রামায়ন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রামায়ন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
০২ এপ্রিল ২০২০
ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাব তিথিকে "রামনবমী" বলা হয়।
চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষের নবমী তিথিতে ত্রেতা যুগে অয্যোধ্যার ইক্ষ্বাকু বংশীয় সম্রাট মহারাজ দশরথের স্ত্রী কৌশল্যা দেবীর সন্তান রূপে আবির্ভূত হন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাব তিথিকে "রামনবমী" বলা হয়। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, রাবন বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেছিলেন। চৈত্রমাসের প্রকৃতি । মধুমাসে প্রকৃতি সুন্দর হয়ে উঠলো। অযোধ্যার বৃক্ষ গুলি সুগন্ধে ভরা পুস্পে ভরে উঠলো। নানা রঙ বেরঙের প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগলো সেই সব পুস্পে, মধুলোভী অলিকূল মধুলোভে পুস্পের ডালে গমন করতে লাগলো। কোকিলাদি নানা পক্ষী মিষ্ট সুরে ভরিয়ে তুলে দিলো অযোধ্যার পরিবেশকে । ভগবানের আবির্ভাব কাল উপস্থিত । কৃত্তিবাস ওঝা লেখেছেন-
কৌশল্যারে দেখা দেন প্রভু নারায়ণ ।।
চতুর্ভুজ রূপে দেখা দিলেন শ্রীহরি ।।
পুত্রভাবে হরিকে করিল রাণী কোলে ।
কহিলেন কৌশল্যারে ডাকিয়া মা ব’লে ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
কৌশল্যা দেবী স্বপ্নে চতুর্ভুজ ভগবানের নীলনবঘন শ্রীমূর্তি দর্শন পেলেন। দেখলেন সেই অনাদির আদি গোবিন্দ পুত্র রূপে তাঁর ক্রোড়ে ।
সন্ত তুলসীদাস গোস্বামী মহারাজ লিখেছেন-
বিপ্র ধেনু সুর সন্ত হিত লীনহ মনুজ অবতার ।
নিজ ইচ্ছা নির্মিত তনু মায়া গুন গো পার ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
এর অর্থ- “শ্রীভগবানের নরদেহ ধারন বিপ্র, ধেনু, দেবগণ ও সাধু সন্ত কল্যাণে নিহিত ছিল । অজ্ঞান রূপে মায়ার মলিনতা , ত্রিগুণ ও ইন্দ্রিয় তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তাঁর দিব্য তনু নিজ ইচ্ছায় নির্মিত , তা কোন কর্ম বন্ধনের বশীভূত হয়ে ত্রিগুণাত্মক পঞ্চভূত দেহ নয় ।”
কৃত্তিবাস ওঝা লেখেছেন-
মধুচৈত্রমাস, শুক্লা শ্রীরাম নবমী ।
শুভক্ষণে ভূমিষ্ঠ হ’লেন জগৎস্বামী ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
রাজা দশরথের অপর পত্নী কৈকয়ী জন্ম দিলেন এক পুত্রের। তাঁর নাম ভরত ।
রাজা দশরথের অপর পত্নী সুমিত্রা দুটি যমজ পুত্রের জন্ম দিলেন। দুই যমজ পুত্রের নাম লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন রাজা দশরথের আনন্দের সীমা নেই । সুমিত্রা সহ যমজ পুত্র দেখে খুশীতে ভরে উঠলেন । শ্রীরামের জন্মেতে ধরিত্রী দেবী খুশী হলেন । বলা হয় ভগবান বিষ্ণু নিজে চার অংশ হয়ে শ্রীরাম, ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন রূপে জন্ম নিয়েছিলেন। মুনি ঋষি রা আনন্দিত হলেন – যথা কৃত্তিবাস পণ্ডিত গেয়েছেন-
রামের জনম শুনি, নাচেন সকল মুনি ,
দণ্ড কমণ্ডলু করি হাতে ।
স্বর্গে নাচে দেবগণ , মর্তে নাচে মর্তজন
হরিষে নাচিছে দশরথে ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
২৬ মার্চ ২০১৮
রামায়ন কথা (সম্পূর্ন)
আদিকাণ্ড
রামায়ন কথাঃ আদিকান্ড - ৩২ পর্ব
অযোধ্যাকাণ্ড
অরণ্যকাণ্ড
রামায়ন কথাঃ অরণ্যকাণ্ড - ১২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ সুন্দরাকাণ্ড - ১২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ সুন্দরাকাণ্ড -১৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ সুন্দরাকাণ্ড -১৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৪ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৫ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৫ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৮ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৯ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -০৯ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৬ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৭ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -১৭ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২০ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২১ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২১ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৪ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৫ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৫ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৮ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৯ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -২৯ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩২ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৩ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৬ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৭ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড -৩৭ পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
রামায়ন কথাঃ লঙ্কাকাণ্ড - পর্ব
১২ নভেম্বর ২০১৬
রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ৪১ )
রাবণের আদেশে রাক্ষসেরা সমানে বানর, ভল্লুক, মর্কট দের বধ করতে লাগলো। লক্ষ লক্ষ রাক্ষসেরা বানর দলের দিগে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে লাগলো। বানর সেনাদলে হাহাকার আর ক্রন্দন উঠলো। রাবণের নিক্ষেপিত দিব্যাস্ত্রের তাণ্ডবে মনে হল যেনো বসুমতী আজ সপ্ত পাতাল তলে নিমজ্জিত হবে। দিব্যাস্ত্র সকল প্রভাবে চতুর্দিকে অন্ধকার নেমে এলো আবার কখনো বা শত সূর্যের ন্যায় আলোকিত হয়ে উঠলো। এই সকল ঘাতক অস্ত্রের প্রভাবে সমুদ্রে উথালপাতাল অবস্থা হল । বানরেরা ছিন্নভিন্ন হয়ে চতুর্দিকে পড়তে লাগলো । রাবণ “শত্রুঘাতী” নামক রথ সকলকে নিজের চারেপাশে রেখেছিলো। এই সকল রথের চাকার সাথে অগণিত শর ছিলো। যখন অশ্বের আকর্ষণে এই রথের চক্র ঘুরতো, তখন এই শর গুলি চতুর্দিকে ছুটে যেতো। তাই এই রথ গুলি বানর সেনার মধ্যে যখন চলছিল, তখন বানর দের ছিন্নভিন্ন শব ও রক্ত ভিন্ন কিছুই দেখা যাচ্ছিল্ল না। কারণ তীক্ষ্ণ শরের সামনে কেউ টিকতে পারলো না । হনুমান ও অঙ্গদ মিলে প্রবল বিক্রম দেখালো। গদা প্রহারে রাক্ষস দের চূর্ণ করলো। লেজে পেঁচিয়ে আছার দিলো। পদতলে পিষ্ট করলো। বানরেরা সমানে প্রস্তর, বৃক্ষ নিক্ষেপ করে রাবণের রাক্ষস সেনাদের পিষ্ট করে দিলো। ক্রোধে উন্মত্ত রাবণ একের পর এক দিব্যাস্ত্র সকল ছুড়তে লাগলো। তাঁর অট্টাহস্যে দিগবিদিক কেঁপে উঠলো। রাবণের মদমত্ত হস্তী গুলি বানরদের শুণ্ডে তুলে ভূমিতে আছার দিলো। কাউকে পদ চাপে পিষ্ট করলো। রক্ত রক্তময় হল চতুর্দিক। এই দেখে বানরেরা হস্তীগুলির দিকে পর্বত শৃঙ্গ তুল্য প্রস্তর নিক্ষেপ করতে লাগলো । বিশাল বিশাল প্রস্তর আকাশ হতে হস্তী গুলির ওপর ঝড়ে পড়লো। হস্তী সহিত প্রস্তর গুলি যখন ভূমিতে পড়লো বারংবার ভূকম্পের ন্যায় কেঁপে উঠলো। রাবণের রথ গুলি থেকে রাক্ষসেরা অগণিত বর্শা ও শর বানরদের দিকে নিক্ষেপ করতে লাগলো। লক্ষ লক্ষ বানর হতাহত হলে, ভল্লুকেরা তীব্র গর্জন করে ছুটে গেলো । ভল্লুকেরা গিয়ে প্রবল গর্জন করে রাক্ষস দের ওপর লম্ফ দিয়ে পড়ে আঁচর, কামড় বসাতে লাগলো । রথ গুলি তুলে তুলে আছরে ভূমিতে ফেলল। স্বর্ণ রথের টুকরো তে মেদিনী ঢাকা পড়লো । ভল্লুকদের থাবায় হতাহত হয়ে ভূমিতে শায়িত হল রাক্ষসেরা। চতুর্দিকে কেবল বানর ও রাক্ষসদের শব ভিন্ন কিছু দেখা গেলো না । সমুদ্র তট যেনো বালিকার বদলে শবদেহ দ্বারা রচিত হয়েছিলো । রাবণ তখন নানা দিব্যাস্ত্রে ভল্লুক দের নষ্ট করতে লাগলো। মণিমুকুট বাণ নিক্ষেপ করলো রাবণ। সেই অস্ত্রের থেকে লক্ষ লক্ষ জলন্ত শেল উৎপন্ন হয়ে ভল্লুকদের বুকে আঘাত হানলে, ভল্লুকেরা রক্তবমি করতে করতে মরল। লক্ষ্মণ এই দিকে এগিয়ে এলো। তাঁর সাথে আসলেন ভগবান শ্রীরাম । লক্ষ্মণ তখন বললেন- “ওরে তস্কর! ওরে মায়াবী! আয় আমার সহিত যুদ্ধ কর। কেন এই নীরিহ সেনাদের বধ করছিস?” রাবণ ক্রোধে বললেন- “ওরে লক্ষ্মণ! আমি তোকেই খুঁজে চলছি। তোকে দেখা মাত্রই আমার মনে পুত্র হারানোর শোক ও তার দরুন ক্রোধ উৎপন্ন হচ্ছে।” এই বলে রাবণ কালবাণ নিক্ষেপ করলেন। ভয়ানক শব্দ সহিত সেই অস্ত্র ছুটে আসতে দেখে লক্ষ্মণ হাস্য করে যমাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। দুটি অস্ত্রের প্রবল সংঘর্ষ হল। ক্রোধে রাবণ অর্ধচন্দ্র, বিনাশক, খড়্গ বাণ নিক্ষেপ করলেন। লক্ষ্মণ চোখের নিমিষে সূর্যবাণ, বজ্রবাণ, বায়ব্যবাণ নিক্ষেপ করলেন। দুজনের নিক্ষিপ্ত বাণ দুজনের দিকে ধেয়ে আসতে লাগলো। দিব্যাস্ত্র সকলের মুখোমুখিতে যেন জগত কাঁপতে লাগলো। দেখতে দেখতে রাবণের অস্ত্র সকল ধূলিসাৎ হল। তখন রাবণ লক্ষ্মণের দিকে শেল নিক্ষেপ করলে লক্ষ্মণ মূর্ছিত হল। হনুমান এসে তাঁহাকে ধরে শিবিরে নিয়ে গেলেন ।
এরপর বিভীষণ রাবণকে বললেন- “অগ্রজ! তুমি মন্দবুদ্ধি । তুমি অধর্মের আশ্রয় করে এতই দাম্ভিক হয়ে উঠেছো যে প্রভুর ভ্রাতাকে আঘাত করে সকল সীমা অতিক্রম করেছো। আজ আমি তোমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবো।” এই বলে বিভীষণ গদা নিয়ে ধেয়ে গেলো। গদা প্রহারে রাবণের অনুগত রাক্ষসদের হত্যা করতে করতে রাবণের দিকে এগিয়ে গেলো। ভগবান রাম বললেন- “মিত্র বিভীষণ! তুমি আর অগ্রসর হয়ো না। এ রাবণের মায়া। সে তোমাকে বন্দী করবে। দেখো রাক্ষসেরা কিরূপে তোমাকে বুহ্যজালে নিয়ে যাচ্ছে।” বিভীষণ সমানে রাক্ষসদের অন্ত করতে করতে রাবণের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল্ল । রাবণ হাসছিল। কিন্তু শ্রীরাম হনুমান ও অঙ্গদ সহিত সামনে এগিয়ে গেলো। ভগবান শ্রীরামের বাণে রাক্ষসরা ছিন্নভিন্ন হল। রাক্ষসদের রক্ত যেনো নদীর আকার নিয়ে যুদ্ধভূমিতে প্রবাহিত হল । এই ভাবে ভগবান শ্রীরাম রাক্ষসদের বুহ্য গুলি ধ্বস্ত করে দিলেন । বিভীষণ যখন অতি সন্নিকটে তখন রাবণ হাস্য করে বললেন – “দুষ্ট! বিশ্বাসঘাতক ! তোর মতো ভ্রাতাকে বাঁচিয়ে রাখলে ক্ষতি হবে।” এই বলে রাবণ তখন ভয়ানক শক্তিঅস্ত্র হস্তে নিলো। বিভীষণের দিকে ছুড়লো ।
আবত দেখি সক্তি অতি ঘোরা ।
প্রণতারতি ভঞ্জন পন মোরা ।।
তুরত বিভীষণ পাছেঁ মেলা ।
সম্মুখ রাম সহেউ সোই সেলা ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
সেই শক্তি অস্ত্র স্বয়ং মহাদেবের প্রদত্ত। সেই অস্ত্রের ঘাতে বিভীষণের মৃত্যু অনিবার্য । শরণাগতকে প্রভু শ্রীরাম নিজ জীবন বিপন্ন করেও রক্ষা করেন । ভগবান রাম তখন বিভীষণকে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে , তার আগে দাঁড়ালেন । শক্তিঅস্ত্র এসে ভগবান রামের বুকে বিদ্ধ হল। ভগবান রাম অচেতন হয়ে ভূমিতে পড়লেন । সকলে দেখলো ভগবান রামের নবদূর্বাদল অঙ্গকান্তি রুধিরে লিপ্ত হয়েছে । বিভীষণ এই দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে রাবণকে বললেন- “ওরে মন্দবুদ্ধি! তুই মহা মূর্খ ও অতিশয় অধম । তুই সর্বদা মুনি, ঋষি, দেবতা, মানব দের সাথে যুদ্ধ করেই যাচ্ছিস? ব্রহ্মার বরে দশমুখ পেয়ে এত দম্ভ তোর কিসের? রামবিমুখ হয়ে সম্পদ ভোগ করতে চাস ? তোর কাল তোর শিয়রে উপস্থিত ।” এই বলে বিভীষণ গদা নিয়ে ধেয়ে গিয়ে রাবণের বক্ষে প্রহার করলো। সেই আঘাতে রাবণ রথ থেকে ভূমিতে পতিত হল। তাঁর রক্তবমি হতে লাগলো। রাবণ আশ্চর্য হল বিভীষণের এত শক্তি দেখে। এই সেই বিভীষণ- যাকে পদাঘাত করে লঙ্কা থেকে তাড়ানো হয়েছিলো। যাই হোক আঁধার নেম আসতেই সেদিনের যুদ্ধ থেমে গেলো। ভগবান শ্রীরাম চেতন পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সেই শক্তি অস্ত্রে তাঁর কিছু হল না ।
( ক্রমশঃ )
রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৪০ )
ব্রহ্মা এরপর দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা কে আদেশ দিলেন- “হে বিশ্বকর্মা! আপনি একটি দিব্য রথ প্রস্তুত করুন। সামনেই ভগবান শ্রীরাম ও রাবণের মধ্যে অন্তিম সংঘাত উপস্থিত হবে। প্রভু শ্রীরাম সেই রথে চেপে যুদ্ধ করবেন। ইন্দ্রের অশ্ব সকল সেই রথের অশ্ব হবেন। মাতলি হবেন সেই রথের সারথি।” বিশ্বকর্মা বললেন- “আমি রথ নির্মাণ করবো। কিন্তু ভগবান শ্রীরাম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছেন যে তিনি চতুর্দশ বৎসর কোন রাজকীয় সেবা গ্রহণ করবেন না। এই অবস্থায় তিনি কি রথে আরোহণ করে যুদ্ধ করতে সম্মত হবেন?” ব্রহ্মা বললেন- “আপনার যুক্তি যথার্থ। কিন্তু দেবতা প্রদত্ত দ্রব্য রাজকীয় সম্পদে ধরা হয় না। সেই সূত্রে দেবতাদের প্রদত্ত রথ পার্থিব রথের মধ্যে গণ্য হবে না। সেই রথ অবশ্যই গ্রহণ করবেন প্রভু শ্রীরাম।” অপরদিকে রাবণ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হল। ক্রোধে সে সমস্ত লঙ্কাপুরীর যত রাক্ষস সেনা ছিলো সবকে ডেকে আনলো। এমনকি আহত রাক্ষসদের ডেকে আনলো। মন্দোদরী অনেক বুঝালেন। রাবণ শুনলো না। রাবণ ভদ্রকালী মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করলো- “মাতঃ! কদাপি আমি তোমার পূজায় অবহেলা অনাচার করিনি । বসন্ত ঋতুতে বিবিধ বলি দ্বারা তোমার পূজা করেছি । শাস্ত্র নিয়মে প্রত্যহ তোমার সেবা করেছি। মাতঃ তুমি আশীর্বাদ দিয়েছিলে যে যতদিন আমি তোমায় ত্যাগ না করি, ততদিন তুমি আমাকে রক্ষা করবে। হে অম্বিকা! আমি রামের সাথে অন্তিম যুদ্ধ করতে যাচ্ছি। আমার বংশ নাশ হয়েছে। আমি বড়ই সঙ্কটে। রামকে যতটা শক্তিহীন জ্ঞান করেছিলাম, সে ততটা নয়। সে রাক্ষস কূল উজার করেছে। হে জগদম্বা ! আমি অতি সঙ্কটে নিমগ্ন হয়ে তোমাকে শরণ করছি। হে ভবানী! যুদ্ধকালে আমাকে তুমি রক্ষা করো। রামের কোন অস্ত্র যেনো আমার শরীর স্পর্শ না করে।” এই বলে রাবণ ভবানীর কাছে স্তবস্তুতি করলো। কৈলাস হতে মহেশ্বর ও মহেশ্বরী সকল কিছুই দেখছিলেন । মহাদেব ত তাহাকে ত্যাগ করেছেন । মহাদেব বললেন- “দেবী! তুমি কি রাবণের পক্ষ অবলম্বন করবে নাকি শ্রীরামের পক্ষ? তুমি ধর্ম না অধর্মের পক্ষ গ্রহণ করবে? তুমি নিজেই অস্ত্র ধারণ করে অসুর বধ করে দেবতাদের স্বর্গ রাজ্য অসুরমুক্ত করেছিলে । এবার তুমি কি সেই অসুরদের পক্ষ নেবে?”
দেবী বললেন- “প্রভু! মহীরাবণের পক্ষ কি আমি গ্রহন করেছিলাম ? রাবণ ঐ মহীরাবণের ন্যায় স্বার্থান্ধ । কিন্তু আমি রাবণের আরাধনাতে সন্তুষ্ট হয়ে তাহাকে বর প্রদান করেছিলাম যে সে যতদিন আমাকে ত্যাগ না করবে ততদিন আমি তাকে কৃপা করবো। রাবণ একদিন আমাকে ত্যাগ করবে। সেই দিন অতি নিকটে আসছে। সেইদিন রাবণের বিনাশ হবে। প্রভু আমি জানি অসুর জাতি ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা নিয়ে আস্ফালন করে অসৎ কর্মে লিপ্ত হয়। কিন্তু ঈশ্বরের কর্তব্য সকাম ও নিস্কাম উভয় ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা। সেই কারনেই পিতামহ ব্রহ্মা অসুরদিগকে বর প্রদান করেন। এই রাবণ পূর্বেও আপনার ও পিতামহ ব্রহ্মার বর পেয়েছে। হে মহেশ্বর! আপনি নিজেও স্বয়ং ভস্মাসুরকে বর প্রদান করেছিলেন, আপনি কি জানতেন না অপাত্রে উত্তম বস্তু দেবার পরিণাম কি? সেইরূপ রাবণের ওপর আমি কৃপাদৃষ্টি ততদিন রাখবো, যতদিন সে না আমাকে ত্যাগ করে।” মহেশ্বর বললেন- “হে অম্বিকা! এই যুদ্ধে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। সেই ইতিহাসের মধ্যমণি হবে তুমিই। বিশ্ব সংসারে এক পরিবর্তন আসবে।” ব্রহ্মা স্বয়ং জানতেন দেবী সদয় আছেন রাবণের পর। যাই হোক রাবণ যুদ্ধে বের হল । এক বিশাল সংখ্যক সেনাবাহিনী নিয়ে আসলো।
চলেউ নিসাচর কটকু অপারা ।
চতুরঙ্গিনী অনী বহু ধারা ।।
বিবিধি ভাঁতি বাহন রথ জানা ।
বিপুল বরন পতাক ধ্বজ নানা ।।
চলে মত্ত গজ জূথ ঘনেরে ।
প্রাবিট জলদ মরুত জনু প্রেরে ।।
বরন বরন বিরদৈত নিকায়া ।
সমর সূর জানহিঁ বহু মায়া ।।
অতি বিচিত্র বাহিনী বিরাজী ।
বীর বসন্ত সেন জনু সাজী ।।
চলত কটক দিগসিন্ধুর ডগহীঁ ।
ছুভিত পয়োধি কুধর ডগমগহীঁ ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
অর্থাৎ-“ বিপুল রাক্ষস সৈন্যবাহিনী এগিয়ে গেল। চতুরঙ্গ সেনারাই কত দল ছিল। বহু রকমের বাহন, রথ ও যান ব্যবহৃত হল । ধ্বজা পতাকাও বহু রঙের ছিল । দলে দলে মদমত্ত হস্তীসকল এগিয়ে চলল । মনে হল যেন পবনের প্রেরণায় বর্ষার মেঘের মিছিল । চিত্রবিচিত্র সাজসজ্জায় বীর সকল চলছিল ; তারা অতিশয় রণকুশল বহু আবার মায়াযুদ্ধে নিপুণ । অতি বিচিত্র ছিল সেই সৈন্যবাহিনীর শোভা । মনে হচ্ছিল যেন বসন্ত সৈন্যবাহিনী সুসজ্জিত করে অগ্রসর হচ্ছে । সৈন্যবাহিনীর পদ্ভারে দিগগজ সকল টলমল হল, সমুদ্র বিক্ষুব্ধ হল আর পর্বত দুলে উঠলো।”
উঠী রেনু রবি গয়উ ছপাঈ ।
মরুত থকিত বসুধা অকুলাঈ ।।
পণব নিসান ঘোর রব বাজহিঁ ।
প্রলয় সময় কে ঘন জনু গাজাহিঁ ।।
ভেরি নফীরি বাজ সহনাঈ ।
মারূ রাগ সুভট সুখদাঈ ।।
কেহরি নাদ বীর সব করহীঁ ।
নিজ নিজ বল পৌরুষ উচ্চরহীঁ ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
অর্থাৎ- সৈণ্যবাহিনীর পদভারে দিগবিগন্ত ধূলিময় হল । যাতে সূর্যের আলোক ধূলায় ঢাকা পড়লো , বসুধা বিহ্বল চিত্ত হয়ে পড়লো । উচ্চগ্রামে ঢোল, নাকরা বেজে উঠল ; তখন তাকে প্রলয়ঙ্কর মেঘের গর্জন মনে হচ্ছিল্ল। ভেরী, তূরী ও সানাই বেজে উঠল । তাতে যোদ্ধাদের প্রিয় মারিবেহাগ বাজছিল । বীরেরা সিংহনাদ করে উঠছিল ; তারা নিজ বলবত্তা জাহির করে উদ্বুদ্ধ করছিল নিজেদের।
রাবণ বলল- “রাক্ষস বীরেরা ! তোমরা ঐ বানর, ঋক্ষ , মর্কট দলকে বধ করো। আমি ঐ দুই রাজকুমার ভ্রাতাকে হত্যা করবো।” লঙ্কার দ্বার খুলতেই রাক্ষসেরা ঝাঁপিয়ে পড়লো। বানরেরা জবাব দিল। ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ শরে শরে রাক্ষস বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে লাগলেন ।
( ক্রমশঃ )
দেবী বললেন- “প্রভু! মহীরাবণের পক্ষ কি আমি গ্রহন করেছিলাম ? রাবণ ঐ মহীরাবণের ন্যায় স্বার্থান্ধ । কিন্তু আমি রাবণের আরাধনাতে সন্তুষ্ট হয়ে তাহাকে বর প্রদান করেছিলাম যে সে যতদিন আমাকে ত্যাগ না করবে ততদিন আমি তাকে কৃপা করবো। রাবণ একদিন আমাকে ত্যাগ করবে। সেই দিন অতি নিকটে আসছে। সেইদিন রাবণের বিনাশ হবে। প্রভু আমি জানি অসুর জাতি ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা নিয়ে আস্ফালন করে অসৎ কর্মে লিপ্ত হয়। কিন্তু ঈশ্বরের কর্তব্য সকাম ও নিস্কাম উভয় ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা। সেই কারনেই পিতামহ ব্রহ্মা অসুরদিগকে বর প্রদান করেন। এই রাবণ পূর্বেও আপনার ও পিতামহ ব্রহ্মার বর পেয়েছে। হে মহেশ্বর! আপনি নিজেও স্বয়ং ভস্মাসুরকে বর প্রদান করেছিলেন, আপনি কি জানতেন না অপাত্রে উত্তম বস্তু দেবার পরিণাম কি? সেইরূপ রাবণের ওপর আমি কৃপাদৃষ্টি ততদিন রাখবো, যতদিন সে না আমাকে ত্যাগ করে।” মহেশ্বর বললেন- “হে অম্বিকা! এই যুদ্ধে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। সেই ইতিহাসের মধ্যমণি হবে তুমিই। বিশ্ব সংসারে এক পরিবর্তন আসবে।” ব্রহ্মা স্বয়ং জানতেন দেবী সদয় আছেন রাবণের পর। যাই হোক রাবণ যুদ্ধে বের হল । এক বিশাল সংখ্যক সেনাবাহিনী নিয়ে আসলো।
চলেউ নিসাচর কটকু অপারা ।
চতুরঙ্গিনী অনী বহু ধারা ।।
বিবিধি ভাঁতি বাহন রথ জানা ।
বিপুল বরন পতাক ধ্বজ নানা ।।
চলে মত্ত গজ জূথ ঘনেরে ।
প্রাবিট জলদ মরুত জনু প্রেরে ।।
বরন বরন বিরদৈত নিকায়া ।
সমর সূর জানহিঁ বহু মায়া ।।
অতি বিচিত্র বাহিনী বিরাজী ।
বীর বসন্ত সেন জনু সাজী ।।
চলত কটক দিগসিন্ধুর ডগহীঁ ।
ছুভিত পয়োধি কুধর ডগমগহীঁ ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
অর্থাৎ-“ বিপুল রাক্ষস সৈন্যবাহিনী এগিয়ে গেল। চতুরঙ্গ সেনারাই কত দল ছিল। বহু রকমের বাহন, রথ ও যান ব্যবহৃত হল । ধ্বজা পতাকাও বহু রঙের ছিল । দলে দলে মদমত্ত হস্তীসকল এগিয়ে চলল । মনে হল যেন পবনের প্রেরণায় বর্ষার মেঘের মিছিল । চিত্রবিচিত্র সাজসজ্জায় বীর সকল চলছিল ; তারা অতিশয় রণকুশল বহু আবার মায়াযুদ্ধে নিপুণ । অতি বিচিত্র ছিল সেই সৈন্যবাহিনীর শোভা । মনে হচ্ছিল যেন বসন্ত সৈন্যবাহিনী সুসজ্জিত করে অগ্রসর হচ্ছে । সৈন্যবাহিনীর পদ্ভারে দিগগজ সকল টলমল হল, সমুদ্র বিক্ষুব্ধ হল আর পর্বত দুলে উঠলো।”
উঠী রেনু রবি গয়উ ছপাঈ ।
মরুত থকিত বসুধা অকুলাঈ ।।
পণব নিসান ঘোর রব বাজহিঁ ।
প্রলয় সময় কে ঘন জনু গাজাহিঁ ।।
ভেরি নফীরি বাজ সহনাঈ ।
মারূ রাগ সুভট সুখদাঈ ।।
কেহরি নাদ বীর সব করহীঁ ।
নিজ নিজ বল পৌরুষ উচ্চরহীঁ ।।
( তুলসীদাসী রামায়ণ )
অর্থাৎ- সৈণ্যবাহিনীর পদভারে দিগবিগন্ত ধূলিময় হল । যাতে সূর্যের আলোক ধূলায় ঢাকা পড়লো , বসুধা বিহ্বল চিত্ত হয়ে পড়লো । উচ্চগ্রামে ঢোল, নাকরা বেজে উঠল ; তখন তাকে প্রলয়ঙ্কর মেঘের গর্জন মনে হচ্ছিল্ল। ভেরী, তূরী ও সানাই বেজে উঠল । তাতে যোদ্ধাদের প্রিয় মারিবেহাগ বাজছিল । বীরেরা সিংহনাদ করে উঠছিল ; তারা নিজ বলবত্তা জাহির করে উদ্বুদ্ধ করছিল নিজেদের।
রাবণ বলল- “রাক্ষস বীরেরা ! তোমরা ঐ বানর, ঋক্ষ , মর্কট দলকে বধ করো। আমি ঐ দুই রাজকুমার ভ্রাতাকে হত্যা করবো।” লঙ্কার দ্বার খুলতেই রাক্ষসেরা ঝাঁপিয়ে পড়লো। বানরেরা জবাব দিল। ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ শরে শরে রাক্ষস বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে লাগলেন ।
( ক্রমশঃ )

—
রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৩৯)
মকরধ্বজকে পাতালের রাজা বানালো হল। ব্রাহ্মণেরা বৈদিক স্তুতি পাঠ করলেন। পবিত্র বারি দ্বারা মকরধ্বজের অভিষেক করানো হল। পাতালের রাক্ষসেরা সকলে হনুমানের ভয়ে মকরধ্বজের অনুগত হল। এছারা তারা মকরধ্বজের শক্তি জানতো। তারাও আর পাপ করবে না বলে ভগবান শ্রীরামের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। মকরধ্বজের মাতা বলল- “প্রভু! আপনি স্বয়ং মর্যাদা পুরুষোত্তম । আমার পুত্র সদ্য কিশোর। সে সকল রাজধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত নয়। কৃপা করে তাহাকে উপদেশ প্রদান করুন।” ভগবান শ্রীরাম তখন মকরধ্বজকে বললেন- “বতস্য! সদা ধর্মপথে থেকো। ধর্মই সব। ধর্ম হীন হলে সে সব কিছুই হারিয়ে ফেলে। নিজেও অধর্ম করবে না, কদাপি অধার্মিকদের সঙ্গ দেবে না। যে অধার্মিক দিগের সঙ্গ করে, সে নিজেও অধার্মিক হয়। অধার্মিক দিগকে সর্বদা ধর্ম কথা শ্রবন করাবে । কদাপি ব্রাহ্মণ দ্বেষী হবে না। ব্রাহ্মণ দিগকে সর্বদা ধেনু, ভূমি, অর্থ , বস্ত্র দান করিবে। শাস্ত্র বিধান মান্য করবে চলবে। মাতার সেবা করবে। প্রজাদিগকে সন্তান ন্যায় পালন করবে। কদাপি প্রজার ওপর অত্যাচার করিবে না। বরং প্রজাদের স্বার্থে ব্যক্তিগত সুখ ত্যাগ করবে। রাজার কর্তব্য সুখ ভোগ করা নয়। রাজার কর্তব্য গো- ব্রাহ্মণ- শাস্ত্র- নারী ও প্রজাদের রক্ষা করা। যে রাজা ইহা করে না সে নরকে গমন করে। প্রত্যহ সাধ্যানুসারে দান- ধ্যান করবে। প্রজাদের মতামত মান্য করবে।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম , মকরধ্বজকে অনেক উপদেশ প্রদান করলেন । হনুমান তখন দুই স্কন্ধে প্রভু শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে উঠালেন। তারপর হাস্যমুখে ফিরে চললেন । পাতালের পথ বেয়ে চললেন। পথে আসবার সময় কপিল মুনিকে দেখতে পেলেন। কপিল মুনির আশ্রমে নেমে এলেন। ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ কপিল মুনিকে প্রণাম করলেন । কপিল মুনি অন্তরে অন্তরে প্রভু শ্রীরামকে প্রনাম করলেন । কপিল মুনির কাছে আধ্যাত্মিক বানী শ্রবন করলেন। তারপর সেখানে কিঞ্চিৎ সেবা গ্রহণ করে পুনঃ হনুমানের স্কন্ধে চাপলেন ।
একে একে লাভার নদী সকল পার করলেন । দেবী বসুমতীকে দেখলেন । তারপর ধীরে ধীরে বলি রাজার ওখানে আসলেন । বলি রাজা ভগবানের দিব্যরূপ দেখে ভূমিতে সষ্টাঙ্গে প্রণাম জানিয়ে বললেন- “প্রভু! আপনি সেই বামনদেব। আপনার চরণ স্পর্শে আমি ধন্য হয়েছি। আপনি এই ভক্তের আলয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করুন।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মহারাজ বলি। আমি ত সর্বদা ভক্তের সঙ্গেই থাকি। ভক্তের হৃদয় আমার প্রিয় বাসস্থান । আমি সর্বদা তোমার সাথেই আছি। তোমার ভক্তি শ্রদ্ধাতেই আমি আছি। কিন্তু আমি এই অবতারে চতুর্দশ বৎসর কোন রাজকীয় সেবা গ্রহণে অপারগ। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। চতুর্দশ বৎসর সমাপন হতে আর মাত্র কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে।” বলি মহারাজকে কৃপা করে পুনঃ হনুমানের স্কন্ধে চড়লেন । তারপর আবার চললেন। পাতালপুরী সকল দেখতে লাগলেন । অনেক মুনি ঋষি ও পুন্যাত্মা দিগকে দেখতে পেলেন । একসময় সুরঙ্গের পথ ধরে রাম লক্ষ্মণ কে স্কন্ধে নিয়ে হনুমান উঠে আসলেন । ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে এভাবে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে দেখে বানর সেনাদলে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেলো । সকলে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনিতে চতুর্দিক ভরিয়ে দিলেন। ভগবান রাম তখন বিভীষণ ও সুগ্রীবকে আলিঙ্গন প্রদান করলেন । সকল ঘটনা ব্যক্ত করলেন। হনুমানের পুত্র মকরধ্বজের কথা শ্রবণ করে সকলে আশ্চর্য হলেন। খুশী হলেন এই শুনে যে মকরধ্বজ এখন পাতালের রাজা। মহীরাবণ ও অহীরাবণ দুই বধ হয়েছে । ভগবান শ্রীরাম তখন বললেন- “এই সকল অঘটনকে দূর করেছে হনুমান। সেই ছিলো বলে মহীরাবণ আমাদের বলি দিতে অসমর্থ হয়েছে। হনুমানের উপকার আমি কিরূপে শোধ করবো?” হনুমান লজ্জিত হয়ে বললেন- “ছি! ছি! প্রভু! আমাকে লজ্জা দেবেন না। আপনার কৃপাতেই এই সকল সম্ভব । আপনি স্বয়ং মায়াধীশ। মহীরাবণের সাধ্য কি যে সে আপনাকে মায়াজালে নিক্ষেপ করে? এই সকল হয়েছে কেবল আমার দ্বারা মহীরাবণের অন্ত হওয়ার জন্য। এই সকল আপনারই লীলা।”
বানর দলের জয়ধ্বনি লঙ্কায় পৌছে গিয়েছিলো । ত্রিজটা গিয়ে সীতাদেবীকে সব সংবাদ দিলেন। মহীরাবণের ঘটনা শুনে সীতাদেবী শোকে উন্মাদিনী হয়েছিলেন । কিন্তু প্রভু শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ কে অক্ষত অবস্থায় হনুমান ফিরিয়ে এনেছে, হনুমান নিজে মহীরাবণ আর অহীরাবণের বধ করেছে শুনে আনন্দে দেবতাদের ধন্যবাদ প্রদান করতে লাগলেন । হনুমানকে অনেক আশীর্বাদ দিলেন । বললেন- “দাম্ভিক রাবণের এই পরিণতি হওয়ার ছিলো। অহঙ্কারী ব্যক্তি অহঙ্কারে এত শীর্ষে উঠতে চায় যে সে সেখান থেকে পতিত হয়ে নিদারুন ভাবে চূর্ণ হয়। রাবণ সেই রকম।” পুত্র ও নাতির মৃত্যু সংবাদ ও রাম লক্ষ্মণের জীবিত অবস্থায় ফেরা শুনে রাবণ শোকে অস্থির হল। শোকে সে ভূমিতে পতিত হয়ে রোদন করতে লাগলো । “হা পুত্র!” বলে রোদন করতে লাগলো। রাবণ শোকে বলতে লাগলো – “আমার সকল সন্তান, নাতিপুতি সকলেই নিহত হয়েছে। এই শোক আমি কোথায় রাখবো? হে মহেশ্বর! আমি কেনই বা এত শোক পাচ্ছি। আমার বংশে প্রদীপ দেবার কেউ থাকলো না!” এই বলে রাবণ রোদন করতে লাগলো। মন্দোদরী এসে বলল- “স্বামী! আমি এইদিনেরই ভয় পেয়েছিলাম । আমি , আপনার ভ্রাতা বিভীষণ, আপনার পিতামাতা আপনাকে কত বুঝিয়েছিলাম , মনে আছে? যেদিন আপনি সীতাকে হরণ করতে গিয়েছিলেন, সেইদিনই আপনাকে কত বুঝিয়েছি! বারবার বুঝিয়েছি আর বারবার আপনি শক্তির দম্ভ দেখিয়েছেন। শ্রীরাম অজেয়, কেউ তাঁহাকে পরাজিত করতে পারে না। আপনি কারোর কথাই মানেন নি। এই সব হতোই। এখন শোক করে আর কি পুত্রদের ফিরে পাবেন? তাই বলছি সীতাকে ফিরিয়ে দিন। আপনি নতুন করে রাজ্যকে সাজিয়ে পরিচালনা করুন।” রাবণ ক্রোধে বলল- “যে আমার বংশকে নির্বংশ করলো, আমি তার দাবী মেনে নেবো? কদাপি নয়। আমার শ্বাস যতদিন আছে, সীতাকে ফিরিয়ে দেবো না। নাই বা থাকলো কেও। আমি যুদ্ধে গিয়ে জয়ী হয়ে ফিরবো। পুত্রঘাতী সেই শত্রুদের কাহাকেও জীবিত রাখবো না।”
( ক্রমশঃ )
একে একে লাভার নদী সকল পার করলেন । দেবী বসুমতীকে দেখলেন । তারপর ধীরে ধীরে বলি রাজার ওখানে আসলেন । বলি রাজা ভগবানের দিব্যরূপ দেখে ভূমিতে সষ্টাঙ্গে প্রণাম জানিয়ে বললেন- “প্রভু! আপনি সেই বামনদেব। আপনার চরণ স্পর্শে আমি ধন্য হয়েছি। আপনি এই ভক্তের আলয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করুন।” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মহারাজ বলি। আমি ত সর্বদা ভক্তের সঙ্গেই থাকি। ভক্তের হৃদয় আমার প্রিয় বাসস্থান । আমি সর্বদা তোমার সাথেই আছি। তোমার ভক্তি শ্রদ্ধাতেই আমি আছি। কিন্তু আমি এই অবতারে চতুর্দশ বৎসর কোন রাজকীয় সেবা গ্রহণে অপারগ। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। চতুর্দশ বৎসর সমাপন হতে আর মাত্র কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে।” বলি মহারাজকে কৃপা করে পুনঃ হনুমানের স্কন্ধে চড়লেন । তারপর আবার চললেন। পাতালপুরী সকল দেখতে লাগলেন । অনেক মুনি ঋষি ও পুন্যাত্মা দিগকে দেখতে পেলেন । একসময় সুরঙ্গের পথ ধরে রাম লক্ষ্মণ কে স্কন্ধে নিয়ে হনুমান উঠে আসলেন । ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে এভাবে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে দেখে বানর সেনাদলে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেলো । সকলে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনিতে চতুর্দিক ভরিয়ে দিলেন। ভগবান রাম তখন বিভীষণ ও সুগ্রীবকে আলিঙ্গন প্রদান করলেন । সকল ঘটনা ব্যক্ত করলেন। হনুমানের পুত্র মকরধ্বজের কথা শ্রবণ করে সকলে আশ্চর্য হলেন। খুশী হলেন এই শুনে যে মকরধ্বজ এখন পাতালের রাজা। মহীরাবণ ও অহীরাবণ দুই বধ হয়েছে । ভগবান শ্রীরাম তখন বললেন- “এই সকল অঘটনকে দূর করেছে হনুমান। সেই ছিলো বলে মহীরাবণ আমাদের বলি দিতে অসমর্থ হয়েছে। হনুমানের উপকার আমি কিরূপে শোধ করবো?” হনুমান লজ্জিত হয়ে বললেন- “ছি! ছি! প্রভু! আমাকে লজ্জা দেবেন না। আপনার কৃপাতেই এই সকল সম্ভব । আপনি স্বয়ং মায়াধীশ। মহীরাবণের সাধ্য কি যে সে আপনাকে মায়াজালে নিক্ষেপ করে? এই সকল হয়েছে কেবল আমার দ্বারা মহীরাবণের অন্ত হওয়ার জন্য। এই সকল আপনারই লীলা।”
বানর দলের জয়ধ্বনি লঙ্কায় পৌছে গিয়েছিলো । ত্রিজটা গিয়ে সীতাদেবীকে সব সংবাদ দিলেন। মহীরাবণের ঘটনা শুনে সীতাদেবী শোকে উন্মাদিনী হয়েছিলেন । কিন্তু প্রভু শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ কে অক্ষত অবস্থায় হনুমান ফিরিয়ে এনেছে, হনুমান নিজে মহীরাবণ আর অহীরাবণের বধ করেছে শুনে আনন্দে দেবতাদের ধন্যবাদ প্রদান করতে লাগলেন । হনুমানকে অনেক আশীর্বাদ দিলেন । বললেন- “দাম্ভিক রাবণের এই পরিণতি হওয়ার ছিলো। অহঙ্কারী ব্যক্তি অহঙ্কারে এত শীর্ষে উঠতে চায় যে সে সেখান থেকে পতিত হয়ে নিদারুন ভাবে চূর্ণ হয়। রাবণ সেই রকম।” পুত্র ও নাতির মৃত্যু সংবাদ ও রাম লক্ষ্মণের জীবিত অবস্থায় ফেরা শুনে রাবণ শোকে অস্থির হল। শোকে সে ভূমিতে পতিত হয়ে রোদন করতে লাগলো । “হা পুত্র!” বলে রোদন করতে লাগলো। রাবণ শোকে বলতে লাগলো – “আমার সকল সন্তান, নাতিপুতি সকলেই নিহত হয়েছে। এই শোক আমি কোথায় রাখবো? হে মহেশ্বর! আমি কেনই বা এত শোক পাচ্ছি। আমার বংশে প্রদীপ দেবার কেউ থাকলো না!” এই বলে রাবণ রোদন করতে লাগলো। মন্দোদরী এসে বলল- “স্বামী! আমি এইদিনেরই ভয় পেয়েছিলাম । আমি , আপনার ভ্রাতা বিভীষণ, আপনার পিতামাতা আপনাকে কত বুঝিয়েছিলাম , মনে আছে? যেদিন আপনি সীতাকে হরণ করতে গিয়েছিলেন, সেইদিনই আপনাকে কত বুঝিয়েছি! বারবার বুঝিয়েছি আর বারবার আপনি শক্তির দম্ভ দেখিয়েছেন। শ্রীরাম অজেয়, কেউ তাঁহাকে পরাজিত করতে পারে না। আপনি কারোর কথাই মানেন নি। এই সব হতোই। এখন শোক করে আর কি পুত্রদের ফিরে পাবেন? তাই বলছি সীতাকে ফিরিয়ে দিন। আপনি নতুন করে রাজ্যকে সাজিয়ে পরিচালনা করুন।” রাবণ ক্রোধে বলল- “যে আমার বংশকে নির্বংশ করলো, আমি তার দাবী মেনে নেবো? কদাপি নয়। আমার শ্বাস যতদিন আছে, সীতাকে ফিরিয়ে দেবো না। নাই বা থাকলো কেও। আমি যুদ্ধে গিয়ে জয়ী হয়ে ফিরবো। পুত্রঘাতী সেই শত্রুদের কাহাকেও জীবিত রাখবো না।”
( ক্রমশঃ )

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৩৮)
দেবতাবৃন্দ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞেস করছিলেন , “হে প্রজাপতি! দয়া করে মহীরাবণের সম্বন্ধে বলুন। কেনই সে এত শক্তিশালী?” ব্রহ্মা বললেন- “সুরবৃন্দ! বহু পূর্বে শত্রুধনু নামক এক গন্ধর্ব ছিলো। সে ছিলো ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত । সে ভক্তিতে তন্ময় হয়ে বৈকুণ্ঠে ভগবানের সামনে নৃত্যগীত করতো। তাহার প্রতি ভগবান হরিও তুষ্ট ছিলেন । একদা অষ্টবক্র মুনি ভগবানকে দর্শন করতে এসেছিলেন । প্রতিবন্ধী অষ্টবক্র মুনিকে দেখে শত্রুধনু হাস্য উপহাস করে। এতে অষ্টবক্র কুপিত হয়ে সেই গন্ধর্বকে অভিশাপ প্রদান করে যে সে রাক্ষস হয়ে জন্মাবে। শারীরিক প্রতিবন্ধক নিয়ে হাস্য উপহাস করা আসুরিক লক্ষণ । গন্ধর্ব শত্রুধনু ক্ষমা প্রার্থনা চাইলে মুনি বলেন যে রাক্ষস কুলে জন্মালেও মহামায়া তার ওপর সদয় থাকবেন । অবশেষে ভগবান বিষ্ণু রাক্ষস ধ্বংস করতে নর রূপে আবির্ভূত হবেন। তাঁরই কোন ভক্ত শিরোচ্ছেদ করে তাহাকে মুক্তি দেবেন।” এই ছিলো মহীরাবণের পূর্ব পরিচয় । গভীর নিশি উপস্থিত । মহীরাবণ পূজা শেষ করে রাম লক্ষ্মণ কে এনে হাঁড়িকাঠের সামনে উপস্থিত করলেন । রক্তবস্ত্র, রক্ততিলক ও রুদ্রাক্ষে ভূষিত আলো অন্ধকারময় পাতালভৈরবীর মন্দিরে মহীরাবণের চেহারা অতি ভয়ঙ্কর রূপ বোধ হচ্ছিল্ল। দেবীর মূর্তির পেছনে বসে হনুমান অপেক্ষা করছিলেন । মহীরাবণ বলল- “রাম লক্ষ্মণ! তোমাদের অসীম সৌভাগ্য যে মহামায়ার সেবায় নিয়োজিত হচ্ছ। সষ্টাঙ্গে হাঁড়িকাঠে মাথা রেখে মহামায়াকে প্রণাম করো।” ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ বললেন- “অবশ্যই! কিন্তু একটি সমস্যা আছে। আমরা অযোধ্যার রাজপুত্র। আমাদের পিতা শক্তিশালী নৃপতি ছিলেন। সকলে আমাদিগকে প্রণাম করতো। বনবাসে আসলেও বানরেরা আমাদের প্রণাম করতো। কদাপি আমরা কাহাকেও প্রণাম করিনি । কিভাবে প্রণাম করতে হয়- জানিও না। যদি দেখিয়ে দিবেন, তাহলে বুঝবো।” মহীরাবণ হাস্য করে বলল- “এই ব্যাপার ! বেশ আমি দেখিয়ে দিচ্ছি প্রণাম করার বিঁধি!” এই বলে মহীরাবণ হাস্য করে ‘জয় মা’ বলে হাঁড়িকাঠে মাথা রেখে প্রণাম করতে নিলেন। তখুনি দেবীর মূর্তির পেছন থেকে হনুমান লম্ফ দিয়ে বের হলেন ।হনুমান এসেই প্রথমে হাঁড়িকাঠের শিক আটকে দিলেন। চোখের পলকে দেবীর হস্ত থেকে খড়্গ নিয়ে এককোপে মহীরাবনের শিরোচ্ছেদ করলেন । মহীরাবণের মুণ্ড গড়িয়ে দেবীর চরণে চলে গেলো। দেবীর মূর্তি দেখে মনে হল, তিঁনি খুবুই প্রীতা হয়ে প্রসন্ন হয়ে হাসছেন । দেবী যেনো মহীরাবণের বলি গ্রহণ করলেন । মহীরাবনের রক্তে ভেসে গেলো মন্দির । মহীরাবণের অন্ত হল । হনুমান তখন শ্রীরাম ও লক্ষ্মণের হস্তের বাঁধন খুলে দিলেন । রাক্ষসেরা রে রে করে তেরে আসলো। হনুমানের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ হল। লণ্ডভণ্ড হল পূজাগৃহ। প্রদীপদানি উলটে আগুন ধরল। গদা দিয়ে রাক্ষসদের পিটিয়ে মারলো মারুতি। কাউকে ল্যাজে পেঁচিয়ে ভূমিতে আছরে মারলো । ্কাউকে তুলে আছার দিলো । কাউকে পদতলে পিষ্ট করলো। এই সময় সেই বানর সেনাপতি মকরধ্বজ ছুঁটে আসলো গদা নিয়ে মকরধ্বজের সাথে হনুমানের যুদ্ধ বাঁধলো। কেউ যেনো কাউকে হারাতে পারে না। উভয়ে উভয়কে কিল চর লাথি ঘুষি দিতে লাগলো। উভয়ের গাত্র থেকে রক্ত বের হল। গদার সংঘর্ষে যেনো পাতাল পুরী কেঁপে উঠলো। স্তম্ভাদি সকল ভেঙ্গে পড়তে থাকলো। কে এই বীর! হনুমান ভাবতে লাগলো। এমন সময় এক মতস্যকন্যা এসে বলল- “পুত্র রোষো! পিতার সাথে কেন যুদ্ধ করছ ?” এই শুনে হনুমান চমকে উঠলো। সে বলল- “আপনি মিথ্যা বলছেন! আমি ব্রহ্মচারী। আমি বিবাহ করিনি। কেন এ আমার পুত্র হবে?” মতস্যকন্যা বলল- “পবনপুত্র! এ আপনারই পুত্র। মনে আছে মাতা সীতার আদেশে আপনি পুচ্ছের অগ্নি নির্বাপিত করবার জন্য সমুদ্রে লাঙুল নিমজ্জিত করেছিলেন ? সে সময় আপনার লাঙুলের বারি ধারা আমার উদরে প্রবেশ করে। আমি গর্ভবতী হই । এ আপনার পুত্র! রাক্ষস দের সাথে নিবাস করতে করতে আমিও রাক্ষসের গুণ পেয়েছি। রাক্ষস, অসুরদের মধ্যে ভূমিষ্ঠ শিশু মানবশিশুর থেকেও অনেক শীঘ্র বয়োঃবৃদ্ধি ঘটে। রাক্ষস গুণের ফলে এই মকরধ্বজ রাক্ষসদের সেবা করছে।” এই বলে মতস্যকন্যা বললেন- “পুত্র মকরধ্বজ! তুমি ধর্মের পক্ষ অবলম্বন করো। অধার্মিক দের কেহই রক্ষা করেন না। নিজেই ত প্রমান পেলে। দেবী অম্বিকা কি মহীরাবণকে বাঁচিয়েছেন ? পুত্র! রাক্ষসেরা কদাপি তোমার আপন জন নয়। লঙ্কায় যুদ্ধে রাক্ষসেরা বহু বানরকে হত্যা করেছে। অতএব পুত্র তুমি স্বজাতির পক্ষ অবলম্বন করে ধর্মের মার্গ অবলম্বন করো।”
হনুমান কপালে হাত দিয়ে বসলো। বসে রোদন করে বলতে লাগলো- “এই পৃথিবী আমাকে ব্রহ্মচারী রূপে জানে। আজ আমি কলঙ্কের ভাগী হলাম । আমি এই মুখ কিভাবে দেখাবো? আমার সমস্ত সম্মান ধূলিসাৎ হয়েছে। এ আমি কি পাপ করলাম।” ভগবান শ্রীরাম তখন হনুমানের মস্তকে হস্ত বুলিয়ে বললেন- “হনুমান! রোদন করো না। যাহা হয় তাহার পেছনে কোন শুভ উদ্দেশ্য থাকে। তুমি স্বেচ্ছায় নারীসঙ্গ করো নি। সুতরাং তোমার বিন্দুমাত্র দোষ নেই। নিজেকে অপরাধী ভেবো না। তাহলে তোমার পুত্র মকরধ্বজ অত্যন্ত দুঃখী হবে। তুমি বরং পুত্রকে আলিঙ্গন করে স্নেহ আশীর্বাদ প্রদান করো।” মকরধ্বজ এসে তখন হনুমানের চরণে প্রণাম করতে নিলে হনুমান বলল- “আমাকে নয়। বরং প্রভুকে অগ্রে প্রণাম করো।” মকরধ্বজ গিয়ে ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে প্রণাম করলে তাঁহারা আশীর্বাদ দিলেন- “বীর প্রতাপী হয়ে পাতাল পুরী শাসন করো। সদা ধর্ম পথে থেকো।” এরপর হনুমানকে প্রনাম করলেন মকরধ্বজ । হনুমান , পুত্রকে বুকে জড়িয়ে স্নেহ আশীর্বাদ প্রদান করলেন । এই সময় অহীরাবণ সেনা সমেত এলো। গর্জন করে বলতে লাগলো- “কোথায় সেই আমার পিতৃঘাতী মর্কট?” ভগবান শ্রীরাম বললেন- “অহীরাবণ! দেখো পাপের পথ অবলম্বন করলে কি পরিণাম হয়। তুমি আর পাপ করো না। তোমার পিতাকেই দেখো, তাঁর কি পরিণাম হয়েছে। তোমার সাথে আমার শত্রুতা নেই। এসো আমাদের সহিত সখ্যতা স্থাপন করো।” অহীরাবণ ত মানলো না। হৈহৈ করে তেরে এলো। রাক্ষসেরা সব আসলো। হনুমান গদা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিমিষে অসংখ্য রাক্ষস বধ করলো। রাক্ষসদের দেহের স্তূপ জমল । এরপর অহীরাবণ যুদ্ধে এলো। হনুমানের সাথে প্রবল যুদ্ধ হল। এমন হাতাহাতি লড়াই হল, মনে হল গোটা পাতালপুরী বুঝি ভেঙ্গে পড়বে। অন্তিমে হনুমান , অহীরাবণকে তুলে আছার দিলো ভূমিতে। সেই আছারে অহীরাবণের মস্তক চূর্ণ হল। এইভাবে রাক্ষস পিতাপুত্রের অন্ত হল। ভগবান রামচন্দ্র বললেন- “পাতালপুরী এখন শূন্য। এখানে এখন শাসকের প্রয়োজন । মকরধ্বজ আজ থেকে পাতালপুরীর রাজা হবে।” এরপর বলা হয় পাতালভৈরবী দেবীর আদেশে হনুমান সেই দেবীর বিগ্রহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার যুগ্যাদা শক্তিপীঠে স্থাপন করেছিলেন । এই স্থানে দেবী সতীর দক্ষিণ চরণের অঙ্গুষ্ঠ পতিত হয়েছিলো । তবে মহীরাবণ পূজিত পাতালভৈরবী মূর্তি এখন আর এখানে নেই। এখানে এখন উগ্রচণ্ডী মূর্তিতে দেবীর পূজা হয়। বর্ধমান আসলে আপানার এই পীঠ দেখে যেতে পারেন ।
( ক্রমশঃ )
রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৩৭)
হনুমান পুনঃ ক্ষুদ্রাকৃতি হয়ে মহীরাবণের রাজপ্রাসাদে ঘুরতে থাকলেন। সেই প্রাসাদ এত সৌন্দর্যে ভরা ছিলো যে অবাক হতে হয়। স্তম্ভে খোদাই করা মূর্তি গুলি অতি মূল্যবাণ রত্নাদি দ্বারা সজ্জিত ছিলো। এবং তাদের দ্যুতিতে জায়গা জায়গাতে আলোকিত হয়ে ছিলো । নানা রকম বাদ্য বাজনা আদি বেজে চলছে । একস্থানে দেখতে পেলো বলি দেবার জন্য নানা পশু ছাগ- মেষ- মহিষ এনে রাখা হয়েছে । তারপর সে দেখলো মহীরাবণের স্থাপিত সেই মন্দির। অপূর্ব সুন্দর মন্দিরের গাত্র গুলি সোনা, হীরা, মাণিক্য দ্বারা নির্মিত ছিলো। স্বর্ণ ইঁট দ্বারা মন্দিরের গাত্র তৈরী । এই দেখে হনুমান তাজ্জব হল। সামনে দেখতে পেলো মন্দিরের প্রবেশ পথ। দ্বার বন্ধ। হনুমান দ্বারের তল দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলো। দেখলো প্রদীপের আলোকে চারপাশে ভরে থাকলেও কেমন একটা আলো আঁধারি পরিবেশ । ধূপের গন্ধ চতুর্দিকে ভরে গেছে। সামনে দেখতে পেলেন পাতালভৈরবীর বিগ্রহ । ভয়ানক রূপ সেই দেবীর । উগ্রা রূপিনী- এলোকেশী- কেশ রাশি চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত দেবীর। চরণে শায়িত মহাকাল । দেবীর কণ্ঠে নর করোটির মাল্য। চতুর্দিকে নর করোটি রাখা। দেবীর হস্তে খড়্গ- ত্রিশূল- ঢাল- গদা- চক্র- শঙ্খ – পদ্ম ধনুর্বাণ শোভা পাচ্ছে । দেবীর নয়ন ত্রয় অতি বৃহৎ ও গোলাকার। হনুমান গিয়ে দেবীর সামনে প্রথমে প্রণাম করলো। তাহার পর বললেন- “মাতঃ! এ তোমার কিরূপ লীলা? তুমি নিজেই অসুর বধ করে ধর্ম রক্ষা করেছো। কিন্তু মা তুমি পুনঃ কেন এই দানবিক শক্তিকে কৃপা করছ? মা তুমিই এইস্থানে মুক্তির উপায় প্রদর্শন করো। কিরূপে আমি মহীরাবণের বিনাশ করবো ? মা তুমিই বলে দাও। এই অধার্মিক মহীরাবণ আজ সফল হলে এই পৃথিবী থেকে ধর্ম, সত্য, পুণ্যের বিনাশ হবে।” এই বলে হনুমান , দেবী পাতালভৈরবীর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন। কৈলাসে বসে হর গৌরী এই লীলা সকল দেখছিলেন। ভগবান শিব তখন মাতা পার্বতীকে বললেন- “দেবী! তুমি কার পক্ষ অবলম্বন করবে? ভক্তের না হনুমানের ? ঈশ্বর রূপে ভক্তের সঙ্গে থাকাই কর্তব্য। দেবী তুমি কার পক্ষ অবলম্বন করবে?” এই বলে মহাদেব , দেবীর পরীক্ষা নিচ্ছিল্লেন । মাতা ভবানী তখন সেই কৌতুকের জবাব দিলেন ।দেবী বললেন- “স্বয়ং ভোলানাথ নিজেও নিজের ভক্ত রাবণকে ত্যাগ করেছেন ? তিঁনি যখন পাপের সঙ্গ দিলেন না, তাঁহার অর্ধাঙ্গিনী কিরূপে পাপীকে সহায়তা প্রদান করবে? প্রভু! আপনি সকল কিছুই জানেন। মহীরাবণ কদাপি আমার ভক্ত ছিলো না, সে কেবল স্বার্থান্ধ । ভক্ত তাঁহাকেই বলে যে ঈশ্বরকে ভালোবাসে, যে ঈশ্বরের সৃষ্ট সকল জীবে ঈশ্বরকে দর্শন করে তাহাদিগকে ভালোবাসে, ভক্ত তাহাকেই বলে যে ঈশ্বরলাভ ভিন্ন অপর কিছুই চায় না। মহীরাবণের মধ্যে এই সকল কোন গুনই নেই, যেমন তার পিতা রাবণের মধ্যেও নেই। এতকাল ধরে সে আমার উপাসনা করেছে, কেবল নিজ স্বার্থ সিদ্ধির নিমিত্ত । আমার প্রদত্ত শক্তিকে অসৎ কাজে প্রয়োগ করে এসেছে। এমন স্বার্থান্ধ ব্যক্তি কদাপি ভক্ত হতে পারে না। এই যুদ্ধে আমি মহীরাবনকে কোন সহায়তা প্রদান করবো না। আমি ধর্মের সঙ্গেই ছিলাম ও থাকবো।” অপরদিকে হনুমান সমানে মাকে ডেকে চলছে। ক্রোধে বললেন- “মাতঃ! যদি তুমি আজ নিশ্চুপ থাকবো- তবে বুঝবো তুমি পাষাণ। তোমার মূর্তি আমি চূর্ণ করবো।”
সবংশে মারিব মহী দেখিবে পশ্চাতে ।
ডুবাব তোমারে জলে মন্দির শিতে ।।
রামের কিঙ্কর আমি সুগ্রীবের দাস ।
এত শুনি দেবীর ঈষৎ হৈল হাস ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
হনুমান দেখলো হঠাত যেনো মন্দির ঝলমল করে উঠলো। দিব্য জ্যোতিতে মন্দির পূর্ণ হল। মায়ের বিগ্রহ থেকে দিব্য জ্যোতি বিচ্ছুরিত হতে লাগলো। সেই জ্যোতি ধরেই মহামায়া আবির্ভূত হলেন । দেবী হাস্য করে বললেন- “হনুমান! মহীরাবণের অন্তিম দিন আজ। আমি নিজে দুষ্ট দানব বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেছি। কদাপি আমি এই পাপীর বিজয় ইচ্ছা করি না। এই দুর্মতি আমার প্রদত্ত শক্তির অপব্যাবহার করে গেছে। পুত্র মারুতি! আমার বরে মহীরাবণ পশুর হাতেই বধ্য । আর তাকে বধ করবে তুমি। তাও এই মন্দিরে । আজ সেই দুরাচারীর বলি গ্রহণ করবো আমি। তুমি তাহাকে এই মন্দিরেই বধ করবে।”
হনুমান বলল- “মাতঃ! এতই যখন কৃপা করলে, তখন বলে দাও কিভাবে আমি মহীরাবণকে বধ করবো?” দেবী অম্বিকা বললেন- “হনুমান। এই সকল ঘটনা পূর্ব কল্পিত । আমার বরে মহী কেবল পশুর হাতেই বধ্য। শ্রীরাম এই সত্য জানতেন । তিঁনিই ইচ্ছা করে এই স্থানে এসেছেন, যাতে তাঁর অন্বেষণে তুমি এইস্থানে এসে মহীকে বধ করতে পারো। পুত্র হনুমান, শ্রীরাম স্বয়ং মায়াধীশ। তাঁর ওপর কোন মায়াই প্রভাব খাটাতে পারে না। এই সকল লীলা কেবল তোমার হস্তে মহীর নিধন করবার জন্য। কারণ মহী বধ না হলে, রাবণ বধ হওয়ার পর ধর্মাত্মা বিভীষণ নিষ্কণ্টক ভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে পারবে না। পাতালে রাক্ষসদের রাজত্ব কেউই রোধ করতে পারবে না। তাই রাক্ষসদের গোড়া থেকেই নির্মূল করাই শুভ হবে। আমি তোমাকে বুদ্ধি দিচ্ছি, শ্রবণ করো।” এই বলে দেবী পাতালভৈরবী বুদ্ধি দিয়ে আশীর্বাদ করে অদৃশ্য হলেন । হনুমান ফিরে এসে ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে সব বলে বললেন- “প্রভু! বলি দেবার আগে মহীরাবণ আপনাদের প্রণাম জানাতে বলবেন। আপনারা বলবেন , যে আমরা অযোধ্যার রাজকুমার। আমরা প্রনাম করতে জানি না। কিভাবে প্রণাম করতে হয়, দেখিয়ে দিতে। এই শুনে মহীরাবণ নিজেই প্রণাম করা দেখাতে গেলে আমি খড়্গ দিয়ে মহীরাবনের শিরোচ্ছেদ করবো। আমি পাতালভৈরবীর মূর্তির পেছনে আত্মগোপন করে থাকবো।” এই বলে হনুমান মন্দিরে গিয়ে ফলমূলাদি ভক্ষণ করলেন। তার পর মূর্তির পেছনে লুকালেন। রাত নেমে অন্ধকার নেমে আসলো। রাম, লক্ষ্মণকে স্নান করানো হল। মহীরাবণ পূজাতে বসলেন। তন্ত্র বিধানে পাতালভৈরবীর উপাসনা করে চলছেন। একে একে পশুগুলিকে বলি দিলেন। রক্ত নদীর ধারা দেবীর মন্দির থেকে নেমে এলো ।
( ক্রমশঃ )
রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৩৬)
হনুমান এরপর আরোও অগ্রসর হল। দেখলো বিচিত্র সব অট্টালিকা। আর তাহাতে বিচিত্র সব জন বাস করছে । বড় বড় বৃক্ষ দেখলো। পর্বত প্রমান সেই উচ্চ বৃক্ষ তল বাঁধানো। সেখানে মানুষেরা বসে নানা গল্পগুজব করছে । মনে মনে হনুমান ভাবলেন এই পুরেই ত ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ আছেন । কারণ এইস্থান রাক্ষসদের বস্তি । আর এখানেই মহীরাবণ রাজত্ব করে। অশ্ব, হস্তী, রথ সকল দেখলো। এই দেখে হনুমান একটি বৃক্ষের ওপরে উঠলো ।মর্কট রূপেতে রহে বৃক্ষের উপর ।
বিচিত্র নির্মাণ ঘাট দেখে সরোবর ।।
বহু লোক আসি তথা করে স্নান দান ।
বানর দেখিয়া হয় চমৎকার জ্ঞান ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
হনুমান বৃক্ষের উপরে উঠে সমগ্র স্থান দেখছিলেন । ক্ষুধায় সেই বৃক্ষের ফল সেবা নিলেন । এই রাজ্যের রাক্ষসেরা ধর্ম কর্ম করে। দেখে আশেপাশে মন্দিরে রাক্ষসেরা পূজা দিচ্ছে। স্নান সেড়ে দানধ্যান আদি পুণ্যকর্ম করছে । কেউ কেউ আবার হনুমানের দিকে চেয়ে দেখছিলো। ভাবছিলো এমন বানর এখানে কোথার থেকে আসলো ? এই রাজ্যে বানর ত নেই। ঘাটে বসে বৃদ্ধারা সকলে গল্প করছিল। বৃদ্ধা বলছিল- “এই বানর এখানে কিভাবে এলো? মহারাজ মহীরাবণ জানলে একে শূলে চড়াবে।” অন্যরা বলল- “মনে হয় মহারাজ মহীরাবণ খুবুই বীর! তিনি কাউকে ভয় পান না।” বৃদ্ধা বলল- “কেনই বা ভয় পাবেন ? মহামায়ার কৃপায় তিনি অজেয়। বহু আগে তিনি মহামায়ার উপাসনা করে বর পেয়েছেন যে - দেবতা, নর, গন্ধর্ব, যক্ষ, পিশাচ, রাক্ষস, কিন্নর কেউই তাহাকে বধ করতে পারবে না। কেবল বনের পশুই তাহাকে বধ করতে পারবে।” এরপর বৃদ্ধা হেসে বলল- “বনের পশুর আর সাহস কি যে সে রাক্ষস রাজ মহীরাবণকে বধ করে? সে ত দেখেই ভয়ে পলায়ন করবে।” অন্যেরা তখন বলল- “রাজবাটিতে এত বাদ্য কেন বা বাজে? সেখানে সবাই কেন আনন্দিত হয়ে নৃত্য করছে? কিসের উৎসব?” বৃদ্ধা বলল- “তাহা আমি কি জানি বাপু! খানিক বাদেই রাজবাটির বৃদ্ধা দাসী এখানে স্নানে আসবেন। তোমরা তাহাকেই জিজ্ঞাসা করো।” সত্যই মহীরাবণের রাজ মহলে ঢাক, ঢোল, ন্যাকরা , দুন্দুভি, বাঁশী, শিঙা বাজছিলো। সেখান থেকে নৃত্যগীতের আওয়াজ আসছিলো ।
হনুমান সব শুনছিল। সে ভাবল এবার রাজ মহলের দিকে যেতে হবে । একটু পর রাজবাটির বৃদ্ধা দাসী স্নান করতে এলো। তাহাকে সবাই জিজ্ঞাসা করলো- “বলুন । রাজবাটিতে এত আনন্দ উৎসব কেন হচ্ছে ? কি এর কারণ?” বৃদ্ধা দাসী বললেন- “আমি তাহা বলিতে পারি না। বাতাসেরও কান আছে। যদি মহারাজ মহীরাবণের কানে এই সংবাদ যায় তাহলে আমার গর্দান যাবে।” তবুও সকলে নাছোড়বান্দা । সকলে জোর করলে বৃদ্ধা দাসী চারপাশে দেখলো যে কেউ আছে নাকি। তারপর বলল,
বৃদ্ধা নারী বলে শুন যতেক রূপসী ।
রাজার বাটীর কথা কৈতে ভয় বাসি ।।
কহিঁতে নিষেধ আছে কহিবারে নয় ।
প্রকাশ না কর কথা দণ্ড চারি ছয় ।।
জিজ্ঞাসা করিলে যদি সঙ্গোপনে বলি ।
মহামায়া- কাছে আজি হবে নরবলি ।।
আনিয়াছে দুটি শিশু পরম সুন্দর ।
না দেখি এমন রূপ অবনী ভিতর ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )
বৃদ্ধা এরপর বললেন- “মহারাজ সেই রাম- লক্ষ্মণকে এনেছেন । যাদের সাথে এখন লঙ্কারাজ রাবণের যুদ্ধ চলছে। শুনেছি সেই দুই ভ্রাতা অযোধ্যার রাজকুমার। বিমাতার ইচ্ছায় বনে এসে থাকছিলো। তাঁহারা ক্ষত্রিয়। আজ তাহাদের বলি দেবেন নিশিপূজায়। তাই আজ এত ঢাক ঢোল বাজছে। এই কথা যেনো কাকপক্ষীও টের না পায়, তবে আমার প্রান যাবে।” হনুমান সব শুনে মাথায় হাত দিলো। সর্বনাশ! আজ রাত্রেই কি বলি দেবে। তবে যা করবার আজকেই করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে হনুমান আবার মক্ষী আকৃতি হয়ে চলল। মহীরাবণের রাজমহলে প্রবেশ করলো। সেখানে ঢুকে সে এক তাজ্জব ব্যাপার দেখলো। দেখলো যে হুবুহু তাঁর মতোন দেখতে এক কিশোর বানর মহলে প্রহরা দিচ্ছে। হঠাত সে দেখলো এক রাক্ষস এসে সেই বানরকে বলল- “সেনাপতি মকরধ্বজ ! তুমি অতি সতর্কে মহল প্রহরা দেবে। রাম, লক্ষ্মণ কে নিয়ে আসা হয়েছে। কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। বানরেরা নিশ্চয়ই বসে নেই। তারা যেন এখানে না আসতে পারে।” হনুমান বুঝতে পারলো যে এই বানরের নাম মকরধ্বজ । সে পাতালে এসে রাক্ষসদের মাঝে এমন রাক্ষস অনুগত বানরকে দেখে যারপরনাই আশ্চর্য হল। এবার হনুমান খুঁজতে লাগলো, কোথায় রাম ও লক্ষ্মণ আছেন।
দুষ্ট মহীরাবণ কোথায় প্রভু শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে লুকিয়ে রেখেছে – তাই খুঁজে বেঁড়াতে লাগলো মহীরাবণ । রাক্ষসের মহল অতি সুন্দর ও সুশোভিত। বিচিত্র সব অট্টালিকা তে হীরা, মুক্তা, মণি দ্বারা নানা রকম নকশা খোদাই করা। জায়গা জায়গাতে ঝর্ণা । উদ্যানে নানা সুশোভিত সুগন্ধি ফুলের গাছ দেখলো। আর দেখলো বিচিত্র আকৃতি রাক্ষসেরা নানা অস্ত্র নিয়ে মহল প্রহরা দিচ্ছে । ক্ষুদ্রাকৃতি হনুমান কারোর নজরে এলো না । স্বেচ্ছায় হনুমান সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে লাগলেন । সুন্দর, সুশোভিত মহলে গিয়ে মহীরাবণের স্ত্রীকে দেখতে পেলো। কোন কক্ষে মহীরাবণের পুত্র অহীরাবণকে দেখতে পেলো। এই ভেবে ঘুরতে ঘুরতে হনুমান কারাগারে প্রবেশ করলো। দেখলো ভগবান শ্রীরাম ও ভ্রাতা লক্ষ্মণ একটি কক্ষে আছেন। সাতটি লৌহ কপাট পার করে সেখানে যেতে হয় । হনুমান খুঁজতে খুঁজতে ভগবান শ্রীরামের কাছে ক্ষুদ্র শরীর নিয়ে কপাটের তলা দিয়ে প্রবেশ করে গেলেন। দেখলেন ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ শয়ন করছেন। আর দেখলেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিপীলিকাদল মুখে চিনি বয়ে এনে ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণের মুখে দিচ্ছেন। হনুমানের খুব দয়া হল পিপীলিকাদের ওপর। হনুমানের স্পর্শে ভগবান রাম ও লক্ষ্মণ জেগে উঠলেন। জেগে উঠে বললেন- “আমরা কোথায়?” হনুমান তখন স্বাভাবিক রূপে এসে বললেন- “প্রভু! এ পাতাল পুরী। দুষ্ট মহীরাবণ আপানদের বলি দেবার জন্য এখানে মায়া দ্বারা এনেছেন। আপনারা সেই মায়া নিদ্রায় অচেতন ছিলেন। আপনারা চিন্তা করবেন না, মহীরাবণকে বধ করে আপনাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবো।” পরমেশ্বর ভগবান শ্রীরাম পিঁপড়েদের এমন ভক্তি দেখে অবাক হলেন। অচেতন অবস্থায় তারা সকল চিনি মুখে এনে দিয়েছে। ভগবান শ্রীরাম বললেন, “এই পিপীলিকার দল আমার সেবা করছে। হে পিপীলিকাগণ আমি তোমাদের আশীর্বাদ দিচ্ছি, আজ হতে পূজার যে সকল নৈবদ্য ভূমিতে পতিত হবে, তাহাতে তোমাদেরই অধিকার থাকবে। সর্ব অবস্থায় তোমরা জীবিত থাকতে পারবে। কদাপি তোমাদের বংশ নাশ হবে না।” এরপর ভগবান শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ বললেন- “কিন্তু সেই মায়াবী রাক্ষসের থেকে মুক্ত হবো কিভাবে?” হনুমান বলল- “এই উপায় আমিও জানি না। মহীরাবণ যাঁর চরণে আপনাদের বলি দেবে বলে স্থির করেছে, সেই দেবীকেই জিজ্ঞাসা করি। আশা করি সেই দেবী নিরাশ করবেন না। তিনি ধর্মের পক্ষই অবলম্বন করবেন।” এই বলে হনুমান পুনঃ মক্ষী রূপে কারাগার থেকে বের হল ।
( ক্রমশঃ )
১৬ জুন ২০১৬
হনুমান জী, শ্রীরামচন্দ্রের একনিষ্ঠ সেবক
হনুমান জী, শ্রীরামচন্দ্রের একনিষ্ঠ সেবক। মা সীতার অপহরণের পর হনুমান জীর উদ্যোগে ভগবান রামচন্দ্রের সাথে বানর রাজ বালীর ভাই সুগ্রীবের বন্ধুত্ব হয়। বালী আবার নিজ ভ্রাতা সুগ্রীবের বৌ রুমাকে অপহরণ করে বন্দী করে রেখেছিল- রামচন্দ্র বালীকে বধ করে সুগ্রীবকে বানর জাতির রাজা বানান। হনুমান জী প্রথম অপহৃতা মা সীতার সংবাদ আনেন। ভগবান রামচন্দ্রের লঙ্কা আক্রমণ কালে হনুমান জী নিজে প্রচুর রাক্ষস সৈন্য, বড় বড় রাক্ষস বীরদের বধ করেন, এবং যুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্রে আহত লক্ষণ এর প্রান বাঁচাতে তিনি গন্ধমাদন পর্বত টাই তুলে আনেন। এভাবে হনুমান জী ভগবান রামচন্দ্রের সেবা করেন। হনুমান জীর প্রবল ভক্তির একটি কথা পুরানে পাওয়া যায়। ভগবান রামচন্দ্র তখন রাক্ষস বাহিনী আর লঙ্কেশ রাবণকে বধ করে ভাই লক্ষণ ও সীতাদেবীকে নিয়ে ১৪ বছর বনবাস শেষে অযোধ্যাতে ফিরেছেন। একদা মা সীতা দেবী হনুমান জীকে একটি মুক্তার মালা উপহার দিলেন। ভক্ত হনুমান জী মালাটি নিয়ে দেখে, নেড়ে চেড়ে ছিড়ে মুক্তো গুলো দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ফেলে দিলেন। সকলে অবাক হল। ভাবল বনের পশু মুক্তার মালার মর্ম কি জানে? সকলে হনুমান জীকে কারন জিজ্ঞাসা করলে হনুমান জী বললেন- “যাহাতে রাম নাম নেই- তাহাতে কি প্রয়োজন?” সকলে বলল- “তাই যদি হয়- তবে তোমার অন্তরে কি রাম নাম আছে? থাকলে দেখাও দিকি।” এই শুনে হনুমান জী নিজের নখ দিয়ে নিজের বুক বিদীর্ণ করলেন- সকলে দেখলো সেখানে ভগবান রামচন্দ্র মা সীতা বিরাজমান। হনুমান জীর এই শিক্ষা আমাদের পথ দেখায়। যাঁহাতে ভগবানের নাম নেই, যেখানে ভগবানের নাম কীর্তন হয় না - সেই স্থান পরিত্যাগ করা উচিৎ।
হনুমান জী দ্বাপর যুগেও ছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছেন। হনুমান জীর অনুরোধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-ভগবান রামচন্দ্রের রূপ ধারন করে হনুমান জীকে একবার দর্শন দিয়েছিলেন। এবং বলা হয় হনুমান জী পরম বৈষ্ণব, ভগবান হরির প্রিয় ভক্ত। একটি মন্ত্রে বলা হয় –
যত্র যত্র রঘুনাথকীর্তনং তত্র তত্র কৃতমস্তকাঞ্জলিম্।
বাষ্পবারিপরিপূর্ণলোচনং মারুতিং নমত রাক্ষসান্তকম্।।
অর্থাৎ -- যেখানে যেখানে রঘুনাথের গুণগান করা হয়, সেখানে সেখানেই যিনি মস্তকে অঞ্জলি স্থাপনপূর্বক সাশ্রুনয়নে অবস্থান করেন, সেই রাক্ষস বিনাশী মারুতিকে (হনুমান) সকলে নমস্কার করুন।
হনুমান জীর প্রনাম মন্ত্রে বলা হয় --
মনোজবং মারুততুল্যবেগং
জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্।
বাতাত্মজং বানরযূথমুখ্যং
শ্রীরামদূতং শিরসা নমামি।।
অর্থাৎ -- যিনি মন ও বায়ূর ন্যায় দ্রুতগামী, বুদ্ধিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বানর বাহিনীর অধিনায়ক, সেই শ্রীরামের দূত, জিতেন্দ্রিয় পবন নন্দনকে অবনত মস্তকে নমস্কার করি।
courtesy by : Prithwish Ghosh
হনুমান জী দ্বাপর যুগেও ছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছেন। হনুমান জীর অনুরোধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-ভগবান রামচন্দ্রের রূপ ধারন করে হনুমান জীকে একবার দর্শন দিয়েছিলেন। এবং বলা হয় হনুমান জী পরম বৈষ্ণব, ভগবান হরির প্রিয় ভক্ত। একটি মন্ত্রে বলা হয় –
যত্র যত্র রঘুনাথকীর্তনং তত্র তত্র কৃতমস্তকাঞ্জলিম্।
বাষ্পবারিপরিপূর্ণলোচনং মারুতিং নমত রাক্ষসান্তকম্।।
অর্থাৎ -- যেখানে যেখানে রঘুনাথের গুণগান করা হয়, সেখানে সেখানেই যিনি মস্তকে অঞ্জলি স্থাপনপূর্বক সাশ্রুনয়নে অবস্থান করেন, সেই রাক্ষস বিনাশী মারুতিকে (হনুমান) সকলে নমস্কার করুন।
হনুমান জীর প্রনাম মন্ত্রে বলা হয় --
মনোজবং মারুততুল্যবেগং
জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্।
বাতাত্মজং বানরযূথমুখ্যং
শ্রীরামদূতং শিরসা নমামি।।
অর্থাৎ -- যিনি মন ও বায়ূর ন্যায় দ্রুতগামী, বুদ্ধিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বানর বাহিনীর অধিনায়ক, সেই শ্রীরামের দূত, জিতেন্দ্রিয় পবন নন্দনকে অবনত মস্তকে নমস্কার করি।
courtesy by : Prithwish Ghosh
১৫ জুন ২০১৬
রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ১০ )
চতুর্দশ শক্তিশালী রাক্ষসের নিধনের বার্তা পেয়ে খড় আর দূষণ আশ্চর্য, অবাক ও অতিশয় ক্রুদ্ধ হল। তারা রাগে গর্জন করতে করতে সমস্ত রাক্ষস সেনাকে হস্তি, অশ্ব, রথ সহ তৈরী হতে আদেশ দিলেন । দূষণ রাক্ষস ছয় হাজার সেনা সমেত যুদ্ধে চললেন, এছাড়া খড় রাক্ষস অযূথ রথ, অশ্বারোহী , হস্তী বাহিনী, পদাতিক রাক্ষস সেনা নিয়ে চললেন। খড়ের সেনাপতি বিকট দর্শন ত্রিমস্তকধারী ত্রিশিরা রাক্ষস প্রকাণ্ড মুগুর নিয়ে রথে উঠলেন । হৈ হৈ করতে করতে ভয়ানক দর্শন রাক্ষসেরা আসতে লাগলো । বন জঙ্গলে ভেঙ্গে, প্রকাণ্ড বৃক্ষ গুলিকে উৎপাটন করে রাক্ষসেরা আসতে লাগলো। অযূথ রাক্ষসের আগমনে মনে হতে লাগলো এক ঝড় যেনো জঙ্গল মধ্য দিয়ে ধেয়ে আসছে। রাম বললেন- “লক্ষণ তুমি জানকী সহিত পর্বতের গুহায় আশ্রয় নাও। এই রাক্ষসদের সাথে আমি এখন যুদ্ধ করবো।” লক্ষণ বলল- “অগ্রজ! আপনি কেন আমাকে এত দুর্বল বিবেচোনা করেন? আমি চোখের পলকে এই রাক্ষসদের ধ্বংস করতে পারবো। আপনি ও বৌঠান দুজনে বিশ্রাম করুন। আমি এদের যমালয়ে প্রেরন করবো।” রামচন্দ্র মৃদু হাস্য করে বললেন- “লক্ষণ, ভ্রাতা ! আমি জানি তুমি এই সকল রাক্ষস তৃণবৎ নষ্ট করতে পারবে। কিন্তু এই রাক্ষসদের বিনাশ করতে আমি ইচ্ছা করি। তাই ইহাদিগকে আমি ধ্বংস করবো।” অগ্রজের আদেশ মেনে লক্ষণ তখন সীতাদেবীকে নিয়ে পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন । অপরদিকে খড়, দূষণ তার বিশাল সেনা নিয়ে এসে সমানে চতুর্দশ সেনার দেহ দেখতে পেলেন। শৃগাল, শকুন, কাকেরা সেই মৃতদেহ আনন্দে ভক্ষণ করছে। খড় রামচন্দ্রের সুন্দর কোমল রূপ দর্শন করে বললেন- “ওহে বনবাসী যোদ্ধা। আমি জানি তুমি বীর। তোমার মতো বীরকে দেখে আমার হত্যা করতে মন চাইছে না। তুমি তোমার স্ত্রীকে আমাদের হস্তে সমর্পণ করে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমরা তোমাকে ক্ষমা করবো।” রামচন্দ্র বললেন- “ওহে দুর্মতি! যুদ্ধক্ষেত্রে বাক্যালাপ না করে যুদ্ধ করো। দেখি তোমার শক্তি কত!”
খড় ক্রুদ্ধ হয়ে আক্রমণ করতে আদেশ দিলেন । হৈ হৈ করে “রামকে মারো” বলে রাক্ষসেরা উজ্জ্বল শানিত অস্ত্র নিয়ে ধেয়ে গেলো। শ্রীরামচন্দ্র মন্ত্র পড়ে বজ্র বাণ, ইন্দ্রাস্ত্র বাণ নিক্ষেপ করলেন । বাণের প্রভাবে আকাশ থেকে অনেক জোরে শব্দ করে বজ্রপাত হতে লাগলো। সেই বজ্রে রাক্ষসেরা ঝলসে গেলো। ভগবান রাম পর্বত বাণ নিক্ষেপ করলেন। গগন থেকে পর্বতের চূড়ার ন্যায় শিলাখণ্ড পতিত হল । সেই শিলার আঘাতে রথ, হস্তী, অশ্বারোহী সকল পিষ্ট হতে লাগলো। রক্ত নদীর ধারা প্রবাহিত হতে লাগলো বর্ষার জলে পুষ্ট নদীর জলের ন্যায় । পবন বাণ নিক্ষেপ করে রাক্ষসদের বহু উচুতে নিয়ে গেলেন, সেখান থেকে ভূপতিত হয়ে শয়ে শয়ে রাক্ষস চূর্ণবিচূর্ণ হল । গৃধ, কাক আদি মাংসাশী প্রানী ও শৃগালেরা মনের সুখ বিচরণ করতে লাগলো মাংস খণ্ডের আশায় । দেবতারা আকাশে জড় হলেন এই যুদ্ধ দেখবার জন্য । ভগবান রাম এরপর সূচীমুখ, শিলামুখ বাণ নিক্ষেপ করলেন। রাক্ষসদের হাত, পা, মুণ্ড কেটে কেটে বহু দূরে দূরে পতিত হল। উড়ন্ত কাক, গৃধ, শৃগালেরা সেই মাংস পাবার জন্য নিজেদের মধ্যে কোন্দল করতে লাগলো। অবশেষে এত রাক্ষসের ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উড়ে এলো যে তারা কোন্দল ভুলে মনের সুখে রক্ত, মাংস, নাড়ি-ভুঁড়ি ভোজন করতে লাগলো । মুণ্ডুহীন রাক্ষসেরা কবন্ধের ন্যায় মায়াবলে উঠে দাঁড়িয়ে নৃত্য করছিলো। ভগবান রাম অগ্নিবাণ ছুড়লেন । আকাশ থেকে অগ্নিপিণ্ড পতিত হতে লাগলো। অগ্নিতে ভস্ম হয়ে রাক্ষসদের ভস্ম চতুর্দিকে আচ্ছন্ন করে দিলো । অগ্নিতে হস্তী, অশ্ব আদি ভস্ম হল। রামচন্দ্রের নিক্ষেপিত দিব্যাস্ত্র থেকে হাজার হাজার শর উৎপন্ন হয়ে রাক্ষসদের বুকে বিদ্ধ হল। রক্তে মেদিনী কর্দমাক্ত হয়েছিলো। এরপর ভগবান রাম পুনঃ শিলাবাণ নিক্ষেপ করে বাকী রথ, হস্তী, অশ্বগুলি রাক্ষস সহিত পিষ্ট করলেন । এভাবে হত হতে দেখে ত্রিশিরা রাক্ষস এসে রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করলো । ত্রিশিরার সব অস্ত্র ভগবান রাম ধ্বংস করে দিলেন । ত্রিশিরা ক্রুদ্ধ হয়ে হস্তের প্রকাণ্ড মুগুর নিক্ষেপ করলে ভগবান রাম সেই মুগুর ধ্বংস করলেন। তারপর তিনটি শর দিয়ে ত্রিশিরার তিন মস্তক কেটে ফেললেন।
সব রাক্ষস অন্ত হয়েছে। এখানে দেহের স্তূপ জমেছে। রক্তনদীর ধারা গিয়ে গোদাবরীতে মিশেছে। চতুর্দিকে মাংসাশী প্রানী সকল মনের আনন্দে নিহত রাক্ষসদের ভক্ষণ করছে। দেহের স্তূপে বড় বড় বৃক্ষ গুলি চাপা পড়ে গেছে । দূষণ রাক্ষস রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করলেন । নানা দিব্যাস্ত্র রামচন্দ্রের দিকে নিক্ষেপ করলেও সব শর রামচন্দ্রের চালিত বাণে ধ্বংস হয়ে গেলো। এরপর ভগবান রাম তীক্ষ্ণ শর দ্বারা দূষণের রথের অশ্ব, সারথি, ধ্বজ, ছত্র, চক্র সব খণ্ডন করে গোটা রথ টাই খণ্ড খণ্ড করলেন । দূষণ লম্ফ দিয়ে ভূমিতে নেমে শূল নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলে , রামচন্দ্র গন্ধর্ব বাণে দূষণের দেহ দ্বিখণ্ড করে দিলেন । ভ্রাতাকে নিহত হতে দেখে খড় শোক পেলো। রথ হতে নেমে ক্রুদ্ধ হয়ে একাকী খড় রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধ করতে লাগলো। খড় বাণে বাণে আচ্ছদিত করে রামচন্দ্রকে ঢেকে দিলো। রামচন্দ্র বললেন- “মূর্খ রাক্ষস তুমি এমন বালকদের ভাতি কেন যুদ্ধ করছ? তোমার শর আমার গাত্রে পুষ্পসম ঠেকছে। যাও ভালো মতো যুদ্ধবিদ্যা শিখে এসো।” খড় ক্রোধে অধীর হয়ে এক বাণে রামচন্দ্রের ধনুক খণ্ড খণ্ড করে দিলো । রামচন্দ্র তখন মহর্ষি শরভঙ্গ প্রদত্ত শার্ঙ্গ ধনুক নিলেন। প্রবল বীক্রমে যুদ্ধ করলেন । রামচন্দ্রের শরে খড়ের সর্বাঙ্গ রক্তে প্লাবিত হল। রক্তে রক্তময় চতুর্দিকে। যেনো এইস্থানে রক্তবৃষ্টি হয়েছে। গাছগুলি নিজস্ব বর্ণ হারিয়ে রক্তবর্ণ ধারন করেছে। মাংসাশি পশু পক্ষী গুলির গাত্রবর্ণ অবধি রক্তবর্ণ হয়েছে । এরপর রামচন্দ্র দিব্যাস্ত্রে খড়ের বধ করলেন। সব রাক্ষস নিহত। দণ্ডকারণ্যে আর রাক্ষসের অস্তিত্ব নেই । মুনি ঋষি, ঊর্ধ্বে দেবতাবৃন্দ ভগবান রামের ওপর পুস্প বর্ষণ করে স্তব স্তুতি করতে লাগলেন । শূর্পনাখা ক্রন্দন করতে করতে লঙ্কায় গমন করলো । রাক্ষসেরা ভগবানের হাতে নিধন হয়ে দিব্যদেহ প্রাপ্ত করে বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্তি করলো । নিহত রাক্ষসদের দেহের স্তূপে যেনো মনে হয় বিধাতা এই স্থানে পর্বতমালা তৈরী করেছেন । চতুর্দিকে কেবল রাক্ষসদের খণ্ড খণ্ড দেহ, খণ্ড অস্ত্র, খণ্ড রথ- অশ্ব- হস্তী , কীরিট , রক্তাক্ত আভূষণ ব্যতীত আর কিছুই দেখা গেলো না ।
( ক্রমশঃ )













