একটি অর্ধ উন্মোচিত উক্তি। উক্তিটি হওয়া উচিত – ‘নিজেকে জানো, অন্যকেও জানো’। পরিতাপের বিষয় হলো আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে জানি না অন্যকে জানার ইচ্ছাও বহুদুরে। অথচ পারস্পরিক এই অজানা থেকেই জন্ম নেয় অবিশ্বাস, যেখান থেকে জন্ম নেয় অন্যের প্রতি অসহিষ্ণু মনোবৃত্তি, সেখান থেকে জন্ম নেয় কলহ। এই সীমাবদ্ধতাকে উপড়ে ফেলতে অগ্রসর হই সনাতন ধর্ম সম্পর্কে জানার। যতটুকু জানছি তারই কিছুটা উন্মোচন করতে এই প্রয়াস।


 হিরণ্যকশিপু পূর্বজন্মে কে ছিলেন ?

বৈকুন্ঠের দ্বারী ছিলেন জয় এবং বিজয় । একবার ব্রাহ্মণরা জয় এবং বিজয়কে তাদের ঔদ্ধত্যৈর জন্য অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, মর্ত্যলোকে তিন জন্ম নাস্তিক আর নিষ্ঠুর হয়ে কাটাতে হবে। এই তিনটি জন্মই তাদের কাটাতে হবে প্রচন্ড দেব- বিরোধিতা করে, অসুর মনোভাব নিয়ে অত্যাচার করে।ভগবান এই দুই দ্বারীকে খুবই ভালবাসতেন। তবে ঔদ্ধত্যৈর শাস্তি পাওয়া উচিত বিবেচনা করে ব্রাহ্মণের সেই অভিশাপ তিনি অনুমোদন করেছিলেন ।তবে ভগবান তাদের অশ্বাস দিয়েছিলেন যে তিনি স্বয়ং নিজে মর্ত্যে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে আনবেন। জয় প্রথমে মর্ত্যে জন্ম নিয়েছিলেন হিরণ্যকশিপু হয়ে । শ্রীশ্রী নৃসিংহ দেব হিরণ্যকশিপুকে সংহার করে প্রথম জন্ম থেকে মুক্তি দেন। দ্বিতীয়বার জয়কে জন্মাতে হয়েছিল রাবন হয়ে। শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে দ্বিতীয় জন্ম থেকে মুক্তি দেন। শেষে জন্মাতে হয়েছিল শিশুপাল হয়ে। পরমেশ্বর স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র দিয়ে শিশুপালের মাথা বিছিন্ন করে তৃতীয় জন্ম থেকে মুক্তি দেন। এভাবে পরমেশ্বর স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে এসে স্বর্গের দ্বারী জয়কে শাপ মুক্ত করেন । মুক্তি পেয়ে বৈকুন্ঠের দ্বারী জয় আবার বৈকুন্ঠে ফিরে যায়। উল্লেখ্য , বিজয় প্রথমে হিরণক্ষ্য হয়ে জন্মগ্রহন করেন, তারপরে জন্মগ্রহন করেন কুম্ভকর্ণ হয়ে। সর্বশেষে বিজয় জন্মগ্রহন করেন কংস হয়ে। পরমেশ্বর স্বংয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসকে বধ করে শাপ মুক্ত করেন।শাপ মুক্ত হয়ে বিজয় বৈকুন্ঠে ফিয়ে যায়।

 অবতারঃ

অবতার শব্দের আক্ষরিক অর্থ অবতরণকারী। দেবতারা যখন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে পৃথিবিতে অবতীর্ণ হন তখন তাদেরকে অবতার বলা হয়। হিন্দুধর্মে অবতারবাদ মূলত বিষ্ণুকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। বিষ্ণু ত্রিমূর্তির অন্যতম দেবতা ও হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী জগতের পালক ও রক্ষাকর্তা। ত্রিমূর্তি হচ্ছে হিন্দু ধর্মের একটি ধারণা যা মনে করা হয় জন্ম, পালন এবং বিনাশের রূপ। ব্রহ্মা হচ্ছে জন্মকর্তা যিনি মানুষের জন্ম দেয়। তিনি সকল প্রাণী এবং সকল বস্তুর পিতা। তারপরেই আছেন বিষ্ণু, যিনি মানুষকে পালন করে থাকেন। তিনিই মানুষের সকল জীবনের সমস্যা এবং সমাধানের পথের পাথেয়। সবশেষে আছেন শিব অথবা মহেশ্বর, যিনি প্রয়োজন মত মানুষের জীবনাবসনের দায়িত্ব পালন করেন। এই তিনজনকে আরো বলা হয় - তাদের সাথে পৃথিবী, জল এবং অগ্নির সম্পর্ক আছে। ব্রহ্ম হচ্ছে পৃথিবী, বিষ্ণু হচ্ছে জল এবং শিব হচ্ছে আগুন। বিষ্ণুর দশ প্রসিদ্ধ অবতারকে দশাবতার নামে পরিচিত।

১. মৎস্য :- মাছরূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
২. কূর্ম :- কচ্ছপের রূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
৩. বরাহ :- বন্য শূকরের রূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
৪. নৃসিংহ :- অর্ধনরসিংহরূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
৫. বামন :- খর্বকায় বামনের রূপে ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ
৬. পরশুরাম :- পরশু অর্থাৎ কুঠারধারী রামের রূপে ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ
৭. রাম :- অযোধ্যার যুবরাজ ও রাজা রূপে ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ
৮. কৃষ্ণ :- দ্বাপরযুগে জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরাম সহ অবতীর্ণ। ভাগবত পুরাণ অনুসারে দ্বাপরযুগে অনন্ত নাগের অবতার বলরাম রূপে কৃষ্ণের সঙ্গে অবতীর্ণ হন। অধিকাংশ বৈষ্ণব শাখাসম্প্রদায় বলরামকে বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করেন। যে সকল সূত্রে বুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই সেখানে বলরামকেই বিষ্ণুর নবম অবতার রূপে দশাবতারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৯. বলরাম :- কোনো কোনো মতে বিষ্ণুর নবম অবতার। (এই স্থানে বলরাম সম্পর্কে জানতে নিচে বিকল্প তালিকা দেখুন।)
১০. কল্কি :- এই ভবিষ্যৎ অবতার কলিযুগের শেষ পর্বে অবতীর্ণ হবেন বলে হিন্দুরা মনে করেন।

দক্ষিণ ভারতে বলরামকে দশাবতারের তালিকাভুক্ত করা হয়। এই মত অনুসারে, বুদ্ধের অবতারত্ব স্বীকৃত নয়। কোনো কোনো গ্রন্থে আবার কৃষ্ণকে অবতার তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। একাধিক মধ্যযুগীয় ধর্মসম্প্রদায়ে কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান নামে পরিচিত। গৌড়ীয় বৈষ্ণব, বল্লভ সম্প্রদায়, ও নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের মতে তিনি সকল অবতারের উৎস। নিম্বার্ক মতে, কৃষ্ণ আবার শুধু সকল অবতারের উৎসই নন, তিনি স্বয়ং বিষ্ণুরও উৎস। এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছে "ভাগবতের একটি প্রসিদ্ধ উক্তি" (১।৩।২৮)।

 কোনো কোনো তালিকা অনুসারে, বলরাম কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা এবং গৌতম বুদ্ধের স্থলে বিষ্ণুর নবম অবতার। ভাগবত পুরাণ –এর মতে দ্বাপরযুগে শেষনাগের অবতার রূপে বলরামের আবির্ভাব। অধিকাংশ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে তিনি অবতাররূপে পূজিত হন। এই সকল তালিকায় গৌতম বুদ্ধের নাম দেখা যায় না।
মহারাষ্ট্র ও গোয়ার ঐতিহ্য অনুসারে পঞ্চাঙ্গ ও বিভিন্ন মন্দির স্থাপত্যে বিঠোবা বিষ্ণুর নবম অবতার বুদ্ধরূপে গণ্য হন। মহারাষ্ট্রের সন্তকবিরাও বিঠোবাকে বুদ্ধের রূপে বন্দনা করেছেন।

দশাবতারের তালিকা পাওয়া যায় গরুড় পুরাণে। জয়দেব রচিত প্রলয়পয়োধিজলে (গীতগোবিন্দম্ কাব্যের প্রথম সর্গের প্রথম গীত, দশাবতার স্তোত্র নামে সমধিক পরিচিত) স্তোত্রে দশটি পৃথক স্তবকে দশ অবতারের বিবরণদানের পর নিম্নোক্ত শ্লোকে দশাবতারের কীর্তির একটি সুসংবদ্ধ তালিকা প্রদান করা হয়েছে :-

বেদানুদ্ধরতে জগন্তি বহতে ভূগোলমুদ্বিভ্রতে
দৈত্যং দারয়তে বলিং ছলয়তে ক্ষত্রক্ষয়ং কুর্বতে।
পৌলস্ত্যং জয়তে হলং কলয়তে কারুণ্যমাতন্বতে
ম্লেচ্ছান মূর্চ্ছয়তে দশাকৃতিকৃতে কৃষ্ণায় তুভ্যং নমঃ।।

“ বেদের উদ্ধারকারী, ত্রিলোকের ভারবহনকারী, ভূমণ্ডল উত্তোলনকারী, হিরণ্যকশিপু বিদারণকারী, বলিকে ছলনাকারী, ক্ষত্রক্ষয়কারী, দশানন-সংহারকারী, হলকর্ষণকারী, করুণাবিতরণকারী, ম্লেচ্ছধ্বংসকারী, দশরূপধারী হে কৃষ্ণ, তোমায় প্রণাম করি।।১৬।। ”

যাই হোক, এই দশ অবতারই মানব সমাজে তাঁদের প্রভাবের ভিত্তিতে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হন। দশাবতারের প্রথম চার জন অবতীর্ণ হয়েছিলেন সত্যযুগে। সত্যযুগের ব্যপ্তিকাল ছিল ১৭ লক্ষ ২৮ হাজার বছর। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে এযুগের উত্‍পত্তি হয়েছিল।সত্য যুগ ছিল পুরা সময়টাই ছিল ধর্ম ও শাস্ত্র নির্ভর। কেউ শাস্ত্রনিষিদ্ধ উপায়ে অর্থ বা বিদ্যা লাভের চেষ্টা করতেন না। তপস্যাই এযুগের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। মানুষের আয়ু ছিল ৪০০বছর। কোন রোগ শোক দুঃখ ছিল না। মানুষের সকল কামনা পূর্ণ হতো। মানুষ ছিল পুন্যবান। দেবতা ও পিতৃলোকের তৃপ্তসাধন করতেন এবং তারা ছিলেন জিতেন্দ্রিয়। সত্য যুগে মানুষ দেবতুল্য ছিলেন । মানুষের রুপে নিয়ে দেবতারা ইহ ও স্বর্গলোক বিচরন করতে পারতেন। পরের দ্রব্যকে দেখতো মাটির ঢেলার মত। চোর মিথ্যাবাদী বা প্রতারক এযুগে ছিল না। সত্যযুগে অকাল মৃত্যু ছিল না। এমনকি ছিল না রোগভয় ও দূর্ভিক্ষ । এযুগে পৃথিবী অতি শস্যশালিনী ছিল। মেঘ সময়মত বারি বর্ষণ করত এবং বৃক্ষরাজি ছিল ফলভারে অবনত।তখন যে চারজন অবতার এসেছেন তারা ছিলেন, এক - মত্‍স অবতার, চৈত্রের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে, দুই - কূর্ম অবতার ভাদ্রমাসের শুক্লা পূর্ণিমা তিথিতে, তিন - বরাহ অবতার ভাদ্রমাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে, চার - নৃসিংহ অবতার বা নরসিংহ, অর্ধনরসিংহ যিনি বৈশাখ মাসের চতুদ্দর্শী তিথিতে আর্বিভূত হন।

  নৃসিংহ (সংস্কৃত: नरसिंह, বানানান্তরে নরসিংহ) বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার। পুরাণ, উপনিষদ ও অন্যান্য প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থে তাঁর উল্লেখ রয়েছে। তিনি হিন্দুদের জনপ্রিয়তম দেবতাদের অন্যতম। সাধারণত দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের অন্যতম প্রতীক তিনি ৷ প্রাচীন মহাকাব্য, মূর্তিতত্ত্ব, মন্দির ও উৎসব ইত্যাদির তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায় এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর পূজা প্রচলিত রয়েছে। নৃসিংহকে শৌর্যের মূর্তিস্বরূপ এবং তাঁর মন্ত্র শত্রুনিধন ও অমঙ্গল দূরীকরণে বিশেষ ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়; তাই অতীতে শাসক ও যোদ্ধারা নৃসিংহের পূজা করতেন।

নৃসিংহ অর্ধ-মনুষ্য অর্ধ-সিংহ আকারবিশিষ্ট। তাঁর দেহ মনুষ্যাকার, কিন্তু সিংহের ন্যায় মস্তক ও নখরযুক্ত। মৎস্যপুরাণ অনুযায়ী নৃসিংহ অষ্টভূজ হলেও, অগ্নিপুরাণ অনুযায়ী তিনি চতুর্ভূজ। একাধিক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে তাঁর পূজা প্রচলিত। দক্ষিণ ভারতে নৃসিংহ পূজার বিশেষ প্রচলন দেখা যায়। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী, নৃসিংহ ‘মহারক্ষক’; তিনি ভক্তকে তার প্রয়োজনের সময় সর্বদা রক্ষা করে থাকেন।

একাধিক পুরাণ গ্রন্থে নৃসিংহের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাণে নৃসিংহ-সংক্রান্ত মূল উপাখ্যানটির সতেরোটি পাঠান্তর বর্তমান। কয়েকটি কাহিনি অন্যান্য কাহিনিগুলির চেয়ে একটু বিস্তারিত। নৃসিংহ অবতারের বর্ণনা রয়েছে ভাগবত পুরাণ (সপ্তম স্কন্দ), অগ্নিপুরাণ (৪।২-৩), ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ (২।৫।৩-২৯), বায়ুপুরাণ (৬৭।৬১-৬৬), হরিবংশ (৪১ এবং ৩।৪১-৪৭), ব্রহ্মাপুরাণ (২১৩।৪৪-৭৯), বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ (১।৫৪), কূর্মপুরাণ (১।১৫।১৮-৭২), মৎস্যপুরাণ (১৬১-১৬৩), পদ্মাপুরাণ (উত্তরখণ্ড, ৫।৪২), শিবপুরাণ (২।৪।৪৩ ও ৩।১০-১২), লিঙ্গপুরাণ (১।৯৫-৯৬), স্কন্দপুরাণ ৭ (২।১৮।৬০-১৩০) ও বিষ্ণুপুরাণ (১।১৬-২০) গ্রন্থে। মহাভারত-এও (৩।২৭২।৫৬-৬০) নৃসিংহ অবতারের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে। এছাড়া একটি প্রাচীন বৈষ্ণব তাপনী উপনিষদ (নরসিংহ তাপনী উপনিষদ) তাঁর নামে উল্লিখিত হয়েছে।

ঋগ্বেদে একটি শ্লোকাংশে একটি রূপকল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই রূপকল্পটি নৃসিংহরূপী বিষ্ণুর রূপকল্প বলে অনুমিত হয়ে থাকে। উক্ত শ্লোকে বলা হয়েছে "বন্য জন্তুর ন্যায়, ভয়ংকর, বিধ্বংসী ও পর্বতচারী" রূপে বিষ্ণুর গুণ কেবল তাঁর অবতারে দৃষ্ট হয় (ঋগ্বেদ ১।১৫৪।২ক)। ঋগ্বেদের অষ্টম মণ্ডলে (১৪।১৩) বর্ণিত নামুচির উপাখ্যানে নৃসিংহের ছায়া লক্ষিত হয়: "হে ইন্দ্র, জলের বুদ্বুদের দ্বারা তুমি নামুচির মস্তক ছিন্ন করলে এবং সকল প্রতিকূল শক্তিগুলিকে নিমজ্জিত করলে।" মনে করা হয় এই ক্ষুদ্র উল্লেখটি থেকে নৃসিংহের পূর্ণ কাহিনিটি বিকাশ লাভ করেছে।

ভাগবত পুরাণ-এ বর্ণিত নৃসিংহের কাহিনিটি নিম্নরূপ :-

মহর্ষি কশ্যপের ঔরসে তৎপত্নী দিতির গর্ভে এই দৈত্যের জন্ম হয়। তার ভাইয়ের নাম হিরণ্যাক্ষ।
হিরণ্যাক্ষ নৃসিংহের পূর্ববর্তী অবতার বরাহের হাতে নিহত হয় । হিরণ্যকশিপু এই কারণে প্রবল বিষ্ণুবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। দাদার হত্যার প্রতিশোধ মানসে তিনি বিষ্ণুকে হত্যা করার পথ খুঁজতে থাকেন। তিনি মনে করেন, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এই জাতীয় প্রবল ক্ষমতা প্রদানে সক্ষম। তিনি বহু বছর ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করেন। ব্রহ্মাও হিরণ্যকশিপুর তপস্যায় সন্তুষ্ট হন। তিনি হিরণ্যকশিপুর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বর দিতে চান।

হিরণ্যকশিপু বলেন :-

" হে প্রভু, হে শ্রেষ্ঠ বরদাতা, আপনি যদি আমাকে সত্যই বর দিতে চান, তবে এমন বর দিন যে বরে আপনার সৃষ্ট কোনো জীবের হস্তে আমার মৃত্যু ঘটবে না।
আমাকে এমন বর দিন যে বরে আমার বাসস্থানের অন্দরে বা বাহিরে আমার মৃত্যু ঘটবে না; দিবসে বা রাত্রিতে, ভূমিতে বা আকাশে আমার মৃত্যু হবে না। আমাকে এমন বর দিন যে বরে শস্ত্রাঘাতে, মনুষ্য বা পশুর হাতে আমার মৃত্যু হবে না।
আমাকে এমন বর দিন যে বরে কোনো জীবিত বা মৃত সত্তার হাতে আমার মৃত্যু হবে না; কোনো উপদেবতা, দৈত্য বা পাতালের মহানাগ আমাকে হত্যা করতে পারবে না; যুদ্ধক্ষেত্রে আপনাকে কেউই হত্যা করতে পারে না; তাই আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমাকেও বর দিন যাতে আমারও কোনো প্রতিযোগী না থাকে। এমন বর দিন যাতে সকল জীবসত্তা ও প্রভুত্বকারী দেবতার উপর আমার একাধিপত্য স্থাপিত হয় এবং আমাকে সেই পদমর্যাদার উপযুক্ত সকল গৌরব প্রদান করুন। এছাড়া আমাকে তপস্যা ও যোগসাধনার প্রাপ্তব্য সকল সিদ্ধাই প্রদান করুন, যা কোনোদিনও আমাকে ত্যাগ করবে না। "

হিরণ্যকশিপু যখন মন্দার পর্বতে তপস্যা করছিলেন, তখন ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবগণ তাঁর প্রাসাদ আক্রমণ করেন। দেবর্ষি নারদ হিরণ্যকশিপুর স্ত্রী কায়াদুকে রক্ষা করেন। দেবর্ষি দেবগণের নিকট কায়াদুকে ‘পাপহীনা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। নারদ কায়াদুকে নিজ আশ্রমে নিয়ে যান। সেখানে কায়াদু প্রহ্লাদ নামে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। নারদ প্রহ্লাদকে শিক্ষিত করে তোলেন। নারদের প্রভাবে প্রহ্লাদ হয়ে ওঠেন পরম বিষ্ণুভক্ত। এতে তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।

ক্রমে প্রহ্লাদের বিষ্ণুভক্তিতে হিরণ্যকশিপু এতটাই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হন যে তিনি নিজ পুত্রকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যতবারই তিনি বালক প্রহ্লাদকে বধ করতে যান, ততবারই বিষ্ণুর মায়াবলে প্রহ্লাদের প্রাণ রক্ষা পায়। হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে বলেন তাঁকে ত্রিভুবনের অধিপতি রূপে স্বীকার করে নিতে। প্রহ্লাদ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন একমাত্র বিষ্ণুই এই ব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ প্রভু। ক্রুদ্ধ হিরণ্যকশিপু তখন একটি স্তম্ভ দেখিয়ে প্রহ্লাদকে জিজ্ঞাসা করেন যে ‘তার বিষ্ণু’ সেখানেও আছেন কিনা :-

"ওরে হতভাগা প্রহ্লাদ, তুই সব সময়ই আমার থেকেও মহৎ এক পরম সত্তার কথা বলিস। এমন এক সত্তা যা সর্বত্র অধিষ্ঠিত, যা সকলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং যা সর্বত্রব্যাপী। কিন্তু সে কোথায়? সে যদি সর্বত্র থাকে তবে আমার সম্মুখের এই স্তম্ভটিতে কেন নেই ? "

প্রহ্লাদ উত্তর দিলেন, " তিনি [এই স্তম্ভে] ছিলেন, আছে ও থাকবেন।" উপাখ্যানের অন্য একটি পাঠান্তর অনুযায়ী, প্রহ্লাদ বলেছিলেন, " তিনি এই স্তম্ভে আছেন, এমনকি ক্ষুদ্রতম যষ্টিটিতেও আছেন। " হিরণ্যকশিপু ক্রোধ সংবরণ করতে না পেরে গদার আঘাতে স্তম্ভটি ভেঙে ফেলেন। তখনই সেই ভগ্ন স্তম্ভ থেকে প্রহ্লাদের সাহায্যার্থে নৃসিংহের মূর্তিতে আবির্ভূত হন বিষ্ণু।

ব্রহ্মার বর যাতে বিফল না হয়, অথচ হিরণ্যকশিপুকেও হত্যা করা যায়, সেই কারণেই বিষ্ণু নরসিংহের বেশ ধারণ করেন :-
হিরণ্যকশিপু দেবতা, মানব বা পশুর বধ্য নন, তাই নৃসিংহ পরিপূর্ণ দেবতা, মানব বা পশু নন; হিরণ্যকশিপুকে দিবসে বা রাত্রিতে বধ করা যাবে না, তাই নৃসিংহ দিন ও রাত্রির সন্ধিস্থল গোধূলি সময়ে তাঁকে বধ করেন; হিরণ্যকশিপু ভূমিতে বা আকাশে কোনো শস্ত্রাঘাতে বধ্য নন, তাই নৃসিংহ তাঁকে নিজ জঙ্ঘার উপর স্থাপন করে নখরাঘাতে হত্যা করেন; হিরণ্যকশিপু নিজ গৃহ বা গৃহের বাইরে বধ্য ছিলেন না, তাই নৃসিংহ তাঁকে বধ করেন তাঁরই গৃহদ্বারে।

কূর্মপুরাণ-এর বর্ণনা অনুসারে, এরপর পুরুষ ও দৈত্যদের মধ্যে এক প্রবল সংগ্রাম শুরু হয়। এই যুদ্ধে তিনি পাশুপত নামে এক মহাস্ত্রকে প্রতিহত করেন। পরে প্রহ্লাদের ভাই অনুহ্রদের নেতৃত্বাধীন দৈত্যবাহিনীকে নৃসিংহ অবতারের দেহ হতে নির্গত এক মহাসিংহ যমালয়ে প্রেরণ করেন। মৎস্যপুরাণ (১৭৯) গ্রন্থেও নৃসিংহ অবতারের বর্ণনার পর এই ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাগবত পুরাণ-এ আরও বলা হয়েছে: হিরণ্যকশিপুকে বধ করার পর সকল দেবতাই নৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণে ব্যর্থ হন। বিফল হন স্বয়ং শিবও। সকল দেবগণ তখন তাঁর পত্নী লক্ষ্মীকে ডাকেন; কিন্তু লক্ষ্মীও স্বামীর ক্রোধ নিবারণে অক্ষম হন। তখন ব্রহ্মার অনুরোধে প্রহ্লাদ এগিয়ে আসেন। ভক্ত প্রহ্লাদের স্তবগানে অবশেষে নৃসিংহদেব শান্ত হন। নৃসিংহদেব "প্রহ্লাদকে কোলে লইয়া গা চাটিতে লাগিলেন।" প্রত্যাবর্তনের পূর্বে নৃসিংহদেব প্রহ্লাদকে রাজা করে দেন।

শিবপুরাণ গ্রন্থে নৃসিংহ উপাখ্যানের একটি শৈব পাঠান্তর বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথাগত কাহিনিটির থেকে একটু ভিন্ন: নৃসিংহকে শান্ত করতে শিব প্রথমে বীরভদ্রকে প্রেরণ করেন। কিন্তু বীরভদ্র ব্যর্থ হলে শিব স্বয়ং মনুষ্য-সিংহ-পক্ষী রূপী শরভের রূপ ধারণ করেন। এই কাহিনির শেষভাগে বলা হয়েছে, শরভ কর্তৃক বদ্ধ হয়ে বিষ্ণু শিবের ভক্তে পরিণত হন। লিঙ্গপুরাণ গ্রন্থেও শরভের কাহিনি রয়েছে। যদিও বিজয়েন্দ্র তীর্থ প্রমুখ বৈষ্ণব দ্বৈতবাদী পণ্ডিতগণ সাত্ত্বিক পুরাণ ও শ্রুতি শাস্ত্রের ভিত্তিতে নৃসিংহের উপাখ্যানটির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে বিতর্কের অবকাশ রেখেছেন।

ACHARYA KUSH MUKHERJEE
RAMPURHAT CHAKLAMATH BIRBHUM (W.B)
Share:

২০ এপ্রিল ২০২০

প্রহ্লাদপুরী মন্দির, মুলতান পাকিস্তান - এখানেই নৃসিংহ দেব হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করে প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন (ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের ভিডিওসহ) ।

প্রহ্লাদপুরী মন্দিরের ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবর মুল বিগ্রহ
 প্রহ্লাদপুরী মন্দির পাকিস্তানের একটি হিন্দু মন্দির।এটি পাকিস্তানের মুলতানে অবস্থিত। বর্তমানে এই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। প্রহ্লাদ মহারাজের জন্ম হয় ত্রেতাযুগে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান শহরে । কশ্যপ বংশীয় রাজা হিরণ্যকশিপুর পুত্ররূপে তাঁর জন্ম হয় । প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন এক মহান বিষ্ণুভক্ত । কিন্তু তাঁর পিতা ছিলেন বিষ্ণু বিদ্বেষী । পিতা পুত্রের মনোভাবের এই বিরোধের ফলে, দৈত্য পিতা প্রহ্লাদকে নানাভাবে নির্যাতন করেছিল এবং বধ করার চেষ্টা করেছিল । সেই নির্যাতন যখন অসহ্য হয়ে উঠে, তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব রূপে আর্বিভূত হয়ে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছিলেন । বর্তমান পাকিস্তানের মুলতান শহরে প্রাচীন প্রহ্লাদপুরী মন্দির অবস্থিত ।এই স্থানটি পূর্বে কশ্যপপুর নামে পরিচিত ছিল । প্রহ্লাদপুরী মন্দিরটি ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের উদ্দেশ্যে স্বয়ং প্রহ্লাদ মহারাজ নির্মাণ করেছিলেন ।

মুলতাত মুসলমানদের আক্রমণের পর মুলতানের সূর্য মন্দিরের মতো এই মন্দিরটিও ধ্বংস হয়ে যায়। মন্দিরটি তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে এবং ১৯ শতকের সময় একটি আদর্শ মন্দির হয়ে ওঠে। মন্দিরটি মুলতানের দুর্গে একটি উচ্চ স্থানে অবস্থিত। হযরত বাহাহুল হক জাকারিয়ার সমাধির সমীপবর্তী । মন্দিরের কাছে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল । এটি শিখ সাম্রাজ্যের অধীনেও ছিল। এএন খানের মতে শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে মন্দিরটি পুন তৈরি করা হয়। ১৮৩১ সালে আলেকজান্ডার বার্নস মন্দির পরিদর্শন করেন এবং জানালেন যে এটি পরিত্যক্ত হয়েছে এবং এর ছাদ ছিল না। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশরা মুলতানের মুলকাস দুর্গে আক্রমণ করে। একটি কার্তুজ

দুর্গের ভিতরে একটি খোলা জানালাতে রাখা ছিল। বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার কবর , মন্দির ও দুর্গটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।




মন্দিরে একটি প্রধান হলরুম, প্রশস্থ মন্ডপ ছিল । প্রধান মধ্যবর্তী হলে রয়েছে মূল প্রাচীন বিগ্রহের একটি রেপ্লিকা বিগ্রহ । এছাড়া মন্দিরের সন্নিকটে রয়েছে ধর্মশালা । ঐতিহাসিক মতে একসময় এই মন্দিরটি পুরোটাই স্বর্ণ দিয়ে তৈরী ছিল । কিন্তু অজানা এক কারনে একসময় সমগ্র মন্দিরটিই মাটিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে । পরবর্তী একই স্থানে বর্তমান মন্দিরটি তৈরী করা হয় । মুলতানের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য জরিপ ও গবেষণার জন্য আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে পরিদর্শনে আসেন। প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগে উল্লেখ করেন যে, এটি "বর্গক্ষেত্র এবং ইট মন্দির" ছিল। ছাদকে

অবলম্বন দেয়ার জন্য কাঠের স্তম্ভ ছিল। বর্তমান মন্দিরটি ১৮৬১ সালে বদ্বল রাম দাস দ্বারা ১১ হাজার রুপি ব্যয় করে নির্মিত হয়েছিল।

পাকিস্তানের সৃষ্টি হওয়ার পর, অনেক হিন্দু ভারতে চলে যায়। মন্দিরটি দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের সময় মূল নৃসিংহদেবের বিগ্রহটি ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় । এই মন্দিরটিতে থাকা মুল নরসিংহের বিগ্রহটি হরিদ্বারে আছে (নৃসিংহধাম রোড ) । বাবা নারায়ণ দাস বাত্রা মূল বিগ্রহটি ভারতে নিয়ে আসেন। নারায়ণ দাস একজন বিখ্যাত সন্ন্যাসী, যিনি বহু বিদ্যালয় ও কলেজ নির্মাণ করেছেন। সমাজের উন্নয়নের কাজ করার জন্য ২০১৮ সালে পদ্মশ্রী পান তিনি। ১৯৯২ সালে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলে পাকিস্তানের মুসলিম জনতা মন্দিরটি ধ্বংস করেছিল।

এটি একটি প্রাচীন মন্দির। বিশ্বাস করা হয় যে, মন্দিরটি প্রহ্লাদ মন্দিরের স্থানে অবস্থিত। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে হোলিকা দহন পালন শুরু হয়েছে এখান থেকে। এখানে দুই দিন ধরে হোলিকা দহন (Holika Dahan) উৎসব এবং নয় দিন ধরে হোলি পালিত হয়।

হোলিকার দহন হচ্ছে হোলি উৎসবের সবচেয়ে বেশি পরিচিত পৌরাণিক ব্যাখ্যা। ভারতের বিভিন্ন স্থানে হোলিকার মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ বলা হয়, কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই এই বিষয়ে সম্মতি দেখা যায় যে, মুলাস্থান শহরে এই ঘটনাটি ঘটেছিল, যা বর্তমানে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান নামে পরিচিত। এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
  • বিষ্ণু বাঁধা দেন বলে হোলিকা আগুনে পোড়ে
  • ব্রহ্মা হোলিকাকে হোলিকাকে এই শর্তে তার আগুনে না পুড়বার ক্ষমতাটি দান করেছিলেন যে, এই ক্ষমতাটিকে অন্য কারও ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা হবে না।
  • হোলিকা ভাল নারী ছিলেন, এবং তার পোশাকের কারণে তাকে আগুনে পোড়ানো সম্ভব ছিল না। প্রহ্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে এটা জেনে তিনি তার পোশাক প্রহ্লাদকে দিয়ে দেন এবং নিজে আগুনে পুড়ে আত্মত্যাগ করেন।
  • হোলিকা যখন আগুনের উপর বসেন, তিনি তার চাদর পরিধান করেন এবং প্রহ্লাদকে তার কোলের উপর বসান। প্রহ্লাদ বিষ্ণুর প্রতি প্রার্থনা শুরু করলে বিষ্ণ বাতাস পাঠিয়ে দেন, যা হোলিকার চাদরটিকে উড়িয়ে নিয়ে প্রহ্লাদকে তা দিয়ে আবৃত করে। এরফলে প্রহ্লাদ বেঁচে যায়, এবং হোলিকা আগুনে পুড়ে মারা যায়।




প্রহ্লাদপুরী মন্দির,মুলতান
Prahladpuri Temple View.jpg
প্রহ্লাদপুরী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ
ধর্ম
অন্তর্ভুক্তিহিন্দুধর্ম
পরিচালনা সংস্থাপাকিস্তান হিন্দু কাউন্সিল
অবস্থান
স্থাপত্য
ধরনহিন্দু মন্দির
ওয়েবসাইট
http://www.pakistanhinducouncil.org/



তথ্যসূত্রঃ
  1. Syad Muhammad Latif (১৯৬৩)। The early history of Multan। পৃষ্ঠা 3,54। Kasyapa, is believed, according to the Sanscrit texts, to have founded Kashyapa-pura (otherwise known as Multan
  2. Gazetteer of the Multan District, 1923-24 Sir Edward Maclagan, Punjab (Pakistan)। ১৯২৬। পৃষ্ঠা 276–77।
  3. Imperial rule in Punjab: the conquest and administration of Multan, 1818-1881 by J. Royal Roseberry। পৃষ্ঠা 243, 263। 
  4. All the year round , Volume 51। Charles Dickens। ১৮৮৩। 
  5. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৭ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে Survey & Studies for Conservation of Historical Monuments of Multan. Department of Archeology & Museums, Ministry of Culture, Government of Pakistan 
  6. Muslim Saints of South Asia: The Eleventh to Fifteenth Centuries By Anna Suvorova। পৃষ্ঠা 153। 
  7. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১০ এপ্রিল ২০১৯। Cunningham, 129 
  8. Ajudhia Das, who was formerly Mahant of two temples at Multan named Prahlad and N'arasingpuri, was removed from his office on January 23rd, 1913, by a Panchayat appointed at a mass meeting of Hindus which was convened on that date. All India reporter, Volume 3 by D.V. Chitaley, 1923

ধন্যবাদ উইকিপিডিয়াকে ।
Share:

১৯ নভেম্বর ২০১৭

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাধর।
কৃষ্ণচন্দ্র কর দয়া করুণাসাগর।।
জয় রাধে গোবিন্দু গোপাল বনমালী।
শ্রীরাধার প্রাণধন মুকন্দ মুরারি।।
হরিনাম বিনে রে গোবিন্দু নাম বিনে।
বিফলে মনুষ্য জন্ম যায় দিনে দিনে।।
দিন গেল মিছে কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে।
না ভজিনু রাধাকৃষ্ণ চরণার বিন্দে।।
কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু।
মিছে মায়ায় বদ্ধ হ’য়ে বৃক্ষসম হৈনু।।
ফলরূপে পুত্র কন্যা ডাল ভাঙ্গি পড়ে।
কালরূপে সংসারেতে পক্ষী বাসা করে।।
যখন কৃষ্ণ জন্ম নিল দৈবকী উদরে।
মথুরাতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করে।।
বসুদেব রাখি এলো নন্দের মন্দিরে।
নন্দের আলয়ে কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে।।
শ্রীনন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন।
১ যশোদা রাখিল নাম যাদু বাছাধন।।
২ উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল।
৩ ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল।।
৪ সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই।
৫ শ্রীদাম রাখিল নাম রাখাল রাজা ভাই।।
৬ ননীচোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী।
৭ কালসোনা নাম রাখে রাধা-বিনোদিনী।।
৮ কুজ্বা রাখিল নাম পতিত-পাবন হরি।
৯ চন্দ্রাবলী নাম রাখে মোহন বংশীধারী।।
১০ অনন্ত রাখিল নাম অন্ত না পাইয়া।
১১ কৃষ্ণ নাম রাখেন গর্গ ধ্যানেতে জানিয়া।।
১২ কন্বমুনি নাম রাখে দেব চক্রপাণী।
১৩ বনমালী নাম রাখে বনের হরিণী।।
১৪ গজহস্তী নাম রাখে শ্রীমধুসূদন।
১৫ অজামিল নাম রাখে দেব নারায়ন।।
১৬ পুরন্দর নাম রাখে দেব শ্রীগোবিন্দ।
১৭ দ্রৌপদী রাখিল নাম দেব দীনবন্ধু।।
১৮ সুদাম রাখিল নাম দারিদ্র-ভঞ্জন।
১৯ ব্রজবাসী নাম রাখে ব্রজের জীবন।।
২০ দর্পহারী নাম রাখে অর্জ্জুন সুধীর।
২১ পশুপতি নাম রাখে গরুড় মহাবীর।।
২২ যুধিষ্ঠির নাম রাখে দেব যদুবর।
২৩ বিদুর রাখিল নাম কাঙ্গাল ঈশ্বর।।
২৪ বাসুকি রাখিল নাম দেব-সৃষ্টি স্থিতি।
২৫ ধ্রুবলোকে নাম রাখে ধ্রুবের সারথি।।
২৬ নারদ রাখিল নাম ভক্ত প্রাণধন।
২৭ ভীষ্মদেব নাম রাখে লক্ষ্মী-নারায়ণ।।
২৮ সত্যভামা নাম রাখে সত্যের সারথি।
২৯ জাম্বুবতী নাম রাখে দেব যোদ্ধাপতি।।
৩০ বিশ্বামিত্র নাম রাখে সংসারের সার।
৩১ অহল্যা রাখিল নাম পাষাণ-উদ্ধার।।
৩২ ভৃগুমুনি নাম রাখে জগতের হরি।
৩৩ পঞ্চমুখে রাম নাম গান ত্রিপুরারি।।
৩৪ কুঞ্জকেশী নাম রাখে বলী সদাচারী।
৩৫ প্রহ্লাদ রাখিল নাম নৃসিংহ-মুরারী।।
৩৬ বশিষ্ঠ রাখিল নাম মুনি-মনোহর।
৩৭ বিশ্বাবসু নাম রাখে নব জলধর।।
৩৮ সম্বর্ত্তক নাম রাখে গোবর্দ্ধনধারী।
৩৯ প্রাণপতি নাম রাখে যত ব্রজনারী।।
৪০ অদিতি রাখিল নাম আরতি-সুদন।
৪১ গদাধর নাম রাখে যমল-অর্জুন।।
৪২ মহাযোদ্ধা নাম রাখি ভীম মহাবল।
৪৩ দয়ানিধি নাম রাখে দরিদ্র সকল।।
৪৪ বৃন্দাবন-চন্দ্র নাম রাখে বিন্দুদূতি।
৪৫ বিরজা রাখিল নাম যমুনার পতি।।
৪৬ বাণী পতি নাম রাখে গুরু বৃহস্পতি।
৪৭ লক্ষ্মীপতি নাম রাখে সুমন্ত্র সারথি।।
৪৮ সন্দীপনি নাম রাখে দেব অন্তর্যামী।
৪৯ পরাশর নাম রাখে ত্রিলোকের স্বাম।।
৫০ পদ্মযোনী নাম রাখে অনাদির আদি।
৫১ নট-নারায়ন নাম রাখিল সম্বাদি।।
৫২ হরেকৃষ্ণ নাম রাখে প্রিয় বলরাম।
৫৩ ললিতা রাখিল নাম বাদল-শ্যাম।।
৫৪ বিশাখা রাখিল নাম অনঙ্গমোহন।
৫৫ সুচিত্রা রাখিল নাম শ্রীবংশীবদন।।
৫৬ আয়ন রাখিল নাম ক্রোধ-নিবারণ।
৫৭ চন্ডকেশী নাম রাখে কৃতান্ত-শাসন।।
৫৮ জ্যোতিষ্ক রাখিল নাম নীলকান্তমণি।
৫৯ গোপীকান্ত নাম রাখে সুদাম ঘরণী।।
৬০ ভক্তগণ নাম রাখে দেব জগন্নাথ।
৬১ দুর্বাসা নাম রাখে অনাথের নাথ।।
৬২ রাসেশ্বর নাম রাখে যতেক মালিনী।
৬৩ সর্বযজ্ঞেশ্বর নাম রাখেন শিবানী।।
৬৪ উদ্ধব রাখিল নাম মিত্র-হিতকারী।
৬৫ অক্রুর রাখিল নাম ভব-ভয়হারী।।
৬৬ গুঞ্জমালী নাম রাখে নীল-পীতবাস।
৬৭ সর্ববেত্তা নাম রাখে দ্বৈপায়ণ ব্যাস।।
৬৮ অষ্টসখী নাম রাখে ব্রজের ঈশ্বর।
৬৯ সুরলোকে নাম রাখে অখিলের সার।।
৭০ বৃষভানু নাম রাখে পরম ঈশ্বর।
৭১ স্বর্গবাসী নাম রাখে সর্ব পরাৎপর।।
৭২ পুলোমা রাখেন নাম অনাথের সখা।
৭৩ রসসিন্ধু নাম রাখে সখী চিত্রলেখা।।
৭৪ চিত্ররথ নাম রাখে অরাতি দমন।
৭৫ পুলস্ত্য রাখিল নাম নয়ন-রঞ্জন।।
৭৬ কশ্যপ রাখেন নাম রাস-রাসেশ্বর।
৭৭ ভাণ্ডারীক নাম রাখে পূর্ণ শশধর।।
৭৮ সুমালী রাখিল নাম পুরুষ প্রধান।
৭৯ পুরঞ্জন নাম রাখে ভক্তগণ প্রাণ।।
৮০ রজকিনী নাম রাখে নন্দের দুলাল।
৮১ আহ্লাদিনী নাম রাখে ব্রজের গোপাল।।
৮২ দেবকী রাখিল নাম নয়নের মণি।
৮৩ জ্যোতির্ম্ময় নাম রাখে যাজ্ঞবল্ক্য মুনি।।
৮৪ অত্রিমুনি নাম রাখে কোটি চন্দ্রেশ্বর।
৮৫ গৌতম রাখিল নাম দেব বিশ্বম্ভর।।
৮৬ মরীচি রাখিল নাম অচিন্ত্য-অচ্যুত।
৮৭ জ্ঞানাতীত নাম রাখে শৌনকাদিসুখ।।
৮৮ রুদ্রগণ নাম রাখে দেব মহাকাল।
৮৯ সুরগণ নাম রাখে ঠাকুর দয়াল।।
৯০ সিদ্ধগণ নাম রাখে পুতনা-নাশন।
৯১ সিদ্ধার্থ রাখিল নাম কপিল তপোধন।।
৯২ ভাদুরি রাখিল নাম অগতির গতি।
৯৩ মৎস্যগন্ধা নাম রাখে ত্রিলোকের পতি।।
৯৪ শুক্রাচার্য্য নাম রাখে অখিল বান্ধব।
৯৫ বিষ্ণুলোকে নাম রাখে দেব শ্রীমাধব।।
৯৬ যদুগণ নাম রাখে যদুকুলপতি।
৯৭ অশ্বিনীকুমার নাম রাখে সৃষ্টি-স্থিতি।।
৯৮ অর্য্যমা রাখিল নাম কাল-নিবারণ।
৯৯ সত্যবতী নাম রাখে অজ্ঞান-নাশন।।
১০০ পদ্মাক্ষ রাখিল নাম ভ্রমরী-ভ্রমর।
১০১ ত্রিভঙ্গ রাখিল নাম যত সহচর।।
১০২ বংকচন্দ্র নাম রাখে শ্রীরূপমঞ্জরী।
১০৩ মাধুরা রাখিল নাম গোপী-মনোহারী।।
১০৪ মঞ্জুমালী নাম রাখে অভীষ্টপুরণ।
১০৫ কুটিলা রাখিল নাম মদনমোহন।।
১০৬ মঞ্জরী রাখিল নাম কর্ম্মব্রহ্ম-নাশ।
১০৭ ব্রজব নাম রাখে পূর্ণ অভিলাস।।
১০৮ দৈত্যারি দ্বারিকানাথ দারিদ্র-ভঞ্জন।
দয়াময় দ্রৌপদীর লজ্জা-নিবারণ।।
স্বরূপে সবার হয় গোলকেতে স্থিতি।
বৈকুন্ঠে ক্ষীরোদশারী কমলার পতি।।
রসময় রসিক নাগর অনুপম।
নিকুঞ্জবিহারী হরি নবঘনশ্যাম।।
শালগ্রাম দামোদর শ্রীপতি শ্রীধর।
তারকব্রহ্ম সনাতন পরম ঈশ্বর।।
কল্পতরু কমললোচন হৃষীকেশ।
পতিত-পাবন গুরু জ্ঞান-উপদেশ।।
চিন্তামণি চতুর্ভুজ দেব চক্রপাণি।
দীনবন্ধু দেবকী নন্দন যাদুমনি।।
অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা।
নারদাদি ব্যাসদেব দিতে নারে সীমা।।
নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার।
অনন্ত কৃষ্ণের নাম মহিমা অপার।।
শততার সুবর্ণ গো কোটি কন্যাদান।
তথাপি না হয় কৃষ্ণ নামের সমান।।
যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি।
নামের সহিত আছে আপনি শ্রীহরি।।
শুন শুন ওরে ভাই নাম সংকীর্তন।
যে নাম শ্রবণে হয় পাপ বিমোচন।।
কৃষ্ণনাম হরিনাম বড়ই মধুর।
যেই জন কৃষ্ণ ভজে সে বড় চতুর।।
ব্রহ্ম-আদি দেব যারেঁ ধ্যানে নাহি পায়।
সে ধন বঞ্চিত হলে কি হবে উপায়।।
হিরণ্যকশিপুর উদর-বিদরণ।
প্রহ্লাদে করিল রক্ষা দেব নারায়ণ।।
বলীরে ছলীতে প্রভু হইলা বামন।
দ্রৌপদীর লজ্জা হরি কৈলা নিবারণ।।
অষ্টোত্তর শতনাম যে করে পঠন।
অনায়াসে পায় রাধা কৃষ্ণের চরণ।।
ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণকারী নন্দের নন্দন।
মথুরায় কংস-ধ্বংস লঙ্কায় রাবণ।।
বকাসুর বধ আদি কালীয়-দমন।
নরোত্তম কহে এই নাম সংকীর্ত্তণ।

হরে কৃষ্ণ সম্প্রদায়
Share:

২৫ অক্টোবর ২০১৭

দয়াময় ভগবান

ভগবান মানবের মঙ্গলসাধ‌নে আর ভক্ত‌দের বি‌শেষভা‌বে দৃঢ় করবার জন্য তাঁ‌দের পরীক্ষা নি‌য়ে থা‌কেন । যদিও তি‌নি আমা‌দের অন্ত‌রের প্র‌তি‌টি অ‌ভিপ্রায়‌কে ভা‌লোভা‌বে জা‌নেন তবুও শি‌ক্ষক যেমন শিক্ষার্থী‌দের যোগ্যতা - অ‌যোগ্যতা জে‌নেও তা‌দের পরীক্ষ‌া করেন তেমনভা‌বেই তি‌নি সতত আমা‌দের পরীক্ষা নি‌য়ে থা‌কেন । শিক্ষক তো সাম‌গ্রিকভা‌বে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা জা‌নেন না তাই সেইখা‌নে পরীক্ষা নেওয়ার যু‌ক্তি আ‌ছে কিন্তু ভগবান তো অন্তর্যামী - সব কিছুই জা‌নেন , তাঁর কিছুই অজানা নয় ।

আমরা যা‌কে বিপদ - আপদ ব‌লি তা বস্তুত ভগবা‌নের দ্বারা বি‌হিত এবং তা উপ‌স্থিত হয় ক্রমাগত আমা‌দের শক্তসামর্থ্য আর উত্থান সু‌নি‌শ্চিত করবার জন্য । অ‌নিচ্ছা ও প‌রের ইচ্ছায় যে প‌রি‌স্থি‌তি উপ‌স্থিত হয় তা‌কে ভগবা‌নের বিধান ম‌নে ক‌রে প্রসন্ন থাকা উ‌চিত । এই কথা কেবল অ‌নিচ্ছা ও প‌রের ইচ্ছায় লাভ করা সুখ - দুঃখা‌দি ভো‌গেই সীমাবদ্ধ , নত‌ুন কর্মসম্ব‌ন্ধে নয় । নতুন কর্ম তো ভগবা‌নের আশ্রয় নি‌য়ে নিজ সা‌ত্ত্বিক ব‌ু‌দ্ধির দ্বারা তাঁর আ‌দেশ অনুসা‌রে সুচারুরূ‌পে সম্পন্ন করুন । সকল ক‌র্মেই এই ভাব থাকা প্র‌য়োজন ।অনুকূল - প্র‌তিকূল প‌রি‌স্থি‌তিকে যার রাগ - দ্বেষ , হর্ষ - শোক যতটা ক্ষীণ হ‌য়ে‌ছে সে আধ্যা‌ত্মিক প‌থে ততটাই অগ্রসর হ‌য়ে‌ছে । বিকার অ‌ধিক থাক‌লে অধঃপতনও তদনুরূপ হয় ।

‌
বিকার দুই প্রকারের হয়ে থা‌কে ১ । মু‌ক্তি প্রদায়ক আর ২ । পতনকারক ।

মু‌ক্তি প্রদায়ক বিকার হল অ‌ন্যের দুঃখ দে‌খে দুঃখী হওয়া আর অপ‌রের সু‌খে সুখী হওয়া । এ‌টি বিকার হ‌লেও যে‌হেতু মু‌ক্তিপ্রদায়ক তাই তা গ্র‌হণ‌যোগ্য হয় । যে বিকার পতন সু‌নি‌শ্চিত ক‌রে - তা হল নিজ দুঃ‌খে দুঃখী আর নিজ সু‌খে অর্থাৎ সুখ প্রদায়ক বস্তু প্রা‌প্তি‌তে হ‌র্ষিত হওয়া । এই বিকার ত্যাজ্য । কিন্তু যে বিকার এই দুই থে‌কেও বড় বিকার তা অ‌তিশয় লজ্জাজনক তা হল অপরের দুঃখে সুখী হওয়া , প্রফুল্ল হওয়া আর অপর‌কে সুখী দে‌খে , উন্নত দে‌খে ঈর্ষা অনুভব করা । এ‌টি অ‌তিশয় সংকীর্ণত‌ার লক্ষণ ।

এ‌টি হল অাসু‌রিক স্বভাব । আর এর থে‌কে বড় অপরাধ হল , যে উপকার ক‌রে তারও অপকার করা । এইরূপ সংকীর্ণমনা ব্য‌ক্তির জন্য শা‌স্ত্রে কো‌নো শব্দই নেই ।

স‌র্বোত্তম কী ? যে অপকার ক‌রে তাও উপকার করা । এতেই নি‌জের কল্যাণ সু‌নি‌শ্চিত হয় । যি‌নি উত্তম ক্ষমাযুক্ত ব্য‌ক্তি তি‌নি কোন নি‌য়‌মের দি‌কে দৃ‌ষ্টিপাত ক‌রেন না । তাঁ‌দের তো ক্ষমা করা স্বভাব হ‌য়ে থা‌কে । তাঁরা তো স্বভা‌বেই সর্বভূ‌তে বি‌দ্বেষ বির‌হিত হ‌য়ে সক‌লের বন্ধু হ‌য়ে যান । তাঁ‌দের অন্তরে সক‌লের প্র‌তি করুণাভাব থা‌কে । সাধু ব্য‌ক্তি য‌দি শো‌নেন যে তাঁর অপকারকারী দণ্ড পা‌বে , তাহলে তি‌নি খুবই কষ্ট পান , তাঁর অশ্রুপাত‌ হ‌তে থা‌কে ।

এক মহানুভব ব্য‌ক্তি নৌকায় ব‌সে পারাপার হ‌চ্ছি‌লেন । সেই নৌকা‌তেই দুইজন অত্যাচারী দুষ্টও ব‌সে‌ছিল । অ‌হেতুক অপর‌কে কষ্ট দেওয়া তো দু‌ষ্টের স্বভাবই হ‌য়ে থা‌কে । সেই মহানুভব ব্য‌ক্তির সৌম্য , ঋজু ও শান্ত আকৃ‌তি তা‌দের ক্লেশ প্রদান কর‌তে লাগল । দুষ্ট দুইজন সং‌কেত ক‌রে সেই মহানুভব ব্য‌ক্তি‌কে নদী‌তে ফে‌লে দেওয়‌ার পরিকল্পনা করল । তারা আস্তে আ‌স্তে ক‌রে তাঁকে নৌকা থেকে ঠে‌লে জ‌লে ফে‌লে দি‌তে উদ্যত হল ।

সেই সম‌য়েই দৈববাণী হল - ' এই দুইজন অ‌তিশয় দুষ্ট , অত্যাচারী ও আপনা‌কে কষ্ট দি‌চ্ছে । এরা আপনা‌কে নদী‌তে ডু‌বি‌য়ে মে‌রে ফেল‌তে চায় । আপ‌নি অনু‌মতি দি‌লে এ‌দেরই নদী‌তে ডু‌বি‌য়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করি । ' দৈববাণী শ্রবণ ক‌রে মহানুভব ব্য‌ক্তি ক্রন্দন কর‌তে লাগ‌লেন আর বল‌তে লাগলেন - ' আ‌মি কী অপরাধী - যার জন্য এ‌দের ডু‌বি‌য়ে মে‌রে ফেল‌বার কথা শুন‌ছি । ' মহানুভবের করুণায় প‌রিপূর্ণ কথাগু‌লি শ্রবণ ক‌রে আবার দৈববার্তা হল - দণ্ড না দি‌য়ে কী কর‌লে ভা‌লো হয় ? তখন তি‌নি বল‌লেন - এঁরা আমার দর্শন ক‌রে‌ছেন , স্পর্শ ক‌রে‌ছেন আর আমার সঙ্গ লাভ ক‌রে‌ছেন । আ‌মি য‌দি ঈশ্ব‌রের কৃপাধন্য হই আর সাধু ব‌লে প‌রি‌চিত হই তাহ‌লে সাধুসঙ্গ লা‌ভে যেন এঁ‌দেরও সেই লাভ হয় আর এঁরাও প্রকৃত সাধুব্য‌ক্তি হ‌য়ে যান । '

সেই মহানুভব ব্য‌ক্তির ও দৈববাণীর বৃত্তান্ত শ্রবণ ক‌রে দুষ্ট ব্য‌ক্তি‌দের উপর খুবই অ‌তিশ্রয় প্রভ‌াব পড়ল । তারা মহানুভব ব্য‌ক্তির চরণযুগলে লু‌টি‌য়ে পড়ল আর তখন থে‌কেই সাধু ব্য‌ক্তি‌তে প‌রিণত হল ।

এই হল উচ্চ শ্রেণীর ব্যবহার । এ‌তে দয়া , ক্ষমা , অ‌হিংসা ও অ‌ক্রোধ সবই পূর্ণরূ‌পে বিদ্যমান । এই সকলই উচ্চভাবসম্পন্ন । দৈববাণী শ্রবণ ক‌রে মহানুভব ব্য‌ক্তি ক্রন্দন মুখর হ‌য়ে‌ছিলেন তা অবশ্যই বিকার ছিল কিন্তু সেই বিকার অপ‌রের হিতকাঙ্ক্ষায় ছিল তাই তা মু‌ক্তিদায়ক হয় । এ‌ই হল মহাপুরু‌ষের সিদ্ধান্ত , তাঁ‌দের অন্ত‌রের ব্যঞ্জনা । এই আচরণ‌কে যে কেউ বাস্তবে প‌রিণত কর‌তে পা‌রে । সক‌লের যা‌তে কল্যাণ হয় - এই ম‌নোভাব যেন সর্বদা থা‌কে । এইটুকু হ‌লেই হবে । এ‌কেই বলা হয় কর্ম‌যোগ ।

কর্ম‌যোগ তাহ‌লে কী ? যে কা‌র্যে স্বার্থ থাক‌বে না , কো‌নো ফলাকাঙ্ক্ষা থাক‌বে না আর যা অপ‌রের কল্যা‌ণে নি‌বে‌দিত থাক‌বে তাই তো কর্ম‌যোগ । এই কর্ম‌যো‌গের স্বপ্ল পাল‌নেই কল্যাণ সু‌নি‌শ্চিত । ঈশ্বর নিজ মু‌খে ব‌লে‌ছেন --

নেহা‌ভিক্রমনা‌শোহস্তি প্রত্যবা‌য়ো ন বিদ্য‌তে ।

স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়‌তে মহ‌তো ভয়াৎ ।। ( ২ \ ৪০ ) ।।

' নিষ্কাম কর্ম‌যোগে আর‌ম্ভের বিফলতা হয় না অর্থাৎ বী‌জের বিনাশ হয় না আর বিপরীত ফলরূপ দোষ‌ও হয় না । উপরন্তু এই নিষ্কাম কর্ম‌যো‌গরূপ ধ‌র্মের অল্প সাধনাও জন্ম - মৃত্যুরূপ মহাভয় থে‌কে রক্ষা ক‌রে । '

অতএব এর অন্ত‌র্নি‌হিত ভাব এই সামান্য কর্মও নিঃস্বার্থভা‌বে সম্পাদন কর‌লে তা মু‌ক্তি প্রদায়ক হ‌য়ে থা‌কে । এবং যাঁর সম্পূর্ণ কর্ম নিঃস্বার্থভা‌বে সতত সম্প‌া‌দিত হয় তি‌নি তো মু‌ক্তিস্বরূপ হ‌য়ে থা‌কেন । তাঁর দর্শন , স্পর্শ ও বাণী‌তে অন্যরা প‌বিত্র হ‌য়ে যায় - মুক্ত হ‌য়ে যায় । তাই স্বেচ্ছায় যা কিছু কর্ম করা হয় তা যেন সাবধা‌নে করা হয় , স্বার্থত্যাগ ক‌রে করা হয় আর অপরের কল্যা‌ণে জন্য যেন করা হয় । সেই কর্মই করা উ‌চিত যা‌তে ঈশ্বর প্রসন্ন হন , আর সতত তা প্রসন্ন‌চি‌ত্তে এই ম‌নে করা যে , ঈশ্ব‌রের হস্ত মস্ত‌কের উপর সতত ধরা আছে । যেন তি‌নি সর্বদ‌া মাথার উপর হাত রে‌খে আমাদের আশীর্বাদ কর‌ছেন ।

এই পথই উকৃষ্ট পথ ঈশ্বর সাধনায় । নিজ বু‌দ্ধি অনুসা‌রে সেই কার্য সম্পাদনই যেন হতে থা‌কে যা‌তে ঈশ্বর প্রসন্ন হন । স্বেচ্ছায় তো ভগবানের প্রসন্নতা অনুসা‌রে ও তাঁর আ‌দেশ শি‌রোধার্য ক‌রে কার্য সম্পাদন করা আর অ‌নিচ্ছা ও অপ‌রের ইচ্ছায় সম্পা‌দিত কর্ম‌কে ঈশ্ব‌রের প্রে‌রিত মঙ্গলময় বিধান ম‌নে করা । অপ‌রের ইচ্ছায় সম্পা‌দিত ক‌র্মের বিষয় এই চিন্তা ধারণ করা ভা‌লো যে ঈশ্বরই এমন ক‌রি‌য়ে‌ছেন আর অ‌নিচ্ছায় সম্পা‌দিত কর্ম সম্ব‌ন্ধে ঈশ্বর স্বয়ংই তা ক‌রি‌য়ে‌ছেন - এরূপ ম‌নে করা স‌র্বোত্তম । এইরূপ ম‌নে ক‌রে সর্বদা প্রসন্ন‌চিত্ত থাকা উ‌চিত । এ‌কেই বলা হয় ভ‌ক্তি , শরণাগ‌তি ও কর্ম‌যোগ ।

যে কা‌র্যে ভগবা‌নের সম্মতি আ‌ছে তাই করা আর তা কেবল তাঁর জন্যই সম্পন্ন করা । সব কিছু ঈশ্ব‌রের ম‌নে ক‌রে তাঁ‌কে অর্পণ করা আর সকল কার্য সম্পাদনকা‌লে তাঁ‌কে ম‌নে রাখা প্র‌য়োজন । ঈশ্বর প্রদত্ত প্র‌তি‌টি প‌রি‌স্থি‌তি‌তে কর্ম সম্পাদনকা‌লে তাঁ‌কে স্মরণ ক‌রে ও স‌ন্তোষ অনুভব ক‌রে প্রসন্ন থাকা উ‌চিত । প্রশ্ন উঠ‌তে পা‌রে যে কী ভে‌বে প্রসন্ন থাকব ? প্রসন্ন থাকা সম্ভব ভগবা‌নের দয়ার কথা ম‌নে ক‌রে , যেমন দেখ ! ভগবা‌নের কী অসীম কৃপা আমার উপ‌রে ! সক‌লের উপ‌রে !

অসীম কৃপার কথা ম‌নে ক‌রে এত আনন্দ হওয়া দরকার যেন তা চি‌ত্তে উথ‌লে প‌ড়ে ! সতত আ‌নন্দে মুগ্ধ থাকা । প্র‌য়োজ‌নে বারে বা‌রে প্রসন্ন‌চি‌ত্ত হওয়া । আহা ! প্রভু কত দয়াময় । এ‌টি স‌র্বোৎকৃষ্ট সাধনা আর এইটাই ভ‌ক্তি আর এরই নাম শরণাগত হওয়া । ঈশ্ব‌রের কৃপা ,রু‌চি এবং তার স্বরূপ স্মরণ ক‌রে প্রসন্ন চিত্ত থাকা দরকার । সুখ - দুঃখ যাই আসুক , তা‌তেই তাঁর কৃপা দর্শন করা । নি‌জে যা কর‌বেন তাতে লক্ষ্য রাখ‌তে হয় যে এই কা‌র্যে ঈশ্ব‌রের অনু‌মোদন র‌য়ে‌ছে তো ?

ঈশ্বরের দয়া ও অ‌ভিরু‌চির প্র‌তি লক্ষ্য থাক‌লে তাঁর স্বরূ‌পের প্র‌তি স্বতই অন্ত‌রে বজায় থাক‌বে । যখন আপ‌নি এই ম‌নে কর‌বেন - ' কোন একজন মহাপুরুষ আমার উপর কত কৃপা ক‌রে‌ছেন তখন স্বতই তাঁর স্মৃ‌তি হ‌বে আর যখন আপ‌নি তাঁর ইচ্ছা অনুসা‌রে কাজ কর‌বেন তখনও তাঁর স্মৃ‌তি সতত বর্তমান থাক‌বেই । তদনুরূপভা‌বে ভগবা‌নের ক্ষে‌ত্রেও এ‌টি প্র‌যোজ্য ।অতএব ভগবা‌নের প্রসন্নতা লা‌ভেচ্ছু ব্য‌ক্তিগণ ভগবা‌নের দয়ার উপর নির্ভর ক‌রে থাক‌বেন আর তা প্রত্যক্ষ ক‌রে উত্তরোত্তর প্রসন্ন হ‌বেন । তাঁর প্রী‌তির জন্যই কার্য সম্পাদন করে যাওয়া উ‌চিত এবং সতত তাঁ‌কে স্মর‌ণে রাখা উ‌চিত ।

Courtesy by: Joy Shree Radha Madhav
Share:

২৫ আগস্ট ২০১৭

'সত্য' হলো 'ভগবান'

পরমাত্মা যে মানুষের মধ্যেই থাকেন এটা কিন্তু অনেক সুপ্রাচীন বিশ্বাস। অন্তত ধর্ম গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা যেসব কিংবদন্তী পাই তা থেকে বিষয়টা বোঝা যায়। ধর্ম তো আর আকাশ থেকে গল্প তৈরী করে আনেনি! প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে আর দর্শনকে সংকলিত কার হয়েছে ধর্মগ্রন্থে। স্থান ও কালের গন্ডিতে মোড়ানো এ জগতের দৃশ্যমান কোন দেহেই পরমাত্মা তার সব গুনাবলী নিয়ে আর্বিভূত হন না, আর সে কারনেই দেহ-খাঁচায় বন্দি আত্মা দেখতে পায় না তার আসল রূপ। কিন্তু সব দেহের তুলনায় মানবদেহেই আত্মা আর্বিভূত হন তার সবচেয়ে বেশী গুনাবলী বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এই কারণে মানুষের চিন্তা জগতের কোন সীমা পরিসীমা নেই। অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে মানুষের পক্ষে সব দেখা সম্ভব। নিজেকে চেনা সম্ভব। কিন্তু মানুষ চিনতে পারে না নিজেকে। রিপুর তাড়নায় মানুষ হয়ে পড়ে দেহ কেন্দ্রিক। তখন মানব আত্মার ভাবনা গুলো হয়ে পড়ে নিতান্তই দেহ কেন্দ্রিক। আত্মার প্রধান কাজই হয়ে পড়ে দেহজাত তাড়নাতে সাড়া প্রদান করা।

ঈশ্বর নিজেকে স্থান ও কালের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ করে মানবরুপে আর্বিভূত হয়েছেন কেননা পরমাত্মা দেখতে চান ভালবাসা দিয়ে দেহজাত সব তাড়নাকে পরাজিতা করা সম্ভব কিনা। ভালবাসা দিয়ে সাধন সিদ্ধ হয় যার, সেই আত্মা লীন হয় পরমে। আর ব্যর্থ আত্মা ফিরে আসে বার বার মানব দেহে যতবার না মানব-সাধন সিদ্ধ হয়। যে সত্য জানে সে নিজেকে খুঁজে পায়। মানবসাধন সেদিনই হবে সিদ্ধ যেদিন ভালবাসার আলোয় দেহ আর মন হবে একই স্বত্ত্বা।

ভাল আর মন্দ হলো জগতের আর সব দ্বান্দিক বিষয়ের মতই প্রতিনিয়ত চলমান। মূর্ত আর বিমূর্ত সব কিছুই কিন্তু জগতে দ্বান্দিক জোড়ায় বিদ্যমান। দ্বন্দের মাধ্যমে কি তিনি কোন মীমাংসায় পৌঁছতে চান? ভাল আর মন্দের দ্বান্দ্বিকতা জগতের নিয়ম। মায়াময় জগৎ ঈশ্বরেরই তৈরী ভ্রান্তি। এ মোহনীয় ভ্রান্তিকে সত্যের বিপরীতে তিনি দাঁড় করিয়ে সত্যের মহানুভবতাকে উদযাপন করেন। সত্য আর মিথ্যা যদি পাশাপশি না থাকে তাহলে সত্যের সৌন্দর্য আর গুরুত্ব তাৎপর্য্যহীন হয়ে পড়ে। তাই এ জগতে সত্যের পাশাপাশি থাকে মিথ্যা, সুন্দরের পাশাপাশি কদর্য, শুভর পাশেই থাকে অশুভ, ভালোর সাথে মন্দ।

মানবজনম তারই সার্থক হয় যে খুঁজে নিতে পারে সত্যকে। 'সত্য' হলো 'ভগবান', জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ভালবাসা আর মানবিকতা।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

০৯ জুলাই ২০১৭

ঈশ্বর ও আত্মা

হিন্দু ধর্মে 'আত্মা' বুঝতে হলে প্রথমেই এর ঈশ্বরবাদ বুঝতে হবে, ঈশ্বর কয়জন, প্রথমেই এই প্রশ্নের উত্তর জেনে হিন্দু ধর্মে প্রবেশ করতে হবে। কারণ কেউ যদি না জানে যে ঈশ্বর কয়জন ও কি তবে ভক্তি অর্চনা করবে কাকে?
পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন সেই ঈশ্বর যিনি সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আছেন এবং থাকবেন এবং তিনিই প্রকৃত আরাধ্য। ঈশ্বর, পরমাত্মা বা পরমব্রহ্ম হচ্ছেন নিরাকার, কিন্তু তিনি চাইলেই যে কোন সাকার রুপ ধারণ করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণকে সেই পরমব্রহ্মের এক সাকার রূপ ধরা হয় এবং পরমেশ্বর মানা হয়। এখন কেউ যদি বলেন শ্রীকৃষ্ণ না শিবই আমার কাছে পরমেশ্বর তাতেও ভুল নেই কারণ তিনি যাঁকেই ডাকুন না কেন, সেই পরেমশ্বর কেই ভজনা করছেন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে কৃষ্ণ বড় নাকি শিব বড়। ব্রক্ষ্মবৈবর্ত পুরাণের সৃষ্টিখন্ডে ঈশ্বর শিবকে বলছেন -- "যে তোমার ও আমার মাঝে বিভেদ করবে তার মত পাপী আর পৃথিবীতে নেই"।
মূল কথা হচ্ছে ঈশ্বর একজন তিনি নিরাকার বা সাকার, আমরা যাকেই ভক্তি বা পূজা করিনা কেন তা সেই ঈশ্বরকেই করা হয়। আমারা বিভিন্ন রুপের মূর্ত্তিকে পুজা করি তা কিন্তু ঈশ্বর থেকে আলাদা মনে করে না, মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকেই পূজা করা হয়। ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ কল্পনা করে আমরা পূজা করেলেও ঈশ্বর কিন্তু সেই একজনই। অনেকে প্রশ্ন করেন ভাত সোজা করে না খেয়ে এত ঘুরিয়ে খাও কেন?

গীতায় ঈশ্বর বলেছেন -- "যে আমাকে যেভাবে ডাকবে আমি তাকে সেভাবেই ফলদান করব"। হিন্দু ধর্ম যে কতটা উদার তার প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। আমি যেভাবে, যেরুপে তাকে ডাকব তিনি সেভাবেই আসবেন তা সে ৩৩ কোটির যে কোন একটা হোক না কেন।

আমাদের দেহে যে আত্মা আছে, তা সকল ধর্মেই বিশ্বাস করে। ঈশ্বর হচ্ছেন সকল আত্মার উৎস অর্থাৎ পরমাত্মা। আর প্রতিটি জীবের শরীরে যে আত্মা আছে তা হচ্ছে জীবাত্মা। সকল ধর্ম কর্মের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে লীন হওয়া অর্থাৎ পৃথিবী থেকে মুক্ত হওয়া। পুরষ্কার অথবা শাস্তির শেষ আছে, মানে ভাল কাজের জন্য স্বর্গভোগ আর খারাপ কাজের জন্য নরকভোগ আছে। কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়, দুই টাকায় ভালো করে ১০ টাকার মিষ্টি খাবেন তা হবে না। পাকা হিসাবে যতটুকু ভাল ততটুকুই মিষ্টি। কিন্তু প্রধান উদ্দেশ্য কিন্তু স্বর্গ নয় সেই পরমাত্মার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া, এর আর কোন শেষ নেই।

আত্মার কোন ধ্বংস বা শেষ নেই। এটা এক দেহ হতে অন্য দেহে গমন করে মাত্র। দেহের পরিবর্তন হয়, শিশু হতে কিশোর আবার কিশোর হতে যুবক, কিন্তু আত্মার পরিবর্তন নেই। গীতা অনুযায়ী মানুষ যেমন পুরাতন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে তেমনি আত্মা ও পুরাতন জীর্ন শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে গমন করে। একটু আধুনিক ভাবে বলা যায়, দেহ হচ্ছে প্রোগ্রাম করা কোন যন্ত্র আর আত্মা হচ্ছে এর ব্যাটারী যখন এই দুই একত্রিত হবে তখনই যন্ত্র সচল হবে এখানে ব্যাটারী দিয়ে কথা তা যে যন্ত্র বা শরীরে সেট করা হোক না কেন, এর চালনা শক্তি থাকলেই চলে।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

১৯ মে ২০১৭

পরমেশ্বর ভগবানও শ্রীকৃষ্ণ


শ্রীকৃষ্ণ ও পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন অভিন্ন। তাই সমগ্র ভগবদ্ গীতায় তাঁকে ভগবান বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ভগবান হচ্ছেন পরমতত্ত্বের চরম সীমা। পরমতত্ত্ব উপলব্ধির তিনটি স্তর রয়েছে।
১) ব্রক্ষ অর্থাৎ নির্বিশেষ সর্বব্যাপ্ত সত্তা।
২) পরমাত্মা অর্থাৎ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বরের প্রকাশ।
৩) ভগবান অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
পরমতত্ত্বের এই বিশ্লেষণ সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভগবতে (১-২-১১) বলা হয়েছে -
যা অদ্বয় জ্ঞান, অর্থাৎ এক অদ্বিতীয় বাস্তব বস্তু, জ্ঞানীরা তাকেই পরমার্থ বলেন। সেই পরমতত্ত্ব ব্রক্ষ, পরমাত্মা ও ভগবান-- এই ত্রিবিধ সংজ্ঞায় অভিব্যক্ত হয়।
------------------------------------------
এই তিনটি চিন্ময় প্রকাশ সূর্যের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। সূর্যের ও তিনটি প্রকাশ রয়েছে, যেমন--
১) সূর্যরশ্মি।২) সূর্যগোলক। ৩) সূর্যমণ্ডল
১) সূর্যরশ্মি জানাটা হচ্ছে প্রাথমিক স্তর।
২) সূর্যগোলক সম্বন্ধে জানাটা আরও উচ্চতর স্তর।
৩) সূর্যমণ্ডলে প্রবেশ করে সূর্য সম্বন্ধে জানাটা হচ্ছে সর্বোচ্চ স্তর। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সূর্যকিরণ সম্বন্ধে জেনেই সন্তুষ্ট থাকে- তার সর্বব্যাপকতা এবং তার নির্বিশেষ রশ্মিছটা সম্বন্ধে যে জ্ঞান,তাকে পরমতত্ত্বের ব্রক্ষ উপলব্ধির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে এবং যাঁরা সূর্যমণ্ডলেরর অন্তঃস্থলে প্রবিষ্ট হয়েছেন, তাঁদের জ্ঞান পরম-তত্ত্বের সর্বোত্তম সবিশেষ রূপ সম্বন্ধে অবগত হওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাই ভগবদ্ভক্তবৃন্দ অথবা যে সমস্ত পরমার্থবাদীরা পরমতত্ত্বের ভগবৎ-স্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁরাই হচ্ছেন সর্বোচ্চ পরমার্থবাদী, যদি ও সমস্ত পরমার্থবাদীরা সেই একই পরমতত্ত্বের অনুসন্ধানে রত।
সূর্যরশ্মি, সূর্যগোলক ও সূর্যমণ্ডল এই তিনটি একে অপর থেকে পৃথক হতে পারে না, কিন্তু তবুও তিনটি স্তরের অন্বেষণকারীরা সমপর্যায়ভুক্ত নন।
------------------------------------------
শ্রীল ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি ভগবান কথাটির বিশ্লেষণ করেছেন। সমগ্র ঐশ্বর্য, সমগ্র বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র শ্রী, সমগ্র জ্ঞান ও সমগ্র বৈরাগ্য যাঁর মধ্যে পূর্নরূপে বর্তমান সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান।
কোন জীবই, এমন কি ব্রক্ষা, শিব, ণারায়ন ও শ্রীকৃষ্ণের মতো পূর্ণ ঐশ্বর্যসম্পন্ন হতে পারে না। তাই ব্রক্ষসংহিতাতে ব্রক্ষা নিজে বলেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। তিনি হচ্ছেন আদি পুরুষ, অথবা গৌবিন্দ নামে পরিজ্ঞাত ভগবান এবং তিনি সর্ব। কারণের পরম কারণ।
"ভগবতেও পরমেশ্বরের অনেক অবতারের বর্ণনা আছে। সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা তাঁর অংশের অংশ-প্রকাশ,কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান।
(ভাগবত ১-৩২৮)

Written by: Rajib Ghosh
Share:

০৮ মে ২০১৭

দেবতা ও ভগবানের পার্থক্য

Image may contain: 1 person

ভগবানের সাকার স্বরূপের উপাসনা করা সর্বোত্তম বা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সাকার স্বরূপের যারা উপাসনা করেন তাদের মধ্যে ভগবান সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার বিভ্রান্তি-
সাধারণত হিন্দু সমাজে কিছু মানুষ দেবতা ও ভগবানের পার্থক্য জানে না। ইন্দ্র, চন্দ্র, বরুণ, শিব, দুর্গা, কালী প্রভৃতি দেবতাদের সঙ্গে বিষ্ণু, নারায়ণ, রাম, নৃ্সিংহ, বামন প্রভৃতি ভগবানের সম পর্যায়ভুক্ত বলে মনে করে থাকেন। এটি আমাদের জানা উচিত যে ভগবান ও দেবতাদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। যেমন- দেবতারা হচ্ছেন ভগবানের দ্বারা নিযুক্ত এ জড়জগতের বিভিন্ন কার্য সম্পাদনের নিয়ন্ত্রণ কর্তা। যে ভাবে অগ্নি দেবতা অগ্নি নিয়ন্ত্রণ করেন; বরুণদেব জলের নিয়ন্ত্রণ করেন; বায়ু দেবতা বায়ু নিয়ন্ত্রণ করেন ইত্যাদি। শাস্ত্র অনুসারে দেবতারা জীবতত্ত্ব। যে কোন জীব ভগবান থেকে বিশেষ শক্তি প্রাপ্ত হয়ে দেবতাদের আসন গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু ভগবান জীবতত্ত্ব নন, তিনি হচ্ছেন বিষ্ণু তত্ত্ব। দেবতাদের আধিপত্য এই জড়জগতে সীমাবদ্ধ, কিন্তু ভগবানের আধিপত্য বা ঐশ্বরত্বের প্রভাব জড় ও চিন্ময় জগত সর্বত্র ব্যাপ্ত। দেবতারা মানুষকে একমাত্র ভৌতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করতে পারেন, কিন্তু মুক্তি দিতে পারেন না। ভগবান জীবকে মুক্তি প্রদান করতে পারেন। দেবতারা মায়াধীন, কিন্তু ভগবান হচ্ছেন মায়াধীশ। সৃষ্টি ও প্রলয়কালে দেবতাদেরও প্রভাবিত হতে হয়, কিন্তু ভগবান নিত্য বর্তমান এবং তার ধামও নিত্য বর্তমান। এইভাবে ইন্দ্রলোক, চন্দ্রলোক প্রলয়ের সময়ে সব ধ্বংস প্রাপ্ত হবে। কিন্তু ভগবানের ধাম- বৈকুণ্ঠ, অযোধ্যা, গোলক বৃন্দাবন ইত্যাদি ধ্বংস প্রাপ্ত হবে না। ইন্দ্র, চন্দ্র প্রভৃতি দেবতাগণ প্রকৃতির তিনটি গুণ দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকেন। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, রাম, নারায়ণ প্রভৃতি গুণাতীত। তাদের কার্যকলাপ প্রকৃতির তিনটি গুণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। সাধারণ মানুষ এই সমস্ত পার্থক্য বুঝতে পারে না। দেবতা ও ভগবানকে এক বা সমপর্যায় বলে মনে করে থাকে। এটি অবশ্য জেনে রাখা উচিত আমাদের বৈদিক সাহিত্যে তেত্রিশ কোটি দেবতাদের বর্ণনা করা হয়েছে। শাস্ত্রানুসারে যারা বিভিন্ন জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা বিভিন্ন ফল অতি সত্ত্বর লাভ করতে চান, তারা ভিন্ন ভিন্ন দেবতাদের উপাসনা করতে পারেন। কিন্তু সেটি বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়, কেননা জাগতিক ফল অনিত্য। যারা বুদ্ধিমান ব্যক্তি তারা ভগবানের শরণাগত হন। এভাবে সমস্ত দেবতাদেরকে ভগবান বলে উপাসনা করা ঠিক নয়। তার সঙ্গে সঙ্গে এটুকুও জানতে হবে যে দেবতাদের ভগবানের সমান না হলেও তাঁরা ভগবানের অতি নিজজন, তাঁরা পূজ্য, তাই দেবতাদের শ্রদ্ধা করা মানুষের কর্তব্য। দেবতাদের পূজা করা যেতে পারে, শ্রদ্ধা করা যেতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভক্তি করতে হয়। এভাবে মানুষের ভগবান ও দেবতাদের মধ্যে পার্থক্য জেনে শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে ভগবানের ভক্ত হওয়া কর্তব্য। তা না হলে দুর্লভ মনুষ্য জীবনের আসল লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে না। ভগবদ্গীতায় বর্ণনা করা হয়েছে-
যান্তি দেবব্রতা দেবান্ পিতৃন্ যান্তি পিতৃব্রতাঃ।
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা যান্তি মদ্যাজিনোহপি মাম্।।
(ভঃগী ৯/২৫)
দেবতাদের উপাসনা করলে দেবলোক যাবে, পিতৃপুরুষদের উপাসনা করলে পিতৃলোক যাবে, ভূত-প্রেতের পূজা করলে ভূতলোক যাবে। কৃষ্ণের উপাসনা করলে কৃষ্ণের ধামে যাবে। দেবতাদের পূজা করে দেবলোক যাবে এবং কৃষ্ণের পূজা করে কৃষ্ণ লোক যাবে- এটার মধ্যে পার্থক্য হল- দেবলোক যাওয়ার পর পুণ্য শেষ বা ক্ষয় হলে আবার মর্ত্যলোকে ফিরে আসতে হবে। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে-“আব্রহ্মভূবনাল্লোকাঃপুনরাবর্তিনোহর্জুন” কিন্তু ভগবদ্ধামে গিয়ে ভগবানকে প্রাপ্ত হলে আর এ জড়জগতে ফিরে আসতে হবে না। “ মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে”।“যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম”। এভাবে দেখানো হয়েছে জীবনের আবর্ত থেকে অর্থাৎ বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে হলে জীবনকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
গ্রন্থ; ভগবান কে?
শ্রীমদ্ ভক্তিপুরুষোত্তম স্বামী
প্রাপ্তিস্থান: নিকটস্থ ইসকন মন্দির


Courtesy by: প্রশ্ন করুন, উত্তর পাবেন। সনাতন ধর্মের হাজারও প্রশ্ন এবং উত্তর
Share:

ভগবান কে?

Image may contain: 2 people, indoor
ভগবানের অনন্ত ভগবৎ স্বরূপ রয়েছে
"অনাদি অন্তরূপম আদ্যং পুরান পুরুষং...।"
ভগবানের রাম,নরসিংহ,বামন,কূর্ম ইত্যাদি অনন্ত রূপের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ রূপটি হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ।

শ্রুতি,স্মৃতি অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমব্রহ্ম,স্বয়ং ভগবান। ভক্ত প্রবর অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভূতির কথা শ্রবণ করে নিজে স্বয়ং এটি স্বীকার করেছেন,

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান ।
পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভূম ।।
(গীতা-১০/১২)

আহুসত্বআমৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষির্নারদস্তথা ।
অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে ।।
(গীতা ১০/১৩)

অর্থাৎ "অর্জুন বললেন,-তুমি পরমব্রহ্ম,পরমধাম,পরম পবিত্র,পরম পুরুষ ,নিত্য,আদিদেব,অজ ও বিভু। দেবর্ষি নারদ,অসিত,দেবল,ব্যাস প্রভৃতি ঋষিরা সেই ভাবে তোমাকে বর্ণনা করেছেন এবং তুমি নিজেও এখন আমাকে তা বলছ।"

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা। যদিও তিনি স্বয়ং এই সৃষ্টি,স্থিতি প্রলয় আদি করেন না। ব্রহ্মা,বিষ্ণু ও মহেশ্বর জগতের সৃষ্টি,স্থিতি প্রলয় করেন,তবে তারা এই সব কর্ম শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা অনুসারে করে থাকেন। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাতেই দৃশ্যমান জগতের সৃষ্টি,পালন ও প্রলয় হয়ে থাকে।

গ্রন্থঃ ভগবান কে?


প্রশ্ন করুন, উত্তর পাবেন। সনাতন ধর্মের হাজারও প্রশ্ন এবং উত্তর
Share:

০১ এপ্রিল ২০১৬

যে দেহেই অবস্থান করুক না কেন, ভগবান সর্বক্ষণ তার সঙ্গে থাকেন

কঠোপনিষদ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে আছে -----
'সমানে বৃক্ষে পুরুষো নিমগ্নোহনীশয়া শোচতি মুহ্যমানঃ।
জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশমস্য মহিমানমিতি বীতশোকঃ।।'

অনুবাদ -- “দুটি পাখী একই গাছে বসে, কিন্তু যে পাখীটি ফল আহারে রত, সে তাঁর কর্মের ফলস্বরূপ সর্বদাই শোক, আশঙ্কা এবং উদ্বেগের দ্বারা মুহ্যমান। কিন্তু যদি সে একবার তার নিত্যকালের বন্ধু অপর পাখীটির দিকে ফিরে তাকায়, তবে তার সমস্ত শোকের অবসান হয়, কারণ তার বন্ধু হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তিনি সমগ্র ঐশ্বর্যের দ্বারা মহিমান্বিত।”


পদ্মপূরাণ থেকে আমরা জানতে পারি যে এই ব্রহ্মাণ্ডে মোট ৮৪ লক্ষ ধরণের জীব-শরীর বা প্রজাতি রয়েছে এদের মধ্যে --
৯ লক্ষ প্রজাতি হচ্ছে জলচর জীব,
২০ লক্ষ উদ্ভিদ প্রজাতি,
কীট-পতঙ্গ হচ্ছে ১১ লক্ষ প্রজাতির,
পাখী-প্রজাতি হচ্ছে ১০ লক্ষ,
পশু ৩০ লক্ষ প্রজাতির
এবং মানুষ ৪ লক্ষ প্রজাতির।
জীবসত্তা নানা প্রজাতির বিভিন্ন রকম জীব-শরীরে অবিরাম দেহান্তরিত হয়ে চলে, কিন্তু পরমাত্মা একান্ত সখার মতোই সর্বদাই তার সঙ্গে থাকেন; সেই জীবসত্তা মানবদেহে বা একটি কীট দেহে --- যে দেহেই অবস্থান করুক না কেন, ভগবান সর্বক্ষণ তার সঙ্গে থাকেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে অর্জুনের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা এই তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারি ---- অর্জুন হচ্ছেন ফল-আহারে রত পাখী, আর পর্যবেক্ষণরত পাখীটি হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। যদিও তাঁরা একে অপরের বন্ধু, তবুও তাঁদের একজন হচ্ছেন প্রভু এবং অন্যজন হচ্ছেন ভৃত্য। পরমাত্মার সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্কের কথা ভুলে যাবার ফলেই জীবাত্মা-রূপ পাখী এক গাছ থেকে অন্য গাছে, অর্থাৎ এক দেহ থেকে আরেক দেহে ঘুরে বেড়ায়। এই জড়দেহ-রূপ বৃক্ষে জীবাত্মা তার কর্মের ফল-স্বরূপ নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে, কিন্তু যে মুহূর্তে সে পরমাত্মার নিত্য দাসত্ব বরণ করে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে -- সেই মুহূর্তে সে জড়বন্ধন থেকে মুক্ত হয় এবং তার সবরকম দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি ঘটে।

Written by:  Prithwish Ghosh
Share:

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

অসুরের দেশে রাম নাম

রামায়নে কথিত আছে রাবনের ভাই বিভীষন ছিল রাম ভক্ত আর রাবনের দেশ ছিল লঙ্কায় । তিনি অসুরের ভাই হয়েও অসুরের দেশে রাম নাম করতেন আর তার বাড়ির ভিতরে ও আশেপাশে রাম নাম লিখে রাখতেন । রাবন তার শত্রুর নাম লিখাতে ক্ষেপে গিয়েছিল বিভীষনের উপর, তখন বিভীষন বললেন
রাবন দাদা আমি তোমার নাম প্রচার করছি । তখন রাবন বললেন কিভাবে? বিভীষন বললেন রাম মানে “রা-তে রাবন আর ম-তে মন্ধোদরি” । তখন রাবন বুঝতে পেরে বিভীষনকে তার গলার মালা খুলে পুরুষ্কার হিসেবে দেন ।

কিন্তু শেষে ফলাফল দেখা যায় রাম এসে ঐ অসুর রাজ্যে অসুরদের বিনাশ করে বিভীষনকে লঙ্কার রাজা বানিয়ে দেন । এতে কিন্তু বিভীষনের কম কষ্ট হয় নায় বললে ভুল হবে । রাম ভক্ত হওয়ার কারনে উনি অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন এমনকি তাকে পরিবার থেকে ত্যাগ করে দিয়েছিল এবং আরো অনেক ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু বিভীষন রামকে ছাড়েনি রামের উপর বিশ্বাস ছিলই বিধায় শেষে সত্যের জয় হয়েছিল ।

আবার এদিকে দেখি হিরন্যকশিপু একজন মারাত্মক অসুর হওয়ার পরও তিনি তার ছেলের মুখ থেকে তার শত্রু বিষ্ণুর নামটি ছাড়াতে পারি নি । এতে তার পুত্র প্রহ্লাদকে মেরে ফেলার জন্য কত পরিকল্পনা করেছিল কিন্তু একটিও বাস্তবতা হয়নি । প্রহ্লাদ কিন্তু ভগবান বিষ্ণুকে ছাড়েনি শেষে ফলাফল দেখলাম বিষ্ণু নৃসিংহ অবতারে হিরণ্যকশিপুকে মেরে ফেললেন আর একসময় তার বাবার রাজ্যের রাজা হলেন । এতে কিন্তু প্রহ্লাদের কম কষ্ট হয় নাই বললে ভুল হবে তিনিও অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন এমনকি তাকে মেরে ফেলার প্ল্যান করেছিল কিন্তু বিষ্ণুর প্রতি অগাদ বিশ্বাস ছিল বলে শেষে সত্যের জয় হয়েছিল ।

উপরের দুটি ঘটনা থেকে আমরা শিখতে পারি কেউ যখন ভক্তিযোগ পালন করে তখন তিনি আর সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ট থাকে না কারন ভগবানের চোখে সবাই সমান তার কাছে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ট বলতে কিছু নাই, যারাই ভক্তি করবে তাদের জিত অবশ্যই হবে তাদের কোন বিনাশ নাই যা ভগবদগীতায়ও বলা হয়েছে । কিন্তু আমাদের শুধু একটু ধৈর্য ধরতে হবে আর ভগবানের ভক্তি করতে হবে যা যেকোন কঠিন পরিস্থিতিতে আসুক না কেন, আমাদের ভক্তি ত্যাগ করা উচিত নয় । তা যদি করতে পারি তাহলে জিত আমাদের হবেই । কারন জগৎটা এমনই ভক্তদের কষ্ট দেওয়ার জন্য অসুরেরা সবসময় তৎপর সেটা অন্য যুগে ছিল তা নয় এটা আমরা এই কলিযুগেও দেখি । উপরের ঘটনায় বিভীষন আর প্রহ্লাদ ছিলেন কিন্তু সংখ্যালঘু, তাই বলে কি ওদের ভক্তি কি কেউ কেড়ে নিতে পারেছে, না কেউ কেড়ে নিতে পারে নি, জয় কিন্তু সেই সংখ্যালঘুদের হয়েছে । তাই সংখ্যালঘু বলে নিজেকে দুর্বল ভাববেন না ভগবানের ভক্তি করুন মনে সাহস আনুন আর একতা থাকার চেষ্টা করুন দেখবেন ভগবান আপনার পাশেই আছে আর জিত আপনারেই হবে ।

Written by: songkirton madob das
Share:

০২ মে ২০১৫

মঙ্গলাগিরিতে ভগবান নৃসিংহদেব

অনেকেই বলে যে, ‘পৃথিবীতে ভগবান বলতে কিছুই নেই’ । আবার অনেকে বলে, ‘ভগবানকে কেউ দেখেছে নাকি? বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে ভগবান মানে সেকেলের কাল্পনিক ধারণা মাত্র, যা হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয় ।’ এই সমস্ত প্রচলিত উক্তি আমাদের সমাজে অনেকেই করে থাকে । তাদের জন্যে ‘মঙ্গলাগিরি’ এক বাস্তব প্রমাণ ।
পারমার্থিক জগতে ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে অপ্রাকৃতিক লীলা দর্শনের মাধ্যমে আমাদের ভক্তি কিংবা বিশ্বাস বৃদ্ধি পায় । ভক্তগন পারমার্থিক জ্ঞান দ্বারা এবং পূর্বতন আচার্যদের গুণাবলী কিংবা লীলা দর্শন করে ভগবানের প্রতি বিশ্বাস সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করে । আমরা অনেকেই হয়তো সরাসরিভাবে ভগবানের লীলা উপলব্ধি করতে পারি না । কিন্তু অপ্রাকৃতিক ধাম ‘মঙ্গলাগিরি’ তে এলে যে কেউ ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে সাক্ষাৎ লীলা দর্শন করতে পারেন । এতে ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রেমভক্তি বৃদ্ধি পায় ।
অর্ধসিংহ ও অর্ধ নররূপি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার ভগবান নৃসিংহদেব, যিনি সত্যযুগে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষার জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন । ভগবান নৃসিংহদেবের আবির্ভাব স্থান অহোভিলাম থেকে কিছু দূরে দক্ষিণ ভারতে মঙ্গলাগিরি ধাম অবস্থিত । এই ধামের চতুর্দিক হাতি সদৃশ । এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় ‘স্কন্দ পুরাণ’ হতে ।
একবার বিভিন্ন শারীরিক প্রতিবন্ধক অবস্থায় জন্ম নেয় এক বালক ঋষ্যশৃঙ্গি । ঋষ্যশৃঙ্গি যখন বুঝতে সক্ষম হলেন যে তার পিতা পরিযাত্র তার প্রতিবন্ধী শরীরে জন্মগ্রহণে অসন্তুষ্ঠ, তখন তিনি পিতৃ আবাস ত্যাগ করলেন । তীর্থ পরিক্রমা কালে তিনি কৃষ্ণ নদীর দক্ষিন পার্শ্বে এসে পদিত আশ্রমে আশ্রয় নেন । তিনি যখন শুনলেন যে তার পিতা সেখানে আসছেন, তখন তিনি সেখানের লক্ষ্মীনারায়ণ বিগ্রহের কাছে প্রার্থনা করলেন তারা যাতে লক্ষ্মীনৃসিংহ রূপে অবতীর্ণ হয়ে পাহাড়ে নিত্য অবস্থান করেন । ঋষ্যশৃঙ্গির কঠোর তপস্যা ও কৃচ্ছসাধনে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান নৃসিংহদেব এই স্থানে আবির্ভূত হয়েছিলেন । ঋষ্যশৃঙ্গির স্তোত্র পাঠের কারণে উক্ত পাহাড়কে ‘স্তোত্রাদ্রি’ বলা হয় । স্তোত্রাদ্রি পাহাড়ের উপর ৬০০টি সিড়ি পাড় হয়ে উঠলে লক্ষ্মীনৃসিংহ মন্দির দর্শন করা যায় । ৬০০ সিড়ি বেয়ে উঠতেই প্রচন্ড ক্লান্তি আপনাকে অবসন্ন করতে পারে । তবে চিন্তা নেই, আপনার ক্লান্তি নিমিষেই চলে যাবে যখন আপনি এখানের এক বিশেষ প্রসাদ গ্রহণ করবেন । আখের রস, কর্পুর, এলাচ ও কালো মরিচের সমন্বয়ে তৈরি এক অপূর্ব শরবত বা পঙ্কম (তামিল ভাষায়) এখানে নৃসিংহদেবকে নিবেদন করা হয় । যে কারো নিবেদিত এই শরবত ভগবান গ্রহণ করে থাকেন এবং এজন্যে আপনাকে টিকেট সংগ্রহ করতে হবে । পাহাড়ের গুহায় অবস্থিত এই মন্দিরের বিগ্রহের নাম পঙ্কল নৃসিংহ । এই পঙ্কল নৃসিংহ হচ্ছেন স্বপ্রকাশিত বিগ্রহ যার রয়েছে বড় মুখ যা ছয়ইঞ্চি গভীর । চর্তুহস্তে এবং বিশাল মুখে তিনি সরাসরি ভোগদ্রব্য গ্রহন করে থাকেন । একটি শরবত পূর্ণ জগ নিয়ে যদি আপনি ভগবানকে নিবেদন করেন তখন পূজারী সেই শরবত ভোগ সরাসরি শঙ্গের সাহায্যে পঙ্কল নৃসিংহদেবের মুখে প্রবেশ করিয়ে দেয় । ঠিক তখন খল খল শব্দ হয় এবং ভগবান যে স্বয়ং সেই নিবেদিত জল গ্রহণ করছেন তা বোঝা যায় । কিন্তু এক সময় ঐ শব্দ আর শোনা যায় না । তখন পূজারী পঙ্কম পান করানো থেকে বিরত থাকেন । তবে এখানে আশ্চর্যের বিষয় যে, ভগবান কখনো সম্পূর্ণ পাত্রপূর্ণ শরবত গ্রহণ করেন না । তিনি ঠিক অর্ধেক গ্রহণ করেন এবং প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায় যে, প্রতিবারই যখনই ভাগবানকে ভোগ নিবেদন করা হয় তখন কেবল অর্ধেক গ্রহন করেন । পঙ্কল নৃসিংহ মূলত স্বপ্রকাশিত পাথরের বিগ্রহ, যার ডানে রয়েছে শঙ্খ এবং বামে সুদর্শন চক্রের চিহ্ন । ভক্তের প্রীতিবিধানের উদ্দেশ্য এবং নিবেদিত ভোগ্য সরাসরি গ্রহণ করার জন্য খোলা মুখমণ্ডল । যদিও প্রতিদিন এখানে প্রচুর পরিমানে সুমিষ্ট পানীয় নিবেদিত হয় তবুও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এখানে কোন পিঁপড়া নেই । এছাড়া এত গ্যালন গ্যালন পানীয় যে কোথায় যায় তা এখনো পর্যন্ত কেউ উপলব্ধি করতে পারেনি । স্কন্দ পুরাণে বলা আছে প্রতিদিন রাতে দেবদেবীরা এই নৃসিংহদেব পূজা আর স্তুতি করে থাকে যা এখনো হয়ে থাকে, সন্ধ্যার পর এই মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হয় আর যখন সকালে মন্দির খোলে তখন অপূর্ব মনোহর এক সুগন্ধ ভেসে আসে, তারপ সারাদিন আর ঐ সুগন্ধ থাকে না আবার রাতে দরজা বন্ধ করলে পরেরদিন সকালে সে একই সুগন্ধ ভেসে আসে । সত্যিই আশ্চর্যকর ভগবানে নৃসিংহদেবের মহিমা ।


Written by: সংকীর্তন মাধব
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।