• মহাভারতের শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান

    মহাভারতে যে সময়ের এবং শহরগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা কি, এবং ঠিক কোথায় এই শহরগুলো অবস্থিত সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার তাগিদে আমরা যেমন অতীতের অনেক ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবো, তেমনি বর্তমানের পরিস্থিতির আলোকে শহরগুলোর অবস্থা বিচার করবো। আশা করি পাঠকেরা জেনে সুখী হবেন যে, মহাভারতের শহরগুলো কোনো কল্পিত শহর ছিল না। প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে সেই শহরগুলো আজও টিকে আছে এবং নতুন ইতিহাস ও আঙ্গিকে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।

  • মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

    তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী । পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।

  • প্রাচীন মন্দির ও শহর পরিচিতি (পর্ব-০৩)ঃ কৈলাশনাথ মন্দির ও ইলোরা গুহা

    ১৬ নাম্বার গুহা, যা কৈলাশ অথবা কৈলাশনাথ নামেও পরিচিত, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ইলোরা’র কেন্দ্র। এর ডিজাইনের জন্য একে কৈলাশ পর্বত নামে ডাকা হয়। যা শিবের বাসস্থান, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত কিন্তু এটি একটিমাত্র পাথরকে কেটে তৈরী করা হয়েছে। যার আয়তন এথেন্সের পার্থেনন এর দ্বিগুণ। প্রধানত এই মন্দিরটি সাদা আস্তর দেয়া যাতে এর সাদৃশ্য কৈলাশ পর্বতের সাথে বজায় থাকে। এর আশাপ্সহ এলাকায় তিনটি স্থাপনা দেখা যায়। সকল শিব মন্দিরের ঐতিহ্য অনুসারে প্রধান মন্দিরের সম্মুখভাগে পবিত্র ষাঁড় “নন্দী” –র ছবি আছে।

  • কোণারক

    ১৯ বছর পর আজ সেই দিন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সোমবার দেবতার মূর্তির ‘আত্মা পরিবর্তন’ করা হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘নব-কলেবর’ নামের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হবে। পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে, পূজারীদের বিশ্বাস। এ জন্য ইতিমধ্যেই জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলভদ্রের নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে, যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে এটা তাঁরা দেখতে না পান। পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রা পরিচালনা করেন পুরোহিতদের যে বংশ, নতুন বিগ্রহ তৈরী তাদেরই দায়িত্ব থাকে।

  • বৃন্দাবনের এই মন্দিরে আজও শোনা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহন-বাঁশির সুর

    বৃন্দাবনের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নিধিবন মন্দির। এই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। যা আজও পর্যটকদের সমান ভাবে আকর্ষিত করে। নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য-ঘেরা সব গল্পের আদৌ কোনও সত্যভিত্তি আছে কিনা, তা জানা না গেলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাভূমিতে এসে আপনি মুগ্ধ হবেনই। চোখ টানবে মন্দিরের ভেতর অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে ভরা রাধা-কৃষ্ণের মুর্তি।

শিব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শিব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

০৫ মে ২০২২

নীল ষষ্ঠী, জেনে নিন, কেন এই দিন পালনের রীতি রয়েছে মহিলাদের মধ্যে।

 “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে” -- সন্তানের মঙ্গলকামনা করে শিবের কাছে ব্রত করার উৎসবই নীল ষষ্ঠী। বারো মাসে তেরো পার্বণে অভ্যস্ত বাঙালির কাছে কৌলিন্যের আদরে এই ব্রতের ভূমিকা কিছুটা হারালেও, গ্রাম বাংলায় এখনও বেশ জাঁকজমকের সঙ্গেই নীল ষষ্ঠী পালনের রেওয়াজ রয়েছে। অথচ আগেকার দিনে কত ব্রতই না পালিত হত বাংলায়! অশোক ষষ্ঠী ব্রত, আদর সিংহাসন ব্রত, আদা-হলুদ ব্রত, ইতু ব্রত, কালকুমারি পূজা ব্রত, কুলুই পূজা ব্রত, তুষ তুলসী ব্রত, দশ পুতুল ব্রত, পুন্যিপুকুর ব্রত, বানব্রতের উৎসব ব্রত, মাঘ মন্ডল ব্রত, মেছেনী ব্রত, মেঘারানীর ব্রত, যমপুকুর ব্রত, ষষ্ঠী ব্রত, সবুজ পাতার ব্রত, সাবিত্রী ব্রত, সেঁজুতি ব্রত, হরিচরণ ব্রত, হেলেনা ব্রত, অরন্য ষষ্ঠী ব্রত, নীল ষষ্ঠী ব্রত, পাটাই ষষ্ঠী ব্রত, দুর্গা ষষ্ঠী ব্রত, রাধাষ্ঠমী ব্রত, জন্মাষ্ঠমী ব্রত, অক্ষয় তৃতীয়া ব্রত, জিতাষ্টমী ব্রত, পৃথিবী ব্রত, চাঁপাচন্দন ব্রত, নখ ছুটের ব্রত, সুবচনী ব্রত, বসন্তবুড়ী ব্রত, মাকাল ব্রত, ওলাই চন্ডী ব্রত, মঙ্গল চন্ডী ব্রত, নাগপঞ্চমী ব্রত, মধুসংক্রান্তি ব্রত, বিবিঞ্চি ব্রত, ডেঁপু ব্রত, কার্তিক ব্রত, কুলকুলাতি ব্রত, গাড়ু ব্রত, গিন্নিপালন ব্রত, গোকুল ব্রত, ঘাঁটো ব্রত, জামাই ষষ্ঠী ব্রত, বিপত্তারিনী ব্রত, রাম নবমী ব্রত, শনি দেবের ব্রত, সত্যনারায়ণ ব্রত, জয় মঙ্গলবার ব্রত, শিবরাত্রির ব্রত, সন্তেষীমার ব্রত, বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজার ব্রত, শীতলা ষষ্ঠী ব্রত --- আমার ছোটবেলায় এ'রকম অনেক ব্রত উদযাপন করতে দেখেছি। তবে, আধুনিক কালে আর দেখি না। আর এই চৈত্র মাসের এই ব্রতকে অনেকে নীল পুজোও বলে থাকেন। নীলপূজা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, হাওড়া, বাংলাদেশ এবং ত্রিপুরায় বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়। নদিয়া জেলার নবদ্বীপের গাজন উৎসবের একটি অংশ হিসাবে বাসন্তী পুজোর দশমীর ভোরে শিবের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।


অশোকষষ্ঠী বা বাসন্তীদুর্গাপুজো হয় চৈত্রমাসের শুক্লাতিথিতে। তবে মহাদেবের নীলের পুজোর দিনটা বরাদ্দ চড়ক বা গাজনের দিনক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষশেষের সংক্রান্তির আগের দিনে। সনাতন হিন্দু ধর্মে এই উৎসবকে শিব-দুর্গার বিয়ে নামেও অভিহিত করা হয়।


নীল বা নীলকণ্ঠ মহাদেব শিবের অপর নাম। সেই নীল বা শিবের সাথে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর বিয়েই নীল-পুজো। গ্রাম বাংলায় এখনও শিব-দুর্গা সেজে নীলের গান বা অষ্টক গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করতে দেখা যায় নীলসন্ন্যাসীদের। অনেকে আার নিম বা বেল কাঠ দিয়ে তৈরি করেন নীলের মূর্তি। সেই মূর্তি সাজিয়ে শুরু হয় উৎসব। পরনে লাল বা গেরুয়া কাপড়, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে ত্রিশূল নিয়ে ব্রত রাখা নীলসন্ন্যাসীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। তাঁদের সঙ্গ দেন শিব-দুর্গা বেশের সঙেরা। গৃহস্থ মহিলারা বা গর্ভবতী মহিলারা এই নীলের মিছিল দেখলেই তাঁদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আনেন। নীলের মাথায় তেল-সিঁদুর লেপে শুরু হয় পুজো। তারপরই নীলের গানে মেতে ওঠেন সকল নীলসন্ন্যাসীরা --


"শুন সবে মন দিয়ে হইবে শিবের বিয়ে

কৈলাসেতে হবে অধিবাস।

(ও) তাতে নারদ করে আনাগোনা

কৈলাসে বিয়ার ঘটনা

বাজে কাঁসী বাঁশী, মোহন বাঁশরী।"

"(ও) নারদ চলল গিরি রাজের গৃহেতে।।


আর একদিনেতে শূলপাণি,

নারদকে বলেন বাণী

শুনো নারদ শুনো আমার সাধ,

আমি দুই পাশে দুই বালিশ দিয়ে,

মধ্যিখানে থাকি শুয়ে

উশিপুসি করে কাটাই রাত।।

(ও) নারদ চললো গিরি রাজের গৃহেতে।।


আর ওই শিব কয় কৈলাসে যেয়ে,

দেখে এসেছি মেয়ে

শীঘ্র করো বিয়ের আয়োজন,

(ও) নারদ চললো গিরি রাজের গৃহেতে।।


চলিলেন নারদ মুনি, চলিলেন নারদ ধনি

উপনীত গিরি পুরে যেয়ে।

কইলেন মেনকা রানী, আইলেন নারদ মুনি

দেখা পেয়ে এল মুনির ঠাঁই।।

(ও) নারদ চললো গিরি রাজের গৃহেতে।।


শোনো ওগো গিরি রাজা, হইবা আমার আজা

জামাই তোমার হবে দিগম্বর।।"


বিয়ের ঘটক ভাগিনেয় নারদ মুনির কাছে শিব আর্তি জানান,


"ভাইগনা যদি উপকারী হও।

তবে বিয়া দিয়া আমার প্রাণ বাঁচাও।।"


--- এমন নানা গান এখনও নীল-ষষ্ঠীর দিন শোনা যায় গ্রাম বাংলায়।


এই নীল ষষ্ঠী নিয়ে ব্রতকথাও রয়েছে। কাহিনী বহু কাল আগের। এক স্থানে বাস করত এক ব্রাহ্মণ আর এক ব্রাহ্মণী। তাঁদের সন্তান ভাগ্য ছিল খুব খারাপ। ছেলেমেয়ে জন্মালেই মারা যেত। অনেক বার- অনেক ব্রত করেও কোনও ফল না হওয়ায় তারা ঠিক করলো সব ছেড়ে কাশী চলে যাবে।


একদিন নানা তীর্থ ঘুরতে ঘুরতে কাশীর গঙ্গা ঘাটে বসে তাঁরা দু’জনে যখন বিলাপ করছে, তখন মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার বেশে এসে তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘হ্যাঁ গা, তোরা কাঁদছিস কেন?’ মনের দুঃখে ব্রাহ্মণী জানায়, “আমাদের সব সন্তান মারা গেছে। কেউ বেঁচে নেই। অনেক পুজো করেও ফল মেলেনি। তুমি বলো এখন কী করি?” সব শুনে বৃদ্ধা বলেন, “এ সব হয়েছে তোমাদের অহঙ্কারের জন্য। শুধু বার-ব্রত করলেই হয় না। ভগবানে বিশ্বাস থাকা চাই। মন দিয়ে তাঁকে ডাকতে হবে।’


ব্রাহ্মণী তখন তাঁর পা ধরে বললেন -- “কে তুমি, বল মা।”

বৃদ্ধা বললেন -- “আমিই মা ষষ্ঠী। শোন, এই চৈত্র মাসে সন্ন্যাস করবি এবং সেই সঙ্গে শিবপুজো করবি। সংক্রান্তির আগের দিন উপবাস করে নীলাবতীর পুজো করে নীলকন্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে দিবি। আর তারপর আমাকে প্রণাম করে জল খাবি। একে বলে নীল ষষ্ঠী।”


মা ষষ্ঠী এই কথা বলেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এর পর দেশে ফিরে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী নীলের দিন খুব ভক্তি আর নিষ্ঠার সঙ্গে নীলষষ্ঠী ব্রত পালন করেন। তার কিছু দিন পরেই তাঁদের সুন্দর ছেলে জন্মায়। নীল ষষ্ঠী ব্রতের এই মাহাত্ম্য দেখে দেশে দেশে সবাই তখন এই ব্রত পালন করতে আরম্ভ করে।


পূজার রীতি বলতে -- চৈত্র মাসের সংক্রান্তির দিন সারা দিন উপোস করার পর সন্ধ্যাবেলা শিবের মাথায় জল ঢেলে শিবকে প্রণাম করে গর্ভবতী মহিলারা বা মায়েরা। অনেকে নির্জলা থেকেও ব্রত পালন করেন। সন্ধেয় প্রদীপ জ্বালিয়ে শিবের মাথায় জল ঢালার পরেই ব্রত ভঙ্গ হয়। কথায় বলে, নীলের ব্রত নিষ্ঠামতো পালন করলে কোনওদিন সন্তানের অমঙ্গল হয় না। সন্তান দীর্ঘজীবন লাভ করে।


তাই সন্তান লাভ ও সন্তানের মঙ্গল কামনা করে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পালন করা হয় নীল ষষ্ঠী। এই দিন মায়েরা সারাদিন ধরে উপোস করে থাকেন। বিকেলে পুজো দিয়ে তবেই কিছু মুখে দেন তাঁরা। বাঙালি গৃহিণীরা নিজের সন্তান এর মঙ্গল কামনায় নীরোগ সুস্থ জীবন কামনা করে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন। আজ ঘরে ঘরে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের মঙ্গলকামনায় তাঁরা বলেন --


"নীলের ঘরে দিলাম বাতি,

সাক্ষী থেকো মা ভগবতী।"


ওঁ নমঃ শিবায়,

ওঁ নমঃ চণ্ডিকায়ৈ।


Written by: Prithwish Ghosh

Share:

প্রতিটি জীবই শিব

 অন্নদা মঙ্গলে দেবী স্বয়ং নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন -

গোত্রের প্রধান পিতা মুখবংশজাত।

পরমকুলীন স্বামী বন্দবংশখ্যাত।।

পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম।

অনেকের পতি তেঁই পতি মোর বাম।।

অতিবড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ।

কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন।।

কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ।

কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।।

গঙ্গা নামে সতা তার তরঙ্গ এমনি।

জীবনস্বরূপা সে স্বামীর শিরোমণি।।

ভূত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে।

না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে।।

অভিমানে সমুদ্রেতে ঝাঁপ দিলা ভাই।

যে মোরে আপনা ভাবে তারি ঘরে যাই।।

পড়তে এ সব বেশ লাগে, তবে ভাবি কি নিপুন ভাবে কত বড় এক তত্ব কথা কি সহজ ভাবে পরিবেশন করেছেন ভরত চন্দ্র রায় গুনাকর আবার ভাবি, শুধু রায় গুনাকর কেন? আঠারোটা পুরাণ আছে আমাদের... সবার মাঝেই তো তত্ব কথা এমনি ভাবেই লুকিয়ে আছে ।

মহাদেব শিব... অনাদি অনন্ত... কত রূপে বিরাজ করছেন তিনি

একধারে তিনি পঞ্চানন, পাঁচটি তাঁর আনন বা মুখ  আর নয়ন তিনটি, তৃতীয়টি তাঁর জ্ঞান নয়ন, জ্ঞান ত’ অগ্নি স্বরূপ, সব আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে চারিদিক আলোকিত করে তোলে। এই রূপে তিনি সগুণ ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা, জীবের নিয়ন্তা ।

দেবী তাই ত বললেন -- “ভূত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে”  পঞ্চভুত ত’ তাঁর ইঙ্গিতেই নাচছে

আরও বলছেন দেবী -- “অনেকের পতি তেঁই পতি মোর বাম।” বিশ্বনাথ তিনি; তিনি যে জগতের পতি, হলাহল পান করে তিনিই ত’ সৃষ্টি রক্ষা করেছিলেন, তাই ত তাঁর কণ্ঠ ভরা বিষ ।

“কুকথায় পঞ্চমুখ” – তারও যেন কি একটা অর্থ আছে, কুকথা মানে কিন্ত গালাগালি বা খারাপ কথা নয়. সেকি চতুর্বেদেরও ওপারে যে তত্ব আছে তারই ইঙ্গিতই করছে ? 

তবে, এইখানেই শেষ নয়, অন্য আরেক দিক দিয়ে দেখতে গেলে শিব নির্গুণ ব্রহ্মও বটেন। তাই ত দেবী বললেন, “অতিবড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ। কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন” 


আবার জীব রূপে এই শিবই ত’ এই বিশ্বচরাচর ছেয়ে আছেন... আপন প্রকৃতিকে অবলম্বন করে তিনিই ত জীব সেজে হাসছেন, কাঁদছেন, নাচছেন... সংসার সংসার খেলা খেলে চলেছেন.......... অবশ্য জীব সাজতে গিয়ে শিব কে প্রকৃতির সাহায্য নিতে হয়েছে  শাস্ত্র বলে, প্রকৃতির দুইটি রূপ, পরা আর অপরা ।

গিরিরাজকন্যা পার্বতী, শান্ত সমাহিত সেই দৈবী পরা প্রকৃতির প্রতীক আর গঙ্গা তাঁর অপরা প্রকৃতির প্রতীক যাকে অবলম্বন করে শিবের জীবলীলা. তাই ত’ দেবী বলছেন, “গঙ্গা নামে সতা তার তরঙ্গ এমনি, জীবনস্বরূপা সে স্বামীর শিরোমণি” গঙ্গা যে উচ্ছল তরঙ্গায়িত, সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় সে চলার নেশায়, শিবের এই বিশ্বলীলার ধারক ও বাহক সে তাকেই অবলম্বন করে, যে স্বরূপত শিব, তার এই জীব জীব খেলা, এ খেলা খেলা হয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে... আরও কতদিন চলবে কে তা জানে?

-

তবে একদিন নিশ্চয়ই আসবে যেদিন হয়ত শিবের এই খেলা সাঙ্গ করার সাধ হবে

কিম্বা হয় ত এই সাধও এই খেলারই এক অঙ্গ

সে যাই হক... সেদিন শিবেরই জটা জালে আবদ্ধা হবে তরঙ্গময়ী উচ্ছল গঙ্গা

তাঁরই মঙ্গলময় স্পর্শে নিয়ন্ত্রিতা হবে তাঁর এই জীব প্রকৃতি

ধীরে ধীরে সেই চপলা প্রকৃতির মাঝে জেগে ওঠবে এক কল্যাণময় রূপ


পর্বত কন্দরে যার জন্ম

পার্বতীর সেই সতীন

কেমন করে যেন রূপান্তরিত হতে থাকবে

আসলে তার আর পার্বতীর মধ্যে স্বরূপত ত’ কোন ভেদ নেই 

তাই সাগরের বুকে নিজেকে বিলীন করে গঙ্গা আবার ফিরে যাবে সেই গিরি পর্বতের মাঝে

পার্বতীর সতীন তখন পার্বতীরই বুকের মাঝে লীন হয়ে যাবে

আর জীব হয়ে যাবে শিব

সেই জীবরূপী শিব তখন বলে ওঠবে  "অহম্ ব্রহ্মাস্মি"

-

ওঁ নমঃ শিবায়  ওঁ নমঃ শিবায় ওঁ নমঃ শিবায়


Written by Prithwish Ghosh

Share:

০৬ এপ্রিল ২০২১

ভগবান শিবের এই মন্ত্রটি অন্ততঃ দশবার পাঠ করুন, যে কোনও অসুস্থ্যতা থেকে দ্রুত আরোগ্যলাভ করবেন

 আপনি কি নিত্য পূজা করেন?

যদি করেন তো  নিত্যকর্মের পর সংক্ষেপে ভগবান শিবের পূজা করুন ও তারপর নিম্নলিখিত মন্ত্রটি অন্ততঃ দশবার পাঠ করুন। সম্ভব হলে অসংখ্যবার পাঠ করুন। যে কোনও অসুস্থ্যতা থেকে দ্রুত আরোগ্যলাভ করবেন। 

মন্ত্র

------

'ওঁ ত্র্যম্বকম্ যজামহে সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্।

উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঅমৃতাৎ।।

নমস্তে অস্তু ভগবন্

বিশ্বেশ্বরায় মহাদেবায়

ত্রম্ব্যকায় ত্রিপুরান্তকায়

ত্রিকালাগ্নিকালায়

কালাগ্নিরুদ্রায় নীলকণ্ঠায়

মৃত্যুঞ্জয়ায় সর্বেশ্বরায়

সদাশিবায়

মাম্ রক্ষ রক্ষ

মম আয়ুর্দেহি বলম্ দেহি

বীর্যম্ বৃদ্ধি কুরু করু স্বাহা।' 

★ মন্ত্রটি পাঠের সময় মনে ধারনা করবেন যে -- ভগবান শিব নিজ হাতে আপনার মাথায় ব্রহ্মতালুতে রোগনিবৃতকারী ওষধি কলসীতে করে ঢেলে দিচ্ছেন। এই ওষধি আপনার সারা শরীরের ভিতর ও বাইরে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমস্ত রোগ-জীবানু, মল-ময়লা, ব্যথা-বেদনা সারিয়ে আপনাকে সুস্থ্য করে দিচ্ছে এবং আপনি ধীরে ধীরে আপনার সুস্থ্যতাও ফিরে পাচ্ছেন।

তিনদিন পর থেকে আপনি এই চমৎকার লক্ষ্য করবেন। ভক্তি ও বিশ্বাসের সাথে করুন, নিশ্চয়ই আপনার এই উপলব্ধি হবে বলে, আমি পৃথ্বীশ, মনে করি।

এই পোস্ট পড়ে কোলকাতার একজন মহিলা এডভোকেট তার দীর্ঘদিনের অসুস্থ্যতা থেকে রেহাই পেয়েছেন বলে -- কয়েকদিন আগেই আমায় জানিয়েছেন। আপনিও ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে জপ করুন, অবশ্যই সুস্থ্য হবেন।

ধন্যবাদ।


লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh

Share:

আমরাই তো অমৃতের পুত্র, আমরাই শিব

শিবোহং, শিবোহং, শিবোহং, শিবোহং

আমাদের মৃত্যু হতে অমৃতে নিয়ে যাও

-----------------------------------------------

সত্যম্, শিবম্, সুন্দরম্।

আমরা জানি ও মানি -- শিব সত্য ও সুন্দর। আবার এ ও জানি -- যত্র জীব তত্র শিব। 

'মনো বুধ্যহংকার চিত্তানি নাহং

ন চ শ্রোত্র জিহ্বা ন চ ঘ্রাণনেত্রম্।

ন চ ব্যোম্ ভূমির্ন তেজো ন বায়ুঃ

চিদানন্দ রূপঃ শিবোহং শিবোহম্।।'

--- আমি মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা, চোখ, ক্ষিতি, বায়ু, অগ্নি, ব্যোম বা বায়ু নই, আমি চিদাত্মা, চিদানন্দ স্বরূপ শিব -- শিবোহম্।

'অহং ভবানয়ঞ্চৈব রুদ্রোহয়ং যো ভবিষ্যতি।

একং রূপং ন ভেদোহস্তি ভেদে চ বন্ধনং ভবেৎ।।

তথাপীহ মদীয়ং শিবরূপং সনাতনম্।

মূলভূতং সদা প্রোক্তং সত্যং জ্ঞানমনন্তকম্।।' (জ্ঞানসংহিতা)।

--- আমি, তুমি, এই ব্রহ্মা এবং রুদ্র নামে যিনি উৎপন্ন হবেন, এই সকলই এক। এদের মধ্যে কোনো ভেদ নাই, ভেদ থাকলে বন্ধন হত। তথাপি আমার শিবরূপ সনাতন এবং সকলের মূল স্বরূপ বলে কথিত হয়, যা সত্য জ্ঞান ও অনন্ত স্বরূপ।

"যদাহতমস্তন্ন দিবা ন রাত্রির্নসন্ন চাসচ্ছিব এব কেবলঃ।" --- যখন আলো ছিল না, অন্ধকারও ছিল না; দিন ছিল না, রাত্রিও ছিল না; সৎ ছিল না, অসৎ ও ছিল না -- তখন কেবলমাত্র ভগবান শিবই ছিলেন। শিব ব্যতীত কারো সম্পর্কে এভাবে বলা হয়নি। শুধুমাত্র শিবের ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে -- "শিব এব কেবলঃ"। সুতরাং সৃষ্টির পূর্বে একমাত্র শিবই বর্তমান ছিলেন।

সেই নিরাকার, সর্বব্যাপী পরমব্রহ্ম অমর ও আদি, যিনি রামেরও উপাস্য আবার যিনি রাবনেরও উপাস্য। যিনি শান্ত সদাশিব, যিনি অশান্ত রুদ্র, যিনি অজ্ঞানীর জ্ঞান, সেই তাঁকে একবার পাবার আশায় যুগ থেকে যুগে মানবকুল হিমালয়কে অতিক্রম করে চলেছেন মানস সরোবর ও কৈলাসে। 

মর্তলোকের সীমান্তে দন্ডায়মান হয়ে মানুষ অমরত্বের সন্ধানে, অমৃতের পুত্র কন্যাগন অমর্ত্যলোকের দ্বারে যাওয়ার বাসনায় মগ্ন থাকেন -- তুষারসমাকীর্ণ যে স্থানে মহাদেব বাস করেন বলে বিশ্বাস, যে পথে স্বয়ং মহাদেব মহামায়াকে নিয়ে চলাচল করেন। সম্মুখে অমরাবতী কৈলাস আর পিছনে যাত্রীরা দীর্ঘ পথে মৃত্যুকে ত্যাগ করে এসেছেন। অসত্যের থেকে সত্যকে, ভয় কে জয় করেছেন, তাই জয়ধ্বনি বিঘোষিত হয় --

‘অসতো মা সদগময়, 

তমসো মা জ্যোতির্গময়, 

মৃত্যোর্মাহমৃতং গময়।

আবিরাবির্ম এধি, 

রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্।’

— আমাদেরকে অসত্য হতে সত্যে নিয়ে যাও, আমাদের আঁধার হতে জ্যোতিতে নিয়ে যাও, আমাদের মৃত্যু হতে অমৃতে নিয়ে যাও, আমাদের নিকট আবির্ভূত হও, আবির্ভূত হও আমাদের নিকট আগমন কর। হে রুদ্র, তোমার যে করুণাপূর্ণ দক্ষিণমুখ, তদ্দ্বারা আমাদেরকে নিত্য রক্ষা কর।

হাজার হাজার বছর ধরে সনাতন হিন্দু ধর্ম 'সর্বপথ সম্ভব' দর্শনে বিশ্বাস করে। 

নানা মত সঙ্গে নিয়ে চলাই সনাতন হিন্দুর ঐতিহ্য। 

সনাতন হিন্দু ধর্ম বলে -- 'সত্য একটাই'। 

সনাতন হিন্দু ধর্ম বলেছেন --

'সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ 

সর্বে সন্তু নিরাময়ঃ 

সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু মা কশ্চিদ্ দুঃখভাগভবেৎ।' 

--- সবাই সুখী হোক, সবাই হোক নীরোগ, সবার মঙ্গল হোক, কেউ যেন দুঃখ না পায়। 

সনাতন হিন্দু কখনও বলেনি শুধু হিন্দুরা সুখে থাক, সনাতন ধর্ম চেয়েছে সকলকে সুখী রাখতে। 

সনাতন হিন্দুরা কখনও কোনও মতকে আক্রমণ করেনি, পৃথিবীর কোনও ধর্মীয় সমাজকে তলোয়ার নিয়ে আঘাত করেনি। 

সম্প্রসারণবাদ ভারতের রক্তে নেই। 

সনাতন হিন্দু দেশের সমাজ 'বসুধৈব কুটুম্বকম' আদর্শ নিয়েই বাঁচে। 

আমাদের গর্ব করা উচিত আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে। মহামারী থেকে বাঁচতে, রোগের জ্বালা থেকে সকলকে সুস্থ্য হয়ে উঠতে, করোনার মৃত্যুভ্রুকুটি থেকে বাঁচতে, মৃত্যুর অন্ধকারকে মুছে দিতে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের নিজেদের প্রয়াসে আলো জ্বালাতে বলেছেন। 

আসলে তিনি আমাদের হৃদয়ে সঞ্জীবনী আলোকবর্তিকা জ্বালাতে বলেছেন।

আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে বলেছেন।

সকলকে সত্য ও সুন্দরের প্রতিভূ স্বরূপ শিব হতে বলেছেন।

সকলে বলুন --- আমরাই তো অমৃতের পুত্র, আমরাই শিব -- শিবোহং, শিবোহং, শিবোহং, শিবোহং, শিবোহং, শিবোহং।


লিখেছেনঃ Prithwish Ghosh


Share:

২২ এপ্রিল ২০২০

শিবগীতা - শিবপ্রাদুর্ভাবাখ্যশ্চতুর্থোহধ্যায়ঃ (শ্লোক ২৫ থেকে ৩০ পর্যন্ত)

পীযূষমথনোদ্ভূতনবনীতস্য পিণ্ডবৎ ।
অতিশুভ্রং মরকতচ্ছায়শৃঙ্গদ্বয়ান্বিতম্ ॥


নীলরত্নেক্ষণং হ্রস্বকণ্ঠকম্বলভূষিতম্ ।
রত্নপল্যনসংযুক্তং নিবদ্ধং শ্বেতচামরৈঃ ॥

ঘণ্টিকাঘর্ঘরীশব্দৈঃ পূরয়ন্তং দিশো দশ ।
তত্রাসীনং মহাদেবং শুদ্ধস্ফটিকবিগ্রহম্ ॥

কোটিসূর্য্যপ্রতীকাশং কোটিশীতাংশুশীতলম্ ।
ব্যাঘ্রচর্মাম্বরধরং নাগযজ্ঞোপবীতিনম্ ॥

সর্বালংকারসংযুক্তং বিদ্যুৎপিঙ্গজটাধরম্ ।
নীলকণ্ঠং ব্যাঘ্রচর্মোত্তরীয়ং চন্দ্রশেখরম্ ॥

নানাবিধায়ুধোদ্ভাসিদশবাহুং ত্রিলোচনম্ ।
যুবানং পুরুষশ্রেষ্ঠং সচ্চিদানন্দবিগ্রহম্ ॥

অনুবাদ :- বৃষটি দুধ থেকে উৎপন্ন মাখন পিণ্ডের মতো ধবধবে সাদা রংয়ের এবং মরকত মণির মতো কান্তিমান তার শিং দুটি ॥

বৃষটির চোখ দুটি নীলমণির মতো মনোরম , ক্ষুদ্র গলদেশ মনোমুগ্ধকর কম্বলে ভূষিত । তার পিঠের উপর রত্নখচিত আসন এবং লেজটি শ্বেত চামরে শোভিত ॥

তার কণ্ঠদেশের ঘণ্টাগুলোর সুমধুর ঘর্ঘরী শব্দে আকাশ বাতাস সহ দশদিক মুখরিত হচ্ছে । শুদ্ধ স্ফটিক বিগ্রহের ন্যায় পরম শোভা বর্ধন করে দেবাদিদেব মহাদেব সেই বৃষের পিঠে বসে আছেন ॥

তিনি কোটি সূর্যের সমান প্রকাশমান , কোটি চন্দ্রের মতো শীতল , বাঘের চামড়ার বসন তার পরিধানে এবং তিনি নাগ যজ্ঞোপবীতধারী পরমপুরুষ ॥২৮॥

সর্ব অলংকারে তিনি ভূষিত , মস্তকে বিদ্যুতের মতো পিঙ্গলবর্ণের জটা ধারণ করে আছেন । তাঁর কণ্ঠদেশ নীলবর্ণের , ব্যাঘ্রচর্মের উত্তরীয় তাঁর কাঁধে এবং মস্তক চূড়ায় অর্ধচন্দ্র শোভা পাচ্ছে ॥

তাঁর দশহাত নানারকম অস্ত্র - শস্ত্র দ্বারা উদ্ভাসিত । তিনি পাঁচ মুখযুক্ত , তিন চোখ এবং দশহাত যুক্ত চিরযুবক । তিনি পুরুষশ্রেষ্ঠ ও সচ্চিদানন্দময় ॥

প্রভু শিবের ভাবে বিভোর হয়ে যান তবেই মুক্তি ।।

★ জয় শিব-শক্তি★

Post Courtesy by: Subrata Roy Rial
Share:

০২ এপ্রিল ২০২০

অষ্টমূর্তি

দেবাদিদেবের অষ্টমূর্তিময় এই নিখিল জগত সেই অষ্ট মূর্তিতে- সূত্রে, মণিগণের ন্যায় ব্যাপিয়া রহিয়াছে । কর্প্পদীর সেই সকল অষ্টসংখ্যক মূর্তি- শর্ব্ব, ভব, রুদ্র , উগ্র, ভীম , পশুপতি , ঈশান ও মহাদেব এই আট নামে প্রসিদ্ধ । সেই শর্ব্বাদি অষ্টমূর্তিই ক্ষিতি, জল, অনল, অনিল, আকাশ, ক্ষেত্রজ্ঞ , সূর্য ও চন্দ্রে যথাক্রমে অধিষ্ঠান করিয়া আছেন ।
পরমাত্মা শর্ব্বের পৃথিবী রূপিণী “শর্ব্ব” নামে মূর্তি স্থাবর জঙ্গমাত্মক বিশ্বকে ধারণ করিতেছেন ।
জলরূপিনী “ভব” নামে দ্বিতীয় মূর্তি সমস্ত জগতের জীবন রক্ষা করিতেছেন ।
“রুদ্রের” অঘোররূপিণী শুভজানিকা তেজোময়ী রুদ্রাখ্যা মূর্তি জগতের বাহিরে এবং অন্তরে ব্যাপিয়া অধিষ্ঠান করিতেছেন ।
বেধা উগ্রের পবনাত্মিকা যে মূর্তি এই বিশ্বকে স্পন্দিত করিয়া ধারন করিতেছেন এবং স্বয়ং স্পন্দিত হইতেছেন পণ্ডিতেরা সেই মূর্তিকে “উগ্র” নামে আখ্যাত করেন ।
সকলের অবকাশদায়িনী গগনময়ী ভীমের “ভীমা” আখ্যা মূর্তি সকল ভূতের ভেদসাধন করত এই অখিল বিশ্বকে ব্যাপিয়া রহিয়াছেন ।
সর্বক্ষেত্র নিবাসী সর্বরূপী ক্ষেত্রজ্ঞের অধিষ্ঠাত্রী পশুপতিনায়ী “পশুপতি” র ষষ্ঠ মূর্তি পশুদিগের পাশ বন্ধন ছেদন করিতেছেন ।
নিখিল জগতের দীপ্তিজনিকে দিবাকরস্বরূপা মহেশের ঈশানাখ্য মূর্তি আকাশ ব্যাপিয়া অবস্থান করিতেছেন ।
আর কর্প্পদীর সোমময়ী মহাদেবাভিধানা মূর্তি সুধাংশু বর্ষণে অখিল ভুবনের আনন্দ উৎপাদন করিতেছেন ।
পরমাত্মা শিবের ঐ অষ্টম মূর্তি স্বীয় অপর মূর্তিগুলিকে ব্যাপিয়া আছেন বলে , বিশ্ব শিবাত্মক নামে প্রসিদ্ধ ।
( শিবমহাপুরাণ... বায়বীয় সংহিতা...৪র্থ অধ্যায়... ১৪- ২৮ )
বৃক্ষমূলস্য সেকেন শাখাঃ পুষ্যন্তি বৈ যথা ।
শিবস্য পূজয়া তদ্বৎ পুষ্যত্যস্য বপুর্জগৎ ।।
( শিবমহাপুরাণ... বায়বীয় সংহিতা...৪র্থ অধ্যায় ... ২৯ )
অর্থাৎ- যেরূপ বৃক্ষমূলে সেচন করিলে শাখার পুষ্টি জন্মে , সেইরূপ শিবপূজায় তাঁহার জগতরূপ শরীর পুষ্টিলাভ করিয়া থাকে।
Share:

শিবরাত্রি ব্রত

একদা কৈলাশে ভগবান শিব ও মা পার্বতী সৃষ্টি তত্ত্ব, পুরান তত্ত্ব, শাস্ত্র তত্ত্ব নিয়ে নানান আলোচনা করছিলেন। ভগবান শিবের মুখে সেই সকল ঘটনা সমূহ জেনে মা পার্বতী অতি আনন্দিত হচ্ছিলেন । একসময় মা গৌরী জিজ্ঞেস করলেন- “হে প্রভু। আপনি কিসে সন্তুষ্ট হন?” শুনে মহাদেব বললেন- “হে দেবী। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিকে শিব চতুর্দশী বলে। এই দিন উপবাস করে আমার পূজা দিলে, আমি যতটা সন্তুষ্ট হই। অন্য কোন যাগ- যজ্ঞ- পূজাতে আমি সেরূপ সন্তুষ্ট হই না। এই ব্রতের প্রভাবে মানবের সকল প্রকার ইচ্ছা পূরণ হয়, অন্তিমে সে আমার শাশ্বত শিবধাম প্রাপ্ত হয়।” এই ঘটনা শুনে মা পার্বতী পুনঃ মহাদেবকে এই ব্রত মাহাত্ম্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলেন । দেবাদিদেব ভোলানাথ তখন এই ব্রতের ঘটনা বলতে লাগলেন । অনেক কাল আগে বারানসিতে এক নিষ্ঠুর ব্যাধ ছিল, সে নিত্য প্রচুর পশু বধ করতো । একদিন সে বনে শিকার করতে গিয়ে অনেক পশু বধ করে মাংস পীঠে চাপিয়ে বাড়ীর দিকে ফিরতে লাগলো। কিন্তু অন্ধকার ঘনীভূত হওয়ায় সে বনের মধ্যে পথ হারালো, উপায় না দেখে একটা বেল গাছে উঠে বসলো । পেটে তার খাবার যায় নি, সমস্ত দিন তার অনাহারে গেছে । ব্যাধ খুব ক্লান্তি বোধ করলো। বেলগাছে উঠে ব্যাধ আনমনা হয়ে একটা একটা করে বেলপাতা ছিড়ে মাটিতে ফেলতে লাগলো। সেই গাছ তলায় একটি শিবলিঙ্গ ছিল। ব্যাধ এটা জানতো না। আর সেদিন ছিল শিব চতুর্দশী। ব্যাধ যে বেলপাতা গুলো আনমনা হয়ে ছিড়ে ছিড়ে মাটিতে ফেলছিল, সেগুলি ওই শিবলিঙ্গের ওপর এসে পড়ছিল। ভগবান শিব ব্যাধের ওপরে খুব সন্তুষ্ট হলেন। এভাবে অজান্তে সেই ব্যাধ শিব চতুর্দশী ব্রতের ফল পেলো । পরদিন বাড়ীতে ফিরে ব্যাধ দুপুরে যেই খাবার খেতে যাবে- দ্বারে এক সন্ন্যাসী ভিক্ষা চাইতে উপস্থিত হল। ব্যাধের কি মনে হল, সে তার খাবার ঐ সন্ন্যাসীকে দান করে দিল। কিছু কাল পর ব্যাধের মৃত্যু হল। ব্যাধের আত্মাকে নরকে নিয়ে যেতে যমদূত আসলো । কারন ব্যাধ সারা জীবন কেবল পশু পাখী বধ করেছে। কিন্তু আশ্চর্য, একদল শিব দূত ব্যাধের আত্মাকে নিতে আসলো । শিব দূতরা যম দূতদের মেরে তাড়ালো। ব্যাধের আত্মাকে শিবলোকে নিয়ে গেলো । এই হল শিবরাত্রির ব্রত কথা ।
 
 
Share:

ভগবান শিব কামদেবকে ভস্ম করেছিলেন

ভগবান শিব কামদেবকে ভস্ম করেছিলেন। কামদহন উৎসব রূপে অনেকে ন্যাড়া পোড়নাকে উল্লেখ করে থাকেন। তারকাসুর নাম এক দৈত্য ব্রহ্মার বরে কেবল শিবপুত্রের হাতে নিহত হবার বরদান পেয়েছিলো। কিন্তু তখন ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর বিবাহ হয় নি। দেবী পার্বতী রোজ আসতেন হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় ভগবান শিবের সাধনা স্থলে শিবপূজো করতে। কিন্তু ভগবান শিব মাতা পার্বতীকে চেয়েও দেখেন না। দেবতাদের মধ্যে চিন্তা জাগল এখন কিভাবে শিব পার্বতীর মধ্যে প্রেম- অনুরাগ হবে, কিভাবে দুজনের মিলনে পুত্রের জন্ম হবে- আর কবেই বা তারকাসুরের বধ হবে। দেবতাদের পরামর্শে ভগবান শিবের মনে প্রেমানুরাগ ও কাম জাগাতে মদন দেব সস্ত্রীক , ঋতুরাজ বসন্তকে নিয়ে এগিয়ে এলেন। ঋতুরাজ বসন্ত হিমালয়ে তুষারাবৃত স্থানে সৃষ্টি করলেন বসন্তের অনুপম প্রকৃতি । মদন ও রতিদেবী ধরলেন মিলনের নৃত্যগীত। একে একে মদনদেব পুষ্পধনু থেকে পঞ্চবাণ নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু যোগীশ্রেষ্ঠ ভগবান মহেশ্বর নির্বিকার। শেষে ভগবান শিব তৃতীয় নয়নের অনলে ভস্ম করলেন কামকে। অপরদিকে কামপত্নী রতিদেবী এই ঘটনার জন্য দোষী মনে করে পার্বতীদেবীকে অভিশাপ দিলেন- “তোমার গর্ভে কখনোই সন্তান আসবে না।” কার্ত্তিক এর জন্ম মহাদেবের তেজ , কেয়াপাতায় একত্রিত হয়ে, আর গণেশ সৃষ্টি হয়েছিলেন মাতা পার্বতীর অঙ্গ প্রসাধন থেকে।
কিন্তু এরপর কঠোর তপস্যা করে মাতা পার্বতী দেবাদিদেবকে স্বামী রূপে লাভ করেছিলেন। শিব পার্বতীর বিবাহ কালে রতিদেবী ভগবান শিবের কাছে কাতর অনুনয় বিনয় করেন। মহাদেবের আশীর্বাদে , কায়াহীন কামদেব ছায়ারূপে প্রকট হলেন। পরে দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুত্র রূপে জন্মে কামদেব নিজ শরীর ফিরে পেয়েছিলেন। হোলিকার ন্যাড়া পোড়ানোকে অনেকে কামদহন রূপে উল্লেখিত করেছেন।
 
Share:

০৭ জানুয়ারি ২০১৯

শিবলিঙ্গে দুধ-জল ঢালার কারন - সবাইকে মনোযোগ সহকারে পড়ার অনুরোধ রইলো


                                                                         *"ওঁ নমঃ শিবায়ঃ*

আজ আমরা একটা সনাতনী নিয়মধারা শিবলিঙ্গে দুধজল ঢালার কারণ সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করবো, যা অনেকেরই অজানা। সবাইকে মনোযোগ সহকারে পড়ার অনুরোধ রইলো। আশাকরি সবারই ভাল লাগবে।

 একবার দেবতা ও অসুরদের মধ্যে যুদ্ধে অমৃত পানের জন্য দেবতারা সমুদ্রমন্থন করেন। সমুদ্রমন্থনের সময় এক পর্যায়ে সমুদ্র থেকে হলাহল নামক মারাত্নক বিষ উত্থিত হয়েছিলো। যেটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল জীবের জীবন বিপন্ন করার ক্ষমতা ছিলো অত্যাধিক।


ভগবান নারায়নের পরামর্শে, শিবশঙ্কর সকল দেবতাদের অনুরোধে এই বিষ থেকে সবাইকে রক্ষা করার ঐশ্বরিক দায়িত্ব নেন । এরপর দায়িত্ব সম্পন্নের জন্যই তিনি সমস্ত বিষ পান করেন এবং কন্ঠে তা সংরক্ষন করে রেখে দেন। আর সে জন্যই শিবের আরেক নাম নীলকন্ঠ। হলাহল বিষের বিষাক্ততার মাত্রা ছিলো প্রচন্ড রকমের বেশি। যদিও শিবের উপরও তার প্রভাব পড়েছিলো। কিন্তু হলাহল বিষের তাপমাত্রার প্রভাব প্রশমিত করার জন্য দেবতারা শিবের জন্য গঙ্গা অভিষেক করেন। আর এই গঙ্গা অভিষেকের মাধ্যমে দেবতারা শিবকে প্রসন্ন করেছিলেন। শিবের সেই গঙ্গা অভিষেকে শুধুমাত্র সাপেরা এগিয়ে এসেছিলো এই ঐশ্বরিক কারণ সমর্পনের জন্য। তারা নিজেরাও বিষের কিছু অংশ পান করে ও তাদের বিষদাঁতে কিছু বিষ গ্রহণ করে। সে জন্যই সেদিন থেকেই কিছু সাপ বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে।


সমুদ্র মন্থনের সময় যে গঙ্গা অভিষেক করা হয়েছিল, শিবের উপাসকদের দ্বারা শিবলিঙ্গে ডাবের জল বা দুধ ঢালার কারণ হচ্ছে, শিবের প্রতি ভক্তদের ভক্তি প্রতিভাস করার জন্য। শিবের পূজায় শিবলিঙ্গে ডাবের জল বা দুধ ঢালা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিষেক ছাড়া শিবের পূজা অসম্পূর্ণ। অভিষেকের সময় এই ডাবের জল বা দুধ ঢালা খুবই পবিত্র। কারণ অভিষেকের দ্বারাই শিবের প্রতি ভক্তদের গভীর অনুরক্তি প্রকাশিত হয়।

এখানে অনেকে বলে থাকে, শিবলিঙ্গে দুধ ঢেলে দুধ অপচয় করা হচ্ছে, যদিও এটা মোটেই সঠিক নয়। কারণ এই দুধের বেশ খানিকটা অংশ চরণামৃত বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয় এবং পূজা শেষে ভক্তদের মাঝে প্রসাদ আকারে বিতরণ করা হয়। তাই দুধ ঢালা কোনো ক্রমেই অপচয় নয় বরং এটা নিষ্কলুষ ভক্তির বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

 শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা নিয়ে অনেকেরই মতানৈক্য আছে। শিবলিঙ্গে দুধ ঢালার কথা শুনলেই এক শ্রেণীর তথাকথিত অজ্ঞ গোষ্ঠী অপপ্রচার করে বেড়ায় যে এটা নাকি অপচয়। ৩৬৪ দিনে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগলে তারা খবর না নিয়ে মদ গাজা প্রভৃতি নেশা দ্রব্যে মগ্ন থাকে যখন শিব রাত্রি আসে তখনই তারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বলে, একদিনের শিব রাত্রিতে নাকি ৩৬৪ দিনে অপুষ্টিতে থাকা শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগে।


আশাকরি যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করেন, পোষ্টখানা পড়ে বিকৃত মনাদের বিকৃত মানষিকতা ঠিক করে নিবে বলে আশা রাখি। তাছাড়া এই পৃথিবীতে আমরা সবাই নিতান্তই তুচ্ছ, আমাদের নিজের বলে কোনো কিছুই নেই। তাই শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা নিয়ে কৈফিয়ত চাওয়ারও কোনো কারণ নেই। মনে রাখতে হবে বাবা মহেশ্বর পরম বৈষ্ণব, অর্থাৎ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর একনিষ্ঠ এবং প্রধান ভক্ত।

 পরমকরুনাময় গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর একান্ত হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণী আর পরমেশ্বরের সংহারী প্রতিরুপ ভোলামহেশ্বরের চরণকমলে, সবার মঙ্গল, কল্যাণ আর সবাঙ্গীন আনন্দময়তার জন্য প্রার্থনা আমাদের।


"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!"
!!জয় হোক সকল ভক্তদের!!
!!জয় শিবশম্ভুর জয়!!
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!

Post Courtesy: দেবেন্দ্র
Share:

০৬ জানুয়ারি ২০১৯

শ্রীশ্রী শিবের অষ্টোত্তর শতনাম

শ্রীশ্রী শিবের প্রণাম মন্ত্রঃ

নমস্তুভ্যং বিরূপাক্ষং নমস্তে দিব্যচক্ষুষে।

নমঃ পিণাকহস্তায় বজ্রহস্তায় বৈ নমঃ।।

নমস্ত্রিশূলহস্তায় দণ্ডপাশাংসিপাণয়ে।

নমস্ত্রৈলোক্যনাথায় ভূতানাং পতয়ে নমঃ।।



শ্রীশ্রী শিবের অষ্টোত্তর শতনামঃ

দিকপতি মহাদেব পৃথিবীর পতি ।

ভূত-গতি ভুত-পতি আর শান্তমতি ।।

শান্তিময় আর নাম হয় হরি হর।

শিবশম্ভু কহে মোরে আর দিগম্বর ।।

দাতা ভোক্তা নাম মোর কর অবধান।

দিনমনি মহীপাল আর অনুপম।।

ভৈরবগণের প্রভু জানিবে শিবানী ।

আশুতোষ কৃপাসিন্ধু আর শূলপাণি।।

ভূতচক্র ভুতপতি আর খগেশ্বর।

খেপা খ্যাতি নাম মোর খ্যাত চরাচর।।

শ্রী অঙ্গ আমারে কহে কাল কালময়।

ত্রিশূলধারী আর নাম সদা দয়াময়।।

জগত পালন নাম বিষ্ণুর ভবন।

ভরণীর নাম এই অতি মনোরম।।

অপর নাম গৌরীবর বলে সর্বজন।

কল্পজাত কল্পময় জানে ত্রিভুবনে।।

কৃপাণধারী কহে মোরে জগত মাঝারে।

সংসারনাশক নাম বিখ্যাত সংসারে।।

রমণীর প্রমুগ্ধ হয় আর এক নাম।

সর্ব্বদেব অধিকারী সুন্দর সুঠাম।।

ত্র্যম্বক এক নাম অপর ত্রিপুরারি।

সকলেতে নাম লয় ত্রি-জগৎ ভরি।।

দীনদুঃখী বলি মোর হয় এক নাম।

আরো কহে সবে মোরে নবঘনশ্যাম।।

ব্যাঘ্রচর্ম্ম পরিধান কেহ কেহ বলে।

বৃষভ বাহন কেহ বলয়ে আমারে।।

বিঘ্নহারী মম নাম জানিবে শিবানী।

অপর নাম হয় বিভু শূলপাণি।।

ত্রিশূলধারী নাম মোর বিদিত ভুবন।

অন্য নাম চণ্ডীবর জ্ঞাত সর্বজন।।

যোগীশ্রেষ্ট বলে দেবী জানিবে আমাকে।

যোগেশ্বর বলে মোরে ব্রম্মাণ্ডের লোকে।।

যমরাজ, কাল, যম, হয় মোর নাম।

শব, মড়া, মম নাম বিদিত ভুবন।।

অন্য এক নাম দেবী ভোলানাথ কয়।

অন্য নাম মহাকাল অপর অভয়।।

ভোলা নামে ডাকে মোরে বিশ্বের মাঝারে।

নীলকণ্ঠ নাম মম খ্যাত চরাচরে।।

উমাপতি নাম মম খ্যাত জগত ঈশ্বর।

নিজে হর হই আমি নাম গৌরীবর।।

বাতরূপী আমি হই জানিবে শিবানী ।

তব স্বামী হই আমি তুমি দাক্ষায়ণী।।

ধূর্জ্জটি অপর নাম খ্যাত চরাচর।

ব্রহ্মাণ্ডে বিখ্যাত নাম আমিই ঈশ্বর ।।



-শ্রীশ্রী শিবের অষ্টোত্তর শতনাম সম্পূর্ণ-



‘শিব বলে কথা মোর শুনিলে মঙ্গলা।

পড়িবে আমার শাস্ত্র বিপদের বেলা।।’

পোষ্ট কার্টেসীঃ অমিত 
Share:

০৩ জুলাই ২০১৮

অমরনাথের পথে

অমরনাথ গুহা একটি হিন্দু তীর্থক্ষেত্র যা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত। এটি একটি শৈব তীর্থ। এই গুহাটি সমতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার (১২,৭৫৬ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাঁও শহর অতিক্রম করতে হয়। এই তীর্থ ক্ষেত্রটি হিন্দুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। গুহাটি পাহাড় ঘেরা আর এই পাহাড় গুলো সাদা তুষারে আবৃত থাকে বছরের অনেক মাস ধরে। এমনকি এই গুহার প্রবেশপথও বরফ ঢাকা থাকে।গ্রীষ্মকালে খুব স্বল্প সময়ের জন্য এই দ্বার প্রবেশের উপযোগী হয়। তখন লক্ষ লক্ষ তীর্থ যাত্রী অমরনাথের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অমরনাথের গুহাতে চুইয়ে পড়া জল জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন।


গুহার ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) ভিতরে গুহার ছাদ থেকে জল ফোঁটায় ফোঁটায় চুঁইয়ে পড়ে।এই চুঁইয়ে পড়া জলের ধারা খাড়া ভাবে গুহার মেঝেয় পড়ার সময় জমে গিয়ে শিব লিঙ্গের আকার ধারণ করে। কখনো কখনো ৮ ফুট উঁচুও হয় এই শিব লিঙ্গ। তবে গত কয়েকবছর ধরেই সময়ের আগেই বরফলিঙ্গ গলে যাচ্ছে যা হয়তো উষ্ণায়নের ফল। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন। তীর্থ যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্যই এই শিব লিঙ্গে পূজা দেওয়া।


অমরনাথ গুহার বয়স আনুমানিক ৫০০০ বছর। পুরাণ অনুসারে, শিব পার্বতীকে অমরত্ব শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে অমরনাথ গুহাকে বেছে নিয়েছিলেন। পহেলগাঁও, যেখান থেকে অমরনাথ যাত্রা শুরু হয়, সেই স্থানে শিব তাঁর ষাঁড় নন্দীকে রেখে গিয়েছিলেন। চন্দনওয়াড়িতে তিনি তাঁর শিরস্থ চন্দ্রকে রেখে যান এবং শেষনাগে তিনি তাঁর দেহে বিচরণরত সর্পকুলকে রাখেন। গণেশকে রাখেন মহাগণেশ পর্বতে। তার পরে বায়ু, অগ্নি, জল, মৃত্তিকাকে রাখেন পঞ্জতরণী নামক স্থানে। প্রায় সব নির্মোক ত্যাগ করেই তিনি পার্বতীকে নিয়ে অমরনাথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

যখন শিব পার্বতীকে অমরত্ব সম্পর্কে জ্ঞানদান করছিলেন, তখন সেখানে কোনও জীবিত প্রাণী ছিল না। কেবলমাত্র একটি পায়রার ডিম সেখানে থেকে গিয়েছিল। কথিত আছে এই ডিম থেকে একজোড়া পায়রা জন্মায় এবং তারা অবধারিতভাবে অমরত্ব লাভ করে। এদের নাকি আজও গুহার ভিতরে দেখা যায়।



অমরনাথ গুহাটি আবিষ্কার করেন বুটা মালিক নামে এক মুসলমান মেষপালক। তিনি এখানে এক সন্ন্যাসীর দেখা পান। সন্ন্যাসী তাঁকে একটা থলিতে কিছু কয়লা দান করেন। পরে সেই কয়লা সোনায় পরিণত হয়। বুটা সেই স্থানে ফিরে যান। কিন্তু সেই সন্ন্যাসীকে আর দেখতে পাননি। বদলে তিনি অমরনাথ লিঙ্গ দেখাতে পান।
অমরনাথ তুষারলিঙ্গের বৃদ্ধি চন্দ্রকলার উপরে নির্ভরশীল। শিবলিঙ্গ ছাড়াও আরও দু’টি লিঙ্গ এই গুহায় রয়েছে। এদের পার্বতী ও গণেশ মনে করা হয়।

অমরনাথে কবে থেকে তীর্থ যাত্রা শুরু হয় তা জানা যায় না। একটি তথ্যসুত্র থেকে ধারণা করা হয় কিংবদন্তী রাজা আরজরাজা( খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সাল) বরফ নির্মিত শিবলিঙ্গে পূজা দিতেন। ধারণা করা হয়, রাণী সূর্যমতি ১১ শতকে অমরনাথের এই ত্রিশূল, বাণলিঙ্গ ও অন্যান্য পবিত্র জিনিস উপহার দেন। এছাড়াও পুরাতন বিভিন্ন বই থেকে আরও বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন এ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়।
ধারণা করা হয় মধ্যযুগে অমরনাথের কথা মানুষে ভুলে গিয়েছিল কিন্তু ১৫ শতকে তা আবার আবিষ্কৃত হয়। প্রচলিত আছে কাশ্মীর একসময় জলে প্লাবিত হয়ে যায় এবং কাশ্যপ মুনি সে জল নদীর মাধ্যমে বের করে দেন। এরপর ভৃগু মুনি অমরনাথ বা শিবের দেখা পান। এভাবে আবার অমরনাথের প্রচার শুরু হয়। বর্তমানে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ অমরনাথ যাত্রা করে।


জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাঁও শহর অতিক্রম করতে হয়।পহেলগাঁও থেকে অমরনাথ যেতে পাঁচ দিন সময় লাগে। অমরনাথে যাওয়ার জন্য আগে প্রত্যেক যাত্রীর রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। শ্রী অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড (SASB) যাত্রা শুরুর মোটামুটি মাসখানেক আগে যাত্রা শুরুর ও শেষের তারিখ ঘোষণা করে। জম্মু-কাশ্মীর ব্যাঙ্ক থেকে ফর্ম সংগ্রহ করতে হয়। পূরণ করা ফর্মটি ২টি পাসপোর্ট ছবি ও শারীরিক সক্ষমতার ডাক্তারি প্রশংসাপত্র সহ নিকটবর্তী জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের অফিসে জমা দিতে হয়।

তীর্থ যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন যাত্রা পথে বিনা মুল্যে খাবার, চিকিৎসাসেবা ও বিশ্রামের জন্য তাঁবু সরবরাহ করে থাকে। মন্দিরের কাছে স্থানীয়রা শত শত তাঁবুর ব্যবস্থা করে তীর্থযাত্রীদের রাত্রি যাপনের জন্য। জম্মু থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কাটরা পর্যন্ত বাস ও ভাড়া গাড়ি চলে। শেষ ১৪ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হয় মন্দিরে। যাঁরা হাঁটতে পারেন না তাঁদের জন্য রয়েছে ডান্ডি ও ঘোড়ার ব্যবস্থা। কাটরা শহরের ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার থেকে যাত্রা-স্লিপ অর্থাৎ 'পরচি' সংগ্রহ করতে হয়।

পুজোর উপকরণ আর নগদ টাকা পয়সা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ নিষেধ। নিকটতম রেলস্টেশন জম্মু। জম্মু থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কাটরায় নিয়মিত বাস যায়। জম্মু বা কাটরা থেকে হেলিকপ্টারেও বৈষ্ণোদেবী ঘুরে আসা যায়। জম্মু থেকে প্রতিদিন ২টি ও কাটরা থেকে ৫টি পবনহংস ফ্লাইট রয়েছে। জম্মু যাওয়ার আগে জেনে নিতে হবে উড়ান চালু আছে কিনা।

এই তীর্থ যাত্রা রাজ্য সরকার ও শ্রী অমরনাথ যাত্রা ট্রাস্ট যৌথ ভাবে আয়োজন করে থাকে। ( সমাপ্ত )


জয় বাবা অমরনাথ।

Courtesy by: Radhakanta Let


Share:

০৩ জানুয়ারি ২০১৮

তন্ত্র নিয়ে কিছু অজানা তথ্য

তন্ত্র - ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু গভীর তার অন্তর্নিহিত অর্থ। তন্ত্র হল এক বৃহৎ ও অতিপ্রাচীন গুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় সাধন বিষয়। মুক্ত বিশ্বকোষে বলা আছে, তন্ত্র হিন্দুসমাজে প্রচলিত ঈশ্বর উপাসনার একটি পথবিশেষ। শিব ও মহাশক্তির উপাসনা সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলিকেও তন্ত্র সাধনা নামে অভিহিত করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, এই মহাবিশ্ব হল শিব ও মহাশক্তির দিব্যলীলা। তন্ত্রে যেসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি-নীতির বর্ণনা রয়েছে তার উদ্দেশ্যই হল মানুষকে অজ্ঞানতা ও পুনর্জন্মের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া।

ভারতের আদি ও অকৃত্রিম তন্ত্র সাধনার জায়গা হল নীলাচল পর্বত। যা 'কামাখ্যাধাম' নামে পরিচিত। তন্ত্র এমনই একটি শাস্ত্র যার মাধ্যমে নিজেকে অনুসন্ধান করা যায়। নিজের অন্তরের ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়।

তন্ত্র শব্দটির অর্থ ব্যাপক। সংক্ষেপে তন্ত্র হচ্ছে "সৃষ্টির পরিচালনার নিয়ম"। মহাদেব বা শিবের ডমরু থেকে তন্ত্রের উৎপত্তি। সতী বা দেবী দুর্গার দশ হাতে আছেন দশ মহাবিদ্যা। এই দশমহাবিদ্যার উপর ভিত্তি করেই অনেকটা তন্তশাস্ত্র গড়ে উঠেছে। তন্ত্রের বিষয়টা অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। সাধারণভাবে, তন্ত্র অসীম জ্ঞানের আধার। সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের তন্ত্রসাধনা রিসার্চ করলে দেখা যায়, যা অবিদ্যাকে গ্রাস করে তাই জ্ঞান। তন্ত্র জ্ঞানচক্ষু উম্মোচন করে। সৃষ্টির কারন বুঝতে সাহায্য করে তন্ত্র। তন্ত্র সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের পরিচালনা শক্তি। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এই তিন শক্তির পরিচালনা নিয়ম ব্যক্ত করে তন্ত্র।

তন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত আছে মন্ত্র, যন্ত্র। তন্ত্র সাধনায় সাধক সৃষ্টির রহস্য জেনে পরমানন্দ অনুভব করে।

চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকে তুষ্ঠ করতেই পূজা করা হয়; যাতে পূজারী / ভক্তের জীবন আনন্দময়, কল্যাণময় হয়ে ওঠে। তন্ত্র হচ্ছে দর্শন বা তত্ত্ব। আর পূজা হচ্ছে পদ্ধতি।

তন্ত্রের প্রধান একটি সিদ্ধান্তই হল এই যে প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করা। কিন্তু, শক্তি কি? বিশ্বজগতে সবই তো শক্তির সমাহার। যে শক্তিকে বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়।


তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তার কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, মা বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে; দেবী মা (প্রাকৃতি) কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে।

এই হল বিজ্ঞান এবং তন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য।

চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী দূর্গা - কালী - বাসুলী - তারা - শিবানী। কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন (আমি আগেই একবার ইঙ্গিত দিয়েছি) অনার্য দেবতা শিব। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছেন কালীর কাছ থেকে। আবার শিব এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তিলাভ করে নারীশক্তি থেকে। শিব শক্তি লাভ করেছেন তাঁর নারীশক্তির প্রকাশ - গৌরীর শক্তি থেকে। তবে শিবের নিজস্ব শক্তিও স্বীকৃত। তন্ত্রসাধনার মূল উদ্দেশ্যই হল - (প্রাকৃতিক) শক্তি দেবীর সাধনা করে "শিবত্ব" লাভ তথা শক্তিমান হওয়া।

প্রাচীন বাংলার নিষাদসমাজের তান্ত্রিক বিশ্বাস ও বাহিরাগত (আর্যরা প্রাচীন বাংলার বাইরে থেকে এসেছিল বলে) আর্যবৈদিক মতের কিছু পার্থক্য রয়েছে। বহিরাগত আর্যদের বৈদিক ধর্মবিশ্বাসটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক; পক্ষান্তরে বাংলার অনার্যদের তান্ত্রিক মত মাতৃতান্ত্রিক। তা ছাড়া আর্যদের বৈদিক মত হল ঋষিজ: তার মানে দার্শনিক বা ফিলোজফিক্যাল। এ কারণে মানবকল্যাণে এর ভূমিকা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ। অন্যদিকে তান্ত্রিকমত মুণিজ বা বিজ্ঞান ভিত্তিক হওয়ায় জগৎসংসারে জীবজগতে এর প্রভাব প্রত্যক্ষ। সনাতনধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিধান্ত হল - দর্শনের সামগ্রিক দৃষ্টি এবং তন্ত্রমতের খন্ডিত বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি একত্রিত হলেই জ্ঞান সম্পূর্ণ হয়। এ কারণেই বেদের যজ্ঞ এবং তন্ত্রের পূজা সম্মিলিত ভাবে সনাতনধর্মকে একটি দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে।

তন্ত্র থেকে তত্ত্ব। তন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্য হল তত্ত্বের সিদ্ধান্তকে জীবনের কর্মক্ষেত্রে রূপদান করা।

(C) Shubhankar Roy
Share:

২৯ ডিসেম্বর ২০১৭

শিব ধ্বংসকর্তা ও মঙ্গলময় সত্ত্বা

প্রথমা পত্নী দাক্ষায়ণী সতীর শবদেহ স্কন্ধে শিব

যজুর্বেদে শিবের দুটি পরস্পরবিরোধী সত্ত্বার উল্লেখ রয়েছে। এখানে একদিকে তিনি যেমন ক্রুর ও ভয়ংকর (রুদ্র); অন্যদিকে তেমনই দয়ালু ও মঙ্গলময় (শিব)। এই কারণে চক্রবর্তী মনে করেন, "যে সকল মৌলিক উপাদান পরবর্তীকালে জটিল রুদ্র-শিব সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়েছিল, তার সবই এই গ্রন্থে নিহিত রয়েছে। মহাভারতেও শিব একাধারে "দুর্জেয়তা, বিশালতা ও ভয়ংকরের প্রতীক" এবং সম্মান, আনন্দ ও মহত্ত্বের দ্বারা ভূষিত । শিবের নানা নামের মধ্যে তাঁর এই ভয়াল ও মঙ্গলময় সত্ত্বার বিরোধের উল্লেখ রয়েছে।

রুদ্র (সংস্কৃত: রুদ্র) নামটি শিবের ভয়ংকর সত্ত্বার পরিচায়ক। প্রথাগত ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা অনুসারে, রুদ্র শব্দটির মূল শব্দ হল রুদ্-, যার অর্থ রোদন করা বা চিৎকার করা।স্টেলা ক্র্যামরিক অবশ্য এর একটি পৃথক ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই ব্যাখ্যাটি বিশেষণ রৌদ্র শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যার অর্থ বন্য বা রুদ্র প্রকৃতির। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তিনি রুদ্র নামটির অর্থ করেছেন যিনি বন্য বা প্রচণ্ড দেবতা। এই ব্যুৎপত্তিব্যাখ্যা অনুসারে, আর. কে. শর্মা রুদ্র শব্দের অর্থ করেছেন ভয়ংকর। মহাভারতের অনুশাসনপর্বের অন্তর্গত শিব সহস্রনাম স্তোত্রে শিবের হর (সংস্কৃত: हर) নামটির উল্লেখ করা হয়েছে তিন বার। এটি শিবের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। অনুশাসনপর্বে তিন বারই এই নামের উল্লেখ করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নতর অর্থে। আর. কে. শর্মা এই তিনটি উল্লেখে হর নামটির অর্থ করেছেন "যিনি বন্দী করেন", "যিনি এক করেন" এবং "যিনি ধ্বংস করেন"। শিবের অপর দুই ভয়ংকর রূপ হল "কাল" (সংস্কৃত: काल) ও "মহাকাল" (সংস্কৃত: महाकाल)। এই দুই রূপে শিব সকল সৃষ্টি ধ্বংস করেন। ধ্বংসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শিবের অপর একটি রূপ হল ভৈরব (সংস্কৃত: भैरव)। "ভৈরব" শব্দটির অর্থও হল "ভয়ানক"।

অপরপক্ষে শিবের শংকর (সংস্কৃত: शङ्कर) নামটির অর্থ "মঙ্গলকারক" বা "আনন্দদায়ক"।এই নামটি শিবের দয়ালু রূপের পরিচায়ক। বৈদান্তিক দার্শনিক আদি শংকর (৭৮৮-৮২০ খ্রি.) এই সন্ন্যাসজীবনের নাম হিসেবে নামটি গ্রহণ করে শংকরাচার্য নামে পরিচিতি লাভ করেন। একই ভাবে শম্ভু (সংস্কৃত: शम्भु) নামটির অর্থও "আনন্দদায়ক"। এই নামটিও শিবের দয়ালু রূপের পরিচায়ক।

👏 লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

(C) Aashis Sarkar
Share:

শিবের রূপ

শিব ও পার্বতী। শিব এখানে ত্রিনয়ন, মস্তকে অর্ধচন্দ্রধারী, সর্প ও নরকরোটির মালা পরিহিত, সর্বাঙ্গে বিভূতি-মণ্ডিত এবং ত্রিশূল ও ডমরুধারী। তাঁর জটাজুট থেকে গঙ্গা প্রবাহিত।

তৃতীয় নয়ন:

শিবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তাঁর তৃতীয় নয়ন। এই নয়ন দ্বারা শিব কামকে ভস্ম করেছিলেন। বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে শিবের যে ত্র্যম্বকম্ (সংস্কৃত: त्र्यम्बकम्) নামটি পাওয়া যায় তার প্রকৃত অর্থ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ধ্রুপদি সংস্কৃতে অম্বক শব্দের অর্থ চক্ষু; মহাভারতে শিবকে ত্রিনয়ন রূপে কল্পনা করা হয়েছে; তাই উক্ত নামটির আক্ষরিক অর্থ করা হয়ে থাকে "তৃতীয় নয়নধারী"। যদিও বৈদিক সংস্কৃতে অম্বা বা অম্বিকা শব্দের অর্থ মা; এই প্রাচীন অর্থের ভিত্তিতে ত্র্যম্বকম্ নামটির আক্ষরিক অর্থ করা হয়, তিন জননীর সন্তান। ম্যাক্স ম্যুলার ও আর্থার ম্যাকডোনেল শব্দটির শেষোক্ত অর্থটিকেও ধরেছেন। তবে শিবের তিন জননী সংক্রান্ত কোনো কাহিনির প্রচলন নেই। তাই ই. ওয়াশবার্ন হপকিনস মনে করেন, এই নামটির সঙ্গে তিন জননীর কোনো সম্পর্ক নেই; বরং অম্বিকা নামে পরিচিত তিন মাতৃদেবীর সঙ্গে এটি সম্পর্কযুক্ত। শব্দটির অন্য একটি অর্থ করা হয় "যাঁর তিন স্ত্রী বা ভগিনী বর্তমান"। কেউ কেউ মনে করেন, শব্দটি এসেছে রুদ্রের সঙ্গে শিবের সমত্বারোপের ফলস্রুতিতে। কারণ রুদ্রের সঙ্গে দেবী অম্বিকার একটি সম্পর্ক রয়েছে।

অর্ধচন্দ্র:

শিবের মস্তকে একটি অর্ধচন্দ্র বিরাজ করে। এই কারণে শিবের অপর নাম চন্দ্রশেখর (সংস্কৃত: चन्द्रशेखर)। রুদ্রের রুদ্র-শিব রূপে বিবর্তনের প্রথম যুগ থেকেই এই অর্ধচন্দ্র শিবের একটি বৈশিষ্ট্য। সম্ভবত বৈদিক ও পরবর্তীকালের সাহিত্যে চন্দ্রদেবতা সোম ও রুদ্রের একীভবনের সূত্রেই শিবের এই বৈশিষ্ট্যটির উদ্ভব ঘটেছিল।

বিভূতি:

শিব তাঁর সর্বাঙ্গে বিভূতি বা ভস্ম মাখেন। ভৈরব ইত্যাদি শিবের কয়েকটি রূপ প্রাচীন ভারতীয় শ্মশান বৈরাগ্য দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে সম্পর্কহীন কয়েকটি গোষ্ঠী এই মত অনুযায়ী ধর্মসাধনা করেন। থেরবাথ বৌদ্ধধর্মের পালি ধর্মগ্রন্থেও এই শ্মশান সাধনার উল্লেখ রয়েছে। এই কারণে শিবের অপর নাম শ্মশানবাসী ও বিভূতিভূষণ।

জটাজুট:

শিবের মস্তকের কেশরাশি জটাবদ্ধ। এই কারণে শিবের অপর নাম জটী বা কপর্দী ("কপর্দ বা কড়ির ন্যায় কেশযুক্ত")।

নীলকণ্ঠ:

একবার দেবতা আর অসুর মধ্যে যুদ্ধে অমৃত পানের জন্যে দেবতারা সমুদ্রমন্থন করছিলেন। মন্থনকালের এক পর্যায়ে সমুদ্র থেকে হলাহল বিষ উত্থিত হলে তার বিষাক্ত নির্যাষে দেবতারা অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। তখন দেবতাদের রক্ষা করার জন্য ভগবান শিব সেই বিষাক্ত বিষ পান করেন। এর ফলে উনার কন্ঠ নীল হয়ে যায়। একারনেই ভগবান শিব নীলকণ্ঠ (সংস্কৃত: नीलकण्ठ) নামে পরিচিত হন।

গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণকালে শিব তাঁকে জটায় ধারণ করছেন; সম্মুখে পার্বতী, নন্দী ও ভগীরথ, সন্ত নারায়ণের হিন্দি পাণ্ডুলিপির চিত্র, ১৭৪০ খ্রি.

পবিত্র গঙ্গা:

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, গঙ্গা নদীর উৎস শিবের জটা।এই কারণে শিবের অপর নাম গঙ্গাধর।

ব্যাঘ্রচর্ম: শিবের পরিধেয় বস্ত্র ব্যাঘ্রচর্ম বা বাঘছাল। এই কারণে শিবের অপর নাম কৃত্তিবাস। শিব ব্যাঘ্রচর্মের আসনের উপর উপবিষ্টও থাকেন। উল্লেখ্য, ব্যাঘ্রচর্মের আসন ছিল প্রাচীন ভারতের ব্রহ্মর্ষিদের জন্য রক্ষিত একটি বিশেষ সম্মান।

সর্প: শিবের গলায় একটি সাপ সর্বদা শোভা পায়।

ত্রিশূল: শিবের অস্ত্র হল ত্রিশূল।

ডমরু:

শিবের হাতে ডমরু নামে একপ্রকার বাদ্যযন্ত্র শোভা পায়। নটরাজ নামে পরিচিত শিবে নৃত্যরত মূর্তির এটি একটি বিশিষ্ট দিক। ডমরুধারণের জন্য নির্দিষ্ট একটি মুদ্রা বা হস্তভঙ্গিমা ডমরুহস্ত নামে পরিচিত। ডমরু কাপালিক সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

নন্দী:

নন্দী নামে একটি পৌরাণিক ষাঁড় শিবের বাহন। শিবকে পশুদের দেবতা মনে করা হয়। তাই তাঁর অপর নাম পশুপতি (সংস্কৃত: पशुपति)। আর. কে. শর্মার মতে, পশুপতি শব্দটির অর্থ "গবাদি পশুর দেবতা"। অন্যদিকে ক্র্যামরিক এই নামটিকে প্রাচীন রুদ্রের অভিধা আখ্যা দিয়ে এর অর্থ করেছেন "পশুদের দেবতা"।

গণ:

শিবের অনুচরদের গণ বলা হয়। এঁদের নিবাসও কৈলাস। এঁদের ভৌতিক প্রকৃতি অনুসারে ভূতগণ নামেও অভিহিত করা হয়। এঁরা সাধারণত দয়ালু। কেবল কোনো কারণে তাঁদের প্রভু ক্রুদ্ধ হলে এঁরা প্রভুর সঙ্গে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠেন। শিব স্বীয় পুত্র গণেশকে তাঁদের নেতা মনোনীত করেন। এই কারণেই গণেশ গণপতি নামে অভিহিত হন।

কৈলাস:

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, শিবের অধিষ্ঠান হিমালয়ের কৈলাস পর্বতে। হিন্দুপুরাণ অনুসারে, লিঙ্গাকার কৈলাস পর্বত মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।

বারাণসী:

বারাণসী শিবের প্রিয় নগরী। এই নগরী হিন্দুদের পবিত্রতম তীর্থগুলির অন্যতম। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে এই নগরী কাশীধাম নামে পরিচিত।

 লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

(C) Aashis Sarkar
Share:

২৪ জুলাই ২০১৭

শ্রী শ্রী দুর্গার ভৈরব রূপে শ্রী শ্রী নারদের পূজা হয়।

শ্রী শ্রী দুর্গার ভৈরব রূপে শ্রী শ্রী নারদের পূজা হয়।
অনেকের ভাবেন দুর্গার ভৈরব নারদ আর পরমবৈষ্ণব দেবর্ষি নারদ এক ব্যক্তি।
কিন্তু আসলে তা নয়।তোড়ল তন্ত্র স্বয়ং সদাশিব বলেছেন:
দুর্গায়া দক্ষিণেদেশে নারদং পরিপূজয়েৎ।
নাকারঃ সৃষ্টিকর্ত্তা চ দকারঃ পাকঃ সদা।
রেফঃ সংহারূপত্বান্নারদঃ পরিকীর্ত্তিতা।।
দুর্গার দক্ষিন দিকে ভৈরব নারদের পূজা করিবে।এস্থলে নারদের ন কারের অর্থ সৃষ্টিকর্তা,দ কারের অর্থ পালনকর্তা ,রকার সংহার রূপ বলিয়া ইনি নারদ নামে কীর্তিত হইয়াছেন,অর্থাৎ যিনি সৃষ্টি ,স্থিতি,সংহারকর্ত্তা তিনিই নারদ
অর্থাৎ নারদ অর্থে পরমেশ্বর শিব।
Share:

এই শিবমন্দিরে নন্দীর মূর্তি থেকে ঝরে পড়ে রহস্যময় জলধারা। এ কি ঐশ্বরিক লীলা?



এই মন্দিরের রহস্যময়তা অন্যত্র নিহিত। যে ষাঁড়ের মূ্র্তিটি সবার আগে নজরে এসেছিল বাসিন্দাদের, সেই মূ্র্তিটি ছিল আসলে শিবের সহচর নন্দীর মূ্র্তি। সেই মূর্তির মুখে জমে থাকা মাটি পরিষ্কার করতেই দেখা যায়, নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্ষীণ জলধারা।


১৯৯৭ সালের কোনও এক সকালবেলার ঘটনা। বেঙ্গালুরুর মাল্বেশ্বরম এলাকার বাসিন্দাদের কাছে দিনটা শ‌ুরু হয়েছিল আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই। কিন্তু দিনটির বিশিষ্টতা একটু পরেই বোঝা গেল যখন বিখ্যাত মল্লিকার্জুন স্বামী মন্দিরের সামনের জমিটিতে কোনও একটি নির্মাণকাজের প্রয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হল। কয়েক হাত মাটি খুঁড়তেই কোদাল ঠেকল শক্ত কোনও জিনিসে। মাটি সরাতে পাওয়া গেল এক ষাঁড়ের মূ্র্তি। স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি খবর দিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসে গভীরতর খননকার্য চালিয়ে মাটির তলা থেকে তুলে আনলেন একটি আস্ত শিবমন্দিরকে। গবেষণা করে জানা গেল, এই মন্দির ৪০০ বছর আগে তৈরি। মন্দিরটি পরিচিত হয় নন্দীকেশ্বর বা দক্ষিণমুখ নন্দীতীর্থ মন্দির নামে।


ভারতের মতো ঐতিহাসিক সমৃদ্ধিসম্পন্ন একটি দেশে এরকম অদ্ভুতভাবে একটি প্রাচীন মন্দিরের আবিষ্কার খুব অস্বাভাবিক হয়তো নয়। কিন্তু এই মন্দিরের রহস্যময়তা অন্যত্র নিহিত। যে ষাঁড়ের মূ্র্তিটি সবার আগে নজরে এসেছিল বাসিন্দাদের, সেই মূ্র্তিটি ছিল আসলে শিবের সহচর নন্দীর মূ্র্তি। সেই মূর্তির মুখে জমে থাকা মাটি পরিষ্কার করতেই দেখা যায়, নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্ষীণ জলধারা। আরও মাটি খোঁড়ার পরে দেখা যায়, নন্দীর মূর্তিটির সামনে ফুট দশেক নীচে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। নন্দীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জল সোজা এসে পড়ছে সেই শিবলিঙ্গের উপর। শিবলিঙ্গের গা ধুইয়ে দিয়ে সেই জল এসে জমা হচ্ছে আরও নীচে অবস্থিত একটি পুকুরে (সেই পুকুরের বর্তমান নাম কল্যাণী)। আশ্চর্যের বিষয় হল, নন্দীর মুখ থেকে যে জলধারা বেরোতে শুরু করেছিল সেই ১৯৯৭ সালে সেই জলধারা আজও বন্ধ হয়নি। নিরন্তর জল ঝরে চলেছে নন্দীর মুখ থেকে।




কিন্তু এই জলধারার উৎস কী? কী বলছেন বিজ্ঞানীরা? তাঁরা মনে করছেন, ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডারের সঙ্গে কোনওরকম সংযোগ রয়েছে নন্দীর মূর্তিটির। সাইফোন পদ্ধতিতে সেই জল মাটির তলা থেকে নন্দীর মু‌খে উঠে আসছে। কিন্তু সেরকম কোনও ভূগর্ভস্থ জলাধারের খোঁজ পেয়েছেন কি বিজ্ঞানীরা? না, তা তাঁরা পাননি। তবে তাঁরা আশাবাদী যে, অদূর ভবিষ্যতে সেই জলাধারের সন্ধান মিলবে। সে যাই হোক, ভক্তরা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ধার ধারেন না। তাঁদের ধারণা, সবটাই ঈশ্বরের লীলা। স্বয়ং ঈশ্বরের পরিকল্পনাতেই নন্দীর মূর্তির মুখ থেকে নিরন্তর বহে চলেছে জল। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে ভক্তদের মনে এক বিশিষ্ট জায়গা করে নিয়েছে এই নন্দীকেশ্বর মন্দির।

-এবেলা
Share:

কথিত আছে এই মন্দিরেই বিয়ে করেছিলেন শিব ও পার্বতী

সতীর আত্মাহুতির পর শিবের জীবনে এসেছিলেন পার্বতী। বিশ্বাস করা হয়, সতীর পরজন্ম ছিল পার্বতী রূপে। শিব প্রথমে পার্বতীকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, পার্বতীর প্রেমকে দূরে ঠেলে ফেলে দিতে পারেননি শিব।

দেবতাদের দেশ উত্তরাখণ্ড

হিমালয়ের কোলে থাকা এই মন্দিরটিকে কেদারনাথের শিব মন্দিরের মতো দেখতে লাগলেও আসলে এর নাম ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দির’। ‘ত্রিযুগি’ মানে তিনটি যুগ। আর নারায়ণ মানে বিষ্ণু। স্থানীয়দের বিশ্বাস বছরের পর বছর এই মন্দিরের ভিতরে এক অদৃশ্য পবিত্র অগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে আসছে। যার আনুমানিক বয়স তিনটি যুগ পেরিয়ে গিয়েছে। এই তিন যুগকেই হিন্দিতে ‘ত্রিযুগ’ বলা হয়। আর যেহেতু এটি নারায়ণ মন্দির। তাই এর নাম ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দির’। যা উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগে।


বরফে ঢাকা গৌরীকুণ্ড

স্থানীয় কথা অনুযায়ী, পার্বতী ছিলেন ‘ত্রিযুগিনারায়ণ’-এর রাজা হিমাবত-এর কন্যা। কিন্তু, সতীর মৃত্যুর পর কার্যত পাগলপারা দশা হয়েছিল শিবের। পার্বতী ছিলেন শিবের পূজারিনী এবং শিবকেই মনে মনে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু, সতী বিরহে কাতর শিব কোনওভাবেই পার্বতীকে নিজের জীবনে প্রবেশ করতে দিতে রাজি ছিলেন না। শেষমেশ গৌরীকুণ্ডে পার্বতীর নাচ এবং ভালবাসার বিকিরণে চমকিত হন শিব। পার্বতীর প্রেমকে এরপর আর দূরে ঠেলে দিতে পারেননি তিনি।


গুপ্তকাশীতে মন্দাকিনী নদী

বিশ্বাস করা হয় গুপ্তকাশী থেকে কেদারনাথ যাওয়ার পথে মন্দাকিনী নদীর তীরে শিব বিবাহের প্রস্তাব দেন পার্বতীকে।

‘ত্রিয়ুগিনারায়ণ মন্দির’-এ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন শিব-পার্বতী
রাজা হিমাবতের ব্যবস্থাপনায় রাজধানী ত্রিযুগিনারায়ণের ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দিরেই বসেছিল বিয়ের আসর। ‘ত্রিযুগিনারায়ণ’-এর পবিত্র অগ্নির সামনেই পার্বতীর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন শিব। সেই থেকে এই অগ্নিকুণ্ড এবং ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দির’-কে দেবতাদের স্থান হিসাবেই ধরা হয়। বিয়ের আসরে পার্বতীর ভাই-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু। আর এই মেগা বিবাহের পুরোহিত ছিলেন খাস ব্রহ্মা। এমনকী বিয়ের আচার পালনের সময়ে শিব ও পার্বতী তিনটি কুণ্ডে স্নান করেছিলেন। যা পরবর্তীকালে ব্রহ্মকুণ্ড, রুদ্রকুণ্ড এবং বিষ্ণুকুণ্ড বলে পরিচিতি পায়।

বর্তমানে যাঁরা এই মন্দিরে আসেন তাঁরা সঙ্গে করে একটি কাঠের টুকরো নিয়ে প্রবেশ করেন। ‘অখণ্ড ধুনি’ নামে এই আগুনে সেই কাঠের টুকরো পুড়িয়ে দেন তাঁরা। এরপর সেই কাঠের টুকরোর ছাইকে প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করেন। যাঁরা প্রথমবার এই মন্দিরে আসেন তাঁরা একইসঙ্গে পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকা গৌরীকুণ্ড এবং সরস্বতীকুণ্ড ঘুরে যায়।
বিশ্বাস করা হয়, নিঃসন্তান দম্পতি এই ‘ত্রিযুগিনারায়ণ মন্দিরে’ এসে পুজো দিলে মনস্কামনা পূরণ হয়। এমনকী, সদ্য বিবাহিত দম্পতি এই মন্দিরে পূজো দিতে পারলে তাঁদের সাংসারিক জীবনে সুখ ও শান্তি বিরাজ করে বলেই দাবি করা হয়।

#এবেলা
Share:

শিবকে চেনেন, কিন্তু তাঁর বাহন নন্দীর মাহাত্ম্য জানেন কি

যে কোনও শিব মন্দিরে প্রবেশ করার সময়ে সবার আগে যাঁর দিকে দৃষ্ট যায়, তিনি এক মহাষণ্ড। যাঁকে আমরা নন্দী বলেই জানি। এবং তাঁর পরিচয় শিবের বাহন হিসেবে। কিন্তু এ কথা আমাদের অনেকেরই জানা নেই, নন্দী স্বয়ং শিবেরই অবতার।
‘শিবপুরাণ’ জানাচ্ছে, নন্দী কৈলাসে শিবালয়ের দ্বাররক্ষী। শৈব ঐতিহ্য অনুসারে, তিনি নন্দীনাথ সম্প্রদায়ের আট প্রধান পুরুষের গুরু। যে আটজনের মধ্যে যোগদর্শনের প্রবক্তা মহামুনি পতঞ্জলীও রয়েছেন। এই আট প্রবক্তাই শৈব দর্শনকে আট দিকে ছড়িয়ে দেন বলে বিশ্বাস।
নন্দীকে ষণ্ড বা ষাঁড় রূপে কল্পনা করা হয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে টোটেম হিসেবে ষাঁড়ের উপাসনার কথা জানিয়েছিলেন। ষাঁড় অনেক সভ্যতাতেই সূর্য ও শৌর্যের প্রতীক হিসেবে পূজিত হত। পরে তা শৈব ধর্মের অঙ্গীভূত হয়। এবং শিবের বাহন হিসেবে তাকে গণ্য করা হতে থাকে।
























পুরাণ অনুসারে নন্দী শিলদ মুনির সন্তান। শিলদ শিবের কাছে থেকে এক অমর সন্তান চেয়েছিলেন। শিবের প্রসাদেই চিরঞ্জীব নন্দীর জন্ম হয়। নন্দী কোনও মানবীর গর্ভজাত নন। তিনি অযোনিসম্ভূত, যজ্ঞাগ্নি থেকেই তাঁর উদ্ভব।
আগম ও তন্ত্র ঐতিহ্যে নন্দীকে প্রবল জ্ঞানী বলে মনে করা হয়। এই জ্ঞান তিনি স্বয়ং শিবের কাছ থেকেই প্রাপ্ত হন। এই জ্ঞানই তিনি তাঁর আট শিষ্যকে দান করেন। এই আট জন হলেন— সনক, সনাতন, সানন্দন, সনৎকুমার, তিরুমুলার, ব্যগ্রপদ, পতঞ্জলী এবং শিবযোগ।
বিবিধ পুরাণ থেকে জানা যায়, নন্দী অসংখ্য বার বিভিন্ন পরাক্রান্ত বীরের মোকাবিলা করেছিলেন। তিনিই রাবণকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তাঁর স্বর্ণলঙ্কা এক বানর দগ্ধ করবে।
আজও মন্দী দ্বাররক্ষী হয়ে বিরাজ করছেন তাবৎ শিব মন্দিরে। তিনি বিরাজ করছেন বিভিন্ন শৈব সম্প্রদায়ের পতাকা। উল্লেখ্য, কর্ণাটকে নন্দীশ্বর মন্দির স্বয়ং নন্দীর প্রতিই উৎসর্গীকৃত।

প্রতিবেদন, এবেলা.ইন

Share:

এই শিবমন্দিরে দিনে তিনবার বদলে যায় শিব লিঙ্গের রং

অনেকের অনুমান শিবলিঙ্গের রং পরিবর্তনের পিছনে সূর্যালোকের ক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।


অচলেশ্বর শিব মন্দির। ছবি: ইউটিউব থেকে
কথিত আছে, এই স্থানে নাকি মহাদেবের গোড়ালির ছাপ বিদ্যমান। আর তাই কালনিরবধি এটি এক পুণ্যতীর্থ। রাজস্থানের আরাবল্লী রেঞ্জের ছোট জনপদ ঢোলপুর। সন্নিহিত এলাকা বেহড়, চম্বল। একদিকে যদি পাক থেকে থাকে ডাকু মালখান সিং, মান সিং আর ফুলনদেবীর কিংবদন্তি, তা হলে অন্য দিকে অবিচল হয়ে রয়েছে অচলেশ্বর মহাদেবের পুরাণকথা।

















অচলেশ্বর শিবলিঙ্গ, ছবি: ইউটিউব
মিথোলজি যা-ই বলুক না কেন, এই মন্দিরের মহিমা শুধু কাহিনিতে নয়। ঢোলপুর শিব মন্দিরের বিশেষত্ব এখানেই যে, এই মন্দিরে অবস্থানরত শিবলিঙ্গটি দিনে তিন বার রং বদলায়। এই দৃশ্য দেখতেই হাজার হাজার পুণ্যার্থার ভিড় হয় এই মন্দিরে। মানুষের বিশ্বাস, শিবমহিমাতেই এই ‘অলৌকিক’ সম্ভব।































নন্দীমূর্তি, ছবি:ইউটিউব
স্থানীয় কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, এই দেবস্থান ২৫,০০০ বছরেরেও বেশি পুরনো। মন্দির সংলগ্ন একটি পুকুরের পাড়ে পাথরের তিনটি মহিষ মূর্তি রয়েছে, যাদের আকৃতি ও শৈলিই বলে দেয় এই স্থানের প্রাচীনত্ব।মন্দিরের প্রবেশদ্বারে অষ্টধাতুর এক বিশাল নন্দীমূর্তি। কথিত, এই নন্দীর কৃপাতেই নাকি এই মন্দির বার বার রক্ষা পেয়েছে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে।



















রহস্যময় মহিষমূর্তি, ছবি:ইউটিউব
আজকের মন্দিরটি আনুমানিক খ্রিষ্টিয় নবম শতকে তৈরি। মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ শিবলিঙ্গটি স্বয়ম্ভূ। অনেকের অনুমান শিবলিঙ্গের রং পরিবর্তনের পিছনে সূর্যালোকের ক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি। তেমন কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণাও সম্ভব হয়নি এই লিঙ্গকে ঘিরে। যা দেখা যায়, তা হল এই— সকালে এই লিঙ্গের রং থাকে লাল, বেলা বাড়লে তা গেরুয়া হয়ে ওঠে এবং রাত্রে এর রং একেবারেই কালো।

প্রতিবেদন, এবেলা.ইন 
Share:

০৯ জুলাই ২০১৭

মহেশ্বর

দেবাদিদেব মহাদেব শিব যুগ-যুগান্তর ধরে সনাতন ধর্মের সাধনপীঠে বিরাজিত রয়েছেন। তিনিই সহস্রাধিক দিব্য নামে নিত্য বন্দিত হন আসমুদ্র হিমাচলের শত সহস্র দেবালয়ে ও ভক্তদের হৃদয়মন্দিরে। সনাতন হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদী হলেও সত্যদ্রষ্টা মুনিঋষিগণ তাঁদের হৃদয়বেদিতে অভিষিক্ত করেছেন বিভিন্ন সাকার বিগ্রহে কিংবা লিঙ্গমূর্তিতে। উপনিষদে তাঁকে বলা হয়েছে ‘শান্তং শিবং অদ্বৈতম্‌’ অর্থাৎ নির্বিকার অদ্বিতীয় শিব চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা) রূপে, আবার সশক্তিকে প্রকাশে বর্ণিত করা হয়েছে, ‘তমীশ্বরানাং পরমং মহেশ্বরং, তং দেবতানাং পরমং চ দৈবতম্‌’’ পরমদেবতারূপে। প্রকৃতপক্ষে ‘শিব’ শব্দটি হল পরমমঙ্গলের পরিচায়ক। তিনিই আবার সর্বসংহারকারী ধ্বংসের দেবতা রুদ্ররূপেও বন্দিত হয়েছেন বেদ-উপনিষদে।

শিবের এক হাজার আট নামের মধ্যে রুদ্র নামটি বিশেষ নিরিখে মানুষই অভিহিত করেছে। মানুষ যখন বাঁচার তাগিদে অরণ্যে বা পার্বত্য অঞ্চলে দাবানল, নদীতটে বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, কিংবা সমতলে অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে মোকাবিলা করত, সেই ভয় ও ত্রাসের মধ্যে তাদের মনে প্রকটিত হয়েছে এক সংহারকারী সর্বশক্তিমান মহামানবের অস্তিত্বের বোধ। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেই মানুষ তাঁকে অভিহিত করেছে ‘রুদ্র’ নামে।

যজুর্বেদের মহীধর ভাষ্যে আছে, ‘‘যিনি সত্যনিষ্ঠকে জ্ঞানদান করেন, কিন্তু পাপীগণকে দুঃখভোগের মাধ্যমে ক্রন্দন করান, তিনিই রুদ্র।’’ রবণং রুৎ জ্ঞানং... রোদয়তি রুদ্রঃ’’। মানুষ তখনই বিশেষ অনুভূতি দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছে, অলক্ষ্যে বিরাজমান এক নিষ্ঠুর ভয়ংকর দেবতাকে। যাকে তুষ্ট করলে আধিদৈবিক দুর্যোগগুলি থেকে রক্ষা পাওয়া হয়তো সম্ভব হত। কিন্তু চেতনার ক্রমবিকাশে, পরিণত মননে ক্রমে তাঁরা অনুভব করেছে এই অদৃশ্য সত্তার আর একটি পরিচয়ও আছে। ধ্বংসেরই অদৃষ্ট নিয়ন্তার কর্মধারার বাহ্যিক প্রকাশের অন্তরালেই রয়েছে নতুন সৃষ্টির উদ্বোধন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সৃষ্টির বীজ।

প্রলয়ান্তে যে নবীন সৃষ্টির ধারা, সেটি তো ধ্বংসের মধ্য দিয়েই উন্মিষিত হয়। সুতরাং, ধ্বংস ও সৃষ্টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রলয়ের উৎস যিনি, সৃষ্টির উৎসও অলক্ষ্যে অবশ্যই তিনি। তাই পালনও তাঁর দ্বারাই হয়ে থাকে। কারণ সৃষ্ট বস্তু মাত্রই যেমন আপাতভাবে তাঁর দ্বারাই পালিত হচ্ছে, তেমনই প্রকৃতপক্ষে সময়ের মাত্রা ধরে সেটিও ধ্বংসের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যায়। কোনও বস্তু সৃষ্ট হলেও তার ক্ষয় হওয়াটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তাই সৃষ্টিকর্তা, পালন কর্তা ও লয়কর্তাকে আলাদা করা যায় না। তাই তাঁর রূপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর।

মহাভারতে যেমন তাঁর সৌম্য শান্তরূপের বর্ণনা আছে, তেমনই আছে উগ্ররূপেরও। সৌম্যরূপের বর্ণনায় আছে, তিনি চন্দ্রশোভিত জটাযুক্ত প্রসন্নবদন, মৃগচর্মে বস্ত্রাবৃত অভয়প্রদানকারী। কথিত আছে রুদ্রের এই উগ্ররূপটি দেখেছিলেন একমাত্র অশ্বত্থামা। গভীর রাতে ঘুমন্ত পঞ্চপাণ্ডবকে হত্যা করার জন্য তিনি যখন পাণ্ডবদের শিবিরদ্বারে কাপুরুষের মতো উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তিনি এক অতিকায় ভয়ানক দেবমূর্তিকে দণ্ডায়মান দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। সেই অতিকায় তীব্র দীপ্তি-সমন্বিত পুরুষের পরিধানে ছিল রক্তাক্ত ব্যাঘ্রচর্ম, কৃষ্ণাজিন ও কণ্ঠে নাগোপবীত। তাঁর দেহাঙ্গ অগ্নিমুখ সর্প দ্বারা বেষ্টিত ছিল। মহাভারতে বলা হয়েছে, বিগ্রহ নির্মাণ করেই অশ্বত্থামা শিব পূজা করতেন। সুতরাং মহাভারতীয় যুগ থেকেই মূর্তি গড়ে শিবপুজোর প্রচলন ছিল। অশ্বত্থামার পূজিত শিববিগ্রহ হলেন ‘পঞ্চানন’।
সাকাররূপে শিবের পঞ্চানন বিগ্রহের ধ্যানমন্ত্রে আছে, ‘‘পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রং’’। শিবের এই পাঁচটি মুখের নাম উল্লিখিত রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। এই নামগুলি হল—সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ ও ঈশান। নির্বাণতন্ত্রের মতে, ‘সদ্যোজাত’ মুখটি শুদ্ধ স্ফটিকের মতো শুক্লবর্ণ—সেটি পশ্চিমে, ‘বামদেব’ পীতবর্ণ সৌম্য মনোহর—সেটি উত্তরে, ‘অঘোর’ কৃষ্ণবর্ণ ভয়ংকর—সেটি দক্ষিণে; ‘তৎপুরুষ’ রক্তবর্ণ দিব্য মনোরম—সেটি পূর্বে; এবং ‘ঈশান’ শ্যামল সর্বদেব-স্বরূপ শিব সেটি ঊর্ধ্বে। কথিত আছে, শিবের এই পঞ্চমুখ থেকেই ২৮টি আগম (তন্ত্র) রচিত হয়েছে।

কুলার্ণবতন্ত্রে বলা হয়েছে, স্বয়ং শিবের পঞ্চমুখ থেকে ‘পঞ্চ আম্নায়’ [চতুর্বেদ ও আয়ুর্বেদ (ভেষজ বিদ্যা)] প্রকাশিত হয়েছে। কালক্রমে অগ্নি ও ডমরুধারী প্রলয়নৃত্যরত নটরাজরূপী শিবের অভিব্যক্তিকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছে নান্দনিক শিল্পের বহুমুখী প্রসার। বস্তুত ভারতীয় সংস্কৃতিতে নৃত্য, গীত ও বাদ্যচর্চার সুমহান ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে শৈব-সংস্কৃতির ভূমিকা।
শুধু পঞ্চানন, রুদ্র বা শিবরূপেই নয়, বিভিন্ন মূর্তিতে এবং বিভিন্ন নামে যুগ যুগ ধরে তিনি আরাধিত। কিন্তু তাঁর যে প্রতীকী রূপটি পুরাকাল থেকে মহাপূজ্যরূপে সমাদূত, সেটি হল তাঁর লিঙ্গরূপ। শাস্ত্রবচনে লিঙ্গের সংজ্ঞায় আছে—‘‘লীয়তে গম্যতে যত্র যেন সর্বং চরাচরম্‌। তদেব লিঙ্গং ইত্যুক্তং লিঙ্গ তত্ত্ব পরায়ণৈঃ।।’’ অর্থাৎ, নিখিল বিশ্ব চরাচর যাঁকে আশ্রয় করে উদ্ভূত হয়ে ক্রিয়াশীল হয় এবং শেষে যাঁর মধ্যে লীন হয়ে যায় সেই অস্তিত্বই ‘লিঙ্গ’। আবার ‘‘যস্মিন সর্বাণি ভূতানি লীয়ন্তে বুদ্বুদাইব।’’ সমুদ্রে যেমন উত্তাল ঢেউয়ে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়ে পরক্ষণেই আবার সেখানেই লয় প্রাপ্ত হয়, তেমনই সবই ব্যাপ্তিস্বরূপ শিব-অস্তিত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয়ে আবার সেইখানেই লয়প্রাপ্ত হয়। তাই সর্বভূতের সৃষ্টি ও লয়স্থানরূপে লিঙ্গপ্রতীকে শিব আরাধিত হন।

প্রধানত দুই রূপে শিবলিঙ্গের প্রকাশ ঘটে থাকে। প্রথমটি প্রকৃতিজাত ‘স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ’ যা পৃথিবীর ভূমি ভেদ করে উত্থিত। অপরটি মনুষ্য দ্বারা নির্মিত ধাতব, প্রস্তর কিংবা মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্ট লিঙ্গ। এই দুটি ছাড়াও বাণলিঙ্গ এবং পঞ্চভূতাত্মক লিঙ্গ আছে; তেমন ক্ষিতিলিঙ্গ (শর্ব), জললিঙ্গ (ভব), অগ্নিলিঙ্গ (রুদ্র), বায়ুলিঙ্গ (উগ্র) ও আকাশলিঙ্গ (ভীম)। প্রতিটি শিবলিঙ্গেরই একটি পীঠিকা বা ‘আসন’ থাকে। স্কন্দপুরাণে আছে, -- ‘‘আকাশং লিঙ্গ নিত্যাহুঃ। পৃথিবী তস্য পীঠিকা।’’ অর্থাৎ আকাশও একটি লিঙ্গ যার পীঠিকা পৃথিবীই। বস্তুত স্বয়ম্ভূ লিঙ্গ মাত্রেরই আসন বা পীঠিকা এই পৃথিবী। মানুষের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গগুলির পীঠ উত্তরমুখী করে স্থাপিত হয়। এই পীঠিকাকে গৌরীপীঠ বা গৌরীপট্টও বলা হয়। এই পঞ্চতত্ত্ব লিঙ্গ অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ্‌, তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পঞ্চভূতের নামে পাঁচটি শিবলিঙ্গ দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি তীর্থে আছে।

ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠেও পঞ্চতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ঠাকুরের কথায়, অখণ্ড তত্ত্ব যদি হন অগ্নি, তাহলে আলো হল তাঁর চৈতন্য আর দহনক্ষমতা হল তাঁর শক্তি। তিনি যদি হন সাগর, তবে জল হল তাঁর চৈতন্যস্বরূপ আর ঢেউরূপে প্রবহমানতা হল তাঁর শক্তি-পরিচয়। এই অখণ্ডসত্তা চৈতন্যরূপে যেমন সর্বশক্তিমান, তেমনই শক্তিরূপে চৈতন্যস্বরূপিণী। অর্থাৎ চৈতন্য ও শক্তি অভেদ। একক অদ্বিতীয় অখণ্ড সত্তার নিত্য স্থিতিশীল দিকটি যেমন ‘ব্রহ্মচৈতন্য’ বা শিবস্বরূপ, তেমনই নিত্যগতিশীল দিকটি ব্রহ্মশক্তি। এই হল অখণ্ড শক্তিব্রহ্মবাদ বা শিব-শক্তি তত্ত্বের মূলকথা।
আর ‘বাণলিঙ্গ’ হল ক্ষুদ্রাকার মসৃণগাত্রের শিলাপিণ্ড যা নর্মদা নদীতে পাওয়া যায়। শিবভক্ত বাণাসুরের নামে পরিচায়িত এই লিঙ্গ একাদশ প্রকারের হয়ে থাকে। এই বাণলিঙ্গগুলি প্রতিষ্ঠিত হয় তদুপযোগী আয়তনের ধাতব পীঠিকা নির্মাণ করে, যেটি শুধু পূজাকালেই ব্যবহার্য। এই প্রকৃতির বিস্ময় এই বাণলিঙ্গ সৃষ্টি হত ওঁকারেশ্বরের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অনতিদূরে নর্মদার কোলে ধাবরি কুণ্ডে। মামলেশ্বর বাঁধ নির্মাণের সময় এই প্রকৃতির বিস্ময় ধাবরি কুণ্ডটি বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে বাণলিঙ্গের সৃষ্টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আর মৃত্তিকানির্মিত শিবলিঙ্গ প্রতিবার পূজাকালে নির্মাণ করে পূজান্তে বিসর্জন দিয়ে দিতে হয়।

যে কোনও শিবলিঙ্গেরই তিনটি ভাগ থাকে। নিম্নাংশকে ‘ব্রহ্মা-পীঠ’, মধ্যেরটিকে ‘বিষ্ণু-পিঠ’ এবং উপরিভাগটিকে ‘শিব-পীঠ’ নামে পরিচিত। লিঙ্গরূপী মহাদেবকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকের একশত হস্ত পরিমিত স্থানকে ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতভূমির বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত স্বয়ম্ভূ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গকে বিশেষ ‘শিবক্ষেত্র’ রূপে মহাতীর্থ মর্যাদায় মান্য করা হয়। তার মধ্যে সমুদ্রতীরে দুটি (সোমনাথ, রামেশ্বর), নদীতীরে তিনটি (বিশ্বেশ্বর, ত্র্যম্ব঩কেশ্বর, মহাকাল), পর্বতে চারটি (কেদারনাথ, মল্লিকার্জুন, ওংকারেশ্বর বা অমলেশ্বর, ভীমাশঙ্কর) এবং সমতলে তিনটি (বৈদ্যনাথ, ঘৃষ্ণেশ্বর ও নাগেশ্বর) জ্যোতির্লিঙ্গ বিরাজমান। এছাড়াও হিমালয়ের গহনে রয়েছে পঞ্চকেদার শিব।

এই জগৎরূপটি দশাগতভাবে নিত্য পরিবর্তনশীল প্রকাশের হলেও এটির আধাররূপ চৈতন্যস্বরূপের কোনও পরিবর্তন নেই। জাগতিক প্রকাশগত ভাবে যে ভেদমূলক অনন্ত নামরূপ সবই সেই অরূপ সত্তারই অন্তর্গত আপেক্ষিক বিকাশপ্রবাহ। তিনিই এক এবং অদ্বিতীয়ম্‌। তিনিই আমাদের সৃষ্টি, রক্ষা, গড়ে তোলেন আবার প্রয়োজনে লয় করেন। তাঁর পুজোয় কোনও আড়ম্বর নেই। বেলপাতা, ধুতরো ফুল আর গঙ্গাজল। এতেই তিনি তুষ্ট।

Written by: Prithwish Ghosh
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।